জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

বাংলা (Bangla) – 202104, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২০

Abswer.com Abswer.com
22 September, 2026
৬৭ মিনিট পড়ার সময়
৭ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২০
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: বাংলা (Bangla)
বিষয় কোড: 202104 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০

২০২০ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষের বাংলা (Bangla, বিষয় কোড: 202104) পরীক্ষাটি সাহিত্য ইতিহাস, গদ্য ও প্রবন্ধ, কবিতা এবং ব্যাকরণ ও প্রায়োগিক রচনার সমন্বয়ে প্রণীত হয়েছিল। প্রশ্নপত্রটি চারটি বিভাগে বিভক্ত: ক বিভাগ (সাহিত্য ইতিহাস – ২০ নম্বর), খ বিভাগ (গদ্য ও গল্প – ২০ নম্বর), গ বিভাগ (কবিতা – ২০ নম্বর) এবং ঘ বিভাগ (ব্যাকরণ ও নির্মিতি – ২০ নম্বর)। নিচে প্রতিটি প্রশ্নের প্রমিত ও পূর্ণাঙ্গ উত্তরমালা সংকলিত হলো।

ক বিভাগ: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস

১। (ক) বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ বলতে কী বুঝ? প্রাচীন যুগের একমাত্র সাহিত্য নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা কর।

[১. (ক) বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের পরিচয় এবং চর্যাপদের গুরুত্ব।]

ভূমিকা

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের হাজার বছরের পথপরিক্রমায় প্রাচীন যুগ হলো এর ভিত্তিমূল। এ যুগে বাংলা ভাষার আদি রূপ উন্মেষ লাভ করে একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় তৈরি করে।

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের ব্যাপ্তিকাল ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। অন্যদিকে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে এ সময়সীমা ৯৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ। এটি মূলত পাল ও সেন রাজাদের শাসনকাল। এ যুগে আর্য সংস্কৃতির সাথে স্থানীয় অনার্য জীবনাচারের সমন্বয়ে আদি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভিত্তিপ্রস্তর রচিত হয়।

প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন: চর্যাপদ

প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের একমাত্র প্রামাণ্য ও লিখিত নিদর্শন হলো ‘চর্যাপদ’ বা ‘চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়’। ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের রয়েল লাইব্রেরি থেকে এ পুঁথি আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহা’ নামে প্রকাশ করেন। মোট সাড়ে ৪৬টি পদ আবিষ্কৃত হয়, যার রচয়িতা লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা প্রমূখ ২৪ জন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য।

চর্যাপদের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

১. ভাষাতাত্ত্বিক গুরুত্ব: ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর কালজয়ী গবেষণা ‘ODBL’ (Origin and Development of the Bengali Language)-এ ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ দ্বারা প্রমাণ করেন যে চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা। এতে আদি বাংলা ভাষার ক্রিয়া ও বিভক্তির সুস্পষ্ট রূপ সংরক্ষিত আছে।
২. সামাজিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব: চর্যাপদে তৎকালীন বাংলার সাধারণ মানুষের দুঃখ-দারিদ্র্য, শিকার, নৌকা চালনা, ডোম্বি ও শবরদের প্রান্তিক জীবনযাত্রা, নদীমাতৃক রূপ এবং দারিদ্র্যের নিখুঁত বাস্তব চিত্র চিত্রিত হয়েছে। যেমন: “হাঁড়িত ভাত নাহি নিতি আবেসী” (হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ প্রতিদিন প্রতিবেশী এসে ভিড় জমায়)।
৩. সাহিত্যিক ও কাব্যিক আবেদন: রূপক ও প্রতীকের অন্তরালে চর্যাপদের পদগুলোতে গভীর কাব্যময়তা, প্রকৃতির উপমা এবং ছন্দ ও চিত্রকল্পের সার্থক সন্নিবেশ ঘটেছে।
৪. ধর্মীয় ও দার্শনিক তাৎপর্য: তান্ত্রিক বৌদ্ধ সহজিয়া মতবাদের গোপন সাধনা ও কায়াসাধনার গুহ্য তত্ত্ব এতে সান্ধ্যভাষায় বিধৃত হয়েছে।

উপসংহার

চর্যাপদ কেবল বাংলা সাহিত্যের জন্মলগ্নের স্মারক নয়, বরং বাঙালি জাতির ভাষা, ইতিহাস ও সমাজচেতনার অবিনাশী ঐতিহ্য।


[অথবা] ১। (খ) টীকা লেখ: রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ও ইউসুফ-জুলেখা।

[১. (খ) মধ্যযুগের রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান এবং শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জুলেখা’ কাব্যের পরিচয়।]

ভূমিকা

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের গতানুগতিক দেবদেবী-নির্ভর ধারা (যেমন: মঙ্গলকাব্য ও দেবমহিমা) থেকে বের হয়ে প্রথম রক্ত-মাংসের মানুষের নিখাদ পার্থিব প্রেমের জয়গান গেয়েছিল ‘রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান’ ধারা। এই ধারাটি বাংলা সাহিত্যে মানবতাবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষ শিল্পচেতনার এক যুগান্তকারী নবদিগন্ত উন্মোচন করে।

রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য

১. মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি: এ ধারার মূল নায়ক-নায়িকা কোনো অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী দেবদেবী নয়, বরং সুখ-দুঃখ, বিরহ-মিলন ও কামনাময় সাধারণ মানুষ।
২. মুসলিম কবিদের ঐতিহাসিক অবদান: পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত গৌড় সুলতানি দরবার এবং আরাকান (রোসাং) রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম কবিগণ প্রধানত ফারসি ও আরবি সাহিত্যের আখ্যান অবলম্বন করে এ জাতীয় কাব্য রচনা করেন।
৩. বাস্তব জীবনের রূপায়ণ: অলৌকিক কাহিনীর আবরণ থাকলেও এতে তৎকালীন বাংলার শ্যামল প্রকৃতি, সমাজব্যবস্থা ও পারিবারিক অনুভূতির বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।

শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জুলেখা’

বাংলা সাহিত্যের প্রথম রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান রচয়িতা হলেন কবি শাহ মুহম্মদ সগীর। তিনি গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের (১৩৮৯-১৪১০ খ্রি.) রাজত্বকালে তাঁর কালজয়ী কাব্য ‘ইউসুফ-জুলেখা’ রচনা করেন।

১. কাহিনির উৎস: পবিত্র কুরআনের ‘সূরা ইউসুফ’ (আহসানুল কাসাস বা শ্রেষ্ঠ কাহিনি) এবং প্রখ্যাত ফারসি কবি জামী ও ফেরদৌসীর রচনার ভাববস্তু অবলম্বনে কবি এই আখ্যানকাব্যটি সৃজন করেন।
২. প্রেমের আধ্যাত্মিক ও পার্থিব রূপ: কাব্যে নবী হযরত ইউসুফ (আ.)-এর অনিন্দ্য রূপসৌন্দর্য এবং মিসরের আজিজ-পত্নী জুলেখার অন্ধপ্রেমের রূপায়ণ ঘটেছে। কবি জুলেখার প্রেমাবেগকে পাপ হিসেবে চিত্রিত না করে এক পরম নিষ্ঠাপূর্ণ বিরহসাধনা ও প্রেমে রূপান্তরের মাধ্যমে মহিমান্বিত করেছেন।
৩. দেশপ্রেম ও দেশীয় ভাষার মর্যাদা: তৎকালীন সময়ে ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে অনেকে বাংলা ভাষায় কিতাব লেখাকে ভালো চোখে দেখতেন না। কিন্তু শাহ মুহম্মদ সগীর অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ঘোষণা করেন:
“না না বোলে না না গুণী শুনিয়া অধর্ম।
যে জন যে দেশে জন্মে সেই তার কর্ম॥”

উপসংহার

শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জুলেখা’ কেবল বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রণয়কাব্যই নয়, এটি মধ্যযুগের ধর্মীয় আচ্ছন্নতার মধ্যে মানবপ্রেমের এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা।


২। (ক) বাংলা গদ্যের বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা আলোচনা কর।

[২. (ক) বাংলা গদ্য বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অবদান।]

ভূমিকা

উনিশ শতকের সূচনায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বাংলা গদ্যের আধুনিক রূপায়ণে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। পাঠ্যপুস্তকের অভাব পূরণ এবং ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের দেশীয় ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্য থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি বাংলা গদ্যের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করে।

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠা ও প্রেক্ষাপট

১৮০০ সালের ৪ মে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। কলেজটিতে ১৮০১ সালে বাংলা বিভাগ চালু হয় এবং বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ উইলিয়াম কেরি এর প্রধান অধ্যাপক নিযুক্ত হন।

বাংলা গদ্য বিকাশে কলেজের মূল অবদানসমূহ

১. পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও মুদ্রিত গদ্যের সূচনা: উইলিয়াম কেরির নেতৃত্বে একদল বাঙালি পণ্ডিত ও মুনশি পাঠ্যপুস্তক রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। এর ফলে মুখে প্রচলিত বাংলা গদ্য প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক গ্রন্থরূপ লাভ করে।
২. পণ্ডিতমণ্ডলীর সাহিত্য সাধনা:
উইলিয়াম কেরি: রচনা করেন ‘কথোপকথন’ (১৮০১) ও ‘ইতিহাসমালা’ (১৮১২)। ‘কথোপকথন’-এ তিনি সাধারণ মানুষের মুখের জীবন্ত কথ্যভাষাকে গদ্যে রূপ দেন।
রামরাম বসু: প্রথম মৌলিক বাংলা ঐতিহাসিক গদ্যগ্রন্থ ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ (১৮০১) রচনা করেন।
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার: সংস্কৃতবহুল অথচ বলিষ্ঠ গদ্যরীতির জনক। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বত্রিশ সিংহাসন’ (১৮০২), ‘হিতোপদেশ’ (১৮০৮), ‘রাজাবলি’ (১৮০৮) এবং ‘প্রবোধ চন্দ্রিকা’ (১৮৩৩)।
– অন্যান্য পণ্ডিতদের মধ্যে গোলকনাথ শর্মা (হিতোপদেশ), তারিণীচরণ মিত্র (ওরিয়েন্টাল ফেবুলিস্ট), চণ্ডীচরণ মুন্সী (তোতা ইতিহাস) উল্লেখযোগ্য।
৩. গদ্যের বিবিধ রীতির বিকাশ: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মাধ্যমে বাংলা গদ্যে যুগপৎ দুটি ধারার উন্মেষ ঘটে—একটি সংস্কৃতানুসারী সাধুরীতির মার্জিত ধারা এবং অপরটি আরবি-ফারসি ও দেশীয় শব্দমিশ্রিত ব্যবহারিক ধারা।
৪. পরবর্তী যুগের ভিত্তি নির্মাণ: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক শিল্পরূপ দান করেন।

উপসংহার

বাংলা গদ্যের শিশুকালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ যে ধাত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিল, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।


[অথবা] ২। (খ) বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান আলোচনা কর।

[২. (খ) বাংলা কবিতা ও সঙ্গীতে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান।]

ভূমিকা

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে রবীন্দ্র-প্রতিভার সর্বগ্রাসী প্রভাবের যুগে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, বলিষ্ঠ বিদ্রোহ ও মানবতার বার্তা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলা সাহিত্যের শিরায় শিরায় সঞ্চার করেছিলেন নতুন যৌবনের তেজ ও মুক্তির অবিনাশী প্রেরণা।

সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নজরুলের অবদান

১. বিদ্রোহ ও দেশপ্রেমের কবিতা: পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নজরুলই প্রথম প্রকাশ্য সশস্ত্র বিদ্রোহের ডাক দিয়েছিলেন। ১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলা কবিতার প্রচলিত ধারাকে আমূল বদলে দেয়। তিনি ঘোষণা করেন:
“বল বীর— বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নতশির ওই শিখর হিমাদ্রীর!”

তাঁর ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয়োল্লাস’ পরাধীন বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে।

২. সাম্যবাদ ও গণমানুষের অধিকার: নজরুলই বাংলা সাহিত্যে প্রথম সর্বহারা, কুলি-মজুর, কৃষক ও প্রান্তিক মেহনতি মানুষের জয়গান গেয়েছেন। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যে তিনি বলেন:
“গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!”

নারী-পুরুষের সম-অধিকারের পক্ষে তিনি স্পষ্ট উচ্চারণ করেন: “বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”

৩. অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও হিন্দু-মুসলিম মিলন: নজরুল তাঁর সৃষ্টিতে কুরআন-হাদিসের পাশাপাশি হিন্দু পৌরাণিক উপমার সার্থক সমন্বয় ঘটিয়েছেন। তিনি ছিলেন প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক।

৪. সঙ্গীতের অদ্বিতীয় মহিমা: নজরুল প্রায় চার হাজার গানের রচয়িতা ও সুরকার। তিনি বাংলা গজল ও ইসলামি গানের জনক (‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’, ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ’)। একই সাথে শ্যামাসঙ্গীত ও রাগপ্রধান সংগীতেও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।

৫. কথাসাহিত্য ও অন্যান্য: উপন্যাস ‘বাঁধন-হারা’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘কুহেলিকা’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘ব্যথার দান’, ‘রিক্তের বেদন’-এ তিনি সমাজের দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের নিখুঁত ছবি এঁকেছেন।

উপসংহার

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একাধারে বিপ্লবের চারণ, প্রেমের রূপকার এবং শোষিত মানবতার অবিনাশী মুক্তির প্রতীক। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান চির অম্লান।

খ বিভাগ: বাংলা গদ্য ও ছোটগল্প

৩। (ক) ‘তৈল’ প্রবন্ধ অবলম্বনে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতামত আলোচনা কর।

[৩. (ক) হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য।]

ভূমিকা

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচিত ‘তৈল’ বাংলা সাহিত্যের একটি কালজয়ী ব্যঙ্গধর্মী ও মননশীল প্রবন্ধ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তৈলমর্দন বা তোষামোদির অপরিহার্য কার্যকারিতা তিনি তীক্ষ্ণ শ্লেষ ও রসাত্মক ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন।

প্রাবন্ধিকের মূল দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণ

১. তৈলের বিশ্বজনীন উপযোগিতা: প্রাবন্ধিক শুরুতেই বলেছেন, তৈল অতি উপাদেয় পদার্থ। এটি যেমন শরীর স্নিগ্ধ করে ও মাথার চুল সুন্দর রাখে, তেমনি কর্মক্ষেত্রে মানুষের মন গলাতেও এর জুড়ি নেই।
২. সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তৈলমর্দন: হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দেখিয়েছেন, সমাজে মেধা, যোগ্যতা বা সততার চেয়ে তোষামোদ বা ‘তৈল ঢালা’র ক্ষমতা মানুষকে বেশি দ্রুত সফল করে। যার শরীরে যত বেশি তৈল ঢালার দক্ষতা আছে, সে জীবনে তত সহজে পদোন্নতি ও প্রতিপত্তি লাভ করে।
৩. রাজনীতি ও রাজদরবারে তৈল: শাসনব্যবস্থায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মন জয় করার সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র হলো তৈল। যে ব্যক্তি তৈলদানে অক্ষম, তার বিদ্যাবুদ্ধি কোনো কাজে আসে না।
৪. তৈলদানের কৌশল: লেখক ব্যঙ্গ করে বলেছেন, তৈলদান একটি সূক্ষ্ম শিল্প। সকল মানুষের স্বভাব এক নয়, তাই কাকে কীভাবে তৈল দিতে হবে তা জেনে বুঝে ঠান্ডা মাথায় তৈল নিক্ষেপ করতে হয়।

উপসংহার

বাহ্যত ব্যঙ্গরসাত্মক হলেও হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধটি তৎকালীন পরাধীন ও নীতিহীন ঔপনিবেশিক সমাজের অবক্ষয়িত মনস্তত্ত্বের ওপর এক নির্মম কষাঘাত।


[অথবা] ৩। (খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পের আলোকে মৃন্ময়ী চরিত্র বিশ্লেষণ কর।

[৩. (খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ ছোটগল্পে মৃন্ময়ী চরিত্রের রূপ ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ।]

ভূমিকা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র ‘মৃন্ময়ী’ বাংলা ছোটগল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বৈচিত্র্যময় চরিত্র। গ্রামবাংলার সনাতনী অনুশাসনের প্রাচীর ভেঙে নারীর স্বাধীন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং দাম্পত্য প্রেমে আত্মউদ্বোধনের এক অনবদ্য প্রতীক মৃন্ময়ী।

মৃন্ময়ী চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

১. দুরন্তপনা ও প্রকৃতির প্রতি নিবিড় অনুরাগ: মৃন্ময়ী প্রচলিত সমাজের ‘সুশীলা বালিকা’র ছাঁচে গড়া কোনো চরিত্র ছিল না। তার কেশদাম ছিল এলোমেলো, চোখ দুটো ছিল হরিণীর মতো চঞ্চল। গাছে চড়ে আম পাড়া, সমবয়সী ছেলেদের সাথে নদীতে সাঁতার কাটা এবং মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ানোই ছিল তার স্বভাব। সমাজের সংকীর্ণ চোখ তাকে ‘পাগলি’ আখ্যা দিয়েছিল।
২. বিবাহের বাধ্যবাধকতায় বিদ্রোহ: সদ্য কলকাতাফেরত গ্র্যাজুয়েট অপূর্ব তার এই বুনো সৌন্দর্য ও প্রাণপ্রাচুর্যে আকৃষ্ট হয়ে তাকে বিবাহ করে। কিন্তু বিয়ের পর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া বধূবেশ ও শ্বশুরবাড়ির চারদেয়ালের বন্দিত্ব মৃন্ময়ীর মন কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। সে নিঃসংকোচে অপূর্বকে জানিয়ে দেয়: “আমি তোমাকে ভালোবাসি না।”
৩. আত্মমর্যাদাবোধ ও প্রতিবাদী চেতনা: অপূর্ব যখন তাকে জোর করে নিজের বশীভূত করতে চাইল, মৃন্ময়ী গভীর রাতে জানালা দিয়ে পালিয়ে তার স্বাধীন সত্তার জানান দেয়। ভালোবাসাকে কোনো কৃত্রিম শৃঙ্খলা বা ক্ষমতার জোরে অর্জন করা যায় না, মৃন্ময়ী তা প্রমাণ করে।
৪. বিচ্ছেদের অনলে রূপান্তর: অপূর্ব যখন বুঝতে পেরে তাকে তার পিতার কাছে পাঠিয়ে দেয় এবং নিজে চাকরির উদ্দেশ্যে দূরে চলে যায়, তখন মৃন্ময়ীর হৃদয়ে এক অপার্থিব রূপান্তর ঘটে। নির্জনতায় ও বিচ্ছেদের বেদনায় সে প্রথম অনুভব করে অপূর্বর প্রতি তার অন্তরের নিঃশব্দ গভীর ভালোবাসা।
৫. প্রণয়োচ্ছ্বাসে সমাপ্তি: গল্পের শেষে ঝড়ের রাতে কলকাতায় অপূর্বর শয্যায় এসে যখন মৃন্ময়ী নীরবে লুটিয়ে পড়ে এবং কান্নার সুরে অপূর্বের বাহুডোরে আত্মসমর্পণ করে, তখন বাঁধনহারা চপলা কিশোরী এক পরম প্রেমময়ী নারীতে রূপান্তরিত হয়।

উপসংহার

রবীন্দ্রনাথ মৃন্ময়ী চরিত্রের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে নারীকে দাসত্ব দিয়ে নয়, বরং শ্রদ্ধা, মুক্তি ও মমতার চোখ দিয়ে দেখলেই তার ভেতরের পূর্ণাঙ্গ প্রেম বিকশিত হয়।


৪। (ক) ‘সমাপ্তি’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমাজ নিরীক্ষার অনবদ্য দলিল— ব্যাখ্যা কর।

[৪. (ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পের সমাজ ভাবনা ও বিশ্লেষণ।]

ভূমিকা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজবাস্তবতাবাদী ছোটগল্প। গ্রামবাংলার সমাজব্যবস্থায় নারীর স্বাধীন সত্তার বিকাশ এবং পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বের সংঘাত ও রূপান্তর এ গল্পে অসাধারণ দক্ষতায় উন্মোচিত হয়েছে।

সমাজ নিরীক্ষার প্রেক্ষাপট ও মূল দিকসমূহ

১. গ্রাম্য সমাজের অচলায়তন: উনিশ শতকের গ্রামীণ সমাজে নারীর জন্য নির্ধারিত ছিল গৃহবন্দিত্ব, বাল্যবিবাহ এবং নিছক বাধ্যগত পুতুল চরিত্র। সেখানে বাঁধনহারা, চঞ্চল ও দুরন্ত প্রকৃতির ‘মৃন্ময়ী’ ছিল প্রচলিত সমাজের চোখে এক ‘পাগলি’ বা অসংলগ্ন চরিত্র।
২. অপূর্বর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা: শিক্ষিত নবীন গ্র্যাজুয়েট অপূর্ব কলকাতার শিক্ষা নিয়ে গ্রামে এসে তথাকথিত ‘লক্ষ্মী মেয়ে’ না খুঁজে মৃন্ময়ীর অবাধ্য রূপ ও প্রাণের সজীবতায় আকৃষ্ট হয়। কিন্তু বিয়ের পর সে-ও মৃন্ময়ীকে প্রচলিত সমাজের গৃহিণী বানানোর প্রচলিত ছাঁচেই মাপতে চেয়েছিল, যা জটিল সংঘাতের সৃষ্টি করে।
৩. নারীর আত্মমর্যাদাবোধ: জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বিবাহ ও দাসত্বকে মৃন্ময়ী মেনে নিতে পারেনি। সে শ্বশুরবাড়ি থেকে পালিয়ে যায় এবং অপূর্বকে প্রত্যাখ্যান করে নিজের স্বাধীন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের জানান দেয়।
৪. রূপান্তর ও পরিণয়: রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, ভালোবাসাকে শাসন বা জোরজুলুম দিয়ে লাভ করা যায় না। অপূর্ব যখন মৃন্ময়ীকে তার মতো করে বোঝার সুযোগ দেয় এবং বিচ্ছেদ ঘটে, তখনই মৃন্ময়ীর অন্তরে অপূর্বের প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ প্রেম জাগ্রত হয়।

উপসংহার

নারীর ব্যক্তিত্ব, বিবাহ সম্পর্কের মনস্তত্ত্ব এবং সমাজসংস্কারের দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলে রবীন্দ্রনাথ ‘সমাপ্তি’ গল্পটিকে তৎকালীন সমাজ পর্যবেক্ষণের এক শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য দলিলে পরিণত করেছেন।


[অথবা] ৪। (খ) ‘শিউলিমালা’ গল্পের আলোকে শিউলির চরিত্র অঙ্কন কর।

[৪. (খ) কাজী নজরুল ইসলামের ‘শিউলিমালা’ গল্পের শিউলি চরিত্রের মনস্তত্ত্ব ও আত্মত্যাগ।]

ভূমিকা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রোমান্টিক ধারার কালজয়ী ছোটগল্প ‘শিউলিমালা’-র নামচরিত্র হলো ‘শিউলি’ (বা শিউলি বেগম)। শরৎকালের ক্ষণস্থায়ী শুভ্র শিউলি ফুলের মতোই পবিত্র, স্নিগ্ধ অথচ গভীর বিরহবেদনায় নিমগ্ন এক আত্মত্যাগী নারী হিসেবে গল্পকার শিউলি চরিত্রটি সৃষ্টি করেছেন।

শিউলি চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

১. স্নিগ্ধ ও অনুভূতিপ্রবণ মনস্তত্ত্ব: শিউলি রূপবতী, কোমলমতি ও শৈশব থেকেই সুর ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগী। তার ভেতর কোনো কৃত্রিম অহংকার ছিল না; বরং সে ছিল প্রকৃতির মতোই সরল ও সংবেদনশীল।
২. রেজার প্রতি নিখাদ প্রেম: গল্পের নায়ক সুরসাধক রেজার প্রতি শিউলির ভালোবাসা ছিল গভীর ও নিঃস্বার্থ। রেজার গান ও সান্নিধ্য তার অন্তরে এক অপার্থিব অনুভূতির সৃষ্টি করেছিল। নিজের হাতে শিউলি ফুলের মালা গেঁথে সে রেজার গলায় পরিয়ে দিয়েছিল, যা তাদের অমর প্রেমের স্মারক।
৩. ভাগ্যের পরিহাস ও নীরব আত্মত্যাগ: পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার কারণে রেজার সাথে শিউলির বিবাহ হতে পারেনি। অন্য পাত্রের সাথে তার বিয়ে হলেও শিউলি তার হৃদয়ের পবিত্র প্রেমকে কলুষিত করেনি। সে মুখ বুজে সমাজের বিধান মেনে নিয়েছে, কিন্তু অন্তরে রেজার স্মৃতি ও সুরকে সারাজীবন লালন করেছে।
৪. শিউলি ফুলের প্রতীকী তাৎপর্য: শিউলি ফুল যেমন রাতে ফোটে এবং সকালে নিঃশব্দে ঝরে পড়ে তার সুরভি বিলিয়ে দেয়, শিউলির প্রেমও তেমনি কোনো প্রকাশ্য দাবিহীন, নীরব এবং চিরন্তন সৌরভময়। জীবনের শেষ লগ্নেও শিউলিমালার স্মৃতি তার অন্তরের ব্যাকুলতাকে অমর করে রেখেছে।

উপসংহার

নজরুল শিউলি চরিত্রের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন— প্রেমের সার্থকতা কেবল বৈষয়িক মিলনে নয়, বরং নীরব ত্যাগ, হৃদয়ের পবিত্রতা ও অক্ষয় অনুভূতির মহিমায়।

গ বিভাগ: বাংলা কবিতা

৫। (ক) ‘বলাকা’ কাব্যের মূল বক্তব্য আলোচনা কর।

[৫. (ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাকা’ কাব্যের গতিবাদ ও মূল ভাবধারা।]

ভূমিকা

১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘বলাকা’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যসাধনার এক অনন্যসাধারণ মোড় পরিবর্তনকারী সংকলন। ‘গীতাঞ্জলি’ ও ‘গীতিমাল্য’ পর্বের ভক্তিময় শান্ত রসের পর ‘বলাকা’-য় এসে কবি বিশ্বজগতের চিরন্তন গতি ও অন্তহীন রূপান্তরের এক বৈপ্লবিক দর্শনে প্রবেশ করেন।

‘বলাকা’ কাব্যের মূল ভাব ও দর্শন

১. গতিবাদ ও জীবনপ্রবাহ (Philosophy of Motion): ‘বলাকা’ কাব্যের মূল দার্শনিক সুর হলো গতিবাদ বা বিবর্তনবাদ। ফরাসি দার্শনিক অঁরি বের্গসঁর ‘এলাঁ ভিতাল’ (প্রাণশক্তি) এবং ভারতীয় দর্শনের ‘চরৈবেতি’ (সামনে চলো) মন্ত্রের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে এখানে। কবি উপলব্ধি করেছেন যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনো কিছুই স্থির নয়, সবকিছুই রূপান্তরের ভেতর দিয়ে অবিরাম এগিয়ে চলেছে:
“হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।”
২. বুনো হাঁসের প্রতীকী ব্যঞ্জনা: কাশ্মীরের ঝিলম নদীর তীরে বসে কবি যখন আকাশে উড়ে যাওয়া বলাকার (বুনো হাঁসের ঝাঁকের) ডানার শব্দ শোনেন, তখন তাঁর মনে হয় বিশ্বপ্রকৃতির স্তব্ধ পাহাড়-পর্বত ও বনানীও উড়ে চলার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে:
“পাহাড় চাহিল হতে বৈশাখের মেঘের মতন,
তরুশ্রেণী চাহে ডানা মেলি…”

৩. আধুনিক জীবন ও যুদ্ধের প্রেক্ষাপট: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমকালীন প্রেক্ষাপটে রচিত এই কাব্যে ধ্বংসের অন্তরালে নতুন প্রাণের আগমনী ধ্বনিত হয়েছে। পুরোনো জীর্ণ সভ্যতা ভেঙে নতুন যুগের যে উত্থান, কবি তাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
৪. মৃত্যুচেতনার নবায়ন: রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুতে কোনো পরিসমাপ্তি দেখেননি। মৃত্যু হলো নতুন জীবনেরই প্রবেশদ্বার। পুরাতনকে বিসর্জন দিয়ে নতুনকে বরণ করে নেওয়াই বিশ্বজীবনের ধর্ম।
৫. ছন্দের মুক্তি: ‘বলাকা’-তেই রবীন্দ্রনাথ মুক্তক মাত্রাবৃত্ত বা মুক্তছন্দের সার্থক প্রয়োগ ঘটান, যা বাংলা কবিতার শরীরকেও গতির উপযোগী করে তোলে।

উপসংহার

‘বলাকা’ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি স্থবিরতার বিরুদ্ধে প্রাণের চিরন্তন জয়গান এবং বিশ্বজগতের অন্তহীন অগ্রযাত্রার এক শ্রেষ্ঠ শিল্পভাষ্য।


[অথবা] ৫। (খ) ‘উমর ফারুক’ কবিতা অবলম্বনে হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর চারিত্রিক মাহাত্ম্যের পরিচয় দাও।

[৫. (খ) কাজী নজরুল ইসলামের ‘উমর ফারুক’ কবিতায় বর্ণিত চারিত্রিক গুণাবলি।]

ভূমিকা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘উমর ফারুক’ একটি অনুপম ইতিহাস-আশ্রয়ী চরিত্রপ্রধান কবিতা। ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর ইনসাফ, সাম্যবাদ, মানবপ্রেম ও কঠোর শৃঙ্খলার অপূর্ব সংমিশ্রণ নজরুলের কলমে অমর রূপ লাভ করেছে।

চারিত্রিক মাহাত্ম্যের প্রধান দিকসমূহ

১. সাম্য ও মানবতার পরাকাষ্ঠা: জেরুজালেম যাত্রাকালে উটের পিঠে পালাক্রমে আরোহণ করে উমর (রা.) বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। খলীফা নিজে রশি ধরে হেঁটেছেন এবং ভৃত্যকে উটের পিঠে চড়িয়েছেন। কবি বিস্ময়ে গেয়ে ওঠেন:
“উটের পিঠে চড়িয়া উমর চলিয়াছেন দূর দেশ,
দাঁড়ায়ে ভৃত্য রশি ধরে তার নাইকো গর্বলেশ।”
২. নিপীড়িত মানুষের প্রতি মমত্ববোধ: গভীর রাতে ছদ্মবেশে ঘুরে প্রজাদের ঘরে ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না শুনে বায়তুল মাল থেকে আটার বস্তা নিজের কাঁধে বহন করে নিয়ে গিয়ে উমর (রা.) নিজেই খাবার রান্না করে দিয়েছিলেন।
৩. ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন: স্বজনপ্রীতিমুক্ত কঠোর ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন আপসহীন। নিজের সন্তানের অপরাধেও তিনি বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি।
৪. অনাড়ম্বর জীবনযাপন: অর্ধ-পৃথিবীর শাসক হয়েও তাঁর পরনে ছিল তালিযুক্ত সাধারণ পোশাক, আর শয্যা ছিল খেজুরপাতার বিছানায়।

উপসংহার

নজরুল তাঁর কবিতায় উমর ফারুক (রা.)-কে কেবল একজন ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের শোষিত মানবতার মুক্তির আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মহিমান্বিত করেছেন।


৬। (ক) জসীমউদ্দীন রচিত ‘মুসাফির’ কবিতার মূলভাব লেখ।

[৬. (ক) পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘মুসাফির’ কবিতার মূলভাব ও জীবনদর্শন।]

ভূমিকা

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘মুসাফির’ একটি গভীর দার্শনিক ও অধ্যাত্মবাদী কবিতা। গ্রামীণ জীবনের নিপুণ চিত্রকার হলেও এ কবিতায় কবি মানবজীবনের নশ্বরতা, পরকালের চিরন্তন সত্য এবং পার্থিব মোহের মায়াজাল ছিন্ন করার এক শাশ্বত জীবনদর্শনের অবতারণা করেছেন।

‘মুসাফির’ কবিতার মূলভাব ও তাৎপর্য

১. পার্থিব জীবনের নশ্বরতা ও মুসাফির রূপক: আরবি ‘মুসাফির’ শব্দের অর্থ পথিক বা পর্যটক। কবি এই সুন্দর পৃথিবীতে মানুষকে একজন ক্ষণিকের মুসাফির হিসেবে দেখেছেন। পথের মাঝে পথিক যেমন কোনো পান্থশালা বা সরাইখানায় কিছু সময়ের বিশ্রাম নিয়ে আবার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়, মানুষও তেমনি এই পার্থিব পৃথিবীতে ক্ষণকালের জন্য এসেছে। এই সংসার তার স্থায়ী ঠিকানা নয়।
২. মায়ামোহের বৃথা অহংকার: মানুষ ধন-সম্পদ, ঘরবাড়ি, সন্তান-সন্ততি ও জাগতিক প্রতিষ্ঠার মোহে অন্ধ হয়ে এই চিরবিদায়ের সত্যকে ভুলে থাকে। সে এমনভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে যেন সে এখানে অমর হয়ে থাকবে। কিন্তু কবি মনে করিয়ে দেন— মৃত্যুর অমোঘ ডাক এলে সবাইকে একাকী শূন্যহাতে কবরের অনন্ত যাত্রায় শামিল হতে হবে:
“এ নহে তোমার ঘর, এ নহে তোমার দেশ,
মুসাফির তুমি পথ চলিবে নিঃশেষ।”

৩. পরকালের পাথেয় সঞ্চয়ের আহ্বান: কবি মানুষকে পার্থিব মোহে মত্ত না থেকে অনন্ত আখিরাতের পাথেয় হিসেবে নেক আমল, মানবপ্রেম ও স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন। সৎকর্মই হবে পরপারের চিরন্তন সঙ্গী।
৪. সহজিয়া সুর ও আবেদন: কবিতার ভাষা অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী। কবি লোকজ উপমা ও আধ্যাত্মিক সুফি ভাবধারার সমন্বয়ে মানবজীবনের এই পরম সত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন।

উপসংহার

জসীমউদ্দীনের ‘মুসাফির’ কবিতাটি মানুষের অন্তর্চক্ষু উন্মোচনকারী এক কালজয়ী সৃষ্টি, যা জীবনের অন্তঃসারশূন্যতা বুঝিয়ে চিরস্থায়ী মুক্তির পথনির্দেশ করে।


[অথবা] ৬। (খ) ‘স্বাধীনতা তুমি’ শামসুর রাহমানের স্বাধীনতা বন্দনার অনন্য প্রয়াস— বিশ্লেষণ কর।

[৬. (খ) শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার রূপক ও শিল্পমূল্য।]

ভূমিকা

আধুনিক বাংলা কবিতার বরপুত্র কবি শামসুর রাহমানের এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘স্বাধীনতা তুমি’। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বন্দি স্বদেশভূমিতে বসে তিনি বাংলাদেশের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে চিরন্তন কাব্যিক রূপ দান করেন।

কবিতার মূল সুর ও শিল্পবৈশিষ্ট্য

১. মূর্ত ও বিমূর্ত রূপকের মেলবন্ধন: কবি স্বাধীনতার বিমূর্ত ধারণাকে বাঙালির দৈনন্দিন জীবন, স্মৃতি, লোকজ সংস্কৃতি ও ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক দিয়ে সাজিয়েছেন।
২. ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন: রবিঠাকুরের গান, নজরুলের ঝাঁকড়া চুল, শহীদ মিনারের অমর একুশে এবং রেসকোর্স ময়দানের বজ্রকণ্ঠের সাথে স্বাধীনতাকে একীভূত করা হয়েছে। কবি বলেন:
“স্বাধীনতা তুমি রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।
স্বাধীনতা তুমি কাজী নজরুল, ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ…”
৩. গৃহকোণের মমতা ও প্রকৃতি: স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক মুক্তিসনদ নয়; এটি কৃষকের হাসি, গৃহবধূর শাড়ির আঁচল, উঠোনে রোদে দেওয়া মায়ের শুকনো পাটশাক এবং নদীর ঢেউয়ে ভেসে চলা রাখালের সুর।

উপসংহার

‘স্বাধীনতা তুমি’ কেবল একটি দেশপ্রেমের কবিতা নয়, এটি বাঙালি জাতির শত বছরের রক্তস্নাত আত্মত্যাগ ও স্বপ্নের এক অমর মহাকাব্যিক রূপরেখা।

ঘ বিভাগ: বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি

৭। (ক) “উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে”— উদাহরণসহ আলোচনা কর।

[৭. (ক) উপসর্গের অর্থবাচকতা ও অর্থদ্যোতকতা।]

উত্তর:
বাংলা ব্যাকরণে উপসর্গ হলো এমন কিছু অর্থহীন অব্যয়সূচক শব্দাংশ, যা স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত না হয়ে ধাতুর বা শব্দের পূর্বে বসে নতুন অর্থযুক্ত শব্দ গঠন করে।
অর্থবাচকতা নেই: উপসর্গের নিজস্ব কোনো সুনির্দিষ্ট স্বাধীন অর্থ নেই। যেমন ‘প্র’, ‘পরা’, ‘বি’, ‘উপ’ শব্দাংশগুলো আলাদাভাবে কোনো অর্থ প্রকাশ করতে পারে না। এজন্য বলা হয়— উপসর্গের কোনো ‘অর্থবাচকতা’ (Meaning-bearing quality) নেই।
অর্থদ্যোতকতা আছে: কিন্তু এই উপসর্গগুলো যখন অন্য কোনো মূল শব্দের পূর্বে যুক্ত হয়, তখন তা শব্দের অর্থের নানা পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংকোচন বা নতুন দ্যোতনা সৃষ্টি করতে পারে। একেই বলে ‘অর্থদ্যোতকতা’ (Meaning-modifying capacity)।
উদাহরণ: ‘হার’ মূল শব্দের সাথে বিভিন্ন উপসর্গ যুক্ত হয়ে অর্থের চমৎকার পরিবর্তন ঘটায়:
– প্র + হার = প্রহার (মারধর করা)
– আ + হার = আহার (ভোজন)
– বি + হার = বিহার (ভ্রমণ)
– উপ + হার = উপহার (উপঢৌকন)
– পরি + হার = পরিহার (বর্জন করা)
সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, উপসর্গের নিজস্ব অর্থবাচকতা না থাকলেও নতুন অর্থ সৃষ্টির অনন্য অর্থদ্যোতকতা শক্তি রয়েছে।


৭। (খ) বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বাংলা বানানের পাঁচটি নিয়ম লেখ।

[৭. (খ) প্রমিত বাংলা বানানের পাঁচটি নিয়ম।]

১. অতৎসম শব্দে ই-কার: সকল অতৎসম (তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র) শব্দে কেবল হ্রস্ব ‘ই’ বা ই-কার (ি) ব্যবহৃত হবে, দীর্ঘ ‘ঈ’ বা ঈ-কার (ী) হবে না। যেমন: গাড়ি, শাড়ি, চাবি, সরকারি, কারবারি ইত্যাদি।
২. রেফের পর দ্বিত্ব বর্জন: শব্দের মধ্যে রেফের (র্) পর কোনো ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব রূপ হবে না। যেমন: কর্ম (কর্ম্ম নয়), সূর্য (সূর্য্য নয়), ধর্ম (ধর্ম্ম নয়)।
৩. যুক্তবর্ণে ‘ক্ষ’ ও ‘খ’: তৎসম শব্দের ‘ক্ষ’ অবিকৃত থাকবে (যেমন: লক্ষণ, শিক্ষা), কিন্তু অতৎসম বা তদ্ভব শব্দে কেবল ‘খ’ হবে (যেমন: খিদে, খেত)।
৪. ‘আলি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দ: ‘আলি’ প্রত্যয়যুক্ত সকল শব্দে হ্রস্ব ই-কার (ি) হবে। যেমন: সোনালি, রুপালি, বর্ণালি, মিতালি, অঞ্জলি।
৫. বিদেশি শব্দে ‘ষ’ ও ‘ণ’ বর্জন: ইংরেজি, আরবি, ফারসি ইত্যাদি বিদেশি শব্দে মূর্ধন্য-ষ এবং মূর্ধন্য-ণ এর ব্যবহার হবে না, সর্বত্র দন্ত্য-স ও দন্ত্য-ন হবে। যেমন: স্টেশন, কর্নার, কুরআন, পোস্ট, গভর্নর ইত্যাদি।


৭। (গ) ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি):

[৭. (গ) সমাস নির্ণয়।]

১. বহুব্রীহি: বহু ব্রীহি (ধান) আছে যার = বহুব্রীহি সমাস (সমানাধিকরণ বহুব্রীহি)।
২. আমরা: তুমি, সে ও আমি = দ্বন্দ্ব সমাস (একশেষ দ্বন্দ্ব)।
৩. দ্বিগু: দ্বি (দুই) গুর (গরুর) সমাহার = দ্বিগু সমাস।
৪. নয়-ছয়: নয় ও ছয় = দ্বন্দ্ব সমাস।
৫. উপকূল: কূলের সমীপে = অব্যয়ীভাব সমাস।
৬. তেমাথা: তিন মাথার সমাহার = দ্বিগু সমাস।
৭. আনাগোনা: আনা ও গোনা = দ্বন্দ্ব সমাস।
৮. শতাব্দী: শত অব্দের সমাহার = দ্বিগু সমাস।


৭। (ঘ) ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান কাকে বলে? ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধানের তিনটি করে নিয়ম উদাহরণসহ লেখ।

[৭. (ঘ) ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধানের পরিচয় ও নিয়ম।]

ণ-ত্ব বিধান: তৎসম বা সংস্কৃত শব্দে দন্ত্য-ন এর পরিবর্তে মূর্ধন্য-ণ হওয়ার ব্যাকরণিক নিয়মকে ণ-ত্ব বিধান বলে।
ণ-ত্ব বিধানের ৩টি নিয়ম:
১. ঋ, র, ষ-এর পর মূর্ধন্য-ণ হয়। যেমন: ঋণ, কারণ, বর্ণ, ভীষণ।
২. ট-বর্গীয় ধ্বনির পূর্বে যুক্তবর্ণে সর্বদা মূর্ধন্য-ণ হয়। যেমন: ঘণ্টা, লণ্ঠন, কাণ্ড।
৩. ঋ, র, ষ-এর পর স্বরবর্ণ, ক-বর্গ, প-বর্গ এবং য, ৱ, হ বা অনুস্বর থাকলে পরবর্তী দন্ত্য-ন মূর্ধন্য-ণ হয়। যেমন: কৃপণ, গ্রহণ।

ষ-ত্ব বিধান: তৎসম বা সংস্কৃত শব্দে দন্ত্য-স এর মূর্ধন্য-ষ এ রূপান্তরিত হওয়ার নিয়মকে ষ-ত্ব বিধান বলে।
ষ-ত্ব বিধানের ৩টি নিয়ম:
১. অ বা আ ভিন্ন অন্য স্বরবর্ণ এবং ক ও র-এর পরবর্তী প্রত্যয়ের দন্ত্য-স মূর্ধন্য-ষ হয়। যেমন: ভবিষ্যৎ, পরিষ্কার, মুমূর্ষু।
২. ই-কারান্ত এবং উ-কারান্ত উপসর্গের পর কতকগুলো ধাতুতে দন্ত্য-স মূর্ধন্য-ষ হয়। যেমন: অভিষেক, অনুষ্ঠান, নিষেধ।
৩. ট এবং ঠ এর পূর্বে যুক্তবর্ণে সর্বদা মূর্ধন্য-ষ হয়। যেমন: কষ্ট, কাষ্ঠ, বৃষ্টি, নষ্ট।


৭। (ঙ) সাধু ও চলিত ভাষার পার্থক্য লেখ।

[৭. (ঙ) সাধু ও চলিত ভাষার পার্থক্য।]

১. আভিজাত্য ও রূপ: সাধু ভাষা ব্যাকরণের সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় নিয়মে আবদ্ধ ও তৎসম শব্দবহুল। চলিত ভাষা পরিবর্তনশীল ও তদ্ভব-দেশি শব্দবহুল।
২. সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের রূপ: সাধু ভাষায় সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের পূর্ণাঙ্গ রূপ ব্যবহৃত হয় (যেমন: করিয়াছিলা, তাহার, উহাদের)। চলিত ভাষায় সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ সংক্ষিপ্ত রূপ ধারণ করে (যেমন: করেছিলে, তার, ওদের)।
৩. ব্যবহারের ক্ষেত্র: সাধু ভাষা কেবল গুরুগম্ভীর রচনা ও লিখিত রূপের জন্য প্রযোজ্য, মুখের ভাষা নয়। চলিত ভাষা একাধারে কথ্য, নাটকের সংলাপ ও আধুনিক সাহিত্যের প্রাণবন্ত মাধ্যম।
৪. অব্যয় পদের পার্থক্য: সাধু ভাষায় তৎসম অব্যয় ব্যবহৃত হয় (যেমন: তথাপি, যদ্যপি, অদ্য)। চলিত ভাষায় সহজ অব্যয় ব্যবহৃত হয় (যেমন: তবুও, যদিও, আজ)।


৭। (চ) ভাব-সম্প্রসারণ লেখ: “স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন”।

[৭. (চ) ভাব-সম্প্রসারণ।]

মূলভাব: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করা এক ঐতিহাসিক গৌরবময় ঘটনা। কিন্তু সেই অর্জিত স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক মুক্তি ও স্থিতিশীলতা টিকিয়ে রাখা তার চেয়েও অধিকতর কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রাম।

সম্প্রসারিত ভাব: মানব ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, জাতির জাগ্রত আবেগ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক পরাশক্তিকে পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পরেই শুরু হয় নতুন এক অদৃশ্য যুদ্ধ—দেশ গড়ার যুদ্ধ। অর্জিত স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে হলে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা অপরিহার্য। স্বাধীনতার সুফল যদি সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে না পৌঁছায়, তবে রাজনৈতিক মুক্তি অর্থহীন হয়ে পড়ে। এছাড়া বাইরের সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র এবং অভ্যন্তরীণ জাতিগত বিভেদ স্বাধীনতার অস্তিত্বকে সর্বদা হুমকির মুখে রাখে। স্বাধীনতা অর্জন একটি সাময়িক লড়াই, কিন্তু স্বাধীনতা রক্ষা হলো অনন্তকালের অতন্দ্র প্রহরীর মতো এক নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ববোধ।

মন্তব্য: তাই আত্মতুষ্টিতে নিমজ্জিত না থেকে জাতীয় ঐক্য ও সততার মাধ্যমে স্বাধীনতার ভিত্তিকে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়াই প্রতিটি সচেতন নাগরিকের প্রধানতম কর্তব্য।


৭। (ছ) বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা প্রভাষক পদে চাকরির জন্য একটি আবেদনপত্র লেখ।

[৭. (ছ) প্রভাষক পদের চাকরির আবেদনপত্র।]

তারিখ: ১৫ মার্চ ২০২০
বরাবর
রেজিস্ট্রার
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ঢাকা।

বিষয়: বাংলা বিষয়ে প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য আবেদন।

জনাব,
বিনীত নিবেদন এই যে, গত ১ মার্চ ২০২০ তারিখে দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানতে পারলাম যে, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা অনুষদের অধীন বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। আমি উক্ত পদের একজন আগ্রহী প্রার্থী হিসেবে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জীবনবৃত্তান্ত আপনার সদয় বিবেচনার জন্য নিচে পেশ করছি:

জীবনবৃত্তান্ত:
১. প্রার্থীর নাম: মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম
২. পিতার নাম: মোহাম্মদ আবদুর রহমান
৩. মাতার নাম: মোসাম্মাৎ ফাতেমা খাতুন
৪. স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: আনন্দপুর, ডাকঘর: সোনারগাঁও, জেলা: নারায়ণগঞ্জ।
৫. জন্ম তারিখ: ১০ জানুয়ারি ১৯৯৫
৬. জাতীয়তা: বাংলাদেশি (জন্মসূত্রে)
৭. ধর্ম: ইসলাম

শিক্ষাগত যোগ্যতা:
এস.এস.সি/দাখিল (২০১০): বিজ্ঞান বিভাগ, জিপিএ ৫.০০, ঢাকা বোর্ড।
এইচ.এস.সি/আলিম (২০১২): মানবিক বিভাগ, জিপিএ ৫.০০, ঢাকা বোর্ড।
বি.এ. সম্মান (বাংলা – ২০১৬): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সিজিপিএ ৩.৭৫ (প্রথম শ্রেণি)।
এম.এ. (বাংলা – ২০১৭): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সিজিপিএ ৩.৮০ (প্রথম শ্রেণি)।

অতএব, মহোদয়ের সমীপে বিনীত প্রার্থনা, উপরোক্ত তথ্যাবলির আলোকে আমাকে উক্ত পদে নিয়োগ পরীক্ষার সুযোগ দিয়ে বাধিত করবেন।

বিনীত নিবেদক,
মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম
সংযুক্তি: সকল সনদের সত্যায়িত অনুলিপি, ছবি ও প্রশংসাপত্র।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. চর্যাপদ কোন্ লিপিতে এবং কোন্ অঞ্চলে রচিত হয়েছিল?

চর্যাপদ প্রাচীন বাংলা লিপির আদিরূপে তালপাতায় লিখিত এবং এটি মূলত প্রাচীন পূর্ব ভারতের বাংলা ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের দ্বারা রচিত হয়েছিল।

২. ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর উদ্দেশ্য কী ছিল?

১৮০০ সালের ৪ মে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতির শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

৩. হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধের মূল বার্তা কী?

তোষামোদ বা চাটুকারিতার মাধ্যমে সমাজে কীভাবে অযোগ্য ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং মেধা উপেক্ষিত হয়, তা ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরাই এ প্রবন্ধের মূল বার্তা।

৪. নজরুলের ‘উমর ফারুক’ কবিতার মূল অনুপ্রেরণা কী?

হযরত উমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক ইনসাফ, সাম্যবাদী শাসনব্যবস্থা এবং জনগণের প্রতি নিখাদ দায়িত্ববোধই এ কবিতার মূল অনুপ্রেরণা।

৫. ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান কি বিদেশি শব্দে প্রযোজ্য?

না, ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান কেবল তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের বানানে প্রযোজ্য; খাঁটি বাংলা বা বিদেশি শব্দে কখনো মূর্ধন্য-ণ বা মূর্ধন্য-ষ হয় না।

৬. ‘উপসর্গের নিজস্ব অর্থবাচকতা নেই’ কথাটির অর্থ কী?

এর অর্থ হলো উপসর্গের কোনো স্বাধীন বা পৃথক অর্থ থাকে না; এটি অন্য শব্দের পূর্বে যুক্ত হয়েই কেবল অর্থের পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে পারে।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *