ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা 2021
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ (السيرة النبوية)
বিষয় কোড: 201204 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) – ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি (মান: ১৫ × ৪ = ৬০)
١- ماذا تعرف عن الأيام الجاهلية ثم بيّن الحالات الاجتماعية والدينية والخلقية للعرب الجاهلية-
[১. আইয়ামে জাহেলিয়্যাহ বলতে তুমি কী বুঝ? জাহিলী যুগে আরবের সামাজিক, ধর্মীয় ও চারিত্রিক অবস্থা বর্ণনা কর।]
১. আইয়ামে জাহেলিয়্যাতের সংজ্ঞা:
‘আইয়াম’ শব্দের অর্থ যুগ বা দিনসমূহ এবং ‘জাহেলিয়্যাহ’ অর্থ অজ্ঞতা, বর্বরতা ও তমসাচ্ছন্নতা। ইসলামের ইতিহাসে হযরত ঈসা (আ.)-এর তিরোধানের পর থেকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছরের তমসাচ্ছন্ন কালকে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতার যুগ বলা হয়।
২. জাহিলী যুগের সামাজিক অবস্থা:
- গোত্রীয় সংঘাত ও রক্তপাত: আরব সমাজ বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল। সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলত (যেমন: হারবুল বাসূস, হারবুল ফিজার)।
- নারীর অবমাননা ও কন্যাশিশু হত্যা: সমাজে নারীদের কোনো মানবিক অধিকার ছিল না। কন্যা সন্তান জন্ম নেওয়াকে চরম অপমানজনক মনে করে জীবন্ত কবর (ওয়াদুল বানাত) দেওয়া হতো।
- দাসপ্রথা ও অমানবিক শোষণ: ক্রীতদাস-দাসীদের পশুর মতো হাটে কেনাবেচা করা হতো এবং তাদের উপর নির্মম নির্যাতন চালানো হতো।
৩. ধর্মীয় অবস্থা:
আরবরা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর তাওহীদী আদর্শ সম্পূর্ণরূপে ভুলে গিয়ে চরম পৌত্তলিকতায় নিমজ্জিত হয়েছিল। পবিত্র কা’বা গৃহে ৩৬০টি প্রতিমা স্থাপন করে পূজা করা হতো (যেমন: লাত, মানাত, উযযা, হুবাল)। কিছু লোক ভাগ্য গণনা ও তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে শুভ-অশুভ নির্ণয় করত।
৪. চারিত্রিক অবস্থা:
মদ্যপান, জুয়া, ব্যভিচার ও রাহাজানিকে বীরত্ব মনে করা হতো। তবে তাদের মধ্যে অতিথি পরায়ণতা, কাব্যচর্চা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার মতো কিছু প্রশংসনীয় গুণও বিদ্যমান ছিল।
٢- حرّر عن أهمّ الواقعات التي وقعت قبل وبعد مولد النبيّ صلّى الله عليه وسلّم-
[২. নবি (স) এর জন্মের পূর্বে ও পরে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ লেখ।]
১. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের পূর্বে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ:
- আসহাবুল ফীল ও আবরাহার হস্তীবাহিনীর ধ্বংস: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের প্রায় ৫০-৫৫ দিন পূর্বে ইয়েমেনের গভর্ণর আবরাহা সুবিশাল হস্তীবাহিনী নিয়ে কা’বা ধ্বংস করতে আসে। আল্লাহ তা’আলা আবাবীল পাখির মাধ্যমে তাদের চর্বিত ঘাসের ন্যায় নিশ্চিহ্ন করে দেন।
- পিতা আবদুল্লাহর ওফাত: রাসূলুল্লাহ (সা.) মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থাতেই তাঁর পিতা আবদুল্লাহ সিরিয়া থেকে বাণিজ্য শেষে ফেরার পথে মদীনায় (ইয়াসরিবে) ইন্তেকাল করেন।
- অলৌকিক নিদর্শনাবলি: তাঁর শুভ জন্মলগ্নে পারস্যের রাজপ্রাসাদের ১৪টি স্তম্ভ ধসে পড়ে, হাজার বছর ধরে প্রজ্বলিত অগ্নিপূজকদের অগ্নিকুণ্ড নিভে যায় এবং সাওয়া হ্রদ শুকিয়ে যায়।
২. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের পরে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ:
- হালিমাতুস সাদীয়ার গৃহে প্রতিপালন ও সীনা চাক: জন্মের পর বনু সাদ গোত্রে মা হালীমার কাছে চার বছর লালিত-পালিত হন। সেখানে তাঁর বক্ষ বিদারণ (শাক্কুস সদর) ঘটে।
- মাতা ও দাদার ইনতিকাল: ৬ বছর বয়সে মা আমিনা মদিনা থেকে ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে এবং ৮ বছর বয়সে দাদা আবদুল মুত্তালিব ইন্তেকাল করেন। অতঃপর চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে প্রতিপালিত হন।
- সিরিয়া সফর ও পাদ্রী বুহাইরা: ১২ বছর বয়সে চাচার সাথে বাণিজ্য কাফেলায় সিরিয়া যাওয়ার পথে বুহাইরা নামক খ্রিস্টান পাদ্রী তাঁর মধ্যে শেষ নবীর লক্ষণ প্রত্যক্ষ করেন।
- হিলফুল ফুজুল গঠন: ফিজার যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে অন্যায়ের প্রতিকার ও মজলুমের সহায়তায় মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি শান্তিসংঘ গঠন করেন।
- হযরত খাদীজা (রা.)-এর সাথে বিবাহ: ২৫ বছর বয়সে তিনি সততা ও আমানতদারীর কারণে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হযরত খাদীজা (রা.)-এর সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন।
- কা’বা গৃহের সংস্কার ও হাজরে আসওয়াদ স্থাপন: ৩৫ বছর বয়সে গোত্রীয় রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়িয়ে স্বীয় বুদ্ধিমত্তায় চাদরে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করে সংকট নিরসন করেন।
٣- ما معنى الهجرة ثم بيّن سبب هجرة النبيّ صلى الله عليه وسلّم من مكة إلى المدينة مع بيان واقعة الهجرة-
[৩. হিজরত অর্থ কী? নবি (স) মক্কা হতে মদিনায় হিজরতের কারণ উল্লেখপূর্বক হিজরতের ঘটনা বর্ণনা কর।]
১. হিজরতের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:
আভিধানিক অর্থ: ত্যাগ করা, সম্পর্ক ছিন্ন করা বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করা।
পারিভাষিক অর্থ: আল্লাহর দ্বীন রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বদেশ, পরিবার ও সহায়-সম্পদ ত্যাগ করে নিরাপদ ভূমিতে গমন করাকে হিজরত বলে। ঐতিহাসিক পরিভাষায়, ৬২২ খ্রিস্টাব্দে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মক্কা মুকাররমা থেকে মদীনা মুনাওয়ারায় গমনকে হিজরত বলা হয়।
২. মক্কা হতে মদিনায় হিজরতের প্রধান কারণসমূহ:
- মক্কার কুরাইশদের অসহনীয় নির্যাতন: মুসলমানদের উপর কুরাইশদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চরম আকার ধারণ করে।
- আশার আলোকবর্তিকা হিসেবে মদীনাবাসীর আহ্বান: আকাবার দুটি ঐতিহাসিক শপথে মদীনাবাসী ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেয়।
- দারুন নদওয়ায় হত্যার ষড়যন্ত্র: কুরাইশরা সকল গোত্রের যুবকদের একত্রিত করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রাতের আঁধারে হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
- আল্লাহ তা’আলার প্রত্যক্ষ ওহী ও নির্দেশ: আল্লাহ তা’আলা ওহীর মাধ্যমে রাসূল (সা.)-কে কুরাইশদের ষড়যন্ত্র অবগত করেন এবং হিজরতের অনুমতি দেন।
৩. ঐতিহাসিক হিজরতের রোমাঞ্চকর ঘটনা:
হত্যার ষড়যন্ত্রের রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে তাঁর বিছানায় শয়ন করান এবং জনগণের গচ্ছিত আমানত ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি কাফেরদের চোখে ধুলো দিয়ে নিরাপদে গৃহ থেকে বের হয়ে পরম বিশ্বস্ত বন্ধু হযরত আবু বকর (রা.)-কে সাথে নিয়ে মক্কা থেকে দক্ষিণে সাওর পর্বতের গুহায় (গარე সাওর) তিন দিন আত্মগোপন করেন। সেখানে কুরাইশরা গুহামুখ পর্যন্ত পৌঁছে গেলেও মাকড়সার জাল ও কবুতরের ডিম দেখে ফিরে যায়। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে উরায়ক্বীতের পথপ্রদর্শনে লোহিত সাগরের উপকূলীয় পথ ধরে অবশেষে মদিনার প্রবেশদ্বার কুবা পল্লীতে পৌঁছান এবং সেখানে ইসলামের প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। অতঃপর মদিনায় পৌঁছলে আনসার সাহাবীগণ তাঁকে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা জানান।
٤- تحدث عن وثيقة المدينة مع بيان خمسة عشر نبذًا مهما منها بالتفصيل-
[৪. মদিনা সনদের পনেরটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাসহ এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর।]
১. মদিনা সনদের ঐতিহাসিক পটভূমি:
হিজরতের পর মদিনার বহুজাতি, বহুধর্ম ও বহুগোত্রের (মুহাজির, আনসার, স্থানীয় পৌত্তলিক ও বিভিন্ন ইহুদি গোত্র) মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহানবী (সা.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দে ৪৭টি (মতান্তরে ৫৩টি) ধারাবিশিষ্ট এক ঐতিহাসিক লিখিত চুক্তি প্রণয়ন করেন। এটি মানব ইতিহাসের **প্রথম লিখিত সংবিধান** হিসেবে খ্যাত।
২. মদিনা সনদের ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ধারা:
- মদিনার মুহাজির, আনসার এবং সনদে স্বাক্ষরকারী সকল সম্প্রদায় মিলে একটি অবিভাজ্য একক জাতি (উম্মাহ ওয়াহিদা) গঠিত হবে।
- সনদে অন্তর্ভুক্ত সকল পক্ষ নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে; কারো ধর্মীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা হবে না।
- মদিনা নগরীকে একটি সম্মানিত ও রক্তপাতহীন পবিত্র শান্তি অঞ্চল (হারাম) ঘোষণা করা হলো।
- বহিরাগত কোনো শত্রু মদিনা আক্রমণ করলে সকল সম্প্রদায় সম্মিলিতভাবে নগরীর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে।
- যুদ্ধ চলাকালীন ইহুদিরা মুসলমানদের পাশাপাশি সামরিক ব্যয়নির্বাহ বহন করবে।
- মক্কার কুরাইশ কিংবা তাদের কোনো মিত্রকে কেউ কোনো প্রকার আশ্রয় বা অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে পারবে না।
- সনদভুক্ত কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার দায়ভার তাকেই বহন করতে হবে, তার পুরো গোত্রকে নয়।
- দুর্বল ও মজলুমকে সর্বাবস্থায় সাহায্য করা হবে এবং জালেমকে কোনো প্রকার প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
- সনদভুক্ত পক্ষসমূহের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তার চূড়ান্ত ফায়সালা করবেন মহান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সা.)।
- কোনো পক্ষ কুরাইশদের সাথে পৃথক কোনো চুক্তি সম্পাদন করতে পারবে না।
- খুন ও রক্তপণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রথাগত ন্যায়বিচার অক্ষুণ্ণ থাকবে।
- কেউ কারও অধিকার হরণ করবে না এবং পারস্পরিক সম্পর্ক হবে কল্যাণ ও ন্যায়ের ভিত্তিতে।
- মদিনায় শান্তি রক্ষায় ইহুদি ও মুসলিম পরস্পরের পরম হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধু হিসেবে বসবাস করবে।
- মদিনা থেকে যারা বাইরে যাবে এবং যারা মদিনায় অবস্থান করবে তারা উভয়েই নিরাপদ থাকবে, যদি না সে সীমালঙ্ঘনকারী হয়।
- আল্লাহ তা’আলা এই সনদের সর্বাধিক নিষ্ঠাবান ও সততাপূর্ণ পালনকারীদের অভিভাবক ও সাহায্যকারী।
٥- عرّف الغزوة ثم تحدث عن غزوة أحد مع ذكر العبر التي تعلّمها المسلمون من هذه الغزوة-
[৫. غزوة এর পরিচয় দাও। অতঃপর غزوة أحد সম্পর্কে আলোচনপূর্বক এ غزوة হতে মুসলমানদের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো উল্লেখ কর।]
১. গাযওয়ার সংজ্ঞা:
ইসলামী পরিভাষায়, যে সকল সামরিক অভিযানে স্বয়ং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সশরীরে উপস্থিত থেকে সেনাপতিত্ব করেছেন, সেগুলোকে ‘গাযওয়া’ (الغزوة) বলা হয়। আর যে অভিযানে তিনি নিজে অংশগ্রহণ না করে কোনো সাহাবীকে সেনাপতি মনোনীত করে প্রেরণ করেছেন, তাকে ‘সারিয়্যাহ’ (السرية) বলা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে গাযওয়ার সংখ্যা ২৭টি।
২. ওহুদ যুদ্ধের বিবরণ (৩য় হিজরী):
বদর যুদ্ধের শোচনীয় পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ এবং সিরিয়া বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত করার জন্য আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশরা ৩,০০০ সুসজ্জিত সৈন্য নিয়ে মদিনা অভিমুখে ওহুদ প্রান্তরে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) ১,০০০ সৈন্য নিয়ে বের হলেও পথিমধ্যে মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ৩০০ সঙ্গীসহ দলত্যাগ করে। অবশিষ্ট ৭০০ মুসলিম সৈন্য নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) ওহুদ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান নেন। তিনি পিছন দিক থেকে শত্রুর অশ্বারোহী বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর নেতৃত্বে ৫০ জন তীরন্দাজকে ওহুদ গিরিপথে মোতায়েন করেন এবং নির্দেশ দেন—জয় বা পরাজয় যাই হোক, নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত এ স্থান ত্যাগ করা যাবে না।
যুদ্ধের প্রথমার্ধে মুসলিমরা বিজয়ী হয়ে গণিমত সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়লে তীরন্দাজদের অধিকাংশ গিরিপথ ছেড়ে চলে আসে। এই সুযোগে খালিদ বিন ওয়ালিদ (তখনও অমুসলিম) পিছন দিক থেকে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। ফলে মুসলিম শিবিরে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, হযরত হামযাহ (রা.)-সহ ৭০ জন শ্রেষ্ঠ সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন এবং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাঁত মুবারক শহীদ হয় ও তিনি আহত হন।
৩. ওহুদ যুদ্ধ থেকে মুসলমানদের শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ:
- নেতৃত্বের নির্দেশের প্রতি অবিচল আনুগত্য: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি সামরিক নির্দেশ ক্ষণিকের জন্য অমান্য করার ফলে নিশ্চিত বিজয় সাময়িক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছিল।
- পার্থিব মোহ ও গণিমতের লালসা বর্জন: দুনিয়াবী সম্পদের প্রতি মোহ আধ্যাত্মিক ও সামরিক উভয় ময়দানে পতনের কারণ হয়।
- পরীক্ষা ও আত্মশুদ্ধি: সত্য মুমিন ও মুনাফিকের মধ্যকার ভেদাভেদ ওহুদের ময়দানে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
- সবর ও অবিচলতা: প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে ময়দানে অটল থাকার অনুপম শিক্ষা।
٦- تحدث عن فتح خيبر بالتفصيل-
[৬. খায়বার বিজয় সম্পর্কে বিস্তারিত লেখ।]
১. খায়বার অভিযানের পটভূমি (৭ম হিজরী):
মদিনা থেকে বিতাড়িত ইহুদিরা মদিনার উত্তর দিকে অবস্থিত সুরক্ষিত খায়বার দুর্গে সমবেত হয়ে কুরাইশ ও অন্যান্য আরব গোত্রকে ইসলামের বিরুদ্ধে উস্কানি দিত। খন্দক যুদ্ধের মূল ষড়যন্ত্রকারী ছিল খায়বারের ইহুদিরা। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর মক্কার দিক থেকে সাময়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) ১,৪০০ সাহাবী নিয়ে খায়বার অভিমুখে রওয়ানা হন।
২. যুদ্ধ ও খায়বারের দুর্গসমূহ জয়:
খায়বারে ৮টি শক্তিশালী পাথুরে দুর্গ ছিল (যেমন: নায়েম, ক্বামূস, নাতাত ইত্যাদি)। এক এক করে দুর্গগুলো বিজিত হলেও মারহাবের সুরক্ষিত কামূস দুর্গ কিছুতেই জয় করা যাচ্ছিল না। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করলেন:
«لَأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ غَدًا رَجُلًا يُحِبُّهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ، وَيُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَى يَدَيْهِ»
পরদিন তিনি হযরত আলী (রা.)-কে পতাকা অর্পণ করেন। হযরত আলী (রা.) বীরবিক্রমে ইহুদি সেনাপতি মারহাবকে দ্বিখণ্ডিত করেন এবং দুর্গের ভারী লৌহকপাট উপড়ে ফেলে কামূস দুর্গ জয় করেন।
৩. সন্ধি ও ফলাফল:
ইহুদিরা সম্পূর্ণ পরাজিত হয়ে সন্ধির প্রস্তাব দেয় যে, তারা খায়বারের জমি চাষাবাদ করবে এবং ফসলের অর্ধেক মুসলিমদের প্রদান করবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ প্রস্তাব গ্রহণ করেন। খায়বার বিজয়ের মাধ্যমে আরবে ইহুদি সামরিক আধিপত্য চিরতরে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং মুসলিমদের অর্থনৈতিক সংকট দূরীভূত হয়।
مجموعة (ب) – খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (মান: ৫ × ৪ = ২০)
٧- اكتب نتائج غزوة بدر بالاختصار-
[৭. غزوة بدر এর ফলাফল সংক্ষেপে লেখ।]
- সত্যের চূড়ান্ত বিজয়: বদর যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় সংখ্যা ও অস্ত্র নয়, বরং ঈমানী বলিয়ানতাই বিজয়ের মূল চাবিকাঠি (আল-ফুরক্বান)।
- কুরাইশ নেতৃত্বের ধ্বংস: আবু জাহেল, উতবা, শাইবা, উমাইয়া ইবনে খালাফসহ কুরাইশদের শীর্ষস্থানীয় ৭০ জন নেতা নিহত হয় এবং ৭০ জন বন্দি হয়।
- মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সুসংহত: নবপ্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্র একটি অপরাজেয় সামরিক শক্তি হিসেবে আরবের বুকে আত্মপ্রকাশ করে।
- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব: আরবের বিভিন্ন যাযাবর গোত্র ও বহিঃবিশ্ব মুসলমানদের সমীহ করতে শুরু করে।
٨- تحدث عن حلف الفضول-
[৮. হিলফুল ফুজুল সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ফিজার যুদ্ধের বিভীষিকা এবং এক ইয়েমেনী ব্যবসায়ীর পণ্য মক্কার আস ইবনে ওয়ায়েল কর্তৃক আত্মসাতের ঘটনার পর, জাহেলী সমাজের অন্যায় ও জুলুমের অবসান ঘটাতে জুবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিবের উদ্যোগে আবদুল্লাহ ইবনে জুদ’আনের গৃহে একটি শান্তিসংঘ গঠিত হয়। মাত্র ২০ বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ (সা.) এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এর মূল নীতি ছিল—মজলুমকে সাহায্য করা, রক্তপাত বন্ধ করা এবং পথচারীদের নিরাপত্তা দেওয়া। নবুওয়াতের পরও রাসূলুল্লাহ (সা.) বলতেন, এর বিনিময়ে যদি আমাকে লাল উটও দেওয়া হতো তবে আমি খুশি হতাম না, আর ইসলামেও এমন চুক্তির আহ্বান জানানো হলে আমি সাড়া দেব।
٩- تحدث عن الهجرة الأولى إلى الحبشة-
[৯. আবিসিনিয়ায় প্রথম হিজরত সম্পর্কে আলোচনা কর।]
নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষে (৬১৫ খ্রি.) কুরাইশদের অসহনীয় জুলুম-নির্যাতন চরম সীমায় পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে ন্যায়পরায়ণ খ্রিস্টান বাদশাহ নাজ্জাশীর দেশ আবিসিনিয়ায় হিজরতের পরামর্শ দেন। হযরত উসমান (রা.) ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যাহ (রা.)-সহ মোট ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী গোপনে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে আবিসিনিয়ায় গমন করেন। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম হিজরত। সেখানে তাঁরা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে ধর্ম পালনের সুযোগ পান।
١٠- تحدّث عن أهل بيت النبيّ صلّى الله عليه وسلّم وأولاده-
[১০. নবি (স) এর পরিবার ও সন্তানাদি সম্পর্কে আলোচনা কর।]
- আহলে বাইত: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র স্ত্রীগণ (উম্মাহাতুল মু’মিনীন) এবং হযরত আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে নিয়ে প্রধানত আহলে বাইত গঠিত।
- সন্তানসন্ততি: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মোট ৭ জন সন্তান ছিলেন (৩ পুত্র ও ৪ কন্যা)।
- পুত্রগণ: কাসিম, আবদুল্লাহ (উভয়ে খাদীজা রা.-এর গর্ভে) এবং ইব্রাহীম (মারিয়া কিবতিয়া রা.-এর গর্ভে)। তাঁরা সকলেই শৈশবে ইন্তেকাল করেন।
- কন্যাগণ: যায়নাব, রুকাইয়্যাহ, উম্মে কুলসুম এবং সাইয়্যিদাতু নিসায়িল আলামীন ফাতিমাতুয যাহরা (রা.)। সকল কন্যাই হযরত খাদীজা (রা.)-এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন।
١١- تحدّث عن بيعة العقبة-
[১১. بيعة আকাবা সম্পর্কে আলোচনা কর।]
হজের মৌসুমে মক্কার উপকণ্ঠে ‘আকাবা’ নামক স্থানে মদিনার অধিবাসীদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঐতিহাসিক দুটি বায়’আত অনুষ্ঠিত হয়:
- প্রথম বায়’আতে আকাবা (নবুওয়াতের ১২তম বর্ষ): মদিনার ১২ জন ব্যক্তি শিরক, চুরি, ব্যভিচার ও মিথ্যা অপবাদ বর্জন এবং রাসূলের আনুগত্যের শপথ নেন। একে ‘বায়’আতে নিসা’ও বলা হয়।
- দ্বিতীয় বায়’আতে আকাবা (নবুওয়াতের ১৩তম বর্ষ): মদিনার ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে মদিনায় হিজরতের আমন্ত্রণ জানান এবং নিজেদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে তাঁকে রক্ষা করার চূড়ান্ত শপথ গ্রহণ করেন। এটিই হিজরতের পথ সুগম করে।
١٢- تحدث عن حجة الوداع-
[১২. বিদায় হজ সম্পর্কে আলোচনা কর।]
১০ম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবনে একমাত্র পূর্ণাঙ্গ হজ আদায় করেন, যা ‘হাজ্জাতুল বিদা’ বা বিদায় হজ নামে পরিচিত। আরাফাতের ময়দানে জাবালে রাহমাতের পাদদেশে প্রায় সোয়া লক্ষ সাহাবীর সম্মুখে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণ প্রদান করেন। এ ভাষণে তিনি মানবজাতির সার্বজনীন মৌলিক মানবাধিকার, বর্ণবাদের অবসান, নারীর অধিকার ও মর্যাদা, রক্তের বদলা রদ, সুদের বিলুপ্তি এবং কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে রাখার চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রদান করেন। এ দিনই অবতীর্ণ হয় দ্বীনের পূর্ণতা ঘোষণার আয়াত: «الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ»।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ পাঠের মূল উদ্দেশ্য কী?
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ, নেতৃত্ব ও নৈতিক শিক্ষা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বাস্তবায়ন করাই এ বিষয়ের মূল লক্ষ্য।
২. মদিনা সনদকে ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান বলা হয় কেন?
কারণ এর মাধ্যমে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনার বহুজাতি ও বহুধর্মীয় সমাজে লিখিত আইনের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল।
৩. ওহুদ যুদ্ধের প্রধান শিক্ষণীয় দিক কী?
আমীর বা যোগ্য নেতৃত্বের নির্দেশ নিঃশর্তভাবে মেনে চলা এবং দুনিয়াবী স্বার্থ বা গণিমতের মোহ পরিহার করা।
৪. খায়বার যুদ্ধে কে ঐতিহাসিক লৌহকপাট উন্মোচন করেছিলেন?
আসাদুল্লাহিল গালিব হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা.) মারহাবকে বধ করে খায়বারের কামূস দুর্গ জয় করেন।
৫. হিলফুল ফুজুল কেন গঠিত হয়েছিল?
ফিজার যুদ্ধের পর জাহেলী আরবের অন্যায়, অবিচার ও রক্তপাত বন্ধ করে মজলুম ও পথচারীদের সহায়তার উদ্দেশ্যে এটি গঠিত হয়।
৬. ফাজিল অনার্স পরীক্ষায় সীরাতুন্নবী বিষয়ে ভালো নম্বরের উপায় কী?
ঐতিহাসিক সন-তারিখের নির্ভুল উল্লেখ, আরবি উদ্ধৃতি ও প্রাসঙ্গিক দলিলের আলোকে পয়েন্টভিত্তিক উত্তর লিখলে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যায়।