ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২০
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: মুসতালাহুল হাদিস (Mustalahul Hadith)
বিষয় কোড: 202101 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
২০২০ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মুসতালাহুল হাদিস (Mustalahul Hadith – 202101) পরীক্ষাটি মূলত হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা, সনদ ও মতন যাচাইয়ের মূলনীতি এবং রাবিদের গ্রহণযোগ্যতার শর্তাবলি মূল্যায়নের লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে। প্রশ্নপত্রটি দুটি অংশে বিভক্ত: مجموعة (أ) (রচনামূলক – চারটির উত্তর দিতে হবে, মান ৪ × ১৫ = ৬০) এবং مجموعة (ب) (সংক্ষিপ্ত – চারটির উত্তর দিতে হবে, মান ৪ × ৫ = ২০)। নিচে পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও গবেষণার সুবিধার্থে সকল প্রশ্নের প্রামাণ্য ও বিস্তারিত সমাধান উপস্থাপন করা হলো।
مجموعة (أ) [ক-অংশ: রচনামূলক প্রশ্ন]
١- عرف علم مصطلح الحديث متحدثا عن موضوعه وغرضه ونشأته وتطوره-
[১. علم مصطلح الحديث এর সংজ্ঞা, আলোচ্যবিষয়, উদ্দেশ্য, উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি জ্ঞানকাণ্ডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সূক্ষ্মতম শাখা হলো ‘ইলমু মুসতালাহিল হাদিস’ (علم مصطلح الحديث)। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণী, কর্ম ও মৌনসম্মতিকে অবিকৃতভাবে পরবর্তী প্রজন্মের নিকট পৌঁছানো এবং সহীহ হাদিসকে দুর্বল ও জাল বর্ণনা থেকে পৃথক করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিই এ শাস্ত্রের মূল লক্ষ্য।
ইলমু মুসতালাহিল হাদিসের সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘মুসতালাহ’ (مصطلح) শব্দটি বাবে ইফতি’আল থেকে ইসমে মাফ’উল, যার অর্থ পারিভাষিক রূপ দান করা বা বিশেষ অর্থে গ্রহণ করা। আর ‘হাদিস’ (الحديث) অর্থ নতুন বা কথা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: হাফিজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘নুখবাতুল ফিকার’-এ বলেন:
«علم بأصول وقواعد يعرف بها أحوال السند والمتن من حيث القبول والرد»
(ইলমু মুসতালাহিল হাদিস হলো এমন কিছু অকাট্য মূলনীতি ও নিয়মের জ্ঞান, যার মাধ্যমে সনদ এবং মতনের গ্রহণযোগ্যতা ও বর্জনীয়তার অবস্থা নিরূপণ করা যায়)।
আলোচ্য বিষয় (موضوعه)
মুসতালাহুল হাদিসের মূল আলোচ্য বিষয় হলো হাদিসের ‘সনদ’ (Sanad – বর্ণনাকারী পরম্পরা) এবং ‘মতন’ (Matn – মূল বক্তব্য বা বাণী), যেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা (قبول) অথবা বর্জনীয়তা (رد) পর্যালোচনা করা হয়।
উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য (غرضه)
১. সহীহ ও যয়ীফ পৃথকীকরণ: গ্রহণযোগ্য ও অগ্রহণযোগ্য হাদিসকে সুনির্দিষ্ট দলিলের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা।
২. সুন্নাহর সংরক্ষণ: নবুওয়াতের পবিত্র শিক্ষাকে মানবীয় বিকৃতি, অমূলক সংযোজন ও জাল হাদিসের কলুষতা থেকে সুরক্ষিত রাখা।
৩. শরীয়তের বিধান নির্ধারণ: ফিকহি মাসআলা উদ্ভাবন ও আমলের জন্য প্রামাণ্য হাদিস চিহ্নিত করা।
৪. ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তি: সহীহ সুন্নাহর অনুসরণের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ (نشأته وتطوره)
১. নবুওয়াত ও সাহাবা যুগ: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরাম সরাসরি ওহীর ধারকের কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করতেন। সাহাবা যুগে বিশেষত হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাত পরবর্তী রাজনৈতিক ফিতনার সময়ে বর্ণনাকারীর সনদ চাওয়ার প্রচলন শুরু হয়। ইমাম ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন, “প্রথমে সনদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হতো না; কিন্তু ফিতনা দেখা দেওয়ার পর বলা হতে লাগল— তোমাদের রাবিদের পরিচয় দাও।”
২. তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ী যুগ: এ যুগে ইমাম যুহরী (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.), শু’বা ইবনুল হাজ্জাজ এবং ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন প্রমূখ মুহাদ্দিসগণ সনদ পর্যালোচনা ও জারহ-তা’দিলের ধারা সুসংহত করেন।
৩. গ্রন্থবদ্ধকরণের সূচনা: ইমাম শাফেয়ী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘আর-রিসালাহ’ (الرسالة)-তে প্রথম মুসতালাহুল হাদিসের নিয়মাবলি লিপিবদ্ধ করেন।
৪. স্বতন্ত্র গ্রন্থের যুগ: আল-কাদী আবু মুহাম্মদ আল-রামহুরমুযী (মৃত্যু ৩৬০ হি.) সর্বপ্রথম ‘আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল বাইনার রাবি ওয়াল ওয়ায়ী’ (المحدث الفاصل بين الراوي والواعي) গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। পরবর্তী সময়ে হাকিম নিশাপুরী, খতীব বাগদাদী, ইবনুস সালাহ এবং হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী এ শাস্ত্রকে পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্তে পৌঁছে দেন।
উপসংহার
মুসতালাহুল হাদিস কেবল একটি শাস্ত্র নয়, বরং এটি ইসলামি সভ্যতার সেই ঐতিহাসিক নিরপেক্ষ ও কঠোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যা পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্ম বা প্রাচীন ইতিহাসে অনুপস্থিত।
٢- ما الحديث المشهور؟ وما الفرق بينه وبين المستفيض؟ بين حكمهما بالإيضاح-
[২. হাদিসে মাশহুর কাকে বলে? হাদিসে মাশহুর ও হাদিসে মুসতাফিয এর মধ্যে পার্থক্য কী? উভয় হাদিসের হুকুম স্পষ্টভাবে বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
খবরে ওয়াহিদ (أخبار الآحاد)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকার হলো হাদিসে মাশহুর (الحديث المشهور)। বর্ণনাকারীর সংখ্যার দিক থেকে এটি মুতাওয়াতিরের কাছাকাছি না পৌঁছালেও বিপুল গ্রহণযোগ্যতার অধিকারী।
হাদিসে মাশহুরের সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘মাশহুর’ (مشهور) শব্দটি ‘শুহরত’ (شهرة) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ প্রসিদ্ধ, সুবিদিত বা প্রকাশিত।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন:
«هو ما رواه ثلاثة فأكثر في كل طبقة، ما لم يبلغ حد التواتر»
(যে হাদিসের সনদের প্রতিটি স্তরে কমপক্ষে তিনজন বা ততোধিক রাবি হাদিস বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তা মুতাওয়াতিরের স্তরে পৌঁছেনি, তাকে হাদিসে মাশহুর বলে)।
উদাহরণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
«المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده»
“প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে।” (সহীহ বুখারী)।
হাদিসে মাশহুর ও হাদিসে মুসতাফিয (المستفيض)-এর পার্থক্য
মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের মাঝে মাশহুর ও মুসতাফিযের সম্পর্কের ব্যাপারে তিনটি মতামত রয়েছে:
১. সমার্থক (مترادفان): একদল মুহাদ্দিসের মতে মাশহুর ও মুসতাফিয একই পরিভাষা। যা-ই মাশহুর, তা-ই মুসতাফিয।
২. আম ও খাস মুতলাক (أعم وأخص مطلقاً): ইমাম ইবনুস সালাহ ও অধিকাংশ গবেষকদের মতে, মুসতাফিয হলো বিশেষ এবং মাশহুর হলো সাধারণ। কারণ মুসতাফিযের সনদের উভয় প্রান্ত (শুরু ও শেষ) এবং মধ্যবর্তী সকল স্তরে রাবির সংখ্যা সমান হওয়া আবশ্যক। কিন্তু মাশহুরে কোনো স্তরে তিনজন এবং পরবর্তী স্তরে দশজন হলেও তা মাশহুর গণ্য হয়। সুতরাং প্রত্যেক মুসতাফিয-ই মাশহুর, কিন্তু প্রত্যেক মাশহুর মুসতাফিয নয়।
৩. মুসতাফিযের নির্দিষ্ট স্তর: কারও মতে যা প্রথম স্তর থেকেই ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে তা মুসতাফিয, আর যা পরে প্রসার লাভ করেছে তা মাশহুর।
উভয় হাদিসের হুকুম (حكمهما)
১. ইলমের দৃষ্টিকোণ থেকে: হাদিসে মাশহুর ও মুসতাফিয ‘ইলমে ক্বাতঈ’ (অকাট্য নিশ্চিত জ্ঞান) প্রদান করে না, বরং ‘ইলমে নাজারী বা ইতমিনানী’ (প্রশান্তিদায়ক প্রবল ধারণা) প্রদান করে। তবে হানাফী উসূলবিদগণের মতে, মাশহুর হাদিস ‘ইলমে তুমআনিনাত’ প্রদান করে, যার দ্বারা কুরআনের সাধারণ আয়াতের বিধানকে তাখসীস (সীমিত) করা বা অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করা জায়েজ।
২. আমলের দৃষ্টিকোণ থেকে: যদি মাশহুর বা মুসতাফিয হাদিসের সনদের রাবিগণ বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য হন, তবে তা গ্রহণযোগ্য (সহীহ বা হাসান) এবং এর ওপর আমল করা সর্বসম্মতভাবে ওয়াজিব। কিন্তু যদি সনদে কোনো দুর্বল রাবি থাকে, তবে তা মাশহুর হওয়া সত্ত্বেও প্রত্যাখ্যাত হতে পারে (যেমন জনমুখে প্রচলিত বহু অপ্রমাণিত মাশহুর কথা)।
٣- ما الخبر المردود؟ تحدث عن أقسامه مفصلا-
[৩. الخبر المردود কাকে বলে? এর প্রকারভেদ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
মুসতালাহুল হাদিসে যেসব বর্ণনা গ্রহণযোগ্যতার আবশ্যকীয় শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, সেগুলোকে ‘আল-খাবারুল মারদুদ’ বা প্রত্যাখ্যাত বর্ণনা বলা হয়। দ্বীনের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য মারদুদ হাদিসের কারণ ও প্রকার জানা অপরিহার্য।
আল-খাবারুল মারদুদের সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘মারদুদ’ (مردود) অর্থ প্রত্যাখ্যাত, বর্জিত বা অগ্রহণযোগ্য।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে হাদিসের বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতা ও বর্ণনার নির্ভুলতা প্রমাণের শর্তাবলি অনুপস্থিত থাকায় মুহাদ্দিসগণের নিকট তা বর্জনীয় সাব্যস্ত হয়, তাকে খবরুল মারদুদ বলা হয়। সংক্ষেপে— যয়ীফ ও মওযু শ্রেণির সকল বর্ণনা খবরুল মারদুদের অন্তর্ভুক্ত।
খবরুল মারদুদের মূল কারণ ও প্রকারভেদ
খবর মারদুদ হওয়ার প্রধান দুটি কারণ রয়েছে:
১. সনদ বিচ্ছিন্ন হওয়া (سقط في الإسناد)
২. রাবির ওপর দোষারোপ বা সমালোচনা (طعن في الراوي)
১. সনদ বিচ্ছিন্নতাজনিত প্রকারভেদ (السقط في الإسناد)
সনদ থেকে রাবি বাদ পড়ার ধরন অনুযায়ী মারদুদ হাদিস চার প্রকার:
– মু’আল্লাক (الحديث المعلق): সনদের শুরু থেকে (মুসান্নিফের দিক থেকে) এক বা একাধিক রাবি ধারাবাহিকভাবে বাদ পড়লে।
– মুরসাল (الحديث المرسل): সনদের শেষ প্রান্ত থেকে সাহাবির নাম বাদ দিয়ে তাবেয়ী সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করলে।
– মু’দাল (الحديث المعضل): সনদের মধ্যবর্তী কোনো স্থান থেকে পরপর দুই বা ততোধিক রাবি বাদ পড়লে।
– মুনকাতি’ (الحديث المنقطع): সনদের যেকোনো স্তর থেকে ধারাবাহিকভাবে নয় বরং বিচ্ছিন্নভাবে একজন রাবি বাদ পড়লে।
২. রাবির ওপর আপত্তিজেনিত প্রকারভেদ (الطعن في الراوي)
রাবির সততা (আদালাত) বা স্মরণশক্তি (যাবত)-এর ত্রুটির কারণে হাদিস মারদুদ হয়। এর প্রধান প্রকারগুলো হলো:
– মাওদূ’ (الحديث الموضوع): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে ইচ্ছাকৃত বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বানোয়াট ও মিথ্যা রচিত কথা। এটি নিকৃষ্টতম মারদুদ হাদিস।
– মাতরূক (الحديث المتروك): রাবির বিরুদ্ধে সাধারণ জীবনে মিথ্যা বলার অভিযোগ থাকলে বা হাদিসে মারাত্মক ভুল করার কারণে পরিত্যক্ত হলে।
– মুনকার (الحديث المنكر): কোনো দুর্বল রাবি যখন অধিকতর নির্ভরযোগ্য ও সুদৃঢ় রাবির বিরোধী বর্ণনা দেয়।
– মু’আল্লাল (الحديث المعلل): বাহ্যত সহীহ মনে হলেও সনদে বা মতনে এমন কোনো সূক্ষ্ম দোষ থাকে যা কেবল গভীর প্রজ্ঞাবান মুহাদ্দিসগণ ধরতে পারেন।
– মুদরাজ (المدرج): সনদে বা মতনে রাবির নিজস্ব কোনো শব্দ বা ব্যাখ্যা এমনভাবে মিশিয়ে দেওয়া যা মূল হাদিস বলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
– মাকলূব (المقلوب): রাবির নাম বা হাদিসের শব্দাবলি অগ্রপশ্চাৎ বা উলটপালট করে বর্ণনা করা।
– মুযতারাব (المضطرب): বিভিন্ন সনদে এমনভাবে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা আসা যার কোনো একটিকে অপরটির ওপর প্রাধান্য দেওয়া সম্ভব নয়।
উপসংহার
খবরুল মারদুদের এই বিজ্ঞানসম্মত শ্রেণিবিন্যাস প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস সংরক্ষণে উম্মতে মুহাম্মাদীর মুহাদ্দিসগণ সর্বোচ্চ সতর্কতা ও বস্তুনিষ্ঠ যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন।
٤- عرف الحديث الصحيح والحسن والضعيف- ثم اذكر شروط الحديث الصحيح-
[৪. সহীহ, হাসান ও যয়ীফ হাদিসের পরিচয় দাও। সহীহ হাদিসের শর্তাবলি উল্লেখ কর।]
ভূমিকা
হাদিস শাস্ত্রের মৌলিক শ্রেণিবিভাগ মূলত তিনটি স্তরে বিন্যস্ত: সহীহ (প্রামাণ্য বিশুদ্ধ), হাসান (উত্তম গ্রহণযোগ্য) এবং যয়ীফ (দুর্বল)। ইসলামি শরীয়তের আহকাম ও আকাইদ নির্ধারণে এই তিন স্তরের গুরুত্ব অপরিসীম।
১. সহীহ হাদিস (الحديث الصحيح)
সংজ্ঞা: ইমাম ইবনুস সালাহ (রহ.) বলেন:
«هو الحديث المسند الذي يتصل إسناده بنقل العدل الضابط عن العدل الضابط إلى منتهاه، ولا يكون شاذاً ولا معللاً»
(যে মুত্তাসিল সনদের শেষ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে পূর্ণ বিশ্বস্ত, ন্যায়পরায়ণ এবং প্রখর স্মরণশক্তির অধিকারী রাবি অপর অনুরূপ রাবি থেকে বর্ণনা করেন এবং যা শায (উদ্ভট) ও মু’আল্লাল (সূক্ষ্ম ত্রুটিযুক্ত) নয়, তাকে সহীহ হাদিস বলে)।
২. হাসান হাদিস (الحديث الحسن)
সংজ্ঞা: হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, যে হাদিসের সনদের সকল রাবি ন্যায়পরায়ণ এবং সনদও অবিচ্ছিন্ন, তবে কোনো রাবির স্মরণশক্তি বা ধারণক্ষমতা সহীহ হাদিসের রাবির তুলনায় সামান্য কম (خفيف الضبط), আর হাদিসটি শায ও মু’আল্লাল মুক্ত— তাকে হাসান লি-যাতিহী বলে। এটি সহীহ অপেক্ষা মর্যাদায় কিছুটা নিচে হলেও শারঈ বিধান হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
৩. যয়ীফ হাদিস (الحديث الضعيف)
সংজ্ঞা: যে হাদিসে সহীহ এবং হাসান হাদিসের শর্তাবলির কোনো একটি বা একাধিক শর্ত অনুপস্থিত থাকে, তাকে হাদীসে যয়ীফ (দুর্বল হাদিস) বলে। যেমন— সনদে বিচ্ছিন্নতা থাকা, অথবা রাবি ফাসিক বা স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়া।
সহীহ হাদিসের শর্তাবলি (شروط الحديث الصحيح)
মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি হাদিস সহীহ হওয়ার জন্য পাঁচটি অপরিহার্য শর্ত পূর্ণ হতে হয়:
১. ইত্তিসালুস সানাদ (اتصال السند – সনদের অবিচ্ছিন্নতা): সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি রাবি তার পূর্ববর্তী উস্তাদ বা শায়খের কাছ থেকে সরাসরি শ্রবণ বা অনুমোদনক্রমে গ্রহণ করেছেন মর্মে নিশ্চিত হতে হবে। সনদের মাঝে কোনো ছেদ থাকতে পারবে না।
২. আদালাতুর রুওয়াত (عدالة الرواة – বর্ণনাকারীর ন্যায়পরায়ণতা): সনদের প্রত্যেক রাবিকে মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান, তাকওয়াবান এবং কবিরা গুনাহ ও নীচ মানসিকতা (খাওয়ারিমুল মুরুওয়াহ) থেকে মুক্ত হতে হবে।
৩. যাবতুর রুওয়াত (ضبط الرواة – বর্ণনাকারীর ধারণক্ষমতা): প্রত্যেক রাবির প্রখর স্মৃতিশক্তি (যাবতুস সদর) অথবা লিখিত কিতাবের নির্ভুল হেফাজত ক্ষমতা (যাবতুল কিতাব) থাকতে হবে।
৪. আদমূশ শুযূয (عدم الشذوذ – বৈপরীত্যমুক্ত হওয়া): নির্ভরযোগ্য রাবির বর্ণিত হাদিসটি তাঁর চেয়েও অধিকতর বিশ্বস্ত ও সংখ্যাগরিষ্ঠ রাবিদের বর্ণনার বিপরীত হতে পারবে না।
৫. আদমুল ইল্লাহ (عدم العلة – সূক্ষ্ম ত্রুটিমুক্ত হওয়া): বাহ্যত বিশুদ্ধ মনে হলেও হাদিসের সনদ বা মতনে এমন কোনো গোপন ত্রুটি (ইল্লাত ক্বাদিহাহ) থাকা চলবে না, যা হাদিসের বিশুদ্ধতাকে বিনষ্ট করে।
উপসংহার
এই পাঁচটি শর্তের শতভাগ নিশ্চিত প্রয়োগের মাধ্যমেই ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁদের সহীহ গ্রন্থদ্বয় সংকলন করেছিলেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত সত্যের দিশারি হয়ে থাকবে।
٥- عرف الراوي واذكر شروط قبوله- ثم بين مراتب الجرح والتعديل-
[৫. الراوی এর পরিচয় দাও এবং الراوی এর গৃহীত হওয়ার শর্তাবলি আলোচনা কর। অতঃপর الجرح والتعديل এর স্তরসমূহ আলোচনা কর।]
ভূমিকা
হাদিসের সনদ হলো রাসুলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত পৌঁছানোর সিঁড়ি, আর সেই সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ হলেন হাদিসের রাবি বা বর্ণনাকারী। রাবির চরিত্র ও যোগ্যতার মূল্যায়নের ওপরই হাদিসের বিশুদ্ধতা নির্ভর করে।
রাবির পরিচয় (تعريف الراوي)
আভিধানিক অর্থ: ‘রাবি’ (الراوي) শব্দটি ‘রিওয়ায়াহ’ (رواية) ধাতু থেকে গঠিত, যার অর্থ বহনকারী বা বর্ণনাকারী।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: যিনি সনদসহ রাসুলুল্লাহ (সা.), সাহাবা বা তাবেয়ীগণের বাণী, কর্ম বা বিবরণ শ্রবণ করে অপরের নিকট বিশ্বস্ততার সাথে বর্ণনা করেন, তাকে হাদিসের পরিভাষায় ‘রাবি’ বলা হয়।
রাবির বর্ণনা গৃহীত হওয়ার শর্তাবলি (شروط قبوله)
মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত নীতি অনুযায়ী রাবির রেওয়ায়েত কবুল হওয়ার জন্য দুটি মৌলিক গুণ অপরিহার্য, যার প্রতিটি আবার কয়েকটি উপ-শর্তে বিভক্ত:
১. আল-আদালাত (العدالة – চারিত্রিক ন্যায়পরায়ণতা):
– ইসলাম: কাফেরের রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য নয়।
– বুলূগ (প্রাপ্তবয়স্কতা): প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বর্ণনা পেশ করা আবশ্যক (যদিও অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় শ্রবণ বৈধ)।
– আকল (বিবেকবান হওয়া): মস্তিষ্কবিকৃত বা পাগল ব্যক্তির বর্ণনা অগ্রাহ্য।
– তাকওয়া: প্রকাশ্য কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং সগিরা গুনাহে অভ্যস্ত না হওয়া।
– মুরূওয়াত: সামাজিক শিষ্টাচার ও মানবতাবিরোধী হীন আচরণ থেকে মুক্ত থাকা।
২. আদ-দাবত (الضبط – বিশুদ্ধ সংরক্ষণ ক্ষমতা):
– হাদিসটি শ্রবণের পর থেকে অন্যের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত অবিকৃতভাবে স্মরণ বা সংরক্ষণ রাখা।
– অধিক গাফলতি, অতিমাত্রায় ভুলভ্রান্তি ও মানসিক অমনোযোগিতা থেকে মুক্ত থাকা।
জারহ ও তা’দিলের স্তরসমূহ (مراتب الجرح والتعديل)
ইমাম ইবনে আবি হাতিম এবং হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) জারহ ও তা’দিলের স্তরগুলোকে ছয়টি করে শ্রেণিতে বিন্যস্ত করেছেন:
তা’দিলের স্তরসমূহ (গ্রহণযোগ্যতার স্তর):
১. সর্বোচ্চ স্তর: যা মুবালাগা বা তাগীদের শব্দ দ্বারা ব্যক্ত (যেমন: أَوْثَقُ النَّاسِ – শ্রেষ্ঠতম বিশ্বস্ত, ثِقَةٌ ثِقَةٌ – পরম নির্ভরযোগ্য)।
২. একক তাগীদের শব্দ (যেমন: ثِقَةٌ বা ثَبْتٌ – বিশ্বস্ত ও সুদৃঢ়)।
৩. কিছুটা নিম্নের শব্দ (যেমন: صَدُوقٌ – সত্যবাদী, لا بَأْسَ بِهِ – কোনো সমস্যা নেই)।
৪. দুর্বলতার সম্ভাবনাযুক্ত শব্দ (যেমন: مَحَلُّهُ الصِّدْقُ – সত্যবাদিতার কাছাকাছি)।
৫. দুর্বল সনদ সমর্থিত শব্দ (যেমন: يُكْتَبُ حَدِيثُهُ – তার হাদিস লেখা যায়)।
৬. সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্যতা (যেমন: صَالِحُ الْحَدِيثِ – মোটামুটি ভালো)।
জারহের স্তরসমূহ (অগ্রহণযোগ্যতার স্তর):
১. মৃদু আপত্তি (যেমন: لَيِّنُ الْحَدِيثِ – বর্ণনায় কিছুটা শৈথিল্য আছে)।
২. নির্ভরযোগ্যতার অভাব (যেমন: لا يُحْتَجُّ بِهِ – তার দ্বারা দলিল গ্রহণীয় নয়)।
৩. স্পষ্ট দুর্বলতা (যেমন: ضَعِيفٌ جِدًّا – অত্যন্ত দুর্বল)।
৪. মারাত্মক অভিযোগ (যেমন: مَتْرُوكُ الْحَدِيثِ – হাদিস পরিত্যাজ্য)।
৫. মিথ্যার অভিযোগ (যেমন: مُتَّهَمٌ بِالْكَذِبِ – মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত)।
৬. চরমতম জারহ (যেমন: كَذَّابٌ – ডাহা মিথ্যাবাদী, دَجَّالٌ – চরম প্রতারক)।
٦- عرف المصطلحات الآتية: السند، المعلق، المعضل، العزيز، الغريب-
[৬. নিচের পরিভাষাসমূহের পরিচয় দাও: السند، المعلق، المعضل، العزيز، الغريب]
(১) আস-সানাদ (السند)
আভিধানিক অর্থ: নির্ভরস্থল বা যা কোনো কিছুর ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে।
পারিভাষিক অর্থ: হাদিসের মূল মতন (বক্তব্য) পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য বর্ণনাকারীদের যে ধারাবাহিক শৃঙ্খল বা পরম্পরা (سلسلة الرجال) বিদ্যমান থাকে, তাকে ‘সনদ’ বলে। ইমাম ইবনুল মুবারক বলেন, “সনদ হলো দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; সনদ না থাকলে যে যা খুশি তা-ই বলত।”
(২) আল-মু’আল্লাক (المعلق)
আভিধানিক অর্থ: ঝুলন্ত বস্তু।
পারিভাষিক অর্থ: যে হাদিসের সনদের শুরু থেকে (মুসান্নিফ বা গ্রন্থকারের দিক থেকে) এক বা একাধিক রাবিকে ধারাবাহিকভাবে বাদ দিয়ে সরাসরি ওপরের রাবি বা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বরাতে বর্ণনা করা হয়, তাকে হাদিসে মু’আল্লাক বলে। যেমন ইমাম বুখারী অনেক সময় বলেন: “রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন…” পূর্ববর্তী সনদের রাবি উল্লেখ না করে।
(৩) আল-মু’দাল (المعضل)
আভিধানিক অর্থ: অক্ষমকারী বা জটিল সমস্যাপূর্ণ।
পারিভাষিক অর্থ: যে হাদিসের সনদের মধ্যবর্তী স্থান থেকে যেকোনো জায়গায় পরপর দুজন বা ততোধিক বর্ণনাকারী বাদ পড়ে যায়, তাকে হাদিসে মু’দাল বলে। এটি মুনকাতি’ হাদিসের চেয়েও মারাত্মক দুর্বল।
(৪) আল-আযীয (العزيز)
আভিধানিক অর্থ: দুর্লভ বা শক্তিশালী।
পারিভাষিক অর্থ: যে হাদিসের সনদের যেকোনো একটি স্তরে কমপক্ষে দুজন রাবি হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং কোনো স্তরেই রাবির সংখ্যা দুজনের কম হয়নি, তাকে হাদিসে আযীয বলে। যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হব।”
(৫) আল-গারীব (الغريب)
আভিধানিক অর্থ: নিঃসঙ্গ, অপরিচিত বা প্রবাসী।
পারিভাষিক অর্থ: যে হাদিসের সনদের যেকোনো একটি স্তরে মাত্র একজন রাবি হাদিসটি রেওয়ায়েত করেছেন, তাকে হাদিসে গারীব বা খবরুল ওয়াহিদ আল-ফারদ বলে। যেমন ‘ইন্নামাল আ’মালু বিন নিয়্যাত’ হাদিসটি প্রথম কয়েকটি স্তরে একজন করে রাবি বর্ণনা করেছেন।
مجموعة (ب) [খ-অংশ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন]
٧- عرف الحديث المرسل لغة واصطلاحا-
[৭. الحديث المرسل এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয় দাও।]
আভিধানিক অর্থ: ‘মুরসাল’ (مرسل) শব্দটি বাবে ইফ’আল থেকে ইসমে মাফ’উল, যার অর্থ উন্মুক্ত ছেড়ে দেওয়া বা অবমুক্ত করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায়:
«هو ما سقط من آخر إسناده من بعد التابعي»
(যে হাদিসের সনদের শেষ প্রান্তে তাবেয়ীর পরবর্তী বর্ণনাকারী অর্থাৎ সাহাবির নাম বাদ পড়ে যায় এবং তাবেয়ী সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে হাদিস বর্ণনা করেন, তাকে হাদীসে মুরসাল বলে)।
উদাহরণ: বিশিষ্ট তাবেয়ী সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহ.) যখন বলেন: “রাসুলুল্লাহ (সা.) এ নির্দেশ দিয়েছেন”, অথচ তিনি স্বচক্ষে রাসুল (সা.)-কে দেখেননি। জমহুর মুহাদ্দিসগণের নিকট মুরসাল হাদিস মুনকাতি’র অন্তর্ভুক্ত এবং প্রাথমিকভাবে দুর্বল, তবে ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালিক (রহ.) নির্ভরযোগ্য তাবেয়ীর মুরসালকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন।
٨- اكتب أسماء خمسة أشهر المصنفات في علم مصطلح الحديث-
[৮. علم مصطلح الحديث বিষয়ে রচিত পাঁচটি প্রসিদ্ধ কিতাবের নাম লিখ।]
মুসতালাহুল হাদিস শাস্ত্রে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রচিত হয়েছে বহু কালজয়ী কিতাব। তন্মধ্যে পাঁচটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো:
১. আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল বাইনার রাবি ওয়াল ওয়া’ঈ (المحدث الفاصل بين الراوي والواعي): প্রণয়ন করেছেন আল-কাদী আবু মুহাম্মদ আল-রামহুরমুযী (মৃত্যু ৩৬০ হি.)। এটি এ শাস্ত্রের সর্বপ্রথম স্বতন্ত্র গ্রন্থ।
২. মা’রিফাতু উলূমিল হাদিস (معرفة علوم الحديث): প্রণয়ন করেছেন ইমাম আবু আবদুল্লাহ আল-হাকিম নিশাপুরী (মৃত্যু ৪০৫ হি.)।
৩. আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ (الكفاية في علم الرواية): প্রণয়ন করেছেন আল-খতীব আল-বাগদাদী (মৃত্যু ৪৬৩ হি.)।
৪. মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ (مقدمة ابن الصلاح): প্রণয়ন করেছেন হাফিজ আবু আমর উসমান ইবনুস সালাহ (মৃত্যু ৬৪৩ হি.)।
৫. নুখবাতুল ফিকার ফী মুসতালাহি আহলিল আসার (نخبة الفكر في مصطلح أهل الأثر): প্রণয়ন করেছেন শায়খুল ইসলাম হাফিজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হি.)।
٩- عرف الحديث المتواتر ثم بين شروطه-
[৯. الحديث المتواتر এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এর শর্তসমূহ বর্ণনা কর।]
সংজ্ঞা: যে হাদিসের সনদের প্রতিটি স্তরে এত বিপুল সংখ্যক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী রেওয়ায়েত করেন, যাদের পক্ষে কোনো বিষয়ে মিথ্যা রটানোর জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া স্বভাবত অসম্ভব, তাকে হাদিসে মুতাওয়াতির বলে। এটি অকাট্য ও সন্দেহাতীত জ্ঞান প্রদান করে।
শর্তাবলি: হাদিস মুতাওয়াতির হওয়ার জন্য চারটি শর্ত আবশ্যক:
১. সনদের প্রতিটি স্তরে বিপুল সংখ্যক রাবি বিদ্যমান থাকা (সাধারণত ন্যূনপক্ষে দশজন বা ততোধিক)।
২. বর্ণনাকারীদের সংখ্যা ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি এমন হওয়া যাতে স্বাভাবিকভাবে তাদের পরস্পরে মিথ্যায় একমত হওয়া অসম্ভব হয়।
৩. সনদের প্রথম স্তর থেকে শেষ স্তর পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে এই শর্ত অবিচ্ছিন্নভাবে বহাল থাকা।
৪. বর্ণনাকারীদের বর্ণনাটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালব্ধ হওয়া (যেমন: “আমরা শুনেছি” বা “আমরা দেখেছি”), কোনো যুক্তিভিত্তিক অনুমান না হওয়া।
١٠- تحدث عن آداب الرواية-
[১০. হাদিস বর্ণনার নিয়মাবলি আলোচনা কর।]
হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে বর্ণনাকারী ও শিক্ষকের জন্য ইসলামি নীতিশাস্ত্র বিশেষ কিছু শিষ্টাচার (আদাব) নির্ধারণ করেছে:
১. ইখলাস ও নিয়ত পরিশুদ্ধ করা: দুনিয়াবী খ্যাতি, পদমর্যাদা বা সম্পদের মোহমুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হাদিস শিক্ষা দেওয়া ও বর্ণনা করা।
২. দৈহিক ও আত্মিক পবিত্রতা: হাদিস পাঠ ও বর্ণনার সময় ওযু অবস্থায় থাকা, উত্তম পোশাক পরিধান করা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা (যেমনটি ইমাম মালিক রহ. করতেন)।
৩. গাম্ভীর্য ও মর্যাদা রক্ষা: হাদিস বর্ণনার আসরে পূর্ণ ভাবগাম্ভীর্য ও বিনম্রতা বজায় রাখা, অনর্থক হাসাহাসি বা লঘু আচরণ পরিহার করা।
৪. সঠিক উচ্চারণ ও শব্দচয়ন: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যবহৃত মূল আরবি শব্দের সঠিক হরকত ও নুকতাসহ বিশুদ্ধ উচ্চারণ নিশ্চিত করা।
৫. যথাযথ সনদ উল্লেখ করা: হাদিস বর্ণনার সময় সনদের ধারাবাহিকতা ও উস্তাদের নাম নির্ভুলভাবে পরিবেশন করা।
৬. শ্রোতাদের সক্ষমতা বিবেচনা: উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মেধা ও ধারণক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে হাদিসের মর্মব্যাখ্যা উপস্থাপন করা।
١١- بين حكم رواية الحديث الضعيف والعمل به-
[১১. যয়ীফ হাদিস বর্ণনা করা ও সে অনুযায়ী আমল করার হুকুম বর্ণনা কর।]
১. বর্ণনা করার হুকুম: কোনো হাদিস যয়ীফ হলে মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা সনদ ছাড়া বর্ণনা করার সময় “রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন” (قَالَ رَسُولُ اللهِ) এভাবে দৃঢ়তার সাথে বলা নাজায়েজ। বরং নরম বা সংশয়সূচক শব্দ (صِيغَةُ التَّمْرِيضِ) যেমন: “বর্ণিত আছে” (رُوِيَ عَنْهُ) বা “বলা হয়ে থাকে” (يُذْكَرُ) ব্যবহার করা ওয়াজিব।
২. আমল করার হুকুম:
– আকাইদ ও আহকামে: হালাল-হারাম এবং মৌলিক বিশ্বাস বা আকাইদের ক্ষেত্রে যয়ীফ হাদিস দ্বারা দলিল গ্রহণ সর্বসম্মতভাবে নিষিদ্ধ।
– ফাযায়েলে আমল ও সৎকাজে: ইমাম ইবনুস সালাহ ও হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর মতে তিনটি শর্তে নেক আমল ও ফযিলতের ক্ষেত্রে যয়ীফ হাদিসের ওপর আমল করা জায়েজ:
(ক) দুর্বলতা অত্যন্ত মারাত্মক (যেমন রাবি মিথ্যাবাদী বা মাতরূক) হতে পারবে না।
(খ) হাদিসটি শরীয়তের কোনো সাধারণ বা প্রতিষ্ঠিত মূলনীতির অধীন হতে হবে।
(গ) আমল করার সময় এটিকে সুনিশ্চিত সুন্নাহ মনে করা যাবে না, বরং সতর্কতামূলক আমল হিসেবে গণ্য করতে হবে।
١٢- تحدث عن أسباب الطعن في العدالة والضبط-
[১২. হাদিস বর্ণনাকারীর العدالة ও ضبط প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কারণগুলো আলোচনা কর।]
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী রাবির ওপর আপত্তি বা সমালোচনার (طعن) কারণ মোট ১০টি। এর মধ্যে ৫টি চারিত্রিক সততা (আদালাত)-এর সাথে এবং ৫টি ধারণক্ষমতা (যাবত)-এর সাথে সম্পর্কিত:
আদালাত (العدالة) প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ৫টি কারণ:
১. আল-কিযব (الكذب): হাদিসের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর মিথ্যা আরোপ করা।
২. তুহমাতুল কিযব (التهمة بالكذب): সাধারণ কথাবার্তায় মিথ্যা বলার প্রমাণ থাকা।
৩. আল-ফিসক (الفسق): প্রকাশ্য পাপাচারে লিপ্ত থাকা বা তাকওয়ার খেলাফ চলা।
৪. আল-বিদআহ (البدعة): বিদআতে লিপ্ত হওয়া এবং স্বীয় বিদআতের দিকে মানুষকে আহ্বান করা।
৫. আল-জাহালাহ (الجهالة): রাবির পরিচয় ও নির্ভরযোগ্যতা অজ্ঞাত থাকা।
যাবত (الضبط) প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ৫টি কারণ:
১. ফাহশুল গালাত (فحش الغلط): বর্ণনায় মারাত্মক ভুলভ্রান্তি করা।
২. কাসরাতুল গাফলাহ (كثرة الغفلة): বর্ণনায় চরম অসচেতনতা ও অমনোযোগিতা।
৩. আল-ওয়াহম (الوهم): ধারণার বশবর্তী হয়ে সনদ বা মতন গুলিয়ে ফেলা।
৪. মুখালাফাতুস সিকাত (مخالفة الثقات): অধিকতর নির্ভরযোগ্য রাবিদের বিপরীত রেওয়ায়েত করা।
৫. সূউল হিফয (سوء الحفظ): দুর্বল স্মরণশক্তি বা বার্ধক্যজনিত স্মৃতিভ্রষ্টতা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. মুসতালাহুল হাদিস পাঠের মূল ফায়দা কী?
মুসতালাহুল হাদিস অধ্যয়নের প্রধান ফায়দা হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশুদ্ধ হাদিসকে দুর্বল ও বানোয়াট বর্ণনা থেকে নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক নিয়মে পৃথক করার যোগ্যতা অর্জন করা।
২. সহীহ ও হাসান হাদিসের মধ্যে মূল পার্থক্য কোথায়?
সহীহ হাদিসের বর্ণনাকারীর স্মরণশক্তি ও মুখস্থ ক্ষমতা থাকে সর্বোচ্চ মানের (تام الضبط), পক্ষান্তরে হাসান হাদিসের বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি সামান্য দুর্বল (خفيف الضبط) হলেও অন্যান্য সকল শর্ত সমান থাকে।
৩. মুরসাল হাদিস কি সরাসরি পরিত্যাজ্য?
জমহুর মুহাদ্দিসগণের মতে মুরসাল হাদিস সনদ বিচ্ছিন্নতার কারণে দুর্বল। তবে কোনো কোনো ফিকহি মাযহাবে (যেমন হানাফী ও মালিকী) নির্ভরযোগ্য তাবেয়ীর মুরসাল বর্ণনা শারঈ দলিলের মর্যাদা পায়।
৪. মুতাওয়াতির হাদিসের হুকুম কী?
মুতাওয়াতির হাদিস অকাট্য নিশ্চিত জ্ঞান (العلم اليقيني القطعي) প্রদান করে। এর ওপর ঈমান আনা ও আমল করা সর্বসম্মতভাবে ওয়াজিব এবং তা অস্বীকার করা কুফরীর নামান্তর।
৫. যয়ীফ হাদিস কি হালাল-হারাম প্রমাণের দলিল হতে পারে?
না, যয়ীফ হাদিস দ্বারা হালাল-হারাম বা কোনো শারঈ বিধান কিংবা ইসলামি আকিদা প্রমাণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৬. মু’দাল ও মুনকাতি’ হাদিসের মধ্যে পার্থক্য কী?
সনদের মধ্যবর্তী কোনো স্থান থেকে পরপর দুজন বর্ণনাকারী বাদ পড়লে তাকে মু’দাল বলে, আর যদি বিচ্ছিন্নভাবে একজন রাবি বাদ পড়ে তবে তাকে মুনকাতি’ বলে।