ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: উলুমুল হাদিস (Ulumul Hadith)
বিষয় কোড: 202103 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
২০২২ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের উলুমুল হাদিস (Ulumul Hadith – 202103) পরীক্ষাটি শিক্ষার্থীদের উলুমুল হাদিসের মৌলিক শাখা, উচ্চ ও নিম্ন সনদ, তাবারিজাল শাস্ত্র, মুস্তাকরাজাত, তাখরিজুল হাদিস এবং জটিল হাদিস বিশ্লেষণ দক্ষতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়। প্রশ্নপত্রটি দুটি অংশে বিভক্ত: مجموعة (الف) (রচনামূলক – চারটির উত্তর দিতে হবে, মান ৪ × ১৫ = ৬০) এবং مجموعة (ب) (সংক্ষিপ্ত – চারটির উত্তর দিতে হবে, মান ৪ × ৫ = ২০)। নিচে পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে সকল প্রশ্নের বস্তুনিষ্ঠ ও প্রামাণ্য সমাধান তুলে ধরা হলো।
مجموعة (الف) [ক-অংশ: রচনামূলক প্রশ্ন]
١- ما المراد بعلوم الحديث؟ اذكر موضوع علوم الحديث وغرضها وأهميتها-
[১. উলূমুল হাদিস বলতে কী বোঝায়? এর আলোচ্য বিষয়, উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি শরিয়তের মৌলিক ভিত্তিসমূহ সংরক্ষণে ‘উলুমুল হাদিস’ (علوم الحديث) এক অনন্য জ্ঞানভাণ্ডার। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মুখনিঃসৃত বাণী, কর্ম, সম্মতি ও সিফাতকে সহীহ ও অবিকৃতভাবে রক্ষা করার জন্য মুসলিম মনীষীগণ যে বহুস্তরীয় গবেষণা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, তাকে সামগ্রিকভাবে উলুমুল হাদিস বলা হয়।
উলুমুল হাদিসের সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘উলূম’ (علوم) শব্দটি ‘ইলম’ (علم)-এর বহুবচন, যার অর্থ জ্ঞানসমূহ বা বিজ্ঞানসমূহ। আর ‘হাদিস’ (الحديث) অর্থ নতুন, কথা বা বাণী।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম ইবনুস সালাহ ও আল-বুলকিনী (রহ.)-এর মতে:
«علم بأصول وقواعد يعرف بها أحوال السند والمتن، ويشمل جميع العلوم المتعلقة برواية الحديث ودرايته ونقده وفهمه»
(উলুমুল হাদিস হলো এমন কিছু অকাট্য মূলনীতি ও নিয়মের সমষ্টি, যার দ্বারা হাদিসের সনদ ও মতনের সার্বিক অবস্থা নিরূপণ করা যায়; এবং এটি হাদিসের রিওয়ায়াত, দিরায়াত, সমালোচনা ও অনুধাবন সম্পর্কিত যাবতীয় জ্ঞানকে অন্তর্ভুক্ত করে)।
উলুমুল হাদিসের বিষয়বস্তু (موضوعه)
এ শাস্ত্রের প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো রাসূলে আকরাম (সা.)-এর সুন্নাহ তথা হাদিস। বিশেষ করে:
১. সনদের ধারাবাহিকতা ও রাবিদের গুণাবলি (ন্যায়পরায়ণতা ও স্মৃতিশক্তি)।
২. মতনের ব্যাকরণিক, ঐতিহাসিক ও ফিকহি বিশুদ্ধতা।
৩. গ্রহণযোগ্য ও বর্জনীয় বর্ণনার সার্বিক অবস্থা।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (غايته)
উলুমুল হাদিসের মূল লক্ষ্যগুলো নিম্নরূপ:
১. সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হাদিসকে জাল ও দুর্বল বর্ণনা থেকে চিরতরে পৃথক করা।
২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপকারীদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা।
৩. শরিয়তের আহকাম প্রণয়নে অভ্রান্ত ও নির্ভুল দলিলের ওপর নির্ভর করা।
৪. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নাজাত লাভ করা।
গুরুত্ব ও তাৎপর্য
উলুমুল হাদিসের গুরুত্ব অপরিসীম। এ শাস্ত্রের মাধ্যমেই উম্মতে মুহাম্মাদী তাদের নবীর দ্বীনকে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বৈজ্ঞানিক পন্থায় সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.) বলেন: “ফেরেশতাগণ যেমন আসমানের পাহারাদার, হাদিস বিশারদগণ তেমনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অতন্দ্র প্রহরী।”
٢- عرف الإسناد- وما المراد بالإسناد العالى والنازل؟ اذكر أهمية هذا العلم مع ذكر أقوال العلماء-
[২. الإسناد এর পরিচয় দাও। اسناد عالى ও اسناد نازل দ্বারা উদ্দেশ্য কী? উলামাদের বক্তব্য উল্লেখপূর্বক علم اسناد এর গুরুত্ব আলোচনা কর।]
ভূমিকা
সনদ হলো হাদিস শাস্ত্রের প্রাণভোমরা। কোনো হাদিস দলিলের মর্যাদা পাবে কি না তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সনদের বিশুদ্ধতার ওপর। সনদের রাবিদের সংখ্যার কম-বেশির ওপর ভিত্তি করে সনদকে ‘উঁচু মানের সনদ’ ও ‘নিম্ন মানের সনদ’ হিসেবে ভাগ করা হয়।
ইসনাদের সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘ইসনাদ’ শব্দটি ‘আসনাদা’ (أسند) ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ কোনো কিছুর ওপর ভর করা বা কোনো বিষয়ের উৎস নির্দেশ করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা:
«هو حكاية طريق المتن، وسلسلة الرجال الموصلة إلى المتن»
(হাদিসের মূল বক্তব্য বা মতন পর্যন্ত পৌঁছানোর বর্ণনাকারী পরম্পরাকে ইসনাদ বলা হয়)।
আল-ইসনাদুল আলী ও আল-ইসনাদুন নাযিল
১. আল-ইসনাদুল আলী (الإسناد العالي – উচ্চ সনদ):
– সংজ্ঞা: যে সনদে রাসুলুল্লাহ (সা.) অথবা কোনো ইমাম পর্যন্ত পৌঁছাতে মধ্যবর্তী বর্ণনাকারীর সংখ্যা কম থাকে।
– বৈশিষ্ট্য: বর্ণনাকারীর সংখ্যা যত কম হবে, সনদে ভুলের সম্ভাবনা তত হ্রাস পাবে। যেমন: ইমাম বুখারী (রহ.)-এর ‘সুলাসিয়াত’ (ثلاثيات) যেখানে তাঁর ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মাঝে মাত্র তিনজন বর্ণনাকারী ছিলেন।
২. আল-ইসনাদুন নাযিল (الإسناد النازل – নিম্ন সনদ):
– সংজ্ঞা: যে সনদে একই পর্যায়ের অন্য সনদের তুলনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বা নির্দিষ্ট ইমাম পর্যন্ত পৌঁছাতে মধ্যবর্তী রাবির সংখ্যা বেশি থাকে।
– বৈশিষ্ট্য: রাবির সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে সতর্কতার প্রয়োজন বাড়ে। তবে যদি নিম্ন সনদের রাবিগণ উচ্চ সনদের চেয়ে অধিকতর ফকীহ ও বিশ্বস্ত হন, তবে মর্যাদার দিক থেকে তা শ্রেষ্ঠ হতে পারে।
উভয়ের গুরুত্ব
মুহাদ্দিসগণ উচ্চ সনদ অনুসন্ধানকে সুন্নাহ ও বিশেষ বরকত বলে মনে করতেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন: «طلب الإسناد العالي سنة عمن سلف» (উচ্চ সনদ অন্বেষণ করা পূর্বসূরি সালাফদের একটি সুন্নাত)। তবে মূল লক্ষ্য হলো বিশুদ্ধতা— যদি নিম্ন সনদটি অধিকতর নির্ভরযোগ্য রাবিদের দ্বারা গঠিত হয়, তবে তা অধিক গ্রহণযোগ্য সাব্যস্ত হয়।
٣- ما المراد بالطبقة في علوم الحديث؟ تحدث عن أشهر الكتب المؤلفة في علم تواريخ الرجال وطبقاتهم-
[৩. علوم الحديث শাস্ত্রে الطبقة বলতে কী বোঝায়? এ বিষয়ে লিখিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
হাদিসের সনদ ও বর্ণনাকারীদের পারস্পরিক সাক্ষাৎ যাচাই করার জন্য ‘তবকা’ (স্তর) সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। সমকালীনতা ও বয়সের নৈকট্যের ওপর ভিত্তি করে বর্ণনাকারীদের স্তর বিন্যাস করা হয়।
তবকার সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘তাবাক্বাহ’ (الطبقة) অর্থ স্তর, দল, প্রজন্ম বা সদৃশ ব্যক্তিবর্গ।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায়:
«قوم تقاربوا في السن والإسناد، أو في الشيوخ الذين أخذوا عنهم»
(বয়স, সনদের সময়কাল অথবা যেসব উস্তাদের কাছ থেকে তারা হাদিস গ্রহণ করেছেন তাদের পারস্পরিক নৈকট্যে সমসাময়িক রাবিদের দলকে একটি তবকা বলা হয়)।
বর্ণনাকারীদের প্রধান তবকাসমূহ
হাফিজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.) তাঁর ‘তাক্বরীবুত তাহযীব’ গ্রন্থে রাবিদের বারোটি তবকায় ভাগ করেছেন:
| তবকা | নাম ও বিবরণ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| ১ম তবকা | সাহাবায়ে কেরাম (সর্বশ্রেষ্ঠ ও পরম নির্ভরযোগ্য প্রজন্ম) | হযরত আবু বকর, উমর, আলী ও আবু হুরায়রা (রা.) |
| ২য় তবকা | বরিষ্ঠ তাবেয়ীন (যাঁরা প্রাচীন সাহাবিদের সান্নিধ্য পেয়েছেন) | সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, কায়স ইবনে আবি হাযিম (রহ.) |
| ৩য় তবকা | মধ্যম স্তরের তাবেয়ীন | হাসান বসরী, ইবনে সিরীন, মুজাহিদ (রহ.) |
| ৪র্থ তবকা | কনিষ্ঠ তাবেয়ীন (যাঁরা অল্প বয়সে কয়েকজন সাহাবি দেখেছেন) | যুহরী, কাতাদাহ, আ’মাশ (রহ.) |
| ৫ম তবকা | তাবে-তাবেয়ীনের প্রাথমিক স্তর | ইমাম আবু হানিফা, শু’বা, মালিক ইবনে আনাস (রহ.) |
| ৬ষ্ঠ তবকা | তাবে-তাবেয়ীনের স্বর্ণযুগ ও হাদিস সংকলক ইমামগণ | সুফিয়ান সাওরী, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ইমাম শাফেয়ী (রহ.) |
তবকা শাস্ত্রে রচিত বিখ্যাত গ্রন্থাবলি
১. আত-তাবাক্বাতুল কুবরা: ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সা’দ আল-বাগদাদী (মৃত্যু ২৩০ হি.)। এটি এ শাস্ত্রের সবচেয়ে প্রাচীন ও বিস্তৃত মহাগ্রন্থ।
২. তাবাক্বাতুল মুহাদ্দিসীন: আবু নুয়াইম আল-ইস্পাহানী (মৃত্যু ৪৩০ হি.)।
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ: ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (মৃত্যু ৭৪৮ হি.)।
৪. তাবাক্বাতুল হুফফাজ: ইমাম জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (মৃত্যু ৯১১ হি.)।
٤- ما المردود؟ اذكر أنواع الحديث المردود بأسباب الطعن في الضبط-
[৪. الحديث المردود কী? ضبط বিনষ্ট হওয়ার কারণে مردود হাদিসের প্রকারগুলো উল্লেখ কর।]
ভূমিকা
হাদিস শাস্ত্রে যে হাদিস গ্রহণযোগ্যতার শর্তাবলি পূরণ করতে ব্যর্থ হয় এবং যার বিশুদ্ধতা প্রামাণিক মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হয় না, তাকে ‘খবরে মারদুদ’ (الحديث المردود) বলা হয়। মারদুদ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি ও ধারণক্ষমতা (ضبط)-এর মধ্যে ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা থাকা।
মারদুদ হাদিসের পরিচয় (تعريف الحديث المردود)
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম ইবনুস সালাহ ও হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর মতে:
«هو الحديث الذي لم تتوفر فيه شروط القبول، أي فقد شرطا أو أكثر من شروط الحديث الصحيح والحسن»
(যে হাদিসের মধ্যে সহীহ ও হাসান হাদিস গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্তাবলি উপস্থিত থাকে না, অর্থাৎ যার মধ্যে এক বা একাধিক শর্তের ঘাটতি দেখা দেয়, তাকে মারদুদ হাদিস বলে)।
যাব্ত (ضبط) বিনষ্ট হওয়ার কারণসমূহ ও মারদুদ হাদিসের প্রকারভেদ
মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় ‘যাব্ত’ বলতে হাদিস শ্রবণ থেকে শুরু করে অন্যের নিকট বর্ণনা করা পর্যন্ত কোনো প্রকার কম-বেশি ছাড়া স্মৃতিপটে (ضبط الصدر) অথবা নিজ কিতাবে (ضبط الكتاب) নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করার ক্ষমতাকে বোঝায়। হাফিজ ইবনে হাজার (রহ.)-এর শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী যাব্ত বিনষ্ট হওয়ার কারণে হাদিস মারদুদ হওয়ার পাঁচটি প্রধান কারণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকারসমূহ নিম্নরূপ:
| ক্রম | যাব্ত বিনষ্টের কারণ (الطعن في الضبط) | মারদুদ হাদিসের প্রকার (نوع الحديث) | বিশ্লেষণ ও বিবরণ |
|---|---|---|---|
| ১ | ফাহশুল গালাত (فحش الغلط): অতিরিক্ত ভুলভ্রান্তি করা। |
আল-মুনকার (المنكر) | যে বর্ণনাকারীর বর্ণনায় নির্ভুল কথার চেয়ে ভুলের পরিমাণই বেশি হয়, তার হাদিসকে মুনকার বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়। |
| ২ | কাসরাতুল গাফলাহ (كثرة الغفلة): স্মৃতি সংরক্ষণে চরম অসচেতনতা ও উদাসীনতা। |
আল-মুনকার (المنكر) | যে রাবি পাঠদান ও বর্ণনার সময় অসতর্ক ও অমনোযোগী থাকে, তার হাদিসও চরম দুর্বলতার কারণে মুনকার হিসেবে গণ্য হয়। |
| ৩ | আল-ওয়াহাম (الوهم): ভুল ধারণা বা সন্দেহপ্রবণতা। |
আল-মু’আল্লাল (المعلل / المعل) | রাবি ধারণার বশবর্তী হয়ে একটি হাদিসের সনদ বা মতনকে অন্য হাদিসের সাথে মিলিয়ে ফেলে। গভীর অনুসন্ধানে যা ‘ইল্লাত’ হিসেবে প্রকাশ পায়। |
| ৪ | মুখালাফাতুস সিক্বাত (مخالفة الثقات): অধিকতর বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের বিপরীত বর্ণনা করা। |
– আল-মুদরাজ (المدرج): নিজস্ব ব্যাখ্যা সনদ বা মতনে ঢুকিয়ে দেওয়া। – আল-মাকলুব (المقلوب): রাবির নাম বা শব্দের ক্রম উল্টে দেওয়া। – আল-মুদতারিব (المضطرب): পরস্পরবিরোধী বর্ণনা যা সমন্বয় করা অসম্ভব। – আল-মুসাহহাফ (المصحف): নুকতা বা অক্ষরের হেরফের করা। – আশ-শায (الشاذ): নির্ভরযোগ্য দলের বিপরীত একক বর্ণনা। |
সিক্বাহ রাবিদের সাথে বৈসাদৃশ্য তৈরি করার কারণে এ সকল প্রকারের হাদিস মারদুদ ও অগ্রহণযোগ্য বলে সাব্যস্ত হয়। |
| ৫ | সূউল হিফজ (سوء الحفظ): স্মৃতিশক্তির স্থায়ী বা সাময়িক দুর্বলতা। |
– আশ-শায / আয-যয়ীফ: সর্বদা স্মৃতিশক্তি দুর্বল থাকলে। – আল-মুখতালাত (المختلط): বার্ধক্য বা দৃষ্টিহীনতার কারণে স্মৃতিবিভ্রম ঘটলে। |
যদি স্মৃতিশক্তি স্থায়ীভাবে দুর্বল হয় তবে তা যয়ীফ; আর যদি জীবনের শেষভাগে স্মৃতিবিভ্রম ঘটে, তবে বিভ্রান্তির পূর্বের হাদিস গ্রহণযোগ্য কিন্তু পরের হাদিস মারদুদ হয়। |
٥- عرف المعلل- ثم اذكر أقسامه من حيث العلة-
[৫. معلل এর সংজ্ঞা দাও। علة এর দিক থেকে তা কত প্রকার উল্লেখ কর।]
ভূমিকা
উলুমুল হাদিসের সবচেয়ে সূক্ষ্ম, জটিল ও গভীরতম শাখা হলো ‘ইলমুল ইলাল’ (علم العلل)। কেবলমাত্র দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও সুগভীর প্রজ্ঞার অধিকারী শ্রেষ্ঠ ইমামগণই হাদিসের গুপ্ত দোষ উদঘাটন করতে পারতেন।
মু’আল্লাল হাদিসের সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘মু’আল্লাল’ বা ‘মা’লূল’ শব্দটি ‘ইল্লাত’ (علة) থেকে এসেছে, যার অর্থ রোগ, ব্যাধি বা অন্তর্নিহিত ত্রুটি।
পারিভাষিক সংজ্ঞা:
«هو الحديث الذي اطلع فيه على علة تقدح في صحته مع أن الظاهر السلامة منها»
(যে হাদিসের আপাতদৃষ্টিতে সনদ ও মতন সম্পূর্ণ সহীহ ও ত্রুটিমুক্ত মনে হয়, কিন্তু সূক্ষ্ম অনুসন্ধানের পর এমন এক গোপন ক্ষতিকর ত্রুটি উদঘাটিত হয় যা হাদিসটির বিশুদ্ধতাকে বিনষ্ট করে দেয়, তাকে হাদিসে মু’আল্লাল বলে)।
ইল্লত বা ক্ষতিকর ত্রুটির প্রকারভেদ
১. সনদগত ইল্লাত (العلة في السند): আপাতদৃষ্টিতে সনদের রাবিগণ বিশ্বস্ত মনে হলেও বাস্তবে কোনো রাবি মুনকাতি’কে মুত্তাসিল করেছেন, অথবা মওকুফ হাদিসকে মারফু বানিয়েছেন।
২. মতনগত ইল্লাত (العلة في المتن): সনদের কোনো রাবি অন্য কোনো হাদিসের শব্দ নিজের হাদিসের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন (ইদরাজ), অথবা মূল ভাবার্থের বিপরীত শব্দ সংযোজন করেছেন।
৩. সনদ ও মতন উভয়টিতে ইল্লাত: যেখানে সনদের পরিবর্তনের কারণে হাদিসের মূল ভাবার্থেও পরিবর্তন সূচিত হয়।
ইল্লত সনাক্তকরণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিসমূহ
মুহাদ্দিসগণ ইল্লত উদঘাটনের জন্য নিম্নলিখিত নীতিগুলো অনুসরণ করতেন:
১. জম’উত তুরুক্ব (جمع الطرق – সমস্ত সনদ একত্রীকরণ): একটি নির্দিষ্ট হাদিসের যতগুলো সনদ ও পথ রয়েছে সবগুলোকে সামনে রেখে তুলনা করা।
২. রাবিদের পারস্পরিক তুলনা: শক্তিশালী ও নিখুঁত স্মৃতিসম্পন্ন বর্ণনাকারীর সাথে দুর্বল বা তুলনামূলক কম নিখুঁত রাবির বর্ণনার তারতম্য পর্যালোচনা করা।
৩. মুহাদ্দিসের অন্তর্দৃষ্টি ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা: স্বর্ণকার যেমন খাঁটি স্বর্ণ ও ভেজালের পার্থক্য নিমেষেই ধরে ফেলেন, তেমনি মুহাদ্দিসগণ দীর্ঘ সাধনার ফলে অর্জিত অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সূক্ষ্ম ইল্লত ধরে ফেলতেন। যেমন ইমাম আবদুর রহমান ইবনে মাহদী (রহ.) বলেন: “কোনো হাদিসের ইল্লত বুঝতে পারা এক বিশেষ ইলহাম।”
٦- ماذا تفهم بعلم ناسخ الحديث ومنسوخه؟ ثم بين أهمية معرفته وأشهر ما صنف فيه-
[৬. علم ناسخ الحديث ومنسوخه বলতে কী বুঝ? ইহা জানার গুরুত্ব ও এ বিষয়ে লিখিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থাদির বর্ণনা দাও।]
ভূমিকা
ইসলামি শরিয়তের বিধিবিধানের পর্যায়ক্রমিক বিবর্তনে ‘নাসিখ ও মানসূখ’ শাস্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একাধিক সহীহ হাদিসের মধ্যে যদি বিধানগত বৈপরীত্য দেখা দেয়, তবে কোনটি পূর্ববর্তী এবং কোনটি পরবর্তী তা নির্ধারণ করার জন্য এই শাস্ত্রের জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।
নাসিখ ও মানসূখের সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘নাসখ’ (النسخ) অর্থ দূর করা, পরিবর্তন করা, বিলুপ্ত করা বা প্রতিস্থাপন করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা:
«رفع الشارع حكما شرعيا سابقا بحكم شرعي لاحق متأخر عنه»
(শরিয়ত প্রণেতা আল্লাহ বা তাঁর রাসুল কর্তৃক পরবর্তী কোনো দলিলের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কোনো প্রতিষ্ঠিত শরয়ী হুকুমকে রহিত বা প্রত্যাহার করে নেওয়ার নাম নাসখ)। যে হাদিস দ্বারা বিধান রহিত হয় তাকে ‘নাসিখ’ এবং যার বিধান রহিত হয় তাকে ‘মানসূখ’ বলে।
নাসিখ-মানসূখের গুরুত্ব
ফিকহ ও ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে নাসিখ-মানসূখের জ্ঞান থাকা একজন মুজতাহিদের জন্য ফরজ। এ শাস্ত্র না জানলে মানসূখ বা রহিত হাদিসের ওপর ভিত্তি করে ভুল ফতোয়া দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। হযরত আলী (রা.) এক বক্তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “তুমি কি নাসিখ ও মানসূখ চেন?” সে বলল: “না।” তিনি বললেন: “তবে তুমি নিজেও ধ্বংস হয়েছ এবং অন্যকেও ধ্বংস করেছ।”
বাস্তব উদাহরণ
১. কবর জিয়ারত সংক্রান্ত বিধান: রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমদিকে কবর জিয়ারত নিষেধ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেই তা প্রত্যাহার করে বলেন:
«كنت نهيتكم عن زيارة القبور فزوروها فإنها تذكركم الآخرة» (আমি পূর্বে তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা কবর জিয়ারত কর; কেননা তা তোমাদের আখিরাত স্মরণ করিয়ে দেয়)। এখানে প্রথম হুকুমটি মানসূখ এবং দ্বিতীয় হুকুমটি নাসিখ।
২. আগুনে পাকা খাদ্য গ্রহণের পর অজু: প্রথমদিকে আগুনে রান্না করা খাদ্য খেলে অজু করার বিধান ছিল, যা পরবর্তীতে রহিত হয়ে যায়।
এ শাস্ত্রে রচিত প্রধান গ্রন্থাবলি
১. আল-ই’তিবার ফিন নাসিখ ওয়াল মানসূখ মিনাল আসার: ইমাম আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-হাযিমী (মৃত্যু ৫৮৪ হি.)।
২. নাসিখুল হাদিস ওয়া মানসূখুহু: ইমাম ইবনে শাহীন (মৃত্যু ৩৮৫ হি.)।
৩. আন-নাসিখ ওয়াল মানসূখ: ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)।
٧- تحدث عن المستخرجات وأشهر المصنفات فيها مفصلا-
[৭. مستخرجات ও এ বিষয়ের প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
হাদিস সংকলনের ইতিহাসে ‘মুস্তাকরাজাত’ (المستخرجات) এক বিশেষ সাহিত্য শাখা। এর মাধ্যমে মূল হাদিসগ্রন্থগুলোর নির্ভরযোগ্যতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় এবং অতিরিক্ত ইলমি ফায়দা অর্জিত হয়।
মুস্তাকরাজের সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘মুস্তাকরাজ’ শব্দটি ‘ইসতিখরাজ’ (استخراج) থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ বের করে আনা বা আহরণ করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা:
«أن يأتي المصنف إلى كتاب من كتب الحديث كصحيح البخاري، فيخرج أحاديثه بأسانيد لنفسه من غير طريق صاحب الكتاب، فيجتمع معه في شيخه أو من فوقه»
(কোনো হাদিস বিশারদ পূর্ববর্তী কোনো প্রামাণ্য কিতাবের (যেমন সহীহ বুখারী) হাদিসগুলোকে কিতাবের মূল সংকলকের সূত্র ব্যতিরেকে নিজের সনদে বর্ণনা করেন এবং মূল সংকলকের উস্তাদ বা তাঁরও উপরের স্তরের কোনো রাবিতে গিয়ে মিলিত হন, তাকে মুস্তাকরাজ বলা হয়)।
মুস্তাকরাজের প্রধান উপকারিতাসমূহ
১. সনদের শক্তি বৃদ্ধি (علو الإسناد وكثرة الطرق): একাধিক বিকল্প সনদ উন্মোচিত হওয়ায় হাদিসের সত্যতা আরও সুদৃঢ় হয়।
২. জিয়াদাতুল আলফায (زيادة في المتن): অনেক সময় মূল গ্রন্থে বর্ণিত শব্দের চেয়ে মুস্তাকরাজে অতিরিক্ত ও ব্যাখ্যামূলক সহীহ শব্দ পাওয়া যায়।
৩. মুদাল্লিসের তাছরীহ: মূল গ্রন্থে যদি কোনো মুদাল্লিস বর্ণনাকারী ‘আন’ (عن) দ্বারা বর্ণনা করে থাকেন, তবে মুস্তাকরাজে প্রায়শই তার সরাসরি শোনার স্পষ্ট ঘোষণা (حدثنا বা سمعت) পাওয়া যায়।
৪. সনদের জটিলতা নিরসন: কোনো রাবির অস্পষ্ট পরিচয় মুস্তাকরাজের সনদে স্পষ্ট হয়ে যায়।
পাঁচটি বিখ্যাত মুস্তাকরাজ গ্রন্থ
| ক্রম | গ্রন্থের নাম | গ্রন্থকারের নাম | মূল ভিত্তি গ্রন্থ |
|---|---|---|---|
| ১ | মুস্তাকরাজু আবি নুয়াইম আলা সহীহিল বুখারী | আবু নুয়াইম আল-ইস্পাহানী (মৃত্যু ৪৩০ হি.) | সহীহ বুখারী |
| ২ | মুস্তাকরাজু আবি আওয়ানাহ আলা সহীহি মুসলিম | আবু আওয়ানাহ আল-ইস্ফিরায়িনী (মৃত্যু ৩১৬ হি.) | সহীহ মুসলিম |
| ৩ | মুস্তাকরাজু আবি নুয়াইম আলা সহীহি মুসলিম | আবু নুয়াইম আল-ইস্পাহানী (মৃত্যু ৪৩০ হি.) | সহীহ মুসলিম |
| ৪ | মুস্তাকরাজুল ইসমাঈলী আলা সহীহিল বুখারী | আবু বকর আল-ইসমাঈলী (মৃত্যু ৩৭১ হি.) | সহীহ বুখারী |
| ৫ | মুস্তাকরাজু ইবনি রাজিব আলা সুনানি আবি দাউদ | ইবনে রাজিব আল-বাযযায (রহ.) | সুনানে আবু দাউদ |
٨- ماذا تفهم بعلم تخريج الحديث؟ اكتب نشأته وتطوره וطرقه-
[৮. علم تخريج الحديث বলতে কী বুঝ? এর উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও পদ্ধতিসমূহ লেখ।]
ভূমিকা
সমসাময়িক যুগে কোনো উদ্ধৃত হাদিসের মূল উৎস ও বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক মাধ্যম হলো ‘ইলমুত তাখরিজ’ (علم التخريج)। এর মাধ্যমে যেকোনো অনুল্লেখিত বা অপ্রসিদ্ধ হাদিসের মূল সংকলন, সনদ ও হুকুম বের করা সম্ভব হয়।
তাখরিজের সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘তাখরিজ’ (تخريج) অর্থ বের করা, উন্মোচন করা বা উপস্থাপন করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা:
«الدلالة على موضع الحديث في مصادره الأصلية التي أخرجته بسنده، ثم بيان مرتبته عند الحاجة»
(হাদিসের মূল প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহ—যেখানে সনদসহ হাদিসটি সংকলিত হয়েছে—সেখান থেকে হাদিসের মূল স্থান নির্দেশ করা এবং ক্ষেত্রবিশেষে তার প্রামাণিকতার স্তর বা হুকুম বিশ্লেষণ করাকে তাখরিজুল হাদিস বলে)।
উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
প্রথম যুগে মুহাদ্দিসগণ মুখস্থ শক্তির বলে যেকোনো হাদিসের উৎস নিমিষেই বলে দিতে পারতেন। কিন্তু কালক্রমে যখন ফিকহ, তাফসীর ও সাহিত্যের কিতাবে সনদবিহীন হাদিসের উদ্ধৃতি বাড়তে থাকে, তখন পরবর্তী ওলামায়ে কেরাম তাখরিজের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেন। অষ্টম হিজরি শতক থেকে হাফিজ যাইনুদ্দীন ইরাকী, হাফিজ যাইলায়ী, ইবনে হাজার আসকালানী ও আস-সাখাবী (রহ.) তাখরিজের স্বতন্ত্র কিতাব সংকলন করে এ শাস্ত্রকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
তাখরিজ করার পাঁচটি আধুনিক ও সনাতন পদ্ধতি
১. সাহাবির নামের ভিত্তিতে তাখরিজ (التخريج عن طريق الراوي الأعلى): যদি হাদিসের বর্ণনাকারী সাহাবির নাম জানা থাকে, তবে মুসনাদ (যেমন মুসনাদে আহমদ) বা মু’জাম জাতীয় গ্রন্থের সাহায্যে সহজে হাদিস খুঁজে বের করা যায়।
২. হাদিসের প্রথম শব্দের ভিত্তিতে (التخريج عن طريق أول لفظ المتن): হাদিসের শুরুর শব্দ জানা থাকলে বর্ণানুক্রমিক গ্রন্থাবলি (যেমন ‘আল-জামি’উস সাগীর’, ‘কাশফুল খাফা’) ব্যবহার করা হয়।
৩. হাদিসের বিরল ও অপ্রসিদ্ধ শব্দের ভিত্তিতে (التخريج عن طريق لفظة غريبة): কনকর্ডেন্স বা ‘আল-মু’জামুল মুফাহরাস লি-আলফাযিল হাদিসিন নাবাবী’ ব্যবহার করে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ শব্দের মাধ্যমে হাদিসের পৃষ্ঠা ও নম্বর বের করা যায়।
৪. হাদিসের বিষয়বস্তু বা ফিকহি অধ্যায়ের ভিত্তিতে (التخريج عن طريق الموضوع): হাদিসের মূল প্রতিপাদ্য অনুযায়ী ফিকহি বিন্যাসে সাজানো কিতাব (সহীহ বুখারী, মুসলিম, সুনান গ্রন্থাবলি) থেকে তাখরিজ করা।
৫. হাদিসের কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে (التخريج بالنظر في صفة خاصة): হাদিসটি কুদসি, মুরসাল, মুত্তাফাক্ব আলাইহ বা মুতাওয়াতির কি না—তার ওপর রচিত বিশেষ গ্রন্থের সাহায্য নেওয়া।
مجموعة (ب) [খ-অংশ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন]
٩- وضح العبارة الآتية “الإسناد من الدين، لولا الإسناد لقال من شاء ما شاء”-
[৯. الإسناد من الدين، لولا الاسناد لقال من شاء ما شاء উক্তিটি বিশ্লেষণ কর।]
তাবেয়ী হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.)-এর এই কালজয়ী বাণীটি হাদিস সংরক্ষণের মূল ভিত্তিস্তম্ভ। ইসলামপূর্ব ধর্মে সনদের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় আসমানি কিতাবগুলোতে মানবীয় বিকৃতি ঘটেছিল। কিন্তু ইসলামে প্রতিটি বাণীর বিপরীতে বর্ণনাকারী পরম্পরা দাবি করার কারণে কেউ ইচ্ছামতো মনগড়া কথা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে চালাতে পারেনি। সনদ থাকার কারণেই সত্য ও মিথ্যার মধ্যে চিরস্থায়ী দেয়াল তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
١٠- بين أنواع الجروح الناشئة عن خلل العدالة-
[১০. عدالة এর অসম্পূর্ণতার কারণে সৃষ্ট جرح এর প্রকারগুলো বর্ণনা কর।]
রাবির আদালত বিনষ্টকারী পাঁচটি মৌলিক কারণ রয়েছে:
১. আল-কিযব (الكذب): হাদিস বর্ণনায় ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলা (এর বর্ণনা মওজু)।
২. আত-তুহমাতু বিল কিযব (التهمة بالكذب): সাধারণ জীবনে মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত হওয়া (এর বর্ণনা মাতরূক)।
৩. আল-ফিসক (الفسق): প্রকাশ্যে কবিরা গুনাহে লিপ্ত থাকা।
৪. আল-বিদ’আত (البدعة): মনগড়া আকিদা পোষণ ও প্রচার করা।
৫. আল-জাহালাত (الجهالة): বর্ণনাকারীর সত্তা বা চারিত্রিক গুণাবলি অজ্ঞাত থাকা।
١١- ما الفرق بين مشكل الحديث ومختلف الحديث؟ بين موضحا-
[১১. مختلف الحديث ও مشكل الحديث এর মধ্যে পার্থক্য কী? বিশদভাবে বর্ণনা কর।]
১. মুখতালিফুল হাদিস (مختلف الحديث): দুটি গ্রহণযোগ্য হাদিসের মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে বিরোধিতা পরিলক্ষিত হলেও মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ সমন্বয় (জম’অ), নাসখ বা তারজীহের মাধ্যমে তাদের মধ্যে সমাধান খুঁজে পান।
২. মুশকিলুল হাদিস (مشكل الحديث): হাদিসের কোনো বাক্য বা অর্থ বিবেক, যুক্তি বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠিত মূলনীতির সাথে আপাতদৃষ্টিতে বিরোধপূর্ণ মনে হয় এবং এর অন্তর্নিহিত জটিলতা উন্মোচনে সুগভীর ব্যাখ্যা ও শাস্ত্রীয় জ্ঞানের প্রয়োজন হয়।
١٢- اكتب أسماء أهم الكتب المؤلفة في علم أطراف الحديث-
[১২. علم أطراف الحديث এর উপর লিখিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলির নাম লেখ।]
সংজ্ঞা: ইলমু আতরাফিল হাদিস এমন একটি শাস্ত্র, যেখানে পুরো হাদিস উল্লেখ না করে কেবল হাদিসের সূচনাংশ বা এমন একটি অংশ উল্লেখ করা হয় যা দ্বারা পুরো হাদিসটি চিহ্নিত করা যায়, এবং সাথে সাথে বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত এর সকল সনদ ও সূত্রকে একত্র করা হয়।
বিখ্যাত গ্রন্থাবলি:
১. তুহফাতুল আশরাফ বি-মা’রিফাতিল আতরাফ: ইমাম ইউসুফ আল-মিযযী (রহ.)।
২. ইতরাফুল মুসনাদিল মু’তালী বি-আতরাফিল মুসনাদিল হান্বালী: হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)।
١٣- علق على علم الزوائد وأشهر المصنفات فيه-
[১৩. علم الزوائد ও এ বিষয়ক প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলির উপর টীকা লেখ।]
সংজ্ঞা: এমন শাস্ত্র যাতে কোনো মৌলিক বা প্রসিদ্ধ সংকলনে (যেমন কুতুবে সিত্তাহ) বিদ্যমান নেই এমন অতিরিক্ত সহীহ হাদিসগুলোকে অন্য কিতাব (মুসনাদ ও মু’জাম) থেকে একত্র করে সংকলন করা হয়।
দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ:
১. মাজমাউয যাওয়াইদ ওয়া মানবাউল ফাওয়াইদ: হাফিজ নূরুদ্দীন আল-হাইসামী (রহ.)।
২. ইতহাফুল খিয়ারাতিল মাহারা বি-যাওয়াইদিল মাসানীদিল আশারা: ইমাম শিহাবুদ্দীন আল-বূসীরী (রহ.)।
١٤- ما الفرق بين غريب الحديث والحديث الغريب؟
[১৪. غريب الحديث ও الحديث الغريب এর মধ্যকার পার্থক্য কী?]
| বিষয় | গারীবুল হাদিস (غريب الحديث) | আল-হাদিসুল গারীব (الحديث الغريب) |
|---|---|---|
| মূল ক্ষেত্র | হাদিসের মতন বা শব্দার্থের সাথে সম্পর্কিত। | হাদিসের সনদের সাথে সম্পর্কিত। |
| সংজ্ঞা | হাদিসের এমন কোনো জটিল, বিরল বা অপ্রচলিত আরবি শব্দ যার অর্থ অনুধাবন করতে ভাষার গভীর অভিধানের প্রয়োজন হয়। | যে হাদিসের সনদের কোনো এক স্তরে কেবল একজনমাত্র বর্ণনাকারী থাকেন। |
| উদাহরণ ও গ্রন্থ | ইমাম ইবনুল আসীর রচিত ‘আন-নিহায়াহ ফী গারীবিল হাদিস’। | «إنما الأعمال بالنيات» এর মতো একক সনদে বর্ণিত হাদিস। |
١٥- ما معنى التدليس لغة واصطلاحا؟ اكتب بالمثال-
[১৫. التدليس এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? উদাহরণসহ লেখ।]
আভিধানিক অর্থ: ‘তাদলীস’ শব্দটি ‘দালস’ (الدلس) থেকে গৃহীত, যার অর্থ অন্ধকার বা পণ্যের ত্রুটি ক্রেতার নিকট গোপন করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: সনদের কোনো ত্রুটি বা বর্ণনাকারীর নিম্ন মানকে গোপন করে হাদিসকে বাহ্যিকভাবে ত্রুটিমুক্ত দেখানোর অপচেষ্টাকে তাদলীস বলে।
উদাহরণ (তাদলীসুল ইসনাদ): কোনো রাবি এমন কোনো উস্তাদের কাছ থেকে হাদিসটি ‘আন’ (عن فلان) দ্বারা বর্ণনা করেন যার সাথে তাঁর সমকালীনতা বা সাক্ষাৎ ছিল, কিন্তু এই নির্দিষ্ট হাদিসটি তিনি তাঁর থেকে শোনেননি বরং মাঝে অন্য কোনো দুর্বল বর্ণনাকারী ছিলেন যাকে তিনি সনদে উল্লেখ করেননি।
١٦- تحدث عن الكتاب “معارف السنن” موجزا-
[১৬. معارف السنن গ্রন্থ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
গ্রন্থ পরিচয়: ‘মা’আরিফুস সুনান শরহু জামিয়িত তিরমিযী’ (معارف السنن شرح جامع الترمذي) হলো ইমাম তিরমিযীর বিখ্যাত সংকলনের এক সুবিশাল ও কালজয়ী ফিকহি ও হাদিস শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যাগ্রন্থ। এতে হানাফি মাযহাবের প্রমাণাদিসহ সকল মাযহাবের দলিলের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও হাদিসের রাবিদের পূর্ণ তাহক্বীক্ব উপস্থাপন করা হয়েছে।
রচয়িতা: এই মহান গ্রন্থের লেখক হলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকীহ আল্লামা মুহাম্মদ ইউসুফ বিন্নুরী (রহ.) [মৃত্যু ১৩৯৭ হি./১৯৭৭ খ্রি.]। তিনি পাকিস্তানের করাচিতে অবস্থিত বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া উলূমিল ইসলামিয়া বিন্নুরী টাউনের প্রতিষ্ঠাতা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
উলুমুল হাদিস ও মুসতালাহুল হাদিসের মধ্যে সম্পর্ক কী?
মুসতালাহুল হাদিস হলো উলুমুল হাদিসের মূল ভিত্তি ও পারিভাষিক কাঠামো, আর উলুমুল হাদিস হলো হাদিসের সনদ, মতন, ইতিহাস, তাখরিজ ও ব্যাখ্যা সংক্রান্ত সকল শাখার সমন্বিত রূপ।
উচ্চ সনদ (الإسناد العالي) কেন বেশি মর্যাদাপূর্ণ?
উচ্চ সনদে রাসুলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত পৌঁছাতে বর্ণনাকারীর সংখ্যা কম থাকায় মানুষের বিস্মৃতি বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের সম্ভাবনা সবচেয়ে কম থাকে।
মুস্তাকরাজ (المستخرجات) গ্রন্থের সবচেয়ে বড় সুবিধা কী?
মুস্তাকরাজ গ্রন্থ মূল গ্রন্থের বিকল্প ও নতুন সনদ উন্মোচন করে হাদিসের নির্ভরযোগ্যতা ও প্রামাণিকতাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে।
তাখরিজুল হাদিসের প্রধান উদ্দেশ্য কী?
যেকোনো অপ্রসিদ্ধ বা সনদহীন হাদিস মূল কোন কিতাবে কোন সনদে সংকলিত হয়েছে তা খুঁজে বের করা এবং এর বিশুদ্ধতার মান যাচাই করা।
গারীবুল হাদিস ও হাদিসে গারীবের পার্থক্য কী?
গারীবুল হাদিস হলো হাদিসের ভাষার অপ্রচলিত ও কঠিন শব্দের ব্যাখ্যা, আর হাদিসে গারীব হলো সনদের কোনো স্তরে একক রাবি থাকা সংক্রান্ত পরিভাষা।
মা’আরিফুস সুনান গ্রন্থটি কোন কিতাবের ব্যাখ্যাগ্রন্থ?
এটি ইমাম আবু ঈসা আত-তিরমিযী (রহ.) সংকলিত বিখ্যাত সুনানে তিরমিযী বা জামি’ তিরমিযীর একটি গভীর ও প্রামাণ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ।