জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

উলূমুল হাদিস (Ulumul Hadith) – ২০২১০৩, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩

Abswer.com Abswer.com
22 September, 2026
৫১ মিনিট পড়ার সময়
৫ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৩
আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: উলূমুল হাদিস (Ulumul Hadith)
বিষয় কোড: ২০২১০৩
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
[দ্রষ্টব্য: ‘ক’ বিভাগ হতে ৪টি এবং ‘খ’ বিভাগ হতে ৪টি সহ মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]


مجموعة (أ) [ক-বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্ন]

১. عرف علوم الحديث – ثم اكتب اهميتها متحدثا عن ذكر اشهر الكتب المؤلفة فيها –

প্রশ্ন : [১. উলূমুল হাদীসের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর উলূমুল হাদীস বিষয়ে রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থরাজির নাম উল্লেখপূর্বক এ শাস্ত্রের গুরুত্ব আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামের দ্বিতীয় উৎস হাদিসের বাণী ও রাবি পরম্পরাকে নিখুঁত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার লক্ষ্যে মুসলিম মনীষীগণ জ্ঞানের যে সুবিশাল জগৎ গড়ে তুলেছেন, তাকে সামগ্রিকভাবে ‘উলূমুল হাদিস’ (علوم الحديث) বলা হয়। মানব ইতিহাসের এটি এক অতুলনীয় বৈজ্ঞানিক শাস্ত্রধারা।

উলূমুল হাদিসের সংজ্ঞা

আভিধানিক অর্থ: ‘উলূম’ (علوم) হলো ‘ইলম’ (علم)-এর বহুবচন, যার অর্থ জ্ঞানসমূহ, বিজ্ঞান বা শাস্ত্রাবলি। আর ‘হাদিস’ (الحديث) অর্থ নতুন, কথা বা বাণী। সুতরাং উলূমুল হাদিস অর্থ হাদিস সংক্রান্ত শাস্ত্রসমূহ।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম ইবনুস সালাহ (রহ.) এবং ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী (রহ.)-এর মতে:
«علم يُعرف به القوانين والقواعد التي يُتوصَّلُ بها إلى معرفة أحوال السند والمتن من حيث القبول والرد»
(উলূমুল হাদিস হলো এমন সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও মূলনীতির জ্ঞান, যার মাধ্যমে হাদিসের সনদ ও মতনের অবস্থা নিরূপণ করা যায়— তা গ্রহণযোগ্য নাকি বর্জনীয়)।

উলূমুল হাদিসের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

  1. সুন্নাহ সংরক্ষণ: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে রচিত জাল ও বানোয়াট কথা থেকে উম্মাহকে রক্ষা করার প্রধানতম প্রাচীর হলো এই শাস্ত্র।
  2. শুদ্ধতা যাচাই: প্রতিটি বর্ণনার সনদ ও রাবির চরিত্র বিশ্লেষণ করে সহিহ ও দুর্বল হাদিস পৃথক করা যায়।
  3. শরিয়তের বিধান নির্ণয়: পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যারূপে সুন্নাহর যথাযথ প্রয়োগ ও ফিকহি ইজতিহাদের জন্য উলূমুল হাদিসের জ্ঞান অপরিহার্য।
  4. ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতা: তথ্যের বস্তুনিষ্ঠ যাচাইয়ে উম্মতে মুহাম্মদীর এই ইসনাদি পদ্ধতি পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য অবদান।

এ বিষয়ে রচিত পাঁচটি মৌলিক গ্রন্থ

  • মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ (مقدمة ابن الصلاح): হাফিজ আবু আমর উসমান ইবনুস সালাহ (মৃত্যু: ৬৪৩ হি.) কর্তৃক রচিত। এটি উলূমুল হাদিসের সর্বপ্রধান আকর গ্রন্থ।
  • আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল বাইনার রাবি ওয়াল ওয়াঈ (المحدث الفاصل بين الراوي والواعي): কাজী আবু মুহাম্মদ আর-রামাহুরমুযী (মৃত্যু: ৩৬০ হি.) কর্তৃক রচিত। এ শাস্ত্রের প্রথম স্বতন্ত্র গ্রন্থ।
  • মারিফাতু উলূমিল হাদিস (معرفة علوم الحديث): ইমাম হাকিম আন-নায়সাবুরি (মৃত্যু: ৪০৫ হি.)।
  • আল-কিফায়াহ ফি ইলমির রিওয়ায়াহ (الكفاية في علم الرواية): খতিব আল-বাগদাদি (মৃত্যু: ৪৬৩ হি.)।
  • তাদরীবুর রাবি ফি শারহি তাকরীবিন নাওয়াওয়ী (تدريب الراوي): ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী (মৃত্যু: ৯১১ হি.)।

২. عرف علم الاسناد – ثم بين نشأته وتطوره مع بيان اهمية علم الاسناد –

প্রশ্ন : [২. ‘ইলমুল ইসনাদ’-এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর ‘ইলমুল ইসনাদ’-এর উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও গুরুত্ব বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের সবচেয়ে অনন্য ও শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য হলো ‘সনদ’ বা ‘ইসনাত’ প্রথা। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে এমন একটি পদ্ধতি দান করেছেন যার ফলে সরাসরি রাসুল (সা.) পর্যন্ত প্রতিটি বাণীর প্রত্যক্ষ বাহকদের পরিচয় সংরক্ষিত রয়েছে।

ইসনাতের সংজ্ঞা

আভিধানিক অর্থ: ‘ইসনাত’ (الإسناد) শব্দটি বাবে ইফ’আলের মাসদার, যার অর্থ কোনো কিছুর প্রতি সম্বন্ধযুক্ত করা, ভর করা বা ভিত্তি স্থাপন করা।
পারিভাষিক অর্থ: কোনো হাদিসের মূল বক্তব্যকে তার ধারাবাহিক বর্ণনাকারী ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত সম্বন্ধযুক্ত করার প্রক্রিয়াকে ইসনাত বলা হয় (رفع الحديث إلى قائله برواة متصلين)।

ইসনাতের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

১. নবীযুগ ও সাহাবিদের যুগ: রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায় সকল সাহাবি সরাসরি তাঁর কাছ থেকে শুনতেন, তাই সনদের কোনো প্রশ্ন ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম সকলেই ন্যায়পরায়ণ (عدول) হওয়ায় একজন সাহাবি অপর সাহাবির মাধ্যমে শুনলেও নিঃসংশয়ে তা গ্রহণ করতেন।
২. ফিতনার সূচনা ও সনদের আবশ্যকতা: হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাত এবং পরবর্তী সময়ে সিফফিনের যুদ্ধের পর যখন রাজনৈতিক ও আকিদাগত মতবিরোধের সুযোগে সুবিধাবাদী দলগুলো হাদিস বানানো শুরু করল, তখন সনদ যাচাই আবশ্যক হলো। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন:
«لَمْ يَكُونُوا يَسْأَلُونَ عَنِ الإِسْنَادِ، فَلَمَّا وَقَعَتِ الْفِتْنَةُ قَالُوا: سَمُّوا لَنَا رِجَالَكُمْ»
(পূর্বে মানুষ সনদ জিজ্ঞেস করত না; কিন্তু যখন ফিতনা সংঘটিত হলো, তখন মুহাদ্দিসগণ বললেন: তোমাদের বর্ণনাকারীদের নাম বল, যাতে আহলে সুন্নাহর হাদিস গ্রহণ করা যায় এবং বিদআতিদের হাদিস বর্জন করা যায়)।
৩. তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের যুগ: এ যুগে সনদ যাচাই এক সুসংহত বিজ্ঞানে রূপ নেয়। ইমাম যুহরি, শু’বা, মালিক ইবনে আনাস প্রমুখ মনীষী প্রতিটি হাদিসের প্রতিটি রাবির নির্ভরযোগ্যতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নথিভুক্ত করতে থাকেন।

সুন্নাহ সংরক্ষণে ইসনাতের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) সুপ্রসিদ্ধ ঘোষণা দেন:
«الإِسْنَادُ مِنَ الدِّينِ، وَلَوْلا الإِسْنَادُ لَقَالَ مَنْ شَاءَ مَا شَاءَ»
(ইসনাত বা সনদ হলো দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; যদি সনদ না থাকত, তবে যার যা ইচ্ছা সে তা-ই বলত)। সনদ প্রথার মাধ্যমেই ইসলামি সুন্নাহ বিকৃতি, অপব্যাখ্যা এবং বাতিল শক্তির জাল বিস্তার থেকে চিরতরে সুরক্ষিত হয়েছে।


৩. ما هو علم اطراف الحديث؟ اكتب اهم الكتب المؤلفة فى هذا الموضوع –

প্রশ্ন : [৩. علم اطراف الحديث কাকে বলে? এ বিষয়ে রচিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সম্পর্কে আলোচনা কর।]

ভূমিকা

হাদিস গবেষণায় সুবিশাল হাদিস ভাণ্ডার থেকে অতি দ্রুত কোনো হাদিসের সমস্ত সনদ ও মূল গ্রন্থের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য মুহাদ্দিসগণ ‘আতরাফুল হাদিস’ শাস্ত্রের সূচনা করেন।

ইলমু আতরাফিল হাদিসের সংজ্ঞা

‘আতরফ’ (أطراف) শব্দটি ‘তারফ’ (طرف)-এর বহুবচন, যার অর্থ প্রান্ত, অংশ বা শুরু।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে শাস্ত্রে সুবিশাল কোনো হাদিসের পূর্ণাঙ্গ মতন উল্লেখ না করে কেবল তার সূচনালগ্নের এমন একটি অংশ বা বাক্যাংশ উল্লেখ করা হয় যা দ্বারা সম্পূর্ণ হাদিসটি সহজেই চিহ্নিত করা যায় এবং এরপর বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে থাকা উক্ত হাদিসের সমস্ত সনদ ও সূত্র একত্রিতভাবে উপস্থাপন করা হয়, তাকে ইলমু আতরাফিল হাদিস বলে।

আতরাফুল হাদিসের উপকারিতা

  1. দ্রুত হাদিস অনুসন্ধান: বিভিন্ন বৃহৎ হাদিস সংকলনে একটি হাদিস কোন কোন অধ্যায়ে ও কোন কোন পৃষ্ঠায় রয়েছে তা অল্প সময়ে খুঁজে বের করা যায়।
  2. সনদসমূহের একত্রীকরণ: একই হাদিসের সকল সহিহ, হাসান ও যঈফ সনদ এক নজরে প্রত্যক্ষ করা যায়, যা হাদিসের শক্তি ও স্তর নিরূপণে সহায়তা করে।
  3. মুদাল্লিস ও সনদের ত্রুটি শনাক্তকরণ: বিভিন্ন সনদ পাশাপাশি মেলালে সনদের অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতা, তাদলিস বা রাবির ভ্রম সহজে ধরা পড়ে।
  4. শায ও জিয়াদাত নির্ণয়: বিভিন্ন রাবির বাচনিক ব্যবধান ও শব্দের অতিরিক্ত অংশ (زيادة الثقة) সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়।

এ শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ সংকলনসমূহ

  • তুহফাতুল আশরাফ বি মা’রিফাতিল আতরাফ (تحفة الأشراف بمعرفة الأطراف): ইমাম ইউসুফ ইবনে আবদির রহমান আল-মিযযী (রহ., মৃত্যু: ৭৪২ হি.)। এটি কুতুবে সিত্তাহর আতরাফ সম্বলিত সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ।
  • আতরাফুস সাহিহাইন (أطراف الصحيحين): ইমাম আবু মাসউদ দামেশকী ও আবু মুহাম্মদ ওয়াসেতী (রহ.)।
  • যাখায়িরুল মাওয়ারিস ফি দিলালাতি আলাল মাওয়াদিস (ذخائر المواريث): শায়খ আবদুল গনি আন-নাবলুসী।

৪. عرف زوائد الحديث – بين انواعها وفوائدها – ثم اذكر اهم الكتب المؤلفة فيه –

প্রশ্ন : [৪. زوائد الحديث-এর সংজ্ঞা দাও। এর প্রকারভেদ ও উপকারিতা বর্ণনা কর। অতঃপর এ বিষয়ে রচিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলি উল্লেখ কর।]

ভূমিকা

হাদিস সাহিত্যের বিকাশে মূল সংকলনগুলোর বাইরে অন্যান্য সংকলনে বিদ্যমান স্বতন্ত্র হাদিসগুলোকে সংকলিত করার একটি আধুনিক পদ্ধতি হলো ‘কুতুবুজ জাওয়াইদ’।

জাওয়াইদুল হাদিসের সংজ্ঞা

‘জাওয়াইদ’ (زوائد) শব্দটি ‘যায়িদাহ’ (زائدة)-এর বহুবচন, যার অর্থ অতিরিক্ত বা বর্ধিত।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: মূল ও ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত কোনো এক বা একাধিক নির্দিষ্ট হাদিস সংকলনে (যেমন: কুতুবে সিত্তাহ) যে হাদিসগুলো নেই, কিন্তু অন্য কোনো সংকলনে (যেমন: মুসনাদে আহমদ, মুসনাদে বাযযার ইত্যাদি) এমন অতিরিক্ত কোনো হাদিস বা বাড়তি বাক্য বিদ্যমান রয়েছে, তাকে ‘হাদিসের জাওয়াইদ’ বলা হয়।

জাওয়াইদের প্রকারভেদ

জাওয়াইদ প্রধানত দুই প্রকার:

  • জাওয়াইদে মুতলাক্ব (মৌলিক জাওয়াইদ): সম্পূর্ণ নতুন একটি হাদিস, যা মূল সংকলনগুলোর কোনোটিতেই কোনো সূত্রেই বর্ণিত হয়নি।
  • জাওয়াইদে নিসবি (আপেক্ষিক জাওয়াইদ): হাদিসের মূল অংশ মূল সংকলনে রয়েছে, কিন্তু অতিরিক্ত সংকলনটিতে নতুন কোনো বাড়তি অর্থপূর্ণ বাক্য (زيادة في المتن) কিংবা একেবারেই নতুন কোনো নির্ভরযোগ্য সনদ (إسناد آخر) বিদ্যমান রয়েছে।

জাওয়াইদ শাস্ত্রের উপকারিতা

  1. সহজেই কুতুবে সিত্তাহর বাইরের নির্ভরযোগ্য হাদিসসমূহ এক গ্রন্থে অধ্যয়ন করা যায়।
  2. অতিরিক্ত সনদ প্রাপ্তির মাধ্যমে দুর্বল হাদিস হাসান বা সহিহ লি-গায়রিহিতে উন্নীত হয়।
  3. ফিকহি গবেষণায় এমন নতুন দলিল পাওয়া যায় যা সুপ্রসিদ্ধ কিতাবসমূহে অনুপস্থিত ছিল।

এ বিষয়ের প্রধান প্রধান সংকলন

  • মাজমাউয যাওয়াইদ ওয়া মানবাউল ফাওয়াইদ (مجمع الزوائد ومنبع الفوائد): হাফিজ নুরউদ্দিন আল-হাইসামী (রহ., মৃত্যু: ৮০৭ হি.)। এটি মুসনাদে আহমদ, আবু ইয়া’লা, বাযযার এবং তাবারানির তিন মু’জাম থেকে সংকলিত অনন্য বিশ্বকোষ।
  • আল-মাতালিবুল আলিয়াহ বি যাওয়াইদিল মাসানিদি সালাসাহ (المطالب العالية): হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)।
  • ইত্তিহাফুল খিয়ারাতিল মাহারা বি যাওয়াইদিল মাসানিদুল আশারা (إتحاف الخيرة المهرة): ইমাম বুসিরী (রহ.)।

৫. ما المراد بعلم الجرح والتعديل؟ ثم بين مراتب الجرح والتعديل –

প্রশ্ন : [৫. علم الجرح والتعديل বলতে কী বুঝায়? এর স্তরসমূহ বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

হাদিসের সনদ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীদের সত্যবাদিতা, সততা, স্মৃতিশক্তি ও চারিত্রিক ত্রুটি-বিচ্যুতি মূল্যায়নের যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মুহাদ্দিসগণ আবিষ্কার করেছেন, তাকে ‘ইলমুল জারহ ওয়াত তা’দীল’ বলা হয়। এটি গিবত নয়, বরং দ্বীন রক্ষার ফরজ দায়িত্ব।

জারহ ও তা’দীলের সংজ্ঞা

আল-জারহ (الجرح): আভিধানিক অর্থ আহত বা ক্ষতবিক্ষত করা। পরিভাষায়: রাবির আদালত ও যব্তের মধ্যে এমন কোনো দোষ বা ত্রুটি প্রকাশ করা, যার কারণে তাঁর বর্ণিত হাদিস প্রত্যাখ্যাত বা দুর্বল সাব্যস্ত হয়।
আত-তা’দীল (التعديل): আভিধানিক অর্থ ভারসাম্যপূর্ণ বা ন্যায়সঙ্গত করা। পরিভাষায়: রাবির মধ্যে সততা, তাকওয়া ও প্রখর স্মৃতিশক্তির এমন গুণাবলি বিদ্যমান থাকা যার ভিত্তিতে তাঁর বর্ণিত হাদিস সহিহ বা গ্রহণযোগ্য সাব্যস্ত হয়।

জারহ ও তা’দীলের স্তরসমূহ (مراتب الجرح والتعديل)

ইমাম ইবনে আবি হাতিম ও হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) জারহ ও তা’দীলকে ৬টি করে স্তরে বিভক্ত করেছেন:

স্তর তা’দীলের স্তর ও পরিভাষা (গ্রহণযোগ্যতা) জারহের স্তর ও পরিভাষা (বর্জনীয়তা)
১ম স্তর সর্বোচ্চ গুণ: أثبت الناس / أوثق الناس নরম আপত্তি: فلان لين الحديث / فيه مقال
২য় স্তর দ্বৈত গুণ: ثقة ثقة / ثقة ثبت দলিলহীনতা: لا يُحتج به / ضُعِّف
৩য় স্তর একক গুণ: ثقة / متقن / عدل স্পষ্ট দুর্বলতা: ضعيف جداً / واهٍ
৪র্থ স্তর মধ্যম মান: صدوق / لا بأس به হাদিস বর্জন: متروك الحديث / ساقط
৫ম স্তর দুর্বল সমর্থন: محله الصدق / شيخ মিথ্যার অভিযোগ: متهم بالكذب / وضاع
৬ষ্ঠ স্তর সর্বনিম্ন: صالح الحديث / يُكتب حديثه সর্বনিকৃষ্ট: أكذب الناس / ركن الكذب

জারহকারী ও তা’দীলকারীর শর্তাবলি

  • তাঁকে অবশ্যই তাকওয়াবান, ন্যায়পরায়ণ এবং পক্ষপাতহীন হতে হবে।
  • জারহ ও তা’দীলের কারণসমূহ সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিবহাল হতে হবে।
  • আরবি ভাষার প্রয়োগ ও সমসাময়িক যুগের পরিভাষা সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান থাকতে হবে।
  • ব্যক্তিগত শত্রুতা বা মাযহাবি সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।

৬. ما هو علم ناسخ الحديث ومنسوخه؟ ثم بين شروط النسخ واقسامه –

প্রশ্ন : [৬. ইলমুন নাসিখ ওয়াল মানসূখ কাকে বলে? নাসখ-এর শর্ত ও প্রকারভেদ বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

শরিয়তের বিধান প্রণয়নে ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ের কোনো বিধান পরবর্তী কোনো সুস্পষ্ট আদেশের মাধ্যমে স্থগিত বা পরিবর্তিত হওয়াকে ‘নাসখ’ বলা হয়। পরস্পরবিরোধী হাদিসের বিধান নির্ধারণে এই জ্ঞান অপরিহার্য।

সংজ্ঞা

আভিধানিক অর্থ: ‘নাসখ’ (النسخ) অর্থ বিলুপ্ত করা, দূর করা বা স্থানান্তরিত করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: পূর্ববর্তী কোনো শরয়ি বিধানকে পরবর্তী কোনো শরয়ি দলিলের মাধ্যমে প্রত্যাহার বা রহিত করাকে নাসখ বলে। যে হাদিসটি পূর্বের বিধানকে রহিত করে তাকে ‘নাসিখ’ (الناسخ) এবং যার বিধান রহিত হয় তাকে ‘মানসুখ’ (المنسوخ) বলা হয়।

নাসখের শর্তাবলি

  1. উভয় হাদিসের মধ্যে এমন সুস্পষ্ট বৈপরীত্য থাকতে হবে যার কোনো প্রকার সমন্বয় সাধন সম্ভব নয়।
  2. উভয় দলিলের ঐতিহাসিক সময়কাল (কোনটি পূর্বে এবং কোনটি পরে) নিশ্চিতভাবে জানা থাকতে হবে।
  3. নাসিখ দলিলটি মানসুখ দলিলের সমমানের অথবা তার চেয়ে অধিক শক্তিশালী হতে হবে।

নাসখ জানার উপায়সমূহ (طرق معرفة النسخ)

  • রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট ঘোষণা: যেমন রাসুল (সা.) বলেছেন: «كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ، فَزُورُوهَا» (পূর্বে আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা জিয়ারত কর)।
  • সাহাবির সুস্পষ্ট উক্তি: যেমন হযরত জাবির (রা.) বলেন: «كَانَ آخِرَ الأَمْرَيْنِ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ تَرْكُ الْوُضُوءِ مِمَّا مَسَّتِ النَّارُ» (রাসুল সা.-এর সর্বশেষ সিদ্ধান্ত ছিল আগুনে রান্না করা খাবার গ্রহণের পর অজু না করা)।
  • ঐতিহাসিক তারিখের জ্ঞান: কোনো সাহাবির ইসলাম গ্রহণের সন অথবা কোনো ঘটনার সুনির্দিষ্ট তারিখ থেকে পরবর্তী আদেশ চিহ্নিত করা।
  • উম্মাহর ইজমা: উম্মতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত জানা যে অমুক হাদিসটি মানসুখ হয়ে গেছে।

৭. عرف علم المستخرجات والمستدركات – وما هو فوائدهما؟ ثم اذكر اشهر الكتب فيهما –

প্রশ্ন : [৭. علم المستخرجات والمستدركات-এর সংজ্ঞা দাও। এর উপকারিতা কী? অতঃপর এ বিষয়ে রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ আলোচনা কর।]

ভূমিকা

হাদিস সাহিত্যের সমৃদ্ধিতে পূর্ববর্তী মৌলিক সংকলনগুলোর পরিপূরক ও সহায়ক রূপ হিসেবে মুস্তাখরাজ ও মুস্তাদরাক গ্রন্থসমূহ অনন্য ভূমিকা পালন করেছে।

১. আল-মুস্তাখরাজাত (المستخرجات)

সংজ্ঞা: কোনো মুহাদ্দিস যখন পূর্ববর্তী কোনো সংকলকের (যেমন: ইমাম বুখারি বা মুসলিম) কিতাবের প্রতিটি হাদিসকে মূল সংকলকের সূত্র ব্যবহার না করে, নিজের স্বতন্ত্র সনদে তাঁর নিজস্ব শায়খের মাধ্যমে সংকলন করেন, তখন সেই গ্রন্থকে ‘মুস্তাখরাজ’ বলা হয়।
উপকারিতা: সনদের নতুন বিকল্প সূত্র পাওয়া যায়; অনেক সময় মূল গ্রন্থের চেয়ে উচ্চমানের সংক্ষিপ্ত সনদ (علو الإسناد) লাভ হয়; এবং মূল গ্রন্থের কোনো অস্পষ্ট বা সংক্ষিপ্ত শব্দের বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
প্রসিদ্ধ কিতাব: আবু নুয়াইম আল-ইসফাহানী এবং আবু আওয়ানাহ রচিত ‘মুস্তাখরাজ আলা সহিহ মুসলিম’।

২. আল-মুস্তাদরাকাত (المستدركات)

সংজ্ঞা: কোনো মুহাদ্দিস যখন পূর্ববর্তী কোনো ইমামের (যেমন: বুখারি ও মুসলিম) নির্ধারিত বিশুদ্ধতার শর্তাবলি (شروط الصحة) অনুযায়ী সহিহ এমন হাদিসসমূহ সংকলন করেন, যা মূল ইমামগণ তাঁদের গ্রন্থে স্থান দিতে পারেননি বা বাদ পড়ে গেছে, তখন তাকে ‘মুস্তাদরাক’ বলা হয়।
উপকারিতা: সহিহ হাদিসের ভাণ্ডার সম্প্রসারিত হয় এবং ফিকহি গবেষণার পরিধি বৃদ্ধি পায়।
প্রসিদ্ধ কিতাব: ইমাম আবু আবদুল্লাহ আল-হাকিম আন-নায়সাবুরি (রহ.) রচিত ‘আল-মুস্তাদরাকু আলাস সাহিহাইন’ (المستدرك على الصحيحين)।


৮. ماذا تفهم بعلم غريب الحديث؟ ثم تحدث عن اهميته ونشأته وتطوره –

প্রশ্ন : [৮. علم غريب الحديث বলতে কী বুঝ? এর গুরুত্ব, উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।]

ভূমিকা

হাদিসের বিশুদ্ধ পাঠ ও অর্থ অনুধাবনে ভাষার জটিল ও বিরল শব্দাবলি বোঝার জন্য যে বিজ্ঞান উদ্ভাবিত হয়েছে, তাকে ‘ইলমু গারিবিল হাদিস’ বলা হয়।

সংজ্ঞা ও গুরুত্ব

সংজ্ঞা: হাদিসের মতনে ব্যবহৃত এমন সব অপ্রচলিত, বিরল, রূপক বা গভীর অর্থবোধক আরবি শব্দ যার অর্থ সাধারণ পাঠকের কাছে সহজবোধ্য নয়, তাকে ভাষাতাত্ত্বিক ও প্রাসঙ্গিক অর্থে সুস্পষ্ট করার শাস্ত্রকে ‘গারিবুল হাদিস’ বলে।
গুরুত্ব: রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বাধিক বিশুদ্ধ আরবি ভাষার অধিকারী। অনারবদের ইসলামে প্রবেশের পর এই বিরল শব্দগুলোর ভুল ব্যাখ্যা থেকে হাদিসকে রক্ষা করতে এ শাস্ত্র অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষভাগ থেকে যখন ইসলামি ভূখণ্ডে অনারব সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে, তখন আবু উবায়দাহ মা’মার ইবনুল মুসান্না (মৃত্যু: ২১০ হি.) এবং আবু উবায়দ আল-কাসিম ইবনে সাল্লাম (মৃত্যু: ২২৪ হি.) এ বিষয়ে প্রথম দিককার মৌলিক সংকলন রচনা করেন। পরবর্তীকালে ইবনুল আসির একে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন।

এ বিষয়ের প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ

  • আন-নিহায়াহ ফি গারিবিল হাদিস ওয়াল আসার (النهاية في غريب الحديث والأثر): ইমাম ইবনুল আসির আল-জাযারি (রহ., মৃত্যু: ৬০৬ হি.)। এটি এ শাস্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ ও পরিপূর্ণ গ্রন্থ।
  • গারিবুল হাদিস: আবু উবায়দ আল-কাসিম ইবনে সাল্লাম (রহ.)।
  • গারিবুল হাদিস: ইমাম ইবনে কুতাইবাহ আদ-দিনাওয়ারী (রহ.)।
  • আল-ফাইক ফি গারিবিল হাদিস: ইমাম যামাখশারী (রহ.)।

مجموعة (ب) [খ-বিভাগ: সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন]

৯. ما الفرق بين مختلف الحديث ومشكل الحديث؟

প্রশ্ন : [৯. مشكل الحديث ও مختلف الحديث-এর পার্থক্য কী?]

উত্তর:
১. মুখতালাফুল হাদিস (مختلف الحديث): যখন আপাতদৃষ্টিতে দুটি বিশুদ্ধ হাদিস পরস্পরবিরোধী মনে হয়, কিন্তু গভীর পর্যালোচনার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সমন্বয় (جمع), তারিখ জানার মাধ্যমে নাসখ (রহিতকরণ) অথবা কোনো একটিকে অগ্রাধিকার (ترجيح) দেওয়া সম্ভব হয়, তাকে মুখতালাফুল হাদিস বলে।
২. মুশকিলে হাদিস (مشكل الحديث): যখন কোনো একটি একক হাদিসের মতন যুক্তি, কুরআনুল কারিমের কোনো আয়াত, বিজ্ঞান কিংবা বাস্তবতার সাথে আপাতদৃষ্টিতে অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হয় এবং তার জটিলতা দূর করতে গভীর তাফসির ও ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়, তাকে মুশকিলে হাদিস বলে। সংক্ষেপে: মুখতালাফ হলো দুই হাদিসের আপাত বিরোধ, আর মুশকিল হলো মূল ভাবার্থের জটিলতা।


১০. ما هو عصر الرواية؟ كم طبقة للرواة؟

প্রশ্ন : [১০. عصر الرواية কোন সময়কে বলে? রাবিদের طبقات কয়টি?]

উত্তর:
আসরুর রিওয়ায়াত (বর্ণনার যুগ): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র যুগ থেকে শুরু করে হাদিসের মৌলিক সংকলনগ্রন্থসমূহ (যেমন: কুতুবে সিত্তাহ ও মাসানিদ) চূড়ান্তভাবে সংকলিত ও লিপিবদ্ধ হওয়া পর্যন্ত সময়কালকে (আনুমানিক ১ম থেকে ৪র্থ হিজরি শতক পর্যন্ত) আসরুর রিওয়ায়াত বলা হয়।
রাবিদের প্রধান তবকা বা স্তরসমূহ: হাফিজ ইবনে হাজার রাবিদের ১২টি স্তরে বিভক্ত করেছেন, যার মূল পর্যায়গুলো হলো:
১. সাহাবায়ে কেরাম (কনিষ্ঠ ও প্রবীণ),
২. ক্বিবারুত তাবেয়ীন (প্রবীণ তাবেয়ীগণ, যেমন: সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব),
৩. ওসতাতুত তাবেয়ীন (মধ্যম স্তরের তাবেয়ীগণ, যেমন: হাসান বসরি ও ইবনে সিরীন),
৪. সিগারুত তাবেয়ীন (কনিষ্ঠ তাবেয়ীগণ, যেমন: ইমাম যুহরি),
৫. ইতবাউত তাবেয়ীন (তাবে-তাবেয়ীগণ, যেমন: ইমাম মালিক ও সুফিয়ান সাওরি),
৬. কিবারু আতবা ইতবাউত তাবেয়ীন (ইমাম বুখারি, মুসলিম ও তাঁদের উস্তাদগণের যুগ)।


১১. حقق كلمة الصحابى مع بيان الإختلاف فى تعريفه-

প্রশ্ন : [১১. সাহাবি শব্দের অর্থ এবং সাহাবির সংজ্ঞা নিয়ে মতভেদ আলোচনা কর।]

উত্তর:
আভিধানিক অর্থ: ‘সাহাবি’ (الصحابي) শব্দটি ‘সুহবাত’ (الصحبة) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ সঙ্গী, সাথী বা সহচর।
পারিভাষিক সংজ্ঞা ও মতপার্থক্য:
১. জমহুর মুহাদ্দিসগণের মত (ইমাম বুখারি ও ইবনে হাজার): যিনি ইমানের অবস্থায় রাসুল (সা.)-এর সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ইমানের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনিই সাহাবি; সান্নিধ্যের সময়কাল দীর্ঘ হোক বা স্বল্প।
২. উসুলবিদ ও ফকিহগণের মত: কোনো কোনো উসুলবিদের মতে কেবল একবার দেখলেই সাহাবি হওয়া যায় না; বরং দীর্ঘ সময় রাসুলের সান্নিধ্যে অবস্থান করা (طالت صحبته) এবং তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করা আবশ্যক। তবে মুহাদ্দিসগণের প্রথম মতটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও সর্বসম্মত।


১২. ما المراد بالتابعى؟ وما أريد بقوله تعالى : ‘والذين اتبعوهم بإحسان’؟

প্রশ্ন : [১২. তাবি’ঈ বলতে কী বুঝায়? মহান আল্লাহর বাণী ‘والذين اتبعوهم بإحسان’ দ্বারা কী বুঝানো হয়েছে?]

উত্তর:
তাবেয়ীর সংজ্ঞা: যে ব্যক্তি ইমানের অবস্থায় অন্তত একজন সাহাবির সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ইমানের ওপর মৃত্যুবরণ করেছেন, তাকে তাবেয়ী বলা হয়।
আয়াতের ব্যাখ্যা: সূরা আত-তাওবার ১০০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: ﴿وَالسَّابِقُونَ الأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ﴾। এখানে ‘ওয়াল্লাযীনাত্তাবা’ঊহুম বিইহসান’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সেই সকল পুণ্যবান তাবেয়ী ও পরবর্তী মুমিনগণ, যাঁরা মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের ইমান, আমল, ত্যাগ, সততা ও সুন্নাহর আদর্শকে আন্তরিকতা ও নিখুঁতভাবে অনুসরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা সাহাবিদের পাশাপাশি তাঁদের যথাযথ অনুসারী তাবেয়ীগণের প্রতিও তাঁর সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন।


১৩. بين مناقب الصحابة رضى الله عنهم فى ضوء القرآن والسنة-

প্রশ্ন : [১৩. কুরআন সুন্নাহর আলোকে সাহাবিগণের মানাকিব বর্ণনা কর।]

উত্তর: সাহাবায়ে কেরাম হলেন উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম। কুরআন ও সুন্নাহে তাঁদের অতুলনীয় মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে:
১. কুরআনের ঘোষণা: আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ﴾ (তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, যাদের মানবজাতির কল্যাণে বের করা হয়েছে)। অন্যত্র বলেন: ﴿لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ﴾ (নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করছিল)।
২. হাদিসের ঘোষণা: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «خَيْرُ أُمَّتِي قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ» (আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ, অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ)। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন: «لا تَسُبُّوا أَصْحَابِي» (তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিও না; তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও দান করে, তবুও তাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ দানের সমান মর্যাদায় পৌঁছতে পারবে না)।


১৪. ما هو علم شروح الحديث؟ ثم اذكر اشهر الكتب لشروح الحديث-

প্রশ্ন : [১৪. شروح الحديث কাকে বলে? এ বিষয়ে রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ সম্পর্কে আলোচনা কর।]

উত্তর:
শুরূহুল হাদিসের সংজ্ঞা: হাদিসের কঠিন শব্দাবলির ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, সনদের রাবিদের নির্ভরযোগ্যতা, হাদিসের পটভূমি বা শানে উরুদ, ফিকহি বিধানসমূহ এবং তা থেকে শিক্ষণীয় হিকমতসমূহ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে যে সুবিশাল গ্রন্থরাজি রচিত হয়েছে, তাকে ‘শুরূহুল হাদিস’ বলা হয়।
সহিহ আল-বুখারির পাঁচটি বিশ্ববিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ:

  1. ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি (فتح الباري): হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)। এটি বুখারির সর্বশ্রেষ্ঠ ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
  2. উমদাতুল ক্বারি শারহু সহিহিল বুখারি (عمدة القاري): আল্লামা বদরুদ্দিন আল-আইনী (রহ.)।
  3. ইরশাদুস সারি ইলা শারহি সহিহিল বুখারি (إرشاد الساري): ইমাম শিহাবুদ্দিন আল-কাসতাল্লানী (রহ.)।
  4. আত-তাওশিহ আলাল জামিউস সহিহ (التوشيح): ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী (রহ.)।
  5. আ’লামুস সুনান (أعلام السنن): ইমাম আবু সুলাইমান আল-খাত্তাবী (রহ.)।

১৫. من هم السبعة المكثرون فى رواية الحديث؟

প্রশ্ন : [১৫. সাতজন অধিকসংখ্যক হাদিস বর্ণনাকারী কারা?]

উত্তর: যে সাতজন মহান সাহাবি এক হাজারেরও বেশি হাদিস বর্ণনা করে ‘মুকসিরূন’ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন, তাঁদের তালিকা নিম্নরূপ:

ক্রম সাহাবির নাম (রা.) বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) ৫,৩৭৪ টি
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ২,৬৩০ টি
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) ২,২৮৬ টি
উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) ২,২১০ টি
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ১,৬৬০ টি
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) ১,৫৪০ টি
হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) ১,১cw টি (১,১৭০ টি)

১৬. تحدث عن وجوه الترجيح بين الأحاديث المتعارضة-

প্রশ্ন : [১৬. পরস্পর বিরোধী হাদিসগুলোর মধ্যে প্রাধান্য দেয়ার পদ্ধতিসমূহ আলোচনা কর।]

উত্তর: আপাতদৃষ্টিতে দুটি হাদিসের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী হলে মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ নিম্নলিখিত চার স্তরবিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করেন:

  1. আল-জাম’ ওয়াত তাওফিক্ব (الجمع والتوفيق): প্রথম চেষ্টা হলো উভয় হাদিসের মধ্যে সমন্বয় করা (যেমন: একটি সাধারণ নির্দেশ, অপরটি বিশেষ প্রেক্ষাপটের)। উসুলবিদদের নীতি: «الإِعْمَالُ أَوْلَى مِنَ الإِهْمَالِ» (আমলযোগ্য করা বাতিল করার চেয়ে শ্রেয়)।
  2. আন-নাসখ (النسخ): সমন্বয় অসম্ভব হলে ঐতিহাসিক তারিখ অনুসন্ধান করে পরবর্তী হাদিসকে ‘নাসিখ’ এবং পূর্বের হাদিসকে ‘মানসুখ’ নির্ধারণ করা।
  3. আত-তারজীহ (الترجيح): তারিখ জানা না গেলে শক্তিশালী প্রমাণের ভিত্তিতে একটিকে অপরের ওপর প্রাধান্য দেওয়া। প্রাধান্য দেওয়ার প্রধান পদ্ধতিসমূহ:
    • সনদের ভিত্তিতে: রাবিদের সংখ্যাধিক্য (যেমন: বুখারির হাদিস অন্যের ওপর), রাবির অধিক স্মৃতিশক্তি ও বিশ্বস্ততা।
    • মতনের ভিত্তিতে: কুরআনের সুস্পষ্ট দলিলের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া, নিষেধাজ্ঞা বা সতর্কতামূলক হাদিসকে অনুমোদনের ওপর প্রাধান্য দেওয়া।
    • সাহাবির আমলের ভিত্তিতে: প্রধান চার খলিফার আমল যে বর্ণনার পক্ষে রয়েছে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
  4. আত-তাওয়াক্কুফ (التوقف): উপরের কোনো পদ্ধতিতেই সমাধান না হলে চূড়ান্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত উক্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

উলূমুল হাদিস শাস্ত্রে প্রথম স্বতন্ত্র গ্রন্থ কোনটি?

কাজী আবু মুহাম্মদ আর-রামাহুরমুযী (রহ.) কর্তৃক রচিত ‘আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল বাইনার রাবি ওয়াল ওয়াঈ’ এ শাস্ত্রের প্রথম স্বতন্ত্র গ্রন্থ।

ইসনাত বা সনদ প্রথাকে কেন দ্বীনের অংশ বলা হয়েছে?

কারণ সনদ না থাকলে যে কেউ রাসুল (সা.)-এর নামে মিথ্যা ও বিকৃত বক্তব্য প্রচার করতে পারত; সনদের মাধ্যমেই সুন্নাহর বিশুদ্ধতা অটুট রয়েছে।

মুস্তাখরাজ ও মুস্তাদরাক গ্রন্থের মধ্যে মূল তফাত কী?

মুস্তাখরাজে পূর্ববর্তী গ্রন্থের হাদিসগুলোকে ভিন্ন সনদে সংকলন করা হয়, আর মুস্তাদরাকে পূর্ববর্তী ইমামদের শর্তানুযায়ী সহিহ কিন্তু বাদ পড়ে যাওয়া নতুন হাদিস সংকলন করা হয়।

কুতুবুজ জাওয়াইদের সর্বপ্রধান সংকলন কোনটি?

হাফিজ নুরউদ্দিন আল-হাইসামী (রহ.) রচিত ‘মাজমাউয যাওয়াইদ ওয়া মানবাউল ফাওয়াইদ’ জাওয়াইদ শাস্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বকোষ।

সাহাবিগণের মধ্যে সর্বাধিক হাদিস কে বর্ণনা করেছেন?

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) সর্বমোট ৫,৩৭৪টি হাদিস বর্ণনা করে সাহাবিদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন।

পরস্পরবিরোধী হাদিস নিরসনে প্রথম পদক্ষেপ কী?

প্রথম পদক্ষেপ হলো ‘আল-জাম’ বা উভয় হাদিসের মাঝে সমন্বয় সাধন করা, যাতে কোনো হাদিসকে পুরোপুরি বাতিল করতে না হয়।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *