ফাযিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪
আল হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি
বিষয় কোড : 202106 | সময় : ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান : ৮০
২০২৪ সালের ফাজিল ১ম বর্ষ আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের পরীক্ষার্থীদের জন্য অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি বিষয়ের ক-বিভাগ (রচনামূলক) ও খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত) উভয় অংশের মূল প্রশ্নপত্রের মুদ্রিত প্রতিটি ইংরেজি ও বাংলা প্রশ্ন শতভাগ অবিকলভাবে তুলে ধরে পূর্ণাঙ্গ অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে প্রস্তুত করে দেওয়া হলো।
ক বিভাগ (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও) — মান: ১৫ × ৪ = ৬০
১। অর্থনীতির সংজ্ঞা দাও। অর্থনীতি পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর। (৫+১০=১৫)
[Define economics. Discuss the importance and necessity of reading economics.]
অর্থনীতির সংজ্ঞা (Definition of Economics):
অর্থনীতি মানবজাতির বস্তুগত কল্যাণ ও সীমিত সম্পদের দক্ষ ব্যবহারের বিজ্ঞান। গ্রিক শব্দ ‘Oikonomia’ (যার অর্থ গৃহস্থালি পরিচালনা) থেকে আধুনিক ‘Economics’ শব্দের উৎপত্তি। যুগে যুগে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদগণ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনীতির সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন:
- অ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith): ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ ১৭৭৬ সালে তাঁর বিখ্যাত ‘Wealth of Nations’ গ্রন্থে অর্থনীতিকে সম্পদের বিজ্ঞান হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “Economics is an inquiry into the nature and causes of the wealth of nations.”
- আলফ্রেড মার্শাল (Alfred Marshall): নব্য-ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদ মার্শাল ১৮৯০ সালে ‘Principles of Economics’ গ্রন্থে বলেন, “Economics is a study of mankind in the ordinary business of life.” তিনি অর্থনীতিকে মানব কল্যাণের বিজ্ঞান বলে চিহ্নিত করেন।
- লায়োনেল রবিন্স (Lionel Robbins): আধুনিক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রবিন্স ১৯৩২ সালে সর্বাধিক বিজ্ঞানসম্মত সংজ্ঞায় বলেন, “Economics is the science which studies human behavior as a relationship between ends and scarce means which have alternative uses.” অর্থাৎ অর্থনীতি এমন একটি বিজ্ঞান যা মানুষের অসীম অভাব এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সীমিত সম্পদের পারস্পরিক সম্পর্কবিষয়ক মানবীয় আচরণ বিশ্লেষণ করে।
অর্থনীতি পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা (Importance and Necessity of Reading Economics):
- সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার: মানুষের অভাবের কোনো সীমা নেই কিন্তু অভাব পূরণের সম্পদ সীমিত। অর্থনীতি পাঠের মাধ্যমে ব্যক্তি ও রাষ্ট্র শিখতে পারে কীভাবে সীমিত সম্পদের দক্ষতম উপায়ে ব্যবহার করে সর্বোচ্চ উপযোগ অর্জন করা যায়।
- নির্বাচন সমস্যার সমাধান: মানবজীবনের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো ‘নির্বাচন’ (Problem of Choice)। অর্থনীতি আমাদের অভাবের গুরুত্ব ও তীব্রতা অনুসারে অগ্রাধিকার নির্ধারণের শিক্ষা দেয়।
- দৈনন্দিন পারিবারিক বাজেট পরিচালনা: গৃহস্থালির সীমিত আয় দিয়ে কীভাবে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার বাজেট সুষমভাবে বণ্টন করা যায়, তা অর্থনীতি শিক্ষা দেয়।
- উৎপাদন ও বাণিজ্যের গতি প্রকৃতি নির্ধারণ: ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, পণ্যের মূল্য নির্ধারণ এবং সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনে অর্থনীতির চাহিদা ও যোগান তত্ত্ব দিকনির্দেশনা দেয়।
- জাতীয় নীতি ও বাজেট প্রণয়ন: সরকারের রাজস্ব আয়, উন্নয়ন ব্যয়, দারিদ্র্য বিমোচন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বেকারত্ব দূরীকরণে অর্থনীতির জ্ঞান অপরিহার্য।
- ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির উপলব্ধি: ইসলামে অপচয় ও অপব্যয় বর্জন করে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতি পাঠের মাধ্যমে হালাল উপার্জন ও বৈষম্যহীন সম্পদ বণ্টনের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।
২। চাহিদা ও যোগান বলতে কী বুঝ? চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্বটি আলোচনা কর। (৫+১০=১৫)
[What do you mean by demand and supply? Discuss the conventional theory of demand and supply.]
চাহিদা ও যোগানের ধারণা (Concept of Demand and Supply):
চাহিদা (Demand): সাধারণ অর্থে কোনো বস্তু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে চাহিদা বলে। কিন্তু অর্থনীতিতে কেবল আকাঙ্ক্ষা থাকলেই চাহিদা হয় না। কোনো দ্রব্যের চাহিদা হতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ হতে হয়: (১) দ্রব্যটি পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, (২) দ্রব্যটি কেনার মতো প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য (অর্থ), এবং (৩) সেই অর্থ ব্যয় করার মানসিক ইচ্ছা। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দামে একজন ক্রেতা কোনো দ্রব্যের যে পরিমাণ ক্রয় করতে ইচ্ছুক ও সক্ষম হয়, তাকে চাহিদা বলে।
যোগান (Supply): অর্থনীতিতে কোনো বিক্রেতা বা উৎপাদক একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দামে বাজারে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে কোনো দ্রব্যের যে পরিমাণ প্রস্তুত ও উপস্থাপন করে, তাকে যোগান বলে। গুদামে মজুত থাকা মোট দ্রব্যের পরিমাণ হলো ‘মজুত’ (Stock), আর মজুতের যে অংশ বর্তমান দামে বিক্রির জন্য বাজারে আনা হয়, তা-ই হলো ‘যোগান’ (Supply)।
চাহিদা ও যোগানের সনাতন বা ক্লাসিক্যাল তত্ত্ব (Conventional Theory of Demand and Supply):
সনাতন অর্থনীতিবিদদের মতে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কোনো সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়াই ক্রেতার চাহিদা এবং বিক্রেতার যোগানের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে বাজারে একটি ভারসাম্য দাম (Equilibrium Price) এবং ভারসাম্য পরিমাণ (Equilibrium Quantity) নির্ধারিত হয়।
- চাহিদা বিধি: অন্যান্য অবস্থা স্থির থাকলে কোনো দ্রব্যের দাম কমলে তার চাহিদা বাড়ে এবং দাম বাড়লে চাহিদা কমে। দামের সাথে চাহিদার এই সম্পর্ক বিপরীতমুখী।
- যোগান বিধি: অন্যান্য অবস্থা স্থির থাকলে কোনো দ্রব্যের দাম বাড়লে বিক্রেতার যোগান বাড়ে এবং দাম কমলে যোগান কমে। দামের সাথে যোগানের এই সম্পর্ক সমমুখী।
- ভারসাম্য দাম নির্ধারণ: বাজারে যে নির্দিষ্ট দামে মোট চাহিদা (Qd) এবং মোট যোগান (Qs) পরস্পর সমান হয়, তাকে ভারসাম্য দাম বলে।
গাণিতিক শর্ত: Qd = Qs।
যদি বাজারে দাম ভারসাম্যের চেয়ে বেশি হয়, তবে বাজারে যোগানের প্রাচুর্য (Surplus) তৈরি হবে। অবিক্রিত পণ্যের চাপে বিক্রেতারা দাম কমাতে বাধ্য হবে। পক্ষান্তরে, দাম ভারসাম্যের নিচে নামলে অতিরিক্ত চাহিদা (Deficit) তৈরি হবে এবং ক্রেতাদের প্রতিযোগিতায় দাম পুনরায় ভারসাম্যে পৌঁছে যাবে।
উপসংহার: অ্যাডাম স্মিথের ‘অদৃশ্য হাত’ (Invisible Hand) মূলত চাহিদা ও যোগানের এই সনাতন বাজার শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ।
৩। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাকে বলে? অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর। (৫+১০=১৫)
[What is international trade? Discuss the differences between internal and international trade.]
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সংজ্ঞা (Definition of International Trade):
যখন দুই বা ততোধিক স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি ও রীতিনীতির অধীনে পণ্য, সেবা ও মূলধনের আদান-প্রদান বা কেনাবেচা সম্পন্ন হয়, তখন তাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য (International Trade) বলে। কোনো দেশই তার প্রয়োজনীয় সব পণ্য একাকী উৎপাদন করতে পারে না; ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তুলনামূলক উৎপাদন ব্যয়ের সুবিধার ভিত্তিতে দেশগুলো পারস্পরিক বাণিজ্যে লিপ্ত হয়।
অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মধ্যে পার্থক্য:
| পার্থক্যসূচক বিষয় | অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য (Internal Trade) | আন্তর্জাতিক বাণিজ্য (International Trade) |
|---|---|---|
| ভৌগোলিক পরিধি | একটি নির্দিষ্ট দেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানার অভ্যন্তরে ঘটে। | দুই বা ততোধিক স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রীয় সীমানা অতিক্রম করে পরিচালিত হয়। |
| ব্যবহৃত মুদ্রা | সমগ্র দেশে একক জাতীয় মুদ্রা (যেমন: টাকা) কার্যকর থাকে। | ভিন্ন ভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা (যেমন: মার্কিন ডলার, ইউরো) বিনিময় হারের মাধ্যমে ব্যবহৃত হয়। |
| উৎপাদন উপাদানের গতিশীলতা | শ্রম ও মূলধন দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে অবাধে চলাচল করতে পারে। | আইনগত, ভাষাগত ও ভিসা বিধিনিষেধের কারণে উপাদানসমূহের আন্তর্জাতিক চলাচল সীমিত। |
| শুল্ক ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ | দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহনে কোনো প্রকার আমদানি-রপ্তানি শুল্ক বা কোটা প্রযোজ্য হয় না। | উভয় দেশের কাস্টমস আইন, শুল্ক, অশুল্ক বাধা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি মেনে চলতে হয়। |
| লেনদেনের ভারসাম্য | দেশের ভেতরে অঞ্চলভিত্তিক লেনদেনের ভারসাম্যের কোনো সংকট দেখা দেয় না। | বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য (Balance of Payments) হিসাব বজায় রাখতে হয়। |
| বাজার পরিবেশ | আইন, ভাষা, সমাজ ব্যবস্থা ও ক্রেতার রুচি প্রায় অভিন্ন থাকে। | ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, আইন ও বাণিজ্যিক ঐতিহ্যের মুখোমুখি হতে হয়। |
৪। অর্থনীতিতে উৎপাদন বলতে কী বুঝ? উৎপাদনের উপকরণগুলোর বিবরণ দাও। (৫+১০=১৫)
[What is meant by production in economics? Discuss about factors of productions.]
অর্থনীতিতে উৎপাদন (Production in Economics):
সাধারণ অর্থে উৎপাদন বলতে কোনো নতুন বস্তু তৈরি করাকে বোঝায়। কিন্তু বিজ্ঞান ও অর্থনীতি অনুসারে মানুষ কোনো মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি বা ধ্বংস করতে পারে না। অর্থনীতিতে উৎপাদন বলতে প্রকৃতির প্রদত্ত বস্তুকে রূপান্তর, স্থান পরিবর্তন বা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজন মেটানোর উপযোগী নতুন উপযোগ (Utility) সৃষ্টি করাকে বোঝায়। যেমন: কাঠ থেকে আসবাবপত্র তৈরি করা কাঠের রূপগত উপযোগ সৃষ্টি করে, যা অর্থনীতিতে উৎপাদন।
উৎপাদনের উপকরণসমূহের বিবরণ (Factors of Production):
অর্থনীতিতে যেকোনো দ্রব্য বা সেবা উৎপাদনের জন্য চারটি মৌলিক উপকরণ অপরিহার্য:
- ভূমি (Land): প্রকৃতির সকল উপাদান যা উৎপাদনে সহায়ক, তাকে ভূমি বলে। মাটি, পানির উৎস, খনিজ দ্রব্য, বনাঞ্চল, নদ-নদী এবং জলবায়ু ভূমির অন্তর্ভুক্ত। ভূমির জোগান সম্পূর্ণ অস্থিতিস্থাপক (প্রকৃতির দান)। ভূমির মালিক ব্যবহারের বিনিময়ে যে অর্থ পায় তাকে ‘খাজনা’ (Rent) বলে।
- শ্রম (Labour): উৎপাদন কাজে নিয়োজিত মানুষের শারীরিক ও মানসিক সকল প্রকার সচেতন কর্মপ্রচেষ্টা যার বিনিময়ে আর্থিক পারিশ্রমিক পাওয়া যায়, তাকে শ্রম বলে। শ্রম ক্ষণস্থায়ী এবং শ্রমিক থেকে শ্রম বিচ্ছিন্ন করা যায় না। শ্রমের প্রতিদান হলো ‘মজুরি’ (Wages)।
- মূলধন (Capital): মানুষের শ্রম দ্বারা অতীতে উৎপাদিত সম্পদের যে অংশ সরাসরি ভোগে ব্যয় না করে পুনরায় অধিকতর সম্পদ উৎপাদনে বিনিয়োগ করা হয়, তাকে মূলধন বলে (যেমন: কলকারখানা, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ইত্যাদি)। মূলধনের প্রতিদান হলো ‘সুদ’ বা ইসলামি শরিয়াহ মতে ‘মুনাফা’ (Profit)।
- সংগঠন (Organization): ভূমি, শ্রম ও মূলধন—এই তিনটি উপকরণকে একত্র করে সমন্বয় সাধন, উৎপাদনের ঝুঁকি গ্রহণ এবং সার্বিক উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিচালনার কাজকে সংগঠন বলে। যিনি এ দায়িত্ব পালন করেন তাঁকে উদ্যোক্তা বা সংগঠক (Entrepreneur) বলা হয়। সংগঠনের অর্জিত প্রতিদান হলো ‘মুনাফা’ (Profit)।
৫। ইসলামি ব্যাংক বলতে কী বুঝ? ইসলামি ব্যাংকের কার্যাবলি আলোচনা কর। (৫+১০=১৫)
[What do you mean by Islamic Bank? Discuss the functions of Islamic Bank.]
ইসলামি ব্যাংকের সংজ্ঞা:
ইসলামি শরিয়াহর মৌলিক নীতিমালা এবং কুরআন-সুন্নাহর অনুশাসন অনুসরণ করে সুদমুক্ত (Riba-free) পদ্ধতিতে পরিচালিত এবং লাভ-লোকসান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আর্থিক মধ্যস্থতাকারী সংস্থাকে ইসলামি ব্যাংক বলে। ইসলামে সুদকে চিরতরে হারাম এবং ব্যবসাকে হালাল করা হয়েছে (“وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا”)। তাই ইসলামি ব্যাংকে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার সম্পর্ক থাকে না, বরং ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্ক হয় অংশীদার (মুদারাবা/মুশারাকা), ক্রেতা-বিক্রেতা (মুরাবাহা/বাইয়ে মুয়াজ্জাল) অথবা ইজারাদাতা-ইজারাগ্রহীতার।
ইসলামি ব্যাংকের কার্যাবলি (Functions of Islamic Bank):
- সুদমুক্ত আমানত গ্রহণ: ইসলামি ব্যাংক দুটি প্রধান পদ্ধতিতে আমানত সংগ্রহ করে:
- আল-ওয়াদিয়াহ (চলতি হিসাব): আমানতকারী যখন ইচ্ছা টাকা জমা দিতে ও তুলতে পারেন, ব্যাংক এতে কোনো মুনাফা দেয় না এবং মূলধনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
- মুদারাবা হিসাব (সঞ্চয়ী ও মেয়াদি): ব্যাংক গ্রাহকের মূলধনের ম্যানেজার (মুদারিব) হিসেবে কাজ করে এবং ব্যবসায় অর্জিত প্রকৃত মুনাফা পূর্বনির্ধারিত হারে বণ্টন করে।
- শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ পদ্ধতি পরিচালনা:
- মুরাবাহা: লাভ যুক্ত করে বাকিতে বা নগদে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়।
- মুশারাকা ও মুদারাবা: সরাসরি শিল্প বা ব্যবসায় অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে লাভ-লোকসান ভাগাভাগি।
- ইজারা (Leasing): যন্ত্রপাতি, যানবাহন বা বাড়ি লিজ প্রদান করে ভাড়া আদায়।
- বাইয়ে সালাম ও বাইয়ে ইসতিসনা: কৃষি ও নির্মাণ খাতে অগ্রিম অর্থায়ন।
- সম্পদভিত্তিক অর্থায়ন (Asset-backed Financing): কেবল কাগজি টাকার লেনদেন না করে বাস্তব উৎপাদনমুখী পণ্য বা সেবার সাথে অর্থায়নকে সংযুক্ত রাখা হয়।
- সামাজিক কল্যাণ ও যাকাত তহবিল পরিচালনা: ইসলামি ব্যাংক নিয়মিত যাকাত ফান্ড পরিচালনা করে, অসহায় ও দুস্থদের করযে হাসানা (বিনা সুদে ঋণ) প্রদান করে এবং সামাজিক পুনর্বাসনে কাজ করে।
- শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড দ্বারা নিরীক্ষা: প্রতিটি কার্যক্রম ইসলামি শরিয়াহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা নিশ্চিত করতে অভিজ্ঞ ফকিহদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডের অধীনে নিয়মিত অডিট পরিচালিত হয়।
৬। হালাল-হারাম বলতে কী বুঝ? মানবজীবনে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব ও হারাম উপার্জনের অপকারিতা আলোচনা কর। (৫+১০=১৫)
[What do you mean by Helal and Haram? Discuss the importance of earning in Halal way and demerits of earning in Haram way in human life.]
হালাল ও হারামের ধারণা:
হালাল (حلال): ইসলামি শরিয়াহতে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল (সা.) যেসব বস্তু ও কর্মকে মানুষের জন্য বৈধ, পবিত্র ও অনুমোদনযোগ্য ঘোষণা করেছেন, তাকে হালাল বলে।
হারাম (حرام): যেসব বস্তু, কর্ম ও উপার্জন পদ্ধতিকে কুরআন ও সুন্নাহর দ্ব্যর্থহীন বিধানে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, অপবিত্র ও শাস্তিযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে, তাকে হারাম বলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “হালালও সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট; আর এ দুয়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়।” (সহিহ বুখারি)।
মানবজীবনে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব:
- ফরজ ইবাদতের মর্যাদা: রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, “ফরজ ইবাদতসমূহের পর হালাল জীবিকা অন্বেষণ করা অন্যতম একটি ফরজ।” (বায়হাকি)।
- ইবাদত ও দোয়া কবুলের পূর্বশর্ত: হালাল খাদ্য ও পোশাক ছাড়া মহান আল্লাহর দরবারে কোনো সালাত, রোজা, হজ বা দোয়া কবুল হয় না।
- আত্মিক প্রশান্তি ও পরিবারে বরকত: হালাল পন্থায় অর্জিত সীমিত সম্পদেও আল্লাহ বরকত দান করেন এবং পারিবারিক জীবনে প্রভূত শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় থাকে।
- শোষণহীন অর্থনৈতিক সমাজ: সৎ ব্যবসা, কায়িক শ্রম ও বৈধ লেনদেনের মাধ্যমে সমাজে ইনসাফ ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার কায়েম হয়।
হারাম উপার্জনের অপকারিতা ও ভয়াবহ পরিণতি:
- পরকালে জাহান্নামের শাস্তি: হাদিস শরিফে এসেছে, “যে শরীর হারাম খাদ্যে পুষ্ট হয়েছে, জাহান্নামের আগুনই তার সর্বোত্তম প্রাপ্য।” (তিরমিযি)।
- ইবাদত ও মোনাজাত প্রত্যাখ্যাত হওয়া: হারাম উপার্জনকারীর দোয়া ও নামাজ আল্লাহর কাছে কখনোই গৃহীত হয় না।
- সম্পদের বরকত ধ্বংস হওয়া: সুদ, ঘুষ, ভেজাল, কালোবাজারি ও দুর্নীতির অর্থ দেখতে বৃদ্ধি পেলেও শেষ পর্যন্ত ধ্বংস, অশান্তি ও অপচয় বয়ে আনে।
- সামাজিক বৈষম্য ও অপরাধের বিস্তার: হারামের সয়লাবে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, জুলুম এবং ধনী-দরিদ্রের তীব্র বৈষম্য দেখা দেয়।
৭। মুদারাবা কাকে বলে? মুদারাবার শর্ত ও বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর। (৫+১০=১৫)
[What is Mudaraba? Discuss the conditions and the characteristics of Mudaraba.]
মুদারাবার সংজ্ঞা:
ইসলামি অর্থনীতি ও ব্যবহারিক ফিকহের পরিভাষায় ‘মুদারাবা’ হলো এমন একটি বিশেষ আর্থিক অংশীদারি চুক্তি, যেখানে এক পক্ষ সম্পূর্ণ মূলধন সরবরাহ করে (যাকে ‘সাহিবুল মাল’ বা মূলধনদাতা বলা হয়) এবং অপর পক্ষ তার শ্রম, মেধা ও ব্যবসায়িক দক্ষতা নিয়োগ করে পরিচালনা করে (যাকে ‘মুদারিব’ বা উদ্যোক্তা বলা হয়)।
মুদারাবার মৌলিক শর্তসমূহ:
- মূলধনের স্পষ্টতা: মূলধন সুনির্দিষ্ট ও নগদ অর্থে নির্ধারিত হতে হবে। কোনো বকেয়া বা কাল্পনিক ঋণের ওপর মুদারাবা চুক্তি গঠন করা বৈধ নয়।
- অনুপাতে লাভ বণ্টন: অর্জিত নিট মুনাফা চুক্তিকালীন সময়ে উভয়ের সম্মতিতে নির্ধারিত শতকরা হারে (যেমন: ৬০:৪০ বা ৫০:৫০) বণ্টিত হতে হবে। কোনো পক্ষকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অঙ্কের টাকা (Fixed sum) প্রদানের শর্ত দিলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে।
- লোকসানের দায়ভার: ব্যবসায় স্বাভাবিক কারণে আর্থিক ক্ষতি বা লোকসান হলে তা এককভাবে মূলধনদাতা (সাহিবুল মাল) বহন করবে। মুদারিব কোনো আর্থিক ক্ষতি দেবে না; তার শ্রম ও সময়ের অপচয়ই তার ক্ষতি। তবে মুদারিবের প্রমাণিত অবহেলা বা চুক্তিভঙ্গের কারণে ক্ষতি হলে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
- স্বাধীন ব্যবস্থাপনার সুযোগ: মুদারিব স্বাধীনভাবে বৈধ ব্যবসা পরিচালনা করবেন। তবে ‘মুদারাবা মুকাইয়্যাদাহ’ (শর্তযুক্ত মুদারাবা) হলে শরিয়াহসম্মত যৌক্তিক শর্ত মান্য করতে হবে।
মুদারাবার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- এটি মেধা ও শ্রমের সাথে অলস মূলধনের সমন্বয় সাধন করে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।
- সুদের মতো শোষণমূলক নয়, বরং ন্যায়সঙ্গত অংশীদারিত্বের সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
- আধুনিক ইসলামি ব্যাংকসমূহ সাধারণ আমানতকারীদের সাথে মুদারাবা নীতির ভিত্তিতেই তাদের ফান্ড সংগ্রহ ও বিনিয়োগ করে থাকে।
৮। কর কাকে বলে? বাংলাদেশে করের ভিত্তি ও আওতার উৎস কম হওয়ার কারণ কী? বর্ণনা কর। (৫+১০=১৫)
[What is Tax? What are the causes of Low Tax-Base and Tax-Net source in Bangladesh? Describe it.]
করের সংজ্ঞা (Definition of Tax):
কোনো প্রকার সরাসরি সুযোগ-সুবিধা বা প্রত্যুপকারের প্রত্যাশা ছাড়াই রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরকারের আইন অনুসারে যে বাধ্যতামূলক আর্থিক প্রদেয় পরিশোধ করে, তাকে কর (Tax) বলে। অধ্যাপক টসিগ (Taussig)-এর মতে, “The essence of a tax, as distinguished from other charges by government, is the absence of a direct quid pro quo between the taxpayer and the public authority.”
বাংলাদেশে করের ভিত্তি ও আওতার উৎস কম হওয়ার কারণসমূহ:
- ব্যাপক অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি (Large Informal Economy): দেশের মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সিংহভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক ও নগদ লেনদেনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা কর কর্তৃপক্ষের হিসাবের বাইরে থাকে।
- কর ফাঁকির প্রবণতা ও মিথ্যা ঘোষণা: উচ্চ আয়ের বহু ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, আইনজীবী ও ব্যক্তিবর্গ প্রকৃত আয় গোপন করে ভুয়া অডিট রিপোর্টের মাধ্যমে কর ফাঁকি দেন।
- ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশনের অভাব: কর ব্যবস্থায় শতভাগ অনলাইন মনিটরিং ও আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহারের ঘাটতি থাকায় করদাতারা জটিল পদ্ধতির ভয়ে কর দিতে চান না।
- অযৌক্তিক কর অব্যাহতি ও ট্যাক্স হলিডে: প্রভাবশালী শিল্পপতি ও বাণিজ্যিক খাতসমূহকে দীর্ঘমেয়াদে অন্যায্য কর রেয়াত ও কর অবকাশ দেওয়ার ফলে করজাল বিস্তৃত হতে পারে না।
- কর প্রশাসনের দুর্বলতা ও দুর্নীতি: কর কর্মকর্তা ও করদাতাদের মধ্যকার আঁতাত এবং কর ফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব।
- নাগরিক সচেতনতা ও সরকারি সেবায় আস্থার অভাব: সাধারণ নাগরিকেরা মনে করেন যে কর প্রদান করলেও রাষ্ট্রীয় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা সন্তোষজনকভাবে পাওয়া যায় না।
খ বিভাগ (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও) — মান: ৫ × ৪ = ২০
৯। পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার বলতে কী বুঝ? (৫)
[What do you mean by perfect competitive market?]
উত্তর: যে বাজারে অসংখ্য ক্রেতা ও বিক্রেতা সমজাতীয় (Homogeneous) পণ্য একটি একক নির্ধারিত দামে অবাধে ক্রয়-বিক্রয় করে, তাকে পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার (Perfect Competitive Market) বলে।
প্রধান বৈশিষ্ট্য: (১) অসংখ্য ক্রেতা ও অসংখ্য বিক্রেতার উপস্থিতি, (২) পণ্যটি গুণগতভাবে সম্পূর্ণ একই রকম, (৩) বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতা দাম গ্রহণকারী (Price Taker), (৪) নতুন ফার্মের প্রবেশ ও প্রস্থানে পূর্ণ স্বাধীনতা, এবং (৫) বাজার দর সম্পর্কে সবার নিখুঁত জ্ঞান থাকা।
১০। মুনাফা ও সুদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ কর। (৫)
[Make distinction between profit and interest.]
| পার্থক্যসূচক দিক | মুনাফা (Profit) | সুদ (Interest/Riba) |
|---|---|---|
| শরিয়াহ বিধান | ইসলামে মুনাফাকে ব্যবসা ও শ্রমের বৈধ ফল হিসেবে সম্পূর্ণ হালাল করা হয়েছে। | কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট অকাট্য দলিলে সুদকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। |
| ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা | ব্যবসায়ে লাভ ও লোকসান উভয়ের বাস্তবিক ঝুঁকি বিদ্যমান থাকে। | কোনো প্রকার ঝুঁকি ছাড়াই মূলধনের ওপর নির্দিষ্ট অর্থ আদায় করা হয়। |
| উৎপাদনশীলতা | বাস্তব পণ্য বা সেবার উৎপাদন ও ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি যুক্ত। | কেবলমাত্র সময়ের অতিবাহিত হওয়ার বিনিময়ে অন্যায্যভাবে দাবি করা হয়। |
১১। তাকাফুল বা ইসলামি বিমা কী? (৫)
[What is Takaful or Islamic insurance?]
উত্তর: তাকাফুল (التكافل) হলো ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক পারস্পরিক সংহতি, সমবায় এবং যৌথ সামাজিক নিরাপত্তার সুদমুক্ত বিমা ব্যবস্থা। প্রচলিত বিমায় বিদ্যমান সুদ (রিবা), জুয়া (কিমার) এবং প্রতারণামূলক অনিশ্চয়তা (গারার) বর্জন করে তাকাফুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাকাফুলে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা পারস্পরিক সাহায্যার্থে একটি অভিন্ন তহবিলে নির্দিষ্ট অর্থ দান বা অনুদান (তাবাররু) হিসেবে জমা রাখেন, যার মাধ্যমে কোনো সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঐ তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয় এবং উদ্বৃত্ত অর্থ অংশগ্রহণকারীদের মাঝে বণ্টন করা হয়।
১২। চাহিদা রেখা কেন ডানদিকে নিম্নগামী হয়? (৫)
[Why demand curve slopes downward to the right?]
উত্তর: দ্রব্যের দামের সাথে চাহিদার পরিমাণের বিপরীতমুখী সম্পর্কের কারণে চাহিদা রেখা বাম থেকে ডানদিকে নিম্নগামী হয়। এর প্রধান কারণসমূহ হলো:
১. ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি: কোনো নির্দিষ্ট দ্রব্যের ভোগ বৃদ্ধির সাথে সাথে তার প্রান্তিক উপযোগ কমতে থাকে, ফলে ক্রেতা কম দাম না হলে অতিরিক্ত একক কিনতে চায় না।
২. আয় প্রভাব: পণ্যের দাম কমলে ভোক্তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, ফলে চাহিদা বাড়ে।
৩. বিকল্পায়ন প্রভাব: একটি দ্রব্যের দাম কমলে অন্য বিকল্প দ্রব্যের চেয়ে তা সস্তা হয়, ফলে ক্রেতারা ঐ সস্তা দ্রব্যটি বেশি ক্রয় করে।
১৩। উশর ও খারাজ বলতে কী বোঝায়? (৫)
[What do you mean by Ushar and Kharaj?]
উত্তর:
উশর (العشر): মুসলিম কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ওপর ইসলামি শরিয়াহ কর্তৃক ধার্যকৃত বাধ্যতামূলক যাকাত বা ভূমিকরকে উশর বলে। প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টিতে সেচপ্রাপ্ত ভূমিতে মোট উৎপন্ন ফসলের দশ ভাগের এক ভাগ (১০%) এবং কৃত্রিম সেচে উৎপাদিত ফসলে বিশ ভাগের এক ভাগ (৫%) বায়তুলমালে জমা দিতে হয়।
খারাজ (الخراج): ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকদের অধিকৃত ও আবাদকৃত কৃষিজমির ওপর রাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত ভূমি রাজস্বকে খারাজ বলে। এটি উৎপন্ন ফসলের আনুপাতিক হারে অথবা নির্দিষ্ট নগদ অর্থ হিসেবে নির্ধারিত হতো।
১৪। ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদ বণ্টনের মূলনীতিগুলো লেখ। (৫)
[Write the principles of distribution of wealth in Islamic economics.]
উত্তর: ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদ বণ্টনের মৌলিক নীতিসমূহ নিম্নরূপ:
১. সার্বভৌম মালিকানা একমাত্র আল্লাহর: আসমান ও জমিনের সকল সম্পদের প্রকৃত ও সার্বভৌম মালিক আল্লাহ; মানুষ কেবল তাঁর প্রতিনিধি ও আমানতদার।
২. সম্পদের পুঞ্জীভূতকরণ নিষিদ্ধ: সম্পদ যেন কেবল মুষ্টিমেয় ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না থাকে (“كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنكُمْ”)।
৩. যাকাত ও সাদাকাহর মাধ্যমে সুষম পুনর্বণ্টন: বাধ্যতামূলক যাকাত, ফিতরা, উশর ও মিরাসের বিধানের মাধ্যমে সমাজ থেকে দারিদ্র্য নির্মূল করা।
৪. শোষণ ও সুদমুক্ত অর্থায়ন: শ্রমিকের ন্যায্য ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার মজুরি প্রদান এবং একচেটিয়া কারবার বন্ধ করা।
১৫। যাকাতের নিসাব আলোচনা কর। (৫)
[Discuss the Nisab of Zakat.]
উত্তর: কোনো ব্যক্তির মালিকানায় নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও ঋণমুক্ত যে ন্যূনতম পরিমাণ উদ্বৃত্ত সম্পদ থাকলে তার ওপর শরিয়াহ মোতাবেক যাকাত প্রদান ফরজ হয়, তাকে যাকাতের ‘নিসাব’ (نصاب) বলে।
নিসাবের নির্ধারিত পরিমাণ:
১. স্বর্ণ: সাড়ে সাত তোলা বা ভরি (৮৭.৪৮ গ্রাম বা ৮৫ গ্রাম)।
২. রৌপ্য ও নগদ অর্থ: সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা ভরি (৬১২.৩৬ গ্রাম বা ৫৯৫ গ্রাম) খাঁটি রৌপ্য অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য।
উক্ত পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক চান্দ্র বছর (হাওলানুল হাওল) মালিকানায় সংরক্ষিত থাকলে শতকরা আড়াই টাকা (২.৫%) হারে যাকাত আদায় করা ফরজ।
১৬। বাইয়ে মুয়াজ্জাল এর বৈশিষ্ট্যগুলো লেখ। (৫)
[Write the characteristics of Bai-e-Muazzal.]
উত্তর: বাইয়ে মুয়াজ্জাল (بيع مؤجل) হলো এমন একটি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি যেখানে বিক্রেতা তাৎক্ষণিকভাবে ক্রেতার কাছে পণ্য হস্তান্তর করে এবং ক্রেতা চুক্তিতে নির্ধারিত ভবিষ্যতে কোনো এক নির্দিষ্ট তারিখে বা কিস্তিতে পণ্যের মূল্য পরিশোধের অঙ্গীকার করে (বাকিতে বিক্রয়)।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
(১) পণ্যের মোট বিক্রয়মূল্য এবং পরিশোধের সুনির্দিষ্ট মেয়াদ চুক্তিকালীন স্পষ্ট থাকতে হবে।
(২) চুক্তির সময় পণ্যটি বিক্রেতার পূর্ণ মালিকানা ও হস্তান্তরের অধিকারে থাকতে হবে।
(৩) নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্রেতা মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে কোনো অতিরিক্ত জরিমানা বা বিলম্ব ফি দাবি করা যাবে না, কারণ তা সুদে রূপান্তরিত হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ১ম বর্ষ অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি পরীক্ষায় পূর্ণমান কত?
অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি পরীক্ষায় পূর্ণমান ৮০ নম্বর এবং সময় ৪ ঘণ্টা। প্রশ্নপত্রটিতে ক-বিভাগ থেকে ৪টি এবং খ-বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
ইসলামি ব্যাংকের সাথে সাধারণ প্রচলিত ব্যাংকের প্রধান অমিল কী?
সাধারণ ব্যাংক সুদের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট লাভ ও ঋণ প্রদান করে, পক্ষান্তরে ইসলামি ব্যাংক সম্পূর্ণ সুদমুক্ত পদ্ধতিতে লাভ-লোকসান ভাগাভাগি এবং উৎপাদনমুখী পণ্য কেনাবেচার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
মুদারাবা চুক্তিতে লোকসান হলে কে আর্থিক ক্ষতি বহন করে?
মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসায়ে লোকসান হলে আর্থিক ক্ষতি এককভাবে মূলধনদাতা (সাহিবুল মাল) বহন করে এবং উদ্যোক্তার শ্রম নিষ্ফল হয়। তবে উদ্যোক্তার অবহেলা প্রমাণিত হলে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।
উশর ও খারাজের মৌলিক পার্থক্য কী?
উশর হলো মুসলিম কৃষকদের জমির ফসলের ওপর ধার্যকৃত যাকাত, আর খারাজ হলো ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমদের মালিকানাধীন কৃষিজমির ওপর আরোপিত ভূমিকর।
তাকাফুলকে কেন প্রচলিত বিমার বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়?
তাকাফুল ব্যবস্থায় প্রচলিত বিমার মতো সুদ, জুয়া ও অস্পষ্টতা থাকে না; এটি সমবায়ভিত্তিক দান ও পারস্পরিক সংহতির শরিয়াহসম্মত কাঠামোতে কাজ করে।
বাংলাদেশে করের আওতা কম হওয়ার প্রধান কারণ কী?
অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ব্যাপকতা, ট্যাক্স ফাইলিংয়ে ডিজিটাল পদ্ধতির ধীরগতি, উচ্চবিত্তদের কর ফাঁকি এবং কর সচেতনতার অভাবই প্রধান কারণ।