কামিল (স্নাতকোত্তর) প্রথম পর্ব পরীক্ষা ২০২৪
হাদীস বিভাগ (দ্বিতীয় পত্র)
বিষয়: সুনানুত তিরমিযী ওয়া শামায়িলুত তিরমিযী [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
বিষয় কোড: ৬১১১০২ | পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[الملاحظة : أجب عن اربعة من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب) والدرجات مذكورة في الهامش-]
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ হতে যেকোনো চারটি এবং (খ) বিভাগ হতে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও। মার্জিনে উল্লেখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]
مجموعة (أ) – ক বিভাগ : হাদীস অংশ (মান: ২০ × ৪ = ৮০)
١- حدثنا قتيبة بن سعيد أنا أبو عوانة عن سماك بن حرب ح ونا هناد ثنا وكيع عن إسرائيل عن سماك عن مصعب بن سعد عن ابن عمر رضى الله عنهما عن النبى صلى الله عليه وسلم قال لا تقبل صلوة بغير طهور ولا صدقة من غلول – قال هناد فى حديثه الا بطهور – قال ابو عيسى هذا الحديث اصح شيء فى هذا الباب واحسن – وفى الباب عن ابى المليح عن أبيه وابى هريرة وانس رضى الله عنهم –
[১. কুতায়বাহ ইবনে সাঈদ আবু আওয়ানাহ থেকে, তিনি সিমাক ইবনে হারব থেকে (সনদ পরিবর্তন) এবং হান্নাদ ওয়াকী থেকে, তিনি ইসরাঈল থেকে, তিনি সিমাক থেকে, তিনি মুসআব ইবনে সা’দ থেকে এবং তিনি হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন। নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন: পবিত্রতা ছাড়া কোনো নামায কবুল হয় না এবং আত্মসাৎকৃত (হারাম) মাল থেকে কোনো সদকাহ কবুল হয় না। হান্নাদ তাঁর বর্ণনায় ‘ইল্লা বিতুহুর’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। ইমাম আবু ঈসা তিরমিযী (রহ.) বলেন: এই অধ্যায়ে এটি সর্বাধিক সহীহ ও সুন্দরতম হাদীস। এ বিষয়ে আবুল মালীহ তাঁর পিতা থেকে, আবু হুরায়রা ও আনাস (রা.) থেকেও হাদীস বর্ণিত রয়েছে।]
শব্দার্থ ও তাহক্বীক্ব (তাহক্বীক্বে কালিমা):
| শব্দরূপ (কালিমা) | মূলধাতু (মাদ্দাহ) | বাব (অধ্যায়) | সিগাহ ও বাহাস | বাংলা অর্থ |
|---|---|---|---|---|
| طُهُور / طَهُور | ط – ه – ر | نصر/كرم | اسم مصدر / اسم آلة | পবিত্রতা / পবিত্রকারী পানি |
| غُلُول | غ – ل – ل | نصر | مصدر | গনীমতের মাল আত্মসাৎ / অবৈধ উপার্জন |
| أَصَحّ | ص – ح – ح | – | اسم تفضيل | সর্বাধিক সহীহ বা বিশুদ্ধ |
| تُقْبَلُ | ق – ب – ل | سمع | واحد مؤنث غائب، نفى مجرد مجهول | কবুল করা হয় না / গৃহীত হয় না |
(أ) عرف الطهارة لغة وشرعا – ثم بين اقسامها –
[(ক) তাহারাত-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাও এবং এর প্রকারভেদ বর্ণনা কর।]
আভিধানিক অর্থ: ‘তাহারাত’ (الطهارة) শব্দটি ‘তুহর’ মূলধাতু থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হলো বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল প্রকার অপবিত্রতা ও ময়লা-আবর্জনা থেকে মুক্ত হওয়া বা পবিত্রতা অর্জন করা (النظافة والنزاهة عن الأدناس)।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় যে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ওজু, গোসল বা তায়াম্মুমের মাধ্যমে হাদাছ (অদৃশ্য নাপাকী) দূর করা হয় এবং শরীর, পোশাক ও নামাযের স্থান থেকে খাবাছ (দৃশ্যমান নাপাকী) অপসারণ করা হয়, তাকে তাহারাত বলে।
তাহারাতের প্রকারভেদ: তাহারাত মূলত দুই প্রকার: ১. তাহারাতুস সুগরা (ছোট নাপাকী থেকে পবিত্রতা): ওজুর মাধ্যমে অজুহীন অবস্থা থেকে পবিত্র হওয়া। ২. তাহারাতুল কুবরা (বড় নাপাকী থেকে পবিত্রতা): ফরয গোসলের মাধ্যমে জানাবাত, হায়েয ও নিফাস থেকে পবিত্রতা লাভ। এছাড়াও আধ্যাত্মিক দিক থেকে তাহারাত হলো শিরক, বিদআত ও কুপ্রবৃত্তি থেকে হৃদয়কে পবিত্র রাখা।
(ب) ما معنى الغلول؟ وما حكم التصدق من مال الحرام؟ بين –
[(খ) গুলূল শব্দের অর্থ কী? হারাম মাল থেকে সদকাহ করার শরঈ বিধান কী? স্পষ্ট কর।]
গুলূলের অর্থ: ‘গুলূল’ (الغلول) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো গোপনে খিয়ানত করা বা চুরি করা। শরীয়তের পরিভাষায় গণিমতের মাল বণ্টনের পূর্বে কোনো যোদ্ধা কর্তৃক সেখান থেকে কোনো অংশ গোপনে আত্মসাৎ করাকে গুলূল বলা হয়। পরবর্তীতে ঘুষ, সুদ, ছিনতাই এবং যে কোনো অবৈধ বা হারাম উপার্জনকে গুলূলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
হারাম মাল থেকে সদকাহর বিধান: হারাম সম্পদ থেকে দান-সদকাহ করলে কোনো সওয়াব পাওয়া যাবে না এবং আল্লাহর দরবারে তা কবুল হবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا (নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ব্যতীত গ্রহণ করেন না)। তবে যদি কারো নিকট হারাম সম্পদ এসে পড়ে, তবে তার বিধান হলো সওয়াবের আশা ছাড়া দায়মুক্তির নিয়তে সেই সম্পদ প্রকৃত মালিককে ফেরত দেওয়া; আর মালিক অজ্ঞাত হলে গরিব-মিসকীনকে সওয়াবের নিয়ত ব্যতিরেকে দান করে দেওয়া ওয়াজিব।
(ج) بين احكام فاقد الطهورين مفصلا ومدللا –
[(গ) ফাকিদুত তুহুরাইন (পানি ও মাটি উভয়ের ব্যবহারে অক্ষম ব্যক্তি)-এর বিধান দলিলসহ বিস্তারিত লিখ।]
‘ফাকিদুত তুহুরাইন’ (فاقد الطهورين) হলেন এমন ব্যক্তি যিনি পানি না পাওয়ার কারণে ওজু-গোসল করতে পারছেন না এবং রোগ বা মাটির অনুপস্থিতির কারণে তায়াম্মুমও করতে সক্ষম নন (যেমন অসুস্থতা বা আবদ্ধাবস্থা)। তাঁর ব্যাপারে ইমামগণের চারটি মাযহাব রয়েছে:
১. আহনাফের অভিমত: ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, তিনি নামাযের ওয়াক্তের সম্মানার্থে (تشبيها بالمصلين) রুকু-সিজদাসহ নামাযের সাদৃশ্য অবলম্বন করবেন। পরবর্তীতে যখন পানি বা মাটি পাবেন, তখন সেই নামায পুনরায় কাযা আদায় করে নেবেন।
২. ইমাম শাফেয়ী ও আহমাদ (রহ.)-এর অভিমত: তিনি বর্তমান অবস্থাতেই পূর্ণ নামায আদায় করবেন। কারণ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ (তোমরা তোমাদের সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় কর)। ইমাম শাফেয়ীর মতে পরবর্তীতে কাযা করতে হবে, আর ইমাম আহমাদের মতে এই আদায়ই যথেষ্ট, কাযা লাগবে না।
৩. ইমাম মালিক (রহ.)-এর অভিমত: তাঁর ওপর থেকে সালাতের বাধ্যবাধকতা সাময়িকভাবে রহিত হয়ে যাবে; ফলে তাকে ওয়াক্তে পড়তে হবে না এবং পরবর্তীতে কাযাও করতে হবে না। তবে অধিকাংশ ফকীহের মতে ওয়াক্তে নামাযের সাদৃশ্য রাখা এবং পরবর্তীতে কাযা করা অধিক সতর্কতামূলক ও উত্তম।
(د) ما المراد بقول الامام الترمذى : هذا الحديث اصح شيء فى هذا الباب؟
[(ঘ) ইমাম তিরমিযীর উক্তি: “এই অধ্যায়ে এটি সর্বাধিক সহীহ”-এর তাৎপর্য কী?]
ইমাম তিরমিযী (রহ.) যখন কোনো হাদীস সম্পর্কে বলেন “هذا أصح شيء في هذا الباب”, তখন এর অর্থ এই নয় যে হাদীসটি সনদের বিচারে বুখারী বা মুসলিমের সর্বোচ্চ শর্তে সহীহ। বরং এর অর্থ হলো আলোচ্য বিষয়ে যতগুলো হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তাদের পারস্পরিক তুলনামূলক বিচারে এই সনদটি ত্রুটিমুক্ত, এর রাবীগণ অধিক নির্ভরযোগ্য এবং এটিই এই মাসআলায় সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও অগ্রাধিকারযোগ্য দলিল। এটি তুলনামূলক জারহ-তাদীল ও হাদীস মূল্যায়নে ইমাম তিরমিযীর এক অনুপম সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক পরিভাষা।
٢- عن انس رضى الله عنه ان ناسا من عرينة قدموا المدينة فاجتووها فبعثهم رسول الله صلى الله عليه وسلم فى ابل الصدقة وقال اشربوا من البانها وابوالها فقتلوا راعى رسول الله صلى الله عليه وسلم واستاقوا الابل وارتدوا عن الاسلام فاتى بهم النبى صلى الله عليه وسلم فقطع ايديهم وارجلهم من خلاف وسمر اعينهم والقاہم بالحرة – قال انس فكنت ارى احدهم يكد الأرض بفيه حتى ماتوا – وربما قال حماد يكدم الارض بفيه حتى ماتوا – قال ابو عيسى هذا حديث حسن صحيح –
[২. হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, উরাইনাহ গোত্রের একদল লোক মদীনা শরীফে আসল এবং মদীনার আবহাওয়া তাদের প্রতিকূল হলো (তারা অসুস্থ হয়ে পড়ল)। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে সদকার উটের পালের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন: তোমরা সেগুলোর দুধ ও পেশাব পান কর। কিন্তু তারা সুস্থ হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাখালকে নির্মমভাবে হত্যা করল, উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল এবং ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে গেল। সংবাদ পেয়ে নবী করীম (সা.) তাদের পশ্চাদ্ধাবনকারী দল পাঠালেন এবং তাদেরকে ধরে আনা হলো। অতঃপর নবীজী তাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দিলেন, চোখে তপ্ত শলাকা বিদ্ধ করলেন এবং হাররা নামক পাথুরে প্রান্তরে ফেলে রাখলেন। হযরত আনাস (রা.) বলেন: আমি তাদের একজনকে তৃষ্ণায় কাতর হয়ে মুখ দিয়ে মাটিতে কামড়াতে দেখেছি, অবশেষে তারা এভাবেই মারা গেল। حماد-এর বর্ণনায় ‘ইয়াকদুমু’ এসেছে। ইমাম তিরমিযী বলেন, এটি হাদীসে হাসান সহীহ।]
শব্দার্থ ও তাহক্বীক্ব (তাহক্বীক্বে কালিমা):
| শব্দরূপ (কালিমা) | মূলধাতু (মাদ্দাহ) | বাব (অধ্যায়) | সিগাহ ও বাহাস | বাংলা অর্থ |
|---|---|---|---|---|
| اجْتَوَوْهَا | ج – و – ي | افتعال | جمع مذكر غائب | আবহাওয়া তাদের অনুপযোগী হলো |
| سَمَرَ | س – م – ر | نصر | واحد مذكر غائب | তপ্ত শলাকা দিয়ে অন্ধ করে দিল |
| يَكُدُّ / يَكْدُمُ | ك – د – د / ك – د – م | – | واحد مذكر غائب | মাটিতে কামড়ানো বা আঁচড়ানো |
| ارْتَدُّوا | ر – د – د | افتعال | جمع مذكر غائب | তারা ধর্মত্যাগী বা মুরতাদ হলো |
(أ) ما حكم ابوال ماكول اللحم؟ اذكر اقوال العلماء فيه مفصلا –
[(ক) হালাল পশুর পেশাবের বিধান কী? এ বিষয়ে আলেমগণের বিস্তারিত অভিমত উল্লেখ কর।]
যেসব পশুর গোশত খাওয়া হালাল (যেমন উট, গরু, ছাগল), সেগুলোর পেশাব পবিত্র না অপবিত্র—এ নিয়ে ফকীহদের মধ্যে সুস্পষ্ট মতভেদ রয়েছে:
১. ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.): তাঁদের মতে হালাল পশুর পেশাব ও গোবর সম্পূর্ণ পাক ও পবিত্র। তাঁদের প্রধান দলিল হলো আলোচ্য উরাইনাহর হাদীস, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ বেদুইনদের উটের পেশাব পান করার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন। যদি তা নাপাক হতো তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) তা পান করতে বলতেন না।
২. ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম শাফেয়ী (রহ.): তাঁদের মতে সকল পশুর পেশাবই নাপাক। তবে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে হালাল পশুর পেশাব নাজাসাতে খাফীফাহ (হালকা নাপাকী), আর ইমাম শাফেয়ীর মতে তা নাজাসাতে গালীযাহ। তাঁদের যুক্তি হলো রাসুলুল্লাহ (সা.) কবরের আযাবের বর্ণনায় সাধারণভাবে ইরশাদ করেছেন: اسْتَنْزِهُوا مِنَ الْبَوْلِ فَإِنَّ عَامَّةَ عَذَابِ الْقَبْرِ مِنْهُ (পেশাব থেকে বেঁচে থাক, কেননা কবরের অধিকাংশ আযাব এর কারণেই হয়ে থাকে)। উরাইনাহর ক্ষেত্রে তা ছিল নিছক প্রাণরক্ষার জরুরি চিকিৎসা হিসেবে অনুমতি।
(ج) هل المثلة جائزة؟ والا فكيف فعل بهم النبى صلى الله عليه وسلم المثلة وقد بعث رحمة للعالمين؟
[(গ) মুছলাহ (অঙ্গচ্ছেদ ও বিকৃত শাস্তি) কি জায়েয? যদি না হয়, তবে রহমাতুল্লিল আলামীন নবী (সা.) তাদের সাথে এই আচরণ কেন করলেন?]
ইসলামী শরীয়তে সাধারণ অবস্থায় শত্রুর মৃতদেহ বা বন্দীর অঙ্গ বিকৃত করা (المثلة – মুছলাহ) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ عَنِ النُّهْبَى وَالْمُثْلَةِ। তাহলে উরাইনাহ গোত্রের সাথে এরূপ কঠোর শাস্তির কারণ কী? মুহাদ্দিসীনগণ এর চমৎকার জবাব দিয়েছেন:
১. ক্বিসাস বা সমকক্ষ প্রতিশোধ: সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য রেওয়ায়েতে সুস্পষ্টভাবে এসেছে যে উরাইনাহর ডাকাতরা নবীজী (সা.)-এর নিরীহ রাখালকে জীবন্ত অবস্থায় চোখ উপড়ে ফেলে এবং হাত-পা কেটে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। ফলে কুরআনের বিধান وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ (যদি তোমরা প্রতিশোধ নাও তবে ঠিক ততটুকুই নাও যতটুকু তোমাদের ওপর করা হয়েছে) অনুযায়ী এটি ছিল ক্বিসাস বা সমপর্যায়ের শাস্তি।
২. হুদুদ ও মুহারাবা আইন: তারা ছিল সশস্ত্র ডাকাত ও বিদ্রোহী (মুহারিবীন)। সুরা আল-মায়িদাহর ৩৩ নম্বর আয়াতে বিদ্রোহীদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়ার সরাসরি ঐশী দণ্ডবিধি কার্যকর করা হয়েছিল।
৩. পরবর্তীতে মুছলাহ রহিতকরণ: ইমাম বুখারী ও কাতাদাহ (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে এই ঘটনার পরই রাসুলুল্লাহ (সা.) চূড়ান্তভাবে মুছলাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
٣- حدثنا هناد نا وكيع عن الاعمش عن ابراهيم عن همام بن الحارث قال بال جرير بن عبد الله ثم توضأ ومسح على خفيه فقيل له اتفعل هذا قال وما يمنعنى وقد رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم يفعله قال وكان يعجبهم حديث جرير لان اسلامه كان بعد نزول المائدة –
[৩. হান্নাদ ওয়াকী থেকে, তিনি আমাশ থেকে, তিনি ইব্রাহীম থেকে এবং তিনি হাম্মাম ইবনুল হারিস থেকে বর্ণনা করেন: তিনি বলেন, জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) প্রস্রাব করলেন, অতঃপর ওজু করলেন এবং তাঁর চামড়ার মোজার (খুফফাইন) ওপর মাসেহ করলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো: আপনি কি এমনটি করেন? তিনি বললেন: আমাকে বাধা দেবে কে, অথচ আমি স্বচক্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এরূপ করতে দেখেছি! হাম্মাম বলেন: সাহাবা ও তাবেয়ীগণ জারীরের এই হাদীস শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হতেন; কারণ জারীর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ ছিল সুরা আল-মায়িদাহ নাযিল হওয়ার পরবর্তী সময়ের।]
শব্দার্থ ও তাহক্বীক্ব (তাহক্বীক্বে কালিমা):
| শব্দরূপ (কালিমা) | মূলধাতু (মাদ্দাহ) | বাব (অধ্যায়) | সিগাহ ও বাহাস | বাংলা অর্থ |
|---|---|---|---|---|
| بَالَ | ب – و – ل | نصر | واحد مذكر غائب | সে পেশাব করল |
| مَسَحَ | م – س – ح | فتح | واحد مذكر غائب | মাসেহ করল / হাত বুলাল |
| خُفَّيْهِ | خ – ف – ف | – | تثنية مذكر مجرور بالإضافة | তাঁর চামড়ার মোজাদ্বয় |
| يُعْجِبُهُمْ | ع – ج – ب | إفعال | واحد مذكر غائب مضارع | তাদের মুগ্ধ করত / আনন্দ দিত |
(أ) ما الاختلاف بين الائمة فى جواز المسح على الخفين؟ ومن ينكره؟ بين مع الادلة –
[(ক) চামড়ার মোজার ওপর মাসেহ করার বৈধতায় ইমামদের মতভেদ কী? কারা এটি অস্বীকার করে? দলিলসহ আলোচনা কর।]
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইজমা: চার মাযহাবের ইমামসহ (আবু হানীফা, মালিক, শাফেয়ী ও আহমাদ) আহলে সুন্নাতের সকল মুহাদ্দিস ও ফকীহ একমত যে চামড়ার মোজার ওপর মাসেহ করা শরীয়তের মুতাওয়াতির ও সুপ্রমাণিত সুন্নাহ। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন: যতক্ষণ পর্যন্ত আমার কাছে সুর্যের আলোর মতো স্পষ্ট দলিল আসেনি ততক্ষণ আমি মাসেহের ফতোয়া দিইনি। আশিজনেরও অধিক সাহাবী থেকে মোজার ওপর মাসেহের হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এটি আহলে সুন্নাতের আকিদাগত পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
কারা অস্বীকার করে: শিয়া ও খারেজীরা মোজার ওপর মাসেহ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। তাদের দাবি হলো সুরা আল-মায়িদাহর আয়াতে পা ধৌত করার নির্দেশ এসেছে (وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ), যা মোজার মাসেহকে রহিত করেছে। কিন্তু আহলে সুন্নাত এই দাবি খণ্ডন করে বলেন, জারীর (রা.) সুরা মায়িদাহ নাযিলের পর ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তিনি নবীজী (সা.)-কে মাসেহ করতে দেখেছেন। অতএব মোজার মাসেহ কুরআনকে রহিত করেনি, বরং কুরআনের সাধারণ নির্দেশের ক্ষেত্রে বিশেষ অবস্থার একটি প্রামাণ্য সুন্নাহসম্মত ব্যাখ্যা ও শিথিলতা (রুখসাত)।
(ب) هل المسح على الخفين مؤقت ام لا؟ بين اختلاف العلماء فيه –
[(খ) মোজার ওপর মাসেহ করার কি সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে? আলেমদের মতভেদ বর্ণনা কর।]
১. জুমহুর ফকীহগণের অভিমত (মুআক্কাত / সময় নির্ধারিত): ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে মোজার ওপর মাসেহের সময়সীমা নির্দিষ্ট। মুকীম (স্বদেশে অবস্থানকারী)-এর জন্য এক দিন এক রাত (২৪ ঘণ্টা) এবং মুসাফির (ভ্রমণকারী)-এর জন্য তিন দিন তিন রাত (৭২ ঘণ্টা)। তাঁদের প্রধান দলিল হলো হযরত আলী (রা.) বর্ণিত সহীহ মুসলিমের হাদীস: جَعَلَ رَسُولُ اللَّهِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَلَيَالِيهِنَّ لِلْمُسَافِرِ وَيَوْمًا وَلَيْلَةً لِلْمُقِيمِ।
২. ইমাম মালিক (রহ.)-এর অভিমত: ইমাম মালিকের এক বর্ণনা অনুযায়ী মোজা না খোলা পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তবে জুমহুরের মতটিই শক্তিশালী হাদীসের ভিত্তিতে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ও আমলযোগ্য।
(ج) ما هي شروط جواز المسح على الخفين؟ بينها مفصلا –
[(গ) মোজার ওপর মাসেহ বৈধ হওয়ার আবশ্যকীয় শর্তাবলী বর্ণনা কর]
১. পূর্ণ পবিত্র অবস্থায় (ওজু করে পা ধোয়ার পর) মোজা পরিধান করতে হবে।
২. মোজা এমন পুরু চামড়া বা উপাদানের হতে হবে যাতে পানি সহজে ভেতরে প্রবেশ না করে এবং তা পরে এক ফারসাখ বা তিন মাইল পর্যন্ত হাঁটা যায়।
৩. মোজা টাখনু পর্যন্ত আবৃতকারী হতে হবে।
৪. কেবল ছোট নাপাকী (ওজু ভঙ্গের কারণ)-এর ক্ষেত্রে মাসেহ বৈধ; কিন্তু গোসল ফরয হলে মোজা খুলে সর্বসম্মতভাবে গোসল করতে হবে।
٤- حدثنا قتيبة نا الليث عن ابن شهاب عن سعيد بن المسيب وابى سلمة عن ابى هريرة رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا اشتد الحر فابردوا عن الصلوة فان شدة الحر من فيح جهنم – وحدثنا قتيبة قال حدثنا الليث عن عروة عن عائشة أنها قالت : صلى رسول الله صلى الله عليه وسلم العصر والشمس فى حجرتها ولم يظهر الفىء من حجرتها –
[৪. কুতায়বাহ লাইস থেকে, তিনি ইবনে শিহাব থেকে, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব ও আবু সালামা থেকে এবং তাঁরা হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: যখন গরম তীব্র আকার ধারণ করে, তখন সালাতকে ঠাণ্ডা করে আদায় কর। কেননা তীব্র গরম জাহান্নামের নিঃশ্বাসের অংশবিশেষ। অপর সনদে হযরত আয়েশা (রা.) বলেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন সময় আসরের নামায আদায় করতেন যখন তাঁর কামরার মধ্যে রোদ অবশিষ্ট থাকত এবং ছায়া কামরার দেয়ালের ওপর ওঠেনি।]
শব্দার্থ ও তাহক্বীক্ব (তাহক্বীক্বে কালিমা):
| শব্দরূপ (কালিমা) | মূলধাতু (মাদ্দাহ) | বাব (অধ্যায়) | সিগাহ ও বাহাস | বাংলা অর্থ |
|---|---|---|---|---|
| اشْتَدَّ | ش – د – د | افتعال | واحد مذكر غائب | তীব্র হলো / বৃদ্ধি পেল |
| أَبْرِدُوا | ب – ر – د | إفعال | جمع مذكر حاضر، أمر حاضر | তোমরা শীতল কর / বিলম্বে পড় |
| فَيْح | ف – ي – ح | ضرب | مصدر | তপ্ত নিঃশ্বাস / উত্তাপের বিস্তার |
| الْفَيْء | ف – ي – أ | ضرب | اسم مصدر | পশ্চিমাকাশের ছায়া (যা পূর্বদিকে পড়ে) |
(أ) اذكر اقوال العلماء فى اخر وقت الظهر واول وقت العصر مدللا –
[(ক) জোহরের শেষ ওয়াক্ত ও আসরের প্রথম ওয়াক্ত সম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের অভিমত দলিলসহ উল্লেখ কর।]
১. জুমহুর ফকীহগণের অভিমত (মিছলে আওয়াল): ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমাদ এবং আহনাফের সাহেবাইন (ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ)-এর মতে, প্রতিটি বস্তুর ছায়া যখন আসল ছায়া (মায়িলুয যাওয়ালে) ছাড়া তার এক গুণ (مِثْلٌ وَاحِدٌ) বৃদ্ধি পায়, তখন জোহরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে আসরের ওয়াক্ত শুরু হয়ে যায়। তাঁদের দলিল জিবরীল (আ.)-এর ইমামতির হাদীস, যেখানে তিনি দ্বিতীয় দিন এক গুণ ছায়ায় জোহর শেষ করে আসর শুরু করেছিলেন।
২. ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর অভিমত (মিছলে সানী): ইমাম আযম আবু হানীফা (রহ.)-এর নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী, প্রতিটি বস্তুর ছায়া আসল ছায়া ছাড়া দুই গুণ (مِثْلَيْنِ) দীর্ঘ না হওয়া পর্যন্ত জোহরের ওয়াক্ত বিদ্যমান থাকে এবং দুই গুণ অতিক্রম করার পরই আসরের ওয়াক্ত সূচিত হয়। তাঁর প্রধান দলিল হলো আলোচ্য আবু দাউদ ও তিরমিযীর হাদীস: أَبْرِدُوا بِالظُّهْرِ (জোহরকে ঠাণ্ডা করে পড়)। কারণ আরবের প্রচণ্ড গরমে এক গুণ ছায়ায় বাতাস শীতল হতো না, বরং দুই গুণ ছায়া হলেই তাপমাত্রা কমত। তবে সতর্কতা হিসেবে এক গুণ ছায়ার পূর্বেই জোহর পড়া এবং দুই গুণের পর আসর পড়া উত্তম।
(د) قوله عليه السلام فان شدة الحر من فيح جهنم “معارض بقول اهل الهيئة ان شدة الحر من قرب الشمس” فما هو التوفيق؟
[(ঘ) রাসুল (সা.)-এর বাণী: “তীব্র গরম জাহান্নামের নিঃশ্বাসের ফল”—এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণার বিপরীত, তাদের মতে সূর্যের দূরত্বের কারণে গরম হয়। উভয়ের মাঝে সমন্বয় কীভাবে করবে?]
জ্যোতির্বিজ্ঞানের বক্তব্য এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণীর মাঝে কোনো বৈপরীত্য নেই, বরং এটি বাস্তবতার গভীরতার দুই স্তর:
১. বাহ্যিক বনাম প্রকৃত কারণ: বিজ্ঞান কেবল দৃশ্যমান বাহ্যিক কারণ (Secondary Cause) অনুসন্ধান করে, যা হলো পৃথিবীর কক্ষপথে সূর্যের অবস্থানের নৈকট্য ও খাড়া রশ্মি। পক্ষান্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) অদৃশ্য জগতের মূল আধ্যাত্মিক কারণ (Ultimate / Primary Cause) উন্মোচন করেছেন, যা হলো মহান আল্লাহর হুকুমে জাহান্নামের বছরে দুটি শ্বাস গ্রহণের প্রতিক্রিয়া।
২. আল্লাহর সর্বময় কুদরত: সূর্য ও জাহান্নাম উভয়েই আল্লাহর সৃষ্টি। জাহান্নামের অগ্নির উত্তাপ মহাশূন্যের মাধ্যমে সৌরজগৎ ও বৈশ্বিক তাপমাত্রার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যা জাগতিক বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতির সীমার ঊর্ধ্বে। অতএব ঈমানদারদের জন্য নবুওয়াতের সংবাদ অকাট্য সত্য।
٥- عن عبادة بن الصامت رضى الله عنه قال صلى رسول الله صلى الله عليه وسلم الصبح فثقلت عليه القراءة فلما انصرف قال انى أراكم تقرءون وراء امامكم قال قلنا يا رسول الله اى والله قال لا تفعلوا الا بام القران، فانه لا صلوة لمن لم يقرأ بها –
[৫. হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজরের সালাত আদায় করলেন, কিরাআত পাঠ করা তাঁর জন্য কষ্টসাধ্য ও ভারী বোধ হলো। সালাত সমাপ্ত করে তিনি বললেন: আমার মনে হয় তোমরা তোমাদের ইমামের পেছনে কিরাআত পাঠ করছ? আমরা নিবেদন করলাম: হে আল্লাহর রাসুল! হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ আমরা তা-ই করি। তিনি বললেন: তোমরা এমনটি করো না, কেবল সুরা ফাতিহা ছাড়া; কেননা যে সুরা ফাতিহা পাঠ করে না তার কোনো সালাত হয় না।]
শব্দার্থ ও তাহক্বীক্ব (তাহক্বীক্বে কালিমা):
| শব্দরূপ (কালিমা) | মূলধাতু (মাদ্দাহ) | বাব (অধ্যায়) | সিগাহ ও বাহাস | বাংলা অর্থ |
|---|---|---|---|---|
| ثَقُلَتْ | ث – ق – ل | كرم | واحد مؤنث غائب | ভারী হলো / কষ্টসাধ্য হলো |
| انْصَرَفَ | ص – ر – ف | انفعال | واحد مذكر غائب | তিনি ফিরে তাকালেন / সালাত শেষ করলেন |
| لَا تَفْعَلُوا | ف – ع – ل | فتح | جمع مذكر حاضر، نهى حاضر | তোমরা এরূপ করো না |
| أُمّ الْقُرْآن | أ – م – م | – | مركب إضافى | কুরআনের মূল / সুরা ফাতিহা |
(أ) اكتب اختلاف الائمة فى حكم قراءة الفاتحة خلف الإمام –
[(ক) ইমামের পেছনে সুরা ফাতিহা পাঠের ব্যাপারে ইমামগণের মতভেদ উল্লেখ কর।]
১. আহনাফের মাযহাব (সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও মাকরূহে তাহরীমী): ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে কিরাআত উচ্চস্বরে হোক (জাহরী) কিংবা নিঃশব্দে হোক (সিররী), কোনো অবস্থাতেই মুক্তাদীর জন্য সুরা ফাতিহা বা অন্য কোনো কিরাআত পড়া জায়েয নেই; বরং ইমামের কিরাআত মনোযোগ সহকারে শোনা ও চুপ থাকা ওয়াজিব। দলিল: কুরআনের নির্দেশ وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا এবং হাদীস مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ فَقِرَاءَةُ الْإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ।
২. ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মাযহাব (সর্বাবস্থায় ফরয): মুক্তাদী হোক বা একাকী, জাহরী সালাত হোক বা সিররী সালাত, ইমামের পেছনে মুক্তাদীর জন্যও সুরা ফাতিহা পাঠ করা সালাতের অন্যতম রুকন। দলিল: لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ।
৩. ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর মাযহাব (সিররীতে মুস্তাহাব, জাহরীতে নিষিদ্ধ): জোহর ও আসরের মতো নিঃশব্দ সালাতে মুক্তাদী সুরা ফাতিহা পাঠ করবে, কিন্তু মাগরিব, এশা ও ফজরের মতো উচ্চস্বরের সালাতে ইমামের কিরাআত শুনবে এবং চুপ থাকবে।
(ب) كيف التوفيق بين الحديثين؟
[(খ) উভয় হাদীসের মাঝে সমন্বয় সাধনের পদ্ধতি আলোচনা কর]
উবাদাহ (রা.)-এর হাদীসটি ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগের নির্দেশ যখন সাহাবীগণ উচ্চস্বরে নবীর পেছনে পড়তেন। পরবর্তীতে যখন সুরা আল-আ’রাফের ২০৪ নং আয়াত (وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا) নাযিল হয়, তখন মুক্তাদীর কিরাআত রহিত হয়ে যায় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন: “ইমামের কিরাআতই মুক্তাদীর কিরাআত হিসেবে গণ্য হবে।”
٦- حدثنا الحسن بن على الخلال ثنا عبد الرزاق ثنا معمر عن ايوب عن نافع عن ابن عمر قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من جر ثوبه خيلاء لم ينظر الله اليه يوم القيامة – فقالت ام سلمة فكيف تصنع النساء بذيولهن؟ قال يرخين شبرا فقالت اذا تنكشف اقدامهن قال فيرخينه ذراعا لا يزدن عليه – هذا حديث حسن صحيح –
[৬. হাসান ইবনে আলী আল-খাল্লাল আব্দুর রাযযাক থেকে, তিনি মা’মার থেকে, তিনি আইয়ূব থেকে, তিনি নাফে থেকে এবং তিনি হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি অহংকারবশত নিজের পোশাক ঝুলিয়ে মাটির সাথে টেনে চলবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না। তখন উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.) আরজ করলেন: তবে নারীরা তাদের পোশাকের ঝুলানো আঁচল কীভাবে রাখবে? নবীজী বললেন: তারা এক বিঘত ঝুলিয়ে রাখবে। তিনি বললেন: তবে তো তাদের পা অনাবৃত হয়ে পড়বে! নবীজী ইরশাদ করলেন: তবে তারা এক হাত পরিমাণ ঝুলিয়ে রাখবে, এর বেশি কোনোভাবেই বাড়াবে না। এটি হাদীসে হাসান সহীহ।]
শব্দার্থ ও তাহক্বীক্ব (তাহক্বীক্বে কালিমা):
| শব্দরূপ (কালিমা) | মূলধাতু (মাদ্দাহ) | বাব (অধ্যায়) | সিগাহ ও বাহাস | বাংলা অর্থ |
|---|---|---|---|---|
| جَرَّ | ج – ر – ر | نصر | واحد مذكر غائب | সে টেনে চলল / হেঁচড়ালো |
| خُيَلَاء | خ – ي – ل | – | مصدر | অহংকার / আত্মগর্ব |
| يُرْخِينَ | ر – خ – و | إفعال | جمع مؤنث غائب مضارع | তারা ঢিলা করবে / ঝুলিয়ে দেবে |
| لَا يَزِدْنَ | ز – ي – د | ضرب | جمع مؤنث غائب، نهى | তারা আর বৃদ্ধি করবে না |
(أ) حرمة جر الاثواب على الاطلاق ام مشروطة بالمخيلة؟
[(ক) কাপড় ঝুলিয়ে চলার নিষেধাজ্ঞা কি সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য, নাকি অহংকারের সাথে শর্তযুক্ত?]
পুরুষদের ক্ষেত্রে টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরার ব্যাপারে ফকীহদের দুটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে: ১. জুমহুর ফকীহগণ: যদি অহংকারবশত হয় তবে তা সর্বসম্মতভাবে হারামে ক্বাতঈ এবং কবীরা গুনাহ। আর যদি অহংকার ব্যতীত স্বাভাবিকভাবে অভ্যাসবশত ঝুলিয়ে পরে তবে তা মাকরূহে তানযীহী বা তাহরীমী। ২. অন্যান্য মুহাদ্দিসীন: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাধারণ বাণী مَا أَسْفَلَ مِنَ الْكَعْبَيْنِ مِنَ الْإِزَارِ فَفِي النَّارِ (টাখনুর নিচের অংশ জাহান্নামে যাবে)-এর আলোকে সর্বাবস্থায় টাখনুর নিচে পরা নাজায়েয, কারণ ঝুলিয়ে পড়ার মধ্যেই অহংকারের লক্ষণ সুপ্ত থাকে।
(ب) ما هو حد جر ثوب النساء؟ بين في ضوء فقه أم سلمة رضي الله عنها –
[(খ) নারীদের কাপড় ঝুলিয়ে পরার শারঈ সীমা ও উম্মে সালামা (রা.)-এর প্রশ্নের তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর]
পুরুষের পোশাকের ক্ষেত্রে টাখনুর নিচে যাওয়া নিষিদ্ধ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে পা সম্পূর্ণরূপে আবৃত রাখা ওয়াজিব। উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.)-এর এই সুতীক্ষ্ণ প্রশ্নের মাধ্যমে নারীদের পর্দার পূর্ণাঙ্গ সীমা নির্ধারিত হয়েছে যে, তাদের পোশাক মাটি থেকে এক বিঘত অথবা সর্বোচ্চ এক হাত পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখার অনুমতি রয়েছে যাতে চলার সময় পায়ের পাতা বা গোড়ালি প্রকাশিত না হয়ে পড়ে।
٧- حدثنا محمد بن يحيى القطعى نا عبد العزيز بن ربيعة البنانى نا الاعمش عن ابى صالح، عن ابى هريرة رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم كل مولود يولد على الملة، فابواه يهودانه وينصرانه ويشركانه، قيل : يا رسول الله، فمن هلك قبل ذلك قال الله اعلم بما كانوا عاملين به –
[৭. মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আল-ক্বাতী আব্দুল আযীয ইবনে রাবীআ থেকে, তিনি আমাশ থেকে, তিনি আবু সালিহ থেকে এবং তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: প্রতিটি নবজাতক শিশুই ফিতরাত বা দ্বীন-ই-ইসলামের ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতামাতা তাকে ইহুদী বানায়, নাসারা (খ্রিস্টান) বানায় অথবা মুশরিক বানায়। নিবেদন করা হলো: হে আল্লাহর রাসুল! যে শিশু এর পূর্বেই শৈশবে মৃত্যুবরণ করে তাদের পরিণতি কী হবে? তিনি বললেন: তারা বেঁচে থাকলে কী আমল করত তা আল্লাহই সম্যক অবগত।]
শব্দার্থ ও তাহক্বীক্ব (তাহক্বীক্বে কালিমা):
| শব্দরূপ (কালিমা) | মূলধাতু (মাদ্দাহ) | বাব (অধ্যায়) | সিগাহ ও বাহাস | বাংলা অর্থ |
|---|---|---|---|---|
| مَوْلُود | و – ل – د | ضرب | اسم مفعول | নবজাতক শিশু |
| يُهَوِّدَانِهِ | ه – و – د | تفعيل | تثنية مذكر غائب | তারা দুজনে তাকে ইহুদী বানায় |
| يُنَصِّرَانِهِ | ن – ص – ر | تفعيل | تثنية مذكر غائب | তারা দুজনে তাকে নাসারা বানায় |
| هَلَكَ | ه – ل – ك | ضرب | واحد مذكر غائب | মারা গেল / ধ্বংস হলো |
(أ) ما معنى الفطرة لغة واصطلاحا؟
[(ক) ফিতরাত শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী?]
‘ফিতরাত’ (الفطرة) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো সৃষ্টিগত স্বভাব, আদি প্রকৃতি বা জন্মগত শুভ্রতা (الخلقة الأولى والجبّلة السليمة)। শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানবজাতিকে রূহের জগতে ‘আলাসতু বিরাব্বিকুম’ (আমি কি তোমাদের প্রভু নই)-এর যে অকৃত্রিম তাওহীদের স্বীকারোক্তি ও ঈমানের মৌলিক যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, সেই আদি তাওহীদী স্বভাবকেই ‘ফিতরাত’ বলা হয়।
(ب) ما معنى القدر لغة وشرعا؟ وما موقف اهل السنة والجماعة فى الايمان بالقدر؟
[(খ) তাকদীর শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? তাকদীরের ওপর ঈমান আনয়নে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা কী?]
তাকদীরের সংজ্ঞা: তাকদীরের আভিধানিক অর্থ হলো পরিমাপ করা, নির্ধারণ করা। শরীয়তের পরিভাষায় মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্বেই ভূত ও ভবিষ্যতের সমস্ত সৃষ্টি, তাদের কর্ম ও নিয়তি সম্পর্কে আল্লাহর অনাদি অনন্ত জ্ঞান এবং সে অনুযায়ী সবকিছু লিপিবদ্ধ ও নির্ধারিত রাখাকে তাকদীর বলে।
আহলে সুন্নাতের আকিদা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিশ্বাস হলো ভালো ও মন্দ সমস্ত ভাগ্য আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারিত (وَالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى)। তবে মানুষকে আল্লাহ ইচ্ছাশক্তি ও কর্মক্ষমতা (কাসব) দান করেছেন। মানুষ যা করে তা আল্লাহর জানা ও সৃষ্টির অধীনে হলেও মানুষ নিজ ইচ্ছায় পাপ বা পুণ্য অর্জন করে এবং সে অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। জাবরিয়াদের মতো বাধ্যও নয়, আবার ক্বাদারিয়াদের মতো আল্লাহর ক্ষমতা অস্বীকারকারীও নয়; আহলে সুন্নাত এ দুই চরমপন্থার মধ্যবর্তী সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
مجموعة (ب) – খ বিভাগ : তাত্ত্বিক ও ইতিহাস অংশ (মান: ২০ × ১ = ২০)
٨- اكتب ماذا تعلم عن الجامع للامام الترمذى (رح) مفصلا مع بيان تعريف الجامع والسنن؟ ولم يسمى كتابه بالجامع والسنن معا؟
[৮. ইমাম তিরমিযী (রহ.)-এর ‘আল-জামি’ গ্রন্থ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর। জামি ও সুনানের সংজ্ঞা দাও এবং তাঁর গ্রন্থকে একই সাথে জামি ও সুনান কেন বলা হয়?]
ভূমিকা: সিহাহ সিত্তাহ বা হাদীসের প্রামাণ্য ছয়টি গ্রন্থের মধ্যে এক অনন্য সাধারণ ও অতীব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গ্রন্থ হলো ইমাম আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা আত-তিরমিযী (রহ.) কর্তৃক সংকলিত ‘আল-জামি’ আল-কবীর’ বা ‘জামিুত তিরমিযী’। ইলমে হাদীস, ফিকহুল হাদীস, ইলমুল ইলাল এবং বিভিন্ন মাযহাবের মুজতাহিদ ফকীহগণের ইখতিলাফ ও ফতোয়ার পর্যালোচনায় এই গ্রন্থের সমকক্ষ দ্বিতীয় কোনো গ্রন্থ ইসলামি ঐতিহ্যে বিরল।
জামি (الجامع)-এর প্রামাণ্য সংজ্ঞা: হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায় যে মহাগ্রন্থে ইসলামের মৌলিক আটটি প্রধান বিষয়ের হাদীস সামগ্রিকভাবে সংকলিত থাকে তাকে ‘জামি’ বলা হয়। মুহাদ্দিসীন কেরাম এই আটটি মৌলিক বিষয়কে এভাবে বিন্যস্ত করেছেন:
১. আক্বাইদ (العقائد): তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত, তাকদীর ও মালাইকা সংক্রান্ত মৌলিক বিশ্বাস।
২. আহকাম (الأحكام): দৈনন্দিন জীবনের ফিকহী হুকুম-আহকাম, ইবাদত ও মুয়ামালাতের বিধান।
৩. সিয়ার ও মাগাযী (السير والمغازي): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনী ও যুদ্ধাভিযান।
৪. আদাব (الآداب): আখলাক, শিষ্টাচার, সমাজজীবন ও পারস্পরিক ব্যবহারের বিধান।
৫. তাফসীর (التفسير): কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন আয়াতের তাফসীর ও শানে নুযূল।
৬. ফিতান (الفتن): শেষ যামানার সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উপদ্রব এবং পরীক্ষা।
৭. আশরাত বা আলামাতুস সাআহ (أشراط الساعة): কিয়ামতের নিকটবর্তী আলামত ও মহাপ্রলয়ের লক্ষণসমূহ।
৮. মানাক্বিব ও মাআসিব (المناقب والمثالب): আম্বিয়ায়ে কেরাম, সাহাবায়ে কেরাম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মর্যাদা।
সুনান (السنن)-এর প্রামাণ্য সংজ্ঞা: যে হাদীস গ্রন্থে আক্বাইদ বা ইতিহাসের চেয়ে ফিকহী আহকাম ও ব্যবহারিক জীবনের হালাল-হারামের হাদীসসমূহকে প্রাধান্য দিয়ে ফিকহী তারতীবে (যেমন তাহরাত, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্জ, নিকাহ, বাই-বাণিজ্য) সাজানো হয় তাকে ‘সুনান’ বলা হয়।
একই সাথে জামি ও সুনান নামকরণের গভীর রহস্য: ইমাম তিরমিযীর এই অমর সংকলনটির মধ্যে একই সাথে উভয় বৈশিষ্ট্যের অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছে। গ্রন্থটির বাহ্যিক কাঠামো সম্পূর্ণ ফিকহী অধ্যায়সমূহের ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে, যার কারণে একে ‘সুনানুত তিরমিযী’ বলা হয়। আবার এর অভ্যন্তরীণ বিষয়বস্তুর দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় যে এতে আহকামের পাশাপাশি আক্বাইদ, তাফসীর, সিয়ার, আদাব, ফিতান এবং মানাক্বিবসহ জামি গ্রন্থের আটটি মৌলিক বিষয়ের প্রতিটি সুবিন্যস্তভাবে সংকলিত হয়েছে। এ কারণেই মুহাদ্দিসীনগণ একে ‘জামিুত তিরমিযী’ এবং সাধারণ্যে ‘সুনানুত তিরমিযী’ উভয় নামেই অভিহিত করে থাকেন।
গ্রন্থটির ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ও মর্যাদা: শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (রহ.) ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ফিকহী মাসআলার দলিল ও হাদীসের গুণগত মান নির্ধারণে জামিুত তিরমিযী একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কিতাব। ইমাম তিরমিযী নিজে বলেছেন: “আমি যখন এই কিতাব সংকলন শেষ করলাম, তখন হিজায, ইরাক ও খোরাসানের ওলামায়ে কেরামের কাছে তা পেশ করলাম। তাঁরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে এটি গ্রহণ করলেন। যার ঘরে এই কিতাবটি রয়েছে, মনে হবে তার ঘরে যেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) অবস্থান করছেন এবং তিনি কথা বলছেন।”
٩- اكتب مقالة وجيزة حول حياة الامام الترمذى تشتمل على النقاط التالية : (أ) اسمه ونسبه وولادته ونشأته؛ (ب) رحلاته العلمية؛ (ج) قصة ذكاءه وفطنته واشهر شيوخه وتلاميذه؛ (د) ثناء الناس عليه ومناقبه واقوال العلماء عنه ومؤلفاته ووفاته.
[৯. ইমাম তিরমিযী (রহ.)-এর জীবন ও কর্মের ওপর একটি সংক্ষিপ্ত গবেষণা প্রবন্ধ রচনা কর, যা নিম্নোক্ত বিষয়গুলো ধারণ করবে: (ক) নাম, বংশ, জন্ম ও শৈশব; (খ) জ্ঞানার্জনের সফরসমূহ; (গ) স্মরণশক্তি, মেধার বিস্ময়কর ঘটনা, প্রধান উস্তাদ ও ছাত্রবৃন্দ; (ঘ) ওলামায়ে কেরামের প্রশংসা, চারিত্রিক গুণাবলী, রচনাবলী ও ওফাত।]
(ক) নাম, বংশ, জন্ম ও শৈশব: পূর্ণ নাম মুহাম্মদ ইবনে ঈসা ইবনে সাওরাহ ইবনে মূসা ইবনুয যাহহাক আস-সুলামী আল-বুগী আত-তিরমিযী। উপনাম আবু ঈসা। তিনি ২০৯ হিজরীতে আমু দরিয়ার তীরে অবস্থিত বর্তমান উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক ‘তিরমিয’ শহরের নিকটবর্তী ‘বুগ’ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি কুরআন হিফয ও ইলমের প্রতি আত্মনিয়োগ করেন।
(খ) জ্ঞানার্জনের সফর: হাদীস অন্বেষণে তিনি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানকেন্দ্রগুলো ভ্রমণ করেন। তিনি খোরাসান, ইরাকের বাগদাদ, বসরা, কুফা, হিজাযের মক্কা ও মদীনা সফর করেন এবং সমকালীন মুহাদ্দিসীনদের দরবারে দীর্ঘকাল উপস্থিত থেকে সনদসহ হাদীস লিপিবদ্ধ করেন।
(গ) স্মরণশক্তি ও মেধার বিস্ময়কর ঘটনা: ইমাম তিরমিযী ছিলেন প্রখর মুখস্থশক্তির অধিকারী। বর্ণিত আছে, মক্কার পথে এক শায়খের সাথে তাঁর সাক্ষাত হয় যাঁর থেকে তিনি পূর্বে দুটি জুয হাদীস লিখেছিলেন কিন্তু পাণ্ডুলিপি সঙ্গে ছিল না। তিনি একটি সাদা কাগজ হাতে নিয়ে এমনভাবে শুনছিলেন যেন তিনি খাতা দেখে মিলাচ্ছেন। শায়খ সাদা কাগজ দেখে ক্ষুব্ধ হলে ইমাম তিরমিযী স্মৃতি থেকে হুবহু সম্পূর্ণ দুটি খণ্ড নির্ভুলভাবে শুনিয়ে দেন। এতে শায়খ তাঁর বিস্ময়কর মেধা দেখে হতবাক হয়ে যান। তাঁর প্রধান উস্তাদ ছিলেন আমিরুল মুমিনীন ফিল হাদীস ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারী (রহ.), ইমাম মুসলিম (রহ.) এবং ইমাম আবু দাউদ (রহ.)। ইমাম বুখারী নিজে তিরমিযীর প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেছিলেন: مَا انْتَفَعْتَ بِي أَكْثَرَ مِمَّا انْتَفَعْتُ بِكَ (তুমি আমার থেকে যতটা উপকৃত হয়েছ, আমি তোমার থেকে তার চেয়েও বেশি উপকৃত হয়েছি)।
(ঘ) রচনাবলী ও ওফাত: ইমাম তিরমিযীর অমর গ্রন্থাবলীর মধ্যে ‘আল-জামি’’, ‘আশ-শামায়িলুল মুহাম্মাদিয়্যাহ’, ‘কিতাবুল ইলাল’, ‘কিতাবুয যুহদ’ এবং ‘কিতাবুত তারিখ’ জগদ্বিখ্যাত। জীবনের শেষভাগে আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অন্ধ হয়ে যান। ২৭৯ হিজরীর ১৩ই রজব ৭০ বছর বয়সে এই মহান ইমাম নিজ জন্মভূমি তিরমিযের বুগ গ্রামে ইন্তেকাল করেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. কামিল ১ম বর্ষ হাদীস ২য় পত্রের বিষয় কোড ও নাম কী?
কামিল ১ম বর্ষ হাদীস দ্বিতীয় পত্রের বিষয় নাম হলো ‘সুনানুত তিরমিযী ওয়া শামায়িলুত তিরমিযী’ (Sunan at-Tirmidhi wa Shamailut Tirmidhi 2nd Paper) এবং এর কোড হলো ৬১১১০২ (611102)।
২. সুনানুত তিরমিযী ও শামায়িলুত তিরমিযী পরীক্ষার মানবণ্টন কীরূপ?
মোট নম্বর ১০০ এবং সময় ৪ ঘণ্টা। ‘ক’ বিভাগ হতে ৭টি হাদীসের মধ্য থেকে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় (৪ × ২০ = ৮০ নম্বর) এবং ‘খ’ বিভাগ হতে ২টি নিবন্ধমূলক প্রশ্নের মধ্য থেকে ১টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় (১ × ২০ = ২০ নম্বর)।
৩. ইমাম তিরমিযীর গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্য কী?
ইমাম তিরমিযী প্রতিটি হাদীসের নিচে ফকীহগণের মাযহাব, কোন কোন সাহাবী এই অধ্যায়ে হাদীস বর্ণনা করেছেন (وفي الباب عن فلان), এবং হাদীসের স্তরভেদ (সহীহ, হাসান, গরীব) সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যা অন্য কোনো কিতাবে পাওয়া যায় না।
৪. শামায়িলুত তিরমিযী গ্রন্থে কী বিষয় সংকলিত হয়েছে?
শামায়িলুত তিরমিযী গ্রন্থে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র দৈহিক গঠন, সুরত, পোশাক-পরিচ্ছদ, পানাহার, স্বভাব-চরিত্র, ইবাদত-বন্দেগী ও দৈনন্দিন জীবনের অনুপম সুন্নতসমূহ অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহীভাবে সংকলিত হয়েছে।
৫. হাদীসের স্তর মূল্যায়নে ইমাম তিরমিযীর ‘হাসান’ পরিভাষার ভূমিকা কী?
ইমাম তিরমিযীই সর্বপ্রথম ‘হাসান’ (الحسن) পরিভাষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করেন এবং সহীহ ও যয়ীফের মধ্যবর্তী গ্রহণযোগ্য হাদীসের একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন।
৬. কামিল ২য় পত্রে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তির উপায় কী?
হাদীসের পূর্ণাঙ্গ তরজমার সাথে তাহক্বীক্বে কালিমার ছক তৈরি করা, ফকীহদের মাযহাব দলিলের সাথে তুলনা করা এবং ইমাম তিরমিযীর ফিকহী মন্তব্যের যথার্থ তাৎপর্য উপস্থাপন করার মাধ্যমে পরীক্ষায় এ-প্লাস অর্জন করা সম্ভব।

