বাংলাদেশ স্টাডিজ (Bangladesh Studies) – 205107, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
১১৮ মিনিট পড়ার সময়
৯ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৩৫
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বাংলাদেশ স্টাডিজ (Bangladesh Studies)
বিষয় কোড: ২০৫১০৭
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক-বিভাগ থেকে যে কোনো ৪টি এবং খ-বিভাগ থেকে যে কোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]


ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)

১। বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা কর এবং জনজীবনে এর প্রভাব আলোচনা কর।

[Describe the geo-natural features of Bangladesh and discuss its impact on the public life.]

ভূমিকা

দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চল। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে দেশটি ২০°৩৪´ উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২৬°৩৮´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°০১´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৯২°৪১´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। দেশটির মোট আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার (সামুদ্রিক জলসীমা ব্যতীত)। ভূ-প্রকৃতি, নদ-নদী এবং জলবায়ুগত অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে এ দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সমাজব্যবস্থা এবং মানুষের জীবনযাত্রায় ভূ-প্রকৃতির অপরিসীম ও প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে।

বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক শ্রেণিবিভাগ

ভূ-তাত্ত্বিক গঠন ও ভূমিরূপের উচ্চতার তারতম্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে প্রধানত তিনটি ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়:

  • ১. টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ (মোট আয়তনের প্রায় ১২%): প্রায় দুই কোটি বছর পূর্বে হিমালয় পর্বত গঠিত হওয়ার সময় টারশিয়ারি যুগের ভূ-আন্দোলনে এসব পাহাড়ের সৃষ্টি হয়েছিল। এগুলো দুটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত:
    • উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়: ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা জেলার উত্তরাংশ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার পাহাড় এবং সুনামগঞ্জের সীমান্তসংলগ্ন টিলাভূমি। এগুলোর উচ্চতা সাধারণত ৩০ থেকে ৯০ মিটারের বেশি নয়। চিকনাগুল ও খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় এ অঞ্চলের অন্তর্গত।
    • দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়: রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার পাহাড়িয়া অঞ্চল। এগুলো ভাঁজ পর্বতের অন্তর্ভুক্ত এবং বেলেপাথর, কাদা ও শেল দ্বারা গঠিত। বান্দরবানের তাজিংডং বা বিজয় (উচ্চতা প্রায় ১,২৮০ মিটার) এবং কেওক্রাডং (উচ্চতা প্রায় ১,২৩০ মিটার) এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।
  • ২. প্লাইস্টোসিন কালের সোপানসমূহ (মোট আয়তনের প্রায় ৮%): আজ থেকে প্রায় ২৫,০০০ বছর পূর্বের বরফ গলিত প্লাইস্টোসিন যুগে আন্তঃবরফ যুগে নদীর পলল সঞ্চিত হয়ে গঠিত চত্বরভূমি। এগুলো মূলত অনুর্বর লাল ও কাঁকড়যুক্ত মাটি দিয়ে গঠিত:
    • বরেন্দ্রভূমি: রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া, জয়পুরহাট, দিনাজপুর ও রংপুর জেলার প্রায় ৯,৩২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। আশপাশের সমভূমি থেকে এর উচ্চতা ৬ থেকে ১২ মিটার।
    • মধুপুর ও ভাওয়ালের গড়: ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলার প্রায় ৪,১০৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত। এখানকার মাটি লালচে এবং শালবনের জন্য বিখ্যাত।
    • লালমাই পাহাড়: কুমিল্লা শহরের ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এবং গড়ে ২১ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট সোপানভূমি।
  • ৩. সাম্প্রতিক কালের প্লাবন সমভূমি (মোট আয়তনের প্রায় ৮০%): বাংলাদেশের প্রায় সমগ্র অংশই পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও তাদের শত শত শাখা-প্রশাখার পলল সঞ্চয়ের মাধ্যমে গঠিত পলল সমভূমি। এই অঞ্চলের মাটি অত্যন্ত উর্বর, যা কৃষিকাজের জন্য পৃথিবীর অন্যতম আদর্শ অঞ্চল।

জনজীবনে ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রভাব

  • ১. কৃষিকাজ ও জীবিকা: সাম্প্রতিক কালের উর্বর পলিমাটির কারণে বাংলাদেশের ৮০% সমতল অঞ্চল ধান, পাট, গম, ডাল, সরিষা ও শাকসবজি উৎপাদনের অনুকূল। নদীবিধৌত পলিমাটি প্রতি বছর প্রাকৃতিকভাবে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে, যা কৃষিনির্ভর সমাজ বিনির্মাণ করেছে। অন্যদিকে পাহাড়ি অঞ্চলে জুম চাষ এবং চাবাগান গড়ে উঠেছে।
  • ২. জনবসতির বিস্তার: সমতল ও উর্বর পলল সমভূমিতে যোগাযোগ সুবিধা ও জীবিকার প্রাচুর্যের কারণে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যধিক (প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,১০০ জনের বেশি)। বিপরীতে উঁচু পাহাড় ও পাহাড়ি বনভূমিতে জনবসতি অত্যন্ত বিরল।
  • ৩. নদীমাতৃক যোগাযোগব্যবস্থা: শত শত নদী ও খালের উপস্থিতির কারণে স্বল্প খরচে অভ্যন্তরীণ নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। নৌকা, লঞ্চ, ট্রলার ও কার্গো জাহাজ দেশের পরিবহন খাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
  • ৪. প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি: দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান ফানেল আকৃতির বঙ্গোপসাগরের শীর্ষে হওয়ায় প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও নদীভাঙনের শিকার হতে হয়। ফলে উপকূলীয় ও চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সংগ্রামী।
  • ৫. সাংস্কৃতিক মনন ও জীবনদর্শন: নদী ও সবুজে ঘেরা ভূ-প্রকৃতি বাঙালিকে ভাবুক, সংবেদনশীল, অতিথিপরায়ণ এবং সঙ্গীতপ্রেমী করেছে। জারি, সারি, ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়া গানের সুর ও ছন্দ এ দেশের নদী ও মাটির স্পন্দন থেকেই উৎসারিত।

উপসংহার

বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি যেমন এ দেশের মানুষকে উর্বর ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অফুরন্ত প্রাচুর্য দিয়েছে, তেমনি প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে টিকে থাকার অদম্য সংগ্রামশীল মানসিকতা গড়ে তুলেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সমন্বয় করে কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও গতিশীল হবে।


২। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন-এর প্রেক্ষাপট উল্লেখ কর। এটি কীভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষে ভূমিকা রেখেছিল তা পর্যালোচনা কর।

[Mention the background of the Great Language Movement of 1952. Review how it contributed to the emergence of Bengali Nationalism?]

ভূমিকা

১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তিপ্রস্তর এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম সূতিকাগার। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র কয়েক মাসের মাথায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অগ্রাহ্য করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার একতরফা ও হঠকারী সিদ্ধান্ত বাঙালি সমাজকে প্রতিবাদী করে তোলে।

ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

  • ১. জনসংখ্যার বাস্তবতা ও ভাষা বিতর্ক: ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির সময় সমগ্র পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ। এর মধ্যে পূর্ব বাংলার জনসংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৪০ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬%। পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষাভাষীদের সংখ্যা ছিল: পাঞ্জাবি ২৮.৫৫%, সিন্ধি ৫.৮%, পশতু ৭% এবং উর্দু ভাষাভাষী ছিল মাত্র ৩.২৭%। অথচ শাসকগোষ্ঠী এই স্বল্পসংখ্যক মানুষের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পাঁয়তারা করে।
  • ২. আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বক্তব্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদ: ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের বিপরীতে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। এর প্রতিবাদে বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ড. এনামুল হক সংবাদপত্রে নিবন্ধ লিখে প্রমাণ করেন যে বাংলাই হওয়া উচিত পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা।
  • ৩. তমুদ্দুন মজলিসের ভূমিকা: ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে গঠিত হয় প্রথম ইসলামিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমুদ্দুন মজলিস’। ১৫ সেপ্টেম্বর তারা “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?” শীর্ষক একটি ঐতিহাসিক পুস্তিকা প্রকাশ করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার আনুষ্ঠানিক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন শুরু করে।
  • ৪. করাচি শিক্ষা সম্মেলনের সিদ্ধান্ত ও ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব: ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ করা হয়। এর বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে কুমিল্লার বীর সন্তান ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের সরকারি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও খাজা নাজিমুদ্দীন এই প্রস্তাবকে পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
  • ৫. ১৯৪৮ সালের ধর্মঘট ও মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘোষণা: ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। ১১ মার্চ বাংলা ভাষার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদসহ বহু ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার হন। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন—“Urdu, and only Urdu shall be the state language of Pakistan”। উপস্থিত ছাত্ররা তাৎক্ষণিকভাবে ‘নো, নো’ বলে তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
  • ৬. ১৯৫২ সালের চূড়ান্ত স্ফূলিঙ্গ: ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন পুনরায় জিন্নাহর ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করেন। এর প্রতিবাদে ৩০ জানুয়ারি ছাত্রধর্মঘট এবং ৩১ জানুয়ারি কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’। পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট ও আইনসভা ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করে।
  • ৭. ১৪৪ ধারা ভঙ্গ ও রক্তাক্ত ২১ ফেব্রুয়ারি: সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সব ধরণের মিছিল ও সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ঐতিহাসিক ছাত্রসমাবেশে ১৪৪ ধারা ভাঙার সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১০ জন করে ছাত্রের মিছিল বের হলে পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও বেধড়ক লাঠিচার্জ করে। বিকেল ৩টায় মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে পরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসরমান মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। এতে বরকত, রফিক, জব্বার, সালাম, শফিউরসহ অনেকে শহীদ হন। ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি আন্দোলন জনসমুদ্রে রূপ নেয় এবং প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষে ভাষা আন্দোলনের ভূমিকা

  • ১. দ্বিজাতিতত্ত্বের মোহভঙ্গ: ১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের উন্মাদনায় পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করে যে শুধুমাত্র ধর্মের মিল একটি ভিন্ন ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত জাতিগোষ্ঠীকে একত্রিত করে রাখতে পারে না। এর ফলে ধর্মভিত্তিক পরিচয়ের স্থানে ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক ‘বাঙালি’ পরিচয়ের নবজাগরণ ঘটে।
  • ২. অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ: ভাষা আন্দোলন ছিল হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সকল বাংলাভাষী মানুষের সম্মিলিত মুক্তির সংগ্রাম। এই আন্দোলন রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্রকেও ধর্মনিরপেক্ষ করতে ভূমিকা রাখে; যেমন ১৯৫৫ সালে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বর্জন করে ‘আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়।
  • ৩. রাজনৈতিক সচেতনতা ও যুক্তফ্রন্টের বিজয়: ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফসল ছিল ১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক নির্বাচন। ভাষা শহীদদের স্মরণে ২১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে গঠিত যুক্তফ্রন্ট মুসলিম লীগকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে মুসলিম লীগের রাজনীতির কবর রচনা করে।
  • ৪. পরবর্তী সকল মুক্তি সংগ্রামের প্রেরণা: ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই বাঙালি ধাপে ধাপে ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জন করে।

উপসংহার

ভাষা আন্দোলন কেবল মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলন ছিল না, বরং এটি ছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরাধীনতা থেকে মুক্তির প্রথম সুসংহত জাতীয় জাগরণ। এই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে বিশ্বদরবারে বাঙালি জাতিকে এক অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে।


৩। ১৯৬৬ সালের ছয়দফা কর্মসূচির ধারাসমূহের উল্লেখপূর্বক বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রেক্ষাপট সৃষ্টিতে এটি কীভাবে কাজ করেছিল তা পর্যালোচনা কর।

[Review the Six Point Program of 1966 with reference to its provisions and how it worked to create the background for the achievement of Bangladesh’s independence.]

ভূমিকা

১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি ছিল বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও মুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর এক জাতীয় সম্মেলনে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এটি বাঙালির কাছে ‘ম্যাগনাকার্টা’ (Magna Carta) বা ‘মুক্তির সনদ’ হিসেবে অবিহিত।

ঐতিহাসিক ছয় দফার দফাসমূহ

  • ১ম দফা (শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি): ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংবিধান রচনা করে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকার ফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে গঠন করতে হবে। সরকার হবে সংসদীয় পদ্ধতির এবং সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভা গঠিত হবে।
  • ২য় দফা (কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা): ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেবল দুটি বিষয় ন্যস্ত থাকবে—’প্রতিরক্ষা’ (Defense) এবং ‘পররাষ্ট্র বিষয়’ (Foreign Affairs)। অবশিষ্ট অন্যান্য সকল বিষয় প্রদেশের হাতে ন্যস্ত থাকবে।
  • ৩য় দফা (মুদ্রা ও অর্থব্যবস্থা): মুদ্রা সম্পর্কিত দুটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়:
    • (ক) পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক কিন্তু সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান থেকে মুদ্রা যাতে পশ্চিমে পাচার হতে না পারে সেজন্য সংবিধানে কার্যকর বিধান থাকতে হবে এবং পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভ থাকবে। অথবা,
    • (খ) সমগ্র দেশের জন্য একটি মাত্র মুদ্রা থাকবে, তবে সংবিধানে এমন সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচার বন্ধ হয় এবং এজন্য পূর্ব পাকিস্তানে একটি পৃথক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে।
  • ৪র্থ দফা (রাজস্ব, কর ও শুল্ক আদায়ের ক্ষমতা): ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্য বা প্রদেশগুলোর হাতে সকল প্রকার কর, শুল্ক ও খাজনা ধার্য ও আদায়ের পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রের নিজস্ব কোনো কর আদায়ের ক্ষমতা থাকবে না; কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রদেশগুলো আদায়কৃত রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট নির্ধারিত অংশ কেন্দ্রকে প্রদান করবে।
  • ৫ম দফা (বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ):
    • (ক) প্রদেশগুলোর উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ওপর স্ব স্ব প্রদেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
    • (খ) কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা প্রদেশগুলো সমানুপাতিক হারে মেটাবে।
    • (গ) প্রদেশগুলো বিদেশের সাথে সরাসরি বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন ও অর্থনৈতিক প্রতিনিধিদল প্রেরণের অধিকারী হবে।
  • ৬ষ্ঠ দফা (আঞ্চলিক সুরক্ষায় আধা-সামরিক বাহিনী গঠন): জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংহতি রক্ষার্থে আঞ্চলিক সরকারগুলোকে তাদের অধীনস্থ অঞ্চলে মিলিশিয়া বা প্যারা-মিলিটারি (আধা-সামরিক) বাহিনী গঠনের পূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা দিতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানে নৌবাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপন করতে হবে।

স্বাধীনতা অর্জনের প্রেক্ষাপট সৃষ্টিতে ছয় দফার ভূমিকা

  • ১. ঔপনিবেশিক শোষণের মুখোশ উন্মোচন: ছয় দফা কর্মসূচির মাধ্যমে পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকারের দীর্ঘ ১৯ বছরের চরম বৈষম্য ও পাচারনীতির স্বরূপ জনগণের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তান যে কেবল পশ্চিম পাকিস্তানের কাঁচামাল সরবরাহকারী বাজার ও উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল, তা ছয় দফার অর্থনৈতিক যুক্তিতে প্রমাণিত হয়।
  • ২. স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার পথে রূপান্তর: ছয় দফা দাবি উত্থাপনের পর পাকিস্তানি সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান একে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী অস্ত্র’ আখ্যায়িত করে “অস্ত্রের ভাষায় জবাব” দেওয়ার হুমকি দেন। আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফলে বাঙালিরা বুঝতে পারে যে স্বায়ত্তশাসন চেয়ে পাকিস্তানি জান্তার মন গলানো সম্ভব নয়, পূর্ণ স্বাধীনতাই একমাত্র বিকল্প।
  • ৩. আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান: ছয় দফার জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে ১ নম্বর আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ (ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা) দায়ের করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ছাত্রসমাজ ১১ দফা যুক্ত করে ঐতিহাসিক ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে আইয়ুব খানের পতন ঘটায় এবং শেখ মুজিবকে কারাগার থেকে মুক্ত করে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।
  • ৪. ১৯৭০ সালের নির্বাচনে গণরায়: বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে ‘ছয় দফার ওপর গণভোট’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি জাতীয় পরিষদ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন লাভ করে ঐতিহাসিক নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে ছয় দফাকে সাংবিধানিক বৈধতা দেয়।
  • ৫. মুক্তিযুদ্ধের অমোঘ ভিত্তি: নির্বাচনে জয়লাভ সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে গণহত্যা শুরু হলে বাঙালি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছয় দফার রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তিতেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

উপসংহার

ছয় দফা কর্মসূচি ছিল বাঙালির ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির দিশারি। এটি ছিল স্বাধিকার আন্দোলনের এমন এক বীজমন্ত্র যা পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে ১৯৭১ সালের মহান রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র উপহার দেয়।


৪। সুদবিহীন ব্যাংক কাকে বলে? একটি সুদবিহীন ইসলামি ব্যাংকের লক্ষ্য ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা কর।

[What is an interest less bank? Describe the aims and characteristics of a interest less Islamic Bank.]

ভূমিকা

আধুনিক অর্থব্যবস্থায় ব্যাংক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান। তবে প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সুদের (Riba) ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, যা পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সম্পূর্ণরূপে হারাম ও নিষিদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামি শরিয়াহর বিধিবিধান এবং লাভ-লোকসানের নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে সুদবিহীন বা ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা।

সুদবিহীন ব্যাংকের সংজ্ঞা

যে ব্যাংক ব্যবস্থা যাবতীয় আর্থিক লেনদেন, আমানত গ্রহণ, বিনিয়োগ এবং ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সুদ বা পূর্বনির্ধারিত অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ বা প্রদান সম্পূর্ণ বর্জন করে ইসলামি শরিয়াহ অনুমোদিত লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্ব এবং ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাকে সুদবিহীন ব্যাংক বা ইসলামি ব্যাংক (Islamic Bank) বলা হয়।

ইসলামি ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক সংস্থা Organization of Islamic Cooperation (OIC)-এর আওতাধীন ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের সংজ্ঞামতে: “An Islamic Bank is a financial institution whose statutes, rules and procedures expressly state its commitment to the principles of Islamic Shariah and to the banning of the receipt and payment of interest on any of its operations.” অর্থাৎ, ইসলামি ব্যাংক এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যার নিয়ম ও সংবিধানে শরিয়াহর মূলনীতি মেনে চলার এবং সকল লেনদেনে সুদের আদান-প্রদান বর্জনের স্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত থাকে।

সুদবিহীন ইসলামি ব্যাংকের মূল লক্ষ্যসমূহ

  • ১. শরিয়াহর বিধান বাস্তবায়ন: অর্থনৈতিক লেনদেনের সকল পর্যায় থেকে সুদ (রিবা), জুয়া (কিমার), এবং অনিশ্চয়তা বা প্রতারণা (গারার) দূর করে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আর্থিক বিধান বাস্তবায়ন করা।
  • ২. সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা: সমাজের সম্পদ কিছু নির্দিষ্ট পুঁজিপতির হাতে পুঞ্জীভূত হওয়া রোধ করে কুরআনের নির্দেশনা (সূরা হাশর: ৭) অনুযায়ী সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।
  • ৩. উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি: কেবল সুদের নিশ্চয়তার ভিত্তিতে ঋণ না দিয়ে বাস্তবমুখী উৎপাদনশীল খাত, শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মূলধন বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা।
  • ৪. আত্মকর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচন: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ক্ষুদ্র বিনিয়োগ ও কল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য হ্রাস করা।
  • ৫. নৈতিক ব্যাংকিং চর্চা: মদ, তামাক, জুয়া, অশ্লীলতা বা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো অনৈতিক ব্যবসায় তহবিল সরবরাহ না করে হালাল ব্যবসায় আর্থিক সহায়তা প্রদান করা।

সুদবিহীন ইসলামি ব্যাংকের প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি

  • ১. সুদের সম্পূর্ণ বর্জন: ইসলামি ব্যাংকে আমানত গ্রহণ কিংবা অর্থায়নের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পূর্বনির্ধারিত নির্দিষ্ট হারে অতিরিক্ত মুনাফা (সুদ) ধার্য করা হয় না। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন: “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)।
  • ২. লাভ ও লোকসানের অংশীদারিত্ব (PLS Model): লাভ-লোকসান ভাগাভাগির ভিত্তিতে ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ব্যবসায় লাভ হলে চুক্তি অনুযায়ী আনুপাতিক হারে বণ্টিত হয় এবং ব্যবসায় লোকসান হলে শরিয়াহর নিয়মানুযায়ী মূলধন অনুপাতে তা বহন করতে হয়।
  • ৩. পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়ে জড়িত হওয়া: প্রচলিত ব্যাংক টাকার ব্যবসা করে এবং টাকাকে পণ্য গণ্য করে সুদ নেয়। বিপরীতে ইসলামি ব্যাংক প্রকৃত পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয়, লিজ কিংবা অংশীদারিত্বের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে।
  • ৪. শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড: প্রতিটি ইসলামি ব্যাংকে বিশিষ্ট ফকিহ ও অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ‘শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি’ থাকে। এই কমিটি ব্যাংকের দৈনন্দিন সকল লেনদেন, বিনিয়োগ চুক্তি ও নীতিমালা শরিয়াহসম্মত কি না তা নিয়মিত নিরীক্ষা ও তদারকি করে।
  • ৫. শরিয়াহসম্মত বিভিন্ন বিনিয়োগ পদ্ধতি: ইসলামি ব্যাংক বিভিন্ন স্বীকৃত চুক্তির মাধ্যমে অর্থায়ন করে:
    • মুদারাবা (Mudarabah): এক পক্ষ মূলধন সরবরাহ করে (সাহেবুল মাল) এবং অন্য পক্ষ শ্রম ও মেধা দেয় (মুদারিব)। অর্জিত লাভ পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে বণ্টিত হয়।
    • মুশারাকা (Musharakah): ব্যাংক ও গ্রাহক উভয় পক্ষ যৌথভাবে মূলধন বিনিয়োগ করে ব্যবসায় পরিচালনা করে এবং লাভ-লোকসান অনুপাতে ভাগ করে নেয়।
    • মুরাবাহা (Murabahah): ক্রয়মূল্যের সাথে সম্মত মুনাফা যোগ করে বাকিতে পণ্য বিক্রয়ের চুক্তি।
    • বাই-মুয়াজ্জাল (Bai Muajjal): নির্ধারিত সময়ে কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে পণ্য বিক্রয়।
    • ইজারা (Ijarah): কোনো সম্পদ লিজ বা ভাড়ায় প্রদানের চুক্তি।
    • ক্বর্দে হাসানা (Qard Hasanah): নিঃস্বার্থ ও সুদবিহীন কল্যাণমুখী ঋণ প্রদান।
  • ৬. যাকাত ও সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল: ইসলামি ব্যাংক নিজস্ব অর্জিত সম্পদ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ২.৫% হারে যাকাত আদায় করে এবং যাকাত ফান্ড ও সাদাকাহ ফান্ডের মাধ্যমে নিঃস্ব ও অসচ্ছল মানুষের সার্বিক পুনর্বাসনে সহায়তা করে।

উপসংহার

সুদবিহীন ইসলামি ব্যাংক কেবল একটি ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি শোষণহীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তব রূপরেখা। আধুনিক বিশ্বের পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সংকটে সুদবিহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একটি সফল বিকল্প অর্থনৈতিক দর্শন হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে।


৫। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহের তাৎপর্য ও গুরুত্ব বর্ণনা কর।

[Describe significance and importance of the principle of governance.]

ভূমিকা

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন, লক্ষ্য এবং ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার দিকনির্দেশনা প্রতিফলিত হয় তার শাসনতন্ত্রে বর্ণিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহের মাধ্যমে। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে গৃহীত এবং ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ৮ থেকে ২৫ পর্যন্ত) রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ সন্নিবেশিত করা হয়েছে।

সংবিধানের চার মূলনীতি

সংবিধানের মূল ৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মৌলিক স্তম্ভ হলো:

  • ১. জাতীয়তাবাদ (অনুচ্ছেদ ৯): ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত ঐক্যের ভিত্তিতে বাঙালি জাতির যে জাতীয় সত্তা গড়ে উঠেছে, তা-ই হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।
  • ২. সমাজতন্ত্র ও শোষণমুক্তি (অনুচ্ছেদ ১০): মানুষের ওপর মানুষের শোষণ অবসানের লক্ষ্যে একটি শোষণমুক্ত, ন্যায়পরায়ণ ও সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
  • ৩. গণতন্ত্র ও মানবাধিকার (অনুচ্ছেদ ১১): প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে এবং প্রশাসনের সকল স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।
  • ৪. ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ১২): রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করবে না; ধর্মীয় নির্যাতন, বৈষম্য বা ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধ করে প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করা।

অন্যান্য সহযোগী মূলনীতিসমূহ

চারটি মৌলিক স্তম্ভ ছাড়াও সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে জনকল্যাণমূলক আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি বর্ণিত হয়েছে:

  • মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা (অনুচ্ছেদ ১৫): সকল নাগরিকের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা, কর্মের অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
  • গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব (অনুচ্ছেদ ১৬): নগর ও গ্রামের বৈষম্য নিরসন এবং আধুনিক গ্রামীণ সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ করা।
  • অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা (অনুচ্ছেদ ১৭): সব শিশুর জন্য অভিন্ন, গণমুখী, সার্বজনীন ও অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণ।
  • জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা (অনুচ্ছেদ ১৮): পুষ্টিমান বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি, মাদকদ্রব্য ও পতিতাবৃত্তি নিষিদ্ধকরণ।
  • সুযোগের সমতা (অনুচ্ছেদ ১৯): সব নাগরিকের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা এবং মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করা।
  • বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ (অনুচ্ছেদ ২২): রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হতে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা।
  • আন্তর্জাতিক শান্তি ও সংহতি (অনুচ্ছেদ ২৫): জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়’ নীতির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপন।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহের তাৎপর্য ও গুরুত্ব

  • ১. রাষ্ট্র পরিচালনার আদর্শিক রূপরেখা: অনুচ্ছেদ ৮(২) অনুযায়ী, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ আইন প্রণয়ন, সংবিধান ও অন্যান্য আইনের ব্যাখ্যা এবং রাষ্ট্র ও সরকারের নীতি নির্ধারণে মৌলিক পথপ্রদর্শক বা দিকনির্দেশক নীতি হিসেবে কাজ করে।
  • ২. কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিত্তি: এই মূলনীতিগুলো বাংলাদেশকে একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র (Welfare State) হিসেবে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি ও আশ্রয়ের অঙ্গীকার রাষ্ট্রকে পুঁজিবাদী শোষণের বিপরীতে মানবিক সমাজ গঠনে বাধ্য করে।
  • ৩. আদালত কর্তৃক সরাসরি বলবৎযোগ্য না হলেও নৈতিক ভিত্তি: সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮(২)-এ উল্লেখ রয়েছে যে, এই নীতিসমূহ কোনো আদালত কর্তৃক সরাসরি বলবৎযোগ্য হবে না (Non-justiciable)। অর্থাৎ রাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্য বা কাজ দিতে ব্যর্থ হলে নাগরিক আদালতে মামলা করতে পারবেন না; কিন্তু এগুলো আইনসভার জন্য বাধ্যতামূলক নৈতিক আদর্শ যা সরকারকে ক্রমাগত সামাজিক উন্নয়নের দিকে পরিচালিত করে।
  • ৪. আইন প্রণয়ন ও ব্যাখ্যার মাপকাঠি: উচ্চ আদালত যখন কোনো আইনের বৈধতা বিচার করেন বা কোনো জটিল সাংবিধানিক সংকট সমাধান করেন, তখন তাঁরা এই মূলনীতিগুলোর আলোকে আইনের যৌক্তিকতা নিরূপণ করেন।
  • ৫. মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শোষণ, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, সংবিধানের মূলনীতিগুলোতে সেই মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের আইনি প্রতিফলন ঘটেছে।

উপসংহার

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ কেবল কাগুজে দর্শন নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য ও জাতীয় প্রতিশ্রুতির ঐতিহাসিক দলিল। একটি শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে এ মূলনীতিগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন অপরিহার্য।


৬। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি পর্যালোচনা কর।

[Review the main features of the constitution of Bangladesh.]

ভূমিকা

সংবিধান হলো কোনো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দলিল। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাঙালি জাতির জন্য একটি অনন্য মাইলফলক রচিত হয় ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর, যখন গণপরিষদে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে কার্যকর হওয়া এই সংবিধান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রগতিশীল লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এই ঐতিহাসিক দলিল উপহার দেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি

  • ১. লিখিত দলিল: বাংলাদেশের সংবিধান একটি সুস্পষ্ট লিখিত সংবিধান। এতে একটি প্রস্তাবনা (Preamble), ১১টি ভাগ (Parts), ১৫৩টি অনুচ্ছেদ (Articles) এবং ৭টি তফসিল (Schedules) রয়েছে।
  • ২. সংবিধানের প্রাধান্য (Supremacy of Constitution): সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল সংবিধানের অধীনেই কার্যকর হবে। সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যে কোনো আইন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে।
  • ৩. দুষ্পরিবর্তনীয় প্রকৃতি (Rigid Nature): বাংলাদেশের সংবিধান সহজে পরিবর্তনযোগ্য নয়। অনুচ্ছেদ ১৪২ অনুযায়ী, সংবিধানের কোনো ধারা সংশোধন করতে হলে জাতীয় সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সদস্যের সমর্থনে পাস হতে হয়।
  • ৪. রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি: সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮-এ রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি প্রধান স্তম্ভ নির্ধারণ করা হয়েছে—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা।
  • ৫. সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা: সংবিধানে ইংল্যান্ডের ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের মন্ত্রিসভা-শাসিত সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। সরকারপ্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী, যিনি তাঁর মন্ত্রিসভাসহ আইনসভার (জাতীয় সংসদ) কাছে যৌথভাবে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন। রাষ্ট্রপতি হলেন সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান।
  • ৬. এককেন্দ্রীক রাষ্ট্র ও এক-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা: বাংলাদেশ একটি এককেন্দ্রিক প্রজাতন্ত্র (Unitary State), যার কোনো প্রদেশ নেই। সমগ্র দেশের আইন প্রণয়নের জন্য ‘জাতীয় সংসদ’ নামে একটিমাত্র কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা রয়েছে, যা বর্তমানে ৩০০ জন সরাসরি নির্বাচিত এবং ৫০ জন সংরক্ষিত নারী আসনের সমন্বয়ে মোট ৩৫০ সদস্যবিশিষ্ট।
  • ৭. মৌলিক অধিকারের সমাবেশ ও সাংবিধানিক নিশ্চয়তা: সংবিধানের তৃতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ২৭ থেকে ৪৪ পর্যন্ত) নাগরিকদের ১৮টি মৌলিক অধিকার সন্নিবেশিত হয়েছে; যেমন—আইনের দৃষ্টিতে সমতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ইত্যাদি। অনুচ্ছেদ ৪৪ ও ১০২ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে নাগরিক সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করে তা বলবৎ করতে পারেন।
  • ৮. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: সংবিধানের ২২ নম্বর অনুচ্ছেদে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের অঙ্গীকার এবং অনুচ্ছেদ ৯৪ ও ১১৬-এর আলোকে বিচারকদের বিচারকার্য পরিচালনায় স্বাধীন ঘোষণা করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের অভিভাবক ও ব্যাখ্যাকারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।
  • ৯. সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার: অনুচ্ছেদ ১২২ অনুযায়ী, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা সম্পত্তি নির্বিশেষে ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের সুস্থ মনের প্রত্যেক নাগরিক ভোটদানের অধিকারী।
  • ১০. ন্যায়পাল পদ সৃষ্টি: অনুচ্ছেদ ৭৭ অনুযায়ী, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার তদন্ত করার জন্য সংসদে আইন পাস করে ‘ন্যায়পাল’ (Ombudsman) নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে।
  • ১১. সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ: নির্বাচন কমিশন (অনুচ্ছেদ ১১৮), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (অনুচ্ছেদ ১২৭) এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন বা বিপিএসসি (অনুচ্ছেদ ১৩৭)-এর মতো স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

উপসংহার

বাংলাদেশের সংবিধান জনগণের রক্তক্ষয়ী ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এক পবিত্র জাতীয় আমানত। এটি কেবল সরকারের শাসনযন্ত্র নিয়ন্ত্রণের দলিল নয়, বরং নাগরিকদের স্বাধীনতা, সমতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চিরন্তন আলোকবর্তিকা।


৭। বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলসমূহের উৎপত্তি ও বিকাশ আলোচনা কর।

[Discuss the origin and development of the mainstream political parties in Bangladesh.]

ভূমিকা

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো রাজনৈতিক দল। একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং এর পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অগ্রযাত্রায় মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা অবিসংবাদিত। এ দেশের দলীয় রাজনীতির ইতিহাস দীর্ঘ ধারাবাহিক আন্দোলন, ঔপনিবেশিক শোষণবিরোধী সংগ্রাম এবং ক্ষমতা ও আদর্শিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।

মূলধারার রাজনৈতিক দলসমূহের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিকাশ

১. বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (Bangladesh Awami League)

  • উৎপত্তি: ১৯৪৯ সালের ২৩-২৪ জুন পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও শামসুল হকের নেতৃত্বে তৎকালীন মুসলিম লীগের গণবিরোধী আচরণের প্রতিবাদে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মওলানা ভাসানী ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন প্রথম যুগ্ম সম্পাদক।
  • ধর্মনিরপেক্ষ বিকাশ: ১৯৫৫ সালে দলের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র তুলে ধরার জন্য কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বর্জন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ করা হয়।
  • স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে দলটি পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান মঞ্চে পরিণত হয়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সফল নেতৃত্ব দেয়। স্বাধীন বাংলাদেশে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন এবং পরবর্তীকালে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে দলটি পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়।

২. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল – বিএনপি (Bangladesh Nationalist Party)

  • উৎপত্তি: ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেনাপ্রধান এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন মতাদর্শের (ডানপন্থী, বামপন্থী ও মধ্যপন্থী) ব্যক্তিবর্গকে একত্রিত করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। এর পূর্বে তিনি ‘জাগদল’ গঠন করেছিলেন।
  • আদর্শ ও বিকাশ: দলটি ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এবং ‘১৯ দফা’ উন্নয়ন কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে তাদের রাজনৈতিক দর্শন নির্ধারণ করে। দলটির প্রধান শ্লোগান ছিল অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, উৎপাদনমুখী রাজনীতি এবং খাল খনন কর্মসূচি।
  • পরবর্তী ভূমিকা: ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৮২-১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম পরিচালনা করে এবং ১৯৯১ ও ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে।

৩. জাতীয় পার্টি (Jatiya Party)

  • উৎপত্তি ও বিকাশ: ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী সেনাপ্রধান লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তাঁর ক্ষমতাকে রাজনৈতিক বৈধতা ও বেসামরিক রূপ দিতে ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি ‘জাতীয় পার্টি’ গঠন করেন।
  • রাজনীতি: এরশাদের নয় বছরের শাসনকালে দলটি উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তন, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের রাজনীতি পরিচালনা করে। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে দলটি বিরোধী দল ও বিভিন্ন সরকারের জোটসঙ্গী হিসেবে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে।

৪. বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

  • পটভূমি: ১৯৪১ সালে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর নেতৃত্বে অবিভক্ত ভারতে ‘জামায়াতে ইসলামী হিন্দ’ হিসেবে এর প্রতিষ্ঠা হয়। পাকিস্তান আমলে দলটি ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে।
  • বিকাশ: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা এবং শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে স্বাধীনতার পর সংবিধানে ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে দলটি নিষিদ্ধ হয়। ১৯৭৭ সালে সংবিধানের ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদের সংশোধনীর পর দলটি গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বে বাংলাদেশে পুনরায় প্রকাশ্যে কার্যক্রম শুরু করে এবং ১৯৯১ ও ২০০১ সালের সংসদীয় রাজনীতিতে অংশ নেয়।

৫. বামপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলসমূহ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাম ধারার দলগুলোর উৎপত্তি ব্রিটিশ বিরোধী ও ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (পরবর্তীতে সিপিবির রূপ নেয়), মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও ওয়ার্কার্স পার্টি বিভিন্ন সময়ে কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষা এবং জাতীয় সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

উপসংহার

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিহাস একদিকে যেমন আত্মত্যাগ, জাতীয় মুক্তি ও গণতন্ত্রের সংগ্রামের দীপ্ত অধ্যায়, অন্যদিকে দলীয় কোন্দল, অসহিষ্ণুতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সাক্ষী। একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিনির্মাণে দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অপরিহার্য।


৮। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠার বিশেষ উল্লেখপূর্বক বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষার সম্প্রসারণে আলিয়া মাদ্রাসার ভূমিকা পর্যালোচনা কর।

[Review the contribution of Alia Madrasah to spreading the Islamic teachings in Bangladesh with special emphasis on the establishment of Dhaka Alia Madrasah.]

ভূমিকা

দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামি শিক্ষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার অবদান অপরিসীম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ইসলামি জ্ঞানের বিশুদ্ধতা রক্ষা এবং আধুনিক বাস্তবতার সাথে সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার যাত্রা শুরু হয়েছিল, যা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়ে আজকের ঐতিহ্যবাহী ‘সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা’ হিসেবে বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষার প্রধান বাতিঘরে পরিণত হয়।

ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ঐতিহাসিক পটভূমি ও প্রতিষ্ঠা

  • ১. কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা (১৭৮০ খ্রি.): ১৭৮০ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতার শিয়ালদহের নিকটস্থ বৈঠকখানায় মুসলমানদের অনুরোধে ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ‘কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা’ (Calcutta Madrasah) প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রথম প্রধান তত্ত্বাবধায়ক (মোল্লা-ই-মাদিন) ছিলেন প্রখ্যাত আলেম মাওলানা মাজদুদ্দীন (বাহরুল উলুমের শিষ্য)। এটিই ছিল ব্রিটিশ সরকারের অধীনে প্রতিষ্ঠিত ভারতের সর্বপ্রথম সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
  • ২. পাঠ্যক্রম সংস্কার ও বিকাশ: এই মাদ্রাসায় সুপ্রসিদ্ধ ‘দারসে নিজামি’ পাঠ্যক্রম অনুসরণের পাশাপাশি আরবি, ফারসি, ইসলামি আইন (ফিকহ), হাদিস এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো হয়। পরবর্তীতে ১৮৫৭ সালে এটি এ্যাংলো-পার্সিয়ান ও আরবি বিভাগে বিভক্ত হয়ে উচ্চতর ইসলামি গবেষণার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
  • ৩. ১৯৪৭ সালে ঢাকায় স্থানান্তর: ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক, ছাত্র, বিশাল ও দুর্লভ লাইব্রেরি এবং সকল ঐতিহাসিক দলিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। প্রথমে এটি পুরান ঢাকার ইসলামপুরের ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (বর্তমান কবি নজরুল কলেজ) অস্থায়ীভাবে কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে বকশিবাজারে বর্তমান নিজস্ব ক্যাম্পাসে বিশাল ভবন নির্মাণ করে এটি স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হয়।

বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষার সম্প্রসারণে আলিয়া মাদ্রাসার ভূমিকা

  • ১. সুসংহত ইসলামি শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন: ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সমগ্র পূর্ব বাংলায় শত শত আলিয়া মাদ্রাসা (দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল) প্রতিষ্ঠার প্রেরণা তৈরি হয়। এটি দেশের সমগ্র আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় মাদার ইনস্টিটিউশন (Mother Institution) হিসেবে কাজ করে পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ করেছে।
  • ২. হাদিস, তাফসির ও ফিকহ শাস্ত্রের বিকাশ: আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামি ফিকহের বিশুদ্ধ চর্চা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। কামিল পর্যায়ে তাফসির, হাদিস, ফিকহ এবং আদব (আরবি সাহিত্য) বিভাগে হাজার হাজার মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও ফকিহ তৈরি হয়ে সারাদেশে ইসলামি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেন।
  • ৩. সমন্বিত শিক্ষা পদ্ধতির প্রবর্তন: আলিয়া মাদ্রাসা কেবল ঐতিহ্যবাহী ইসলামি জ্ঞান নয়, বরং ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করে এক অনন্য সমন্বিত ধারার জন্ম দিয়েছে। ফলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা যুগোপযোগী ইসলামি জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে।
  • ৪. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাওয়াতি নেতৃত্ব: ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসাসহ দেশের আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর প্রাক্তন গ্র্যাজুয়েটরা জাতীয় পর্যায়ে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের প্রতিটি মসজিদে ইমাম, খতিব, ওয়ায়েজ হিসেবে সহীহ দ্বীনি দাওয়াত পৌঁছে দিচ্ছেন। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণায় মেধার স্বাক্ষর রাখছেন।
  • ৫. পাঠ্যপুস্তক ও আরবি গ্রন্থ রচনা: ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার প্রথিতযশা শিক্ষকবৃন্দ, যেমন—মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী, মাওলানা আব্দুর রহমান কাশগরি, মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, মুফতি সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আমীমুল ইহসান বারকাতী প্রমুখ বহু মৌলিক আরবি ও ইসলামি গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করে বিশ্বদরবারে এ অঞ্চলের সুনাম বৃদ্ধি করেছেন। বিশেষ করে মুফতি আমীমুল ইহসানের রচিত ফিকহ ও হাদিস বিষয়ক গ্রন্থসমূহ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
  • ৬. আধুনিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ও আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা: আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন ও সনদ স্বীকৃতির ধারাবাহিকতায় প্রথমে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে ২০১৩ সালে ঢাকায় ‘ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার সিংহভাগ শিক্ষক ও গবেষক আলিয়া মাদ্রাসা ধারারই সৃষ্টি।

উপসংহার

ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণের এক ঐতিহাসিক প্রতীক। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশে মধ্যপন্থী, উদার ও পরিশুদ্ধ ইসলামি মূল্যবোধ প্রসারে আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর ভূমিকা জাতীয় ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।


খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)

৯। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কেন সফল হয়েছিল তা ব্যাখ্যা কর।

[Explain why the Mass Upsurge of 1969 was successful.]

উত্তর:

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির এক অভূতপূর্ব ও ঐক্যবদ্ধ গণবিস্ফোরণ। এটি সফল হওয়ার প্রধান কারণসমূহ নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • ১. সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা: ডাকসুর তৎকালীন ভিপি আসাদুজ্জামান ও ছাত্রনেতাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার সাথে ছাত্রদের সমস্যা ও কৃষক-শ্রমিকদের দাবি যুক্ত করে ঐতিহাসিক ১১ দফা প্রণয়ন করে, যা আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিকে ব্যাপক ও মজবুত করে।
  • ২. শহীদের আত্মত্যাগ: ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান, ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্টে বন্দি আগরতলা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহাকে পাকিস্তানি বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। এই আত্মত্যাগ সমগ্র জাতিকে ক্রোধে অগ্নিগর্ভ করে তোলে।
  • ৩. সর্বস্তরের জনতার সম্পৃক্ততা: এই আন্দোলনে কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, চাকুরিজীবী এবং নারীসমাজসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে এসে এক অপরাজেয় গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলে।
  • ৪. আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্রের চরম অবক্ষয়: এক দশকের স্বৈরশাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং দুর্নীতির কারণে সামরিক জান্তার নৈতিক ভিত্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। গণআন্দোলনের তীব্রতায় ভীত হয়ে আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকলকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন এবং ২৫ মার্চ স্বয়ং আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন।

১০। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের বিষয়বস্তু উল্লেখ কর।

[Mention the content of 7th March Speech of Bangabandhu.]

উত্তর:

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় ১৮ মিনিটের যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন, তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের পরোক্ষ স্বাধীনতার মহাকাব্য। ভাষণটির প্রধান বিষয়বস্তু নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

  • ১. বঞ্চনা ও রক্তপাতের পটভূমি: বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দীর্ঘ ২৩ বছরের অত্যাচার, নিপীড়ন এবং ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে গণহত্যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করার নির্মম চিত্র তুলে ধরা হয়।
  • ২. অসহযোগ আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা: পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সাথে পূর্ণ অসহযোগিতার নির্দেশ দিয়ে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ রাখা, ব্যাংক, কোর্ট-কাচারি, অফিস-আদালত বন্ধ রাখার সুস্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়।
  • ৩. জাতীয় পরিষদে যোগদানের ৪টি পূর্বশর্ত: ২৫ মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য বঙ্গবন্ধু চারটি সুনির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করেন: (ক) অবিলম্বে সামরিক আইন (Martial Law) প্রত্যাহার করতে হবে, (খ) সমস্ত সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, (গ) গণহত্যার সঠিক তদন্ত করতে হবে, এবং (ঘ) জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
  • ৪. গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি ও স্বাধীনতার চূড়ান্ত ডাক: শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধের নির্দেশ দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন—“তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো… ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।” এবং ভাষণের শেষ প্রান্তে স্বাধীনতার সুস্পষ্ট ঘোষণা দেন—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” (২০১৭ সালে ইউনেস্কো এ ভাষণকে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়)।

১১। বাংলাদেশের আদিবাসীদের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় দাও।

[Give the ethnographic identity of the indigenous people of Bangladesh.]

উত্তর:

বাংলাদেশের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বাঙালি হলেও দেশের পাহাড়ি ও সমতল অঞ্চলে প্রায় ৫০টিরও বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী সম্প্রদায় দীর্ঘকাল ধরে তাদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে বসবাস করে আসছে। নৃ-তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এদের পরিচয় নিম্নরূপ:

  • ১. মূল নৃ-তাত্ত্বিক ধারা: বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নৃ-তাত্ত্বিক বিচারে ‘মঙ্গোলয়েড’ (Mongoloid) বা পীত বর্ণের মানবগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে চ্যাপ্টা নাক, বাদামি চোখ, চোখের কোণে মঙ্গোলীয় ভাঁজ (Epicanthic fold), সোজা ও কালো চুল, ফর্সা থেকে হলুদাভ ত্বকের বর্ণ এবং মাঝারি গড়নের শরীর। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, খাসিয়া, ম্রো, বম প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠী এই ধারার অন্তর্গত।
  • ২. প্রোটো-অস্ট্রালয়েড ও নেগ্রিটো ধারা: দেশের সমতল অঞ্চলের (বিশেষ করে রাজশাহী, দিনাজপুর ও বরেন্দ্র অঞ্চলের) সাঁওতাল, ওঁরাও, মুণ্ডা, কোল ও মালপাহাড়িয়া জনগোষ্ঠী মূলত ‘অস্ট্রালয়েড’ (Australoid) বা প্রোটো-অস্ট্রালয়েড ধারার অন্তর্ভুক্ত। এদের বৈশিষ্ট্য হলো গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ ত্বক, ঢেউখেলানো বা কোঁকড়ানো চুল এবং বিস্তৃত নাক।
  • ৩. ভাষা পরিবার: এদের ভাষাগুলো প্রধানত তিনটি প্রধান ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত:
    • তিব্বতি-বর্মী (Tibeto-Burman): গারো, মারমা, ত্রিপুরা, বম, লুসাই ও ম্রোদের ভাষা।
    • অস্ট্রো-এশিয়াটিক (Austro-Asiatic): খাসিয়া, সাঁওতালি ও মুণ্ডাদের ভাষা।
    • ইন্দো-ইউরোপীয়: চাকমাদের ভাষা বাংলা ভাষার সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত।
  • ৪. সামাজিক কাঠামো: গারো ও খাসিয়াদের পরিবার হলো মাতৃতান্ত্রিক (Matriarchal), যেখানে পরিবারের সম্পত্তি ও বংশমর্যাদা মায়ের মাধ্যমে হস্তান্তরিত হয়। অন্যদিকে চাকমা, মারমা, সাঁওতাল ও অন্যান্য অধিকাংশ আদিবাসী পিতৃতান্ত্রিক (Patriarchal) পরিবার ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত।

১২। গণতন্ত্রের স্বরূপ ব্যাখ্যা কর।

[Explain the features of democracy.]

উত্তর:

গণতন্ত্র (Democracy) হলো আধুনিক বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা। ইংরেজি ‘Democracy’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Demos’ (জনগণ) এবং ‘Kratos’ (শাসন বা ক্ষমতা) থেকে উদ্ভূত, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘জনগণের শাসন’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের বিশ্বখ্যাত সংজ্ঞামতে: “Democracy is a government of the people, by the people, for the people.” (গণতন্ত্র হলো জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য এবং জনগণের সরকার)।

গণতন্ত্রের মূল স্বরূপ ও মৌলিক উপাদানসমূহ নিম্নরূপ:

  • ১. জনগণের সার্বভৌমত্ব: গণতন্ত্রের মূল নীতি হলো সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ। সরকারের বৈধতা জনগণের সম্মতি ও আস্থার ওপর নির্ভরশীল।
  • ২. নিয়মিত ও অবাধ নির্বাচন: সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময় পর পর নিরপেক্ষ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ গণতন্ত্রের প্রধান ভিত্তি।
  • ৩. আইনের শাসন (Rule of Law): গণতন্ত্রে শাসক ও সাধারণ নাগরিক সকলেই আইনের চোখে সমান। কোনো ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং বিনা বিচারে কাউকে দণ্ডিত বা গ্রেপ্তার করা যায় না।
  • ৪. মৌলিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা: গণতন্ত্রে ব্যক্তির চিন্তা, বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মচর্চার স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়।
  • ৫. পরমতসহিষ্ণুতা ও কার্যকর বিরোধী দল: বহুত্ববাদী সমাজ ও পরমতসহিষ্ণুতা গণতন্ত্রের প্রাণ। সংসদে ও রাজপথে বিরোধী দলকে দেশপ্রেমিক অংশীদার হিসেবে গণ্য করে তাদের গঠনমূলক সমালোচনাকে সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
  • ৬. জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা: রাষ্ট্রের নির্বাহী কর্তৃপক্ষ আইনসভা ও জনগণের নিকট তাদের নীতি ও কার্যক্রমের জন্য সার্বক্ষণিক জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে।

১৩। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা সম্পর্কে একটি টীকা লেখ।

[Write a note on the potentials of tourism industry in Bangladesh.]

উত্তর:

প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য, সমৃদ্ধ প্রাচীন ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং অতিথিপরায়ণ মানুষের কারণে বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশটির পর্যটন খাতের প্রধান সম্ভাবনা ও ক্ষেত্রসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ১. পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত: কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্রসৈকত এবং পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সৈকত (যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উভয়ই দেখা যায়) আন্তর্জাতিক পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
  • ২. পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন: ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী সুন্দরবন রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, লবণাক্ত পানির কুমির ও বৈচিত্র্যময় জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিবেশবান্ধব পর্যটনের (Ecotourism) অন্যতম শীর্ষ কেন্দ্র।
  • ৩. পাহাড়ি সৌন্দর্য ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি: বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির সবুজ পাহাড়, সাকাহাফং, কেওক্রাডং, নীলগিরি, সাজেক ভ্যালি, পাহাড়ি ঝর্ণা এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনাচার প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে।
  • ৪. ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ: বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার (সোমপুর মহাবিহার), বগুড়ার মহাস্থানগড়, ঢাকার লালবাগ কেল্লা এবং আহসান মঞ্জিল সমৃদ্ধ ইতিহাসভিত্তিক পর্যটনের দ্বার উন্মোচন করেছে।
  • ৫. ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পর্যটন: হযরত শাহজালাল (রহ.), হযরত শাহপরান (রহ.), বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.), খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার শরিফ এবং দেশের প্রাচীন ঐতিহাসিক মসজিদসমূহ আধ্যাত্মিক পর্যটনের জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত।

বাধা ও উত্তরণ: অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-রিসোর্টের সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তা ও ব্র্যান্ডিংয়ের ঘাটতির কারণে এ সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। সমন্বিত মহাপরিকল্পনা, ভিসা সহজীকরণ এবং বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের আধুনিকায়নের মাধ্যমে পর্যটন খাত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হতে পারে।


১৪। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের বাঁধাসমূহ চিহ্নিত কর।

[Trace out the difficulties of women empowerment in Bangladesh.]

উত্তর:

নারীর ক্ষমতায়ন বলতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার্যকর অংশগ্রহণের ক্ষমতাকে বোঝায়। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। দেশের পোশাক শিল্প ও ক্ষুদ্রঋণে নারীদের সরব অংশগ্রহণ থাকলেও নারীর সামগ্রিক ক্ষমতায়নের পথে এখনও বেশ কিছু গভীর প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান:

  • ১. পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি: সমাজে এখনও গভীরভাবে শিকড় গেড়ে থাকা পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব নারীকে কেবল গৃহস্থালী কাজের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করে। পরিবার ও সমাজের নীতিনির্ধারণে নারীর মতামতকে খাটো করে দেখার মানসিকতা রয়ে গেছে।
  • ২. কুসংস্কার ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যা: একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ধর্মীয় অপব্যাখ্যা এবং সামাজিক কুসংস্কারের কারণে নারীদের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ঘরের বাইরে স্বাধীন চলাফেরায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। অথচ প্রকৃত ইসলাম নারীকে শিক্ষা, সম্পত্তি ও সামাজিক সম্মানের পূর্ণ অধিকার প্রদান করেছে।
  • ৩. বাল্যবিয়ে ও যৌতুক প্রথা: আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাব ও অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে এখনও গ্রাম ও চরাঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে। এর ফলে অল্প বয়সেই তাদের শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটে এবং তারা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে।
  • ৪. নিরাপত্তা সংকট ও কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা: রাস্তাঘাট, গণপরিবহন এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও নিরাপত্তার অভাব নারীর অবাধ গতিশীলতা ও চাকরিজীবনে প্রবেশকে নিরুৎসাহিত করে।
  • ৫. অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও সম্পত্তিতে অসম অধিকার: পারিবারিক সম্পত্তিতে নারীর ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং মূলধনে সরাসরি প্রবেশাধিকার না থাকায় বহু নারী অর্থনৈতিকভাবে পিতা কিংবা স্বামীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য হন।
  • ৬. নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর অংশগ্রহণের অভাব: জাতীয় রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব থাকলেও মাঠপর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ ও অন্যান্য স্থানীয় সরকারে সংরক্ষিত নারী সদস্যরা এখনও পর্যাপ্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা ও বাজেট বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত থাকেন।

১৫। বাংলাদেশের দুর্নীতি সমস্যার প্রতিকার আলোচনা কর।

[Discuss the remedies of corruption problem of Bangladesh.]

উত্তর:

দুর্নীতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সুশাসন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সর্বপ্রধান অন্তরায়। জাতীয় উন্নয়নের সুফল প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে দুর্নীতির দুষ্টচক্র ভাঙা অপরিহার্য। দুর্নীতি প্রতিকারের কার্যকর উপায়সমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো:

  • ১. আইনের কঠোর প্রয়োগ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূরীকরণ: অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দুর্নীতির মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা আবশ্যক।
  • ২. দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সম্পূর্ণ স্বাধীন ও ক্ষমতায়ন করা: দুদককে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। সংস্থার জনবল ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং যেকোনো ভিআইপি ব্যক্তির দুর্নীতির স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
  • ৩. ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও অটোমেশন (ডিজিটালাইজেশন): সরকারি সেবা প্রদান ব্যবস্থায় (যেমন—ভূমি রেজিস্ট্রেশন, পাসপোর্ট, কর প্রদান, টেন্ডার প্রক্রিয়া, ড্রাইভিং লাইসেন্স) মানবীয় হস্তক্ষেপের পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ ই-গভর্ন্যান্স ও ই-টেন্ডারিং বাধ্যতামূলক করা হলে ঘুষ লেনদেনের সুযোগ অনেকাংশেই বন্ধ হবে।
  • ৪. সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিকদের সম্পদের হিসাব বাধ্যতামূলক করা: দায়িত্ব গ্রহণের সময় এবং প্রতি বছর সরকারি কর্মচারী, আমলা ও সংসদ সদস্যদের পরিবারের সকল সদস্যের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদের বিবরণী জনসম্মুখে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • ৫. প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও সংসদীয় তদারকি: রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ‘মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক’ (CAG) এবং জাতীয় সংসদের ‘সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি’র ভূমিকা জোরদার করে সরকারি ব্যয়ের পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
  • ৬. নৈতিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুশাসনের জাগরণ: পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব এবং হারাম ও ঘুষের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সততা ও দেশপ্রেমের শিক্ষাদর্শন যুক্ত করতে হবে।
  • ৭. স্বাধীন গণমাধ্যম ও নাগরিক সচেতনতা: দুর্নীতির তথ্য উন্মোচনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন ও ‘নাগরিক সমাজ’ (Civil Society)-এর তদারকি বৃদ্ধি করা।

১৬। বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে সুফিদের ভূমিকা সংক্ষেপে আলোচনা কর।

[Briefly discuss the role of Sufis in spreading Islam in Bangladesh.]

উত্তর:

বাংলায় ইসলামের সুমহান বাণী কোনো সামরিক শক্তির তরবারি বা রাজনৈতিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং এই অঞ্চলে ইসলামের ভিত্তি রচিত হয়েছিল নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগী সুফি, দরবেশ, পীর ও ওলিয়াদের মানবকল্যাণমূলক আদর্শের মাধ্যমে। বাংলায় ইসলাম প্রচারে তাঁদের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিম্নরূপ:

  • ১. মানবসেবা ও খানকার ভূমিকা: সুফিগণ কেবল উপাসনায় মগ্ন থাকতেন না, বরং প্রতিটি খানকাকে পরিণত করেছিলেন আশ্রয়স্থল ও মানবসেবার কেন্দ্রে। তাঁদের লঙ্গরখানায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করা হতো এবং পথচারীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও আশ্রয় দেওয়া হতো। এই নিঃস্বার্থ মানবিক আচরণ সাধারণ মানুষকে মুগ্ধ করে।
  • ২. জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে মানবিক সাম্য: প্রাচীন বাংলায় বর্ণবাদী হিন্দু ও বৌদ্ধ সমাজের নিচু স্তরের অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষেরা (যেমন—চণ্ডাল, কৈবর্ত, ডোম) চরম সামাজিক বৈষম্য, নির্যাতন ও অস্পৃশ্যতার শিকার ছিলেন। সুফি দরবেশরা তাঁদের বুকে টেনে নিয়ে ঘোষণা করলেন—“ইসলামে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই, আল্লাহ তায়ালার চোখে সবাই সমান।” ফলে লাখ লাখ নির্যাতিত মানুষ স্বেচ্ছায় ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
  • ৩. স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে মেলবন্ধন: সুফি-সাধকগণ বিদেশি হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত দ্রুত স্থানীয় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রপ্ত করেন। তাঁরা আরবি ও ফারসি ভাষার পরিবর্তে স্থানীয় মানুষের কথ্য ভাষায় ভালোবাসা, একত্ববাদ ও আধ্যাত্মিকতার সহজ শিক্ষা প্রদান করেন।
  • ৪. প্রখ্যাত সুফি সাধকদের অবদান:
    • হযরত শাহজালাল (রহ.): ১৩০৩ সালে ৩৬০ জন আউলিয়াকে নিয়ে সিলেটে আগমন করে অত্র অঞ্চলের অত্যাচারী রাজা গৌরগোবিন্দের পতন ঘটিয়ে সমগ্র সুরমা উপত্যকায় ইসলামের আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত করেন।
    • হযরত শাহ পরান (রহ.): সিলেটের আনাচে-কানাচে ইসলাম প্রচার ও সুফিবাদের শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
    • হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.): চট্টগ্রামে সুফিবাদের প্রথম সূচনা করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
    • হযরত শাহ মাখদুম রূপোশ (রহ.): রাজশাহী ও বরেন্দ্র অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন।
    • হযরত খান জাহান আলী (রহ.): খুলনা, বাগেরহাট ও যশোর অঞ্চলে জলাশয় খনন, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং ঐতিহ্যবাহী ষাটগম্বুজ মসজিদ প্রতিষ্ঠাসহ জনহিতকর কাজের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করেন।
    • বাবা আদম শহীদ (রহ.): বিক্রমপুরে প্রাচীন আমলে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছান।

উপসংহার: সুফি-দরবেশদের চারিত্রিক মাধুর্য, আত্মিক পবিত্রতা এবং পরমতসহিষ্ণুতার ফলেই আজ বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে রূপ লাভ করেছে।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. বাংলাদেশ স্টাডিজ (২০৫১০৭) পরীক্ষায় উচ্চ নম্বর পেতে কোন কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে পড়তে হবে?

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ঐতিহাসিক ৬ দফা, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও ৭ মার্চের ভাষণ, ১৯৭২-এর সংবিধানের মূল বৈশিষ্ট্য ও মূলনীতি, সুদবিহীন ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বাংলায় ইসলাম প্রচারে সুফিদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২. ছয় দফাকে কেন বাঙালি জাতির ‘ম্যাগনাকার্টা’ বলা হয়?

১২১৫ সালে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকারের প্রথম দলিল ছিল ম্যাগনাকার্টা। একইভাবে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ছয় দফায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মুক্তির পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা বর্ণিত হওয়ায় একে বাঙালির ম্যাগনাকার্টা বলা হয়।

৩. সুদবিহীন ইসলামি ব্যাংকের মূল বিনিয়োগ পদ্ধতিগুলো কী কী?

ইসলামি ব্যাংকের প্রধান বিনিয়োগ পদ্ধতিগুলো হলো মুদারাবা (শ্রম ও মূলধনের অংশীদারিত্ব), মুশারাকা (যৌথ মূলধনী অংশীদারিত্ব), মুরাবাহা (লাভযুক্ত বাকিতে বিক্রয়), ইজারা (সম্পদ লিজ বা ভাড়া প্রদান) এবং ক্বর্দে হাসানা (সুদবিহীন কল্যাণ ঋণ)।

৪. বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার বলবৎ করার সাংবিধানিক উপায় কী?

সংবিধানের ৪৪ এবং ১০২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ যেকোনো নাগরিক তাঁর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।

৫. কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা কখন এবং কেন ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়?

১৭৮০ সালে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্তির পর পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম শিক্ষার্থীদের উচ্চতর ইসলামি শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে শিক্ষক, ছাত্র ও লাইব্রেরিসহ ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়।

৬. বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতি কীভাবে বাংলাদেশের জলবায়ু ও জনজীবনকে প্রভাবিত করে?

বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতির কারণে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটে যা কৃষির জন্য সহায়ক; কিন্তু একইসাথে এটি বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছ্বাসকে সরাসরি বাংলাদেশের উপকূলের দিকে ধাবিত করে নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি করে।