দিরাসাতুত তাফসীর ৩য় পত্র (Dirasatut Tafsir 3rd Paper) – 111007, উলূমুল কুরআন – ফাযিল পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
৬৮ মিনিট পড়ার সময়
৪ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা
ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ : দিরাসাতুত তাফসীর (তৃতীয় পত্র) : দিরাসাতুত তাফসীর-৩ (বিষয় কোড: ১১১০০৭)
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[الملاحظة : أجب عن ستة من مجموعة “الف” وعن واحد من مجموعة “ب” – والاعداد بالهامش تدل على الدرجة الكاملة -]
[দ্রষ্টব্য : “الف” অংশ থেকে ছয়টি এবং “ب” অংশ থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের দিরাসাতুত তাফসীর ৩য় পত্র (বিষয় কোড: ১১১০০৭ – দিরাসাতুত তাফসীর-৩) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও গবেষণাধর্মী সমাধান নিচে দেওয়া হলো। তাফসিরে জালালাইন, তাফসিরে কুরতুবী ও ইবনে কাসীরের আলোকে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ মানদণ্ডে সংকলিত হয়েছে।

১। إنها شجرة تخرج في أصل الجحيم أي قعر جهنم وأغصانها ترتفع إلى دركاتها – طلعها المشبه بطلع النخل كأنه رؤوس الشياطين الحيات القبيحة المنظر – فإنهم أي الكفار لآكلون منها مع قبحها لشدة جوعهم فمالئون منها البطون –

[সূরা আস-সাফফাত : ৬৪-৬৬ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ এবং জাহান্নামের যাক্কুম বৃক্ষের বীভৎস স্বরূপ]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কালামুল্লাহয় জান্নাতের অতুলনীয় নিয়ামতের বর্ণনার পাশাপাশি জাহান্নামীদের অবর্ণনীয় আজাব ও তাদের নিকৃষ্টতম খাদ্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সূরা আস-সাফফাতে জাহান্নামের তলদেশ থেকে উদ্গত ‘যাক্কুম’ বৃক্ষ এবং কাফেরদের সেই বিষাক্ত ফল ভক্ষণের করুণ পরিণতির এক জীবন্ত ও লোমহর্ষক বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

নিশ্চয় এটি এমন এক বৃক্ষ যা জাহান্নামের তলদেশ (জাহান্নামের গভীর গহ্বর) থেকে উদ্গত হয় এবং যার শাখাপ্রশাখা জাহান্নামের বিভিন্ন স্তরে ও উপত্যকায় বিস্তৃত হয়ে ওঠে। এর থোকা বা মঞ্জরী—যা দেখতে খেজুরের মোচার মতো, কিন্তু তা বীভৎসতায় যেন শয়তানের মাথা কিংবা অত্যন্ত কুৎসিত বিষাক্ত সাপের মস্তকের সদৃশ। অতঃপর কাফেররা চরম ও অসহ্য ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হয়ে এই অতি কুৎসিত ও তিক্ত ফলটি ভক্ষণ করবে এবং এর দ্বারা তাদের পেট পূর্ণ করবে।

(الف) জাহান্নামের তলদেশ থেকে উদ্গত বৃক্ষের নাম এবং কুরআনে এর থোকার বর্ণনা

  • বৃক্ষের নাম: এই বৃক্ষের নাম হলো ‘শাজারাতুয যাক্কুম’ (شجرة الزقوم) বা যাক্কুম বৃক্ষ। পবিত্র কুরআনে একে ‘শাজারাতুল মালউনাহ’ বা অভিশপ্ত বৃক্ষ বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছে।
  • থোকার বীভৎস বর্ণনা: আল্লাহ তাআলা এই বৃক্ষের ফল ও থোকাকে তুলনা করেছেন ‘রউসুশ শায়াতীন’ (رؤوس الشياطين) অর্থাৎ শয়তানের মস্তকের সাথে। তাফসিরে জালালাইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এর দুটি প্রধান তাৎপর্য রয়েছে:
    • ১. এটি আরব মরুভূমির এক শ্রেণির অতি বিষাক্ত ও কুৎসিত চেহারার সাপকে রূপক অর্থে ‘শয়তান’ বলা হতো, যার মুখের অবয়ব ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর ও দৃষ্টিকটু।
    • ২. মানুষের কল্পনায় ইবলিস বা শয়তানের চেহারা যেমন চরম কদর্য, ভয়াল ও ঘৃণ্য—এই বৃক্ষের ফলগুলোও দেখতে তেমনই চরম ঘৃণ্য ও বীভৎস। কাফেররা তা দেখামাত্রই ভয়ে শিউরে উঠবে।

(খ) জাহান্নামীরা এই যাক্কুম ফলের সাথে কী করবে এবং এর পরিণতি কী হবে?

  • ক্ষুধার তাড়নায় ভক্ষণ: হাশর ও জাহান্নামের ময়দানে কাফেররা যখন তীব্র ক্ষুধার যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকবে, তখন ক্ষুধা নিবারণের জন্য কোনো খাদ্য না পেয়ে বাধ্য হয়ে এই কুৎসিত, কাঁটাযুক্ত ও দুর্গন্ধময় যাক্কুম ফল ভক্ষণ করতে শুরু করবে এবং উদর পূর্ণ করবে।
  • উদর বিদীর্ণ হওয়া ও উত্তপ্ত তরল পান: এই ফল পেটে প্রবেশ করতেই তা ফুটন্ত তেলের মতো পেটের নাড়িভুঁড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে গলিয়ে দেবে (সূরা আদ-দুখান: ৪৫-৪৬)। এরপর তাদের তীব্র পিপাসা পেলে তাদের সামনে ফুটন্ত উত্তপ্ত বিষাক্ত পানি (হামীম) পেশ করা হবে, যা পান করা মাত্রই তাদের মুখমণ্ডল ও অন্ত্র ছিন্নভিন্ন হয়ে পায়ুপথ দিয়ে গলে বের হয়ে যাবে।

উপসংহার

যাক্কুম বৃক্ষের এই ভয়ংকর বর্ণনা মানবজাতিকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগলিপ্সা ত্যাগ করে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য তাকওয়া অবলম্বনের চরম সতর্কবাণী প্রদান করে।

২। قل يا عبادي الذين آمنوا اتقوا ربكم أي عذابه بأن تطيعوه للذين أحسنوا في هذه الدنيا بالطاعة حسنة هي الجنة وأرض الله واسعة فهاجروا إليها من بين الكفار ومشاهدة المنكرات إنما يوفى الصابرون على الطاعة وما يبتلون به أجرهم بغير حساب بغير مكيال ولا ميزان –

[সূরা আয-যুমার : ১০ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, হিজরতের নির্দেশ এবং ধৈর্যশীলদের সীমাহীন প্রতিদান]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

মক্কার নির্যাতিত ও নিপীড়িত সাহাবীগণ যখন কাফেরদের অত্যাচার এবং মূর্তিপূজার প্রকাশ্য পাপের কারণে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করতে পারছিলেন না, তখন আল্লাহ তাআলা এই সান্ত্বনামূলক আয়াত নাজিল করে তাঁদেরকে আল্লাহর সুবিশাল জমিনে হিজরত করার উদাত্ত আহ্বান জানান এবং ধৈর্যের অপূর্ব সুসংবাদ দান করেন।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

আপনি বলুন: হে আমার মুমিন বান্দাগণ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের আযাব ও গযবকে ভয় কর তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে। যারা এই দুনিয়াতে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য পরকালে রয়েছে এক মহান কল্যাণ—আর তা হলো জান্নাত। আর আল্লাহর জমিন অত্যন্ত প্রশস্ত; অতএব তোমরা কাফেরদের অত্যাচার ও পাপের পরিবেশ পরিহার করে আল্লাহর জমিনে হিজরত কর। নিশ্চয় ধৈর্যশীলদেরকে—যারা দ্বীনের আনুগত্যে ও বিপদে অবিচল থাকে, তাদের প্রতিদান কোনো প্রকার হিসাব, মাপ বা পাল্লা ছাড়াই অপরিমিতভাবে পূর্ণরূপে প্রদান করা হবে।

(الف) মুমিনদের উদ্দেশ্যে নবীজী (সা.)-কে কী বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?

  • ১. আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন: মুমিনদের প্রধান কর্তব্য হলো আল্লাহর ভয় অন্তরে ধারণ করে যাবতীয় পাপাচার ও হারাম থেকে নিজেদের হেফাজত করা।
  • ২. সৎকাজের সুসংবাদ: যারা এই নশ্বর পৃথিবীতে প্রতিকূলতার মাঝেও নেক আমল ও আনুগত্যে অবিচল থাকবে, তাদের জন্য দুনিয়াতে আত্মিক শান্তি এবং পরকালে জান্নাতের সুমহান নিয়ামত সংরক্ষিত রয়েছে।
  • ৩. হিজরতের স্পষ্ট তাগিদ: কোনো অঞ্চলে যদি ঈমান ও আমল রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে পাপীদের সাথে আপস না করে আল্লাহর সুবিশাল পৃথিবীর এমন স্থানে চলে যেতে হবে যেখানে স্বাধীনভাবে আল্লাহর দ্বীন পালন করা যায়। মক্কা থেকে হাবশায় এবং পরবর্তীতে মদিনায় হিজরতের পটভূমিতে এই নির্দেশ কার্যকর হয়েছিল।

(খ) “إنما يوفى الصابرون أجرهم بغير حساب”-এর ব্যাখ্যা

  • বিনা হিসাবে প্রতিদানের অর্থ: কিয়ামতের দিন অন্যান্য আমলের সওয়াব পাল্লায় ওজন করে বা নির্দিষ্ট মাপে (যেমন ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত) দেওয়া হবে। কিন্তু যারা আল্লাহর দ্বীনের খাতিরে ত্যাগ স্বীকার করে সবর বা ধৈর্য ধারণ করেছে, তাদের জন্য সওয়াবের কোনো নির্দিষ্ট সীমা বা স্কেল থাকবে না। তাদের সামনে নেয়ামতের বারিধারা উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে (বগাইরি মিকইয়ালিন ওয়া লা মীযান)।
  • ধৈর্যের তিনটি স্তর:
    • ক. সবর আলাত তা’আহ: নিয়মিত ইবাদত ও শরিয়ত পালনে আলস্যের বিরুদ্ধে ধৈর্য।
    • খ. সবর আনিল মা’সিয়াহ: লোভ ও কুপ্রবৃত্তির মুখে পাপ বর্জনে ধৈর্য।
    • গ. সবর আলাল বালাইয়া: রোগ, শোক, দারিদ্র্য ও শত্রুর অত্যাচারে আল্লাহর সন্তুষ্টিতে ধৈর্য ধারণ করা।

উপসংহার

সবর হলো মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। পার্থিব সমস্ত দুঃখ-কষ্টের বিনিময়ে পরকালে আল্লাহ যে অসীম পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন, এই আয়াত তারই অবিসংবাদিত ঘোষণা।

৩। قالوا أي الخزنة تهكما أولم تك تأتيكم رسلكم بالبينات بالمعجزات الظاهرات قالوا بلى أي فكفروا بهم قالوا فادعوا أنتم فإننا لا نشفع للكافرين، قال تعالى وما دعاء الكافرين إلا في ضلال انعدام –

[সূরা গাফির : ৫০ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, জাহান্নামের প্রহরীদের উপহাস এবং কাফেরদের দোয়ার ব্যর্থতা]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

জাহান্নামের অসহ্য আযাবে দগ্ধ হতে হতে কাফেররা যখন দিশেহারা হয়ে পড়বে, তখন তারা জাহান্নামের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান ফেরেশতাদের কাছে হাত জোড় করে মিনতি করবে যেন তারা আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে অন্তত এক দিনের জন্য আযাব কিছুটা হালকা করে দেন। তখন ফেরেশতারা তাদের যে জবাব দেবেন—তা এই আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

জাহান্নামের প্রহরীরা (খাযানাতু জাহান্নাম) উপহাস ও ভর্ৎসনা করে বলবে: তোমাদের কাছে কি তোমাদের নবী-রাসূলগণ স্পষ্ট অলৌকিক মু’জিযা ও নিদর্শন নিয়ে আগমন করেননি? কাফেররা বলবে: হ্যাঁ, অবশ্যই এসেছিলেন (অর্থাৎ আমরাই তাঁদের মিথ্যাবাদী বলে অস্বীকার করেছিলাম)। তখন প্রহরীরা বলবে: তবে তোমরাই দোয়া ও চিৎকার করতে থাক, কেননা আমরা কাফেরদের জন্য কোনো সুপারিশ করব না! আর আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: কাফেরদের যাবতীয় প্রার্থনা ও ফরিয়াদ কেবল চরম ব্যর্থতা ও শূন্যতায় পর্যবসিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

(الف) রাসূলদের সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে কাফেররা কী বলবে?

  • কাফেররা সত্য স্বীকার করে বলবে: ‘বালা’ (بلى)—হ্যাঁ, অবশ্যই আমাদের কাছে নবীরা সুস্পষ্ট ওহী, কিতাব এবং অলৌকিক নিদর্শনাবলী নিয়ে এসেছিলেন।
  • তারা সেদিন আল্লাহর সামনে নিজেদের হঠকারিতা ও অপরাধের অকাট্য স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হবে। তারা স্বীকার করবে যে দোষ নবীদের ছিল না; বরং তারা নিজেরাই অহংকারবশত সত্যবাণী প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু এই স্বীকারোক্তি তাদের কোনো মুক্তি দেবে না।

(খ) কাফেরদের স্বীকারোক্তির পর প্রহরীদের কঠোর জবাব

  • প্রহরীদের উপহাস: জাহান্নামের প্রহরীরা বলবে—তোমরা যখন জেনেশুনে নবী ও আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকার করেছিলে, তখন আমরা তোমাদের জন্য কেন আল্লাহর কাছে সুপারিশ করতে যাব? আমরা কোনো কাফেরের জন্য সুপারিশ করতে পারি না। অতএব তোমরা নিজেরাই চিৎকার করে দোয়া করতে থাক।
  • “وما دعاء الكافرين إلا في ضلال”-এর মর্ম: জাহান্নামে কাফেরদের কান্না, আর্তনাদ বা দোয়া কখনোই আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছাবে না; বরং তা এক অন্তহীন মরুভূমির বালুকারাশির মতো শূন্যে হারিয়ে যাবে। আযাবের তীব্রতা কমার কোনো সম্ভাবনা কোনোদিন থাকবে না।

উপসংহার

দুনিয়া হলো আমলের জায়গা, আর আখেরাত হলো কেবল প্রতিদানের। সেখানে সুযোগ শেষ হওয়ার পর শত কান্না ও আর্তনাদ কোনো কাজেই আসবে না।

৪। حم الله أعلم بمراده به – تنزيل من الرحمن الرحيم مبتدأ – كتاب خبره فصلت آياته بينت بالأحكام والقصص والمواعظ قرآنا عربيا حال من كتاب بصفته لقوم متعلق بفصلت يعلمون يفهمون ذلك وهم العرب –

[সূরা ফুসসিলাত : ১-৩ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ এবং কুরআন আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হওয়ার ঐশী হিকমত]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা ফুসসিলাত (বা হা-মীম আস-সাজদাহ) মক্কী সূরা। মক্কার শীর্ষ কুরাইশ নেতা উতবা ইবনে রাবীআ যখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে নানা লোভ দেখিয়ে ইসলাম প্রচার বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছিল, তখন নবীজী তার উত্তরে এই সূরার প্রারম্ভিক আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে তাকে নির্বাক করে দিয়েছিলেন।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘হা-মীম’—আল্লাহ তাআলাই এর প্রকৃত মর্মার্থ সম্পর্কে সম্যক অবগত। ‘তানযীলুম মির-রাহমানির রাহীম’—এটি পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ মহাগ্রন্থ (এটি মুবতাদা); ‘কিতাবুন ফুসসিলাত আয়াতুহূ’—এটি এমন এক কিতাব যার আয়াতসমূহ বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে (এটি খবর); বিধিবিধান, শিক্ষণীয় ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও নসীহতের দ্বারা তা সুবিন্যস্ত করা হয়েছে; ‘কুরআনান আরাবিয়্যা’—আরবি ভাষার এক প্রাঞ্জল কুরআন হিসেবে (এটি ‘কিতাব’-এর হাল); ‘লিক্বাওমিঁই ইয়া’লামূন’—এমন এক সম্প্রদায়ের জন্য যারা গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা রাখে এবং এর অর্থ অনুধাবন করতে পারে (আর তারা হলো তৎকালীন আরবের মানুষ)।

(الف) কুরআন “আরবি ভাষায়” অবতীর্ণ হওয়ার ঐশী হিকমত

  • ১. আরবি ভাষার অতুলনীয় সমৃদ্ধি ও অলঙ্কারশাস্ত্র: আরবি হলো পৃথিবীর প্রাচীনতম ও সর্বাধিক শব্দসমৃদ্ধ, ব্যঞ্জনাময় এবং বিজ্ঞানসম্মত ভাষা। অন্য কোনো ভাষায় একটি শব্দের এত বিপুল ধাতুগত বৈচিত্র্য ও ভাবের গভীরতা প্রকাশ করা অসম্ভব।
  • ২. প্রাথমিক সম্বোধিত জাতির মাতৃভাষা: যে জাতির মাঝে নবীজী আবির্ভূত হয়েছিলেন তারা ছিল আরবিভাষী। তাদের বোধগম্য ভাষায় কিতাব নাযিল না হলে তারা অজুহাত তুলত যে আমরা এই কিতাবের ভাষা বুঝি না (সূরা ফুসসিলাত: ৪৪)।
  • ৩. আরবের কাব্যিক দম্ভ চূর্ণ করা: আরবরা নিজেদের বিশুদ্ধ ভাষার কারণে সমগ্র অনারব বিশ্বকে ‘আজম’ (বোবা বা ভাষাহীন) মনে করত। আল্লাহ তাদের প্রিয়তম মাতৃভাষাতেই কুরআন নাজিল করে তাদের একটি সূরার মতো কিছু রচনার চ্যালেঞ্জ দিয়ে তাদের অহংকার চিরতরে চূর্ণ করেছেন।

(খ) “لقوم يعلمون” (জ্ঞানবান সম্প্রদায়ের জন্য)-এর বিশেষত্ব

  • কুরআন সবার জন্য অবতীর্ণ হলেও এখানে বিশেষভাবে ‘জ্ঞানবানদের’ উল্লেখ করার কারণ হলো—কুরআনের রূপক, বালাগাত ও দার্শনিক গভীরতা কেবল তারাই অনুধাবন করতে পারে যাদের সুস্থ বিচারবুদ্ধি, ভাষাতাত্ত্বিক পাণ্ডিত্য এবং চিন্তার যোগ্যতা রয়েছে। মূর্খ ও হঠকারীরা এর বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখলেও এর অভ্যন্তরীণ জ্ঞানের পরশ পায় না।

উপসংহার

আরবি ভাষার এই ঐশী নির্বাচন কুরআনকে এক চিরন্তন, অবিকৃত ও অলৌকিক জীবন্ত সংবিধানে রূপান্তর করেছে—যা কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্পন্দিত থাকবে।

৫। وهو الذي يقبل التوبة عن عباده ويعفوا عن السيئات المتاب عنها ويعلم ما تفعلون بالياء والتاء – ويستجيب الذين آمنوا وعملوا الصالحات يجيبهم إلى ما يسألون ويزيدهم من فضله والكافرون لهم عذاب شديد –

[সূরা আশ-শূরা : ২৫-২৬ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, তওবা কবুলের শর্তাবলি এবং কাফেরদের ভয়াবহ পরিণতি]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

মানুষ ভুল ও পাপের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু পাপের সাগরে নিমজ্জিত মানুষের জন্য আল্লাহ তাআলা স্বীয় রহমতের দরজা সর্বদা উন্মুক্ত রেখেছেন। সূরা আশ-শূরার এই আয়াতে আল্লাহর অসীম দয়া, তওবা কবুলিয়াত এবং সৎকর্মশীলদের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার অনুপম আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

এবং তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি স্বীয় বান্দাদের পক্ষ থেকে তওবা কবুল করেন এবং তাদের কৃত পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন যার থেকে তওবা করা হয়েছে; আর তোমরা যা কিছু কর সে বিষয়ে তিনি সম্যক অবগত আছেন (ইয়া ও তা উভয় কেরাতে পঠিত)। আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করেছে তিনি তাদের দোয়ায় সাড়া দেন এবং স্বীয় অনুগ্রহে তাদের প্রাপ্য সওয়াবের চেয়েও বহুগুণ বৃদ্ধি করে দান করেন; আর যারা কাফের তাদের জন্য পরকালে রয়েছে এক অতি কঠোর ও মর্মান্তিক শাস্তি।

(الف) “يعفوا عن السيئات”-এর ব্যাখ্যা এবং আল্লাহ কি বান্দার প্রতিটি পাপের হিসাব নেবেন?

  • ‘সিয়্যিআত’ মাফের অর্থ: বান্দা যখন কোনো পাপের পর খাঁটি অন্তরে তওবা করে, তখন আল্লাহ সেই পাপ ক্ষমা করে দেন। শুধু ক্ষমাই নয়, সূরা ফুরক্বানের ৭০ নম্বর আয়াত অনুযায়ী আল্লাহ তওবাকারীর অতীতের পাপগুলোকে পুণ্যে রূপান্তরিত করে দেন।
  • পাপের হিসাব গ্রহণের শারঈ নিয়ম:
    • ১. যে ব্যক্তি তওবা ছাড়া মারা যায়, আল্লাহ চাইলে স্বীয় ইনসাফ অনুযায়ী তাকে শাস্তি দিতে পারেন, কিংবা স্বীয় রহমতে মাফও করে দিতে পারেন।
    • ২. বান্দার হক বা মানুষের অধিকার হরণ (যেমন চুরি, গিবত বা অত্যাচার): এটি কেবল আল্লাহর কাছে তওবা করলেই মাফ হবে না; যতক্ষণ না সংশ্লিষ্ট মজলুম বান্দা তার অধিকার ফিরিয়ে পেয়ে ক্ষমা করে।
    • ৩. খাঁটি তওবা সম্পন্ন হলে সেই পাপের জন্য কিয়ামতে আল্লাহ বান্দাকে লাঞ্ছিত করবেন না; বরং তা চিরতরে আমলনামা থেকে মুছে দেওয়া হবে।

(খ) কাফেরদের চূড়ান্ত পরিণতি এবং এই শাস্তির কারণ

  • চূড়ান্ত পরিণতি: কাফেরদের জন্য আখেরাতে রয়েছে ‘আযাবুন শাদীদ’ অর্থাৎ চিরন্তন জাহান্নামের অবর্ণনীয় আগুনের শাস্তি, যেখানে মৃত্যুও হবে না আবার শান্তির কোনো উপায়ও থাকবে না।
  • শাস্তির যৌক্তিক কারণ: আল্লাহ পৃথিবীতে তাদের বিবেক, চোখ, কান ও জীবনোপকরণ দিয়েছিলেন সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য। নবীরা এসে তাদের হেদায়েতের পথ দেখিয়েছেন। কিন্তু তারা সত্যকে জেনে-শুনেও অহংকারে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এই চরম অকৃতজ্ঞতা ও ঔদ্ধত্যের কারণেই তারা এই চিরস্থায়ী শাস্তির উপযুক্ত হয়েছে।

উপসংহার

আল্লাহর রহমত তাঁর গযবের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। বান্দা যত বড় পাপীই হোক না কেন, মৃত্যুর পূর্বে খাঁটি তওবা করে ফিরে এলে আল্লাহ তাকে স্বীয় পরম ভালোবাসায় গ্রহণ করে নেন।

৬। ولئن لام قسم سألتهم من خلق السماوات والأرض ليقولن حذف منه نون الرفع لتوالي النونات وواو الضمير لالتقاء الساكنين خلقهن العزيز العليم أخر جوابهم الخ عليم زاد تعالى : الذي جعل لكم الأرض مهادا فراشا كالمهد للصبي وجعل لكم فيها سبلا طرقا لعلكم تهتدون إلى مقاصدكم في أسفاركم –

[সূরা আয-যুখরুফ : ৯-১০ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, মুশরিকদের স্ববিরোধী আকিদা এবং ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

মক্কার মুশরিকদের আকিদাগত এক চরম স্ববিরোধিতা ছিল যে, তারা সৃষ্টিজগতের একক স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহকে বিশ্বাস করত (তাওহীদে রুবূবিয়াত মানত), কিন্তু ইবাদতের ক্ষেত্রে তারা মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে শিরক করত। এই আয়াতে তাদের এই স্ববিরোধী চিন্তাকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

আর আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন—কে আসমানসমূহ ও জমিনকে সৃষ্টি করেছেন? তবে তারা অবশ্যই এক বাক্যে বলবে: এগুলোকে সেই পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ সত্তাই সৃষ্টি করেছেন! (এখানে নূনের ধারাবাহিকতা পরিহার করতে মারফূ’ নূন বিলুপ্ত হয়েছে এবং দুই সাকিনের মিলনে ওয়াও বিলুপ্ত হয়েছে)। কাফেরদের উত্তরের ধারাবাহিকতায় আল্লাহ স্বয়ং আরও বৃদ্ধি করে বলেন: তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্য জমিনকে বানিয়েছেন এক সুকোমল বিছানাসদৃশ (যেমন শিশুর জন্য দোলনা প্রস্তুত করা হয়), এবং তাতে তোমাদের চলাচলের জন্য তৈরি করেছেন অসংখ্য পথ ও রাস্তাঘাট; যাতে তোমরা তোমাদের ভ্রমণের গন্তব্যে পথ খুঁজে পেতে পার।

(الف) মুশরিকদের নিকট এই প্রশ্ন করা হলে তাদের উত্তর কী হতো এবং কেন?

  • মুশরিকদের উত্তর: তারা দ্বিধাহীনভাবে বলবে: ‘খালাক্বাহুন্নাল আযীযুল আলীম’—সেই পরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞানী আল্লাহই এদেরকে সৃষ্টি করেছেন।
  • এর অন্তর্নিহিত কারণ: আরবের মুশরিকরা ভালো করেই জানত যে তাদের তৈরি লাত, মানাত বা উযযা কোনো আসমান বা জমিন তৈরি করতে পারে না; বৃষ্টি বর্ষণ করতে পারে না। তাদের বিবেক সাক্ষ্য দিত যে নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ। কিন্তু অন্ধ পূর্বপুরুষদের প্রথা ও পার্থিব স্বার্থের কারণে তারা মূর্তিদেরকে আল্লাহর কাছে সুপারিশকারী মধ্যস্থতাকারী মনে করে পূজা করত।

(খ) মুশরিকদের জবাবে ‘আল-আযীয’ ও ‘আল-আলীম’-এর উল্লেখের ঐশী হিকমত

  • ‘আল-আযীয’ (العزيز – মহাপরাক্রমশালী): যিনি নিখিল বিশ্ব সৃষ্টিতে কোনো অংশীদার বা সাহায্যকারীর মুখাপেক্ষী নন; যাঁর শক্তির সামনে সমগ্র সৃষ্টি মস্তক অবনত করতে বাধ্য।
  • ‘আল-আলীম’ (العليم – সর্বজ্ঞানী): যাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী এই মহাবিশ্ব এক নিখুঁত নিয়মে ও শৃঙ্খলায় আবর্তিত হচ্ছে।
  • মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুক্তি: আল্লাহ তাদের জবাবে বলছেন—তোমরা যখন নিজ মুখেই স্বীকার করছ যে স্রষ্টা হলেন পরম পরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহ, তবে কেন তোমরা শক্তিহীন ও অজ্ঞ মূর্তিদের উপাসনা কর? এটি তোমাদের চরম নির্বুদ্ধিতা ও মানসিক দেউলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়।

উপসংহার

তাওহীদে রুবূবিয়াত স্বীকার করার অনিবার্য দাবি হলো তাওহীদে উলূহিয়াত অর্থাৎ যাবতীয় ইবাদত কেবল একমাত্র আল্লাহর জন্যই সমর্পণ করা।

৭। رب السماوات والأرض وما بينهما برفع رب خبر ثالث وبجره بدل من ربك إن كنتم يا أهل مكة موقنين بأنه تعالى رب السماوات والأرض فأيقنوا بأن محمدا رسوله لا إله إلا هو يحيي ويميت ربكم ورب آبائكم الأولين –

[সূরা আদ-দুখান : ৭-৮ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, জীবন-মৃত্যুর ঐশী কর্তৃত্ব এবং পূর্বপুরুষদের স্মরণের তাৎপর্য]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা আদ-দুখান মক্কী সূরা। কাফেররা যখন দুর্ভিক্ষ ও অনাহারে পর্যুদস্ত হয়েছিল, তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মহাজাগতিক সৃষ্টির বিশালতা এবং জীবন ও মৃত্যুর ওপর একমাত্র আল্লাহর কর্তৃত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে একত্ববাদের প্রতি আহ্বান জানান।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

তিনি আসমানসমূহ, জমিন এবং এই উভয়ের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুর একমাত্র প্রতিপালক (‘রাব্বু’ পেশযোগে পড়লে তৃতীয় খবর, আর যেরযোগে পড়লে ‘রাব্বিকা’-এর বাদল); হে মক্কাবাসী! তোমরা যদি এই বিশ্বাসে সুদৃঢ় হও যে আল্লাহই আসমান ও জমিনের রব, তবে এ বিষয়েও দৃঢ় বিশ্বাস রাখ যে মুহাম্মদ (সা.) তাঁরই প্রেরিত সত্য রাসূল। তিনি ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই; তিনিই জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু ঘটান; তিনিই তোমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদের পূর্ববর্তী পূর্বপুরুষদেরও প্রতিপালক।

(الف) “يحيي ويميت” (তিনিই জীবন ও মৃত্যু দেন)-এর গভীর তাত্বিক অর্থ ও উলূহিয়াতের দলীল

  • জীবন ও মৃত্যুর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা: অনস্তিত্ব থেকে কোনো জড় বস্তুকে প্রাণবন্ত করা এবং জীবিত সৃষ্টিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে দেওয়া—এটি এমন এক অলৌকিক ক্ষমতা যা বিশ্বের কোনো বিজ্ঞানী, চিকিৎসক বা রাজা-বাদশাহ কোনোদিন অর্জন করতে পারেনি।
  • উলূহিয়াতের অকাট্য দলীল: যিনি জীবন ও মৃত্যুর একমাত্র নিয়ন্ত্রক, তিনিই কেবল যাবতীয় ইবাদত, সেজদা ও আনুগত্য পাওয়ার একমাত্র হকদার। কোনো মৃত মানুষ বা প্রাণহীন মূর্তি কাউকে এক সেকেন্ডের জীবনও দিতে পারে না এবং কারও মৃত্যু রোধও করতে পারে না। সুতরাং তাদের পূজা করা চরম বাতুলতা। হযরত ইব্রাহীম (আ.) নমরূদের সাথে বিতর্কে এই অকাট্য যুক্তি পেশ করেছিলেন (সূরা আল-বাকারা: ২৫৮)।

(খ) “ربكم ورب آبائكم الأولين”-এর তাৎপর্য এবং পূর্বপুরুষদের উল্লেখের কারণ

  • মুশরিকদের অন্ধ যুক্তির খণ্ডন: আরবের কাফেরদের প্রধান যুক্তি ছিল—আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের যে ধর্মের ওপর পেয়েছি আমরা তার অন্ধ অনুকরণ করব।
  • ঐশী জবাব: আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন—তোমাদের বাপ-দাদারা কোনো চিরন্তন প্রভু ছিলেন না; তারাও রক্ত-মাংসের দুর্বল সৃষ্টি ছিলেন। তাদেরও সৃষ্টি করেছিলেন এক আল্লাহ এবং তাদেরও মৃত্যু দিয়েছিলেন সেই একই আল্লাহ। অতএব যে পূর্বপুরুষরা স্বয়ং আল্লাহর মুখাপেক্ষী ও সৃষ্টি ছিলেন, তাদের অন্ধ পূজা বর্জন করে তাদের ও তোমাদের পরম স্রষ্টার ইবাদতে ফিরে আসাই পরম সত্য।

উপসংহার

জীবন ও মৃত্যুর এই সুমহান চক্র প্রমাণ করে যে মানবজাতি এক পরাক্রমশালী মালিকের অধীন। অতএব মৃত্যুর পূর্বেই সেই প্রভুর সমীপে আত্মসমর্পণ করা আবশ্যক।

৮। ويل كلمة عذاب لكل أفاك كذاب أثيم كثير الإثم – يسمع آيات الله القرآن تتلى عليه ثم يصر على كفره مستكبرا متكبرا عن الإيمان كأن لم يسمعها فبشره بعذاب أليم –

[সূরা আল-জাসিয়াহ : ৭-৮ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, ‘আফফাকিন আসীম’-এর স্বরূপ এবং কুরআনের অবমাননার শাস্তি]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা আল-জাসিয়াহ মক্কী সূরা। যারা অহংকারবশত আল্লাহর আয়াতসমূহ শুনেও তা নিয়ে উপহাস করে এবং নিজেদের কুফরি ও পাপাচারের ওপর অনড় থাকে, তাদের জন্য এই আয়াতে এক ধ্বংসাত্মক সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘ওয়াইলুন’—চরম ধ্বংস ও কঠিন আজাব অবধারিত; ‘লিকুল্লি আফফাকিন আসীম’—প্রত্যেকটি চরম মিথ্যাবাদী ও মহাপাপী ব্যক্তির জন্য; ‘ইয়াসমা’উ আয়াতিল্লাহি তুতলা আলাইহি’—যে আল্লাহর আয়াতসমূহকে স্বীয় কর্ণে তেলাওয়াত করতে শোনে, ‘ছুম্মা ইউসিররু মুসতাকবিরান’—অতঃপর অহংকারে অন্ধ হয়ে স্বীয় কুফরির ওপর অবিচল থাকে, ‘কাআল লাম ইয়াসমা’হা’—যেন সে সেই বাণী আদৌ শুনতেই পায়নি! ‘ফাবাশ্শিরহু বিআযাবিন আলীম’—অতএব আপনি তাকে এক অতি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ (ভর্ৎসনামূলক সুসংবাদ) শুনিয়ে দিন।

(الف) আয়াতে উল্লেখিত ‘আফফাকুন আসীম’ (أفاك أثيم) কে এবং তার বৈশিষ্ট্যসমূহ কী?

  • শব্দার্থ: ‘আফফাক’ অর্থ চরম মিথ্যাবাদী, যে সত্যকে উল্টে দিয়ে মিথ্যা অপপ্রচার চালায়; এবং ‘আসীম’ অর্থ মহাপাপী, যে সর্বদা গর্হিত ও হারামে নিমজ্জিত থাকে।
  • কাদের শানে নাযিল: মুফাসসিরীনদের মতে আয়াতটি প্রধানত কুখ্যাত কাফের নেতা নযর ইবনুল হারিস (মতান্তরে আবু জাহেল)-এর ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিল। নযর ইবনুল হারিস পারস্য ও রোম থেকে কাল্পনিক রূপকথা ও গানের দাসী এনে সাধারণ মানুষকে কুরআনের বাণী শোনা থেকে বিভ্রান্ত করত এবং বলত—মুহাম্মদ তো কেবল প্রাচীন উপকথা শোনায়, আমার কাছে এর চেয়েও ভালো রূপকথা আছে!
  • তার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ: অহংকার, সত্যবাণী শুনেও বধির সেজে থাকা, মানুষকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করা এবং আল্লাহর দীনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা।

(খ) “كأن لم يسمعها”-এর ব্যাখ্যা ও কুরআনের সামনে কাফেরদের মনস্তত্ত্ব

  • কুরআনের আয়াত এতই সুস্পষ্ট ও হৃদয়গ্রাহী ছিল যে কাফেররা শুনলে তাদের অন্তর কেঁপে উঠত। কিন্তু তাদের বংশীয় অহংকার ও জিদ এত প্রকট ছিল যে তারা বাহ্যিকভাবে ভান করত যেন তারা কিছুই শোনেনি।
  • তারা নিজেদের কানে আঙুল দিয়ে রাখত এবং সমস্বরে হট্টগোল করত যাতে কেউ কুরআন শুনতে না পারে (সূরা ফুসসিলাত: ২৬)। সত্যের সামনে এই অন্ধ বধিরতার কারণেই তাদের জন্য ‘আযাবে আলীম’ নির্ধারিত হয়েছে।

উপসংহার

আল্লাহর বাণী শুনে অহংকার করা আত্মহত্যার শামিল। বিনীত হৃদয়ে সত্যকে গ্রহণ করাই মানুষকে পরকালের অবধারিত ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারে।

৯। إن الله يدخل الذين آمنوا وعملوا الصالحات جنات تجري من تحتها الأنهار والذين كفروا يتمتعون في الدنيا ويأكلون كما تأكل الأنعام أي ليس لهم هم إلا بطونهم وفروجهم ولا يلتفتون إلى الآخرة والنار مثوى لهم منزلة ومقام ومصير –

[সূরা মুহাম্মদ : ১২ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, কাফেরদের পশুতুল্য জীবন এবং মুমিন বনাম কাফেরদের পরিণতির বৈপরীত্য]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা মুহাম্মদ মাদানী সূরা। সূরার দ্বাদশ আয়াতে ঈমানদার ও কাফেরদের জীবনের লক্ষ্য, দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরকালীন অনন্ত পরিণতির এক সুদূরপ্রসারী দার্শনিক বৈপরীত্য চিত্রিত হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের প্রবেশ করাবেন যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করেছে এমন সব জান্নাতে যার তলদেশ দিয়ে নদ-নদী প্রবাহিত হয়। আর যারা কুফরি করেছে তারা পার্থিব জীবনে ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে এবং তারা আহার করে যেমন চতুষ্পদ জন্তুরা আহার করে থাকে; অর্থাৎ পেট ও লজ্জাস্থান ছাড়া তাদের জীবনের আর কোনো লক্ষ্য থাকে না এবং তারা আখেরাতের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করে না; আর জাহান্নামের আগুনই হলো তাদের চিরস্থায়ী বাসস্থান, ঠিকানা ও চূড়ান্ত পরিণতি।

(الف) আখেরাতে মুমিন ও কাফেরদের পরিণতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ

দিকসমূহ মুমিনদের পরিণতি কাফেরদের পরিণতি
১. চিরস্থায়ী ঠিকানা চিরসবুজ সুরম্য জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে দুধ, মধু ও সুমিষ্ট পানির নহর বহমান। জাহান্নামের উত্তপ্ত অগ্নিকুণ্ড—যা হবে তাদের চিরস্থায়ী কারাগার।
২. মানসিক ও আত্মিক অবস্থা আল্লাহর পরম সন্তুষ্টি, দিদার এবং অনন্ত সম্মান ও মর্যাদা। লাঞ্ছনা, অপমান, অনুশোচনা এবং আল্লাহর রহমত থেকে চিরদিনের জন্য বিতাড়ন।
৩. প্রাপ্তি ও স্থায়িত্ব কখনো শেষ না হওয়া অনন্ত সুখ ও যৌবন। অবিরাম শাস্তি—চামড়া জ্বলে গেলে নতুন চামড়া পাল্টে দেওয়া হবে।

(খ) পার্থিব জীবনে কাফেরদের পশুর সাথে তুলনা করার হিকমত

  • পশুর জীবনের কোনো নৈতিক দায়বদ্ধতা নেই; পশু জানে না তার স্রষ্টা কে, হালাল-হারাম কী এবং মৃত্যুর পর জবাবদিহিতা কী। তার জীবনের একমাত্র কাজ হলো কেবল চরে খাওয়া, পেট ভরা এবং প্রজনন চাহিদা মেটানো।
  • কাফেরদের অবস্থাও ঠিক তাই। আল্লাহ তাদের বিবেক ও চিন্তা করার শক্তি দেওয়া সত্ত্বেও তারা জীবনের পরম উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে কেবল অর্থনৈতিক ভোগবাদ, উদরপূর্তি ও কামলিপ্সায় ডুবে থাকে। আখেরাতের কোনো প্রস্তুতি তারা নেয় না। তাই আল্লাহ তাদের পশুর চেয়েও অধম ও নির্বোধ বলে আখ্যা দিয়েছেন (সূরা আল-আ’রাফ: ১৭৯)।

উপসংহার

মানুষ কেবল তখনই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি (আশরাফুল মাখলুকাত), যখন সে ঈমান ও নৈতিকতা দিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে; অন্যথায় আত্মনিয়ন্ত্রণহীন মানুষ বন্য পশুর চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

১০। والمرسلات عرفا أي الرياح متتابعة كعرف الفرس يتلو بعضه بعضا ونصبه على الحال – فالعاصفات عصفا الرياح الشديدة – والناشرات نشرا الرياح تنشر المطر – فالفارقات فرقا أي آيات القرآن تفرق بين الحق والباطل والحلال والحرام –

[সূরা আল-মুরসালাত : ১-৪ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ এবং প্রাকৃতিক ও ঐশী শক্তির শপথের হিকমত]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা আল-মুরসালাত হলো মক্কী সূরা। রাসুলুল্লাহ (সা.) মিনার এক গুহায় অবস্থানকালে এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছিল। সূরার প্রারম্ভেই আল্লাহ তাআলা মহাশক্তিশালী প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ এবং ওহীর আয়াতসমূহের শপথ করে কিয়ামতের অবশ্যম্ভাবী আগমন ঘোষণা করেছেন।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

শপথ সেই প্রেরিত বায়ুপ্রবাহের—যা একের পর এক ধারাবাহিকভাবে ধাবিত হয় (যেমন ঘোড়ার কেশর একটির পর একটি সজ্জিত থাকে); শপথ সেই প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ুর—যা প্রবল বেগে ঝড়ো হাওয়ার রূপ ধারণ করে; শপথ সেই মেঘমালা বিস্তারকারী বায়ুর—যা বৃষ্টির সঞ্চার করে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দেয়; শপথ সেই আয়াতসমূহের—যা সত্য ও মিথ্যার মাঝে এবং হালাল ও হারামের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য নিরূপণ করে দেয়।

(الف) সূরার শুরুতে আল্লাহ কেন এই বস্তুগুলোর শপথ করলেন?

  • আল্লাহর শপথ করার নিয়ম: আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির কোনো মহিমান্বিত নিদর্শন বা ঘটনার গুরুত্ব বোঝাতে স্বীয় সৃষ্টির শপথ করতে পারেন (বান্দা কেবল আল্লাহর নামেই শপথ করতে পারে)।
  • কিয়ামতের শক্তির চাক্ষুষ প্রমাণ: মৃদুমন্দ বাতাস থেকে শুরু করে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়—বাতাসের এই রূপান্তর মানুষের চোখের সামনে আল্লাহর অসীম শক্তি ও ধ্বংসক্ষমতার জীবন্ত প্রমাণ। যে আল্লাহ নিমিষেই শান্ত বাতাসকে বিধ্বংসী তুফানে পরিণত করে জনপদ ধ্বংস করতে পারেন, সেই আল্লাহর পক্ষে কিয়ামতের মহাপ্রলয় ঘটানো বিন্দুমাত্র কঠিন নয়। এই সত্যটি স্মরণ করিয়ে দিতেই এই শপথসমূহ করা হয়েছে।

(খ) ‘আল-মুরসালাত’ এবং ‘আল-ফারিক্বাত’-এর মধ্যকার তাত্ত্বিক যোগসূত্র

  • বাহ্যিক জগৎ বনাম আত্মিক জগৎ: ‘মুরসালাত’ হলো প্রাকৃতিক জগতের বাতাস—যা মেঘমালা উড়িয়ে এনে মৃত জমিনকে সজীব করে এবং মানুষের বস্তুগত জীবন বাঁচিয়ে রাখে।
  • পক্ষান্তরে ‘ফারিক্বাত’ হলো ওহী ও কুরআনের আয়াত—যা মৃত হৃদয়গুলোকে জীবিত করে সত্য ও অসত্যের পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়ে মানুষের আত্মিক জীবনকে রক্ষা করে।
  • উভয় শক্তির চালিকাশক্তি হলেন মহান আল্লাহ। বাতাস যেমন পৃথিবীকে আবর্জনা থেকে মুক্ত করে পবিত্র করে, ওহীও তেমনি মানব সমাজকে জাহেলিয়াতের আবর্জনা থেকে মুক্ত করে ইনসাফের আলোয় উদ্ভাসিত করে।

উপসংহার

প্রকৃতির প্রতিটি ঝড় ও শান্ত পরিবেশ মানুষের অন্তরে এক পরাক্রমশালী রবের ভীতি ও শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করার অনুপম মোজেযা।

১১। كيف وصف الله جزاء عباده المخلصين في سورة الصافات؟

[সূরা আস-সাফফাতে বর্ণিত আল্লাহর মুখলিস বান্দাদের জান্নাতী নেয়ামত ও সুমহান মর্যাদার বিশদ চিত্র]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কুরআনে জান্নাতের অফুরন্ত সুখ ও শান্তির বর্ণনা মুমিনদের সৎকাজের প্রধান প্রেরণা। সূরা আস-সাফফাতের ৪০ থেকে ৬১ আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর একনিষ্ঠ ‘মুখলিস’ (إلا عباد الله المخلصين) বান্দাদের জন্য আখেরাতে যে রাজকীয় ও মনোহর মেহমানদারী প্রস্তুত রেখেছেন, তার অত্যন্ত মুগ্ধকর বিবরণ দিয়েছেন।

সূরা আস-সাফফাতে বর্ণিত মুখলিস বান্দাদের প্রধান প্রধান নেয়ামতসমূহ

  • ১. সুনির্দিষ্ট রাজকীয় রিজিক (رزق معلوم): জান্নাতীদের কোনো অভাব বা অনিশ্চয়তা থাকবে না। তাদের জন্য নির্ধারিত থাকবে এমন সব লোভনীয় জান্নাতী ফলমূল ও উপাদেয় খাদ্য যা কখনো শেষ হবে না এবং যাতে কোনো ক্লান্তি বা রোগব্যাধি থাকবে না।
  • ২. পরম সম্মানিত মেহমান (وهم مكرمون): তারা জান্নাতে কোনো সাধারণ নাগরিক হিসেবে থাকবে না; বরং আল্লাহ ও ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে তাদের সর্বোচ্চ রাজকীয় সম্মান ও সমাদর প্রদান করা হবে।
  • ৩. নেয়ামতপূর্ণ উদ্যান ও আরামদায়ক আসন (في جنات النعيم على سرر متقابلين): তারা সুরম্য পালঙ্কে একে অপরের সামনাসামনি আনন্দঘন পরিবেশে হেলান দিয়ে বসবে। তাদের অন্তরে কারও প্রতি বিন্দুমাত্র হিংসা, বিদ্বেষ বা দূরত্ব থাকবে না।
  • ৪. সুস্বাদু নির্মল জান্নাতী শরাব (يطاف عليهم بكأس من معين): তাদের সামনে প্রবহমান ঝর্ণাধারা থেকে প্রস্তুতকৃত শুভ্র পানপাত্র পরিবেশন করা হবে—যা পানে কোনো মাথাব্যথা বা মাতলামি হবে না; বরং তা হবে পরম তৃপ্তিদায়ক ও সুগন্ধময়।
  • ৫. সুনয়না ডাগরচোখা হুর ও সঙ্গিনী (وعندهم قاصرات الطرف عين): তাদের জন্য থাকবে এমন অনিন্দ্যসুন্দরী সঙ্গিনী—যাদের দৃষ্টি থাকবে কেবল তাদের স্বামীদের প্রতি নিবদ্ধ এবং যাদের রূপ হবে সুরক্ষিত শুভ্র ডিম্ব বা মুক্তার ন্যায় নিখুঁত।
  • ৬. অতীতের বন্ধুদের স্মৃতি ও বিজয়ের উল্লাস: জান্নাতীরা পার্থিব জীবনের সেই নাস্তিক ও বিভ্রান্ত বন্ধুদের কথা স্মরণ করবে যারা তাদের বলত—মৃত্যুর পর কি আর পুনরুত্থান সম্ভব? তখন তারা জাহান্নামের অতল গহ্বরে সেই অহংকারী বন্ধুকে শাস্তি পেতে দেখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বলবে: ‘আল্লাহর শোকর! তাঁর অনুগ্রহ না থাকলে আজ আমিও জাহান্নামী হতাম!’

উপসংহার

মুখলিস বান্দাদের এই চিরন্তন পুরস্কার প্রমাণ করে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়ার সাময়িক ত্যাগ স্বীকারকারী ব্যক্তিই অনন্তকালের পরম বিজয়ী।

১২। ما المقصود بـ “المرسلات عرفا” و “العاصفات عصفا” في بداية السورة حسب تفسير الجلالين؟

[তাফসিরে জালালাইনের আলোকে সূরা আল-মুরসালাতের প্রারম্ভিক আয়াতদ্বয়ের প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় তাৎপর্য]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা আল-মুরসালাতের প্রারম্ভিক শপথসূচক আয়াতগুলোতে মহাজাগতিক শক্তির যে রূপক বিবরণ এসেছে, তাফসিরে জালালাইনে তার অত্যন্ত গভীর ও সূক্ষ্ম ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে।

১. “والمرسلات عرفا” (ওয়াল মুরসালাতি উরফা)-এর জালালাইনভিত্তিক ব্যাখ্যা

  • জালালাইনের মূল পাঠ: আল্লামা জালালুদ্দীন মহল্লী (রহ.) লিখেছেন: ‘আইয়ির রিয়াহু মুতাতাব্বাআতান কাউরফিল ফারাস’ (أي الرياح متتابعة كعرف الفرس)।
  • বিশদ তাৎপর্য:
    • এখানে ‘আল-মুরসালাত’ বলতে বোঝানো হয়েছে ধারাবাহিকভাবে প্রেরিত বায়ুপ্রবাহ।
    • ‘উরফান’ (عُرفًا) শব্দটি ঘোড়ার গলার সুন্দর ও দীর্ঘ কেশর (উরফুল ফারাস) থেকে রূপক হিসেবে নেওয়া হয়েছে। ঘোড়ার কেশর যেমন একটির পর একটি ঘনভাবে সুসংহত থাকে, তেমনি আল্লাহর কুদরতি বাতাস একটার পর একটা ঢেউয়ের মতো অবিরাম ও ছন্দোময় গতিতে প্রবাহিত হতে থাকে।
    • অপর তাফসীর অনুযায়ী—এগুলো হলো সেই সম্মানিত ফেরেশতাকুল, যাঁরা আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ ও ওহী নিয়ে পৃথিবীতে একের পর এক ধারাবাহিকভাবে অবতরণ করেন।

২. “فالعاصفات عصفا” (ফাল আসিফাতি আসফা)-এর জালালাইনভিত্তিক ব্যাখ্যা

  • জালালাইনের মূল পাঠ: ‘আর-রিয়াহুশ শাদীদাহ’ (الرياح الشديدة)—অর্থাৎ প্রচণ্ড শক্তিশালী ও প্রলয়ঙ্করী ঝঞ্ঝাবায়ু।
  • বিশদ তাৎপর্য:
    • ‘আসিফাত’ শব্দটি ‘আসফ’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ দ্রুতগতিতে কোনো কিছুকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলা বা উপড়ে ফেলা।
    • যে বাতাস এক মুহূর্তে ছিল শান্ত ও কল্যাণকর, তা আল্লাহর হুকুমে নিমিষেই ভয়ংকর সাইক্লোন, টর্নেডো বা মরুঝড়ে রূপান্তরিত হয়ে অবাধ্য জাতিসমূহকে (যেমন কওমে আদ ও সামূদ) ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে।
    • এর মাধ্যমে কাফেরদের সতর্ক করা হয়েছে যে আল্লাহর কুদরতের সামনে মানুষ চরম অসহায়; অতএব এই শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই না করে তাঁর সমীপে আনুগত্য প্রকাশ করাই মুক্তির পথ।

উপসংহার

জালালাইনের এই বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে কুরআনের প্রতিটি উপমা সৃষ্টিজগতের বাস্তব নিয়মের সাথে নিখুঁতভাবে সঙ্গতিপূর্ণ ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ১ম বর্ষ দিরাসাতুত তাফসীর-৩ ২০২৪ পরীক্ষার বিষয় কোড কত ছিল?

পরীক্ষার বিষয় কোড ছিল ১১১০০৭ এবং পূর্ণমান ১০০ নম্বর। সময় ৩ ঘণ্টা।

জাহান্নামের তলদেশ থেকে উদ্গত বৃক্ষটির নাম কী?

যাক্কুম বৃক্ষ (شجرة الزقوم), যার ফল দেখতে অত্যন্ত কুৎসিত শয়তানের মস্তকের সদৃশ।

ধৈর্যশীলদের সওয়াব কিয়ামতের ময়দানে কীভাবে দেওয়া হবে?

কোনো প্রকার মাপ বা পাল্লা ছাড়াই অপরিমিতভাবে ‘বিনা হিসাবে’ দেওয়া হবে।

পবিত্র কুরআন কেন আরবি ভাষায় অবতীর্ণ করা হয়েছিল?

আরবি ভাষার অতুলনীয় শব্দসম্ভার, বিশুদ্ধতা এবং প্রাথমিক সম্বোধিত উম্মতের বোধগম্যতার কারণে।

হযরত ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনীর মূল শিক্ষা কী?

চরম দুঃখ ও সংকটের মুখেও ধৈর্য ধারণ করলে আল্লাহ অবশ্যই বান্দাকে বিজয়ী করেন।

‘আল-মুরসালাতু উরফা’ বলতে তাফসিরে জালালাইনে কী বোঝানো হয়েছে?

ঘোড়ার কেশরের মতো একের পর এক ধারাবাহিকভাবে প্রবহমান কুদরতি বায়ুপ্রবাহকে বোঝানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *