ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: বাংলা (Bangla)
বিষয় কোড: 202104 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
২০২২ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের বাংলা (Bangla – 202104) পরীক্ষাটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, নির্বাচিত গদ্য, কবিতা এবং ব্যবহারিক ব্যাকরণের গভীর অনুধাবন মূল্যায়নের জন্য অনুষ্ঠিত হয়। প্রশ্নপত্রটি চারটি বিভাগে বিন্যস্ত: ক-বিভাগ (ইতিহাস – ২০ নম্বর), খ-বিভাগ (গদ্য – ২০ নম্বর), গ-বিভাগ (কবিতা – ২০ নম্বর) এবং ঘ-বিভাগ (ব্যবহারিক বাংলা ও ব্যাকরণ – ২০ নম্বর)। নিচে সকল প্রশ্নের সুবিন্যস্ত ও প্রামাণ্য উত্তরমালা দেওয়া হলো।
ক-বিভাগ: সাহিত্যের ইতিহাস (যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: মান ২০)
১। (ক) চর্যাপদে বাঙালি জীবন ধারার যে পরিচয় পাওয়া যায় তা আলোচনা কর।
ভূমিকা
চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদিমতম লিখিত নিদর্শন। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবারের রাজকীয় রয়্যাল লাইব্রেরি থেকে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধগান ও দোহা’ শিরোনামে চর্যাপদের পুথি আবিষ্কার করেন। চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের সাধনসংগীত হলেও রূপক ও প্রতীকের অন্তরালে তৎকালীন হাজার বছর পূর্বের আবহমান বাঙালি সমাজের বাস্তব জীবনচিত্র, দৈনন্দিন আচার-আচরণ, অর্থনৈতিক অনটন ও লৌকিক সংস্কৃতি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
চর্যাপদে বাঙালি সমাজ ও জীবনধারার প্রতিফলন
১. ভৌগোলিক পরিবেশ ও নদ-নদী: চর্যাপদের পদাবলিতে তৎকালীন পূর্ব ভারতের নদীমাতৃক বাংলার রূপ স্পষ্ট। গঙ্গা, যমুনা, নালা-বিল, খাল-ডোবা এবং নদী পারাপারের জন্য নৌকা ও সাঁকোর ব্যবহার হরহামেশা দেখা যায়। ডোম্বী পাড়ার মেয়েরা নৌকা বাইত এবং পারাপারের জন্য কড়ি (মুদ্রা) নেওয়ার কথাও পদাবলিতে উল্লিখিত আছে।
২. দৈনন্দিন পেশা ও জীবিকা: চর্যার পদকর্তারা সমাজের শ্রমজীবী নিম্নবর্ণের মানুষের পেশাকে রূপকের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পদগুলোতে শিকারি, ব্যাধ, জেলে, নৌকার মাঝি, তাঁতি, ডোম, শবর এবং চণ্ডাল শ্রেণির উল্লেখ পাওয়া যায়। শবররা বনে শিকার করে এবং ময়ূরপুচ্ছ পরে টিলায় টিলায় ঘুরে বেড়াত। ডোম নারীরা বাঁশ দিয়ে চাটাই ও তক্তপোষ বুনত।
৩. তীব্র দারিদ্র্য ও অনাহার: চর্যাপদের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী চিত্র হলো তৎকালীন অন্ত্যজ শ্রেণির সীমাহীন অর্থনৈতিক কষ্ট। কবি ঢেন্ধন পা তাঁর ৩৩ নম্বর পদে লিখেছেন:
“টালত মোর ঘর নাহি পড়বেসী।
হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী॥”
(পর্বতের টিলায় আমার নির্জন কুঁড়েঘর, কোনো প্রতিবেশী নেই। হাড়িতে কোনো ভাত নেই, অথচ প্রতিদিন ক্ষুধার্ত অতিথির ভিড়)। সাধারণ মানুষের নিঃস্ব ও বুভুক্ষু জীবনের এমন মর্মন্তুদ বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে বিরল।
৪. খাদ্যাভ্যাস ও মাদক সেবন: চর্যার মানুষের প্রধান খাদ্য ছিল ভাত, হরিণের মাংস, নদীর মাছ এবং বিভিন্ন ফলমূল। উৎসব-পার্বণে তীব্র নেশার জন্য মহুয়া ফুলের তৈরি চোলাই মদ কিংবা মাদকদ্রব্য সেবনের উল্লেখ রয়েছে (যেমন: “মাতাঙ্গী সুন্দরি তোরে কুড়িয়াঁ দিল মউলা ফুলরে”)।
৫. বিবাহরীতি ও সামাজিক আনন্দ-উৎসব: বরযাত্রীসহ বিয়ে এবং যৌতুক বা পণপ্রথার পরোক্ষ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিয়ের সময় ঢোলক, সানাই, মাদল ও বাদ্যযন্ত্রের সমারোহ হতো। নাচে-গানে ভরপুর ছিল তাদের সামাজিক উৎসব। নারী-পুরুষ একসঙ্গে নাচগান ও অভিনয়ে অংশ নিত।
৬. চৌর্যবৃত্তি ও প্রশাসনিক অনাচার: সমাজের বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতার চিত্রও পদগুলোতে পাওয়া যায়। রাতে ঘরে সিঁধ কেটে চুরি, প্রহরীর উপস্থিতি এবং চুরি ঠেকাতে কড়া পাহারার ব্যবস্থা নির্দেশ করে যে সমাজে শ্রেণিভেদ ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে অপরাধ প্রবণতাও বিদ্যমান ছিল।
উপসংহার
চর্যাপদ নিছক একটি ধর্মীয় তত্ত্বগ্রন্থ নয়; বরং ধর্মতত্ত্বের আড়ালে হাজার বছর আগের প্রাচীন বাংলার নদী, আকাশ, অরণ্য এবং দুঃখী শোষিত সাধারণ মানুষের হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিল। এটি প্রাচীন বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় উন্মোচনে শ্রেষ্ঠ সমাজতাত্ত্বিক সম্পদ।
১। (খ) অথবা, মধ্যযুগে মুসলিম কবিদের রচিত রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান কাব্য ধারার মূল্যায়ন কর।
ভূমিকা
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ছিল মূলত দেব-দেবী নির্ভর এবং মঙ্গলকাব্যের ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ। এই আধ্যাত্মিক ও অলৌকিক পরিবেশ থেকে বাংলা সাহিত্যকে মুক্ত করে মানুষের ইহজাগতিক প্রেম, রূপলাবণ্য এবং মিলনের বাস্তব আকুতিকে উপজীব্য করে মুসলিম কবিগণ যে অনন্য কাব্যধারার সূচনা করেন, তা বাংলা সাহিত্যে ‘রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান’ নামে খ্যাত। মধ্যযুগের মুসলিম কবিরাই প্রথম দেব-দেবীর অলৌকিক মহিমা পরিহার করে রক্তমাংসের মানুষকে সাহিত্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের সাধারণ বৈশিষ্ট্য
১. ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক প্রেম: এই ধারার প্রধান সুর হলো নর-নারীর বিশুদ্ধ পার্থিব প্রেম। কোনো অলৌকিক দেব-দেবীর কৃপা বা শাপে নয়, বরং রূপদর্শন, পরিচয় ও বিরহের মধ্য দিয়ে এই প্রেম পূর্ণতা লাভ করে।
২. উৎস ও অনুবাদ সাহিত্যের বৈচিত্র্য: অধিকাংশ প্রণয়োপাখ্যান পারস্য, আরব বা ভারতীয় লোকগাথা থেকে গৃহীত। তবে অনুবাদ নিছক আক্ষরিক ছিল না; কবিরা একে দেশজ বাঙালি আবহ ও গ্রামীণ সংবেদনশীলতায় অলংকৃত করেছিলেন।
৩. নারীর স্বতন্ত্র রূপায়ণ: রোমান্টিক কাব্যে নারী চরিত্রগুলো কেবল পুরুষের অনুগামী নয়, বরং তেজস্বিনী, প্রেমনিষ্ঠ ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন হিসেবে চিত্রিত (যেমন: পদ্মাবতী, জুলেখা, লায়লী, ময়না)।
প্রধান মুসলিম কবি ও তাঁদের অমর সৃষ্টিসমূহ
১. শাহ মুহম্মদ সগীর: গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালে (১৩৮৯-১৪১০ খ্রি.) তিনি রচনা করেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রণয়োপাখ্যান ‘ইউসুফ-জুলেখা’। কুরআন মাজিদের ‘আহসানুল কাসাস’ বা শ্রেষ্ঠ কাহিনির পটভূমিতে এবং ফেরদৌসী-জামির কাব্যের অনুপ্রেরণায় রচিত হলেও এটি মানবীয় প্রেমের এক অপূর্ব অনুপম নিদর্শন। তিনিই বাংলা সাহিত্যের প্রথম পরিচিত মুসলিম কবি।
২. দৌলত উজির বাহরাম খান: চট্টগ্রাম অঞ্চলের এই কবি পারস্যের কবি জামির কাব্য অবলম্বনে রচনা করেন ‘লায়লী-মজনু’। কায়েস ও লায়লীর নিঃস্বার্থ, পবিত্র ও বিরহকাতর প্রেমের বর্ণনায় তাঁর কাব্য মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পসৃষ্টি।
৩. সাবিরিদ খান: ষোড়শ শতকের কবি সাবিরিদ খান রচনা করেন ‘হানিফা ও কয়রাপরী’, ‘বিদ্যাসুন্দর’ এবং ‘রসুলবিজয়’। তাঁর কাব্যে প্রেম ও বীররসের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে।
৪. দৌলত কাজী: আরাকান (রোসাং) রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য ‘সতী ময়না ও লোর-চন্দ্রানী’। সাধন ভোজপুরী কাব্যের ছায়া অবলম্বনে রচিত এ কাব্যে বারোমাস্যা ও বিরহ বর্ণনায় তিনি অসামান্য কাব্যপ্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর অকালমৃত্যুতে কাব্যটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
৫. মহাকবি আলাওল: সপ্তদশ শতকের আরাকান রাজসভার শ্রেষ্ঠ কবি আলাওল। দৌলত কাজীর অসমাপ্ত ‘সতী ময়না ও লোর-চন্দ্রানী’ সমাপ্ত করার পাশাপাশি তিনি মালিক মুহম্মদ জায়সীর হিন্দি পদুমাবৎ অবলম্বনে রচনা করেন বিশ্বখ্যাত রোমান্টিক মহাকাব্য ‘পদ্মাবতী’ (১৬৪৬-১৬৫১ খ্রি.)। এছাড়া তিনি ‘সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল’, ‘হপ্তপয়কর’, ‘তোহফা’ ও ‘সিকান্দরনামা’ রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেন। তাঁর ভাষা ছিল সংস্কৃতানুসারী, অলংকৃত ও বুদ্ধিবৃত্তিক।
৬. মুহম্মদ কবীর: তিনি রচনা করেন জনপ্রিয় প্রেমকাব্য ‘মধুমালতী’। মনোহর ও মধুমালতীর প্রেমের মধ্য দিয়ে অপার্থিব সাধনা ও লৌকিক আকুতির চমৎকার মেলবন্ধন ঘটান।
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
মধ্যযুগে মুসলিম কবিদের রচিত প্রণয়োপাখ্যান বাংলা সাহিত্যকে ধর্মীয় সংস্কার ও কূপমণ্ডূকতা থেকে মুক্ত করে আধুনিক সাহিত্যের পথ রচনা করেছিল। রক্তমাংসের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আবেগ, প্রণয়পীড়িত হৃদয়ের হাহাকার এবং দেশজ সৌন্দর্যবোধকে ধারণ করে এই কাব্যধারা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের কাতারে সম্মানিত করেছে।
২। (ক) বাংলা গদ্যের বিকাশে মুসলিম সাহিত্যিকদের ভূমিকা মূল্যায়ন কর।
ভূমিকা
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০ খ্রি.) এবং শ্রীরামপুর মিশনের পণ্ডিত ও পাদ্রিদের মাধ্যমে বাংলা গদ্যের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। প্রাথমিক পর্বে বাংলা গদ্য ছিল অতিরিক্ত সংস্কৃতঘেঁষা এবং মুসলিম সমাজ ও সংস্কৃতির ভাবধারা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে মুসলিম সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের বলিষ্ঠ পদচারণায় বাংলা গদ্য সর্বজনীন, গতিশীল, প্রাঞ্জল ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। আধুনিক সমাজচেতনা, জাতীয় জাগরণ ও মননশীলতার উন্মেষে মুসলিম গদ্যকারদের অবদান অনস্বীকার্য।
প্রধান মুসলিম গদ্যকার ও তাঁদের বিশিষ্ট অবদান
১. মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১): আধুনিক বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক ও জনপ্রিয় মুসলিম সাহিত্যিক। তাঁর রচিত অমর মহাকাব্যিক গদ্যগ্রন্থ ‘বিষাদ-সিন্ধু’ (১৮৮৫-১৮৯১) কারবালার বিষাদময় ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির ওপর ভিত্তি করে রচিত হলেও তা বাঙালি হৃদয়ের চিরন্তন বেদনাকাব্যে পরিণত হয়েছে। এছাড়া তিনি নীলকরদের অত্যাচার নিয়ে লিখেছেন প্রথম মুসলিম রচিত নাটক ‘জমিদার দর্পণ’ (১৮৭৩), সামাজিক প্রহসন ‘বসন্তকুমারী’ এবং আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমার জীবনী’ ও ‘গাজী মিয়াঁর বস্তানী’। তাঁর গদ্য প্রাঞ্জল, ভাবসমৃদ্ধ ও সংগীতময়।
২. মোজাম্মেল হক (১৮৬০-১৯৩৩): শান্ত, পরিচ্ছন্ন ও শিক্ষামূলক গদ্যের জন্য তিনি স্মরণীয়। তাঁর রচিত ‘হজরত মোহাম্মদ’ ও ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’র অনুবাদ তরুণ সমাজের নৈতিক বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করে।
৩. সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০-১৯৩১): মুসলিম জাতীয় জাগরণ ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অনলবর্ষী বাগ্মী। তাঁর ‘অনল প্রবাহ’ বাজেয়াপ্ত হলে তিনি কারাবরণ করেন। গদ্যে তিনি রচনা করেন ‘রায় নন্দিনী’, ‘তারেক বিজয়’, ‘তুর্কী নারী’ প্রভৃতি তেজোদৃপ্ত উপন্যাস। তাঁর গদ্যে গতিশীলতা, সাহস ও বীররসের প্রাধান্য স্পষ্ট।
৪. বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২): মুসলিম নারী শিক্ষা ও নারী জাগরণের অবিসংবাদিত অগ্রদূত। তাঁর তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক, যুক্তিনিষ্ঠ ও মানবতাবাদী গদ্য বাংলা সাহিত্যের স্থায়ী সম্পদ। ‘মতিচূর’ (১ম ও ২য় খণ্ড), ‘সুলতানার স্বপ্ন’ (Sultana’s Dream), ‘অবরোধ-বাসিনী’ এবং উপন্যাস ‘পদ্মরাগ’-এ তিনি সমাজের অচলায়তন ও পুরুষতান্ত্রিক ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করেছেন। তাঁর ভাষা ছিল শাণিত, আধুনিক ও মননশীল।
৫. কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬): তাঁর অমর উপন্যাস ‘আবদুল্লাহ’ (১৯৩২) তৎকালীন মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের কুসংস্কার, পিছুটান ও আধুনিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে সার্থক বাস্তববাদী গদ্যে ফুটিয়ে তুলেছে। কোনো আতিশয্য ছাড়া অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সুসংহত ভাষায় তিনি গদ্য রচনা করেছেন।
৬. মোহাম্মদ লুৎফর রহমান (১৮৮৯-১৯৩৬): মানবতাবাদী ও উন্নত চিন্তার প্রবক্তা। ‘উন্নত জীবন’, ‘মানব জীবন’, ‘মহৎ জীবন’ প্রভৃতি নীতিবাদী ও আত্মউন্নয়নমূলক প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি সহজ, সাবলীল ও পরিচ্ছন্ন বাংলা গদ্যের এক স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেন।
৭. মননশীল ও গবেষক গদ্যকারবৃন্দ: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর প্রামাণ্য ভাষাতাত্ত্বিক ও গবেষণামূলক প্রবন্ধের মাধ্যমে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। এস ওয়াজেদ আলী তাঁর ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ ও অন্যান্য প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক মানবতাবাদী গদ্যশৈলী উপহার দেন। এছাড়াও কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘যুগবাণী’, ‘রুদ্র-মঙ্গল’ ও ‘দুর্দিনের যাত্রী’ প্রবন্ধে বাংলা গদ্যকে অগ্নিবর্ষী বিপ্লবের হাতিয়ারে পরিণত করেন।
উপসংহার
মুসলিম সাহিত্যিকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাংলা গদ্য হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালি জাতির জীবন্ত ভাবপ্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে। ঐতিহ্যচেতনার সাথে আধুনিক মননশীলতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তাঁরা বাংলা গদ্যকে যে গতি ও ঐশ্বর্য দান করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
২। (খ) অথবা, বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান আলোচনা কর।
ভূমিকা
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলা সাহিত্যের এক ধূমকেতুসম বিস্ময়কর প্রতিভা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সংকটময় ঔপনিবেশিক ভারতে তাঁর আবির্ভাব বাংলা কাব্যজগতে অভূতপূর্ব বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল। পরাধীনতা, অন্যায়, সাম্প্রদায়িকতা ও শোষণের বিরুদ্ধে তিনি যেমন রুখে দাঁড়িয়েছেন বজ্রকণ্ঠে, তেমনি প্রেম, সৌন্দর্য ও মানবতার মহিমায় তিনি ছিলেন অতলান্ত সুধাকর।
নজরুলের বহুমুখী অবদান
১. বিদ্রোহী চেতনা ও মুক্তির প্রেরণা: ১৯২১ সালে রচিত তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলা কবিতার গতিপথ চিরতরে বদলে দেয় (“বল বীর—/ বল উন্নত মম শির! / শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রীর!”)। পরাধীন ভারতের মুক্তিকামী জনতার মনে তাঁর কবিতা আত্মবিশ্বাস ও বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়েছিল। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নি-বীণা’ (১৯২২) প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে ব্রিটিশ রাজশক্তির ভিত্তি কেঁপে ওঠে। ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙ্গার গান’, ‘প্রলয়োল্লাস’ প্রভৃতি কবিতায় তিনি মুক্তির দামামা বাজিয়েছেন।
২. সাম্যবাদ ও মানবতাবাদ: নজরুল ছিলেন মানবতার শ্রেষ্ঠ পূজারি। তাঁর ‘সাম্যবাদী’ ও ‘সর্বহারা’ কাব্যে তিনি কৃষক, মজুর, কুলি ও বারাঙ্গনাদের সমান মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন:
“গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!”
নারী-পুরুষের সমান অধিকারের প্রশ্নে তাঁর ‘নারী’ কবিতা এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল (“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, / অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”)।
৩. অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মিলনসাধনা: নজরুল ছিলেন হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির জীবন্ত প্রতীক। একদিকে তিনি ইসলামী ভাবধারার না’ত, হামদ ও জাগরণমূলক গান রচনা করেছেন, অন্যদিকে শ্যামাসংগীত ও কীর্তন রচনা করে বাংলার উভয় সম্প্রদায়ের অন্তরে সমান আসন লাভ করেছেন। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে তিনি আজীবন আপসহীন সংগ্রাম করেছেন।
৪. বাংলা সংগীতে নজরুলের একক সাম্রাজ্য: নজরুল প্রায় তিন সহস্রাধিক গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন, যা ‘নজরুল গীতি’ নামে পরিচিত। তিনি বাংলা সংগীতে রাগপ্রধান উচ্চাঙ্গ সংগীত এবং মধ্যপ্রাচ্যের গজলকে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে সমন্বয় করেন। সংগীতের সুর ও বাণীর এমন বৈচিত্র্য বিশ্বসংগীতেও বিরল।
৫. কথাসাহিত্য, নাটক ও সাংবাদিকতা: কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্যে তাঁর অবদান অনবদ্য। উপন্যাস ‘বাঁধন-হারা’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘কুহেলিকা’; গল্পগ্রন্থ ‘ব্যথার দান’, ‘রিক্তের বেদন’, ‘শিউলিমালা’ এবং নাটক ‘ঝিলিমিলি’, ‘আলেয়া’ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। সাংবাদিকতায় তিনি ‘ধূমকেতু’ ও ‘লাঙ্গল’ পত্রিকার মাধ্যমে কৃষক-শ্রমিকের অধিকারের কথা তুলে ধরেন।
উপসংহার
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যকে অভিজাত ড্রয়িংরুম থেকে টেনে এনে মেহনতি মানুষের জীবনের সাথে একাত্ম করেছিলেন। তাঁর অমর সৃষ্টিসম্ভার অনন্তকাল ধরে নিপীড়িত মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এবং ভালোবাসায় জীবনকে সাজানোর প্রেরণা জোগাবে।
খ-বিভাগ: নির্বাচিত গদ্য (যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: মান ২০)
৩। (ক) হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধে বাস্তবতার যে চিত্র ফুটে উঠেছে তার পরিচয় দাও।
ভূমিকা
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১) রচিত ‘তৈল’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ক্লাসিক সমাজতাত্ত্বিক ও ব্যঙ্গধর্মী প্রবন্ধ। আপাতদৃষ্টিতে তৈলের উপযোগিতা ও ব্যবহার বর্ণনার মধ্য দিয়ে প্রাবন্ধিক তৎকালীন ভারতীয় ও বাঙালি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, তোষামোদপ্রিয়তা এবং স্বার্থপরতার নির্মম বাস্তবতাকে অত্যন্ত শাণিত ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
প্রবন্ধে প্রতিফলিত বাস্তবতার রূপ
১. তোষামোদ বা তৈলমর্দনই সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি: প্রাবন্ধিক অত্যন্ত নির্মোহভাবে উল্লেখ করেছেন যে সমাজে মেধা, সততা বা বিদ্যাবুদ্ধির চেয়ে তোষামোদ করার ক্ষমতা বা তৈলপ্রদানের দক্ষতাই ব্যক্তির উন্নতির প্রধান কারণ। যিনি তৈল দিতে পারেন, তিনি সহজেই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন; আর যিনি তা পারেন না, তিনি যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সমাজে কোণঠাসা হয়ে থাকেন।
২. সর্বজনীন প্রয়োজনীয়তা ও বৈষম্যহীন ব্যবহার: তৈল এমন একটি সার্বজনীন বস্তু যা রাজা থেকে প্রজা, পণ্ডিত থেকে মূর্খ—সবার কাছেই সমানভাবে কার্যকর। ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের মন জয় করতে অধীনস্থরা কীভাবে স্বীয় আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে তৈলমর্দনে লিপ্ত হয়, তার বাস্তব চিত্র প্রবন্ধে অঙ্কিত হয়েছে।
৩. ঔপনিবেশিক দাসত্ব ও ব্রিটিশ শাসনের তোষণনীতি: তৎকালীন পরাধীন ভারতে দেশীয় মানুষ কীভাবে পদোন্নতি, খেতাব ও সুযোগ-সুবিধা লাভের আশায় শ্বেতাঙ্গ ইংরেজ শাসকদের পদতলে তৈল ঢালত, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী অত্যন্ত সূক্ষ্ম তির্যক হাসির অন্তরালে সেই দাসসুলভ মানসিকতাকে উন্মোচিত করেছেন।
৪. মানবচরিত্রের দ্বিমুখী ভণ্ডামির স্বরূপ: মানুষ মুখে সততা ও নীতির বুলি আওড়ালেও অন্তরে তোষামোদ শুনতে ভালোবাসে। স্তাবকতা পছন্দ করে না এমন মানুষ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রাবন্ধিকের এই পর্যবেক্ষণ আধুনিক সমাজেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
উপসংহার
‘তৈল’ কেবল কৌতুকরসের রচনা নয়, বরং এটি সমাজদেহে বাসা বাঁধা ভণ্ডামি, সুবিধাবাদ ও নৈতিক দেউলিয়াত্বের বিরুদ্ধে এক তীব্র চাবুক। হাসির খোরাক জোগাতে জোগাতে প্রাবন্ধিক পাঠককে আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন।
৩। (খ) অথবা, সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পাদটীকা’ গল্পে যে নির্মম সত্য প্রকাশ করেছেন তার স্বরূপ বিশ্লেষণ কর।
ভূমিকা
বহুভাষাবিদ ও প্রখ্যাত রম্যরচয়িতা সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪)-এর অন্যতম অবিস্মরণীয় ছোটগল্প ‘পাদটীকা’। আপাতদৃষ্টিতে শান্তিনিকেতন আশ্রমের স্মৃতিচারণ ও কৌতুকাবহ বয়ান মনে হলেও গল্পটির গভীরে প্রচ্ছন্ন রয়েছে সমাজের মেকি ডিগ্রিধারীদের দাপট এবং প্রকৃত জ্ঞানসাধক শিক্ষকদের প্রতি সমাজের চরম অবহেলা ও হৃদয়হীনতার এক নির্মম জীবনবাস্তবতা।
গল্পে প্রকাশিত নির্মম সত্যের বিভিন্ন মাত্রা
১. পণ্ডিত মশাইদের প্রান্তিক ও অবহেলিত অবস্থান: গ্রন্থের মূল টেক্সটের নিচে যেমন গুরুত্বহীন অতিরিক্ত ব্যাখ্যার জন্য ‘পাদটীকা’ (Footnote) ক্ষুদ্রাক্ষরে পড়ে থাকে, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে আদর্শ দেশীয় পণ্ডিতদের অবস্থানও ছিল মূলধারার বাইরে নিছক একটি পাদটীকা সদৃশ। গল্পে পণ্ডিত মশাইয়ের জীর্ণ চটি, দারিদ্র্যপীড়িত পোশাক এবং সামান্য বেতনের চিত্র সেই বঞ্চনাকেই মূর্ত করে তোলে।
২. বিদেশি ডিগ্রি ও বিলাতি অন্ধানুকরণের ভণ্ডামি: গল্পের অন্যতম প্রধান মর্মান্তিক দিক হলো সমাজে অভ্যন্তরীণ মেধার চেয়ে বাহ্যিক ও পাশ্চাত্য ডিগ্রির অযৌক্তিক পূজা। ইউরোপ-আমেরিকা থেকে নামকাওয়াস্তে ডিগ্রিধারী ব্যক্তিরা বিপুল সম্মান ও মোটা বেতন পেলেও আজীবন শাস্ত্র ও জ্ঞানচর্চায় নিবেদিত পণ্ডিতদের কোনো সামাজিক মূল্যায়ন ছিল না।
৩. কর্তৃপক্ষের হৃদয়হীন আচরণ ও অর্থনৈতিক লাঞ্ছনা: বিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও ধনী অভিভাবকরা পণ্ডিত মশাইকে মানুষ বলে গণ্য করতেও কুণ্ঠাবোধ করতেন। সামান্য বেতন বৃদ্ধির জন্য তাঁকে যে মানসিক যন্ত্রণা ও অপমান সহ্য করতে হতো, তা লেখকের অন্তরে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
৪. হাস্যরসের অন্তরালে ট্র্যাজিক হাহাকার: মুজতবা আলীর রচনার প্রধান কৌশল হলো কান্নার কথা হাসির ছলে বলা। পণ্ডিত মশাইয়ের ব্যাকরণ পড়ানোর বিচিত্র ভঙ্গি ও ছাত্রদের সঙ্গে কথোপকথন একদিকে কৌতুক সৃষ্টি করে, কিন্তু পাঠশেষে পাঠকের অন্তরে এক গভীর বিষাদ ও অপরাধবোধের সৃষ্টি হয়।
উপসংহার
‘পাদটীকা’ গল্পের মাধ্যমে সৈয়দ মুজতবা আলী সমাজের শিক্ষা-সচেতনতার শূন্যগর্ভ রূপ এবং শিক্ষক সমাজের প্রতি চরম অবজ্ঞার যে রূপ উন্মোচন করেছেন, তা কেবল বিগত শতাব্দীর নয়; বরং আজও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক জীবন্ত ও নির্মম প্রতিচ্ছবি।
৪। (ক) ছোট গল্পের বৈশিষ্ট্য বিচারে কাজী নজরুলের ‘শিউলিমালা’ গল্পের সার্থকতা বিশ্লেষণ কর।
ভূমিকা
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রধানত কবি হিসেবে স্মরণীয় হলেও কথাসাহিত্যেও তিনি গভীর সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ ‘শিউলিমালা’র নামগল্প ‘শিউলিমালা’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নন্দিত প্রেমের ছোটগল্প। ছোটগল্পের তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও শৈল্পিক মানদণ্ডে বিচার করলে গল্পটি এক অনন্য সার্থক সৃষ্টি হিসেবে প্রতিভাত হয়।
ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ ও ‘শিউলিমালা’য় তার প্রতিফলন
১. আয়তনের সংক্ষেপণ ও একক লক্ষ্যমুখী ভাব: ছোটগল্পের প্রধান শর্ত হলো এটি আকারে সংক্ষিপ্ত হবে এবং জীবনের একটি বিশেষ মুহূর্ত বা একটি মাত্র কেন্দ্রীয় ভাবকে ধারণ করবে। ‘শিউলিমালা’য় কোনো অবান্তর কাহিনির বিস্তার নেই; বরং শিউলি ও তার প্রণয়ী শেফালির মধ্যকার নীরব, আত্মত্যাগময় প্রণয়ভাবনাই গল্পের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু।
২. নাটকীয় সূচনা ও দ্রুত পরিণতি: গল্পের প্রারম্ভেই একটি মৃদু বিষাদের সুর ধ্বনিত হয় এবং কোনো দীর্ঘ ভূমিকা ছাড়াই পাঠক মূল চরিত্রের আবেগের সাথে পরিচিত হন। পরিণতিতেও ঘটনার দীর্ঘায়িত সমাধান না রেখে দ্রুত ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে সমাপ্তি ঘটে।
৩. চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণ: ছোটগল্পে ঘটনার চেয়ে চরিত্রের অন্তর্জগতের টানাপোড়েন বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ‘শিউলিমালা’ গল্পে নায়িকা শিউলির কোমল হৃদয়, প্রেমের গভীর অনুভূতি এবং সামাজিক বাস্তবতা ও আত্মমর্যাদার কারণে নীরব আত্মাহুতির দ্বন্দ্ব অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতায় অঙ্কিত হয়েছে।
৪. সংগীতময় ভাষা ও রোমান্টিক আবহ: নজরুলের ভাষার প্রধান সম্পদ তাঁর অন্তর্লীন কাব্যিক সুর। গল্পের বর্ণনায় সুরের মূর্ছনা, শিউলি ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ এবং শরতের স্নিগ্ধ প্রকৃতি মিলে এক অপূর্ব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আবহ তৈরি করেছে।
৫. অতৃপ্তিময় সার্থক সমাপ্তি: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় ছোটগল্পের ধর্ম হলো: “শেষ হইয়াও হইল না শেষ।” ‘শিউলিমালা’ গল্পের শেষে নায়ক-নায়িকার প্রথাগত মিলন ঘটেনি; বরং এক অপার্থিব নীরব বেদনা ও অনন্ত শূন্যতার মাঝে গল্পটি শেষ হয়েও পাঠকের হৃদয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকে।
উপসংহার
গঠনশৈলী, রূপক দ্যোতনা, মনস্তাত্ত্বিক সংহতি এবং অতৃপ্তিময় কাব্যিক সমাপ্তির বিচারে কাজী নজরুলের ‘শিউলিমালা’ বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে এক পরম সার্থক ও উৎকৃষ্ট সৃষ্টি।
৪। (খ) অথবা, রবীন্দ্রনাথের ‘সমাপ্তি’ গল্পে মানব জীবনের সঙ্গে বিশ্ব প্রকৃতির যে নিগূঢ় সম্পর্ক প্রত্যক্ষ করা যায়, তা আলোচনা কর।
ভূমিকা
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্পের এক অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য হলো মানব মনের সূক্ষ্ম অনুভূতির সাথে বিশ্বপ্রকৃতির নিগূঢ় ও রহস্যময় ঐকতান। তাঁর রচিত অমর ছোটগল্প ‘সমাপ্তি’-তে চঞ্চল, বাঁধনহারা গ্রাম্য বালিকা ‘মৃন্ময়ী’র বুনো স্বভাব এবং পরবর্তীকালে গৃহবধূ হিসেবে তার মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনে প্রকৃতি এক অনন্য জীবন্ত অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
মানব জীবন ও বিশ্বপ্রকৃতির নিগূঢ় সম্পর্কের স্বরূপ
১. মৃন্ময়ীর চরিত্রের সাথে উন্মুক্ত প্রকৃতির একাত্মতা: গল্পের প্রথমার্ধে মৃন্ময়ী যেন নদীর অবাধ জলধারা, দুরন্ত বাতাস ও অরণ্যের মুক্ত বিহঙ্গ। কোনো সামাজিক শৃঙ্খল বা কৃত্রিম শিষ্টাচার তাকে বাঁধতে পারেনি। সে নদীর ঘাটে ছোটাছুটি করে, গাছে চড়ে এবং বুনো হরিণীর মতো মুক্ত বিহ্বলতায় মেতে থাকে। প্রকৃতির উন্মুক্ততাই ছিল মৃন্ময়ীর প্রকৃত সত্তা।
২. অপূর্বর দৃষ্টিতে প্রকৃতির মূর্ত রূপ মৃন্ময়ী: কলকাতার শহুরে বিএ পাস তরুণ অপূর্ব যখন গ্রামে আসে, তখন সে প্রচলিত লক্ষ্মী শান্ত স্বভাবের পাত্রী না খুঁজে মৃন্ময়ীর এই বুনো, সতেজ ও প্রাণবন্ত রূপের প্রেমে পড়ে। অপূর্ব মৃন্ময়ীর মধ্যে পল্লীপ্রকৃতির অকৃত্রিম শ্যামল সৌন্দর্য ও প্রাণচাঞ্চল্য প্রত্যক্ষ করেছিল।
৩. প্রকৃতির রূপান্তরের সাথে মনের রূপান্তর: বিবাহের পর মৃন্ময়ীকে যখন অন্তঃপুরের চার দেয়ালে বন্দি করা হয়, তখন সে খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ছটফট করতে থাকে এবং বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। কিন্তু অপূর্ব যখন তাকে আঘাত না করে ভালোবাসার স্বাধীনতায় ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় চলে যায়, তখন নিঃসঙ্গ বর্ষার বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতি ও নদীর নীরবতা মৃন্ময়ীর হৃদয়ে ভালোবাসার অঙ্কুরোদগম ঘটায়। প্রকৃতির মৌনতাই তার ভেতরের ঔদ্ধত্য দূর করে ভালোবাসার পিপাসা জাগিয়ে তোলে।
৪. ঝড়-বৃষ্টি ও পুনর্মিলন: গল্পের সমাপ্তি পর্বে অন্ধকার রাতের প্রতিকূল প্রকৃতি, বৃষ্টি ও ঝড় মৃন্ময়ীর আকুলতাকে তীব্রতর করে তোলে। অবশেষে অপূর্বর ঘরে ফিরে এসে মৃন্ময়ীর গভীর আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়ে বুনো প্রকৃতির চপলতা এক শান্ত, গম্ভীর ও পরিপূর্ণ নারীহৃদয়ে রূপ লাভ করে।
উপসংহার
‘সমাপ্তি’ গল্পে প্রকৃতি কেবল পটভূমি হিসেবে আসেনি; বরং মানবমনের বিবর্তন, আবেগ ও প্রেমের উন্মেষের জীবন্ত অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে। মানুষ ও প্রকৃতির এই নিগূঢ় রসায়নই গল্পটিকে রবীন্দ্রসাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় শিল্পকর্মে পরিণত করেছে।
গ-বিভাগ: নির্বাচিত কবিতা (যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: মান ২০)
৫। (ক) ‘উমর ফারুক’ কবিতা অবলম্বনে হযরত উমর ফারুক (রা)-এর মহত্ত্বের পরিচয় দাও।
ভূমিকা
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘উমর ফারুক’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য মহাকাব্যিক ও আদর্শবাদী কবিতা। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ফারুক (রা)-এর অতুলনীয় ন্যায়পরায়ণতা, আত্মমর্যাদাবোধ, অপরিসীম প্রজাবাৎসল্য এবং বিশ্বমানবতার অনন্য রূপ কবি অত্যন্ত আবেগঘন ও সাবলীল ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
হযরত উমর ফারুক (রা)-এর মহত্ত্বের বিভিন্ন দিক
১. সাম্য ও ইনসাফের মূর্ত প্রতীক: উমর (রা) ছিলেন অর্ধপৃথিবীর পরাক্রমশালী শাসক, রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের ত্রাস; অথচ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন পরম বিনয়ী। জেরুজালেম অভিযানের সময় উটের পিঠে ভৃত্যকে বসিয়ে নিজে মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর উটের রশি ধরে হেঁটে যাওয়ার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি বিশ্বশাসকদের সামনে সাম্যবাদের অমর পাঠ রেখে গেছেন।
২. প্রজাবাৎসল্য ও গভীর দায়িত্ববোধ: রাতের আঁধারে ছদ্মবেশে প্রজাদের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের দুঃখ-কষ্টের খোঁজ নিতেন। অনাহারক্লিষ্ট এতিম শিশুদের কান্নার শব্দ শুনে নিজে বায়তুল মাল থেকে আটার বস্তা কাঁধে বহন করে এনে তাদের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছিলেন। কবি লিখেছেন:
“উমর! তোমার নাম শুনে আজো কাপে যে দুনিয়া ত্রাসে,
তুমি শুয়ে আছ সামান্য এক খেজুর পাতার বাসে!”
৩. কঠোর আত্মশুদ্ধি ও খোদাভীতি: তিনি বলতেন, ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি অনাহারে মারা যায়, তবে কিয়ামতের দিন খলিফা উমরকে তার জন্য আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। তাঁর হৃদয়ে আল্লাহর ভয় এতটাই গভীর ছিল যে নিজের স্বার্থে বায়তুল মালের এক কানাকড়িও ভোগ করতেন না।
৪. ইসলাম ও মানবতার বিজয় কেতন: অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের যুগে হযরত উমরের ইসলাম গ্রহণ ছিল সত্য ও ন্যায়ের মহান বিজয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ‘আল-ফারুক’ বা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। কবি নজরুল বর্তমান শোষিত ও পথহারা মুসলিম সমাজকে পুনরুজ্জীবিত করতে উমরের মতো নির্ভীক, পরোপকারী ও মহান নেতার আবির্ভাব কামনা করেছেন।
উপসংহার
‘উমর ফারুক’ কবিতাটি কেবল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের প্রশস্তিগীতি নয়; বরং এটি একজন প্রকৃত গণমানুষের শাসক, ইনসাফভিত্তিক সমাজব্যবস্থা এবং মানবতার চিরন্তন আদর্শের জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
৫। (খ) অথবা, ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার মূলভাব নিজের ভাষায় লেখ।
ভূমিকা
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নাগরিক কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও কালোত্তীর্ণ সৃষ্টি ‘স্বাধীনতা তুমি’। ১৯৭১ সালের রক্তঝরা মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে অবরুদ্ধ স্বদেশের নির্যাতিত বাস্তবতায় বসে কবি কবিতাটি রচনা করেন। তাঁর বিখ্যাত ‘বন্দী শিবির থেকে’ (১৯৭২) কাব্যগ্রন্থে সংকলিত এই কবিতাটি স্বাধীনতা সম্পর্কে বাঙালির আশা, স্বপ্ন, স্মৃতি ও রক্তিম আত্মত্যাগের এক অনন্য রূপক মহাকাব্য।
কবিতার মূলভাব ও শিল্পরূপ
১. স্বাধীনতার রূপক ও অনুভূতির বিস্তার: কবি স্বাধীনতাকে কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় আবদ্ধ রাখেননি; বরং বাঙালি জীবনের প্রতিটি আনন্দের মুহূর্ত, নান্দনিক সৃষ্টি এবং সাংস্কৃতিক চেতনায় স্বাধীনতাকে মূর্ত করে তুলেছেন। স্বাধীনতা বাঙালির স্মৃতি, বর্তমানের সংগ্রাম এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নকে ধারণ করে আছে।
২. সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধন: রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের অবিনাশী গানের সুরের মধ্যেই কবি স্বাধীনতাকে প্রত্যক্ষ করেছেন:
“স্বাধীনতা তুমি
রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।
স্বাধীনতা তুমি
কাজী নজরুল, ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো
মহান পুরুষ, সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে কাঁপা…”
বাঙালির হাজার বছরের আবহমান সাহিত্য ও শিল্পচেতনা স্বাধীনতার রক্তে প্রবাহিত।
৩. সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও প্রকৃতির রূপক: স্বাধীনতা কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা নয়; স্বাধীনতা হলো রৌদ্রদগ্ধ দুপুরের কৃষকের মিষ্টি হাসি, নদীতে মাঝির ভাটিয়ালি গানের সুর, উঠোনে গৃহবধূর রোদে মেলা সুবাসিত ধান এবং মেঠোপথে খালি পায়ে হেঁটে চলা শিশুদের উল্লাস। প্রকৃতির প্রতিটি ঘাস ও পল্লীর নিস্তব্ধতায় স্বাধীনতা জড়িয়ে আছে।
৪. শহীদের রক্ত ও আত্মত্যাগের শপথ: স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে রয়েছে কোটি বাঙালির রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও শহীদ ভাইয়ের আত্মত্যাগ। বোনের চোখের জল এবং পিতার বেদনার্ত বুকের গভীরেই রচিত হয়েছে মুক্তির এই অবিনাশী ঠিকানা।
উপসংহার
‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় কবি শামসুর রাহমান চিত্রকল্পের অনবদ্য সমাহারে স্বাধীনতাকে প্রতিটি বাঙালির শ্বাস-প্রশ্বাস ও আত্মার অংশে পরিণত করেছেন। স্বদেশপ্রেম, জাতিসত্তার অহংকার ও চিরন্তন মুক্তির আকুলতায় ভাস্বর এই কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক চিরন্তন অমূল্য সম্পদ।
৬। (ক) ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতা অবলম্বনে বাংলার অপরূপ সৌন্দর্যের পরিচয় দাও।
ভূমিকা
প্রখ্যাত কবি ও চিন্তাবিদ সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০১০) রচিত ‘আমার পূর্ব বাংলা’ স্বদেশপ্রেম ও রূপসী বাংলার রূপলাবণ্যে ভরপুর এক অনন্য লিরিকধর্মী কবিতা। কবি এই কবিতায় দেশমাতৃকার মাটি, নদী, আকাশ এবং গ্রামীণ সৌন্দর্যের এমন এক অখণ্ড চিত্রপট অঙ্কন করেছেন যা প্রতিটি দেশপ্রেমিক বাঙালির হৃদয়কে আলোড়িত করে।
কবিতা অবলম্বনে বাংলার অপরূপ রূপসৌন্দর্য
১. নদীমাতৃক রূপ ও পলির সুবাস: পূর্ব বাংলা মূলত নদী ও জলের দেশ। কবি মেঘনা, পদ্মা, শীতলক্ষ্যা ও তাদের অসংখ্য উপনদীর কলতানকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ধারণ করেছেন। বর্ষার প্লাবনে জেগে ওঠা পলিমাটির সুবাস এবং ধানের খেতে বাতাসের ঢেউ বাংলার নদীকেন্দ্রিক সৌন্দর্যকে অপার মহিমায় ভরিয়ে তুলেছে।
২. সবুজ শ্যামলিমা ও ঋতুর রূপবদল: কবি বাংলার শ্যামল বনানী, বাঁশঝাড়, সুপারি বাগান এবং দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠের রূপ বর্ণনা করেছেন। শিশিরভেজা সকাল, মিষ্টি রোদের দুপুর এবং গোধূলির রক্তিম আকাশ বাংলার চিরন্তন লাবণ্যের সাক্ষ্য দেয়।
৩. মাতৃরূপী স্বদেশ ও ভালোবাসার গভীরতা: কবি পূর্ব বাংলাকে কেবল একখণ্ড ভূগোল হিসেবে দেখেননি; বরং তাকে দেখেছেন এক মমতাময়ী জননী হিসেবে। যার কোল জুড়ে রয়েছে অপার শান্তি এবং যে মা তার সন্তানকে ফল, ফুল ও স্নেহের অবারিত ধারায় সিক্ত করে রাখে।
৪. শব্দচয়ন ও রূপকের মাধুর্য: সৈয়দ আলী আহসানের শব্দচয়ন অত্যন্ত স্নিগ্ধ, পরিশীলিত ও শ্রুতিমধুর। কবিতার প্রতিটি চরণে বাংলার মাটি ও মানুষের আত্মিক স্পন্দন প্রতিধ্বনিত হয়েছে, যা পাঠককে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের জগতে নিয়ে যায়।
উপসংহার
‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতাটি বাংলার নৈসর্গিক রূপের এক অমর দলিল। কবি প্রকৃতির নিখুঁত রূপায়নের মধ্য দিয়ে বাঙালির আত্মপরিচয় এবং মাটির প্রতি পরম ভালোবাসার এক অবিস্মরণীয় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছেন।
৬। (খ) অথবা, “‘বনলতা সেন’ একটি অনন্য আধুনিক বাংলা কবিতা”—উক্তিটির যথার্থ বিচার বিশ্লেষণ কর।
ভূমিকা
রূপসী বাংলার কবি ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)-এর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘বনলতা সেন’ (১৯৪২)। আধুনিক মানুষের ক্লান্তি, একাকীত্ব, ঐতিহাসিক দূরবীক্ষণ এবং শান্তির অন্বেষণে রচিত এই কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ও অতুলনীয় শিল্পকীর্তি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।
আধুনিক কবিতা হিসেবে ‘বনলতা সেন’-এর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. ঐতিহাসিক চেতনা ও কালিক বিস্তার: আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো ব্যক্তিসত্তাকে ইতিহাসের সুবিশাল পটভূমিতে স্থাপন করা। কবি নিজেকে এক অনন্ত পথিকের ভূমিকায় উপস্থাপন করেছেন যিনি হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে হেঁটে চলেছেন:
“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে…”
সিংহল, মালয়, বিম্বিসার, অশোক এবং বিদর্ভ নগরের ইতিহাস ও দূরত্বের বিস্তার আধুনিক কবিতার কল্পনাকে এক মহাজাগতিক মাত্রা দান করেছে।
২. আধুনিক নাগরিক জীবনের ক্লান্তি ও নিঃসঙ্গতা: প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আধুনিক মানুষের জীবনে যে চরম হতাশা, একাকীত্ব ও আত্মিক ক্লান্তি নেমে এসেছিল, কবি তাকে ব্যক্ত করেছেন গভীর সংবেদনশীলতায়। জীবন সমুদ্রের ফেনিল ঘূর্ণাবর্তের মাঝে কবি খুঁজে ফিরেছেন ক্ষণিক শান্তি ও আশ্রয়।
৩. প্রকৃতি ও নারীর অনবদ্য মেলবন্ধন: ‘বনলতা সেন’ কোনো রক্তমাংসের পার্থিব নারীমাত্র নয়; সে হলো সমস্ত ক্লান্তি দূরকারী এক চিরন্তন শান্তির প্রতীক ও শিল্পসত্তা। কবি তার রূপ বর্ণনা করেছেন প্রকৃতির অবিস্মরণীয় উপমায়:
“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ‘পর
হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা…”
বিদিশার নিশা, শ্রাবস্তীর কারুকার্য এবং দারুচিনি দ্বীপের চিত্রকল্প বাংলা কবিতায় সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব ও অনন্য।
৪. সুর ও ছন্দের যাদুকরী মোহময়তা: কবিতাটির প্রবহমান অক্ষরবৃত্ত ছন্দ, শব্দবিন্যাস এবং মৃদু সুরের দোলা পাঠককে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে নিমজ্জিত করে। দিনের শেষে সব পাখির নীড়ে ফেরা এবং নদীর ঘরে ফিরে আসার রূপকের মধ্য দিয়ে দিনান্তের যে নীরবতা ফুটে ওঠে, তা আধুনিক কবিতার শ্রেষ্ঠ শিল্পসিদ্ধি।
উপসংহার
অতএব, গভীর ঐতিহাসিক বোধ, আধুনিক জীবনের ক্লান্তি নিবারক আশ্রয়ের আকুতি এবং উপমা-চিত্রকল্পের অভিনবত্বে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য, কালোত্তীর্ণ ও শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবিতা।
ঘ-বিভাগ: ব্যবহারিক বাংলা ও ব্যাকরণ (যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও: মান ৫ × ৪ = ২০)
৭. (ক) “ব্যাকরণই ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং ভাষাই ব্যাকরণকে নিয়ন্ত্রণ করে”— উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর।
উত্তর: ভাষা একটি জীবন্ত ও গতিশীল নদীর মতো। মানবসমাজে ভাব বিনিময়ের প্রয়োজনে আগে ভাষার জন্ম হয়েছে, আর সেই ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও গঠনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে বহু শতাব্দী পর ব্যাকরণের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাকরণ ভাষার অনুশাসক নয়, বরং অনুসারী। কালের আবর্তনে মানুষের মুখে মুখে ভাষার শব্দভাণ্ডার ও ধ্বনি পরিবর্তিত হয়। জীবন্ত ভাষার এই স্বাভাবিক রূপান্তরকে ব্যাকরণ কখনো কৃত্রিম নিয়মের শৃঙ্খলে চিরতরে বেঁধে রাখতে পারে না; বরং ভাষার গতি পরিবর্তনের সাথে সাথে ব্যাকরণের নিয়মাবলিকেই সংশোধিত ও পরিমার্জিত হতে হয়। অতএব, ভাষা ব্যাকরণ সৃষ্টি করে, ব্যাকরণ ভাষা সৃষ্টি করে না।
৭. (খ) উপভাষা কাকে বলে? বাংলা উপভাষার শ্রেণিবিভাগ উদাহরণসহ আলোচনা কর।
উত্তর: একই মূল ভাষার অন্তর্গত যে বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে স্থানীয় জনগণের মুখের ভাষা হিসেবে প্রচলিত থাকে, তাকে উপভাষা (Dialect) বলে। ভাষাতাত্ত্বিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে বাংলা উপভাষাকে প্রধানত পাঁচটি শাখায় বিভক্ত করা যায়:
১. রাঢ়ী: দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গ (কলকাতা, বর্ধমান, নদিয়া)। এটিই আধুনিক প্রমিত চলিত বাংলার ভিত্তি।
২. বঙ্গালী: পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ (ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, ফরিদপুর)।
৩. বরেন্দ্রী: উত্তর বঙ্গ (রাজশাহী, পাবনা, মালদহ)।
৪. ঝাড়খণ্ডী: দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল (মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া)।
৫. কামরূপী: উত্তর-পূর্ব সীমান্ত (রংপুর, দিনাজপুর, আসামের গোয়ালপাড়া)।
৭. (গ) সাধু ভাষা থেকে চলিত ভাষায় রূপান্তর কর:
মূল শব্দাবলি: মালঞ্চ, কাঞ্চন, শস্য, হরিৎ, রক্ত।
| সাধু / তৎসম রূপ | চলিত / তদ্ভব রূপ |
|---|---|
| মালঞ্চ | ফুলের বাগান |
| কাঞ্চন | সোনা / কাঁচা সোনা |
| শস্য | ফসল |
| হরিৎ | সবুজ |
| রক্ত | লাল / খুন / লহু |
৭. (ঘ) শুদ্ধ বানান লেখ:
| অশুদ্ধ রূপ | শুদ্ধ রূপ | নিয়ম / মন্তব্য |
|---|---|---|
| আকাংখা | আকাঙ্ক্ষা | যুক্তবর্ণে ‘ঙ’ ও ‘ক্ষ’ এর সঠিক রূপ। |
| উত্কৃষ্ট | উৎকৃষ্ট | খণ্ড-ত (ৎ) এর শুদ্ধ প্রয়োগ। |
| উপরোক্ত | উপর্যুক্ত / উপরিউক্ত | সন্ধিজনিত শুদ্ধ প্রয়োগ (উপরি + উক্ত)। |
| কাহিনী | কাহিনি | বাংলা একাডেমি নিয়ম অনুযায়ী অতৎসম শব্দে ই-কার। |
| প্রতিদ্বন্দী | প্রতিদ্বন্দ্বী | উভয় ‘দ’-এ ব-ফলা যুক্ত হবে। |
| শশুর | শ্বশুর | শুদ্ধ বর্ণে তালব্য শ-এ ব-ফলা। |
| সৌহার্দ্যতা | সৌহার্দ্য / সুহৃদতা | প্রত্যয়জনিত দ্বৈত প্রয়োগ বর্জনীয়। |
৭. (ঙ) ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয় কর:
| প্রদত্ত শব্দ | ব্যাসবাক্য | সমাসের নাম |
|---|---|---|
| সিংহাসন | সিংহ চিহ্নিত আসন | মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস |
| শতাব্দী | শত অব্দের সমাহার | দ্বিগু সমাস |
| হাতাহাতি | হাতে হাতে যে যুদ্ধ | ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস |
| চৌরাস্তা | চার রাস্তার সমাহার | দ্বিগু সমাস |
| প্রতিদিন | দিনে দিনে | অব্যয়ীভাব সমাস |
৭. (চ) ভাব-সম্প্রসারণ কর: “মঙ্গলের করিবার শক্তিই ধন, বিলাসের সামগ্রী নহে।”
মূলভাব: পার্থিব ধন-সম্পদ ব্যক্তির নিজস্ব ভোগ-বিলাসের জন্য নয়, বরং তা মানবকল্যাণ ও আর্তমানবতার সেবায় নিবেদন করার মধ্যেই ধনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।
ভাব-সম্প্রসারণ: মানবসমাজে ধন-সম্পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। ধন হলো লক্ষ্য অর্জনের একটি উপায় মাত্র। অনেকেই মনে করেন বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়ে ভোগ-বিলাসে গা ভাসিয়ে দেওয়াই জীবনের পরম সার্থকতা। কিন্তু প্রাচুর্যের মধ্যে অতিরিক্ত বিলাসিতা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক, অলস ও বিবেকহীন করে তোলে। সম্পদের অপচয় কখনোই প্রকৃত সুখ দিতে পারে না।
পক্ষান্তরে, মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে যে ধন দিয়েছেন তা একটি পবিত্র আমানত। সমাজের অগণিত অনাহারক্লিষ্ট, রিক্ত ও নিঃস্ব মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া, শিক্ষার আলো ছড়ানো এবং সামাজিক কল্যাণে সম্পদ ব্যয় করাই মানুষের প্রধান কর্তব্য। যে ধন মানবতার কল্যাণে ব্যবহৃত হয় না, তা একসময় অভিশাপে পরিণত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে যাঁরা অমর হয়েছেন, তাঁরা প্রাচুর্যের জন্য নয়, বরং নিজেদের ধন-সম্পদকে মানুষের কল্যাণে অকাতরে দান করার জন্যই স্মরণীয় হয়ে আছেন।
মন্তব্য: বিলাসিতায় অর্থ অপচয় না করে তা আর্তমানবতার সেবায় উৎসর্গ করাই ধনের প্রকৃত মহত্ত্ব ও ধর্মীয় নির্দেশনা।
৭. (ছ) তোমার এলাকায় একটি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট একটি আবেদনপত্র লেখ।
তারিখ: ১৫ নভেম্বর ২০২২
বরাবর,
সচিব
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়
বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা।
বিষয়: এলাকায় একটি দৃষ্টিনন্দন মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য আবেদন।
জনাব,
বিনীত নিবেদন এই যে, আমরা আপনার মন্ত্রণালয়ের অধীন দেশব্যাপী পরিচালিত ঐতিহাসিক মডেল মসজিদ নির্মাণ উদ্যোগের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমাদের এলাকাটি একটি সুপ্রাচীন ও ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ। এখানে প্রায় পঞ্চাশ হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলিম নাগরিকের বসবাস এবং পাঁচটি প্রাচীন মাদরাসা রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এত বিশাল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এ অঞ্চলে কোনো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ বা ইসলামি গবেষণাগার নেই। ফলে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পরিচালনা, বিশুদ্ধ দ্বীনি জ্ঞানার্জন, হজযাত্রীদের প্রশিক্ষণ এবং সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ বিরোধী সচেতনতা সৃষ্টিতে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে।
আমাদের এলাকায় সরকারি খাসজমির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে, যা একটি আধুনিক তিনতলা মডেল মসজিদ ও কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য সম্পূর্ণ উপযুক্ত।
অতএব, আপনার নিকট আকুল আবেদন, আমাদের এলাকার সার্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এখানে একটি দৃষ্টিনন্দন মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দের সদয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাধিত করবেন।
বিনীত নিবেদক—
এলাকাবাসীর পক্ষে
মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম
সদর উপজেলা, জেলা: কুষ্টিয়া।
৭. (জ) আন্তর্জাতিক আরবি ভাষা দিবস উপলক্ষে তোমার মাদরাসায় আয়োজিত ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতা ও সেমিনারের ওপর একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রণয়ন কর।
আন্তর্জাতিক আরবি ভাষা দিবসে মাদরাসায় বর্ণাঢ্য ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী ও সেমিনার অনুষ্ঠিত
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: ১৮ ডিসেম্বর ২০২২
বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আরবি ভাষা দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ও উৎসবমুখর পরিবেশে দিনব্যাপী ইসলামি ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতা ও বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মাদরাসা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ফাজিল ও কামিল শ্রেণির শতাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।
সকাল ৯টায় পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর “পবিত্র সুন্নাহ ও কুরআনের ভাষা সংরক্ষণে আরবি লিপিকলার ভূমিকা” শীর্ষক বিশেষ সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। বক্তাগণ উল্লেখ করেন যে, আরবি ভাষা কেবল ইসলামি শরিয়তের মূল উৎস নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সভ্যতা, বিজ্ঞান ও দর্শনের অন্যতম সমৃদ্ধ বাহন।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল লাইভ ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী। শিক্ষার্থীরা সুলুস, নাসখ, কুফি ও দিওয়ানি রীতিতে পবিত্র কুরআনের আয়াত ও হাদিসের বাণী ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন। বিচারকমণ্ডলীর মূল্যায়নে প্রথম স্থান অর্জনকারীকে সম্মাননা স্মারক ও আর্থিক বৃত্তি প্রদান করা হয়। সমাপনী বক্তব্যে অধ্যক্ষ মহোদয় শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরবি ভাষার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার আহ্বান জানান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
চর্যাপদ মূলত কোন ধর্মের সাধনসংগীত?
চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের আধ্যাত্মিক সাধন-ভজন ও গুহ্যতত্ত্বের গান, যা রূপক ও সান্ধ্যভাষায় রচিত হয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি কোন কাব্যের অন্তর্গত?
‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নি-বীণা’ (১৯২২)-এর অন্তর্ভুক্ত।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধের মূল অন্তর্নিহিত বার্তা কী?
তৈল প্রবন্ধের মূল বার্তা হলো মানুষের চাটুকারিতা, দাসসুলভ তোষামোদপ্রিয়তা এবং যোগ্যতার চেয়ে তৈলমর্দনের প্রাধান্যকে ব্যঙ্গাত্মক শ্লেষে সংশোধন করা।
রবীন্দ্রনাথের ‘সমাপ্তি’ গল্পে মৃন্ময়ীর রূপান্তরের প্রধান কারণ কী?
অপূর্বর প্রতি জন্ম নেওয়া অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং অপূর্বর দূর প্রবাসে চলে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট গভীর বিরহবোধই মৃন্ময়ীর মানসিক পরিবর্তনের মূল কারণ।
“মঙ্গলের করিবার শক্তিই ধন, বিলাসের সামগ্রী নহে”—এর তাৎপর্য কী?
সম্পদকে আত্মকেন্দ্রিক বিলাসে অপচয় না করে তা আর্তমানবতার কল্যাণ ও সামাজিক উন্নয়নে নিবেদন করাই সম্পদের মূল সার্থকতা।
উপভাষা ও প্রমিত ভাষার মধ্যে পার্থক্য কী?
উপভাষা হলো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষের মুখের স্বাভাবিক ভাষা, আর প্রমিত ভাষা হলো সার্বজনীন যোগাযোগের জন্য ব্যাকরণসম্মত সর্বস্বীকৃত রূপ।