বাংলা (Bangla) – 201104, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২০

StudyBoi StudyBoi
September 22, 2026
আপডেট: September 26, 2026
১০২ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০০৮
ফাজিল স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২০
আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
(বাংলা)
বিষয় কোড: ২০১১০৪
সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০

[দ্রষ্টব্য: ডান পাশের সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]


ক বিভাগ

মান — ১০ × ২ = ২০


১। (ক) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যুগবিভাগ সম্পর্কে পণ্ডিতদের মতামত বিশ্লেষণ কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
যেকোনো ভাষার সাহিত্যের ইতিহাসকে সুবিন্যস্তভাবে জানা ও মূল্যায়নের সুবিধার্থে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের আলোকে কালসীমা বা যুগে বিভক্ত করা হয়। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও হাজার বছরের বিবর্তনধারাকে পণ্ডিতগণ বিভিন্ন যুগে বিভক্ত করেছেন। যদিও এই যুগবিভাগ নিয়ে গবেষক ও ভাষাতাত্ত্বিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে, তবুও সাধারণ সর্বসম্মত ধারায় বাংলা সাহিত্যকে তিনটি প্রধান যুগে ভাগ করা হয়েছে: প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগ।

১. পণ্ডিতদের মতামতের আলোকে যুগবিভাগ:

(ক) ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মত:
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর কালজয়ী গবেষণা গ্রন্থ ‘The Origin and Development of the Bengali Language’ (ODBL)-এ বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ নিম্নরূপে নির্ধারণ করেছেন:
১. প্রাচীন যুগ: ৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।
২. মধ্যযুগ: ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।
৩. আধুনিক যুগ: ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত।
অধিকাংশ আধুনিক গবেষক ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখে ড. চট্টোপাধ্যায়ের এই কালসীমাকেই অধিকতর বিজ্ঞানসম্মত ও প্রামাণ্য মনে করেন।

(খ) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মত:
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে বাংলা ভাষার জন্ম খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকে নির্ধারণ করে যুগবিভাগ করেছেন:
১. প্রাচীন যুগ: ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।
২. মধ্যযুগ: ১২০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।
৩. আধুনিক যুগ: ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল।
তিনি তিব্বতি পণ্ডিত লাsections-উপাচার্য তারানাথের বিবরণ ও বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সময়কালের ভিত্তিতে চর্যাপদের রচনাকাল খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতক বলে অভিমত দেন।

(গ) ড. সুকুমার সেনের মত:
ড. সুকুমার সেন তাঁর ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থে সামান্য ভিন্ন আঙ্গিকে যুগবিভাগ উপস্থাপন করেছেন:
১. প্রাচীন যুগ: দশম শতক থেকে দ্বাদশ শতক (৯০০/১০০০–১২০০ খ্রি.)।
২. মধ্যযুগ: দ্বাদশ শতকের শেষ থেকে অষ্টাদশ শতক (১২০০–১৮০০ খ্রি.)। এর মধ্যে তিনি চৈতন্যপূর্ব (দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ শতক) এবং চৈতন্যোত্তর (ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতক) ভাগ প্রদর্শন করেছেন।
৩. আধুনিক যুগ: ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান পর্যন্ত।

(ঘ) গোপাল হালদারের মত:
গোপাল হালদার আর্থ-সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে তুর্কি আক্রমণোত্তর কালকে সংকটকাল ধরে মধ্যযুগকে কয়েকটি উপ-পর্বে বিভক্ত করেছেন।

২. মধ্যযুগের ‘অন্ধকার যুগ’ বা ক্রান্তিকাল বিতর্ক:
১২০১ থেকে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে পণ্ডিতদের একাংশ (যেমন ড. দীনেশচন্দ্র সেন, ড. সুকুমার সেন) ‘অন্ধকার যুগ’ বা ‘বন্ধ্যা যুগ’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের ফলে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়, তাতে কোনো উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সৃষ্টি হয়নি।
তবে আধুনিক গবেষক ড. মুহম্মদ এনামুল হক, ড. ওয়াকিল আহমদ এবং অন্যান্য পণ্ডিতরা প্রমাণ করেছেন যে, এই যুগেও ‘শূন্যপুরাণ’, ‘সেক শুভোদয়া’ এবং ‘হলায়ুধ মিশ্রের সেকশুভোদয়া’ জাতীয় মিশ্র সাহিত্যের বিকাশ ঘটেছিল। ফলে এটি সম্পূর্ণ বন্ধ্যা ছিল না, বরং তা ছিল প্রাচীন ধারা থেকে মধ্যযুগীয় ধারায় উত্তরণের এক প্রস্তুতিমূলক ক্রান্তিকাল।

৩. যুগসমূহের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য:
* প্রাচীন যুগ (চর্যাপদ): বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের সাধনসঙ্গীত, সাংকেতিক সন্ধ্যাভাষা ও ব্যক্তিচেতনার উন্মেষ।
* মধ্যযুগ (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী, অনুবাদ সাহিত্য, প্রণয়োপাখ্যান): ধর্মকেন্দ্রিকতা, দেবমাহাত্ম্য প্রচার ও আখ্যানমূলক কাব্যের প্রাধান্য। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের মৃত্যু (১৭৬০ খ্রি.) মধ্যযুগের সমাপ্তি নির্দেশ করে।
* আধুনিক যুগ (১৮০১–বর্তমান): মানবকেন্দ্রিকতা, যুক্তি ও বিজ্ঞানচেতনা, গদ্য সাহিত্যের বিকাশ, ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদ ও বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি।

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ কেবল পঞ্জিকার বর্ষগণনা নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সামাজিক বিবর্তন ও ভাষাতাত্ত্বিক পরিবর্তনের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। পণ্ডিতদের সূক্ষ্ম মতভেদ সত্ত্বেও প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক—এই ত্রিস্তরীয় বিভাজনই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে সুশৃঙ্খলভাবে উপলব্ধির একমাত্র সুপ্রতিষ্ঠিত মানদণ্ড।


অথবা,

১। (খ) টীকা লিখ: বিদ্যাসুন্দর ও পদ্মাবতী (নম্বর ১০)

* বিদ্যাসুন্দর:

১. পরিচয় ও পটভূমি:
‘বিদ্যাসুন্দর’ মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের একটি বিশিষ্ট লৌকিক ও রোমান্টিক আখ্যানকাব্য। এটি মূলত মঙ্গলকাব্য ধারার অন্যতম শাখা ‘কালিকামঙ্গল’ বা ‘বিদ্যাসুন্দর কাব্য’ নামে পরিচিত। দেবী কালিকার মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশ্যে রচিত হলেও এ কাব্যের মূল আকর্ষণ রাজকন্যা বিদ্যা ও কাঞ্চীপুরের রাজপুত্র সুন্দরের গভীর ও গোপন প্রণয়কাহিনী। মধ্যযুগের বহু কবি (যেমন গোবিন্দদাস, দ্বিজ রামপ্রসাদ, বলরাম কবিরাজ প্রমুখ) এ কাব্য রচনা করলেও মধ্যযুগের শেষ মহান কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের রচিত ‘বিদ্যাসুন্দর’ (অন্নদামঙ্গল কাব্যের দ্বিতীয় খণ্ড) এ ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ ও চূড়ান্ত শৈল্পিক রূপ।

২. কাহিনী সংক্ষেপ:
বর্ধমান রাজ বীরসিংহের রূপবতী ও বিদূষী কন্যা বিদ্যা প্রতিজ্ঞা করেন যে, বিচারে যে তাঁকে পরাজিত করতে পারবে তাকেই তিনি পতিত্বে বরণ করবেন। কাঞ্চীপুরের রাজকুমার সুন্দর এই প্রতিজ্ঞার কথা শুনে বর্ধমানে আসেন এবং সুড়ঙ্গ খনন করে বিদ্যার অন্তঃপুরে গোপনে প্রবেশ করে শাস্ত্রীয় বিচারে বিদ্যাকে পরাস্ত করেন। তাঁদের মধ্যে গান্ধর্ব মতে প্রণয় ও গোপন মিলন ঘটে। পরবর্তীকালে বিষয়টি প্রকাশ পেলে সুন্দরের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়। তবে মশানে সুন্দর কর্তৃক রচিত ও গীত ‘চণ্ডী’ বা কালীর স্তবগানে দেবী তুষ্ট হন এবং দেবীর অলৌকিক কৃপায় সুন্দর রক্ষা পান ও সসম্মানে বিদ্যার সাথে তাঁর পরিণয় সম্পন্ন হয়।

৩. কাব্যিক বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব:
ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর কাব্যে দেবমাহাত্ম্যের চেয়ে নাগরিক রসবোধ, কৌতুক, তীব্র শ্লেষ এবং রূপক-অলঙ্কারের প্রাচুর্য প্রাধান্য পেয়েছে। মধ্যযুগের স্থূল ভক্তিবাদের বিপরীতে এতে মানবীয় রূপপিপাসা ও জীবনরস অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মূর্ত হয়েছে। এ কাব্যের ছন্দঝংকার ও ভাষার পরিশীলিত আভিজাত্য আধুনিক বাংলা কবিতার পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়।


* পদ্মাবতী:

১. পরিচয় ও উৎস:
‘পদ্মাবতী’ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক অনন্যসাধারণ রোমান্টিক ও রূপক মহাকাব্য। মধ্যযুগের আরাকান (রোসাং) রাজসভার শ্রেষ্ঠ কবি সৈয়দ আলাওল তাঁর পৃষ্ঠপোষক মাগন ঠাকুরের নির্দেশে ১৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে এটি রচনা করেন। কাব্যটি মূলত হিন্দি সুফি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর রচিত সুফি পদ্যাখ্যান ‘পদুমাবত’ (১৫৪০ খ্রি.) কাব্যের ভাবানুবাদ। তবে আলাওল কেবল অন্ধ অনুবাদ করেননি; তাঁর পাণ্ডিত্য, রূপক সংকেত এবং নিজস্ব কবিপ্রতিভার স্পর্শে এটি মৌলিক কাব্যের মর্যাদা লাভ করেছে।

২. মূল কাহিনী ও ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত:
সিংহলের রূপসী রাজকন্যা পদ্মাবতী এবং চিতোরের রাজা রত্নসেনের প্রেম, বিরহ ও মিলনের আখ্যান এ কাব্যের মূল উপজীব্য। শুকপাখির মাধ্যমে পদ্মাবতীর রূপের বর্ণনা শুনে রত্নসেন সন্ন্যাসী বেশে সিংহলে যান এবং নানা দুর্যোগ অতিক্রম করে পদ্মাবতীকে বিবাহ করে চিতোরে আনেন। পরবর্তীতে দিল্লির সুলতান আলাউদ্দীন খলজী পদ্মাবতীর রূপের মোহে চিতোর আক্রমণ করেন। রত্নসেন বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন এবং প্রতিবেশী রাজা দেবপালের সাথে মল্লযুদ্ধে প্রাণ হারান। স্বামীর চিতায় পদ্মাবতী ও রত্নসেনের প্রথমা স্ত্রী নাগমতী সহমরণে আত্মাহুতি দেন। সুলতান আলাউদ্দীন চিতোর অধিকার করেও কেবল ভস্মাবশেষ দেখতে পান।

৩. সুফি রূপক ও মানবিক আবেদন:
আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যে কাহিনীর অন্তরালে একটি গভীর সুফি রূপক ভাবনা নিহিত রয়েছে—রত্নসেন হলেন সাধক বা মানবাত্মা, পদ্মাবতী হলেন পরমাত্মা বা ঐশী প্রজ্ঞা, শুকপাখি হলো মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শক, আর আলাউদ্দীন হলেন পার্থিব মায়া ও মোহ। মধ্যযুগীয় পৌরাণিক অলৌকিকতার বিপরীতে আলাওল রক্তমাংসের মানুষের সুখ-দুঃখ, সৌন্দর্যবোধ ও বাস্তব জীবনালেখ্য ফুটিয়ে তুলে বাংলা সাহিত্যে মানবতাবাদের এক অভিনব দ্বার উন্মোচন করেন।


২। (ক) বাংলা গদ্য বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা মূল্যায়ন কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে বাংলা গদ্যের যে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, তার প্রধান কেন্দ্র ছিল কলকাতার ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত ইউরোপীয় কর্মচারীদের প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে দেশীয় ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্যে চালু হলেও তা বাংলা গদ্যের ক্রমবিকাশ ও আধুনিকীকরণে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে।

১. ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠা ও পটভূমি:
১৮০০ সালের ৪ মে তৎকালীন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম চত্বরে এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন (যদিও টিপু সুলতানের পতনের স্মারক হিসেবে সনদপত্রে ১৮০০ সালের ৪ মে তারিখ উল্লেখ করে ১৮০১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠদান শুরু হয়)। ভারতে আগত তরুণ ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের বাংলাসহ প্রাচ্যের বিভিন্ন ভাষা, আইন, ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে দক্ষ করে তোলাই ছিল এর লক্ষ্য।

২. উইলিয়াম কেরি ও বাংলা বিভাগ:
১৮০১ সালে ব্যাপটিস্ট মিশনের প্রখ্যাত ধর্মপ্রচারক ও বহুভাষাবিদ রেভারেন্ড উইলিয়াম কেরি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের প্রধান বা অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। কেরি বুঝতে পেরেছিলেন যে, পাঠ্যপুস্তকের অভাবে সিভিলিয়ানদের বাংলা শেখানো অসম্ভব। তাই তিনি দেশীয় পণ্ডিত ও মুন্সী নিয়োগ করে দ্রুত পাঠ্যপুস্তক রচনার উদ্যোগ নেন। কেরি স্বয়ং দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন:
* ‘কথোপকথন’ (১৮০১): এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন মুখের ভাষা সংলাপ আকারে সংকলিত হয়, যা ছিল বাংলা ভাষার প্রথম কথ্যরীতির নিদর্শন।
* ‘ইতিহাসমালা’ (১৮১২): ১৫০টি লোককাহিনী ও ঐতিহাসিক গল্পের সংকলন, যা বাংলা গদ্যে সাবলীল বর্ণনার পথ তৈরি করে।

৩. পণ্ডিত ও মুন্সীগণের অবদান:
উইলিয়াম কেরির অধীনে একদল প্রতিভাবান বাঙালি লেখক বাংলা গদ্য রচনায় আত্মনিয়োগ করেন:

(ক) রামরাম বসু:
তিনি রচনা করেন ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ (১৮০১), যা কোনো বাঙালির রচিত এবং মুদ্রিত প্রথম মৌলিক বাংলা গদ্যগ্রন্থ। পরবর্তীকালে তিনি ‘লিপিমালা’ (১৮০২) নামক পত্রসাহিত্য রচনা করেন। তাঁর গদ্যে ফারসি ও আরবি শব্দের স্বাভাবিক মিশ্রণ ছিল।

(খ) মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার:
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকদের মধ্যে সর্বাধিক শক্তিমান ও পণ্ডিত লেখক ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। তিনি সংস্কৃতবহুল ও সাধুরীতির গদ্যের অন্যতম রূপকার। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে—‘বত্রিশ সিংহাসন’ (১৮০২), ‘হিতোপদেশ’ (১৮০৮), ‘রাজাবলি’ (১৮০৮) এবং ‘প্রবোধচন্দ্রিকা’ (১৮১৩)। ‘প্রবোধচন্দ্রিকা’ গ্রন্থে তিনি পণ্ডিতি ভাষা, লৌকিক ভাষা এবং চলতি মুখের ভাষা—এই তিন রীতির চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন।

(গ) অন্যান্য লেখকবৃন্দ:
* গোলকনাথ শর্মা: ‘হিতোপদেশ’ (১৮০১)
* তারিণীচরণ মিত্র: ‘ওরিয়েন্টাল ফ্যাবুলিস্ট’ (১৮০৩)
* চণ্ডীচরণ মুন্সী: ‘তোতা ইতিহাস’ (১৮০৫)
* রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়: ‘মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রম’ (১৮০৫)
* হরপ্রসাদ রায়: ‘পুরুষ পরীক্ষা’ (১৮১৫)

৪. বাংলা গদ্যে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
* পাঠ্যবই ও গদ্যের অনুশীলন: ১৮০১ থেকে ১৮১৫ সালের মধ্যে এই কলেজ থেকে ১৩ জন লেখকের প্রায় ৩০টি গদ্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যা বাংলা গদ্যের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে।
* মুদ্রণশিল্পের সংযোগ: শ্রীরামপুর মিশনের ছাপাখানার সহযোগিতায় মুদ্রণযোগ্য সুবিন্যস্ত গদ্যরীতির উদ্ভব ঘটে।
* যতিচিহ্নের প্রাথমিক প্রয়োগ: যদিও যতিচিহ্নের পূর্ণাঙ্গ শৃঙ্খলা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল, তবুও বাক্যের পূর্ণতার জন্য দাঁড়ির সুশৃঙ্খল প্রয়োগ ফোর্ট উইলিয়ামের পণ্ডিতদের মাধ্যমেই গতি পায়।

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকদের রচিত গদ্যে কিছুটা আড়ষ্টতা, অসঙ্গতি ও ব্যাকরণগত জটিলতা থাকলেও বাংলা গদ্যের যে শৈশবকালীন রূপ তারা নির্মাণ করেছিলেন, তারই ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক ও শিল্পসম্মত রূপ দান করেন। তাই বাংলা গদ্যের সূতিকাগার হিসেবে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা চিরস্মরণীয়।


অথবা,

২। (খ) মহাকবি হিসেবে মাইকেল মধুসূদন দত্তের সার্থকতা নিরূপণ কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
ঊনবিংশ শতাব্দীর রেনেসাঁসের প্রধান পুরুষ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী প্রতিভা মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪–১৮৭৩)। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মহাকাব্যিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি বাংলা ভাষায় প্রথম ও সার্থক মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ (১৮৬১) রচনা করেন। প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্যের কাহিনি কাঠামোকে গ্রহণ করে পাশ্চাত্য রেনেসাঁসের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও মানবতাবোধে উজ্জীবিত করে মহাকবি হিসেবে তিনি বাংলা সাহিত্যে নিজেকে এক অনন্য ও অপরাজেয় উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করেছেন।

১. মহাকাব্যের আঙ্গিক ও মধুসূদনের শিল্পসিদ্ধি:
পাশ্চাত্য মহাকাব্যের নিয়ম অনুযায়ী মহাকাব্যে একটি মহৎ বিষয়, সর্বজনীন সংঘাত, ধ্রুপদী গাম্ভীর্য, দেবতাদের সংশ্লিষ্টতা এবং বীরত্বপূর্ণ পটভূমি থাকা আবশ্যক। মধুসূদন হোমার, ভার্জিল, দান্তে, ট্যাসো ও মিল্টনের মহাকাব্যিক ঐতিহ্য গভীরভাবে আত্মস্থ করেছিলেন। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ নয়টি সর্গে বিভক্ত। কাব্যের প্রারম্ভে সরস্বতীর আবাহন, যুদ্ধের মহাজাগতিক পরিমণ্ডল এবং মহাকাব্যোপযোগী বিস্তৃত বর্ণনাশৈলী মহাকাব্যের সকল শাস্ত্রীয় শর্ত পূরণ করেছে।

২. চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গির বিপ্লবী রূপান্তর:
মহাকবি হিসেবে মধুসূদনের সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব হলো সনাতন রামায়ণের মূল্যায়নকে সম্পূর্ণ উল্টে দেওয়া। বাল্মীকি রামায়ণে রাম-লক্ষণ হলেন অবতার ও পূজনীয়, আর রাবণ ও মেঘনাদ হলেন অধার্মিক ও রাক্ষস। কিন্তু মধুসূদন আধুনিক যুক্তিবাদী দৃষ্টিতে রাবণ ও মেঘনাদকে দেশপ্রেমিক, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ট্র্যাজিক নায়ক হিসেবে তুলে ধরেছেন:
* রাবণ: একজন স্নেহশীল পিতা এবং সাম্রাজ্যের স্বাধীনতা রক্ষায় আপসহীন বীর যোদ্ধা। ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে একে একে পুত্র ও সেনাপতি হারিয়েও তিনি অটল মহিমায় দণ্ডায়মান।
* মেঘনাদ: দেশমাতৃকার প্রতিরক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ অপরাজেয় বীর। নিরস্ত্র অবস্থায় নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণের কাপুরুষোচিত আক্রমণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
* মধুসূদন স্বয়ং এক চিঠিতে লিখেছিলেন: “I despise Ram and his rabble, but the idea of Raban elevates and kindles my imagination.”

৩. অমিত্রাক্ষর ছন্দের ঐশ্বর্য:
মধ্যযুগীয় পয়ার ছন্দের অন্ত্যমিলের নিগড় ভেঙে মধুসূদন উদ্ভাবন করেন ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’ (Blank Verse)। এই ছন্দে ভাব অনুসারে বাক্য এক চরণ থেকে অন্য চরণে অনায়াসে প্রবাহিত হতে পারে। মহাকাব্যের যুদ্ধবর্ণনা, বজ্রকঠোর সংলাপ এবং গম্ভীর ভাবাবেগ প্রকাশের জন্য এই ছন্দ ছিল সম্পূর্ণ অপরিহার্য।

৪. উপমা ও চিত্রকল্পের বিস্তার:
হোমারীয় উপমা (Homeric Simile)-এর মতো মহাকাব্যিক উপমা সৃষ্টিতে মধুসূদন অনন্য সিদ্ধহস্ত ছিলেন। যেমন মেঘনাদের পতনের উপমা দিতে গিয়ে তিনি বিশাল মহীরুহের ধূলিসাৎ হওয়ার চিত্রকল্প অঙ্কন করেছেন। সিন্ধু, পর্বত, কালবৈশাখী ও বজ্রের উপমায় পুরো কাব্য এক অপ্রতিরোধ্য গাম্ভীর্য লাভ করেছে।

৫. করুণ রস ও ট্র্যাজেডির মহিমা:
ভারতীয় আলংকারিকদের মহাকাব্য মিলনান্তক হলেও মধুসূদনের মহাকাব্য পাশ্চাত্য ট্র্যাজেডির মতো চরম বেদনাময় ও বিষাদান্তক। মেঘনাদের মৃত্যু, প্রমীলার চিতায় আত্মাহুতি এবং পুত্রহারা রাবণের সমুদ্রতীরে নীরব অশ্রুপাতের মধ্য দিয়ে কাব্যটি এক অপার মহাজাগতিক শূন্যতা ও ট্র্যাজেডির সৃষ্টি করে।

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, মহাকাব্যের বিশাল বিস্তার, চরিত্র সৃষ্টির অভিনবত্ব, অমিত্রাক্ষর ছন্দের বীরোচিত গাম্ভীর্য এবং মানবতাবাদী দর্শনের কারণে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের একক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ‘মহাকবি’। বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্যের যে চরম শিখর তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তা আজ পর্যন্ত অতিক্রম করা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি।


খ বিভাগ

মান — ১০ × ২ = ২০


৩। (ক) ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর যুক্তিতর্কের মূল্যায়ন কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
প্রখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক ও মনীষী ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ একটি অত্যন্ত তথ্যনিষ্ঠ, যুক্তিনির্ভর ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন প্রবন্ধ। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর যখন নবগঠিত পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদী শাসকগোষ্ঠী ও উর্দুপন্থী বুদ্ধিজীবীরা উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল, তখন ডঃ শহীদুল্লাহ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ভাষাতাত্ত্বিক সত্য ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অনবদ্য বক্তব্য পেশ করেন।

১. জনসংখ্যার ঐতিহাসিক ও গণতান্ত্রিক যুক্তি:
প্রাবন্ধিক শুরুতেই গণতান্ত্রিক নীতি ও আদমশুমারির বাস্তব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রশ্ন তোলেন। অবিভক্ত পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ ছিল বাংলাভাষী। অপরপক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যেও উর্দুর ব্যবহারকারী ছিল অত্যন্ত নগণ্য (মাত্র শতকরা ৭ ভাগ)। সুতরাং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষাকে বাদ দিয়ে সংখ্যালঘু জনগণের ভাষা উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়া ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, গণতন্ত্রবিরোধী ও বৈষম্যমূলক।

২. জাতীয় সংহতি ও বহুভাষিক সমাধান:
ডঃ শহীদুল্লাহ কানাডা (ইংরেজি ও ফরাসি), সুইজারল্যান্ড (জার্মান, ফরাসি, ইতালীয়, রোমানশ), বেলজিয়াম প্রভৃতি বহুভাষিক রাষ্ট্রের বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, একাধিক রাষ্ট্রভাষা থাকলে দেশের সংহতি বিনষ্ট হয় না, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়। তাই তিনি পাকিস্তানের উভয় অংশের ন্যায্য দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে বাংলা ও উর্দু—উভয় ভাষাকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দেন।

৩. ধর্ম ও ভাষার পৃথকীকরণ:
উর্দুপন্থীরা দাবি করত যে, উর্দু হলো ‘ইসলামের ভাষা’ বা মুসলিম সংস্কৃতির প্রতীক। ডঃ শহীদুল্লাহ অত্যন্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ যুক্তিতে এই বিভ্রান্তিকর প্রচার খণ্ডন করেন। তিনি বলেন, ভাষার সাথে ধর্মের কোনো ভৌগোলিক সংযোগ নেই। বিশ্বের সকল মুসলমানের ধর্মীয় ভাষা এক হলেও তাদের মাতৃভাষা ভিন্ন। আরবদের ভাষা আরবি, তুর্কিদের তুর্কি, ইরানিদের ফারসি। উর্দু মুসলমানদের আবিষ্কার নয়; এটি হিন্দুস্তানের একটি আঞ্চলিক ভাষার বিবর্তিত রূপ। তিনি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন যে, মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা ইসলাম পরিপন্থী নয়, বরং বাংলাভাষী মুসলমানদের জন্য এটি আল্লাহর অন্যতম অসীম নিয়ামত।

৪. আরবি হরফে বাংলা লেখার উদ্ভট প্রস্তাবের খণ্ডন:
তৎকালীন সময়ে পাকিস্তানি শাসকরা ষড়যন্ত্র করে রোমান বা আরবি হরফে বাংলা লেখার দাবি উত্থাপন করেছিল। ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত হিসেবে ডঃ শহীদুল্লাহ ধ্বনিতত্ত্বের আলোকে প্রমাণ করেন যে, বাংলা ভাষার স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির যে বিপুল বৈচিত্র্য ও স্বাতন্ত্র্য রয়েছে, তা আরবি বা রোমান হরফে সঠিকভাবে উচ্চারণ বা প্রকাশ করা অসম্ভব। হরফ পরিবর্তন করলে বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে যাবে এবং জাতি ভাষাগতভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়বে।

৫. রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার যোগ্যতা:
ডঃ শহীদুল্লাহ তুলে ধরেন যে, বাংলা ভাষা কোনো অপূর্ণাঙ্গ বা প্রাদেশিক উপভাষা নয়; এটি প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল বিজয়ের মাধ্যমে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে। আদালতের ভাষা, উচ্চশিক্ষার মাধ্যম এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে বাংলার যোগ্যতা অবিসংবাদিত।

উপসংহার:
ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধের যুক্তিতর্ক ছিল কেবল তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়, বরং এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রণোদনা ও আদর্শিক দিশা, তা এই প্রবন্ধের বলিষ্ঠ ও বাস্তবমুখী যুক্তির মধ্য দিয়েই নিশ্চিত হয়েছিল।


অথবা,

৩। (খ) হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধের নামকরণের সার্থকতা বিচার কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচিত ‘তৈল’ বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী ব্যঙ্গাত্মক ও রম্যধর্মী প্রবন্ধ। আপাতদৃষ্টিতে প্রবন্ধটির বিষয়বস্তু গৃহস্থালি ও প্রাত্যহিক জীবনের বস্তু তৈল মনে হলেও এর মূল অভিসন্ধি ছিল সমাজের তোষামোদ, তোয়াজ ও চাটুকারিতার সর্বগ্রাসী প্রভাবকে ব্যঙ্গবিদ্রূপের শাণিত তিরে বিদ্ধ করা। নামকরণের অন্তরালে যে গভীর জীবনদর্শন ও রূপক দ্যোতনা নিহিত রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলেই এর নামকরণের সার্থকতা উপলব্ধি করা যায়।

১. আক্ষরিক অর্থ বনাম রূপক ব্যঞ্জনা:
প্রাবন্ধিক শুরুতেই তৈলের ভৌত ও বৈষয়িক গুণাবলি বর্ণনা করেছেন: তৈল স্নিগ্ধকর, শীতলকারী, রুক্ষতা দূরকারী এবং ঘর্ষণ প্রশমনকারী। কিন্তু অতি দ্রুতই লেখক বস্তুগত তৈল থেকে সামাজিক ‘তৈলপ্রদান’ অর্থাৎ ‘তেলমর্দন’ বা চাটুকারিতার মানসিকতায় প্রবেশ করেন। তিনি বলেন:
“তৈল যে কি পদার্থ, তাহা সংস্কৃত কবিরা উত্তমরূপ বুঝিতেন। তাঁহারা তৈল ও স্নেহ একই ধাতুরূপ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন।”
সংস্কৃতে ‘স্নেহ’ শব্দের দুটি অর্থ—একটি ভালোবাসা বা মমতা, অপরটি তেল। লেখক দেখিয়েছেন আধুনিক যুগে স্নেহ পেতে হলে তেলের প্রয়োগ অনিবার্য।

২. চাটুকারিতার সার্বজনীনতা ও কার্যকারিতা:
প্রবন্ধে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমাণ করেছেন যে, সমাজে বিদ্যা, বুদ্ধি, মেধা ও সততা থাকলেও সাফল্য আসে না, যদি ব্যক্তি তেল দিতে অপারগ হয়। অপরদিকে মেধা ও যোগ্যতাহীন ব্যক্তি কেবল চাটুকারিতা বা তৈলপ্রদানের অসীম ক্ষমতার জোরে সমাজের উচ্চপদে আসীন হয়। প্রাবন্ধিকের সরস মন্তব্য:
“যে তৈল দিতে পারে সে সর্বশক্তিমান। সে অসাধ্য সাধন করিতে পারে।”
রাজার সন্তুষ্টি, উচ্চপদস্থ সাহেবের অনুগ্রহ, এমনকি পণ্ডিতের আশীর্বাদ লাভেও এই তৈল অব্যর্থ ওষুধের মতো কাজ করে।

৩. তৈলপ্রদানের কলাকৌশল ও সমাজবাস্তবতা:
লেখক অত্যন্ত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে দেখিয়েছেন তৈলপ্রদানের নির্দিষ্ট স্থান, কাল ও পাত্র রয়েছে। খাঁটি বাঙালি তৈল আর বিলাতি সাহেবের তৈলের মধ্যে পার্থক্য আছে। কাউকে প্রকাশ্যে স্তুতিবাক্য বলে, কাউকে আড়ালে প্রশংসা করে, আবার কাউকে মৌন আনুগত্য প্রকাশ করে তেল দিতে হয়। পরাধীন ভারতবর্ষের তোষামোদকারী সুবিধাভোগী মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানসিক গোলামি ও চরিত্রহীনতাকে উন্মোচিত করতে লেখক ‘তৈল’ শব্দটিকে সমাজব্যাধির রূপক প্রতীকে পরিণত করেছেন।

৪. নামকরণের অন্তর্নিহিত শিল্পসৌকর্য:
সাহিত্যে নামকরণের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান রীতি দেখা যায়—বিষয়বস্তুভিত্তিক, চরিত্রপ্রধান ও তাৎপর্যবাহী বা ব্যঞ্জনাধর্মী। ‘তৈল’ প্রবন্ধের নামকরণটি একই সাথে বিষয়মুখী এবং উচ্চমাত্রার রূপক ও ব্যঞ্জনাধর্মী। একটিমাত্র শব্দের ব্যবহারে লেখক মানব চরিত্রের সবচেয়ে প্রাচীন ও কুৎসিত দুর্বলতা ‘তোষামোদপ্রীতি’কে চিরন্তন ব্যঙ্গে রূপায়িত করেছেন।

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধের নামকরণটি অত্যন্ত সুপ্রযুক্ত, সংক্ষিপ্ত ও ব্যঞ্জনাময়। তৈলের পিচ্ছিলতা ও মসৃণতার সাথে চাটুকারদের নীতিহীন সুবিধাবাদের অপূর্ব সাদৃশ্য ফুটিয়ে তোলার কারণে এ নামকরণটি সর্বতোভাবে শিল্পসার্থক ও অনন্য।


৪। (ক) ‘পাদটীকা’ গল্পে সৈয়দ মুজতবা আলী যে সত্য প্রকাশ করেছেন তার স্বরূপ বিশ্লেষণ কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
প্রখ্যাত রম্যলেখক ও বিদগ্ধ মনীষী সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পাদটীকা’ বাংলা ছোটগল্পের ধারায় এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। আপাতদৃষ্টিতে গল্পটি পরিহাস ও কৌতুকমিশ্রিত আবহে উপস্থাপিত হলেও এর অন্তরালে রয়েছে ব্রিটিশ উপনিবেশশাসিত এদেশের সমাজব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থার গলদ এবং প্রকৃত জ্ঞানতাপস শিক্ষকের চরম দারিদ্র্য ও সামাজিক অবমূল্যায়নের এক মর্মস্পর্শী ও নির্মম সত্যের রূপায়ণ।

১. গল্পের পটভূমি ও ‘পাদটীকা’ রূপক:
পুস্তকের মূল পৃষ্ঠায় থাকে প্রধান পাঠ, আর অবহেলিত, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক তথ্যগুলো নিচে ‘পাদটীকা’ (Footnote) হিসেবে স্থান পায়। গল্পকার রূপক অর্থে দেখিয়েছেন যে, সমাজে প্রকৃত জ্ঞানবান, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হলেন সেই অবহেলিত ‘পাদটীকা’র মতো। সমাজ, রাষ্ট্র এবং আধুনিক আমলাতান্ত্রিক শিক্ষা কাঠামো তাঁদের কেবল প্রয়োজনীয় অথচ তুচ্ছ ভৃত্য হিসেবে ব্যবহার করে, কিন্তু কোনো মর্যাদা বা জীবিকার নিরাপত্তা দেয় না।

২. পণ্ডিত মশাইয়ের চরিত্র ও গভীর পাণ্ডিত্য:
গল্পের মূল চরিত্র স্কুলের সংস্কৃত ও বাংলার পণ্ডিত মশাই। তিনি সংস্কৃত ব্যাকরণ, সাহিত্য ও ঐতিহ্যে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। অথচ বিদ্যালয়ে তাঁর বেতন নগণ্য, পরিবারে নিত্য অনাহার এবং সামাজিক প্রতিপত্তি শূন্যের কোঠায়। বিপরীতে স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং স্কুল পরিদর্শক (Inspector of Schools) ইংরেজি জানা, পদমর্যাদাসম্পন্ন কিন্তু হৃদয়হীন ও আত্মম্ভরী আমলা।

৩. ইনস্পেক্টরের আগমন ও ঘটনার সংঘাত:
স্কুলে ব্রিটিশ অনুগত ইন্সপেক্টরের আগমন ঘটে। পরিদর্শক মহোদয় শ্রেণিকক্ষে এসে ছাত্রদের এবং পণ্ডিত মশাইকে অপমান করার জন্য একটি দুরূহ ও অদ্ভুত প্রশ্ন ছুড়ে দেন। কিন্তু পণ্ডিত মশাই তাঁর গভীর মেধা ও উপস্থিত বুদ্ধির জোরে অত্যন্ত প্রামাণ্যভাবে এবং শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতি দিয়ে সেই জটিল প্রশ্নের নিখুঁত উত্তর প্রদান করেন। ইন্সপেক্টর নিজের অজ্ঞতা ঢাকতে ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করেন।

৪. সত্যের নির্মম রূপ—যোগ্যতার পুরস্কার বনাম প্রতিশোধ:
পণ্ডিত মশাইয়ের এই অগাধ পাণ্ডিত্য ও সত্যবাদিতা তাঁর জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনেনি, বরং ডেকে আনে চরম বিপর্যয়। উদ্ধত আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার কাছে পাণ্ডিত্য পরাজিত হয়। ইন্সপেক্টর তাঁর বার্ষিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে পণ্ডিত মশাইয়ের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ এনে তাঁর সামান্য বেতন বৃদ্ধি বন্ধ করে দেন এবং চাকরিচ্যুতির হুমকি দেন। পণ্ডিত মশাই কোনো প্রতিবাদ না করে নিজের জীর্ণ ছাতাটি মাথায় দিয়ে বৃষ্টিভেজা কাদামাখা পথ ধরে রিক্তহস্তে বাড়ি ফিরে যান।

৫. প্রকাশিত সত্যের স্বরূপ:
সৈয়দ মুজতবা আলী এই গল্পের মাধ্যমে সমাজের যে নির্মম সত্য প্রকাশ করেছেন তা হলো:
* মেধা ও শিক্ষার অবমূল্যায়ন: যেখানে জ্ঞানের চেয়ে ক্ষমতার দাপট বড়, সেখানে শিক্ষকতা একটি অভিশপ্ত বৃত্তি।
* উপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের অহমিকা: সাম্রাজ্যবাদী প্রশাসন কখনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জ্ঞানী মানুষকে সহ্য করে না; তারা কেবল পদলেহী স্তাবক খোঁজে।
* হাস্যরসের আবরণে ট্র্যাজেডি: মুজতবা আলীর নিজস্ব গদ্যভঙ্গির রসিকতার নিচে লুকিয়ে থাকা অশ্ৰুর জলবিন্দু পাঠকের বিবেককে তীব্রভাবে নাড়া দেয়।

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ‘পাদটীকা’ গল্পে সৈয়দ মুজতবা আলী তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতা এবং জ্ঞানসাধকের ট্র্যাজেডিকে নিখুঁতভাবে উন্মোচন করেছেন। পণ্ডিত মশাই কেবল একটি ব্যক্তিচরিত্র নন, তিনি আমাদের গোটা সমাজের উপেক্ষিত বিবেকের এক জীবন্ত প্রতীক।


অথবা,

৪। (খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পের আলোকে মৃন্ময়ী চরিত্র বিশ্লেষণ কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও হৃদয়স্পর্শী ছোটগল্প ‘সমাপ্তি’। এই গল্পের কেন্দ্রবিন্দু মৃন্ময়ী চরিত্র। গ্রামীণ বাংলার মুক্ত ও বাঁধনহারা প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা এক চঞ্চলা কিশোরীর চিরায়ত নারীসত্তায় রূপান্তর এবং প্রেমের আত্মজাগরণের যে মনস্তাত্ত্বিক আলেখ্য রবীন্দ্রনাথ এঁকেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে এক বিরল ও কালজয়ী চরিত্রচিত্রণ।

১. পল্লীপ্রকৃতির দুরন্ত ও বন্য প্রতিমূর্তি:
গল্পের শুরুতে মৃন্ময়ীকে দেখা যায় গ্রামের এক দুরন্ত ও স্বাধীনচেতা কিশোরী হিসেবে। গ্রামবাসী তাকে ‘পাগলী’ বলে ডাকত। সামাজিক আচার-নিয়ম, মেয়েলিপনা বা কৃত্রিম সংস্কারের কোনো বালাই তার মধ্যে ছিল না। ছেলেদের সাথে গাছে চড়া, নদীর জলে সাঁতার কাটা, কাঁচা ফল পেড়ে খাওয়া আর উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে ছুটে বেড়ানোই ছিল তার আনন্দ। তার কোঁকড়ানো চুল, চঞ্চল দৃষ্টি এবং বাঁধনভাঙা হাসি পল্লীপ্রকৃতির অবাধ্য সৌন্দর্যের প্রতীক।

২. অপূর্বের দৃষ্টিতে মৃন্ময়ীর আকর্ষণ:
কলকাতায় বিএ পাস করা শিক্ষিত ও মার্জিত যুবক অপূর্ব যখন মায়ের পছন্দের সুশীলা ও শান্ত পাত্রীদের প্রত্যাখ্যান করে মৃন্ময়ীকে স্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করে, তখনই গল্পের মূল নাটকীয়তা শুরু হয়। অপূর্ব মৃন্ময়ীর মধ্যে সামাজিক দাসত্বহীন এক জীবন্ত, সতেজ প্রাণের স্পন্দন প্রত্যক্ষ করেছিল। কিন্তু স্বাধীনচেতা মৃন্ময়ী এই বিবাহকে নিজের স্বাধীনতার ওপর এক অনাকাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খল হিসেবে গণ্য করে।

৩. বৈবাহিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ:
বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির গণ্ডিবদ্ধ জীবনে প্রবেশ করে মৃন্ময়ী খাঁচায় বন্দি বুনো পাখির মতো ছটফট করতে থাকে। শাশুড়ির শাসন ও গৃহকর্মের অনুশাসন সে মেনে নিতে পারে না। বাসর রাতে সে জানালা গলে বেরিয়ে তার প্রিয় গাছের ডালে গিয়ে বসে থাকে। অপূর্বের প্রেমপূর্ণ স্পর্শকেও সে প্রত্যাখ্যান করে। এমন এক রাতে সে শ্বশুরবাড়ি থেকে পালিয়ে নদীতে একা নৌকায় চড়ে তার বাপের বাড়ি চলে যায়। এই বিদ্রোহ ছিল তার স্বাধীন আত্মসত্তার এক স্বাভাবিক আত্মরক্ষা।

৪. বিরহ ও আত্মজাগরণের রূপান্তর:
মৃন্ময়ীর চরিত্রের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পর্ব শুরু হয় অপূর্বের কলকাতা প্রত্যাবর্তনের পর। অপূর্ব যখন তাকে কোনো জোর না করে এবং তার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে নীরবে দূরে চলে যায়, তখনই মৃন্ময়ীর অন্তরে এক গভীর রূপান্তর ঘটে। সে বুঝতে পারে, অপূর্বের ভালোবাসা কোনো শাসন ছিল না, তা ছিল পরম আশ্রয়। অপূর্বের অনুপস্থিতির শূন্যতা তাকে ব্যথিত করে। তার অবুঝ বন্য কিশোরী মনের অন্তরালে সুপ্ত নারীহৃদয় ও ভালোবাসার অপূর্ব অনুভূতি জেগে ওঠে।

৫. দাম্পত্য প্রেমের পূর্ণতা ও সমাপ্তি:
মৃন্ময়ীর অহংকার ও বিদ্রোহ গভীর ভালোবাসার অনুরাগে বিগলিত হয়। সে নিজের চুল বাঁধে, শান্ত হয় এবং ব্যাকুলভাবে স্বামীর প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষা করতে থাকে। গল্পের শেষে গভীর রাতে যখন অপূর্ব ঘরে ফিরে আসে, তখন আত্মনিবেদিত মৃন্ময়ী অশ্রুসজল নয়নে অপূর্বের বুকের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে বলে—“আমি তোমায় ভালোবাসি।” এখানেই তার অশান্ত কিশোরী জীবনের সমাপ্তি ঘটে এবং এক পরিপূর্ণ প্রেমময়ী নারীর জন্ম হয়।

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃন্ময়ী চরিত্রের মধ্য দিয়ে নারীর মুক্তিচেতনা ও প্রেমের শক্তির অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন। বন্য চঞ্চলতা থেকে গভীর আত্মোপলব্ধিতে উত্তরণের এই মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ মৃন্ময়ীকে বাংলা সাহিত্যের এক চিরভাস্বর ও প্রাণবন্ত নারী চরিত্রে পরিণত করেছে।


গ বিভাগ

মান — ১০ × ২ = ২০


৫। (ক) ‘বলাকা’ কবিতা যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্থবিরতার বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহ। — উক্তিটির যথার্থতার পরিচয় দাও। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যসাধনার এক নতুন ও বৈপ্লবিক মোড় ‘বলাকা’ (১৯১৬)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সংকটময় পটভূমিতে রচিত এই কাব্যের নাম-কবিতা ‘বলাকা’য় কবি ভারতীয় ঐতিহ্যিক শান্ত অচলায়তন ও সনাতন স্থবিরতার বিপরীতে মহাজাগতিক গতিবাদের (Doctrine of Vitalism / Dynamic Flux) জয়গান গেয়েছেন। কাশ্মীরের শ্রীনগরে ঝিলম নদীর তীরে বসে রচিত এ কবিতাটি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অনন্ত চলমানতা ও স্থবিরতার বিরুদ্ধে মানবাত্মার সচেতন বিদ্রোহের এক অমর কাব্যভাষ্য।

১. পটভূমি ও দৃশ্যপট:
সন্ধ্যার ধূসর আলোয় কাশ্মীরের ঝিলম নদী বাঁকা তলোয়ারের মতো স্থির হয়ে পড়ে আছে। পর্বতশ্রেণী যেন ধ্যানে নিমগ্ন এক স্তব্ধ মহিমা। সমগ্র দৃশ্যপটের মধ্যে বিরাজ করছিল এক গভীর নৈঃশব্দ্য ও নিশ্চলতা। কিন্তু হঠাৎ সেই স্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে উড়ে গেল একঝাঁক বুনো হাঁস। তাদের ডানার দ্রুত পক্ষধ্বনি যেন স্থির প্রকৃতির বক্ষে তীব্র গতির কাঁপন ধরিয়ে দিল।

২. স্থবিরতার প্রাচীর ভাঙার শব্দ:
বুনো হাঁসের ডানার শব্দ কবির অন্তরে এক অলৌকিক রূপান্তর ঘটায়। কবির মনে হলো, এই উড্ডয়ন কেবল পাখিদের স্থানান্তর নয়; এটি যেন নিখিল সৃষ্টির অন্তর্নিহিত গতির প্রতীক। স্তব্ধ পর্বত, নিশ্চল অরণ্য এবং স্থির নদীও যেন অন্তরে অন্তরে মহাশূন্যের পানে ধাবিত হতে চাইছে। কবি বলেন:
“পর্বত চাহিল হিতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘের মতন;
তরুশ্রেণী চাহে পাখা মেলি
মাটির বন্ধন ফেলি…”

মাটির বন্ধনে আবদ্ধ উদ্ভিদ ও জড় পর্বতও যেন বন্ধনমুক্ত হয়ে অসীমের পানে উড়ে যাওয়ার ব্যাকুলতায় স্পন্দিত।

৩. গতিবাদ ও রূপান্তরের দর্শন:
রবীন্দ্রনাথ ফরাসি দার্শনিক অঁরি বের্গসোর (Henri Bergson) ‘এলান ভিটাল’ (Elan Vital) বা প্রাণপ্রবাহ দর্শনের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। ‘বলাকা’ কবিতায় কবি উপলব্ধি করেন যে, সৃষ্টি কখনোই এক জায়গায় থেমে থাকার জন্য নয়। স্থবিরতাই মৃত্যু, আর নিরন্তর রূপান্তর ও গতিশীলতাই হলো পরম জীবন। কোনো অর্জনই চূড়ান্ত নয়; এক রূপ থেকে নব রূপান্তরে চলাই সৃষ্টির আদিম নিয়ম:
“হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।”

৪. স্থবির সমাজ ও চিন্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ:
রবীন্দ্রনাথের এই বিদ্রোহ কেবল দার্শনিক নয়, তা তৎকালীন ভারতীয় সমাজের কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অচলায়তন ও নিশ্চল মানসিকতার বিরুদ্ধেও এক তীব্র আঘাত। কবি মানুষকে আহ্বান জানান জড়তা ও অতীতে পড়ে থাকার মোহ ত্যাগ করে অজানার পথে অভিযান চালাতে। মানবাত্মার পাখা আছে; সেই পাখা দিয়ে সে স্থান ও কালের সমস্ত সীমাকে অতিক্রম করে অনন্ত নূতনের সন্ধানে উড়ে চলবে।

উপসংহার:
সুতরাং আলোচ্য উক্তিটি সর্বতোভাবে সত্য ও যথার্থ। ‘বলাকা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ গতি ও প্রাণের যে শঙ্খধ্বনি বাজিয়েছেন, তা স্থবিরতা, অন্ধ সংস্কার ও নিস্তরঙ্গ জীবনের বিরুদ্ধে এক চিরন্তন ও সচেতন বিদ্রোহের বিজয়গাথা।


অথবা,

৫। (খ) ‘উমর ফারুক’ কবিতার মূল বক্তব্য আলোচনা কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
বিদ্রোহী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘উমর ফারুক’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও উদ্দীপনামূলক ঐতিহাসিক চরিত্রভিত্তিক কবিতা (তাঁর ‘জিঞ্জীর’ কাব্যের অন্তর্গত)। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব, নিখাদ ধর্মপরায়ণতা, অনুপম সাম্যবাদ, কঠোর অথচ ন্যায়নিষ্ঠ শাসন এবং নিঃস্বার্থ মানবপ্রেম এ কবিতার মূল উপজীব্য। কবি মুসলিম জাতির গৌরবময় অতীত ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে খলিফা উমরের আদর্শকে এ কবিতায় মূর্ত করেছেন।

১. কঠোর ও কোমলের অপূর্ব সমন্বয়:
কবি নজরুল উমর (রা.)-এর দ্বৈত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের চমৎকার চিত্রণ করেছেন। ইসলামের চরম শত্রুরূপে যিনি উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করতে গিয়েছিলেন, তিনিই পবিত্র কুরআনের মধুর বাণী শুনে ইসলামের বিশ্বস্ততম খাদেম ও সৈনিকে পরিণত হন। তিনি সত্যের প্রশ্নে ছিলেন বজ্রের মতো কঠোর, অথচ দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের জন্য তাঁর হৃদয় ছিল কুসুমের মতো কোমল:
“এক হাতে তব কৃপাণ রক্ত-মাখা,
অন্য হাতেতে কুরআন রয়েছে ঢাকা।”

২. সাম্যবাদ ও গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক:
অর্ধ-পৃথিবীর অধিপতি হয়েও খলিফা উমর যে গণতান্ত্রিক সাম্যবাদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, নজরুল অত্যন্ত আবেগময় ভাষায় তা তুলে ধরেছেন। জেরুজালেম অভিযানের সময় উটের পিঠে চড়ার পালাবদল ছিল মানব ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ঘটনা। খলিফা নিজে উটের রশি ধরে হেঁটে চলেছেন এবং তাঁর সাধারণ ভৃত্য উটের পিঠে বসে আছেন—এমন সাম্যবাদের দৃশ্য পৃথিবীর কোনো সাম্রাজ্যে কখনো দেখা যায়নি:
“ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি,
মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী!”

৩. প্রজাবাৎসল্য ও দায়িত্ববোধ:
শাসনকর্তা হিসেবে খলিফা উমরের প্রজাবাৎসল্য ছিল অতুলনীয়। রাতের আঁধারে তিনি ছদ্মবেশে প্রজাদের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের সুখ-দুঃখের সন্ধান নিতেন। ক্ষুধার্ত এতিম শিশুদের কান্নার শব্দ শুনে তিনি বায়তুল মাল থেকে নিজ কাঁধে আটার বস্তা বহন করে এনে তাদের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন। তিনি বলতেন—ইউফ্রেটিস নদীর তীরে যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায়, তবে বিচার দিবসে শাসক হিসেবে উমরকেই তার জবাবদিহি করতে হবে।

৪. স্বজনপ্রীতিহীন ন্যায়বিচার:
উমর (রা.)-এর ন্যায়বিচারে আপন ও পরের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। মদপানের অপরাধে স্বয়ং নিজ পুত্র আবু শাহমাকে তিনি শরিয়তের নির্ধারিত বেত্রাঘাত করতে সামান্যতম দ্বিধাবোধ করেননি। আইনের চোখে ধনী-দরিদ্র, খলিফা ও সাধারণ নাগরিক সকলেই ছিলেন সমান মর্যাদার অধিকারী।

৫. অধঃপতিত মুসলিম সমাজের প্রতি কবির আহ্বান:
কবিতার শেষাংশে নজরুল তৎকালীন পরাধীন ও নৈতিকভাবে অধঃপতিত মুসলিম সমাজের দুর্দশায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, ভোগবিলাসী ও স্বার্থান্বেষী নেতৃত্বের কারণেই মুসলমানরা আজ তাদের ঐতিহ্য হারিয়েছে। তাই কবি আর্তনাদ করে পুনরায় উমরের মতো এক সিংহহৃদয় ও ত্যাগী নেতার আবির্ভাব কামনা করেছেন, যিনি আবার মুসলিম জাতিকে সত্য, সাম্য ও ন্যায়ের পথে ফিরিয়ে আনবেন।

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ‘উমর ফারুক’ কেবল একজন ঐতিহাসিক মহামানবের বন্দনাগীতি নয়; এটি শ্রেণিহীন সমাজ, সুবিচার এবং গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক চিরন্তন দলিল। নজরুলের অগ্নিঝরা ভাষা ও গভীর শ্রদ্ধাবোধ কবিতাটিকে বাংলা সাহিত্যে এক অবিস্মরণীয় মহিমা দান করেছে।


৬। (ক) ‘বনলতা সেন’ কবিতার ভাব ও কাব্য সৌন্দর্য বিচার কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
আধুনিক বাংলা কবিতার বরপুত্র জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯–১৯৫৪) সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক জনপ্রিয় রোমান্টিক কবিতা ‘বনলতা সেন’ (১৯৪২)। মহাকালের পটভূমিতে বিপন্ন মানবাত্মার নিঃসঙ্গতা, ঐতিহাসিক পরিভ্রমণের ক্লান্তি এবং পরিশেষে চিরন্তন নারীর আশ্রয়ে ক্ষণিকের শান্তির যে অপূর্ব ইন্দ্রজাল কবি বুনেছেন, তা এ কবিতাকে বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য গীতিকবিতার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে।

১. মহাকালিক পরিভ্রমণ ও নিঃসঙ্গতার ভাব:
কবিতার প্রারম্ভেই কবি মহাকালের দীর্ঘ পরিভ্রমণকে সামনে এনেছেন:
“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;”

এখানে ‘আমি’ কেবল কবি জীবনানন্দ নন; এ হলো আবহমান কাল ধরে পথচলা ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত মানবাত্মা। বিম্বিসার, অশোক ও বিদর্ভ নগরের মতো প্রাচীন সভ্যতার উত্থান-পতন প্রত্যক্ষ করে ক্লান্ত মানবসত্তা যখন চারপাশের জীবনে কেবল হতাশা ও ফেনার মতো অশান্তি প্রত্যক্ষ করেছে, তখনই সে খুঁজেছে শান্তির আশ্রয়।

২. বনলতা সেন: শান্তির অবিনাশী প্রতীক:
চারদিকের ক্লান্তি ও অন্ধকারের মধ্যে জীবনানন্দ খুঁজে পান নাটোরের বনলতা সেনকে। বনলতা সেন কেবল রক্তমাংসের কোনো সাধারণ নারী নন; তিনি হলেন ক্লান্ত আত্মার পরম আশ্রয়, সান্ত্বনা ও চিরন্তন সৌন্দর্যের প্রতীক:
“আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।”
সমুদ্রের ঝড়ে দিশেহারা নাবিক যেমন দূর দারুচিনি দ্বীপের সবুজ পাতার ঘ্রাণ পেয়ে আশ্বস্ত হয়, তেমনি জীবনের ঝড়ে ক্লান্ত কবিও বনলতার সান্নিধ্যে ফিরে পেয়েছেন বেঁচে থাকার পরম ভরসা।

৩. অনুপম রূপকল্প ও চিত্রকল্পের সৌন্দর্য:
জীবনানন্দ দাশ চিত্রকল্প নির্মাণে ছিলেন অতুলনীয় যাদুকর। বনলতা সেনের রূপ বর্ণনায় তিনি যে উপমা ব্যবহার করেছেন, তা বাংলা কবিতায় চিরন্তন হয়ে আছে:
“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর
হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা…”

বনলতার চোখকে কবি তুলনা করেছেন ‘পাখির নীড়ের’ সাথে—“পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।” পাখির নীড় যেমন অস্থির ও ক্লান্ত পাখির জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ও পরম শান্তির নীড়, বনলতার চোখও কবির জন্য তেমনি এক পরম আশ্বাসের জগৎ।

৪. সুরের বিষাদ ও অন্তিম স্তব্ধতা:
কবিতার শেষ স্তবকে এসে দিনশেষে সন্ধ্যার আগমন ঘটে। সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ হয়, নদীর শিশিরের শব্দে কুয়াশা নামে, ডানা মুছে ফেলে চিল। পৃথিবীর সমস্ত লেনদেন শেষ হয়ে আসে, কেবল থাকে অন্ধকার এবং সেই অন্ধকারে মুখোমুখি বসে থাকা কবি ও বনলতা সেন:
“সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।”

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ইতিহাসের গভীরতা, রোমান্টিক প্রেমের অতিলৌকিক অনুভব, বিষাদময় সুরের মূর্ছনা এবং চিত্রকল্পের নিটোল সংহতির কারণে ‘বনলতা সেন’ বাংলা রোমান্টিক কবিতার এক অনুপম ক্লাসিক সৃষ্টি।


অথবা,

৬। (খ) ‘আমার পূর্ব বাংলা’ একটি অসামান্য আধুনিক কবিতা। — উক্তিটি বিশ্লেষণ কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কবি সৈয়দ আলী আহসানের ‘আমার পূর্ব বাংলা’ একটি অনন্যসাধারণ আধুনিক স্বদেশপ্রেমমূলক কবিতা। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে যখন বাঙালির আত্মপরিচয় ও জাতীয়তাবোধের জাগরণ ঘটছিল, তখন রচিত এই কবিতাটিতে চিরায়ত রূপসী বাংলার নৈসর্গিক সৌন্দর্য, আবহমান লোকঐতিহ্য এবং মানুষের গভীর আত্মিক অনুভূতিকে আধুনিক চিত্রকল্প ও সংবেদনশীল কাব্যভাষায় মূর্ত করা হয়েছে।

১. স্বদেশপ্রেমের অভিনব ও আধুনিক প্রকাশ:
ঐতিহ্যবাহী দেশাত্মবোধক কবিতায় সাধারণত স্লোগানধর্মী দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর দেখা যায়। কিন্তু সৈয়দ আলী আহসান ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতায় কোনো চটুল রাজনৈতিক স্লোগান ব্যবহার করেননি। তিনি স্বদেশকে দেখেছেন একজন সংবেদনশীল প্রেমিকের দৃষ্টিতে। পূর্ব বাংলা তাঁর কাছে কোনো ভৌগোলিক মানচিত্র মাত্র নয়; এটি একটি জীবন্ত সত্তা, রূপবতী নারী এবং পরম আশ্রয়ের নাম।

২. প্রকৃতির সংবেদনশীল ও জীবন্ত চিত্রায়ন:
কবি পূর্ব বাংলার নিসর্গকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপমার মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলেছেন। নদীমাতৃক বাংলার জলধারা, শস্যখেতের শ্যামলতা, নরম কাদামাটি আর মেঘের আনাগোনা কবিতার পরতে পরতে দৃশ্যমান। কবি পূর্ব বাংলাকে তুলনা করেছেন ‘স্নিগ্ধ শ্যামল কোমল এক প্রতিচ্ছবির’ সাথে। তিনি বলেন:
“আমার পূর্ব বাংলা একগুচ্ছ স্নিগ্ধ রজনীগন্ধা,
রূপালী ইলিশের মতো চকচকে একটি নদী…”

এমন দৃশ্যময় ও স্পর্শযোগ্য উপমা আধুনিক কবিতারই অনন্য বৈশিষ্ট্য।

৩. ঐতিহ্য ও লোকজীবনের মেলবন্ধন:
কবিতাটিতে পূর্ব বাংলার লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান যেমন—বটগাছের শীতল ছায়া, রাখালের বাঁশির সুর, জারী-সারী-ভাটিয়ালি গানের আবহ এবং সাধারণ পল্লীবাসীর সহজ-সরল জীবনযাপন এক অপরূপ মমতায় বিধৃত হয়েছে। অতীতের ঐতিহ্য ও সমকালীন অস্তিত্বের এমন সুসমন্বিত রূপ আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান লক্ষণ।

৪. কাব্যভাষা ও আঙ্গিক সৌকর্য:
সৈয়দ আলী আহসান এ কবিতায় মুক্তক ছন্দের সাবলীল গতি ব্যবহার করেছেন। তৎসম শব্দের সাথে দেশজ শব্দের চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি একটি স্বতন্ত্র কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন। এতে রোমান্টিক ভাবাবেগের পাশাপাশি রয়েছে আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক সংবেদনশীলতা।

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কেবল একটি ভূখণ্ডের স্তুতি নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের শিকড় সন্ধান এবং স্বদেশের প্রতি এক পরম ভালোবাসার শিল্পিত ইশতেহার। এর গভীর সুর, অনুপম চিত্রকল্প এবং শিল্পসুষমার কারণে এটি আধুনিক বাংলা কবিতার এক অসামান্য ও কালোত্তীর্ণ সৃষ্টি।


ঘ বিভাগ

মান — ৫ × ৪ = ২০


৭। যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও:

(ক) ভাষা কাকে বলে? সাধু ও চলিত ভাষার পার্থক্য লিখ। (নম্বর ৫)

১. ভাষার সংজ্ঞা:
মানুষ তার মনের ভাব অন্যের কাছে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করার জন্য বাগযন্ত্রের (কণ্ঠ, জিহ্বা, তালু, ওষ্ঠ, দন্ত ইত্যাদি) সাহায্যে যে অর্থপূর্ণ ও বোধগম্য ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি উচ্চারণ করে, তাকে ভাষা বলে।
* ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে: “মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনির দ্বারা নিষ্পন্ন, কোনো বিশেষ জনসমাজে ব্যবহৃত, স্বতন্ত্রভাবে অবস্থিত, তথ বাক্যে প্রযুক্ত শব্দসমষ্টিকে ভাষা বলে।”
* ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে: “মনুষ্য জাতি যে সকল অর্থপূর্ণ ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করে, তাহার নাম ভাষা।”

২. সাধু ও চলিত ভাষার পাঁচটি মূল পার্থক্য:

বৈশিষ্ট্য সাধু ভাষা চলিত ভাষা
১. শব্দভাণ্ডার সাধু ভাষা প্রধানত তৎসম বা সংস্কৃত শব্দবহুল ও গম্ভীর। চলিত ভাষা তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দের আধিক্যযুক্ত এবং সহজ-সরল।
২. সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের রূপ পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘ। যেমন—তাহাকে, করিয়াছি, যাইবেন। সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের রূপ সংক্ষিপ্ত ও সংকুচিত। যেমন—তাকে, করেছি, যাবেন।
৩. অপরিবর্তনশীলতা সাধু ভাষা ব্যাকরণের সুনির্দিষ্ট নিয়মের অনুসারী এবং অপরিবর্তনশীল। চলিত ভাষা পরিবর্তনশীল এবং স্থান ও কালভেদে রূপ পরিবর্তন করতে পারে।
৪. নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতা সাধু ভাষা বক্তৃতা ও নাটকের সংলাপের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। চলিত ভাষা চটুল, জীবন্ত এবং নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতার জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
৫. অনুসর্গের রূপ অনুসর্গের রূপ দীর্ঘ ও প্রাচীন। যেমন—হইতে, দ্বারা, লাগিয়া। অনুসর্গের রূপ সংক্ষিপ্ত ও আধুনিক। যেমন—হতে, দিয়ে, লেগে।

(খ) ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি): (নম্বর ৫)

প্রদত্ত শব্দ ব্যাসবাক্য সমাসের নাম
অভাব ভাবের অভাব অব্যয়ীভাব সমাস
প্রতিদিন দিনে দিনে অব্যয়ীভাব সমাস
দুধভাত দুধ ও ভাত দ্বন্দ্ব সমাস (অলুক দ্বন্দ্ব)
উপজেলা জেলার সদৃশ অব্যয়ীভাব সমাস
হাতেখড়ি হাতে খড়ি দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস
গৃহান্তর অন্য গৃহ নিত্য সমাস
সপ্তাহ সপ্ত অহের সমাহার দ্বিগু সমাস

(গ) প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি): (নম্বর ৫)

প্রদত্ত শব্দ প্রকৃতি ও প্রত্যয় প্রত্যয়ের শ্রেণি
ঢাকাই ঢাকা + আই তদ্ধিত প্রত্যয়
দয়ালু দয়া + আলু তদ্ধিত প্রত্যয়
ডুবন্ত √ডুব্ + অন্ত কৃৎ প্রত্যয়
পার্থিব পৃথিবী + ষ্ণ (অ) তদ্ধিত প্রত্যয় (সংস্কৃত)
কুলীন কুল + ঈন তদ্ধিত প্রত্যয় (সংস্কৃত)
অনুচর অনু – √চর্ + অ (অচ্) কৃৎ প্রত্যয়
চৌকিদার চৌকি + দার তদ্ধিত প্রত্যয় (ফারসি)

(ঘ) উপসর্গ কাকে বলে? বাংলা শব্দ গঠনে উপসর্গের ভূমিকা কী? (নম্বর ৫)

১. উপসর্গের সংজ্ঞা:
যেসব অর্থহীন অব্যয় বা শব্দাংশ ধাতু বা প্রাতিপদিকের পূর্বে বসে নতুন অর্থবিশিষ্ট শব্দ গঠন করে কিংবা শব্দের অর্থের পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংকোচন বা পূর্ণতা সাধন করে, সেগুলোকে উপসর্গ বলে।
ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে—“উপসর্গের নিজস্ব কোনো অর্থবাচকতা (স্বাধীন অর্থ) নেই, কিন্তু অন্য শব্দের পূর্বে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ সৃষ্টির অর্থদ্যোতকতা (অর্থ সৃষ্টির ক্ষমতা) আছে।” যেমন: ‘হার’ শব্দের পূর্বে ‘আ’ যুক্ত হয়ে ‘আহার’ (খাওয়া), ‘প্র’ যুক্ত হয়ে ‘প্রহার’ (মারধর), ‘উপ’ যুক্ত হয়ে ‘উপহার’ (ভেট) ইত্যাদি নতুন অর্থ তৈরি করে।

২. বাংলা শব্দ গঠনে উপসর্গের ভূমিকা:
বাংলা শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ ও সম্প্রসারিত করতে উপসর্গের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানত পাঁচটি উপায়ে উপসর্গ নতুন শব্দ গঠন ও অর্থের বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে:

  1. নতুন অর্থবোধক শব্দ সৃষ্টি: মূল শব্দের পূর্বে বসে সম্পূর্ণ বিপরীত বা নতুন ভাব প্রকাশ করে। যেমন: √কৃ + অনট = কর্ম; তার পূর্বে ‘অপ’ যুক্ত হয়ে ‘অপকর্ম’ (খারাপ কাজ)।
  2. শব্দের অর্থের পূর্ণতা সাধন: শব্দের অর্থকে পূর্ণাঙ্গ ও সুসংহত করে। যেমন: ‘পুষ্ট’ শব্দের আগে ‘পরি’ যুক্ত হয়ে ‘পরিপুষ্ট’।
  3. শব্দের অর্থের সম্প্রসারণ: মূল ভাবের সীমানা বাড়িয়ে দেয়। যেমন: ‘তাপ’ শব্দের পূর্বে ‘প্র’ যুক্ত হয়ে ‘প্রতাপ’ (প্রভাব/শক্তি)।
  4. শব্দের অর্থের সংকোচন: শব্দের অর্থকে সীমিত বা খর্ব করে। যেমন: ‘হাজির’ শব্দের পূর্বে ‘গর’ যুক্ত হয়ে ‘গরহাজির’ (অনুপস্থিত)।
  5. শব্দের অর্থের পরিবর্তন: মূল শব্দের মূলভাব সম্পূর্ণ উল্টে বা পরিবর্তিত করে দেয়। যেমন: ‘জয়’ শব্দের পূর্বে ‘পরা’ যুক্ত হয়ে ‘পরাজয়’।

(ঙ) আধুনিক বাংলা বানানের পাঁচটি নিয়ম উদাহরণসহ লিখ। (নম্বর ৫)

বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী আধুনিক বাংলা বানানের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম নিচে উদাহরণসহ উল্লেখ করা হলো:

  1. অতৎসম শব্দে ই ও উ-কার: সকল অতৎসম (তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র) শব্দে কেবল হ্রস্ব ‘ই’ এবং ‘উ’ এবং এদের কারচিহ্ন (ি, ু) ব্যবহৃত হবে; কখনো ‘ঈ’ বা ‘ঊ’ হবে না।
    উদাহরণ: গাড়ি, বাড়ি, চাবি, শাড়ি, টুপি, কেরানি, জাপানি, কুরবানি।
  2. রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব বর্জন: শব্দের মধ্যে রেফ (র্)-এর পর কোনো ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব (দ্বৈত রূপ) হবে না।
    উদাহরণ: কর্ম (কর্ম্ম নয়), সূর্য (সূর্য্য নয়), ধর্ম (ধর্ম্ম নয়), কার্য (কার্য্য নয়), মূর্ছা।
  3. সন্ধিতে ‘ং’ ও ‘ঙ’-এর ব্যবহার: সন্ধির নিয়মে ক, খ, গ, ঘ পরে থাকলে পদের অন্তস্থিত ‘ম্’ স্থানে অনুস্বার (ং) হবে (যেমন: অহং + কার = অহংকার, সং + গীত = সংগীত)। কিন্তু সন্ধিবদ্ধ না হলে প্রত্যয়হীন তদ্ভব বা দেশি শব্দে ‘ঙ’ অক্ষুণ্ণ থাকবে (যেমন: অঙ্ক, অঙ্গ, কাঙ্ক্ষা, রঙিন)।
  4. স্ত্রীবাচক অতৎসম শব্দে ঈ-কার বর্জন: অতৎসম স্ত্রীবাচক শব্দের ক্ষেত্রে সংস্কৃত ‘ঈ-প্রত্যয়’ প্রযোজ্য হবে না, হ্রস্ব ই-কার হবে।
    উদাহরণ: পাগলি (পাগলী নয়), মাসি, পিসি, চাচি, নানি।
  5. শব্দের শেষে বিসর্গ (ঃ) বর্জন: আধুনিক বাংলা বানানে শব্দের শেষে অপ্রয়োজনীয় বিসর্গ (ঃ) বর্জন করা হয়েছে।
    উদাহরণ: কার্যত (কার্যতঃ নয়), প্রধানত (প্রধানতঃ নয়), বস্তুত (বস্তুতঃ নয়), প্রায়শ (প্রায়শঃ নয়)।

(চ) ভাব-সম্প্রসারণ লিখ: ‘সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত’। (নম্বর ৫)

মূলভাব:
প্রকৃত শিক্ষা কোনো বাহ্যিক চাপিয়ে দেওয়া বিষয় নয়; অন্তরের সাধনা ও আত্মচেষ্টার মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃত শিক্ষিত হয়ে ওঠে। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা সনদের চেয়ে স্বীয় আগ্রহ ও জ্ঞানসাধনায় অর্জিত শিক্ষাই মানবজীবনকে যথার্থভাবে আলোকিত ও বিকশিত করে।

সম্প্রসারিত ভাব:
মানুষের মনুষ্যত্ববোধের জাগরণ ও মেধার পূর্ণ বিকাশের নামই শিক্ষা। কিন্তু বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মানুষকে কেবল শিক্ষার পথপ্রদর্শন করতে পারে এবং জ্ঞানার্জনের উপযুক্ত পরিবেশ ও কৌশল শেখাতে পারে। কোনো শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক কারো মস্তিষ্কে জ্ঞান ঢুকিয়ে দিতে পারে না। বিদ্যা অর্জনের জন্য ছাত্রের নিজস্ব কৌতূহল, আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং আত্মউদ্বোধনের প্রয়োজন হয়। যে ব্যক্তি নিজের চেষ্টার দ্বারা সত্যকে উপলব্ধি করে এবং জ্ঞানভাণ্ডারকে আত্মস্থ করে, তিনিই প্রকৃত অর্থে সুশিক্ষিত।

আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যপুস্তকের মুখস্থবিদ্যা ও সনদভিত্তিক শিক্ষার যে প্রবণতা রয়েছে, তা মানুষকে কেবল চাকরি লাভের যোগ্য কেরানি বানাতে পারে, কিন্তু মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। একজন শিক্ষার্থী লাইব্রেরিতে গিয়ে স্বাধীনভাবে অধ্যয়ন করে এবং চিন্তা-ভাবনার অনুশীলন ঘটিয়ে নিজেকে জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে। তাই প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী যথার্থই বলেছেন—“শিক্ষকের সার্থকতা শিক্ষাদান করায় নয়, কিন্তু ছাত্রকে তাহা অর্জন করিতে সক্ষম করায়।”

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, স্বীয় মেধা, শ্রম ও সাধনা ছাড়া শিক্ষার আসল সুফল কখনো ভোগ করা যায় না। আত্মশিক্ষার আলোকবর্তিকা যার চিত্তকে আলোকিত করে, তিনিই সমাজের সত্যিকারের আলোকবর্তিকা। অতএব, সুশিক্ষিত হতে হলে প্রত্যেক মানুষকে অবশ্যই স্বশিক্ষিত হতে হবে।


(ছ) যৌন হয়রানি প্রতিরোধে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে পত্রিকায় প্রকাশের জন্য একটি পত্র লিখ। (নম্বর ৫)

তারিখ: ১৫ অক্টোবর, ২০২০
বরাবর,
সম্পাদক,
দৈনিক প্রথম আলো
প্রগতি সরণি, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।

বিষয়: সংযুক্ত পত্রটি আপনার বহুল প্রচারিত পত্রিকায় প্রকাশের জন্য বিনীত আবেদন।

জনাব,
আপনার বহুল প্রচারিত ও মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার জনগুরুত্বপূর্ণ কলামে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধে চাই ব্যাপক গণসচেতনতা’ শীর্ষক নিম্নোক্ত পত্রটি প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আপামর দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে আপনার সদয় মর্জি কামনা করছি।

বিনীত নিবেদক,
মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম
সচেতন নাগরিক সমাজ, ধানমন্ডি, ঢাকা।


যৌন হয়রানি প্রতিরোধে চাই ব্যাপক গণসচেতনতা

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন হয়রানি এবং ইভটিজিংয়ের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পথঘাট, গণপরিবহন, কর্মক্ষেত্র এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নারীরা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের মানসিক ও শারীরিক হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। এটি একটি সভ্য ও স্বাধীন দেশের জন্য অত্যন্ত গ্লানিকর ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা।

যৌন হয়রানি কেবল কোনো আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি গভীর সামাজিক ব্যাধি ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফল। কেবল কঠোর আইন প্রণয়ন বা পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে এ সামাজিক ব্যাধির স্থায়ী মূলোৎপাটন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমাজব্যাপী ব্যাপক গণসচেতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন:

  1. পারিবারিক ও ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষার চর্চা: প্রতিটি পরিবারে শৈশব থেকেই পুত্রসন্তানদের নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাতে হবে। ধর্মের মূল মানবিক ও চারিত্রিক শিক্ষার বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে।
  2. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর নজরদারি: উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ‘অভিযোগ সেল’ গঠন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
  3. আইনের দ্রুত প্রয়োগ: অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কেউ পার পাওয়ার সাহস না পায়।
  4. সামাজিক প্রতিরোধ: যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ পথচারী ও নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নীরব দর্শক না থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে।

আসুন, আমরা দলমত নির্বিশেষে নারী ও শিশুর জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে প্রত্যয়ী হই।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফাজিল ১ম বর্ষের বাংলা আবশ্যিক কোর্সের পূর্ণমান ও সময় কত?

ইসলামিক অ্যারাবিক ইউনিভার্সিটির অধীনে ফাজিল ১ম বর্ষের বাংলা (বিষয় কোড: ২০১১০৪) পরীক্ষার পূর্ণমান ৮০ নম্বর এবং নির্ধারিত পরীক্ষার সময় ৪ ঘণ্টা।

২. বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে?

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকভাবে প্রধান তিনটি যুগে ভাগ করা হয়েছে: প্রাচীন যুগ (৯৫০/৬৫০-১২০০ খ্রি.), মধ্যযুগ (১২০১-১৮০০ খ্রি.) এবং আধুনিক যুগ (১৮০১ খ্রি.-বর্তমান)।

৩. বাংলা গদ্যের বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মূল অবদান কী?

১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে উইলিয়াম কেরি, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ও রামরাম বসুর মতো লেখকদের মাধ্যমে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যপুস্তক রচনা ও সুসংহত গদ্যরীতির ভিত্তি স্থাপিত হয়।

৪. মহাকাব্য হিসেবে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?

মাইকেল মধুসূদন দত্তের রচিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মহাকাব্য, যা পাশ্চাত্য মহাকাব্যের রীতি, নয় সর্গের কাঠামো, অমিত্রাক্ষর ছন্দ এবং দেশপ্রেমিক ট্র্যাজিক নায়ক রাবণ ও মেঘনাদের রূপায়ণে সমৃদ্ধ।

৫. ‘সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত’—উক্তিটির মূল তাৎপর্য কী?

প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরীর মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল জ্ঞানার্জনের পথ দেখাতে পারে; কিন্তু আত্মচেষ্টা, নিজস্ব কৌতূহল ও গভীর সাধনা ছাড়া কোনো মানুষ কখনোই প্রকৃত সুশিক্ষিত হতে পারে না।

৬. আধুনিক বাংলা বানানে রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণের নিয়ম কী?

বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুসারে, শব্দের মধ্যে রেফের (র্) পর কোনো ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব (দ্বৈত রূপ) হবে না; যেমন—কর্ম, সূর্য, ধর্ম, কার্য।