ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: বাংলা (Bangla)
বিষয় কোড: 202104 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
২০২৩ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের বাংলা (Bangla – 202104) পরীক্ষাটি সাহিত্যের প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের ইতিহাস, নির্বাচিত শিল্পোত্তীর্ণ গদ্য ও কবিতা এবং প্রমিত ব্যাকরণিক প্রয়োগ দক্ষতা মূল্যায়নের জন্য অনুষ্ঠিত হয়। প্রশ্নপত্রটি চারটি সুনির্দিষ্ট বিভাগে বিন্যস্ত: ক-বিভাগ (সাহিত্যের ইতিহাস – ২০ নম্বর), খ-বিভাগ (নির্বাচিত গদ্য – ২০ নম্বর), গ-বিভাগ (নির্বাচিত কবিতা – ২০ নম্বর) এবং ঘ-বিভাগ (ব্যবহারিক ব্যাকরণ ও নির্মিতি – ২০ নম্বর)। নিচে পরীক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে প্রতিটি প্রশ্নের প্রামাণ্য ও বিস্তারিত সমাধান উপস্থাপন করা হলো।
ক-বিভাগ: সাহিত্যের ইতিহাস (মান: ২০)
১. (ক) চর্যাপদের সাহিত্যিক মূল্য পর্যালোচনা কর। অথবা, (খ) টীকা লেখ: (i) পদ্মাবতী, (ii) ইউসুফ-জোলেখা।
চর্যাপদের সাহিত্যিক মূল্য
ভূমিকা: মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবারের রয়েল লাইব্রেরি থেকে আবিষ্কৃত ‘চর্যাপদ’ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের আধ্যাত্মিক সাধন-ভজনের গুহ্য সংকলন। ধর্মীয় উদ্দেশ্য নিয়ে রচিত হলেও চর্যাপদের পদকর্তাগণ কেবল তত্ত্বকথা প্রচার করেননি, বরং সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উপকরণ—উপমা, চিত্রকল্প, ছন্দ, রূপক ও মানবীয় অনুভূতির অনুপম মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। ফলে চর্যাপদ কেবল ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন নয়, বাংলা সাহিত্যেরও আদি শিল্পোত্তীর্ণ কাব্যগ্রন্থ।
কাব্যরূপ ও গীতিকবিতার লক্ষণ: চর্যাপদের পদগুলো মূলত এক-একটি স্বয়ংসংম্পূর্ণ গীতি বা পদাবলি। প্রতিটি পদের শুরুতে নির্দিষ্ট রাগ-রাগিণীর নাম (যেমন—পটমঞ্জরী, মল্লারী, রামকেলী, কামোদ ইত্যাদি) এবং পদের শেষে ধ্রুবপদের উল্লেখ প্রমাণ করে যে এগুলো সুর সহযোগে গীত হতো। সিদ্ধাচার্যগণ তাঁদের অন্তরের গূঢ় আধ্যাত্মিক অনুভূতিকে ব্যক্ত করতে গিয়ে যে আবেগ ও তন্ময়তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তা খাঁটি গীতিকবিতার লক্ষণাক্রান্ত।
উপমা, রূপক ও চিত্রকল্পের সার্থক প্রয়োগ: চর্যাপদের কবিগণ তত্ত্বব্যাখ্যার জন্য কোনো শুষ্ক দার্শনিক পরিভাষা বেছে নেননি, বরং বাংলার চিরন্তন নদীমাতৃক প্রকৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্যপট থেকে উপমা সংগ্রহ করেছেন। যেমন—মনের চঞ্চলতাকে কাঠবিড়ালির চপলতার সাথে তুলনা করে ভুসুকুপা লিখেছেন:
“আপণে মাংসে হরিণা বৈরী।
খনহ ন ছাড়ই ভুসুকু অহেরী।।”
এখানে হরিণের মাংসের প্রতি লোভ যেমন তার কাল হয়, তেমনি মানবদেহের রিপু বা প্রবৃত্তিও সাধনার পথে কাল হয়ে দাঁড়ায়। এমন নিখুঁত ও মর্মস্পর্শী রূপক সৃষ্টির দক্ষতা অত্যন্ত উঁচুমাপের সাহিত্যিক চেতনার পরিচায়ক।
বাস্তবধর্মিতা ও জীবনরস: চর্যাপদের রচয়িতারা আকাশচারী ছিলেন না; তাঁদের দৃষ্টি ছিল মাটির কাছাকাছি। ডোম, শবর, ধীবর, চণ্ডালদের সাধারণ জীবনযাত্রা, নদীতে সাঁকো তৈরি, নৌকা পারাপার, হরিণ শিকার, বিয়েতে যৌতুক ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার—এসব সামাজিক অনুষঙ্গ পদগুলোতে যেভাবে উঠে এসেছে, তা পদগুলোকে নিছক ধর্মসংগীতের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তববাদী সাহিত্যের মর্যাদা দিয়েছে। যেমন কুক্কুরীপাদের পদে সাধারণ মানুষের অন্নকষ্টের হাহাকার ফুটে উঠেছে:
“টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী।
হাঁড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।।”
ছন্দ ও অলংকার: চর্যাপদে প্রধানত মাত্রাবৃত্ত ছন্দের আদিরূপ (পাদাকুলক ছন্দ) ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতিটি চরণে সাধারণত আট ও ছয় মাত্রার পর্ববিন্যাস লক্ষ্য করা যায়, যা পরবর্তীকালে মধ্যযুগের পয়য়ার ও ত্রিপদী ছন্দের ভিত্তি নির্মাণ করেছে। অনুপ্রাস ও অন্ত্যমিলের সাবলীল ব্যবহার এর কাব্যগুণকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে।
উপসংহার: রূপক ও সান্ধ্যভাষার (আলো-আঁধারি ভাষা) আবরণে রচিত হলেও চর্যাপদ তার সুগভীর শিল্পরস, চিত্ররূপময় ভাষা এবং রূপক নির্মাণের অভিনবত্বে বাংলা সাহিত্যের অমূল্য শৈল্পিক সম্পদ হিসেবে চিরভাস্বর।
অথবা, (খ) টীকা লেখ:
(i) পদ্মাবতী: মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আলাওল (১৬০৭-১৬৭৩) রচিত ‘পদ্মাবতী’ মধ্যযুগীয় বাংলা রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ধারার এক অনন্য চূড়া। এটি মূলত হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবত’ কাব্যের ভাবানুবাদ হলেও আলাওলের পাণ্ডিত্য, মৌলিক কবিত্ব এবং বাস্তব জীবনের চিত্রায়নে এটি একটি স্বতন্ত্র মহাকাব্যিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। কাব্যের মূল চরিত্র চিতোরের রাজা রত্নসেন, সিংহল রাজকন্যা পদ্মাবতী এবং রত্নসেনের প্রথমা স্ত্রী নাগমতী। প্রেম ও বীরত্বের সমন্বয়ে রচিত এ কাব্যে আলাওল মধ্যযুগীয় দেবনির্ভরতার বিপরীতে রক্তমাংসের মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। আলাওলের সুচারু শব্দচয়ন, অলংকারসমৃদ্ধ ভাষা এবং সঙ্গীতময় ছন্দবিন্যাস মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতার পথ দেখিয়েছিল।
(ii) ইউসুফ-জোলেখা: শাহ মুহম্মদ সগীর রচিত ‘ইউসুফ-জোলেখা’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান। সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের রাজত্বকালে (১৩৮৯-১৪১০) রচিত এ কাব্য মধ্যযুগীয় ধার্মিক আবহের মধ্যে পার্থিব মানবীয় প্রেমের প্রথম উন্মোচন ঘটায়। পবিত্র কুরআনুল কারিমে বর্ণিত হযরত ইউসুফ (আ.) ও মিসরের আজিজ-পত্নী জোলেখার পবিত্র প্রেমকাহিনি এবং পরবর্তীতে জোলেখার নৈতিক পরিশুদ্ধি ও পরিণয় এ কাব্যের মূল উপজীব্য। শাহ মুহম্মদ সগীর ফারসি কবি জামী বা ফেরদৌসীর কাহিনি দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও বাঙালি গ্রামীণ আবহ ও নারীর মনস্তাত্ত্বিক রূপায়নে তাঁর গভীর মৌলিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ধর্মীয় উপাখ্যানের মানবায়ন ও মানবিক প্রেমের সার্থক শিল্পরূপ হিসেবে এটি বাংলা সাহিত্যের এক ঐতিহাসিক সংযোজন।
২. (ক) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয় কেন? আলোচনা কর। অথবা, (খ) বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বর্ণনা কর।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয় কেন?
ভূমিকা: বাংলা গদ্যের সূত্রপাত উনিশ শতকের সূচনালগ্নে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও শ্রীরামপুর মিশনের পণ্ডিতদের হাতে হলেও তা ছিল জড়তাহীনতা ও স্বাভাবিকতার অভাবগ্রস্ত। সেই বিশৃঙ্খল ও অসংস্কৃত গদ্যকে সর্বপ্রথম একটি সুসংহত, শ্রুতিমধুর, নিয়মনিষ্ঠ এবং গতিশীল সাহিত্যিক রূপ দান করেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১)। এ কারণেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁকে যথার্থই ‘বাংলা গদ্যের জনক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
যতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্নের সার্থক প্রবর্তন: বিদ্যাসাগরের পূর্বে বাংলা গদ্যে কেবল দাঁড়ি (।) ছাড়া আর কোনো যতিচিহ্ন ব্যবহৃত হতো না। ফলে কোনো বাক্য কোথায় থামবে, বক্তব্য কী অর্থ প্রকাশ করবে তা বোঝা পাঠকের জন্য অত্যন্ত দুরূহ ছিল। বিদ্যাসাগর ১৮৪৭ সালে রচিত তাঁর ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ গ্রন্থে সর্বপ্রথম ইংরেজি ব্যাকরণের অনুকরণে কমা, সেমিকোলন, কোলন, প্রশ্নবোধক চিহ্ন ও দাঁড়ি ব্যবহার করেন। এর ফলে বাংলা গদ্য সুশৃঙ্খল ব্যাকরণিক কাঠামো এবং সঠিক অর্থদ্যোতনা লাভ করে।
গদ্যে সঙ্গীতময় তাল ও ছন্দের সংযোজন: বিদ্যাসাগর লক্ষ্য করেছিলেন যে পদ্যের মতো গদ্যেও একটি নিজস্ব শ্রুতিমাধুর্য বা অন্তরীণ ছন্দ রয়েছে। তিনি সংস্কৃত শব্দের গুরুগম্ভীরতা এবং খাঁটি বাংলা শব্দের মাধুর্যের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়ে বাংলা বাক্যে এক অপূর্ব তাল ও প্রবাহ সৃষ্টি করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর মূল্যায়নে যথার্থই লিখেছেন:
“বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যভাষার উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে সুসংযত করিয়া তাহার মধ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা আনয়ন করিয়াছিলেন… তিনি বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী।”
শব্দচয়ন ও বাক্যবিন্যাসের শৃঙ্খলা: বিদ্যাসাগরের পূর্বে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার বা উইলিয়াম কেরির গদ্য ছিল হয় অতিরিক্ত ফারসিমিশ্রিত নতুবা অত্যন্ত দুর্বোধ্য সংস্কৃতবহুল। বিদ্যাসাগর প্রথম তৎসম শব্দের সঙ্গে তদ্ভব শব্দের ভারসাম্য স্থাপন করে একটি প্রমিত ও সর্বজনবোধ্য সাধু গদ্যরীতি গড়ে তোলেন। তাঁর ‘শকুন্তলা’ (১৮৫৪) ও ‘সীতার বনবাস’ (১৮৬০) গ্রন্থে বাংলা গদ্য প্রথম পূর্ণাঙ্গ শিল্পগুণ ও আবেগময়তার স্পর্শ লাভ করে।
শিক্ষামূলক ও সমাজসংস্কারমূলক গদ্যের বিকাশ: তিনি কেবল সাহিত্যের জন্যই গদ্য সৃষ্টি করেননি, বরং বাঙালি সমাজকে শিক্ষিত ও কুসংস্কারমুক্ত করার বাহন হিসেবে গদ্যকে ব্যবহার করেন। তাঁর রচিত ‘বর্ণপরিচয়’, ‘কথামালা’, ‘বোধোদয়’ শিশুপাঠ্য হিসেবে বাংলা শিক্ষার ভিত গড়ে তোলে। আবার ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ গ্রন্থে তিনি শাণিত যুক্তিনির্ভর গদ্যের অবতারণা করেন।
উপসংহার: বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের জন্ম দেননি সত্য, কিন্তু সেই অপরিণত ও অগোছালো গদ্যকে শৈল্পিক শৃঙ্খলা, সাবলীল সৌন্দর্য ও গতিশীলতা দান করে সাহিত্যের উপযুক্ত বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বলেই তিনি নিঃসংশয়ে ‘বাংলা গদ্যের জনক ও প্রথম সার্থক শিল্পী’।
অথবা, (খ) বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান
ভূমিকা: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা ও আধুনিকতার প্রধান রূপকার। তাঁর স্পর্শে বাংলা সাহিত্য আঞ্চলিকতার গণ্ডি অতিক্রম করে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে সগৌরবে স্থান করে নেয়। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সংগীতস্রষ্টা ও দার্শনিক চিন্তাবিদ।
১. বাংলা কাব্যে অবদান: রবীন্দ্রনাথের হাতেই বাংলা কবিতা কৈশোর থেকে পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করে। তাঁর ‘মানসী’, ‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’, ‘চৈতালি’, ‘কল্পনা’, ‘ক্ষণিকা’ ও ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থে সৌন্দর্যতত্ত্ব, রোমান্টিক প্রণয়, আধ্যাত্মিক আর্তি এবং গতিবাদের এক অনন্য সমন্বয় ঘটে। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ (Song Offerings) কাব্যের জন্য তিনি এশিয়ার মধ্যে প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে বাংলা ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেন।
২. বাংলা ছোটগল্পের জনক ও শ্রেষ্ঠ শিল্পী: বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের সার্থক সূত্রপাত ও বিকাশ রবীন্দ্রনাথের হাতেই সম্পন্ন হয়। ‘হিতবাদী’, ‘সাধনা’ ও ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর গল্পগুলোতে বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতি, সাধারণ মানুষের আনন্দ-বেদনা এবং জটিল মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর নিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে। ‘পোস্টমাস্টার’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘ছুটি’, ‘একরাত্রি’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘সমাপ্তি’ এবং ‘অপরিচিতা’ বিশ্বমানের ছোটগল্পের মর্যাদা লাভ করেছে।
৩. উপন্যাসে আধুনিক মনস্তত্ত্বের বিকাশ: বঙ্কিমচন্দ্রের ঐতিহাসিক ও সামাজিক আখ্যানের পর রবীন্দ্রনাথ বাংলা উপন্যাসে আধুনিক নাগরিক মনস্তত্ত্বের অবতারণা করেন। তাঁর ‘চোখের বালি’ (১৯০৩) বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। এছাড়া ‘নৌকাডুবি’, ‘গোরা’ (বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও উদার মানবতাবাদের মহাকাব্যিক রূপ), ‘ঘরে বাইরে’ এবং কাব্যিক রীতির ‘শেষের কবিতা’ বাংলা উপন্যাসের গতিপ্রকৃতি চিরতরে বদলে দেয়।
৪. নাটকে রূপক ও সাংকেতিকতার প্রয়োগ: শেক্সপীয়রীয় বা প্রাচীন সংস্কৃত নাট্যরীতির অনুকরণ না করে রবীন্দ্রনাথ নিজস্ব ধারার সাংকেতিক ও কাব্যনাট্য সৃষ্টি করেন। ‘বিসর্জন’, ‘রাজা’, ‘অচলায়তন’, ‘ডাকঘর’ ও ‘রক্তকরবী’ বিশ্বমানের দার্শনিক ও সমাজসচেতন নাটক হিসেবে সমাদৃত।
৫. গান ও প্রবন্ধ সাহিত্য: রবীন্দ্রনাথ প্রায় আড়াই হাজার গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন (রবীন্দ্রসংগীত), যা বাঙালির আবেগ, উৎসব ও আধ্যাত্মিকতার চিরন্তন আশ্রয়। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা” তাঁরই সৃষ্টি। পাশাপাশি সাহিত্যতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, শিক্ষা ও রাজনীতি বিষয়ে তাঁর রচিত শত শত প্রবন্ধ বাংলা মননশীল গদ্যের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন।
উপসংহার: সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যা রবীন্দ্রনাথ সমৃদ্ধ করেননি। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায়: “বিশ্বভারতী তব সৃষ্টির কাছে / চিরকাল তাই বাংলা ধন্য আছে।” বাংলা সাহিত্যকে আধুনিক, সমৃদ্ধ ও বিশ্বজনীন রূপ দিতে রবীন্দ্রনাথের অবদান চিরস্মরণীয়।
খ-বিভাগ: নির্বাচিত গদ্য (মান: ২০)
৩. (ক) ‘তৈল’ প্রবন্ধের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা কর। অথবা, (খ) “ভাষার ক্ষেত্রে কোনো প্রকারের গোঁড়ামি থাকা উচিত নয়”—উক্তিটি ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধের আলোকে বিশ্লেষণ কর।
‘তৈল’ প্রবন্ধের নামকরণের সার্থকতা
ভূমিকা: সাহিত্যের যেকোনো সৃষ্টির ক্ষেত্রে নামকরণ একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শিল্প-উপাদান। নামকরণের মাধ্যমেই রচনার মূল ভাববস্তু, বক্তব্য ও লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটে। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচিত ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধ ‘তৈল’-এর নামকরণ আপাতদৃষ্টিতে একটি অতি পরিচিত ব্যবহারিক পদার্থের ইঙ্গিত দিলেও এর গভীরে নিহিত রয়েছে তীব্র সামাজিক শ্লেষ ও তোষামোদি সংস্কৃতির নগ্ন রূপ।
আভিধানিক বনাম আলংকারিক তাৎপর্য: বাহ্যিক দৃষ্টিতে তেল একটি উদ্ভিজ্জ বা খনিজ তরল পদার্থ, যা পিচ্ছিলকারক, চুল নরমকারী বা রান্নার কাজে লাগে। কিন্তু হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই ভৌতিক গুণাবলিকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন মানবসমাজের তৈলমর্দন তথা চাটুকারিতা ও পদলেহনের প্রতীক হিসেবে। লেখক স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন:
“তৈল যে কি পদার্থ তাহা পণ্ডিতেরা এখনও স্থির করিতে পারেন নাই। তবে তৈল যে সর্বশক্তিমান তাহা প্রত্যক্ষসিদ্ধ।”
এখানে ‘তৈল’ শব্দটি তোষামোদের রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
সামাজিক সর্বগ্রাসী ব্যাধি ও তোষামোদের শক্তি: প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন যে মানুষের যোগ্যতা, মেধা বা শ্রমের চেয়ে তৈলপ্রয়োগের ক্ষমতা সমাজে অনেক বেশি কার্যকর। যে ব্যক্তি ওপরওয়ালাকে তৈল দিতে পারে, সমাজে তার পদোন্নতি, মান-সম্মান এবং প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পায়; আর যার তৈলপ্রয়োগের সামর্থ্য নেই, সে অসীম মেধা থাকা সত্ত্বেও অবহেলিত থাকে। লেখক ইংরেজ আমলাতন্ত্র, বাঙালি বাবুসমাজ এবং পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তেলের অমোঘ প্রভাবকে ব্যঙ্গের চাবুকে উন্মোচন করেছেন।
নামকরণের যথার্থতা: হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সম্পূর্ণ প্রবন্ধে তৈল শব্দটির বহুমুখী ব্যবহার করে এক নিরেট কৌতুক ও গভীর বিদ্রূপ সৃষ্টি করেছেন। ‘তৈল’ শব্দটিই পুরো প্রবন্ধের কেন্দ্রবিন্দু, চালিকাশক্তি এবং ব্যঙ্গাত্মক অভিব্যক্তির মূল ভিত্তি। সমাজের ভণ্ডামি ও মোসাহেবির নোংরা রূপ প্রকাশে এই একক শব্দটি সমগ্র ভাববস্তুকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে।
উপসংহার: রূপকধর্মী ও ইঙ্গিতময়তার দিক থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধের নামকরণ বিষয়বস্তুর সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ, সার্থক ও রসোত্তীর্ণ হয়েছে।
অথবা, (খ) “ভাষার ক্ষেত্রে কোনো প্রকারের গোঁড়ামি থাকা উচিত নয়”—উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ
ভূমিকা: বহুভাষাবিদ ও প্রখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯) রচিত ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ একটি গভীর দূরদর্শী ও পথপ্রদর্শক প্রবন্ধ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর নব্য পাকিস্তানে যখন বাংলা ভাষার সত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক টানাপোড়েন শুরু হয়, তখন ড. শহীদুল্লাহ অত্যন্ত যুক্তিনির্ভর ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষার উন্মুক্ত ও উদার বিকাশের আহ্বান জানান।
উক্তিটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই শাসকগোষ্ঠী এবং একদল প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবী বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বহুমুখী ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা দাবি তোলে—বাংলা ভাষাকে ইসলামীকরণ করতে হবে, বাংলা বর্ণমালার বদলে আরবি বা উর্দু হরফে বাংলা লিখতে হবে এবং ভাষার ভেতর থেকে প্রচলিত সংস্কৃত শব্দ বাদ দিয়ে জোর করে ভিনদেশি আরবি-ফারসি শব্দ ঢোকাতে হবে। অন্যদিকে হিন্দু রক্ষণশীলদের এক দল বাংলা থেকে শত শত বছর ধরে প্রচলিত স্বাভাবিক আরবি-ফারসি শব্দ বাদ দিয়ে দুর্বোধ্য সংস্কৃতায়ন করতে চেয়েছিল। এই উভয় সংকীর্ণতাবাদী গোঁড়ামির মুখে দাঁড়িয়ে ড. শহীদুল্লাহ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন—“ভাষার ক্ষেত্রে কোনো প্রকারের গোঁড়ামি থাকা উচিত নয়।”
ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীবন্ত সত্তা: ভাষার ধর্মই হলো নদীর মতো প্রবহমান থাকা। ড. শহীদুল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে, কোনো জীবন্ত ভাষা কৃত্রিম অনুশাসন বা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার নিগড়ে বন্দি থাকতে পারে না। বাংলা ভাষা দীর্ঘ হাজার বছর ধরে দ্রাবিড়, অস্ট্রিক, সংস্কৃত, প্রাকৃত, আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ ও ইংরেজি ভাষার হাজারো শব্দকে নিজস্ব খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে পরিপুষ্ট হয়েছে। টেবিল, চেয়ার, কলম, কাগজ, আইন, আদালত, নামাজ, রোজা—এসব শব্দ আজ বাংলার রক্তমাংসে মিশে গেছে। এগুলোকে জোর করে বর্জন করা যেমন মারাত্মক ভুল, তেমনি বিদেশি শব্দ জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়াও ভাষার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও প্রাণপ্রবাহকে হত্যা করার শামিল।
মাতৃভাষার সার্বভৌমত্ব ও সমন্বয়বাদী দৃষ্টি: প্রাবন্ধিক প্রমাণ করেছেন যে, ভাষা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের নয়; ভাষা মানবগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়। বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা বাংলা এবং এই ভাষার বিকাশ হতে হবে তার নিজস্ব ব্যাকরণ ও প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে। একই সাথে আন্তর্জাতিক সংযোগের জন্য ইংরেজি এবং ইসলামি ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে যোগসূত্রের জন্য আরবি শিক্ষায় কোনো বাধা নেই। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই মাতৃভাষা বাংলার ওপর কোনো কৃত্রিম সংস্কার বা গোঁড়ামি চাপানো যাবে না।
উপসংহার: ড. শহীদুল্লাহর এই দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণতা ও অন্ধ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মুক্তচিন্তার এক অনন্য উচ্চারণ। উক্তিটি তৎকালীন সময়ের ভাষা সংকট উত্তরণে যেমন ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল, আজও তা যেকোনো ভাষার সার্বজনীন ও স্বাধীন বিকাশে চিরভাস্বর নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত।
৪. (ক) ছোটগল্প কাকে বলে? ছোটগল্প হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পের সার্থকতা আলোচনা কর। অথবা, (খ) ‘পাদটীকা’ গল্পে সৈয়দ মুজতবা আলী তৎকালীন শিক্ষক সমাজের দুরবস্থার যে সত্য চিত্র প্রকাশ করেছেন তার স্বরূপ বিশ্লেষণ কর।
ছোটগল্প হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পের সার্থকতা
ছোটগল্পের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য: ছোটগল্প হলো জীবনের একটি বিশেষ মুহূর্ত বা খণ্ডাংশের নিবিড় শিল্পরূপ। ইংরেজি সাহিত্যতাত্ত্বিক এডগার অ্যালান পো-র মতে, যে গল্প আধা ঘণ্টা থেকে এক বা দুই ঘণ্টার মধ্যে এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করা যায় এবং যা পাঠকের মনে একটি একক সামগ্রিক প্রভাব (singleness of effect) সৃষ্টি করে, তাকে ছোটগল্প বলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় ছোটগল্পের সবচেয়ে কালজয়ী সংজ্ঞা দিয়েছেন:
“ছোট প্রাণ, ছোট কথা, ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা,
নিতান্তই সহজ সরল,
সহস্র বিস্মৃতি-রাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি,
তারি দু-চারিটি অশ্রুজল…
শেষ হয়ে হইল না শেষ।”
ছোটগল্পে ঘটনার বাহুল্য থাকে না, থাকে চরিত্রের অন্তর্জগতের অতল রূপান্তর ও এক অপার্থিব অতৃপ্তি।
‘সমাপ্তি’ গল্পের মূল উপজীব্য ও সার্থকতা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ বাংলা সাহিত্যের একটি সার্থক ও মনস্তাত্ত্বিক ছোটগল্প। গল্পটিতে বাল্য ও কৈশোরের উন্মুক্ত চপলতা থেকে এক কিশোরীর পূর্ণাঙ্গ নারীত্বে উত্তরণের যে রূপান্তর চিত্রিত হয়েছে, তা গল্পটিকে অনন্য উচ্চতা দিয়েছে।
১. আকার ও সংহতি: গল্পটির ব্যাপ্তি সীমিত এবং এতে কোনো অপ্রয়োজনীয় উপকাহিনি নেই। সদ্য আইন পাস করা তরুণ অপূর্বর সাথে গ্রাম্য দুরন্ত চঞ্চল মেয়ে মৃন্ময়ীর পরিণয় এবং দাম্পত্যের সূচনাকে কেন্দ্র করেই এর মূল আখ্যান আবর্তিত।
২. চরিত্র সৃষ্টি ও রূপান্তর: মৃন্ময়ী প্রচলিত সমাজের শান্তশিষ্ট বধূ নয়; সে গাছে চড়ে, রাখাল বালকদের সাথে খেলা করে এবং বন্ধনহীন প্রকৃতির মতোই মুক্ত। তাকে বিয়ে করে অপূর্ব এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক সংকটে পড়ে। শ্বশুরবাড়ির শৃঙ্খলাকে অস্বীকার করে মৃন্ময়ীর বিদ্রোহ এবং পরবর্তীতে অপূর্বর প্রতি গভীর অনুরাগের জন্ম ও অপূর্বর বিচ্ছেদে বিরহের আগুন—এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরটি রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত মিতব্যয়ী ও হৃদয়গ্রাহী তুলিতে এঁকেছেন।
৩. নাটকীয়তা ও ক্লাইম্যাক্স: গল্পটির সমাপ্তি অত্যন্ত চমকপ্রদ ও কাব্যময়। দূর প্রবাস থেকে অপূর্বর হঠাৎ প্রত্যাবর্তনের রাতে মৃন্ময়ীর নীরব উপস্থিতি এবং তার সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ছোটগল্পের মেজাজকে চরম সার্থকতা দিয়েছে।
উপসংহার: আঙ্গিক গঠন, পরিমিতিবোধ, গভীর মনস্তত্ত্ব এবং ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’-এর ব্যঞ্জনায় রবীন্দ্রনাথের ‘সমাপ্তি’ বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে একটি নিখুঁত ও কালজয়ী সৃষ্টি।
অথবা, (খ) ‘পাদটীকা’ গল্পে শিক্ষক সমাজের দুরবস্থার যে সত্য চিত্র প্রকাশ পেয়েছে তার স্বরূপ
ভূমিকা: বাংলা সাহিত্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বী রম্যরচয়িতা ও বহুভাষাবিদ সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪) রচিত ‘পাদটীকা’ একটি অত্যন্ত সুগভীর সমাজসচেতন ও বেদনাময় ছোটগল্প। আপাতদৃষ্টিতে হাস্যরসাত্মক ও কৌতুকপূর্ণ মনে হলেও এর গভীরে নিহিত রয়েছে তৎকালীন ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক ঘুণেধরা সমাজে জ্ঞানতাপস শিক্ষক সমাজের চরম লাঞ্ছনা, দারিদ্র্য এবং সামাজিক মর্যাদাহীনতার মর্মান্তিক রূপ।
পণ্ডিতমশাই চরিত্রের প্রতীকী অর্থ: গল্পের মূল চরিত্র নরহরি পণ্ডিত বা ‘পণ্ডিতমশাই’ একটি নামকরা ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলার শিক্ষক। তিনি একাধারে অসামান্য পণ্ডিত, নিষ্ঠাবান শিক্ষাগুরু এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু এই বস্তুতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী সমাজ তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকতার কোনো মূল্যায়ন করেনি। তাঁর একমাত্র অপরাধ ছিল—তিনি ইংরেজি জানতেন না এবং তথাকথিত আধুনিক কোট-প্যান্ট পরিহিত বাবুদের মতো তোষামোদ করতে পারতেন না।
আর্থিক বৈষম্য ও চরম দারিদ্র্য: গল্পে লেখক তৎকালীন শিক্ষক সমাজের চরম আর্থিক দুরবস্থার এক নির্মম চিত্র তুলে ধরেছেন। বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, জমাদার বা দরোয়ানের বেতন যেখানে ছিল সম্মানজনক, সেখানে একজন আজীবন সাধক পণ্ডিতের মাসিক বেতন ছিল মাত্র পঁচিশ-ত্রিশ টাকা! এই সামান্য অর্থে সংসার চালানো তো দূরের কথা, অসুস্থতার পথ্য কেনারও সংস্থান ছিল না। ছেঁড়া চটিজুতো, তালি দেওয়া চাদর আর অর্থাভাব ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। সমাজ শিক্ষকদের মুখে মুখে “জাতির বিবেক” বা “শ্রদ্ধেয় গুরু” বলে বন্দনা করলেও বাস্তবে তাঁদের প্রাপ্য মৌলিক অধিকারটুকু দিতে অস্বীকার করত।
বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ ও ধনী সমাজের শঠতা: বিদ্যালয়ের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী সভায় বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের ধনী সভাপতি বা প্রধান অতিথি যখন মঞ্চে অলংকারবহুল বক্তৃতায় শিক্ষকদের দেবতুল্য সম্মান দেওয়ার মিথ্যা বুলি আউড়াতেন, তখন পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা পণ্ডিতমশাইয়ের পেটের ক্ষুধাই প্রমাণ করত সেই বক্তব্যের চরম কপটতা। নিজের দারিদ্র্য ঢাকার জন্য পণ্ডিতমশাইকে মিথ্যা সান্ত্বনার আশ্রয় নিতে হতো।
‘পাদটীকা’ নামকরণের শ্লেষ ও উপযোগিতা: বইয়ের মূল পাতার মূল লেখার নিচে যেমন ছোট হরফে নিতান্ত অবহেলিত অবস্থায় ‘পাদটীকা’ (Footnote) পড়ে থাকে, সমাজদেহে পণ্ডিতমশাইদের স্থানও ঠিক তেমনি। সমাজপতি ও বিত্তবানেরা হলেন মূল পৃষ্ঠা, আর যে শিক্ষকেরা জাতিকে মানুষ করার ভিত্তি তৈরি করেন, তাঁরা সমাজের পাতায় নিতান্ত একটি অপ্রয়োজনীয় ও উপেক্ষিত ‘পাদটীকা’ মাত্র।
উপসংহার: সৈয়দ মুজতবা আলী নিছক হাসির খোরাক জোগাতে এ গল্প লেখেননি; বরং সমাজের ভণ্ডামির মুখে চাবুক মেরে শিক্ষক সমাজের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক অশ্রুসজল মানবিক দাবি উপস্থাপন করেছেন।
গ-বিভাগ: নির্বাচিত কবিতা (মান: ২০)
৫. (ক) “‘বলাকা’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্থবিরতার বিরুদ্ধে যেন সচেতন বিদ্রোহ।”—উক্তিটি বিশ্লেষণ কর। অথবা, (খ) ‘মুসাফির’ কবিতায় জীবনের যে চরম বাস্তবতার চিত্রটি ফুটে উঠেছে তা আলোচনা কর।
‘বলাকা’ কবিতায় গতিবাদ ও স্থবিরতার বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহ
ভূমিকা: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাকা’ (১৯১৬) কাব্যগ্রন্থ ও এর নামকবিতাটি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক গতিবাদী চেতনার এক অমর দলিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞের পটভূমিতে রচিত এ কবিতায় কবি রূপকের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান জগতের জড়তা ও স্থবিরতাকে অস্বীকার করে এক চিরন্তন ও ক্লান্তিহীন গতির জয়গান গেয়েছেন।
গতিবাদের স্বরূপ ও বলাকা দর্শন: কবি একদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে কাশ্মীরের ঝিলম নদীর শান্ত তীরের দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। ঝিলমের বাঁকা জলধারা যেন খাপে ঢাকা তলোয়ারের মতো নিশ্চল হয়ে ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু হঠাৎ সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা ভেঙে একঝাঁক বুনো হাঁস (বলাকা) পাখা ঝাপটে দূর দিগন্তে উড়ে গেল। এই উড্ডীন বলাকার ডানার ঝটপটানি কবির চেতনায় এক বিরাট বিপ্লব সৃষ্টি করল। কবির মনে হলো, এই নিখিল বিশ্ব কখনোই স্থির নয়; সর্বত্র এক অদৃশ্য অনন্ত গতির স্পন্দন বয়ে চলেছে। কবি উচ্চারণ করলেন:
“হে হংসবলাকা,
তোমরা যে এনে দিলে পাখা!
স্তব্ধতার তলে তলে তরঙ্গে তরঙ্গে চলিয়াছে
অনন্তের ব্যাকুল চঞ্চল নৃত্য।”
স্থবিরতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: কবি দেখলেন, দৃশ্যত যা কিছু শান্ত ও অটল—যেমন পর্বত, অরণ্য, নদী—সবই আসলে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অনন্তের দিকে ধেয়ে চলেছে। পর্বত যেন আকাশে ডানা মেলতে চাইছে, মহীরুহ শাখা মেলে অসীমের উদ্দেশ্যে উড়ে যেতে ব্যাকুল। কবি মানবসমাজ ও ব্যক্তির জীবনেও এই গতিবাদকে প্রত্যক্ষ করেছেন। জড়তা, গতানুগতিকতা এবং স্থবিরতাই হলো আত্মার মৃত্যু। প্রাণের প্রকৃত ধর্মই হলো সামনের দিকে এগিয়ে চলা। কবি বলেন:
“হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে!”
উপসংহার: বলাকা কবিতাটি নিছক প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণনা নয়; এটি জড়তা, ক্লান্তি ও সনাতন স্থবিরতার মুখে চাবুক মেরে আত্মাকে নবজাগরণ ও অন্তহীন চলার ছন্দে দীক্ষিত করার এক মহাকাব্যিক প্রেরণা। তাই উক্তিটি সম্পূর্ণরূপে যথার্থ ও তাৎপর্যপূর্ণ।
অথবা, (খ) ‘মুসাফির’ কবিতায় জীবনের যে চরম বাস্তবতার চিত্রটি ফুটে উঠেছে তা আলোচনা কর
ভূমিকা: পল্লীকবি জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) রচিত ‘মুসাফির’ বাংলা সাহিত্যের এক অনুপম অধ্যাত্মবাদী ও দার্শনিক কবিতা। গ্রামবাংলার মাটির সুর ও সহজ-সরল জীবনের চিত্রকার হলেও এ কবিতায় কবি মানবজীবনের গভীরতম সত্য—পার্থিব জীবনের অনিত্যতা, মৃত্যুর অনিবার্য পদধ্বনি এবং পরকালের অনন্ত যাত্রার নিখাদ বাস্তব রূপ তুলে ধরেছেন।
পার্থিব জীবনের নশ্বরতা ও মুসাফির রূপক: আরবি ‘মুসাফির’ শব্দের অর্থ পথিক, পরিব্রাজক বা ক্ষণিক যাত্রী। কবি এই রূপকের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন যে, মানুষ এই পৃথিবীর স্থায়ী বাসিন্দা নয়। পথিক যেমন দূর দেশে ভ্রমণের পথে কোনো পান্থশালা বা সরাইখানায় রাতের জন্য সামান্য বিশ্রাম নিয়ে ভোর হতেই আবার পথ চলতে শুরু করে, মানবজীবনের এই পার্থিব সংসারও ঠিক তেমনি এক ক্ষণস্থায়ী সরাইখানা মাত্র। কবি বলেন:
“মুসাফির! তুমি পথ চলিবে নিঃশেষ,
সংসার-পান্থশালায় নিশি যাপিয়া আবার যাত্রা।”
মানুষের ধন-দৌলত, বাড়ি-গাড়ি, ক্ষমতা ও সামাজিক জৌলুস সবই এই ক্ষণিকের মুসাফিরখানার সাময়িক অলংকার।
মায়ার মোহ ও চরম বাস্তবতা: মানবজীবনের চরম বিয়োগান্তক বাস্তবতা হলো মানুষ এই ক্ষণস্থায়ী সংসারকে চিরস্থায়ী মনে করে অনন্ত মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে। সে সন্তান, পরিবার ও সম্পদের মোহে মত্ত হয়ে ভুলে যায় যে তার যাত্রার সময় ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। হঠাৎ যখন মৃত্যুর অমলিন ডাক এসে উপস্থিত হয়, তখন সমস্ত মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে একাকী কবরের অন্ধকারে যাত্রা করতে হয়। কবরে সঙ্গে যায় না কোনো সঞ্চিত অর্থ বা আপনজন; কেবল ভালো-মন্দের আমলনামাই হয় মুসাফিরের একমাত্র পাথেয়।
আত্মার জাগরণ ও কবির অমিয় বাণী: কবি জসীমউদ্দীন কোনো তাত্ত্বিক পণ্ডিতের মতো নয়, বরং একজন দরদি বন্ধুর মতো মানুষকে আত্মবিস্মৃতির ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন। পার্থিব লোভ-লালসা, অহংকার ও ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে হানাহানি যে কতটা অর্থহীন ও অন্তঃসারশূন্য, তা তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল ভাষায় প্রকাশ করেছেন। মানুষের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে অন্তরে আল্লাহর ভয়, পরকালের প্রস্তুতি এবং আর্তমানবতার সেবার মধ্যে।
উপসংহার: ‘মুসাফির’ কবিতাটি কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়, বরং বিভ্রান্ত মানবাত্মার প্রতি চিরন্তন জীবনবাস্তবতার এক চরম হুঁশিয়ারি। মৃত্যুর অমোঘ সত্য ও পার্থিব জীবনের নশ্বরতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়ে এ কবিতা মানুষকে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে।
৬. (ক) ‘বনলতা সেন’ কবিতার মূলভাব ও কাব্যসৌন্দর্য বিচার কর। অথবা, (খ) ‘আমার পূর্ব বাংলা’ একটি অসামান্য আধুনিক কবিতা—উক্তিটি বিশ্লেষণ কর।
‘বনলতা সেন’ কবিতার মূলভাব ও কাব্যসৌন্দর্য
ভূমিকা: আধুনিক বাংলা কবিতার তিমিরবিনাশী রূপকার জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯-১৯৫৪) সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক পঠিত কবিতা ‘বনলতা সেন’। এটি কেবল একটি রোমান্টিক প্রেমের কবিতা নয়, বরং অনন্ত কালের পথচলায় ক্লান্ত ও অবসন্ন মানবাত্মার চিরন্তন শান্তি ও আশ্রয়ের এক সুগভীর অধিবিদ্যক (metaphysical) আকুতি।
কাব্যভাবনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কবিতার সূচনাই ঘটে এক সুদূর ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক পরিভ্রমণের সুর দিয়ে:
“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরিয়াছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।”
এখানে ‘পথ হাঁটা’ মানব সভ্যতার অস্তিত্ব সংকটের প্রতীক। প্রাচীন ইতিহাস ও দূর অতীতের অন্ধকার ভেদ করে আধুনিক মানুষ আজ চরম নিঃসঙ্গ ও ক্লান্ত। সেই ক্লান্তির মধ্যে নাটোরের বনলতা সেন কোনো রক্তমাংসের সাধারণ নারী নয়, সে শাশ্বত আশ্রয়, অপার্থিব প্রশান্তি এবং ভালোবাসার প্রতীক।
অনুপম রূপকল্প ও চিত্ররূপময়তা: জীবনানন্দের চিত্রকল্প সৃষ্টিতে এই কবিতা অনন্য শিখর স্পর্শ করেছে। বনলতা সেনের কেশের অন্ধকার বিদিশার নিশার মতো নিবিড়, আর তার মুখাবয়ব শ্রাবস্তীর কারুকার্যের মতো শৈল্পিক। সবচেয়ে কালজয়ী চিত্রকল্প হলো:
“পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।”
পাখি সারাদিনের ক্লান্ত উড়াউড়ির পর যেমন নীড়ে ফিরে পরম নির্ভরতা খুঁজে পায়, তেমনি কবি বনলতা সেনের চোখের দৃষ্টিতে খুঁজে পান জীবনের পরম আশ্রয়।
উপসংহার ও কাব্যসৌন্দর্য: কবিতার অন্তিম স্তবকে দিনান্তের আলো মুছে যাওয়া, শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যার আগমন এবং সমস্ত পাখিদের ঘরে ফেরা এক নৈসর্গিক ও দার্শনিক বিষাদের পরিবেশ রচনা করে। জীবনানন্দ প্রমাণ করেছেন যে প্রেম ও সৌন্দর্যই এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষের একমাত্র অন্তিম সান্ত্বনা।
অথবা, (খ) ‘আমার পূর্ব বাংলা’ একটি অসামান্য আধুনিক কবিতা—উক্তিটির মূল্যায়ন
ভূমিকা: প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, গবেষক ও আধুনিক মনস্ক কবি সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০১০) রচিত ‘আমার পূর্ব বাংলা’ আধুনিক বাংলা দেশপ্রেমমূলক কবিতার এক অনবদ্য শিখর। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রক্তভেজা পটভূমিতে রচিত এ কবিতায় রোমান্টিক প্রকৃতিচেতনা, ঐতিহ্যের গভীর শিকড় এবং সমকালীন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এক অপূর্ব আধুনিক শিল্পরূপ লাভ করেছে।
আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্য ও ‘আমার পূর্ব বাংলা’: আধুনিক কবিতার মূল লক্ষণ হলো আবেগ ও বুদ্ধির পরিশীলিত মেলবন্ধন, নতুন চিত্রকল্প সৃষ্টি, মুক্তছন্দের সাবলীল প্রবাহ এবং ব্যক্তিস্বভাবের সাথে সমষ্টিগত চেতনার রূপায়ণ। এ কবিতায় কবি দেশকে নিছক মাটির ভূগোল হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে রূপায়িত করেছেন এক জীবন্ত, অনুভূতিশীল ও স্নিগ্ধ সত্তা হিসেবে:
“আমার পূর্ব বাংলা একগুচ্ছ স্নিগ্ধ কদম্বের মতো,
একটি প্রচ্ছন্ন উদাসীন নদীর চরের মতো…”
এখানে প্রচলিত দেশপ্রেমের উচ্চকিত স্লোগান নেই, আছে মাটির গভীর থেকে উঠে আসা এক সুতীব্র নান্দনিক সৌন্দর্য ও মমত্ববোধ।
অনুপম চিত্রকল্প ও ইন্দ্রিয়ঘন রূপায়ণ: কবি সৈয়দ আলী আহসান আধুনিক ইন্দ্রিয়ঘন (sensuous) চিত্রকল্প নির্মাণে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। পূর্ব বাংলার রূপবৈচিত্র্যকে তিনি বর্ণনা করেছেন বহুমাত্রিক উপমায়: কখনো তা ‘শ্রাবণের মেঘের মতো শ্যামল ও সজল’, কখনো ‘ধানের গন্ধমাখা সন্ধ্যার বাতাস’, আবার কখনো ‘নম্র ও লজ্জাতুরা গ্রামীণ বধূর মতো’। প্রতিটি উপমা যেন বাংলার চিরন্তন নদীমাতৃক প্রকৃতিকে চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলে।
জাতীয় মুক্তির আকুতি ও ভৌগোলিক আত্মপরিচয়: কবিতার রচনার সময়টি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আগ্রাসন ও সাংস্কৃতিক দাসত্বের যুগ। সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে দাঁড়িয়ে পূর্ব বাংলার স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব ও অধিকারের দাবিকে কবি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে উচ্চারণ করেছেন। ‘আমার পূর্ব বাংলা’ শব্দটি বারবার ব্যবহারের মাধ্যমে কবি এই ভূখণ্ডের স্বাধিকার ও জাতীয়তাবোধকে এক নান্দনিক আধুনিক রূপ দিয়েছেন, যা পরবর্তীকালে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান শৈল্পিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।
উপসংহার: ছন্দবিন্যাসের সাবলীল আধুনিকতা, চিত্রকল্পের গভীর মৌলিকতা এবং দেশমাতৃকার প্রতি অতল প্রেমের মহাকাব্যিক সমাহারে ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসংশয়ে এক অসামান্য ও কালোত্তীর্ণ আধুনিক কবিতা।
ঘ-বিভাগ: ব্যবহারিক বাংলা ও ব্যাকরণ (যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও: মান ৫ × ৪ = ২০)
৭. (ক) বাংলা ব্যাকরণ কাকে বলে? ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয়গুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
বাংলা ব্যাকরণের সংজ্ঞা: যে শাস্ত্র পাঠ করলে বাংলা ভাষা শুদ্ধরূপে লিখতে, পড়তে ও বলতে পারা যায় এবং ভাষার অভ্যন্তরীণ গঠনপ্রকৃতি ও নিয়মাবলি স্পষ্টভাবে জানা যায়, তাকে বাংলা ব্যাকরণ বলে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে: “যে শাস্ত্র জানিলে বাঙ্গালা ভাষা শুদ্ধরূপে লিখিতে, পড়িতে ও বলিতে পারা যায়, তাহার নাম বাঙ্গালা ব্যাকরণ।”
ব্যাকরণের প্রধান আলোচ্য বিষয়সমূহ: যেকোনো ভাষার ব্যাকরণের মতো বাংলা ব্যাকরণেরও চারটি প্রধান আলোচ্য বিষয় রয়েছে:
১. ধ্বনি Bernardo/ধ্বনিমূলতত্ত্ব (Phonology): এতে ধ্বনি, বর্ণ, স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির উচ্চারণপ্রক্রিয়া, ধ্বনি পরিবর্তন, সন্ধি, ন-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান ইত্যাদি বিশদভাবে আলোচিত হয়।
২. রূপতত্ত্ব বা শব্দতত্ত্ব (Morphology): শব্দের গঠন, ধাতু ও প্রাতিপদিক, উপসর্গ, প্রত্যয়, লিঙ্গ, বচন, পদপ্রকরণ এবং সমাস সংক্রান্ত নিয়মাবলি এতে আলোচিত হয়।
৩. বাক্যতত্ত্ব (Syntax): বাক্যের গঠনপ্রণালী, পদক্রম, বাক্যের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক সম্পর্ক, বাক্য রূপান্তর, বাচ্য এবং যতিচিহ্নের যথাযথ ব্যবহার বাক্যতত্ত্বের মূল আলোচ্য।
৪. অর্থতত্ত্ব (Semantics): শব্দের অর্থবিচার, অর্থের পরিবর্তন, সমার্থকতা, বিপরীতার্থকতা এবং শব্দের গৌণ ও মুখ্য অর্থ বিশ্লেষণ অর্থতত্ত্বের আওতাভুক্ত।
(এছাড়া আধুনিক ব্যাকরণে ছন্দ ও অলংকার এবং কোশতত্ত্ব বা অভিধানতত্ত্বও অন্তর্ভুক্ত করা হয়)।
৭. (খ) প্রমিত বাংলা বানানের পাঁচটি নিয়ম উদাহরণসহ লেখ।
বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বাংলা বানানের পাঁচটি মৌলিক নিয়ম নিম্নরূপ:
- অ-তৎসম শব্দে ই-কারের ব্যবহার: সকল তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র শব্দে কেবল ‘ই’ বা এর কারচিহ্ন ‘ি’ ব্যবহৃত হবে; ‘ঈ’ বা ‘ী’ হবে না। যেমন: সরকারি, তরকারি, দাদি, নানি, পাখি, হাতি, বাড়ি ইত্যাদি।
- বিদেশি শব্দে ‘ণ’, ‘ষ’ ও ‘ছ’ বর্জন: যেকোনো বিদেশি (আরবি, ফারসি, ইংরেজি ইত্যাদি) শব্দে কখনো মূর্ধন্য-ণ এবং মূর্ধন্য-ষ হবে না; সর্বদা দন্ত্য-ন এবং দন্ত্য-স হবে। যেমন: কর্নার, গভর্নর, স্টেশন, পোস্টমাস্টার, বাস, পুলিশ ইত্যাদি।
- রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব নিষিদ্ধ: তৎসম বা অতৎসম কোনো শব্দেই রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণ দ্বিত্ব (দুইবার) হবে না। যেমন: কর্ম (কর্ম্ম নয়), সূর্য (সূর্য্য নয়), ধর্ম (ধর্ম্ম নয়), অর্জন (অর্জ্জন নয়)।
- সমাসবদ্ধ পদের সংযোগ: সমাসবদ্ধ পদগুলো সাধারণত একসঙ্গে মিলিয়ে লিখতে হবে। যেমন: গুরুশিষ্য, হাটবাজার, সংবাদপত্র। বিশেষ ক্ষেত্রে অর্থের বিভ্রান্তি এড়াতে হাইফেন ব্যবহার করা যায় (যেমন: বাপ-বেটা)।
- ‘আলি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দে হ্রস্ব-ই: ‘আলি’ প্রত্যয়যুক্ত সকল শব্দে হ্রস্ব ‘ই’ কার হবে। যেমন: সোনালি, রুপালি, মিতালি, গীতালি ইত্যাদি।
৭. (গ) ষ-ত্ব বিধান কাকে বলে? তৎসম শব্দে ‘ষ’ ব্যবহারের পাঁচটি নিয়ম লেখ।
ষ-ত্ব বিধানের সংজ্ঞা: বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের বানানে মূর্ধন্য-ষ ব্যবহারের অকাট্য নিয়মকেই ষ-ত্ব বিধান বলে। খাঁটি বাংলা বা বিদেশি শব্দে এই নিয়ম প্রযোজ্য হয় না।
তৎসম শব্দে ‘ষ’ ব্যবহারের পাঁচটি নিয়ম:
- ‘ঋ’ ও ঋ-কারের পর ‘ষ’: তৎসম শব্দে ‘ঋ’ কিংবা ঋ-কারের পর মূর্ধন্য-ষ হয়। যেমন: ঋষি, বৃষ, কৃষক, বৃষ্টি, দৃষ্টি ইত্যাদি।
- ট-বর্গীয় ধ্বনির পূর্বে ‘ষ’: তৎসম শব্দে ট-বর্গীয় ধ্বনির (ট, ঠ, ড, ঢ) পূর্বে যুক্ত ব্যঞ্জনে সর্বদা মূর্ধন্য-ষ ব্যবহৃত হয়। যেমন: কষ্ট, নষ্ট, মিষ্টান্ন, কাষ্ঠ, পৃষ্ঠা ইত্যাদি।
- ই-কারান্ত ও উ-কারান্ত উপসর্গের পর: ই-কারান্ত এবং উ-কারান্ত উপসর্গের (যেমন: অভি, অধি, নি, বি, সু, প্রতি ইত্যাদি) পর কতগুলো নির্দিষ্ট ধাতুতে মূর্ধন্য-ষ হয়। যেমন: অভিষেক, পরিষ্কার, প্রতিষেধক, সুষম, বিষাদ ইত্যাদি।
- অ বা আ ভিন্ন অন্য স্বরবর্ণের পর: অ এবং আ ভিন্ন অন্য কোনো স্বরবর্ণ এবং ক ও র-এর পরবর্তী প্রত্যয়ের দন্ত্য-স মূর্ধন্য-ষ হয়। যেমন: ভবিষ্যৎ, মুমূর্ষু, চিকিৎসা ইত্যাদি।
- স্বভাবতই মূর্ধন্য-ষ: কোনো কোনো তৎসম শব্দে কোনো নিয়ম ছাড়াই স্বভাবসিদ্ধ মূর্ধন্য-ষ ব্যবহৃত হয়। যেমন: আষাঢ়, পাষাণ, মানুষ, ষড়যন্ত্র, ঔষধ, মহিষ ইত্যাদি।
৭. (ঘ) যেকোনো পাঁচটি শব্দের শুদ্ধ বানান লেখ:
| প্রদত্ত অশুদ্ধ রূপ | প্রমিত শুদ্ধ রূপ | ব্যাখ্যা / নিয়ম |
|---|---|---|
| দৈন্যতা | দৈন্য অথবা দীনতা | প্রত্যয় ও প্রত্যয়ান্ত শব্দের দ্বৈত প্রয়োগ বর্জনীয়। |
| নূন্যতম | ন্যূনতম | তৎসম সন্ধিজাত নিয়মে ‘ন্যূন’ বানানে দীর্ঘ-ঊ কার। |
| ইতিপূর্বে | ইতোপূর্বে | সন্ধির নিয়মে অ-কারের পর বিসর্গ থাকলে ‘ও’ কার হয়। |
| পোষ্টমাষ্টার | পোস্টমাস্টার | ইংরেজি বা বিদেশি শব্দে ‘ষ্ট’ হয় না, ‘স্ট’ হয়। |
| বিদূশী | বিদুষী | স্ত্রীলিঙ্গে হ্রস্ব-উ কার হয়। |
| সমিচীন | সমীচীন | উভয় বর্ণেই দীর্ঘ-ঈ কার যুক্ত হয়। |
| স্বরস্বতী | সরস্বতী | দন্ত্য-স এর নিচে ব-ফলা হয় না। |
৭. (ঙ) যেকোনো পাঁচটি শব্দের ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয় কর:
| প্রদত্ত শব্দ | ব্যাসবাক্য | সমাসের নাম |
|---|---|---|
| কাজলকালো | কাজলের ন্যায় কালো | উপমান কর্মধারয় সমাস |
| গুরুশিষ্য | গুরু ও শিষ্য | দ্বন্দ্ব সমাস |
| চিরসুখী | চিরকাল ব্যাপিয়া সুখী | দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস |
| দেশান্তর | অন্য দেশ | নিত্য সমাস |
| নবরত্ন | নবরত্নের সমাহার | দ্বিগু সমাস |
| সোনার বাংলা | সোনার ন্যায় বাংলা / সোনা রূপ বাংলা | উপমিত / রূপক কর্মধারয় সমাস |
| সময়সূচি | সময়ের সূচি | ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস |
৭. (চ) যেকোনো পাঁচটি শব্দের প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় কর:
| প্রদত্ত শব্দ | প্রকৃতি ও প্রত্যয় | প্রত্যয়ের শ্রেণি |
|---|---|---|
| গন্তব্য | √গম্ + তব্য | সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় |
| গ্রামীণ | গ্রাম + ঈন | সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় |
| দৈন্য | দীন + য (ষ্ণ্য) | সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় |
| নাবিক | নৌ + ইক (ষ্ণিক) | সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় |
| পৃথিবী | পৃথু + ঈ | সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় |
| ভাবুক | √ভাব্ / ভূ + উক | বাংলা কৃৎপ্রত্যয় |
| সৌন্দর্য | সুন্দর + য (ষ্ণ্য) | সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় |
৭. (ছ) ভাব-সম্প্রসারণ কর: “সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত।”
মূলভাব: প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা সনদের মাধ্যমে প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হয় না। মানুষের অন্তর্নিহিত জ্ঞানপিপাসা, আত্মিক জিজ্ঞাসা এবং নিজস্ব সাধনার মধ্য দিয়েই মানুষ প্রকৃত সুশিক্ষিত রূপ পরিগ্রহ করে।
ভাব-সম্প্রসারণ: শিক্ষা মানুষের অন্তরের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায় এবং বিবেককে জাগ্রত করে। কিন্তু প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল সহায়ক ও পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জোর করে কাউকে জ্ঞান গলাধঃকরণ করাতে পারে না, যদি না শিক্ষার্থীর নিজের অন্তরে জানার ব্যাকুলতা থাকে। পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া আর প্রকৃত জ্ঞানবান হওয়া এক কথা নয়।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে যথার্থই বলেছেন যে, শিক্ষকের কাজ হলো ছাত্রের মনের ক্ষিধে জাগিয়ে দেওয়া। জ্ঞান কোনো দানযোগ্য বস্তু নয়; তা স্বীয় সাধনায় অর্জন করতে হয়। পৃথিবীর যত মহামনীষী, বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও চিন্তাবিদ মানবতার ইতিহাসে আলো ছড়িয়েছেন, তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন স্বশিক্ষিত। লাইব্রেরি চর্চা, গভীর অধ্যয়ন ও মুক্তচিন্তার অনুশীলনই মানুষকে প্রকৃত শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে। যে ব্যক্তি নিজে নিজে শেখে না, তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সার্টিফিকেট এক অর্থহীন কাগজে পরিণত হয়।
মন্তব্য: স্বতঃস্ফূর্ত আত্মঅনুশীলন এবং আত্মজ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই একজন মানুষ পরিপূর্ণ সুশিক্ষিত ও আলোকোজ্জ্বল নাগরিকে পরিণত হতে পারে।
৭. (জ) উচ্চশিক্ষা ও ইসলামি শিক্ষার প্রসারে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা শীর্ষক একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রণয়ন কর।
উচ্চশিক্ষা ও ইসলামি আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগান্তকারী অবদান
বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা: ২৪ অক্টোবর ২০২৩
বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা শিক্ষাধারাকে উচ্চশিক্ষার মূলধারার সাথে সমন্বিত করে এক আধুনিক, যোগ্য ও যুগোপযোগী আলেম সমাজ গঠনের লক্ষ্যে বিশেষায়িত সরকারি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম দেশজুড়ে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ফাজিল ও কামিল স্তরের হাজার হাজার মাদরাসাকে একটি সুশৃঙ্খল একক শিক্ষা কাঠামোর অধীনে এনে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে এ প্রতিষ্ঠান এক অনন্য মাইলফলক স্থাপন করেছে।
সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত কেন্দ্রীয় ক্যাম্পাসে “একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইসলামি শিক্ষার আধুনিকায়ন” শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে বক্তাগণ উল্লেখ করেন যে, অতীতে দেশের আলিয়া মাদরাসাগুলোর ফাজিল ও কামিল স্তরের সনদের আন্তর্জাতিক সমতা এবং আধুনিক বিষয়সমূহের সমন্বয়হীনতার কারণে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ত। কিন্তু বিশেষায়িত অধিভুক্তিকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনার্স কোর্স চালু, আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কোরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞানের পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সমান পারদর্শিতা অর্জন করছে।
সেমিনারে জানানো হয়, বর্তমানে দেশের শতাধিক স্বনামধন্য ফাজিল মাদরাসায় আল-হাদিস, আল-কুরআন, দাওয়াহ, আরবি ভাষা ও সাহিত্য এবং ইসলামি ইতিহাস বিভাগে ৪ বছর মেয়াদি অনার্স কোর্স চালু রয়েছে। এর ফলে ধর্মপ্রাণ তরুণ প্রজন্ম একাধারে শরিয়াহর গভীর জ্ঞান এবং আধুনিক বিশ্বের নেতৃত্বের উপযোগী গবেষণামূলক দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং গবেষণা সেমিনার চালুর মাধ্যমে পাঠদানের গুণগত মানও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাপনী বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ এই ধারাকে আরো গতিশীল করতে আধুনিক ডিজিটাল লাইব্রেরি ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে স্কলারশিপ বিনিময় চুক্তি বৃদ্ধির জোর তাগিদ দেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
চর্যাপদ কোন ছন্দে রচিত এবং এর আদি কবি কে?
চর্যাপদ মূলত মাত্রাবৃত্ত বা পাদাকুলক ছন্দে রচিত এবং এর প্রথম পদটি রচনা করায় লুইপাকে চর্যাপদের আদি কবি হিসেবে গণ্য করা হয়।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে কেন বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী বলা হয়?
তিনি সর্বপ্রথম বাংলা গদ্যে যতিচিহ্নের শৃঙ্খলা ও শ্রুতিমধুর স্বরসঙ্গতি এনে গদ্যকে সাহিত্যের সুনির্দিষ্ট ও গতিশীল বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধের মূল ব্যঙ্গার্থ কী?
সমাজের সর্বস্তরে যোগ্যতার চেয়ে চাটুকারিতা, তোষামোদ ও পদলেহনের মাধ্যমে সুবিধা আদায়ের নীতিহীন সংস্কৃতিকে ব্যঙ্গাত্মক শ্লেষে উপস্থাপন করা।
‘সমাপ্তি’ ছোটগল্পে মৃন্ময়ীর রূপান্তরের মূল উপাদান কী?
বিবাহের পর চপল কিশোরীর অন্তরে স্বামীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও প্রবাসের বিরহবেদনা তার মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি।
‘বলাকা’ কবিতায় উড়ন্ত বুনো হাঁস কিসের প্রতীক?
উড়ন্ত বলাকার ঝাঁক মহাবিশ্বের অনন্ত গতিবাদ, আত্মার রূপান্তর এবং সমস্ত জড়তা ও স্থবিরতার বিরুদ্ধে বিজয়ের চিরন্তন প্রতীক।
প্রমিত বানানে বিদেশি শব্দে মূর্ধন্য-ষ ও ণ ব্যবহার নিষিদ্ধ কেন?
বাংলা একাডেমি প্রমিত বানানের নিয়ম অনুযায়ী মূর্ধন্য-ষ এবং মূর্ধন্য-ণ কেবল তৎসম বা সংস্কৃত শব্দেই ব্যবহৃত হয়; বিদেশি শব্দে সর্বদা স ও ন হয়।