ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ২য় পত্র (Islamic History and Culture 2nd Paper) – 414, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাযিল পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
৭৫ মিনিট পড়ার সময়
১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ফাযিল (স্নাতক) পাস তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (ঐচ্ছিক) দ্বিতীয় পত্র
[ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের রাজনৈতিক ইতিহাস (৭১২-১৭০৭ খ্রিঃ পর্যন্ত)]
বিষয় কোড : ৪১৪
সময় : ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান : ১০০
[দ্রষ্টব্য: সকল প্রশ্নের মান সমান। যে কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


কন্টেন্ট তালিকা / প্রশ্নসূচি

  1. ১। আরবদের সিন্ধু বিজয়ের পটভূমি বর্ণনা কর? ভারত ও ইসলামের ইতিহাসে এ বিজয়ের ফলাফল কী হয়েছিল?
  2. ২। উদ্দেশ্যের বিশেষ উল্লেখসহ গজনির সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযানসমূহ বর্ণনা কর।
  3. ৩। মুহাম্মদ ঘূরীর আক্রমণের প্রাক্কালে ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা কর।
  4. ৪। দিল্লির মামলুক সুলতানগণের মধ্যে কাকে তুমি শ্রেষ্ঠ বলে মনে কর? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন কর।
  5. ৫। দিল্লি সালতানাতের সংহতির জন্য সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন?
  6. ৬। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুগলকের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাসমূহ পর্যালোচনা কর।
  7. ৭। সুলতান আলাউদ্দিন খলজীর মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিবরণ দাও। এই ব্যবস্থা কতটুকু সফল হয়েছিল?
  8. ৮। সম্রাট আকবরের রাজপুত নীতি সম্পর্কে আলোচনা কর।
  9. ৯। সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের প্রধান ঘটনাবলি সংক্ষেপে আলোচনা কর।
  10. ১০। টীকা লেখ (যে কোনো দুটি):

রচনামূলক প্রশ্নাবলি ও পূর্ণাঙ্গ উত্তর

১। আরবদের সিন্ধু বিজয়ের পটভূমি বর্ণনা কর? ভারত ও ইসলামের ইতিহাসে এ বিজয়ের ফলাফল কী হয়েছিল?

ভূমিকা

৭১২ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খলিফা প্রথম আল-ওয়ালিদের রাজত্বকালে সতেরো বছর বয়সী তরুণ ও প্রতিভাবান সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে আরবদের সিন্ধু বিজয় ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে। এই বিজয়ের মাধ্যমে ভারত ভূখণ্ডে সর্বপ্রথম ইসলামের স্থায়ী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।

আরবদের সিন্ধু বিজয়ের পটভূমি ও কারণসমূহ

  • ১. বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সমৃদ্ধির আকর্ষণ: ইসলাম পূর্বকাল থেকেই আরব বণিকদের সাথে ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলের (মালাবার, গুজরাট, সিন্ধু) সুপ্রাচীন বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। ভারতের ধনসম্পদের প্রাচুর্য ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি মুসলিমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।
  • ২. ভারতীয় জলদস্যুদের ঔদ্ধত্য ও প্রত্যক্ষ কারণ: শ্রীলঙ্কার (সিলন) রাজা উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ এবং ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জন্য বহু মূল্যবান উপহার এবং সেখানে মৃত্যুবরণকারী আরব বণিকদের এতিম কন্যা ও বিধবাদের আটটি জাহাজে করে আরবে পাঠাচ্ছিলেন। জাহাজগুলো সিন্ধুর দেবল বন্দরের নিকট পৌঁছালে স্থানীয় সিন্ধি জলদস্যুরা জাহাজগুলো লুট করে এবং নারীদের বন্দি করে।
  • ৩. রাজা দাহিরের অস্বীকৃতি: হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সিন্ধুর ব্রাহ্মণ রাজা দাহিরের নিকট ক্ষতিপূরণ, লুণ্ঠিত মালামাল এবং বন্দিদের মুক্তির দাবি জানান। কিন্তু রাজা দাহির উদ্ধতভাবে জবাব দেন—“জলদস্যুরা আমার অধীন নয়, তাদের ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।” এই অবমাননাকর জবাবে ক্ষুব্ধ হয়ে হাজ্জাজ সিন্ধু অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন।
  • ৪. পূর্বতন দুটি অভিযানের ব্যর্থতা: হাজ্জাজ প্রথমে উবায়দুল্লাহ এবং পরে বুদাইলের নেতৃত্বে দুটি সামরিক অভিযান পাঠান; কিন্তু রাজা দাহিরের সৈন্য ও হাতির মুখে উভয় সেনাপতি নিহত ও অভিযান ব্যর্থ হয়। এর ফলে উমাইয়াদের জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় একটি শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ অভিযান অনিবার্য হয়ে ওঠে।
  • ৫. মুহাম্মদ বিন কাসিমের অভিযান (৭১২ খ্রি.): অবশেষে হাজ্জাজ তাঁর সতেরো বছর বয়সী ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা মুহাম্মদ বিন কাসিমকে ৬,০০০ সিরীয় অশ্বারোহী, ৬,০০০ উষ্ট্রারোহী এবং আধুনিক ‘মাঞ্জানিক’ (পাথর নিক্ষেপক যন্ত্র) দিয়ে সজ্জিত করে পাঠান। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে দেবল বন্দর বিজয়ের পর রাওয়ারের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রাজা দাহির পরাজিত ও নিহত হন এবং সমগ্র সিন্ধু ও মুলতান মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।

ভারত ও ইসলামের ইতিহাসে সিন্ধু বিজয়ের ফলাফল

  • ১. রাজনৈতিক প্রভাব: ইংরেজ ঐতিহাসিক স্ট্যানলি লেনপুল মন্তব্য করেছিলেন যে, “আরবদের সিন্ধু বিজয় ছিল ইসলামের ইতিহাসে একটি নিষ্ফল উপাখ্যান (an episode without result)।” তবে আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে এই মন্তব্য পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ রাজনৈতিকভাবে আরবরা সমগ্র ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে না পারলেও সিন্ধুতে তিন শতাধিক বছর ধরে স্বাধীন আরব আমিরাত টিকে ছিল এবং পরবর্তীতে সুলতান মাহমুদ ও মুহাম্মদ ঘূরীর ভারত বিজয়ের পথ সুগম করেছিল।
  • ২. ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাব: আরবরা জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করেনি; বরং সিন্ধুর হিন্দুদের ‘জিম্মি’ (সুরক্ষিত প্রজা) মর্যাদা দেওয়া হয় এবং উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সহনশীল নীতি ও সুফি সাধকদের আগমনে সিন্ধুর হাজার হাজার বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের হিন্দু ইসলাম গ্রহণ করে। সিন্ধুকে বলা হয় ‘বাবুল ইসলাম’ (ইসলামের প্রবেশদ্বার)।
  • ৩. বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান: সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমেই ভারতীয় জ্ঞানভাণ্ডার মুসলিম বিশ্বে এবং পরবর্তীতে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় গণিতশাস্ত্র, দশমিক পদ্ধতি ও শূন্যের ধারণা (হিন্দু-আরবি সংখ্যাপদ্ধতি), ব্রহ্মগুপ্তের জ্যোতির্বিজ্ঞানের গ্রন্থ ‘সিদ্ধান্ত’ (আরবিতে সিন্দহিন্দ) এবং চিকিৎসাগ্রন্থ ‘চরক সংহিতা’ বাগদাদে অনূদিত হয়। পঞ্চতন্ত্রের গল্প আরবিতে ‘কালিলা ওয়া দিমনা’ নামে অনূদিত হয়।

উপসংহার

সিন্ধু বিজয় কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল জয় ছিল না; বরং এটি ছিল প্রাচ্য ও আরব সভ্যতার এক ঐতিহাসিক মহামিলন, যা ভারতীয় উপমহাদেশের সার্বিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মানচিত্রে চিরস্থায়ী ছাপ রেখেছিল।


২। উদ্দেশ্যের বিশেষ উল্লেখসহ গজনির সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযানসমূহ বর্ণনা কর।

ভূমিকা

মধ্যযুগীয় ভারতের সামরিক ইতিহাসে গজনির সুলতান মাহমুদ (শাসনকাল: ৯৯৭—১০৩০ খ্রি.) ছিলেন এক অপরাজেয় সমরনায়ক। ইয়ামিনউদ্দৌলা উপাধিতে ভূষিত এই সুলতান ১০০০ থেকে ১০২৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী মাত্র ২৬ বছরে ভারতের বুকে মোট সতেরোটি সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। কোনো একটি অভিযানেও তিনি পরাজিত হননি।

সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযানের উদ্দেশ্যসমূহ

ঐতিহাসিকদের মধ্যে মাহমুদের ভারত অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে তিনটি প্রধান মত প্রচলিত রয়েছে:

  • ১. অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য (প্রধান লক্ষ্য): অধিকাংশ আধুনিক ঐতিহাসিকের মতে, মাহমুদের অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক। তৎকালীন ভারতের মন্দিরগুলোতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অগাধ স্বর্ণ, রৌপ্য ও ধনরত্ন পুঞ্জীভূত ছিল। গজনির শুষ্ক ও অনুর্বর মাটির বিপরীতে ভারতকে তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের উন্নয়নের জন্য অর্থের প্রধান উৎস গণ্য করেন। লুণ্ঠিত অর্থ দিয়ে তিনি মধ্য এশিয়ায় সাম্রাজ্য রক্ষা এবং গজনিকে একটি নয়নাভিরাম ও স্থাপত্যসমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত করেন।
  • ২. সামরিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: গজনির পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত পাঞ্জাবের শক্তিশালী হিন্দুশাহী রাজা জয়পাল গজনি সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক হুমকি ছিলেন। নিজের পূর্বাঞ্চলীয় সীমানা নিরাপদ রাখা এবং ভারতীয় রাজাদের সামরিক শক্তি ভেঙে দেওয়াই ছিল তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। তিনি ভারতে কোনো স্থায়ী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চাননি।
  • ৩. ধর্মীয় উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক: অনেক মধ্যযুগীয় মুসলিম ইতিহাসবিদ তাঁকে পৌত্তলিকতা ধ্বংসকারী ‘গাজী’ বা ‘বুতশিকান’ (মূর্তিভঙ্গকারী) হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অন্যদিকে কট্টর হিন্দু ঐতিহাসিকরা তাঁকে ধর্মান্ধ আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করেননি। মন্দির তিনি আক্রমণ করেছিলেন ধর্মের কারণে নয়, বরং মন্দিরগুলো ছিল তৎকালীন ভারতের সবচেয়ে সুরক্ষিত ব্যাংক বা ধনভাণ্ডার। তাঁর নিজের সেনাবাহিনীতে তিলক, সেবান্দরাইয়ের মতো বহু হিন্দু সেনাপতি ও সৈন্য উচ্চপদে আসীন ছিল।

সুলতান মাহমুদের প্রধান প্রধান অভিযানসমূহ

  • ১. প্রথম ও সীমান্ত অভিযান (১০০০ খ্রি.): খাইবার গিরিপথ পার হয়ে পেশোয়ারের নিকটবর্তী সীমান্ত দুর্গগুলো দখল করেন।
  • ২. জয়পালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১০০১ খ্রি.): পেশোয়ারের যুদ্ধে হিন্দুশাহী রাজা জয়পালকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও বন্দি করেন। পরবর্তীতে মুক্তি পেয়ে অপমানে জয়পাল চিতায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
  • ৩. ভেরা ও মুলতান বিজয় (১০০৪—১০০৬ খ্রি.): ভেরার শাসক বাজি রায়কে পরাজিত করেন এবং মুলতানের ইসমাইলি শিয়া শাসক আবুল ফাতাহ দাউদকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন।
  • ৪. আনন্দপালের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত বাহিনীর পরাজয় (১০০৮ খ্রি.): রাজা আনন্দপাল উজ্জয়িনী, গোয়ালিয়র, কনৌজ, দিল্লি ও আজমিরের রাজপুত রাজাদের নিয়ে এক বিশাল যৌথ বাহিনী গঠন করেন। পেশোয়ারের ওয়াইহিন্দের যুদ্ধে মাহমুদ অসাধারণ রণকৌশলে রাজপুতদের হাতির বাহিনীকে পরাজিত করে ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে নেন এবং নগরকোটের কাংড়া দুর্গ থেকে বিপুল ধনরত্ন লাভ করেন।
  • ৫. থানেস্বর ও কনৌজ অভিযান (১০১৪—১০১৮ খ্রি.): প্রাচীন পবিত্র তীর্থক্ষেত্র থানেস্বর এবং গঙ্গা অববাহিকার সমৃদ্ধতম রাজধানী কনৌজ জয় করেন। কনৌজের প্রতিহার রাজা রাজ্যপাল তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
  • ৬. ঐতিহাসিক সোমনাথ মন্দির অভিযান (১০২৫—১০২৬ খ্রি.): এটি ছিল তাঁর ষোড়শ এবং সর্বাধিক বিখ্যাত অভিযান। গুজরাটের কাথিয়াবাড় সমুদ্রোপকূলে অবস্থিত সোমনাথ মন্দিরে তিনি সাহসিকতার সাথে রাজপুতদের তীব্র প্রতিরোধ চূর্ণ করে প্রবেশ করেন। মন্দির থেকে প্রায় দুই কোটি দিনার মূল্যের স্বর্ণমুদ্রা ও রত্নভাণ্ডার হস্তগত করেন।
  • ৭. জাঠদের বিরুদ্ধে শেষ অভিযান (১০২৬ খ্রি.): সোমনাথ থেকে ফেরার পথে সিন্ধুর লবণাক্ত উপত্যকায় যেসব জাঠ উপজাতি তাঁর বাহিনীকে আক্রমণ করেছিল, ১০২৬ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু নদে নৌযুদ্ধে তাদের সম্পূর্ণ দমন করেন।

উপসংহার

সুলতান মাহমুদ ভারতে কোনো স্থায়ী শাসনব্যবস্থা গড়ে না তুললেও পাঞ্জাবকে গজনির সাথে সংযুক্ত করে ভারতীয় প্রতিরক্ষার প্রাচীর চূর্ণ করেছিলেন। তাঁর এই অভিযানই পরবর্তীকালে মুহাম্মদ ঘূরীর মাধ্যমে ভারতে স্থায়ী মুসলিম সালতানাত প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।


৩। মুহাম্মদ ঘূরীর আক্রমণের প্রাক্কালে ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা কর।

ভূমিকা

দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে (১১৯১—১১৯২ খ্রি.) গজনির সুলতান মুইজ্জুদ্দীন মুহাম্মদ বিন সাম (যিনি মুহাম্মদ ঘূরী নামে সমধিক পরিচিত) ভারতে যে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন, তা ভারতের ইতিহাসে স্থায়ী মুসলিম শাসনের শুভ সূচনা করে। তাঁর আক্রমণের প্রাক্কালে তৎকালীন উত্তর ও পশ্চিম ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা ছিল চরম বিশৃঙ্খল, আত্মঘাতী ও দুর্বল।

আক্রমণের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা

  • ১. রাজনৈতিক অনৈক্য ও খণ্ডরাজ্য: এ সময় ভারতে কোনো কেন্দ্রীয় পরাশক্তি ছিল না। সমগ্র উত্তর ভারত অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন ও যুদ্ধপ্রিয় রাজপুত রাজ্যে বিভক্ত ছিল। যেমন—দিল্লি ও আজমিরে চৌহান বংশ, কনৌজে গাহাদবাল (রাঠোর) বংশ, বুন্দেলখণ্ডে চন্দেল্লা বংশ, গুজরাটে চালুক্য (সোলাঙ্কি) বংশ এবং মালবে পারমার বংশ।
  • ২. রাজপুতদের আত্মঘাতী অহমিকা ও গৃহযুদ্ধ: রাজপুত শাসকরা ছিলেন বীরযোদ্ধা; কিন্তু তাদের মধ্যে তীব্র পারস্পরিক হিংসা, শত্রুতা ও আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সংঘাত লেগেই থাকত। বিশেষ করে দিল্লির রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান এবং কনৌজের রাজা জয়চন্দ্রের মধ্যকার তীব্র ব্যক্তিগত শত্রুতা ভারতের জাতীয় প্রতিরক্ষাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। জয়চন্দ্রের কন্যা সংযুক্তাকে পৃথ্বীরাজ স্বয়ংবর সভা থেকে হরণ করায় জয়চন্দ্র চরম শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ঘূরীর আগমনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
  • ৩. জাতীয়তাবোধ ও দূরদর্শিতার অভাব: রাজপুত রাজারা নিজেদের সংকীর্ণ বংশীয় অহংকারকে দেশের নিরাপত্তার চেয়ে বড় মনে করত। ফলে যখন কোনো বহিরাগত শত্রু একজন রাজার ওপর আক্রমণ চালাত, পার্শ্ববর্তী রাজারা শত্রুর প্রতিরোধে এগিয়ে না এসে গোপনে আনন্দ প্রকাশ করত।
  • ৪. যুদ্ধকৌশলের সনাতন পদ্ধতি: ভারতীয় বাহিনী মূলত মন্থরগতির হাতি এবং বিপুল পদাতিক সৈন্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বিপরীতে তুর্কিরা ছিল দ্রুতগামী অশ্বারোহী এবং তীরন্দাজিতে সিদ্ধহস্ত। ফলে রণকৌশলে ভারতীয়রা তুর্কিদের তুলনায় বহু পেছনে ছিল।

আক্রমণের প্রাক্কালে ভারতের সামাজিক অবস্থা

  • ১. কঠোর বর্ণপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্য: হিন্দু সমাজ তখন কঠোর চার বর্ণে (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) বিভক্ত ছিল। সমাজের সিংহভাগ নিম্নবর্ণের শূদ্র ও অন্ত্যজদের চরম ঘৃণা ও অস্পৃশ্যতার চোখে দেখা হতো। তাদের উপাসনালয়ে প্রবেশ বা ধর্মগ্রন্থ পাঠ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। ফলে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের সাথে কোনো আত্মিক সংযোগ অনুভব করত না।
  • ২. নারী জাতির অবক্ষয়: সমাজে নারীদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। বাল্যবিয়ে, বহুবিবাহ, পণপ্রথা এবং স্বামীকে চিতায় পুড়িয়ে মারার অমানবিক ‘সতীদাহ প্রথা’ ও ‘জওহর ব্রত’ সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। নারীদের নিজস্ব কোনো স্বাধীনতা ছিল না।
  • ৩. ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস ও আচারসর্বস্বতা: ধর্মের মূল দর্শন হারিয়ে পৌত্তলিকতা, কুসংস্কার ও পুরোহিতদের একচেটিয়া শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। বহু মন্দিরে ‘দেবদাসী প্রথা’র নামে নৈতিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছিল।

উপসংহার

রাজনৈতিক গৃহবিবাদ এবং সামাজিক বর্ণবাদের কারণে তৎকালীন ভারতীয় সমাজ ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। এই চরম সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক অনৈক্যের সুযোগ নিয়েই মুহাম্মদ ঘূরী ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত করে ভারতে আটশত বছরের মুসলিম শাসনের জয়যাত্রা নিশ্চিত করেন।


৪। দিল্লির মামলুক সুলতানগণের মধ্যে কাকে তুমি শ্রেষ্ঠ বলে মনে কর? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন কর।

ভূমিকা

১২০৬ থেকে ১২৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লি সালতানাত শাসনকারী প্রথম রাজবংশকে ‘মামলুক বংশ’ বা দাস বংশ বলা হয়। এই বংশের উল্লেখযোগ্য সুলতানগণ হলেন কুতুবউদ্দীন আইবেক, শামসুদ্দীন ইলতুতমিশ, সুলতানা রাজিয়া এবং গিয়াসউদ্দীন বলবন। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও প্রশাসনিক দক্ষতার বিচারে আমি সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশকে (শাসনকাল: ১২১১—১২৩৬ খ্রি.) মামলুক সুলতানগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে বিবেচনা করি।

সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশকে শ্রেষ্ঠ শাসক মনে করার যুক্তিসমূহ

  • ১. দিল্লি সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা: কুতুবউদ্দীন আইবেক মাত্র চার বছর লাহোরে বসে শাসন করেন এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করতে পারেননি। ১২১১ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করে ইলতুতমিশ রাজধানী লাহোর থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করেন এবং ধ্বংসোন্মুখ সালতানাতকে সুসংহত করেন। তাই তিনিই দিল্লি সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।
  • ২. শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বী দমন: সিংহাসন লাভের পর তিনি গজনির তাজুদ্দীন ইয়ালদুজকে তরাইনের যুদ্ধে (১২১৫ খ্রি.) পরাজিত ও হত্যা করেন এবং সিন্ধুর নাসিরুদ্দীন কুবাচাকে (১২২৮ খ্রি.) সিন্ধু নদে ডুবিয়ে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়ে সাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমান্ত নিরাপদ করেন। এছাড়া বিদ্রোহী বাংলার শাসক গিয়াসউদ্দীন ইওয়াজ খলজিকে দমন করে বাংলাকে দিল্লির করদ রাজ্যে পরিণত করেন।
  • ৩. মোঙ্গল আক্রমণ থেকে ভারতের রক্ষা (১২২১ খ্রি.): চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল বাহিনী যখন খাওয়ারেজম শাহ জালালউদ্দীন মাংগাবার্নিকে তাড়া করে সিন্ধু সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছিল, তখন জালালউদ্দীন ইলতুতমিশের নিকট রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। ইলতুতমিশ অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে দিল্লির গরম আবহাওয়া সহ্য হবে না অজুহাত দেখিয়ে মিষ্টি ভাষায় আশ্রয় প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলে ভারত মোঙ্গলদের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পায়।
  • ৪. আব্বাসীয় খলিফার ঐতিহাসিক স্বীকৃতি (১২২৯ খ্রি.): ১২২৯ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা আল-মুসতানসির বিল্লাহ ইলতুতমিশকে ‘নাসিরু আমিরুল মুমিনীন’ (বিশ্বাসীগণের নেতার সাহায্যকারী) উপাধিতে ভূষিত করেন এবং খিলাফতের রাজকীয় খেলাত (পোশাক) ও সনদ পাঠান। এর ফলে দিল্লি সালতানাত সমগ্র মুসলিম বিশ্বে প্রথম বৈধ সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করে।
  • ৫. ‘চল্লিশ চক্র’ বা বন্দগান-ই-চিহিলগানের প্রতিষ্ঠা: সাম্রাজ্যকে সুসংহত রাখতে তিনি তাঁর অনুগত চল্লিশজন তুর্কি ক্রীতদাসকে নিয়ে ‘আমিরান-ই-চিহিলগান’ বা চল্লিশ চক্র গঠন করেন, যা ছিল তাঁর প্রশাসনের মূল চালিকাশক্তি।
  • ৬. মুদ্রাব্যবস্থা ও ইকতা পদ্ধতির প্রবর্তন: তিনিই ভারতে সর্বপ্রথম খাঁটি রৌপ্যমুদ্রা ‘টঙ্কা’ (১৭৫ গ্রেন) এবং তাম্রমুদ্রা ‘জিতল’ প্রবর্তন করেন, যা ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত ভারতীয় মুদ্রার ভিত্তি ছিল। সামরিক কর্মকর্তাদের বেতন প্রদানের জন্য তিনি জমি বরাদ্দের ‘ইকতা’ ব্যবস্থা চালু করেন।
  • ৭. স্থাপত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ: কুতুবউদ্দীন আইবেক কর্তৃক অসমাপ্ত ‘কুতুব মিনার’-এর নির্মাণকাজ তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেন এবং দিল্লিতে সুফি সাধক খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকীর স্মৃতিকে চিরভাস্বর করে রাখেন।
  • ৮. সুলতানা রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী মনোনয়ন: পুত্রদের অযোগ্যতা দেখে তিনি মেধার ভিত্তিতে স্বীয় কন্যা রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে মধ্যযুগে এক অনন্য প্রগতিশীল মানসিকতার পরিচয় দেন।

উপসংহার

গিয়াসউদ্দীন বলবন নিঃসন্দেহে কঠোর ও দক্ষ শাসক ছিলেন; কিন্তু ইলতুতমিশ যদি সালতানাতকে টিকে থাকার মতো সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় না করাতেন, তবে বলবনের শাসনই সম্ভব হতো না। অতএব, দূরদর্শিতা, সাম্রাজ্য রক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিবেচনায় শামসুদ্দীন ইলতুতমিশই মামলুক বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সুলতান।


৫। দিল্লি সালতানাতের সংহতির জন্য সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন?

ভূমিকা

১২৬৬ থেকে ১২৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লি সালতানাত শাসনকারী সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন ছিলেন এক দূরদর্শী, লৌহমানব সদৃশ শাসক। ইলতুতমিশের মৃত্যুর পর পরবর্তী ত্রিশ বছরে অযোগ্য শাসক ও উচ্চাভিলাষী তুর্কি আমিরদের ষড়যন্ত্রে দিল্লি সালতানাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল। বলবন কঠোর হাতে অরাজকতা দমন করে সালতানাতের সংহতি ও নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।

সালতানাতের সংহতির জন্য বলবনের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ

১. রাজকীয় মর্যাদা ও দেবত্ব তত্ত্ব (Theory of Kingship)

সুলতানের পদমর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে বলবন ঘোষণা করেন যে সুলতান হলেন ‘জিলিল্লাহ’ (আল্লাহর ছায়া) এবং ‘নিয়াবাতে খোদাই’ (আল্লাহর প্রতিনিধি)। তিনি পারস্যের সাসানীয় রাজদরবারের অনুকরণে চরম রাজকীয় গাম্ভীর্য প্রবর্তন করেন:

  • দরবারে হাসি-ঠাট্টা, মদ্যপান ও সাধারণ মানুষের সাথে মেলামেশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন।
  • সুলতানের সামনে ‘সিজদা’ (নতজানু হয়ে প্রণাম) এবং ‘পাইবোস’ (সুলতানের পদযুগল চুম্বন) প্রথা বাধ্যতামূলক করেন।
  • দরবারে উন্মুক্ত তরবারিধারী বিশাল দেহী কৃষ্ণবর্ণের দেহরক্ষী মোতায়েন করে সবার মনে ত্রাসের সঞ্চার করেন।

২. রক্ত ও লৌহ নীতি (Blood and Iron Policy)

অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহীদের দমনে তিনি চরম কঠোর ‘রক্ত ও লৌহ নীতি’ অনুসরণ করেন:

  • চল্লিশ চক্র ধ্বংস: ইলতুতমিশের গঠিত ‘চল্লিশ চক্র’ (চিহিলগান) সুলতান তৈরির কারিগর হয়ে উঠেছিল। বলবন বিষপ্রয়োগ, নির্বাসন ও প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে এই অহংকারী আমিরদের ক্ষমতা সম্পূর্ণ চূর্ণ করেন।
  • মেওয়াতি ও দোয়াবের দস্যু দমন: দিল্লির উপকণ্ঠে মেওয়াতি ডাকাতরা দিনে-দুপুরে আক্রমণ করত। বলবন দিল্লির জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করেন এবং কয়েক হাজার মেওয়াতিকে হত্যা করে দিল্লিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করেন।
  • বাংলার তুঘরিল খানের বিদ্রোহ দমন: ১২৭৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলার গভর্নর তুঘরিল খান স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বলবন স্বয়ং বাংলায় অভিযান চালান। তুঘরিলকে হত্যা করে লখনৌতির প্রধান বাজারে দুই মাইল দীর্ঘ শূলিতে বিদ্রোহীদের ঝুলিয়ে এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

৩. দক্ষ গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক (বারিদ)

সাম্রাজ্যের প্রতিটি প্রদেশ, শহর ও সেনাবাহিনীতে তিনি বিশ্বস্ত ও সৎ ‘বারিদ’ (গুপ্তচর) নিয়োগ করেন। কোনো গভর্নর বা সেনাপতি সামান্য অন্যায় বা ষড়যন্ত্র করলে দ্রুত সুলতানের কাছে খবর চলে আসত। দায়িত্বে অবহেলার কারণে তিনি বারিদদেরও মৃত্যুদণ্ড দিতে দ্বিধা করতেন না।

৪. মোঙ্গল প্রতিরোধে সুদৃঢ় সীমান্ত দুর্গ ব্যবস্থা

মোঙ্গলদের ভয়াবহ আক্রমণ ঠেকাতে বলবন সাম্রাজ্য বিস্তারের নীতি ত্যাগ করে অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষায় মনোযোগ দেন। তিনি উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে দুর্গের একটি শক্ত প্রাচীর গড়ে তোলেন এবং তাঁর প্রিয় জ্যেষ্ঠ পুত্র যুবরাজ মুহাম্মদ এবং কনিষ্ঠ পুত্র বুগরা খানকে প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দেন। ১২৮৫ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলদের সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে যুবরাজ মুহাম্মদ শহীদ হন, যা বলবনের হৃদয় ভেঙে দেয়।

উপসংহার

বলবনের কঠোর নীতি ও প্রশাসনিক সুসংহতকরণের ফলেই দিল্লি সালতানাত মোঙ্গলদের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পেয়েছিল। তাঁর সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীকালে খলজি ও তুগলক সাম্রাজ্যের গৌরবময় অধ্যায় রচিত হয়েছিল।


৬। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুগলকের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাসমূহ পর্যালোচনা কর।

ভূমিকা

তুগলক বংশের দ্বিতীয় সুলতান মুহাম্মদ বিন তুগলক (শাসনকাল: ১৩২৫—১৩৫১ খ্রি.) ছিলেন মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসের সর্বাধিক আলোচিত, প্রতিভাবান ও বিতর্কিত চরিত্র। তিনি ছিলেন আরবি, ফারসি, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা ও দর্শনের এক অগাধ পণ্ডিত। ঐতিহাসিক এলফিনস্টোন তাঁকে ‘স্ববিরোধী গুণের সমাবেশ’ (A Mixture of Opposites) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর সুদূরপ্রসারী ও উচ্চাভিলাষী পাঁচটি ঐতিহাসিক পরিকল্পনা সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকার কারণে এবং বাস্তবায়ন ত্রুটির ফলে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

মুহাম্মদ বিন তুগলকের পাঁচটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা

  • ১. রাজধানী স্থানান্তর (দিল্লি থেকে দেবগিরি/দৌলতাবাদ, ১৩২৭ খ্রি.):
    • উদ্দেশ্য: উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যবর্তী কেন্দ্রবিন্দু থেকে সমগ্র সাম্রাজ্য শাসন করা এবং দিল্লিকে ঘন ঘন মোঙ্গল আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। তিনি দেবগিরির নাম দেন ‘দৌলতাবাদ’।
    • বাস্তবায়ন ও ব্যর্থতা: তিনি কেবল রাজদরবার নয়, বরং দিল্লির সমগ্র নাগরিক, আলেম ও সুফিদের ৭০০ মাইল দূরবর্তী দৌলতাবাদে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। তীব্র গ্রীষ্মে দীর্ঘ যাত্রাপথে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ মারা যায়। পরে তিনি বুঝতে পারেন দক্ষিণ থেকে উত্তর ভারতের সীমান্ত রক্ষা অসম্ভব, তাই পুনরায় সবাইকে দিল্লিতে ফিরে আসার নির্দেশ দেন। এর ফলে বিপুল অর্থ ও প্রাণের অপচয় ঘটে।
  • ২. প্রতীকী তাম্রমুদ্রা প্রবর্তন (Token Currency, ১৩২৯—১৩৩০ খ্রি.):
    • উদ্দেশ্য: বিশ্বে রৌপ্যের ঘাটতি এবং রাজকীয় কোষাগারের চাহিদা মেটাতে তিনি চীনের কুবলাই খানের কাগজের নোটের অনুকরণে সোনা ও রুপার সমমূল্যমানের ‘তামা ও ব্রোঞ্জের’ প্রতীকী মুদ্রা চালু করেন।
    • ব্যর্থতা: তিনি রাজকীয় টাকশালের মুদ্রার সুরক্ষায় কোনো গোপন চিহ্ন বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করেননি। ফলে সাধারণ মানুষ ঘরে ঘরে কামারশালায় নকল মুদ্রা তৈরি করতে শুরু করে। বাজারে স্বর্ণমুদ্রা বন্ধ হয়ে নকল তাম্রমুদ্রায় সয়লাব হয়ে যায় এবং বৈদেশিক বাণিজ্য অচল হয়ে পড়ে। সুলতান বাধ্য হয়ে সরকারি তহবিল থেকে সোনা-রুপা দিয়ে সমস্ত তামার মুদ্রা কিনে নেন, যা কোষাগারকে শূন্য করে দেয়।
  • ৩. দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধি (১৩২৬ খ্রি.):
    • উদ্দেশ্য: গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী উর্বর ‘দোয়াব’ অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বেশি হওয়ায় তিনি রাজস্ব কর ১০ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করেন।
    • ব্যর্থতা: দুর্ভাগ্যবশত ঠিক সে বছরই দোয়াবে ভয়াবহ খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। রাজস্ব কর্মচারীদের কঠোরতা সহ্য করতে না পেরে কৃষকরা জমি ফেলে জঙ্গলে পালিয়ে যায় এবং বিদ্রোহ দেখা দেয়। পরে সুলতান ঋণ মওকুফ ও কৃষিঋণ (তাকাভী) দিলেও অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
  • ৪. খোরাসান অভিযান পরিকল্পনা: পারস্যের রাজনৈতিক অরাজকতার সুযোগে মধ্য এশিয়ার খোরাসান ও ইরাক বিজয়ের জন্য তিনি ৩,৭০,০০০ সৈন্যের এক সুবিশাল বাহিনী গড়ে তোলেন এবং তাদের এক বছরের অগ্রিম বেতন দেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণ পরিবর্তন হওয়ায় অভিযানটি বাতিল করা হয় এবং বিশাল বাহিনী ভেঙে দেওয়ায় বিপুল অর্থ ক্ষতি হয়।
  • ৫. কারাচিল বা কুমাউন অভিযান: চীন সীমান্তের হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল কুমাউন ও গাড়োয়ালের অবাধ্য উপজাতিদের দমন করতে তিনি সেনাদল পাঠান। প্রাথমিক বিজয়ের পর প্রবল তুষারপাত ও পাহাড়ি গেরিলা হামলায় প্রায় সমগ্র মুসলিম সেনাদল ধ্বংস হয়ে যায়; মাত্র কয়েকজন সৈন্য দিল্লিতে ফিরে দুঃসংবাদ দিতে পেরেছিল।

উপসংহার

মুহাম্মদ বিন তুগলকের পরিকল্পনাগুলো উদ্দেশ্য ও তাত্ত্বিক দিক থেকে ছিল আধুনিক ও যুগান্তকারী; কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি, জনসাধারণের মানসিক অনগ্রসরতা এবং তাঁর নিজস্ব ধৈর্যহীনতা ও কঠোরতার কারণে পরিকল্পনাগুলো ব্যর্থ হয়।


৭। সুলতান আলাউদ্দিন খলজীর মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিবরণ দাও। এই ব্যবস্থা কতটুকু সফল হয়েছিল?

ভূমিকা

খলজি বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সুলতান আলাউদ্দীন খলজী (শাসনকাল: ১২৯৬—১৩১৬ খ্রি.) মধ্যযুগীয় অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসে তাঁর বৈপ্লবিক ‘মূল্য নিয়ন্ত্রণ নীতি’ (Market and Price Control System)-এর জন্য চিরস্মরণীয়। আধুনিক অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যযুগে কোনো সম্রাটের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার এমন সুসংহত ও বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা সমগ্র বিশ্বে দ্বিতীয়টি নেই।

মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য ও কৌশলসমূহ

  • ১. সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য: সুলতান আলাউদ্দীন মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করতে এবং সমগ্র ভারত বিজয় করতে প্রায় পৌনে পাঁচ লক্ষ সৈন্যের এক বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন করেছিলেন। রাজকোষের অতিরিক্ত অপচয় রোধ করে স্বল্প বেতনে সৈনিকদের স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করাই ছিল পণ্যমূল্য সস্তা ও স্থির রাখার মূল লক্ষ্য।
  • ২. পৃথক বাজার স্থাপন: দিল্লির বিভিন্ন পণ্যের জন্য চারটি পৃথক বাজার স্থাপন করা হয়:
    • (ক) খাদ্যশস্যের বাজার (মান্ডি)।
    • (খ) মহার্ঘ্য বস্ত্র, চিনি, ঘি ও শুষ্ক ফলের বাজার (সরাই-ই-আদল)।
    • (গ) ঘোড়া, গবাদিপশু ও দাস-দাসীর বাজার।
    • (ঘ) সাধারণ খুচরা পণ্যের বাজার।
  • ৩. দ্রব্যমূল্যের সরকারি তালিকা ও কঠোর স্থিতিশীলতা: চাল, গম, ডাল, তেল, লবণ থেকে শুরু করে সুঁই-সুতো পর্যন্ত সকল পণ্যের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। যেমন—প্রতি মণ গমের দাম ছিল সাড়ে সাত জিতল, চাল পাঁচ জিতল। সুলতানের পুরো শাসনামলে দুর্ভিক্ষ বা যুদ্ধকালেও এক পয়সাও দাম বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
  • ৪. খাদ্যশস্যের মজুদ ও রেশনিং ব্যবস্থা: জরুরি দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার জন্য তিনি দিল্লিতে বিশাল সরকারি শস্যভাণ্ডার (ওয়্যারহাউস) গড়ে তোলেন। কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত শস্য কিনে মজুদ রাখা হতো এবং দুর্ভিক্ষের সময় মাথাপিছু আধা মণ করে রেশনের ব্যবস্থা ছিল।
  • ৫. দক্ষ বাজার কর্মকর্তা ও গোপন গোয়েন্দা নিয়োগ: বাজারের সার্বিক তদারকির জন্য একজন সৎ ও কঠোর প্রধান নিয়ন্ত্রক ‘শাহনা-ই-মান্ডি’ এবং বাণিজ্য পরিদর্শক ‘দেওয়ান-ই-রিয়াসাত’ নিয়োগ করা হয়। ব্যবসায়ী ও বণিকদের তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক ছিল। সুলতান বাজারের সততা যাচাইয়ের জন্য ছোট ছোট শিশুদের পাঠাতেন; ওজনে এক রতি কম দিলে দোকানদারের শরীর থেকে সমপরিমাণ মাংস কেটে নেওয়ার কঠোর বিধান ছিল।

এই ব্যবস্থা কতটুকু সফল হয়েছিল?

সাফল্য: তৎকালীন ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারানীর মতে, সুলতান আলাউদ্দীনের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলৌকিক বিস্ময়। এর ফলে:

  • সুলতান স্বল্প ব্যয়ে বিশাল সেনাবাহিনী টিকিয়ে রেখে মোঙ্গলদের পরপর ছয়টি বিধ্বংসী আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হন।
  • সাধারণ প্রজা ও দরিদ্র মানুষ অত্যন্ত সস্তায় খেয়ে-পরে শান্তিতে বসবাস করতে পারত।
  • সমগ্র ভারতে ব্যবসা-বাণিজ্যে ওজনে কারচুপি ও মুনাফাখোরি চিরতরে বন্ধ হয়েছিল।

সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি: তবে এই ব্যবস্থাটি মূলত দিল্লি এবং এর আশপাশের সেনাবাহিনীর স্বার্থে বেশি কার্যকর ছিল। কৃষকরা তাদের ফসলের ন্যায্য উদ্বৃত্ত মূল্য পেত না এবং ব্যবসায়ীদের লাভের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছিল। এটি ছিল সুলতানের ব্যক্তিগত ব্যক্তিত্ব ও কঠোর ভয়ের ওপর নির্ভরশীল; তাই ১৩১৬ খ্রিস্টাব্দে আলাউদ্দীনের মৃত্যুর সাথে সাথেই এই কৃত্রিম বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।


৮। সম্রাট আকবরের রাজপুত নীতি সম্পর্কে আলোচনা কর।

ভূমিকা

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা তৃতীয় মুঘল সম্রাট জালালুদ্দীন মুহাম্মদ আকবর (শাসনকাল: ১৫৫৬—১৬০৫ খ্রি.) উপলব্ধি করেছিলেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ যুদ্ধপ্রিয় হিন্দুদের (বিশেষ করে রাজপুতদের) শত্রু বানিয়ে ভারতে একটি স্থায়ী ও নিরাপদ মুসলিম সাম্রাজ্য পরিচালনা অসম্ভব। এই বাস্তবতার আলোকে তিনি ঐতিহ্যগত যুদ্ধনীতির বিপরীতে কূটনৈতিক মৈত্রী, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও উদারতার ওপর ভিত্তি করে এক সুদূরপ্রসারী ‘রাজপুত নীতি’ (Rajput Policy) প্রণয়ন করেন।

আকবরের রাজপুত নীতির মূল উপাদানসমূহ

  • ১. বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন: আকবর যুদ্ধবিগ্রহ পরিহার করে রাজপুত রাজপরিবারগুলোর সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে আত্মিক বন্ধন গড়ে তোলেন। ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দে তিনি অম্বরের (জয়পুর) রাজা বিহারীমলের জ্যেষ্ঠা কন্যা রাজকুমারী হীরা কুনওয়ারিকে (যিনি ইতিহাসে মরিয়ম-উজ-জামানী বা যোধাবাঈ নামে খ্যাত) বিবাহ করেন। পরবর্তীতে তিনি বিকানীর ও জয়সলমীরের রাজকন্যাদেরও বিবাহ করেন। এই বিবাহের শর্ত ছিল রাজকন্যারা নিজ প্রাসাদে পূর্ণ হিন্দু ধর্মীয় রীতি পালন করতে পারবেন, কাউকে ধর্মান্তরিত করা হবে না। আকবরের পুত্র জাহাঙ্গীরের জন্ম এই রাজপুত রানীর গর্ভেই হয়েছিল।
  • ২. সাম্রাজ্যের উচ্চপদে রাজপুতদের নিয়োগ: আকবর কোনো ভেদাভেদ না রেখে রাজপুত বীর ও শাসকদের মুঘল সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পদে আসীন করেন। রাজা বিহারীমলের পুত্র রাজা ভগবান দাস এবং পৌত্র রাজা মানসিংহ মুঘল সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি (সাত হাজারী মনসবদার) নিযুক্ত হন। মানসিংহ মুঘলদের পক্ষে কাবুল থেকে বাংলা পর্যন্ত বীরত্বের সাথে বিজয় অভিযান পরিচালনা করেন। এছাড়া রাজা টোডরমলকে মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থমন্ত্রী (দেওয়ান) নিযুক্ত করা হয়।
  • ৩. অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন ও রাজকীয় সম্মান: যে সমস্ত রাজপুত রাজ্য মুঘলদের বশ্যতা স্বীকার করেছিল, আকবর তাদের অভ্যন্তরীণ শাসনকাজে কোনো হস্তক্ষেপ করেননি; তাদের নিজ রাজ্যে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেন এবং নিয়মিত মনসব ও রাজকীয় উপাধিতে ভূষিত করেন।
  • ৪. ধর্মীয় বৈষম্যমূলক কর প্রত্যাহার: রাজপুত তথা হিন্দু প্রজাদের মন জয় করতে আকবর ১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে তীর্থযাত্রী কর এবং ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে অমুসলিমদের ওপর আরোপিত দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক ‘জিজিয়া কর’ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করেন।
  • ৫. অবাধ্যদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান: মেওয়ারের বীর শিশোদিয়া রাজপুত বংশ মুঘলদের বশ্যতা অস্বীকার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে আকবর মেওয়ারের রাজধানী চিতোর দুর্গ অবরোধ ও জয় করেন। পরবর্তীতে মেওয়ারের মহান বীর রানা প্রতাপের বিরুদ্ধে ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহাসিক ‘হলদিঘাটের যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়। রানা প্রতাপ আমৃত্যু পাহাড়ে থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যান কিন্তু কখনোই আকবরের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি।

উপসংহার

আকবরের দূরদর্শী রাজপুত নীতি মুঘল সাম্রাজ্যের জন্য এক আশীর্বাদ প্রমাণিত হয়েছিল। রাজপুতদের রক্ত ও তলোয়ারই পরবর্তী এক শতাব্দী ধরে মুঘল সাম্রাজ্যকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেছে এবং সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তরকে সুদৃঢ় করেছে।


৯। সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের প্রধান ঘটনাবলি সংক্ষেপে আলোচনা কর।

ভূমিকা

১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে পিতা আকবরের মৃত্যুর পর যুবরাজ সেলিম ‘নুরুদ্দীন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশা গাজী’ উপাধি ধারণ করে মুঘল সিংহাসনে আরোহণ করেন (শাসনকাল: ১৬০৫—১৬২৭ খ্রি.)। তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণতা, শিল্পকলার প্রতি গভীর অনুরাগ এবং মেধা ও আবেগের এক মিশ্র ব্যক্তিত্ব।

জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের প্রধান প্রধান ঘটনাবলি

  • ১. বারোটি রাজকীয় ফরমান ও ন্যায়বিচারের জিঞ্জির (Zanjir-i-Adl): সিংহাসনে আরোহণের পরপরই তিনি প্রজাকল্যাণে ১২টি অনুশাসন জারি করেন; যার মধ্যে মাদকদ্রব্য নিষিদ্ধকরণ, অন্যায় কর বাতিল এবং বন্দিমুক্তি উল্লেখযোগ্য। সাধারণ মানুষের সরাসরি ন্যায়বিচারের জন্য তিনি আগ্রা দুর্গের শাহবুরুজ থেকে যমুনা নদীর তীর পর্যন্ত ৬০টি ঘণ্টা সম্বলিত একটি দীর্ঘ স্বর্ণের ন্যায়বিচারের শিকল ঝুলিয়ে দেন, যা টেনে যে কেউ খলিফাকে অভিযোগ জানাতে পারত।
  • ২. জ্যেষ্ঠ পুত্র খসরুর বিদ্রোহ (১৬০৬ খ্রি.): জাহাঙ্গীরের ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তাঁর জনপ্রিয় পুত্র যুবরাজ খসরু লাহোরে বিদ্রোহ করেন। জাহাঙ্গীর কঠোর হস্তে ভাইরোয়ালের যুদ্ধে খসরুকে পরাজিত ও বন্দি করেন। খসরুকে আশ্রয় ও আশীর্বাদ দেওয়ার অপরাধে শিখদের পঞ্চম গুরু অর্জুন দেবকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়, যা শিখ-মুঘল দীর্ঘমেয়াদী শত্রুতার সূচনা করে।
  • ৩. মেওয়ারের দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অবসান (১৬১৫ খ্রি.): আকবর যে মেওয়ার পুরোপুরি পদানত করতে পারেননি, জাহাঙ্গীরের পুত্র যুবরাজ খুররম (শাহজাহান) মেওয়ারের রানা অমর সিংহকে (রানা প্রতাপের পুত্র) পরাজিত করে মুঘলদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন। জাহাঙ্গীর অমর সিংহের প্রতি অত্যন্ত উদার ব্যবহার করে সম্মানজনক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন।
  • ৪. বাংলায় বারো ভূঁইয়াদের দমন ও ঢাকা রাজধানী স্থাপন: জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বাংলার সুবাদার ইসলাম খান চিশতি বাংলার স্বাধীনচেতা বারো ভূঁইয়াদের (ঈসা খাঁ ও মুসা খাঁর বংশধরদের) সম্পূর্ণরূপে দমন করেন এবং ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকাকে সুবাহ বাংলার রাজধানী করে এর নাম দেন ‘জাহাঙ্গীরনগর’।
  • ৫. সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের উত্থান (১৬১১ খ্রি.): ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে বিধবা মেহেরুন্নেসাকে (নূরজাহান) বিবাহের পর জাহাঙ্গীরের জীবনে এক অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটে। নূরজাহান ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী, বুদ্ধিমতী ও রাজনৈতিক দূরদর্শী। শেষ পনেরো বছর খিলাফতের প্রকৃত কর্তৃত্ব চলে যায় নূরজাহানের হাতে; এমনকি তাঁর নামে মুদ্রা জারি করা হতো।
  • ৬. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমন: জাহাঙ্গীরের রাজদরবারেই সর্বপ্রথম ব্রিটিশ রাজা প্রথম জেমসের দূত হিসেবে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হকিন্স (১৬০৮ খ্রি.) এবং স্যার টমাস রো (১৬১৫ খ্রি.) আগমন করেন। টমাস রো ভারতে ব্রিটিশদের জন্য সুরাটে কারখানা স্থাপন ও বাণিজ্য শুল্ক মওকুফের অনুমতি লাভ করেন, যা ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশের বীজ বপন করে।
  • ৭. কাংড়া দুর্গ ও কান্দাহার হাতছাড়া: ১৬২০ সালে তিনি পাঞ্জাবের অজেয় কাংড়া দুর্গ জয় করেন। তবে ১৬২২ সালে পারস্যের শাহ আব্বাস মুঘলদের হাত থেকে কৌশলগত কান্দাহার শহরটি দখল করে নেন।

উপসংহার

সম্রাট জাহাঙ্গীর ছিলেন মুঘল চিত্রকলা ও উদ্যানবিদ্যার শ্রেষ্ঠ সমঝদার। কাশ্মীরের শালিমার বাগ ও নিশাত বাগ তাঁর অমর শিল্পকীর্তি। ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে কাশ্মীর থেকে ফেরার পথে তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং লাহোরের শাহদরায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।


১০। টীকা লেখ (যে কোনো দুটি):

(ক) কুতুব মিনার

দিল্লির মেহরাউলিতে অবস্থিত ‘কুতুব মিনার’ ভারতের মুসলিম স্থাপত্যকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রাচীনতম বিস্ময়। ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লি সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দীন আইবেক প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহ.)-এর পুণ্য স্মৃতি এবং মুহাম্মদ ঘূরীর ভারত বিজয়ের স্মারক মিনার হিসেবে এর নির্মাণকাজ শুরু করেন। আইবেক কেবল মিনারের প্রথম তলা নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর উত্তরসূরি সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশ আরও তিনটি তলা নির্মাণ করে মিনারটি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক এর ওপর মার্বেল পাথরের আরও দুটি ক্ষুদ্র তলা সংযোজন করেন। ৭২.৫ মিটার (২৩৮ ফুট) উচ্চতাবিশিষ্ট এবং পাঁচ তলাবিশিষ্ট লাল বেলেপাথরের এই মিনারের গায়ে পবিত্র কুরআনের চমৎকার ক্যালিগ্রাফি খোদাই করা রয়েছে। এটি ইউনেস্কো ঘোষিত একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।

(খ) সুলতানা রাজিয়া

সুলতানা রাজিয়া (শাসনকাল: ১২৩৬—১২৪০ খ্রি.) ছিলেন মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষ এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের প্রথম মহিলা শাসক। পিতা সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশ পুত্রদের অযোগ্যতা ও বিলাসিতা দেখে স্বীয় বুদ্ধিমতী ও অসীম সাহসী কন্যা রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন। রক্ষণশীল সমাজ ও তুর্কি আমিরদের ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিল্লির মসনদে বসেন। তিনি পর্দাপ্রথা বর্জন করে পুরুষের মতো শিরস্ত্রাণ ও জোব্বা পরিধান করে রাজদরবারে বসতেন এবং হাতির পিঠে চড়ে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। তিনি ছিলেন বিচক্ষণ, ন্যায়পরায়ণ ও প্রজাবৎসল। কিন্তু তুর্কি আমিররা একজন নারীর কর্তৃত্ব সহ্য করতে না পেরে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ভাতিন্ডার গভর্নর আলতুনিয়া বিদ্রোহ করলে রাজিয়া তা দমনে যান এবং পরবর্তীতে কৌশলগত কারণে আলতুনিয়াকে বিবাহ করেন। কিন্তু ১২৪০ খ্রিস্টাব্দে ভাই বাহরাম শাহের সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

(গ) শের শাহ

শের শাহ সূরী (১৪৮৬—১৫৪৫ খ্রি.) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান প্রশাসক ও সংস্কারক। বিহারের এক সামান্য জায়গিরদারের পুত্র ফরিদ খাঁ থেকে নিজের অসীম বীরত্বে বাঘ হত্যা করে তিনি ‘শের খাঁ’ উপাধি পান। ১৫৩৯ সালে চৌসা এবং ১৫৪০ সালে কনৌজের (বিলগ্রাম) যুদ্ধে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে তিনি দিল্লিতে দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্য (সূরী বংশ) প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র পাঁচ বছরের শাসনামলে (১৫৪০—১৫৪৫ খ্রি.) তিনি ভারতীয় প্রশাসনে বৈপ্লবিক সংস্কার সাধন করেন। তিনি সোনারগাঁও থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত ৩,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশ্ববিখ্যাত ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’ (সড়ক-ই-আযম) নির্মাণ করেন। ঘোড়ার ডাক ব্যবস্থা, সরাইখানা, ছায়াদার বৃক্ষরোপণ, পাট্টা ও কবুলিয়ত পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষকের জমির মালিকানা নিশ্চিতকরণ এবং খাঁটি রৌপ্যমুদ্রা ‘রুপিয়া’ (যা বর্তমান রুপি ও টাকার ভিত্তি) প্রবর্তন করেন। ১৫৪৫ সালে কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধকালে বারুদ বিস্ফোরণে এই মহান বীরের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

(ঘ) সম্রাট শাহজাহান

মুঘল সম্রাট শাহজাহান (শাসনকাল: ১৬২৮—১৬৫৮ খ্রি.) ছিলেন মুঘল স্বর্ণযুগের শ্রেষ্ঠ রূপকার। তাঁর ৩০ বছরের শাসনামলকে ‘মুঘল স্থাপত্যকলার স্বর্ণযুগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তাঁর অমর কীর্তি হলো প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মরণে যমুনা নদীর তীরে শ্বেতপাথরে নির্মিত বিশ্বের অন্যতম সপ্তাশ্চর্য ‘তাজমহল’। এছাড়া দিল্লির লাল কেল্লা, জামে মসজিদ, দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস, ময়ূর সিংহাসন এবং কোহিনূর হীরক তাঁর রাজত্বকালের রাজকীয় ঐশ্বর্যের পরিচয় বহন করে। তিনি সাম্রাজ্যে শান্তি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শেষ জীবনে পুত্র আওরঙ্গজেবের সাথে উত্তরাধিকার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি জীবনের শেষ আট বছর আগ্রা দুর্গে বন্দি অবস্থায় তাজমহলের দিকে তাকিয়ে থেকে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফাযিল ৩য় বর্ষের ৪১৪ কোডের পরীক্ষায় সফলতার চাবিকাঠি কী?

মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়, সুলতান মাহমুদ ও ঘূরীর ভারত অভিযান, দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠা (ইলতুতমিশ ও বলবন) এবং মুঘল সাম্রাজ্যের নীতিসমূহ (আকবর ও জাহাঙ্গীর) পয়েন্টভিত্তিক সুবিন্যস্ত করা।

২. মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ফলাফল কোনটি?

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ইসলামের স্থায়ী প্রবেশ এবং ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান (গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসা) অনুবাদ ও আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে ছড়িয়ে পড়া।

৩. সুলতান মাহমুদ মোট কতবার ভারত অভিযান পরিচালনা করেছিলেন?

১০০০ থেকে ১০২৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সুলতান মাহমুদ মোট ১৭ বার ভারতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং কোনোটিতেই তিনি পরাজিত হননি।

৪. তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী ছিল?

১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে মুহাম্মদ ঘূরী দিল্লির রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত করেন, যার ফলে ভারতে স্থায়ী মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়।

৫. আলাউদ্দীন খলজী কেন মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন?

মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করতে ও রাজ্য বিস্তার করতে গঠিত বিশাল সেনাবাহিনীর ব্যয়ভার স্বল্প বেতনে নির্বাহ করার সুবিধার্থে নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল দ্রব্যের মূল্য তিনি কমিয়ে স্থির রেখেছিলেন।

৬. সম্রাট আকবরের রাজপুত নীতির মূল দর্শন কী ছিল?

যুদ্ধ ও শত্রুতার বদলে বৈবাহিক সম্পর্ক, উচ্চ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ ও ধর্মীয় সহনশীলতার মাধ্যমে যুদ্ধপ্রিয় রাজপুতদের মুঘল সাম্রাজ্যের বিশ্বস্ত অংশীদারে পরিণত করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *