কামিল (স্নাতকোত্তর) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা, ২০২৪
বিষয়: দিরাসাতুত তাফসীর ওয়া উসূলিহি (Dirasatut Tafsir wa Usulihi) — ৭ম পত্র [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
বিষয় কোড: ৬১১১০৭ | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (أ) وعن ثلاثة من مجموعة (ب) وعن أربعة من مجموعة (ج) وعن ثلاثة من مجموعة (د) وعن اثنين من مجموعة (هـ) وعن اثنين من مجموعة (و) –
কামিল (মাস্টার্স) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা ২০২৪-এর ‘দিরাসাতুত তাফসীর ওয়া উসূলিহি’ (Dirasatut Tafsir wa Usulihi – বিষয় কোড: ৬১১১০৭) বিষয়ের মূল প্রশ্নপত্র ও প্রতিটি বিভাগের প্রামাণ্য একাডেমিক সমাধান নিচে সন্নিবেশিত করা হলো। বিশ্ববিখ্যাত অলঙ্কারপূর্ণ তাফসীরগ্রন্থ ‘তাফসীরে কাশশাফ’ (আল্লামা যামাখশারী), গভীর দর্শন ও ভাষাতাত্ত্বিক গ্রন্থ ‘তাফসীরে বায়যাবী’ (ইমাম কাজী বায়যাবী) এবং উলূমুল কুরআনের মূলনীতি (উসূলুত তাফসীর)-এর সমন্বয়ে প্রস্তুতকৃত এ সমাধানটি কামিল পরীক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে।
প্রশ্নকাঠামো ও নম্বর বণ্টন:
১. ‘ক’ বিভাগ (তাফসীরে কাশশাফ – আয়াত ব্যাখ্যা): ৮টি আয়াতাংশ হতে ৪টির উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ৫ × ৪ = ২০)
২. ‘খ’ বিভাগ (তাফসীরে কাশশাফ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন): ৬টি প্রশ্ন হতে ৩টির উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ৫ × ৩ = ১৫)
৩. ‘গ’ বিভাগ (তাফসীরে বায়যাবী – আয়াত ব্যাখ্যা): ৮টি আয়াতাংশ হতে ৪টির উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ৫ × ৪ = ২০)
৪. ‘ঘ’ বিভাগ (তাফসীরে বায়যাবী – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন): ৫টি প্রশ্ন হতে ৩টির উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ৫ × ৩ = ১৫)
৫. ‘ঙ’ বিভাগ (উসূলুত তাফসীর – বিশদ প্রশ্ন): ৪টি প্রশ্ন হতে ২টির উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ১০ × ২ = ২০)
৬. ‘চ’ বিভাগ (উসূলুত তাফসীর – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন): ৪টি প্রশ্ন হতে ২টির উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ৫ × ২ = ১০)
(পরীক্ষার্থীদের শতভাগ প্রস্তুতির সুবিধার্থে সকল বিভাগের প্রতিটি প্রশ্ন ও আয়াতের বিশদ সমাধান নিচে দেওয়া হলো)।
١- مجموعة (أ) – تفسير الكشاف : ترجم الآيات التالية مع التفسير كما جاء فى تفسير الكشاف :
(أ) اهدنا الصراط المستقيم – صراط الذين انعمت عليهم – غير المغضوب عليهم ولا الضالين –
(ب) ان الذين كفروا لن تغنى عنهم اموالهم ولا اولادهم من الله شيئا – وأولئك هم وقود النار – كدأب ال فرعون والذين من قبلهم كذبوا باياتنا فأخذهم الله بذنوبهم والله شديد العقاب –
(ج) لا يتخذ المؤمنون الكافرين اولياء من دون المؤمنين – ومن يفعل ذلك فليس من الله فى شى الا ان تتقوا منهم تقة – ويحذركم الله نفسه والى الله المصير –
(د) قل ان كنتم تحبون الله فاتبعونى يحببكم الله ويغفر لكم ذنوبكم والله غفور رحيم – قل اطيعوا الله واطيعوا الرسول – فان تولوا فان الله لا يحب الكافرين –
(هـ) واذ قالت الملئكة يا مريم ان الله اصطفاك وطهرك واصطفاك على نساء العالمين – يا مريم اقنتى لربك واسجدى واركعى مع الراكعين –
(و) أفغير دين الله يبغون وله أسلم من في السماوات والأرض طوعا وكرها وإليه يرجعون – قل امنا بالله وما انزل علينا وما انزل على ابراهيم و اسماعيل و اسحاق ويعقوب والاسباط وما اوتى موسى و عيسى والنبيون من ربهم لا نفرق بين احد منهم و نحن له مسلمون –
(ز) لن تنالوا البر حتى تنفقوا مما تحبون وما تنفقوا من شى فان الله به عليم – كل الطعام كان حلا لبنى اسرائيل الا ما حرم اسرائيل على نفسه من قبل ان تنزل التوراة – قل فأتوا بالتوراة فاتلوها ان كنتم صادقين –
(ح) ان اول بيت وضع للناس للذى ببكة مباركا وهدى للعالمين – فيه ايات بينات مقام ابراهيم ومن دخله كان امنا – ولله على الناس حج البيت من استطاع اليه سبيلا – ومن كفر فإن الله غنى عن العالمين –
[১. ‘ক’ বিভাগ – তাফসীরে কাশশাফ: তাফসীরে কাশশাফের আলোকে নিম্নের আয়াতসমূহের তরজমা ও বিশদ তাফসীর লিখ: (ক) সূরা ফাতিহার শেষাংশ (আয়াত ৫-৭); (খ) সূরা আলে ইমরানের কাফিরদের পরিণতি ও ফেরাউনের দৃষ্টান্ত (আয়াত ১০-১১); (গ) কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধকরণ ও তাক্বিয়্যার বিধান (আয়াত ২৮); (ঘ) আল্লাহর ভালোবাসা ও রাসূলের আনুগত্য (আয়াত ৩১-৩২); (ঙ) মারইয়াম (আ.)-এর মর্যাদা ও ইবাদতের নির্দেশ (আয়াত ৪২-৪৩); (চ) আল্লাহর দ্বীনের প্রতি বিশ্বজগতের আত্মসমর্পণ (আয়াত ৮৩-৮৪); (ছ) প্রিয় বস্তু দান ছাড়া পুণ্যলাভ অসম্ভব ও বনী ইসরাঈলের খাদ্য হারামকরণ (আয়াত ৯২-৯৩); (জ) পৃথিবীর আদি গৃহ কাবা শরীফ ও হজের বিধান (আয়াত ৯৬-৯৭)।]
তাফসীরে কাশশাফের আলোকে নির্বাচিত আয়াতের তাহকীক ও তাফসীর:
(ক) সূরা ফাতিহা (اهدنا الصراط المستقيم…):
– অনুবাদ: “আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। তাদের পথ, যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন; তাদের পথ নয় যারা আপনার ক্রোধে নিপতিত হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।”
– কাশশাফের তাহকীক ও বালাগত: আল্লামা যামাখশারী (রহ.) বলেন, هدنا অর্থ হলো أرشدنا وثبتنا (আমাদের পথ দেখান এবং সত্যের ওপর অবিচল রাখুন)। কেননা একজন মুমিন প্রতিনিয়ত হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য মুখাপেক্ষী। صراط الذين انعمت عليهم হলো بدل বা বদলুল কুল্ল, যা বাক্যে বিশেষ প্রাঞ্জলতা এনে দেয়। ‘আল-মাগদূবি আলাইহিম’ দ্বারা অভিশপ্ত ইয়াহুদী জাতিকে এবং ‘আদ-দ্বাল্লীন’ দ্বারা সত্যত্যাগী খ্রিষ্টানদের বোঝানো হয়েছে। বাক্যটিতে বদদোয়া বা অভিশাপের রূপটি এমন সুন্দর কাঠামোর ভেতর বিন্যস্ত হয়েছে যা আরবী অলঙ্কার শাস্ত্রের চরম পরাকাষ্ঠা।
(গ) কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধকরণ (لا يتخذ المؤمنون الكافرين اولياء…):
– অনুবাদ: “মুমিনগণ যেন মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফিরদের অভিভাবক ও বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে। আর যে এমনটি করবে, আল্লাহর সাথে তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না; তবে যদি তোমরা তাদের থেকে আত্মরক্ষা করতে চাও (তাক্বিয়্যা অবলম্বন কর)। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর নিজের ব্যাপারে সতর্ক করছেন এবং আল্লাহর নিকটই সকলের প্রত্যাবর্তন।”
– কাশশাফের তাফসীর ও তাক্বিয়্যার শারঈ বিধান: যামাখশারী ব্যাখ্যা করেন যে, ‘মুওয়ালাত’ বা অন্তরঙ্গ ভালোবাসা কেবল মুমিনের সাথেই শোভা পায়। কাফিরদের সাথে দ্বীনী স্বার্থবিরোধী মৈত্রী ঈমানের পরিপন্থী। তবে الا ان تتقوا منهم تقة হলো استثناء منقطع—অর্থাৎ যদি কোনো মুসলিম দুর্বল অবস্থায় কাফিরদের জান-মালের চরম হুমকির মুখে পড়ে, তবে জান বাঁচানোর স্বার্থে মুখে আপাত বন্ধুত্ব বা নমনীয়তা প্রকাশ করা জায়েয (যাকে তাক্বিয়্যা বলে), কিন্তু অন্তরে কুফরির প্রতি ঘৃণা বজায় রাখা অপরিহার্য।
(ঘ) আল্লাহর ভালোবাসা ও রাসূলের আনুগত্য (قل ان كنتم تحبون الله فاتبعونى…):
– অনুবাদ: “বলুন! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার অনুসরণ কর; তবেই আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
– কাশশাফের বালাগত: যামাখশারী উল্লেখ করেন, এ আয়াতটিকে আয়াহতুল ইমতিহান (পরীক্ষার আয়াত) বলা হয়। কিছু মানুষ মুখে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার দাবি করত; আল্লাহ এ আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট প্রমাণ করে দিলেন যে, ভালোবাসার একমাত্র কষ্টিপাথর ও পূর্বশর্ত হলো বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুগমন ও বাস্তবায়ন। রাসূলের সুন্নাহ বর্জন করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।
(জ) কাবা ঘরের মর্যাদা ও হজ্বের বিধান (ان اول بيت وضع للناس…):
– অনুবাদ: “নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহটি নির্মিত হয়েছিল তা বাক্কায় (মক্কায়) অবস্থিত; যা কল্যাণময় এবং বিশ্বজগতের জন্য পথপ্রদর্শক। তাতে রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ—মাক্বামে ইবরাহীম; এবং যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করে সে নিরাপদ হয়ে যায়। আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ গৃহের হজ্ব করা মানুষের ওপর ওয়াজিব—যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রয়েছে।”
– কাশশাফের ফিকহী ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: যামাখশারী প্রমাণ করেছেন যে ‘মাক্কা’ ও ‘বাক্কা’ একই স্থানের দুটি নাম; বাক্কা বলা হয়েছে ভিড়ের কারণে মানুষের পরস্পরের ধাক্কাধাক্কির কারণে (من البكّ وهو الازدحام)। এটি পৃথিবীর প্রথম উপাসনালয় যা বায়তুল মুকাদ্দাসের ৪০ বছর পূর্বে নির্মিত হয়েছিল। من استطاع اليه سبيلا হলো হজ্ব ফরজ হওয়ার অকাট্য দলীল, যেখানে ‘ইস্তিতাআত’ বলতে পথখরচ, নিরাপত্তা ও শারীরিক সুস্থতার বিধান বোঝানো হয়েছে।
٢- مجموعة (ب) – الأسئلة الموجزة : أجب عن ثلاثة من الأسئلة التالية :
(أ) ما الاسم الكامل لتفسير الكشاف؟ ثم اكتب خصائص تفسير الكشاف –
(ب) كم اية فى سورة الفاتحة؟ هل التسمية اية من سورة الفاتحة ام لا؟ بين اقوال العلماء فيه –
(ج) تحدث عن قصة زكريا عليه السلام فى ضوء سورة ال عمران –
(د) ما معنى المباهلة؟ اذكر قصة المباهلة فى زمن رسول الله صلى الله عليه وسلم فى ضوء القران الكريم –
(هـ) ما معنى الرحمن؟ وما الفرق بين الرحمن والرحيم؟
(و) اشرح قوله تعالى : ان مثل عيسى عند الله كمثل ادم –
[২. ‘খ’ বিভাগ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (কাশশাফ): (ক) তাফসীরে কাশশাফের পূর্ণ নাম কী এবং এর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ লিখ; (খ) সূরা ফাতিহার আয়াতসংখ্যা কত এবং তাসমিয়াহ (বিসমিল্লাহ) কি ফাতিহার আয়াত কি-না? ফকীহদের মতভেদ লিখ; (গ) সূরা আলে ইমরানের আলোকে হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর প্রার্থনা ও ইয়াহইয়া (আ.)-এর জন্মের ঘটনা লিখ; (ঘ) মুবাহালাহ অর্থ কী? সীরাত ও কুরআনের আলোকে মুবাহালার ঐতিহাসিক ঘটনা লিখ; (ঙ) রহমান-এর অর্থ কী এবং রহমান ও রহীম-এর পার্থক্য কী? (চ) “নিশ্চয় আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের মতো”—আয়াতের তাফসীর লিখ।]
(ক) তাফসীরে কাশশাফের পূর্ণ নাম ও অনন্য বৈশিষ্ট্য:
– পূর্ণ নাম: الكشاف عن حقائق غوامض التنزيل وعيون الأقاويل في وجوه التأويل (আল-কাশশাফু আন হাক্বায়িক্বি গাওয়ায়েদিত তানযীল ওয়া উয়ূনিল আক্বাবীলি ফী ওজূহিত তা’বীল)। রচয়িতা আল্লামা আবুল কাসিম মাহমুদ ইবনে উমর আয-যামাখশারী (ওফাত ৫৩৮ হি.)।
– অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. বালাগাত ও অলঙ্কার শাস্ত্রের শীর্ষগ্রন্থ: ইলমুল মা’আনী ও বায়ান-এর আলোকে কুরআনের অনুপম লালিত্য উন্মোচনে এটি মুসলিম বিশ্বের অপ্রতিদ্বন্দ্বী গ্রন্থ।
২. প্রশ্নোত্তর শৈলী: فان قلت … قلت (যদি তুমি বল… আমি উত্তরে বলব)—এই চমৎকার দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে গভীর তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়েছে।
৩. তবে সতর্কতা: যামাখশারী মু’তাযিলা মতাদর্শী হওয়ায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে মু’তাযিলা আক্বীদার ছাপ রয়েছে, যা পরবর্তীতে ইমাম ইবনুল মুনীর ও কাজী বায়যাবী সুনানসম্মতভাবে সংশোধন করেছেন।
(খ) সূরা ফাতিহার আয়াত ও বিসমিল্লাহর শারঈ বিধান:
সূরা ফাতিহার আয়াত সংখ্যা সর্বসম্মতিক্রমে ৭টি (سبعا من المثاني)। তবে বিসমিল্লাহ ফাতিহার অংশ কি-না তা নিয়ে ফকীহদের মতভেদ রয়েছে:
১. ইমাম শাফেঈ (রহ.): বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম হলো সূরা ফাতিহার প্রথম পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র আয়াত। ফলে নামাজে বিসমিল্লাহ পড়া ওয়াজিব।
২. হানাফী মাযহাব (ইমাম আবু হানীফা রহ.): বিসমিল্লাহ সূরা ফাতিহা বা অন্য কোনো সূরার নিজস্ব আয়াত নয়, বরং দুই সূরার মাঝে পার্থক্যকারী ও বরকতের জন্য অবতীর্ণ কুরআনের একটি স্বতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ আয়াত। এজন্য নামাজে ইমাম নীরবে বিসমিল্লাহ পাঠ করবেন।
(ঘ) মুবাহালাহ ও ঐতিহাসিক ঘটনা:
– অর্থ: ‘মুবাহালাহ’ (المباهلة) অর্থ পরস্পরে আল্লাহর লানত বা অভিশাপ কামনা করা। যখন সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বে কোনো পক্ষ যুক্তি মানতে নারাজ হয়, তখন উভয় পক্ষ নিজ পরিবার নিয়ে ময়দানে এসে দো’আ করে—”মিথ্যুকের ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক।”
– ঐতিহাসিক ঘটনা: নবম হিজরীতে নাজরানের খ্রিষ্টান প্রতিনিধিদল মদিনায় এসে হযরত ঈসা (আ.)-কে খোদার পুত্র বলে গোঁড়ামি করতে থাকে। তখন আল্লাহ নাযিল করেন: فمن حاجك فيه من بعد ما جاءك من العلم فقل تعالوا ندع أبناءنا وأبناءكم… রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে সাথে নিয়ে ময়দানে উপস্থিত হন। বিশ্বনবীর চেহারার নবুওয়তী তেজ দেখে খ্রিষ্টান বিশপরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মুবাহালাহ বর্জন করে বার্ষিক জিযিয়া কর দিয়ে সন্ধি করতে বাধ্য হয়।
(ঙ) রহমান ও রহীম-এর সূক্ষ্ম পার্থক্য:
উভয় নামই আল্লাহর ‘রহমত’ গুণবাচক নাম। তবে ‘আর-রহমান’ হলো বাবে ফা’লান (فعلان) যা পূর্ণতা ও প্রাচুর্য প্রকাশ করে; আর ‘আর-রহীম’ হলো ফাঈল (فعيل) যা অবিরাম ধারাবাহিকতা বোঝায়। ফকীহদের মতে: রহমান হলো সাধারণ রহমত—যিনি দুনিয়াতে মুমিন ও কাফির নির্বিশেষে সকল সৃষ্টিকে রিযিক্ব ও জীবন দিয়ে অনুগ্রহ করেন। আর রহীম হলো বিশেষ রহমত—যিনি আখিরাতে কেবল ঈমানদার বান্দাদের ক্ষমার মাধ্যমে জান্নাত দিয়ে অনুগ্রহ করবেন।
٣- مجموعة (ج) – تفسير البيضاوى : ترجم الآيات التالية مع التفسير كما جاء فى تفسير البيضاوى :
(أ) ختم الله على قلوبهم وعلى سمعهم وعلى ابصارهم غشاوة ولهم عذاب عظيم – ومن الناس من يقول امنا بالله وباليوم الاخر وما هم بمؤمنين –
(ب) يا ايها الناس اعبدوا ربكم الذى خلقكم والذين من قبلكم لعلكم تتقون – الذى جعل لكم الارض فراشا والسماء بناء وانزل من السماء ماء فاخرج به من الثمرات رزقا لكم، فلا تجعلوا لله اندادا وانتم تعلمون –
(ج) واذ قال ربك للملائكة انى جاعل فى الارض خليفة قالوا اتجعل فيها من يفسد فيها ويسفك الدماء ونحن نسبح بحمدك ونقدس لك قال انى اعلم ما لا تعلمون –
(د) أتأمرون الناس بالبر وتنسون انفسكم وانتم تتلون الكتاب افلا تعقلون – واستعينوا بالصبر والصلوة وانها لكبيرة الا على الخاشعين –
(هـ) بلى من كسب سيئة واحاطت به خطيئته فاولئك اصحاب النار، هم فيها خالدون – والذين امنوا وعملوا الصالحات اولئك اصحاب الجنة هم فيها خالدون –
(و) ما ننسخ من اية او ننسها نأت بخير منها او مثلها – الم تعلم ان الله على كل شىء قدير – الم تعلم ان الله له ملك السموت والارض وما لكم من دون الله من ولى ولا نصير –
(ز) ومن اظلم ممن منع مساجد الله ان يذكر فيها اسمه وسعى فى خرابها، اولئك ما كان لهم ان يدخلوها الا خائفين، لهم فى الدنيا خزى ولهم فى الاخرة عذاب عظيم –
(ح) واذ ابتلى ابراهيم ربه بكلمات فاتمهن، قال انى جاعلك للناس اماما، قال ومن ذريتى، قال لا ينال عهدى الظالمين – واذ جعلنا البيت مثابة للناس وامنا، واتخذوا من مقام ابراهيم مصلى وعهدنا الى ابراهيم واسماعيل ان طهرا بيتى للطائفين والعاكفين والركع السجود –
[৩. ‘গ’ বিভাগ – তাফসীরে বায়যাবী: তাফসীরে বায়যাবীর আলোকে নিম্নের আয়াতসমূহের তরজমা ও গভীর দার্শনিক ও নাহবী তাফসীর লিখ: (ক) কাফিরদের অন্তরে মোহর ও মুনাফিকদের দ্বিমুখী চরিত্র (সূরা বাকারা: ৭-৮); (খ) তাওহীদের সর্বজনীন আহ্বান ও সৃষ্টির নিদর্শন (আয়াত ২১-২২); (গ) মানব সৃষ্টি ও খিলাফতের ঐতিহাসিক ঘোষণা (আয়াত ৩০); (ঘ) সৎকাজের আদেশ ও আত্মবিস্মৃতির ভর্ৎসনা এবং সবর-সালাত দ্বারা সাহায্য প্রার্থনা (আয়াত ৪৪-৪৫); (ঙ) পাপাচারে নিমজ্জিতদের শাস্তি ও মুমিনদের জান্নাত (আয়াত ৮১-৮২); (চ) নাসখ-এর বাস্তবতা ও আল্লাহর সার্বভৌম কুদরত (আয়াত ১০৬-১০৭); (ছ) মসজিদ ধ্বংসকারীদের শাস্তি ও মহা অপমানের ঘোষণা (আয়াত ১১৪); (জ) ইবরাহীম (আ.)-এর পরীক্ষা ও কা’বার পবিত্রতা রক্ষা (আয়াত ১২৪-১২৫)।]
তাফসীরে বায়যাবীর আলোকে নির্বাচিত আয়াতের দার্শনিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ:
(ক) কাফিরদের মোহর ও মুনাফিক চরিত্র (ختم الله على قلوبهم…):
– অনুবাদ: “আল্লাহ তাদের অন্তরে ও তাদের শ্রবণে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তাদের চোখের ওপর রয়েছে পর্দা; আর তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি। আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা বলে আমরা আল্লাহ ও পরকালে ঈমান এনেছি, অথচ তারা আদৌ মুমিন নয়।”
– বায়যাবীর গভীর তাফসীর: ইমাম কাযী বায়যাবী (রহ.) মু’তাযিলাদের খণ্ডন করে আহলুস সুন্নাহর আক্বীদা প্রতিষ্ঠা করেন যে, মোহর মেরে দেওয়া আল্লাহর তাকদীর ও কুদরতের সৃষ্টি। তবে কাফিররা যখন তাদের ইচ্ছাশক্তি (ইখতিয়ার) ব্যবহার করে সত্যকে বারবার প্রত্যাখ্যান করে হঠকারিতা করে, তখন শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তাদের অন্তরে সত্য গ্রহণের যোগ্যতা চিরতরে বন্ধ করে দেন। ومن الناس من يقول দ্বারা মুনাফিকদের চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের মুখ ও অন্তরের মাঝে বিপরীতমুখী সংঘাত বিদ্যমান।
(গ) মানব সৃষ্টি ও ফেরেশতাদের প্রশ্ন (واذ قال ربك للملائكة…):
– অনুবাদ: “আর স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন—নিশ্চয় আমি জমিনে একজন প্রতিনিধি (খলীফা) সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। তারা বলল, আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে বিপর্যয় ঘটাবে এবং রক্তপাত করবে? অথচ আমরাই তো আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করি এবং আপনার মহিমা কীর্তন করি। তিনি বললেন, নিশ্চয় আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।”
– বায়যাবীর তাফসীর: ‘খলীফা’ হলো আল্লাহর আহকাম জারি করার প্রতিনিধি। ফেরেশতাদের উক্তি কোনো অহংকার বা আপত্তি ছিল না, বরং বিস্ময় প্রকাশ ও হেকমত জানার আরজি ছিল; কারণ তারা পূর্ববর্তী জিন জাতির রক্তপাতের ইতিহাস প্রত্যক্ষ করেছিল। আল্লাহ তা’আলা আদমকে সৃষ্টি করে আসমা (বস্তুনিচয়ের নাম ও জ্ঞান) শিক্ষা দিয়ে ফেরেশতাদের ওপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন।
(চ) আয়াতের নাসখ বা রহিতকরণের বিধান (ما ننسخ من اية او ننسها…):
– অনুবাদ: “আমি কোনো আয়াত রহিত করলে কিংবা তা বিস্মৃত করিয়ে দিলে, তার চেয়ে উত্তম কিংবা তার সমমানের কোনো আয়াত নিয়ে আসি। তুমি কি জানো না যে আল্লাহ সর্ববিষয়ে পরাক্রমশালী?”
– বায়যাবীর বিশ্লেষণ: নাসখ (النسخ) অর্থ এক শারঈ বিধানের মেয়াদ সমাপ্ত করে তদস্থলে অপর শারঈ বিধান প্রতিস্থাপন করা। বায়যাবী প্রমাণ করেছেন যে নাসখ কোনো ভুল সংশোধন নয়, বরং মানবজাতির রুচি ও সময়ের প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে মহান হাকীমের উপযুক্ত বিধান প্রণয়নের এক চিরন্তন প্রজ্ঞাময় কৌশল।
٤- مجموعة (د) – الأسئلة الموجزة : أجب عن ثلاثة من الأسئلة التالية :
(أ) اكتب نبذة من حياة صاحب تفسير البيضاوى ثم بين مزايا تفسيره مفصلا –
(ب) ما معنى الكفر والنفاق؟ ثم بين علامات المنافقين فى ضوء القران والحديث –
(ج) تحدث عن قصة خلق ادم وحواء عليهما السلام وهبوطهما من الجنة الى الدنيا فى ضوء سورة البقرة –
(د) من هم المتقون؟ اذكر اوصافهم فى ضوء القران الكريم –
(هـ) اشرح قوله تعالى : “صبغة الله – ومن أحسن من الله صبغة” –
[৪. ‘ঘ’ বিভাগ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (বায়যাবী): (ক) তাফসীরে বায়যাবীর রচয়িতার সংক্ষিপ্ত জীবনী ও তাঁর তাফসীরের বৈশিষ্ট্যসমূহ লিখ; (খ) কুফর ও নিফাক্ব-এর অর্থ এবং কুরআন ও হাদীসের আলোকে মুনাফিকদের আলামত লিখ; (গ) সূরা বাকারার আলোকে আদম ও হাওয়া (আ.)-এর সৃষ্টি ও পৃথিবীতে আগমনের ঘটনা লিখ; (ঘ) মুত্তাক্বী কারা? কুরআন অনুযায়ী তাদের বৈশিষ্ট্য লিখ; (ঙ) “আল্লাহর রঙে রঙিন হও; আল্লাহর রঙের চেয়ে কার রঙ উত্তম হতে পারে?”—আয়াতের ব্যাখ্যা দাও।]
(ক) ইমাম কাযী বায়যাবীর জীবনী ও তাফসীরের বৈশিষ্ট্য:
– নাম ও পরিচিতি: ইমাম নাসিরুদ্দীন আবু সাঈদ আব্দুল্লাহ ইবনে উমর আল-বায়যাবী আশ-শাফেঈ। তিনি ইরানের শিরাজের অন্তর্গত বায়যা নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন এবং দীর্ঘদিন শিরাজের প্রধান বিচারপতির (কাযিউল কুযাত) দায়িত্ব পালন করেন। ৬৮৫ বা ৬৯১ হিজরীতে তাবরীযে ইন্তেকাল করেন।
– তাফসীরের নাম: أنوار التنزيل وأسرار التأويل (আনওয়ারুত তানযীল ওয়া আসরারুত তা’বীল)।
– বৈশিষ্ট্যসমূহ: এটি কাশশাফের সারসংক্ষেপ, তবে এতে যামাখশারীর মু’তাযিলা বিভ্রান্তিগুলোকে সুন্নী আশ’আরী আক্বীদা অনুযায়ী সংশোধন করা হয়েছে। এতে নাহু, বালাগাত, কিরাআত এবং ফিকহী ইস্তিম্বাতের অপূর্ব সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ সমাবেশ ঘটেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি বিশ্বখ্যাত সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত।
(খ) কুফর ও নিফাক্ব-এর পরিচয় এবং মুনাফিকের আলামত:
– কুফর (الكفر): আভিধানিক অর্থ ঢেকে রাখা; পারিভাষিক অর্থে ইসলামের কোনো একটি মৌলিক বিশ্বাসকে জেনে-শুনে অস্বীকার করা।
– নিফাক্ব (النفاق): মুখে ঈমানের দাবি করা কিন্তু অন্তরে কুফর লালন করে দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করা।
– কুরআন ও হাদীসে মুনাফিকের আলামত: কুরআনে বলা হয়েছে—তারা নামাজে অলসভাবে দাঁড়ায় এবং মানুষকে দেখায় (সূরা নিসা)। আর হাদীসে রাসূল (সা.) বলেন: “মুনাফিকের লক্ষণ চারটি—কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখলে খেয়ানত করে এবং বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল গালিগালাজ করে।”
(ঘ) মুত্তাক্বীনদের কুরআনিক বৈশিষ্ট্য:
সূরা বাকারার শুরুতে আল্লাহ তা’আলা মুত্তাক্বীদের ৫টি প্রধান বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন:
১. গায়েবের ওপর ঈমান: আল্লাহ, ফেরেশতা, আখিরাত ইত্যাদি অদেখা সত্যকে কায়মনোবাক্যে বিশ্বাস করা।
২. নামাজ কায়েম করা: শর্ত ও রুকনসমূহ মেনে নিয়মিত সালাত প্রতিষ্ঠা করা।
৩. আল্লাহর পথে ইনফাক্ব: নিজের উপার্জিত হালাল রিযিক্ব হতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করা।
৪. আসমানী কিতাবে ঈমান: পবিত্র কুরআন এবং পূর্ববর্তী সকল আসমানী কিতাবের প্রতি ঈমান রাখা।
৫. আখিরাতের ওপর এক্বীন: পরকাল, হিসাব-নিকাশ, জান্নাত ও জাহান্নামের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা।
(ঙ) “স্বিবগাতুল্লাহ” (صبغة الله)-এর তাফসীর:
খ্রিষ্টানদের একটি ধর্মীয় প্রথা ছিল—যখন কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করত, তখন তারা হলুদ রঙের পানিতে শিশুকে চুবিয়ে বলত, “এখন সে প্রকৃত খ্রিষ্টান হলো।” একে তারা ব্যাপটিজম বা দীক্ষাস্নান বলত। আল্লাহ তা’আলা তাদের এই কৃত্রিম প্রথার রদ করে ইরশাদ করেন: আসল রঙ কোনো বাহ্যিক পানির রঙ নয়, বরং তা হলো ‘স্বিবগাতুল্লাহ’—আল্লাহর রঙ অর্থাৎ তাওহীদ, ফিতরাত ও ইসলামের পবিত্র দ্বীন। এই ঈমানী রঙেই মানবাত্মার প্রকৃত সৌন্দর্য বিকশিত হয়।
٥- مجموعة (هـ) – اصول التفسير (الاسئلة المفصلة) : اجب عن اثنين من الأسئلة التالية :
(أ) اذكر اقوال العلماء فى اول ما نزل من الايات والسور من القران الكريم مع بيان الصحيح منها مدللا –
(ب) ما اسباب النزول؟ وما اهميتها؟ ثم اذكر فوائد اسباب النزول مفصلا –
(ج) ما المعجزة؟ و كم قسما لها؟ بين وجوه إعجاز القران مفصلا –
(د) اذكر القواعد المهمة التى يحتاج إليها المفسر لتفسير القران –
[৫. ‘ঙ’ বিভাগ – উসূলুত তাফসীর (বিশদ প্রশ্ন): যে কোনো দুটির পূর্ণাঙ্গ উত্তর দাও: (ক) কুরআনের সর্বপ্রথম নাযিলকৃত আয়াত ও সূরা সম্পর্কে উলামাদের মতামত এবং দলীলসহ বিশুদ্ধ মতটি বর্ণনা কর; (খ) শানে নুযূল কী এবং এর গুরুত্ব ও ফায়দাসমূহ বিস্তারিত লিখ; (গ) মু’জিযা কাকে বলে ও এর প্রকারভেদ কী? কুরআনের মু’জিযা হওয়ার দিকসমূহ (উজূহুল ই’জায) আলোচনা কর; (ঘ) কুরআন তাফসীর করার ক্ষেত্রে একজন মুফাসসিরের আবশ্যকীয় নীতি ও যোগ্যতাসমূহ লিখ।]
(ক) কুরআনের প্রথম নাযিলকৃত আয়াত ও সূরা সংক্রান্ত পর্যালোচনা:
মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণের মাঝে ৪টি মত পাওয়া যায়:
১. সূরা আলাক্ব-এর প্রথমাংশ (اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ): হেরা গুহায় জিবরাঈল (আ.) কর্তৃক সর্বপ্রথম ৫টি আয়াত নাযিল হয়। এটিই জমহুর উম্মাহর সর্বসম্মত ও চূড়ান্ত বিশুদ্ধতম মত (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ওহী)।
২. সূরা মুদ্দাসসির (يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ): হযরত জাবির (রা.)-এর মত। তবে ফকীহগণ সমন্বয় করেছেন যে, এটি ছিল ওহী সাময়িক স্থগিত থাকার (ফাতরাতুল ওহী) পর সর্বপ্রথম নাযিলকৃত সূরা।
৩. সূরা ফাতিহা: সর্বাঙ্গীন পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে সর্বপ্রথম নাযিল হয়েছে।
৪. বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম: প্রতিটি সূরার শুরুতে অবতীর্ণ হওয়ার বিচারে প্রথম।
– সিদ্ধান্ত: আয়াত হিসেবে সূরা আলাক্বের প্রথম ৫ আয়াতই সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী।
(খ) আসবাবুন নুযূল (শান-ই নুযূল) ও এর অসীম গুরুত্ব:
– সংজ্ঞা: যে বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনা, প্রেক্ষাপট বা কোনো প্রশ্নের উত্তরের প্রেক্ষিতে পবিত্র কুরআনের কোনো এক বা একাধিক আয়াত নাযিল হয়েছিল, তাকে ‘আসবাবুন নুযূল’ বা শানে নুযূল বলে।
– গুরুত্ব ও ফায়দা:
১. আয়াতের প্রকৃত মর্মার্থ উপলব্ধি: প্রেক্ষাপট না জানলে অনেক আয়াতের অর্থ সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে যেতে পারে। যেমন: “তোমরা যেদিকেই মুখ ফেরাও সেদিকেই আল্লাহর মুখ” আয়াতটি নফল সালাতের কিবলা সংক্রান্ত প্রেক্ষাপট ছাড়া সাধারণ নামাযে প্রয়োগ করলে মারাত্মক বিভ্রান্তি ঘটবে।
২. শারঈ বিধানের কারণ ও হেকমত অনুধাবন: আল্লাহ কেন একটি নির্দেশ দিয়েছেন তার অন্তর্নিহিত যুক্তি স্পষ্ট হয়।
৩. কাফিরদের অবান্তর সংশয় নিরসন: আয়াত কেন এমন শব্দে নাযিল হলো তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে যায়।
(গ) আল-মু’জিযাহ ও কুরআনের অলৌকিকত্ব (إعجاز القرآن):
– সংজ্ঞা: নবীদের নবুওয়তের সত্যতা প্রমাণের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন কোনো অতিপ্রাকৃতিক ও অলৌকিক ঘটনার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো, যা সাধারণ মানুষের প্রাকৃতিক নিয়মের সম্পূর্ণ বাইরে এবং যার মুকাবিলা করতে সমস্ত বিশ্বজগতের সৃষ্টি সম্পূর্ণ অক্ষম হয়, তাকে মু’জিযা বলে।
– কুরআনের ই’জায বা মু’জিযা হওয়ার প্রধান দিকসমূহ:
১. অনুপম ভাষাগত লালিত্য ও বালাগাত: আরবের শ্রেষ্ঠ কবি ও বাগ্মীদের কুরআনের একটি সূরার মতো রচনার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা চিরতরে পরাস্ত হয়েছিল।
২. অতীত ও ভবিষ্যতের নির্ভুল ভবিষ্যৎবাণী: রোমানদের পুনর্জয় (আলিফ লাম মীম, গুলিবাতির রূম), মক্কা বিজয় ও বদরের বিজয় সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলেছিল।
৩. চিরন্তন অবিকৃত রূপ: হাজার বছর ধরে এক হরফ বা এক যের-যবরও পরিবর্তন হয়নি।
৪. আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য: ভ্রূণতত্ত্ব, মহাবিশ্ব সৃষ্টি ও সমুদ্রবিজ্ঞানের তত্ত্বসমূহ আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে হুবহু মিলে যায়।
٦- مجموعة (و) – الأسئلة الموجزة : أجب عن اثنين من الأسئلة التالية :
(أ) اكتب خصائص السور المكية والمدنية –
(ب) اذكر أسماء القران مع بيان وجوه التسمية بها –
(ج) عرف المحكم والمتشابه – وما حكمهما؟
(د) نسخ القران بالسنة جائز أم لا؟ بين –
[৬. ‘চ’ বিভাগ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (উসূলুত তাফসীর): (ক) মাক্কী ও মাদানী সূরার মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ লিখ; (খ) কুরআনের প্রসিদ্ধ নামসমূহ ও নামকরণের তাৎপর্য লিখ; (গ) মুহকাম ও মুতাশাবিহাতের পরিচয় ও শারঈ হুকুম লিখ; (ঘ) সুন্নাহ দ্বারা কুরআনের আয়াত রহিত (নাসখ) করা জায়েয কি-না? ফকীহদের মতামত দাও।]
(ক) মাক্কী ও মাদানী সূরার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
– মাক্কী সূরার বৈশিষ্ট্য: ১. এতে তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত, জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা প্রাধান্য পায়; ২. আয়াতগুলো সাধারণত ছান্দিক ও সংক্ষিপ্ত; ৩. এতে كلا (কখনোই নয়) শব্দের আধিক্য থাকে এবং সাজদার আয়াতসমূহ থাকে; ৪. সম্বোধন সাধারণত يَا أَيُّهَا النَّاسُ (হে মানবজাতি) দ্বারা হয়।
– মাদানী সূরার বৈশিষ্ট্য: ১. এতে শরীয়তের বাস্তব বিধান—সালাত, যাকাত, জিহাদ, হুদূদ ও পারিবারিক আইন থাকে; ২. মুনাফিক ও আহলে কিতাবদের সাথে বাহাস থাকে; ৩. আয়াতগুলো বিস্তারিত ও দীর্ঘ; ৪. সম্বোধন সাধারণত يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا (হে ঈমানদারগণ) দিয়ে শুরু হয়।
(খ) কুরআনের প্রধান নামসমূহ ও তাৎপর্য:
১. আল-কুরআন (القرآن): অর্থ পঠিত গ্রন্থ; যা মানব ইতিহাসে সর্বাধিক তিলাওয়াত করা হয়।
২. আল-ফুরক্বান (الفرقان): যা সত্য ও মিথ্যার মাঝে চূড়ান্ত পার্থক্য সৃষ্টি করে দেয়।
৩. আল-কিতাব (الكتاب): যা কালির অক্ষরে একত্রিত ও লিখিত গ্রন্থ।
৪. আয-যিকর (الذكر): যা বিশ্ববাসীর জন্য মহা উপদেশ ও নসীহত।
৫. আন-নূর (النور): যা অন্ধকারকে দূরীভূত করে সত্যের আলো বিকিরণ করে।
(গ) মুহকাম ও মুতাশাবিহ-এর পরিচয় ও হুকুম:
– মুহকাম (المحكم): যে আয়াতের অর্থ সুস্পষ্ট, প্রকাশ্য এবং যাতে একাধিক ব্যাখ্যার কোনো অস্পষ্টতা নেই। যেমন হালাল-হারামের স্পষ্ট বিধান। হুকুম: এর ওপর সরাসরি নিঃসংশয়ে আমল করা ওয়াজিব।
– মুতাশাবিহ (المتشابه): যে আয়াতের প্রকৃত তাৎপর্য ও অর্থ মানুষের সাধারণ জ্ঞানের অতীত এবং যার প্রকৃত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। যেমন আল্লাহর হাত, চেহারা, আরশে সমাসীন হওয়া কিংবা হুরূফে মুকাত্তা’আত (আলিফ-লাম-মীম)। হুকুম: রূপক বা বিকৃত ব্যাখ্যা না করে এর সত্যতার প্রতি অন্তরে ঈমান রাখাই একমাত্র শারঈ নির্দেশ।
(ঘ) সুন্নাহ দ্বারা কুরআনের আয়াত রহিতকরণের বিধান:
– জমহুর হানাফী ও মুহাদ্দিসগণের মত: মুতাওয়াতির বা মাশহূর সুন্নাহ দ্বারা কুরআনের আয়াত রহিত হওয়া সম্পূর্ণ ‘জায়েয’। দলীল: আল্লাহ বলেন—”আমি আপনার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি যাতে আপনি মানুষের জন্য তা স্পষ্ট করে দেন।” তাছাড়া কুরআনের সাধারণ নির্দেশ ছিল অসিয়তের ব্যাপারে, কিন্তু নবীজীর বিখ্যাত হাদীস—”লা অসিয়্যাতা লিওয়ারিসিন” (উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই) দ্বারা কুরআনের অসিয়তের সাধারণ আয়াত রহিত হয়েছে।
– ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মত: তিনি কুরআনের কোনো আয়াত সুন্নাহ দ্বারা রহিত হওয়া স্বীকার করেন না; বরং তিনি বলেন সুন্নাহ কেবল কুরআনের ব্যাখ্যা করতে পারে। তবে হানাফী মাযহাবের দলীল অত্যন্ত সুদৃঢ়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. কামিল ১ম বর্ষ হাদীস ৭ম পত্রের নাম ও কোড কী?
এ পত্রের বিষয় নাম হলো ‘দিরাসাতুত তাফসীর ওয়া উসূলিহি’ (Dirasatut Tafsir wa Usulihi 7th Paper) এবং বিষয় কোড হলো ৬১১১০৭ (611107)।
২. এ পত্রে কোন কোন তাফসীর গ্রন্থ পাঠ্য রয়েছে?
এ পত্রে আল্লামা যামাখশারীর ‘তাফসীরে কাশশাফ’ এবং কাযী বায়যাবীর ‘তাফসীরে বায়যাবী’র নির্বাচিত অংশ বিস্তারিতভাবে পাঠ্য রয়েছে।
৩. তাফসীরে কাশশাফের প্রধান বিশেষত্ব কী?
কুরআনের অনুপম অলঙ্কারশাস্ত্র (বালাগাত), ইলমুল মা’আনী ও বায়ান-এর রহস্য উন্মোচনে তাফসীরে কাশশাফ সমগ্র মুসলিম জাহানে অদ্বিতীয়।
৪. তাফসীরে বায়যাবীর মূল বৈশিষ্ট্য কী?
এটি দর্শন, কালামশাস্ত্র ও গভীর নাহবী ব্যাকরণের সংমিশ্রণে রচিত এক প্রজ্ঞাময় তাফসীর, যা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা প্রতিষ্ঠা করে।
৫. কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত কোনটি?
সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী জমহুর উম্মাহর ঐকমত্যে সূরা আলাক্বের প্রথম ৫টি আয়াত (ইক্বরা বিসমি রাব্বিকা…) সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী।
৬. পরীক্ষায় তাফসীরের আয়াত ব্যাখ্যার নিয়ম কী?
প্রথমে বিশুদ্ধ অনুবাদ, এরপর শাব্দিক তাহকীক ও ব্যাকরণিক আলোচনা এবং শেষে সংশ্লিষ্ট তাফসীরকারের মতামত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।

