মানাহিজুল মুফাসসিরীন ৬ষ্ঠ পত্র (Manahijul Mufassirin 6th Paper) – 111010, উলূমুল কুরআন – ফাযিল পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
৯২ মিনিট পড়ার সময়
৭ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা
ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
উলূমুল কুরআন (তৃতীয় পত্র) : মানাহিজুল মুফাসসিরীন (বিষয় কোড: ১১১০১০)
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[الملاحظة : أجب عن خمسة من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب) -]
[দ্রষ্টব্য : (أ) অংশ থেকে পাঁচটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর উলূমুল কুরআন ৩য় পত্র (বিষয় কোড: ১১১০১০ — মানাহিজুল মুফাসসিরীন বা মুফাসসিরগণের তাফসীর পদ্ধতি) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও গবেষণাধর্মী সমাধান নিচে বিস্তারিতভাবে প্রদান করা হলো। ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী, হাফেজ ইবনে কাসীর এবং আল্লামা মুহাম্মদ হুসাইন আয-যাহাবীর ‘আত-তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরূন’-এর আলোকে প্রতিটি উত্তর উচ্চতর অ্যাকাডেমিক মানে সংকলিত হয়েছে।

১। عرف التفسير والتأويل – هل هما مترادفان ام لا؟ ثم بين اهميتهما مفصلا –

[তাফসীর ও তাবীল-এর পরিচয় দাও। তাফসীর ও তাবীল সমার্থবোধক কি না? অতঃপর এতদুভয়ের গুরুত্ব বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহের অন্তর্নিহিত ভাবার্থ, শাব্দিক রহস্য ও শরিয়তের অনুশাসন অনুধাবনের ক্ষেত্রে ‘তাফসীর’ ও ‘তা’বীল’ দুটি সর্বাধিক মৌলিক পারিভাষিক প্রত্যয়। ইসলামি জ্ঞানের ইতিহাসে তাফসীরশাস্ত্রের উন্মেষ ও ক্রমবিকাশে এই দুটি শব্দের সঠিক অর্থ এবং পারস্পরিক সীমারেখা নির্ধারণের ওপর কুরআন ব্যাখ্যার বিশুদ্ধতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল।

তাফসীর ও তা’বীলের আভিধানিক ও পারিভাষিক স্বরূপ

  • তাফসীর (التفسير)-এর সংজ্ঞা:
    • আভিধানিক অর্থ: ‘তাফসীর’ শব্দটি বাবে তাফঈলের মাসদার, যা আরবি ‘আল-ফাসর’ (الفسر) ধাতু থেকে নিষ্পন্ন। এর অর্থ সুস্পষ্ট করা, ব্যাখ্যা করা, উন্মোচন করা এবং আবৃত বিষয়কে প্রকাশ করা (الكشف والإظهار والبيان)।
    • পারিভাষিক অর্থ: আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী ও ইমাম সুয়ূতী (রহ.)-এর মতে:

      «هو علم يفهم به كتاب الله المنزل على نبيه محمد صلى الله عليه وسلم، وبيان معانيه واستخراج أحكامه وحكمه.»

      অর্থাৎ, ‘তাফসীর হলো এমন এক জ্ঞান যার মাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ আল্লাহর কিতাবের সঠিক মর্ম অনুধাবন করা যায়, এর অর্থসমূহ প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং এর অন্তর্নিহিত হুকুম ও প্রজ্ঞাময় হেকমতসমূহ আহরণ করা যায়।’

  • তা’বীল (التأويل)-এর সংজ্ঞা:
    • আভিধানিক অর্থ: ‘তা’বীল’ শব্দটি ‘আল-আওল’ (الأول) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ফিরে আসা বা প্রত্যাবর্তন করানো (الرجوع إلى الأصل)। কোনো বিষয়ের চূড়ান্ত পরিণাম বা মূল উৎসে ফিরে যাওয়াকে তা’বীল বলা হয়।
    • পারিভাষিক অর্থ: ইমাম রাগিব ইসফাহানী (রহ.)-এর মতে, কোনো আয়াতে একাধিক সম্ভাব্য অর্থ থাকলে বাহ্যিক আপাত অর্থ বাদ দিয়ে উপযুক্ত দলিলের ভিত্তিতে তার সুদূরপ্রসারী অন্তর্নিহিত ভাবার্থ গ্রহণ করাই হলো তা’বীল। যেমন রূপক বা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ আয়াতের গভীর ব্যাখ্যা।

তাফসীর ও তা’বীল কি সমার্থবোধক (مترادف)? বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি

মুফাসসির ও উসূলবিদগণের মধ্যে তাফসীর ও তা’বীলের সম্পর্ক নিয়ে দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:

  • প্রথম মত (উভয়ে সমার্থবোধক): প্রাচীন মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরদের একটি দলের মতে (যেমন ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী রহ.), তাফসীর ও তা’বীল মূলত সমার্থবোধক। তাবারী তাঁর তাফসীরে প্রায়শই বলেন: «القول في تأويل قوله تعالى» যার অর্থ হলো আল্লাহর বাণীর তাফসীর বা ব্যাখ্যা।
  • দ্বিতীয় মত (উভয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান — জমহুর ওলামার মত): অধিকাংশ গবেষক আলেমদের মতে উভয় পরিভাষার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে:
    • ১. রিওয়ায়াত বনাম দিরায়াত: তাফসীর মূলত হাদিস, আসবাবুন নুযূল ও ঐতিহাসিক রিওয়ায়াতের ওপর নির্ভরশীল; পক্ষান্তরে তা’বীল হলো মুজতাহিদের সূক্ষ্ম বোধশক্তি, ভাষা ও ইজতিহাদের ওপর নির্ভরশীল।
    • ২. ব্যাপকতা: তাফসীর শব্দের বাহ্যিক অর্থের উন্মোচন ঘটায়, আর তা’বীল বাক্যের অন্তর্নিহিত গভীর ভাব ও পরম তাৎপর্য উদ্ঘাটন করে। আবু তালিব আস-সা’লাবী বলেন: “তাফসীর হলো কোনো বিষয়ের বাহ্যিক রূপ স্পষ্ট করা, আর তা’বীল হলো তার নিগূঢ় রহস্যের গভীরে প্রবেশ করা।”

দ্বীনের ক্ষেত্রে তাফসীর ও তা’বীলের অপরিহার্য গুরুত্ব

  • ১. মানবজীবনের সংবিধান বোঝা: কুরআন মানবজাতির জীবনব্যবস্থা। তাফসীর ছাড়া আসমানি সংবিধানের আইন, আদেশ ও নিষেধ কার্যকর করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
  • ২. ভ্রান্ত মতবাদ ও বিকৃতি প্রতিরোধ: যদি তাফসীর ও তা’বীলের সঠিক মূলনীতি না থাকত, তবে মুতাযিলা, খারেজী, বাতেনী ও কাদিয়ানীদের মতো বাতিল ফিরক্বাগণ নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যা দ্বারা কুরআনকে বিকৃত করে ফেলত।
  • ৩. শরীয়তের হুকুম ইস্তিনবাত: আধুনিক যুগে নিত্যনতুন উদ্ভূত জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার শরঈ সমাধান কুরআনের মৌলিক আয়াতসমূহ থেকে বের করার মূল চাবিকাঠি হলো তাফসীর ও তা’বীল।

উপসংহার

তাফসীর ও তা’বীল ইসলামি শরীয়তের প্রাণভোমরা। এদের মাধ্যমেই আসমানি ওহীর চিরন্তন নূর যুগে যুগে মানবজাতির চিন্তা ও বাস্তব জীবনকে আলোকিত করে চলেছে।

২। ما هى الشروط التى يحتاج اليها المفسر فى تفسير القرآن الكريم؟ ثم بين مصادر التفسير مفصلا –

[আল কুরআনুল কারীমের তাফসীর করার জন্য মুফাসসিরগণ কী কী শর্তের মুখাপেক্ষী? অতঃপর তাফসীরের উৎসসমূহের বিশদ বর্ণনা দাও।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কুরআন বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞাময় বাণী। এই মহাগ্রন্থের তাফসীর ও ব্যাখ্যা করা সাধারণ কোনো সাহিত্য পর্যালোচনার মতো নয়; বরং এটি দ্বীনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ও মহান আমানত। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: «مَنْ قَالَ فِي الْقُرْآنِ بِرَأْيِهِ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ» (তিরমিযী) — “যে ব্যক্তি কোনো জ্ঞান ছাড়া কেবল নিজের মতামতের ভিত্তিতে কুরআনের ব্যাখ্যা করবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা নির্ধারণ করে নেয়।” তাই তাফসীরের যোগ্যতা অর্জনের জন্য কঠোর শর্তাবলি ও প্রামাণ্য উৎস নির্ধারণ করা হয়েছে।

একজন যোগ্য মুফাসসিরের আবশ্যকীয় শর্তাবলি (شروط المفسر)

ইমাম সুয়ূতী, ইমাম নববী ও আল্লামা আয-যাহাবী (রহ.)-এর মতে একজন ব্যক্তির মুফাসসির হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত মৌলিক শর্তসমূহ পূরণ করা অপরিহার্য:

  • ১. বিশুদ্ধ ইসলামি আকিদা পোষণ (صحة العقيدة): মুফাসসিরকে অবশ্যই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের নির্ভেজাল তাওহীদি আকিদার অনুসারী হতে হবে। বিদআতি বা বাতিল আকিদার লোক নিজের মতবাদ প্রমাণের জন্য আয়াত বিকৃত করবে।
  • ২. কুপ্রবৃত্তি ও পক্ষপাতিত্ব থেকে মুক্ত থাকা (التجرد عن الهوى): কোনো রাজনৈতিক দল, গোত্রীয় পক্ষপাত বা ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার মানসিকতা সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে।
  • ৩. আরবি ভাষা ও সাহিত্যের ১৫টি মৌলিক বিদ্যায় পূর্ণ পাণ্ডিত্য: যার মধ্যে প্রধান হলো—নাহু (সিনট্যাক্স), সরফ (মরফোলজি), ইশতিক্বাক্ব (ধাতুমূল), মা’আনী, বায়ান, বাদী’ (অলংকারশাস্ত্র), কিরাআত এবং প্রাচীন জাহেলী কবিতা।
  • ৪. উলূমুল হাদিস ও আসবাবুন নুযূলের অগাধ জ্ঞান: সহিহ, হাসান ও জয়িফ হাদিসের পার্থক্য নির্ণয় এবং ওহী নাযিলের প্রেক্ষাপটের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ জানা।
  • ৫. উসূলুল ফিক্বহ ও নাসিখ-মানসূখের জ্ঞান: সাধারণ ও বিশেষ (আম-খাস), সামগ্রিক ও বিস্তারিত (মুজমাল-মুফাসসাল), হুকুম রহিতকরণ সংক্রান্ত সমস্ত নিয়মাবলি অবগত হওয়া।
  • ৬. ইলমে মাওহিবাত বা ঐশী দানকৃত প্রজ্ঞা (علم الموهبة): আল্লাহর তাকওয়া ও সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসরণের ফলে আল্লাহ মুমিনের হৃদয়ে যে বিশেষ আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা দান করেন।

তাফসীরের প্রামাণ্য ও বিশুদ্ধ উৎসসমূহ (مصادر التفسير)

তাফসীর করার ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততার ক্রমানুসারে নিম্নোক্ত পাঁচটি প্রধান উৎসের ওপর নির্ভর করা ফরজ:

  • ১. কুরআন দ্বারা কুরআনের তাফসীর (تفسير القرآن بالقرآن): তাফসীরের সর্বশ্রেষ্ঠ ও অবিসংবাদিত উৎস হলো স্বয়ং কুরআন। কুরআনের এক স্থানের সংক্ষিপ্ত বা অস্পষ্ট বিষয়ের ব্যাখ্যা অন্য সূরার বিস্তারিত আয়াতে আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছেন। যেমন সূরা ফাতিহার ‘যাদের ওপর আপনি অনুগ্রহ করেছেন’ («أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ»)-এর ব্যাখ্যা সূরা নিসার ৬৯ নম্বর আয়াতে নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সালেহীনের উল্লেখ দ্বারা স্বয়ং আল্লাহই করে দিয়েছেন।
  • ২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও হাদিস (تفسير القرآن بالسنة): রাসুল (সা.) ছিলেন কুরআনের প্রধানতম মুফাসসির। কুরআনের আদেশ ছিল: «وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ» (সূরা নাহল: ৪৪)। কুরআনের নামাজের নির্দেশ থাকলেও রাকাত সংখ্যা ও পদ্ধতি হাদিসের মাধ্যমেই সুস্পষ্ট হয়েছে।
  • ৩. সাহাবায়ে কেরামের আছার ও মতামত (أقوال الصحابة): সাহাবায়ে কেরাম ওহী নাযিল চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছেন, তাদের ভাষা ছিল নিখুঁত এবং অন্তরের তাকওয়া ছিল শীর্ষস্থানে। বিশেষ করে খুলাফায়ে রাশেদীন, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর তাফসীর অতুলনীয় উৎস।
  • ৪. শীর্ষ তাবেয়ীগণের ব্যাখ্যা (أقوال التابعين): সাহাবায়ে কেরামের সরাসরি ছাত্র মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, কাতাদাহ ও হাসান বসরী (রহ.)-এর ব্যাখ্যা তাফসীরের চতুর্থ শক্তিশালী ভিত্তি।
  • ৫. বিশুদ্ধ আরবি ভাষা ও ব্যাকরণ (لغة العرب): পূর্বোক্ত কোনো স্পষ্ট বর্ণনা না থাকলে বিশুদ্ধ প্রাক-ইসলামি আরবি কবিতার উপমা ও ব্যাকরণিক মূলনীতির আলোকে তাফসীর করতে হবে।

উপসংহার

এই সুনির্দিষ্ট শর্ত ও উৎসসমূহ বজায় রেখেই কুরআন তাফসীরের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এর সামান্য ব্যত্যয় ঘটলে তা মনগড়া তাফসীর হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হবে।

৩। تحدث عن مصادر التفسير فى عهد الصحابة والتابعين – ومن هم المفسرون المشهورون منهم؟

[সাহাবী ও তাবেয়ীগণের যুগের তাফসীরের উৎসগুলো সম্পর্কে আলোচনা কর। তাঁদের মধ্যে প্রসিদ্ধ মুফাসসির কারা?]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও পটভূমি

ইসলামের ইতিহাসে সাহাবা ও তাবেয়ীগণের যুগ ছিল তাফসীরশাস্ত্রের সর্বাধিক পবিত্র, বিশুদ্ধ ও স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সংস্পর্শধন্য সাহাবায়ে কেরাম এবং তাঁদের একনিষ্ঠ শাগরেদ তাবেয়ীগণ যে অবিচল নিষ্ঠায় কুরআনের বাণী সংরক্ষণ ও ব্যাখ্যা করেছিলেন, তার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে আজকের সমগ্র তাফসীর সাহিত্য।

সাহাবী ও তাবেয়ীগণের যুগে তাফসীরের প্রধান উৎসসমূহ

  • ১. কুরআনুল কারীম: সাহাবীগণ কোনো আয়াতের মর্ম না বুঝলে কুরআনেরই অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আয়াতের মাধ্যমে তার সমাধান খুঁজতেন।
  • ২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস ও প্রত্যক্ষ শিক্ষা: সাহাবায়ে কেরাম সরাসরি নবীজী (সা.)-এর মুখনিঃসৃত ব্যাখ্যা ও সুন্নাহর আলোকে আয়াতের বিধান গ্রহণ করতেন। আর তাবেয়ীগণ সাহাবাদের মাধ্যমে সেই হাদিসের জ্ঞান অর্জন করতেন।
  • ৩. ওহী নাযিলের চাক্ষুষ প্রত্যক্ষতা ও আসবাবুন নুযূল: সাহাবীগণ স্বচক্ষে দেখেছেন কোন পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে কোন আয়াত নাযিল হয়েছিল। এই প্রত্যক্ষ জ্ঞান তাঁদের ব্যাখ্যাকে ভুলভ্রান্তি থেকে শতভাগ সুরক্ষিত রেখেছিল।
  • ৪. বিশুদ্ধ আরবি ভাষা ও তৎকালীন ঐতিহ্য: তৎকালীন আরবের খাঁটি বাকরীতি, প্রবাদ ও উপমা সাহাবা ও বড় তাবেয়ীদের মজ্জাগত ছিল, ফলে ভাষার কোনো রূপক বা অলংকার তাদের বুঝতে কষ্ট হতো না।
  • ৫. আহলে কিতাবের ইসলাম গ্রহণকারী আলেমদের বর্ণনা (ইসরাঈলিয়াত): পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবের বিস্তারিত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানতে সাহাবী ও তাবেয়ীগণ আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম ও কা’ব আল-আহবারের মতো ইসলাম গ্রহণকারী পণ্ডিতদের থেকে কিছু বর্ণনা শুনতেন। তবে আকিদা ও আহকামের ক্ষেত্রে কখনোই এর ওপর নির্ভর করা হতো না।

সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে প্রসিদ্ধ মুফাসসিরগণ

ইমাম সুয়ূতী (রহ.) ‘আল-ইতক্বান’ গ্রন্থে সাহাবাদের মধ্যে দশজনকে প্রখ্যাত মুফাসসির হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে শীর্ষ চারজন হলেন:

  • ১. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.): যাকে রাসুল (সা.) স্বয়ং ‘সুলতানুল মুফাসসিরীন’ ও ‘তুরজুমানুল কুরআন’ (কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার) খেতাবে ভূষিত করেছিলেন এবং দোয়া করেছিলেন: «اللَّهُمَّ فَقِّهْهُ فِي الدِّينِ وَعَلِّمْهُ التَّأْوِيلَ»।
  • ২. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.): তিনি গর্ব করে বলতেন: “আল্লাহর কিতাবের এমন কোনো আয়াত নেই যার সম্পর্কে আমি জানি না যে তা কার ব্যাপারে এবং কোথায় নাযিল হয়েছে।”
  • ৩. হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.): চার খলিফার মধ্যে কুরআনের তাফসীর তাঁর থেকেই সর্বাধিক বর্ণিত হয়েছে। তিনি ছিলেন জ্ঞানের অবিসংবাদিত সিংহদ্বার।
  • ৪. হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.): রাসুল (সা.)-এর যুগে আনসারদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ক্বারী ও ওহী লেখক।

তাবেয়ীগণের মধ্য থেকে প্রখ্যাত মুফাসসিরগণ

সাহাবায়ে কেরামের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন শহরে তাবেয়ীদের গৌরবোজ্জ্বল দল তাফসীরে নেতৃত্ব দেন:

  • মক্কা স্কুলের তাবেয়ীগণ: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর প্রধান ছাত্রবৃন্দ—মুজাহিদ ইবনে জাবর (যিনি পুরো কুরআন তিনবার ইবনে আব্বাসের সামনে পেশ করে প্রতিটি আয়াতের তাফসীর শিখেছিলেন), আতা ইবনে আবি রাবাহ, সাঈদ ইবনে জুবায়ের ও ত্বাউস (রহ.)।
  • মদিনা স্কুলের তাবেয়ীগণ: উবাই ইবনে কাবের অনুসারী যায়েদ ইবনে আসলাম, আবুল আলিয়াহ এবং উরওয়া ইবনুয যুবায়ের (রহ.)।
  • ইরাক/কুফা স্কুলের তাবেয়ীগণ: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের ছাত্র আলক্বামাহ, আসওয়াদ, ইবরাহিম নাখঈ, হাসান বসরী ও কাতাদাহ (রহ.)।

উপসংহার

সাহাবী ও তাবেয়ীগণের বর্ণিত তাফসীরসমূহ মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্য উত্তরাধিকার, যা কিয়ামত পর্যন্ত কুরআন গবেষণার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত থাকবে।

৪। كم طبقة للمفسرين؟ اذكر خمسة من مشاهير المفسرين مع بيان اسماء تفاسيرهم –

[মুফাসসিরগণের স্তর কতটি? তাফসীরগ্রন্থের নামসহ প্রখ্যাত পাঁচজন মুফাসসিরের উল্লেখ কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও পটভূমি

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি আল-কুরআনের তাফসীর অবিচ্ছিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়ে আসছে। যুগে যুগে যেসকল মহান গবেষক ও মনীষী তাফসীরশাস্ত্রে ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন, উলূমুল কুরআনের বিশেষজ্ঞগণ তাঁদের যোগ্যতা, কালখণ্ড ও পদ্ধতির ভিত্তিতে বিভিন্ন স্তর বা ‘ত্ববাক্বাত’ (طبقات)-এ বিভক্ত করেছেন।

মুফাসসিরগণের স্তরবিন্যাস (طبقات المفسرين)

আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী ও মুহাম্মদ হুসাইন আয-যাহাবী (রহ.)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী মুফাসসিরগণকে প্রধানত পাঁচটি ঐতিহাসিক স্তরে ভাগ করা যায়:

  • প্রথম স্তর (সাহাবায়ে কেরামের যুগ): খুলাফায়ে রাশেদীন, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর পবিত্র প্রজন্ম।
  • দ্বিতীয় স্তর (তাবেয়ীগণের যুগ): মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, ইকরামা, হাসান বসরী ও কাতাদাহ (রহ.)-এর সোনালী প্রজন্ম।
  • তৃতীয় স্তর (তাবে-তাবেয়ী ও প্রাথমিক সংকলন যুগ): সুফিয়ান সাওরী, ওয়াকী ইবনুল জাররাহ ও সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ (রহ.)। এ যুগে তাফসীর মূলত হাদিসের সনদের সাথে লিপিবদ্ধ হতো।
  • চতুর্থ স্তর (স্বতন্ত্র আকরগ্রন্থ প্রণয়নের যুগ): ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী, ইবনে আবি হাতিম ও ইবনুল মুনযির (রহ.)। এই স্তরে হাদিস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাফসীর স্বতন্ত্র এক পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
  • পঞ্চম স্তর (পরবর্তী বিশেষজ্ঞ ও বহুমুখী পদ্ধতির যুগ): জামাখশারী, ফখরুদ্দীন রাযী, কুরতুবী, ইবনে কাসীর ও সুয়ূতী (রহ.)। এই স্তরে দর্শন, বালাগাত, ফিক্বহ ও আকিদার বিস্তারিত সমন্বয়ে বিশাল তাফসীরসমূহ রচিত হয়।

তাফসীরগ্রন্থের নামসহ প্রখ্যাত পাঁচজন বিশ্বখ্যাত মুফাসসিরের পরিচিতি

  • ১. ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারীর আত-তাবারী (রহ.) [মৃত্যু: ৩১০ হিজরি]:

    তাফসীরগ্রন্থের নাম: «جامع البيان عن تأويل آي القرآن» (জামেউল বায়ান আন তা’বীলে আইইল কুরআন — যা ‘তাফসীরে তাবারী’ নামে খ্যাত)।

    বৈশিষ্ট্য: তিনি হলেন ‘মুফাসসিরকুলের ইমাম’। এটি তাফসীর বিল মা’ছূরের সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য বিশ্বকোষ। তিনি সাহাবা ও তাবেয়ীদের মতামত পূর্ণ সনদসহ সংকলন করে তার মধ্যে শক্তিশালী যুক্তি দিয়ে পর্যালোচনা করেছেন।

  • ২. হাফেজ ইমাদুদ্দীন আবুল ফিদা ইসমাইল ইবনে কাসীর আদ-দিমাশকী (রহ.) [মৃত্যু: ৭৭৪ হিজরি]:

    তাফসীরগ্রন্থের নাম: «تفسير القرآن العظيم» (তাফসীরুল কুরআনিল আযীম — যা ‘তাফসীরে ইবনে কাসীর’ নামে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত)।

    বৈশিষ্ট্য: কুরআন দ্বারা কুরআন এবং সহিহ হাদিস দ্বারা তাফসীর করার ক্ষেত্রে এটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। তিনি ইসরাঈলিয়াতের কঠোর সমালোচনা ও প্রত্যাখ্যান করেছেন।

  • ৩. ইমাম ফখরুদ্দীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে উমর আর-রাযী (রহ.) [মৃত্যু: ৬০৬ হিজরি]:

    তাফসীরগ্রন্থের নাম: «مفاتيح الغيب» (মাফাতিহুল গায়েব — যা ‘তাফসীরে কাবীর’ নামে সুপরিচিত)।

    বৈশিষ্ট্য: এটি তাফসীর বির-রায়ের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শনগ্রন্থ। বিজ্ঞানের নানা শাখা, জ্যোতির্বিদ্যা, কালামশাস্ত্র ও বাতিল মতবাদীদের যুক্তি খণ্ডনে এটি এক অতুলনীয় মহাকোষ।

  • ৪. ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল-কুরতুবী (রহ.) [মৃত্যু: ৬৭১ হিজরি]:

    তাফসীরগ্রন্থের নাম: «الجامع لأحكام القرآن» (আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন — যা ‘তাফসীরে কুরতুবী’ নামে খ্যাত)।

    বৈশিষ্ট্য: শরিয়তের ফিক্বহী মাসআলা ও আইনগত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এটি একক শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। তিনি কোনো বিশেষ মাজহাবের অন্ধ অনুসরণ না করে দলিলের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ফিক্বহী বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন।

  • ৫. আল্লামা আবুল কাসেম মাহমুদ ইবনে উমর আয-যামাখশারী (রহ.) [মৃত্যু: ৫৩৮ হিজরি]:

    তাফসীরগ্রন্থের নাম: «الكشاف عن حقائق التنزيل وعيون الأقاويل» (আল-কাশশাফ — তাফসীরে কাশশাফ)।

    বৈশিষ্ট্য: আরবি ভাষার বালাগাত, অলংকারশাস্ত্র ও সাহিত্যিক রূপরেখা উন্মোচনে এটি এক অনুপম শাহকার। তবে মুতাযিলা আকিদার সংমিশ্রণ থাকায় বিজ্ঞ আলেমগণ সতর্কতার সাথে এ থেকে ভাষাগত উপাদান গ্রহণ করেন।

উপসংহার

এই মহান মনীষীগণের নিরলস আত্মত্যাগ ও গবেষণার ফলেই কুরআনের জ্ঞানধারা শতাব্দী অতিক্রম করে আজও অম্লান হয়ে রয়েছে।

৫। اذكر خصائص التفسير فى عهد الصحابة مع بيان ترجمة الصحابى الجليل عبد الله بن عباس (رض) –

[বিশিষ্ট সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-এর জীবনী বর্ণনাসহ সাহাবীগণের যুগে তাফসীরের বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও পটভূমি

সাহাবায়ে কেরামের যুগ ছিল তাফসীরশাস্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের যুগ। ওহী প্রত্যক্ষ করার কারণে তাদের তাফসীর ছিল সন্দেহের ঊর্ধ্বে। আর সাহাবাদের মধ্যে তাফসীরের আকাশে যে নক্ষত্রটি সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে, তিনি হলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচাতো ভাই রইসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)।

সাহাবীগণের যুগে তাফসীরের মৌলিক বৈশিষ্ট্যাবলি

  • ১. সম্পূর্ণ কুরআনের ধারাবাহিক তাফসীর না থাকা: সাহাবায়ে কেরাম পুরো কুরআনের প্রতিটি শব্দের তাফসীর করার প্রয়োজন বোধ করতেন না। কারণ তাদের মাতৃভাষা আরবি হওয়ায় অধিকাংশ আয়াতের অর্থ তারা সরাসরি বুঝতেন। কেবল অস্পষ্ট ও গভীর অর্থবোধক আয়াতসমূহই তারা আলোচনা করতেন।
  • ২. মতপার্থক্যের অনুপস্থিতি ও ঐক্য: আকিদা ও মৌলিক বিধানে সাহাবাদের মধ্যে কোনো মতভেদ ছিল না। সামান্য যেটুকু পার্থক্য দেখা যেত, তা ছিল শব্দচয়ন ও ব্যাখ্যার বৈচিত্র্যগত (اختلاف تنوع), কোনো পরস্পরবিরোধী বিরোধ (اختلاف تضاد) ছিল না।
  • ৩. মৌখিক বর্ণনা ও মুখস্থের ওপর নির্ভরতা: সাহাবীগণের যুগে তাফসীর গ্রন্থাকারে সংকলিত ছিল না; বরং তা মুখে মুখে হাদিসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বর্ণিত হতো।
  • ৪. ইসরাঈলী বর্ণনার বিরল উপস্থিতি ও সতর্কতা: অতীত উম্মতের সংক্ষিপ্ত বিবরণের ক্ষেত্রে কোনো কোনো সাহাবী আহলে কিতাবদের থেকে সীমিত বর্ণনা শুনলেও তাকে কখনো শরিয়তের দলিল বানাতেন না।

রইসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর জীবনী ও অবদান

  • নাম, বংশ ও জন্ম: নাম আব্দুল্লাহ, কুনিয়াত আবুল আব্বাস। পিতা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব, মাতা উম্মুল ফজল লুবাবাহ। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচাতো ভাই। হিজরতের তিন বছর পূর্বে শি’আবে আবি তালিবে অবরুদ্ধ থাকাকালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। রাসুল (সা.)-এর ওফাতকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৩ বা ১৫ বছর।
  • রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মোবারক দোয়া: বাল্যকালেই নবীজী (সা.) তাঁর জ্ঞানলিপ্সা ও বিচক্ষণতা দেখে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর সিনায় হাত রেখে বরকতময় দোয়া করেছিলেন:

    «اللَّهُمَّ فَقِّهْهُ فِي الدِّينِ وَعَلِّمْهُ التَّأْوِيلَ»

    “হে আল্লাহ! আপনি তাকে দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা দান করুন এবং কুরআনের তা’বীল ও ব্যাখ্যা শিক্ষা দিন।” (সহিহ বুখারি)। এই দোয়ার বরকতে তিনি জ্ঞানের সমুদ্রে পরিণত হন।

  • উপাধি ও মর্যাদা: উম্মতে মুসলিমা তাঁকে ‘হিবরুল উম্মাহ’ (উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত), ‘আল-বাহর’ (জ্ঞানের অতল মহাসমুদ্র) এবং ‘তুরজুমানুল কুরআন’ (কুরআনের শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার) খেতাবে ভূষিত করেছে। খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর (রা.) বদরী প্রবীণ সাহাবাদের পরামর্শসভায় কমবয়সী ইবনে আব্বাসকে পাশে বসাতেন এবং তাঁর রায়কে অগ্রাধিকার দিতেন।
  • তাফসীরে অবদান ও ঐতিহাসিক পাঠশালা: তিনি মক্কায় একটি সুবিশাল তাফসীর পাঠশালা গড়ে তোলেন। মুজাহিদ, আতা, ইকরামা, ত্বাউস ও সাঈদ ইবনে জুবায়েরের মতো বিশ্বখ্যাত তাবেয়ী মুফাসসিরগণ তাঁর পাঠশালা থেকেই তৈরি হয়েছিলেন। তিনি কুরআনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে জাহেলী যুগের বিশুদ্ধ কবিতা থেকে নজির পেশ করার রীতি প্রবর্তন করেন।
  • ইন্তেকাল: ৬৮ হিজরিতে ৭০ বছর বয়সে তায়েফ নগরীতে এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন। বিশিষ্ট সাহাবী মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যা তাঁর জানাজায় বলেছিলেন: “আজ এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ রব্বানী আলেম বিদায় নিলেন।”

উপসংহার

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর তাফসীররীতি বিশ্বজুড়ে তাফসীর সাহিত্যের প্রধানতম চালিকাশক্তি হিসেবে আজও দীপ্তিমান।

৬। كم قسما للتفسير؟ ثم تحدث عن مدارس التفسير فى عهد الصحابة (رض) –

[তাফসীর কত প্রকার? অতঃপর সাহাবীগণের যুগে তাফসীরের মাদরাসাসমূহ সম্পর্কে আলোচনা কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কুরআনের তাফসীর পদ্ধতির বৈচিত্র্য ও উৎসের ভিন্নতার কারণে মুসলিম আলেমগণ তাফসীরকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছেন। ইসলামের প্রথম শতাব্দীতে সাহাবায়ে কেরাম সমগ্র মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন এবং সেখানে কুরআন চর্চার অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্র বা ‘মাদরাসাতুত তাফসীর’ গড়ে তোলেন, যা থেকে ইসলামের পরবর্তী জ্ঞানাকাশ আলোকিত হয়েছিল।

তাফসীরের মৌলিক প্রকারভেদসমূহ

পদ্ধতি ও উৎসের ভিন্নতার বিচারে তাফসীর প্রধানত তিন প্রকার:

  • ১. তাফসীর বিল মা’ছূর বা তাফসীর বির-রিওয়ায়াত (التفسير بالمأثور): যে তাফসীর কুরআন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহিহ হাদিস, সাহাবাদের মতামত ও বড় বড় তাবেয়ীগণের ব্যাখ্যার ওপর পূর্ণ নির্ভর করে সনদের সাথে রচিত হয়। যেমন: তাফসীরে তাবারী ও তাফসীরে ইবনে কাসীর।
  • ২. তাফসীর বির-রায় বা তাফসীর বিদ-দিরায়াত (التفسير بالرأي): যে তাফসীরে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা, অলংকারশাস্ত্র, সুস্থ মানবীয় বুদ্ধি এবং শরঈ মূলনীতির আলোকে ইজতিহাদ করে কুরআনের তাৎপর্য তুলে ধরা হয়। এর প্রশংসনীয় অংশকে ‘তাফসীর মাহমুদ’ এবং মনগড়া অংশকে ‘তাফসীর মাজমুম’ বলা হয়। যেমন: তাফসীরে কাবীর ও তাফসীরে কাশশাফ।
  • ৩. তাফসীরুল ইশারী বা বাতেনী তাফসীর (التفسير الإشاري): শরিয়তের বাহ্যিক অর্থকে অক্ষুণ্ণ রেখে আধ্যাত্মিক সাধক ও আউলিয়ায়ে কেরামের অন্তরে আল্লাহর পক্ষ থেকে উদ্ভাসিত সূক্ষ্ম ইশারা ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের ভিত্তিতে রচিত তাফসীর। যেমন: আলূসীর ‘রুহুল মাআনী’ ও তাফসীরে তুসতারী।

সাহাবীগণের যুগে তাফসীরের প্রধান প্রধান মাদরাসাসমূহ

সাহাবায়ে কেরামের যুগে তিনটি প্রধান ভৌগোলিক অঞ্চলে তাফসীরের বিশ্বখ্যাত পাঠশালা বা স্কুল গড়ে উঠেছিল:

  • ১. মক্কার তাফসীর মাদরাসা (مدرسة مكة):
    • প্রতিষ্ঠাতা: রইসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)।
    • বৈশিষ্ট্য: এটি ছিল তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ তাফসীর কেন্দ্র। শাব্দিক বিশ্লেষণ, ভাষার বালাগাত এবং প্রাক-ইসলামি কবিতার সাহায্যে শব্দার্থ নির্ণয়ে এ পাঠশালা অগ্রগামী ছিল।
    • প্রসিদ্ধ ছাত্রবৃন্দ: ইমাম মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, ইকরামা মাওলা ইবনে আব্বাস, আতা ইবনে আবি রাবাহ এবং ত্বাউস ইবনে কায়সান (রহ.)। ইমাম সুফিয়ান সাওরী বলতেন: “যখন তোমার কাছে মুজাহিদের তাফসীর আসবে, তখন তা-ই তোমার জন্য যথেষ্ট।”
  • ২. মদিনার তাফসীর মাদরাসা (مدرسة المدينة):
    • প্রতিষ্ঠাতা: রাসুল (সা.)-এর প্রখ্যাত ওহী লেখক হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.)।
    • বৈশিষ্ট্য: ওহীর শহর মদিনায় গড়ে ওঠা এ কেন্দ্রে হাদিস ও সুন্নাহর আলোকে আয়াতের তাফসীর এবং শরিয়তের আহকাম সংক্রান্ত আলোচনার আধিক্য ছিল।
    • প্রসিদ্ধ ছাত্রবৃন্দ: যায়েদ ইবনে আসলাম (ইমাম মালিকের উস্তায), আবুল আলিয়াহ আর-রিয়াহী এবং মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কুরাযী (রহ.)।
  • ৩. ইরাক ও কুফার তাফসীর মাদরাসা (مدرسة العراق والكوفة):
    • প্রতিষ্ঠাতা: ফক্বীহুল উম্মাহ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)।
    • বৈশিষ্ট্য: অনারবদের সংমিশ্রণ এবং জটিল সামাজিক পরিস্থিতির কারণে এ মাদরাসায় যুক্তিনির্ভর চিন্তা, রায় ও কিয়াসের সমন্বয়ে তাফসীর করার বিশেষ ধারা প্রবর্তিত হয়, যা পরবর্তীকালে হানাফী ফিক্বহের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
    • প্রসিদ্ধ ছাত্রবৃন্দ: আলক্বামাহ ইবনে কায়স, মাসরূক্ব, আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ, মুরাহ আল-হামদানী এবং ইবরাহিম নাখঈ (রহ.)।

উপসংহার

সাহাবাদের প্রতিষ্ঠিত এই তিনটি মাদরাসায় তাফসীরশাস্ত্রের পদ্ধতিগত ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিশ্বব্যাপী তাফসীর সংকলনের মূল মডেল হিসেবে অনুসৃত হয়।

৭। من هم اشهر المفسرين من التابعين؟ اكتب ترجمة احد منهم بالايجاز –

[তাবেয়ীদের মধ্যে প্রখ্যাত মুফাসসির কারা? তাঁদের মধ্যে একজনের জীবনী সংক্ষেপে লেখ।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও পটভূমি

সাহাবায়ে কেরামের পবিত্র সংস্পর্শে লালিত তাবেয়ীগণের যুগ ছিল তাফসীরশাস্ত্রের বিস্তার ও সংকলনের স্বর্ণালী ধাপ। তাঁরা সাহাবাদের নিকট থেকে প্রতিটি আয়াতের শানে নুযূল, প্রেক্ষাপট ও অর্থ নিখুঁতভাবে সংগ্রহ করেছিলেন। তাফসীরের ইতিহাসে তাবেয়ীগণের অবদান এক চিরভাস্বর অধ্যায়।

তাবেয়ীগণের মধ্য থেকে প্রখ্যাত মুফাসসিরদের তালিকা

অঞ্চলভিত্তিক তাবেয়ী মুফাসসিরগণের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ হলেন:

  • মক্কা অঞ্চলের মনীষীবৃন্দ: ইমাম মুজাহিদ ইবনে জাবর, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, ইকরামা (ইবনে আব্বাসের মুক্তদাস), আতা ইবনে আবি রাবাহ এবং ত্বাউস ইবনে কায়সান (রহ.)।
  • মদিনা অঞ্চলের মনীষীবৃন্দ: যায়েদ ইবনে আসলাম, আবুল আলিয়াহ আর-রিয়াহী, মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কুরাযী এবং উরওয়া ইবনুয যুবায়ের (রহ.)।
  • ইরাক ও বসরার মনীষীবৃন্দ: ইমাম হাসান বসরী, কাতাদাহ ইবনে দিআমাহ আস-সাদূসী, আলক্বামাহ, ইবরাহিম নাখঈ এবং আমের আশ-শা’বী (রহ.)।

ইমামুল মুফাসসিরীন মুজাহিদ ইবনে জাবর (রহ.)-এর প্রামাণ্য জীবনী ও অবদান

  • নাম, বংশ ও জন্ম: পুরো নাম আবু আল-হাজ্জাজ মুজাহিদ ইবনে জাবর আল-মাখযূমী আল-মক্কী (রহ.)। তিনি হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে ২১ হিজরিতে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন হযরত সায়েব ইবনে আবি আস-সায়েব আল-মাখযূমীর আযাদকৃত দাস।
  • শিক্ষা ও জ্ঞানার্জন সাধনা: তিনি সরাসরি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বিশিষ্ট শাগরেদ ছিলেন। তিনি ছাড়াও হযরত আলী, আয়েশা, আবু হুরায়রা ও সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর মতো শীর্ষ সাহাবাদের নিকট থেকে তিনি তাফসীর ও হাদিস শিক্ষা লাভ করেন।
  • কুরআন অধ্যয়নে তাঁর অনন্য নিষ্ঠা: ইমাম মুজাহিদ নিজেই তাঁর ঐতিহাসিক অধ্যয়ন সম্পর্কে গর্ব করে বলতেন:

    «عَرَضْتُ الْمُصْحَفَ عَلَى ابْنِ عَبَّاسٍ ثَلَاثَ عَرْضَاتٍ، مِنْ فَاتِحَتِهِ إِلَى خَاتِمَتِهِ، أَقِفُهُ عِنْدَ كُلِّ آيَةٍ وَأَسْأَلُهُ عَنْهَا: فِيمَ نَزَلَتْ؟ وَكَيْفَ كَانَتْ؟»

    “আমি সূরা ফাতিহা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত পুরো মুসহাফ তিনবার হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সামনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পেশ করেছি; প্রতি আয়াতের নিকট আমি থেমেছি এবং তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছি—এ আয়াত কার ব্যাপারে নাযিল হয়েছে এবং এর পটভূমি কী ছিল?”

  • উম্মাহর নিকট তাঁর গ্রহণযোগ্যতা: উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রহ.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতেন: «إِذَا جَاءَكَ التَّفْسِيرُ عَنْ مُجَاهِدٍ فَحَسْبُكَ بِهِ» — “যখন মুজাহিদের পক্ষ থেকে তোমার নিকট কোনো তাফসীর পৌঁছাবে, তখন তা-ই তোমার জন্য যথেষ্ট।” ইমাম বুখারি ও শাফেয়ী (রহ.) তাফসীরের ক্ষেত্রে ইমাম মুজাহিদের বর্ণনার ওপর সর্বোচ্চ আস্থা স্থাপন করেছেন।
  • মৃত্যু: এই মহান ইমাম ১০৪ হিজরিতে মক্কার পবিত্র হারামে সিজদারত অবস্থায় ৮৩ বছর বয়সে আল্লাহর সান্নিধ্যে পাড়ি জমান।

উপসংহার

ইমাম মুজাহিদ (রহ.) ছিলেন তাবেয়ীগণের মধ্যে তাফসীর জগতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, যাঁর অবদান ছাড়া তাফসীর সাহিত্যের ইতিহাস অসম্পূর্ণ।

৮। حرر الفرق بين تفسير اهل السنة والجماعة وتفسير المعتزلة – ثم اذكر مزايا التفسير للزمخشرى –

[আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ও মুতাযিলাদের তাফসীর-এর মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ কর। অতঃপর আল্লামা যামাখশারীর তাফসীরের বৈশিষ্ট্যাবলি উল্লেখ কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও পটভূমি

ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে কুরআন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দলের মধ্যে মৌলিক মতাদর্শিক সংঘাত তৈরি হয়েছিল। একদিকে ছিল কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবাদের আকিদার ওপর প্রতিষ্ঠিত ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’, আর অন্যদিকে মানবীয় যুক্তি ও গ্রিক দর্শনের অন্ধ পূজারী ‘মুতাযিলা’ সম্প্রদায়। তাফসীর সাহিত্যের গবেষণায় উভয়ের পদ্ধতির পার্থক্য ও পারস্পরিক অবস্থান অনুধাবন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ও মুতাযিলাদের তাফসীরের মৌলিক পার্থক্যসমূহ

  • ১. বুদ্ধি বনাম ওহীর প্রাধান্য:
    • আহলে সুন্নাত: ওহীকে (কুরআন ও সহিহ হাদিস) সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত প্রামাণ্য দলিল মনে করে এবং মানবীয় যুক্তিকে ওহীর অধীনস্ত রাখে।
    • মুতাযিলা: মানবীয় বুদ্ধিকে মূল বিচারক মনে করে। বুদ্ধি দিয়ে যা সমর্থন পায় তা গ্রহণ করে, আর যা বুদ্ধির সাথে মেলে না তাকে অপব্যাখ্যা করে অথবা সরাসরি অস্বীকার করে।
  • ২. আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলির ব্যাখ্যা:
    • আহলে সুন্নাত: কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর হাত, চেহারা, আরশে সমাসীন হওয়া ইত্যাদি গুণাবলি কোনো রূপক বা সৃষ্টির সাথে তুলনা না করে (بلا كيف ولا تشبيه) বিশ্বাস করে।
    • মুতাযিলা: আল্লাহর সিফাতসমূহকে সরাসরি অস্বীকার করে এবং রূপক ব্যাখ্যার (তা’তীল) আশ্রয় নিয়ে আল্লাহর ক্ষমতা বা নিয়ামত অর্থ করে।
  • ৩. আখেরাতে আল্লাহকে দর্শন (রূ’ইয়াতুল্লাহ):
    • আহলে সুন্নাত: জান্নাতি মুমিনগণ আখেরাতে আল্লাহ তাআলাকে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করবে—এতে পূর্ণ বিশ্বাস রাখে (সূরা আল-ক্বিয়ামাহ: ২২-২৩)।
    • মুতাযিলা: বুদ্ধি দিয়ে সম্ভব নয় অজুহাতে আখেরাতে আল্লাহকে দর্শন পাওয়ার স্পষ্ট আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে।
  • ৪. কালামুল্লাহর প্রকৃতি (খালকে কুরআন বিতর্ক):
    • আহলে সুন্নাত: কুরআন আল্লাহর চিরন্তন, অবিনশ্বর কালাম (غير مخلوق)।
    • মুতাযিলা: কুরআনকে সৃষ্টি (مخلوق) বলে বিশ্বাস করে।

আল্লামা যামাখশারীর ‘তাফসীরে কাশশাফ’-এর অনন্য বৈশিষ্ট্যাবলি

আল্লামা আবুল কাসেম মাহমুদ ইবনে উমর আয-যামাখশারী (রহ.) প্রণীত ‘আল-কাশশাফ’ (الكشاف) তাফসীর জগতের এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। মুতাযিলা আকিদার হওয়া সত্ত্বেও গ্রন্থটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি নিম্নরূপ:

  • ১. অতুলনীয় বালাগাত ও অলংকারশাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ: আরবি ইলমুল মা’আনী ও ইলমুল বায়ান প্রয়োগ করে কুরআনের অলৌকিক সাহিত্যরস উন্মোচনে ‘আল-কাশশাফ’-এর কোনো দ্বিতীয় নজির নেই। খোদ আহলে সুন্নাতের আলেমগণও এর সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেছেন।
  • ২. প্রশ্নোত্তরমূলক আকর্ষণীয় উপস্থাপনা: যামাখশারী প্রায়শই বলেন: «فإن قلتَ: كذا، قلتُ: كذا» (যদি তুমি প্রশ্ন কর এমন, তবে আমি বলব এমন)—এই সংলাপধর্মী পদ্ধতিতে তিনি পাঠকের মনের সুপ্ত প্রশ্নের নিখুঁত সমাধান দিয়েছেন।
  • ৩. সংক্ষিপ্ত ও প্রাঞ্জল শব্দচয়ন: অপ্রয়োজনীয় ও দীর্ঘ সনদ বাদ দিয়ে অত্যন্ত চমৎকার শব্দবিন্যাসে আয়াতের মূল সুর ফুটিয়ে তুলেছেন।
  • ৪. মুতাযিলা মতবাদের চতুর অনুপ্রবেশ (সতর্কতামূলক দিক): অত্যন্ত সুকৌশলে তিনি অলংকারের আড়ালে মুতাযিলা আকিদা ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আল্লামা বলক্বীনী বলেন: “আমি চিমটা দিয়ে কাশশাফ থেকে মুতাযিলা আকিদা বের করেছি।” পরবর্তীকালে আল্লামা ইবনুল মুনীর ‘আল-ইনসাফ’ গ্রন্থ লিখে কাশশাফের এই বিভ্রান্তিগুলো খণ্ডন করেছেন।

উপসংহার

আহলে সুন্নাতের পদ্ধতিই হলো হেদায়েতের একমাত্র রাজপথ। আর আল্লামা যামাখশারীর কাশশাফ হলো আরবি সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ, যা আকিদার সতর্কতা বজায় রেখে অধ্যয়ন করা অপরিহার্য।

৯। تحدث عن نشأة علم التفسير وتطوره بالايجاز –

[তাফসীরশাস্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সংক্ষেপে আলোচনা কর।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কুরআন মানবজাতির হেদায়েতের জন্য নাযিলকৃত আসমানি কিতাব। ওহী নাযিলের সাথে সাথেই তাফসীরশাস্ত্রের বীজ রোপিত হয়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় রাসুল (সা.)-এর পবিত্র যুগ থেকে শুরু করে শতাব্দী পরম্পরায় এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক শাস্ত্রে রূপ লাভ করে।

তাফসীরশাস্ত্রের ক্রমবিকাশের প্রধান পর্যায়সমূহ

  • ১. নবুওয়ত ও রিসালাতের যুগ (উৎস পর্ব): রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন কুরআনের প্রথম ও মূল শিক্ষক। সাহাবায়ে কেরামকে তিনি কেবল কুরআনের শব্দ তেলাওয়াতই শেখাননি, বরং প্রতিটি আয়াতের অন্তর্নিহিত মর্ম ও আমল শিক্ষা দিয়েছেন। স্বয়ং রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহই ছিল তাফসীরের সূচনা।
  • ২. সাহাবায়ে কেরামের যুগ (বিস্তার পর্ব): রাসুল (সা.)-এর ওফাতের পর চার খলিফা এবং হযরত ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসউদ ও উবাই ইবনে কাব (রা.) তাফসীরের চর্চাকে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেন। এ যুগে তাফসীর মূলত মৌখিকভাবে বর্ণিত হতো।
  • ৩. তাবেয়ীগণের যুগ (আঞ্চলিক পাঠশালা পর্ব): মক্কা, মদিনা ও ইরাকে তিনটি স্বতন্ত্র তাফসীর কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে জুবায়ের ও হাসান বসরী (রহ.) সাহাবাদের কাছ থেকে তাফসীর সংগ্রহ করে তা উম্মাহর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
  • ৪. হাদিসের অধ্যায় হিসেবে প্রথম সংকলন পর্ব (দ্বিতীয় শতাব্দী): ইয়াজিদ ইবনে হারুন, ওয়াকী ইবনুল জাররাহ এবং সুফিয়ান সাওরী (রহ.) হাদিসের কিতাবের একটি অধ্যায় (কিতাবুত তাফসীর) হিসেবে সাহাবা ও তাবেয়ীদের বক্তব্য প্রথম লিপিবদ্ধ করেন।
  • ৫. স্বতন্ত্র গ্রন্থ হিসেবে তাফসীরের চূড়ান্ত উন্মেষ পর্ব (তৃতীয় শতাব্দী ও পরবর্তীকাল): ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী (রহ.) সর্বপ্রথম পুরো কুরআনের আয়াত অনুযায়ী স্বতন্ত্র তাফসীর গ্রন্থ ‘জামেউল বায়ান’ রচনা করে তাফসীরকে একটি স্বাধীন শাস্ত্রে উন্নীত করেন। পরবর্তীতে যুগে যুগে বিষয়ভিত্তিক, ফিক্বহী, বালাগাতভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বহু তাফসীর গ্রন্থ রচিত হয়ে তাফসীরশাস্ত্র সমৃদ্ধির শীর্ষে আরোহণ করে।

উপসংহার

মৌখিক ওহীর যুগ থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত তাফসীরশাস্ত্রের এই ধারাবাহিক বিকাশ আসমানি কিতাবের শাশ্বত সত্যতারই অকাট্য প্রমাণ।

১০। ما هى اداب المفسر؟ اكتب مختصرا –

[মুফাসসিরের আদবসমূহ কী কী? সংক্ষেপে লেখ।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও আদবের গুরুত্ব

মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের তাফসীর করা কেবল একটি সাধারণ অ্যাকাডেমিক বা ভাষাগত বিদ্যা নয়; বরং এটি মহান রব্বুল আলামীনের পবিত্র কালামের প্রতিনিধিত্ব ও তাঁর ইচ্ছার অনুবাদ করার এক অতীব সংবেদনশীল ধর্মীয় দায়িত্ব। এই মহান আমানত বহন করার জন্য মুফাসসিরকে কেবল বাহ্যিক জ্ঞানে পণ্ডিত হলেই চলে না, বরং তাঁর আত্মিক পরিশুদ্ধি ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী হওয়া অপরিহার্য। ইমাম নববী, ইমাম সুয়ূতী ও আল্লামা আয-যাহাবী (রহ.) একজন নিষ্ঠাবান মুফাসসিরের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু নৈতিক আদব ও শিষ্টাচার নির্ধারণ করেছেন।

একজন মুফাসসিরের জন্য আবশ্যকীয় প্রধান আদবসমূহ

  • ১. নিখাদ নিয়তের বিশুদ্ধতা ও ইখলাস (حسن النية والإخلاص): মুফাসসিরের একমাত্র লক্ষ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, দ্বীনের সঠিক মর্ম প্রচার এবং মানবজাতির হেদায়েত। পার্থিব পদমর্যাদা, খ্যাতি, অর্থলিপ্সা কিংবা কোনো ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর প্রশংসা পাওয়ার হীন উদ্দেশ্য থেকে অন্তরকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে হবে। নিয়তের সামান্য ত্রুটি পুরো তাফসীরকর্মকে বরবাদ করে দিতে পারে।
  • ২. তাকওয়া ও কুরআনের বিধানের ওপর বাস্তব আমল (العمل بالقرآن): মুফাসসিরকে স্বয়ং কুরআনের বাস্তব জীবন্ত আদর্শ হতে হবে। তিনি যে আয়াতের তাফসীর করবেন, নিজের জীবনে সবার আগে তার বাস্তবায়ন থাকতে হবে। আমলহীন জ্ঞান মানুষের হৃদয়ে কোনো রেখাপাত করতে পারে না এবং তা আল্লাহর নিকট চরম অসন্তোষের কারণ।
  • ৩. বিনম্রতা ও সত্যের প্রতি আনুগত্য (التواضع والخضوع للحق): গবেষণার ক্ষেত্রে কোনো ভুল প্রমাণিত হলে কোনো প্রকার অহংকার বা গোঁড়ামি না করে অবিলম্বে সত্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। সালাফে সালেহীন ও পূর্ববর্তী বিজ্ঞ মুফাসসিরগণের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে এবং কখনোই নিজেকে অভ্রান্ত মনে করা যাবে না।
  • ৪. তাহক্বীক্ব ও বক্তব্য উপস্থাপনায় পরম সতর্কতা (التثبت والتحرز): আল্লাহর কালামের ওপর কোনো ব্যাখ্যা আরোপ করার পূর্বে সনদ ও অর্থের প্রতিটি দিক শতভাগ যাচাই করতে হবে। কোনো বিষয়ে পর্যাপ্ত দলিল না থাকলে বা সন্দেহ থাকলে কোনো মনগড়া সিদ্ধান্ত না দিয়ে বিনয়ের সাথে “আল্লাহই সর্বাধিক অবগত” («الله أعلم») বলে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নেওয়া মুফাসসিরের মহান গুণ।
  • ৫. পার্থিব স্বার্থে কুরআনের অপব্যাখ্যা পরিহার করা: শাসকগোষ্ঠীর মনোরঞ্জন, রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি কিংবা কোনো দলীয় মতবাদ জোরপূর্বক প্রমাণের হাতিয়ার হিসেবে কুরআনের আয়াতকে বিকৃত করা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা।
  • ৬. শালীন ভাষা ও মর্যাদাশীল বাচনভঙ্গি: তাফসীর রচনার সময় অত্যন্ত মার্জিত, সুসংহত, আকর্ষণীয় ও গভীর ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা যাতে পাঠকের মনে আল্লাহর কালামের প্রতি সর্বোচ্চ ভক্তি জাগ্রত হয়।

উপসংহার

এই মহৎ আদবসমূহে ভূষিত না হয়ে কুরআনের তাফসীরে প্রবৃত্ত হওয়া আত্মঘাতী দুঃসাহস মাত্র। একমাত্র নৈতিকভাবে শুদ্ধ ও আত্মিকভাবে আলোকিত মুফাসসিরের তাফসীরই উম্মাহর পথপ্রদর্শক হতে পারে।

১১। من هم اشهر المفسرين من الصحابة؟ بين ايجازا –

[সাহাবীগণের মধ্যে প্রসিদ্ধ মুফাসসির কারা? সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা কর।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও সাহাবায়ে কেরামের অনন্য মর্যাদা

মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের প্রথম ও প্রত্যক্ষ শ্রোতা ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সাহাবায়ে কেরাম। তাঁরা স্বচক্ষে ওহী নাযিল হতে দেখেছেন, রাসুল (সা.)-এর মুখ থেকে সরাসরি এর তাফসীর ও ব্যাখ্যা শুনেছেন এবং তাঁদের আরবি ভাষা ছিল সকল কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত। ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) ‘আল-ইতক্বান ফী উলূমিল কুরআন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, সাহাবাদের মধ্যে দশজন মুফাসসির হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন—খুলাফায়ে রাশেদীন (আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, উবাই ইবনে কাব, যায়েদ ইবনে সাবিত, আবু মূসা আশয়ারী ও আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের (রা.)।

তাফসীরশাস্ত্রে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ শীর্ষ চারজন সাহাবীর সংক্ষিপ্ত অবদান

  • ১. রইসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.):

    তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচাতো ভাই। নবীজী (সা.) তাঁর জন্য বিশেষ দোয়া করেছিলেন: «اللَّهُمَّ فَقِّهْهُ فِي الدِّينِ وَعَلِّمْهُ التَّأْوِيلَ» (হে আল্লাহ! তাকে দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা ও কুরআনের তাফসীর শিক্ষা দিন)। তিনি ছিলেন ‘তুরজুমানুল কুরআন’ (কুরআনের শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার) এবং ‘হিবরুল উম্মাহ’ (উম্মতের মহাজ্ঞানী পণ্ডিত)। মক্কায় প্রতিষ্ঠিত তাঁর তাফসীর মাদরাসা থেকেই ইসলামের শ্রেষ্ঠ তাবেয়ী মুফাসসিরগণ তৈরি হয়েছিলেন।

  • ২. ফক্বীহুল উম্মাহ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.):

    সাহাবাদের মধ্যে কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞানে তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানীয়। তিনি বলতেন: “আল্লাহর কিতাবের এমন কোনো আয়াত নেই যা সম্পর্কে আমি জানি না যে তা কখন, কোথায় এবং কার ব্যাপারে নাযিল হয়েছে।” তিনি কুফায় তাফসীর পাঠশালা গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীকালে ইরাকের যুক্তিভিত্তিক ফিক্বহী ধারার উন্মেষ ঘটায়।

  • ৩. আসাদুল্লাহিল গালিব হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.):

    চার খলিফার মধ্যে তাফসীর বিষয়ে তাঁর থেকেই সর্বাধিক রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে। তিনি ছিলেন জ্ঞানের অবিসংবাদিত সিংহদ্বার। আরবি ভাষার ব্যাকরণ, অলংকার এবং আধ্যাত্মিক মর্মোদ্ধারে তাঁর তুলনা তিনি নিজেই ছিলেন। জটিলতম আয়াতের তাফসীরে সাহাবীগণ তাঁর শরণাপন্ন হতেন।

  • ৪. সায়্যিদুল কুররা হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.):

    আনসারদের মধ্যে তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ ক্বারী ও ওহী লেখক। স্বয়ং রাসুল (সা.) তাঁকে কুরআন শুনিয়েছিলেন। তিনি মদিনার তাফসীর পাঠশালার মূল স্থপতি ছিলেন। গভীর জ্ঞান ও সনদের বিশুদ্ধতায় তাঁর তাফসীর ছিল অনন্য প্রামাণ্য দলিল।

উপসংহার

সাহাবায়ে কেরামের বর্ণিত তাফসীরসমূহ তাফসীর সাহিত্যের মূল প্রাণ। তাঁদের রেখে যাওয়া এই বিশুদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডারই পরবর্তীকালের সমস্ত তাফসীর সংকলনের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে।

১২। بين خصائص التفسير فى عهد التابعين –

[তাবেয়ীগণের যুগে তাফসীরের বৈশিষ্ট্যগুলো বর্ণনা কর।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও যুগসন্ধিক্ষণ

সাহাবায়ে কেরামের সোনালী যুগের পর তাবেয়ীগণের যুগ ছিল তাফসীরশাস্ত্রের বিকাশ ও রূপান্তরের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। এ যুগে খেলাফতে রাশেদার সীমানা পেরিয়ে ইসলাম এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিশাল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে এবং লাখ লাখ অনারব মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। এই নতুন বিশ্ববাস্তবতার প্রেক্ষিতে তাবেয়ীগণের যুগে তাফসীরের পদ্ধতি, উৎস ও আঙ্গিকে বেশ কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।

তাবেয়ীগণের যুগে তাফসীরের প্রধান প্রধান মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ

  • ১. প্রাতিষ্ঠানিক আঞ্চলিক তাফসীর কেন্দ্রের উন্মেষ: শীর্ষ সাহাবীগণের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপনের ফলে তিনটি প্রধান আঞ্চলিক তাফসীর স্কুল গড়ে ওঠে:
    • মক্কা স্কুল: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত, যেখানে ভাষার শব্দার্থ ও আরবি সাহিত্যের ওপর গভীর জোর দেওয়া হতো (প্রসিদ্ধ ছাত্র: মুজাহিদ, আতা, ইকরামা)।
    • মদিনা স্কুল: হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর নেতৃত্বে হাদিস ও সুন্নাহর বর্ণনানির্ভর ধারা (প্রসিদ্ধ ছাত্র: যায়েদ ইবনে আসলাম, আবুল আলিয়াহ)।
    • ইরাক স্কুল: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর নেতৃত্বে রায়, কিয়াস ও ফিক্বহী পর্যালোচনার ধারা (প্রসিদ্ধ ছাত্র: আলক্বামাহ, আসওয়াদ, হাসান বসরী)।
  • ২. ইসরাঈলিয়াতের ব্যাপক অনুপ্রবেশ: পূর্বে ইহুদি ও খ্রিস্টান থাকা বহু পণ্ডিত ব্যক্তি (যেমন ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ ও কাব আল-আহবার) ইসলাম গ্রহণ করায় সাধারণ মানুষ অতীত নবীদের বিস্তারিত কিচ্ছা-কাহিনী জানার জন্য তাদের দ্বারস্থ হতো। ফলে এ যুগে তাফসীরের বর্ণনায় বিপুল পরিমাণ ইসরাঈলী রেওয়ায়েত প্রবেশ করে, যা পরবর্তী মুফাসসিরদের জন্য বাছাই করার নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
  • ৩. ফিক্বহী ও কালামী মতভেদের সূচনা: বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং আকিদাগত ফেরকার (যেমন খারেজী, শিয়া ও কাদারিয়্যা) উৎপত্তি হওয়ায় আয়াতের তাৎপর্য নির্ধারণে কিছুটা মতপার্থক্য ও বিতর্কের সূচনা হয়।
  • ৪. স্বাধীন ইজতিহাদ ও যুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি: সাহাবা যুগের চেয়ে এ যুগে নিত্যনতুন সমস্যার শরঈ সমাধান খোঁজার প্রয়োজনে কুরআন থেকে যুক্তি ও কিয়াসের মাধ্যমে আহকাম উদ্ঘাটনের প্রবণতা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।
  • ৫. প্রাথমিক সহীফা ও খসড়া লিখন শুরু: যদিও তাফসীর তখনও স্বতন্ত্র গ্রন্থাকারে সংকলিত হয়নি, তথাপি মুজাহিদ ও সাঈদ ইবনে জুবায়েরের মতো বিশিষ্ট তাবেয়ীগণ সাহাবাদের ব্যাখ্যা ব্যক্তিগত সহীফায় লিখে রাখতে শুরু করেন, যা পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থায়নের পথ সুগম করে।

উপসংহার

তাবেয়ীগণের যুগের এই বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্যসমূহ তাফসীরকে একটি সাধারণ মৌখিক বর্ণনা থেকে পরবর্তীকালে একটি পূর্ণাঙ্গ, পদ্ধতিগত ও সুসংহত তাত্ত্বিক শাস্ত্রে রূপান্তরের ভিত্তি রচনা করেছিল।

১৩। عرف التفسير بالرأى – ثم اذكر اقسامه –

[তাফসীর বির রায়-এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এর প্রকারভেদসমূহ উল্লেখ কর।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও পটভূমি

উলূমুল কুরআনের অন্যতম বহুল আলোচিত ও সংবেদনশীল তাফসীররীতি হলো ‘তাফসীর বির-রায়’ (التفسير بالرأي) বা যুক্তিনির্ভর তাফসীর। হাদিস ও আছারের বাইরে ভাষা, ব্যাকরণ ও মানবীয় প্রজ্ঞার সাহায্যে কুরআনের অর্থ নির্ণয়ের এই পদ্ধতিকে শরিয়ত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গ্রহণ করেছে।

তাফসীর বির-রায়ের সংজ্ঞা

  • আভিধানিক অর্থ: ‘রায়’ (الرأي) শব্দের অর্থ মতামত, চিন্তা, বুদ্ধি, ইজতিহাদ বা দৃষ্টিভঙ্গি।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: উলূমুল কুরআনের পরিভাষায়—কেবল বর্ণিত হাদিস বা আছারের ওপর সীমাবদ্ধ না থেকে আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, অলংকারশাস্ত্র এবং শরীয়তের প্রতিষ্ঠিত মূলনীতির আলোকে একজন যোগ্য মুজতাহিদের নিজস্ব চিন্তা, প্রজ্ঞা ও ইজতিহাদ দ্বারা কুরআনের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করাকে ‘তাফসীর বির-রায়’ বলা হয়।

তাফসীর বির-রায়ের মৌলিক প্রকারভেদ

শরঈ গ্রহণযোগ্যতা ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে তাফসীর বির-রায় প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত:

  • ১. প্রশংসনীয় তাফসীর বা তাফসীর বির-রায় আল-মাহমুদ (التفسير المحمود):

    যে তাফসীর একজন যোগ্য, আকিদাগতভাবে বিশুদ্ধ এবং আরবি ভাষা ও উলূমুল কুরআনের সমস্ত শাস্ত্রে পারদর্শী মুজতাহিদের মাধ্যমে রচিত হয়। এটি কুরআন ও সুন্নাহর প্রতিষ্ঠিত মূলনীতির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে এবং এতে কোনো মনগড়া বাতিল মতবাদ চাপিয়ে দেওয়া হয় না। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর ‘তাফসীরে কাবীর’ এবং ইমাম বাইযাবীর ‘আনওয়ারুত তানযীল’ এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই প্রকারের তাফসীর সম্পূর্ণ জায়েজ ও প্রশংসনীয়।

  • ২. নিন্দনীয় তাফসীর বা তাফসীর বির-রায় আল-মাজমুম (التفسير المذموم):

    যে তাফসীর কোনো শাস্ত্রীয় যোগ্যতা ছাড়াই অজ্ঞতাবশত করা হয়, অথবা নিজের কোনো মনগড়া বাতিল আকিদা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কুরআনের অপব্যাখ্যা করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই প্রকারের তাফসীর সম্পর্কেই কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন: «مَنْ قَالَ فِي الْقُرْآنِ بِرَأْيِهِ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ»। মুতাযিলা, বাতেনী ও কাদিয়ানীদের তাফসীর এর অন্তর্ভুক্ত। এই প্রকারের তাফসীর সম্পূর্ণ হারাম ও পথভ্রষ্টতা।

উপসংহার

শর্তসাপেক্ষে সুস্থ যুক্তি ও প্রজ্ঞার ব্যবহার তাফসীরকে সমৃদ্ধ করে; কিন্তু সীমালঙ্ঘন ও মনগড়া মতামত আসমানি কালামকে বিকৃত করে বিধায় শরিয়ত এ ব্যাপারে চরম সতর্কতা আরোপ করেছে।

১৪। اكتب مزايا “تفسير القرآن العظيم” لابن كثير مختصرا –

[আল্লামা ইবনে কাসীর (র)-এর রচিত تفسير القرآن العظيم-এর বৈশিষ্ট্যাবলি সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ কর।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও গ্রন্থের অনন্য মর্যাদা

অষ্টম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ও জগৎখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেজ ইমাদুদ্দীন আবুল ফিদা ইসমাইল ইবনে উমর ইবনে কাসীর আদ-দিমাশকী (রহ.) [মৃত্যু: ৭৭৪ হিজরি] প্রণীত ‘তাফসীরুল কুরআনিল আযীম’ (تفسير القرآن العظيم) যা বিশ্বজুড়ে ‘তাফসীরে ইবনে কাসীর’ নামে খ্যাত। এটি তাফসীর বিল মা’ছূরের জগতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ, বিশুদ্ধতম ও সর্বাধিক পঠিত তাফসীর গ্রন্থ।

তাফসীরে ইবনে কাসীরের প্রধান প্রধান অনন্য বৈশিষ্ট্যাবলি (مزايا التفسير)

  • ১. কুরআন দ্বারা কুরআনের সর্বোত্তম তাফসীর: ইবনে কাসীর (রহ.) কোনো আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সর্বপ্রথম পুরো কুরআনের অন্যান্য যেসকল সূরায় সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা এসেছে, তা সুবিন্যস্তভাবে একত্র করেছেন। এটি তাফসীরের সর্বোৎকৃষ্ট স্তর।
  • ২. সহিহ হাদিসের সুবিশাল ভাণ্ডার ও সনদের চুলচেরা বিশ্লেষণ: তিনি হাদিসের বিশাল সংকলন উল্লেখ করেছেন এবং কেবল হাদিস উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হননি; বরং মুহাদ্দিস হিসেবে প্রতিটি হাদিসের সনদের মান (সহিহ, হাসান বা জয়িফ) স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ করেছেন।
  • ৩. সাহাবা ও তাবেয়ীগণের আছারের বিশুদ্ধ সংকলন: প্রত্যেক আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি শীর্ষ সাহাবা ও তাবেয়ী মুফাসসিরগণের বক্তব্য তাদের মূল ধারায় উপস্থাপন করেছেন।
  • ৪. ইসরাঈলিয়াতের কঠোর সমালোচনা ও অপসারণ: পূর্ববর্তী বহু তাফসীর গ্রন্থে ইহুদি-খ্রিস্টানদের কাল্পনিক কাহিনীর যে অনুপ্রবেশ ঘটেছিল, হাফেজ ইবনে কাসীর অকাট্য দলিলের সাহায্যে সেগুলোর মুখোশ উন্মোচন করেছেন এবং বাতিল ইসরাঈলিয়াতকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
  • ৫. সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনা: কোনো প্রকার জটিল দার্শনিক কচকচানি বা অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক পরিহার করে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও সহজ ভাষায় তিনি সাধারণ ও পণ্ডিত সবার জন্য কুরআনকে উন্মুক্ত করেছেন।
  • ৬. ফিক্বহী মাসআলা ও মাজহাবসমূহের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা: শরিয়তের বিধান সংক্রান্ত আয়াতসমূহে তিনি চার মাজহাবের ইমামদের দলিলসমূহ উল্লেখ করে দলিলের দিক থেকে যা সর্বাধিক শক্তিশালী (রাজেহ), তা গ্রহণ করেছেন।

উপসংহার

হাফেজ ইবনে কাসীরের এই তাফসীর সহিহ সুন্নাহ ও সালাফদের ধারায় কুরআন অনুধাবনের এক অমূল্য নিয়ামত, যা কিয়ামত পর্যন্ত উম্মাহর পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ১ম বর্ষ মানাহিজুল মুফাসসিরীন ২০২৪ পরীক্ষার বিষয় কোড কত ছিল?

বিষয় কোড ছিল ১১১০১০ এবং পূর্ণমান ছিল ১০০ নম্বর। পরীক্ষার সময় ৩ ঘণ্টা।

তাফসীর ও তা’বীলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?

তাফসীর মূলত হাদিস, আসবাবুন নুযূল ও ঐতিহাসিক রিওয়ায়াতের ওপর নির্ভরশীল; পক্ষান্তরে তা’বীল হলো মুজতাহিদের সূক্ষ্ম চিন্তা ও ইজতিহাদের ওপর নির্ভরশীল।

রইসুল মুফাসসিরীন বা তাফসীর জগতের সম্রাট কাকে বলা হয়?

বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে সর্বসম্মতভাবে রইসুল মুফাসসিরীন বলা হয়।

তাফসীর বিল মা’ছূরের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে প্রামাণ্য দুটি কিতাব কী কী?

ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী রচিত ‘তাফসীরে তাবারী’ এবং হাফেজ ইবনে কাসীর রচিত ‘তাফসীরে ইবনে কাসীর’।

তাফসীর বির-রায় কি শরিয়তে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ?

না, শাস্ত্রীয় যোগ্যতা ও বিশুদ্ধ আকিদাসম্পন্ন মুজতাহিদের নিয়মতান্ত্রিক চিন্তাপ্রসূত প্রশংসনীয় তাফসীর (মাহমুদ) জায়েজ; কেবল যোগ্যতা ছাড়া মনগড়া অপব্যাখ্যা (মাজমুম) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

সাহাবায়ে কেরামের যুগে প্রতিষ্ঠিত প্রধান তিনটি তাফসীর মাদরাসা কোথায় ছিল?

মক্কায় হযরত ইবনে আব্বাসের পাঠশালা, মদিনায় হযরত উবাই ইবনে কাবের পাঠশালা এবং ইরাকে হযরত ইবনে মাসউদের পাঠশালা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *