ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা
ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
উলূমুল কুরআন (প্রথম পত্র) : আল মাদখালু ইলা উলূমিল কুরআন (বিষয় কোড: ১১১০০৮)
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[الملاحظة : أجب عن خمسة من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب) -]
[দ্রষ্টব্য : (أ) অংশ থেকে পাঁচটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর উলূমুল কুরআন ১ম পত্র (বিষয় কোড: ১১১০০৮ – আল মাদখালু ইলা উলূমিল কুরআন) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও গবেষণাধর্মী সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ইমাম সুয়ূতীর ‘আল-ইতকান’, আল্লামা যারক্বানীর ‘মানাহিলুল ইরফান’ এবং শায়খ মান্নাউল ক্বাত্তানের ‘মাবাহিস ফী উলূমিল কুরআন’-এর আলোকে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সুবিন্যস্তভাবে সংকলিত হয়েছে।
১। ما معنى الوحي لغة واصطلاحا؟ بين إمكانية الوحي وكيفيته إلى الرسل –
[ওহীর আভিধানিক ও পারিভাষিক স্বরূপ, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাব্যতা এবং আম্বিয়ায়ে কেরামের প্রতি ওহী অবতরণের বিভিন্ন পদ্ধতি]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও পটভূমি
আল্লাহ ও মানবজাতির মধ্যকার যোগাযোগের একমাত্র নির্ভুল ও ঐশী মাধ্যম হলো ‘ওহী’। মানবীয় বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়ের যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, ওহী সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে অদৃশ্য সত্য, শরিয়তের অনুশাসন এবং জীবনের চরম সার্থকতা নির্দেশ করে। ওহীর প্রতি ঈমান আনয়ন ইসলামি আকিদার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি।
الوحي-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: ‘ওহী’ (الوحي) শব্দটি আরবি ধাতু ‘ওয়া-হা-ইয়া’ থেকে নিষ্পন্ন, যার মূল অর্থ হলো দ্রুত ও গোপনে ইশারা করা, সংকেত দেওয়া বা কোনো তথ্য অন্যের অন্তরে অতি সংগোপনে সঞ্চার করে দেওয়া (الإعلام السريع الخفي)। যেমন আল্লাহ মৌমাছির স্বভাবজাত অনুভূতিকে ‘ওহী’ বলেছেন (সূরা আন-নাহল: ৬৮)।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: উলূমুল কুরআনের ইমামগণের সর্বসম্মত সংজ্ঞানুযায়ী:
«هو كلام الله المنزل على نبي من أنبيائه بحكم شرعي ونحوه بطريق خفي وسريع.»
অর্থাৎ, ‘ওহী হলো আল্লাহর সেই পবিত্র কালাম, যা তিনি স্বীয় নবী ও রাসূলগণের ওপর কোনো শারঈ বিধান, আকিদা বা দিকনির্দেশনাসহকারে এক অতীব দ্রুত ও গোপন অলৌকিক পদ্ধতিতে অবতীর্ণ করেন।’
বুদ্ধিবৃত্তিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ওহীর সম্ভাব্যতা (إمكانية الوحي)
বস্তুবাদী ও নাস্তিক্যবাদীরা ওহীর ধারণাকে অলীক বলে উড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু সুস্থ বিচারবুদ্ধি ও আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে ওহী শতভাগ সম্ভব ও যৌক্তিক:
- স্রষ্টা ও সৃষ্টির যোগাযোগ: যে মহান আল্লাহ নিখিল বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, শূন্য থেকে জীবনের স্পন্দন দান করেছেন এবং মানুষকে ভাষা ও চিন্তা দিয়েছেন—সেই সর্বশক্তিমান স্রষ্টা স্বীয় মনোনীত দূতের কাছে বার্তা প্রেরণ করবেন, এটি বুদ্ধির দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র অসম্ভব নয়।
- আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির দৃষ্টান্ত: আজ মানুষ তার সীমাবদ্ধ বুদ্ধিতে তারহীন ওয়্যারলেস, স্যাটেলাইট, রেডিও তরঙ্গ ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে দৃশ্য ও অদৃশ্যের তথ্য নিমেষেই স্ক্রিনে ফুটিয়ে তুলছে। একজন ক্ষুদ্র মানুষ যদি শূন্য মাধ্যমে কোটি কোটি তথ্য সম্প্রচার করতে পারে, তবে নিখিল বিশ্বের মহান স্রষ্টা কেন কোনো মাধ্যম ছাড়া বা ফেরেশতার মাধ্যমে নবীর অন্তরে বার্তা পাঠাতে পারবেন না? সুতরাং ওহী এক বাস্তব ও অনস্বীকার্য সত্য।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর ওহী নাযিলের বিভিন্ন পদ্ধতি (كيفية نزول الوحي)
সূরা আশ-শূরার ৫১ নম্বর আয়াত এবং সহীহ বুখারীর প্রামাণ্য হাদীস অনুযায়ী নবীজী (সা.)-এর ওপর প্রধানত নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে ওহী অবতীর্ণ হতো:
- ১. ঘণ্টার সুমিষ্ট ধ্বনির মতো (صلصلة الجرس): এটি ছিল নবীজীর জন্য সবচেয়ে ভারী ও কষ্টসাধ্য পদ্ধতি। তীব্র শীতের দিনেও নবীজীর কপাল মোবারক থেকে ঘামের ফোঁটা মুক্তার মতো ঝরে পড়ত এবং তিনি উটের ওপর আরোহণ অবস্থায় থাকলে উট ভার সহ্য করতে না পেরে মাটিতে বসে পড়ত। এই তীব্র আওয়াজের মাধ্যমে তাঁর সমস্ত ইন্দ্রিয় পার্থিব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সরাসরি ওহীর সাগরে নিমজ্জিত হতো।
- ২. ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে আগমন: হযরত জিবরাঈল (আ.) একজন অত্যন্ত সুদর্শন যুবকের (প্রধানত সাহাবী হযরত দিহয়াতুল কালবী রা.-এর) রূপ ধারণ করে এসে নবীজীর সামনে বসে বার্তা পৌঁছাতেন। হাদীসে জিবরাঈল এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এটি ছিল নবীজীর জন্য সহজতর পদ্ধতি।
- ৩. জিবরাঈল (আ.)-এর আসল রূপ প্রত্যক্ষ করা: নবীজী তাঁর জীবনে দুইবার জিবরাঈল (আ.)-কে তাঁর আসল ছয়শত ডানা বিশিষ্ট দিগন্ত বিস্তৃত স্বরূপে প্রত্যক্ষ করেছিলেন—একবার হেরা গুহায় এবং দ্বিতীয়বার মিরাজের রজনীতে সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে।
- ৪. অন্তরে অদৃশ্য ইলহাম বা প্রক্ষেপণ (النفث في الروع): জিবরাঈল (আ.) অদৃশ্য থেকেই সরাসরি রাসূল (সা.)-এর পবিত্র হৃদয়ে ঐশী বাণী সঞ্চার করে দিতেন।
- ৫. পর্দার অন্তরাল থেকে সরাসরি কথোপকথন: কোনো ফেরেশতার মাধ্যম ছাড়া আল্লাহ সরাসরি নবীজীর সাথে কথা বলতেন—যেমন মূসা (আ.)-এর সাথে তূর পাহাড়ে এবং বিশ্বনবী (সা.)-এর সাথে মিরাজের রজনীতে।
- ৬. সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصالحة): নবুওয়াতের প্রারম্ভে নবীজী যে স্বপ্ন দেখতেন তা সকালের সূর্যের আলোর মতো হুবহু সত্যে পরিণত হতো। নবীদের স্বপ্নও ওহী।
উপসংহার
ওহী হলো মানবজাতির জন্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত। এর মাধ্যমেই মানুষ সৃষ্টির রহস্য ও পরকালীন অনন্ত জীবনের পথনির্দেশ লাভ করতে পেরেছে।
২। زعموا المنكرون “أن القرآن الكريم من عند محمد صلى الله عليه وسلم – ابتكر معانيه وصاغ أسلوبه وليس وحيا يوحى – فند شبهتهم هذه بالحجة الدامغة –
[ওহী অস্বীকারকারীদের সংশয়—”কুরআন মুহাম্মাদ (সা.)-এর রচিত গ্রন্থ”—এর তাত্ত্বিক পর্যালোচনা এবং অকাট্য দলীলে এর পূর্ণ খণ্ডন]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও পটভূমি
ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই প্রাচ্যবিদ (ওরিয়েন্টালিস্ট) এবং ওহী অস্বীকারকারী ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা অপপ্রচার চালিয়ে আসছে যে, কুরআন কোনো ঐশী ওহী নয়; বরং এটি মুহাম্মদ (সা.)-এর নিজস্ব প্রতিভা, গভীর চিন্তা ও আরবের পারিপার্শ্বিকতার সমন্বয়ে রচিত এক চমৎকার সাহিত্য। তাদের এই ঘৃণ্য দাবিকে কুরআনের অন্তর্নিহিত যুক্তি ও ঐতিহাসিক দলীলে চূর্ণ করা হলো।
সংশয়বাদীদের দাবির অকাট্য খণ্ডন ও দলীলে কাতে’
- ১. স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ‘উম্মী’ বা নিরক্ষর হওয়া:
- রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো বিদ্যালয়ে যাননি, কোনো শিক্ষকের কাছে পড়েননি এবং কোনো কিতাব পড়তে বা লিখতে জানতেন না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:
«وَمَا كُنتَ تَتْلُو مِن قَبْلِهِ مِن كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ ۖ إِذًا لَّارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ»
অর্থাৎ, ‘আপনি এর পূর্বে কোনো কিতাব পাঠ করেননি এবং নিজ হাতে তা লেখেনওনি; যদি এমন করতেন তবে মিথ্যাবাদীরা অবশ্যই সন্দেহ পোষণ করত।’ (সূরা আল-আনকাবূত: ৪৮)। একজন নিরক্ষর মানুষের পক্ষে এমন জ্ঞানগর্ভ ও অলৌকিক কিতাব রচনা করা অসম্ভব।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো বিদ্যালয়ে যাননি, কোনো শিক্ষকের কাছে পড়েননি এবং কোনো কিতাব পড়তে বা লিখতে জানতেন না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:
- ২. আরবের শীর্ষ কবি ও সাহিত্যিকদের ব্যর্থতা (মু’জিযাপূর্ণ চ্যালেঞ্জ):
- আরবরা ছিল ভাষার জাদুকর। কুরআন যদি মানব রচিত হতো, তবে তৎকালীন আরবের সেরা বাগ্মী কবিরা (যেমন ইমরুল কায়েস বা লাবীদ) কুরআনের মতো একটি কিতাব, দশটি সূরা কিংবা অন্তত একটি ছোট সূরার মতো কিছু রচনা করে দেখাতে পারত (সূরা আল-ইসরা: ৮৮, সূরা হূদ: ১৩, সূরা আল-বাকারা: ২৩)। তারা নিজেদের জীবন ও রক্ত বিসর্জন দিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল, কিন্তু একটি সূরাও রচনা করতে পারেনি। যা সমস্ত আরবের সাহিত্যিকরা মিলে করতে পারল না, তা একজন মানুষের পক্ষে রচনা করা কি সম্ভব?
- ৩. হাদীসের ভাষা বনাম কুরআনের ভাষার আকাশ-পাতাল ব্যবধান:
- রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মুখনিঃসৃত সহস্র বাণী ‘হাদীস’ হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। যে কোনো আরবি ভাষাবিদ হাদীসের বাক্যশৈলী এবং কুরআনের বাক্যবিন্যাস পাশাপাশি রাখলে দেখতে পাবেন যে উভয়ের সাহিত্যিক রূপ, ধ্বনিমাধুর্য ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন মানুষের পক্ষে দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে দুই ধরণের সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী উচ্চাঙ্গের ভাষা রচনা করা মানুষের মনস্তত্ত্বের বিচারে অসম্ভব।
- ৪. অতীত ও ভবিষ্যতের অভ্রান্ত ভবিষ্যৎবাণী এবং আধুনিক বিজ্ঞান:
- কুরআনে হাজার বছর পূর্বে এমন সব বৈজ্ঞানিক তথ্য দেওয়া হয়েছে (যেমন ভ্রূণতত্ত্ব, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, পর্বতের পেরেকসদৃশ ভিত্তি, সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ)—যা আধুনিক বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আবিষ্কার ছাড়া কোনো ৭ম শতকের মরুভূমির মানুষের পক্ষে জানা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। এছাড়া রোমানদের বিজয়ের ভবিষ্যৎবাণী (সূরা আর-রূম: ১-৪) হুবহু বাস্তবায়িত হয়েছিল।
- ৫. নবীজীকে সতর্কীকরণ ও ভর্ৎসনা:
- কুরআন যদি নবীজীর রচিত হতো, তবে তাতে এমন কোনো আয়াত থাকত না যেখানে স্বয়ং নবীজীকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে—যেমন অন্ধ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমের ঘটনায় সূরা আবাসায় ভর্ৎসনা, কিংবা যায়েদ ও যয়নবের ঘটনায় সতর্কতা। কোনো মানুষ নিজের রচিত গ্রন্থে নিজেকে তিরস্কার করে না।
উপসংহার
এই সমস্ত অকাট্য দলীল প্রমাণ করে যে, আল-কুরআন নিশ্চিতভাবেই রাব্বুল আলামীনের অবতীর্ণ চিরন্তন ওহী এবং মুহাম্মদ (সা.) হলেন আল্লাহর বিশ্বস্ততম রাসুল।
৩। عرف القرآن الكريم – ثم بين أسماءه وأوصافه بالنصوص –
[আল-কুরআনুল কারীমের পূর্ণাঙ্গ পারিভাষিক সংজ্ঞা এবং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর প্রসিদ্ধ নাম ও গুণাবলীর বিশদ বিবরণ]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও পটভূমি
আল-কুরআন হলো সমগ্র সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ মু’জিযা। মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে অবতীর্ণ এই মহাগ্রন্থের পরিচয় ও এর নানাবিধ পবিত্র নাম অনুধাবন করা উলূমুল কুরআনের প্রাথমিক ও অপরিহার্য বিষয়। মহান আল্লাহ নিজেই এই কিতাবের বহু নাম ও প্রশংসাসূচক সিফাত উল্লেখ করেছেন।
القرآن الكريم-এর পূর্ণাঙ্গ পারিভাষিক সংজ্ঞা
উসূলুল ফিকহ ও উলূমুল কুরআনের ইমামগণের সর্বসম্মত সংজ্ঞানুযায়ী:
«هو كلام الله المعجز، المنزل على خاتم الأنبياء محمد صلى الله عليه وسلم، بواسطة جبريل عليه السلام، المكتوب في المصاحف، المنقول إلينا بالتواتر، المتعبد بتلاوته، المبدوء بسورة الفاتحة والمختوم بسورة الناس.»
অর্থাৎ, ‘আল-কুরআন হলো আল্লাহর সেই চিরন্তন অলৌকিক কালাম, যা সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে, যা মুসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা নিরবচ্ছিন্ন তাওয়াতুর সূত্রে আমাদের কাছে পৌঁছেছে, যার তিলাওয়াত স্বতন্ত্র ইবাদত হিসেবে পরিগণিত এবং যা সূরা আল-ফাতিহা দ্বারা শুরু হয়ে সূরা আন-নাস দ্বারা সমাপ্ত হয়েছে।’
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত এর প্রসিদ্ধ নামসমূহ (أسماء القرآن بالنصوص)
ইমাম যারকাশী তাঁর ‘আল-বুরহান’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে কুরআনের পঞ্চান্নটিরও বেশি নাম রয়েছে, যার মধ্যে প্রধান নামসমূহ হলো:
| ক্রম | পবিত্র নাম | কুরআনী দলীল ও নস | নামের তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| ১ | আল-কুরআন (القرآن) | ‘ইন্না হাযাল কুরআনা ইয়াহদী লিল্লাতী হিয়া আক্বওয়াম’ (সূরা আল-ইসরা: ৯) | সর্বাধিক পঠিত ও তেলাওয়াতকৃত মহাগ্রন্থ। |
| ২ | আল-কিতাব (الكتاب) | ‘যালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফীহ’ (সূরা আল-বাকারা: ২) | লিখিত ও সংরক্ষিত পরিপূর্ণ আসমানী বিধান। |
| ৩ | আল-ফুরক্বান (الفرقان) | ‘তাবা-রাকাল্লাযী নায্যালাল ফুরক্বানা আলা আবদিহী’ (সূরা আল-ফুরক্বান: ১) | সত্য ও মিথ্যার মধ্যবর্তী চূড়ান্ত পার্থক্যকারী। |
| ৪ | আয-যিকর (الذكر) | ‘ইন্না নাহনু নায্যালনায যিকরা ওয়া ইন্না লাহূ লাহাফিযূন’ (সূরা আল-হিজর: ৯) | চিরন্তন উপদেশ ও মানবজাতির মহাস্মারক। |
| ৫ | আত-তানযীল (التنزيل) | ‘ওয়া ইন্নাহূ লাতানযীলু রাব্বিল আলামীন’ (সূরা আশ-শু’আরা: ১৯২) | বিশ্বজাহানের রবের পক্ষ থেকে ধাপে ধাপে অবতীর্ণ কিতাব। |
কুরআন মাজীদের কতিপয় বৈশিষ্ট্যসূচক সিফাত বা গুণাবলী (أوصافه بالنصوص)
- ১. নূর (النور – জ্যোতি): ‘ওয়া আনযালনা ইলাইকুম নূরান মুবীনা’ (সূরা আন-নিসা: ১৭৪)—কুরআন অন্তরের অন্ধকার দূরকারী আলোকবর্তিকা।
- ২. হুদা (الهدى – পথপ্রদর্শক): ‘হুদাল লিন্নাসি ওয়া বাইয়্যিনাতিম মিনাল হুদা’ (সূরা আল-বাকারা: ১৮৫)।
- ৩. শিফা (الشفاء – আরোগ্য): ‘ওয়া নুনাযযিলু মিনাল কুরআনি মা হুয়া শিফাউঁ ওয়া রাহমাতুল লিলমু’মিনীন’ (সূরা আল-ইসরা: ৮২)—আত্মিক ও শারীরিক রোগের পরম মহৌষধ।
- ৪. বায়ান (البيان – সুস্পষ্ট বিবরণ): ‘হাযা বায়ানুল লিন্নাস’ (সূরা আলে ইমরান: ১৩৮)।
- ৫. হাকীম ও মাজীদ (الحكيم والمجيد): প্রজ্ঞাময় ও মহামহিমান্বিত কালাম।
উপসংহার
কুরআনের এই নাম ও গুণাবলী প্রমাণ করে যে এটি সমগ্র মানবজাতির জীবন পুনর্গঠন ও হেদায়েতের এক পূর্ণাঙ্গ ও অপরাজেয় ঐশী আলোকবর্তিকা।
৪। ما هي آراء العلماء في أول ما نزل من القرآن؟ وما الرأي الراجح في ذلك؟ بين مدللا –
[কুরআন নাযিলের সূচনাকালীন প্রথম আয়াত বিষয়ে আলেমদের বিস্তারিত মতামত, তাদের দলীল এবং রাজেহ মতের নিরূপণ]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও পটভূমি
আল্লাহ তাআলা সুদীর্ঘ তেইশ বছর ধরে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য ওহী অবতীর্ণ করেছেন। এই ওহীর সুমহান যাত্রার প্রথম শুভ সূচনা কোন আয়াতের মাধ্যমে হয়েছিল—তা জানা ওহীর ইতিহাস, নাসিখ-মানসূখ এবং নবুওয়াতের প্রারম্ভিক অবস্থা অনুধাবনের জন্য এক মৌলিক বিষয়।
সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত সম্পর্কে মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরদের প্রধান মতামত
উলূমুল কুরআনের ইমামগণের মাঝে এ বিষয়ে প্রধানত চারটি মত পরিলক্ষিত হয়:
- প্রথম মত (জমহুর উলামায়ে কেরাম ও রাজেহ মত): সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত:
«اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ – خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ – اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ – الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ – عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ»
দলীল: সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীস—যেখানে হেরা গুহায় জিবরাঈল (আ.) এসে নবীজীকে জড়িয়ে ধরে তিনবার চাপ দিয়ে এই পাঁচটি আয়াত তিলাওয়াত করিয়েছিলেন। এটিই নবুওয়াতের প্রত্যক্ষ সূচনা।
- দ্বিতীয় মত: হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-এর মতে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে সূরা আল-মুদ্দাসসিরের প্রারম্ভিক আয়াত: ‘ইয়া আইয়ুহাল মুদ্দাসসির, কুম ফাআনযির’ (সূরা মুদ্দাসসির: ১-২)।
- দলীল: হযরত জাবের (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি এই হাদীস বর্ণনা করেন যা সহীহ বুখারীতে এসেছে।
- তৃতীয় মত: কারও কারও মতে পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে সূরা আল-ফাতিহা।
- দলীল: ইমাম বাইহাকী বর্ণিত আমর ইবনে শুরাহবিলের মুরসাল রেওয়ায়েত—যেখানে নবীজী খাদিজা (রা.)-কে বলেছিলেন যে তিনি ‘ইক্বরা’র পর সালাতে ফাতিহা শুনেছেন।
- 第四 মত: অনেকের মতে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’; কেননা প্রতিটি সূরার শুরুতেই এটি অবতীর্ণ হতো।
উক্ত মতামতসমূহের চমৎকার শাস্ত্রীয় সমন্বয় (তাতবীক্ব) ও রাজেহ মত
ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) তাঁর ‘আল-ইতকান’ গ্রন্থে এই মতগুলোর মধ্যে চমৎকার সমন্বয় সাধন করেছেন:
| নাযিলের দৃষ্টিভঙ্গি | কোন আয়াত বা সূরা | সমন্বয়ের যৌক্তিক রূপরেখা |
|---|---|---|
| ১. পরমভাবে সর্বপ্রথম (أول ما نزل مطلقا) | সূরা আল-আলাক (১-৫ আয়াত) | হেরা গুহায় নবুওয়াত প্রদানের পরম সূচনালগ্নে এই আয়াতগুলোই অবতীর্ণ হয়েছিল। এতে কোনো দ্বিমত নেই। |
| ২. ওহী বিরতির পর সর্বপ্রথম (بعد فترة الوحي) | সূরা আল-মুদ্দাসসির | হেরা গুহার পর কিছুকাল ওহী বন্ধ ছিল (ফাতরাতুল ওহী)। এরপর প্রকাশ্যে দাওয়াতের নির্দেশ দিয়ে সর্বপ্রথম মুদ্দাসসির নাযিল হয়। জাবের (রা.) মূলত এই বিরতির পরের প্রথম ওহী বুঝিয়েছেন। |
| ৩. পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে সর্বপ্রথম | সূরা আল-ফাতিহা | সম্পূর্ণ একটি অখণ্ড সূরা হিসেবে সর্বপ্রথম সূরা ফাতিহাই অবতীর্ণ হয়েছিল (আলাকের কেবল ৫ আয়াত নাযিল হয়েছিল)। |
উপসংহার
সুতরাং দলীল ও ঐতিহাসিক প্রামাণিকতার সর্বসম্মত রাজেহ ফয়সালা হলো—সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াতই পরমভাবে সর্বপ্রথম নাযিলকৃত কালামুল্লাহ।
৫। ما معنى جمع القرآن؟ بين خصائص الجمع في عهد النبوة والخلافة –
[‘জমউল কুরআন’ বা কুরআন সংকলনের অর্থ এবং নববী যুগ ও খেলাফত আমলের সংকলনের বৈশিষ্ট্যসমূহের বিশদ রূপরেখা]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও পটভূমি
আল্লাহ তাআলা স্বয়ং কালামুল্লাহ সংরক্ষণের দায়িত্ব ঘোষণা করেছেন: ‘ইন্না নাহনু নায্যালনায যিকরা ওয়া ইন্না লাহূ লাহাফিযূন’। এই ঐশী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলে কুরআন যেভাবে সংকলিত ও সংরক্ষিত হয়েছে—তাকে উলূমুল কুরআনের পরিভাষায় ‘জমউল কুরআন’ বলা হয়।
جمع القرآن-এর অর্থ ও তাৎপর্য
উলূমুল কুরআনের পরিভাষায় ‘জমউল কুরআন’ মূলত দুটি প্রধান অর্থে ব্যবহৃত হয়:
- ১. অন্তরে সংরক্ষণ বা হিফজ করা (الجمع في الصدور): সাহাবায়ে কেরামের স্মৃতিতে কুরআন মুখস্থ করে রাখা। সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন আরবীয় অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী, শত শত সাহাবী পূর্ণ কুরআন মুখস্থ রেখেছিলেন।
- ২. কাগজে বা পাণ্ডুলিপিতে লিপিবদ্ধ করা (الجمع في السطور): বিভিন্ন উপকরণের ওপর লিখে লিখে কিতাব বা মুসহাফ আকারে সংকলন করা।
কুরআন সংকলনের তিনটি ঐতিহাসিক যুগ ও তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. নববী যুগের সংকলন (في عهد النبوة)
- বৈশিষ্ট্য: ওহী নাযিল হওয়ামাত্রই রাসূলুল্লাহ (সা.) কাতিবানে ওহী (ওহী লেখক সাহাবীগণ, যেমন যায়দ ইবনে সাবিত, আলী ও উবাই ইবনে কা’ব রা.)-কে ডেকে তা লিখিয়ে নিতেন।
- লিপিবদ্ধের উপকরণ: তৎকালীন আরবে কাগজের অপ্রতুলতার কারণে খেজুরের ডাল (উসুব), পাতলা সাদা পাথর (লিখাফ), পশুর চামড়া (রিক্বা’) এবং পশুর কাঁধের হাড়ে (আকতাফ) লিখে রাখা হতো।
- আয়াতের বিন্যাস ছিল তাওক্বীফী: জিবরাঈল (আ.) আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী বলে দিতেন কোন আয়াত কোন সূরায় কোন আয়াতের পর বসবে। তবে তখনও কুরআন একটি একক বাঁধাইকৃত কিতাবে সংকলিত হয়নি—যেহেতু ওহী নাযিল অব্যাহত ছিল।
২. হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগের সংকলন (في عهد أبي بكر رضي الله عنه)
- প্রেক্ষাপট: ১২শ হিজরিতে ভণ্ড নবী মুসাইলামা কাযযাবের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী ইয়ামামার যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন হাফেযে কুরআন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এতে হযরত উমর (রা.) চিন্তিত হয়ে আবু বকর (রা.)-কে একটি কিতাবে কুরআন সংকলনের পরামর্শ দেন।
- প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- যায়দ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়।
- কঠোর যাচাই নীতি: কেবল মুখস্থের ওপর নির্ভর করা হয়নি; বরং দুটি চাক্ষুষ লিখিত প্রমাণ ও দুজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর সাক্ষ্য ছাড়া কোনো আয়াত গ্রহণ করা হয়নি।
- সমস্ত বিচ্ছিন্ন পাণ্ডুলিপি একত্রিত করে একটি একক সর্বসম্মত মূল পাণ্ডুলিপিতে (মুসহাফ) সংকলন করা হয়।
৩. হযরত উসমান (রা.)-এর যুগের সংকলন (في عهد عثمان رضي الله عنه)
- প্রেক্ষাপট: আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান অভিযানে মুসলিমদের মধ্যে কেরাতের বিভিন্নতা নিয়ে রক্তক্ষয়ী মতবিরোধ দেখা দেয়। হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) এসে উসমান (রা.)-কে বললেন: উম্মাহকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করুন!
- প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- আবু বকর (রা.)-এর সংরক্ষিত মূল মুসহাফটি হাফসা (রা.)-এর কাছ থেকে এনে যায়দ ইবনে সাবিত ও কুরাইশ বংশীয় সাহাবীদের দিয়ে কুরাইশী উচ্চারণে কয়েকটি হুবহু অবিকল কপি তৈরি করা হয়।
- এই কপিগুলো বিশ্বের প্রধান প্রধান ইসলামি কেন্দ্রসমূহে (মক্কা, মদিনা, কুফা, বসরা, সিরিয়া) পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং বাকি সমস্ত ব্যক্তিগত ভিন্ন বানানযুক্ত পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে দিয়ে সমগ্র উম্মাহকে এক ঐতিহাসিক লিপিরীতিতে (রসমুল উসমানী) ঐক্যবদ্ধ করা হয়। এজন্য উসমান (রা.)-কে ‘জামেউল কুরআন’ (جامع القرآن) বলা হয়।
উপসংহার
সংকলনের এই ত্রিস্তরীয় ইতিহাস প্রমাণ করে যে, আল-কুরআনের একটি নুকতা বা হরফও পরিবর্তন হয়নি এবং তা কেয়ামত পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে।
৬। عرف نسخ – ثم بين أركان النسخ وشروطه وأنواعه مفصلا –
[নাসখ-এর আভিধানিক ও শারঈ সংজ্ঞা, এর রুকনসমূহ, অপরিহার্য শর্তাবলি এবং তিন প্রকার নসখের প্রামাণ্য বিশ্লেষণ]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও পটভূমি
ইসলাম একটি বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা। সমাজ সংস্কারের প্রাথমিক পর্যায়ে আল্লাহ তাআলা কোনো কোনো বিধান সাময়িক জারি করেছিলেন এবং সমাজ প্রস্তুত হওয়ার পর সেই বিধানের স্থানে স্থায়ী পূর্ণাঙ্গ বিধান জারি করেছেন। শরিয়তের এই রহিতকরণ ও নতুন বিধান জারির নীতিকে ‘নাসখ’ বলা হয়।
النسخ-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়
- আভিধানিক অর্থ: ‘নাসখ’ (النسخ) শব্দের দুটি প্রধান অর্থ রয়েছে—১. বিলুপ্ত করা বা মিটিয়ে ফেলা (الإزالة والإعدام)—যেমন বলা হয় ‘নাসাখাতিল আরহু আসারুল মাশি’ (বাতাস পদচিহ্ন মুছে দিল); এবং ২. নকল করা বা স্থানান্তর করা (النقل والتحويل)—যেমন কিতাব নকল করা।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলবিদগণের মতে:
«هو رفع الحكم الشرعي بدليل شرعي متأخر عنه.»
অর্থাৎ, ‘পরবর্তী কোনো শারঈ দলীল দ্বারা পূর্ববর্তী কোনো শারঈ হুকুম বা বিধান সমাপ্ত বা পরিবর্তন করে দেওয়াকে নাসখ বলে।’ যে বিধান রহিত হয় তাকে ‘মানসূখ’ (منسوخ) এবং যা দ্বারা রহিত করা হয় তাকে ‘নাসিখ’ (ناسخ) বলা হয়।
নসখের রুকন ও অপরিহার্য শর্তাবলি (أركان النسخ وشروطه)
- নসখের চার রুকন: ১. নাসিখ (স্বয়ং আল্লাহ), ২. মানসূখ (রহিতকৃত হুকুম), ৩. মানসূখ আনহু (যার ওপর হুকুম ছিল অর্থাৎ বান্দা), এবং ৪. নাসিখ দলীল (কুরআন বা সুন্নাহর পরবর্তী আয়াত/হাদীস)।
- আবশ্যকীয় শর্তাবলি:
- ১. নাসিখ বিধানটি অবশ্যই কালানুক্রমিকভাবে মানসূখ বিধানের পরে অবতীর্ণ হতে হবে।
- ২. উভয় বিধানের দলীল অবশ্যই শারঈ (কুরআন বা সুন্নাহ) হতে হবে; কোনো মানুষের কিয়াস বা ইজমা দিয়ে কুরআন-সুন্নাহ রহিত হতে পারে না।
- ৩. উভয় বিধানের মাঝে বাহ্যিকভাবে এমন বৈপরীত্য থাকতে হবে যার কোনো সমন্বয় সম্ভব নয়।
- ৪. নাসখ কেবল আদেশ-নিষেধ ও ব্যবহারিক আহকামের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য; কোনো আকিদা, ঈমান বা ঐতিহাসিক সংবাদের (আখবার) ক্ষেত্রে নাসখ হওয়া অসম্ভব।
কুরআনুল কারীমে নসখের তিন প্রকারভেদ (أنواع النسخ)
| প্রকারভেদ | স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য | প্রামাণ্য কুরআনী দৃষ্টান্ত |
|---|---|---|
| ১. হুকুম বহাল, তিলাওয়াত রহিত (نسخ التلاوة وبقاء الحكم) |
আয়াতটির শব্দ মুসহাফে তিলাওয়াত করা হয় না, কিন্তু তার শারঈ হুকুম বা বিধান উম্মতের ওপর কিয়ামত পর্যন্ত বহাল রয়েছে। | বিবাহিত ব্যভিচারীর পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড (রজম)-এর আয়াত: ‘আশ-শায়খু ওয়াশ শায়খাতু ইযা যানায়া ফারজুমূহুমা আলবাত্তা…’—হযরত উমর (রা.) বলেন, আমরা এই আয়াত তেলাওয়াত করেছি এবং নবীজী রজম কার্যকর করেছেন। পরবর্তীতে শব্দ রহিত হলেও হুকুম বহাল আছে। |
| ২. তিলাওয়াত বহাল, হুকুম রহিত (نسخ الحكم وبقاء التلاوة) |
মুসহাফে আয়াতটি সওয়াবের নিয়তে তেলাওয়াত করা হয়, কিন্তু তার পূর্ববর্তী হুকুমটি পরবর্তী শক্তিশালী আয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। (কুরআনে এটিই সর্বাধিক)। | ১. বিধবা নারীর এক বছর ভরণপোষণ ও অবস্থানের আয়াত (বাকারা: ২৪০), যা চার মাস দশ দিন এবং মিরাসের আয়াত দ্বারা রহিত হয়েছে। ২. পূর্বে যুদ্ধের সময় ১ জন মুসলিমের ১০ জন কাফেরের মোকাবিলা করার বিধান (আনফাল: ৬৫), যা পরবর্তীতে ১ জনের বিপরীতে ২ জন দ্বারা সহজ করা হয়েছে (আনফাল: ৬৬)। |
| ৩. তিলাওয়াত ও হুকুম উভয়ই রহিত (نسخ التلاوة والحكم معا) |
আয়াতের শব্দাবলীও মুছে দেওয়া হয়েছে এবং তার ওপর আমল করাও সম্পূর্ণ রহিত করা হয়েছে। | হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত: কুরআনে প্রথমে অবতীর্ণ হয়েছিল যে দশবার দুধপানে বিবাহ হারাম হয়; পরবর্তীতে তা পাঁচবারের আয়াত দ্বারা রহিত হয় এবং পরে শব্দও রহিত হয়ে যায়। |
উপসংহার
নাসখ শরিয়তের কোনো ত্রুটি নয়, বরং এটি মানব সমাজের ক্রমবিকাশ ও বাস্তব কল্যাণের স্বার্থে মহান আল্লাহর এক পরম প্রজ্ঞাময় ঐশী শিক্ষা ব্যবস্থা।
৭। عرف المحكم والمتشابه بالأمثلة – ثم اذكر أحكامهما وفروقهما موضحا –
[মুহকাম ও মুতাশাবিহ-এর সংজ্ঞা, উদাহরণ, এদের শারঈ হুকুম এবং উভয় শ্রেণির মধ্যে সূক্ষ্ম শাস্ত্রীয় পার্থক্য]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও পটভূমি
পবিত্র কালামুল্লাহর অর্থ ও বোধগম্যতার গভীরতার ওপর ভিত্তি করে আয়াতসমূহকে প্রধানত ‘মুহকাম’ এবং ‘মুতাশাবিহ’—এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে (সূরা আলে ইমরান: ৭)। বিভ্রান্তি থেকে নিজের ঈমানকে বাঁচাতে এই দুইয়ের পার্থক্য অনুধাবন করা অপরিহার্য।
المحكم এবং المتشابه-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা
- ১. আল-মুহকাম (المحكم):
- আভিধানিক অর্থ: যা সুদৃঢ়, ত্রুটিমুক্ত, সংরক্ষিত ও অটল।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে আয়াতের অর্থ সুস্পষ্ট, প্রকাশ্য ও দ্ব্যর্থহীন; যাতে কোনো রূপক বা ব্যাখ্যার জটিলতা নেই এবং যা থেকে সরাসরি শরিয়তের হালাল-হারামের সুনির্দিষ্ট বিধান বোঝা যায়।
- উদাহরণ: ‘আক্বীমূস সালাতা ওয়া আতূয যাকাত’ (তোমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত দাও); ‘হাররামাত আলাইকুমুল মাইতাতু’ (তোমাদের ওপর মৃত প্রাণী হারাম করা হয়েছে)।
- ২. আল-মুতাশাবিহ (المتشابه):
- আভিধানিক অর্থ: যা পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ বা যাতে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে আয়াতের প্রকৃত অর্থ অত্যন্ত গোপন ও রূপক এবং যার চূড়ান্ত মর্মার্থ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না অথবা তা বোঝার জন্য গভীর ইজতিহাদের প্রয়োজন হয়।
- উদাহরণ: বিভিন্ন সূরার প্রারম্ভের হরফে মুক্বাত্তায়াত (যেমন: الم, كهيعص, يس) এবং আল্লাহর সিফাত সংক্রান্ত আয়াতসমূহ (যেমন: আল্লাহর হাত, আরশে আরোহণ, চেহারা ইত্যাদি)।
উভয়ের শারঈ হুকুম (أحكامهما)
- মুহকামের হুকুম: এর ওপর অন্তরে অকপট বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এর ব্যবহারিক বিধানসমূহের ওপর সার্বক্ষণিক আমল করা প্রতিটি মুমিনের ওপর ফরয।
- মুতাশাবিহের হুকুম: এর ওপর ঈমান রাখা যে এটি আল্লাহর সত্য কালাম; কিন্তু এর মনগড়া ব্যাখ্যা ও গভীর রহস্য উদ্ঘাটনে অযথা লিপ্ত না হয়ে বিনম্রভাবে আল্লাহর কাছে এর ভার সমর্পণ করা (তাফবীয) কিংবা সালাফদের নিয়মে সাদৃশ্যহীনভাবে বিশ্বাস করাই কাম্য।
المحكم ও المتشابه-এর মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য
| পার্থক্যমূলক দিক | মুহকাম (المحكم) | মুতাশাবিহ (المتشابه) |
|---|---|---|
| ১. অর্থ স্পষ্টতা | অর্থ দিবালোকের মতো স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। | অর্থ রূপক, গোপন ও বহু ব্যাখ্যার সম্ভাবনাযুক্ত। |
| ২. ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষিতা | কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না, সরাসরি বোধগম্য। | তা’বীল বা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় কিংবা অর্থ আল্লাহর ওপর ন্যস্ত থাকে। |
| ৩. কিতাবের মূল ভিত্তি | এদেরকে ‘উম্মুল কিতাব’ বা মূল কাণ্ড বলা হয়। | এগুলো মূল কিতাবের অধীন ও শাখা-প্রশাখা। |
| ৪. মানবীয় ভূমিকা | আমল করা ও বাস্তব জীবনে বাস্তবায়ন করা। | ঈমান আনা এবং বিনম্রভাবে অজ্ঞতা স্বীকার করা। |
উপসংহার
মুহকামাত বান্দার কর্মজীবনকে আলোকিত করে, আর মুতাশাবিহাত বান্দার আত্মিক অহংকার চূর্ণ করে বিনম্র সমর্পিত মুমিনে পরিণত করে।
৮। عرف المنطوق والمفهوم – ثم بين أقسام المنطوق مفصلا وممثلا –
[মানতূক ও মাফহূমের সংজ্ঞা, এবং মানতূকে সারীহ ও গায়ের সারীহের বিশদ বিশ্লেষণ ও উদাহরণ]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও পটভূমি
উসূলুল ফিকহ ও উলূমুল কুরআনে শব্দের অর্থ কীভাবে বাক্যে প্রকাশিত হয়—তার ওপর ভিত্তি করে শব্দার্থকে প্রধানত ‘মানতূক’ (সরাসরি উচ্চারিত পাঠ) এবং ‘মাফহূম’ (উহ্য বা অন্তর্নিহিত ভাব) দ্বারা বিশ্লেষণ করা হয়। কুরআনের আয়াত থেকে মাসআলা বের করতে এই দুইয়ের জ্ঞান অপরিহার্য।
المنطوق এবং المفهوم-এর সংজ্ঞা
- ১. আল-মানতূক (المنطوق): বাক্যের সরাসরি উচ্চারিত শব্দের মাধ্যমে যে অর্থ প্রকাশ পায় (ما دل عليه اللفظ في محل النطق)। অর্থাৎ যা সরাসরি বলা হয়েছে।
- ২. আল-মাফহূম (المفهوم): সরাসরি মুখে উচ্চারিত না হলেও বাক্যের ভাব, ইঙ্গিত বা বিপরীত রূপ থেকে যে অর্থ অনুধাবন করা যায় (ما دل عليه اللفظ لا في محل النطق)।
- দৃষ্টান্ত: সূরা বনি ইসরাঈলের ২৩ আয়াতে আল্লাহ পিতা-মাতার ব্যাপারে বলেছেন: ‘ফালা তাকুল লাহুমা উফ’ (তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না)।
- মানতূক: মুখে ‘উহ’ শব্দ বলে বিরক্তি প্রকাশ করা হারাম।
- মাফহূম: যখন ‘উহ’ বলাই হারাম, তখন পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া, প্রহার করা বা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো আরও বহুগুণে হারাম হবে (মাফহূমে মুওয়াফাক্বাত)।
- দৃষ্টান্ত: সূরা বনি ইসরাঈলের ২৩ আয়াতে আল্লাহ পিতা-মাতার ব্যাপারে বলেছেন: ‘ফালা তাকুল লাহুমা উফ’ (তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না)।
আল-মানতূক-এর প্রধান প্রকারভেদ ও দৃষ্টান্ত (أقسام المنطوق)
মানতূক প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত: মানতূকে সারীহ এবং মানতূকে গায়ের সারীহ।
১. মানতূকে সারীহ (المنطوق الصريح – স্পষ্ট মানতূক)
যে শব্দ সরাসরি তার মৌলিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি আবার দুটি স্তরে বিভক্ত:
- ক. নাস্স (النص): যে শব্দের মাত্র একটিই অর্থ হয় এবং কোনো দ্বিতীয় অর্থের সম্ভাবনা থাকে না। যেমন: ‘ফা সিয়ামু সালাসাতি আইয়্যাম’ (তিন দিন রোযা রাখা)—এখানে ‘তিন’ সংখ্যাটি নিশ্চিত।
- খ. যাহির (الظاهر): যে শব্দে একাধিক অর্থের সম্ভাবনা থাকলেও একটি অর্থ প্রধান ও স্পষ্ট। যেমন: ‘ফাতাওয়াদ্বাঊ’—এখানে শরিয়তের ওযু বোঝানোই প্রকাশ্য।
২. মানতূকে গায়ের সারীহ (المنطوق غير الصريح – পরোক্ষ মানতূক)
বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্যের সাথে প্রাসঙ্গিকভাবে যে অর্থ জড়িয়ে থাকে। এটি তিন ভাগে বিভক্ত:
| প্রকার | সংজ্ঞা ও স্বরূপ | কুরআনী দৃষ্টান্ত |
|---|---|---|
| ১. দিলালাতুল ইকতিতা (دلالة الاقتضاء) |
বাক্যের অর্থ সত্য বা বৈধ হওয়ার জন্য কোনো উহ্য শব্দ আবশ্যকীয়ভাবে ধরে নেওয়া। | ‘ওয়াসআলিল ক্বরইয়াহ’ (গ্রামকে জিজ্ঞেস কর)—এখানে ব্যাকরণ ও বুদ্ধির বিচারে উহ্য শব্দ হলো ‘আহলাল ক্বরইয়াহ’ বা গ্রামের অধিবাসীদের জিজ্ঞেস কর। |
| ২. দিলালাতুল তায়বীহ (دلالة التنبيه والإيماء) |
কোনো আদেশের সাথে কোনো কারণের এমন সংযোগ যা থেকে বিধানের হেকমত বোঝা যায়। | ‘চোর ও চোরনীর হাত কেটে দাও’—এখানে চুরিই যে হাত কাটার ইল্লত বা কারণ, তা ইঙ্গিতে স্পষ্ট। |
| ৩. দিলালাতুল ইশারা (دلالة الإشارة) |
বাক্যের মূল উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু গভীর চিন্তা করলে বাক্য থেকে এক চমৎকার নতুন বিধান উদ্ঘাটিত হয়। | এক আয়াতে বলা হয়েছে গর্ভধারণ ও দুধপান মোট ৩০ মাস (আহক্বাফ: ১৫); অন্য আয়াতে দুধপানের মেয়াদ পূর্ণ ২৪ মাস (লুকমান: ১৪)। ৩০ থেকে ২৪ বিয়োগ করে হযরত আলী (রা.) প্রমাণ করলেন যে ন্যূনতম গর্ভধারণের মেয়াদ হলো ৬ মাস। এটি দিলালাতুল ইশারার এক অমর উদাহরণ। |
উপসংহার
মানতূকের এই সূক্ষ্ম স্তরবিন্যাস প্রমাণ করে যে কুরআনের ভাষাশৈলী এক অলৌকিক সমুদ্র—যার প্রতিটি বাক্যে জ্ঞান ও ফিকহের মণিমুক্তা ছড়িয়ে আছে।
৯। ما الفرق بين الحديث القدسي والحديث النبوي؟ بين ممثلا –
[হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববীর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য এবং উভয় বিষয়ের প্রামাণ্য উদাহরণ]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পটভূমি
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জবান দিয়ে যে সমস্ত হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তার কিছু বক্তব্য সরাসরি আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করে বর্ণিত হয়েছে এবং কিছু নবীজীর নিজস্ব জবানী ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে। এই পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে হাদীসকে ‘হাদীসে কুদসী’ ও ‘হাদীসে নববী’ বলা হয়।
সংজ্ঞা ও উদাহরণ
- হাদীসে কুদসী (الحديث القدسي): যে হাদীসের মূল বক্তব্য বা ভাব সরাসরি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ইলহাম বা ওহীর মাধ্যমে রাসূল (সা.)-কে জানানো হয়েছে, কিন্তু তার ভাষা ও শব্দ রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের জবানে আল্লাহর দিকে সম্বন্ধ করে বর্ণনা করেছেন। যেমন নবীজী বলেন: ‘আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: হে আমার বান্দাগণ! আমি আমার নিজের ওপর জুলুম হারাম করেছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও তা হারাম করেছি; অতএব তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।’ (সহীহ মুসলিম)।
- হাদীসে নববী (الحديث النبوي): যে হাদীসের ভাব ও ভাষা উভয়ই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব পবিত্র মুখনিঃসৃত এবং তিনি তা উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বলেছেন। যেমন: ‘ইন্নামাল আ’মালু বিন নিয়্যাত’—নিশ্চয় যাবতীয় কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল (সহীহ বুখারী)।
হাদীসে কুদসী এবং হাদীসে নববীর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য
| পার্থক্যমূলক দিক | হাদীসে কুদসী | হাদীসে নববী |
|---|---|---|
| ১. সম্বন্ধ ও উৎস | এর সম্বন্ধ সরাসরি আল্লাহর দিকে করা হয় (যেমন: ‘ক্বালুল্লাহু তাআলা’)। | এর সম্বন্ধ সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সত্তার দিকে করা হয়। |
| ২. বিষয়ের পরিধি | মূলত আল্লাহর মহিমা, রহমত, ক্ষমা, ইখলাস ও আধ্যাত্মিক নসীহত নিয়ে আলোচিত হয়। শরিয়তের ব্যবহারিক আহকাম এতে কম থাকে। | আকিদা, ইবাদত, মুআমালাত, সমাজ, অর্থনীতি, যুদ্ধ ও দণ্ডবিধিসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রের বিস্তারিত বিধানাবলী থাকে। |
| ৩. সংখ্যার ব্যাপ্তি | হাদীসে কুদসীর সংখ্যা সীমিত (বিশ্বে মাত্র কয়েকশত)। | হাদীসে নববীর সংখ্যা লক্ষাধিক। |
| ৪. কুরআনের সাথে পার্থক্য | হাদীসে কুদসীর ভাব আল্লাহর হলেও ভাষা নবীজীর; তাই নামাজে এর তেলাওয়াত জায়েজ নেই এবং এটি মু’জিযা নয়। পক্ষান্তরে কুরআন ভাব ও ভাষা উভয় দিক থেকেই সরাসরি আল্লাহর কালাম। |
উপসংহার
উভয় প্রকার হাদীসই সুন্নাহর অপরিহার্য অংশ যা উম্মাহর জন্য কুরআনের পর শরিয়তের দ্বিতীয় অকাট্য উৎস হিসেবে বিবেচিত।
১০। ما السورة؟ وهل ترتيب السور توفيقي أم لا؟ بين –
[কুরআনী সূরার সংজ্ঞা এবং সূরাসমূহের বর্তমান বিন্যাস কি তাওক্বীফী নাকি ইজতিহাদী—তার বিশদ বিশ্লেষণ]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পটভূমি
পবিত্র কুরআন ১১৪টি স্বতন্ত্র সূরায় বিভক্ত। এই সূরাগুলোর নামকরণ ও কুরআনের মুসহাফে তাদের ক্রমানুসারে বিন্যাস কীভাবে সম্পন্ন হয়েছিল—তা উলূমুল কুরআনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়।
السورة-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: ‘সূরা’ (السورة) শব্দটি ‘সূর’ থেকে গৃহীত, যার অর্থ প্রাচীর বা সীমানা—যেমন প্রাচীনকালে নগরীর সুরক্ষায় উঁচু প্রাচীর (সূরুল মাদীনাহ) দেওয়া হতো। আবার এর অর্থ সুউচ্চ মর্যাদা বা অলৌকিক প্রাসাদ।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: পবিত্র কুরআনের এমন এক নির্দিষ্ট অংশ বা অধ্যায় যার একটি স্বতন্ত্র নাম রয়েছে, যার একটি নির্দিষ্ট প্রারম্ভ ও সমাপ্তি রয়েছে এবং যাতে ন্যূনতম তিনটি আয়াত সন্নিবেশিত রয়েছে—তাকে সূরা বলে (যেমন সূরা আল-কাউসার)।
সূরাসমূহের বর্তমান বিন্যাস কি তাওক্বীফী (ঐশী নির্দেশিত) নাকি ইজতিহাদী?
মুসহাফে সূরাসমূহের বর্তমান ক্রমবিন্যাস (ফাতিহা, বাকারা, আলে ইমরান… থেকে নাস পর্যন্ত) নিয়ে আলেমদের তিনটি মতামত রয়েছে:
- ১. জমহুর উলামায়ে কেরামের অভিমত (তাওক্বীফী): ইমাম সুয়ূতী, ইবনুল আম্বারী এবং অধিকাংশ মুহাদ্দিসগণের মতে সূরাসমূহের এই ক্রমবিন্যাস স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক আল্লাহর ওহীর নির্দেশে তাওক্বীফী (توقيفي) হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। নবীজী প্রতি রমযানে জিবরাঈল (আ.)-কে এই ক্রমবিন্যাসে কুরআন পাঠ করে শোনাতেন এবং জীবনের শেষ রমযানে দুইবার এই বিন্যাসে পাঠ করেছিলেন (দাওরায়ে আখীরাহ)।
- ২. দ্বিতীয় মত (ইজতিহাদী): সাহাবায়ে কেরাম উসমান (রা.)-এর যুগে ইজতিহাদের ভিত্তিতে সূরাগুলো দৈর্ঘ্য অনুযায়ী (তিওয়াল, মিউন, মাছানী, মুফাসসাল) সাজিয়েছেন। কারণ পূর্বে আলী বা ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ব্যক্তিগত মুসহাফে নাযিলের ক্রম অনুযায়ী কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল।
- ৩. সমন্বিত রাজেহ মত: অধিকাংশ সূরার বিন্যাস ছিল সরাসরি তাওক্বীফী, তবে কয়েকটি নির্দিষ্ট সূরার ক্ষেত্রে সাহাবাদের ইজতিহাদী ঐকমত্য (ইজমা) ছিল। তবে উসমান (রা.)-এর যুগের পর থেকে আজ পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এই বিন্যাসের ওপর ঐক্যবদ্ধ এবং নামাজে ও তিলাওয়াতে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সুন্নাত।
উপসংহার
সূরাসমূহের বর্তমান বিন্যাস উম্মাহর সর্বসম্মত ইজমা দ্বারা সুদৃঢ়, যা কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত থাকবে।
১১। بين فوائد نزول القرآن بالتدريج –
[পবিত্র কুরআন এককালীন অবতীর্ণ না করে তেইশ বছরে ধাপে ধাপে নাযিল করার সুদূরপ্রসারী ঐশী হিকমতসমূহ]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পটভূমি
তাওরাত বা ইঞ্জিলের মতো পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবগুলো স্ব স্ব নবীদের ওপর এককালীন ফলক বা পুস্তিকাকারে অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু মহাগ্রন্থ আল-কুরআন দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে কিস্তিতে কিস্তিতে অবতীর্ণ হয়। কাফেররা এর ওপর আপত্তি তুলেছিল (সূরা আল-ফুরক্বান: ৩২)। আল্লাহ তাআলা সেই আপত্তির জবাবে ধাপে ধাপে নাযিলের অন্তর্নিহিত হিকমত তুলে ধরেছেন।
ধাপে ধাপে (তানযীল) কুরআন নাযিলের প্রধান প্রধান উপকারিতা
- ১. নবীজী (সা.)-এর পবিত্র হৃদয়ে অবিচল সাহস ও সান্ত্বনা দান (تثبيت فؤاد النبي):
কাফেরদের অব্যাহত নির্যাতন, মিথ্যা অপপ্রচার ও হত্যার ষড়যন্ত্রের মুখে নবীজী যখনই ব্যথিত হতেন, তখনই নতুন ওহী অবতীর্ণ হয়ে তাঁর হৃদয়কে শান্ত করত এবং আসমানী সান্ত্বনা জোগাত। - ২. উম্মতের জন্য মুখস্থকরণ ও সংরক্ষণ সহজসাধ্য করা (تيسير حفظه وفهمه):
আরবরা ছিল মূলত নিরক্ষর জাতি। যদি একবারে ৩০ পারা কুরআন অবতীর্ণ হতো, তবে সমগ্র কিতাব মুখস্থ করা ও এর জটিল দর্শন অনুধাবন করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হতো। অল্প অল্প করে আয়াত নাযিল হওয়ায় সাহাবীগণ তা সহজেই মুখস্থ করতেন এবং জীবনে বাস্তবায়ন করতেন। - ৩. সমাজ সংস্কারে পর্যায়ক্রমিক রূপরেখা (التدرج في التشريع):
জাহেলী সমাজ শত শত বছর ধরে মদ, সুদ, ব্যভিচার ও মূর্তিপূজায় গভীরভাবে আসক্ত ছিল। ইসলাম যদি একদিনেই সব নিষিদ্ধ করে দিত তবে কেউ ইসলাম গ্রহণ করত না। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) বলেন: ‘প্রথমে জান্নাত ও জাহান্নামের আকিদা অবতীর্ণ হয়েছিল। মানুষ যখন ঈমানে খাঁটি হলো তখন মদ ও যেনা বর্জনের নির্দেশ এলো। যদি প্রথমেই মদ ছাড়তে বলা হতো তবে তারা বলত আমরা কখনো মদ ছাড়ব না।’ (সহীহ বুখারী)। - ৪. বাস্তব প্রশ্নের জবাব ও সমকালীন সমস্যার সমাধান:
সাহাবীগণ দৈনন্দিন জীবনে যে সমস্ত সামাজিক, পারিবারিক ও যুদ্ধের জটিল সংকটে পড়তেন (যেমন যিহার, লি’আন, গনীমত বা হিজরত)—তখনই তাৎক্ষণিক আসমানী সমাধান দিয়ে আয়াত নাজিল হতো। এতে কুরআনের প্রতি মানুষের ভালোবাসা জীবন্ত হয়ে উঠত। - ৫. কুরআনের অলৌকিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ:
দীর্ঘ তেইশ বছরের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অবতীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কুরআনের ভাষার মান, ছন্দ ও চিন্তার ধারাবাহিকতায় কোনো বৈপরীত্য ঘটেনি। এটি প্রমাণ করে এটি কোনো মানুষের রচিত নয়, বরং এক পরম পরাক্রমশালী আল্লাহর কালাম।
উপসংহার
ধাপে ধাপে নাযিলের এই মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতিই আরব উপদ্বীপের বর্বর জাতিকে মাত্র দুই দশকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদর্শ জাতিতে রূপান্তর করেছিল।
১২। تحدث طرق تخصيص العام بالأمثلة –
[উসূলুল কুরআনে ‘আম’-কে ‘খাস’ করার নিয়মাবলী এবং মুত্তাসিল ও মুনফাসিল দলীল দ্বারা তাখসীসের দৃষ্টান্ত]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পটভূমি
কুরআনের আয়াত থেকে আইন উদ্ঘাটনের এক মৌলিক শাস্ত্রীয় বিধান হলো ‘আম’ (সার্বজনীন বা ব্যাপক শব্দ) এবং ‘খাস’ (নির্দিষ্ট শব্দ)। যখন কোনো সার্বজনীন শব্দের পরিধি থেকে কিছু অংশকে নির্দিষ্ট কোনো দলীল দ্বারা বাদ দেওয়া হয়, তখন তাকে ‘তাখসীসুল আম’ (تخصيص العام) বলা হয়।
তাখসীসের প্রধান পদ্ধতি ও নিয়মাবলী
উসূলবিদদের মতে তাখসীসকারী দলীল (আল-মুখাসসিস) প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত: মুত্তাসিল (যা মূল বাক্যের সাথেই সংযুক্ত থাকে) এবং মুনফাসিল (যা সম্পূর্ণ পৃথক দলীলে আসে)।
১. মুখাসসিসে মুত্তাসিল (المخصص المتصل – সংযুক্ত দলীল)
- ক. ইস্তিসনা (الاستثناء – ব্যতিক্রমী অব্যয়): ‘ইল্লা’ ইত্যাদি দিয়ে বাদ দেওয়া। যেমন: ‘ওয়াল আসর, ইন্নাল ইনসানা লাফী খুসর’ (সমগ্র মানবজাতি ক্ষতিগ্রস্ত)—এটি আম; এরপর বলা হলো: ‘ইল্লাল্লাযীনা আমানূ’ (তবে যারা ঈমান এনেছে তারা ব্যতীত)—এখানে মুমিনদের ক্ষতির ব্যাপকতা থেকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
- খ. শর্ত (الشرط): যেমন: দাসমুক্তির সাধারণ নির্দেশকে অন্য আয়াতে শর্ত দেওয়া হয়েছে: ‘যদি তারা মুমিন হয়’।
- গ. সিফাত বা বিশেষণ (الصفة): যেমন বিবাহের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে: ‘তোমাদের সৎকন্যারা যারা তোমাদের কোলে লালিত-পালিত’।
- ঘ. গায়াত বা সীমা নির্ধারণ (الغاية): ‘হাত্তা’ দিয়ে শেষ সীমা বলে দেওয়া। যেমন ওযুর ক্ষেত্রে হাত ধোয়ার সীমা কনুই পর্যন্ত।
২. মুখাসসিসে মুনফাসিল (المخصص المنفصل – পৃথক স্বতন্ত্র দলীল)
- ক. কুরআন দ্বারা কুরআনের তাখসীস: সূরা বাকারার ২২৮ আয়াতে বলা হয়েছে: ‘তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন হায়েয অপেক্ষা করবে’ (এটি সমস্ত নারীর জন্য আম)। কিন্তু সূরা আহযাবের ৪৯ আয়াতে একে খাস করে বলা হয়েছে: ‘যে নারীকে স্পর্শ করার পূর্বেই তালাক দেওয়া হয়েছে তার কোনো ইদ্দত নেই।’
- খ. সুন্নাহ বা হাদীস দ্বারা কুরআনের তাখসীস: কুরআনে সূরা নিসার ১১ আয়াতে মিরাসের সার্বজনীন বিধান এসেছে যে সন্তান পিতার সম্পত্তি পাবে। কিন্তু সহীহ হাদীস দ্বারা এই সাধারণ বিধান থেকে কাফের ও হত্যাকারীকে বাদ দিয়ে খাস করা হয়েছে: ‘কোনো মুসলিম কাফেরের ওয়ারিশ হবে না।’
- গ. সুস্থ আকল ও ইন্দ্রিয় দ্বারা তাখসীস: যেমন হুদহুদ পাখি সুলাইমান (আ.)-কে বলেছিল বিলকিসকে ‘সবকিছুই দেওয়া হয়েছে’—এখানে আকল বলে সবকিছু বলতে রাজ্য পরিচালনার সামগ্রী, সুলাইমান (আ.)-এর সিংহাসন নয়।
উপসংহার
তাখসীসের এই সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি অনুধাবন না করলে শরিয়তের মাসআলা নির্ধারণে চরম ভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে বাধ্য।
১৩। اكتب خلفية جمع القرآن في عهد عثمان رضي الله عنه –
[তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে পবিত্র কুরআন সংকলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পটভূমি
হযরত আবু বকর (রা.)-এর আমলে কুরআনকে একটি একক পাণ্ডুলিপিতে সংকলন করা হয়েছিল যা উমর (রা.)-এর মৃত্যুর পর উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা.)-এর হেফাজতে ছিল। কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর খিলাফতের যুগে ইসলাম যখন রোম, পারস্য ও ককেশাস ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ল, তখন এক নতুন সংকটের উদ্ভব হলো।
উসমানী সংকলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
- আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের যুদ্ধক্ষেত্র: ২৫ হিজরির দিকে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান অভিযানে সিরিয়া, কুফা ও বসরার মুসলিম সেনাদল একত্রিত হয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালীন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) প্রত্যক্ষ করলেন যে, সিরিয়ার সৈন্যরা উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর কেরাতে এবং ইরাকের সৈন্যরা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কেরাতে কুরআন পড়ছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক কেরাতের সূক্ষ্ম পার্থক্যের কারণে একদল অন্যদলকে ভর্ৎসনা করে বলতে শুরু করল: ‘আমাদের কেরাত তোমাদের কেরাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ!’ এমনকি তারা পরস্পরের ওপর কুফরির অপবাদ দেওয়ার মতো চরম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছিল।
- হুযায়ফা (রা.)-এর দ্রুত মদিনায় আগমন: এই ভয়াবহ চিত্র দেখে আতঙ্কিত হয়ে হুযায়ফা (রা.) দ্রুত মদিনায় খলীফা উসমান (রা.)-এর খেদমতে হাজির হয়ে ফরিয়াদ করলেন:
«يا أمير المؤمنين، أدرك هذه الأمة قبل أن يختلفوا في الكتاب اختلاف اليهود والنصارى!»
অর্থাৎ, ‘হে আমিরুল মুমিনীন! ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানরা যেভাবে নিজেদের ধর্মগ্রন্থ নিয়ে বিভক্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, এই উম্মাহ তাদের কিতাব নিয়ে তেমন ধ্বংসাত্মক বিরোধে লিপ্ত হওয়ার পূর্বেই আপনি এদের রক্ষা করুন!’
- উসমান (রা.)-এর যুগান্তকারী পদক্ষেপ:
- হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের এক জরুরি শূরা অধিবেশন ডাকলেন। সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে হযরত হাফসা (রা.)-এর নিকট রক্ষিত আবু বকরী মূল কপিটি নিয়ে আসা হলো।
- যায়দ ইবনে সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনুল যুবায়ের, সাঈদ ইবনুল আস এবং আব্দুর রহমান ইবনুল হারিস (রা.)-এর সমন্বয়ে চার সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সম্পাদনা বোর্ড গঠন করা হলো।
- নির্দেশ দেওয়া হলো—বানান বা উচ্চারণে মতভেদ দেখা দিলে কুরাইশদের বিশুদ্ধ ভাষায় তা লিপিবদ্ধ করতে হবে। এই কমিটি সেই মূল পাণ্ডুলিপি থেকে হুবহু অবিকল কয়েকটি মাস্টার কপি (মুসহাফে ইমাম) তৈরি করেন।
- একটি কপি মদিনায় রেখে বাকি কপিগুলো মক্কা, কুফা, বসরা, দামেস্ক ও ইয়েমেনের প্রধান প্রধান কেন্দ্রে এক একজন শিক্ষক ক্বারী সাহাবীসহ প্রেরণ করা হয় এবং অন্য সকল ব্যক্তিগত পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে দিয়ে সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে এক চিরন্তন লিপিরীতিতে ঐক্যবদ্ধ করা হয়।
উপসংহার
হযরত উসমান (রা.)-এর এই বিচক্ষণ ও দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলেই আজ চৌদ্দশত বছর পরও বিশ্বের পূর্ব থেকে পশ্চিমের প্রতিটি অঞ্চলের কুরআনের হরফ ও আয়াত হুবহু এক ও অভিন্ন রয়ে গেছে।
১৪। اكتب شروط ترجمة معاني القرآن الكريم –
[পবিত্র কুরআনুল কারীমের অর্থ অনুবাদের আবশ্যকীয় শারঈ শর্তাবলি এবং শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এর সীমারেখা]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পটভূমি
পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আরবি ভাষায়। বিশ্বের অনারব কোটি কোটি মানুষের কাছে কুরআনের হেদায়েত পৌঁছে দেওয়ার জন্য অনারব ভাষায় এর অর্থ অনুবাদ করা এক অপরিহার্য দ্বীনি দাওয়াতি দায়িত্ব। তবে অনুবাদ করতে গিয়ে যাতে আল্লাহর কালামের মূল মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না হয়, সেজন্য ইসলামি শরিয়ত কিছু কঠোর শর্ত নির্ধারণ করেছে।
কুরআন অনুবাদের মৌলিক প্রকারভেদ
- ১. তারজুমা হারফিয়্যাহ (الترجمة الحرفية – আক্ষরিক অনুবাদ): মূল আরবি শব্দের হুবহু প্রতিশব্দ বসিয়ে ভাষার রূপ বজায় রেখে অনুবাদ করা। উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত মতে কুরআনের এমন আক্ষরিক অনুবাদ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব ও নাজায়েজ। কারণ কুরআনের অলৌকিক বালাগাত ও রূপক কোনো মানবীয় প্রতিশব্দ দিয়ে ধারণ করা যায় না।
- ২. তারজুমা মা’নাবিয়্যাহ বা তাফসিরিয়্যাহ (الترجمة التفسيرية): মূল আরবি ভাষা অক্ষুণ্ণ রেখে বন্ধনীর মাধ্যমে আয়াতের অন্তর্নিহিত ভাব ও তাফসির অন্য ভাষায় ব্যক্ত করা। এটি সর্বসম্মতভাবে জায়েজ ও প্রশংসনীয়।
কুরআনের অর্থ অনুবাদের আবশ্যকীয় শর্তাবলি (شروط الترجمة)
- ১. মূল আরবি টেক্সট অবশ্যই সাথে মুদ্রিত থাকা: অনুবাদের পাশাপাশি মূল আরবি কালামুল্লাহ অবশ্যই বিদ্যমান থাকতে হবে। কেবল অনুবাদকে কখনো ‘কুরআন’ বলা যাবে না এবং অনুবাদকে স্বতন্ত্র কুরআন হিসেবে ছাপা নিষিদ্ধ।
- ২. অনুবাদকের আরবি ভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্য: অনুবাদককে প্রাচীন আরবি সাহিত্য, অলঙ্কারশাস্ত্র (বালাগাত), ব্যাকরণ (নাহু-সরফ) এবং শব্দের ধাতুমূলের সূক্ষ্ম ভিন্নতা সম্পর্কে পূর্ণ বিশেষজ্ঞ হতে হবে।
- ৩. অনূদিত লক্ষ্য ভাষার ওপর পূর্ণ দখল: যে ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছে (যেমন বাংলা বা ইংরেজি) সেই ভাষার ব্যাকরণ, সাহিত্যরস ও ভাব প্রকাশের সক্ষমতায় অনুবাদককে অত্যন্ত পারদর্শী হতে হবে যাতে ভুল শব্দচয়নে বিভ্রান্তি না ঘটে।
- ৪. আহলে সুন্নাতের বিশুদ্ধ আকিদার অনুসারী হওয়া: অনুবাদক যদি মুতাযিলা, শিয়া, কাদিয়ানী বা ভ্রান্ত মতবাদের অনুসারী হয়, তবে সে নিজের মতবাদের সমর্থনে আয়াতের বিকৃত অনুবাদ করবে। তাই সহীহ আকিদা থাকা অন্যতম প্রধান শর্ত।
- ৫. আসবাবে নুযূল ও তাফসিরের গভীর জ্ঞান: প্রতিটি আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট, নাসিখ-মানসূখ এবং রাসূল (সা.) ও সাহাবাদের ব্যাখ্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
- ৬. অনুবাদকে কালামুল্লাহর বিকল্প মনে না করা: সর্বদা স্পষ্ট রাখতে হবে যে এটি মানুষের দুর্বল অনুবাদ বা আয়াতের ভাবার্থ মাত্র; এটি স্বয়ং কালামুল্লাহ নয়। নামাজের কেরাতে এই অনুবাদ পাঠ করলে নামাজ বাতিল হয়ে যাবে।
উপসংহার
এই শর্তাবলী মেনে আন্তরিক নিষ্ঠার সাথে কুরআন অনুবাদ করা বিশ্বজুড়ে ইসলামের সত্য আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক মহান জিহাদ ও সওয়াবের কাজ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ১ম বর্ষ উলূমুল কুরআন ১ম পত্র ২০২৪ পরীক্ষার বিষয় কোড কত ছিল?
বিষয় কোড ছিল ১১১০০৮ এবং পূর্ণমান ১০০ নম্বর। সময় ৩ ঘণ্টা।
সর্বপ্রথম নাযিলকৃত আয়াত কোনগুলো?
সর্বসম্মত রাজেহ মত অনুযায়ী হেরা গুহায় অবতীর্ণ সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত।
হযরত উসমান (রা.)-কে কেন ‘জামেউল কুরআন’ বলা হয়?
তিনি আঞ্চলিক কেরাতের বিরোধ দূর করে সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে কুরাইশী লিপিরীতিতে এক মুসহাফে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।
হাদীসে কুদসী ও কুরআনের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
কুরআনের ভাষা ও ভাব উভয়ই আল্লাহর; কিন্তু হাদীসে কুদসীর ভাব আল্লাহর হলেও ভাষা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব।
কুরআন কিস্তিতে কিস্তিতে নাযিল হওয়ার প্রধান হিকমত কী ছিল?
নবীজীর হৃদয়কে সান্ত্বনা দেওয়া, মুখস্থ সহজ করা এবং সমাজকে পর্যায়ক্রমে সংস্কার করা।
কুরআনের আক্ষরিক অনুবাদ কি শরিয়তে জায়েজ?
না, কুরআনের আক্ষরিক অনুবাদ অসম্ভব ও নাজায়েজ; কেবল মূল আরবি বহাল রেখে ভাবানুবাদ বা তাফসিরি অনুবাদ জায়েজ।

