ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আত-তাফসীরুল মুয়াসসির (التفسير المعاصر)
বিষয় কোড: 201202 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৫টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ১টি সহ মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]
ক-বিভাগ (مجموعة أ)
١- قوله تعالى: قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ ثُمَّ انْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ – قُلْ لِمَنْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلْ لِلَّهِ كَتَبَ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ لَيَجْمَعَنَّكُمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَا رَيْبَ فِيهِ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ فَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ.
[১. মহান আল্লাহর বাণী: বলুন, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর, অতঃপর দেখ মিথ্যা আরোপকারীদের পরিণাম কী হয়েছে! বলুন, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা কার? বলুন, আল্লাহর; তিনি নিজের উপর রহমত আবশ্যক করে নিয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে কিয়ামতের দিনে অবশ্যই একত্র করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে, তারাই ঈমান আনবে না।]
(أ) بَيِّنْ سَبَبَ نُزُولِ هَذِهِ الْآيَةِ الْكَرِيمَةِ: قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ… الْمُكَذِّبِينَ.
[আয়াতটির শানে নুযূল বা পটভূমি:]
উক্ত আয়াতটি সূরা আল-আনআমের অন্তর্ভুক্ত। মক্কার মুশরিক ও কাফির সম্প্রদায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত, তাওহীদ এবং পুনরুত্থানকে অস্বীকার করত। তারা নবী কারীম (সা.)-এর দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে নানা প্রকার অলৌকিক নিদর্শন প্রত্যক্ষ করার দাবি জানাত এবং ঔদ্ধত্য প্রকাশ করত। কাফিরদের এই হঠকারিতা ও মিথ্যারোপের জবাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এ আয়াত নাযিল করেন। এতে কাফিরদের পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহের—যেমন কওমে আদ, সামূদ, লূত সম্প্রদায় প্রভৃতির ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ ও নিদর্শনাবলী পরিভ্রমণ করে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা অনুধাবন করতে পারে যে আল্লাহর আয়াত ও রাসূলদের অস্বীকারকারীদের চূড়ান্ত পরিণতি কত ভয়াবহ হয়েছিল।
(ب) حَقِّقِ الْكَلِمَاتِ التَّالِيَةَ: سِيرُوا، لَيَجْمَعَنَّكُمْ، كَتَبَ، السَّمَاوَاتِ.
[শব্দ তাহকীক:]
| শব্দ (الكلمة) | বাবে / ছীগাহ (الباب / الصيغة) | মূলবর্ণ (المادة) | অর্থ (المعنى) |
|---|---|---|---|
| سِيرُوا | أمر حاضر، جمع مذكر حاضر، باب ضرب | س – ي – ر (اجوف يائي) | তোমরা পরিভ্রমণ কর |
| لَيَجْمَعَنَّكُمْ | مضارع معروف مؤكد بلام التوكيد ونون التوكيد الثقيلة، واحد مذكر غائب | ج – م – ع (صحيح) | তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে একত্র করবেন |
| كَتَبَ | ماضي معروف، واحد مذكر غائب، باب نصر | ك – ت – ب (صحيح) | তিনি আবশ্যক করে নিয়েছেন / লিপিবদ্ধ করেছেন |
| السَّمَاوَاتِ | اسم جمع مؤنث سالم | س – م – و (ناقص واوي) | আকাশমন্ডলীসমূহ |
٢- قوله تعالى: قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ – لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ.
[২. মহান আল্লাহর বাণী: বলুন, নিশ্চয় আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোনো শরীক নেই; এবং আমাকে এরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমিই আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে প্রথম।]
(أ) اشْرَحْ قَوْلَهُ تَعَالَى: “إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ”.
[আয়াতটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা:]
সূরা আল-আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াতে তাওহীদে ইবাদত ও সামগ্রিক আত্মনিবেদনের সর্বোৎকৃষ্ট ঘোষণা তুলে ধরা হয়েছে। জাহেলি যুগে মুশরিকরা তাদের মূর্তির উদ্দেশ্যে বলিদান ও ইবাদত করত। আল্লাহ তাআলা তাঁর হাবীবকে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করার আদেশ দেন যে, মুমিনের সমস্ত ইবাদত—বিশেষ করে নামায ও কুরবানী (নূসুক)—কেবলমাত্র এক আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত। এখানে ‘নুসুক’ দ্বারা সাধারণ ইবাদত কিংবা কুরবানির পশু যবাই বুঝানো হয়েছে। আর ‘মাহইয়াই ওয়া মামাতী’ (আমার জীবন ও মৃত্যু) দ্বারা প্রকাশ পায় যে বান্দার পার্থিব জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, কর্মপ্রচেষ্টা এবং পরকালীন অনন্ত জীবনের পথচলা একমাত্র রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত। এতে রিয়া (লোকদেখানো ভাব) ও শির্কের সমূলে মূলোৎপাটন করা হয়েছে।
(ب) حَقِّقِ الْكَلِمَاتِ التَّالِيَةَ: قُلْ، الْعَالَمِينَ، ذَلِكَ، أُمِرْتُ.
[শব্দ তাহকীক:]
| শব্দ (الكلمة) | বাবে / ছীগাহ (الباب / الصيغة) | মূলবর্ণ (المادة) | অর্থ (المعنى) |
|---|---|---|---|
| قُلْ | أمر حاضر، واحد مذكر حاضر، باب نصر | ق – و – ل (اجوف واوي) | আপনি বলুন |
| الْعَالَمِينَ | جمع مذكر سالم ملحق، اسم مفعول | ع – ل – م (صحيح) | বিশ্বজগৎসমূহ / সৃষ্টিজগত |
| ذَلِكَ | اسم إشارة للبعيد، مذكر | ذ – ل – ك | তা / সেই বিষয় |
| أُمِرْتُ | ماضي مجهول، واحد متكلم، باب نصر | أ – م – ر (مهموز الفاء) | আমি আদিষ্ট হয়েছি |
٣- قوله تعالى: وَيَا آدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ فَكُلَا مِنْ حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ.
[৩. মহান আল্লাহর বাণী: আর হে আদম! আপনি ও আপনার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করুন, অতঃপর যেখান থেকে ইচ্ছা আহার করুন, কিন্তু এ গাছের নিকটবর্তী হবেন না; অন্যথায় আপনারা সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।]
(أ) اذْكُرِ الْقِصَّةَ الْمُتَعَلِّقَةَ بِالْآيَاتِ الْكَرِيمَةِ.
[আয়াত সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা:]
আল্লাহ তাআলা আদি পিতা হযরত আদম (আ.) ও মাতা হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টির পর জান্নাতে বসবাস করার অনুমতি দেন এবং জান্নাতের যাবতীয় নিয়ামত স্বচ্ছন্দে ভোগ করার সুযোগ দেন। তবে তাঁদের আনুগত্য ও ধৈর্যের পরীক্ষা স্বরূপ একটি নির্দিষ্ট গাছের ফল খেতে নিষেধ করেন এবং সেটির নিকটে যেতে বারণ করেন। ইবলিস প্রতারণা ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে শপথ করে তাঁদের বলে যে, এই গাছের ফল খেলে তাঁরা চিরঞ্জীব হবে বা ফেরেশতায় পরিণত হবে। শয়তানের প্ররোচনায় তাঁরা গাছটির ফল আস্বাদন করেন, ফলে তৎক্ষণাৎ তাঁদের জান্নাতী পোশাক খসে পড়ে এবং তাঁরা জান্নাতের পাতা দ্বারা নিজেদের আবৃত করতে থাকেন। পরবর্তীতে তাঁরা আল্লাহর নিকট তওবা করেন: “হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিজেদের উপর অবিচার করেছি, যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।” আল্লাহ তাঁদের তওবা কবুল করেন এবং নির্ধারিত সময়ের জন্য দুনিয়াতে বসবাস ও পরীক্ষার নির্দেশ দেন।
(ب) اكْتُبْ أَسْمَاءَ الْجَنَّةِ مُسْتَدِلًّا بِالنُّصُوصِ الْقُرْآنِيَّةِ.
[পবিত্র কুরআনের আলোকে জান্নাতের নামসমূহ:]
পবিত্র কুরআনে মুমিনদের চিরন্তন আবাস জান্নাতকে বিভিন্ন মহিমান্বিত নামে অভিহিত করা হয়েছে:
- জান্নাতুল ফিরদাউস (جَنَّةُ الْفِرْدَوْسِ): “নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের আপ্যায়নের জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফিরদাউস।” (সূরা আল-কাহাফ: ১০৭)
- জান্নাতু আদন (جَنَّاتُ عَدْنٍ): “চিরস্থায়ী জান্নাত, যার প্রতিশ্রুতি পরম করুণাময় তাঁর বান্দাদের দিয়েছেন।” (সূরা মারইয়াম: ৬১)
- জান্নাতুন নাঈম (جَنَّاتُ النَّعِيمِ): “নিশ্চয় মুত্তাকীদের জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত।” (সূরা আল-কলম: ৩৪)
- জান্নাতুল মা’ওয়া (جَنَّةُ الْمَأْوَى): “তারই নিকট রয়েছে জান্নাতুল মা’ওয়া।” (সূরা আন-নাজম: ১৫)
- দারুস সালাম (دَارُ السَّلَامِ): “তাদের জন্য তাদের রবের নিকট রয়েছে শান্তির আবাস।” (সূরা আল-আনআম: ১২৭)
- দারুল মাক্বামাহ (دَارُ الْمُقَامَةِ): “যিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদেরকে স্থায়ী আবাসে স্থান দিয়েছেন।” (সূরা ফাতির: ৩৫)
٤- قوله تعالى: قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ.
[৪. মহান আল্লাহর বাণী: বলুন, আমার প্রতিপালক কেবল নিষিদ্ধ করেছেন প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা, আর পাপ ও অন্যায় সীমালঙ্ঘন; এবং আল্লাহর সাথে এমন কিছুকে শরীক করা যার কোনো প্রমাণ তিনি অবতীর্ণ করেননি, আর আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কথা বলা যা তোমরা জান না।]
(أ) مَا هِيَ الْفَوَاحِشُ الظَّاهِرَةُ وَالْبَاطِنَةُ؟
[প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা (ফাওয়াহিশ):]
আল-ফাওয়াহিশ (الفواحش) হলো এমন সকল গর্হিত কর্ম যা বিবেক ও শরীয়তের দৃষ্টিতে চরম জঘন্য।
- প্রকাশ্য অশ্লীলতা (الفواحش الظاهرة): মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা জনসমক্ষে বা সরাসরি সংঘটিত পাপকর্ম, যেমন—ব্যভিচার (যিনা), সমকামিতা, নগ্নতা, প্রকাশ্যে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি বা নির্লজ্জ কথা বলা। জাহেলি যুগে লোকেরা জনসমক্ষে উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করত এবং প্রকাশ্য ব্যভিচার পরিহার করলেও গোপনে তা করত।
- অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা (الفواحش الباطنة): হৃদয়ের গোপন পঙ্কিলতা ও অন্তরের পাপসমূহ, যেমন—গোপন ব্যভিচার, আত্মগর্ব (কিবর), রিয়া (লোকদেখানো ভাব), হাসাদ (পরশ্রীকাতরতা), নিফাক (কপটতা) এবং অন্তরে কুপ্রবৃত্তি ও অবৈধ লালসা পোষণ করা।
(ب) مَا الْفَرْقُ بَيْنَ الْفَاحِشَةِ وَالْإِثْمِ وَالْبَغْيِ؟
[ফাহিশাহ, ইছম ও বাগী-র মধ্যে পার্থক্য:]
| শব্দ | আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ | স্বরূপ ও প্রায়োগিক ক্ষেত্র |
|---|---|---|
| আল-ফাহিশাহ (الفاحشة) | চরম মাত্রার নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতা | প্রধানত যৌন ব্যভিচার, নগ্নতা ও প্রকাশ্য জঘন্য পাপকর্মে ব্যবহৃত হয় যার লজ্জা ও অপমানের দিক প্রবল। |
| আল-ইছম (الإثم) | যাবতীয় সাধারণ পাপ বা গুনাহের কাজ | যেকোনো ধরনের পাপ যা বান্দাকে কল্যাণ থেকে বিরত রাখে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি বয়ে আনে (যেমন মদ্যপান, মিথ্যা ইত্যাদি)। |
| আল-বাগী (البغي) | অন্যায় সীমালঙ্ঘন ও অহংকারবশত আক্রমণ | অন্যের অধিকার হরণ, যুলুম-অত্যাচার, অন্যায়ভাবে রক্তপাত বা রাষ্ট্র ও সমাজে বিদ্রোহ সৃষ্টি করা। |
٥- قوله تعالى: يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ قُلِ الْأَنْفَالُ لِلَّهِ وَالرَّسُولِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ.
[৫. মহান আল্লাহর বাণী: তারা আপনাকে আনফাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, আনফাল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক সংশোধন কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুমিন হও।]
(أ) مَا مَعْنَى الْأَنْفَالِ؟ وَمَا حُكْمُهَا؟ وَمَا الْفَرْقُ بَيْنَ الْفَيْءِ وَالْغَنِيمَةِ؟
[আনফালের অর্থ, বিধান এবং ফাই ও গানীমতের পার্থক্য:]
১. আনফালের অর্থ (معنى الأنفال): ‘আনফাল’ শব্দটি نَفْل (নাফল)-এর বহুবচন, যার আভিধানিক অর্থ অতিরিক্ত বা উপঢৌকন। ইসলামী শরীয়তে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত অতিরিক্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে আনফাল বা গানীমত বলা হয়।
২. আনফালের হুকুম (حكمها): সূরা আল-আনফালের শুরুতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে এর চূড়ান্ত মালিকানা ও বণ্টন নীতি নির্ধারণের অধিকার আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। পরবর্তীতে ৪১ নম্বর আয়াতে বিস্তারিত বণ্টনবিধি নাযিল করে এক-পঞ্চমাংশ (খুমুস) আল্লাহ, রাসূল, এতিম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য রেখে অবশিষ্ট চার-পঞ্চমাংশ মুজাহিদদের মাঝে বণ্টনের বিধান সুনির্দিষ্ট করা হয়।
৩. ফাই (الفيء) ও গানীমতের (الغنيمة) পার্থক্য:
- গানীমত: কাফিরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে বিজয় অর্জনের পর হস্তগত সম্পদ। এর চার-পঞ্চমাংশ মুজাহিদদের প্রাপ্য এবং এক-পঞ্চমাংশ বায়তুলমালে সংরক্ষিত।
- ফাই: কোনো রক্তপাত বা প্রত্যক্ষ সামরিক যুদ্ধ ছাড়াই কাফিররা ভয়ে পলায়ন করে বা সন্ধির মাধ্যমে যে সম্পদ মুসলিমদের হাতে ছেড়ে দেয়। এই সম্পদ পুরোটাই বায়তুলমালের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় এবং সাধারণ মুসলিমদের কল্যাণার্থে ব্যবহৃত হয়।
(ب) مَا مَعْنَى التَّقْوَى؟ اكْتُبْ مَرَاتِبَ التَّقْوَى مُخْتَصَرًا.
[তাকওয়ার অর্থ ও এর স্তরসমূহ:]
তাকওয়ার অর্থ: তাকওয়া শব্দটি وِقَايَة (রক্ষা করা) ধাতু থেকে উদ্ভূত। পারিভাষিক অর্থে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও শাস্তি থেকে বাঁচতে তাঁর যাবতীয় আদেশ পালন করা এবং নিষেধাবলী বর্জন করাকে তাকওয়া বলে।
তাকওয়ার তিনটি স্তর (مراتب التقوى):
- প্রথম স্তর (শির্ক থেকে সুরক্ষা): তাওহীদে বিশ্বাস স্থাপন করে কুফর ও শির্ক থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা, যার মাধ্যমে চিরন্তন জাহান্নাম থেকে মুক্তি নিশ্চিত হয়।
- দ্বিতীয় স্তর (কবীরা গুনাহ ও বর্জনীয় বিষয় পরিহার): শরীয়তের আদেশ পালন করা এবং যাবতীয় কবীরা গুনাহ, ছগীরা গুনাহের পুনরাবৃত্তি এবং নিষিদ্ধ কাজ বর্জন করা। এটিই সাধারণ মুমিনদের তাকওয়ার পর্যায়।
- তৃতীয় স্তর (ইহসান ও আল্লাহর দিকে সার্বক্ষণিক নিবিষ্টতা): হৃদয় থেকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবকিছুর আকর্ষণ মুছে ফেলা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির ও ধ্যানে নিমগ্ন থাকা। এটি আম্বিয়া ও আউলিয়াগণের সর্বোচ্চ স্তর।
٦- قوله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ – وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَأَنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ.
[৬. মহান আল্লাহর বাণী: হে ঈমানদারগণ! তোমরা জেনেশুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাসভঙ্গ করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতের খেয়ানত করো না। আর জেনে রেখ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষার বস্তু, আর নিশ্চয় আল্লাহর কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার।]
(أ) بَيِّنْ سَبَبَ نُزُولِ الْآيَةِ الْكَرِيمَةِ.
[আয়াতটির শানে নুযূল:]
উক্ত আয়াতটি সাহাবী হযরত আবু লুবাবাহ ইবনে আবদুল মুনযির (রা.)-এর ঘটনার প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়। বনু কুরাইযার ইহুদীরা যখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করে অবরুদ্ধ হয়, তখন তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট আবেদন জানায় যেন পরামর্শের জন্য তাদের মিত্র আবু লুবাবাহকে পাঠানো হয়। আবু লুবাবাহ তাদের নিকট গেলে ইহুদী নারী ও শিশুরা কান্নাকাটি করে তাঁকে জিজ্ঞেস করে, “আমরা কি সাদ ইবনে মুআযের ফয়সালা মেনে আত্মসমর্পণ করব?” তখন আবু লুবাবাহ মুখে বললেন “হ্যাঁ”, কিন্তু হাতের ইশারায় গলার দিকে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিলেন যে সাদ (রা.)-এর ফয়সালা হবে মৃত্যুদণ্ড। তৎক্ষণাৎ আবু লুবাবাহ অনুভব করলেন যে তিনি নবী কারীম (সা.)-এর গোপন সামরিক সিদ্ধান্তের বিষয়টি শত্রুপক্ষের কাছে প্রকাশ করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আমানতের খেয়ানত করেছেন। চরম অনুশোচনায় তিনি মসজিদে নববীতে এসে নিজেকে একটি স্তম্ভের সাথে রশি দিয়ে বেঁধে রাখেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন যে যতক্ষণ আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল না করবেন ততক্ষণ তিনি অনাহারে থাকবেন। পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা তাঁর তওবা কবুল করেন এবং এ সতর্কবাণী নাযিল করেন।
(ب) بَيِّنِ التَّرْكِيبَ: “وَأَنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ”.
[নাহভী তারকীব:]
| বাক্যাংশ (التركيب) | নাহভী বিশ্লেষণ ও ভূমিকা |
|---|---|
| وَ (ওয়াও) | حرف عطف (মাআতুফকারী অব্যয়) |
| أَنَّ (আন্না) | حرف مشبه بالفعل، يَنصب الاسم ويرفع الخبر |
| اللَّهَ (আল্লাহ) | اسم “أنّ” منصوب وعلامة نصبه الفتحة الظاهرة |
| عِنْدَهُ (ইন্দাহু) | “عند” ظرف مكان مضاف، و”الهاء” ضمير متصل مبني في محل جر مضاف إليه، وشبه الجملة متعلق بمحذوف خبر مقدم |
| أَجْرٌ (আজবুন) | مبتدأ مؤخر مرفوع وعلامة رفعه الضمة الظاهرة |
| عَظِيمٌ (আযীম) | نعت / صفة لـ “أجر” مرفوع |
| الجملة الاسمية (عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ) | جملة اسمية في محل رفع خبر “أنّ”، والمصدر المؤول معطوف في محل نصب |
٧- قوله تعالى: لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُدْبِرِينَ.
[৭. মহান আল্লাহর বাণী: অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন বহু যুদ্ধক্ষেত্রে এবং হুনাইনের দিনে; যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের গর্বিত করেছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি এবং পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়েছিল, অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।]
(أ) بَيِّنْ وَاقِعَةَ حُنَيْنٍ مُلَخَّصًا.
[হুনাইনের যুদ্ধের সারসংক্ষেপ:]
৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পর হাওয়াযিন ও সাকীফ গোত্র মুসলিমদের বিরুদ্ধে এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে হুনাইন উপত্যকায় সমবেত হয়। মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল বারো হাজার, যা ছিল তৎকালীন সময়ের সর্ববৃহৎ মুসলিম বাহিনী। সংখ্যার প্রাচুর্য দেখে কোনো কোনো মুসলিম গর্বভরে বলেছিলেন, “আজ আর আমরা পরাজিত হব না।” কিন্তু হুনাইনের গিরিপথে শত্রুরা পূর্ব থেকেই গোপনে ওত পেতে ছিল। মুসলিম বাহিনী উপত্যকায় প্রবেশ করতেই তারা অতর্কিত তীরবৃষ্টি বর্ষণ শুরু করে। এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং মুসলিমদের অগ্রবর্তী দল ছত্রভঙ্গ হয়ে পশ্চাদপসরণ করতে থাকে। এ চরম সংকট মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অটল পাহাড়ের ন্যায় দাঁড়িয়ে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন: “أنا النبي لا كذب، أنا ابن عبد المطلب” (আমিই সত্য নবী, এতে কোনো মিথ্যা নেই; আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান)। হযরত আব্বাস (রা.)-এর মেঘমন্দ্র কণ্ঠে ডাক শুনে আনসার ও মুহাজিরগণ পুনরায় ফিরে আসেন এবং তুমুল যুদ্ধে শত্রুপক্ষ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন বিজয় সৈন্যসংখ্যার উপর নয়, বরং আল্লাহর সাহায্যের উপর নির্ভরশীল।
(ب) اكْتُبِ التَّرْكِيبَ النَّحْوِيَّ لِقَوْلِهِ تَعَالَى: “مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ”.
[নাহভী তারকীব:]
| শব্দ | নাহভী মর্যাদা ও বিশ্লেষণ |
|---|---|
| مَوَاطِنَ | مجرور بـ “في” وعلامة جره الفتحة نيابة عن الكسرة لأنه ممنوع من الصرف على صيغة منتهى الجموع (مفاعل)، وهو موصوف |
| كَثِيرَةٍ | نعت / صفة لـ “مواطن” مجرور وعلامة جره الكسرة الظاهرة على آخره (لأنه منصرف) |
٨- قوله تعالى: لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ – فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ.
[৮. মহান আল্লাহর বাণী: নিশ্চয় তোমাদের নিকট আগমন করেছেন তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল, তোমাদের যে বিষয়ে কষ্ট হয় তা তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক, তিনি তোমাদের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী, মুমিনদের প্রতি পরম স্নেহশীল ও দয়ালু। অতঃপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলুন, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; আমি তাঁরই ওপর ভরসা করেছি এবং তিনি মহান আরশের অধিপতি।]
(أ) اكْتُبْ مِنْ حَيَاةِ الرَّسُولِ الْمَذْكُورِ فِي الْآيَةِ الْكَرِيمَةِ مُخْتَصَرًا.
[আয়াতে বর্ণিত রাসূল (সা.)-এর পবিত্র জীবনী সংক্ষেপে:]
আয়াতে বর্ণিত রাসূল হলেন সাইয়্যিদুনা মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের বনু হাশিম শাখায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি পিতা আব্দুল্লাহ ও মাতা আমেনাকে হারান। সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও চারিত্রিক নিষ্কলুষতার কারণে তিনি নবুওয়াতের পূর্বেই ‘আল-আমীন’ উপাধিতে ভূষিত হন। ৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায় ওহী প্রাপ্তির মাধ্যমে তিনি নবুওয়াত লাভ করেন। দীর্ঘ তেরো বছর মক্কায় অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করে তাওহীদের বাণী প্রচার করেন এবং পরবর্তীতে মদীনায় হিজরত করে একটি ন্যায়ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন উম্মতের প্রতি পরম দয়ালু, কোমল হৃদয় ও চিরন্তন রাহমাতুল্লিল আলামীন। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে (১১ হিজরী) তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন।
(ب) حَقِّقِ الْأَلْفَاظَ الْآتِيَةَ: رَسُولٌ، تَوَلَّوْا، تَوَكَّلْتُ، الْعَظِيمِ.
[শব্দ তাহকীক:]
| শব্দ (الكلمة) | বাবে / ছীগাহ (الباب / الصيغة) | মূলবর্ণ (المادة) | অর্থ (المعنى) |
|---|---|---|---|
| رَسُولٌ | اسم، فعول بمعنى مفعول (مرسل) | ر – س – ل (صحيح) | বার্তাবাহক / প্রেরিত দূত |
| تَوَلَّوْا | ماضي معروف، جمع مذكر غائب، باب تفعل | و – ل – ي (لفيف مفروق) | তারা মুখ ফিরিয়ে নিল |
| تَوَكَّلْتُ | ماضي معروف، واحد متكلم، باب تفعل | و – ك – ل (مثال واوي) | আমি ভরসা করেছি |
| الْعَظِيمِ | صفة مشبهة، مفرد مذكر | ع – ظ – م (صحيح) | মহান / অতি মহিমান্বিত |
٩- قوله تعالى: الر تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْحَكِيمِ – أَكَانَ لِلنَّاسِ عَجَبًا أَنْ أَوْحَيْنَا إِلَى رَجُلٍ مِنْهُمْ أَنْ أَنْذِرِ النَّاسَ وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا أَنَّ لَهُمْ قَدَمَ صِدْقٍ عِنْدَ رَبِّهِمْ قَالَ الْكَافِرُونَ إِنَّ هَذَا لَسَاحِرٌ مُبِينٌ.
[৯. মহান আল্লাহর বাণী: আলিফ-লাম-রা; এগুলো প্রজ্ঞাপূর্ণ কিতাবের আয়াত। মানুষের জন্য কি এটা আশ্চর্যের বিষয় যে, আমি তাদের মধ্য থেকেই একজনের নিকট ওহী প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে আপনি মানুষকে সতর্ক করুন এবং মুমিনদের সুসংবাদ দিন যে তাদের রবের নিকট তাদের জন্য রয়েছে মর্যাদাপূর্ণ সত্য অবস্থান? কাফিররা বলে, এ তো স্পষ্ট জাদুকর।]
(أ) أَيْنَ وَمَتَى نَزَلَتْ سُورَةُ ‘يُونُسَ’؟ بَيِّنْ وَجْهَ تَسْمِيَتِهَا.
[সূরা ইউনুসের নাযিল হওয়ার স্থান, কাল ও নামকরণের কারণ:]
নাযিল হওয়ার স্থান ও সময়: সূরা ইউনুস একটি পবিত্র মাক্কী সূরা। জমহুর মুফাসসিরগণের মতে এটি মাক্কী জীবনের শেষভাগে, মিরাজের পূর্বে এবং হিজরতের কিছু পূর্বে নাযিল হয়। এতে মোট ১০৯টি আয়াত রয়েছে।
নামকরণের কারণ: এ সূরার ৯৮ নম্বর আয়াতে হযরত ইউনুস (আ.) ও তাঁর কওমের বিস্ময়কর ঈমান আনার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আযাবের পূর্বাভাস দেখে আল্লাহর অনুগ্রহে তাঁর কওমের সকলেই আন্তরিক তওবা করে ঈমান এনেছিল এবং আযাব থেকে রেহাই পেয়েছিল, যা মানব ইতিহাসে বিরল। এই বিশেষ শিক্ষণীয় ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতি সম্মান জানিয়ে সূরাটির নাম ‘সূরা ইউনুস’ রাখা হয়েছে।
(ب) “أَوْحَيْنَا إِلَى رَجُلٍ مِنْهُمْ” أَوْضِحْ هَذِهِ الْقِطْعَةَ.
[উক্ত অংশের তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা:]
মক্কার মুশরিকদের একটি বড় ভ্রান্তি ছিল যে তারা মনে করত নবী হবেন কোনো ফেরেশতা বা অতিপ্রাকৃতিক সত্তা। একজন সাধারণ মানুষ, যিনি তাদের মাঝে চলাফেরা করেন, পানাহার করেন এবং বাজার-হাটে যান, তিনি কীভাবে আল্লাহর রাসূল হতে পারেন—এ নিয়ে তারা বিস্ময় প্রকাশ করত। আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে তাদের ভুল ধারণা খণ্ডন করে বলেন, মানুষকে হেদায়াত করার জন্য মানুষের মধ্য থেকেই রাসূল প্রেরণ করাই আল্লাহর শাশ্বত হিকমত ও যুক্তিযুক্ত রীতি। কারণ একজন মানব রাসূলই মানুষের দুঃখ-বেদনা, ভাষা ও মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারেন এবং নিজ জীবন দিয়ে সর্বোত্তম আদর্শ ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে পারেন। ফেরেশতা রাসূল হলে মানুষ তাঁকে অনুসরণ করতে পারত না।
١٠- قوله تعالى: وَيَقُولُونَ لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ آيَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَقُلْ إِنَّمَا الْغَيْبُ لِلَّهِ فَانْتَظِرُوا إِنِّي مَعَكُمْ مِنَ الْمُنْتَظِرِينَ.
[১০. মহান আল্লাহর বাণী: আর তারা বলে, তাঁর রবের পক্ষ থেকে তাঁর উপর কোনো অলৌকিক নিদর্শন কেন অবতীর্ণ হলো না? আপনি বলুন, অদৃশ্যের জ্ঞান তো কেবল আল্লাহরই জন্য। সুতরাং তোমরা অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণদের অন্তর্ভুক্ত।]
(أ) اذْكُرِ الْقِصَّةَ الْمُتَعَلِّقَةَ بِالْآيَةِ الْكَرِيمَةِ.
[আয়াত সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা ও প্রেক্ষাপট:]
মক্কার কাফিররা কুরআনের চিরন্তন অলৌকিকত্ব ও জ্ঞানগর্ভ বাণী প্রত্যক্ষ করা সত্ত্বেও হঠকারিতাবশত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট অদ্ভুত অলৌকিক মোজেযা দাবি করত। তারা দাবি করত সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করতে হবে, মক্কার পাহাড়গুলো সরিয়ে নদীনালা প্রবাহিত করতে হবে অথবা আকাশ থেকে সরাসরি ফেরেশতা নামিয়ে আনতে হবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে জানিয়ে দেন যে অলৌকিক মোজেযা মানুষের ইচ্ছাধীন নয়, বরং তা আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমতের অধীন। পূর্ববর্তী জাতিসমূহকে তাদের দাবিকৃত মোজেযা দেওয়ার পরও যখন তারা ঈমান আনেনি, তখন তাদের সমূলে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। মক্কার কাফিরদের জন্য আল্লাহ এখনই ধ্বংসাত্মক আযাব না পাঠিয়ে তাওবার সুযোগ রেখেছেন।
(ب) مَا مَعْنَى الْغَيْبِ؟ هَلْ يَعْلَمُ غَيْبًا أَحَدٌ غَيْرُ اللَّهِ؟ بَيِّنْ.
[গায়েবের অর্থ এবং গায়েব জানার বিধান:]
গায়েবের অর্থ (معنى الغيب): গায়েব অর্থ অদৃশ্য, অপ্রকাশ্য বা মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয় ও জাগতিক জ্ঞানবুদ্ধির অগম্য বিষয়াবলী। যেমন কিয়ামতের সময়, রূহ, বেহেশত-দোযখ ও তাকদীরের রহস্য।
আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ কি গায়েব জানে?
- মৌলিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জ্ঞান (علم الغيب الذاتي والاستقلالي): কোনো মাধ্যম ছাড়া স্বীয় সত্তাগতভাবে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমস্ত গায়েবের পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলারই বৈশিষ্ট্য। সূরা আন-নামলের ৬৫ আয়াতে ঘোষিত হয়েছে: “বলুন, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহ ব্যতীত কেউই গায়েবের খবর জানে না।”
- আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত জ্ঞান (علم الغيب العطائي): আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ওহী ও নবুওয়াতের মাধ্যমে স্বীয় হাবীব ও মনোনীত রাসূলগণকে দ্বীনের প্রয়োজনে গায়েবের যতটুকু সংবাদ প্রদান করেন, তাঁরা ততটুকুই অবগত হন (সূরা আল-জ্বিন: ২৬-২৭)। এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত। গণক, জ্যোতিষী বা সাধারণ মানুষের গায়েব জানার দাবি সম্পূর্ণ বাতিল ও কুফরী।
খ-বিভাগ (مجموعة ب)
١١- اكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ رَشِيد رِضَا مَعَ خَصَائِصِ تَفْسِيرِهِ ‘تَفْسِيرِ الْمَنَارِ’.
[১১. আল্লামা রশীদ রিদার সংক্ষিপ্ত জীবনী ও তাঁর রচিত ‘তাফসীর আল-মানার’-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।]
১. আল্লামা রশীদ রিদার সংক্ষিপ্ত জীবনী (ترجمة رشيد رضا):
মুহাম্মদ রশীদ রিদা ১৮৬৫ সালে বর্তমান লেবাননের ত্রিপোলির নিকটবর্তী ‘কলমুন’ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত মুফাসসির, আধুনিক সংস্কারক এবং ইসলামী পুনর্জাগরণের অগ্রদূত। তিনি শায়খ মুহাম্মদ আবদুহুর বিশিষ্ট ছাত্র ছিলেন। মিশরে হিজরত করে তিনি বিখ্যাত ‘আল-মানার’ পত্রিকা প্রকাশ করেন, যা মুসলিম বিশ্বের আধুনিক চিন্তাধারাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়ন এবং পশ্চিমা উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধে অনন্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৩৫ সালে কায়রোতে এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন।
২. ‘তাফসীর আল-মানার’-এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص تفسير المنار):
- আকলী ও সামাজিক সংস্কারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি: তিনি কুরআনকে কেবল তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার গ্রন্থ হিসেবে নয়, বরং সমসাময়িক মুসলিম সমাজের অধঃপতন রোধ এবং সামাজিক পুনর্জাগরণের মহৌষধ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
- মুহাম্মদ আবদুহুর দরসের প্রভাব: তাফসীরটির প্রথমাংশ তাঁর উস্তাদ শায়খ মুহাম্মদ আবদুহুর আল-আজহারে প্রদত্ত দরসের ভিত্তিতে সংকলিত এবং পরবর্তীতে রশীদ রিদা স্বীয় গবেষণার মাধ্যমে তা সম্প্রসারিত করেন।
- ইসরাঈলী বর্ণনার তীব্র বিরোধিতা: আল-মানারে কাল্পনিক ও অনির্ভরযোগ্য ইসরাঈলী রেওয়ায়েত সম্পূর্ণ বর্জন করে বিশুদ্ধ সুন্নাহর আলোকে কোরআনের ব্যাখ্যা প্রাধান্য পেয়েছে।
- বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য ও আধুনিক দর্শন: আধুনিক বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কারকে কুরআনের নির্দেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
- সহজ ও সাবলীল আরবী শৈলী: জটিল ব্যাকরণগত বিতর্কে না গিয়ে আধুনিক আরবী গদ্যরীতিতে সর্বসাধারণের উপযোগী প্রাঞ্জল ভাষায় তাফসীরটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
١٢- وَازِنْ بَيْنَ خَصَائِصِ صَفْوَةِ التَّفَاسِيرِ وَتَفْسِيرِ الْمُنِيرِ.
[১২. ‘সাফওয়াতুত তাফাসীর’ ও ‘আত-তাফসীরুল মুনীর’-এর বৈশিষ্ট্যের তুলনামূলক আলোচনা কর।]
মুহাম্মদ আলী আস-সাবূনী রচিত ‘সাফওয়াতুত তাফাসীর’ এবং ড. ওয়াহবাহ আয-যুহায়লী প্রণীত ‘আত-তাফসীরুল মুনীর’ আধুনিক যুগের দুটি শ্রেষ্ঠ ও পাঠকপ্রিয় তাফসীর গ্রন্থ। নিম্নে এ দুটি গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যের তুলনামূলক রূপরেখা তুলে ধরা হলো:
| তুলনার বিষয় | সাফওয়াতুত তাফাসীর (صفوة التفاسير) | আত-তাফসীরুল মুনীর (التفسير المنير) |
|---|---|---|
| গ্রন্থকার | শায়খ মুহাম্মদ আলী আস-সাবূনী (সিরিয়া) | ড. ওয়াহবাহ আয-যুহায়লী (সিরিয়া) |
| পদ্ধতি ও বিন্যাস | প্রাচীন নির্ভরযোগ্য তাফসীরসমূহের (যেমন তাবারী, কাশশাফ, রাযী, কুরতুবী, ইবনে কাসীর) নির্যাস সংকলন। | আক্বীদা, শরীয়ত ও মানহাজ—এই তিন প্রধান শিরোনামে আধুনিক একাডেমিক পদ্ধতিতে বিন্যস্ত। |
| ফিকহী পর্যালোচনা | ফিকহী মতভেদ অত্যন্ত সংক্ষেপে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। | তুলনামূলক ফিকহ (আল-ফিকহুল মুকারান)-এর আলোকে চার মাযহাবের বিশদ দলিলভিত্তিক পর্যালোচনা করেছেন। |
| বালাগাত ও সাহিত্যশৈলী | আরবী বালাগাত, অলঙ্কারশাস্ত্র ও ব্যাকরণিক সৌন্দর্য বিশ্লেষণে বিশেষ অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। | বালাগাত ও ব্যাকরণ আলোচনার পাশাপাশি সমকালীন জীবন দর্শন ও আধুনিক সমাজ বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে। |
| খণ্ড সংখ্যা | মোট ৩ খণ্ডে সমাপ্ত সুসংহত গ্রন্থ। | ১৬ খণ্ডে (বা ৩২ খণ্ডে) সমাপ্ত এক বিশাল ও সমৃদ্ধ জ্ঞানকোষ। |
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল ২য় বর্ষের ‘আত-তাফসীরুল মুয়াসসির’ পরীক্ষার মানবণ্টন কীরূপ?
মোট পূর্ণমান ৮০। পরীক্ষায় মোট ১২টি প্রশ্ন থাকে; ক-বিভাগ থেকে ৫টি এবং খ-বিভাগ থেকে ১টি সহ মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
২. আনফাল ও গানীমতের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
আনফাল বা গানীমত হলো কাফিরদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ও বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, যার চার-পঞ্চমাংশ মুজাহিদদের প্রাপ্য।
৩. হুনাইনের যুদ্ধে মুসলিমদের বিপর্যয়ের মূল কারণ কী ছিল?
মুসলিমদের সংখ্যাধিক্যের প্রতি আত্মতৃপ্তি ও অহংকার প্রকাশ পাওয়ায় প্রাথমিক অবস্থায় শত্রুদের অতর্কিত হামলায় বিপর্যয় ঘটেছিল।
৪. ‘তাফসীর আল-মানার’-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
এটি আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক সংস্কারমূলক ধারার তাফসীর, যাতে ইসরাঈলী রেওয়ায়েত সম্পূর্ণ বর্জন করা হয়েছে।
৫. গায়েবের জ্ঞানের ক্ষেত্রে শরীয়তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী?
স্বয়ংসম্পূর্ণ গায়েবের পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার। তবে আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে স্বীয় রাসূলগণকে নির্দিষ্ট বিষয়ের সংবাদ অবহিত করেন।
৬. ‘সাফওয়াতুত তাফাসীর’ গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্য কী?
এটি প্রাচীন প্রসিদ্ধ তাফসীরসমূহের সারসংক্ষেপ, যাতে সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় বালাগাত ও ব্যাকরণিক আলোচনা সন্নিবেশিত হয়েছে।