পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৩৪
ফাজিল স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বাংলা (Bangla)
বিষয় কোড: ২০৫১০৬
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক, খ ও গ বিভাগ থেকে ২টি করে এবং ঘ বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]
ক বিভাগ (সাহিত্য: প্রাচীন ও মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগ)
১। (ক) বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ বলতে কী বোঝ? প্রাচীন যুগের একমাত্র সাহিত্য নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা কর।
ভূমিকা ও প্রাচীন যুগের সংজ্ঞা
বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক কালবিভাজনে প্রারম্ভিক পর্বটিকে ‘প্রাচীন যুগ’ বলা হয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে প্রাচীন যুগের সময়সীমা খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতক থেকে দ্বাদশ শতক (৬৫০—১২০০ খ্রি.) এবং ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে দশম থেকে দ্বাদশ শতক (৯৫০—১২০০ খ্রি.)। পাল ও সেন রাজাদের শাসনামলে রচিত আদি বাংলা ভাষার রূপ এবং সমাজচিত্র এই যুগের সাহিত্যের মূল ভিত্তি।
প্রাচীন যুগের একমাত্র সাহিত্য নিদর্শন হিসেবে ‘চর্যাপদ’-এর গুরুত্ব
- ১. বাংলা ভাষার আদি রূপের ঐতিহাসিক প্রমাণ: ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক নেপালের রাজদরবারের রাজকীয় লাইব্রেরি থেকে আবিষ্কৃত সাড়ে ৪৬টি পদের সমন্বয়ে গঠিত ‘চর্যাপদ’ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম লিখিত রূপ। ১৯২৬ সালে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর ODBL (Origin and Development of the Bengali Language) গ্রন্থে বৈজ্ঞানিক ব্যাকরণ ও ধ্বনিতত্ত্বের ভিত্তিতে অকাট্যভাবে প্রমাণ করেন যে চর্যাপদের ভাষা অসমিয়া বা ওড়িয়া নয়, বরং তা প্রাচীন বাংলা।
- ২. তৎকালীন সমাজ ও জীবনচিত্রের বিশ্বস্ত দলিল: চর্যাপদের পদকর্তা বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা (লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা) মূলত গুহ্য সাধনতত্ত্ব রূপক ভাষায় (‘সন্ধ্যা ভাষা’) প্রকাশ করলেও এর পরতে পরতে তৎকালীন প্রাচীন বাংলার দরিদ্র সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে। পদ্মা ও গঙ্গার নৌকায় পারাপার, শিকারের দৃশ্য, কাপাস তুলা ধোনা, ডোম ও শবরদের অস্পৃশ্য জীবন, মাদল বাজিয়ে বিবাহ এবং দারিদ্র্যের কারণে হাঁড়িতে ভাত না থাকার নির্মম আর্তি এতে মূর্ত হয়েছে: “টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী / হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।”
- ৩. ছন্দ ও সাহিত্যের আদি উৎস: চর্যাপদ মাত্রাবৃত্ত ছন্দের আদিরূপে রচিত এবং এটিই পরবর্তীকালে মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী এবং আধুনিক গীতিকবিতার মূল ছন্দের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
উপসংহার
চর্যাপদ কেবল বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম শৈল্পিক সৃষ্টি নয়, বরং এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রামাণ্য ভিত্তিপ্রস্তর।
অথবা, ১। (খ) টীকা লেখ: ১। পদ্মাবতী, ২। ইউসুফ-জুলেখা।
১। পদ্মাবতী
মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি মহাকবি আলাওল কর্তৃক আরাকান (রোসাঙ্গ) রাজদরবারের প্রধানমন্ত্রী মাগন ঠাকুরের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৬৪৬—১৬৫২ খ্রিষ্টাব্দে রচিত সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য হলো ‘পদ্মাবতী’। এটি হিন্দি কবি মালিক মুহাম্মদ জায়সীর সুফি কাব্য ‘পদুমাবত’ অবলম্বনে রচিত হলেও আলাওল তাঁর নিজস্ব মৌলিক কবিত্বশক্তি, নাট্যধর্মী বর্ণনা এবং পাণ্ডিত্য দিয়ে এটিকে এক অনুপম মানবিক প্রণয়কাব্য হিসেবে পুনর্নির্মাণ করেন। সিংহলের রাজকন্যা পদ্মাবতী এবং চিতোরের রানা রত্নসেনের প্রেমের ট্র্যাজিক পরিণতির পাশাপাশি দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খলজির চিতোর অভিযানের রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক সংঘাত এতে অপূর্ব ভাষায় রূপায়িত হয়েছে। পদ্মাবতীর রূপবর্ণনায় আলাওলের ছন্দ ও শব্দচয়ন বাংলা সাহিত্যের এক অমর সম্পদ।
২। ইউসুফ-জুলেখা
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান কাব্য হলো শাহ মুহম্মদ সগীর রচিত ‘ইউসুফ-জুলেখা’। গৌড়ের ইলিয়াস শাহী সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের রাজত্বকালে (১৩৮৯—১৪১০ খ্রি.) এটি রচিত হয়। পবিত্র কুরআন ও ফারসি মহাকবি জামীর কাব্য থেকে প্রেরণা গ্রহণ করে তিনি পয়গম্বর হযরত ইউসুফ (আ.) এবং মিসরের আজিজ-পত্নী জুলেখার প্রেমের উপাখ্যানকে চমৎকার মানবিক অনুভূতিতে সাজিয়েছেন। দেব-দেবীর অলৌকিক প্রভাবমুক্ত করে রক্তমাংসের মানুষের জৈবিক ও আধ্যাত্মিক প্রেমের যে জয়গান তিনি গেয়েছিলেন, তা মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ মানবিকতার সূচনা করেছিল।
২। (ক) বাংলা কাব্যে আধুনিকতার প্রবর্তনে মাইকেল মধুসূদনের ভূমিকার মূল্যায়ন কর।
ভূমিকা
ঊনবিংশ শতাব্দীর রেনেসাঁস বা নবজাগরণের শ্রেষ্ঠ সন্তান ছিলেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪—১৮৭৩ খ্রি.)। তিনিই বাংলা কবিতার মধ্যযুগীয় পয়ার ছন্দের বেড়ি ভেঙে প্রথম আধুনিক ভাব, বিদ্রোহ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও বিশ্বসাহিত্যের মুক্ত আবহাওয়া প্রবর্তন করেন। সাহিত্যের ভাষায় তিনিই প্রথম বাংলা কাব্যে আধুনিকতার মহাবিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।
আধুনিকতার প্রবর্তনে মধুসূদনের অমর অবদানসমূহ
- ১. অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন (Blank Verse): মধ্যযুগের বাংলা পয়ার ছন্দের অন্ত্যমিলের কৃত্রিম শৃঙ্খল ভেঙে তিনি ১৮৬০ সালে ‘পদ্মাবতী’ নাটকে এবং পরবর্তীতে ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’-এ প্রবর্তন করেন মুক্ত ও প্রবহমান ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’। ভাবের গতি অনুযায়ী বাক্য এক চরণ থেকে অন্য চরণে অবাধে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
- ২. অমর মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ (১৮৬১ খ্রি.): রামায়ণের চিরন্তন ধর্মীয় কাহিনিকে ভেঙে তিনি সম্পূর্ণ আধুনিক মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে মেঘনাদবধ কাব্য রচনা করেন। রাম-লক্ষ্মণকে ভীরু ও প্রতারক হিসেবে এবং রাক্ষসরাজ রাবণ ও তাঁর পুত্র মেঘনাদকে দেশপ্রেমিক বীর হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আধুনিক মানবতাবাদের বিজয় ঘোষণা করেন: “দেশ বৈরী নাশি কান্তে, এ কি ঘোর রণে / যাব আমি যমপুরে?”
- ৩. বাংলা সাহিত্যে সনেটের প্রবর্তন: ইতালীয় কবি পেত্রার্কের অনুকরণে তিনিই প্রথম বাংলায় চতুর্দশপদী কবিতা বা ‘সনেট’ (Sonnet) প্রবর্তন করেন। তাঁর রচিত ‘বঙ্গভাষা’ এবং ‘কপোতাক্ষ নদ’ স্বাদেশিকতা ও মাতৃভাষার প্রতি নিখাদ অনুরাগের অনন্য নিদর্শন।
- ৪. পত্রকাব্য ও আধুনিক নাটক: ওভিডের ‘হেরোইদিস’-এর অনুকরণে রচিত প্রথম পত্রকাব্য ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’-এ শকুন্তলা, জনা ও তারার মতো পৌরাণিক নারীদের প্রতিবাদের সাহসী ও আধুনিক কণ্ঠে রূপ দিয়েছেন। প্রথম সার্থক আধুনিক ট্র্যাজেডি নাটক ‘কৃষ্ণকুমারী’ এবং প্রহসন রচনাতেও তিনি ছিলেন পথিকৃৎ।
উপসংহার
মধুসূদন ছিলেন বিদ্রোহী উল্কার মতো এক সৃষ্টিশীল প্রতিভা। তিনি মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভর বাংলা কবিতাকে আধুনিক মানুষের মুক্তি ও স্বাধীন চেতনার পরাকাষ্ঠায় উন্নীত করেছিলেন।
অথবা, ২। (খ) বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম ঔপন্যাসিক হিসেবে মীর মশাররফ হোসেনের কৃতিত্ব বিচার কর।
ভূমিকা
উনিশ শতকে যখন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় মুসলিম লেখকদের উপস্থিতি অত্যন্ত ক্ষীণ ছিল, তখন স্বীয় মেধা, অনুপম ভাষা ও সাহিত্যিক সাহসিকতার মাধ্যমে প্রথম আধুনিক মুসলিম সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭—১৯১২ খ্রি.)। তিনি কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করে বাংলা সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় কালজয়ী অবদান রেখে গেছেন।
ঔপন্যাসিক ও সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর প্রধান কৃতিত্বসমূহ
- ১. প্রথম আধুনিক মুসলিম উপন্যাস ‘রত্নাবতী’ (১৮৬৯ খ্রি.): মাত্র বাইশ বছর বয়সে তিনি রূপকথার আদলে রচনা করেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘রত্নাবতী’, যা বাংলা সাহিত্যে কোনো মুসলমানের রচিত প্রথম উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত।
- ২. কালজয়ী মহাকাব্যিক গদ্য ‘বিষাদ-সিন্ধু’ (১৮৮৫—১৮৯১ খ্রি.): কারবালার মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি অবলম্বনে তিনি রচনা করেন তিন খণ্ডে বিভক্ত অমর উপন্যাস ‘বিষাদ-সিন্ধু’ (মহরম পর্ব, উদ্ধার পর্ব ও ইয়াজিদ বধ পর্ব)। এটি কেবল ধর্মীয় ইতিহাস নয়; চরিত্র সৃষ্টি, নাট্যধর্মী সংলাপ এবং ট্র্যাজিক আবেদনের দিক থেকে এটি বাংলা সাহিত্যের এক অতুলনীয় ধ্রুপদী সৃষ্টি। ইমাম হোসেন ও কাশেমের শাহাদাত এবং সাকিনার আহাজারি শতাব্দী ধরে কোটি পাঠকের চোখ অশ্রুসজল করে আসছে।
- ৩. নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদী নাটক ‘জমিদার দর্পণ’ (১৮৭৩ খ্রি.): দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’-এর সমকক্ষ হিসেবে তিনি বাংলার শোষক ইংরেজ নীলকর ও অত্যাচারী হিন্দু জমিদারদের কামলিপ্সা ও প্রজাপীড়নের বিরুদ্ধে রচনা করেন সমাজসচেতন নাটক ‘জমিদার দর্পণ’। এতে হাইওয়ান আলী ও নূরন্নেহারের ট্র্যাজেডি অত্যন্ত সাহসের সাথে তুলে ধরা হয়েছে।
- ৪. আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস: তাঁর স্বরচিত আত্মজীবনী ‘আমার জীবনী’ এবং সমাজচিত্রভিত্তিক উপন্যাস ‘গাজী মিয়াঁর বস্তানী’ ও ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ তৎকালীন গ্রামীণ সমাজ ও পারিবারিক কলহের জীবন্ত দলিল।
উপসংহার
মীর মশাররফ হোসেন ছিলেন বাংলা সাহিত্যে মুসলিম পুনর্জাগরণের প্রথম আলোকবর্তিকা। তিনি সংস্কৃতঘেঁষা আড়ষ্টতাকে পরিহার করে এক সাবলীল ও গতিশীল বাংলা গদ্যরীতি গড়ে তুলেছিলেন, যা পরবর্তী প্রজন্মের বহু মুসলিম লেখকের জন্য রাজপথ উন্মুক্ত করেছিল।
খ বিভাগ (প্রবন্ধ ও ছোটগল্প)
৩। (ক) ভাষার ক্ষেত্রে কোন প্রকারের গোঁড়ামি থাকা উচিত নয়—’আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধের আলোকে উক্তিটি বিশ্লেষণ কর।
উক্তিটির প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ
জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচিত ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে ভাষার স্বাভাবিক বিকাশ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সব ধরনের সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণ করা হয়েছে। ভাষা মানুষের যোগাযোগের জীবন্ত বাহন; কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা উগ্র সাম্প্রদায়িক ভাবাবেগ দিয়ে ভাষার স্বাভাবিক গতি রোধ করা যায় না।
গোঁড়ামি পরিহারের পক্ষে প্রাবন্ধিকের মূল যুক্তি
- কৃত্রিম আরবিকরণ বা সংস্কৃতায়ন বর্জন: পাকিস্তান সৃষ্টির পর কায়েমি শাসকগোষ্ঠী বাংলায় উর্দু-আরবি শব্দ জোর করে ঢুকিয়ে ‘ইসলামি বাংলা’ তৈরির অপচেষ্টা চালিয়েছিল, আবার একদল পণ্ডিত বাংলাকে মাত্রাতিরিক্ত সংস্কৃত শব্দে আড়ষ্ট করতে চেয়েছিলেন। ড. শহীদুল্লাহ উভয় পক্ষকেই উগ্র গোঁড়ামি আখ্যা দিয়ে স্বাভাবিক বাংলা ভাষা ব্যবহারের আহ্বান জানান।
- বিদেশি শব্দের স্বাভাবিক আত্মীকরণ: তিনি বলেন, ইংরেজি, আরবি, ফারসি ও পর্তুগিজ যে শব্দগুলো শত শত বছর ধরে সাধারণ মানুষের মুখে ঢুকে গিয়ে বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পদ হয়ে গেছে (যেমন: টেবিল, কলম, চেয়ার, কাগজ, আদালত, উকিল), সেগুলোকে জাত যাওয়ার ভয়ে বর্জন করা চরম মূর্খতা। একটি সজীব ভাষা সর্বদা বহিরাগত শব্দ নিয়েই পুষ্ট হয়।
- জাতীয় সংহতি ও কথ্য রীতির প্রাধান্য: মুখের ভাষাকে সাহিত্যের ভাষায় রূপ দিতে হবে। কৃত্রিম ভাষা দিয়ে সাধারণ মানুষকে দূরে সরিয়ে না রেখে সহজ-সরল চলতি বাংলার মাধ্যমে জাতীয় জাগরণ সৃষ্টি করাই ছিল তাঁর মূল দর্শন।
অথবা, ৩। (খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পের আলোকে মৃন্ময়ী চরিত্র বিশ্লেষণ কর।
মৃন্ময়ীর চরিত্রের স্বকীয়তা ও রূপান্তর
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ ছোটগল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘মৃন্ময়ী’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য চিরসবুজ সৃষ্টি। সে কোনো প্রথাসিদ্ধ অবগুন্ঠনাবতী শান্ত গ্রাম্য বালিকা নয়, বরং সে ছিল প্রকৃতির মতোই বাঁধনহারা, ডানপিটে ও স্বাধীনচেতা।
- প্রকৃতিদুহিতা ও চঞ্চল বালিকা: গ্রামের সবাই তাকে ‘পাগলী’ ডাকত। গাছে চড়া, ছেলেদের সাথে খেলাধুলা করা এবং খোলা মাঠে দৌড়ে বেড়ানোতেই ছিল তার অপার আনন্দ। অপূর্ব যখন তাকে ভালোবেসে বিয়ে করে, তখন সমাজের প্রচলিত বধূবেশের কৃত্রিম খাঁচা সে মেনে নিতে পারেনি। সে তার পোষা পাখিকে মুক্ত করে দেয় এবং বাসর রাতেও খাঁচা ভেঙে বাইরে পালিয়ে যায়।
- অন্তর্দ্বন্দ্ব ও নিঃসঙ্গতা: অপূর্ব তাকে জোর না করে তার মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কলকাতায় চলে যায়। এই দীর্ঘ বিচ্ছেদে মৃন্ময়ী প্রথমবার নিজের অন্তরে অনুভূতির শূন্যতা অনুভব করে। তার সুপ্ত নারীত্ব ও ভালোবাসার অঙ্কুর জাগ্রত হয়।
- আত্মশুদ্ধি ও ভালোবাসার পূর্ণতা: ঝড়ের রাতে অপূর্বর ফিরে আসার পর মৃন্ময়ীর অবাধ্য চঞ্চলতা এক নিঃশব্দ প্রেমময় আত্মনিবেদনে রূপান্তরিত হয়। সে স্বেচ্ছায় অপূর্বর বুকে আশ্রয় নেয়। এক দুরন্ত চঞ্চল বালিকার প্রেমময়ী নারীতে উত্তরণের এই মনস্তাত্ত্বিক বিকাশই মৃন্ময়ী চরিত্রকে বিশ্বসাহিত্যের মর্যাদায় ভূষিত করেছে।
৪। (ক) ‘পাদটীকা’ গল্পে সৈয়দ মুজতবা আলী যে নির্মম সত্য প্রকাশ করেছেন তার স্বরূপ বিশ্লেষণ কর।
গল্পের মূল বক্তব্য ও নির্মম সত্য
সৈয়দ মুজতবা আলীর অনন্য রম্যগল্প ‘পাদটীকা’ আপাতদৃষ্টিতে হাসির গল্প হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে শিক্ষা ব্যবস্থার এক চরম নির্মম সত্য এবং মধ্যবিত্তের অবহেলিত জীবনের বোবা কান্না।
- শিক্ষকের অমর্যাদা ও বৈষম্য: স্কুলের বাৎসরিক পুরস্কার বিতরণীতে সভাপতি ও স্কুল পরিদর্শক সাহেবদের জন্য রাজকীয় আতিথেয়তা ও সম্মান প্রদর্শন করা হয়, অথচ যে শিক্ষক সারা বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ছাত্রদের মানুষ করেন, সেই পণ্ডিত মশাইকে রাখা হয় পেছনের অন্ধকারে। বইয়ের পৃষ্ঠার নিচে গুরুত্বহীনভাবে পড়ে থাকা ‘পাদটীকা’ (Footnote)-র মতোই সমাজে নিঃস্বার্থ শিক্ষকদের অবস্থান।
- দারিদ্র্য ও রাষ্ট্রের উদাসীনতা: পঁচিশ টাকা বেতনে পণ্ডিত মশাইকে পরিবার নিয়ে অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়। পরিদর্শক সাহেবের সামনে নিজের দারিদ্র্যের কথা এক অসাধারণ শ্লেষাত্মক কৌতুকের মাধ্যমে তুলে ধরে তিনি প্রমাণ করেন যে একটি জাতি যদি তার শিক্ষকদের পেটে ক্ষুধা আর পরনে ছেঁড়া কাপড় দিয়ে রাখে, তবে সেই জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা এক বিরাট প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
অথবা, ৪। (খ) কাজী নজরুল ইসলামের ‘শিউলিমালা’ গল্পে প্রেমের যে স্বরূপ ফুটে উঠেছে তার পরিচয় দাও।
গল্পের পটভূমি ও প্রেমের অমলিন রূপ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘শিউলিমালা’ গল্পগ্রন্থের নাম-গল্পে এক পরম ট্র্যাজিক অথচ নিঃস্বার্থ প্রেমের রূপ চিত্রিত হয়েছে। উচ্চবিত্তের সংস্কার ও সামাজিক ব্যবধানের ঊর্ধ্বে উঠে মানবহৃদয়ের পবিত্র আত্মত্যাগই এ গল্পের মূল ভাববস্তু।
- রফিক ও শেফালির নিঃশব্দ অনুরাগ: গল্পের নায়ক রফিক এবং নায়িকা শেফালি (শিউলি) বাল্যকাল থেকেই পরস্পরের প্রতি গভীর ভালোবাসায় আবদ্ধ ছিল। শেফালির অন্তরে রফিকের স্থান ছিল দেবতার মতো। কিন্তু অদৃষ্টের নির্মম পরিহাসে তাদের মিলন সম্ভব হয়নি।
- আত্মত্যাগ ও নিষ্কাম প্রেম: নজরুল দেখিয়েছেন, ভালোবাসার অর্থ কেবল দৈহিক মিলন বা অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়; প্রিয়জনের আত্মিক সুখের জন্য নিজের সমস্ত চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দেওয়াই হলো ভালোবাসার পরম প্রকাশ। মিলনহীন বিরহের অশ্রুতে শিউলি ফুলের মতোই এ প্রেমের সৌরভ যুগ যুগ ধরে অমলিন থেকে যায়।
গ বিভাগ (কবিতা)
৫। (ক) ‘বলাকা’ কবিতা অবলম্বনে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গতিতত্ত্বের পরিচয় দাও।
রবীন্দ্র দর্শনে গতিতত্ত্বের উন্মেষ
কাশ্মীরের শ্রীনগরে ঝিলম নদীর তীরে বসে রচিত ‘বলাকা’ কাব্যের নাম-কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের পরিণত বয়সের দার্শনিক ভাবনার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ। এই কবিতায় কবি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দৃশ্যমান স্থবিরতার অন্তরালে এক চিরচঞ্চল ও অদম্য ‘গতিচেতনা’ উপলব্ধি করেছেন।
- পাখির ডানার স্পন্দন ও অচল জগতের জাগরণ: ঝিলমের অন্ধকার স্রোতের ওপর দিয়ে একঝাঁক বুনো হাঁসের ডানার তীব্র সাঁ সাঁ শব্দে উড়ে যাওয়া কবির চেতনায় এক অপার্থিব বিদ্যুৎ চমক সৃষ্টি করে। কবি দেখতে পান, আপাতদৃষ্টিতে যা কিছু স্থির—পাহাড়, অরণ্য, নদী, গ্রহ-নক্ষত্র—সবকিছুই এই মহাবিশ্বের মহাশূন্যে এক অজানা সুদূরের পানে উড়ে চলেছে।
- গতিই জীবন, স্থবিরতাই মৃত্যু: উপনিষদের ‘চরৈবেতি’ (এগিয়ে চলো) মন্ত্রের মতো সৃষ্টি ক্রমাগত পুরাতনকে ভেঙে নতুনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মানবাত্মা এক অবস্থায় থেমে থাকতে পারে না; অনন্ত অসীমের দিকে অনন্তকাল ধরে ধাবিত হওয়াই জীবনের চরম সার্থকতা।
অথবা, ৫। (খ) “আমারে দুদ্দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন”—’বনলতা সেন’ কবিতায় জীবনানন্দ দাশের উপর্যুক্ত ভাবনার তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর।
পঙ্ক্তিটির অন্তর্নিহিত গভীর অর্থ ও তাৎপর্য
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার এই বিখ্যাত পঙ্ক্তিটি মানব অস্তিত্বের আদিম ক্লান্তি ও ক্ষণিক পরম শান্তির এক অবিনশ্বর প্রকাশ।
- হাজার বছরের পথচলার ক্লান্তি: কবি কোনো নির্দিষ্ট যুগের মানুষ নন; তিনি সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগর পর্যন্ত হাজার বছর ধরে ইতিহাসের অন্ধকার গলিপথ ধরে হেঁটে চলা এক ক্লান্ত মানবাত্মার প্রতিনিধি। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আধুনিক পৃথিবীর রক্তপাত, হতাশা ও একাকীত্ব কবিকে চরমভাবে অবসাদগ্রস্ত করে তুলেছিল।
- বনলতা সেন—শান্তির চিরন্তন রূপক: এই মহাক্লান্তির মধ্যে নাটোরের বনলতা সেন কোনো সাধারণ প্রেমিকা নন; তিনি প্রকৃতির আশ্রয়ের মতো ক্লান্ত পথিকের কাছে পরম প্রশান্তির প্রতীক। পাখির নীড় যেমন ঝড়ে ডানাভাঙা পাখিকে পরম নিরাপত্তা দেয়, তেমনি বনলতা সেনের কাজলকালো চোখের স্নিগ্ধ দৃষ্টি কবিকে এই নির্মম পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দিয়ে “দুদ্দণ্ড শান্তি” (সামান্য ক্ষণিক কিন্তু পরম প্রশান্তি) দান করেছিল।
৬। (ক) ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় কবি স্বদেশের যে বন্দনা করেছেন তা ব্যাখ্যা কর।
কবিতার মূল সুর ও উপমার বৈচিত্র্য
শামসুর রাহমানের কালজয়ী কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন অবরুদ্ধ স্বদেশের মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির এক অনুপম কাব্যিক বন্দনা। কবি স্বাধীনতার মতো একটি বিমূর্ত রাজনৈতিক ধারণাকে বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের অতি প্রিয় ও পরিচিত বাস্তব উপমার মাধ্যমে মূর্ত করে তুলেছেন।
- সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক ঐতিহ্যে স্বাধীনতা: স্বাধীনতা হলো রবিঠাকুরের অমর কবিতা ও নজরুলের ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো সুর। স্বাধীনতা হলো শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি, পিতার কোমল জায়নামাজ, মায়ের শুভ্র কাঁচের চুড়ি এবং উঠোনে রোদে মেলা বোনটির স্নিগ্ধ শাড়ি।
- মুক্তিকামী বীরত্বে স্বাধীনতা: স্বাধীনতা কেবল শান্ত নিসর্গ নয়; স্বাধীনতা হলো রণাঙ্গনে কৃষকের ছেলের হাতে উদ্যত স্টেনগান এবং মুক্তির জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়া গেরিলা যোদ্ধার অদম্য প্রতিরোধ। কবি প্রমাণ করেছেন, স্বাধীনতা বাঙালির অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও সংগ্রামের প্রতিটি রক্তবিন্দুর সাথে মিশে আছে।
অথবা, ৬। (খ) ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতা অনুসরণে বাংলাদেশের রূপময় চিত্র অঙ্কন কর।
নিসর্গ ও স্বদেশ বন্দনা
কবি সৈয়দ আলী আহসানের ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতায় বাংলাদেশের মাটি, প্রকৃতি ও নদীমাতৃক শ্যামল সৌন্দর্যের এক ইন্দ্রিয়ঘন রূপময় চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে।
- রূপময় রূপক ও রঙের বৈচিত্র্য: কবি পূর্ব বাংলাকে দেখেছেন শ্যামল শস্যক্ষেত, ধানের শিষ, পদ্মফুল এবং শীতল পানির চিরন্তন স্রোতধারার মাঝে। বর্ষার ভেজা মাটি, কাশবনের দোলা এবং রাখালের বাঁশির সুরে কবি স্বদেশের রূপকে মমতাময়ী মাতৃরূপে বন্দনা করেছেন।
- রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রচ্ছন্ন শক্তি: এই অপরূপ প্রকৃতির অন্তরালেই সুপ্ত ছিল পাকিস্তানি বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালির নিজস্ব জাতিসত্তার প্রতিরোধ। কবি বুঝিয়ে দিয়েছেন, এদেশের সবুজ মাটিকে কোনো পরাশক্তি চিরতরে পদানত করে রাখতে পারবে না।
ঘ বিভাগ (ব্যাকরণ ও নির্মিতি)
৭। যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
(ক) বাংলা ভাষা কাকে বলে? বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।
সংজ্ঞা: মানুষ তার মনের ভাব অন্যের কাছে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করার জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে যে অর্থপূর্ণ ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি উচ্চারণ করে এবং যা নির্দিষ্ট মানবসমাজে গৃহীত হয়, তাকে ভাষা বলে। বাঙালি জাতি যে ভাষায় কথা বলে ও সাহিত্য রচনা করে, তাকে বাংলা ভাষা বলে।
উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ:
- বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের শতং (Satem) শাখার অন্তর্ভুক্ত। ইন্দো-ইউরোপীয় থেকে কালক্রমে প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা (বেদ ও সংস্কৃত)-এর জন্ম হয়।
- খ্রিষ্টপূর্ব যুগে তা প্রাকৃত বা লোকভাষায় রূপান্তরিত হয়। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, পূর্ব ভারতে প্রচলিত ‘মাগধী প্রাকৃত’ এবং তৎপরবর্তী ‘মাগধী অপভ্রংশ’ থেকে খ্রিষ্টীয় দশম শতকে বাংলা ভাষার সরাসরি জন্ম হয়। পক্ষান্তরে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, ‘গৌড়ীয় প্রাকৃত’ ও ‘গৌড়ীয় অপভ্রংশ’ থেকে খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকে বাংলা ভাষার উদ্ভব ঘটে।
- ক্রমবিকাশের তিনটি স্তর: প্রাচীন যুগ (চর্যাপদের যুগ: ৬৫০/৯৫০—১২০০ খ্রি.), মধ্যযুগ (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য ও রোমান্টিক প্রণয়কাব্যের যুগ: ১২০১—১৮০০ খ্রি.) এবং আধুনিক যুগ (মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের যুগ: ১৮০১ খ্রি. থেকে বর্তমান)।
(খ) সন্ধি কাকে বলে? সন্ধির প্রকারভেদ উদাহরণসহ আলোচনা কর।
সংজ্ঞা: পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ধ্বনির দ্রুত উচ্চারণের ফলে যে মিলন, পরিবর্তন বা বিলোপ ঘটে, তাকে ব্যাকরণে ‘সন্ধি’ বলে। যেমন: বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়।
প্রকারভেদ: বাংলা ব্যাকরণে সন্ধি প্রধানত দুই প্রকার:
- খাঁটি বাংলা শব্দের সন্ধি (২ প্রকার):
- ক. স্বরসন্ধি: স্বরধ্বনি + স্বরধ্বনি। যেমন: রূপা + আলি = রূপালি।
- খ. ব্যঞ্জনসন্ধি: স্বর + ব্যঞ্জন বা ব্যঞ্জন + ব্যঞ্জন। যেমন: চার + টি = চাট্টি, ছোট + দা = ছোদ্দা।
- তৎসম (সংস্কৃত) শব্দের সন্ধি (৩ প্রকার):
- ক. স্বরসন্ধি: অ/আ + অ/আ = আ। যেমন: হিম + আলয় = হিমালয়। রবি + ইন্দ্র = রবীন্দ্র।
- খ. ব্যঞ্জনসন্ধি: দিক্ + অন্ত = দিগন্ত, সৎ + জন = সজ্জন।
- গ. বিসর্গসন্ধি: বিসর্গের সাথে স্বর বা ব্যঞ্জনের মিলন। যেমন: মনঃ + কষ্ট = মনঃকষ্ট, নমঃ + কার = নমস্কার।
(গ) ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি):
- মনমাঝি: মন রূপ মাঝি = রূপক কর্মধারয় সমাস।
- গাছপাকা: গাছে পাকা = সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস।
- দেশান্তর: অন্য দেশ = নিত্য সমাস।
- উদ্বেল: বেলাকে অতিক্রান্ত = অব্যয়ীভাব সমাস।
- রাজপুত্র: রাজার পুত্র = ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস।
- নদীমাতৃক: নদী মাতা যার = বহুব্রীহি সমাস।
- ত্রিফলা: ত্রি (তিন) ফলের সমাহার = দ্বিগু সমাস।
- আনাগোনা: আনা ও গোনা = দ্বন্দ্ব সমাস।
(ঘ) প্রত্যয়ের নামসহ প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি):
- কর্তব্য: √কৃ + তব্য = কৃৎ প্রত্যয়।
- আড়তদার: আড়ত + দার = তদ্ধিত প্রত্যয় (ফারসি)।
- মানব: মনু + ষ্ণ (অ) = তদ্ধিত প্রত্যয়।
- পার্থিব: পৃথিবী + ষ্ণ (অ) = তদ্ধিত প্রত্যয়।
- কারক: √কৃ + অক (ণক) = কৃৎ প্রত্যয়।
- গাড়োয়ান: গাড়ি + ওয়ান = তদ্ধিত প্রত্যয়।
- নেতা: √নী + তৃচ = কৃৎ প্রত্যয়।
- লেখক: √লিখ্ + অক = কৃৎ প্রত্যয়।
- মেয়েলি: মেয়ে + লি = তদ্ধিত প্রত্যয়।
- দৈনিক: দিন + ষ্ণিক (ইক) = তদ্ধিত প্রত্যয়।
(ঙ) ‘কমা’ ব্যবহারের পাঁচটি নিয়ম উদাহরণসহ লেখ।
বাক্যে স্বল্প বিরতি (এক বলতে যতটুকু সময় লাগে) নির্দেশের জন্য ‘কমা’ (,) ব্যবহৃত হয়। এর পাঁচটি প্রধান নিয়ম:
- সমজাতীয় একাধিক পদ পরপর থাকলে: শেষ পদটি ছাড়া প্রতিটির পর কমা বসে। যেমন: রহিম, করিম, জব্বার ও বরকত ভাষা শহীদ।
- সম্বোধন পদের পর: যেমন: হে বন্ধু, বিদায় নেওয়ার আগে কথাটি শুনে যাও।
- জটিল বাক্যের খণ্ডবাক্যগুলোকে পৃথক করতে: যেমন: যিনি পরিশ্রম করেন, তিনিই সাফল্য লাভ করেন।
- উদ্ধৃতি চিহ্নের পূর্বে: যেমন: শিক্ষক বললেন, “সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা।”
- তারিখ ও মাসের পর এবং ঠিকানার বিভিন্ন অংশের পর: যেমন: ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। ১৬, তোপখানা রোড, ঢাকা।
(চ) বাংলা বানানে ‘ই’-কার ব্যবহারের পাঁচটি নিয়ম লেখ।
প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী হ্রস্ব ই-কার (ি) ব্যবহারের পাঁচটি নিয়ম:
- সকল অতৎসম (দেশি, তদ্ভব ও বিদেশি) শব্দে: সর্বদা হ্রস্ব ই-কার হবে; ঈ-কার হবে না। যেমন: পাখি, শাড়ি, বাড়ি, তরকারি, জানুয়ারি, কেরানি।
- অতৎসম স্ত্রীবাচক শব্দের শেষে: যেমন: মাসি, পিসি, নানি, দাদি, মামি।
- জাতি, ভাষা ও দেশের নামে: যেমন: বাঙালি, জাপানি, ইংরেজি, ইরানি, পাকিস্তানি।
- ‘আলি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দে: যেমন: সোনালি, রুপালি, বর্ণালি, মিতালি, খেয়ালি।
- সংস্কৃত ঈ-কারান্ত শব্দের শেষে ‘তা’, ‘ত্ব’, ‘নী’ যুক্ত হলে: মূল শব্দের ঈ-কার ই-কারে পরিণত হয়। যেমন: অধিকারী > অধিকারিণী, স্থায়ী > স্থায়িত্ব, কৃতি > কৃতিত্ব।
(ছ) ভাব-সম্প্রসারণ লেখ: “মানুষ বাঁচে তার কর্মের মধ্যে বয়সের মধ্যে নহে।”
মূলভাব: মানবজীবনের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্ব দীর্ঘ পরমায়ুর ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে মানুষের নিঃস্বার্থ কর্ম, সৃজনশীল অবদান এবং মানবতার সেবার ওপর। মহৎ কর্মের মাধ্যমেই মানুষ নশ্বর পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ করে।
সম্প্রসারিত ভাব: সময় মানুষের জীবনের মাপকাঠি বটে, কিন্তু কেবল নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বছরের পর বছর বেঁচে থাকার নাম প্রকৃত জীবন নয়। একজন মানুষ যদি শত বছর বেঁচে থেকেও সমাজে কোনো কল্যাণমূলক অবদান না রাখে, তবে তার সেই দীর্ঘ জীবন অর্থহীন। পক্ষান্তরে যিনি অল্প বয়সেও নিজের সৃষ্টিশীল প্রতিভা, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে মানবজাতির কল্যাণ সাধন করেন, তিনি শারীরিকভাবে মৃত্যুবরণ করলেও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরঞ্জীব হয়ে থাকেন। সুকান্ত ভট্টাচার্য মাত্র একুশ বছর বেঁচে ছিলেন, জন কিটস মাত্র পঁচিশ বছর বেঁচে ছিলেন এবং তারিক বিন জিয়াদ ও মুহাম্মদ বিন কাসিম মাত্র সতেরো-আঠারো বছর বয়সে বিশ্ব জয় করে ইতিহাসে নিজেদের স্থান করে নিয়েছিলেন। একাত্তরের তরুণ বীর মুক্তিযোদ্ধারা যৌবনের সূচনাতেই জীবন বিসর্জন দিয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
মন্তব্য: দিন ও মাসের সমষ্টি জীবন নয়; মহৎ কর্মের আলোকবর্তিকাই মানুষের প্রকৃত জীবন। তাই পরমায়ুর হিসাব না করে সৎ ও সৃষ্টিশীল কর্মে আত্মনিয়োগ করাই মানবজীবনের চরম সার্থকতা।
(জ) মাদ্রাসায় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রভাষক পদে চাকরির জন্য একটি আবেদনপত্র লেখ।
তারিখ: ১০ নভেম্বর, ২০২২
বরাবর: সভাপতি / অধ্যক্ষ
দারুননাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা, ডেমরা, ঢাকা।
বিষয়: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে ‘প্রভাষক’ পদে নিয়োগের জন্য আবেদন।
জনাব,
বিনীত নিবেদন এই যে, গত ২৫ অক্টোবর ২০২২ তারিখে দৈনিক ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অবগত হলাম যে, আপনার ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসায় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে একজন প্রভাষক নিয়োগ করা হবে। উক্ত পদের একজন যোগ্য প্রার্থী হিসেবে আমি নিম্নে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জীবনবৃত্তান্ত আপনার সদয় বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করছি:
ব্যক্তিগত বিবরণ:
- ১. প্রার্থীর নাম: মুহাম্মদ শোয়াইবুর রহমান
- ২. পিতার নাম: মো. আব্দুর রশীদ
- ৩. মাতার নাম: খাদিজা বেগম
- ৪. স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: রামপুর, ডাকঘর: ফুলবাড়ী, জেলা: ময়মনসিংহ।
- ৫. বর্তমান ঠিকানা: বাড়ি নং-১২, রোড নং-৪, মিরপুর-১০, ঢাকা।
- ৬. জন্ম তারিখ: ১৫ জানুয়ারি, ১৯৯৬
- ৭. জাতীয়তা: বাংলাদেশি (মুসলিম)
- ৮. মোবাইল নং: ০১৭১০-XXXXXX
শিক্ষাগত যোগ্যতা:
| পরীক্ষার নাম | বিভাগ/বিষয় | বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয় | পাসের সন | প্রাপ্ত জিপিএ/সিজিপিএ |
|---|---|---|---|---|
| দাখিল | সাধারণ | মাদ্রাসা বোর্ড | ২০১১ | জিপিএ ৫.০০ |
| আলিম | সাধারণ | মাদ্রাসা বোর্ড | ২০১৩ | জিপিএ ৪.৯০ |
| ফাজিল (সম্মান) | ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি | ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় | ২০১৭ | সিজিপিএ ৩.৮৫ (১ম শ্রেণি) |
| কামিল (মাস্টার্স) | ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি | ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় | ২০১৮ | সিজিপিএ ৩.৯০ (১ম শ্রেণি) |
অতএব, মহোদয়ের নিকট বিনীত প্রার্থনা, আমার উল্লেখিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সনদের আলোকে আমাকে উক্ত প্রভাষক পদে সাক্ষাৎকার ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদানে বাধিত করবেন।
বিনীত নিবেদক,
মুহাম্মদ শোয়াইবুর রহমান
সংযুক্তি: সকল শিক্ষাগত যোগ্যতার সত্যায়িত সনদ, নম্বরপত্র ও ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘বাংলা সাহিত্য ও ব্যাকরণ (২০৫১০৬)’ পরীক্ষার মানবণ্টন কেমন?
মোট ৮০ নম্বরের মধ্যে ক বিভাগে সাহিত্য (প্রাচীন ও আধুনিক যুগ) ২০ নম্বর, খ বিভাগে গদ্য ও ছোটগল্প ২০ নম্বর, গ বিভাগে কবিতা ২০ নম্বর এবং ঘ বিভাগে ব্যাকরণ ও নির্মিতিতে ২০ নম্বর নির্ধারিত।
২. মাইকেল মধুসূদন দত্তকে কেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক কবি বলা হয়?
কারণ তিনিই প্রথম দেব-নির্ভর মধ্যযুগীয় সাহিত্যের অবসান ঘটিয়ে মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের মহাকাব্য রচনা করেন, অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তন করেন এবং সনেট ও পত্রকাব্য রচনা করে বাংলা কাব্যে বিপ্লব ঘটান।
৩. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচিত ‘তৈল’ প্রবন্ধের মূল অন্তর্নিহিত শিক্ষা কী?
বাঙালি সমাজের অন্ধ চাটুকারিতা ও তোষামোদের সংস্কৃতিকে তীব্র ব্যঙ্গ করে মানুষের আত্মমর্যাদাবোধ ও মেধার মূল্যায়ন জাগ্রত করাই ছিল এই কালজয়ী প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য।
৪. ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান কেবল কোন শব্দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়?
ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান কেবল তৎসম (খাঁটি সংস্কৃত) শব্দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়; কোনো দেশি, তদ্ভব বা বিদেশি শব্দে (যেমন: স্টেশন, মাস্টার) কখনো মূর্ধন্য-ণ বা মূর্ধন্য-ষ ব্যবহৃত হয় না।
৫. মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ কোন ধারার রচনা?
এটি ঐতিহাসিক সত্য ও কল্পনার অপূর্ব সমন্বয়ে রচিত একটি মহাকাব্যিক গদ্য উপন্যাস, যাতে কারবালার মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি নাট্যধর্মী সংলাপে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
৬. ২০৫১০৬ বিষয়ের ব্যাকরণ অংশে পূর্ণ নম্বর পাওয়ার কৌশল কী?
সমাস নির্ণয়ে সঠিক ব্যাসবাক্য ও সমাসের নাম লেখা, সন্ধি ও বানানের নিয়মগুলো উদাহরণসহ সুনির্দিষ্ট পয়েন্টে উপস্থাপন করা এবং প্রত্যয় নির্ণয়ে ধাতুচিহ্ন (√) নির্ভুলভাবে ব্যবহার করা।

