মুসলমানদের ইতিহাস (৭৫০—১২৫৮) আব্বাসীয় এবং আঞ্চলিক রাজবংশসমূহ (History of the Muslims 750-1258) – 205102, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
৪৬ মিনিট পড়ার সময়
১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৩০
ফাজিল স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
[History of the Muslims (750—1258) The Abbasids and the Regional Dynasties]
[মুসলমানদের ইতিহাস (৭৫০—১২৫৮) আব্বাসীয় এবং আঞ্চলিক রাজবংশসমূহ]
বিষয় কোড: ২০৫১০২
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক বিভাগ থেকে ৪টি এবং খ বিভাগ থেকে ২টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]


ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)

১। আবুল আব্বাস আস-সাফফাহর অবদানের বিশেষ উল্লেখপূর্বক আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার পটভূমি পর্যালোচনা কর।

[Review the background of the establishment of the Abbasid Khilafat with special reference to the contribution of Abul Abbas as-Saffa.]

ভূমিকা

৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে দামেস্কের উমাইয়া খিলাফতের পতনের মধ্য দিয়ে মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু দামেস্ক থেকে ইরাকে স্থানান্তরিত হয় এবং মহানবি (সা.)-এর পিতৃব্য হযরত আব্বাস (রা.)-এর বংশধরদের নেতৃত্বে ‘আব্বাসীয় খিলাফত’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই রাজবংশের প্রথম খলিফা ছিলেন আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহ আস-সাফফাহ (শাসনকাল: ৭৫০—৭৫৪ খ্রি.)। একটি গোপন বিপ্লবী আন্দোলনকে সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে সার্বভৌম সাম্রাজ্যে রূপান্তরে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার পটভূমি

  • ১. উমাইয়াদের অপশাসন ও গণঅসন্তোষ: কারবালার ট্র্যাজেডি, মদিনা আক্রমণ (হাররার যুদ্ধ) এবং কা’বা শরিফে অগ্নিসংযোগের কারণে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অন্তরে উমাইয়াদের প্রতি গভীর ক্ষোভ ছিল।
  • ২. মাওয়ালীদের বৈষম্য ও বিদ্রোহ: অনারব মুসলিমদের (বিশেষ করে পারসিকদের) ওপর অন্যায় কর ও সামাজিক অসম্মান উমাইয়া সাম্রাজ্যের প্রাচীরকে ফাঁপা করে দিয়েছিল।
  • ৩. গোপন প্রচার আন্দোলন (দাওয়া): মুহাম্মদ বিন আলী এবং ইমাম ইব্রাহিমের নেতৃত্বে আল-হুমায়মাহকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে আব্বাসীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়। তারা ‘আল-রেজা মিন আলে মুহাম্মদ’ (নবি পরিবারের উপযুক্ত ব্যক্তির শাসন) স্লোগান দিয়ে শিয়া ও সাধারণ মুসলমানদের সহানুভূতি অর্জন করে।
  • ৪. আবু মুসলিম খোরাসানীর সামরিক অভ্যুত্থান: ৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে আবু মুসলিম খোরাসানের মার্ভে কালো পতাকা উড়িয়ে উমাইয়া বাহিনীকে বিতাড়িত করেন এবং অল্প সময়ে পারস্য অধিকার করেন।

আবুল আব্বাস আস-সাফফাহর অবদান

  • খলিফা হিসেবে অভিষেক ও ঐতিহাসিক ভাষণ (৭৪৯ খ্রি.): কুফা বিজয়ের পর ১৩২ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে কুফার জামে মসজিদে আবুল আব্বাস খলিফা হিসেবে শপথ নেন। সেখানে তিনি নিজেকে ‘আস-সাফফাহ’ (রক্তপাতকারী বা ন্যায়বিচারের রক্ষক) ঘোষণা করে উমাইয়াদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
  • জাবের যুদ্ধে উমাইয়াদের সমূলে বিনাশ (৭৫০ খ্রি.): আস-সাফফাহর চাচা আব্দুল্লাহ বিন আলীর নেতৃত্বে আব্বাসীয় বাহিনী জাবের যুদ্ধে খলিফা মারওয়ান-২-কে পরাজিত করে দামেস্ক দখল করে।
  • উমাইয়া শক্তির নির্মম বিনাশ: নাহার আবি ফুতরুসে ভোজসভায় ৮০ জন উমাইয়া নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে তিনি উমাইয়াদের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের সমস্ত সম্ভাবনা চিরতরে নস্যাৎ করেন।
  • রাজধানী স্থাপন ও প্রশাসনের সূচনা: তিনি আনবারে অস্থায়ী রাজধানী ‘হাশিমিয়্যাহ’ স্থাপন করে একটি মিশ্র আরব-ফারসি কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সূচনা করেন।

উপসংহার

আস-সাফফাহ ছিলেন মূলত এক নির্দয় যোদ্ধা ও সাম্রাজ্যের উদ্বোধক। উমাইয়াদের বিনাশে তিনি যে চরম কঠোরতা দেখিয়েছিলেন, তার ফলেই আব্বাসীয় খিলাফত কোনো বড় ধরনের তাৎক্ষণিক পাল্টা অভ্যুত্থান ছাড়াই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পেরেছিল।


২। খলিফা হারুন-অর-রশীদ ইতিহাসে এত বিখ্যাত কেন তা আলোচনা কর।

[Discuss why is Khalifa Harun-or-Rashid is so famous in history.]

ভূমিকা

আব্বাসীয় খিলাফতের পঞ্চম খলিফা হারুন-অর-রশীদ (শাসনকাল: ৭৮৬—৮০৯ খ্রি.) বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বলতম শাসক। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ইতিহাসে তিনি প্রবাদপ্রতিম ন্যায়পরায়ণতা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং সাম্রাজ্যের অগাধ বৈভবের কারণে চিরভাস্বর হয়ে আছেন। তাঁর যুগকে ইসলামি সভ্যতার ‘স্বর্ণযুগ’ (Golden Age) বলে অভিহিত করা হয়।

ইতিহাসে হারুন-অর-রশীদের বিখ্যাত হওয়ার কারণসমূহ

  • ১. বাগদাদের জাঁকজমক ও সমৃদ্ধি: তাঁর আমলে রাজধানী বাগদাদ ছিল ধনসম্পদ, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিশ্ব রাজধানী। টাইগ্রিস নদীর তীরে জাহাজ ও বণিকদের ভিড় লেগেই থাকত। বিশ্বখ্যাত আরবি লোকগাথা ‘আলিফ লায়লা ওয়া লায়লা’ (এক হাজার এক রাত)-এর গল্পগুলোতে হারুন-অর-রশীদের দরবারের ঐশ্বর্য অমর হয়ে রয়েছে।
  • ২. জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যের অনন্য পৃষ্ঠপোষকতা: তিনি ছিলেন প্রখ্যাত পণ্ডিত ও কবিদের পৃষ্ঠপোষক। তিনি বাগদাদে ‘বায়তুল হিকমাহ’ বা জ্ঞানভবন প্রতিষ্ঠার সূচনা করেন। ইমাম আবু ইউসুফকে তিনি ‘কাজীউল কুজাত’ (প্রধান বিচারপতি) নিয়োগ করেন এবং তাঁর অনুরোধেই বিখ্যাত রাজস্ব আইনগ্রন্থ ‘কিতাবুল খারাজ’ রচিত হয়।
  • ৩. প্রজাবৎসলতা ও ছদ্মবেশে রাতের টহল: তিনি রাতে সাধারণ নাগরিকের ছদ্মবেশে বাগদাদের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতেন প্রজাদের প্রকৃত দুঃখ-কষ্ট নিজের চোখে দেখার জন্য। তিনি প্রায় প্রতি বছর হজ ও জিহাদ পালন করতেন।
  • ৪. আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বৈশ্বিক প্রভাব:
    • শার্লামেনের সাথে মিত্রতা: পবিত্র রোমান সম্রাট শার্লামেনের সাথে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দূত বিনিময় হয়। তিনি শার্লামেনকে একটি অলৌকিক পিতলের জলঘড়ি উপহার পাঠিয়ে ইউরোপের রাজদরবারকে তাক লাগিয়ে দেন।
    • বাইজেন্টাইনদের দর্প চূর্ণ: রোমান সম্রাট নাইসিফোরাস বাৎসরিক কর বন্ধ করে দিলে হারুন তাঁকে এক ঐতিহাসিক চিঠি লেখেন: “বিশ্বাসীগণের নেতা হারুনের পক্ষ থেকে রোমের কুকুর নাইসিফোরাসের প্রতি: আমি তোমার পত্র পড়েছি, এর উত্তর তুমি কানে শুনবে না, নিজের চোখে দেখবে।” এরপর তিনি সৈন্য নিয়ে এশিয়া মাইনর আক্রমণ করে নাইসিফোরাসকে চরম অপমানজনক শর্তে অতিরিক্ত কর দিতে বাধ্য করেন।
  • ৫. মানবিক সেবা ও হাসপাতাল নির্মাণ: বাগদাদে তিনি তৎকালীন বিশ্বের প্রথম আধুনিক মানসিক ও সাধারণ হাসপাতাল নির্মাণ করেন, যেখানে রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও খাদ্য প্রদান করা হতো।

উপসংহার

হারুন-অর-রশীদ ছিলেন একাধারে সুশাসক, ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিত্ব এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের মহান পৃষ্ঠপোষক। তাঁর গৌরবময় নেতৃত্বই মুসলিম সভ্যতাকে বিশ্বমঞ্চে অপরাজেয় মর্যাদায় আসীন করেছিল।


৩। আব্বাসীয় খিলাফতের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার বিবরণ দাও।

[Narrate the central administrative system of the Abbasid Khilafat.]

ভূমিকা

আব্বাসীয় খিলাফতের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা ছিল খাঁটি পারসিক ও ইসলামি প্রশাসনিক কাঠামোর এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। উমাইয়াদের আরবকেন্দ্রিক স্বৈরাচারী শাসন থেকে সরে এসে আব্বাসীয়রা প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র এবং ওয়াজির বা প্রধানমন্ত্রীর ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল কেন্দ্রীয় প্রশাসন গড়ে তুলেছিল।

কেন্দ্রীয় প্রশাসনের প্রধান অঙ্গসমূহ

  • ১. খলিফা (The Caliph): খলিফা ছিলেন সাম্রাজ্যের সর্বময় আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অধিকারী। উমাইয়া খলিফারা নিজেদের ‘আল্লাহর খলিফা’ বললেও আব্বাসীয়রা নিজেদের ‘রাসুলুল্লাহর প্রতিনিধি’ ও শরিয়তের অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপন করতেন। তবে বাস্তবে তিনি ছিলেন একজন পরম ক্ষমতাধর রাজা।
  • ২. ওয়াজির বা প্রধানমন্ত্রী (The Wazir): আব্বাসীয়দের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশাসনিক সংযোজন ছিল পারসিক আদলে ‘উজির’ পদের সৃষ্টি। উজির ছিলেন খলিফার প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও নির্বাহী প্রধান। উজির দুই প্রকার ছিল:
    • উজিরুত তাফবিদ (পূর্ণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত উজির): খলিফার পক্ষে প্রায় সকল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী (যেমন: বার্মাকীরা)।
    • উজিরুত তানফিজ (বাস্তবায়নকারী উজির): কেবল খলিফার আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষমতাপ্রাপ্ত।
  • ৩. প্রধান দেওয়ান বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়সমূহ:
    • দেওয়ানুল আজিজ (দেওয়ানুল জাইশ): সামরিক বাহিনী, বেতনভাতা ও অস্ত্রাগারের হিসাব রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রধান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
    • দেওয়ানুল খারাজ: সাম্রাজ্যের সামগ্রিক রাজস্ব, কর ও ভূমিস্বত্বের প্রধান অর্থ মন্ত্রণালয়।
    • দেওয়ানুর রাসাইল (ইনশা): খলিফার রাজকীয় ফরমান, চিঠিপত্র ও কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা সংক্রান্ত সচিবালয়।
    • দেওয়ানুল বারিদ: অত্যন্ত দক্ষ ডাক ও তথ্য যোগাযোগ বিভাগ। প্রতিটি প্রদেশের খবরাখবর এবং গভর্নরের গোপন কার্যক্রম খলিফাকে অবহিত করা বারিদের প্রধান কাজ ছিল।
    • দেওয়ানুল মাজালিম: সর্বোচ্চ আপিল আদালত বা প্রশাসনিক আদালত, যেখানে সাধারণ প্রজা উচ্চপদস্থ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করতে পারত। খলিফা বা প্রধান উজির স্বয়ং এই আদালতের প্রধান হতেন।
  • ৪. কাজীউল কুজাত (প্রধান বিচারপতি): বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রূপ দেওয়া হয়। খলিফা আল-মাহদীর আমলে প্রধান বিচারপতির পদ সৃষ্টি হয় এবং ইমাম আবু ইউসুফকে প্রথম কাজীউল কুজাত নিয়োগ করা হয়।

উপসংহার

আব্বাসীয়দের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা এতটাই আধুনিক ও কার্যক্ষম ছিল যে সমসাময়িক বাইজেন্টাইন ও রোমান সাম্রাজ্যের আমলাতন্ত্রের চেয়েও তা ছিল অনেক বেশি শৃঙ্খলিত ও প্রাতিষ্ঠানিক।


৪। ক্রুসেড কী? ক্রুসেডের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।

[What is crusade? Discuss the causes and results of the crusade.]

ভূমিকা ও ক্রুসেডের সংজ্ঞা

১০৯৫ থেকে ১২৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় দুই শতাব্দীব্যাপী মুসলমানদের হাত থেকে পবিত্র ভূমি জেরুজালেম এবং বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে রোমান পোপের উদাত্ত আহ্বানে ইউরোপের সম্মিলিত খ্রিষ্টান শক্তি মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে যে রক্তক্ষয়ী ধারাবাহিক ধর্মযুদ্ধ পরিচালনা করে, তাকে ‘ক্রুসেড’ (Crusade) বা ধর্মযুদ্ধ বলা হয়। খ্রিষ্টান যোদ্ধারা তাদের পোশাকে ও পতাকায় ক্রুশ (Cross) চিহ্ন ব্যবহার করত বলে এ যুদ্ধের নাম ক্রুসেড।

ক্রুসেডের প্রধান কারণসমূহ

  • ১. ধর্মীয় উন্মাদনা ও জেরুজালেম উদ্ধার: খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস ছিল জেরুজালেমের চার্চ অব দ্য হলি সেপালকারে যিশুখ্রিস্টের সমাধি রয়েছে। ১০৯৫ সালে পোপ আরবান-২ এক ঐতিহাসিক সম্মেলনে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ‘পবিত্র কর্তব্য’ ঘোষণা করেন এবং ঘোষণা দেন যে এ যুদ্ধে অংশ নিলে সকল পাপ মোচন হবে।
  • ২. সেলজুক তুর্কিদের ক্রমবর্ধমান বিস্তার: ১০৭১ সালে মানজিকার্টের যুদ্ধে সেলজুক সুলতান আল্প আরসালান বাইজেন্টাইন সম্রাটকে পরাজিত করে কনস্টান্টিনোপলের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যান। ভীত হয়ে রোমান সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কম্নেনাস পোপের কাছে সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করেন।
  • ৩. ইউরোপের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও সামন্তবাদ: তৎকালীন ইউরোপে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দুর্ভিক্ষ এবং সামন্ত প্রভুদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছিল। প্রাচ্যের বিপুল ধনসম্পদ ও উর্বর জমি দখলের লোভ ক্রুসেডারদের উৎসাহিত করে।

ক্রুসেডের ফলাফল ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব

  • ১. জেরুজালেম পুনর্দখল ও সালাহুদ্দীনের মহত্ত্ব: প্রথম ক্রুসেডে (১০৯৯ খ্রি.) খ্রিষ্টানরা জেরুজালেম দখল করে ৭০,০০০ মুসলিম ও ইহুদিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। কিন্তু ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহাসিক হিত্তিনের যুদ্ধে খ্রিষ্টান বাহিনীকে সম্পূর্ণ চূর্ণ করে মহান সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী জেরুজালেম মুক্ত করেন এবং কোনো রক্তপাত না করে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে এক নজিরবিহীন মানবিকতার ইতিহাস রচনা করেন।
  • ২. ইউরোপীয় রেনেসাঁসের পথ উন্মোচন: ক্রুসেডের সবচেয়ে বড় ফল লাভ করেছিল খ্রিষ্টান ইউরোপ। মুসলিম বিশ্বের উন্নত বিজ্ঞান, চিকিৎসা, গণিত, কাগজ তৈরির প্রযুক্তি, সমুদ্রযাত্রা এবং গ্রিক দর্শনের সাথে পরিচিত হয়ে ইউরোপ তার অন্ধকার মধ্যযুগ থেকে আলোকময় রেনেসাঁস বা নবজাগরণের যুগে প্রবেশ করে।
  • ৩. ইউরোপীয় সামন্তবাদের অবসান: শত শত সামন্ত প্রভু ও নাইট ক্রুসেডের যুদ্ধে মারা যাওয়ায় ইউরোপে সামন্তবাদের পতন ঘটে এবং শক্তিশালী জাতীয় রাজতন্ত্র গড়ে ওঠে।
  • ৪. মুসলিমদের সাময়িক অর্থনৈতিক ক্ষতি ও অনৈক্য: দীর্ঘ দুই শতাব্দীর যুদ্ধে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের শহরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে প্রতিরক্ষার নতুন চেতনা জাগ্রত হয়।

৫। বুয়াইয়ারা কারা? তাদের উত্থান-পতনের ইতিহাস লেখ।

[Who are the Buwaihids? Write their history of rise and downfall.]

বুয়াইয়াদের পরিচয় ও উত্থান

বুয়াইয়াহ (বা বুওয়াইহিদ) রাজবংশ ছিল উত্তর পারস্যের কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী দাইলাম অঞ্চলের একটি শিয়া মতাবলম্বী পারসিক যাযাবর পরিবার। এদের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আবু শুজা বুওয়াইহ। তাঁর তিন সুযোগ্য পুত্র—আলী (ইমাদ উদ-দৌলা), হাসান (রুকন উদ-দৌলা) এবং আহমদ (মুইজ উদ-দৌলা) নিজেদের অসামান্য সামরিক যোগ্যতার বলে পারস্যের ফার্স, ইস্পাহান ও রে অঞ্চল জয় করে ৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে একটি শক্তিশালী রাজবংশের ভিত্তি স্থাপন করেন।

বাগদাদ অধিকার ও খিলাফতের নিয়ন্ত্রণ (৯৪৫ খ্রি.)

৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে আহমদ মুইজ উদ-দৌলা বাগদাদে প্রবেশ করেন। অসহায় আব্বাসীয় খলিফা আল-মুস্তাকফি বাধ্য হয়ে আহমদকে ‘আমিরুল উমারা’ (প্রধান সেনাপতি ও রাজকীয় অভিভাবক) পদে ভূষিত করেন। এর মাধ্যমে পরবর্তী দীর্ঘ এক শতাব্দীকাল (৯৪৫—১০৫৫ খ্রি.) আব্বাসীয় খলিফাগণ শিয়া বুয়াইয়াদের সম্পূর্ণ পুতুল শাসকে পরিণত হন। খলিফাকে সামান্য বাৎসরিক ভাতা দেওয়া হতো এবং খলিফা নিয়োগ ও বরখাস্ত পর্যন্ত বুয়াইয়াদের ইচ্ছায় হতো। দরবারে মহররমের মাতম ও গাদিরে খুমের শিয়া উৎসব রাষ্ট্রীয়ভাবে চালু হয়। তবে আজুদ উদ-দৌলার (শাসনকাল: ৯৪৯—৯৮৩ খ্রি.) আমলে বাগদাদে ‘বিমারিস্তান’ (হাসপাতাল), গ্রন্থাগার ও বহু কল্যাণমূলক স্থাপনা নির্মিত হয়।

বুয়াইয়াদের পতন (১০৫৫ খ্রি.)

আজুদ উদ-দৌলার মৃত্যুর পর ভাইদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ, সেনাবাহিনীর তুর্কি ও কুর্দি সৈন্যদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং প্রজাদের অসন্তোষের কারণে বুয়াইয়াহ শক্তি ভেঙে পড়ে। অবশেষে ১০৫৫ খ্রিষ্টাব্দে সেলজুক নেতা তুঘরিল বেগ বাগদাদ আক্রমণ করে শেষ বুয়াইয়াহ আমির আল-মালিকুর রহিমকে বন্দি করেন এবং বুয়াইয়াহ শাসনের চূড়ান্ত অবসান ঘটিয়ে খলিফাকে মুক্ত করেন।


৬। যে অবস্থার প্রেক্ষিতে আব্বাসীয় খিলাফতের অবসান হয় তা বিশ্লেষণ কর।

[Analyze the circumstances that led to the overthrow of the Abbasid Khilafat.]

ভূমিকা

৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বাগদাদের গৌরবময় আব্বাসীয় খিলাফত দীর্ঘ পাঁচশত আট বছর টিকে থাকার পর ৬৫৬ হিজরি / ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে মোঙ্গল নেতা হালাকু খানের ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। শেষ খলিফা আল-মুসতাসিম বিল্লাহর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড কেবল একটি রাজবংশের পতন ছিল না, এটি ছিল ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে শোচনীয় ট্র্যাজেডি।

খিলাফতের অবসানের পটভূমি ও মূল কারণসমূহ

  • ১. খলিফাদের চারিত্রিক দুর্বলতা ও অদূরদর্শিতা: শেষ খলিফা আল-মুসতাসিম ছিলেন দুর্বলচিত্ত, আরামপ্রিয় ও অদূরদর্শী। মোঙ্গলদের মতো ভয়াবহ আগ্রাসনের মুখেও তিনি কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন।
  • ২. শিয়া-সুন্নি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও উজিরের বিশ্বাসঘাতকতা: বাগদাদে কারখ এলাকার শিয়া এবং সুন্নিদের মধ্যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘাত বাঁধে। খলিফার শিয়া উজির ইবনুল আলকামি এই অপমানে প্রতিশোধ নিতে গোপনে হালাকু খানের সাথে আঁতাত করেন এবং খলিফাকে ভুল বুঝিয়ে বাগদাদের সামরিক বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় ও অর্ধেক সৈন্য বরখাস্ত করান।
  • ৩. মোঙ্গল শক্তির বর্বর ধ্বংসযজ্ঞ (১২৫৮ খ্রি.): চেঙ্গিস খানের পৌত্র হালাকু খান প্রায় ২ লাখ দুর্ধর্ষ মোঙ্গল সেনা নিয়ে বাগদাদ অবরোধ করেন। খলিফা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। হালাকু খান খলিফাকে একটি গালিচায় মুড়িয়ে ঘোড়ার খুরের নিচে পিষ্ট করে নির্মমভাবে হত্যা করেন, যাতে খলিফার রক্ত মাটিতে না পড়ে।
  • ৪. বাগদাদ নগরীর নির্মম ধ্বংস ও গণহত্যার বিভীষিকা: মোঙ্গলরা টানা চল্লিশ দিন ধরে বাগদাদে বর্বর গণহত্যা ও লুণ্ঠন চালায়। প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ নিরীহ নাগরিককে হত্যা করা হয়। বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থাগার বায়তুল হিকমার সমস্ত পাণ্ডুলিপি ও বই টাইগ্রিস নদীতে ফেলে দেওয়া হয়, ফলে রক্তের রঙে লাল এবং কালির রঙে নদীর পানি কালো হয়ে গিয়েছিল।

উপসংহার

১২৫৮ সালে বাগদাদের ধ্বংস ছিল এক অপূরণীয় ঐতিহাসিক ক্ষতি। তবে খিলাফত ধ্বংস হলেও ইসলামি সংস্কৃতি নিঃশেষ হয়নি; পরবর্তীতে সেই বর্বর মোঙ্গলরাই ক্রমান্বয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ইসলামের খেদমতে নিজেদের উৎসর্গ করেছিল।


৭। নিজাম উল-মুলক তুসির রাষ্ট্র দর্শন ব্যাখ্যা কর।

[Explain the political philosophy of Nizam ul-Mulk Tusi.]

ভূমিকা ও গ্রন্থ পরিচিতি

সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রধান উজির আবু আলী হাসান বিন আলী নিজামুল মূলক তুসী (১০১৮—১০৯২ খ্রি.) কেবল একজন সফল প্রশাসকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন মধ্যযুগীয় মুসলিম রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাত্ত্বিক। সুলতান মালিক শাহের অনুরোধে তিনি ফারসি ভাষায় তাঁর বিখ্যাত রাষ্ট্রদর্শন বিষয়ক গ্রন্থ ‘সিয়ারুল মুলুক’ বা ‘সিয়াসতনামা’ (Rules for Kings) রচনা করেন।

তুসির রাষ্ট্রদর্শনের প্রধান দিকসমূহ

  • ১. ন্যায়বিচারই রাষ্ট্রের ভিত্তি: তুসি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন: “একটি সাম্রাজ্য কুফর বা অবিশ্বাসের ওপর টিকে থাকতে পারে, কিন্তু তা অবিচার ও অত্যাচারের ওপর কখনো টিকে থাকতে পারে না।” ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা শাসকের প্রথম ও প্রধান ধর্মীয় দায়িত্ব।
  • ২. রাজতন্ত্রের ঐশী উৎস ও দায়িত্ব: শাসককে আল্লাহ তায়ালা প্রজাদের কল্যাণের জন্যই মনোনীত করেন। কিন্তু এটি কোনো স্বৈরতান্ত্রিক অধিকার নয়; পরকালে শাসককে প্রতিটি প্রজার অধিকারের জন্য আল্লাহর দরবারে পুঙ্খানুপুঙ্খ জবাবদিহি করতে হবে।
  • ৩. শক্তিশালী সমন্বিত গোয়েন্দা ব্যবস্থা (বারিদ): সাম্রাজ্যের দুর্নীতিবাজ গভর্নর ও লোভী কাজীদের নজরদারিতে রাখতে প্রতিটি অঞ্চলে নিরপেক্ষ ও খোদাভীরু গুপ্তচর নিযুক্ত করার ওপর তিনি জোর দেন, যাতে প্রজাদের ওপর কোনো অবিচার গোপন না থাকে।
  • ৪. প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও আদর্শিক প্রতিরক্ষা: চরমপন্থী ইসমাইলি হাশাশিং বা বাতেনি মতবাদ মোকাবিলার জন্য তিনি সামরিক শক্তির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা (নেজামিয়া মাদ্রাসা)-র মাধ্যমে সঠিক সুন্নি আকিদা প্রতিষ্ঠার রাষ্ট্রীয় দর্শন তুলে ধরেন।

৮। ইদ্রিসীয় রাজবংশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লেখ।

[Write briefly the history of Idrisid dynasty.]

প্রতিষ্ঠার পটভূমি

৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার কাছে ফাখ-এর যুদ্ধে আব্বাসীয় খলিফা আল-হাদীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে ইমাম হাসানের প্রপৌত্র ইদ্রিস বিন আব্দুল্লাহ গোপনে মরক্কোতে পালিয়ে যান। সেখানে স্থানীয় বারবার গোত্রগুলো তাঁর বংশমর্যাদা ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নেতা মেনে নেয় এবং ৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকায় প্রথম স্বাধীন আলীয় বা জাইদি শিয়া রাজবংশ ‘ইদ্রিসীয় বংশ’ (Idrisid Dynasty: ৭৮৮—৯৭৪ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করে।

ঐতিহাসিক কীর্তি ও পতন

তাঁর সুযোগ্য পুত্র দ্বিতীয় ইদ্রিস এই বংশের প্রকৃত স্থপতি ছিলেন। তিনি ৮০৮ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহাসিক ফেজ (Fez) নগরী প্রতিষ্ঠা করেন এবং মরক্কোর বর্বর বারবারদের ইসলামি তাহজিবে সুসংহত করেন। এই বংশের আমলেই ফেজে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীনতম ‘আল-কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়’ (University of al-Qarawiyyin) প্রতিষ্ঠিত হয়। দশম শতাব্দীতে স্পেনের উমাইয়া এবং মিশরের ফাতেমীয়দের চতুর্মুখী চাপে ৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ইদ্রিসীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।


খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)

৯। আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠায় আবু মুসলিম খোরাসানীর ভূমিকা পর্যালোচনা কর।

[Review Abu Muslim Khorasani’s role to the establishment of the Abbasid Khilafat.]

ভূমিকা ও সামরিক সাফল্য

আবু মুসলিম খোরাসানী ছিলেন আব্বাসীয় বিপ্লবের মূল সামরিক নায়ক ও রাজনৈতিক সংগঠক। ৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে মার্ভে আব্বাসীয়দের কালো পতাকা উড়িয়ে তিনি পারস্যের নির্যাতিত মাওয়ালী ও আরবদের উমাইয়াদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি একের পর এক যুদ্ধে উমাইয়া গভর্নরদের বিতাড়িত করে মার্ভ, নিশাপুর ও খোরাসান জয় করেন এবং ইরাকে আব্বাসীয় বাহিনী পাঠিয়ে কুফায় খিলাফত প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা রাখেন। অবশেষে ৭৫০ সালে জাবের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে উমাইয়া বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে আব্বাসীয় খিলাফতের পথ সুগম করেন।


১০। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নে খলিফা আল-মামুনের কৃতিত্ব আলোচনা কর।

[Discuss the contribution of Khalifa Al Mamun to the development of Science and Knowledges.]

জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগ

সপ্তম আব্বাসীয় খলিফা আব্দুল্লাহ আল-মামুন (শাসনকাল: ৮১৩—৮৩৩ খ্রি.) ছিলেন জ্ঞানচর্চার শ্রেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। ৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাগদাদে প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞান একাডেমি ও অনুবাদ কেন্দ্র ‘বায়তুল হিকমাহ’ (House of Wisdom)। তিনি গ্রিক, ফারসি, সংস্কৃত ও সিরীয় ভাষার সমস্ত মূল্যবান চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও দর্শনের গ্রন্থ আরবিতে অনুবাদ করার ব্যবস্থা করেন এবং অনুবাদকদের স্বর্ণ দিয়ে পুরস্কৃত করতেন। তাঁর দরবারে বিশ্বখ্যাত গণিতবিদ আল-খোয়ারিজমি (বীজগণিতের জনক), আল-কিন্দি এবং বনু মুসা ভাইয়েরা গবেষণা পরিচালনা করেন। তিনি পৃথিবীর পরিধি মাপার জন্য বৈজ্ঞানিক অভিযান প্রেরণ করেন।


১১। সেলজুক সুলতান মালিক শাহের পরিচয় দাও।

[Introduce Seljuk Sultan Malik Shah.]

পরিচিতি ও সাম্রাজ্য বিস্তার

সুলতান জালালুদ্দৌলা মালিক শাহ (শাসনকাল: ১০৭২—১০৯২ খ্রি.) ছিলেন সেলজুক সাম্রাজ্যের তৃতীয় এবং সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও গৌরবময় সুলতান। পিতা আল্প আরসালানের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর বিজ্ঞ উজির নিজামুল মূলক তুসির সহায়তায় সাম্রাজ্যকে চীন সীমান্ত থেকে ভূমধ্যসাগর এবং সিরিয়া থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। তাঁর আমলে রাজ্যে শতভাগ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় গণিতবিদ ওমর খৈয়াম নিখুঁত ‘জালালি বর্ষপঞ্জি’ আবিষ্কার করেন এবং ইস্পাহানে মানমন্দির গড়ে ওঠে।


১২। ১২৫৮ সালে বাগদাদ ধ্বংসের ফলাফল আলোচনা কর।

[Discuss the results of the destruction of Baghdad in 1258 AD.]

ধ্বংসের সুদূরপ্রসারী ফলাফল

  • ১. খিলাফতের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক সমাপ্তি: বাগদাদ ধ্বংসের মাধ্যমে মুসলিম জাহানের ৫০০ বছরের একক কেন্দ্রীয় খিলাফত ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং মুসলিম বিশ্ব আঞ্চলিক সালতানাতগুলোতে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
  • ২. বিশ্ব সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক বিপর্যয়: বাগদাদের শতাব্দীপ্রাচীন লাইব্রেরি, বিজ্ঞানাগার এবং অমূল্য বৈজ্ঞানিক পাণ্ডুলিপি ধ্বংস হওয়ায় মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রা শতাব্দীর জন্য পিছিয়ে যায়।
  • ৩. কায়রোতে নামমাত্র খিলাফতের স্থানান্তর: মামলুক সুলতান বাইবার্স ১২৬১ সালে বেঁচে যাওয়া এক আব্বাসীয় শাহজাদাকে কায়রোতে এনে নামমাত্র আধ্যাত্মিক খলিফা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ‘মুসলমানদের ইতিহাস (৭৫০—১২৫৮)’ কোর্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনটি?

আব্বাসীয় খিলাফতের সুবর্ণ যুগের অর্জনসমূহ, বায়তুল হিকমাহর বিজ্ঞান চর্চা, উজির নিজামুল মূলকের রাষ্ট্রদর্শন, সেলজুকদের উত্থান এবং ১২৫৮ সালে হালাকু খানের বাগদাদ ধ্বংসের ইতিহাস সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।

২. বায়তুল হিকমাহ (House of Wisdom) কী ছিল?

খলিফা আল-মামুন কর্তৃক ৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম সমন্বিত অনুবাদ কেন্দ্র, বিজ্ঞান গবেষণাগার ও রাজকীয় পাবলিক লাইব্রেরি, যা মধ্যযুগীয় বিজ্ঞান বিপ্লবের মূল কেন্দ্র ছিল।

৩. ক্রুসেডে সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর বিজয়ের মূল রহস্য কী ছিল?

তাঁর উন্নত সামরিক রণকৌশল (হিত্তিনের যুদ্ধ), মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং শত্রুর প্রতি নজিরবিহীন ক্ষমা ও মানবিক সহনশীলতা প্রদর্শনই ছিল তাঁর বিজয়ের চাবিকাঠি।

৪. আব্বাসীয় কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায় ‘ওয়াজির’ পদের গুরুত্ব কেমন ছিল?

ওয়াজির বা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খলিফার পরেই সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শক্তিশালী ব্যক্তি; তিনি দেওয়ানসমূহের নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং খলিফার পক্ষে সমগ্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতেন।

৫. নিজামুল মূলক তুসির বিখ্যাত গ্রন্থের নাম কী এবং এর মূল বিষয়বস্তু কী?

গ্রন্থটির নাম ‘সিয়াসতনামা’ বা ‘সিয়ারুল মুলুক’। এটি সুশাসন, রাজার দায়িত্ব, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং দক্ষ গোয়েন্দা নজরদারি সংক্রান্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক ক্লাসিক নির্দেশিকা।

৬. ২০৫১০২ বিষয়ের পরীক্ষায় ভালো উত্তরের মূল শর্ত কী?

যথাযথ কালানুক্রম ও সাল-তারিখ রক্ষা করা, আব্বাসীয় রাজবংশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা এবং ঐতিহাসিক প্রমাণসহ উত্তর গুছিয়ে লেখা।