স্পেন, মিশর ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম শাসন (৭১১—১৫১৭ খ্রি.) (Muslims Rule in Spain, Egypt and North Africa) – 205105, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
৪৭ মিনিট পড়ার সময়
৪ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৩৩
ফাজিল স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
স্পেন, মিশর ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম শাসন (৭১১—১৫১৭ খ্রি.)
[Muslims Rule in Spain, Egypt and North Africa (711—1517 A.D.)]
বিষয় কোড: ২০৫১০৫
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক বিভাগ থেকে ৪টি এবং খ বিভাগ থেকে ২টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]


ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)

১। মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে স্পেনের সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থার বিবরণ দাও।

[Describe the social and religious conditions of Spain on the eve of Muslim conquest.]

ভূমিকা

৭১১ খ্রিষ্টাব্দে তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে আইবেরীয় উপদ্বীপে (স্পেন) মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে দেশটি গথিক (ভিসিগথ) রাজাদের অধীনে মধ্যযুগীয় সামাজিক দাসত্ব, বর্ণবৈষম্য এবং ক্যাথলিক চার্চের অন্ধ ধর্মান্ধতায় চরম অবক্ষয়ের শিকার ছিল। সাধারণ মানুষ সামন্ততান্ত্রিক নিপীড়নে এতটাই জর্জরিত ছিল যে মুসলিমদের আগমন তাদের জন্য মুক্তির বার্তা হিসেবে দেখা দিয়েছিল।

সামাজিক অবস্থা

  • সামাজিক শ্রেণিবিভাজন ও শোষণ: ভিসিগথ শাসিত সমাজ কঠোর চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল: অভিজাত শ্রেণি, চার্চের যাজক সম্প্রদায়, মধ্যবিত্ত বা স্বাধীন নাগরিক এবং চরম নিপীড়িত ভূমিদাস (সার্ফ) ও ক্রীতদাস সম্প্রদায়।
  • ভূমিদাস (সার্ফ) ও ক্রীতদাসদের দুরবস্থা: স্পেনের সিংহভাগ মানুষ ছিল ভূমিদাস বা ক্রীতদাস। তারা জমিতে পশুর মতো খাটত, কিন্তু উৎপাদনের প্রায় সমস্তটাই অভিজাতরা কেড়ে নিত। তাদের বিবাহ, পারিবারিক সম্পর্ক ও সন্তানের ওপর তাদের কোনো অধিকার ছিল না। মালিকরা তাদের হত্যা করলেও কোনো বিচার হতো না।
  • ভারী করের বোঝা: করের সমস্ত বোঝা চাপানো হতো মধ্যবিত্ত ও সাধারণ কৃষকদের ওপর, অথচ ধনী ভূস্বামী ও চার্চের যাজকরা সমস্ত কর মওকুফ পেত। ফলে অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়েছিল।

ধর্মীয় অবস্থা

  • চার্চের সর্বগ্রাসী আধিপত্য ও অসহিষ্ণুতা: টলেডোর ক্যাথলিক চার্চের যাজক পরিষদ (Council of Toledo) রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক ছিল। তারা অ-ক্যাথলিকদের প্রতি চরম অসহিষ্ণু নীতি গ্রহণ করেছিল।
  • ইহুদিদের ওপর পাশবিক নির্যাতন: স্পেনে বিপুলসংখ্যক ধনী ও শিক্ষিত ইহুদি সম্প্রদায় বাস করত। কিন্তু সপ্তদশ কাউন্সিলের নির্দেশে ইহুদিদের জোরপূর্বক খ্রিষ্টান হতে বাধ্য করা হয়। অস্বীকারকারীদের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাদের আজীবন দাস বানিয়ে রাখা হতো এবং তাদের সাত বছর বা তার বেশি বয়সী সন্তানদের খ্রিস্টান পরিবারে দাস হিসেবে বিলিয়ে দেওয়া হতো। ফলে ইহুদিরা সর্বদা বহিরাগত কোনো মুক্তির শক্তির পথ চেয়ে ছিল।

উপসংহার

স্পেনের সামাজিক অবিচার ও ধর্মীয় হিংস্রতাই রডারিকের গথিক সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ পতন নিশ্চিত করেছিল। মুসলিম সেনাপতিরা যখন ন্যায়পরায়ণতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিলেন, তখন স্থানীয় জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুসলিমদের সহযোগিতা করে বিজয়ের পথ সুগম করে।


২। শাসক হিসেবে প্রথম আব্দুর রহমানের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the achievements of Abdur Rahman-I as a ruler.]

ভূমিকা

৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে দামেস্কে উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর আব্বাসীয়দের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া একমাত্র উমাইয়া শাহজাদা প্রথম আব্দুর রহমান (শাসনকাল: ৭৫৬—৭৮৮ খ্রি.)। সুদূর সিরিয়া থেকে নিঃসঙ্গ অবস্থায় মরুভূমি ও সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তিনি স্পেনে এসে ৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীন উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অসাধারণ সাহস, অধ্যবসায় ও রাজকীয় যোগ্যতার কারণে আব্বাসীয় খলিফা আল-মানসুরও মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ‘সাকরে কুরাইশ’ (কুরাইশের বাজপাখি) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

শাসক হিসেবে প্রথম আব্দুর রহমানের প্রধান কৃতিত্বসমূহ

  • ১. স্বাধীন উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা (৭৫৬ খ্রি.): তিনি স্পেনে পৌঁছে স্থানীয় বারবার ও কালবী আরবদের ঐক্যবদ্ধ করেন। ৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে মুসারা-র রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্পেনের শেষ উমাইয়া গভর্নর ইউসুফ আল-ফিহরীকে পরাজিত করে কর্ডোভার মসনদে বসেন এবং দামেস্কের পতনের মাত্র ছয় বছরের মাথায় ইউরোপের বুকে স্বাধীন উমাইয়া আমিরাতের সূচনা করেন।
  • ২. অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন: তাঁর বত্রিশ বছরের শাসনামল ছিল ধারাবাহিক বিদ্রোহ দমনের ইতিহাস। ইয়েমেনি ও কায়সী আরব অভিজাতদের বিদ্রোহ, বারবারদের অসন্তোষ এবং নিজের আত্মীয়দের ষড়যন্ত্র তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে দমন করে আন্দালুসের সীমানা সুরক্ষিত করেন।
  • ৩. আব্বাসীয় ষড়যন্ত্র ও শার্লামেনের আক্রমণ প্রতিহত (রন্সিসভালসের যুদ্ধ):
    • আব্বাসীয় খলিফা আল-মানসুরের প্রেরিত সেনাপতি আলা বিন মুগিসকে তিনি পরাজিত ও শিরশ্ছেদ করে তাঁর মাথা লবণ মেখে উপহারস্বরূপ মানসুরের দরবারে পাঠান, যার ফলে আব্বাসীয়রা আর কখনোই স্পেন আক্রমণের সাহস করেনি।
    • বার্সেলোনার গভর্নর সুলাইমানের আমন্ত্রণে ফরাসি সম্রাট শার্লামেন বিশাল খ্রিস্টান বাহিনী নিয়ে জারাগোজা আক্রমণ করেন। আব্দুর রহমান জারাগোজা রক্ষা করেন। ফিরে যাওয়ার সময় পিরেনিজ পর্বতের রন্সিসভালস গিরিপথে বাস্ক ও মুসলিমদের সম্মিলিত আক্রমণে শার্লামেনের বাহিনীর পেছনের অংশ ধ্বংস হয় এবং তাঁর শ্রেষ্ঠ বীর রোল্যান্ড নিহত হন।
  • ৪. কর্ডোভার জামে মসজিদ নির্মাণ (৭৮৬ খ্রি.): তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অমর স্থাপত্যকীর্তি হলো কর্ডোভার ঐতিহাসিক জামে মসজিদ (Mezquita de Córdoba)। তিনি ৮০,০০০ স্বর্ণ দিনার দিয়ে জমি কিনে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। এর ঘোড়ার খুরের ন্যায় তোরণ ও লাল-সাদা পাথরের দ্বৈত খিলান ইসলামি স্থাপত্যের অনন্য মাস্টারপিস।
  • ৫. কৃষি ও নগর উন্নয়ন: তিনি রূসাফা নামক চমৎকার উপশহর ও উদ্যান নির্মাণ করেন, যেখানে সিরিয়া থেকে খেজুর গাছ ও ডালিম এনে প্রথম ইউরোপে রোপণ করেন। স্পেনে উন্নত সেচ খাল ও পানিব্যবস্থা চালু করেন।

উপসংহার

প্রথম আব্দুর রহমান ছিলেন শূন্য থেকে সাম্রাজ্য গড়ার এক জীবন্ত রূপকার। একলা পালিয়ে এসে ইউরোপের মাটিতে এমন এক শক্তিশালী রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করা, যা পরবর্তী তিনশত বছর টিকে ছিল—বিশ্ব ইতিহাসে সত্যিই এক অভূতপূর্ব অলৌকিক কৃতিত্ব।


৩। ওমর বিন-হাফসুনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর আলোকপাত কর।

[Focus on the political activities of Omar-bin-Hafsun.]

ভূমিকা ও পরিচয়

স্পেনের উমাইয়া খিলাফতের যুগে যে কয়জন আঞ্চলিক বিদ্রোহী খলিফাদের কেন্দ্রীয় শাসনকে প্রায় তিন দশক ধরে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা দুর্ধর্ষ ছিলেন ওমর বিন হাফসুন (মৃত্যু: ৯১৭ খ্রি.)। তিনি ছিলেন মালাগার দক্ষিণ পাহাড় অঞ্চলের একজন নব্য মুসলিম স্প্যানিশ (মুওয়াল্লাদ) পরিবারের সন্তান।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিদ্রোহের বিস্তার

  • ১. ববাসত্রো দুর্গকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা ঘোষণা: ৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মালাগার কাছে দুর্গম ও দুর্ভেদ্য পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত ‘ববাসত্রো দুর্গ’ (Bobastro Castle)-কে নিজের শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি বানান। স্থানীয় মুওয়াল্লাদ (নওমুসলিম) ও খ্রিষ্টান মোজারাবদের ওপর আরবদের বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি জাতীয়তাবাদী শ্লোগান তুলে বিদ্রোহ শুরু করেন।
  • ২. বিশাল অঞ্চলজুড়ে সমান্তরাল শাসন প্রতিষ্ঠা: আমির মুহাম্মদ-১, আল-মুনজির এবং আব্দুল্লাহর দুর্বল শাসনামলে ওমর বিন হাফসুনের ক্ষমতা এতটাই বেড়ে যায় যে মালাগা, গ্রানাডা, জেন এবং সেভিলের বিশাল পার্বত্য অঞ্চল তাঁর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এমনকি তিনি কর্ডোভা আক্রমণ করার দুঃসাহস দেখান।
  • ৩. ফাতেমীয় ও খ্রিষ্টানদের সাথে মিত্রতা: তিনি উত্তর আফ্রিকার উদীয়মান ফাতেমীয় খিলাফতের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং উত্তরে আস্তুরিয়াসের খ্রিষ্টান রাজাদের সাথে জোট বাঁধেন।
  • ৪. খ্রিষ্টধর্মে প্রত্যাবর্তন ও জনপ্রিয়তায় ধস (৮৯৯ খ্রি.): রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য ৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ওমর বিন হাফসুন গোপনে ইসলাম ত্যাগ করে পুনরায় খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং ‘স্যামুয়েল’ নাম নেন। এটি ছিল তাঁর সবচেয়ে মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল। এর ফলে তাঁর বিশাল মুসলিম ও মুওয়াল্লাদ অনুসারীরা বিশ্বাসঘাতক মনে করে তাঁকে ত্যাগ করে এবং তাঁর আন্দোলনের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায়।

বিদ্রোহের অবসান

৯১২ খ্রিষ্টাব্দে তরুণ খলিফা তৃতীয় আব্দুর রহমান ক্ষমতায় এসে ওমর বিন হাফসুনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সামরিক অভিযান চালান। ৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে ওমরের মৃত্যুর পর ৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে আব্দুর রহমান ববাসত্রো দুর্গের পতন ঘটিয়ে হাফসুন পরিবারের বিদ্রোহের চিরতরে অবসান ঘটান এবং আন্দালুসের রাজনৈতিক ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।


৪। স্পেনে মুসলমান শাসনের পতনের কারণসমূহ বিশ্লেষণ কর।

[Analyze the causes of the downfall of the Muslim rule in Spain.]

ভূমিকা

৭১১ খ্রিষ্টাব্দে তারিক বিন জিয়াদের বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপের মাটিতে যে গৌরবময় মুসলিম আন্দালুসের সূচনা হয়েছিল, দীর্ঘ প্রায় আটশত বছর পর ২ জানুয়ারি ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে শেষ মুসলিম দুর্গ গ্রানাডার পতনের মধ্য দিয়ে তার করুণ সমাপ্তি ঘটে। ইউরোপের বাতিঘর হিসেবে পরিচিত একটি উন্নত সভ্যতার এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক পতনের পেছনে বহুবিধ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক কারণ নিহিত ছিল।

পতনের প্রধান কারণসমূহ

  • ১. জাতীয় ঐক্যের অভাব ও উপজাতীয় সংঘাত: স্পেনের মুসলিম জনগোষ্ঠী কখনোই একটি অখণ্ড জাতীয় সত্তায় রূপ নিতে পারেনি। আরবদের মধ্যকার কায়সী বনাম কালবী দ্বন্দ্ব, আরব বনাম বারবারদের জাতিগত বিভেদ এবং স্থানীয় নওমুসলিমদের (মুওয়াল্লাদ) প্রতি অবহেলা সবসময় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের কারণ হতো।
  • ২. খিলাফতের ভাঙন ও ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্তি (মুলুকুত তাওয়াইফ): ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দে কর্ডোভা খিলাফতের পতনের পর স্পেন কুড়িটিরও বেশি ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যে (Taifa Kingdoms) বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই আমীররা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করত এবং একে অপরের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টান রাজাদের সামরিক সাহায্য নিয়ে তাদেরকে নিয়মিত কর (Parias) প্রদান করত, যা খ্রিষ্টানদের শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
  • ৩. খ্রিষ্টানদের সুসংহত পুনর্দখল আন্দোলন (Reconquista): উত্তর স্পেনের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলো পোপের সহযোগিতায় ‘রিকনকুইস্টা’ বা পবিত্র ক্রুসেড যুদ্ধ ঘোষণা করে মুসলিম অঞ্চলগুলো এক এক করে দখল করতে থাকে। ১০৮৫ সালে টলেডো, ১২৩৬ সালে কর্ডোভা এবং ১২৪৮ সালে সেভিলের পতন ঘটে।
  • ৪. ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলার ক্যাথলিক ঐক্য: ১৪৬৯ খ্রিষ্টাব্দে আরাগনের রাজা ফার্ডিন্যান্ড এবং ক্যাস্টিলের রানি ইসাবেলার বৈবাহিক মেলবন্ধনের ফলে খ্রিষ্টান স্পেন একক পরাশক্তিতে পরিণত হয় এবং গ্রানাডার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করে।
  • ৫. গ্রানাডার রাজপরিবারের গৃহযুদ্ধ ও গাদ্দারী: শেষ নাসরি রাজবংশে আমির আবুল হাসান, তাঁর ভাই আল-জাগাল এবং পুত্র আবু আব্দুল্লাহর (Boabdil) মধ্যে রক্তক্ষয়ী ক্ষমতা দখলের যুদ্ধ বাধে। বিশ্বাসঘাতক আবু আব্দুল্লাহ খ্রিষ্টানদের সাথে হাত মিলিয়ে নিজ পিতাকে উৎখাত করেন।
  • ৬. মুসলিম বিশ্বের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও সাহায্যের অভাব: অটোমান সাম্রাজ্য তখন দূরবর্তী পূর্ব ইউরোপ ও কনস্টান্টিনোপল নিয়ে ব্যস্ত ছিল এবং মামলুকরা ছিল দুর্বল। ফলে গ্রানাডা কোনো বহিরাগত সাহায্য পায়নি।

উপসংহার

১৪৯২ সালে আবু আব্দুল্লাহ যখন আলহাম্বরা প্রাসাদের চাবি ফার্ডিন্যান্ডের হাতে তুলে দিয়ে গ্রানাডা ত্যাগ করছিলেন, তখন তাঁর মা আয়েশা ঐতিহাসিক তিরস্কার করেছিলেন: “যে রাজ্য তুমি পুরুষের মতো তরবারি দিয়ে রক্ষা করতে পারলে না, আজ তার জন্য নারীর মতো অশ্রু বিসর্জন করো!” এর মধ্য দিয়ে ইউরোপে মুসলিম আন্দালুসের সূর্য চিরতরে অস্তমিত হয়।


৫। ফাতেমীয় কারা? উত্তর আফ্রিকার ফাতেমীয় খেলাফত প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট আলোচনা কর।

[Who are the Fatimids? Discuss the background of establishment of the Fatimid Khilafat in North Africa.]

ফাতেমীয়দের পরিচয়

ফাতেমীয় রাজবংশ ছিল ইসমাইলি শিয়া মতাবলম্বী একটি শক্তিশালী খেলাফত, যা ৯০৯ থেকে ১১৭১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত উত্তর আফ্রিকা, মিশর ও সিরিয়ায় শাসন পরিচালনা করেছিল। তারা মহানবি (সা.)-এর কন্যা হযরত ফাতিমাতুজ জাহরা (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-এর বংশধর হিসেবে দাবি করে নিজেদের ‘ফাতেমীয়’ (Fatimids) নামে পরিচয় দিত।

উত্তর আফ্রিকায় খেলাফত প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট

  • ১. ইসমাইলি বাতেনি দাওয়াত ও চরম প্রচার: আব্বাসীয় খিলাফতের কঠোর নজরদারির কারণে ইসমাইলি ইমামরা আত্মগোপনে (দাওরে সতর) ছিলেন। তাঁরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে বহু বিশ্বস্ত গোপন প্রচারক (দায়ী) বিভিন্ন প্রান্তে প্রেরণ করেন।
  • ২. দায়ী আবু আব্দুল্লাহ আশ-শিয়ার আগমন: উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মূল রূপকার ছিলেন আবু আব্দুল্লাহ আশ-শিয়া। তিনি ৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় হজের মৌসুমে আলজেরিয়ার কুতামা বারবার গোত্রের সাথে পরিচিত হন এবং তাদের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে উত্তর আফ্রিকার পাহাড়ি অঞ্চলে একটি দুর্ধর্ষ অনুগত সেনাদল গড়ে তোলেন। তিনি প্রচার করেন যে সত্যের প্রতীক ‘ইমাম মাহদী’ অতি দ্রুত আত্মপ্রকাশ করবেন।
  • ৩. আগলাবীয় সুন্নি শাসনের অবক্ষয়: তৎকালীন তিউনিসিয়ার সুন্নি আগলাবীয় শাসক জিয়াদাতুল্লাহ-৩ ছিলেন একজন মাতাল, বিলাসী ও দুর্বলচিত্তের শাসক। তাঁর অত্যাচারে প্রজারা অতিষ্ঠ ছিল। আবু আব্দুল্লাহ একে একে আগলাবীয়দের সমস্ত শহর জয় করেন এবং ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে রাজধানী রাক্কাদা দখল করেন।
  • ৪. ওবায়দুল্লাহ আল-মাহদীর সিংহাসন আরোহণ (৯০৯ খ্রি.): আবু আব্দুল্লাহ মরক্কোর সিজিলমাসায় বন্দিদশা থেকে ওবায়দুল্লাহকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন এবং ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে তিউনিসিয়ার কায়রোয়ানে তাঁকে ‘আমিরুল মুমিনিন আল-মাহদী’ হিসেবে খলিফা ঘোষণা করেন। এর ফলে উত্তর আফ্রিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে ফাতেমীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে তারা রাজধানী হিসেবে ‘মাহদিয়া’ নগরী স্থাপন করে।

৬। মিশরের সর্বশ্রেষ্ঠ খলিফা আল-মুইজের কৃতিত্ব আলোচনা কর।

[Discuss the achievement of al-Muiz as the greatest Khalifa of Egypt.]

ভূমিকা

ফাতেমীয় খিলাফতের চতুর্থ খলিফা এবং মিশরে শাসন পরিচালনাকারী প্রথম ফাতেমীয় শাসক ছিলেন মাআদ আবু তামিম আল-মুইজ লি-দিনিল্লাহ (শাসনকাল: ৯৫৩—৯৭৫ খ্রি.)। তিনি ছিলেন ফাতেমীয় বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য নির্মাতা ও সংস্কৃতির রূপকার। তিনিই ফাতেমীয়দের রাজধানী তিউনিসিয়ার মাহদিয়া থেকে মিশরে স্থানান্তরিত করেন।

খলিফা আল-মুইজের প্রধান কৃতিত্বসমূহ

  • ১. মিশর বিজয় (৯৬৯ খ্রি.): তৎকালীন মিশরের ইখশিদীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে খলিফা আল-মুইজ তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি জওহর আল-সাকিলিকে এক লাখ সুসজ্জিত সৈন্যসহ মিশর অভিযানে পাঠান। জওহর কোনো বড় প্রতিরোধ ছাড়াই ফুসতাত ও মিশর অধিকার করেন।
  • ২. বিশ্বখ্যাত কায়রো নগরী প্রতিষ্ঠা (৯৬৯ খ্রি.): বিজয়ের পরপরই সেনাপতি জওহর নীল নদের পূর্ব তীরে ফাতেমীয়দের নতুন রাজকীয় রাজধানী স্থাপন করেন, যার নাম রাখা হয় ‘আল-কাহিরা’ (Al-Qahirah বা বিজয়ী নগরী), যা আজকের আধুনিক মিশরের রাজধানী ‘কায়রো’। ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে আল-মুইজ স্বয়ং কায়রোতে এসে রাজকীয় প্রাসাদ উদ্বোধন করেন।
  • ৩. আল-আজহার মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ (৯৭০—৯৭২ খ্রি.): আল-মুইজের প্রত্যক্ষ নির্দেশে সেনাপতি জওহর কায়রোতে ঐতিহাসিক ‘জামে আল-আজহার’ নির্মাণ করেন, যা পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীনতম ও শ্রেষ্ঠ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে খ্যাত হয়।
  • ৪. সাম্রাজ্য বিস্তার: তিনি সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং পবিত্র মক্কা ও মদিনা ফাতেমীয় খেলাফতের অধীনস্থ করেন। কায়রো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়।

উপসংহার

আল-মুইজের মিশর বিজয়ের ফলেই ফাতেমীয় খিলাফত একটি আঞ্চলিক শক্তি থেকে বাগদাদের সমকক্ষ এক বিশ্ব সাম্রাজে রূপ পরিগ্রহ করেছিল।


৭। খলিফা আল-হাকিমের রাজত্বকালের বিবরণ দাও। তিনি কি ফাতেমীয় বংশের পতনের জন্য দায়ী ছিলেন?

[Give an account of the reign of Khalifa al-Hakim. Was he responsible for the downfall of the Fatimid dynasty?]

ভূমিকা ও রাজত্বকালের বিবরণ

ফাতেমীয় খিলাফতের ষষ্ঠ খলিফা আল-হাকিম বি-আমরিল্লাহ (শাসনকাল: ৯৯৬—১০২১ খ্রি.) মাত্র ১১ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন। তাঁর ২৫ বছরের রাজত্বকাল ছিল চরম স্ববিরোধিতা, পাগলামি, নিষ্ঠুরতা এবং আকস্মিক অদ্ভুত সব রাজকীয় ফরমানের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। ইতিহাসবিদরা তাঁকে ‘ম্যাড ক্যালिफ’ (Mad Caliph) বা উন্মাদ খলিফা বলে অভিহিত করেছেন।

তাঁর অদ্ভুত ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড

  • খামখেয়ালী রাজকীয় নিষেধাজ্ঞা: তিনি দিনে ঘুমানো এবং রাতে সমস্ত দোকানপাট ও বাজার খোলা রাখার অদ্ভুত নির্দেশ দেন। নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়া এমনকি জুতা তৈরির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তিনি কুকুর হত্যা এবং মূলূখিয়া শাক খাওয়া নিষিদ্ধ করেন।
  • অমুসলিমদের ওপর চরম নির্যাতন ও হলি সেপালকার ধ্বংস: তাঁর পূর্বসূরিদের উদার নীতি ভেঙে তিনি খ্রিস্টান ও ইহুদিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালান। ১০০৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জেরুজালেমের পবিত্র খ্রিস্টান গির্জা ‘চার্চ অব দ্য হলি সেপালকার’ (Church of the Holy Sepulchre) সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেন, যা পরবর্তীতে ইউরোপে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং ক্রুসেডের প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে।
  • নিজেকে খোদা দাবি ও দ্রুজ মতবাদের জন্ম: জীবনের শেষভাগে দারজি ও হামজা নামক দুই উগ্র শিষ্যের প্ররোচনায় তিনি নিজেকে ‘ঈশ্বরের অবতার’ বলে দাবি করেন। তাঁর এই দাবিকে কেন্দ্র করেই লেবাননে ‘দ্রুজ’ (Druze) সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়।
  • রহস্যময় অন্তর্ধান (১০২১ খ্রি.): ১০২১ সালের এক রাতে তিনি গাধার পিঠে চড়ে কায়রোর মোকাট্টাম পাহাড়ের দিকে যান এবং আর কখনোই ফিরে আসেননি; সেখানে কেবল তাঁর রক্তাক্ত পোশাক উদ্ধার করা হয়।

তিনি কি ফাতেমীয়দের পতনের জন্য দায়ী ছিলেন?

হ্যাঁ, বহুলাংশেই তিনি দায়ী ছিলেন। যদিও তিনি ‘দারুল হিকমাহ’ ও লাইব্রেরি স্থাপন করেছিলেন, কিন্তু তাঁর খামখেয়ালিপনা সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ভিত্তি কাঁপিয়ে দেয়, খ্রিস্টান গির্জা ভেঙে ক্রুসেডারদের ডেকে আনে এবং সমাজে ধর্মীয় বিভেদ উসকে দিয়ে ফাতেমীয় খিলাফতকে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।


৮। মামলুক সুলতান আল-নাসিরের রাজত্বকালের বিবরণ দাও।

[Give a description of the reign of Mamluk Sultan al-Nasir.]

পরিচয় ও দীর্ঘ শাসন

মিশরের বাহরি মামলুক বংশের সর্বাপেক্ষা গৌরবময় ও সফল সুলতান ছিলেন আল-নাসির মুহাম্মদ বিন কালাউন। তিনি তিন দফায় (১২৯৩—১২৯৪, ১২৯৯—১৩০৯ এবং ১৩১০—১৩৪১ খ্রি.) প্রায় ৪২ বছর ধরে মিশর ও সিরিয়া শাসন করেন। তাঁর তৃতীয় দফার দীর্ঘ ৩১ বছরের শাসনকাল ছিল মামলুক সালতানাতের পরম স্বর্ণযুগ।

প্রধান কৃতিত্ব ও অবদানসমূহ

  • ১. মোঙ্গলদের চিরতরে বিতাড়ন (মারজ আল-সাফ্ফারের যুদ্ধ, ১৩০৩ খ্রি.): দামেস্কের কাছে মারজ আল-সাফ্ফারের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সুলতান আল-নাসির স্বয়ং মোঙ্গল ইলখানি বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন। এর ফলে সিরিয়া ও মিশরে মোঙ্গল আক্রমণের সমস্ত হুমকি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
  • ২. আর্থিক ও রাজস্ব সংস্কার: তিনি অতিরিক্ত সব অবৈধ কর প্রত্যাহার করেন এবং কৃষকদের অধিকার নিশ্চিত করে নতুন জমি জরিপ (রাওয়াক আল-নাসিরি) সম্পন্ন করেন।
  • ৩. অভাবনীয় স্থাপত্য ও নগর উন্নয়ন: তিনি কায়রোকে একটি আধুনিক স্বপ্নের নগরীতে রূপ দেন। তিনি নীল নদ থেকে কায়রো দুর্গ পর্যন্ত পানি সরবরাহের সুউচ্চ নালা (Aqueduct), আল-নাসির মুহাম্মদ মসজিদ, বহু মাদ্রাসা, প্রাসাদ এবং সুয়েজের কাছে সেচ খাল খনন করেন।

উপসংহার

সুলতান আল-নাসিরের রাজত্বকালে মিশর বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র এবং সমগ্র প্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল।


খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)

৯। টুরসের যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।

[Describe in brief about the battle of Tours.]

যুদ্ধের পটভূমি ও বিবরণ

১১৪ হিজরি / অক্টোবর ৭৩২ খ্রিষ্টাব্দে মধ্য ফ্রান্সের টুরস ও পোয়েটিয়ার্স শহরের মধ্যবর্তী স্থানে স্পেনের মুসলিম সেনাপতি আব্দুর রহমান আল-গাফেকি এবং ফ্রাঙ্কিশ খ্রিষ্টান সেনাপতি চার্লস মার্টেলের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘টুরসের যুদ্ধ’ (Battle of Tours বা মারাকাতু বাওয়াতুশ শুহাদা) সংঘটিত হয়। মুসলিমরা দ্রুত ফ্রান্সে প্রবেশ করেছিল, কিন্তু প্রচণ্ড শীত এবং মালামালের অতিরিক্ত বোঝার কারণে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সেনাপতি গাফেকি শাহাদাতবরণ করেন এবং মুসলিমরা পিছু হটে।

ফলাফল

ঐতিহাসিক গিবন মন্তব্য করেছেন, যদি চার্লস মার্টেল পরাজিত হতেন, তবে আজ অক্সফোর্ড ও প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয়ে বাইবেলের বদলে কুরআন পড়ানো হতো। এই যুদ্ধের ফলে উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে মুসলিমদের সামরিক সম্প্রসারণ স্থায়ীভাবে থেমে যায়।


১০। ‘ইউরোপের বাতিঘর’ হিসেবে কর্ডোভা নগরীর বর্ণনা দাও।

[Describe the city of Cordova as the ‘Light House of Europe’.]

কর্ডোভার স্বর্ণালী রূপ

দশম শতাব্দীতে খলিফা তৃতীয় আব্দুর রহমানের আমলে স্পেনের রাজধানী কর্ডোভা ছিল সমগ্র অন্ধকার ইউরোপের মধ্যে একমাত্র আলোকিত জ্ঞানের শহর। তৎকালীন কর্ডোভায় ছিল দশ লক্ষের বেশি জনসংখ্যা, ৭০০টি মসজিদ, ৩,০০টি হাম্মামখানা (গণস্নানাগার) এবং রাতের বেলা পাথরের বাঁধানো রাস্তায় তেলের বাতি জ্বলত। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউরোপের দূর-দূরান্ত থেকে খ্রিস্টান রাজারা শিক্ষা গ্রহণ করতে আসতেন। রাজকীয় পাঠাগারে ৪ লক্ষাধিক বই সংরক্ষিত ছিল। কর্ডোভার এই জ্ঞান ও আলোর কারণেই আধুনিক ঐতিহাসিকরা একে ‘ইউরোপের বাতিঘর’ (Light House of Europe) বা পৃথিবীর গহনা বলে অভিহিত করেন।


১১। ধর্মান্ধ আন্দোলন-এর পরিচয় দাও।

[Give an introduction of the Zealot Movement.]

আন্দোলনের পটভূমি ও প্রকৃতি

নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (৮৫০—৮৫৯ খ্রি.) আমির দ্বিতীয় আব্দুর রহমান এবং প্রথম মুহাম্মদের আমলে কর্ডোভার একদল চরমপন্থী ধর্মান্ধ খ্রিস্টান যাজক ইউলোগিয়াস (Eulogius) এবং পারফেক্টাসের নেতৃত্বে যে উন্মত্ত আত্মঘাতী আন্দোলন গড়ে তোলে, তাকে ‘ধর্মান্ধ আন্দোলন’ বা ‘কর্ডোভার শহীদ আন্দোলন’ (Martyrs of Cordova / Zealot Movement) বলা হয়। স্পেনের খ্রিস্টানরা আরবি ভাষা, সংস্কৃতি ও পোশাকে এতটাই আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল (যাদের মোজারাব বলা হতো) যে রক্ষণশীল চার্চ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাই মুসলিমদের উত্তেজিত করতে তারা প্রকাশ্য রাজপথে ও আদালতে গিয়ে মহানবি (সা.) ও ইসলামের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে চরম অবমাননাকর ও অশ্লীল গালিগালাজ করত যাতে রাষ্ট্র তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয় এবং তারা চার্চে ‘শহীদ’ হিসেবে পূজিত হতে পারে। পরবর্তীতে খলিফা চার্চ নেতাদের সাথে বৈঠক করে এবং ইউলোগিয়াসকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে এই উন্মাদনা বন্ধ করেন।


১২। বিজেতা হিসেবে সালাহ উদ্দিন আইয়ূবীর মূল্যায়ন কর।

[Evaluate Salah Uddin Ayubi as a conqueror.]

ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী (১۱۳৭—১১৯৩ খ্রি.) ছিলেন মুসলিম ইতিহাসের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বীর ও মানবিক বিজেতা। তাঁর সবচেয়ে গৌরবময় সামরিক সাফল্য হলো ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহাসিক হিত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডার বাহিনীকে সম্পূর্ণ চূর্ণ করা এবং দীর্ঘ ৮৮ বছর পর খ্রিষ্টানদের হাত থেকে পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) উদ্ধার করা। বিজেতা হিসেবে তাঁর মহত্ত্ব ফুটে ওঠে জেরুজালেম বিজয়ের পর—যেখানে ক্রুসেডাররা ১০৯৯ সালে ৭০,০০০ মুসলিমকে হত্যা করেছিল, সেখানে সালাহুদ্দীন কোনো রক্তপাত না করে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন, বন্দিদের মুক্তি দেন এবং নিজের রাজকোষ থেকে গরিব খ্রিস্টানদের ক্ষতিপূরণ দেন। তাঁর এই নজিরবিহীন বীরত্ব ও পরমতসহিষ্ণুতা শত্রুপক্ষের কাছেও তাঁকে বীরের মর্যাদায় ভূষিত করেছিল।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ‘স্পেন, মিশর ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম শাসন’ কোর্সে কোন রাজবংশগুলো প্রধান?

স্পেনের উমাইয়া আমিরাত ও কর্ডোভা খেলাফত, উত্তর আফ্রিকা ও মিশরের ফাতেমীয় খিলাফত এবং পরবর্তীতে সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর সালতানাত ও মামলুক সালতানাত এ কোর্সের প্রধান রাজবংশ।

২. প্রথম আব্দুর রহমানকে কেন ‘সাকরে কুরাইশ’ বা কুরাইশের বাজপাখি বলা হয়?

আব্বাসীয়দের গণহত্যার হাত থেকে একা পালিয়ে এসে সুদূর ইউরোপের মাটিতে একচ্ছত্র স্বাধীন উমাইয়া খেলাফত প্রতিষ্ঠা করার অভাবনীয় বীরত্ব দেখে খলিফা আল-মানসুর তাঁকে এই উপাধি দিয়েছিলেন।

৩. ৭৩২ সালের টুরসের যুদ্ধকে ইউরোপীয়রা কেন ঐতিহাসিক বিবেচনা করে?

কারণ ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত এই যুদ্ধে মুসলিম সেনাপতি আব্দুর রহমান আল-গাফেকির শাহাদাতবরণের মধ্য দিয়ে পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপে ইসলামি সাম্রাজ্যের অগ্রযাত্রা স্থায়ীভাবে থেমে গিয়েছিল।

৪. ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইজের সবচেয়ে প্রধান দুটি অবদান কী?

৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে আধুনিক মিশরের রাজধানী ‘কায়রো’ (আল-কাহিরা) নগরী প্রতিষ্ঠা করা এবং ৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বখ্যাত ‘আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপন করা।

৫. কর্ডোভা শহরকে কেন ‘ইউরোপের বাতিঘর’ বলা হতো?

মধ্যযুগে যখন সমগ্র ইউরোপ অশিক্ষা, ধর্মান্ধতা ও নোংরা আবহে নিমজ্জিত ছিল, তখন কর্ডোভায় পাকা আলোকিত রাস্তা, বিশ্ববিদ্যালয়, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ও চিকিৎসার বিশ্বসেরা আধুনিক সুযোগ ছিল।

৬. ২০৫১০৫ বিষয়ের পরীক্ষায় ভালো নম্বর অর্জনের সেরা কৌশল কী?

আন্দালুস ও মিশরের সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক নাম, সাল-তারিখ, ঐতিহাসিক স্থাপত্যের বিবরণ এবং ইউরোপীয় ও প্রাচ্যবিদ ঐতিহাসিকদের তুলনামূলক মূল্যায়ন পয়েন্টভিত্তিক উপস্থাপন করা।