জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (Economics & Islamic Economics) – 202106, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

Abswer.com Abswer.com
22 September, 2026
৩৭ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২১
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (Economics and Islamic Economics)
বিষয় কোড: 202106 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০

২০২১ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ‘অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি’ (202106) পরীক্ষাটিতে প্রচলিত ও ইসলামি অর্থনীতির মৌলিক নীতিমালা, চাহিদা সূচি ও রেখা, ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি, যাকাত ও দারিদ্র্য বিমোচন, ইসলামি ব্যাংকিং ও তাকাফুল (ইসলামি বিমা), উশর-খারাজ এবং ইসলামি মজুরি কাঠামোর ওপর বিস্তারিত প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত ছিল। নিচে সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান তুলে ধরা হলো।

ক বিভাগ — রচনামূলক প্রশ্ন [মান: ১৫ × ৪ = ৬০]

১. ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা দাও। ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা কর। [মান: ৫ + ১০ = ১৫]

ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা

সাধারণ পরিচয়: ইসলামি অর্থনীতি কেবল কোনো বস্তুগত উৎপাদন ও ভোগের বিজ্ঞান নয়, বরং তা কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য নির্দেশনায় পরিচালিত একটি পূর্ণাঙ্গ ও নৈতিক অর্থব্যবস্থা।
মনীষীদের পারিভাষিক সংজ্ঞা:
ড. এম এ মান্নান: “ইসলামি অর্থনীতি হলো একটি সামাজিক বিজ্ঞান যা ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে মানবজাতির অর্থনৈতিক সমস্যাবলি অধ্যয়ন করে।”
অধ্যাপক খুরশীদ আহমদ: “ইসলামি অর্থনীতি হলো মানবজাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে বস্তুগত ও আর্থিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের বিজ্ঞান।”
ইসলামি দৃষ্টিকোণ: আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে তাঁর প্রদত্ত হালাল-হারামের সীমারেখা মেনে সম্পদের সুবিচারপূর্ণ উৎপাদন, বণ্টন ও ভোগ নিশ্চিত করার সামগ্রিক শৃঙ্খলাই হলো ইসলামি অর্থনীতি।

ইসলামি অর্থনীতির অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ

  1. আল্লাহর পরম মালিকানা: এ অর্থব্যবস্থার মূল স্তম্ভ হলো— মহাবিশ্বের সমস্ত আকাশমণ্ডল, পৃথিবী ও সম্পদের প্রকৃত ও নিঃশর্ত মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। মানুষ কেবল আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে আমানতদার মাত্র।
  2. হালাল ও হারামের সীমারেখা: অবাধ বস্তুগত মুনাফার পরিবর্তে হালাল উপায়ে সম্পদ উপার্জন এবং মদ্যপান, জুয়া, সুদ ও প্রতারণামূলক যাবতীয় হারাম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
  3. সুদমুক্ত অর্থনৈতিক কাঠামো: রিবা বা সুদ হলো শোষণের মূল হাতিয়ার। ইসলাম সুদকে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করে অংশীদারি ও লাভ-লোকসান ভাগাভাগির (মুদারাবা ও মুশারাকা) নীতি প্রবর্তন করেছে।
  4. সম্পদের সুষম বণ্টন ব্যবস্থা: সম্পদ যেন কেবল ধনীদের মাঝেই আবর্তিত না হয় («كي لا يكون دولة بين الأغنياء منكم»), সেজন্য যাকাত, উশর, সাদাক্বাহ ও উত্তরাধিকার আইনের মাধ্যমে সমাজে ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন নিশ্চিত করা হয়েছে।
  5. নৈতিকতা ও বস্তুবাদিতার অপূর্ব সমন্বয়: ধন উপার্জনের সাথে আখিরাতের জবাবদিহিতা ও তাকওয়ার সংযোগ ঘটিয়ে ইসলাম আত্মস্বার্থ ও সামাজিক কল্যাণের মাঝে নিখুঁত সামঞ্জস্য এনেছে।
  6. শোষণমুক্ত বাজারব্যবস্থা: বাজারে মজুতদারি (ইহতিকার), কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, সিন্ডিকেট এবং ওজনে কম দেওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

২. চাহিদা সূচি ও চাহিদা রেখার পার্থক্য নির্ণয় কর। একটি কাল্পনিক চাহিদা সূচি থেকে চাহিদা রেখা অঙ্কন কর। [মান: ৫ + ১০ = ১৫]

চাহিদা সূচি ও চাহিদা রেখার মৌলিক পার্থক্য

তুলনার বিষয় চাহিদা সূচি (Demand Schedule) চাহিদা রেখা (Demand Curve)
১. সংজ্ঞা অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে বিভিন্ন দামে ক্রেতা যে বিভিন্ন পরিমাণ পণ্য ক্রয় করতে প্রস্তুত থাকে, তা যখন সারণি বা টেবিলের মাধ্যমে দেখানো হয়। চাহিদা সূচির সংখ্যাগত উপাত্তগুলোকে যখন জ্যামিতিক চিত্রের মাধ্যমে রেখায় রূপদান করা হয়।
২. উপস্থাপনা এটি একটি গাণিতিক বা সংখ্যাবাচক সারণিভিত্তিক রূপ। এটি একটি জ্যামিতিক বা চিত্রভিত্তিক উপস্থাপন।
৩. ঢাল ও দিকদর্শন দাম ও পরিমাণের বিপরীতমুখী সম্পর্ক সংখ্যার ওঠানামায় বোঝা যায়। দাম ও চাহিদার বিপরীতমুখী সম্পর্কের ফলে রেখাটি বাম থেকে ডানে নিম্নগামী হয়।
৪. ব্যবহারিক রূপ উপাত্ত সংগ্রহ ও প্রাথমিক গণনার ক্ষেত্রে এটি অপরিহার্য। অর্থনৈতিক তত্ত্ব বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে এটি অধিক কার্যকর।

কাল্পনিক চাহিদা সূচি

ধরা যাক, বাজারে কোনো একটি নির্দিষ্ট পণ্য (যেমন: আপেল প্রতি কেজি)-এর বিভিন্ন দামে চাহিদার পরিমাণ নিম্নরূপ:

সংমিশ্রণ বিন্দু প্রতি কেজি পণ্যের দাম (টাকায় – P) চাহিদার পরিমাণ (কেজিতে – Q)
A ৪০
B ৩০
C ২০
D ১০

চাহিদা রেখা অঙ্কন ও ব্যাখ্যা

রেখাচিত্রের বিবরণ:
ভূমি অক্ষে (OX) চাহিদার পরিমাণ এবং লম্ব অক্ষে (OY) পণ্যের দাম নির্দেশ করা হলো।
– যখন পণ্যের দাম ৪০ টাকা, তখন চাহিদার পরিমাণ ১ কেজি (A বিন্দু)।
– দাম কমে ৩০ টাকা হলে চাহিদা বেড়ে হয় ২ কেজি (B বিন্দু)।
– দাম আরও কমে ২০ টাকা হলে চাহিদা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৩ কেজি (C বিন্দু)।
– দাম সর্বনিম্ন ১০ টাকা হলে চাহিদা সর্বোচ্চ ৪ কেজি হয় (D বিন্দু)।
এখন A, B, C এবং D বিন্দুগুলো যোগ করলে যে ‘DD’ রেখাটি পাওয়া যায়, তা-ই হলো কাল্পনিক চাহিদা রেখা। পণ্যের দাম ও চাহিদার পরিমাণের মধ্যে বিপরীতমুখী সম্পর্কের কারণে চাহিদা রেখাটি স্বাভাবিকভাবেই বাম দিক থেকে ডান দিকে নিম্নগামী হয়েছে।


৩. উপযোগ কাকে বলে? সমালোচনাসহ ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধিটি ব্যাখ্যা কর। [মান: ৫ + ১০ = ১৫]

উপযোগের সংজ্ঞা

অর্থনীতিতে উপযোগ (Utility) বলতে কোনো দ্রব্যের মানুষের অভাব মোচন করার অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে বোঝায়। মানুষ যখন কোনো দ্রব্য বা সেবা ভোগ করে, তখন তা থেকে যে মানসিক তৃপ্তি বা সন্তুষ্টি লাভ করে, তা-ই হলো অর্থনীতিতে উপযোগ। অধ্যাপক মার্শাল বলেন, “উপযোগ হলো কোনো দ্রব্যের এমন এক ক্ষমতা যা মানুষের নির্দিষ্ট কোনো অভাব মেটাতে পারে।”

ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি (Law of Diminishing Marginal Utility)

বিধির মূল বক্তব্য: অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থেকে কোনো ভোক্তা যখন একই সময়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট দ্রব্যের বিভিন্ন একক ক্রমাগত ভোগ করতে থাকে, তখন ভোগ বৃদ্ধির সাথে সাথে ওই দ্রব্যের অতিরিক্ত এককগুলো থেকে প্রাপ্ত উপযোগ অর্থাৎ প্রান্তিক উপযোগ (Marginal Utility) ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। একেই অর্থনীতির ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি বলা হয়।

কাল্পনিক সারণির সাহায্যে ব্যাখ্যা:

ভোগের একক (কমলালেবু) মোট উপযোগ (Total Utility – TU টাকায়) প্রান্তিক উপযোগ (Marginal Utility – MU টাকায়)
১ম একক ১০ ১০
২য় একক ১৮
৩য় একক ২৪
৪র্থ একক ২৮
৫ম একক ৩০
৬ষ্ঠ একক (পূর্ণ তৃপ্তি) ৩০ (সর্বোচ্চ) ০ (শূন্য প্রান্তিক উপযোগ)
৭ম একক ২৮ (হ্রাস) -২ (ঋণাত্মক প্রান্তিক উপযোগ)

দেখা যাচ্ছে, ভোগের পরিমাণ যতই বাড়ছে, প্রান্তিক উপযোগ ১০ থেকে কমে ৮, ৬, ৪, ২ এবং ষষ্ঠ এককে শূন্যে পৌঁছেছে। এরপরও ভোগ অব্যাহত রাখলে উপযোগ ঋণাত্মক (-২) হয়ে যায়।

বিধির সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা

  1. সময়ের ব্যবধান: ভোগের এককের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান থাকলে এ বিধি কার্যকর হয় না; যেমন সকালে এক গ্লাস পানি পান করার তিন ঘণ্টা পর পানি পান করলে উপযোগ কমে না।
  2. শখ ও দুর্লভ দ্রব্যের ক্ষেত্রে: প্রাচীন মুদ্রা, ডাকটিকিট বা মূল্যবান চিত্রকর্ম সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংগ্রহ বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রান্তিক উপযোগ না কমে বরং বৃদ্ধি পায়।
  3. মাদকাসক্তি: মাদকাসক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে মাদকের প্রতিটি অতিরিক্ত মাত্রায় তার তীব্র আকর্ষণ ও উপযোগ বাড়ে।
  4. আয়ের পরিবর্তন: ভোক্তার আয় বা সামাজিক অবস্থান পরিবর্তিত হলে দ্রব্যের প্রতি তার উপযোগ বৃদ্ধি পেতে পারে।
  5. উপযোগের সংখ্যাগত পরিমাপের অসম্ভবতা: মনস্তাত্ত্বিক তৃপ্তিকে টাকা বা নির্দিষ্ট সংখ্যার স্কেলে হুবহু মাপা সম্ভব নয়।

৪. যাকাত বলতে কী বোঝায়? সমাজে দারিদ্র্য দূরীকরণে যাকাতের ভূমিকা মূল্যায়ন কর। [মান: ৫ + ১০ = ১৫]

যাকাতের সংজ্ঞা ও বিধান

আভিধানিক অর্থ: ‘যাকাত’ (الزكاة) শব্দের অর্থ পবিত্রতা, প্রবৃদ্ধি ও আধিক্য লাভ করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরিয়তের নির্ধারিত নেসাব পরিমাণ উদ্বৃত্ত সম্পদের মালিক কোনো মুসলিমের ওপর বছরান্তে তার নির্দিষ্ট সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট অংশ (স্বাভাবিকভাবে ২.৫%) কুরআন নির্ধারিত আটটি খাতের কোনো খাতে নিঃশর্ত মালিকানায় অর্পণ করাকে যাকাত বলে। যাকাত ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি ফরজ বিধান।

সমাজে দারিদ্র্য দূরীকরণে যাকাতের কার্যকর ভূমিকা

  1. সম্পদের সুষম ও বাধ্যতামূলক পুনর্বণ্টন: যাকাত পুঁজিপতিদের কুক্ষিগত সম্পদ থেকে একটি অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাজের অবহেলিত, নিঃস্ব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিকট পৌঁছে দেয়, যা ধনবৈষম্য দূর করার মূল হাতিয়ার।
  2. স্থায়ী পুনর্বাসন ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি: কেবল ক্ষণিক আহার না দিয়ে যাকাতের অর্থ দিয়ে দরিদ্রদের রিকশা, সেলাই মেশিন, ক্ষুদ্র ব্যবসার মূলধন বা চাষাবাদের উপকরণ কিনে দিলে তারা স্থায়ীভাবে সচ্ছল হতে পারে এবং নিজেরাই ভবিষ্যতে যাকাতদাতা হতে পারে।
  3. ঋণগ্রস্তদের মুক্তিদান: যাকাতের অন্যতম খাত হলো ‘আল-গারিমীন’ বা নিঃস্ব ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধ। এর ফলে দেউলিয়া উদ্যোক্তারা পুনরায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরে আসতে পারে।
  4. সামগ্রিক ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি: দরিদ্র শ্রেণির হাতে অর্থ পৌঁছালে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ভোগ ও চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা দেশের কলকারখানার উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে তরান্বিত করে।
  5. ভিক্ষাবৃত্তি ও সামাজিক অপরাধের অবসান: দারিদ্র্যের তাড়নায় মানুষ চুরি, ছিনতাই ও অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়। যাকাত সামাজিক সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলে সমাজে শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনে।
  6. খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.)-এর সোনালী দৃষ্টান্ত: রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত পরিচালনার ফলে তাঁর খেলাফতকালে যাকাত গ্রহণের মতো একজনও দরিদ্র ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

৫. ইসলামি ব্যাংক বলতে কী বোঝায়? ইসলামি ব্যাংকের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিত আলোচনা কর। [মান: ৫ + ১০ = ১৫]

ইসলামি ব্যাংকের পরিচয়

সংজ্ঞা: ইসলামি শরিয়তের অনুশাসন ও মূলনীতির পূর্ণ অনুসারী হয়ে সুদের (রিবা) সম্পূর্ণ বর্জন এবং লাভ-লোকসান ভাগাভাগির ভিত্তিতে অর্থ আমানত গ্রহণ, বিনিয়োগ এবং কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক সেবা প্রদানকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ‘ইসলামি ব্যাংক’ বলে।
মূল দর্শন: অর্থ নিজে কোনো পণ্য নয়; অর্থ কেবল বিনিময়ের মাধ্যম। তাই অর্থের বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ (সুদ) নিষিদ্ধ, বরং বাস্তব ব্যবসা ও বিনিয়োগের অংশীদারিত্বই ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মূল ভিত্তি।

ইসলামি ব্যাংকের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

  1. সুদমুক্ত দ্বীনি জীবনযাপন: মুসলিমদের ঈমান ও আমল রক্ষার স্বার্থে সুদের মতো কবিরা গুনাহ ও আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অপরাধ থেকে মুক্ত আর্থিক প্ল্যাটফর্ম নিশ্চিত করা।
  2. উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্ব: মুদারাবা (শ্রম ও মেধার সাথে পুঁজির সংযোগ) এবং মুশারাকা (যৌথ মূলধন)-এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন করে সরাসরি উৎপাদন খাতে অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
  3. মানবকল্যাণ ও সামাজিক সুবিচার: কেবল মুনাফাকেন্দ্রিক অন্ধ বাণিজ্য না করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গ্রামীণ সুবিধাবঞ্চিতদের কল্যাণে বিশেষ যাকাত ও কর্জে হাসানা তহবিল পরিচালনা করা।
  4. মুরাবাহা ও ইজারার স্বচ্ছতা: পণ্য ক্রয় করে নির্দিষ্ট লাভে বিক্রি (মুরাবাহা) এবং ইজারা (ভাড়াভিত্তিক মালিকানা) চুক্তির মাধ্যমে পণ্যের বাস্তব বেচাকেনা নিশ্চিত করা, যা কাগজি মুদ্রাস্ফীতি রোধ করে।
  5. বিশ্ব আর্থিক সংকটে টিকে থাকার সক্ষমতা: ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার সময় দেখা গেছে, সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলো ধসে পড়লেও ইসলামি ব্যাংকগুলো তাদের বাস্তবমুখী ও ঝুঁকিমুক্ত নীতির কারণে অক্ষুণ্ণ ছিল।

৬. বিমা কাকে বলে? প্রচলিত বিমা ও ইসলামি বিমার মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর। [মান: ৫ + ১০ = ১৫]

বিমার সংজ্ঞা

বিমা (Insurance) হলো সম্ভাব্য ঝুঁকি ও অনিশ্চিত আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার একটি যৌথ নিরাপত্তামূলক আর্থিক চুক্তি, যেখানে এক পক্ষ (গ্রাহক) নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম প্রদানের বিনিময়ে অপর পক্ষ (বিমা কোম্পানি) কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের অঙ্গীকার করে।

প্রচলিত বিমা ও ইসলামি বিমা (তাকাফুল)-এর মৌলিক পার্থক্য

তুলনার বিষয় প্রচলিত বিমা (Conventional Insurance) ইসলামি বিমা (Takaful)
১. চুক্তির প্রকৃতি এটি একটি বাণিজ্যিক ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি (মু’আওয়াদাহ), যেখানে ঝুঁকি কেনাবেচা করা হয়। এটি পারস্পরিক সহযোগিতা ও দানভিত্তিক চুক্তি (তাবরু’ বা মুদারাবা)।
২. সুদের উপস্থিতি প্রিমিয়ামের অর্থ সুদি ব্যাংকে বা বন্ডে বিনিয়োগ করা হয় এবং কোম্পানি সুদ থেকে মুনাফা কামায়। রিবা বা সুদ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ; অর্থ কেবল ১০০% হালাল ও শরিয়াহসম্মত ব্যবসায় বিনিয়োগ হয়।
৩. গারার ও কিমার (অনিশ্চয়তা ও জুয়া) ক্ষতি না হলে গ্রাহক কিছুই পায় না বা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, যা জুয়া ও জুয়াসুলভ অনিশ্চয়তার শামিল। তাবরু’ বা স্বেচ্ছা অনুদানের নীতিতে তহবিল গঠন হওয়ায় এতে কোনো গারার বা কিমার থাকে না।
৪. উদ্বৃত্ত তহবিলের বণ্টন দাবিপূরণের পর অবশিষ্ট সমস্ত মুনাফা ও উদ্বৃত্ত কোম্পানির মালিক ও শেয়ারহোল্ডাররা ভোগ করে। উদ্বৃত্ত (Surplus) তহবিলের একটি অংশ পলিসিধারী গ্রাহকদের মাঝে তাদের অধিকার হিসেবে ফেরত দেওয়া হয়।
৫. শরিয়াহ তদারকি কোনো স্বাধীন শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড থাকে না। অভিজ্ঞ ইসলামি ফকীহ ও অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী শরিয়াহ বোর্ড সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করে।

খ বিভাগ — সংক্ষিপ্ত উত্তরদানমূলক প্রশ্ন [মান: ৫ × ৪ = ২০]

৭. উশর ও খারাজ বলতে কী বোঝায়?

উশর (العشر): মুসলিম কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ওপর আরোপিত বাধ্যতামূলক যাকাতকে ‘উশর’ বলে। প্রাকৃতিক বৃষ্টি বা নদীর পানিতে সেচবিহীন উৎপাদিত ফসলে ১০% (এক-দশমাংশ) এবং কৃত্রিম সেচ ও খরচে উৎপাদিত ফসলে ৫% (বিশ ভাগের এক ভাগ) উশর প্রদান করা শরিয়তে ফরজ।
খারাজ (الخراج): ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকদের মালিকানাধীন অথবা মুসলিমদের সাথে সন্ধির মাধ্যমে নির্দিষ্ট চুক্তির অধীনে থাকা কৃষিজমির ওপর রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত ভূমিকরকে ‘খারাজ’ বলে। এটি ইসলামি রাষ্ট্রের বায়তুল মালের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস।


৮. ইসলামে ব্যক্তি মালিকানা বলতে কী বোঝায়?

ইসলামে ব্যক্তি মালিকানা হলো এমন এক বৈধ অধিকার, যার মাধ্যমে ব্যক্তি হালাল উপায়ে অর্জিত সম্পদের ওপর ভোগ, ব্যবহার ও হস্তান্তরের একচ্ছত্র শরিয়তসম্মত ক্ষমতা লাভ করে। তবে এই মালিকানা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো পুরোপুরি অস্বীকৃত নয়, আবার পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মতো অনিয়ন্ত্রিত ও লাগামহীনও নয়। ইসলামে ব্যক্তি মালিকানা হলো আল্লাহর পরম মালিকানার অধীনে মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে একটি পবিত্র আমানত, যা ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপব্যয়, কৃপণতা ও হারাম খাত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।


৯. অর্থের কার্যাবলি আলোচনা কর।

অর্থের প্রধান কার্যাবলিকে চারটি মৌলিক ধারায় বিভক্ত করা যায়:
১. বিনিময়ের মাধ্যম (Medium of Exchange): অর্থ সকল পণ্য ও সেবা ক্রয়-বিক্রয়ের সর্বজনগ্রাহ্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করে পণ্য বিনিময়ের সমস্যা দূর করেছে।
২. মূল্যের পরিমাপক (Measure of Value): যেকোনো দ্রব্যের মূল্য কত তা সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করার একমাত্র মানদণ্ড হলো অর্থ।
৩. স্থগিত লেনদেনের মান (Standard of Deferred Payments): ভবিষ্যৎ ঋণ গ্রহণ ও দেনা-পাওনা নিষ্পত্তির জন্য অর্থ সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।
৪. মূল্যের ভাণ্ডার (Store of Value): পচনশীল দ্রব্য সঞ্চয় করা না গেলেও অর্থ দীর্ঘকাল ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে রাখা সম্ভব।


১০. পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার বলতে কী বোঝায়?

যে বাজারে অসংখ্য ক্রেতা ও বিক্রেতা সমজাতীয় বা একই মানের পণ্য একটি নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত দামে অবাধে ক্রয়-বিক্রয় করে, যেখানে কোনো একক ক্রেতা বা বিক্রেতা বাজার মূল্যকে প্রভাবিত করতে পারে না এবং বাজারে নতুন ফার্মের প্রবেশ ও প্রস্থানে কোনো বাধা থাকে না, তাকে অর্থনীতিতে ‘পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার’ (Perfect Competitive Market) বলে। যেমন: কৃষি পণ্যের কাঁচাবাজার।


১১. মালিকানার অর্থ কী? ইসলামে মালিকানার ধারণা দাও।

মালিকানার অর্থ: আরবি ‘মিলকিয়াত’ (الملكية) অর্থ কোনো বস্তুর ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বা অধিকার রাখা।
ইসলামে মালিকানার দর্শন: ইসলামে প্রকৃত ও আদি মালিক হলেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালা («لِّلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ»)। মানুষ কোনো সম্পদের চিরস্থায়ী স্রষ্টা নয়। আল্লাহ মানুষকে সাময়িকভাবে পরীক্ষার জন্য সম্পদের ভোগাধিকার দান করেছেন। অতএব সম্পদের ব্যবহার অবশ্যই আল্লাহর বিধান অনুযায়ী হতে হবে এবং নির্ধারিত উদ্বৃত্ত অংশ থেকে যাকাত ও গরিবের হক আদায় করতে হবে।


১২. ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি লেখ।

ইসলামে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইনসাফ, মানবিক মর্যাদা ও মৌলিক চাহিদাপূরণের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে:
১. মৌলিক মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা: মজুরি এমন হতে হবে যাতে একজন শ্রমিক তার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে পারে।
২. মালিক ও শ্রমিকের সমমর্যাদা: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের অধীনস্থরা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করেছেন। অতএব তোমরা যা খাও তাদের তা খেতে দাও এবং যা পরিধান করো তাদেরও তা পরিধান করতে দাও।”
৩. শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে পারিশ্রমিক: রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন শ্রমিকের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দিতে হবে। শ্রম শোষণ ইসলামে কবিরা গুনাহ।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি কী?

আল্লাহর পরম সার্বভৌমত্ব ও মালিকানা স্বীকার করে কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে হালাল উপায়ে সম্পদ অর্জন, সুদমুক্ত আর্থিক বিনিময় এবং সম্পদের সুবিচারপূর্ণ বণ্টন নিশ্চিত করাই এর মূল ভিত্তি।

২. চাহিদা সূচি থেকে কীভাবে চাহিদা রেখা পাওয়া যায়?

বিভিন্ন দামে যে বিভিন্ন পরিমাণ চাহিদা সূচিতে থাকে, তা গ্রাফ পেপারের লম্ব ও ভূমি অক্ষে স্থাপন করে বিন্দুগুলো রেখার মাধ্যমে যুক্ত করলেই বাম থেকে ডানে নিম্নগামী চাহিদা রেখা পাওয়া যায়।

৩. প্রান্তিক উপযোগ কখন শূন্য হয়?

ভোক্তা যখন কোনো দ্রব্য ভোগের মাধ্যমে তার চরমতম ও সর্বোচ্চ তৃপ্তিতে পৌঁছে যায় (যেখানে মোট উপযোগ সর্বোচ্চ), তখন প্রান্তিক উপযোগ শূন্য হয়ে যায়।

৪. যাকাত ও করের (Tax) মধ্যে পার্থক্য কী?

যাকাত হলো আল্লাহর নির্ধারিত শরিয়তের এক ফরজ ইবাদত যার হার ও ৮টি খাত অপরিবর্তনীয়; পক্ষান্তরে ট্যাক্স হলো রাষ্ট্র কর্তৃক প্রশাসনিক ব্যয়নির্বাহের প্রয়োজনে আরোপিত পরিবর্তনশীল কর।

৫. প্রচলিত বিমা কেন ইসলামে নিষিদ্ধ?

প্রচলিত বিমায় সুদ (রিবা), জুয়া (কিমার) এবং অনিশ্চয়তা ও ধোঁকা (গারার) বিদ্যমান থাকায় এটি ইসলামি শরিয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

৬. উশর কতটুকু ফসলে দিতে হয়?

বৃষ্টির পানিতে স্বাভাবিকভাবে উৎপাদিত ফসলের এক-দশমাংশ (১০%) এবং নিজস্ব সেচ ও অর্থ ব্যয়ে উৎপাদিত ফসলের বিশ ভাগের এক ভাগ (৫%) উশর হিসেবে আদায় করতে হয়।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *