ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ৩য় পত্র (Islamic History and Culture 3rd Paper) – 415, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাযিল পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
আপডেট: September 27, 2026
৫৮ মিনিট পড়ার সময়
১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা – ২০২৪
বিষয়: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (ঐচ্ছিক) তৃতীয় পত্র (বিষয় কোড: ৪১৫)
[বাংলার ইতিহাস (১২০৪-১৭৫৭ খ্রিঃ পর্যন্ত)]
সময় : ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান : ১০০
[দ্রষ্টব্য : সকল প্রশ্নের মান সমান। যে কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ৩য় পত্র (বিষয় কোড: ৪১৫) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রি ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, প্রামাণ্য দলিল, বিশ্লেষণী ছক এবং ফলাফল সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।

১। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the achievements of Ghiyasuddin Azam Shah.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (১৩৯০-১৪১০ খ্রি.) ছিলেন মুসলিম বাংলার ইলিয়াস শাহী বংশের সর্বাপেক্ষা প্রজ্ঞাবান, প্রজাবাৎসল্য, সংস্কৃতিমনা ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ন্যায়পরায়ণ সুলতান। তিনি কেবল একজন দক্ষ শাসকই ছিলেন না; তিনি নিজে ছিলেন আরবি ও ফারসি ভাষার উঁচু মানের কবি, বিদ্যানুরাগী এবং আইনের নিরপেক্ষ অনুসারী এক অসাধারণ রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর শাসনামলে বাংলার সুনাম ও কূটনৈতিক প্রভাব সুদূর চীন, মক্কা, মদিনা ও পারস্যের রাজদরবার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।

১. নিরপেক্ষ ন্যায়বিচারের অনুপম ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত:
বাংলার ইতিহাসে আইনের অনুশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ প্রতীক ছিলেন গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। একদিন শিকারের সময় তাঁর তীরের আঘাতে এক দরিদ্র বিধবার একমাত্র পুত্রের অনিচ্ছাকৃত মৃত্যু ঘটে। বিধবা নারী প্রধান কাজী সিরাজউদ্দীনকে গিয়ে নালিশ করেন। কাজী নির্ভীকভাবে সুলতানকে আদালতে হাজিরার সমন জারি করেন। সুলতান রাজপোশাকের নিচে তলোয়ার লুকিয়ে সাধারণ আসামির মতো কাজীর আদালতে উপস্থিত হন এবং কাজীর রায় অনুযায়ী বিধবাকে সন্তুষ্টচিত্তে ক্ষতিপূরণ (দিয়াত) প্রদান করেন। বিচার শেষে কাজী সুলতানকে অভিবাদন জানালে সুলতান তলোয়ার দেখিয়ে বললেন: “যদি আপনি আমার পদে ভীত হয়ে অন্যায় রায় দিতেন, তবে এই তলোয়ার দিয়ে আপনার শিরশ্ছেদ করতাম!” কাজী তখন নিজের বেত দেখিয়ে বললেন: “আর আপনি যদি আদালতের রায় না মানতেন, তবে এই বেত দিয়ে আপনার পিঠের চামড়া তুলে নিতাম!”

২. শিক্ষা, সাহিত্য ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অবদানসমূহ:

অবদানের ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট রূপ ও ঐতিহাসিক নজির
১. পারস্যের অমর কবি হাফিজের সাথে পত্রালাপ সুলতান নিজের একটি ফারসি গজল অসম্পূর্ণ রেখে তা সমাপ্ত করার জন্য পারস্যের বিশ্ববিখ্যাত কবি হাফিজ সিরাজীকে আমন্ত্রণ জানান। হাফিজ গজলের বাকি অংশ পূরণ করে সুলতানকে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রশংসাসূচক কবিতা লিখে পাঠান।
২. বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা তিনিই প্রথম মুসলিম সুলতান যিনি বাংলা সাহিত্যের উদার পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় কবি শাহ মুহম্মদ সগীর মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ প্রণয়কাব্য ইউসুফ-জোলেখা রচনা করেন।
৩. মক্কা ও মদিনায় মাদ্রাসা ও জনকল্যাণ মক্কা ও মদিনার পবিত্র হারামাইনে হাজীদের সুবিধার জন্য বিশাল তহবিল পাঠিয়ে দুটি বিখ্যাত মাদ্রাসা (মাদ্রাসায়ে সুলতানিয়া বা গিয়াসিয়া) প্রতিষ্ঠা করেন এবং সুপেয় পানির নহর সংস্কার করেন।
৪. চীনের মিং সম্রাটের সাথে দূত বিনিময় ১৪০৫ থেকে ১৪০৯ সালের মধ্যে চীনের মিং সম্রাট ইয়ং লো-এর দরবারে একাধিকবার দূত ও উপহারসামগ্রী (যেমন বাংলার সুতিবস্ত্র ও জিরাফ) পাঠান এবং চীনা দূত মাহুয়ান বাংলায় আগমন করে বাংলার সমৃদ্ধির বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন।

উপসংহার:
সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ছিলেন মধ্যযুগীয় বাংলার রেনেসাঁসের প্রাণপুরুষ। তাঁর ন্যায়বিচার, আন্তর্জাতিক মৈত্রী এবং মাতৃভাষার প্রতি উদার মনোভাব তাঁকে বাংলার ইতিহাসের এক অমর সোনালী নক্ষত্রে পরিণত করেছে।

২। শিক্ষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আলাউদ্দিন হোসেন শাহের অবদান নিরূপণ কর।

[Determine the contribution of Alauddin Husain Shah as a patron of education and literature.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রি.) ছিলেন মুসলিম বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের শ্রেষ্ঠতম রত্ন এবং ‘হোসেন শাহী বংশের’ প্রতিষ্ঠাতা। হবসী শাসকদের চরম নৈরাজ্য ও অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে তিনি বাংলার মসনদে বসেন। তাঁর দীর্ঘ ছাব্বিশ বছরের শাসনামল ছিল বাংলার জ্ঞান-বিজ্ঞান, ভাষা, সাহিত্য, স্থাপত্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অবিসংবাদিত স্বর্ণযুগ। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে তিনি এত গভীর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন যে হিন্দু কবিগণ তাঁকে ‘নৃপতি তিলক’, ‘জগৎভূষণ’ এবং ‘কলিযুগের কৃষ্ণ’ বলে বন্দনা করেছেন।

১. শিক্ষা ও বাংলা সাহিত্যের অনন্য পৃষ্ঠপোষকতা:
হোসেন শাহের পূর্ব পর্যন্ত বাংলা ভাষা ছিল অবহেলিত; কিন্তু হোসেন শাহ ও তাঁর সেনাপতিদের প্রত্যক্ষ অর্থানুকূল্যে বাংলা ভাষা প্রথমবারের মতো রাজকীয় মর্যাদা লাভ করে:
– মহাভারত ও ভাগবতের বাংলা রূপান্তর ও প্রচার: তাঁর আদেশে কবীন্দ্র পরমেশ্বর ও শ্রীকর নন্দী মহাভারত বাংলায় ভাষান্তর করেন। তাঁর আমলেই মালাধর বসু ভাগবত ভাষান্তরিত করে ‘গুণরাজ খান’ উপাধি পান।
– মনসামঙ্গল ও মুসলিম কবিগণ: বিজয়গুপ্ত ও বিপ্রদাস পিপিলাই তাঁদের মনসামঙ্গল কাব্যে সুলতানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কবি সৈয়দ সুলতান ও যশোরাজ খান তাঁর দরবারের অমূল্য সম্পদ ছিলেন।

২. আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সামগ্রিক অবদানসমূহের রূপরেখা:

অবদানের ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট রূপ ও ঐতিহাসিক নজির
১. প্রশাসনিক সংস্কার ও হবসী বিতাড়ন সিংহাসনে বসেই তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত ও উগ্র হবসী রক্ষীদের বরখাস্ত করে বাংলা থেকে বিতাড়িত করেন এবং পাণ্ডুয়া ও গৌড়ের শৃঙ্খলা ফেরান।
২. সাম্রাজ্য বিস্তার (আসাম ও উড়িষ্যা) আসামের কামরূপ ও কামতা জয় করেন এবং উড়িষ্যার গজপতি রাজাকে পিছু হটতে বাধ্য করে বাংলার সীমানা সুরক্ষিত করেন।
৩. শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলন ও নিরাপত্তা শ্রীচৈতন্যদেবের বৈষ্ণব ভাবান্দোলনে কোনো বাধা না দিয়ে বরং স্থানীয় কর্মচারীদের নির্দেশ দেন যেন চৈতন্যের প্রচারে কেউ বিঘ্ন না ঘটায়।
৪. হিন্দুদের উচ্চপদে নিয়োগ তাঁর একান্ত সচিব ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন দুই হিন্দু ভাই রূপ গোস্বামী (সাকির মল্লিক) ও সনাতন গোস্বামী (দবীর খাস)। তাঁর প্রধান চিকিৎসক ছিলেন মুকুন্দ দাস।
৫. ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন গৌড়ে ঐতিহাসিক ‘ছোটা সোনা মসজিদ’ এবং ‘গুনমন্ত মসজিদ’ তাঁর আমলেই নির্মিত হয়, যা বাংলার পোড়ামাটির স্থাপত্যের চরম পরাকাষ্ঠা।

উপসংহার:
আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ছিলেন ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠা এক মহান উদারতাবাদী সম্রাট। তাঁর শাসনামলে বাংলা যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক প্রস্ফুটন ও সামাজিক সম্প্রীতি দেখেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

৩। সম্রাট আকবর কর্তৃক বাংলা বিজয়ের কারণ ও ফলাফল ব্যাখ্যা কর।

[Explain the causes and consequences of the conquest of Bengal by Emperor Akbar.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আকবর কর্তৃক বাংলা বিজয় মধ্যযুগীয় বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সুদূরপ্রসারী ঘটনা। এর মাধ্যমে দীর্ঘ আড়াই শত বছরের স্বাধীন সুলতানি যুগের অবসান ঘটে এবং বাংলা একটি কেন্দ্রীয় সাম্রাজ্যের প্রাদেশিক ইউনিটে (সুবা বাংলা) রূপান্তরিত হয়। স্বাধীন আফগান কররানী সালতানাতের উদ্ধত অবস্থান এবং ভারতের পূর্ব সীমান্তে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অমোঘ তাগিদ থেকেই আকবর এই ঐতিহাসিক অভিযানে মনোনিবেশ করেছিলেন।

১. আকবরের বাংলা অভিযানের প্রধান কারণসমূহ:
– দাউদ খান কররানীর অবাধ্যতা: সুলাইমান কররানী আকবরের প্রতি মৌখিক আনুগত্য রাখলেও তাঁর পুত্র দাউদ খান কররানী আকবরের নাম বাদ দিয়ে নিজের নামে মুদ্রা জারি করেন ও খুতবা পড়েন, যা ছিল সাম্রাজ্যের জন্য প্রকাশ্য বিদ্রোহ।
– মুঘল বিদ্রোহীদের আশ্রয় প্রদান: আকবরের বিরোধী আফগান ও অন্যান্য বিদ্রোহী সর্দাররা বাংলায় এসে আশ্রয় নিত।
– বাংলার অপরিমেয় সম্পদ ও রাজস্ব: আকবর উপলব্ধি করেছিলেন যে বাংলার উর্বর পলিমাটি, বস্ত্রশিল্প ও নৌবাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ভিত্তি পূর্ণতা পাবে না।

২. বাংলা বিজয়ের প্রধান সামরিক অভিযান ও রাজমহলের যুদ্ধ (১৫৭৬ খ্রি.):

যুদ্ধের পর্যায় ঐতিহাসিক ঘটনা ও যুদ্ধক্ষেত্র ফলাফল ও তাৎপর্য
১. আকবরের পাটনা বিজয় (১৫৭৪ খ্রি.) আকবর স্বয়ং বর্ষাকালে নৌবাহিনী নিয়ে পাটনা আক্রমণ করে দাউদ কররানীকে বাংলায় পালাতে বাধ্য করেন। সেনাপতি মুনিম খান ও রাজা তোদরমলকে বাংলা দখলের দায়িত্ব দেন। বিহার মুঘলদের দখলে আসে এবং বাংলার তোরণ উন্মুক্ত হয়।
২. তুকারয়ের যুদ্ধ (১৫৭৫ খ্রি.) উড়িষ্যার তুকারয়ে আফগানদের সাথে মুঘলদের তীব্র রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। দাউদ কররানী সাময়িক সন্ধি করেন কিন্তু মুনিম খানের মৃত্যুর পর পুনরায় বাংলা দখল করেন। আফগানদের সাময়িক পুনরুত্থান।
৩. ঐতিহাসিক রাজমহলের যুদ্ধ (১২ জুলাই, ১৫৭৬ খ্রি.) মুঘল সেনাপতি খান-ই-জাহান হুসাইন কুলী বেগ এবং রাজা তোদরমলের নেতৃত্বে চূড়ান্ত যুদ্ধ হয়। দাউদ কররানী পরাজিত ও বন্দি হন এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বাংলার স্বাধীন কররানী বংশের চিরতরে বিলুপ্তি এবং সুবা বাংলা হিসেবে মুঘল সাম্রাজ্যভুক্তির আনুষ্ঠানিক সূচনা।

৩. আকবর কর্তৃক বাংলা বিজয়ের সুদূরপ্রসারী ফলাফল:
– সুবা বাংলার জন্ম ও তোদরমলের বন্দোবস্ত: সমগ্র বাংলাকে ১৯টি সরকার এবং ৬৮২টি পরগনায় বিভক্ত করে প্রায় এক কোটি টাকার রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়।
– বার ভূঁইয়াদের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ: রাজমহলের যুদ্ধে রাজধানী গৌড়-তাণ্ডা মুঘলদের দখলে এলেও ভাটি অঞ্চলে ঈসা খাঁর নেতৃত্বে বার ভূঁইয়ারা আকবরের জীবদ্দশায় মুঘলদের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব মেনে নেয়নি। আকবরকে আজীবন বাংলায় সামরিক বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল।

উপসংহার:
আকবরের বাংলা বিজয় বাংলাকে একটি আঞ্চলিক স্বাধীন রাষ্ট্র থেকে সর্বভারতীয় বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রবাহের সাথে যুক্ত করেছিল।

৪। সুবাদার শায়েস্তা খানের শাসনামলের বিবরণ দাও।

[Describe the reign of Subahdar Shaista Khan.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
মুঘল আমলে সুবা বাংলার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা দীর্ঘমেয়াদী, শান্তিপূর্ণ ও সফল সুবাদার ছিলেন নবাব মির্জা আবু তালিব ওরফে শায়েস্তা খান (১৬৬৪-১৬৭৮ এবং ১৬৭৯-১৬৮৮ খ্রি.)। তিনি ছিলেন সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ভ্রাতুষ্পুত্র এবং সম্রাট আওরঙ্গজেবের আপন মামা। সুবাদার মীর জুমলার মৃত্যুর পর চরম সংকটকালে তিনি বাংলার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ বাইশ বছরের শাসনামলে তিনি একদিকে আরাকানী মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের নির্মম দৌরাত্ম্য থেকে বাংলাকে চিরতরে মুক্ত করেন, অন্যদিকে অভাবনীয় সুশাসন ও সস্তা দ্রব্যমূল্যের মাধ্যমে বাংলার অর্থনীতিকে চরম সমৃদ্ধির শিখরে নিয়ে যান।

১. মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যু দমন এবং চট্টগ্রাম বিজয় (১৬৬৬ খ্রি.):
বাংলার দক্ষিণ ও উপকূলীয় অঞ্চল তখন আরাকানের মগ ও পর্তুগিজ হার্মাদ জলদস্যুদের অভয়ারণ্য ছিল। তারা গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করত।
– শায়েস্তা খান ঢাকায় বিশাল নৌবাহিনী (প্রায় ৩০০ যুদ্ধজাহাজ) গড়ে তোলেন।
– তিনি কূটকৌশলে প্রচুর অর্থ ও সুবিধা দিয়ে পর্তুগিজদের মগদের পক্ষ থেকে ভাগিয়ে এনে মুঘল পক্ষে নেন।
– ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর পুত্র বুজুর্গ উমেদ খানের নেতৃত্বে একাধারে স্থল ও নৌ অভিযান চালিয়ে দুর্ভেদ্য চট্টগ্রাম দুর্গ অধিকার করেন এবং মগদের আরাকানে তাড়িয়ে দেন। চট্টগ্রামের নতুন নাম রাখা হয় ‘ইসলামাবাদ’।

২. শায়েস্তা খানের সুশাসন ও ঢাকার স্থাপত্য বিকাশ:

কৃতিত্বের ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট রূপ ও ঐতিহাসিক নজির
১. টাকায় আট মণ চাল (প্রবাদতুল্য সস্তা) তাঁর আমলে বাংলার কৃষি উৎপাদন এত বিপুল ছিল যে বাজারে ১ টাকায় আট মণ (৩২০ কেজি) চাল পাওয়া যেত। ঢাকা ত্যাগের সময় তিনি পশ্চিম ফটক বন্ধ করে লিখে যান—”যে শাসক টাকায় আট মণ চাল বিক্রি করতে পারবে, সে-ই যেন কেবল এই দরজা খোলে!”
২. লালবাগ কেল্লা ও পরীবিবির মাজার যুবরাজ মুহাম্মদ আজম শাহের শুরু করা লালবাগ কেল্লার নির্মাণ তিনি এগিয়ে নেন। তাঁর প্রিয় কন্যা ইরান দুখত ওরফে ‘পরীবিবি’র অকাল মৃত্যুতে তিনি রাজকীয় শ্বেতপাথরের সমাধি নির্মাণ করেন।
৩. সাতগম্বুজ মসজিদ ও ছোট কাটরা বুড়িগঙ্গার তীরে ছোট কাটরা, সাতগম্বুজ মসজিদ এবং চকবাজার শায়েস্তা খানী মসজিদ নির্মাণ করে ঢাকাকে স্থাপত্যের নগরীতে রূপ দেন।
৪. ইংরেজদের ঔদ্ধত্য দমন ১৬৮৬ সালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবিমৃষ্যকারিতার জবাবে জব চার্নকের বাহিনীকে হুগলি থেকে বিতাড়িত করেন এবং কোম্পানিকে মুঘল শক্তির সামনে মাথা নত করতে বাধ্য করেন।

উপসংহার:
শায়েস্তা খানের শাসনামলকে মধ্যযুগীয় বাংলার ‘স্বর্ণালী প্রবাদযুগ’ বলা হয়। তাঁর কঠোর নিরাপত্তা বিধান এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রনীতির ফলেই ঢাকা একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

৫। বাংলায় আফগান শাসন প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লেখ।

[Write a brief history of the establishment of Afghan rule in Bengal.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
মধ্যযুগীয় ভারতে আফগান বা পাঠানরা ছিল এক দুর্ধর্ষ, স্বাধীনতাকামী ও যুদ্ধপ্রিয় জাতি। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর কর্তৃক ইব্রাহিম লোদীর পতনের পর উত্তর ভারত থেকে বিতাড়িত আফগানরা পূর্ব ভারতের বাংলা ও বিহার অঞ্চলকে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা ও প্রতিরোধের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত করে। শের শাহ সুরির বিজয়ের মধ্য দিয়ে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় যে স্বাধীন আফগান শাসনের সূচনা হয়েছিল, তা সুলাইমান কররানী ও দাউদ কররানী হয়ে ১৫৭৬ সাল পর্যন্ত প্রায় চার দশক ধরে চরম প্রতাপের সাথে টিকে ছিল।

১. বাংলায় আফগান শাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান পর্যায়সমূহ:

ঐতিহাসিক পর্ব শাসক ও বংশ মূল রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও তাৎপর্য
১. সুর বংশীয় শাসন (১৫৩৮-১৫৫৩ খ্রি.) শের শাহ সুরি ও তাঁর সুবাদারগণ (খিজির খান, কাজী ফজিলত, মুহাম্মদ খান সুর) ১৫৩৮ সালে শের শাহ বাংলার শেষ সুলতানি শাসক গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহকে উৎখাত করে গৌড় অধিকার করেন। হুমায়ুনের সাময়িক দখলের পর শের শাহ পুনরায় বাংলা দখল করে প্রশাসনিক সংস্কার করেন।
২. স্বাধীন সুর সালতানাত (১৫৫৩-১৫৬৪ খ্রি.) মুহাম্মদ খান সুর (শামসুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ) ও গিয়াসউদ্দিন জালাল শাহ দিল্লির সুর সাম্রাজ্য ভেঙে পড়লে বাংলার আফগান সুবাদাররা স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজেদের নামে মুদ্রা ও খুতবা জারি করেন।
৩. কররানী সালতানাত (১৫৬৪-১৫৭৬ খ্রি.) তাজ খান কররানী, সুলাইমান খান কররানী ও দাউদ খান কররানী বাংলায় আফগান শক্তির চূড়ান্ত স্বর্ণযুগ। উড়িষ্যা ও কুচবিহার বিজয়। মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আফগানদের শেষ সার্বভৌম প্রতিরোধ।

২. আফগান শাসনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:
– মুঘল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধ: বহিরাগত মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে আফগানরা বাংলার মাটি ও মানুষকে সাথে নিয়ে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
– প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও উসূলে ফিকহ: আফগানরা কঠোর কেন্দ্রিয়করণের বদলে গোত্রপ্রধানদের সম্মান দিয়ে সামন্ততান্ত্রিক ভারসাম্যে শাসন পরিচালনা করত। শের শাহের ন্যায়বিচার ও দ্রুত ডাকব্যবস্থার সুফল বাংলায় বাস্তবায়িত হয়েছিল।
– স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে একাত্মতা: মুঘলদের মতো অহংকারী না হয়ে আফগানরা বাংলার স্থানীয় জমিদার ও সাধারণ মানুষের সাথে সহজে মিশে গিয়ে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল।

উপসংহার:
১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে কররানী বংশের পতনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক আফগান সালতানাত বিলুপ্ত হলেও তাদের অবশিষ্টাংশ বার ভূঁইয়াদের প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিয়েছিল। বাংলার ইতিহাসে আফগান শাসন ছিল স্বাধীনতার এক অদম্য প্রতীক।

৬। সুলতানী বাংলার রাজস্ব প্রশাসন ব্যবস্থার বিবরণ দাও।

[Describe the revenue administrative system of Sultanate Bengal.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
মধ্যযুগীয় স্বাধীন সুলতানি আমলে (১৩৩৮-১৫৩৮ খ্রি.) বাংলার রাষ্ট্রীয় সমৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামরিক পরাক্রমের মূল চালিকাশক্তি ছিল এর সুসংগঠিত, বৈজ্ঞানিক ও প্রজাবান্ধব ‘রাজস্ব প্রশাসন ব্যবস্থা’ (Revenue Administration)। নদীমাতৃক উর্বর পলিমাটির অফুরন্ত কৃষি উৎপাদন, বস্ত্রশিল্পের বিশ্বজোড়া খ্যাতি এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের ওপর কার্যকর কর ব্যবস্থার সমন্বয়ে সুলতানগণ এক বিশাল রাজকোষ গড়ে তুলেছিলেন, যা দিল্লির অধীনতামুক্ত স্বাধীন বাংলা পরিচালনায় মূল ভূমিকা রেখেছিল।

১. সুলতানি বাংলার আয়ের প্রধান প্রধান উৎসসমূহ:

রাজস্বের উৎস ইসলামী ও স্থানীয় পরিভাষা আদায়ের নিয়ম ও হার
১. ভূমির রাজস্ব (Land Revenue) খারাজ (خراج) ও মালগুজারি উৎপাদিত ফসলের এক-পঞ্চমাংশ (১/৫) বা এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) ভাগ রাষ্ট্রের পাওনা হিসেবে ধার্য হতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শস্য বা মুদ্রার মাধ্যমে পরিশোধ করা যেত।
২. বাণিজ্য শুল্ক ও শুল্ক কর জাকাত ও রাহদারী (Chungi) নদী বন্দর (সাতগাঁও, সোনারগাঁও, চট্টগ্রাম) এবং হাট-বাজারে পণ্যের ওপর নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক শুল্ক ধার্য ছিল।
৩. টাঁকশাল ও মুদ্রা ব্যবস্থা সিক্কা ও জুরূব স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে প্রতিটি সুলতান নিজ নামে রৌপ্যমুদ্রা (টঙ্কা) জারি করতেন। মুদ্রা তৈরিতে রাজকোষের আয় হতো।
৪. অমুসলিমদের নিরাপত্তা কর জিজিয়া (Jizya) সামরিক বাহিনীতে অংশ না নেওয়া সক্ষম অমুসলিম পুরুষদের ওপর নামমাত্র বাৎসরিক নিরাপত্তা কর ধার্য ছিল (দরিদ্র, নারী ও সন্ন্যাসীরা মুক্ত ছিল)।
৫. উপহার ও নজরানা পেশকশ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনিমত) অধীনস্থ সামন্ত রাজা এবং বিদেশি রাজদূতদের প্রেরিত উপঢৌকন।

২. প্রশাসনিক কাঠামো ও কর্মকর্তা শ্রেণি:
– আমিল ও শিকদার: প্রতিটি শিক বা পরগনায় রাজস্ব পরিমাপ ও আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন সরকারি আমিল ও শিকদারগণ।
– পাটোয়ারী ও চৌধুরী: গ্রাম পর্যায়ে জমির হিসাব ও করের পরিমাণ নির্ধারণে স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিমদের নিয়ে গঠিত সনাতন পাটোয়ারী ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়েছিল।
– কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষা: সুলতানি আমলে মধ্যস্বত্বভোগীদের অত্যাচার ছিল অত্যন্ত সীমিত। খরা বা প্লাবনের সময় সুলতানগণ উদারহস্তে খাজনা মওকুফ করতেন এবং বায়তুল মাল থেকে সহায়তা দিতেন।

উপসংহার:
সুলতানি বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থা ছিল অতিরিক্ত শোষণের হাত থেকে মুক্ত এক ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি। এই অর্থনৈতিক শক্তির কারণেই সুলতানি বাংলা প্রায় দুইশত বছর দিল্লির কোনো আর্থিক বা রাজনৈতিক দাসত্ব না মেনে এক সার্বভৌম ভূস্বর্গ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল।

৭। মুঘল বাংলার সামাজিক জীবনের একটি চিত্র তুলে ধর।

[Depict a picture of the social life in Mughal Bengal.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
মুঘল আমলে (১৫৭৬-১৭৫৭ খ্রি.) বাংলার সামাজিক জীবনে এক অভূতপূর্ব রূপান্তর, সাংস্কৃতিক মিশ্রণ ও নাগরিক সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের প্রসার এবং রাজধানী হিসেবে ঢাকার অভ্যুত্থানের ফলে সনাতন গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার পাশাপাশি এক সমৃদ্ধ অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হয়। একই সাথে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যকার পারস্পরিক সম্প্রীতি, সুফি ও বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাব এবং লোকসংস্কৃতির বিকাশ মুঘল বাংলার সমাজকে এক অনন্য স্বকীয়তা দান করেছিল।

১. মুঘল বাংলার সামাজিক স্তরবিন্যাস:

সামাজিক শ্রেণি অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিবর্গ ও মর্যাদা জীবনযাত্রার মান ও বৈশিষ্ট্য
১. উচ্চবিত্ত ও শাসক শ্রেণি (আশরাফ ও অভিজাত) সুবাদার, দিওয়ান, মনসবদার, মুঘল সেনাপতি, জমিদার এবং উচ্চপদস্থ কাজী ও আলেম। সুদৃশ্য হাবেলী ও কাটোরায় বাস, পারসিক শিষ্টাচার, বিলাসী পোশাক (মসলিন, জামদানি) ও রাজকীয় খাদ্য (পোলাও, কোরমা, বাকরখানি)।
২. মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী শ্রেণি মুৎসুদ্দি, দেওয়ানি কেরানী, বণিক (মারোয়াড়ি, শেঠ), চিকিৎসক ও শিক্ষক। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল; ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজকার্যে প্রভাব বিস্তারকারী শ্রেণি।
৩. নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী শ্রেণি (আতরাফ ও প্রজা) কৃষক, তাঁতি, কামার, কুমার, জেলে ও দিনমজুর। অত্যন্ত সাদামাটা কুটিরে বাস, লুঙ্গি-ধুতি পরিধান, শাক-ভাত ও মাছ প্রধান খাদ্য। তবে সস্তা দ্রব্যমূল্যের কারণে অনাহার ছিল না।

২. ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি:
– হিন্দু-মুসলিম মিলনমেলা: মুঘল আমলে ধর্মীয় উগ্রতা ছিল না বললেই চলে। মুসলিমদের ঈদ ও মহররমের মিছিলে হিন্দুরা অংশ নিত; আবার হিন্দুদের দুর্গাপূজা ও হোলি উৎসবে মুসলিমরা শুভেচ্ছা বিনিময় করত।
– সুফি ও পীর সংস্কৃতির প্রভাব: প্রতিটি অঞ্চলে সুফি সাধক ও পীরদের মাজার বা দরগাহ ছিল সর্বজনীন শ্রদ্ধার স্থান। লালন শাহ, বাউল গান এবং মরমি মারফতি সুর বাংলার মানুষের অন্তরে প্রেম ও সহনশীলতার বীজ বুনে দেয়।
– নারীর সামাজিক অবস্থান: সমাজে পর্দার প্রচলন ছিল প্রবল। সম্ভ্রান্ত নারীরা অন্তঃপুরে থাকতেন। তবে পরিবারে তাদের মতামত সম্মানিত হতো এবং নবাবদের পরিবারে নারীরা (যেমন আলীবর্দীর পত্নী বা পরীবিবি) রাজনীতিতেও পরোক্ষ ভূমিকা রাখতেন।

৩. শিক্ষা, উৎসব ও বিনোদন:
মক্তব ও মাদ্রাসায় কুরআন, আরবি ও ফারসি ভাষা শেখানো হতো; অন্যদিকে পাঠশালায় সংস্কৃত ও হিসাব শিক্ষা দেওয়া হতো। নৌকা বাইচ, কুস্তি, ঘুড়ি ওড়ানো এবং যাত্রাপালা ছিল সর্বস্তরের মানুষের প্রধান সামাজিক বিনোদন।

উপসংহার:
মুঘল বাংলার সমাজ ছিল শান্তি, প্রাচুর্য ও মানবিক সহাবস্থানের এক অনন্য রূপ। এই সামাজিক সম্প্রীতিই আজকের আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ ও পরমতসহিষ্ণু বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তিভূমি।

৮। মুর্শিদকুলী খানের রাজস্ব সংস্কারসমূহ আলোকপাত কর।

[Shed light on the revenue reforms of Murshid Quli Khan.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
অষ্টাদশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে অর্থনৈতিকভাবে চরম বিশৃঙ্খল ও রাজস্ব ঘাটতিতে নিমজ্জিত সুবা বাংলাকে ভারতের সর্বাধিক অর্থসমৃদ্ধ ও লাভজনক প্রদেশে রূপান্তর করেছিলেন নবাব মুর্শিদ কুলী খান (১৭০০-১৭২৭ খ্রি.)। সম্রাট আওরঙ্গজেব কর্তৃক ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার ‘দিওয়ান’ (রাজস্ব প্রধান) নিযুক্ত হয়ে তিনি যে যুগান্তকারী রাজস্ব ও প্রশাসনিক সংস্কার সাধন করেছিলেন, তা বাংলার ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে। তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্যের কারণেই পরবর্তীতে তাঁকে বাংলার প্রথম স্বাধীন ‘নাজিম’ বা নবাবের মর্যাদায় উন্নীত করা হয় এবং রাজধানী ঢাকা থেকে ‘মুর্শিদাবাদে’ স্থানান্তরিত হয়।

১. মুর্শিদ কুলী খানের ঐতিহাসিক রাজস্ব সংস্কারসমূহ:

সংস্কারের ক্ষেত্র গৃহীত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও আধুনিকায়ন অর্থনৈতিক ফলাফল ও প্রভাব
১. জায়গীর জমিকে খাস জমিতে রূপান্তর (খালসা) মনসবদার ও কর্মচারীদের ভোগদখলে থাকা উর্বর জায়গীর জমিগুলো সরকারি ‘খালসা’ (সরাসরি সরকারের অধীন) জমিতে রূপান্তর করেন এবং তাদের উড়িষ্যার অনাবাদী জমি দেন। সরকারের সরাসরি রাজস্ব আয় বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।
২. ‘মাল জামিনী’ বা ইজারাদারি প্রথা প্রবর্তন পুরাতন বংশানুক্রমিক অবাধ্য জমিদারদের ক্ষমতা খর্ব করে চুক্তিভিত্তিক মধ্যস্বত্বভোগী ‘ইজারাদার’ বা নতুন হিন্দু জমিদার (যেমন নাটোর, বর্ধমান, রাজশাহী) সৃষ্টি করেন। রাজস্ব আদায়ে শতভাগ নিশ্চয়তা ও জবাবদিহিতা তৈরি হয়।
৩. ‘তাকাবী’ বা কৃষিঋণ বিতরণ খরার সময় দরিদ্র কৃষকদের বীজ, বলদ ও লাঙ্গল কেনার জন্য রাজকোষ থেকে অগ্রিম সুদবিহীন ‘তাকাবী ঋণ’ প্রদান করেন। কৃষি উৎপাদন অব্যাহত থাকে এবং অনাবাদি জমি আবাদের আওতায় আসে।
৪. কঠোর জরিপ ও সময়মতো খাজনা আদায় সমগ্র বাংলার জমি জরিপ করে প্রকৃত উৎপাদনের ভিত্তিতে ন্যায্য খাজনা নির্ধারণ করেন। তবে খাজনা ফাঁকি দিলে জমিদারদের ওপর কঠোর শাস্তি (যেমন বৈকুণ্ঠবাস বা মলকূপে বন্দি রাখা) আরোপ করতেন। রাজস্ব ফাঁকি চিরতরে বন্ধ হয়।

২. রাজকোষের সমৃদ্ধি ও দিল্লির সহায়তা:
মুর্শিদ কুলী খানের এই সংস্কারের ফলে বাংলার বার্ষিক রাজস্ব এক কোটি ত্রিশ লক্ষ টাকায় উন্নীত হয়। সমস্ত স্থানীয় ব্যয় মিটিয়ে তিনি প্রতি বছর নিয়মিত এক কোটি তিন লক্ষ টাকা দিল্লির কেন্দ্রীয় রাজকোষে পাঠাতেন, যা তৎকালীন ক্ষয়িষ্ণু মুঘল সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখার প্রধান লাইফলাইনে পরিণত হয়েছিল।

উপসংহার:
মুর্শিদ কুলী খানের রাজস্ব নীতি ছিল আধুনিক আমলাতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার পূর্বসূরি। তাঁর সংস্কারের ফলেই বাংলা অষ্টাদশ শতকে সমগ্র ভারতবর্ষের সবচেয়ে ধনী ও সমৃদ্ধ প্রদেশে পরিণত হয়েছিল।

৯। নবাব আলীবর্দী খানের প্রশাসনিক কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the administrative achievements of Nawab Alivardi Khan.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে যখন দিল্লিতে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনোন্মুখ ধ্বংসস্তূপ এবং বাংলায় চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল, তখন এক অসাধারণ সামরিক প্রজ্ঞা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন নবাব আলীবর্দী খান (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রি.)। সরফরাজ খানকে গিরিয়ার যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলার মসনদে বসা এই বিচক্ষণ নবাব দীর্ঘ ষোলো বছরের শাসনামলে একদিকে দুর্ধর্ষ মারাঠা দস্যুদের (বর্গী) আক্রমণ থেকে বাংলাকে রক্ষা করেছিলেন, অন্যদিকে ইউরোপীয় বণিকদের ঔদ্ধত্য কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করে দেশে অভাবনীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিলেন।

১. মারাঠা বর্গী আক্রমণ প্রতিরোধ ও ঐতিহাসিক কৃতিত্ব:
আলীবর্দী খানের শাসনামলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ভাস্কর পণ্ডিত ও রঘুজী ভোঁসলের নেতৃত্বে মহারাষ্ট্রীয় মারাঠাদের উপর্যুপরি দশ বছরের (১৭৪২-১৭৫১ খ্রি.) বিধ্বংসী আক্রমণ। মারাঠারা মেদিনীপুর, বর্ধমান ও উড়িষ্যায় নারকীয় গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিকাণ্ড চালাত, যা বাংলার লোকসাহিত্যে ‘বর্গীর হাঙ্গামা’ নামে কুখ্যাত। वृद्ध বয়সেও আলীবর্দী ঘোড়ার পিঠে চড়ে নিজে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং অবশেষে ১৭৫১ সালে উড়িষ্যার রাজস্ব প্রদান ও বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা ‘চৌথ’ দানের বিনিময়ে মারাঠাদের সাথে শান্তি চুক্তি করে দেশে স্থায়ী স্বস্তি ফিরিয়ে আনেন।

২. নবাব আলীবর্দী খানের প্রধান প্রধান প্রশাসনিক সংস্কার ও অবদান:

প্রশাসনিক ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট রূপ ও নীতি
১. ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ইংরেজ ও ফরাসিদের দুর্গ নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন। তিনি তাদের ‘মৌমাছির চাক’-এর সাথে তুলনা করতেন—”মধু চাইলে লাভবান হওয়া যায়, কিন্তু খোঁচা দিলে কামড়ে হুল ফুটিয়ে দেবে।”
২. কৃষি ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বর্গী হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন, কৃষিঋণ মওকুফ এবং নতুন হাট-বাজার স্থাপন করে রাজস্ব প্রবাহ স্বাভাবিক করেন।
৩. সেনাবাহিনী পুনর্গঠন ও আধুনিকায়ন আফগান বিদ্রোহ (মুস্তফা খাঁ) কঠোর হস্তে দমন করে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করেন।
৪. হিন্দু-মুসলিম রাজকর্মচারী সমন্বয় রায় দুর্লভ, রামনারায়ণ, মীরজাফরদের মেধার ভিত্তিতে প্রশাসনে সমান অধিকার ও উচ্চপদে আসীন করেন।

৩. উত্তরাধিকার নির্ধারণ ও ট্র্যাজেডি:
আলীবর্দী খানের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তাই তিনি তাঁর কনিষ্ঠা কন্যার পুত্র তরুণ সিরাজউদ্দৌলাকে প্রাণাধিক ভালোবাসতেন এবং নিজের উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর ঘষেটি বেগম ও শওকত জঙ্গের পারিবারিক ঈর্ষা এবং ইংরেজদের চক্রান্তই বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত করার পথ সুগম করেছিল।

উপসংহার:
নবাব আলীবর্দী খান ছিলেন মুসলিম বাংলার শেষ বলিষ্ঠ ও সফল শাসক। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, কোনো বিদেশি শক্তি বা অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রকারী বাংলার সার্বভৌমত্বে হাত দেওয়ার সাহস পায়নি।

১০। ভারত উপমহাদেশে ইউরোপীয় বণিক সম্প্রদায়ের আগমনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।

[Give a brief account of the advent of European merchant communities in the Indian subcontinent.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপীয় নাবিকদের জলপথ আবিষ্কারের ফলে বিশ্ববাণিজ্যে এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটেছিল। পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা কর্তৃক ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতের কালিকট বন্দরে আগমনের মাধ্যমে ভারত উপমহাদেশে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক শক্তির অনুপ্রবেশ শুরু হয়। পরবর্তীতে মশলা, সিল্ক, মসলিন এবং সুবিশাল মুনাফার লোভে একে একে ওলন্দাজ (ডাচ), ইংরেজ, ডেনিশ এবং ফরাসিরা ভারতে বাণিজ্যিক কুঠি স্থাপন করে। মূলত বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আগমন করলেও ভারতের অভ্যন্তরীণ অনৈক্যের সুযোগে তারা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষমতার চক্রান্তে লিপ্ত হয়।

১. ভারতে আগমনকারী প্রধান ইউরোপীয় বণিক সম্প্রদায়সমূহ:

বণিক দল ও দেশ ভারতে আগমনের সন প্রধান বাণিজ্য কুঠি ও কার্যক্রম ঐতিহাসিক ভূমিকা ও ফলাফল
১. পর্তুগিজ (Portuguese) ১৪৯৮ খ্রি. (ভাস্কো দা গামা) গোয়া, দমন, দিউ এবং বাংলায় হুগলী ও চট্টগ্রাম (পোর্টো গ্র্যান্ডে)। ভারতে প্রথম আগমনকারী ইউরোপীয় শক্তি। তবে জলদস্যুতা (হার্মাদ) ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরের কারণে বাংলায় শাহজাহানের আমলে তাদের পতন ঘটে।
২. ওলন্দাজ বা ডাচ (Dutch) ১৬০২ খ্রি. (ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোং) নাগাপট্টম, পুলিকট এবং বাংলায় চুঁচুড়া ও কাশিমবাজার। সুতি বস্ত্র ও শোরা বাণিজ্যে মশগুল ছিল। পরবর্তীতে ইংরেজদের কাছে বেদারা যুদ্ধে (১৭৫৯) পরাজিত হয়ে ইন্দোনেশিয়ায় চলে যায়।
৩. ইংরেজ (English) ১৬০০ খ্রি. (ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোং) সুরাট, মাদ্রাজ (সেন্ট জর্জ দুর্গ), বোম্বাই এবং জব চার্নক কর্তৃক ১৬৯০ সালে কলকাতা নগর প্রতিষ্ঠা (ফোর্ট উইলিয়াম)। সম্রাট জাহাঙ্গীরের দূত স্যার টমাস রো-এর মাধ্যমে বাণিজ্য সুবিধা লাভ। অবশেষে ১৭৫৭ সালে পলাশী জয়ের মাধ্যমে ভারতের শাসনক্ষমতা দখল।
৪. ফরাসি (French) ১৬৬৪ খ্রি. (ফ্রেঞ্চ ইস্ট ইন্ডিয়া কোং) পন্ডিচেরী এবং বাংলায় চন্দননগর ও বালেশ্বর। ইংরেজদের প্রধান ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী। ডুপ্লের নেতৃত্বে কর্ণাটকের যুদ্ধে ইংরেজদের সাথে লড়াই করে অবশেষে ১৭৬০ সালে ওয়ান্দিয়াশের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।

২. ইউরোপীয় বণিকদের বাণিজ্যিক আধিপত্য থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তর:
– দস্তক বা শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অপব্যবহার: ১৭১৭ সালে মুঘল সম্রাট ফররুখশিয়ারের ফরমান বলে ব্রিটিশরা যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অধিকার পায়, তার অপব্যবহার করে দেশীয় ব্যবসায়ীদের দেউলিয়া করে দেয়।
– অর্থনৈতিক শোষণ ও সম্পদ পাচার (Drain of Wealth): ভারতীয় কাঁচামাল সস্তায় কিনে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবে জোগান দেওয়া এবং এদেশের স্বর্ণ-রৌপ্য ইউরোপে পাচার করা।
– সেনাবাহিনী গঠন ও দুর্গ নির্মাণ: বাণিজ্যের নিরাপত্তার অজুহাতে তারা ভারতীয় ভূখণ্ডে সেনাবাহিনী ও দুর্গ তৈরি করে স্বাধীন নবাবদের বিরুদ্ধে স্পর্ধা দেখাতে শুরু করে।

উপসংহার:
ইউরোপীয় বণিকদের আগমন ভারতের শিল্প ও স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতিকে ধ্বংস করে পরাধীনতার শৃঙ্খল পরিয়ে দিয়েছিল। বণিকের মানদণ্ড রূপ নিয়েছিল শাসকের রাজদণ্ডে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সাথে কোন পারস্য কবির পত্রালাপ হয়েছিল?

বিশ্বখ্যাত কবি হাফিজ সিরাজীর সাথে।

বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কত সালে দেওয়ানি লাভ করে?

১৭৬৫ সালে বক্সারের যুদ্ধের পর সম্রাট শাহ আলমের নিকট থেকে।

নবাব আলীবর্দী খানের প্রধান শত্রু কারা ছিল যারা বাংলা আক্রমণ করত?

মহারাষ্ট্রীয় মারাঠা বা বর্গী দস্যুরা।

পর্তুগিজ জলদস্যুদের বাংলায় কী বলা হতো?

হার্মাদ বলা হতো।

সুলতানি বাংলার প্রধান রৌপ্যমুদ্রার নাম কী ছিল?

টঙ্কা (যা থেকে আধুনিক ‘টাকা’ শব্দের উৎপত্তি)।

লালবাগ কেল্লায় কোন মোঘল রাজকুমারীর সমাধি অবস্থিত?

শায়েস্তা খানের কন্যা ইরান দুখত ওরফে পরীবিবির।