ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ৩য় পত্র (Islamic History and Culture 3rd Paper) – 415, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাযিল পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
৬১ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা – ২০২৩
বিষয়: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ৩য় পত্র (বিষয় কোড: ৪১৫)
[মুসলিম বাংলার ইতিহাস (১২০৪ থেকে ১৭৫৭ পর্যন্ত)]
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩-এর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ৩য় পত্র (বিষয় কোড: ৪১৫) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রি ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, ঐতিহাসিক তথ্য, যুদ্ধ ও প্রশাসনিক সংস্কার, বিশ্লেষণী ছক এবং ফলাফল সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।

কন্টেন্ট তালিকা / প্রশ্নসূচি

  1. ১। মুসলিম বাংলার ইতিহাসের উৎসসমূহ পর্যালোচনা কর।
  2. ২। বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।
  3. ৩। শাসক হিসেবে সুলতান ইলিয়াস শাহকে মূল্যায়ন কর।
  4. ৪। সোনারগাঁও এর স্বাধীন সুলতান হিসেবে ফখর-উদ-দীন মোবারক শাহের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
  5. ৫। রাজা গণেশ কে ছিলেন? বাংলার সমকালীন রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা নিরূপণ কর।
  6. ৬। বাংলার কররানী বংশের উত্থান ও পতনের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
  7. ৭। বাংলার বার ভূঁইয়াদের সম্পর্কে আলোচনা কর।
  8. ৮। বাংলায় আফগান শাসন প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লেখ।
  9. ৯। সুলতানী বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার বিবরণ দাও।
  10. ১০। পলাশীর যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল বর্ণনা কর।

প্রশ্নোত্তর ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান

১। মুসলিম বাংলার ইতিহাসের উৎসসমূহ পর্যালোচনা কর।

ভূমিকা:
মধ্যযুগীয় মুসলিম বাংলার ইতিহাস (১২০৪-১৭৫৭ খ্রি.) বিনির্মাণে ঐতিহাসিক উপাদান ও উৎসসমূহ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভৌগোলিক দূরত্ব, নদীমাতৃক প্রতিকূল জলবায়ু এবং স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার কারণে প্রাচীন বহু পাণ্ডুলিপি নষ্ট হলেও মুসলিম ঐতিহাসিকদের ধারাবাহিক রচনা, বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্ত, সমকালীন বাংলা সাহিত্য, মুদ্রা ও শিলালিপির এক সুবিশাল ভাণ্ডার আজও সংরক্ষিত রয়েছে। এগুলোর বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণের মাধ্যমেই সুলতানি ও মুঘল বাংলার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস পুনর্গঠন সম্ভব হয়েছে।

১. প্রধান প্রধান ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক উৎসসমূহ:

উৎস ও গ্রন্থের নাম লেখক বা রচয়িতা ঐতিহাসিক তথ্য ও গুরুত্ব
১. তবকাত-ই-নাসিরী (طبقات ناصري) মিনহাজ-ই-সিরাজ জুযজানী (১২৬০ খ্রি.) ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের একমাত্র প্রত্যক্ষ ও সমকালীন প্রামাণ্য ফারসি দলিল।
২. কিতাবুর রেহলা (তুহফাতুন নুযযার) ইবনে বতুতা (মরক্কোর বিশ্বপর্যটক) ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতান ফখর-উদ-দীন মোবারক শাহের আমলে বাংলায় আগমন। বাংলার অফুরন্ত খাদ্যশস্য, অতি সস্তা দ্রব্যমূল্য এবং হযরত শাহজালাল (র)-এর সাক্ষাতের প্রামাণ্য বিবরণ।
৩. তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী জিয়াউদ্দীন বারানী ও শামস-ই-সিরাজ আফিফ সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ ও সিকান্দার শাহের বিরুদ্ধে দিল্লির সুলতান ফিরোজ তুগলকের একডালা দুর্গ অবরোধের বিশদ ইতিহাস।
৪. রিয়াজুস সালাতীন (رياض السلاطين) গোলাম হোসেন সলিম জায়েদপুরী (১৭৮৮ খ্রি.) মুসলিম বাংলার শুরু থেকে পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত সমগ্র মধ্যযুগের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও সুসংহত প্রথম ফারসি ইতিহাসগ্রন্থ।
৫. আকবরনামা ও আইন-ই-আকবরী আবুল ফজল আল্লামী মুঘল সম্রাট আকবর কর্তৃক বাংলা বিজয়, সুবা বাংলা গঠন এবং বার ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক যুদ্ধের রাজকীয় বিবরণ।
৬. বাহারিস্তান-ই-গায়বী মির্জা নাথান (মুঘল সেনাপতি) সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সুবাদার ইসলাম খান চিশতী কর্তৃক বার ভূঁইয়াদের দমন এবং ঢাকা নগরী প্রতিষ্ঠার প্রত্যক্ষ সামরিক ডায়েরি।

২. মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ও শিলালিপি:
– ইউসুফ-জোলেখা ও শ্রীকৃষ্ণবিজয়: শাহ মুহম্মদ সগীর, চণ্ডীদাস ও মালাধর বসুর কাব্যে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ও আলাউদ্দিন হোসেন শাহের ধর্মীয় উদারতা ও সাহিত্য পৃষ্ঠপোষকতার প্রমাণ মেলে।
– মুদ্রাতত্ত্ব (Numismatics): বাংলার সুলতানরা স্বাধীন মুদ্রা চালু করতেন। মুদ্রার খোদাইকৃত সন, টাকশালের নাম (যেমন লাখনৌতি, সোনারগাঁও, ফিরোজাবাদ) এবং সুলতানের উপাধি (যেমন ‘সুলতানুল মুআযযম’) বাংলার সঠিক রাজনৈতিক ভূগোল নির্ধারণে সহায়তা করে।

উপসংহার:
মুসলিম বাংলার ইতিহাসের উপাদানসমূহ প্রমাণ করে যে মধ্যযুগে বাংলা কখনোই দিল্লির নিছক অধীনস্থ করদ রাজ্য ছিল না; বরং সমৃদ্ধ অর্থনীতি, স্বাধীন সুলতানি শাসন এবং সাংস্কৃতিক সমন্বয়বাদের এক অনন্য ভূস্বর্গ ছিল।

২। বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।

ভূমিকা:
ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির নদীয়া ও বাংলা বিজয় বাঙালি জাতির ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা যুগান্তকারী বাঁক পরিবর্তনকারী ঘটনা। এই বিজয়ের মাধ্যমেই বাংলায় দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ শত বছরের মুসলিম শাসনের গৌরবোজ্জ্বল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। সেন রাজাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী শোষণ, বর্ণাশ্রম প্রথা এবং রাজনৈতিক অনৈক্যের পটভূমিতে মাত্র আঠারো জন অশ্বারোহী নিয়ে বখতিয়ারের নদীয়া বিজয় বিশ্ব সামরিক ইতিহাসের এক পরম বিস্ময়।

১. বখতিয়ারের প্রাথমিক জীবন ও বাংলা অভিযানের পটভূমি:
আফগানিস্তানের গরমসিরের খলজি বংশের সন্তান ছিলেন বখতিয়ার। খাটো শারীরিক গঠন ও লম্বা হাতের কারণে গজনী ও দিল্লিতে চাকরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। অবশেষে অযোধ্যার শাসক হুসামুদ্দীনের অধীনে মির্জাপুর অঞ্চলে ভগবত ও ভিউলী পরগনার জায়গীর লাভ করেন। সেখান থেকে তিনি বিহার আক্রমণ করে ওদন্তপুরী ও নালন্দা বৌদ্ধবিহার অধিকার করেন। বিহার বিজয়ের পর ১২০৪ সালে তিনি বাংলার সেন বংশের শেষ শক্তিশালী রাজা লক্ষণ সেনের শীতকালীন রাজধানী নদীয়া অভিমুখে ঐতিহাসিক অভিযান পরিচালনা করেন।

২. নদীয়া বিজয় ও পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ:

অভিযানের পর্যায় ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য
১. ঝাড়খণ্ডের অরণ্য পথ অতিক্রম প্রধান তেলিয়াগড় গিরিপথ এড়িয়ে দুর্গম জঙ্গল দিয়ে এত দ্রুত অগ্রসর হন যে মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী তাঁর সাথে নদীয়ার প্রাসাদে পৌঁছায়। শত্রুপক্ষকে অপ্রস্তুত অবস্থায় চমকে দেওয়ার নিখুঁত সমরকৌশল (Surprise Attack)।
২. ঘোড়া বিক্রেতার ছদ্মবেশ ও নদীয়া পতন প্রাসাদরক্ষীরা তুর্কি বাহিনীকে সাধারণ ঘোড়া ব্যবসায়ী মনে করেছিল। বখতিয়ার আকস্মিক তরবারি বের করে আক্রমণ চালালে মধ্যাহ্নভোজে রত রাজা লক্ষণ সেন পেছনের গোপন নদীপথে বিক্রমপুরে পালিয়ে যান। বিনা রক্তপাতে নদীয়া মুসলিমদের অধিকারে আসে।
৩. লাখনৌতিতে রাজধানী স্থাপন নদীয়ায় স্থায়ী না হয়ে বখতিয়ার উত্তর বাংলার গৌড় বা লাখনৌতি (লক্ষণাবতী) অধিকার করে সেখানে মুসলিম বাংলার প্রথম রাজধানী স্থাপন করেন। ভৌগোলিক ও সামরিকভাবে সুরক্ষিত প্রশাসনিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা।
৪. তিব্বত অভিযান ও মর্মান্তিক পরিণতি (১২০৬ খ্রি.) তুর্কিস্তানের সাথে বাণিজ্যপথ খোলার উদ্দেশ্যে তিব্বত অভিযান চালান; কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও বিষাক্ত নদীতে সেতু ধ্বংসের ফলে অভিযান ব্যর্থ হয়। ভগ্নহৃদয়ে দেবকোটে ফিরে আলী মর্দান খলজি কর্তৃক তিনি নিহত হন। মুসলিম বাংলার প্রথম মহান দিগ্বিজয়ীর করুণ পরিসমাপ্তি।

৩. বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের সুদূরপ্রসারী ফলাফল:
– সামাজিক সাম্য ও মানবমুক্তি: সেন আমলে বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের অন্ত্যজ হিন্দুদের ওপর যে কঠোর সামাজিক নিপীড়ন চলত, বখতিয়ারের বিজয়ের পর সুফী-দরবেশদের আগমনে তারা সাম্য ও মুক্তির নতুন দিগন্ত লাভ করে।
– মসজিদ, মাদ্রাসা ও জনকল্যাণ: মিনহাজের বর্ণনামতে, বখতিয়ার বিজিত অঞ্চলের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মসজিদ, মাদ্রাসা ও মুসাফিরখানা নির্মাণ করে প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করেন।

উপসংহার:
বখতিয়ার খলজি নিছক একজন লুটেরা সেনাপতি ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলার মাটিতে সাম্য, ইনসাফ ও মুক্তবুদ্ধির এক নতুন সভ্যতার স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর পথ ধরেই পরবর্তীকালে স্বাধীন সুলতানি বাংলার স্বর্ণযুগ উন্মোচিত হয়েছিল।

৩। শাসক হিসেবে সুলতান ইলিয়াস শাহকে মূল্যায়ন কর।

ভূমিকা:
শামসুদ্দীন আবুল মুজাফফর ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৮ খ্রি.) ছিলেন মুসলিম বাংলার ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতীয়তাবাদী ও দূরদর্শী সুলতান। তিনিই বাংলার খণ্ডিত রাজনৈতিক ভূগোলকে (রাঢ়, বরেন্দ্র, বঙ্গ) একত্রিত করে সর্বপ্রথম একটি অখণ্ড স্বাধীন ‘বাঙ্গালাহ’ রাষ্ট্রের রূপরেখা দান করেন। তিনি নিজেকে কেবল মুসলিমদের নেতা হিসেবে নয়, বরং ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ (বাংলার বাদশাহ) এবং ‘সুলতান-ই-বাঙালিয়ান’ (বাঙালিদের সুলতান) হিসেবে ঘোষণা করেন। দিল্লির তুগলক সাম্রাজ্যের সর্বগ্রাসী আগ্রাসন রুখে দিয়ে তিনি বাংলার স্বাধীনতাকে স্থায়ী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

১. ইলিয়াস শাহের সিংহাসন লাভ ও বাংলা একত্রীকরণ:
১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে লাখনৌতির শাসক আলাউদ্দিন আলী শাহকে পরাজিত করে ইলিয়াস শাহ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তখন বাংলা লাখনৌতি, সাতগাঁও এবং সোনারগাঁও—এই তিন স্বাধীন খণ্ডে বিভক্ত ছিল। ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে তিনি সোনারগাঁওয়ের ইখতিয়ার উদ্দিন গাজী শাহকে পরাজিত করে সমগ্র বাংলাকে একক কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে এনে ‘ইলিয়াস শাহী বংশ’ প্রতিষ্ঠা করেন।

২. শাসক ও জাতীয় বীর হিসেবে ইলিয়াস শাহের ঐতিহাসিক কৃতিত্বসমূহ:

কৃতিত্বের ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট রূপ ও ঐতিহাসিক নজির
১. ‘বাঙ্গালাহ’ ও ‘বাঙালি’ পরিচয়ের জনক ঐতিহাসিক শামস-ই-সিরাজ আফিফের মতে, ইলিয়াস শাহই প্রথম সমগ্র ভূখণ্ডের নাম দেন ‘বাঙ্গালাহ’ এবং এখানকার অধিবাসীদের দেন ‘বাঙালি’ জাতীয় পরিচয়।
২. একডালা দুর্গ ও দিল্লির আক্রমণ প্রতিহত (১৩৫৩-৫৪ খ্রি.) দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে বাংলা আক্রমণ করলে ইলিয়াস শাহ জলবেষ্টিত দুর্ভেদ্য ‘একডালা দুর্গে’ আশ্রয় নেন। বর্ষার বন্যা ও বাঙালির গেরিলা প্রতিরোধের মুখে ফিরোজ তুগলক সন্ধি করে দিল্লি ফিরে যেতে বাধ্য হন।
৩. বহিঃসাম্রাজ্য বিস্তার (উড়িষ্যা, নেপাল ও আসাম) তিনি উড়িষ্যার জাজনগরের গঙ্গ রাজাকে পরাজিত করে বহু হস্তী উপহার পান। নেপালের তরাই অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে কাঠমান্ডু পর্যন্ত বাংলার সামরিক প্রভাব বিস্তার করেন।
৪. হিন্দু-মুসলিম সামাজিক সম্প্রীতি তিনি প্রশাসনে স্থানীয় হিন্দুদের উচ্চপদে নিয়োগ দেন এবং ধর্মীয় বৈষম্য দূর করে এক সমন্বিত বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপন করেন।
৫. জনকল্যাণ ও স্থাপত্য পাণ্ডুয়ায় সুদৃশ্য জামে মসজিদ নির্মাণ, হাজীপুর নগর প্রতিষ্ঠা এবং সুফি সাধক শেখ আলাউল হকের খানকাহর পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

৩. স্বাধীনতা ও সার্বভৌমিকতার স্থায়ী স্বীকৃতি:
ইলিয়াস শাহের দৃঢ়তার ফলেই দিল্লি সালতানাত বাধ্য হয়ে বাংলাকে একটি স্বাধীন ও সমমর্যাদাপূর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দান করে।

উপসংহার:
সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবোধের আদি স্থপতি। তিনি যদি চতুর্দশ শতকে বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ না করতেন, তবে আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্তিত্ব কল্পনা করা কঠিন হতো।

৪। সোনারগাঁও এর স্বাধীন সুলতান হিসেবে ফখর-উদ-দীন মোবারক শাহের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।

ভূমিকা:
সুলতান ফখর-উদ-দীন মোবারক শাহ (১৩৩৮-১৩৪৯ খ্রি.) ছিলেন মুসলিম বাংলার ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিকপাল। তিনি সোনারগাঁওয়ের স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা করে দিল্লির দাসত্ব থেকে বাংলার দীর্ঘ দুইশত বছরের গৌরবান্বিত ‘স্বাধীন সুলতানি যুগ’ (১৩৩৮-১৫৩৮ খ্রি.)-এর ঐতিহাসিক শুভসূচনা করেছিলেন। দিল্লির উন্মাদ সুলতান মুহাম্মদ বিন তুগলকের দূরবর্তী দুর্বলতার সুযোগে ফখর-উদ-দীন মোবারক শাহ প্রথম স্বাধীনভাবে নিজের নামে মুদ্রা জারি করেন এবং স্বাধীন বাংলার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনেন।

১. ক্ষমতায় আরোহণ ও স্বাধীনতার ঘোষণা:
ফখর-উদ-দীন ছিলেন সোনারগাঁওয়ের তুগলক গভর্নর বাহরাম খানের বিশ্বস্ত সিলাহদার (অস্ত্রাগার রক্ষক)। ১৩৩৮ সালে বাহরাম খানের মৃত্যুর পর দিল্লির আনুষ্ঠানিক নির্দেশের অপেক্ষা না করে তিনি নিজেকে সোনারগাঁওয়ের স্বাধীন সুলতান ঘোষণা করেন। দিল্লির নির্দেশে লাখনৌতির কদর খান ও সাতগাঁওয়ের ইজ্জউদ্দীন তাঁকে দমন করতে এলে তিনি বর্ষাকালে তাঁদের নৌযুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও নিহত করেন।

২. শাসক হিসেবে ফখর-উদ-দীন মোবারক শাহের অনন্য কৃতিত্বসমূহ:

কৃতিত্বের ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট রূপ ও ঐতিহাসিক নজির
১. চট্টগ্রাম বিজয় ও নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠা ১৩৪০ সালে তিনি সর্বপ্রথম দুর্গম চট্টগ্রাম অঞ্চল জয় করে মুসলিম বাংলার সীমানাভুক্ত করেন। আরাকানীদের জলদস্যুতা দমনে তিনি এক শক্তিশালী নৌবাহিনী (নৌবহর) গড়ে তোলেন।
২. মেগা ট্রাঙ্ক রোড নির্মাণ তিনি চাঁদপুর ও কুমিল্লা হয়ে রাজধানী সোনারগাঁও থেকে বিজিত চট্টগ্রাম পর্যন্ত এক সুবিশাল বাঁধের মতো রাজপথ নির্মাণ করেন, যা বর্ষাকালেও সৈন্য ও বণিকদের চলাচলের উপযোগী ছিল।
৩. মসজিদ ও সরাইখানা নির্মাণ চট্টগ্রামে একটি মনোরম মসজিদ নির্মাণ করেন এবং পথচারীদের জন্য স্থানে স্থানে বিনামূল্যে লঙ্গরখানা ও সরাইখানা প্রতিষ্ঠা করেন।
৪. ইবনে বতুতার ঐতিহাসিক সাক্ষ্য (১৩৪৬ খ্রি.) মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর আমলে সোনারগাঁও ভ্রমণ করেন। তিনি সুলতানকে “দরবেশদের পরম ভক্ত ও সমুদ্রের অধিপতি” হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বাংলার সস্তা দ্রব্যমূল্যের (যেমন এক দিরহামে ৮টি মোটা মুরগি, এক দিরহামে এক মণ চাল) প্রশংসা করেন।

৩. স্বাধীনতা সুরক্ষায় মোবারক শাহের ভূমিকা:
দিল্লির মুহম্মদ বিন তুগলকের শত হুমকি সত্ত্বেও মোবারক শাহ নিজ ক্ষমতায় সোনারগাঁওয়ের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ইলিয়াস শাহের অখণ্ড বাংলার স্বাধীনতায় রূপ লাভ করে।

উপসংহার:
সুলতান ফখর-উদ-দীন মোবারক শাহ ছিলেন বাংলার স্বাধীনতার অগ্রদূত। সোনারগাঁওকে তিনি বিশ্ববাণিজ্য ও রাজনীতির এমন এক স্বর্ণদ্বীপে পরিণত করেছিলেন, যা শত শত বছর ধরে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পর্যটকদের মুগ্ধ করেছে।

৫। রাজা গণেশ কে ছিলেন? বাংলার সমকালীন রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা নিরূপণ কর।

ভূমিকা:
পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে (১৪১০-১৪১৮ খ্রি.) মধ্যযুগীয় মুসলিম বাংলার স্বাধীন ইলিয়াস শাহী সালতানাতের অভ্যন্তরে এক নাটকীয় রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ঘটেছিল, যার মূল নায়ক ছিলেন দিনাজপুরের ভাটুরিয়ার জমিদার রাজা গণেশ (Raja Ganesha)। ইলিয়াস শাহী রাজবংশের শেষ দুর্বল সুলতানদের অযোগ্যতার সুযোগে এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী হিন্দু অভিজাত হিসেবে তিনি রাজদরবারের সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন এবং অবশেষে সরাসরি বাংলার সিংহাসন দখল করেন। বাংলার সমকালীন রাজনীতিতে তাঁর এই ক্ষমতা দখল এক বিরাট ধর্মীয়, সামাজিক ও সামরিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

১. ক্ষমতা দখল ও মুসলিম নিপীড়ন:
সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের মৃত্যুর পর তাঁর দুর্বল পুত্র সাইফুদ্দীন হামজা শাহের আমলে রাজা গণেশ প্রধান মন্ত্রী বা রাজদরবারের অভিভাবক হন। ১৪১৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি শেষ সুলতান আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহকে হত্যা করে নিজেই ‘দনুজমর্দন দেব’ উপাধি ধারণ করে সরাসরি বাংলার সিংহাসনে বসেন। ক্ষমতা সুসংহত করতে তিনি বহু আলেম ও সুফি সাধককে হত্যা করেন এবং প্রখ্যাত আউলিয়া হযরত নূর কুতুবুল আলমের অনুসারীদের ওপর নির্যাতন শুরু করেন।

২. নূর কুতুবুল আলমের প্রতিরোধ ও জৌনপুরের সুলতানের হস্তক্ষেপ:

ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ ফলাফল ও ঐতিহাসিক সমাধান
১. নূর কুতুবুল আলমের চিঠি বাংলার মুসলিম শাসন রক্ষায় সুফি সাধক নূর কুতুবুল আলম জৌনপুরের শক্তিশালী শার্কী সুলতান ইব্রাহিম শাহ শার্কীকে বাংলা আক্রমণের উদাত্ত আহ্বান জানান। ইব্রাহিম শার্কী এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে বাংলা অভিমুখে রওনা হন।
২. রাজা গণেশের নতিস্বীকার শার্কী বাহিনীর আগমন ও পরাজয় নিশ্চিত জেনে ভীত হয়ে রাজা গণেশ পাণ্ডুয়ায় নূর কুতুবুল আলমের দরবারে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং আপসের প্রস্তাব দেন। হযরত নূর কুতুবুল আলম শর্ত দেন যে গণেশ নিজে সিংহাসন ছেড়ে তাঁর পুত্রকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে সিংহাসনে বসাতে হবে।
৩. যদুনারায়ণের ধর্মান্তর ও জালালউদ্দীন রূপ গণেশের ১২ বছরের পুত্র যদু বা যদুনারায়ণ স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর নাম রাখা হয় ‘সুলতান জালালউদ্দীন মুহাম্মদ শাহ’। ইব্রাহিম শার্কী সন্তুষ্ট হয়ে জৌনপুরে ফিরে যান।
৪. গণেশের ষড়যন্ত্র ও স্বর্ণধেনু অনুষ্ঠান শার্কী সৈন্য ফিরে গেলে গণেশ বিশ্বাসঘাতকতা করে পুত্রকে জোরপূর্বক আটকে রেখে আবার সিংহাসন দখল করেন এবং স্বর্ণের গরু বানিয়ে প্রায়শ্চিত্ত (স্বর্ণধেনু যজ্ঞ) করিয়ে পুত্রকে হিন্দু বানানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু যদু অন্তরে মুসলিমই থেকে যান। গণেশের মৃত্যুর পর জালালউদ্দীন পুনরায় মুসলিম হিসেবে সিংহাসনে বসে সুবিচার কায়েম করেন।

৩. সমকালীন রাজনীতিতে রাজা গণেশের প্রভাব:
রাজা গণেশের অভ্যুত্থান ছিল সামন্তবাদী প্রতিক্রিয়ার এক ব্যর্থ চেষ্টা। তাঁর পুত্র সুলতান জালালউদ্দীন মুহাম্মদ শাহ পরবর্তীকালে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও ধর্মপ্রাণ ন্যায়পরায়ণ মুসলিম সুলতানে পরিণত হন এবং পিতার মন্দিরমুখী উগ্রতা বর্জন করে মসজিদ ও মাদ্রাসায় বাংলা ভরিয়ে দেন।

উপসংহার:
বাংলার রাজনীতিতে রাজা গণেশের পর্বটি প্রমাণ করে যে বাংলার মুসলিম শাসনের শিকড় সাধারণ মানুষের অন্তরে এত গভীরে প্রোথিত ছিল যে সাময়িক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে একে উপড়ে ফেলা সম্ভব ছিল না।

৬। বাংলার কররানী বংশের উত্থান ও পতনের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।

ভূমিকা:
ষোড়শ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে (১৫৬৪-১৫৭৬ খ্রি.) মুঘল সাম্রাজ্যের পরাক্রমশালী বিস্তার ও আফগানদের রাজনৈতিক পতনের সন্ধিক্ষণে বাংলা অঞ্চলে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল স্বাধীন ‘কররানী রাজবংশ’ (Karrani Dynasty)। শের শাহ সুরির বংশধরদের পতনের পর আফগান জাতির সর্বশেষ স্বাধীন রাজনৈতিক আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল এই মুসলিম বাংলা। বিশেষত সুলাইমান খান কররানী তাঁর তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, কূটনীতি এবং বীরত্ব দিয়ে বাংলাকে এক পরাক্রমশালী রাজ্যে রূপ দিয়েছিলেন, যা ছিল সম্রাট আকবরের বাংলা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত আফগানদের শেষ গৌরবোজ্জ্বল দুর্গ।

১. কররানী বংশের উত্থান ও তাজুদ্দীন কররানী:
১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে গিয়াসউদ্দিন জালাল শাহের হত্যার পর সৃষ্ট অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে আফগান সেনাপতি তাজ খান কররানী গৌড়ের ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বিচক্ষণ কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুলাইমান খান কররানী সিংহাসনে বসে কররানী বংশের সোনালী যুগের সূচনা করেন। তিনি রাজধানী গৌড় থেকে জলবায়ুগত সুবিধার কারণে বর্তমান মালদহের ‘তাণ্ডা’য় স্থানান্তর করেন।

২. সুলাইমান খান কররানীর শাসনকাল ও অনন্য সাফল্যসমূহ:

সাফল্যের ক্ষেত্র গৃহীত কৌশল ও সামরিক অর্জন
১. আকবরের সাথে শান্তি ও কূটনীতি মুঘল সম্রাট আকবরের সাথে সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে কৌশলে নিজের নামে খুতবা পাঠ ও মুদ্রা জারি বন্ধ রেখে আকবরের প্রতি মৌখিক আনুগত্য দেখান। ফলে বাংলা দীর্ঘকাল মুঘল আগ্রাসন থেকে নিরাপদ থাকে।
২. উড়িষ্যা বিজয় ও কালাপাহাড়ের বীরত্ব (১৫৬৮ খ্রি.) সুলাইমান কররানীর বিখ্যাত সেনাপতি রাজীব লোচন রায় ওরফে ‘কালাপাহাড়’ উড়িষ্যার রাজা মুকুন্দ দেবকে পরাজিত করে জগন্নাথ মন্দিরসহ সমগ্র উড়িষ্যা কররানী সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
৩. কুচবিহার আক্রমণ ও দক্ষিণ বাংলা সংহতি উত্তরে কামরূপ ও কুচবিহার আক্রমণ করে বিপুল কর আদায় করেন এবং বাংলার আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে একক পতাকাতলে আনেন।
৪. আলেম ও সুফিদের সান্নিধ্য প্রতিদিন রাতে ১৫০ জন আলেম ও সুফিদের নিয়ে আলোচনা করতেন এবং অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠভাবে শরীয়তের অনুশাসন পালন করতেন।

৩. দাউদ খান কররানীর অপরিণামদর্শিতা ও বংশের পতন (১৫৭৬ খ্রি.):
১৫৭২ সালে সুলাইমান কররানীর মৃত্যুর পর তাঁর অহংকারী ও তরুণ পুত্র দাউদ খান কররানী পিতার সতর্ক কূটনীতি ভঙ্গ করে প্রকাশ্যে আকবরের নাম বাদ দিয়ে নিজের নামে মুদ্রা জারি করেন ও খুতবা পড়েন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আকবর মুনিম খান ও তোদরমলকে বাংলা বিজয়ে পাঠান। অবশেষে ১৫৭৬ সালের ১২ জুলাই ঐতিহাসিক ‘রাজমহলের যুদ্ধে’ দাউদ খান কররানী পরাজিত ও নিহত হন। এর মাধ্যমে স্বাধীন আফগান কররানী সালতানাতের সমাধি ঘটে এবং বাংলা আনুষ্ঠানিক মুঘল সাম্রাজ্যের প্রদেশ (সুবা) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

উপসংহার:
কররানী বংশ ছিল বাংলার স্বাধীন আফগান শাসনের শেষ দীপশিখা। তাঁদের পতনের পর আফগানরা মুঘলদের বিরুদ্ধে বাংলার বার ভূঁইয়াদের প্রতিরোধে যোগ দিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিল।

৭। বাংলার বার ভূঁইয়াদের সম্পর্কে আলোচনা কর।

ভূমিকা:
ষোড়শ শতকের শেষার্ধ ও সপ্তদশ শতকের সূচনালগ্নে (১৫৭৬-১৬১২ খ্রি.) মুঘল সাম্রাজ্যের পরাক্রমশালী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষায় যেসকল পরাক্রমশালী স্বাধীন সামন্ত নৃপতি ও জমিদার এক ঐতিহাসিক মরণপণ জাতীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, ইতিহাসে তাঁরা ‘বার ভূঁইয়া’ (Baro-Bhuiyans) নামে অমর হয়ে আছেন। সংখ্যায় তাঁরা কেবল বারো জন ছিলেন না; বরং পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলার প্রধান স্বাধীন জমিদারদের সমষ্টিগত প্রতীক হিসেবে এই পরিভাষা ব্যবহৃত হতো। ঈসা খাঁ মসনদ-ই-আলার অকুতোভয় নেতৃত্বে এই বার ভূঁইয়ারা জলবেষ্টিত নদ-নদীকে হাতিয়ার করে মুঘল সেনাপতিদের বারংবার শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিলেন।

১. বার ভূঁইয়াদের শীর্ষস্থানীয় সদস্য ও ভৌগোলিক অঞ্চলসমূহ:

নেতা ও ভূঁইয়ার নাম শাসনকেন্দ্র ও অঞ্চল সামরিক শক্তি ও প্রতিরোধ
১. ঈসা খাঁ মসনদ-ই-আলা (প্রধান নেতা) সোনারগাঁও ও খিজিরপুর (নারায়ণগঞ্জ) ভাটি অঞ্চলের অবিসংবাদিত নেতা। শক্তিশালী নৌবহর দিয়ে মুঘল সেনাপতি শাহবাজ খান ও রাজা মানসিংহকে বারবার পরাস্ত করেন।
২. মুসা খাঁ (ঈসা খাঁর পুত্র) সোনারগাঁও ও ভাটি অঞ্চল পিতার মৃত্যুর পর বার ভূঁইয়াদের নেতৃত্ব দেন এবং সুবাদার ইসলাম খানের বিরুদ্ধে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়েন।
৩. উসমান খান লোহানী বোকাইনগর ও ময়মনসিংহ/সিলেট দুর্ধর্ষ আফগান বীর। তিনি মুঘল বাহিনীর সাথে একাধিক রক্তক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন।
৪. প্রতাপাদিত্য যশোর ও খুলনা দক্ষিণ বাংলার অত্যন্ত ক্ষমতাশালী জমিদার; যুদ্ধজাহাজ ও কামানের কারখানা ছিল।
৫. কেদার রায় শ্রীপুর (বিক্রমপুর) মুঘল নৌবাহিনী ও আরাকানীদের বিরুদ্ধে অসীম বীরত্বে যুদ্ধ করে যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের মতো প্রাণ দেন।
৬. কন্দর্প নারায়ণ ও রামচন্দ্র চন্দ্রদ্বীপ (বরিশাল ও বাখেরগঞ্জ) উপকূলীয় অঞ্চলে শক্তিশালী নৌপ্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
৭. আনোয়ার গাজী ও ফজল গাজী ভাওয়াল (গাজীপুর) মুঘলদের বিরুদ্ধে ভাটি অঞ্চলে প্রতিরোধ পরিচালনা করেন।

২. বার ভূঁইয়াদের প্রতিরোধের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য:
– জলযুদ্ধ ও আবহাওয়ার কার্যকর ব্যবহার: মুঘল অশ্বারোহী বাহিনী স্থলযুদ্ধে অপরাজেয় হলেও বাংলার জলমগ্ন ভাটি অঞ্চলে বর্ষাকালে বার ভূঁইয়াদের ছিপ ও কোষা নৌকার সামনে মুঘলরা দিশেহারা হয়ে পড়ত।
– ধর্মীয় ঐক্যের অনুপম দৃষ্টান্ত: বার ভূঁইয়াদের জোটে মুসলিম (ঈসা খাঁ, উসমান লোহানী) এবং হিন্দু (প্রতাপাদিত্য, কেদার রায়) কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অভিন্ন মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষায় দিল্লির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।

৩. বার ভূঁইয়াদের চূড়ান্ত পতন (১৬১২ খ্রি.):
সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে দূরদর্শী সুবাদার ইসলাম খান চিশতী বাংলায় আগমন করেন। তিনি নদীপথে যুদ্ধের জন্য বিশাল রাজকীয় নৌবহর তৈরি করেন এবং ভূঁইয়াদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভেদ সৃষ্টি করে একে একে সকলকে পরাস্ত করেন। ১৬১২ সালে দৌলতম্বাপুরের যুদ্ধে উসমান লোহানীর শাহাদাত এবং মুসা খাঁর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বার ভূঁইয়াদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের অবসান ঘটে।

উপসংহার:
বার ভূঁইয়ারা ছিলেন বাংলার প্রথম জাতীয় বীর ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক। দিল্লির আধিপত্যের সামনে মাথা নত না করার যে শিক্ষা তাঁরা দিয়ে গেছেন, তা চিরকাল বাঙালির স্বাধীনতার রক্তে অনুরণিত হবে।

৮। বাংলায় আফগান শাসন প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লেখ।

ভূমিকা:
মধ্যযুগীয় ভারতে আফগান বা পাঠানরা ছিল এক দুর্ধর্ষ, স্বাধীনতাকামী ও যুদ্ধপ্রিয় জাতি। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর কর্তৃক ইব্রাহিম লোদীর পতনের পর উত্তর ভারত থেকে বিতাড়িত আফগানরা পূর্ব ভারতের বাংলা ও বিহার অঞ্চলকে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা ও প্রতিরোধের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত করে। শের শাহ সুরির বিজয়ের মধ্য দিয়ে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় যে স্বাধীন আফগান শাসনের সূচনা হয়েছিল, তা সুলাইমান কররানী ও দাউদ কররানী হয়ে ১৫৭৬ সাল পর্যন্ত প্রায় চার দশক ধরে চরম প্রতাপের সাথে টিকে ছিল।

১. বাংলায় আফগান শাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান পর্যায়সমূহ:

ঐতিহাসিক পর্ব শাসক ও বংশ মূল রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও তাৎপর্য
১. সুর বংশীয় শাসন (১৫৩৮-১৫৫৩ খ্রি.) শের শাহ সুরি ও তাঁর সুবাদারগণ (খিজির খান, কাজী ফজিলত, মুহাম্মদ খান সুর) ১৫৩৮ সালে শের শাহ বাংলার শেষ সুলতানি শাসক গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহকে উৎখাত করে গৌড় অধিকার করেন। হুমায়ুনের সাময়িক দখলের পর শের শাহ পুনরায় বাংলা দখল করে প্রশাসনিক সংস্কার করেন।
২. স্বাধীন সুর সালতানাত (১৫৫৩-১৫৬৪ খ্রি.) মুহাম্মদ খান সুর (শামসুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ) ও গিয়াসউদ্দিন জালাল শাহ দিল্লির সুর সাম্রাজ্য ভেঙে পড়লে বাংলার আফগান সুবাদাররা স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজেদের নামে মুদ্রা ও খুতবা জারি করেন।
৩. কররানী সালতানাত (১৫৬৪-১৫৭৬ খ্রি.) তাজ খান কররানী, সুলাইমান খান কররানী ও দাউদ খান কররানী বাংলায় আফগান শক্তির চূড়ান্ত স্বর্ণযুগ। উড়িষ্যা ও কুচবিহার বিজয়। মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আফগানদের শেষ সার্বভৌম প্রতিরোধ।

২. আফগান শাসনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:
– মুঘল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধ: বহিরাগত মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে আফগানরা বাংলার মাটি ও মানুষকে সাথে নিয়ে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
– প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও উসূলে ফিকহ: আফগানরা কঠোর কেন্দ্রিয়করণের বদলে গোত্রপ্রধানদের সম্মান দিয়ে সামন্ততান্ত্রিক ভারসাম্যে শাসন পরিচালনা করত। শের শাহের ন্যায়বিচার ও দ্রুত ডাকব্যবস্থার সুফল বাংলায় বাস্তবায়িত হয়েছিল।
– স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে একাত্মতা: মুঘলদের মতো অহংকারী না হয়ে আফগানরা বাংলার স্থানীয় জমিদার ও সাধারণ মানুষের সাথে সহজে মিশে গিয়ে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল।

উপসংহার:
১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে কররানী বংশের পতনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক আফগান সালতানাত বিলুপ্ত হলেও তাদের অবশিষ্টাংশ বার ভূঁইয়াদের প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিয়েছিল। বাংলার ইতিহাসে আফগান শাসন ছিল স্বাধীনতার এক অদম্য প্রতীক।

৯। সুলতানী বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার বিবরণ দাও।

ভূমিকা:
মধ্যযুগীয় স্বাধীন সুলতানি আমলে (১৩৩৮-১৫৩৮ খ্রি.) বাংলার রাষ্ট্রীয় সমৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামরিক পরাক্রমের মূল চালিকাশক্তি ছিল এর সুসংগঠিত, বৈজ্ঞানিক ও প্রজাবান্ধব ‘রাজস্ব প্রশাসন ব্যবস্থা’ (Revenue Administration)। নদীমাতৃক উর্বর পলিমাটির অফুরন্ত কৃষি উৎপাদন, বস্ত্রশিল্পের বিশ্বজোড়া খ্যাতি এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের ওপর কার্যকর কর ব্যবস্থার সমন্বয়ে সুলতানগণ এক বিশাল রাজকোষ গড়ে তুলেছিলেন, যা দিল্লির অধীনতামুক্ত স্বাধীন বাংলা পরিচালনায় মূল ভূমিকা রেখেছিল।

১. সুলতানি বাংলার আয়ের প্রধান প্রধান উৎসসমূহ:

রাজস্বের উৎস ইসলামী ও স্থানীয় পরিভাষা আদায়ের নিয়ম ও হার
১. ভূমির রাজস্ব (Land Revenue) খারাজ (خراج) ও মালগুজারি উৎপাদিত ফসলের এক-পঞ্চমাংশ (১/৫) বা এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) ভাগ রাষ্ট্রের পাওনা হিসেবে ধার্য হতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শস্য বা মুদ্রার মাধ্যমে পরিশোধ করা যেত।
২. বাণিজ্য শুল্ক ও শুল্ক কর জাকাত ও রাহদারী (Chungi) নদী বন্দর (সাতগাঁও, সোনারগাঁও, চট্টগ্রাম) এবং হাট-বাজারে পণ্যের ওপর নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক শুল্ক ধার্য ছিল।
৩. টাঁকশাল ও মুদ্রা ব্যবস্থা সিক্কা ও জুরূব স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে প্রতিটি সুলতান নিজ নামে রৌপ্যমুদ্রা (টঙ্কা) জারি করতেন। মুদ্রা তৈরিতে রাজকোষের আয় হতো।
৪. অমুসলিমদের নিরাপত্তা কর জিজিয়া (Jizya) সামরিক বাহিনীতে অংশ না নেওয়া সক্ষম অমুসলিম পুরুষদের ওপর নামমাত্র বাৎসরিক নিরাপত্তা কর ধার্য ছিল (দরিদ্র, নারী ও সন্ন্যাসীরা মুক্ত ছিল)।
৫. উপহার ও নজরানা পেশকশ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনিমত) অধীনস্থ সামন্ত রাজা এবং বিদেশি রাজদূতদের প্রেরিত উপঢৌকন।

২. প্রশাসনিক কাঠামো ও কর্মকর্তা শ্রেণি:
– আমিল ও শিকদার: প্রতিটি শিক বা পরগনায় রাজস্ব পরিমাপ ও আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন সরকারি আমিল ও শিকদারগণ।
– পাটোয়ারী ও চৌধুরী: গ্রাম পর্যায়ে জমির হিসাব ও করের পরিমাণ নির্ধারণে স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিমদের নিয়ে গঠিত সনাতন পাটোয়ারী ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়েছিল।
– কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষা: সুলতানি আমলে মধ্যস্বত্বভোগীদের অত্যাচার ছিল অত্যন্ত সীমিত। খরা বা প্লাবনের সময় সুলতানগণ উদারহস্তে খাজনা মওকুফ করতেন এবং বায়তুল মাল থেকে সহায়তা দিতেন।

উপসংহার:
সুলতানি বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থা ছিল অতিরিক্ত শোষণের হাত থেকে মুক্ত এক ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি। এই অর্থনৈতিক শক্তির কারণেই সুলতানি বাংলা প্রায় দুইশত বছর দিল্লির কোনো আর্থিক বা রাজনৈতিক দাসত্ব না মেনে এক সার্বভৌম ভূস্বর্গ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল।

১০। পলাশীর যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল বর্ণনা কর।

ভূমিকা:
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে সংঘটিত ‘পলাশীর যুদ্ধ’ (Battle of Plassey) কেবল বাংলার নয়, বরং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের সর্বাধিক কলঙ্কজনক, ট্র্যাজিক ও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। মাত্র তেইশ বছর বয়সী তরুণ দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ধূর্ত সেনাপতি লর্ড রবার্ট ক্লাইভ এবং নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খানের চরম মীরজাফরী ও বিশ্বাসঘাতকতার ফলে এই প্রহসনের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে বাংলার স্বাধীনতা চিরতরে ভূলুণ্ঠিত হয় এবং ভারতবর্ষে প্রায় দুইশত বছরের নির্মম ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অমানিশা নেমে আসে।

১. পলাশীর যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণসমূহ:

যুদ্ধের কারণসমূহ ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ও প্রেক্ষাপট
১. নবাবের আদেশ অমান্য ও ঔদ্ধত্য সিরাজউদ্দৌলা সিংহাসনে বসার পর সমস্ত কোম্পানি প্রচলিত প্রথানুযায়ী নজরানা পাঠালেও ইংরেজরা নবাবকে কোনো উপঢৌকন বা সম্মান জানায়নি।
২. দস্তকের মারাত্মক অপব্যবহার সম্রাট ফররুখশিয়ারের প্রদত্ত দস্তকের অপব্যবহার করে কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত শুল্কমুক্ত ব্যবসা চালিয়ে নবাবের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি করছিল।
৩. কলকাতায় অবৈধ দুর্গ নির্মাণ নবাবের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইংরেজরা কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের প্রাচীর বৃদ্ধি ও সামরিক প্রস্তুতি অব্যাহত রাখে।
৪. অপরাধী কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দান ঢাকার দেওয়ান রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাস বিপুল রাজকোষের অর্থ আত্মসাৎ করে কলকাতায় ইংরেজদের কাছে আশ্রয় নিলে ইংরেজরা তাকে ফেরত দিতে অস্বীকার করে।
৫. মীরজাফর-জগৎশেঠদের গোপন চক্রান্ত নবাবকে হটিয়ে পুতুল নবাব হওয়ার জন্য মীরজাফর, রায় দুর্লভ, জগৎশেঠ ও উমিচাঁদ ১৭৫৭ সালের জুনে ক্লাইভের সাথে কুখ্যাত গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করে।

২. যুদ্ধের প্রহসন ও নবাবের ট্র্যাজিক পরাজয়:
নবাবের ছিল ৫০,০০০ পদাতিক, ১৮,০০০ অশ্বারোহী ও ৫৩টি কামান; বিপরীতে ক্লাইভের ছিল মাত্র ৩,০০০ সৈন্য। যুদ্ধ শুরু হলে দেশপ্রেমিক বীর মীর মদন ও মোহনলালের গোলন্দাজ আক্রমণে ইংরেজরা দিশেহারা হয়ে আমবাগানে আত্মগোপন করে। কিন্তু এক আকস্মিক কামানের গোলার আঘাতে মীর মদন শাহাদাত বরণ করলে ভণ্ড মীরজাফর নবাবকে কুরআন ছুঁয়ে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করার পরামর্শ দেয়। যুদ্ধবিরতির সুযোগে ক্লাইভ অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। মীরজাফরের নীরব বিশ্বাসঘাতকতায় নবাবের সুসজ্জিত বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

৩. পলাশীর যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ফলাফল:
– স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত: মীরজাফরকে নামমাত্র পুতুল নবাব বানিয়ে ক্লাইভ প্রকৃত শাসনকর্তা হয়।
– পলাশী লুণ্ঠন ও অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব: ক্লাইভ নবাবের রাজকোষ থেকে কোটি কোটি টাকার সোনা ও অর্থ ইংল্যান্ডে পাচার করে। এর পরিণতিতেই ঘটেছিল ছিয়াত্তরের ভয়াবহ মন্বন্তর (১৭৭০)।
– সমগ্র ভারত জয়ের ভিত্তি: পলাশীর বিজয়ের জোরেই ইংরেজরা ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভ করে দেওয়ানি সনদ পায় এবং সমগ্র ভারত পদানত করে।

উপসংহার:
পলাশী কোনো সাধারণ সামরিক পরাজয় ছিল না; এটি ছিল দেশীয় কিছু স্বার্থলোভী কুলাঙ্গারের বিশ্বাসঘাতকতার বলিদান। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়ে যাওয়া তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলা চিরকাল বাঙালির স্বাধীনতার অমর শহীদ হয়ে বেঁচে থাকবেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের প্রধান ঐতিহাসিক আকর গ্রন্থ কোনটি?

মিনহাজ-ই-সিরাজ জুযজানী রচিত ‘তবকাত-ই-নাসিরী’।

রাজা গণেশের পুত্র ইসলাম গ্রহণের পর কী নাম ধারণ করেন?

সুলতান জালালউদ্দীন মুহাম্মদ শাহ।

সুলতানি আমলে বাংলার প্রধান নদী বন্দর কোনটি ছিল?

সোনারগাঁও ও সপ্তগ্রাম (সাতগাঁও)।

বাংলায় সুর বংশের আফগান শাসন কে প্রতিষ্ঠা করেন?

শের শাহ সুরি (১৫৩৮ খ্রি.)।

পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পক্ষে জীবন উৎসর্গকারী বীর সেনাপতি কারা ছিলেন?

মীর মদন এবং মোহনলাল।

সুলতান ইলিয়াস শাহের বিরুদ্ধে দিল্লির কোন সুলতান অভিযান চালান?

সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক (একডালা দুর্গ অবরোধ)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *