ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২১
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: উলূমুল হাদিস (Ulumul Hadith – علوم الحديث)
বিষয় কোড: 202103 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
২০২১ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ‘উলূমুল হাদিস’ (علوم الحديث – 202103) পরীক্ষাটিতে হাদিসের ইলমে ইসনাদ, উলূমুল হাদিসের ইতিহাস ও প্রসিদ্ধ সংকলন, ইলমে ইলাল, জারহ ও তাদীল, যাওয়াইদুল হাদিস, নাসিখ-মানসূখ, আতরাফুল হাদিস, মুশকিলুল হাদিস ও মাআরিফুস সুনানের ওপর শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক ও গভীর গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান মূল্যায়ন করা হয়েছে। নিচে প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য সমাধান তুলে ধরা হলো।
مجموعة (الف) [ক-অংশ: রচনামূলক প্রশ্ন]
١- عرف علم الإسناد – ثم بين نشأته وتطوره-
[১. علم الإسناد এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের সবচেয়ে অনন্য ও শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হলো ‘ইলমুল ইসনাদ’ (علم الإسناد)। বিশ্ব ইতিহাসের কোনো ধর্মীয় গ্রন্থ বা ঐতিহ্যের কাছে সনদ ব্যবস্থার মতো এমন বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা পদ্ধতি নেই, যার মাধ্যমে সহস্রাব্দ পূর্বের একটি উক্তিকে তার প্রবক্তা পর্যন্ত নির্ভুলভাবে যাচাই করা যায়।
ইলমুল ইসনাদের সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘ইসনাদ’ (الإسناد) শব্দটি বাবে ইফ’আলের মাসদার, যার অর্থ কোনো কিছুর ওপর ভর করা, প্রমাণ হিসেবে পেশ করা বা উক্তিকে তার বক্তা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায়:
«علم يُعنى بذكر سلسلة الرواة الموصلة إلى متن الحديث ودراسة أحوالهم من حيث العدالة والضبط والاتصال والانقطاع»
(যে শাস্ত্র হাদিসের মূল বক্তব্য বা মতন পর্যন্ত পৌঁছানোর বর্ণনাকারী পরম্পরা এবং সেই রাবিগণের সততা, নির্ভুল স্মৃতিশক্তি, সনদের সংযোগ ও বিচ্ছিন্নতা নিয়ে গবেষণা করে, তাকে ইলমুল ইসনাদ বলে)।
উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস
১. নবুওয়াত যুগ: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় ওহীর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি এবং সাহাবিগণের পরম সততার কারণে সনদের পৃথক অনুসন্ধানের প্রয়োজন ছিল না। সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণীকে সর্বোচ্চ আমানত হিসেবে মুখস্থ রাখতেন এবং পরস্পরের নিকট বিশ্বস্ততার সাথে পৌঁছে দিতেন।
২. সাহাবা যুগ ও ফিতনার প্রাদুর্ভাব: খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যখন রাজনৈতিক বিভেদ ও বিভ্রান্ত দলের উত্থান ঘটে, তখন সনদ ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। সাহাবিগণ কোনো হাদিস শুনলে তার সূত্র জানতে চাইতেন। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন: “শুরুতে কেউ সনদের কথা জিজ্ঞাসা করত না; কিন্তু ফিতনা ছড়িয়ে পড়ার পর বলা হলো— তোমাদের বর্ণনাকারীদের নাম বলো, যাতে আহলে সুন্নাহর হাদিস গ্রহণ করা যায় এবং আহলে বিদআতের হাদিস বর্জন করা যায়।”
