ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ২য় পত্র (Islamic History and Culture 2nd Paper) – 414, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাযিল পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
৬৩ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা – ২০২১
বিষয়: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ২য় পত্র (বিষয় কোড: ৪১৪)
[ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক ইতিহাস (১৭০৭ পর্যন্ত)]
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১-এর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ২য় পত্র (বিষয় কোড: ৪১৪) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রি ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, ঐতিহাসিক তথ্য, যুদ্ধ ও প্রশাসনিক সংস্কার, বিশ্লেষণী ছক এবং ফলাফল সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।

কন্টেন্ট তালিকা / প্রশ্নসূচি

  1. ১। সুলতানী আমলে ভারতের ইতিহাস অধ্যয়নের উৎসসমূহ আলোচনা কর।
  2. ২। দাস বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সুলতান ইলতুতমিশের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
  3. ৩। সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলকের জনহিতকর কার্যাবলি বিশ্লেষণ কর।
  4. ৪। দিল্লি সালতানাতের পতনের কারণগুলো বর্ণনা কর।
  5. ৫। শাসক ও বিজেতা হিসেবে বাবরের কৃতিত্ব বিচার কর।
  6. ৬। সম্রাট হুমায়ুন ও শের শাহের মধ্যে সংঘর্ষের একটি বিবরণ দাও। শের শাহের সাফল্যের কারণ কী?
  7. ৭। মুঘল রাজনীতিতে নূরজাহানের ভূমিকা মূল্যায়ন কর।
  8. ৮। মুঘল সাম্রাজ্যের সংহতি বিধানে সম্রাট আকবরের নীতিসমূহ ব্যাখ্যা কর।
  9. ৯। জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের প্রধান ঘটনাবলি সংক্ষেপে আলোচনা কর।
  10. ১০। টীকা লিখ (যে কোনো দুটি):

প্রশ্নোত্তর ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান

১। সুলতানী আমলে ভারতের ইতিহাস অধ্যয়নের উৎসসমূহ আলোচনা কর।

ভূমিকা:
মধ্যযুগীয় ভারতের দিল্লি সালতানাতের (১২০৬-১৫২৬ খ্রি.) ইতিহাস বিনির্মাণে সমকালীন ঐতিহাসিক উৎসসমূহ অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। প্রাচীন ভারতের মতো সালতানাত যুগের ইতিহাস কেবল লোককথা বা পৌরাণিক কাহিনীর ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এ যুগের মুসলিম ঐতিহাসিকগণ আরব্য ও পারসিক ইতিহাস রচনার বস্তুনিষ্ঠ ধারা অনুসরণ করে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলি রচনা করেছিলেন। সাহিত্যিক বিবরণী, পর্যটকগণের ভ্রমণবৃত্তান্ত, শিলালিপি এবং স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষের সমন্বয়ে সুলতানী আমলের রাষ্ট্রীয় ও আর্থ-সামাজিক রূপরেখা পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়।

১. দিল্লি সালতানাতের প্রধান সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক গ্রন্থসমূহ:

গ্রন্থের নাম ঐতিহাসিক ও লেখক মূল বিষয়বস্তু ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১. তাজুল মাআসির (تاج المآثر) হাসান নিজামী দিল্লি সালতানাতের প্রাথমিক পর্ব, কুতুবউদ্দীন আইবেক এবং ইলতুতমিশের প্রাথমিক বিজয়ের প্রথম আনুষ্ঠানিক রাজকীয় ইতিহাস।
২. তবকাত-ই-নাসিরী (طبقات ناصري) মিনহাজ-ই-সিরাজ জুযজানী সুলতান নাসিরউদ্দীন মাহমুদকে উৎসর্গীকৃত। গজনী, ঘূর এবং মামলুক সুলতানদের ইতিহাস ও ১২০৪ সালে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের একমাত্র প্রত্যক্ষ প্রামাণ্য দলিল।
৩. তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী (১ম) জিয়াউদ্দীন বারানী বলবন থেকে শুরু করে ফিরোজ শাহ তুগলকের প্রথম ছয় বছরের ইতিহাস। আলাউদ্দিন খলজির মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং মুহাম্মদ বিন তুগলকের পরিকল্পনা বিশ্লেষণের শ্রেষ্ঠ আকর।
৪. তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী (২য়) শামস-ই-সিরাজ আফিফ সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলকের সমগ্র রাজত্বকাল, তাঁর জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এবং সালতানাতের প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিশদ চিত্র।
৫. আমির খসরুর ঐতিহাসিক কাব্যসমূহ আমির খসরু দেহলভী কিরানুস সাদাইন, মিফতাহুল ফুতুহ ও খাজাইনুল ফুতুহ গ্রন্থে জালালউদ্দীন ও আলাউদ্দিন খলজির সামরিক অভিযানের প্রত্যক্ষ বিবরণ।
৬. কিতাবুর রেহলা (তুহফাতুন নুযযার) ইবনে বতুতা (মরক্কোর পর্যটক) মুহাম্মদ বিন তুগলকের রাজত্বকালের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ, সুলতানের চরিত্র এবং চতুর্দশ শতকের ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির জীবন্ত দলিল।

২. প্রত্নতাত্ত্বিক ও মুদ্রা সংক্রান্ত উৎস (Archaeological Sources):
– মুদ্রাতত্ত্ব (Numismatics): সুলতান ইলতুতমিশ প্রবর্তিত রৌপ্য মুদ্রা ‘টঙ্কা’ এবং তাম্র মুদ্রা ‘জিতল’ থেকে শুরু করে মুহাম্মদ বিন তুগলকের প্রতীকী তাম্রমুদ্রা তৎকালীন অর্থনৈতিক অবস্থা, সাম্রাজ্যের পরিধি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার অকাট্য প্রমাণ দেয়।
– শিলালিপি ও স্থাপত্য (Inscriptions & Architecture): কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদ, কুতুব মিনার, আলাই দরওয়াজা এবং তুগলকাবাদ দুর্গের শিলালিপি থেকে সুলতানদের উপাধি, নির্মাণকাল ও ধর্মীয় ভাবধারা সুস্পষ্ট হয়।

৩. সমকালীন ঐতিহাসিক উৎসের সীমাবদ্ধতা:
বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ রাজদরবারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থানুকূল্যে কিতাব রচনা করায় বহু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অনুরাগ, তোষামোদি এবং প্রতিপক্ষ সুলতানের প্রতি বিদ্বেষের ছাপ দেখা যায়। তথাপি আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তুলনামূলক যাচাইয়ের মাধ্যমে এই উপাদানগুলো থেকে ইতিহাসের সত্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব।

উপসংহার:
দিল্লি সালতানাতের ইতিহাস অধ্যয়নের এই উপাদানগুলো কেবল রাজনৈতিক উত্থান-পতনের বিবরণ দেয় না; বরং মধ্যযুগীয় ভারতীয় সমাজের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ও অর্থনৈতিক বিবর্তন অনুধাবনের অমূল্য দলিল হিসেবে বিবেচিত।

২। দাস বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সুলতান ইলতুতমিশের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।

ভূমিকা

১২০৬ থেকে ১২৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লি সালতানাত শাসনকারী প্রথম রাজবংশকে ‘মামলুক বংশ’ বা দাস বংশ বলা হয়। এই বংশের উল্লেখযোগ্য সুলতানগণ হলেন কুতুবউদ্দীন আইবেক, শামসুদ্দীন ইলতুতমিশ, সুলতানা রাজিয়া এবং গিয়াসউদ্দীন বলবন। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও প্রশাসনিক দক্ষতার বিচারে আমি সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশকে (শাসনকাল: ১২১১—১২৩৬ খ্রি.) মামলুক সুলতানগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে বিবেচনা করি।

সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশকে শ্রেষ্ঠ শাসক মনে করার যুক্তিসমূহ

  • ১. দিল্লি সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা: কুতুবউদ্দীন আইবেক মাত্র চার বছর লাহোরে বসে শাসন করেন এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করতে পারেননি। ১২১১ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করে ইলতুতমিশ রাজধানী লাহোর থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করেন এবং ধ্বংসোন্মুখ সালতানাতকে সুসংহত করেন। তাই তিনিই দিল্লি সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।
  • ২. শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বী দমন: সিংহাসন লাভের পর তিনি গজনির তাজুদ্দীন ইয়ালদুজকে তরাইনের যুদ্ধে (১২১৫ খ্রি.) পরাজিত ও হত্যা করেন এবং সিন্ধুর নাসিরুদ্দীন কুবাচাকে (১২২৮ খ্রি.) সিন্ধু নদে ডুবিয়ে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়ে সাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমান্ত নিরাপদ করেন। এছাড়া বিদ্রোহী বাংলার শাসক গিয়াসউদ্দীন ইওয়াজ খলজিকে দমন করে বাংলাকে দিল্লির করদ রাজ্যে পরিণত করেন।
  • ৩. মোঙ্গল আক্রমণ থেকে ভারতের রক্ষা (১২২১ খ্রি.): চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল বাহিনী যখন খাওয়ারেজম শাহ জালালউদ্দীন মাংগাবার্নিকে তাড়া করে সিন্ধু সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছিল, তখন জালালউদ্দীন ইলতুতমিশের নিকট রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। ইলতুতমিশ অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে দিল্লির গরম আবহাওয়া সহ্য হবে না অজুহাত দেখিয়ে মিষ্টি ভাষায় আশ্রয় প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলে ভারত মোঙ্গলদের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পায়।
  • ৪. আব্বাসীয় খলিফার ঐতিহাসিক স্বীকৃতি (১২২৯ খ্রি.): ১২২৯ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা আল-মুসতানসির বিল্লাহ ইলতুতমিশকে ‘নাসিরু আমিরুল মুমিনীন’ (বিশ্বাসীগণের নেতার সাহায্যকারী) উপাধিতে ভূষিত করেন এবং খিলাফতের রাজকীয় খেলাত (পোশাক) ও সনদ পাঠান। এর ফলে দিল্লি সালতানাত সমগ্র মুসলিম বিশ্বে প্রথম বৈধ সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করে।
  • ৫. ‘চল্লিশ চক্র’ বা বন্দগান-ই-চিহিলগানের প্রতিষ্ঠা: সাম্রাজ্যকে সুসংহত রাখতে তিনি তাঁর অনুগত চল্লিশজন তুর্কি ক্রীতদাসকে নিয়ে ‘আমিরান-ই-চিহিলগান’ বা চল্লিশ চক্র গঠন করেন, যা ছিল তাঁর প্রশাসনের মূল চালিকাশক্তি।
  • ৬. মুদ্রাব্যবস্থা ও ইকতা পদ্ধতির প্রবর্তন: তিনিই ভারতে সর্বপ্রথম খাঁটি রৌপ্যমুদ্রা ‘টঙ্কা’ (১৭৫ গ্রেন) এবং তাম্রমুদ্রা ‘জিতল’ প্রবর্তন করেন, যা ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত ভারতীয় মুদ্রার ভিত্তি ছিল। সামরিক কর্মকর্তাদের বেতন প্রদানের জন্য তিনি জমি বরাদ্দের ‘ইকতা’ ব্যবস্থা চালু করেন।
  • ৭. স্থাপত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ: কুতুবউদ্দীন আইবেক কর্তৃক অসমাপ্ত ‘কুতুব মিনার’-এর নির্মাণকাজ তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেন এবং দিল্লিতে সুফি সাধক খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকীর স্মৃতিকে চিরভাস্বর করে রাখেন।
  • ৮. সুলতানা রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী মনোনয়ন: পুত্রদের অযোগ্যতা দেখে তিনি মেধার ভিত্তিতে স্বীয় কন্যা রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে মধ্যযুগে এক অনন্য প্রগতিশীল মানসিকতার পরিচয় দেন।

উপসংহার

গিয়াসউদ্দীন বলবন নিঃসন্দেহে কঠোর ও দক্ষ শাসক ছিলেন; কিন্তু ইলতুতমিশ যদি সালতানাতকে টিকে থাকার মতো সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় না করাতেন, তবে বলবনের শাসনই সম্ভব হতো না। অতএব, দূরদর্শিতা, সাম্রাজ্য রক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিবেচনায় শামসুদ্দীন ইলতুতমিশই মামলুক বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সুলতান।


৩। সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলকের জনহিতকর কার্যাবলি বিশ্লেষণ কর।

ভূমিকা:
দিল্লি সালতানাতের তুগলক বংশের তৃতীয় শাসক সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক (১৩৫১-১৩৮৮ খ্রি.) সামরিক বিজয়ের জন্য নয়; বরং তাঁর যুগান্তকারী মানবকল্যাণমুখী প্রশাসনিক সংস্কার, গণপূর্ত নির্মাণ এবং ইসলামি শরীয়তভিত্তিক প্রজাবাৎসল্যের কারণে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তাঁর পূর্বসূরি মুহাম্মদ বিন তুগলকের চরম অস্থির ও বিতর্কিত নীতির ফলে বিক্ষুব্ধ ও অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া প্রজাদের তিনি দীর্ঘ সাইত্রিশ বছরের শান্তিপূর্ণ শাসনামলে অভাবনীয় স্বস্তি ও সমৃদ্ধি এনে দিয়েছিলেন।

১. ফিরোজ শাহ তুগলকের জনহিতকর ও প্রশাসনিক সংস্কারসমূহ:

সংস্কারের ক্ষেত্র গৃহীত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
১. নিষ্ঠুর শাস্তি ও নির্যাতন বিলোপ তিনি হাত-পা কাটা, চোখ উপড়ানো, নখে পেরেক ঠোকা ইত্যাদি অমানবিক মধ্যযুগীয় শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন এবং তাঁর আত্মজীবনী ফুতুহাত-ই-ফিরোজ শাহী-তে তা লিপিবদ্ধ করেন।
২. অন্যায় আবওয়াব ও কর মওকুফ শরীয়ত-বহির্ভূত প্রায় চব্বিশ প্রকার শোষণমূলক স্থানীয় কর (আবওয়াব) রহিত করে কেবল কুরআনী চার প্রকার কর (খারাজ, যাকাত, জিজিয়া ও খুমস) বহাল রাখেন। কৃষকদের পূর্বের সমস্ত কৃষিঋণ (সোন্ধার) সম্পূর্ণ মাফ করে দেন।
৩. কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক উন্নয়ন ভারতে সর্বপ্রথম সুবৃহৎ সেচ খাল ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। যমুনা ও শতদ্রু নদী থেকে পাঁচটি বিশাল সেচ খাল খনন করে বিস্তীর্ণ অনাবাদী জমি চাষযোগ্য করেন এবং ১২০০ ফলের বাগান গড়ে তোলেন।
৪. নতুন নগর ও জনপদ প্রতিষ্ঠা তিনি ফিরোজাবাদ (নতুন দিল্লি), ফতেহাবাদ, হিসার, জৌনপুর (মুহাম্মদ জুনা খানের স্মরণে) এবং ফিরোজপুরের মতো আধুনিক শহর ও বাণিজ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন।
৫. দেওয়ান-ই-খয়রাত (দাতব্য বিভাগ) দরিদ্র, বিধবা ও এতিম মেয়েদের বিবাহ এবং অসহায় পরিবারের আর্থিক সুরক্ষার জন্য স্থায়ী কল্যাণ তহবিল ও সরকারি দপ্তর গড়ে তোলেন।
৬. দারুশ শিফা (বিনামূল্যে হাসপাতাল) দিল্লিতে সুবৃহৎ দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন, যেখানে অভিজ্ঞ হাকিম ও কবিরাজদের তত্ত্বাবধানে রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ প্রদান করা হতো।
৭. দেওয়ান-ই-বন্দেগান (দাস কল্যাণ বিভাগ) প্রায় ১,৮০,০০০ ক্রীতদাসকে বিভিন্ন কারিগরি ও ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে উৎপাদনশীল নাগরিকে রূপান্তর করেন।

২. ফিরোজ শাহের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা:
প্রজাকল্যাণে অনন্য হলেও তাঁর অতিরিক্ত ধর্মীয় গোঁড়ামি, সৈন্যদের বংশানুক্রমিক জায়গীর প্রথা চালু করা এবং দাসদের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা নষ্ট করেছিল, যা পরবর্তীতে সালতানাতকে দুর্বল করে তৈমুরের আক্রমণের পথ সুগম করেছিল।

উপসংহার:
সামগ্রিক মূল্যায়নে সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক ছিলেন একজন মহান প্রজাদরদী শাসক। মধ্যযুগের রক্তক্ষয়ী সহিংসতার মাঝে তাঁর কল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তা এক সুশীতল পরশ বুলিয়ে দিয়েছিল।

৪। দিল্লি সালতানাতের পতনের কারণগুলো বর্ণনা কর।

ভূমিকা:
১২০৬ খ্রিস্টাব্দে কুতুবউদ্দীন আইবেক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দিল্লি সালতানাত দীর্ঘ তিন শতকেরও বেশি সময় ধরে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল। মামলুক, খলজি, তুগলক, সাইয়্যেদ এবং লোদী—এই পাঁচটি রাজবংশের অধীনে সালতানাত চরম বৈভব ও ক্ষমতার শিখরে আরোহণ করে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ অযোগ্যতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং বাহ্যিক আক্রমণের মুখে অবশেষে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবরের কাছে ইব্রাহিম লোদীর শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে এই সুবিশাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

১. দিল্লি সালতানাতের পতনের প্রধান প্রধান কারণসমূহ:

পতনের মূল কারণ ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ও সুনির্দিষ্ট প্রভাব
১. সুনির্দিষ্ট উত্তরাধিকার আইনের অভাব সুলতানের মৃত্যুর পর তরবারির শক্তিতে সিংহাসন দখল করার রেওয়াজ চালু ছিল। ফলে প্রতিটি শাসকের মৃত্যুর পর রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সালতানাতের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।
২. বিশাল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীভূত দুর্বলতা দক্ষিণ ভারত, বাংলা ও সিন্ধুর মতো দূরবর্তী প্রদেশগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মতো আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। ফলে প্রাদেশিক শাসনকর্তারা সুযোগ পেলেই স্বাধীনতা ঘোষণা করত।
৩. মুহাম্মদ বিন তুগলকের ভ্রান্ত নীতি রাজধানী স্থানান্তর ও প্রতীকী তাম্রমুদ্রা প্রবর্তনের মতো অপরিপক্ব পরিকল্পনা রাজকোষ শূন্য করে এবং জনগণের আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে।
৪. ফিরোজ তুগলকের সামরিক শিথিলতা সেনাবাহিনীতে জায়গীর প্রথা ও বংশানুক্রমিক নিয়োগ চালু করায় যুদ্ধের দক্ষতা ধ্বংস হয়ে যায়। ক্রীতদাসদের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ সালতানাতকে পঙ্গু করে।
৫. তৈমুর লং-এর বিধ্বংসী আক্রমণ (১৩৯৮ খ্রি.) তৈমুরের দিল্লি ধ্বংস ও গণহত্যার ফলে সালতানাতের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে এবং রাজনৈতিক মানচিত্র টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
৬. আমির-ওমরাহদের ষড়যন্ত্র ও দলীয় কোন্দল তুর্কি, তাজিক, আফগান ও ভারতীয় মুসলিম অভিজাতদের পারস্পরিক হিংসা ও স্বার্থান্ধ দলাদলি রাষ্ট্রীয় ঐক্য ধ্বংস করে।
৭. ইব্রাহিম লোদীর একগুঁয়েমি ও বাবরের আগমন লোদী বংশের শেষ শাসক ইব্রাহিম লোদীর উদ্ধত আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে দৌলত খান লোদী ও রানা সঙ্গ কাবুলের শাসক বাবরকে ভারত আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান।

২. পানিপথের প্রথম যুদ্ধ (১৫২৬ খ্রি.) ও চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি:
বাবরের উন্নত কামান, রুমি কৌশল (তুলঘুমা) এবং সুদক্ষ অশ্বারোহী বাহিনীর সামনে ইব্রাহিম লোদীর বিশাল কিন্তু বিশৃঙ্খল হস্তীবাহিনী পর্যুদস্ত হয়। ইব্রাহিম লোদী যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন এবং ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন ঘটে।

উপসংহার:
দিল্লি সালতানাতের পতন কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল না; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুঞ্জীভূত প্রশাসনিক ক্লান্তি, সামরিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবই এই পতনের কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।

৫। শাসক ও বিজেতা হিসেবে বাবরের কৃতিত্ব বিচার কর।

ভূমিকা:
জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবর (১৪৮৩-১৫৩০ খ্রি.) ছিলেন মধ্যযুগীয় প্রাচ্যের অন্যতম রোমাঞ্চকর ব্যক্তিত্ব, রণকুশলী সমরনায়ক এবং ভারতবর্ষে মহান মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। পিতৃসূত্রে তিনি ছিলেন দুর্ধর্ষ দিগ্বিজয়ী তৈমুর লং-এর এবং মাতৃসূত্রে রক্তপিপাসু চেঙ্গিস খানের সরাসরি বংশধর। মধ্য এশিয়ার ফারগানার এক ক্ষুদ্র শাসক থেকে শুরু করে চরম প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ভারতবর্ষে এক নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা বাবরের অনন্য সামরিক মেধার সাক্ষ্য বহন করে।

১. প্রারম্ভিক জীবন ও ভারতে আগমনের পটভূমি:
মাত্র এগারো বছর বয়সে ফারগানার সিংহাসনে আরোহণ করেন। সমরকন্দ দখলের ব্যর্থ চেষ্টা এবং স্বদেশ হারিয়ে তিনি যাযাবরে পরিণত হন। ১৫০৪ সালে তিনি কাবুল দখল করেন। এরপর দৌলত খান লোদী ও রানা সঙ্গের আমন্ত্রণ এবং নিজের পূর্বপুরুষ তৈমুরের বিজিত হিন্দুস্তান পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে তিনি ভারত অভিযানে অগ্রসর হন।

২. বিজেতা হিসেবে বাবরের যুগান্তকারী চারটি যুদ্ধ:

যুদ্ধের নাম ও সন প্রতিপক্ষ শক্তি যুদ্ধের ফলাফল ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
১. পানিপথের প্রথম যুদ্ধ (১৫২৬ খ্রি.) দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদী (১ লাখ সেনা ও ১০০০ হাতি) বাবরের মাত্র ১২,০০০ সেনা ‘তুলঘুমা রণকৌশল’ ও আগ্নেয়াস্ত্র (কামান)-এর সাহায্যে লোদী বাহিনীকে ধ্বংস করে। দিল্লি সালতানাতের সমাপ্তি ও মুঘল শাসনের সূচনা।
২. খানুয়ার যুদ্ধ (১৫২৭ খ্রি.) মেওয়ারের বীর রাজপুত রানা সঙ্গ ও রাজপুত জোট ভারতের মাটিতে মুঘল অস্তিত্ব রক্ষার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। বাবর মদের পেয়ালা ভেঙে ‘জিহাদ’-এর ডাক দেন এবং রাজপুতদের চূর্ণ করে ‘গাজী’ উপাধি নেন।
৩. চান্দেরীর যুদ্ধ (১৫২৮ খ্রি.) রাজপুত সর্দার মেদিনী রায় মালব অঞ্চলের শক্তিশালী চান্দেরী দুর্গ অধিকার করে মধ্য ভারতে মুঘল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।
৪. ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯ খ্রি.) বাংলা ও বিহারের আফগান প্রধানদের সম্মিলিত জোট গঙ্গার তীরে আফগান শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করে সিন্ধু থেকে বিহার পর্যন্ত সাম্রাজ্য সুরক্ষিত করেন।

৩. শাসক, সাহিত্যিক ও মানবপ্রেমিক হিসেবে বাবর:
– তুজুক-ই-বাবরী (বাবরনামা): তুর্কি ভাষায় রচিত তাঁর আত্মজীবনী বিশ্বসাহিত্যের এক অনুপম ক্লাসিক, যেখানে ভারতের প্রকৃতি, ফলমূল ও সংস্কৃতি অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে বর্ণিত হয়েছে।
– বাগ-বাগিচা ও রুচিবোধ: কাবুলি বাগ এবং আগ্রায় জ্যামিতিক নকশার চারবাগ পদ্ধতির উদ্যান নির্মাণ করেন।
– পুত্রের জন্য আত্মত্যাগ: জ্যেষ্ঠ পুত্র হুমায়ুনের দুরারোগ্য ব্যাধির সময় নিজের জীবনের বিনিময়ে পুত্রের আরোগ্য কামনায় তাঁর ঐতিহাসিক প্রার্থনা বাবরের পরম পিতৃস্নেহের উজ্জ্বল নিদর্শন।

উপসংহার:
বাবর ভারতে স্থায়ী প্রশাসন গড়ে তোলার পর্যাপ্ত সময় পাননি; কিন্তু তিনি যে সাম্রাজ্যের বীজ রোপণ করেছিলেন, তা পরবর্তীতে আকবর ও শাহজাহানের হাতে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও ঐশ্বর্যময় সাম্রাজ্যে রূপ লাভ করেছিল।

৬। সম্রাট হুমায়ুন ও শের শাহের মধ্যে সংঘর্ষের একটি বিবরণ দাও। শের শাহের সাফল্যের কারণ কী?

ভূমিকা:
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রারম্ভিক ইতিহাসে সম্রাট হুমায়ুন (১৫৩০-১৫৫৬ খ্রি.) এবং সুর বংশের প্রতিষ্ঠাতা শের শাহ সুরির (১৫৪০-১৫৪৫ খ্রি.) মধ্যকার সংঘাত এক নাটকীয় ও শিক্ষাগ্রহণীয় অধ্যায়। পিতার নিকট থেকে বিশাল কিন্তু বিশৃঙ্খল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার পেয়ে হুমায়ুন যখন আরাম-আয়েশ ও আফিমের নেশায় উদাসীন ছিলেন, তখন এক সাধারণ সৈনিক থেকে অসাধারণ প্রতিভাবলে উঠে আসা দূরদর্শী আফগান সেনাপতি শের খাঁ মুঘলদের পরাজিত করে সাময়িকভাবে হিন্দুস্তানের সিংহাসন দখল করেছিলেন।

১. হুমায়ুন ও শের শাহের মধ্যকার সংঘাতের প্রধান যুদ্ধসমূহ:

যুদ্ধের নাম ও সন ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ যুদ্ধের ফলাফল ও প্রভাব
১. চুনার দুর্গ অবরোধ (১৫৩১ ও ১৫৩৭ খ্রি.) শের খাঁ কৌশলে হুমায়ুনের আনুগত্য স্বীকার করে সময়ক্ষেপণ করেন এবং গোপনে বিহার ও বাংলায় নিজের সামরিক শক্তি সংহত করেন। হুমায়ুনের দূরদর্শিতার অভাবে শের খাঁ অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হন।
২. চৌসার যুদ্ধ (১৫৩৯ খ্রি.) বাংলা থেকে ফেরার পথে বিহারের গঙ্গা নদীর তীরে চৌসায় শের খাঁ কূটকৌশলে বর্ষাকালে মুঘল শিবির আক্রমণ করেন। মুঘল বাহিনী চূর্ণবিচূর্ণ হয়। হুমায়ুন ঘোড়াসহ গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে নিজাম নামক এক ভিস্তির (পানি বহনকারী) সহায়তায় প্রাণে বাঁচেন। শের খাঁ ‘শের শাহ’ উপাধি ধারণ করেন।
৩. কনৌজের বা বিলগ্রামের যুদ্ধ (১৫৪০ খ্রি.) হুমায়ুন তাঁর ভাইদের সহায়তা ছাড়া পুনরায় সেনা নিয়ে মুখোমুখি হন। শের শাহের আধুনিক আফগান রণকৌশলের সামনে মুঘল সেনারা সম্পূর্ণ ছত্রভঙ্গ হয়। মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। হুমায়ুন পারস্যে নির্বাসনে পালিয়ে যান এবং ভারতে সুর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

২. শের শাহের সাফল্যের কারণসমূহ:
– সামরিক প্রতিভা ও শৃঙ্খলা: শের শাহ ব্যক্তিগত মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে আফগানদের ঐক্যবদ্ধ করেন এবং আধুনিক অশ্বারোহী ও গোলন্দাজ বাহিনী গড়ে তোলেন।
– হুমায়ুনের চরিত্রগত দুর্বলতা ও অদূরদর্শিতা: বিজয়ের পর গৌড়ে দীর্ঘকাল আমোদ-প্রমোদে মত্ত থাকা, ভাইদের (কামরান, হিন্দাল, আসকারী) মধ্যকার চরম বিশ্বাসঘাতকতা এবং সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থতা।
– শের শাহের অনন্য প্রশাসনিক রূপকল্প: তিনি কেবল বিজেতা ছিলেন না; তিনি গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নির্মাণ, কবুলিয়ত ও পাট্টা প্রথা প্রবর্তন এবং কঠোর আইনের মাধ্যমে প্রজাদের আস্থা অর্জন করেছিলেন।

উপসংহার:
শের শাহ প্রমাণ করেছিলেন যে সিংহাসন কেবল বংশমর্যাদা দিয়ে রক্ষা করা যায় না; তার জন্য প্রয়োজন ইস্পাতকঠিন সংকল্প ও দূরদর্শিতা। তবে শের শাহের মৃত্যুর পর তাঁর অযোগ্য উত্তরসূরিদের কারণে হুমায়ুন ১৫৫৫ সালে পুনরায় মুঘল সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন।

৭। মুঘল রাজনীতিতে নূরজাহানের ভূমিকা মূল্যায়ন কর।

ভূমিকা:
মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সম্রাজ্ঞী নূরজাহান (মেহেরুন্নিসা – ১৫৭৭-১৬৪৫ খ্রি.) ছিলেন সর্বাধিক প্রভাবশালী, বুদ্ধিমতী ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থানকারী মহীয়সী নারী। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনকালের শেষ ষোলো বছর (১৬১১-১৬২৭ খ্রি.) মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত শাসনক্ষমতা কার্যত নূরজাহানের হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল। তাঁর অসাধারণ সৌন্দর্য, প্রশাসনিক মেধা, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং শিল্পরুচি তাঁকে মধ্যযুগের ভারতের সবচেয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল।

১. প্রাথমিক জীবন ও বিয়ে:
পারস্য থেকে আগত অভিজাত মির্জা গিয়াস বেগের কন্যা ছিলেন মেহেরুন্নিসা। প্রথম স্বামী শের আফগানের মৃত্যুর পর ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর প্রেমে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিবাহ করেন এবং প্রথমে ‘নূর মহল’ (প্রাসাদের জ্যোতি) ও পরে ‘নূরজাহান’ (জগতের জ্যোতি) উপাধিতে ভূষিত করেন।

২. মুঘল রাজনীতিতে নূরজাহানের ভূমিকা ও প্রভাবের ক্ষেত্রসমূহ:

প্রভাবের ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট রূপ ও ঐতিহাসিক নজির
১. নূরজাহান জান্তা বা কোটারি (Junta) গঠন ১৬১১ থেকে ১৬২২ সাল পর্যন্ত নূরজাহান তাঁর পিতা ইতিমাদুদ্দৌলা (মির্জা গিয়াস বেগ), ভাই আসিফ খান এবং যুবরাজ খুররম (শাহজাহান)-কে নিয়ে এক শক্তিশালী দল গড়ে তোলেন, যা মুঘল দরবারের সমস্ত সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করত।
২. সার্বভৌম ক্ষমতার প্রত্যক্ষ চর্চা সম্রাট জাহাঙ্গীরের শারীরিক অসুস্থতা ও সুরাসক্তির সুযোগে নূরজাহান ঝরোকা দর্শন দিতেন, রাজকীয় ফরমান জারি করতেন এবং তাঁর নিজস্ব সিলমোহর ব্যবহৃত হতো। এমনকি মুঘল মুদ্রায় সম্রাটের নামের সাথে নূরজাহানের নামও খোদাই করা হয়েছিল।
৩. সেনাপতি মহাব্বত খানের বন্দিত্ব থেকে উদ্ধার ১৬২৬ সালে সেনাপতি মহাব্বত খান সম্রাট জাহাঙ্গীরকে বন্দি করলে নূরজাহান হাতির পিঠে চড়ে স্বশরীরে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং কূটকৌশলে স্বামীকে মুক্ত করেন।
৪. শিল্প ও সংস্কৃতির উৎকর্ষ আগ্রায় পিতা ইতিমাদুদ্দৌলার অপূর্ব শ্বেতপাথরের সমাধি নির্মাণ করেন (যা পরবর্তীতে তাজমহলের নকশার অনুপ্রেরণা ছিল), আতর ও নতুন পোশাকের নকশা উদ্ভাবন করেন।

৩. নূরজাহানের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার নেতিবাচক দিক:
নিজের জামাতা শাহরিয়ারকে সিংহাসনে বসানোর অন্ধ মোহে তিনি যোগ্যতম যুবরাজ খুররম (শাহজাহান)-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং সেনাপতি মহাব্বত খানকে বিদ্রোহী হতে বাধ্য করেন। এর ফলে সাম্রাজ্যের শেষ বছরগুলোতে চরম গৃহযুদ্ধ ও রক্তপাত ঘটে।

উপসংহার:
১৬২৭ সালে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর নূরজাহান রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং লাহোরে নির্বাসিত জীবন যাপন করেন। কিছু রাজনৈতিক ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও মুঘল ইতিহাসের পুরুষতান্ত্রিক দরবারে নূরজাহানের মতো তেজস্বী ও বিদুষী নারী ব্যক্তিত্ব এক কালজয়ী ব্যতিক্রম।

৮। মুঘল সাম্রাজ্যের সংহতি বিধানে সম্রাট আকবরের নীতিসমূহ ব্যাখ্যা কর।

ভূমিকা:
জালালুদ্দীন মুহাম্মদ আকবর (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রি.) কেবল মুঘল সাম্রাজ্যের সীমানাই বিস্তার করেননি; বরং তিনি একটি ভঙ্গুর সামরিক বিজয়কে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সুদৃঢ়, সুসংহত ও বহুত্ববাদী আমলাতান্ত্রিক সাম্রাজ্যে রূপান্তর করেছিলেন। মাত্র তেরো বছর বয়সে বৈরাম খানের অভিভাবকত্বে সিংহাসনে বসে পরবর্তী অর্ধ শতাব্দী ধরে তিনি যে সর্বজনীন সমঝোতা, প্রশাসনিক সংস্কার ও ধর্মীয় উদারতার নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তার ফলেই মুঘল সাম্রাজ্য শত শত বছর টিকে থাকার সুদৃঢ় ভিত্তি লাভ করেছিল।

১. সাম্রাজ্যের সংহতি বিধানে আকবরের গৃহিত বহুমুখী নীতিসমূহ:

নীতির ক্ষেত্র গৃহীত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
১. রাজপুত নীতি (মৈত্রী ও বৈবাহিক সম্পর্ক) যুদ্ধ করে রাজপুতদের দমন করার চেয়ে তাদের সাথে সম্মানজনক বন্ধুত্ব করেন। অম্বরের রাজা ভারমালের কন্যা যোধাবাঈকে বিবাহ করেন এবং রাজা ভগবান দাস ও মানসিংহকে সর্বোচ্চ সামরিক সেনাপতি পদে আসীন করেন।
২. মনসবদারী প্রথা প্রবর্তন (১৫৭৭ খ্রি.) সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনকে মনসব (পদমর্যাদা) ও জাট-সাওয়ার পদ্ধতির সুশৃঙ্খল কাঠামোর অধীনে এনে সাম্রাজ্যের অভিজাতদের খোদ সম্রাটের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।
৩. রাজস্ব সংস্কার (আইন-ই-দহশালা ও টোডরমল) রাজস্ব সচিব রাজা টোডরমলের সহায়তায় সমগ্র সাম্রাজ্যের জমি জরিপ করে বিগত দশ বছরের গড় উৎপাদনের ওপর এক-তৃতীয়াংশ ন্যায্য খাজনা নির্ধারণ করেন।
৪. সাম্রাজ্যের প্রদেশায়ন (সুবা শাসন) সমগ্র সাম্রাজ্যকে ১৫টি সুবায় বিভক্ত করে সুবাদার, দিওয়ান, বখশী ও কোতোয়ালের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের সুদৃঢ় প্রশাসনিক চেইন নিশ্চিত করেন।
৫. সুলহ-ই-কুল বা সর্বজনীন সহনশীলতা জিজিয়া কর ও তীর্থকর রহিত করেন। সকল ধর্মের মানুষের ধর্মীয় উপাসনার পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করে ভারতীয় হিন্দুদের আস্থা অর্জন করেন।

২. দীন-ই-ইলাহী ও তার রাজনৈতিক মূল্যায়ন:
আকবর বিভিন্ন ধর্মের সারবস্তু নিয়ে ‘তৌহিদ-ই-ইলাহী’ বা ‘দীন-ই-ইলাহী’ নামে এক সমন্বয়বাদী নীতি চালু করেছিলেন। ঐতিহাসিকভাবে এটি কোনো সফল ধর্ম ছিল না এবং এর অনুসারী ছিল মাত্র আঠারো জন; কিন্তু এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম ও অমুসলিম প্রজাদের মধ্যে সম্রাটকে পরম শ্রদ্ধার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা।

উপসংহার:
আকবরের দূরদর্শী নীতিমালার ফলেই মুঘল সাম্রাজ্য একটি বিদেশি আক্রমণকারী শক্তি থেকে ভারতের জাতীয় ও মাটিঘেঁষা সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত হয়েছিল। এ কারণেই ঐতিহাসিকগণ তাঁকে ‘আকবর দ্য গ্রেট’ হিসেবে মূল্যায়ন করেন।

৯। জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের প্রধান ঘটনাবলি সংক্ষেপে আলোচনা কর।

ভূমিকা

১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে পিতা আকবরের মৃত্যুর পর যুবরাজ সেলিম ‘নুরুদ্দীন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশা গাজী’ উপাধি ধারণ করে মুঘল সিংহাসনে আরোহণ করেন (শাসনকাল: ১৬০৫—১৬২৭ খ্রি.)। তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণতা, শিল্পকলার প্রতি গভীর অনুরাগ এবং মেধা ও আবেগের এক মিশ্র ব্যক্তিত্ব।

জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের প্রধান প্রধান ঘটনাবলি

  • ১. বারোটি রাজকীয় ফরমান ও ন্যায়বিচারের জিঞ্জির (Zanjir-i-Adl): সিংহাসনে আরোহণের পরপরই তিনি প্রজাকল্যাণে ১২টি অনুশাসন জারি করেন; যার মধ্যে মাদকদ্রব্য নিষিদ্ধকরণ, অন্যায় কর বাতিল এবং বন্দিমুক্তি উল্লেখযোগ্য। সাধারণ মানুষের সরাসরি ন্যায়বিচারের জন্য তিনি আগ্রা দুর্গের শাহবুরুজ থেকে যমুনা নদীর তীর পর্যন্ত ৬০টি ঘণ্টা সম্বলিত একটি দীর্ঘ স্বর্ণের ন্যায়বিচারের শিকল ঝুলিয়ে দেন, যা টেনে যে কেউ খলিফাকে অভিযোগ জানাতে পারত।
  • ২. জ্যেষ্ঠ পুত্র খসরুর বিদ্রোহ (১৬০৬ খ্রি.): জাহাঙ্গীরের ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তাঁর জনপ্রিয় পুত্র যুবরাজ খসরু লাহোরে বিদ্রোহ করেন। জাহাঙ্গীর কঠোর হস্তে ভাইরোয়ালের যুদ্ধে খসরুকে পরাজিত ও বন্দি করেন। খসরুকে আশ্রয় ও আশীর্বাদ দেওয়ার অপরাধে শিখদের পঞ্চম গুরু অর্জুন দেবকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়, যা শিখ-মুঘল দীর্ঘমেয়াদী শত্রুতার সূচনা করে।
  • ৩. মেওয়ারের দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অবসান (১৬১৫ খ্রি.): আকবর যে মেওয়ার পুরোপুরি পদানত করতে পারেননি, জাহাঙ্গীরের পুত্র যুবরাজ খুররম (শাহজাহান) মেওয়ারের রানা অমর সিংহকে (রানা প্রতাপের পুত্র) পরাজিত করে মুঘলদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন। জাহাঙ্গীর অমর সিংহের প্রতি অত্যন্ত উদার ব্যবহার করে সম্মানজনক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন।
  • ৪. বাংলায় বারো ভূঁইয়াদের দমন ও ঢাকা রাজধানী স্থাপন: জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বাংলার সুবাদার ইসলাম খান চিশতি বাংলার স্বাধীনচেতা বারো ভূঁইয়াদের (ঈসা খাঁ ও মুসা খাঁর বংশধরদের) সম্পূর্ণরূপে দমন করেন এবং ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকাকে সুবাহ বাংলার রাজধানী করে এর নাম দেন ‘জাহাঙ্গীরনগর’।
  • ৫. সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের উত্থান (১৬১১ খ্রি.): ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে বিধবা মেহেরুন্নেসাকে (নূরজাহান) বিবাহের পর জাহাঙ্গীরের জীবনে এক অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটে। নূরজাহান ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী, বুদ্ধিমতী ও রাজনৈতিক দূরদর্শী। শেষ পনেরো বছর খিলাফতের প্রকৃত কর্তৃত্ব চলে যায় নূরজাহানের হাতে; এমনকি তাঁর নামে মুদ্রা জারি করা হতো।
  • ৬. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমন: জাহাঙ্গীরের রাজদরবারেই সর্বপ্রথম ব্রিটিশ রাজা প্রথম জেমসের দূত হিসেবে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হকিন্স (১৬০৮ খ্রি.) এবং স্যার টমাস রো (১৬১৫ খ্রি.) আগমন করেন। টমাস রো ভারতে ব্রিটিশদের জন্য সুরাটে কারখানা স্থাপন ও বাণিজ্য শুল্ক মওকুফের অনুমতি লাভ করেন, যা ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশের বীজ বপন করে।
  • ৭. কাংড়া দুর্গ ও কান্দাহার হাতছাড়া: ১৬২০ সালে তিনি পাঞ্জাবের অজেয় কাংড়া দুর্গ জয় করেন। তবে ১৬২২ সালে পারস্যের শাহ আব্বাস মুঘলদের হাত থেকে কৌশলগত কান্দাহার শহরটি দখল করে নেন।

উপসংহার

সম্রাট জাহাঙ্গীর ছিলেন মুঘল চিত্রকলা ও উদ্যানবিদ্যার শ্রেষ্ঠ সমঝদার। কাশ্মীরের শালিমার বাগ ও নিশাত বাগ তাঁর অমর শিল্পকীর্তি। ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে কাশ্মীর থেকে ফেরার পথে তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং লাহোরের শাহদরায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।


১০। টীকা লিখ (যে কোনো দুটি):

(ক) কুতুব মিনার

দিল্লির মেহরাউলিতে অবস্থিত ‘কুতুব মিনার’ ভারতের মুসলিম স্থাপত্যকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রাচীনতম বিস্ময়। ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লি সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দীন আইবেক প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহ.)-এর পুণ্য স্মৃতি এবং মুহাম্মদ ঘূরীর ভারত বিজয়ের স্মারক মিনার হিসেবে এর নির্মাণকাজ শুরু করেন। আইবেক কেবল মিনারের প্রথম তলা নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর উত্তরসূরি সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশ আরও তিনটি তলা নির্মাণ করে মিনারটি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক এর ওপর মার্বেল পাথরের আরও দুটি ক্ষুদ্র তলা সংযোজন করেন। ৭২.৫ মিটার (২৩৮ ফুট) উচ্চতাবিশিষ্ট এবং পাঁচ তলাবিশিষ্ট লাল বেলেপাথরের এই মিনারের গায়ে পবিত্র কুরআনের চমৎকার ক্যালিগ্রাফি খোদাই করা রয়েছে। এটি ইউনেস্কো ঘোষিত একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।

(খ) সুলতানা রাজিয়া

সুলতানা রাজিয়া (শাসনকাল: ১২৩৬—১২৪০ খ্রি.) ছিলেন মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষ এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের প্রথম মহিলা শাসক। পিতা সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশ পুত্রদের অযোগ্যতা ও বিলাসিতা দেখে স্বীয় বুদ্ধিমতী ও অসীম সাহসী কন্যা রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন। রক্ষণশীল সমাজ ও তুর্কি আমিরদের ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিল্লির মসনদে বসেন। তিনি পর্দাপ্রথা বর্জন করে পুরুষের মতো শিরস্ত্রাণ ও জোব্বা পরিধান করে রাজদরবারে বসতেন এবং হাতির পিঠে চড়ে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। তিনি ছিলেন বিচক্ষণ, ন্যায়পরায়ণ ও প্রজাবৎসল। কিন্তু তুর্কি আমিররা একজন নারীর কর্তৃত্ব সহ্য করতে না পেরে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ভাতিন্ডার গভর্নর আলতুনিয়া বিদ্রোহ করলে রাজিয়া তা দমনে যান এবং পরবর্তীতে কৌশলগত কারণে আলতুনিয়াকে বিবাহ করেন। কিন্তু ১২৪০ খ্রিস্টাব্দে ভাই বাহরাম শাহের সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

(গ) শের শাহ

শের শাহ সূরী (১৪৮৬—১৫৪৫ খ্রি.) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান প্রশাসক ও সংস্কারক। বিহারের এক সামান্য জায়গিরদারের পুত্র ফরিদ খাঁ থেকে নিজের অসীম বীরত্বে বাঘ হত্যা করে তিনি ‘শের খাঁ’ উপাধি পান। ১৫৩৯ সালে চৌসা এবং ১৫৪০ সালে কনৌজের (বিলগ্রাম) যুদ্ধে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে তিনি দিল্লিতে দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্য (সূরী বংশ) প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র পাঁচ বছরের শাসনামলে (১৫৪০—১৫৪৫ খ্রি.) তিনি ভারতীয় প্রশাসনে বৈপ্লবিক সংস্কার সাধন করেন। তিনি সোনারগাঁও থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত ৩,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশ্ববিখ্যাত ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’ (সড়ক-ই-আযম) নির্মাণ করেন। ঘোড়ার ডাক ব্যবস্থা, সরাইখানা, ছায়াদার বৃক্ষরোপণ, পাট্টা ও কবুলিয়ত পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষকের জমির মালিকানা নিশ্চিতকরণ এবং খাঁটি রৌপ্যমুদ্রা ‘রুপিয়া’ (যা বর্তমান রুপি ও টাকার ভিত্তি) প্রবর্তন করেন। ১৫৪৫ সালে কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধকালে বারুদ বিস্ফোরণে এই মহান বীরের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

(ঘ) সম্রাট শাহজাহান

মুঘল সম্রাট শাহজাহান (শাসনকাল: ১৬২৮—১৬৫৮ খ্রি.) ছিলেন মুঘল স্বর্ণযুগের শ্রেষ্ঠ রূপকার। তাঁর ৩০ বছরের শাসনামলকে ‘মুঘল স্থাপত্যকলার স্বর্ণযুগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তাঁর অমর কীর্তি হলো প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মরণে যমুনা নদীর তীরে শ্বেতপাথরে নির্মিত বিশ্বের অন্যতম সপ্তাশ্চর্য ‘তাজমহল’। এছাড়া দিল্লির লাল কেল্লা, জামে মসজিদ, দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস, ময়ূর সিংহাসন এবং কোহিনূর হীরক তাঁর রাজত্বকালের রাজকীয় ঐশ্বর্যের পরিচয় বহন করে। তিনি সাম্রাজ্যে শান্তি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শেষ জীবনে পুত্র আওরঙ্গজেবের সাথে উত্তরাধিকার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি জীবনের শেষ আট বছর আগ্রা দুর্গে বন্দি অবস্থায় তাজমহলের দিকে তাকিয়ে থেকে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ৩য় বর্ষ ইসলামের ইতিহাস ২য় পত্রের বিষয় কোড কত?

বিষয় কোড হলো ৪১৪।

পানিপথের প্রথম যুদ্ধ কত সালে সংঘটিত হয়?

১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে বাবর ও ইব্রাহিম লোদীর মধ্যে।

দাস বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কাকে বলা হয়?

সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশকে।

মুঘল রাজনীতিতে ‘নূরজাহান জান্তা’ কী?

সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের প্রভাবশালী প্রশাসনিক কোটারি।

গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের নির্মাতা কে?

সুর বংশের মহান শাসক শের শাহ সুরি।

সুলতানী আমলে তুগলক বংশের শ্রেষ্ঠ সমাজসেবক শাসক কে ছিলেন?

সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *