জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (Economics and Islamic Economics) – 202106, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
22 September, 2026
৫৮ মিনিট পড়ার সময়
৩ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (Economics and Islamic Economics)
বিষয় কোড: 202106 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০

২০২২ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (Economics and Islamic Economics – 202106) পরীক্ষাটি সনাতন ও ইসলামি অর্থনীতির মৌলিক নীতিমালা, চাহিদা ও জোগান বিধি, বাজার তত্ত্ব, ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বণ্টন ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার মূল্যায়নের জন্য অনুষ্ঠিত হয়। প্রশ্নপত্রটি দুটি বিভাগে বিভক্ত: ক-বিভাগ (রচনামূলক – চারটির উত্তর দিতে হবে, মান ৪ × ১৫ = ৬০) এবং খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত – চারটির উত্তর দিতে হবে, মান ৪ × ৫ = ২০)। নিচে সকল প্রশ্নের প্রামাণ্য ও বিস্তারিত সমাধান উপস্থাপিত হলো।

ক-বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্ন (যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও: মান ৪ × ১৫ = ৬০)

১। অর্থনীতির সংজ্ঞা দাও। ইসলামি অর্থনীতি ও প্রচলিত অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর। [Define economics. Discuss the difference between the Islamic economy and the modern economy.]

ভূমিকা

মানবজাতির বৈষয়িক কল্যাণ, সম্পদের দক্ষ বণ্টন এবং অপচয়হীন উৎপাদনের লক্ষ্যে অর্থনীতির উদ্ভব। পার্থিব জীবনের প্রতিটি প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়ত এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ আর্থিক দর্শন উপস্থাপন করেছে যা চরম ব্যক্তিস্বার্থবাদী পুঁজিবাদ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাহীন সমাজতন্ত্র উভয়ের ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

অর্থনীতির প্রামাণ্য সংজ্ঞাসমূহ

১. অ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith): ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথের মতে, “Economics is an inquiry into the nature and causes of the wealth of nations” (অর্থনীতি হলো এমন একটি বিজ্ঞান যা জাতির সম্পদের স্বরূপ ও কারণ অনুসন্ধান করে)।
২. আলফ্রেড মার্শাল (Alfred Marshall): নব-ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদ মার্শালের মতে, “Economics is a study of mankind in the ordinary business of life” (অর্থনীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বৈষয়িক কল্যাণ সাধন সংক্রান্ত কার্যাবলি নিয়ে আলোচনা করে)।
৩. লায়নেল রবিন্স (Lionel Robbins): আধুনিক প্রামাণ্য সংজ্ঞায় রবিন্স বলেন, “Economics is the science which studies human behaviour as a relationship between ends and scarce means which have alternative uses” (অর্থনীতি মানুষের এমন আচরণ বিশ্লেষণ করে যা অসীম অভাব এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সীমিত সম্পদের মধ্যকার সম্পর্ক নির্দেশ করে)।

ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা

ইসলামি অর্থনীতির প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ড. এম এ মান্নান (Dr. M. A. Mannan)-এর মতে:
“Islamic Economics is a social science which studies the economic problems of a people imbued with the values of Islam.”
(ইসলামি অর্থনীতি হলো এমন একটি সমাজবিজ্ঞান, যা ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমস্যা ও তার সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা করে)।

পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র ও ইসলামি অর্থনীতির তুলনামূলক পার্থক্য

বিবেচ্য বিষয় পুঁজিবাদী অর্থনীতি (Capitalism) সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি (Socialism) ইসলামি অর্থনীতি (Islamic Economics)
মালিকানার স্বরূপ উৎপাদনের উপাদানে ব্যক্তির অবাধ ও নিরঙ্কুশ ব্যক্তিগত মালিকানা। ব্যক্তিগত মালিকানা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; সমস্ত সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। মূল মালিকানা একমাত্র মহান আল্লাহর; মানুষ সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ আমানতদার।
সুদের অবস্থান সুদ হলো অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও পুঁজি আহরণের ভিত্তি। সুদ ও মুনাফা উভয়ই নিষিদ্ধ ও শোষণের হাতিয়ার। রিবা বা সুদ সম্পূর্ণ হারাম; লাভ-ক্ষতির অংশীদারি (মুদারাবা-মুশারাকা) বৈধ।
উদ্দেশ্য ও চালিকাশক্তি সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন ও ভোগবাদী প্রাচুর্য। রাষ্ট্রীয় নির্দেশে সামাজিক চাহিদা পূরণ ও সমবণ্টন। আল্লাহর সন্তুষ্টি, হালাল জীবিকা ও সমাজে আদল-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা।
সম্পদ বণ্টনের নীতি বাজারের শক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়; ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য তীব্র হয়। রাষ্ট্র কর্তৃক বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ; কর্মক্ষমতার চেয়ে সাম্য প্রাধান্য পায়। জাকাত, সাদাকাহ, উশর ও ওয়াকফের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।

২। চাহিদা ও যোগান বলতে কী বুঝ? চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্বটি আলোচনা কর। [What do you mean by demand and supply? Discuss the conventional theory of demand and supply.]

চাহিদা ও জোগানের সংজ্ঞা

১. চাহিদা (Demand): সাধারণ অর্থে কোনো বস্তু পাওয়ার ইচ্ছাকে চাহিদা বলে। কিন্তু অর্থনীতিতে কেবল ইচ্ছা থাকলেই চাহিদা হয় না; অর্থনীতিতে কার্যকর চাহিদা হতে হলে তিনটি শর্ত আবশ্যক: (ক) দ্রব্যটি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, (খ) দ্রব্যটি ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য এবং (গ) সেই অর্থ ব্যয় করার মানসিক ইচ্ছা।
২. জোগান (Supply): একটি নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট দামে বিক্রেতা বা উৎপাদক যে পরিমাণ পণ্য বাজারে বিক্রি করার জন্য প্রস্তুত রাখে বা উপস্থাপন করে, তাকে জোগান বলে।

চাহিদা বিধি ও জোগান বিধি

১. চাহিদা বিধি (Law of Demand): অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে কোনো দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেলে তার চাহিদার পরিমাণ হ্রাস পায় এবং দাম হ্রাস পেলে চাহিদার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ দামের সাথে চাহিদার সম্পর্ক বিপরীতমুখী বা ঋণাত্মক।
২. জোগান বিধি (Law of Supply): অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেলে বিক্রির জন্য জোগানের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং দাম হ্রাস পেলে জোগানের পরিমাণ কমে যায়। অর্থাৎ দাম ও জোগানের মধ্যে প্রত্যক্ষ বা সমমুখী সম্পর্ক বিদ্যমান।

ভারসাম্য দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া

মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে ক্রেতার চাহিদা এবং বিক্রেতার জোগানের পারস্পরিক টানাপোড়েনের মাধ্যমে ভারসাম্য দাম (Equilibrium Price) ও ভারসাম্য পরিমাণ নির্ধারিত হয়:

দ্রব্যের দাম (টাকা) চাহিদার পরিমাণ (একক) জোগানের পরিমাণ (একক) বাজারের অবস্থা দামের ওপর প্রভাব
১০ ৫০ ১০ অতিরিক্ত চাহিদা (ঘাটতি) দাম বৃদ্ধির চাপ
২০ ৪০ ২০ অতিরিক্ত চাহিদা দাম বৃদ্ধির চাপ
৩০ ৩০ ৩০ চাহিদা = জোগান (ভারসাম্য) স্থির ভারসাম্য দাম
৪০ ২০ ৪০ অতিরিক্ত জোগান (উদ্বৃত্ত) দাম হ্রাসের চাপ
৫০ ১০ ৫০ অতিরিক্ত জোগান দাম হ্রাসের চাপ

ছকে লক্ষ্য করা যায়, প্রতি এককের দাম যখন ৩০ টাকা, তখন ক্রেতার চাহিদার পরিমাণ (৩০ একক) এবং বিক্রেতার জোগানের পরিমাণ (৩০ একক) পরস্পর সমান হয়। ফলে বাজারে কোনো ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত থাকে না। এই ৩০ টাকাই হলো ভারসাম্য দাম এবং ৩০ একক হলো ভারসাম্য পরিমাণ।


৩। পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার ও একচেটিয়া বাজারের মধ্যে পার্থক্য লেখ। ইসলামে কেন পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার পছন্দ করা হয়? আলোচনা কর। [Write the difference between perfect competitive market and monopoly market. Why the perfect competitive market is preferable in Islam? Discuss.]

পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক ও একচেটিয়া বাজারের সংজ্ঞা ও তুলনা

১. পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার (Perfect Competition): যে বাজারে বহুসংখ্যক ক্রেতা ও বিক্রেতা সম্পূর্ণ সমজাতীয় (Homogeneous) পণ্য একটি নির্ধারিত মূল্যে অবাধে কেনাবেচা করে এবং যেখানে কোনো একক ক্রেতা বা বিক্রেতার পক্ষে বাজারের দাম প্রভাবিত করা সম্ভব হয় না, তাকে পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার বলে।
২. একচেটিয়া বাজার (Monopoly): যে বাজারে কোনো একটি নির্দিষ্ট দ্রব্যের একমাত্র উৎপাদক বা বিক্রেতা থাকে এবং বাজারে দ্রব্যটির কোনো নিকটতম বিকল্প দ্রব্য থাকে না, তাকে একচেটিয়া বাজার বলে।

বিবেচ্য বিষয় পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার একচেটিয়া বাজার
ক্রেতা ও বিক্রেতার সংখ্যা অসংখ্য ক্রেতা ও অসংখ্য বিক্রেতা থাকে। অসংখ্য ক্রেতা থাকে, কিন্তু বিক্রেতা বা উৎপাদক মাত্র একজন।
পণ্যের সমজাতীয়তা পণ্যসমূহ সম্পূর্ণ সমজাতীয় ও অভিন্ন। পণ্যের কোনো নিকটতম বিকল্প দ্রব্য (Close Substitute) থাকে না।
দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফার্ম বা বিক্রেতা দাম গ্রহীতা (Price Taker); বাজার নির্ধারিত দামে বিক্রি হয়। ফার্ম নিজেই দাম নির্ধারক (Price Maker); নিজের ইচ্ছামতো দাম নিয়ন্ত্রণ করে।
বাজারে প্রবেশ ও প্রস্থান নতুন ফার্মের প্রবেশ ও প্রস্থান সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও অবাধ। নতুন ফার্মের প্রবেশে আইনগত, কৌশলগত বা প্রাকৃতিক কঠিন প্রতিবন্ধকতা থাকে।
বিজ্ঞাপন ব্যয় পণ্য সমজাতীয় হওয়ায় কোনো প্রচার বা বিজ্ঞাপন ব্যয়ের প্রয়োজন হয় না। নতুন তথ্য জানাতে মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপনের প্রয়োজন হতে পারে, তবে প্রতিযোগিতা এড়াতে নয়।
মুনাফার পরিমাণ দীর্ঘকালে কেবল স্বাভাবিক মুনাফা (Normal Profit) অর্জিত হয়। স্বল্পকাল ও দীর্ঘকাল উভয় সময়েই অস্বাভাবিক মুনাফা (Super-normal Profit) অর্জন সম্ভব।

ইসলামে কেন পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার পছন্দ করা হয়?

ইসলামি অর্থনীতি একটি ইনসাফভিত্তিক ও শোষণমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে। শরিয়তের দৃষ্টিতে পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও কাঙ্ক্ষিত হওয়ার প্রধান কারণগুলো নিম্নরূপ:

১. মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধ (تحريم الاحتكار): একচেটিয়া বাজারে একক বিক্রেতা বা সিন্ডিকেট পণ্যের জোগান সংকুচিত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লোটার সুযোগ পায়। ইসলামে এ ধরনের মজুতদারি (احتكار – ইহতিকার) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «لَا يَحْتَكِرُ إِلَّا خَاطِئٌ» (পাপী ব্যক্তি ব্যতীত কেউ মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে না – সহীহ মুসলিম)। পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বহুসংখ্যক বিক্রেতা থাকায় কোনো সিন্ডিকেট বা মজুতদারির সুযোগ থাকে না।

২. স্বয়ংক্রিয় ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ (السعر العادل): পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দাম নির্ধারণে হস্তক্ষেপ করতে পারে না; বরং চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিক ভারসাম্য দাম নির্ধারিত হয়। শরিয়তের পরিভাষায় একে ‘সামানুল মিছল’ (ثمن المثل – ন্যায্য বাজারমূল্য) বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেলে সাহাবিরা দাম বেঁধে দেওয়ার আবেদন করলে তিনি বলেন, মূল্য নির্ধারণকারী মূলত মহান আল্লাহ; তিনি স্বাভাবিক বাজার শক্তির ওপর হস্তক্ষেপ পছন্দ করতেন না।

৩. ভোক্তার অধিকার ও সার্বিক কল্যাণ সুরক্ষা (رعاية مصلحة المستهلك): একচেটিয়া বাজারে বিকল্প না থাকায় ভোক্তা ইচ্ছাকৃত উচ্চমূল্য ও নিম্নমানের পণ্য গ্রহণে বাধ্য হয়। বিপরীতে, পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অসংখ্য বিক্রেতা থাকার ফলে ভোক্তারা প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে সর্বোচ্চ গুণগত মানের পণ্য নির্বাচনের পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে, যা ইসলামি ন্যায়বিচার ও ভোক্তা অধিকারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ।

৪. অবাধ প্রবেশাধিকার ও সুযোগের সমতা (حرية الدخول وتكافؤ الفرص): ইসলাম সমাজে প্রতিটি নাগরিকের জন্য হালাল উপার্জনের অবাধ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। একচেটিয়া বাজার কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করে নতুন উদ্যোক্তাদের প্রবেশ রোধ করে। পক্ষান্তরে পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার যেকোনো সক্ষম ব্যক্তিকে হালাল বাণিজ্যে আত্মনিয়োগের সুযোগ দেয়, যা বেকারত্ব দূরীকরণ ও সম্পদে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে।

৫. ধোঁকা ও অতিরিক্ত শোষণ দূরীকরণ (نفي الغبن والتدليس): পূর্ণ প্রতিযোগিতায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই বাজার পরিস্থিতি, পণ্যের মান ও মূল্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত থাকে। ফলে ব্যবসায়িক তথ্য গোপন রাখা, ধোঁকা (গাশশ) এবং অতিরিক্ত মুনাফা শিকারের মাধ্যমে ক্রেতাকে প্রতারিত করার সুযোগ থাকে না।


৪। ইসলামি ব্যাংক বলতে কী বোঝায়? ইসলামি ব্যাংকের কার্যাবলি আলোচনা কর। [What do you mean by ‘Islamic Bank’? Discuss the functions of Islamic Bank.]

ইসলামি ব্যাংকের পরিচয় ও সংজ্ঞা

আভিধানিক অর্থ: ‘ব্যাংক’ শব্দের উৎপত্তি ইতালীয় শব্দ ‘Banco’ বা ‘Banca’ থেকে, যার অর্থ বেঞ্চ বা টাকা লেনদেনের টেবিল।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামি ব্যাংক হলো এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যা ইসলামি শরিয়তের নীতিমালার পূর্ণ অনুসরণে পরিচালিত হয়, যেখানে রিবা (সুদ) সম্পূর্ণরূপে বর্জন করে লাভ-ক্ষতির অংশীদারি (Profit and Loss Sharing) ও ন্যায়সংগত শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের মাধ্যমে আমানত গ্রহণ, ঋণ প্রদান এবং সার্বিক আর্থিক সেবা প্রদান করা হয়।

ইসলামি ব্যাংকসমূহের আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন (IAIB)-এর সংজ্ঞানুযায়ী:
“The Islamic Bank is a financial institution that undertakes banking transactions adhering strictly to the Islamic principles of transactions and Islamic law, establishing socio-economic justice.”

ইসলামি ব্যাংকের প্রধান কার্যাবলি

ইসলামি ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকের মতো কেবল অর্থ লেনদেনকারী মধ্যস্থতাকারী নয়, বরং এটি একটি সমাজকল্যাণমুখী ও শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান। এর মূল কার্যাবলি নিম্নরূপ:

১. শরিয়াহসম্মত আমানত গ্রহণ (قبول الودائع المشروعة):
আল-ওয়াদিয়াহ চলতি হিসাব (Al-Wadi’ah Current Account): আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ শর্তে অর্থ জমা রাখা, যা গ্রাহক চাহিবামাত্র কোনো লাভ-ক্ষতি ছাড়া ফেরত পান।
মুদারাবা সঞ্চয়ী ও মেয়াদি হিসাব (Mudaraba Savings & Term Deposits): গ্রাহক মূলধন জোগানদাতা (সাহিবুল মাল) এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপক (মুদারিব) হিসেবে চুক্তি করে। অর্জিত নিট মুনাফা পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে বণ্টন করা হয়।

২. লাভ-ক্ষতির অংশীদারিভিত্তিক বিনিয়োগ (الاستثمار بالمشاركة والمضاربة):
মুশারাকা (Musharakah): যৌথ মূলধনী ব্যবসায় যেখানে ব্যাংক ও উদ্যোক্তা উভয়ই পুঁজি বিনিয়োগ করে এবং চুক্তি অনুযায়ী লাভ বণ্টন ও মূলধনের অনুপাতে ক্ষতি বহন করে।
মুদারাবা (Mudarabah): ব্যাংক এককভাবে মূলধন প্রদান করে এবং দক্ষ উদ্যোক্তা শ্রম ও মেধা দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে।

৩. বাণিজ্যিক ও বিক্রয়ভিত্তিক অর্থায়ন (التمويل بالبيوع):
মুরাবাহা (Murabahah): গ্রাহকের চাহিদানুযায়ী ক্রয়কৃত পণ্যের প্রকৃত মূল্যের সাথে নির্দিষ্ট লাভ বা মার্ক-আপ যুক্ত করে বাকিতে বা কিস্তিতে বিক্রয়।
বায়’ মুয়াজ্জাল (Bai Mu’ajjal): নির্ধারিত সময়ে মূল্য পরিশোধের শর্তে পণ্য বাকিতে বিক্রয়।
বায়’ সালাম (Bai Salam): কৃষিপণ্য বা নির্ধারিত দ্রব্যের মূল্য অগ্রিম গ্রহণ করে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহের চুক্তি।
ইসতিসনা’ (Istisna’a): নির্দিষ্ট নির্মাণ বা উৎপাদন কাজের অগ্রিম চুক্তিভিত্তিক অর্থায়ন।

৪. সম্পত্তি ভাড়া ও লিজ প্রদান (الإجارة):
ইজারা বিল বাই বা হায়ার পারচেজ (Hire Purchase under Shirkatul Melk – HPSM): স্থায়ী সম্পত্তি যেমন গাড়ি, ভারী যন্ত্রপাতি বা আবাসন যৌথ মালিকানায় ক্রয় করে গ্রাহকের কাছে ভাড়া প্রদান এবং কিস্তি পরিশোধ শেষে পূর্ণ মালিকানা হস্তান্তর।

৫. সামাজিক ও কল্যাণমুখী কার্যক্রম (الخدمات الاجتماعية):
করযে হাসানা (Qard Hasan): অভাবগ্রস্ত, দরিদ্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের কোনো মুনাফা বা সার্ভিস চার্জ ব্যতীত সুদমুক্ত মানবিক ঋণ প্রদান।
জাকাত ও সাদাকাহ তহবিল ব্যবস্থাপনা: গ্রাহক ও ব্যাংকের জাকাত সংগ্রহ করে শরিয়াহ নির্দেশিত আটটি খাতে সরাসরি বণ্টন করা।
ওয়াকফ ও সমাজসেবা: ওয়াকফ তহবিল গঠন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়তা।


৫। ইসলামে আয় ও ব্যয়ের ধারণা দাও। হালাল উপার্জনের বৈধ পন্থাগুলো আলোচনা কর। [Give the concept of expenditure and income in Islam. Discuss the rightful method of income.]

ইসলামে আয়ের ধারণা (مفهوم الدخل في الإسلام)

ইসলামি অর্থব্যবস্থায় আয়ের ধারণা নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রচলিত পুঁজিবাদে যে কোনো উপায়ে অর্থ অর্জনকে বৈধ মনে করা হলেও ইসলামে উপার্জনের পন্থাকে পবিত্র ও কল্যাণকর হতে হয়:

১. সম্পদ আল্লাহর আমানত: বিশ্বজগতের সমস্ত সম্পদের প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহ। মানুষ কেবল শর্তসাপেক্ষ প্রতিনিধি ও আমানতদার। ইরশাদ হয়েছে: ﴿وَآتُوهُم مِّن مَّالِ اللَّهِ الَّذِي آتَاكُمْ﴾ (আর আল্লাহ তোমাদের যে সম্পদ দান করেছেন তা থেকে তাদের প্রদান কর – সূরা আন-নূর: ৩৩)।
২. হালাল উপার্জনের অপরিহার্যতা ও ইবাদততুল্য মর্যাদা: ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল রিজিক অন্বেষণ করা ফরজ দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «طَلَبُ كَسْبِ الْحَلَالِ فَرِيضَةٌ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ» (ফরজ ইবাদতসমূহের পর হালাল জীবিকা সন্ধান করাও একটি ফরজ দায়িত্ব – শু’আবুল ঈমান, বায়হাকী)।
৩. উপার্জনের জবাবদিহিতা: কিয়ামতের দিন আয়ের প্রতিটি উৎসের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে। হাদিস শরিফে এসেছে, মানুষ তার ধনসম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে—এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এক কদমও নড়তে পারবে না।

ইসলামে ব্যয়ের ধারণা (مفهوم الإنفاق في الإسلام)

ইসলাম সম্পদকে অলসভাবে জমিয়ে রাখা কিংবা অনর্থক অপচয় করা—উভয় চরমপন্থাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে:

১. মধ্যমপন্থা ও ভারসাম্য (الاعتدال والوسطية): অপব্যয় ও কৃপণতার মধ্যবর্তী পথ গ্রহণ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: ﴿وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا﴾ (এবং তারা যখন ব্যয় করে তখন অপব্যয়ও করে না, কার্পণ্যও করে না; বরং তাদের নীতি হয় এ দুয়ের মধ্যবর্তী ভারসাম্যপূর্ণ – সূরা আল-ফুরকান: ৬৭)।
২. অপচয় ও অপব্যয় বর্জন: সম্পদের অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই আখ্যা দেওয়া হয়েছে: ﴿إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ﴾ (নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই – সূরা বনী ইসরাঈল: ২৭)।
৩. ব্যয়ের অগ্রাধিকার কাঠামো (ترتيب الأولويات): ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়ত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে: প্রথমত নিজের ও অধীনস্থদের মৌলিক প্রয়োজন (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা); দ্বিতীয়ত আত্মীয়-স্বজনের ভরণপোষণ; তৃতীয়ত জাকাত, উশর ও নফল সাদাকাহর মাধ্যমে অসহায় মানবতার কল্যাণ সাধন।

হালাল উপার্জনের বৈধ পন্থাগুলো

শরিয়তের নির্দেশিত কাঠামোর মধ্যে থেকে একজন মানুষ যেসব পন্থায় হালাল আয় উপার্জন করতে পারে, তা নিম্নরূপ:

১. ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় (التجارة المشروعة): ইসলামে সততাভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য আয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। মহান আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন: ﴿وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا﴾ (আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন – সূরা আল-বাক্বারা: ২৭৫)। সত্যবাদী ব্যবসায়ীর মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: «التَّاجِرُ الصَّدُوقُ الأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ» (সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদগণের সঙ্গে থাকবে – তিরমিযী)।

২. কৃষিকাজ ও ফলন উৎপাদন (الزراعة والفلاحة): ভূমি কর্ষণ, কৃষিকর্ম ও বৃক্ষরোপণ জীবিকার অন্যতম প্রধান বৈধ উৎস। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন: কোনো মুসলমান যদি কোনো বৃক্ষরোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা চতুষ্পদ জন্তু ভক্ষণ করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে (সহীহ বুখারী)।

৩. শিল্প, কারিগরি ও কায়িক শ্রম (الصناعة والحرفة): স্বহস্তে উপার্জন এবং কোনো শিল্প বা হস্তশিল্পে পারদর্শিতা লাভ করা ইসলামের প্রশংসিত নীতি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: «مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أَنْ يَأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ» (নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উৎকৃষ্টতর খাবার কেউ কখনো খায়নি; আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) স্বহস্তে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন – সহীহ বুখারী)।

৪. চাকরি, সেবা ও পারিশ্রমিক (الإجارة والخدمة): শারীরিক বা মানসিক শ্রম দিয়ে কোনো বৈধ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করে ন্যায্য পারিশ্রমিক বা বেতন গ্রহণ করা শরিয়তসম্মত। তবে এতে চুক্তি পালন ও দায়িত্বের পূর্ণ আমানতদারি রক্ষা করা অপরিহার্য।

৫. মুদারাবা ও মুশারাকা বিনিয়োগ (المشاركة والمضاربة): বৈধ যৌথ ব্যবসা বা ইসলামি ব্যাংকিং ও আর্থিক সংস্থায় লাভ-ক্ষতির অংশীদারির ভিত্তিতে হালাল মূলধন খাটানো এবং অর্জিত বৈধ মুনাফা ভোগ করা।

৬. মিরাস বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্তি (الميراث الشرعي): কোনো আত্মীয়ের মৃত্যুর পর শরিয়াহ নির্ধারিত ফারায়েয নীতি অনুযায়ী বণ্টিত উত্তরাধিকার সম্পত্তি সম্পূর্ণরূপে হালাল ও বৈধ আয়ের অংশ।

৭. হেবা, হাদিয়া ও অসিয়ত (الهبة والهدية والوصية): বৈধ নিয়তে কাউকে দেওয়া উপহার, উপঢৌকন বা দান গ্রহণ করা হালাল উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত।


৬। ইসলামি ভোক্তা কাকে বলে? একজন ইসলামি ভোক্তা ও সাধারণ ভোক্তার মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর। [What do you mean by Islamic consumer? Distinguish between an Islamic consumer and conventional consumer.]

ইসলামি ভোক্তার সংজ্ঞা (تعريف المستهلك الإسلامي)

ধারণা: ভোগ হলো মানুষের অভাব মোচনের উদ্দেশ্যে কোনো দ্রব্যের উপযোগিতা ব্যবহার করা। সাধারণ অর্থনীতিতে যে কোনো দ্রব্য ক্রয়ের মাধ্যমে সন্তুষ্টি লাভকারী ব্যক্তিকে ভোক্তা বলা হলেও ইসলামি অর্থনীতিতে ভোক্তার সংজ্ঞা কেবল বৈষয়িক তৃপ্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
সংজ্ঞা: ইসলামি ভোক্তা হলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি তার ভোগসংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত ও আচরণ ইসলামি শরিয়তের হালাল-হারাম বিধান এবং নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে পরিচালনা করেন, যা ইহকালীন শারীরিক ও মানসিক শক্তি অর্জন এবং পরকালীন মুক্তি (ফালাহ – فلاح) লাভের উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত হয়।

ইসলামি ভোক্তা শুধু উপযোগ সর্বোচ্চকরণ (Utility Maximization) নয়, বরং ‘হাসানাত’ ও ‘মারদাতুল্লাহ’ (আল্লাহর সন্তুষ্টি) অর্জনের লক্ষ্যে সম্পদ ভোগ করেন।

ইসলামি ভোক্তা ও সাধারণ (প্রচলিত) ভোক্তার মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য

বিবেচ্য বিষয় ইসলামি ভোক্তা (Islamic Consumer) সাধারণ/প্রচলিত ভোক্তা (Conventional Consumer)
১. মূল চালিকাশক্তি ও দর্শন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন মুক্তি (ফালাহ)। জীবনের মূল দর্শন হলো দায়িত্ববোধ ও আমানতদারি। আত্মস্বার্থ ও বৈষয়িক তৃপ্তি। ‘অর্থনৈতিক মানব’ (Homo Economicus) হিসেবে কেবল নিজের আনন্দ অন্বেষণ করে।
২. উপযোগের ধারণা (Utility Concept) উপযোগ ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতের সামগ্রিক কল্যাণ দ্বারা নির্ধারিত হয় (U = f(Dunya, Akhirah))। উপযোগ সম্পূর্ণ ইহজাগতিক ও বস্তুগত তৃপ্তির ওপর নির্ভরশীল (U = f(Material Consumption))।
৩. ভোগ পণ্যের সীমা ও প্রকৃতি কেবলমাত্র পবিত্র, কল্যাণকর ও শরিয়ত অনুমোদিত হালাল পণ্য (হালালান তাইয়্যেবা) ভোগ করা বৈধ। হারাম পণ্য ভোগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাজারে চাহিদা ও দাম পরিশোধের সামর্থ্য থাকলে যে কোনো বৈধ-অবৈধ বা ক্ষতিকর পণ্য (মদ, জুয়া ইত্যাদি) ভোগ করতে পারে।
৪. বাজেট ও ব্যয়ের বণ্টন বাজেট কেবল নিজের ভোগের জন্য নয়; বরং বাধ্যতামূলক জাকাত ও স্বেচ্ছামূলক সাদাকাহর মাধ্যমে সমাজের নিঃস্বদের জন্য ব্যয় বরাদ্দ রাখে। সম্পূর্ণ বাজেট নিজের এবং পরিবারের ব্যক্তিগত ভোগ ও ভবিষ্যতে সম্পদ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে।
৫. ভোগের মাত্রা ও নিয়ন্ত্রণ অপচয় (ইফরাত) এবং কার্পণ্য (তাফরিত) পরিহার করে পরিমিতিবোধ ও ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। আয়ের সামর্থ্য থাকলে লাগামহীন অপব্যয় বা প্রদর্শনেচ্ছা (Conspicuous Consumption) কোনো বাধা নয়।
৬. চাহিদার অগ্রাধিকার স্তর মাকাসিদুশ শরীয়াহর আলোকে ভোগকে জরুরি প্রয়োজন (জরুরিয়্যাত), সাধারণ প্রয়োজন (হাজিয়্যাত) এবং শোভাদানকারী (তাহসিনিয়্যাত) স্তরে বিন্যস্ত করে। ব্যক্তিগত রুচি, ফ্যাশন ও বিজ্ঞাপনের প্রভাবে কৃত্রিম চাহিদা ও বিলাসিতাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।
৭. সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সহমর্মিতা প্রতিবেশী অভুক্ত রেখে নিজে পেট পুরে খাওয়াকে ইসলামি ভোক্তা হারাম মনে করে। সামাজিক কল্যাণকে ব্যক্তিভোগের ওপর স্থান দেয়। সামাজিক সমবেদনা ব্যক্তিগত নীতিমাত্র; অর্থনৈতিক আচরণে তা কোনো অপরিহার্য বা বিধিবদ্ধ শর্ত নয়।

উপসংহার

সারসংক্ষেপে, প্রচলিত অর্থনীতির ভোক্তা চরম ব্যক্তিস্বার্থপর ও ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত হয়, যা সমাজে অপচয় ও বৈষম্য বাড়িয়ে তোলে। পক্ষান্তরে, একজন ইসলামি ভোক্তা ন্যায়পরায়ণ, পরিমিতিবোধসম্পন্ন এবং নৈতিকতায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা সমাজের প্রতিটি স্তরে ভারসাম্য, সহমর্মিতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।


খ-বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও: মান ৪ × ৫ = ২০)

৭. ইসলামি অর্থনীতিতে জাকাতের গুরুত্ব ও বণ্টনের আটটি খাত উল্লেখ কর।

জাকাতের গুরুত্ব: জাকাত ইসলামি অর্থনীতির ভিত্তিস্তম্ভ এবং দরিদ্রের প্রতি কোনো দয়া নয়, বরং ধনীর সম্পদে তাদের শরয়ী অধিকার। এটি সমাজে সম্পদের আবর্তন নিশ্চিত করে এবং পুঁজিপতিদের সম্পদ কুক্ষিগত করা রোধ করে।
বণ্টনের আটটি খাত (সূরা আত-তাওবা, আয়াত ৬০):
১. ফকির (চরম নিঃস্ব), ২. মিসকিন (অভাবগ্রস্ত আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি), ৩. জাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী (আমেলীন), ৪. মন জয় করার জন্য (মুয়াল্লাফাতুল কুলুব), ৫. দাসমুক্তি বা বন্দিমুক্তি, ৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ (গারেমীন), ৭. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও দ্বীন প্রচার (ফী সাবীলিল্লাহ), এবং ৮. অসহায় মুসাফির বা পথচারী (ইবনুস সাবীল)।


৮. রিবা (সুদ) ও মুনাফার মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য কী?

বিবেচ্য বিষয় রিবা বা সুদ (Riba) মুনাফা বা লাভ (Profit)
শরয়ী অবস্থান কুরআন ও হাদিসের অকাট্য দলিলে সম্পূর্ণ হারাম। বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত মুনাফা হালাল।
ঝুঁকি গ্রহণ ঋণদাতা কোনো ব্যবসায়িক ঝুঁকি বা লোকসান বহন করে না। লাভের সাথে লোকসান ও ব্যবসায়িক ঝুঁকির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকে।
হারের নিশ্চয়তা আগে থেকেই মূলধনের ওপর একটি নির্দিষ্ট হারে অতিরিক্ত টাকা নিশ্চিত করা হয়। ব্যবসায়ের বাস্তব ফলাফলের ওপর নির্ভর করে; পূর্বনির্ধারিত লাভ নির্দিষ্ট নয়।
অর্থনৈতিক প্রভাব ধনীকে আরও ধনী এবং ঋণগ্রহীতাকে নিঃস্ব করে শোষণ বৃদ্ধি করে। উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে ইনসাফপূর্ণ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।

৯. বায়’ মুয়াজ্জাল (بيع مؤجل) ও বায়’ সালাম (بيع سلم) এর সংজ্ঞা দাও।

বায়’ মুয়াজ্জাল: যে বেচাকেনায় চুক্তির সময়ই পণ্য ক্রেতাকে তাৎক্ষণিকভাবে হস্তান্তর করা হয়, কিন্তু পণ্যের মূল্য ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট তারিখে এককালীন অথবা কিস্তিতে পরিশোধের চুক্তি হয়, তাকে বায়’ মুয়াজ্জাল (বাকিতে বিক্রয়) বলে।
বায়’ সালাম: বায়’ মুয়াজ্জালের সম্পূর্ণ বিপরীত পদ্ধতি। এতে ক্রেতা চুক্তির সময়ই অগ্রিম পূর্ণ নগদ মূল্য বিক্রেতাকে পরিশোধ করে দেয়, এবং বিক্রেতা ভবিষ্যতে কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য ক্রেতাকে সরবরাহ করার অঙ্গীকার করে। কৃষি ও মৌসুমী ফসলের ক্ষেত্রে এটি বহুল ব্যবহৃত।


১০. উৎপাদনের উপাদানসমূহ কী কী এবং ইসলামি অর্থনীতিতে তাদের পারিশ্রমিক কীভাবে নির্ধারিত হয়?

অর্থনীতিতে উৎপাদনের মৌলিক উপাদান চারটি:
১. ভূমি (Land): ভূমির ইসলামি পারিশ্রমিক হলো ন্যায্য ভাড়া বা উৎপন্ন ফসলের ভাগ (বর্গা/মুজারাআ)।
২. শ্রম (Labour): শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ঘাম শুকানোর পূর্বেই প্রদান করার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম।
৩. মূলধন (Capital): সনাতন অর্থনীতিতে মূলধনের পারিশ্রমিক ‘সুদ’, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইসলামে মূলধনের পারিশ্রমিক হলো ব্যবসায়ে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অর্জিত বৈধ ‘মুনাফা’।
৪. সংগঠন (Organization): উদ্যোক্তা বা সংগঠনের পারিশ্রমিক হলো ঝুঁকি নেওয়ার ফলস্বরূপ প্রাপ্ত ‘নিট লাভ’।


১১. মুদ্রাস্ফীতি বলতে কী বোঝায়? এটি নিয়ন্ত্রণের ইসলামি উপায় কী?

মুদ্রাস্ফীতির সংজ্ঞা: যখন বাজারে পণ্যের জোগানের তুলনায় মুদ্রা বা অর্থের প্রবাহ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পায়, ফলে দ্রব্যের সামগ্রিক মূল্যস্তর ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়, তখন তাকে মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) বলে।
নিয়ন্ত্রণের ইসলামি উপায়:
১. পণ্য মজুতদারি (ইহতিকার) ও কৃত্রিম সংকট কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা।
২. সুদি ঋণের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম অর্থের সরবরাহ বন্ধ রাখা।
৩. স্বর্ণ ও রৌপ্য ভিত্তিক সম্পদ সমর্থিত (Asset-backed) অর্থনৈতিক লেনদেন চালু করা।
৪. জাকাত ও সাদাকাহর মাধ্যমে প্রকৃত উৎপাদনমুখী খাতে অর্থ বিনিয়োগ উৎসাহিত করা।


১২. মুদারাবা ও মুশারাকার মধ্যে পার্থক্য কী?

বিবেচ্য বিষয় মুদারাবা (Mudarabah) মুশারাকা (Musharakah)
মূলধন জোগান এক পক্ষ (সাহিবুল মাল) সমুদয় মূলধন দেয়, অন্য পক্ষ (মুদারিব) কেবল শ্রম ও মেধা দেয়। উভয় পক্ষই ব্যবসায় অর্থ ও মূলধন বিনিয়োগ করে।
ব্যবস্থাপনা ব্যবসায়ের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কেবল শ্রমদাতার হাতে থাকে। উভয় পক্ষ অথবা তাদের মনোনীত যে কেউ ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে।
লোকসানের দায় ব্যবসায়ে লোকসান হলে আর্থিক ক্ষতি কেবল মূলধনদাতার; মুদারিবের শ্রম বৃথা যায়। লোকসান হলে উভয় পক্ষ নিজ নিজ মূলধনের অনুপাত অনুযায়ী ক্ষতি বহন করে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ইসলামি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কী?

ইসলামি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো হালাল উপায়ে সম্পদ উপার্জন, আদল ও ইনসাফভিত্তিক বণ্টন এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

চাহিদা বিধিতে দাম ও চাহিদার সম্পর্ক কেমন?

চাহিদা বিধি অনুযায়ী দাম বৃদ্ধি পেলে চাহিদা হ্রাস পায় এবং দাম হ্রাস পেলে চাহিদা বৃদ্ধি পায়; অর্থাৎ তাদের সম্পর্ক বিপরীতমুখী।

একচেটিয়া বাজারের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?

একচেটিয়া বাজারে উৎপাদক বা বিক্রেতা একজনমাত্র থাকে এবং উৎপাদিত পণ্যের কোনো নিকটবর্তী বিকল্প দ্রব্য বাজারে থাকে না।

জাকাত বণ্টনের প্রধান খাত কয়টি?

পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াত অনুযায়ী জাকাত বণ্টনের সুনির্দিষ্ট খাত মোট আটটি।

বায়’ সালামের ক্ষেত্রে মূল্য কখন পরিশোধ করতে হয়?

বায়’ সালামের ক্ষেত্রে চুক্তির সময়ই সম্পূর্ণ মূল্য অগ্রিম নগদ পরিশোধ করতে হয় এবং পণ্য ভবিষ্যতে সরবরাহ করা হয়।

ইসলামে মূলধনের ওপর নির্দিষ্ট সুদ হারাম কেন?

সুদ কোনো ঝুঁকি ছাড়াই পুঁজির ওপর অন্যায় অতিরিক্ত দাবি করে ঋণগ্রহীতাকে শোষণ করে, যা ইসলামি ন্যায়বিচার ও সাম্যের পরিপন্থী।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *