ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (Economics and Islamic Economics)
বিষয় কোড: 202106 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
২০২৩ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (Economics and Islamic Economics – 202106) পরীক্ষাটি সনাতন ও ইসলামি অর্থনীতির মৌলিক নীতিমালা, চাহিদা ও জোগান বিধি, বাজার কাঠামো, সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সম্পদ বণ্টন এবং যাকাত ও তাকাফুলের প্রায়োগিক রূপ মূল্যায়নের জন্য অনুষ্ঠিত হয়। প্রশ্নপত্রটি দুটি বিভাগে বিভক্ত: ক-বিভাগ (রচনামূলক – চারটির উত্তর দিতে হবে, মান ৪ × ১৫ = ৬০) এবং খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত – চারটির উত্তর দিতে হবে, মান ৪ × ৫ = ২০)। নিচে পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির সুবিধার্থে সকল প্রশ্নের প্রামাণ্য ও বিস্তারিত সমাধান উপস্থাপন করা হলো।
ক-বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্ন (যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও: মান ৪ × ১৫ = ৬০)
১। ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা দাও। “ইসলামি অর্থনীতির উৎস যেখানে কুরআন ও হাদিস, আধুনিক অর্থনীতি সেখানে মানবপ্রসূত”—উক্তিটি ব্যাখ্যা কর। ১৫
[Give a definition of Islamic economics. “The sources of Islamic economics are the Quran and Hadith, where the modern economics in man-made”—Explain the quote.]
ভূমিকা
মানবজাতির বৈষয়িক সচ্ছলতা ও নৈতিক মুক্তি নিশ্চিতকরণে অর্থনীতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে মানবসৃষ্ট সনাতন অর্থনীতি যেখানে মানুষের আত্মস্বার্থ, ভোগবাদ ও শ্রেণিদ্বন্দ্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, সেখানে ইসলামি অর্থনীতি মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, আসমানি ওহি এবং চিরন্তন নৈতিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা
ইসলামি অর্থনীতির প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও গবেষকগণের প্রদত্ত কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সংজ্ঞা নিম্নরূপ:
১. ড. এম এ মান্নান (Dr. M. A. Mannan): “Islamic Economics is a social science which studies the economic problems of a people imbued with the values of Islam.” (ইসলামি অর্থনীতি হলো এমন এক সমাজবিজ্ঞান, যা ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমস্যা ও তার সমাধানের পথ পর্যালোচনা করে)।
২. ড. খুরশীদ আহমদ: “ইসলামি অর্থনীতি হলো মানবকল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে ইসলামি শরিয়াহর আলোকে বৈষয়িক সম্পদের উৎপাদন, বণ্টন ও ব্যবহারের সুশৃঙ্খল অধ্যয়ন।”
৩. আল্লামা তকী উসমানী: “ইসলামি অর্থনীতি এমন এক অর্থব্যবস্থা, যা হালাল উপায়ে সম্পদ উপার্জনকে ইবাদত গণ্য করে এবং ন্যায়পরায়ণতা (আদল) ও সহমর্মিতার (ইহসান) ভিত্তিতে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে।”
উৎসগত পার্থক্যের বিশ্লেষণ
উক্তিটিতে ইসলামি অর্থনীতি ও আধুনিক সনাতন (পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র) অর্থনীতির মৌলিক উৎসের পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে:
| বিবেচ্য বিষয় | ইসলামি অর্থনীতি (Islamic Economics) | আধুনিক সনাতন অর্থনীতি (Capitalism / Socialism) |
|---|---|---|
| মূল উৎস | পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস (আসমানি ওহি ভিত্তিক)। | মানবীয় বুদ্ধি, দার্শনিক মতবাদ, অভিজ্ঞতা ও বৈষয়িক পর্যবেক্ষণ। |
| স্থায়িত্ব ও নির্ভুলতা | চিরন্তন, অভ্রান্ত ও সর্বকালের সকল মানুষের জন্য অপরিবর্তনীয় ও শাশ্বত। | স্থান-কাল-পাত্রভেদে পরিবর্তনশীল, স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও ক্রমাগত সংশোধনসাপেক্ষ। |
| মালিকানার ধারণা | আসমান ও জমিনের সার্বভৌম মালিকানা একমাত্র আল্লাহর; মানুষ কেবল সাময়িক আমানতদার। | পুঁজিবাদে ব্যক্তির নিরঙ্কুশ অবাধ মালিকানা; সমাজতন্ত্রে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মালিকানা। |
| নৈতিকতা ও পরকাল | অর্থনৈতিক প্রতিটি কর্মকাণ্ড ইবাদত ও আখিরাতের জবাবদিহিতার সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। | পরকাল বা জবাবদিহিতাহীন; সম্পূর্ণ বস্তুগত লাভ-লোকসান ও ব্যক্তিস্বার্থ নির্ভর। |
| আর্থিক বিধিনিষেধ | সুদ, জুয়া, প্রতারণা, মজুতদারি, অপচয় এবং হারাম পণ্যের বাণিজ্য সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। | সুদ ও ফটকাবাজি অর্থনীতির চালিকাশক্তি; মুনাফা অর্জনে পণ্যের নৈতিক বালাই নেই। |
উপসংহার: মানব রচিত আইন কখনোই মানবজাতির প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না, কারণ এতে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব থাকে। পক্ষান্তরে, ঐশী ওহি-নির্ভর ইসলামি অর্থনীতিতে মানুষের সকল প্রকার শোষণ থেকে মুক্তির চূড়ান্ত নিশ্চয়তা রয়েছে। তাই উক্তিটি সর্বতোভাবে সত্য ও যুক্তিযুক্ত।
২। চাহিদা বিধি কাকে বলে? একটি কাল্পনিক চাহিদা সূচি হতে চাহিদা রেখা অংকন কর। ৫+১০=১৫
[What do you mean by law of demand? Draw a demand curve from an imaginary demand schedule.]
চাহিদা বিধির সংজ্ঞা
সাধারণ অর্থে কোনো দ্রব্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে চাহিদা বলা হলেও অর্থনীতিতে কার্যকর চাহিদা হতে তিনটি শর্ত পূরণ হতে হয়: (১) দ্রব্যটি পাওয়ার ইচ্ছা, (২) দ্রব্যটি ক্রয়ের আর্থিক সামর্থ্য এবং (৩) অর্থ ব্যয় করার সদিচ্ছা।
চাহিদা বিধি (Law of Demand): অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে (যেমন—ভোক্তার আয়, রুচি, পছন্দ এবং সম্পর্কিত অন্যান্য দ্রব্যের দাম স্থির থাকলে), কোনো দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেলে তার চাহিদার পরিমাণ হ্রাস পায় এবং দাম হ্রাস পেলে চাহিদার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। দাম ও চাহিদার পরিমাণের মধ্যকার এই বিপরীতমুখী সম্পর্ককে অর্থনীতির ভাষায় ‘চাহিদা বিধি’ বলা হয়। অধ্যাপক আলফ্রেড মার্শাল বলেন: “The amount demanded increases with a fall in price, and diminishes with a rise in price.”
কাল্পনিক চাহিদা সূচি (Demand Schedule)
দাম ও চাহিদার বিপরীতমুখী সম্পর্ক নিচে একটি কাল্পনিক সূচির মাধ্যমে প্রদর্শন করা হলো:
| প্রতি একক দ্রব্যের দাম (টাকায়) | চাহিদার পরিমাণ (এককে) | প্রাপ্ত বিন্দু |
|---|---|---|
| ১০ | ৪০ | A |
| ২০ | ৩০ | B |
| ৩০ | ২০ | C |
| ৪০ | ১০ | D |
চাহিদা রেখা অঙ্কন ও ব্যাখ্যা
উপর্যুক্ত সূচির তথ্যানুযায়ী একটি চাহিদা রেখা অঙ্কন করা যায়:
– অক্ষ পরিচিতি: রেখাচিত্রের ভূমি অক্ষে (OX) চাহিদার পরিমাণ এবং লম্ব অক্ষে (OY) দ্রব্যের দাম নির্দেশ করা হয়।
– বিন্দু স্থাপন: দাম যখন ১০ টাকা, তখন চাহিদার পরিমাণ ৪০ একক (বিন্দু A)। দাম বৃদ্ধি পেয়ে ২০, ৩০ ও ৪০ টাকা হলে চাহিদার পরিমাণ যথাক্রমে হ্রাস পেয়ে ৩০, ২০ ও ১০ এককে নেমে আসে (বিন্দু B, C ও D)।
– রেখা গঠন: A, B, C ও D বিন্দুগুলো পরস্পর সংযুক্ত করলে বাম থেকে ডান দিকে নিম্নগামী DD’ চাহিদা রেখা পাওয়া যায়।
– বৈশিষ্ট্য: DD’ রেখার নিম্নগামী প্রবণতা প্রমাণ করে যে দাম ও চাহিদার মধ্যে ঋণাত্মক বা বিপরীতমুখী সম্পর্ক বিদ্যমান।
৩। মুনাফা ও সুদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ কর। “রিবা আল-নাসিয়া ও রিবা আল-ফদল” ধারণা দুটির ব্যাখ্যা দাও। ৫+১০=১৫
[Make a distinction between profit and interest. Explain the concept of Riba al-Nasia and Riba al-Fadal.]
মুনাফা ও সুদের মধ্যে পার্থক্য
ইসলামি অর্থনীতিতে ব্যবসায়ের ঝুঁকি গ্রহণপূর্বক লব্ধ মুনাফাকে সম্পূর্ণ হালাল এবং নিশ্চিত আর্থিক সুবিধাজনক ঋণজনিত সুদকে দ্ব্যর্থহীনভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এদের মধ্যকার প্রধান পার্থক্যসমূহ নিম্নরূপ:
| তুলনার বিষয় | মুনাফা (Profit) | সুদ (Interest / Riba) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | মূলধন ও শ্রমের যৌথ বিনিয়োগে ব্যবসায়িক লাভ বা লোকসানের ঝুঁকি গ্রহণ করে অর্জিত বৈধ উদ্বৃত্ত। | ঋণ বাবদ মূলধনের ওপর সময় গণনার ভিত্তিতে পূর্বনির্ধারিত বাধ্যতামূলক অতিরিক্ত অর্থ। |
| শরয়ি বিধান | কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সম্পূর্ণ হালাল (সূরা বাক্বারা: ২৭৫)। | কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিলে সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। |
| ঝুঁকি বণ্টন | ব্যবসায়ে লাভ ও লোকসান উভয় ঝুঁকি বিদ্যমান এবং পক্ষদ্বয়ের মধ্যে বণ্টিত হয়। | ঝুঁকিহীন; ব্যবসায় লাভ হোক বা লোকসান হোক, ঋণদাতা নিশ্চিত অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। |
| নির্ধারণ প্রক্রিয়া | ব্যবসায়িক ফলাফল সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকৃত আয়ের অনুপাতে নির্ধারিত হয়। | চুক্তি সম্পাদনের শুরুতেই নিশ্চিত ও নির্ধারিত হারে ধার্য করা হয়। |
| সামাজিক প্রভাব | অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় ও সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। | সমাজের দরিদ্র ও ঋণগ্রস্তের ওপর শোষণ চালায় এবং পুঁজিকেন্দ্রীকরণ ঘটায়। |
রিবা আল-নাসিয়া ও রিবা আল-ফদল-এর ব্যাখ্যা
ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে রিবা (সুদ) প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত:
- রিবা আল-নাসিয়া (رِبَا النَّسِيئَةِ – বিলম্বে প্রদেয় সুদ): এটি হলো ঋণের মেয়াদের বিপরীতে মূলধনের ওপর নির্ধারিত অতিরিক্ত অর্থ। জাহিলি যুগে আরবদের মধ্যে ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানোর বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ ধার্য করার এই প্রথা চালু ছিল। পবিত্র কুরআনে যে সুদের তীব্র নিন্দা ও নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হয়েছে, তা মূলত রিবা আন-নাসিয়া। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রচলিত আমানত ও ঋণের সুদ এর সরাসরি অন্তর্ভুক্ত।
- রিবা আল-ফদল (رِبَا الْفَضْلِ – পণ্য বিনিময়ে অতিরিক্ত নেওয়া): একই জাতীয় পরিমাপযোগ্য বা ওজনযোগ্য দ্রব্যাদি তাৎক্ষণিক নগদ বিনিময়ের ক্ষেত্রে সমপরিমাণ না দিয়ে এক পক্ষের অতিরিক্ত গ্রহণ করাকে রিবা আল-ফদল বলে। রসুলুল্লাহ ﷺ বিখ্যাত হাদিসে উল্লেখ করেছেন: “স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর এবং লবণের বিনিময়ে লবণ—সমান সমান ও হাতে হাতে বিক্রি করতে হবে। যে ব্যক্তি অতিরিক্ত দেবে বা নেবে, সে সুদি কারবার করল।” (সহিহ মুসলিম)। দ্রব্যের অসম বিনিময় এবং এতে প্রতারণা রোধকল্পে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে।
৪। পূর্ণপ্রতিযোগিতামূলক বাজার বলতে কী বুঝ? এ বাজারে পণ্যের দাম কীভাবে নির্ধারিত হয় তা ব্যাখ্যা কর। ৫+১০=১৫
[What do you mean by ‘perfect competitive market’? Explain how price is determined in this type of market.]
পূর্ণপ্রতিযোগিতামূলক বাজারের সংজ্ঞা
যে বাজারে অসংখ্য ক্রেতা ও বিক্রেতা সম্পূর্ণ সমজাতীয় (homogeneous) পণ্য একটি নির্দিষ্ট দামে অবাধে ক্রয়-বিক্রয় করে, যেখানে কোনো একক ক্রেতা বা বিক্রেতার পক্ষে বাজার দামকে প্রভাবিত করা সম্ভব হয় না এবং বাজারে নতুন ফার্মের প্রবেশ ও প্রস্থান সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকে, তাকে পূর্ণপ্রতিযোগিতামূলক বাজার (Perfect Competitive Market) বলে।
প্রধান বৈশিষ্ট্য: (১) অসংখ্য ক্রেতা ও বিক্রেতা, (২) সমজাতীয় পণ্য, (৩) একক বাজার দাম, (৪) ফার্মের অবাধ প্রবেশ ও প্রস্থান, (৫) বাজার সম্পর্কে ক্রেতা ও বিক্রেতার পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান এবং (৬) ফার্ম হলো ‘দাম গ্রহীতা’ (Price Taker), ‘দাম নির্ধারক’ (Price Maker) নয়।
দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া (Price Determination)
পূর্ণপ্রতিযোগিতামূলক বাজারে কোনো একক ক্রেতা বা একক বিক্রেতা পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে পারে না। বরং সামগ্রিক বাজারের ‘মোট চাহিদা’ (Market Demand) এবং ‘মোট জোগান’ (Market Supply)-এর ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমে ভারসাম্য বিন্দুতে পণ্যের দাম নির্ধারিত হয়। মার্শাল একে কাঁচির দুটি ব্লেডের সাথে তুলনা করেছেন।
| প্রতি একক দাম (টাকা) | মোট চাহিদা (একক) | মোট জোগান (একক) | বাজারের অবস্থা | দামের ওপর প্রভাব |
|---|---|---|---|---|
| ১০ | ১০০ | ২০ | চাহিদা > জোগান (ঘাটতি) | দাম বৃদ্ধির চাপ |
| ২০ | ৮০ | ৪০ | চাহিদা > জোগান (ঘাটতি) | দাম বৃদ্ধির চাপ |
| ৩০ | ৬০ | ৬০ | চাহিদা = জোগান (ভারসাম্য) | স্থির দাম (ভারসাম্য) |
| ৪০ | ৪০ | ৮০ | চাহিদা < জোগান (উদ্বৃত্ত) | দাম হ্রাসের চাপ |
| ৫০ | ২০ | ১০০ | চাহিদা < জোগান (উদ্বৃত্ত) | দাম হ্রাসের চাপ |
ভারসাম্য বিশ্লেষণ:
১. ছকে দেখা যায়, দাম যখন ৩০ টাকা, তখন বাজারের মোট চাহিদা (৬০ একক) এবং মোট জোগান (৬০ একক) পরস্পর সমান। ফলে ৩০ টাকা হলো ভারসাম্য দাম (Equilibrium Price) এবং ৬০ একক হলো ভারসাম্য পরিমাণ (Equilibrium Quantity)।
২. দাম ৩০ টাকার নিচে নামলে বাজারে ঘাটতি দেখা দেয়, ফলে ক্রেতাদের প্রতিযোগিতায় দাম পুনরায় ৩০ টাকায় উন্নীত হয়। আবার দাম ৩০ টাকার উপরে উঠলে অবিক্রীত পণ্যের চাপে বিক্রেতাদের প্রতিযোগিতায় দাম কমে পুনরায় ৩০ টাকায় ফিরে আসে। এভাবেই পূর্ণপ্রতিযোগিতামূলক বাজারে ভারসাম্য দাম প্রতিষ্ঠিত হয়।
৫। মালিকানার পরিচয় দাও। ইসলামি অর্থনীতিতে মালিকানার প্রকৃতির স্বরূপ আলোচনা কর। ৫+১০=১৫
[Give the definition of ownership. Discuss the nature of private ownership in Islamic economics.]
মালিকানার সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: আরবি ‘মিলকিয়াত’ (الملكية) বা মালিকানা শব্দের আভিধানিক অর্থ অধিকার, ক্ষমতা, অধীনস্থতা ও কর্তৃত্ব।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ফিকহশাস্ত্রের পরিভাষায়, “মালিকানা হলো কোনো বস্তুর ওপর শরিয়তসম্মত এমন এক বিশেষ অধিকার ও কর্তৃত্ব, যা অন্য কাউকে তাতে বিনা অনুমতিতে হস্তক্ষেপ করতে বাধা দেয় এবং মালিককে শরিয়তের সীমার মধ্যে উক্ত বস্তু ভোগ, ব্যবহার ও হস্তান্তর করার পূর্ণ এখতিয়ার দেয়।”
ইসলামি অর্থনীতিতে মালিকানার প্রকৃতির স্বরূপ
ইসলামে মালিকানার ধারণা পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ভারসাম্যপূর্ণ। এর মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:
- আল্লাহর সার্বভৌম ও নিরঙ্কুশ মালিকানা: ইসলামি আকিদা অনুযায়ী আসমান, জমিন এবং উভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে তার প্রকৃত, সার্বভৌম ও চূড়ান্ত মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। ইরশাদ হয়েছে: ﴿لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ وَمَا فِيهِنَّ﴾ (আসমানসমূহ ও জমিনের এবং এদের মধ্যে যা কিছু আছে তার সার্বিক রাজত্ব ও মালিকানা একমাত্র আল্লাহর—সূরা মায়িদা: ১২০)।
- মানুষের আমানতদারি বা প্রতিনিধিত্বমূলক মালিকানা: মানুষ কোনো বস্তুর চূড়ান্ত মালিক নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিনিধি বা খলিফা (نائب বা مستخلف) হিসেবে সম্পদের সাময়িক রক্ষক বা ট্রাস্টি। ইরশাদ হয়েছে: ﴿وَأَنفِقُوا مِمَّا جَعَلَكُم مُّسْتَخْلَفِينَ فِيهِ﴾ (আর আল্লাহ তোমাদের যে সম্পদে প্রতিনিধি বানিয়েছেন তা থেকে ব্যয় কর—সূরা হাদিদ: ৭)।
- ব্যক্তিগত মালিকানার স্বীকৃতি ও সীমানা: পুঁজিবাদ যেখানে ব্যক্তিকে সম্পদের ওপর স্বেচ্ছাচারী মালিকানা দেয়, ইসলাম সেখানে বৈধ উপায়ে অর্জিত ব্যক্তিগত মালিকানাকে পূর্ণ স্বীকৃতি দেয়। ব্যক্তির সম্পদ বলপূর্বক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে ছিনিয়ে নেওয়া নিষিদ্ধ। তবে এই মালিকানা নিঃশর্ত নয়; তা হালাল উপার্জন, অপচয়হীন ভোগ এবং শরিয়তের সীমার অধীন।
- হারাম উপায়ে উপার্জনের নিষেধাজ্ঞা: সুদ, ঘুষ, জুয়া, রাহাজানি, কালোবাজারি, ওজনে কম দেওয়া ও প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ ইসলামে ব্যক্তিগত মালিকানা হিসেবে গণ্য হয় না, বরং তা রাষ্ট্র কর্তৃক বাজেয়াপ্তযোগ্য।
- সামাজিক দায়বদ্ধতা ও বণ্টন: সম্পদে কেবল ব্যক্তির একার অধিকার নেই; বিত্তবানের সম্পদে অসহায় ও দরিদ্রদের নির্দিষ্ট হক রয়েছে। যাকাত, সদকা ও ফিতরা আদায় করা মালিকের ওপর বাধ্যতামূলক।
- রাষ্ট্রীয় ও যৌথ মালিকানা: যেসব সম্পদ সামগ্রিক মানবজাতির সাধারণ বেঁচে থাকার সাথে সম্পর্কিত (যেমন—নদী, বনজ সম্পদ, খনিজ তেল ও গ্যাস, চারণভূমি), সেগুলোতে ইসলাম ব্যক্তিমালিকানার বদলে যৌথ বা রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে। রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “সকল মানুষ তিনটি বস্তুতে সমান অংশীদার: পানি, চারণভূমি ও আগুন।” (আবু দাউদ)।
উপসংহার: ইসলামি অর্থনীতিতে মালিকানা হলো নৈতিকতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সামাজিক কল্যাণের এক চমৎকার ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়, যা শোষণমুক্ত অর্থনীতির ভিত্তি রচনা করে।
৬। ইসলামি ব্যাংক ও গতানুগতিক ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ কর। সংক্ষেপে ইসলামি ব্যাংক উদ্ভাবনের ক্রম-ইতিহাস বর্ণনা কর। ৫+১০=১৫
[Make a distinction between Islamic bank and conventional bank. Then briefly discuss the history of foundation of Islamic bank.]
ইসলামি ব্যাংক ও গতানুগতিক ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য
ইসলামি ব্যাংক কেবল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি নৈতিক ও আদর্শিক প্রতিষ্ঠান। প্রচলিত গতানুগতিক (সুদি) ব্যাংকের সাথে এর মৌলিক পার্থক্যসমূহ নিম্নরূপ:
| বিবেচ্য বিষয় | ইসলামি ব্যাংক (Islamic Bank) | গতানুগতিক ব্যাংক (Conventional Bank) |
|---|---|---|
| মূল ভিত্তি | ইসলামি শরিয়াহ, কুরআন-সুন্নাহ এবং সুদমুক্ত নীতি। | মানবীয় আইন ও মুনাফাকেন্দ্রীক সুদি অর্থব্যবস্থা। |
| মুনাফা বনাম সুদ | মুদারাবা ও মুশারাকার ভিত্তিতে লাভ-লোকসান বণ্টন নীতিতে পরিচালিত। | আমানত গ্রহণ ও ঋণ প্রদানে পূর্বনির্ধারিত হারে সুদের লেনদেন করে। |
| সম্পদ ও দ্রব্যের সংশ্লিষ্টতা | প্রকৃত পণ্য ও সম্পদের বাস্তব বেচাকেনা এবং লিজের মাধ্যমে বিনিয়োগ হয়। | নিছক অর্থের লেনদেন ও অর্থের বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ তৈরি করে। |
| গ্রাহকের সাথে সম্পর্ক | অংশীদার, ক্রেতা-বিক্রেতা ও ট্রাস্টি বা প্রতিনিধির সম্পর্ক। | ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার (Debtor-Creditor) সম্পর্ক। |
| শরীয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড | প্রতিটি লেনদেন তদারকি করার জন্য আলেম ও ফিকহবিদদের স্বাধীন শরিয়াহ বোর্ড থাকে। | কোনো শরিয়াহ বোর্ড থাকে না; নিছক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রচলিত আইনে পরিচালিত হয়। |
| হারাম খাতে বিনিয়োগ | মদ, জুয়া, সিনেমা, পর্নোগ্রাফি বা অনৈতিক ব্যবসায় বিনিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। | মুনাফা নিশ্চিত হলে যেকোনো আইনসম্মত সনাতন খাতে বিনিয়োগ অনুমোদিত। |
ইসলামি ব্যাংক উদ্ভাবনের ক্রম-ইতিহাস
আধুনিক বিশ্বে সুদের অভিশাপ থেকে মুসলিম উম্মাহকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ইসলামি ব্যাংকিং ধারণার বিকাশ ঘটে। এর প্রধান ঐতিহাসিক ধাপসমূহ:
- প্রারম্ভিক চিন্তা ও তাত্ত্বিক প্রচেষ্টা (১৯৪০-১৯৫০ দশক): বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী, মুহাম্মদ হামিদউল্লাহ, বায়েকার আস-সদর প্রমুখ মুসলিম চিন্তাবিদ সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের তাত্ত্বিক কাঠামো প্রস্তাব করেন।
- মিট গামর লোকাল সেভিংস ব্যাংক (১৯৬৩): আধুনিক বিশ্বে সর্বপ্রথম সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটান মিসরের অর্থনীতিবিদ ড. আহমদ এল-নাজ্জার ১৯৬৩ সালে মিসরের মিট গামর অঞ্চলে। এটি কোনো সুদ ছাড়াই গ্রামীণ সঞ্চয় সংগ্রহ ও মুশারাকার ভিত্তিতে বিনিয়োগ করে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে।
- ওআইসি ও আইডিবি প্রতিষ্ঠা (১৯৭৪-১৯৭৫): ১৯৭৪ সালে ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে ইসলামি অর্থব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালে জেদ্দায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় ‘ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (IDB) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা মুসলিম বিশ্বের উন্নয়নে মাইলফলক স্থাপন করে।
- প্রথম বাণিজ্যিক ইসলামি ব্যাংক (১৯৭৫): ১৯৭৫ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বেসরকারি উদ্যোগে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক ইসলামি ব্যাংক হিসেবে ‘দুবাই ইসলামিক ব্যাংক’ (Dubai Islamic Bank) প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর কুয়েত ফাইন্যান্স হাউস (১৯৭৭), ফয়সাল ইসলামিক ব্যাংক অব ইজিপ্ট (১৯৭৭) ইত্যাদি গড়ে ওঠে।
- দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশে বিকাশ (১৯৮৩): ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম পূর্ণাঙ্গ সুদমুক্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে ‘ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’ (IBBL) যাত্রা শুরু করে, যা বর্তমানে দেশের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে আল-আরাফাহ, সোশ্যাল ইসলামী, শাহজালাল ইসলামি ব্যাংকসহ বহু ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়।
৭। যাকাত বণ্টনের খাতসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর। অতঃপর সমাজের দরিদ্রতা দূরীকরণে যাকাতের ভূমিকা মূল্যায়ন কর। ৭+৮=১৫
[Discuss the sector of Zakat allocation in details. Evaluate the role of Zakat in poverty alleviation in society.]
যাকাত বণ্টনের খাতসমূহ (Eight Heads of Zakat)
মহান আল্লাহ সুরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে যাকাত বণ্টনের আটটি খাত সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন:
﴿إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ﴾
- ফকির (الفقراء): যাদের নিজস্ব কোনো জীবিকা বা সম্পদ নেই অথবা অত্যন্ত সামান্য সম্পদ আছে যা দিয়ে মৌলিক প্রয়োজনের অর্ধেকও মেটানো সম্ভব হয় না।
- মিসকিন (المساكين): যাদের বাহ্যিকভাবে সামান্য আয় বা সংস্থান রয়েছে কিন্তু তা তাদের জীবনযাত্রার অপরিহার্য ব্যয় নির্বাহের জন্য যথেষ্ট নয় এবং তারা লজ্জায় কারও কাছে হাত পাততে পারে না।
- যাকাত আদায়কারী কর্মচারী (العاملين عليها): ইসলামি রাষ্ট্র কর্তৃক যাকাত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বণ্টনের কাজে নিয়োজিত দায়িত্বশীল ও কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ, তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে যাকাত তহবিল থেকে প্রদান করা হয়।
- মুয়াল্লাফাতুল কুলূব (المؤلفة قلوبهم): যাদের চিত্তাকর্ষণের উদ্দেশ্যে বা ইসলামে তাদের মনকে সুদৃঢ় করার জন্য কিংবা ইসলামের ওপর তাদের অনিষ্ট দূরীকরণের জন্য যাকাত দেওয়া হয়।
- দাসমুক্তি (في الرقاب): দাস-দাসীদের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্য বা বন্দিদের মুক্তির ব্যয় নির্বাহে এ খাতের অর্থ ব্যবহৃত হয়।
- ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (الغارمين): যারা বৈধ প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ করে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে এবং নিজস্ব সম্পদ দিয়ে ঋণ পরিশোধে সম্পূর্ণ অক্ষম।
- ফি সাবিলিল্লাহ (في سبيل الله): মহান আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা, ইসলামি দাওয়াহ ও প্রতিরক্ষামূলক জিহাদের পথে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সাহায্যার্থে।
- মুসাফির (ابن السبيل): নিজ এলাকায় সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও সফর অবস্থায় কোনো বৈধ ভ্রমণকারী অর্থাভাবে বিপদে পড়লে তাকে নিজ বাড়ি ফেরার উপযোগী অর্থ প্রদান করা।
দরিদ্রতা দূরীকরণে যাকাতের ভূমিকা
যাকাত নিছক ব্যক্তিগত ঐচ্ছিক দান নয়, বরং এটি দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গঠনের এক বৈপ্লবিক আর্থিক হাতিয়ার:
- ক্রয়ক্ষমতা ও কার্যকর চাহিদা বৃদ্ধি: যাকাত ধনী ব্যক্তিদের নিষ্ক্রিয় পুঞ্জীভূত সম্পদ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হাতে স্থানান্তর করে। দরিদ্রদের প্রান্তিক ভোগপ্রবণতা (MPC) বেশি হওয়ায় তাদের হাতে অর্থ পৌঁছলে তারা খাদ্য, বস্ত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধিকে সচল রাখে।
- সম্পদ পুঞ্জীভূতকরণ রোধ: সম্পদ যাতে কেবল ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয় (সূরা হাশর: ৭), যাকাত তা নিশ্চিত করে এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করে।
- স্থায়ী কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন: ফিকহবিদদের মতে, দরিদ্রকে এমনভাবে যাকাত দেওয়া উত্তম যাতে সে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে; যেমন—রিকশা, সেলাই মেশিন, ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি ইত্যাদি ক্রয়ের মাধ্যমে তাকে স্থায়ীভাবে স্বাবলম্বী করা।
- সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: অক্ষম, পঙ্গু, বিধবা ও ইয়াতিমদের জন্য যাকাত তহবিল একটি সার্বক্ষণিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে, যা ভিক্ষাবৃত্তি উচ্ছেদ করে।
৮। বিমা কাকে বলে? প্রচলিত বিমা ও ইসলামি বিমার মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর। ৫+১০=১৫
[What is insurance? Discuss the difference between conventional insurance and Islamic insurance.]
বিমার সংজ্ঞা
সাধারণ সংজ্ঞা: বিমা (Insurance) হলো এমন একটি আর্থিক চুক্তি, যার মাধ্যমে বিমা কোম্পানি নির্দিষ্ট প্রিমিয়ামের বিনিময়ে গ্রাহকের ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য কোনো ঝুঁকি, ক্ষয়ক্ষতি বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়।
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি: আধুনিক ইসলামি ফিকহবিদদের মতে, পারস্পরিক সাহায্য, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে সম্ভাব্য বিপদে ক্ষতিপূরণ প্রদানের উদ্দেশ্যে শরিয়তসম্মত চুক্তি হলো ইসলামি বিমা বা তাকাফুল (التكافل)।
প্রচলিত বিমা ও ইসলামি বিমার মধ্যে পার্থক্য
প্রচলিত গতানুগতিক বিমায় শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনটি মৌলিক নিষিদ্ধ উপাদান রয়েছে: রিবা (সুদ), কিমার (জুয়া) এবং গারার (চরম অনিশ্চয়তা)। পক্ষান্তরে ইসলামি বিমা তাবাররু (পারস্পরিক দান) ও মুদারাবার নীতিতে পরিচালিত। এদের তুলনামূলক পার্থক্য নিচে তুলে ধরা হলো:
| তুলনার বিষয় | প্রচলিত বিমা (Conventional Insurance) | ইসলামি বিমা / তাকাফুল (Islamic Insurance / Takaful) |
|---|---|---|
| চুক্তির প্রকৃতি | ক্ষতিপূরণ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি (Commercial Contract of Exchange)। | পারস্পরিক সহযোগিতা ও দানভিত্তিক চুক্তি (Tabarru & Aqd Ta’awun)। |
| সুদ (Riba) | প্রিমিয়ামের অর্থ সুদি ব্যাংকে বা বন্ডে খাটানো হয় এবং সুদি মুনাফা অর্জন করা হয়। | তহবিল সম্পূর্ণ সুদমুক্ত ও শরিয়াহ অনুমোদিত হালাল ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়। |
| জুয়া ও অনিশ্চয়তা (Qimar & Gharar) | বিমাকৃত ব্যক্তি ক্ষতি না হলে সম্পূর্ণ অর্থ হারায় অথবা স্বল্প প্রিমিয়ামে বহুগুণ লাভ পায়, যা জুয়া ও গারারের অন্তর্ভুক্ত। | গ্রাহকগণ পারস্পরিক কল্যাণে তহবিলে দান করেন; কোনো ক্ষতি হলে তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ পান, যা স্বচ্ছ ও বরকতময়। |
| তহবিলের মালিকানা | প্রিমিয়ামের সমস্ত টাকার মালিক বিমা কোম্পানি। | তহবিলের মালিক বিমা গ্রাহকগণ; কোম্পানি কেবল ‘ওয়াকিল’ বা ‘মুদারিব’ হিসেবে পরিচালনা ফি পায়। |
| উদ্বৃত্ত বণ্টন (Surplus Distribution) | ব্যবসায় উদ্বৃত্ত হলে তা কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের পকেটে যায়, গ্রাহক কিছু পায় না। | ক্ষতিপূরণ ও পরিচালন ব্যয় মেটানোর পর উদ্বৃত্ত থাকলে তা গ্রাহকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। |
| শরীয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড | কোনো শরীয়াহ বোর্ড নেই। | স্বাধীন ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত শরীয়াহ বোর্ডের কঠোর তদারকিতে পরিচালিত হয়। |
খ-বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও: মান ৪ × ৫ = ২০)
৯। ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধিটি ব্যাখ্যা কর। ৫
[Explain the law of diminishing marginal utility.]
সংজ্ঞা: কোনো নির্দিষ্ট সময়ে একজন ভোক্তা যখন কোনো একটি দ্রব্যের অতিরিক্ত একক ক্রমাগত ভোগ করতে থাকে, তখন ঐ দ্রব্যের প্রতি তার আগ্রহ ও তীব্রতা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে; ফলে পরবর্তী এককগুলো থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত উপযোগ বা প্রান্তিক উপযোগ (Marginal Utility) ক্রমশ হ্রাস পায়। অর্থনীতির এই মৌলিক নীতিকে ‘ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি’ বলা হয়। অধ্যাপক আলফ্রেড মার্শাল বলেন: “The additional benefit which a person derives from a given increase of his stock of a thing diminishes with every increase in the stock that he already has.”
উদাহরণ ও সূচি: একজন ক্ষুধার্ত ব্যক্তি যদি ক্রমাগত কয়েকটি আম খেতে থাকে, তবে ১ম আম থেকে সে যদি ১০ একক উপযোগ পায়, ২য় আম থেকে পাবে ৮ একক, ৩য় আম থেকে ৬ একক এবং ৪র্থ আম থেকে ৪ একক। এক পর্যায়ে প্রান্তিক উপযোগ শূন্য এবং ক্রমাগত ভোগ চালিয়ে গেলে তা ঋণাত্মক হয়ে যায়। এই বিধির কার্যকরতার শর্ত হলো ভোক্তার আয়, পছন্দ স্থির থাকা এবং ভোগের কোনো সময়-বিরতি না থাকা।
১০। ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর। ৫
[Discuss the difference between micro and macro economics.]
ব্যষ্টিক অর্থনীতি (Microeconomics) এবং সামষ্টিক অর্থনীতি (Macroeconomics)-এর মধ্যকার প্রধান পার্থক্যসমূহ নিম্নরূপ:
| বিবেচ্য বিষয় | ব্যষ্টিক অর্থনীতি (Microeconomics) | সামষ্টিক অর্থনীতি (Macroeconomics) |
|---|---|---|
| শব্দগত উৎপত্তি | গ্রিক শব্দ ‘Mikros’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ক্ষুদ্র বা একক। | গ্রিক শব্দ ‘Makros’ থেকে এসেছে, যার অর্থ বৃহৎ বা সামগ্রিক। |
| আলোচনার পরিধি | অর্থনীতির কোনো একটি একক ব্যক্তি, একটি পরিবার বা একটি ফার্মের আচরণ আলোচনা করে। | একটি দেশের সমগ্র অর্থব্যবস্থার সামগ্রিক আচরণ ও সমষ্টিগত চলক নিয়ে আলোচনা করে। |
| মূল বিষয়বস্তু | ব্যক্তিগত চাহিদা, ব্যক্তিগত জোগান, নির্দিষ্ট পণ্যের দাম নির্ধারণ ও ফার্মের ভারসাম্য। | জাতীয় আয়, সামগ্রিক কর্মসংস্থান, মুদ্রাস্ফীতি, রাজস্ব নীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। |
| ভারসাম্যের ধরন | আংশিক ভারসাম্য (Partial Equilibrium) বিশ্লেষণ করে। | সাধারণ ভারসাম্য (General Equilibrium) বিশ্লেষণ করে। |
১১। উশর ও খারাজ বলতে কী বোঝায়? ৫
[What do you mean by Ushar and Kharaj?]
উশর (عشر): ইসলামি রাজস্ব ব্যবস্থায় মুসলিম কৃষকদের উৎপাদিত কৃষি ফসলের ওপর ধার্যকৃত যাকাতকে উশর বলা হয়। প্রাকৃতিক বা বৃষ্টির পানিতে সেচকৃত ফসলের ক্ষেত্রে মোট উৎপাদনের ১০% (এক-দশমাংশ) এবং কৃত্রিম সেচ ও ব্যয়ে উৎপাদিত ফসলের ক্ষেত্রে ৫% (এক-বিংশতি অংশ) উশর আদায় করা ফরজ। এটি একটি বাধ্যতামূলক ধর্মীয় ইবাদত এবং এর অর্থ সুরা তাওবার ৬০ আয়াতে বর্ণিত নির্ধারিত ৮টি খাতে ব্যয় করা হয়।
খারাজ (خراج): মুসলিম রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিকদের মালিকানাধীন আবাদি কৃষিজমির ওপর সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ভূমি কর বা রাজস্বকে খারাজ বলে। হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে বিজিত ইরাক, সিরিয়া ও মিসরের ভূমির ওপর এই কর সর্বপ্রথম সুশৃঙ্খলভাবে প্রবর্তিত হয়। খারাজ থেকে অর্জিত অর্থ কোনো সুনির্দিষ্ট ৮ খাতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বায়তুলমালে জমা হয়ে রাষ্ট্রের সামগ্রিক জনকল্যাণ ও প্রতিরক্ষায় ব্যয়িত হয়।
১২। অর্থের কার্যাবলি আলোচনা কর। ৫
[Discuss the functions of money.]
অর্থনীতিবিদ ওয়াকারের মতে, “Money is what money does” (অর্থ যা করে তাই অর্থ)। আধুনিক অর্থনীতিতে অর্থের কার্যাবলিকে প্রধান চারটি ভাগে ভাগ করা হয়:
- বিনিময়ের মাধ্যম (Medium of Exchange): অর্থ সর্বজনগ্রাহ্য মাধ্যম হিসেবে দ্রব্য ও সেবার ক্রয়-বিক্রয়কে সহজ করে এবং প্রাচীন পণ্য বিনিময় প্রথার (Barter System) জটিলতা দূর করে।
- মূল্যের পরিমাপক (Measure of Value): যেকোনো পণ্য বা সেবার অর্থনৈতিক মূল্য কত তা অর্থের সুনির্দিষ্ট এককে (টাকা, ডলার ইত্যাদি) নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা যায়।
- স্থগিত লেনদেনের মান (Standard of Deferred Payments): ভবিষ্যৎ দেনা-পাওনা, ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের একমাত্র গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড হলো অর্থ।
- মূল্যের সঞ্চয়ের ভাণ্ডার (Store of Value): পচনশীল দ্রব্য দীর্ঘকাল সংরক্ষণ অসম্ভব হলেও অর্থকে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয় করে রাখা যায়।
১৩। ইসলামি ব্যাংকের কাজসমূহ লেখ। ৫
[Write the mode of operations of an Islamic Bank.]
একটি ইসলামি ব্যাংক শরিয়াহর আলোকে বহুমুখী সুদমুক্ত আর্থিক সেবা পরিচালনা করে থাকে। এর প্রধান কার্যাবলি নিম্নরূপ:
- সুদমুক্ত আমানত সংগ্রহ: আল-ওয়াদিয়াহ (চলতি হিসাব হিসেবে সংরক্ষিত) এবং মুদারাবা (লাভ-লোকসান অংশীদারিত্বমূলক সঞ্চয়ী ও মেয়াদী হিসাব) নীতিতে আমানত সংগ্রহ করা।
- শরীয়াহসম্মত বিনিয়োগ পরিচালনা: সরাসরি সুদভিত্তিক ঋণ না দিয়ে মুরাবাহা (লাভযুক্ত বিক্রয়), মুদারাবা ও মুশারাকা (যৌথ অংশীদারি), ইজারা (ভাড়া বা লিজিং) এবং সালাম ও ইসতিসনা-র মাধ্যমে শিল্প, ব্যবসা ও কৃষিতে বিনিয়োগ করা।
- বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স সেবা: হালাল পণ্যের আমদানি ও রপ্তানিতে এলসি (LC) খোলা এবং প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ দ্রুত ও নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া।
- সামাজিক ও কল্যাণমুখী দায়িত্ব পালন: যাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা, করযে হাসানা (সুদবিহীন কল্যাণ ঋণ) প্রদান এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা প্রদান।
১৪। পণ্যের মূল্য নির্ধারণে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা কর। ৫
[Discuss the views of Islam in price determination.]
ইসলামে পণ্যের মূল্য নির্ধারণে স্বাভাবিক বাজার স্বাধীনতা এবং নৈতিক নিয়ন্ত্রণের এক চমৎকার সমন্বয় রয়েছে:
- স্বাভাবিক বাজার স্বাধীনতা: সাধারণ অবস্থায় চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক ঘাত-প্রতিঘাতে বাজার মূল্য নির্ধারিত হতে দেওয়া ইসলামের নীতি। মদিনায় একবার পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে সাহাবিগণ রসুলুল্লাহ ﷺ-কে মূল্য নির্ধারণ (দাম বেঁধে) করে দিতে অনুরোধ করলে তিনি বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহই মূল্য নিয়ন্ত্রক, তিনিই সংকোচনকারী, তিনিই সম্প্রসারণকারী এবং তিনিই রিজিকদাতা। আমি আমার রবের সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করতে চাই না যেখানে কারও ওপর জুলুমের অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে থাকে।” (তিরমিজি)।
- কৃত্রিম সংকট ও সিন্ডিকেট দমন: ব্যবসায়ীরা যদি অসৎ উদ্দেশ্যে পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে (ইহতিকার), কারসাজি বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করে জনসাধারণের ক্ষতি সাধন করে, তবে জনস্বার্থে রাষ্ট্রের প্রশাসন বা মুহতাসিবের (হিসবাহ ব্যবস্থা) জন্য সর্বোচ্চ ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ (Tas’ir) করে দেওয়া শুধু জায়েজই নয়, বরং আবশ্যক।
১৫। আর. ডি. এস এর উপর একটি টীকা লেখ। ৫
[Write a short note on Rural Development Scheme.]
আর. ডি. এস (RDS – Rural Development Scheme): আর.ডি.এস হলো ১৯৯৫ সালে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (IBBL) কর্তৃক প্রবর্তিত একটি যুগান্তকারী সুদমুক্ত গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগ কর্মসূচি।
- মূল উদ্দেশ্য: প্রান্তিক গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি, গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সুদের শোষণমুক্ত হালাল উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা।
- বিনিয়োগের রূপরেখা: এতে সনাতন এনজিওগুলোর মতো উচ্চসুদে নগদ ঋণ দেওয়া হয় না; বরং গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় উপকরণ—যেমন সার, বীজ, গবাদি পশু, সেলাই মেশিন, রিকশা বা ক্ষুদ্র ব্যবসার মালামাল মুরাবাহা ও বাই-মুয়াজ্জাল পদ্ধতিতে ক্রয় করে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়।
- সাফল্য: এর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন কৃষক ও নারী স্বাবলম্বী হয়েছে এবং এর বিনিয়োগ আদায়ের হার প্রায় শতভাগ। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সফল ইসলামি ক্ষুদ্রঅর্থায়ন মডেল।
১৬। অভাব ও চাহিদার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ কর। ৫
[Make a distinction between want and demand.]
সাধারণ দৃষ্টিতে অভাব ও চাহিদাকে সমার্থক মনে হলেও অর্থনীতির দৃষ্টিতে এদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে:
| বিবেচ্য বিষয় | অভাব (Want) | চাহিদা (Demand) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | কোনো দ্রব্য বা সেবা পাওয়ার মানসিক আকাঙ্ক্ষা বা অনুভূতিকে অভাব বলে। | অর্থ ব্যয় করে ক্রয়ক্ষমতা দ্বারা সমর্থিত কার্যকর আকাঙ্ক্ষাকে চাহিদা বলে। |
| ক্রয়ক্ষমতার অপরিহার্যতা | অভাবের জন্য অর্থ বা ক্রয়ক্ষমতা থাকা আবশ্যক নয় (যেমন—দরিদ্রের গাড়ির অভাব)। | চাহিদা হতে হলে অবশ্যই ক্রয়ক্ষমতা ও অর্থ ব্যয়ের সদিচ্ছা থাকতে হবে। |
| সীমাবদ্ধতা | মানুষের অভাব অসীম এবং কল্পনাতীত হতে পারে। | চাহিদা সর্বদা সীমাবদ্ধ এবং ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্যের গণ্ডিতে আবদ্ধ। |
| দাম ও সময়ের সম্পর্ক | অভাব কোনো নির্দিষ্ট দাম বা নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পর্কিত নয়। | চাহিদা সর্বদা একটি নির্দিষ্ট দাম ও নির্দিষ্ট সময়ের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। |
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ইসলামি অর্থনীতিতে রিবা (সুদ) হারাম হওয়ার মূল কারণ কী?
সুদ কোনো প্রকার ব্যবসায়িক ঝুঁকি ছাড়া পুঁজির ওপর অন্যায্য আর্থিক মুনাফা নিশ্চিত করে সমাজের শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ করে এবং সম্পদ কেন্দ্রীভূত করে।
চাহিদা রেখা কেন বাম দিক থেকে ডান দিকে নিম্নগামী হয়?
ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি এবং দাম বাড়লে চাহিদা হ্রাস পাওয়া ও দাম কমলে চাহিদা বৃদ্ধির বিপরীতমুখী সম্পর্কের কারণে চাহিদা রেখা নিম্নগামী হয়।
মুদারাবা ও মুশারাকার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
মুদারাবায় এক পক্ষ পুঁজি দেয় ও অন্য পক্ষ শ্রম/মেধা বিনিয়োগ করে; আর মুশারাকায় সকল অংশীদার যৌথভাবে পুঁজি বিনিয়োগ করে ব্যবসায়িক অংশীদার হয়।
ইসলামি তাকাফুল (বিমা) সনাতন বিমা থেকে কীভাবে পৃথক?
তাকাফুল পারস্পরিক দান, সহযোগিতা (তাবাররু) ও সুদমুক্ত নীতিতে পরিচালিত হয়; এতে সনাতন বিমার মতো জুয়া (মাইসির), সুদ (রিবা) ও অনিশ্চয়তা (গারার) থাকে না।
উশর ও সাধারণ ফসলি করের মধ্যে পার্থক্য কী?
উশর হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মুসলিমদের ফসলের যাকাত যা নির্ধারিত ৮টি খাতে ব্যয় হয়, আর সাধারণ কর রাষ্ট্রীয় ব্যয় মেটানোর প্রশাসনিক খাজনা।
পূর্ণপ্রতিযোগিতামূলক বাজারে একটি ফার্ম কেন ‘দাম গ্রহীতা’ (Price Taker)?
বাজারে অসংখ্য সমজাতীয় ফার্ম থাকায় কোনো একক ফার্মের পক্ষে সামগ্রিক বাজার দাম পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না, ফলে বাজারের নির্ধারিত দামই গ্রহণ করতে হয়।