৩. তাবেয়ী যুগ ও রাবি যাচাই: সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, উরওয়াহ ইবনুয যুবায়ের, ইবনে শিহাব আয-যুহরী প্রমুখ প্রখ্যাত তাবেয়ীগণ সনদের ধারাবাহিকতা যাচাইয়ে কঠোর অনুশাসন আরোপ করেন। ইমাম যুহরীই সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.)-এর নির্দেশে সনদসহ হাদিস সংকলনের ঐতিহাসিক কাজ শুরু করেন।
৪. তাবে-তাবেয়ী ও স্বর্ণযুগ: ইমাম মালিকের ‘মুয়াত্তা’, ইমাম সুফিয়ান সাওরী, শু’বা ইবনুল হাজ্জাজ, এবং পরবর্তীতে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের যুগে এসে সনদ অনুসন্ধান একটি সুসংগঠিত, বৈজ্ঞানিক ও পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্রে পরিণত হয়, যার ওপর ভিত্তি করে সমগ্র হাদিস সাহিত্য দাঁড়িয়ে রয়েছে।
٢- ما المراد بعلوم الحديث؟ اذكر أهميتها مع ذكر أشهر الكتب المؤلفة في علوم الحديث-
[২. علوم الحديث বলতে কী বুঝ? علوم الحديث বিষয়ে রচিত প্রসিদ্ধ রচনাবলি উল্লেখপূর্বক এর গুরুত্ব আলোচনা কর।]
উলূমুল হাদিসের পরিচয়
সংজ্ঞা: ‘উলূম’ শব্দটি ‘ইলম’-এর বহুবচন, যার অর্থ বহুবিদ্যা বা শাস্ত্রসমূহ। আর ‘উলূমুল হাদিস’ হলো হাদিসের সাথে সংশ্লিষ্ট বহুমুখী শাস্ত্রের সমষ্টি। ইবনুস সালাহ আশ-শাহরাযূরী (রহ.)-এর মতে:
«هو علم يشتمل على معرفة القواعد والضوابط التي يُعرف بها أحوال السند والمتن، ويشمل عشرات الفنون المتعلقة بنقل الحديث ونقده وفهمه»
(এটি এমন এক শাস্ত্র যা সনদ ও মতনের অবস্থা নিরূপণের যাবতীয় নিয়মনীতি এবং হাদিসের বর্ণনা, যাচাই, শ্রেণিবিন্যাস ও উপলব্ধির সাথে জড়িত বহুবিধ শাস্ত্রের সমন্বয়কে নির্দেশ করে)। হাফিজ ইবনুস সালাহ তাঁর গ্রন্থে উলূমুল হাদিসের ৬৫টি স্বতন্ত্র শাখা বর্ণনা করেছেন।
উলূমুল হাদিসের গুরুত্ব
- সুন্নাহর বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ: ওহী বহির্ভূত মানবীয় ভ্রান্তি, অসততা বা বিকৃতি থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী ও কর্মকে অবিকল সংরক্ষণ করা।
- দলিলের ভিত্তি নির্ধারণ: শরিয়তের হালাল, হারাম ও মৌলিক আকিদা প্রমাণের জন্য কোন হাদিসটি গ্রহণযোগ্য (মাকবুল) আর কোনটি বর্জনীয় (মারদুদ), তা নিশ্চিত করা।
- মুজতাহিদগণের দিকদর্শন: ফিকহবিদ ও মুজতাহিদগণের ইস্তিম্বাত বা বিধান বের করার ক্ষেত্রে মূল পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করা।
উলূমুল হাদিসে রচিত কালজয়ী প্রসিদ্ধ রচনাবলি
- আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল বাইনার রাবী ওয়াল ওয়াঈ: আল-কাদী আবু মুহাম্মদ আল-হাসান আর-রামহুরমুযী (মৃত্যু ৩৬০ হি.)— উলূমুল হাদিসের ওপর রচিত সর্বপ্রথম স্বতন্ত্র গ্রন্থ।
- মা’রিফাতু উলূমিল হাদিস: আল-হাকিম আন-নিশাপুরী (মৃত্যু ৪০৫ হি.)— হাদিসের পরিভাষাসমূহকে ৫২টি শাখায় শ্রেণিবদ্ধ করেন।
- আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ: আল-খতীব আল-বাগদাদী (মৃত্যু ৪৬৩ হি.)— রিওয়ায়াত ও দেরায়াতের মূলনীতির অবিসংবাদিত প্রামাণ্য গ্রন্থ।
- মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ (উলূমুল হাদিস): তকীউদ্দীন আবু আমর ইবনুস সালাহ (মৃত্যু ৬৪৩ হি.)— যা পরবর্তী সকল মুহাদ্দিসের মৌলিক ভিত্তিমূল।
- তাদরীবুর রাবী ফী শারহি তাকরীবিন নাওয়াভী: ইমাম জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (মৃত্যু ৯১১ হি.)।
- নুখবাতুল ফিকার ও নুজহাতুন নাজার: হাফিজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হি.)।
٣- عرف علم علل الحديث، ثم بين أقسام العلة وأسبابها وأمثلتها-
[৩. علم علل الحديث এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর العلة এর প্রকারভেদ, কারণ ও উদাহরণসমূহ বর্ণনা কর।]
ইলমু ইলালিল হাদিসের সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘ইল্লাত’ (العلة) অর্থ রোগ, ত্রুটি বা অন্তরায়।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: হাদিস শাস্ত্রে বাহ্যিকভাবে নিখুঁত ও বিশুদ্ধ মনে হলেও সনদে বা মতনে এমন কোনো সূক্ষ্ম ও গোপন ত্রুটি থাকা যা হাদিসের বিশুদ্ধতাকে বিনষ্ট করে দেয়, তাকে ‘ইল্লাত’ বলে; আর এই সূক্ষ্ম ত্রুটি উদ্ঘাটনের বিজ্ঞানকে ‘ইলমু ইলালিল হাদিস’ বলে।
ইমাম ইবনুস সালাহ (রহ.) বলেন:
«العلة سبب خفي قادح في صحة الحديث مع أن الظاهر السلامة منه»
ইল্লাতের প্রকারভেদ
১. সনদগত ইল্লাত (علة في الإسناد): সনদের মধ্যে গোপন ক্রটি থাকা। যেমন: কোনো মুনকাতি’ হাদিসকে বাহ্যিকভাবে মুত্তাসিল বা কোনো মাওকুফ হাদিসকে মারফু’ হিসেবে বর্ণনা করা।
২. মতনগত ইল্লাত (علة في المتن): সনদের পাশাপাশি মতনের মূল পাঠের মধ্যে অজ্ঞাত শব্দ বা বাক্যের অসংগতি যুক্ত হওয়া।
৩. মারাত্মক ক্ষতিকর ইল্লাত (علة قادحة): যে ত্রুটি হাদিসের বিশুদ্ধতাকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেয় (যেমন অজ্ঞাত রাবির অনুপ্রবেশ)।
৪. ক্ষতিহীন ইল্লাত (علة غير قادحة): যে ত্রুটি সনদে ঘটলেও মূল হাদিসের গ্রহণযোগ্যতায় কোনো বাধা সৃষ্টি করে না (যেমন একজন নির্ভরযোগ্য রাবির বদলে সমমানের অপর রাবির নাম চলে আসা)।
ইল্লাত সৃষ্টির কারণসমূহ
১. বর্ণনাকারীর স্মৃতিভ্রম বা ধারণার ভুল (ওহাম – الوهم)।
২. মুরসাল বা মুনকাতি’ হাদিসকে ভুলে মুত্তাসিল সনদে জুড়ে দেওয়া।
৩. একটি সনদের অংশবিশেষ অপর কোনো ভিন্ন হাদিসের মতনের সাথে একীভূত করা (ইদরাজ – الإدراج)।
৪. রাবির নামের সমরূপতা বা সাদৃশ্যের কারণে ভুল ব্যক্তিকে নির্ভরযোগ্য মনে করা।
উদাহরণ
যেমন বিখ্যাত একটি বর্ণনা রয়েছে: “ক্রেতা ও বিক্রেতা বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত চুক্তির ইখতিয়ার রাখে।” এই হাদিসটিতে জনৈক রাবি বর্ণনাকারী সুফিয়ান সাওরীকে অন্য সুফিয়ানের সাথে গুলিয়ে ফেলে সনদে বিভ্রাট ঘটিয়েছিলেন, যা সূক্ষ্ম পর্যালোচনায় মুহাদ্দিসগণ চিহ্নিত করেছেন।
٤- ما المراد بعلم الجرح والتعديل؟ ثم بين أنواعه ومراتب الجرح والتعديل-
[৪. علم الجرح والتعديل বলতে কী বোঝায়? অতঃপর এর প্রকারভেদ ও الجرح والتعديل এর স্তরসমূহ বর্ণনা কর।]
ইলমুল জারহ ওয়াত তা’দীলের পরিচয়
আভিধানিক অর্থ: ‘জারহ’ (الجرح) অর্থ ক্ষতবিক্ষত করা বা দোষত্রুটি প্রকাশ করা। আর ‘তা’দীল’ (التعديل) অর্থ ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত সাব্যস্ত করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে শাস্ত্রের মাধ্যমে হাদিসের বর্ণনাকারীদের (রাবিদের) সততা, দ্বীনদারি, তাকওয়া, স্মৃতিশক্তি এবং তাদের মধ্যে থাকা কোনো দোষ বা গুণ নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক আলোচনা করা হয়, যার মাধ্যমে তাদের বর্ণিত হাদিস গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, তাকে ‘ইলমুল জারহ ওয়াত তা’দীল’ বলে।
জারহ ও তা’দীলের স্তরসমূহ (ইবনে আবি হাতিম ও ইবনে হাজারের বিন্যাস)
তা’দীলের স্তরসমূহ (মর্যাদাক্রম অনুযায়ী):
- ১ম স্তর (সর্বোচ্চ স্তর): চরম প্রশংসাসূচক শব্দ। যেমন: أوثق الناس (মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য), إليه المنتهى في التثبت।
- ২য় স্তর: গুণবাচক শব্দের পুনরাবৃত্তি। যেমন: ثقة ثقة (নির্ভরযোগ্য, নির্ভরযোগ্য), ثقة ثبت।
- ৩য় স্তর: একক নির্ভরযোগ্য শব্দ। যেমন: ثقة বা متقن বা عدل।
- ৪র্থ স্তর: সামান্য কম প্রশংসাসূচক। যেমন: صدوق (সত্যবাদী), لا بأس به (কোনো সমস্যা নেই)।
- ৫ম স্তর: গ্রহণযোগ্যতার নিম্নসীমা। যেমন: محله الصدق (তার স্থান সততায়)।
- ৬ষ্ঠ স্তর: দুর্বলতার নিকটবর্তী। যেমন: صالح الحديث বা يُكتب حديثه।
জারহের স্তরসমূহ (তীব্রতা অনুযায়ী):
- ১ম স্তর (হালকা দোষ): যেমন: ليّن الحديث (স্মৃতিতে সামান্য শিথিলতা), فيه مقال।
- ২য় স্তর: যার দ্বারা দলিল দেওয়া যায় না। যেমন: لا يُحتج به, ضعيف।
- ৩য় স্তর: চরম দুর্বল। যেমন: ضعيف جدا, واهٍ بمرة।
- ৪র্থ স্তর: পরিত্যক্ত। যেমন: متروك الحديث (পরিত্যক্ত), ساقط।
- ৫ম স্তর: মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। যেমন: متهم بالكذب বা يضع الحديث।
- ৬ষ্ঠ স্তর (চরমতম জারহ): সরাসরি মিথ্যাবাদী ও জালিয়াত। যেমন: كذاب (চরম মিথ্যাবাদী), دجال (প্রতারক)।
٥- عرف زوائد الحديث ثم بين أنواعها وفوائدها مع ذكر أهم الكتب المؤلفة فيه-
[৫. زوائد الحديث এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এর প্রকারভেদ, উপকারিতাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলির বর্ণনা দাও।]
যাওয়াঈদুল হাদিসের সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘যাওয়াঈদ’ (زوائد) শব্দটি ‘যায়েদাহ’-এর বহুবচন, যার অর্থ অতিরিক্ত বা বর্ধিত সংকলন।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: কোনো মৌলিক বা মূল হাদিসগ্রন্থের (যেমন সিহাহ সিত্তাহ) ওপর ভিত্তি করে অপর কোনো গ্রন্থে থাকা এমন সব হাদিসকে আলাদাভাবে সংকলন করা, যা মূল গ্রন্থাবলিতে নেই বা যার সনদ সম্পূর্ণ ভিন্ন সূত্রে এসেছে, তাকে ‘যাওয়াঈদুল হাদিস’ (زوائد الحديث) বলে।
যাওয়াঈদের প্রকারভেদ
১. মতনগত যাওয়াঈদ (زوائد في المتن): এমন হাদিস যা মূল গ্রন্থে একেবারেই সংকলিত হয়নি, তার পূর্ণ পাঠই নতুন ও অতিরিক্ত।
২. সনদগত যাওয়াঈদ (زوائد في الإسناد): হাদিসের মূল বক্তব্য বা মতনটি মূল গ্রন্থে বিদ্যমান, কিন্তু নতুন গ্রন্থে এমন এক ভিন্ন সনদে বা সাহাবীর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যা মূল কিতাবে ছিল না।
৩. অর্থ ও বাক্যগত পরিবর্ধন (زوائد بزيادة معنى): মূল হাদিসের চেয়ে অতিরিক্ত কোনো বিশেষ বাক্য বা শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবর্ধিত থাকা।
যাওয়াঈদুল হাদিসের উপকারিতা
- হাদিস গবেষণায় সহজলভ্যতা: মুসনাদে আহমদ, বাযযার বা তাবারানীর মতো বিশাল বিশাল কিতাব তন্ন তন্ন করে খোঁজার কষ্ট লাঘব করে অতিরিক্ত হাদিসগুলো সহজে এক মলাটে পাওয়া যায়।
- সনদের শক্তি বৃদ্ধি: সিহাহ সিত্তাহর কোনো দুর্বল বা গারীব হাদিসের বিপরীতে যাওয়াঈদের কিতাব থেকে নতুন সনদ পাওয়া গেলে হাদিসটি হাসান বা সহীহ লি-গাইরিহী স্তরে উন্নীত হতে পারে।
- লুপ্তপ্রায় বর্ণনার সংরক্ষণ: বহু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গেলেও যাওয়াঈদের কিতাবের মাধ্যমে সেই অমূল্য বর্ণনাগুলো উম্মাহর নিকট টিকে রয়েছে।
যাওয়াঈদের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহ
- মাজমাউয যাওয়াইদ ওয়া মানবাউল ফাওয়াইদ: ইমাম আল-হাইসামী (মৃত্যু ৮০৭ হি.)— এটি এ শাস্ত্রের রাজকীয় গ্রন্থ, যেখানে আহমদ, বাযযার, আবু ইয়া’লা ও তাবারানীর তিন মু’জাম থেকে সিহাহ সিত্তাহর অতিরিক্ত হাদিস সংকলন করা হয়েছে।
- ইতহাফুল খিয়ারাহ আল-মাহারাহ বি-যাওয়াঈদুল মাসানীদুল আশারাহ: ইমাম শিহাবুদ্দীন আল-বুসীরী (মৃত্যু ৮৪০ হি.)।
- আল-মাতালিবুল আলিয়াহ বি-যাওয়াঈদুল মাসানীদের সামানিয়াহ: হাফিজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.)।
٦- تحدث عن علم ناسخ الحديث ومنسوخه وأهميته مع ذكر شروط النسخ وأقسامه-
[৬. علم ناسخ الحديث ومنسوخه এর সংজ্ঞা ও এর গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনাপূর্বক النسخ এর শর্তাবলি ও প্রকারসমূহ বর্ণনা কর।]
নাসিখ ও মানসূখের পরিচয়
আভিধানিক অর্থ: ‘নাসখ’ (النسخ) অর্থ বিলোপ করা, স্থানান্তর করা বা রহিত করা। আর ‘নাসিখ’ হলো রহিতকারী এবং ‘মানসূখ’ হলো রহিতকৃত।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: পরবর্তী সময়ে অবতীর্ণ কোনো শরিয়তসম্মত প্রমাণের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কোনো শরিয়তের কার্যকর বিধানকে উঠিয়ে নেওয়া বা সমাপ্ত ঘোষণা করাকে নাসখ বলে। আর যে শাস্ত্রে হাদিসের মাধ্যমে হাদিসের এমন বিধান রদবদল আলোচিত হয় তাকে ‘ইলমু নাসিখিল হাদিস ওয়া মানসূখিহ’ বলে।
এ শাস্ত্রের গুরুত্ব
দ্বীনের সঠিক বিধান অনুসরণের জন্য নাসিখ-মানসূখ জানা ফরজ। যদি কোনো মুফতী বা আলেম রহিতকৃত হাদিসের ওপর ভিত্তি করে ফতোয়া দেন, তবে তিনি মারাত্মক ভুলের শিকার হবেন। হযরত আলী (রা.) এক কিসসাকারকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “তুমি কি নাসিখ ও মানসূখ চেন?” সে বলল: “না।” আলী (রা.) বললেন: “তবে তুমি নিজেও ধ্বংস হলে এবং অন্যদেরও ধ্বংস করলে!”
নাসখের শর্তাবলি
- উভয় হাদিসের মধ্যে সরাসরি বাস্তব সাংঘর্ষিকতা থাকতে হবে এবং কোনোভাবেই তাদের মধ্যে সমন্বয় (তাতবীক) সম্ভব না হওয়া।
- নাসিখ হাদিসটি অবতীর্ণ বা উচ্চারণের দিক থেকে মানসূখ হাদিসের চেয়ে সুনির্দিষ্টভাবে পরবর্তী সময়ের হতে হবে।
- উভয় হাদিসই সনদের বিচারে সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে; কোনো দুর্বল হাদিস দ্বারা সহীহ হাদিস রহিত হতে পারে না।
- বিধানটি এমন বিষয়ের হতে হবে যা রহিত হওয়া সম্ভব (যেমন আদেশ বা নিষেধমূলক আমল); কোনো আকিদা, ঈমান বা ঐতিহাসিক সংবাদে নাসখ কার্যকর হয় না।
নাসখের প্রকারভেদ
১. কুরআন দ্বারা কুরআনের নাসখ: যেমন কেবলা পরিবর্তনের আয়াত।
২. হাদিস দ্বারা হাদিসের নাসখ: যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “আমি পূর্বে তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা কবর জিয়ারত করো।”
৩. কুরআন দ্বারা হাদিসের নাসখ: যেমন আশুরার রোজার আবশ্যকতা রমজানের রোজার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে নফলে রূপান্তরিত হওয়া।
مجموعة (ب) [খ-অংশ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন]
٧- عرف علم اطراف الحديث – ثم اكتب اهم الكتب المؤلفة فيه-
[৭. علم اطراف الحديث এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এ শাস্ত্রের ওপর রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলির নাম লিখ।]
ইলমু আতরাফিল হাদিসের সংজ্ঞা
সংজ্ঞা: যে বিশেষ পদ্ধতিতে হাদিসের পূর্ণ মতন উল্লেখ না করে কেবল হাদিসের সূচনালগ্ন বা মূল বক্তব্য নির্দেশক একটি অংশ (طرف) উল্লেখ করা হয়, এবং সেই বক্তব্যের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গ্রন্থের সমস্ত সনদ ও রেওয়ায়েতের সূত্র একত্রিত করে উপস্থাপন করা হয়, তাকে ‘ইলমু আতরাফিল হাদিস’ বলে।
আতরাফুল হাদিসের প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি
- তুহফাতুল আশরাফ বি-মা’রিফাতি আতরাফ: ইমাম জামালুদ্দীন আল-মিযযী (মৃত্যু ৭৪২ হি.)— সিহাহ সিত্তাহ ও তার সংলগ্ন গ্রন্থাবলির ওপর রচিত আতরাফ শাস্ত্রের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ সংকলন।
- আতরাফুস সাহীহাইন: ইমাম আবু মাসউদ দিমাসকী এবং খালাফ আল-ওয়াসিতী।
- যাখায়েরুল মাওয়ারিস ফী দিলালাতি আলাল মাওয়াদিস: শায়খ আব্দুল গণী আন-নাবলুসী।
- ইতরাফুল মুসনাদ আল-মু’তালী বি-আতরাফ আল-মুসনাদ আল-হাম্বালী: হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)।
٨- ما الفرق بين مشكل الحديث ومختلف الحديث؟ بين موضحا-
[৮. مختلف الحديث ও مشكل الحديث এর মধ্যে পার্থক্য কী? বিশদভাবে বর্ণনা কর।]
| তুলনার বিষয় | মুখতালিফুল হাদিস (مختلف الحديث) | মুশকিলুল হাদিস (مشكل الحديث) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | দুটি গ্রহণযোগ্য (মাকবুল) হাদিস যখন বাহ্যিকভাবে একে অপরের বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে। | একটিমাত্র হাদিসের অর্থ বুঝতে বা যুক্তির সাথে মেলাতে গিয়ে যখন গভীর জটিলতা ও সংশয় দেখা দেয়। |
| বিরোধের পরিধি | বিরোধ সর্বদা হাদিসের সাথে অন্য কোনো সমকক্ষ হাদিসের মধ্যে ঘটে। | বিরোধ হাদিসের সাথে সাধারণ বিবেক, কুরআনের সাধারণ নীতি, বিজ্ঞানের বাস্তবতা বা বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে হতে পারে। |
| সমাধান পদ্ধতি | প্রথমত সমন্বয় (আল-জাম’), ব্যর্থ হলে নাসখ নিরূপণ, অতঃপর তারজীহ বা প্রাধান্য প্রদান। | আরবি ভাষার অলঙ্কার, রূপক অর্থ (মাজায), প্রেক্ষাপট ও বৈজ্ঞানিক বা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে জট খোলা হয়। |
| প্রসিদ্ধ গ্রন্থ | ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর ‘ইখতিলাফুল হাদিস’, ইবনে কুতাইবার ‘তা’বীলু মুখতালিফিল হাদিস’। | ইমাম তাহাবী (রহ.)-এর ‘মুশকিলুল আসার’ ও ‘শারহু মাআনিল আসার’। |
٩- ماذا تفهم بعلم غريب الحديث؟ اذكر أهمية هذا العلم-
[৯. علم غريب الحديث বলতে কী বোঝ? এ বিষয়ের গুরুত্ব আলোচনা কর।]
ইলমু গারীবিল হাদিসের পরিচয়
সংজ্ঞা: রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিগণের পবিত্র বাণীর মধ্যে ব্যবহৃত এমন সব বিরল, অপ্রচলিত, গভীর ব্যঞ্জনাময় বা প্রাচীন আরবি শব্দাবলি— যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সরাসরি অনুধাবন করা কঠিন এবং যার সঠিক অর্থ উদঘাটনের জন্য বিশুদ্ধ প্রাচীন আরবি অভিধান ও ব্যাকরণের গভীর সাহায্য প্রয়োজন হয়, তাকে ‘গারীবুল হাদিস’ বলে; আর এর বিশদ আলোচনাকে ‘ইলমু গারীবিল হাদিস’ বলে।
এ শাস্ত্রের গুরুত্ব
- ভুল ব্যাখ্যা থেকে সুন্নাহর সুরক্ষা: গভীর ও প্রাচীন শব্দের মনগড়া অর্থ করলে শরিয়তের বিধান ও রাসুল (সা.)-এর উদ্দেশ্য বিকৃত হয়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে, যা গারীবুল হাদিস রক্ষা করে।
- আরবি ভাষাতত্ত্বের পূর্ণতা: রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানবজাতির মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ আরবি ভাষী (أفصح العرب)। তাঁর গভীর বাক্যশৈলী উপলব্ধি করার জন্য এ শাস্ত্র অপরিহার্য।
- প্রসিদ্ধ গ্রন্থ: ইমাম আবু উবাইদ কাসিম ইবনে সাল্লামের ‘গারীবুল হাদিস’, এবং ইবনুল আসীরের বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘আন-নিহায়াহ ফী গারীবিল হাদিস ওয়াল আসার’।
١٠- علق على رواية الحديث ودراية الحديث مختصرا-
[১০. رواية الحديث ও دراية الحديث সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত টীকা লেখ।]
রেওয়ায়েতুল হাদিস (رواية الحديث)
পরিচয়: রাসুলুল্লাহ (সা.), সাহাবা ও তাবেয়ীগণের বাণী, কর্ম, মৌনসম্মতি ও গুণাবলিকে যথাযথভাবে মুখস্থ রাখা, নির্ভুলভাবে লিখে সংরক্ষণ করা এবং বিশ্বস্ত সনদের মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের নিকট হুবহু পৌঁছে দেওয়াকে ‘ইলমু রিওয়ায়াতিল হাদিস’ বলে।
মূল আলোচ্য বিষয়: সনদের ধারাবাহিকতা, অক্ষুণ্ণ পাঠ এবং নির্ভুল শব্দবিন্যাস রক্ষা করা।
দেরায়াতুল হাদিস (دراية الحديث)
পরিচয়: হাদিসের অভ্যন্তরীণ মর্ম, তাৎপর্য, গভীর অন্তর্নিহিত বিধান, সত্যতা, সনদের যৌক্তিক বিশ্লেষণ এবং তা শরিয়তের মৌলিক মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না— তা গভীর বিবেক ও ফিকহি প্রজ্ঞার মাধ্যমে অনুধাবন করার বিদ্যাকে ‘ইলমু দিরায়াতিল হাদিস’ বলে।
মূল আলোচ্য বিষয়: মতনের বিশুদ্ধতা ও অন্তর্নিহিত শরিয়তের হেকমত অন্বেষণ করা।
١١- اكتب عن علم شرح الحديث وأقسامه موجزا-
[১১. علم شرح الحديث ও এর প্রকার সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখ।]
ইলমু শারহিল হাদিসের পরিচয়
সংজ্ঞা: যে শাস্ত্রে হাদিসের শব্দার্থ, ব্যাকরণগত কাঠামো, বালাগাত বা সাহিত্যমান, হাদিস থেকে উৎসারিত ফিকহি বিধান, মতনের অন্তর্নিহিত শিক্ষা এবং সমকালীন বাস্তবতায় তার প্রয়োগ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাকে ‘ইলমু শারহিল হাদিস’ বলে।
শারহ বা ব্যাখ্যার প্রকারভেদ
- শারহে মুফাররাদাত (ভাষাগত ব্যাখ্যা): হাদিসের জটিল ও কঠিন শব্দগুলোর আভিধানিক অর্থ বিশ্লেষণ।
- শারহে তাফসিলী বা মুতাওয়াস্সিত (বিশদ ব্যাখ্যা): প্রতিটি শব্দের ব্যাকরণ, ই’রাব, সনদ ও মতনের বিধান নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা (যেমন ইবনে হাজারের ‘ফাতহুল বারী’)।
- শারহে ফিকহী (আইনগত ব্যাখ্যা): হাদিস থেকে বিভিন্ন মাযহাবের ফিকহি দলিল ও তুলনামূলক বিতর্ক উপস্থাপন (যেমন ইমাম নববীর ‘শারহু সহীহ মুসলিম’)।
- শারহে ইজমালী (সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ): সাধারণ পাঠকের সুবিধার্থে হাদিসের মূল শিক্ষাকে সংক্ষেপে তুলে ধরা।
١٢- اكتب ما تعرف عن الكتاب ‘معارف السنن’ وصاحبه-
[১২. ‘معارف السنن’ শীর্ষক গ্রন্থ ও এর লেখক সম্পর্কে যা জান লেখ।]
গ্রন্থটির পরিচিতি
‘মাআরিফুস সুনান শারহু সুনানিত তিরমিযী’ (معارف السنن شرح سنن الترمذي) হলো ইমাম আত-তিরমিযী (রহ.)-এর জগদ্বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ ‘জামি’উত তিরমিযী’-এর ওপর রচিত বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ, সুবিশাল ও গভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ। এতে হানাফি মাযহাবের গভীর ফিকহি বিশ্লেষণ, দলিলের সুদৃঢ় পর্যালোচনা এবং অন্যান্য সকল মাযহাবের মতামতের প্রতি পরম ইনসাফ প্রদর্শন করা হয়েছে।
গ্রন্থকারের পরিচিতি
এ কালজয়ী গ্রন্থের প্রণেতা হলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আল্লামা, মুহাদ্দিস ও ফকীহ শায়খ আল্লামা মুহাম্মদ ইউসুফ বানূরী (রহিমাহুল্লাহ) [১৯০৮ – ১৯৭৭ খ্রি.]। তিনি ছিলেন শায়খুল ইসলাম আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রধান শাগরেদ। পাকিস্তানের করাচিতে বিশ্বখ্যাত দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ‘জামিআতুল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ আল্লামা বানূরী টাউন’ তাঁর হাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর অসাধারণ ধীশক্তি, আরবি ভাষার প্রাঞ্জলতা ও হাদিসের তাহকীকে তাঁর দক্ষতা ‘মাআরিফুস সুনান’ গ্রন্থে ফুটে উঠেছে, যা আরব ও অনারব সমগ্র মুসলিম বিশ্বে উচ্চ সমাদৃত।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. উলূমুল হাদিস ও মুসতালাহুল হাদিসের মধ্যে সম্পর্ক কী?
মুসতালাহুল হাদিস হলো উলূমুল হাদিসের একটি অত্যন্ত মৌলিক ও প্রধান শাখা; উলূমুল হাদিস একটি বৃহত্তর পরিমণ্ডল যা পরিভাষা ছাড়াও রিজাল শাস্ত্র, তারীখ, নাসখ ও ব্যাখ্যাগ্রন্থকে ধারণ করে।
২. জারহ ও তাদীল শাস্ত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নীতি কোনটি?
যদি একই রাবির ক্ষেত্রে জারহ ও তাদীল পরস্পরবিরোধী হয়, তবে সুনির্দিষ্ট কারণসহ ব্যাখ্যায়িত জারহ (الجرح المفسر) তাদীল বা সাধারণ প্রশংসার ওপর অগ্রাধিকার পায়।
৩. যাওয়াঈদুল হাদিসের সংকলন থেকে কীভাবে উপকৃত হওয়া যায়?
যাওয়াঈদ কিতাবের মাধ্যমে সহজে অপ্রচলিত বিরল হাদিস এক মলাটে পাওয়া যায় এবং নতুন ভিন্ন সনদ লাভের মাধ্যমে হাদিসের মান যাচাই ও সনদের শক্তি পরীক্ষা করা সম্ভব হয়।
৪. মুখতালিফুল হাদিসের বিরোধ নিরসনের প্রথম পদক্ষেপ কী?
প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হলো ‘আল-জাম’ ওয়াত তাওফীক’ (الجمع والتوفيق) বা উভয়ের মধ্যে সুন্দর সমন্বয় সাধন করা, যেন কোনো হাদিসকেই বাতিল না করে উভয়টির ওপর আমল করা যায়।
৫. রেওয়ায়েতুল হাদিস ও দেরায়াতুল হাদিসের সমন্বয় কেন জরুরি?
রেওয়ায়েত হাদিসের খাঁটি পাঠকে বিশ্বস্ত সনদের মাধ্যমে সংরক্ষণ করে, আর দেরায়াত সেই পাঠের গভীর বিধান ও শরিয়তের হেকমত উপলব্ধি করতে সাহায্য করে; উভয়ের সমন্বয় ছাড়া দ্বীনের সঠিক জ্ঞান সম্ভব নয়।
৬. আল্লামা ইউসুফ বানূরী (রহ.)-এর ‘মাআরিফুস সুনান’-এর অনন্য বৈশিষ্ট্য কী?
এটি ইমাম তিরমিযীর গ্রন্থের এমন এক গভীর তাহকীকী আরবি ব্যাখ্যা, যা প্রাচীন ও আধুনিক জটিল মাসআলার সমাধান এবং হানাফি ফিকহের দলিলের সুদৃঢ় যৌক্তিক ভিত্তি উপস্থাপন করেছে।