আল-আকীদাহ আল-ইসলামিয়্যাহ ৮ম পত্র (Al-Aqidah Al-Islamiyyah 8th Paper) – 611108, হাদীস – কামিল ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
৮৯ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

কামিল (স্নাতকোত্তর) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা, ২০২৪

বিষয়: আল-আকীদাহ আল-ইসলামিয়্যাহ (Al-Aqidah Al-Islamiyyah) — ৮ম পত্র [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]

বিষয় কোড: ৬১১১০৮ | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০

الملاحظة : أجب عن ثمانية من مجموعة (أ) وعن اربعة من مجموعة (ب) – [দ্রষ্টব্য : (أ) অংশ হতে আটটি এবং (ب) অংশ হতে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]

কামিল (মাস্টার্স) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা ২০২৪-এর ‘আল-আকীদাহ আল-ইসলামিয়্যাহ’ (Al-Aqidah Al-Islamiyyah – বিষয় কোড: ৬১১১০৮) বিষয়ের মূল প্রশ্নপত্র ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আকিদা ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরিদী, ইমাম আবুল হাসান আল-আশ’আরী এবং ইমাম নাসাফী (রহ.)-এর ‘বাহরুল কালাম’ ও ‘আকাইদে নাসাফী’র আলোকে প্রস্তুতকৃত এ উত্তরমালা কামিল পরীক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে।

পরীক্ষা নির্দেশিকা ও প্রশ্নবিন্যাস:
১. ‘ক’ বিভাগ (مجموعة – أ): ইলমুল কালাম ও আকিদার ১২টি বিশদ তাত্ত্বিক প্রশ্ন থেকে যেকোনো ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। (নম্বর: ১০ × ৮ = ৮০)
২. ‘খ’ বিভাগ (مجموعة – ب): ৬টি সংক্ষিপ্ত দার্শনিক ও আকিদাগত প্রশ্ন থেকে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। (নম্বর: ৫ × ৪ = ২০)
(পরীক্ষার্থীদের শতভাগ পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির সুবিধার্থে সকল ১৮টি প্রশ্নের একাডেমিক ও প্রামাণ্য সমাধান নিচে দেওয়া হলো)।

١- عرف علم الكلام ثم بين موضوعه و غايته ومسائله ومكانته مفصلا –

[১. ইলমুল কালাম (علم الكلام)-এর পরিচয় দাও এবং এর আলোচ্য বিষয় (মাওযূ’), চূড়ান্ত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য (গায়াত), মৌলিক মাসায়েল ও ইসলামী শরীয়তে এর মর্যাদা বিস্তারিত লিখ।]

১. ইলমুল কালামের পরিচয় ও সংজ্ঞা:
– আভিধানিক অর্থ: ‘কালাম’ (الكلام) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বাক্য, বাক্যালাপ বা যুক্তিভিত্তিক সংলাপ।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লামা সা’দুদ্দীন তাফতাযানী (রহ.) ‘শারহুল আক্বাইদ’-এ বলেন: “هو العلم بالعقائد الدينية عن الأدلة اليقينية”—অর্থাৎ অকাট্য প্রমাণের সাহায্যে ইসলামী আকিদাগত বিশ্বাসসমূহ সুদৃঢ়ভাবে জানা এবং সংশয়বাদীদের চক্রান্ত থেকে তা সুরক্ষা করার শাস্ত্রকে ইলমুল কালাম বলে। আল্লামা ইবনে খালদূন বলেন, এটি এমন এক শাস্ত্র যা ঈমানী আকিদাসমূহকে যুক্তি ও প্রমাণের মাধ্যমে রক্ষা করে এবং পথভ্রষ্টদের অপব্যাখ্যার দাঁতভাঙা জবাব দেয়।

২. ইলমুল কালামের আলোচ্য বিষয় (موضوعه):
এ শাস্ত্রের মূল আলোচ্য বিষয় হলো ‘আল-মা’লূম’ (المعلوم)—অর্থাৎ যা জানা যায়। এর মধ্যে প্রধানত তিনটি স্তর রয়েছে:
১. ইলাহিয়্যাত (الإلهيات): মহান আল্লাহর পবিত্র সত্তা (যাত), তাঁর চিরন্তন গুণাবলী (সিফাত), কুদরত এবং সৃষ্টির প্রতি তাঁর কর্তৃত্ব।
২. নবুওয়াত (النبوات): নবী ও রাসূল প্রেরণের যৌক্তিক আবশ্যকতা, মু’জিযা, নিষ্পাপত্ব (ইসমত) এবং ওহীর প্রামাণিকতা।
৩. সাম’ইয়াত (السمعيات): যা কেবল ওহী ও হাদীসের মাধ্যমে জানা যায়; যেমন বরযখ, রূহ, কিয়ামত, পুলসিরাত, মীযান, জান্নাত ও জাহান্নাম।

৩. লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (غايته):
১. অন্ধ অনুকরণের (তাক্বলীদ) দুর্বলতা দূর করে অকাট্য যুক্তির মাধ্যমে ঈমানকে ইয়াক্বীনের স্তরে উন্নীত করা।
২. মু’তাযিলা, জাহমিয়া, শিয়া, কাদরিয়া ও বর্তমান যুগের বস্তুবাদী নাস্তিকদের বিভ্রান্তিকর দর্শনের অকাট্য খণ্ডন পেশ করা।
৩. দুনিয়াতে অন্তরের প্রশান্তি লাভ এবং পরকালে চিরন্তন জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্তি পেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত অর্জন।

৪. শরীয়তে ইলমুল কালামের মর্যাদা:
ইসলামী উলূমের মধ্যে ইলমুল কালাম হলো সমস্ত শাস্ত্রের মূল ভিত্তি বা ‘আসলুল উসূল’। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) আকিদার এই শাস্ত্রকে ‘আল-ফিকহুল আকবার’ (সর্বশ্রেষ্ঠ ফিকহ) নামে অভিহিত করেছেন। ইমাম নববী ও গাযযালী (রহ.)-এর মতে, সামগ্রিকভাবে উম্মাহর মধ্যে ইলমুল কালামের পারদর্শী আলিম থাকা ফরযে কিফায়াহ, যাতে ইসলামের আকিদাগত দুর্গ সর্বদা সুরক্ষিত থাকে।

٢- ما هو حد العلم؟ وما الاختلاف فيه بين أهل السنة وأهل البدع؟ بين مفصلا –

[২. ইলম বা জ্ঞানের সংজ্ঞা কী? ইলম-এর সংজ্ঞা ও সীমা নিয়ে আহলুস সুন্নাত এবং বিদআতী সম্প্রদায়সমূহের (মু’তাযিলা ও দার্শনিক) মধ্যকার মতানৈক্য বিস্তারিত আলোচনা কর।]

১. ইলম বা জ্ঞানের পরিচয় ও সংজ্ঞা (حد العلم):
– আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিতে সংজ্ঞা: ইমাম আবুল হাসান আল-আশ’আরী ও আল্লামা নাসাফী (রহ.)-এর মতে: “العلم صفة يتجلى بها المذكور لمن قامت هي به”—অর্থাৎ ইলম হলো বান্দার সত্তায় প্রতিষ্ঠিত এমন এক আত্মিক গুণ বা আলোকবর্তিকা, যার মাধ্যমে কোনো বিষয় বা সত্য মনের আয়নায় কোনোপ্রকার সংশয় ছাড়া সুস্পষ্টভাবে উদ্ভাসিত ও প্রকাশিত হয়ে যায়।
– ইমাম গাযযালী (রহ.)-এর সংজ্ঞা: “معرفة الشيء على ما هو به”—কোনো বস্তুকে তার প্রকৃত বাস্তব রূপ অনুযায়ী নিখুঁতভাবে জানা।

২. আহলুস সুন্নাত বনাম বিদআতীদের মতানৈক্য:
১. আহলুস সুন্নাতের অবস্থান: আহলুস সুন্নাতের মতে ইলম আল্লাহর একটি চিরন্তন সিফাত এবং মানুষের জন্য এটি অর্জিত জ্ঞান। সত্য জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হলো ৩টি: সুস্থ পঞ্চ ইন্দ্রিয় (الحواس السليمة), সত্য সংবাদ বা ওহী (الخبر الصادق), এবং সুস্থ বিবেক (العقل السليم)। জ্ঞান কখনোই বিবেকের একক সৃষ্টি নয়; বিবেক কেবল ওহীর আলো দ্বারা পরিচালিত হয়।
২. মু’তাযিলাদের ভ্রান্ত মত: মু’তাযিলারা দাবি করে বিবেকই হলো ভালো-মন্দের চূড়ান্ত বিচারক (الحسن والقبح العقليان)। ওহী আসার আগেও বিবেক দিয়ে যেকোনো জিনিসের হুকুম ও ইলম নির্ণয় করা সম্ভব। আহলুস সুন্নাহ এটি প্রত্যাখ্যান করে প্রমাণ করেন যে, ওহী ছাড়া শারঈ হুকুম সাব্যস্ত হয় না।
৩. সোফিস্ট ও সন্দেহবাদীদের (السفسطائية) খণ্ডন: সুফাস্তায়িয়্যারা দাবি করত জ্ঞান বলতে কোনো বাস্তব সত্য নেই। আহলুস সুন্নাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন—”حقائق الأشياء ثابتة والعلم بها متحقق”—বস্তুনিচয়ের বাস্তবতা সুপ্রতিষ্ঠিত এবং তা অর্জন করা মানুষের জন্য সুনিশ্চিত সত্য। এর ফলে ইসলামের জ্ঞানতত্ত্ব এক সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

৪. দার্শনিকদের (ফালাসিফাহ) বিভ্রান্তি ও খণ্ডন: প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় দার্শনিকদের একাংশ জ্ঞানকে নিছক মানব মস্তিষ্কের সক্রিয় বুদ্ধিবৃত্তিক বিমূর্ত ধারণার প্রতিফলন মনে করত। ইমাম গাযযালী ও কালামশাস্ত্রবিদগণ ‘তাহাফুতুল ফালাসিফাহ’ গ্রন্থে অকাট্য দলীলে প্রমাণ করেন যে, ইন্দ্রিয় ও বিবেকের সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং ওহীর ঐশী পথনির্দেশ ব্যতীত মানুষের একক বুদ্ধি কখনোই অদৃশ্য জগত (আলমে গায়েব) এবং পারলৌকিক চিরন্তন সত্যসমূহের চূড়ান্ত জ্ঞানলাভে সক্ষম নয়।

٣- ما الإيمان وما صفته وشروطه؟ بين ارآء أهل السنة والجماعة والمعتزلة والمتقشفة مفصلا –

[৩. ঈমান-এর পরিচয়, এর স্বরূপ ও আবশ্যকীয় শর্তাবলী কী কী? ঈমানের সংজ্ঞায়নে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত, মু’তাযিলা ও মুতাক্বাশশিফাহদের মতামত বিস্তারিত লিখ।]

১. ঈমানের পরিচয়, স্বরূপ ও শর্তাবলী:
– আভিধানিক অর্থ: تصديق বা আন্তরিক স্বীকৃতি ও বিশ্বাস স্থাপন করা।
– শরয়ী সংজ্ঞা: রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বীনের যে সকল অকাট্য বিষয় নিয়ে এসেছেন, সেগুলোকে সত্য বলে অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস করা এবং মুখে স্বীকৃতি দেওয়া।
– ঈমানের রুকন ও শর্তাবলী: অন্তরের তাসদীক্ব (تصديق بالجنان) হলো মূল রুকন; আর পার্থিব বিধান জারির জন্য মুখের ইকরার (إقرار باللسان) হলো অপরিহার্য শর্ত। এছাড়া দ্বীনের কোনো অকাট্য বিষয়কে অস্বীকার না করা এবং অহংকার বর্জন করা ঈমান বহাল থাকার শর্ত।

২. বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মতামত পর্যালোচনা:

সম্প্রদায় ঈমানের সংজ্ঞা ও স্বরূপ কবিরা গুনাহকারীর হুকুম
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত (হানাফী ও আশ’আরী) ঈমান হলো অন্তরের তাসদীক্ব ও মুখের ইকরার। আমল ঈমানের রুকন নয়, বরং ঈমানের সৌন্দর্য ও পূর্ণতা। কবিরা গুনাহ করলেও সে কাফির হয় না; বরং ফাসিক্ব মুমিন থাকে। আল্লাহর ইচ্ছায় ক্ষমা পেতে পারে।
মু’তাযিলা ঈমান হলো তিনটি বিষয়ের সমষ্টি: অন্তরের বিশ্বাস, মুখের ইকরার এবং সমস্ত ফরজ আমল সম্পাদন। কবিরা গুনাহকারী ঈমান থেকে বের হয়ে যায়, তবে কাফির হয় না; সে ‘আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইনে’ থাকে এবং তাওবা ছাড়া মরলে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে।
মুতাক্বাশশিফাহ / জাহমিয়্যাহ কেবল বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহকে জানাই (মারিফাত) হলো ঈমান; মুখে ইকরার বা আমলের কোনো প্রয়োজন নেই। তাদের মতে ইবলিস ও আবু জাহেলও আল্লাহকে জানত বিধায় তাদের ভ্রান্ত নীতিতে তারা মুমিন গণ্য হওয়ার হাস্যকর মত পোষণ করে, যা বাতিল।

৩. সারসংক্ষেপ ও হানাফী বিশ্লেষণ:
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ‘আল-ফিকহুল আকবার’-এ সুস্পষ্ট করেছেন যে ঈমানের মূল সত্তা হ্রাস-বৃদ্ধি পায় না, তবে ঈমানের জ্যোতি ও গুণগত মান নেক আমলের দ্বারা বৃদ্ধি পায় এবং পাপ কাজের দ্বারা কলুষিত হয়। আহলুস সুন্নাতের এ ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যমপন্থা উম্মাহকে খারেজীদের উগ্র তাকফীরি ফেতনা এবং মুর্জিয়াদের দায়িত্বহীন শিথিলতা উভয় চরমপন্থা থেকে রক্ষা করেছে।

٤- بين آراء أهل السنة وغيرهم فى إطلاق لفظ الشئ والنفس والنور على الله تعالى مدللا مفصلا –

[৪. আল্লাহ তা’আলার সত্তায় ‘শাই’ (বস্তু/সত্তা), ‘নাফস’ (নিজ সত্তা) এবং ‘নূর’ (জ্যোতি) শব্দ প্রয়োগ করার ব্যাপারে আহলুস সুন্নাত ও অন্যান্যদের মতামত দলীলসহ আলোচনা কর।]

১. আল্লাহ তা’আলার ক্ষেত্রে ‘শাই’ (الشئ) শব্দের প্রয়োগ:
– আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত: আল্লাহর ক্ষেত্রে ‘শাই’ শব্দ ব্যবহার করা জায়েয। তবে এর অর্থ কোনো জড়বস্তু নয়, বরং বিদ্যমান সত্তা (الموجود)। দলীল: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ নিজেই ইরশাদ করেন: “কুল আইয়্যু শায়ইন আকবারু শাহাদাতান? কুলিল্লাহ” (বলুন! সাক্ষ্য হিসেবে কোন সত্তা সর্বশ্রেষ্ঠ? বলুন—আল্লাহ!)। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ‘আল-ফিকহুল আকবার’-এ বলেন: “والله تعالى شيء لا كالأشياء ومعنى الشيء إثباته بلا جسم ولا جوهر ولا عرض”—আল্লাহ শাই কিন্তু অন্যান্য মাখলুকাতের মতো নন; তাঁর কোনো দেহ, আয়তন বা জড়তা নেই।
– জাহমিয়াদের মত: তারা আল্লাহর ক্ষেত্রে ‘শাই’ বলা অস্বীকার করে, যা বাতিল।

২. ‘নাফস’ (النفس) শব্দের প্রয়োগ:
আহলুস সুন্নাতের মতে আল্লাহর ক্ষেত্রে নাফস বলা জায়েয, যার অর্থ হলো আল্লাহর ‘যাত’ বা খোদ নিজ পবিত্র সত্তা। দলীল: কুরআন মাজীদে এসেছে: “ওয়াইউহায্যিরুকুমুল্লাহু নাফসাহূ” (আল্লাহ তোমাদের তাঁর নিজের সত্তা সম্পর্কে সতর্ক করছেন); এবং ঈসা (আ.) বলেন: “তা’লামু মা ফী নাফসী ওয়ালা আ’লামু মা ফী নাফসিকা” (আপনি জানেন যা আমার অন্তরে আছে, কিন্তু আমি জানি না যা আপনার পবিত্র সত্তায় রয়েছে)। এটি আল্লাহর অসীম অস্তিত্বের পূর্ণতা প্রকাশ করে।

৩. ‘নূর’ (النور) শব্দের প্রয়োগ:
আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম হলো ‘আন-নূর’। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে: “আল্লাহু নূরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ব”। তবে আহলুস সুন্নাতের আক্বীদা অনুযায়ী আল্লাহ কোনো উপাদানগত আলো (আলোর কণা বা ফোটন) নন; বরং তিনি হলেন আসমান ও জমিনকে হিদায়াত ও সৃষ্টির মাধ্যমে আলোকিতকারী মহান সত্তা (منور السموات والأرض)। মুজাসসিমা ও মুশাব্বিহারা আল্লাহকে চাক্ষুষ আলোর মতো দেহ কল্পনা করে চরম পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হয়েছে। আহলুস সুন্নাহ প্রমাণ করেন যে আল্লাহ সব ধরনের রূপ, গঠন ও সাদৃশ্যের ঊর্ধ্বে পবিত্র।

٥- ما الكبيرة؟ وهل من توبة لمن ارتكبها؟ وهل المرأ مؤاخذ على قصده دون الفعل؟ بين مفصلا –

[৫. কবিরা গুনাহ কাকে বলে? কবিরা গুনাহকারীর তাওবা কি কবুলযোগ্য? কোনো ব্যক্তি কি কেবল মনের সংকল্পের জন্য পাপী সাব্যস্ত হবে যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে? বিস্তারিত বিশ্লেষণ কর।]

১. কবিরা গুনাহের সংজ্ঞা, প্রকার ও তওবার হুকুম:
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম ইবনে হাজার আল-হাইতামী ও ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (রহ.)-এর মতে: যে সকল মহাপাপের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ও হাদীসে জাহান্নামের সুনির্দিষ্ট কঠিন শাস্তি, আল্লাহর অভিশাপ (লানত), গজব বা দুনিয়াতে নির্ধারিত শারঈ দণ্ডবিধি (হদ) ঘোষিত হয়েছে, তাকে ‘কবিরা গুনাহ’ (الكبائر) বলে। বিখ্যাত কবিরা গুনাহসমূহের মধ্যে রয়েছে—শিরক, নরহত্যা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা, যিনা, সুদ, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ ও মিথ্যা অপবাদ দেওয়া। ফকীহগণ আরও উল্লেখ করেছেন যে, সগিরা গুনাহে অবিচল থাকলে (الإصرار على الصغيرة) তা কবিরা গুনাহে পরিণত হয়ে যায়।
– কবিরা গুনাহকারীর তওবার হুকুম: আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ঐকমত্য অনুযায়ী কবিরা গুনাহকারী যদি মৃত্যুর পূর্বে খাঁটি তাওবায়ে নাসূহা (অনুতপ্ত হওয়া, পাপ সম্পূর্ণ বর্জন করা এবং ভবিষ্যতে না করার সংকল্প করা) করে, তবে আল্লাহ তা’আলা তার সমস্ত কবিরা গুনাহ সম্পূর্ণ ক্ষমা করে দেন। এমনকি তওবা ছাড়া মারা গেলেও সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না; বরং সে আল্লাহর রহমতের অধীন থাকবে—আল্লাহ চাইলে স্বীয় করুণায় বা রাসূল (সা.)-এর শাফাআতের মাধ্যমে তাকে মাফ করে দিতে পারেন, অথবা কৃত পাপের সমপরিমাণ শাস্তি দিয়ে পরবর্তীতে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

২. কেবল অন্তরের ইচ্ছায় (ক্বাসদ) কি মানুষ দায়ী হবে:
মানুষের মনের ভাবনার চারটি স্তর রয়েছে: হাজেস (ক্ষণিক ভাবনা), খাতির (মনের কল্পচিত্র), হাদীসুস নাফস (অন্তরের দ্বিধাদ্বন্দ্ব) এবং আযম বা ক্বাসদে মুসাম্মাম (চূড়ান্ত সুদৃঢ় সংকল্প)।
– সাধারণ হুকুম: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “আল্লাহ আমার উম্মতের মনের অনিচ্ছাকৃত ওয়াসওয়াসাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন যতক্ষণ না তারা তা কাজে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে।”
– তবে চূড়ান্ত সংকল্পের হুকুম: যদি কোনো ব্যক্তি কোনো কবিরা গুনাহ সম্পাদন করার জন্য সুদৃঢ় দৃঢ়সংকল্প (ক্বাসদে মুসাম্মাম) গ্রহণ করে এবং সর্বাত্মক চেষ্টাও চালায়, কিন্তু আকস্মিক কোনো বাধার কারণে তা করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই অন্তরের পাপময় সংকল্পের কারণে সে অবশ্যই আল্লাহর দরবারে গুনাহগার হবে। সহীহ বুখারীর বিখ্যাত হাদীসে এসেছে: “যখন দুই মুসলিম তরবারি নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তখন হত্যাকারী ও নিহত উভয়েই জাহান্নামে যাবে।” সাহাবীগণ আরজ করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! হত্যাকারীর জাহান্নামে যাওয়া তো স্পষ্ট, কিন্তু নিহতের অপরাধ কী?” নবীজী (সা.) জবাব দিলেন: “নিশ্চয় সেও তার প্রতিপক্ষ ভাইকে হত্যা করতে সমভাবে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ছিল।” অতএব, অন্তরের সুদৃঢ় সংকল্প মানুষকে দায়ী ও পাপী করে তোলে।

٦- عرف العرش والكرسى وحملة العرش والحفظة مع ذكر آراء الفريقين أهل السنة وغيرهم بالأدلة –

[৬. আরশ, কুরসী, হামালাতুল আরশ (আরশ বহনকারী ফেরেশতা) এবং হাফাজা (সংরক্ষণকারী ফেরেশতা)-এর পরিচয় দাও এবং আহলুস সুন্নাত বনাম বিদআতীদের দৃষ্টিভঙ্গি দলীলসহ আলোচনা কর।]

১. আরশ, কুরসী, হামালাতুল আরশ ও হাফাজার আকিদাগত পরিচয়:
– আল-আরশ (العرش): এটি সমগ্র মাখলুকাতের ছাদতুল্য আল্লাহর সর্ববৃহৎ বাস্তব সৃষ্টি, যা সমস্ত আসমান, জমিন ও সিদরাতুল মুনতাহার ঊর্ধ্বে অবস্থিত। আল্লাহ আরশের মুখাপেক্ষী নন, বরং আরশ ও সমগ্র সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর একক কুদরত ও শক্তির দ্বারা টিকে রয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “আর-রাহমানু আলাল আরশিস তাওয়া” (দয়াময় আল্লাহ আরশের ওপর সমাসীন হয়েছেন)।
– আল-কুরসী (الكرسي): এটি আরশের সামনে অবস্থিত এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। হযরত আবু যার গিফারী (রা.) বর্ণিত হাদীসে নবীজী (সা.) বলেন: “সাত আসমান ও জমিন কুরসীর তুলনায় এক সুবিশাল মরুভূমিতে ফেলে রাখা লোহার একটি আংটি ছাড়া কিছুই নয়; আর আরশের তুলনায় কুরসীও ঠিক একই রূপ।”
– হামালাতুল আরশ (حملة العرش): আরশ বহনকারী বিশেষ শীর্ষস্থানীয় ফেরেশতামণ্ডলী। বর্তমানে তাঁদের সংখ্যা চারজন এবং কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাঁদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে আটজন করবেন। আল্লাহ বলেন: “ওয়াইয়াহমিলু আরশা রাব্বিকা ফাওক্বাহুম ইয়াওমাইযিন ছামানিয়াহ” (সেদিন আটজন ফেরেশতা তোমার প্রতিপালকের আরশ বহন করবে)।
– আল-হাফাজা (الحفظة): সংরক্ষণকারী ফেরেশতাগণ, যাঁরা মানুষের সকল কথা, কাজ ও নিয়ত সংরক্ষণ করেন। এদের মধ্যে কিরামান কাতিবীন সার্বক্ষণিক মানুষের কাঁধে অবস্থান করে নেকি ও বদী লিপিবদ্ধ করেন।

২. আহলুস সুন্নাত বনাম বিদআতী সম্প্রদায়সমূহের তুলনামূলক মতভেদ:
১. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সুদৃঢ় অবস্থান: আরশ ও কুরসী আল্লাহর বাস্তব নূরের সৃষ্টি, কোনো কাল্পনিক রূপক নয়। আরশের ওপর আল্লাহর ইস্তিয়াওয়া সত্য ও হক্ব; তবে তা সৃষ্টির মতো কোনো স্থানে বসা বা ভর করা নয়। ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালিক (রহ.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন: “ইস্তিয়াওয়া সত্য কিন্তু তার পদ্ধতি মানুষের ধারণার অতীত; এর ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব এবং রূপ নিয়ে অবান্তর প্রশ্ন তোলা বিদআত।”
২. মু’তাযিলাদের বিকৃত ব্যাখ্যা (তা’তীল): মু’তাযিলারা দাবি করে আরশ বলতে রাজকীয় ক্ষমতা এবং ‘ইস্তিয়াওয়া’ মানে ‘ইসতীলা’ (ক্ষমতা কুক্ষিগত করা)। আহলুস সুন্নাহ তাঁদের এ বিকৃতিকে খণ্ডন করে বলেন, বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল কেবল সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যিনি পূর্বে দুর্বল ছিলেন; কিন্তু আল্লাহ শুরু থেকেই সর্বশক্তিমান।
৩. মুজাসসিমাদের ভ্রান্তি (তাশবীহ): তারা আল্লাহকে আরশের ওপর বসে থাকা এক বিশাল দেহধারী রাজা কল্পনা করে কুফরিতে লিপ্ত হয়েছে। আহলুস সুন্নাহ প্রমাণ করেন যে আল্লাহ স্থান, কাল ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সীমাবদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র।

٧- كيف يكون عذاب القبر؟ وأين تكون الأرواح فى البرزخ؟ بين مفصلا –

[৭. কবরের আযাব ও সওয়াবের স্বরূপ কেমন হবে? এবং বরযখ জগতে মানুষের রূহসমূহ কোথায় অবস্থান করে? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত লিখ।]

১. কবরের আযাব ও নিয়ামতের স্বরূপ ও প্রামাণিক বাস্তবতা:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত ও অকাট্য আকিদা হলো—কবরের আযাব ও নিয়ামত সম্পূর্ণ সত্য, বাস্তব ও হক্ব। কোনো মানুষ মৃত্যুবরণ করার পর তাকে মাটিতে দাফন করা হোক, আগুনে পুড়িয়ে ভস্ম করা হোক কিংবা সাগরে নিক্ষেপ করা হোক—সে অবশ্যই বরযখ জগতে পদার্পণ করে।
– মুনকার-নাকীরের সওয়াল ও আযাবের প্রক্রিয়া: দাফন শেষে মুনকার ও নাকীর নামক দুই গম্ভীর ফেরেশতা এসে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন করেন: ‘মান রাব্বুকা’ (তোমার রব কে?), ‘মা দীনুকা’ (তোমার দ্বীন কী?) এবং ‘মান হাযার রাজুল’ (নবীজী সা. সম্পর্কে তোমার কী বিশ্বাস ছিল?)। মুমিন বান্দা সানন্দে সত্য উত্তর প্রদান করে; ফলে তার কবরকে দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত করে জান্নাতের শীতল বাতাস ও জান্নাতী পোশাকের ব্যবস্থা করা হয়। পক্ষান্তরে মুনাফিক্ব ও কাফিররা বলে ‘হাহ হাহ লা আদরী’ (হায় আমি তো কিছুই জানি না); ফলে অন্ধ ও বধির ফেরেশতা এসে লোহার হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে এবং বিষাক্ত সর্প-বিচ্ছু দিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত তাকে দগ্ধ করতে থাকে।
– দেহ ও রূহের বিশেষ সংযোগ: মৃত্যুর পর রূহকে দেহের সাথে এক বিশেষ বরযখী উপায়ে সম্পর্কিত রাখা হয়, যাতে সে শাস্তি বা শান্তি পূর্ণাঙ্গভাবে আস্বাদন করতে পারে। যেমন নিদ্রিত ব্যক্তি স্বপ্নে চরম আনন্দ বা ভয়ংকর বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করে স্বস্তি বা কষ্ট অনুভব করে অথচ শয্যাপাশের জাগ্রত মানুষ তা দেখতে পায় না। মু’তাযিলারা যুক্তি দিয়ে এটি অস্বীকার করে চরম বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছে।

২. বরযখ জগতে বিভিন্ন শ্রেণির রূহের অবস্থানস্থল:
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) ‘কিতাবুর রূহ’-এ হাদীসের আলোকে রূহের বিভিন্ন মর্যাদাগত অবস্থান স্পষ্ট করেছেন:
১. আম্ম্বিয়ায়ে কেরামের রূহ: ইল্লিয়্যিনের সর্বোচ্চ শিখরে ‘রফীক্বিল আ’লা’য় তাঁদের দেহ ও রূহ সম্পূর্ণ সতেজ অবস্থায় বিরাজ করে এবং তাঁদের দেহ জমিনের জন্য ভক্ষণ হারাম।
২. শুহাদায়ে কেরামের রূহ: সহীহ মুসলিমের বর্ণনামতে—সবুজ পাখির অভ্যন্তরে অবস্থান করে জান্নাতের উদ্যানে অবাধে উড়ে বেড়ায় এবং আরশের ছায়ায় ঝুলন্ত নূরের প্রদীপে আশ্রয় নেয়।
৩. সাধারণ নেককার মুমিনদের রূহ: জান্নাতের বৃক্ষে পাখিরূপে বিচরণ করে কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর অফুরন্ত রিযিক্ব উপভোগ করতে থাকে।
৪. ঋণগ্রস্ত বা পাপী মুমিনদের রূহ: ঋণ পরিশোধ না হওয়া বা পাপের প্রায়শ্চিত্ত না হওয়া পর্যন্ত কবরে সাময়িক আটকে থাকে।
৫. কাফির ও মুনাফিকদের অপবিত্র রূহ: সপ্ত জমিনের নিচে চরম অন্ধকার ও ভয়ংকর শাস্তিময় স্থান ‘সিজ্জীন’-এ আবদ্ধ থাকে।

٨- ما الإمامة؟ وكيف تم اختيار الأئمة بعد رسول الله؟ وهل كان رسول الله أوصى لأحد بعده بالإمامة؟ بين مفصلا –

[৮. ইমামত বা খিলাফত কী? রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর খোলাফায়ে রাশেদীনের নির্বাচন পদ্ধতি কেমন ছিল? নবী করীম (সা.) কি নির্দিষ্ট কাউকে খলীফা করার অসিয়ত করে গিয়েছিলেন? বিস্তারিত আলোচনা কর।]

১. ইমামতের সংজ্ঞা ও তাৎপর্য:
দ্বীনের সংরক্ষণ এবং ইসলামী শরীয়তের আলোকে পার্থিব রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র প্রতিনিধিত্ব করার সাধারণ নেতৃত্বকে ‘ইমামতে কুবরা’ বা খিলাফত বলে। উম্মাহর জন্য একজন ন্যায়পরায়ণ খলীফা বা ইমাম নির্বাচন করা সর্বসম্মত ওয়াজিব।

২. খোলাফায়ে রাশেদীনের নির্বাচন পদ্ধতি:
১. হযরত আবু বকর (রা.): সাক্বীফায়ে বনী সা’ইদায় আনসার ও মুহাজির নেতৃবৃন্দের ঐতিহাসিক মাশওয়ারা এবং হযরত ওমরের বাইআতের পর সর্বস্তরের সাহাবীদের সর্বসম্মত বাইআতের মাধ্যমে নির্বাচিত হন।
২. হযরত ওমর (রা.): হযরত আবু বকর (রা.) ওফাতের পূর্বে শীর্ষ সাহাবীদের পরামর্শক্রমে তাঁর নাম প্রস্তাব (ইসতিখলাফ) করেন এবং সাহাবায়ে কেরাম সর্বসম্মতভাবে তা গ্রহণ করেন।
৩. হযরত উসমান (রা.): হযরত ওমর (রা.) কর্তৃক গঠিত ৬ সদস্যের শুরা কমিটির গভীর পর্যালোচনায় আব্দুর রহমান ইবনে আউফের মধ্যস্থতায় নির্বাচিত হন।
৪. হযরত আলী (রা.): উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মদিনার সাহাবায়ে কেরামের গণ-বাইআতের মাধ্যমে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

৩. রাসূল (সা.) কি কাউকে নির্দিষ্ট অসিয়ত করে গিয়েছিলেন:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অকাট্য আকিদা অনুযায়ী—রাসূলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্ট নস বা অসিয়তের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাউকে খলীফা মনোনীত করে যাননি। শিয়াদের দাবি (গাদীরে খুমে আলীকে অসিয়ত করা হয়েছিল) সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। তবে নবীজী (সা.) তাঁর জীবদ্দশার অন্তিম রোগশয্যায় হযরত আবু বকর (রা.)-কে নামাজের ইমামতির দায়িত্বে নিযুক্ত করে পরিষ্কার ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন যে—”যে ব্যক্তিকে নবীজী আমাদের দ্বীনের জন্য পছন্দ করেছেন, আমরা আমাদের দুনিয়াবী খিলাফতের জন্য তাকে কেন পছন্দ করব না!” সাহাবাদের এই ইজমা খিলাফতের বৈধতার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।

٩- بين نقض الإيمان فى ضوء القران والسنة –

[৯. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঈমান বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ (নাওয়াক্বিদুল ঈমান) বিস্তারিত বিশ্লেষণ কর।]

ভূমিকা:
পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য নীতি অনুযায়ী—যে সকল আকিদাগত বিশ্বাস, উচ্চারিত বাক্য বা কাজের কারণে একজন মুমিনের ঈমান সম্পূর্ণ বাতিল ও শূন্য হয়ে যায় এবং সে ইসলামের সীমানা থেকে চিরতরে বহিষ্কৃত হয়ে মুরতাদে পরিণত হয়, ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় সেগুলোকে ‘নাওয়াক্বিদুল ঈমান’ (نواقض الإيمان) বা ঈমান ভঙ্গকারী বিষয় বলা হয়। নিজের আত্মরক্ষা ও ঈমানের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে প্রতিটি মুসলিমের জন্য এ বিষয়গুলো জানা ফরযে আইন।

প্রধান ১০টি ঈমান বিনষ্টকারী বিষয় ও তাদের শারঈ দলীল:
১. আল্লাহর ইবাদতে শিরক করা: গাইরুল্লাহর নামে পশু জবেহ করা, মাজার বা কোনো সৃষ্টির সামনে সিজদা করা, কিংবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে গায়েবের একক মালিক মনে করা। আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত চিরতরে হারাম করে দিয়েছেন।”
২. আল্লাহ ও বান্দার মাঝে মধ্যস্থতাকারী বানিয়ে তার কাছে মাগফিরাত ও হাজত প্রার্থনা করা: যারা মনে করে সুপারিশকারীদের সন্তুষ্ট না করলে আল্লাহ কিছু দিতে পারেন না।
৩. মুশরিক ও কাফিরদের কাফির না বলা: ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান বা প্রকাশ্য ধর্মদ্রোহীদের কুফরিতে সন্দেহ পোষণ করা বা তাদের ধর্মকে ইসলামের সমমর্যাদাসম্পন্ন মনে করা।
৪. মানব রচিত আইনকে ইসলামী শরীয়তের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা: বিশ্বাস করা যে কুরআনের শাসন বর্তমান যুগে অচল বা অনগ্রসর, এবং মানব রচিত ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান আল্লাহর আইনের চেয়ে উত্তম।
৫. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো বিধান বা সুন্নাহকে মনে মনে ঘৃণা করা: এমনকি বাহ্যত তা পালন করলেও এই আন্তরিক ঘৃণার কারণে ঈমান সমূলে বিনষ্ট হয়ে যাবে (সূরা মুহাম্মদ: ৯)।
৬. দ্বীনের কোনো বিধান বা সওয়াব-শাস্তি নিয়ে উপহাস ও বিদ্রূপ করা: আল্লাহ স্পষ্ট ইরশাদ করেন: “বলুন! তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা করছিলে? কোনো অজুহাত পেশ করো না; ঈমান আনার পর তোমরা প্রকাশ্য কাফির হয়ে গেছ।” (সূরা তাওবাহ: ৬৫-৬৬)।
৭. যাদুবিদ্যা, তুকতাক ও শয়তানী তন্ত্রমন্ত্রে লিপ্ত হওয়া: কুরআন মাজীদে যাদুকে স্পষ্ট কুফর ঘোষণা করা হয়েছে (সূরা বাকারা: ১০২)।
৮. মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফির ও মুশরিকদের সহযোগিতা ও যুদ্ধে সহায়তা প্রদান করা: মুসলিম ভূখণ্ডে হামলার জন্য অমুসলিম আগ্রাসীদের সমর্থন দেওয়া।
৯. বিশ্বাস করা যে কোনো ব্যক্তির জন্য শরীয়ত বর্জন করা বৈধ (যেমন বাতিল সুফী ও ইবাহাতপন্থীরা দাবি করে)।
১০. দ্বীন ইসলাম শিক্ষা ও আমল করা থেকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং দ্বীনের প্রতি চূড়ান্ত উদাসীন থাকা।

١٠- قال الله عز وجل “يد الله فوق أيديهم” – بين عقيدة أهل السنة والجماعة والمعتزلة والمشبهة فى إثبات اليد لله تعالى –

[১০. মহান আল্লাহর বাণী: “আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর”—আল্লাহর জন্য ‘হস্ত’ (সিফাতে ইয়াদ) সাব্যস্তকরণে আহলুস সুন্নাত, মু’তাযিলা এবং মুশাব্বিহাদের আকিদাগত মতভেদ ব্যাখ্যা কর।]

ভূমিকা ও আয়াতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ফাতহের ১০ নম্বর আয়াতে হুদায়বিয়ার ঐতিহাসিক বাইআতে রিদওয়ানের বর্ণনায় আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন: “নিশ্চয় যারা আপনার নিকট বাইআত গ্রহণ করছে, তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর নিকটই বাইআত গ্রহণ করছে; আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর।” আল্লাহর ক্ষেত্রে ‘ইয়াদ’ (يد) তথা হস্ত বা হাত শব্দটির প্রয়োগ নিয়ে মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদগণের মাঝে সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত আকিদাগত ব্যাখ্যা বিদ্যমান।

১. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ভারসাম্যপূর্ণ আকিদা:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত নীতি হলো—আল্লাহ তা’আলা কুরআন ও সুন্নাহে নিজের জন্য যে সকল সিফাতে খাবারিয়্যাহ (সংবাদলব্ধ গুণ) সাব্যস্ত করেছেন, তা কোনো প্রকার সৃষ্টিজগতের সাদৃশ্য (তাশবীহ), অবয়ব নির্ধারণ (তাকয়ীফ) কিংবা অস্বীকৃতি (তা’তীল) ছাড়াই সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করতে হবে। ইমাম মালিক (রহ.)-এর সেই অমর নীতি এখানে প্রযোজ্য: “শব্দটি সুপরিচিত, এর পদ্ধতি মানুষের ধারণার অতীত, এর ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব এবং রূপ নিয়ে বিতর্ক করা বিদআত।”
– সালাফে সালেহীনের পদ্ধতি (তাফবীদ): ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ‘আল-ফিকহুল আকবার’-এ বলেন: “আল্লাহর হাত, চেহারা ও নফস রয়েছে যা তিনি কুরআনে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তা মানুষের হাতের মতো কোনো গোশত, অস্থি, রগ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (জাওয়ায়েহ) নয়; বরং এটি তাঁর মর্যাদাপূর্ণ সিফাত, যার প্রকৃত স্বরূপ একমাত্র আল্লাহই অবগত আছেন।”
– খালাফ ও মুতাকাল্লিমীনদের পদ্ধতি (তা’বীল): পরবর্তী যুগের আশ’আরী ও মাতুরিদী ওলামায়ে কেরাম জাহেল মানুষদেরকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কল্পনা করার হাত থেকে বাঁচাতে আরবী ভাষার রূপক বালাগাত অনুযায়ী এর ব্যাখ্যা করেছেন ‘আল্লাহর কুদরত’ (শক্তি), নুসরত (ঐশী সাহায্য) এবং হিমায়েত (সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধান)।

২. মুশাব্বিহা ও মুজাসসিমাদের চরম ভ্রান্তি:
মুশাব্বিহা ও কাররামিয়্যাহ দল দাবি করে যে আল্লাহর বাস্তব হাত মানুষের মতো আঙ্গুল ও জোড়াবিশিষ্ট অঙ্গধারী হাত। নাউযুবিল্লাহ, তারা আল্লাহকে মানুষের দেহের সাথে সাদৃশ্য করে প্রকাশ্য কুফরিতে লিপ্ত হয়েছে। পবিত্র কুরআন ঘোষণা করে: “লাইসা কামিছলিহী শাইউন ওহুয়াস সামীউল বাসীর” (তাঁর সমতুল্য বা সদৃশ কোনো কিছুই নেই)।

৩. মু’তাযিলাদের বিচ্যুতি (তা’তীল):
মু’তাযিলারা যুক্তি দিতে গিয়ে মূল সিফাতকেই অস্বীকার করে বসেছে। তারা দাবি করেছে আল্লাহর কোনো সিফাত থাকতে পারে না, যার মাধ্যমে তারা প্রকারান্তরে এক নির্গুণ ও অস্তিত্বহীন শূন্যতার কল্পনা করেছে। আহলুস সুন্নাহ তাশবীহ ও তা’তীলের মাঝে নিখাদ তাওহীদের আকিদা সমুন্নত রেখেছেন।

١١- بين آراء أهل السنة والجماعة والشيعة عن الوحى وختم النبوة بالادلة –

[১১. ওহী এবং খতমে নবুওয়ত (নবুওয়তের সমাপ্তি) সম্পর্কে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত এবং শিয়াদের মতভেদ দলীলসহ আলোচনা কর।]

ভূমিকা:
ইসলামের মৌলিক ঈমানী স্তম্ভসমূহের মধ্যে অন্যতম প্রধান ও সুদৃঢ় ভিত্তি হলো বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সর্বশেষ নবুওয়ত (খতমে নবুওয়ত) এবং ওহীর ধারাবাহিকতা সমাপ্ত হওয়ার ওপর পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস স্থাপন করা। এ বিষয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত এবং শিয়া সম্প্রদায়ের মাঝে মৌলিক ও সাংঘর্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান।

১. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অকাট্য আকিদা ও দলীলসমূহ:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত ঐকমত্য হলো—হযরত মুহাম্মদ (সা.) হলেন সমগ্র আম্বিয়ায়ে কেরামের সিলসিলার সমাপ্তকারী সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তাঁর আগমনের পর নবুওয়ত ও রিসালাতের পবিত্র দরজা কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে এবং আসমানী শারঈ ওহীর আগমন চিরতরে সমাপ্ত হয়েছে। তাঁর পরে যে কেউ নবুওয়তের বা ওহী প্রাপ্তির দাবি করবে সে চরম দাজ্জাল, কাজ্জাব ও মুরতাদ; এবং যে ব্যক্তি তার এই দাবিতে বিশ্বাস করবে সেও ইসলামের গণ্ডি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে কাফির হয়ে যাবে।
– পবিত্র কুরআনের অকাট্য নস: সূরা আল-আহযাবের ৪০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন:
“مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ”
“মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী (খাতামান নাবিয়্যীন)।”
– মুতাওয়াতির হাদীসের প্রমাণ: নবী করীম (সা.) পরিষ্কার ভাষায় ইরশাদ করেন: “নিশ্চয়ই রিসালাত ও নবুওয়তের ধারা সমাপ্ত হয়ে গেছে; সুতরাং আমার পর আর কোনো রাসূলও আসবে না এবং কোনো নবীও আসবে না।” অপর হাদীসে ইরশাদ করেন: “আনা খাতামুন নাবিয়্যীন, লা নাবিয়্যা বা’দী” (আমি সর্বশেষ নবী, আমার পরে আর কোনো নবী নেই)। সাহাবায়ে কেরাম প্রথম খলীফা আবু বকর (রা.)-এর নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী ইয়ামামার যুদ্ধে নবুওয়তের ভণ্ড দাবিদার মুসায়লামা কাযযাবকে হত্যা করে খতমে নবুওয়তের আকিদাকে রক্ত দিয়ে সংরক্ষণ করেছিলেন।

২. শিয়া সম্প্রদায়ের আকিদা ও তার অকাট্য খণ্ডন:
শিয়া সম্প্রদায় মুখে খতমে নবুওয়তের কথা বললেও তাদের অভ্যন্তরীণ ‘ইমামত’ মতবাদে তারা প্রকারান্তরে নবুওয়তের ধারাবাহিকতা বহাল রেখেছে। তাদের আকিদা হলো—বারোজন নিষ্পাপ ইমামের ওপরও আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম ও গায়েবী ওহী নাযিল হয়, ইমামগণ নবীদের মতোই নিষ্পাপ (মা’সূম) এবং তাঁরা শরীয়তের হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল করার অধিকার রাখেন। এমনকি চরমপন্থী শিয়ারা দাবি করে যে হযরত ফাতিমা (রা.)-এর ওপর ওহী নাযিল হতো এবং সেই ওহী লিপিবদ্ধ করে ‘মুসহাফে ফাতিমা’ প্রস্তুত করা হয়েছে যা বর্তমান কুরআনের তিনগুণ। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রমাণ করেছেন যে, ইমামতের নামে ওহী ও নবীর গুণাবলী আরোপ করার এই আকিদা সম্পূর্ণ কুরআনবিরোধী, কুফরি এবং উম্মাহর সর্বসম্মত ইজমার চরম লঙ্ঘন।

١٢- تحدث عن الأدلة التى أبطل بها المؤلف عقائد أهل الإباحة مفصلا –

[১২. ‘আহলে ইবাহাত’ (স্বৈরাচারী ভোগবাদী ও ভ্রান্ত সুফী)-দের বিভ্রান্ত আকিদা খণ্ডনে কিতাবের লেখক ইমাম নাসাফী (রহ.) যেসব অকাট্য দলীল পেশ করেছেন তা বিস্তারিত লিখ।]

ভূমিকা:
ইসলামী ইতিহাসের বিভিন্ন যুগসন্ধিক্ষণে আধ্যাত্মিকতা ও মারেফাতের ভণ্ড মুখোশ পরে এক শ্রেণির বিভ্রান্ত চরমপন্থী গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছিল, যাদেরকে কালামশাস্ত্রে ‘আহলুল ইবাহাহ’ (أهل الإباحة) বা বাতেনিয়া-ইবাহিয়্যা বলা হয়। ইমাম আবুল মুঈন আন-নাসাফী (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘বাহরুল কালাম’ গ্রন্থে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ যুক্তি ও শরীয়তের অকাট্য নস দিয়ে এদের ভিত্তিহীন মতবাদের মূলোৎপাটন করেছেন।

১. আহলে ইবাহাতের পরিচয় ও তাদের কুফরি দাবি:
ইবাহাতপন্থীদের মূল স্লোগান ছিল—”বান্দা যখন সাধনার মাধ্যমে তাসাউফের সর্বোচ্চ স্তর তথা পরম প্রেমে পৌঁছে যায়, তখন তার জন্য বাহ্যিক শরীয়তের যাবতীয় দায়দায়িত্ব রহিত হয়ে যায়। ফলে সালাত, সিয়াম ইত্যাদি ইবাদতের আর কোনো আবশ্যকতা থাকে না এবং মদ, ব্যভিচার ও পরের সম্পদ ভোগ করাসহ সকল হারাম বিষয় তার জন্য হালাল (মুবাহ) হয়ে যায়।”

২. ইমাম নাসাফী (রহ.) কর্তৃক অকাট্য দলীলসমূহ ও বিভ্রান্তি খণ্ডন:
১. সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের বাস্তব আদর্শ: সমগ্র মানবজাতির মধ্যে স্বয়ং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর মহান সাহাবীগণই ছিলেন আল্লাহর সর্বাধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত ও মারেফাতের সর্বোচ্চ শিখরে সমাসীন। অথচ নবী করীম (সা.) ওফাতের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত পা ফুলে যাওয়া সত্ত্বেও তাহাজ্জুদ ও জামাআতে সালাত আদায় করে গেছেন। যদি মারেফাতে শরীয়ত বিলুপ্ত হওয়া সত্য হতো, তবে বিশ্বনবীই এর প্রথম হকদার হতেন। যে ভণ্ড নিজেকে নবীর চেয়েও আধ্যাত্মিক মনে করে ইবাদত ত্যাগ করে, সে সুনিশ্চিতভাবে শয়তানের দাস।
২. কুরআনের আয়াতের অপব্যাখ্যার জবাব: তারা সূরা হিজরের ৯৯ নম্বর আয়াতের অপব্যাখ্যা করে বলত—”ওয়া’বুদ রাব্বাকা হাত্তা ইয়া’তিয়াকাল ইয়াক্বীন” (ইয়াক্বীন আসা পর্যন্ত রবের ইবাদত কর)—এখানে ইয়াক্বীন মানে নাকি মারেফাত। ইমাম নাসাফী আরবী অভিধান ও সাহাবাদের তাফসীর উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেন যে, এখানে ‘ইয়াক্বীন’ অর্থ হলো নিশ্চিত অবধারিত ‘মৃত্যু’ (الموت)। অর্থাৎ মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি নিঃশ্বাসে শরীয়তের আনুগত্য করা ফরজ।
৩. ইজমা ও চার মাযহাবের চূড়ান্ত ফতোয়া: ইমাম নাসাফী এবং ইমাম গাযযালী (রহ.) ‘ফাদ্বায়িহুল বাতিনিয়্যা’ কিতাবে একমত হয়েছেন যে, যে ব্যক্তি কোনো একটি হারামকে হালাল মনে করে কিংবা শরীয়তের ফরজ ইবাদতকে বর্জনীয় দাবি করে, সে সর্বসম্মত ইজমায় মুরতাদ, যিন্দীক্ব ও কাফির। তাদের প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখানো জায়েয নেই; বরং উম্মাহর ঈমান সুরক্ষায় এদের মুখোশ উন্মোচন করা অপরিহার্য দ্বীনী দায়িত্ব।

١٣- بين حكم من لم تبلغه الدعوة –

[১৩. যার নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি (আহলে ফাতরাত), আখেরাতে তার শারঈ হুকুম কী হবে?]

ভূমিকা:
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় দুই নবীর মধ্যবর্তী যুগে কিংবা এমন প্রত্যন্ত ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ, যার জীবদ্দশায় কোনো নবী-রাসূলের দাওয়াত বা ইসলামের বার্তা পৌঁছেনি, তাকে ‘আহলে ফাতরাত’ (أهل الفترة) বলা হয়। পরকালে তাদের নাজাত ও শাস্তির ব্যাপারে মুতাকাল্লিমীনগণের মাঝে গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রয়েছে।

১. ইমাম আবুল হাসান আল-আশ’আরী ও জমহুর শাফেঈগণের মত:
তাঁদের সর্বসম্মত মতানুযায়ী, যাদের নিকট দাওয়াত পৌঁছেনি তারা পরকালে সম্পূর্ণ শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে এবং নাজাত লাভ করবে। তাঁদের মূল দলীল হলো পবিত্র কুরআনের সূরা বনী ইসরাঈলের ১৫ নম্বর আয়াত:
“وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا”
“আর আমি কোনো রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত কাউকেই শাস্তি প্রদান করি না।” তাঁদের মতে, শারঈ কোনো বাধ্যবাধকতা একক বিবেক দ্বারা সাব্যস্ত হয় না; বরং রাসূল প্রেরণের মাধ্যমেই কেবল দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

২. ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরিদী ও হানাফী ফকীহগণের মত:
ইমাম মাতুরিদী (রহ.) বলেন, শরীয়তের খুঁটিনাটি বিধান (যেমন নামায, রোজা) পালন না করার কারণে তাদের শাস্তি হবে না। কিন্তু একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে নিখিল মহাবিশ্ব ও স্বীয় অস্তিত্বের সুনিপুণ সৃষ্টি দেখে একজন মহান এক ও অদ্বিতীয় সৃষ্টিকর্তার ওপর ঈমান আনা বুদ্ধিগতভাবেই ওয়াজিব ছিল। যদি সে তাওহীদ বিশ্বাস করে মারা যায় তবে সে নাজাত পাবে; আর যদি মূর্তিপূজা বা শিরকে লিপ্ত থাকে তবে সে শাস্তি পাবে।

৩. সহীহ হাদীসের সমন্বয়:
মুসনাদে আহমাদের সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে—কিয়ামতের দিন চার শ্রেণির মানুষের (বধির, চরম নির্বোধ, অতি বৃদ্ধ এবং ফাতরাতের যুগের মানুষ) কোনো ওজর থাকবে না; তখন আল্লাহ তা’আলা হাশরের ময়দানে তাদের জন্য একজন দূত পাঠিয়ে বিশেষ আনুগত্যের পরীক্ষা নিবেন। যারা সেদিন আনুগত্য প্রদর্শন করবে তারা অনায়াসে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যারা অবাধ্য হবে তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।

١٤- بين عقيدة أهل السنة والجماعة فى رؤية الله تعالى –

[১৪. আখেরাতে জান্নাতী মুমিনদের দিদারে ইলাহী বা আল্লাহ তা’আলাকে স্বচক্ষে দর্শনের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা লিখ।]

ভূমিকা:
আখিরাতের চিরন্তন জীবনে জান্নাতী বান্দাদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ পরম প্রাপ্তি ও অকল্পনীয় পুরস্কার হলো স্বয়ং আল্লাহ তা’আলার পবিত্র দিদার বা স্বচক্ষে দর্শন লাভ করা। ইলমুল কালামে এটি ‘রূ’ইয়াতুল্লাহ’ (رؤية الله تعالى) নামে অভিহিত।

১. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সুদৃঢ় আকিদা:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত ও অকাট্য আকিদা হলো—কিয়ামতের ময়দানে এবং চিরস্থায়ী জান্নাতে মুমিন বান্দাগণ মহান আল্লাহকে তাঁদের বাস্তব চর্মচক্ষু দিয়ে সরাসরি দর্শন করবেন। তবে এই দর্শন কোনো জড়দেহের মতো হবে না; এতে কোনো দিক (জিহাত), দূরত্ব, সংযোগ বা সীমাবদ্ধতা থাকবে না। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ‘আল-ফিকহুল আকবার’-এ বলেন: “ولقاء الله تعالى لأهل الجنة حق بلا كيفية ولا تشبيه ولا جهة”—অর্থাৎ জান্নাতীদের জন্য আল্লাহর দর্শন সত্য; তবে তা কোনো রূপ-আকৃতি, সাদৃশ্য বা দিক ব্যতিরেকে সম্পন্ন হবে।

২. কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলীলসমূহ:
১. পবিত্র কুরআনের ঘোষণা: সূরা কিয়ামাহর ২২-২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেন:
“وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ ۝ إِلَىٰ رَبِّهَا نَاظِرَةٌ”
“সেদিন বহু মুখমণ্ডল আনন্দে উজ্জ্বল প্রস্ফুটিত হবে; তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।”
২. সহীহ বুখারী ও মুসলিমের প্রামাণ্য হাদীস: হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে ইরশাদ করলেন: “তোমরা অচিরেই তোমাদের প্রতিপালককে ঠিক তেমনই দেখতে পাবে যেমন এই পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে পাচ্ছ; তাঁর দর্শনে তোমরা কোনো ভিড় বা বাধার সম্মুখীন হবে না।”

৩. মু’তাযিলাদের ভ্রান্তির খণ্ডন:
মু’তাযিলা ও দার্শনিকরা যুক্তি প্রদর্শন করে বলে—কাউকে দেখতে হলে তাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট দিকে ও স্থানে থাকতে হয়, অথচ আল্লাহ স্থান ও দিকমুক্ত; সুতরাং তাঁকে দেখা অসম্ভব। আহলুস সুন্নাহ এর দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে বলেন: আল্লাহকে দেখা পার্থিব সীমাবদ্ধ দৃষ্টি দিয়ে হবে না, বরং আখেরাতে আল্লাহ মুমিনদের দৃষ্টিশক্তিতে এমন বিশেষ কুদরত দান করবেন যার ফলে স্থান ও দিক ছাড়াই তারা প্রভুর নূরানী দিদার উপভোগ করতে সক্ষম হবে।

١٥- تحدث عن مصير أطفال المشركين –

[১৫. মুশরিক ও অমুসলিমদের অপ্রাপ্তবয়স্ক মৃত শিশুদের আখেরাতের পরিণতি সম্পর্কে ফকীহদের মতামত লিখ।]

ভূমিকা:
যে সকল অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু বালেগ হওয়ার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছে এবং যাদের পিতামাতা মুশরিক বা অমুসলিম ছিল, আখেরাতে তাদের চূড়ান্ত পরিণতি ও অবস্থান নিয়ে ইসলামী ধর্মতত্ত্ববিদ ও মুহাদ্দিসগণের মাঝে বিশদ পর্যালোচনা রয়েছে।

১. মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি:
১. প্রথম মত (সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও অগ্রগণ্য মত – তারা জান্নাতী হবে): ইমাম নববী, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী ও অধিকাংশ মুহাক্কিক্বীনদের মতে মুশরিকদের নাবালক শিশুরা সরাসরি জান্নাতে প্রবেশ করবে। এর পক্ষে জোরালো দলীল হলো:
– পবিত্র কুরআনের মূলনীতি: “ওয়ালা তাযিরু ওয়াযিরাতুঁও বিযরা উখরা”—অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না। পিতামাতার কুফরির কারণে নিষ্পাপ শিশুকে শাস্তি দেওয়া আল্লাহর ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
– সহীহ বুখারীর বিখ্যাত মি’রাজের দীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে—রাসূলুল্লাহ (সা.) জান্নাতে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর পাশে বিপুল সংখ্যক শিশুকে দেখতে পান। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের শিশুরাও কি সেখানে আছে?” নবীজী (সা.) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উত্তর দিলেন: “ওয়া আওলাদুল মুশরিকীন” (হ্যাঁ, মুশরিকদের শিশুরাও তাদের অন্তর্ভুক্ত)।
২. দ্বিতীয় মত (তারা জাহান্নামে যাবে): কিছু প্রাচীন বর্ণনাকারীর মতে তারা পিতামাতার সাথে জাহান্নামে যাবে; তবে এ মতটি জমহুর ওলামায়ে কেরাম সর্বসম্মতভাবে অগ্রাহ্য ও বাতিল ঘোষণা করেছেন।
৩. তৃতীয় মত (হাশরের ময়দানে তাদের পরীক্ষা হবে): কোনো কোনো হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী কিয়ামতের দিন তাদেরকে আগুন দিয়ে পরীক্ষা করা হবে; যারা মানবে তারা জান্নাতে যাবে।
৪. চতুর্থ মত (তারা জান্নাতীদের খাদেম হবে): ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর একটি রেওয়ায়েত অনুযায়ী তারা জান্নাতীদের সেবক বা আরাফে অবস্থান করবে।

উপসংহার:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের চূড়ান্ত ফতোয়া হলো—সকল নবজাতক ফিতরাত তথা ইসলামের নিখাদ প্রকৃতির ওপর জন্মগ্রহণ করে; সুতরাং বালেগ হওয়ার আগে পাপহীন অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী সকল শিশুই আল্লাহর অসীম দয়ায় জান্নাত লাভ করবে।

١٦- ما الفرق بين المعجزة والكرامة؟

[১৬. মু’জিযা ও কারামতের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য সংক্ষেপে তুলে ধর।]

ভূমিকা:
ইসলামী আকাইদের পরিভাষায় সৃষ্টিজগতের সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়ম ও চাক্ষুষ কার্যকারণ শৃঙ্খলের বাইরে গিয়ে অতিপ্রাকৃতিক কোনো অলৌকিক বিষয়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোকে সামগ্রিকভাবে ‘খারিক্বে আদাত’ (خارق العادة) বলা হয়। এই অলৌকিক ঘটনা কার মাধ্যমে এবং কী উদ্দেশ্যে সংঘটিত হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে এটি প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত: মু’জিযা এবং কারামত।

১. মু’জিযা ও কারামতের তুলনামূলক বিশ্লেষণ:

পার্থক্যের বিষয় মু’জিযাহ (المعجزة) কারামত (الكرامة)
উৎস ও প্রকাশস্থল শুধুমাত্র আল্লাহর মনোনীত নিষ্পাপ নবী ও রাসূলগণের পবিত্র হাতে প্রকাশিত হয়। নবীর পূর্ণাঙ্গ অনুসারী মুত্তাক্বী অলী ও বুজুর্গগণের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
দাবি ও প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ এতে নবুওয়তের সুস্পষ্ট দাবি থাকে এবং অস্বীকারকারী কাফিরদের অনুরূপ কিছু এনে দেখানোর প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ (التحدي) থাকে। এতে নবুওয়ত বা শ্রেষ্ঠত্বের কোনো দাবি থাকে না; বরং অলীগণ একে আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করে যথাসম্ভব গোপন রাখতে চেষ্টা করেন।
প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সত্য দ্বীনের বিজয় নিশ্চিত করা, শত্রুদের যুক্তিহীন করে পরাস্ত করা এবং নবুওয়তের সত্যতা প্রমাণ করা। আল্লাহর নেককার বান্দাকে সম্মানিত করা, তার বিপদ দূর করা এবং নবীর সুন্নাহ অনুসরণের শুভ পরিণাম প্রকাশ করা।
অস্বীকারের শারঈ হুকুম কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদীসে বর্ণিত নবীদের মু’জিযা (যেমন মূসার লাঠি, চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়া) অস্বীকারকারী অকাট্য কাফির। কোনো বিশেষ অলীর কারামত অস্বীকার করলে কাফির হয় না; তবে সামগ্রিকভাবে কারামতের সত্যতা অস্বীকার করা চরম বিদআত।

২. দৃষ্টান্ত ও দার্শনিক তাৎপর্য:
– মু’জিযার দৃষ্টান্ত: হযরত মূসা (আ.)-এর লাঠি বিশাল অজগরে পরিণত হওয়া, হযরত ঈসা (আ.) কর্তৃক আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করা এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র কুরআন ও ইশারায় চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করা।
– কারামতের দৃষ্টান্ত: হযরত মারইয়াম (আ.)-এর নিকট মৌসুম ছাড়াই বেহেশতী ফলমূল আসা, আসহাবে কাহাফের তিনশত নয় বছর জীবিত থাকা এবং মদিনার মিম্বরে দাঁড়িয়ে হযরত ওমর (রা.) কর্তৃক শত মাইল দূরের সেনাপতি সারিয়াকে সতর্ক করা (ইয়া সারিয়া আল-জাবাল)। ইমাম নাসাফী ও ইমাম তাহাবী (রহ.) প্রমাণ করেছেন যে, অলীর কারামত প্রকৃতপক্ষে যে নবীর তিনি উম্মত, সেই নবীর মু’জিযারই একটি অন্তর্নিহিত শাখা ও জীবন্ত প্রমাণ।

١٧- ما هى المنزلة بين المنزلتين عند المعتزلة؟ فندها بالحجة القاطعة –

[১৭. মু’তাযিলাদের ‘আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন’ (দুই স্তরের মধ্যবর্তী স্তর) মতবাদ কী? অকাট্য যুক্তিতে তা খণ্ডন কর।]

১. মু’তাযিলাদের মতবাদের পরিচয়:
মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসিল ইবনে আতা কর্তৃক উদ্ভাবিত পাঁচটি মূলনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ‘আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন’ (المنزلة بين المنزلتين – দুই মর্যাদার মধ্যবর্তী মর্যাদা)। তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস অনুযায়ী—কোনো মুমিন ব্যক্তি যদি কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয় এবং খাঁটি তাওবা না করে মারা যায়, তবে সে ঈমান থেকে চিরতরে খারিজ হয়ে যায় কিন্তু সে কাফিরও হয় না; বরং ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি একটি স্বতন্ত্র কাল্পনিক স্তরে অবস্থান করে। তবে পরকালে সে চিরকালের জন্য জাহান্নামে অবস্থান করবে, যদিও তার আজাব কাফিরদের চেয়ে কিছুটা হালকা হবে।

২. আহলুস সুন্নাত কর্তৃক অকাট্য যুক্তিতে খণ্ডন:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত কুরআন, হাদীস ও সুস্থ বিবেকের আলোকে মু’তাযিলাদের এই চরমপন্থী মতবাদকে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও বাতিল প্রমাণ করেছেন:
১. কুরআনের অকাট্য শ্রেণিবিভাগ: আল্লাহ তা’আলা কুরআন মাজীদে সমগ্র মানবজাতিকে কেবল দুটি মৌলিক ভাগে বিভক্ত করেছেন; কোনো তৃতীয় মধ্যবর্তী দল নেই। সূরা আত-তাগাবুনের ২ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে:
“هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ فَمِنكُمْ كَافِرٌ وَمِنكُم مُّؤْمِنٌ”
“তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ কাফির এবং কেউ মুমিন।”
২. হাদীসের প্রমাণ ও সাহাবাদের আমল: রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম কবিরা গুনাহে লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও বহু মুমিনের জানাজার নামাজ আদায় করেছেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। যদি তারা ঈমান থেকে বেরই হয়ে যেত, তবে তাদের ওপর জানাজা পড়া সম্পূর্ণ হারাম হতো।
৩. ইজমার প্রমাণ: কবিরা গুনাহকারীকে মুসলিম সমাজে দাফন করা, তার সাথে বিবাহ বন্ধন বৈধ হওয়া এবং মীরাসের অংশ দেওয়া প্রমাণ করে যে সে মুমিন। সুতরাং মু’তাযিলাদের এই মতবাদ সম্পূর্ণ মনগড়া ও প্রত্যাখ্যাত।

١٨- بين حكمة نسخ شرائع من قبلنا فى ضوء بحر الكلام للنسفى –

[১৮. ‘বাহরুল কালাম’ গ্রন্থের আলোকে পূর্ববর্তী নবীদের শরীয়তসমূহ রহিত (নাসখ) হয়ে সর্বশেষ মুহাম্মাদী শরীয়ত কায়েমের হিকমত ও তাৎপর্য লিখ।]

ভূমিকা:
ইমাম আবুল মুঈন আন-নাসাফী (রহ.) তাঁর কালজয়ী কালামশাস্ত্রের গ্রন্থ ‘বাহরুল কালাম’-এ পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব ও শরীয়তসমূহ রহিত (নাসখ) হয়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র শরীয়ত দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার গভীর দার্শনিক ও আকিদাগত যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন।

১. পূর্ববর্তী শরীয়ত রহিত হওয়ার অন্তর্নিহিত হিকমতসমূহ:
১. স্থান ও কালের সাময়িক উপযোগিতা: পূর্ববর্তী সকল নবীর শরীয়ত (যেমন তাওরাত, ইঞ্জিল, যাবূর) সমগ্র বিশ্বের জন্য ছিল না; বরং তা নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ও নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়ের মানুষের জন্য উপযোগী করে প্রণীত হয়েছিল। মানবজাতির বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির সাথে সাথে সেই সাময়িক আইনের মেয়াদ সমাপ্ত হওয়া ছিল এক স্বাভাবিক অপরিহার্যতা।
২. মানবজাতির পূর্ণাঙ্গতা লাভ: একজন মানুষ শৈশব থেকে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ করলে যেমন তার খাদ্যাভ্যাস ও পোশাকে পরিবর্তন আসে, তেমনি মানবজাতি তার ঐতিহাসিক সূচনাপর্ব থেকে ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হয়ে আখেরি নবীর যুগে এসে মানসিক ও সামাজিক সার্বিক পরিপক্বতা লাভ করেছে। ফলে একটি চিরন্তন, সর্বজনীন ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
৩. পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের বিকৃতি সাধন: পূর্ববর্তী উম্মতগণ তাদের লোভ ও কুপ্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে আসমানী কিতাবগুলোতে মানবহস্তে মারাত্মক পরিবর্তন ও তাহরীফ ঘটিয়ে ফেলেছিল। ফলে বিকৃত আইনের পরিবর্তে একটি চিরন্তন অবিকৃত ঐশী সংবিধান হিসেবে কুরআন ও সুন্নাহর প্রবর্তন অনিবার্য ছিল।

২. মুহাম্মাদী শরীয়তের চিরন্তন শ্রেষ্ঠত্ব:
আল্লাহ তা’আলা সূরা আল-মায়িদার ৩ নম্বর আয়াতে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন:
“الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا”
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের একমাত্র দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” ইমাম নাসাফী প্রমাণ করেছেন যে, এই পূর্ণাঙ্গতার পর পূর্বের সকল বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবেই রহিত হয়ে গেছে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. কামিল ১ম বর্ষ হাদীস ৮ম পত্রের বিষয় ও কোড কী?

এ পত্রের বিষয় নাম হলো ‘আল-আকীদাহ আল-ইসলামিয়্যাহ’ (Al-Aqidah Al-Islamiyyah 8th Paper) এবং বিষয় কোড হলো ৬১১১০৮ (611108)।

২. এ পত্রে কোন কোন মূল আকিদা গ্রন্থ পাঠ্য রয়েছে?

এ পত্রে মূলত ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরিদী ও ইমাম নাসাফী (রহ.) সংকলিত ‘বাহরুল কালাম’ এবং আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মৌলিক কালামশাস্ত্র পাঠ্য রয়েছে।

৩. কবিরা গুনাহ করলে কি একজন মানুষ কাফির হয়ে যায়?

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা অনুযায়ী কবিরা গুনাহের কারণে মানুষ কাফির হয় না; বরং সে ফাসিক্ব মুমিন থাকে এবং আল্লাহর ইচ্ছায় ক্ষমা পেতে পারে।

৪. আখেরাতে কি আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখা সম্ভব?

হ্যাঁ, কুরআন ও সহীহ হাদীসের অকাট্য প্রমাণ অনুযায়ী কিয়ামতের দিন জান্নাতী মুমিনগণ কোনো প্রকার সাদৃশ্য ছাড়াই মহান আল্লাহকে স্বচক্ষে দর্শন লাভ করবেন।

৫. খতমে নবুওয়তের ওপর ঈমান রাখা কি আবশ্যক?

হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বশেষ নবী বিশ্বাস করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য শর্ত; তাঁর পরে যে কেউ নবুওয়তের দাবি করবে বা তাকে নবী মানবে সে নির্দ্বিধায় কাফির।

৬. পরীক্ষায় আকিদার প্রশ্নের উত্তর লেখার সর্বোত্তম কৌশল কী?

আহলুস সুন্নাতের বিশুদ্ধ বক্তব্য প্রথমে তুলে ধরা, সংশ্লিষ্ট বাতিল দলসমূহের (মু’তাযিলা, শিয়া, মুজাসসিমা) বিভ্রান্তি উল্লেখ করা এবং কুরআন-হাদীস ও যুক্তির আলোকে তা খণ্ডন করা।