আত-তারীখুল ইসলামী ওয়া তারীখু ইলমিল হাদীস ৬ষ্ঠ পত্র (At-Tarikhul Islami wa Tarikhu Ilmil Hadith 6th Paper) – 611106, হাদীস – কামিল ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
৪৫ মিনিট পড়ার সময়
১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

কামিল (স্নাতকোত্তর) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা, ২০২৪

বিষয়: আত-তারীখুল ইসলামী ওয়া তারীখু ইলমিল হাদীস (At-Tarikhul Islami wa Tarikhu Ilmil Hadith) — ৬ষ্ঠ পত্র [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]

বিষয় কোড: ৬১১১০৬ | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০

مجموعة (أ) : التاريخ الاسلامى (الدرجة – ٦٠) | مجموعة (ب) : تاريخ علم الحديث (الدرجة – ٤٠)

কামিল (মাস্টার্স) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা ২০২৪-এর ‘আত-তারীখুল ইসলামী ওয়া তারীখু ইলমিল হাদীস’ (At-Tarikhul Islami wa Tarikhu Ilmil Hadith – বিষয় কোড: ৬১১১০৬) বিষয়ের মূল প্রশ্নপত্র ও পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্য সমাধান নিচে উপস্থাপন করা হলো। ইসলামী খেলাফতের গৌরবময় রাজনৈতিক ইতিহাস এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাদীস সংকলনের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের গভীর পর্যালোচনামূলক এ গাইডটি পরীক্ষার্থীদের চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য এক অনন্য সম্পদ।

প্রশ্নকাঠামো ও উত্তর বিন্যাস:
১. ‘ক’ বিভাগ: আত-তারীখুল ইসলামী (মান: ৬০): ৪টি মূল প্রশ্ন (প্রতিটিতে অথবা প্রশ্নসহ) হতে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। (নম্বর: ১৫ × ৪ = ৬০)
২. ‘খ’ বিভাগ: তারীখু ইলমিল হাদীস (মান: ৪০): প্রশ্ন নং ৫ হতে যেকোনো ২টি বর্ণনামূলক (১৫ × ২ = ৩০) এবং প্রশ্ন নং ৬ হতে যেকোনো ২টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের (৫ × ২ = ১০) উত্তর দিতে হবে।
(পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির সুবিধার্থে বিকল্পসহ সকল প্রশ্নের উত্তর নিচে সন্নিবেশিত হলো)।

١- قارن بين أحوال العرب السياسية والثقافية والاقتصادية قبل مبعث النبى صلى الله عليه وسلم وبعده – (أو : كيف سميت واقعة الحديبية فتحا مبينا مع أن ظاهرها الهزيمة؟ وضح على ضوء القران والسيرة النبوية -)

[১. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বের ও পরের আরবের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার তুলনামূলক আলোচনা কর। অথবা: হুদায়বিয়ার সন্ধির বাহ্যিক রূপ আপাত পরাজয়ের মতো হলেও পবিত্র কুরআন ও সীরাতের আলোকে কীভাবে একে ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ (ফাতহুম মুবীন) আখ্যায়িত করা হয়েছে? বিশ্লেষণ কর।]

১. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আবির্ভাবের পূর্ব ও পরবর্তী আরবের তুলনামূলক চিত্র:

পর্যালোচনার ক্ষেত্র ইসলাম-পূর্ব জাহেলী আরবের অবস্থা ইসলাম আবির্ভাবের পরবর্তী সোনালী অবস্থা
রাজনৈতিক অবস্থা কোনো কেন্দ্রীয় সরকার বা সংবিধান ছিল না। গোত্রীয় কলহ, ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি এবং শতবর্ষী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ (যেমন হারবুল ফুজ্জার, দাহিস ও গাবরা যুদ্ধ) বিদ্যমান ছিল। মদিনা সনদভিত্তিক সুসংহত ইসলামী রাষ্ট্র গঠিত হয়। সমগ্র আরব ভূখণ্ড এক কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে আসে এবং আইনের শাসন ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয়।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অবস্থা কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া, যথেচ্ছ বহুবিবাহ, অশ্লীল মদ্যপান, জুয়া এবং দাস-দাসীদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন ছিল স্বাভাবিক সংস্কৃতি। গোত্রীয় অহংকারই ছিল জীবনের মাপকাঠি। নারী অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত হয়; কন্যা সন্তানকে রহমত ঘোষণা করা হয়; তাকওয়ার ভিত্তিতে সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বমানবতার কালজয়ী আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়।
অর্থনৈতিক অবস্থা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের মহাজনী শোষণ, ওজনে কারচুপি, রাহাজানি ও দস্যুবৃত্তি ছিল অর্থনীতির মূল ভিত্তি। ধনীদের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত থাকত। সুদমুক্ত বায়তুল মাল ব্যবস্থা কায়েম হয়। যাকাত, সাদাক্বাহ ও ওশর ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়; ফলে অভাবী মানুষের সংকট চিরতরে দূর হয়।

২. বিকল্প আলোচনা: হুদায়বিয়ার সন্ধি কেন ‘ফাতহুম মুবীন’ (সুস্পষ্ট বিজয়):
ষষ্ঠ হিজরীতে সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধির বাহ্যিক শর্তাবলি আপাতদৃষ্টিতে মুসলিমদের প্রতিকূলে মনে হয়েছিল (যেমন: কোনো মুসলিম মক্কায় আশ্রয় নিলে কুরাইশরা ফেরত দিবে না, কিন্তু মক্কার কেউ মদিনায় গেলে ফেরত দিতে হবে)। এ কারণে ওমর (রা.)-এর মতো দৃঢ়চেতা সাহাবীও প্রাথমিক অবস্থায় ব্যথিত হয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা কুরআন মাজীদে ঘোষণা করেন: “ইন্না ফাতাহনা লাকা ফাতহাম মুবীনা” (নিশ্চয় আমি আপনাকে এক প্রকাশ্য বিজয় দান করেছি)।
– বিজয়ের বাস্তব কারণসমূহ:
১. মদিনা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বীকৃতি: এতদিন যারা মুসলিমদের অস্তিত্ব স্বীকার করত না, সেই পরাক্রমশালী কুরাইশরা মদিনা রাষ্ট্রকে সমমর্যাদার শক্তি হিসেবে লিখিত চুক্তি সম্পাদনে বাধ্য হয়।
২. শান্তি ও অবাধ দাওয়াতের সুযোগ: দশ বছরের যুদ্ধবিরতির সুযোগে আরবের সকল গোত্রের সাথে মুসলিমদের অবাধ মেলামেশা শুরু হয়। ইসলামের সৌন্দর্য ও যুক্তির প্রভাবে মাত্র দুই বছরে যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে, তা বিগত উনিশ বছরের মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি ছিল (যেমন খালিদ বিন ওয়ালীদ ও আমর ইবনুল আস (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ)।
৩. মক্কা বিজয়ের রাজপথ উন্মোচন: এ সন্ধির ফলশ্রুতিতেই অষ্টম হিজরীতে সম্পূর্ণ রক্তপাতহীনভাবে ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের দ্বার উন্মোচিত হয়।

٢- تحدث عن الوقائع التى لأجلها لقب الخليفة الأول أبو بكر رضى الله عنه منقذا للإسلام – (أو : اكتب نبذة عن حياة عمر بن الخطاب رضى الله تعالى عنه مع ذكر الفتوحات فى عهده -)

[২. যে সকল ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রা.)-কে ‘ইসলামের ত্রাণকর্তা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়, তা সবিস্তারে আলোচনা কর। অথবা: হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর জীবনকর্ম এবং তাঁর শাসনামলে মুসলিম সাম্রাজ্যের বিশ্ববিজয়ের ইতিহাস তুলে ধর।]

১. হযরত আবু বকর (রা.) কেন ‘ইসলামের ত্রাণকর্তা’ (منقذ الإسلام):
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহ ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত হয়েছিল। চরম শোকের পাশাপাশি মদিনার রাষ্ট্রব্যবস্থা চারদিক থেকে বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। হযরত আবু বকর (রা.) ঈমানী দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সাথে যে সকল সংকট মোকাবিলা করে ইসলামকে রক্ষা করেছিলেন:
১. ওফাতের চরম মানসিক ধাক্কা সামলানো: ওফাতের সংবাদে যখন সাহাবায়ে কেরাম বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন, তখন আবু বকর (রা.) ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে উম্মাহর ঈমানকে সঠিক দিশা দেন: “যে মুহাম্মদের ইবাদত করত সে জেনে রাখুক তিনি ওফাত পেয়েছেন, আর যে আল্লাহর ইবাদত করে নিশ্চয় আল্লাহ চিরঞ্জীব।”
২. উসামার সৈন্যবাহিনী প্রেরণ: চারদিকে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠা সত্ত্বেও তিনি রাসূল (সা.)-এর অন্তিম আদেশ অনুযায়ী উসামা বিন যায়েদের রোমান অভিযান স্থগিত করেননি। ফলে পারস্য ও রোম বুঝতে পারে মুসলিমদের শক্তি অটুট রয়েছে।
৩. মুরতাদ ও ভণ্ড নবীদের দমন (حروب الردة): মুসায়লামা কাযযাব, আসওয়াদ আনসী, তুলাইহা আসাদী ও সাজাহ-এর মতো ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে আপসহীন জিহাদ ঘোষণা করে ইয়ামামার যুদ্ধে নবুওয়তের দাবিদারদের চিরতরে নির্মূল করেন।
৪. যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ: যারা বলত ‘নামাজ পড়ব কিন্তু যাকাত দেব না’, তাদের বিরুদ্ধে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন: “আল্লাহর কসম! রাসূলের যুগে যারা উটের একটি রশিও যাকাত দিত, তা দিতে অস্বীকার করলে আমি তাদের বিরুদ্ধে একাকী জিহাদ করব।”
৫. পবিত্র কুরআন সংকলন: ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজে কুরআনের শাহাদাতের পর হযরত ওমরের পরামর্শে যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে পবিত্র কুরআনকে প্রথম গ্রন্থাকারে সংকলন করান। এজন্য ঐতিহাসিকগণ একবাক্যে বলেন: “আবু বকর ছিলেন ইসলামের ত্রাণকর্তা।”

২. বিকল্প আলোচনা: হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর জীবনী ও বিজয়াভিযান:
হযরত ওমর (রা.) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা। তাঁর কঠোর ইনসাফ, প্রশাসনিক সংস্কার ও সামরিক দূরদর্শিতার কারণে ইসলামী খিলাফত এক অপরাজেয় বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়।
– ১০ বছরের শাসনামলে (১৩-২৩ হি.) ঐতিহাসিক বিজয়াভিযান:
১. রোমান সাম্রাজ্যের পতন: ১৩ হিজরীতে ইয়ারমুকের রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক যুদ্ধে রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের বিশাল বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে সমগ্র সিরিয়া (শাম), দামেশক ও ফিলিস্তিন মুসলিমদের পদানত হয়। ১৬ হিজরীতে স্বয়ং খলীফা জেরুজালেম সফর করে বায়তুল মুকাদ্দাসের চাবি গ্রহণ করেন।
২. পারস্য (সাসানীয়) সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি: ১৪ হিজরীতে ক্বাদিসিয়ার মহাযুদ্ধে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে পারস্যের দম্ভ চূর্ণ হয় এবং তাদের রাজধানী মাদায়েন বিজিত হয়। পরবর্তীতে ২১ হিজরীতে নিহাওয়ান্দের যুদ্ধকে ‘ফাতহুল ফুতূহ’ (বিজয়সমূহের সেরা বিজয়) বলা হয়, যার মাধ্যমে পারস্যের হাজার বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে।
৩. মিশর বিজয়: আমর ইবনুল আস (রা.)-এর নেতৃত্বে রোমানদের হাত থেকে সমগ্র মিশর মুক্ত হয় এবং ফুসতাত নগরী প্রতিষ্ঠিত হয়।

٣- تحدث عن الفتوحات التى حازها المسلمون أيام خلافة معاوية رضى الله تعالى عنه – (أو : اكتب نبذة عن حياة عبد المالك بن مروان مع ذكر التحديات التى واجهها فى عهده -)

[৩. হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর খিলাফতকালে মুসলিমদের ভৌগোলিক ও নৌ-বিজয়াভিযানসমূহ সবিস্তারে আলোচনা কর। অথবা: উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ানের জীবনী এবং তাঁর শাসনামলে মোকাবিলাকৃত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জসমূহ আলোচনা কর।]

১. হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর খিলাফতকালে অর্জিত বিজয়াভিযানসমূহ:
হযরত মুয়াবিয়া (রা.) উমাইয়া খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তাঁর ২০ বছরের শাসনামলে (৪১-৬০ হি.) মুসলিম খিলাফতের সীমানা এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের দ্বারপ্রান্তে নাটকীয়ভাবে প্রসারিত হয়:
১. মুসলিম নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ও ভূমধ্যসাগর বিজয়: তিনি প্রথম মুসলিম নৌবাহিনী গঠন করেন। তাঁর যুগে সাইপ্রাস, রোডস ও ক্রিট দ্বীপপুঞ্জ বিজিত হয় এবং ভূমধ্যসাগরে বাইজেন্টাইন রোমানদের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটে।
২. কনস্টান্টিনোপল (কুসতুনতুনিয়া) অবরোধ: রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের লক্ষ্যে ৪৯ হিজরীতে প্রথম ঐতিহাসিক নৌ ও স্থল অভিযান পরিচালিত হয়, যাতে স্বয়ং হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) অংশগ্রহণ করে দুর্গের প্রাচীরের পাদদেশে শাহাদাত বরণ করেন।
৩. উত্তর আফ্রিকা বিজয়: মহাবীর ওকবা ইবনে নাফে’র নেতৃত্বে সমগ্র উত্তর আফ্রিকা বিজিত হয় এবং ৫০ হিজরীতে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ‘কাইরুয়ান’ নগরী প্রতিষ্ঠিত হয়।
৪. মধ্য এশিয়া ও সিন্ধুর সীমান্তে অগ্রগতি: খোরাসান, সিজিস্তান, কাবুল ও বলখ পর্যন্ত মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তৃত হয় এবং মুহাম্মাদ ইবনুল কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।

২. বিকল্প আলোচনা: খলীফা আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ানের চ্যালেঞ্জ ও অবদান:
আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ান (৬৫-৮৬ হি.) ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের প্রকৃত সুসংহতকারী ও শ্রেষ্ঠ সংস্কারক। তিনি খিলাফতের দায়িত্ব নিয়ে বহুমুখী গৃহযুদ্ধ ও চরম রাজনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হন:
– তিনি যে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেন:
১. আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.)-এর খেলাফত আন্দোলন: হিজায ও ইরাকে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.)-এর সুদৃঢ় শাসন ছিল। আব্দুল মালেক হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে পাঠিয়ে ৭৩ হিজরীতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে হিজায উমাইয়া শাসনের অধীনে আনেন।
২. মুখতার সাক্বাফীর আন্দোলন: কুফায় ইমাম হুসাইন (রা.)-এর রক্তের বদলা নেওয়ার নামে চরমপন্থী শিয়া বিদ্রোহ ও রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন দমন করেন।
৩. খারিজী বিদ্রোহীদের মূলোৎপাটন: চরমপন্থী আযারেক্বা ও নাজদাত খারিজীদের উপর্যুপরি সশস্ত্র বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করে রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
– ঐতিহাসিক সংস্কারসমূহ:
১. আরবি মুদ্রার প্রচলন: রোমান ও পারস্য মুদ্রার পরিবর্তে প্রথম খাঁটি ইসলামিক স্বর্ণের দীনার ও রৌপ্যের দিরহাম চালু করেন।
২. দাপ্তরিক ভাষা আরবীকরণ: ফার্সি ও গ্রিক ভাষার পরিবর্তে খিলাফতের সকল দপ্তরের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে আরবি নির্ধারণ করেন।
৩. কুব্বাতুস সাখরা নির্মাণ: জেরুজালেমে অনুপম স্থাপত্যশৈলীতে ডোম অব দ্য রক (গম্বুজে সাখরা) নির্মাণ করেন।

٤- كيف تم تأسيس الخلافة العباسية؟ بين مفصلا – (أو : اكتب نبذة عن حياة الخليفة هارون الرشيد مع ذكر الازدهار العلمى والثقافى فى عهده -)

[৪. আব্বাসীয় খিলাফত কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? বিস্তারিত ইতিহাস বর্ণনা কর। অথবা: আব্বাসীয় খলীফা হারুন-অর-রশীদের জীবনী এবং তাঁর শাসনামলে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক স্বর্ণযুগের বিকাশ তুলে ধর।]

১. আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত (تأسيس الخلافة العباسية):
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা.)-এর বংশধরদের দ্বারা ১৩২ হিজরীতে (৭৫০ খ্রি.) আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। এর নেপথ্যের ঐতিহাসিক স্তরসমূহ:
১. উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে গণ-অসন্তোষ: উমাইয়াদের আরব-প্রীতি, অনারব মুসলিমদের (মাওয়ালী) প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ এবং কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনার ফলে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল।
২. গোপন দাওয়াত ও প্রচার কাজ (الدعوة العباسية): মুহাম্মদ ইবনে আলী আল-আব্বাসী প্রথম খোরাসান ও কুফায় গোপন প্রচার জাল বিস্তার করেন। তাঁরা অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে স্লোগান দেন—“আর-রিযা মিন আলি মুহাম্মদ” (মুহাম্মদ সা.-এর বংশের যোগ্য ব্যক্তির সন্তুষ্টির দিকে আহ্বান), যার ফলে সাধারণ শিয়ারাও ভাবত আলী পরিবারের কাউকে খলীফা করা হবে।
৩. আবু মুসলিম খোরাসানীর উত্থান: এক ক্ষণজন্মা সামরিক প্রতিভাবান দাস আবু মুসলিম খোরাসানকে আব্বাসীয়দের প্রধান সামরিক নেতা বানানো হয়। ১২৯ হিজরীতে তিনি খোরাসানে কালো পতাকা উত্তোলন করে প্রকাশ্যে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করেন।
৪. যাবের ঐতিহাসিক যুদ্ধ (১৩২ হি.): টাইগ্রিস নদীর উপনদী যাবের তীরে উমাইয়াদের শেষ খলীফা দ্বিতীয় মারওয়ান এবং আব্বাসীয় সেনাপতি আব্দুল্লাহ বিন আলীর মাঝে চূড়ান্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মারওয়ান পরাজিত হয়ে মিশরে পালিয়ে গিয়ে নিহত হন।
৫. খিলাফতের ঘোষণা: কুফার জামে মসজিদে আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ (রক্তপাতকারী) প্রথম আব্বাসীয় খলীফা হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেন এবং উমাইয়া রাজবংশের রক্তক্ষয়ী পরিসমাপ্তি ঘটে।

২. বিকল্প আলোচনা: খলীফা হারুন-অর-রশীদের জীবনী ও সাংস্কৃতিক স্বর্ণযুগ:
হারুন-অর-রশীদ (১৭০-১৯৩ হি.) ছিলেন আব্বাসীয় খিলাফতের পঞ্চম এবং ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতাপশালী ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। তাঁর স্বর্ণযুগ আরব উপকথার ‘আলিফ লায়লা’ (সহস্র এক রজনী)-র রূপকথায় চিরভাস্বর হয়ে আছে।
– জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ:
১. বাইতুল হিকমাহ (دار الحكمة) প্রতিষ্ঠা: বাগদাদে বিশ্বের প্রথম সমন্বিত একাডেমি, গবেষণাগার ও সুবিশাল অনুবাদকেন্দ্র স্থাপন করেন, যেখানে গ্রিক, পারস্য, ভারতীয় ও সিরিয়াক ভাষার শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক গ্রন্থসমূহ আরবিতে অনূদিত হয়।
২. আলেম ও ফকীহদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা: প্রধান বিচারপতি হিসেবে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-কে নিয়োগ দেন এবং তাঁর দ্বারা প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নীতিগ্রন্থ ‘কিতাবুল খারাজ’ রচনা করান। ইমাম মালেক, সুফিয়ান সাওরী ও ইমাম শাফেঈর প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল।
৩. আন্তর্জাতিক মর্যাদা: তাঁর দরবারের দূত ফ্রান্সের রাজা শার্লেমেনের রাজদরবারে পানিঘড়ি উপহার পাঠিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি নিজে এক বছর হজ্জ করতেন এবং অপর বছর সীমান্ত জিহাদে সেনাপতিত্ব করতেন।

٥- اجب عن اثنين : (أ) متى بدأ تدوين الحديث رسميا؟ اذكر مميزات التدوين فى ذلك الحين، (ب) اكتب أشهر المصنفات فى القرن الرابع الهجرى مع دراسة موجزة لمستدرك الحاكم النيسابورى، (ج) ما المسند؟ اكتب نبذة عن حياة الإمام أحمد ومزايا كتابه “المسند”، (د) تحدث عن تاريخ دخول علم الحديث فى شبه القارة الهندية بالتفصيل –

[৫. যে কোনো দুটির পূর্ণাঙ্গ উত্তর দাও: (ক) রাষ্ট্রীয়ভাবে হাদীস সংকলন কখন শুরু হয়? সে সময়কার সংকলনের বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর; (খ) চতুর্থ হিজরি শতকে সংকলিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহের নাম লেখ এবং হাকিম নিশাপুরীর ‘আল-মুস্তাদরাক’ গ্রন্থের পর্যালোচনা দাও; (গ) মুসনাদ কাকে বলে? ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের জীবনী ও তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য লিখ; (ঘ) ভারতীয় উপমহাদেশে ইলমুল হাদীস চর্চার প্রারম্ভিক ইতিহাস সবিস্তারে লিখ।]

(ক) রাষ্ট্রীয়ভাবে হাদীস সংকলন ও সে সময়কার সংকলন বৈশিষ্ট্য:
উমাইয়া খলীফা হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.)-এর শাসনামলে (৯৯-১০১ হি.) হিজরী প্রথম শতকের সমাপ্তিলগ্নে রাষ্ট্রীয় আদেশে সর্বজনীন হাদীস সংকলন শুরু হয়। খলীফার নির্দেশে মদিনার গভর্ণর আবু বকর ইবনে হাযম এবং ইমাম ইবনে শিহাব আয-যুহরী (রহ.) রাষ্ট্রীয় দিওয়ান প্রস্তুত করেন।
– তৎকালীন সংকলনের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. আহকাম ও ফিকহী অধ্যায়বিন্যাসের প্রাথমিক রূপ: সালাত, রোজা, জাকাত ইত্যাদি মৌলিক ফিকহী বিষয়ে হাদীস একত্রিত করা হয়।
২. মারফূ হাদীসের সাথে আসার ও ফতোয়ার মিশ্রণ: এ যুগের কিতাবগুলোতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সহীহ হাদীসের পাশাপাশি সাহাবা ও বড় বড় তাবেঈনের ফতোয়া ও আসার একসাথে সংকলিত হতো (যেমন ইমাম মালিকের মুয়াত্তা)।
৩. সনদের বিশুদ্ধতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব: রাবীদের সততা যাচাই করে প্রতিটি স্তরের নাম উল্লেখের ধারা সূচিত হয়।

(খ) চতুর্থ হিজরি শতকের প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলী ও মুস্তাদরাকে হাকেম-এর পর্যালোচনা:
চতুর্থ হিজরীতে সংকলিত অমর কিতাবসমূহ: ১. সহীহ ইবনে হিব্বান; ২. মুসনাদে আবি আওয়ানাহ; ৩. মু’জামে তাবারানী (সগীর, আওসাত, কাবীর); ৪. শরহু মা’য়ানিল আছার (ইমাম তহাবী); ৫. সুনানুত দারাকুতনী; ৬. আল-মুস্তাদরাকু আলাছ ছহীহাইন (ইমাম হাকেম)।
– মুস্তাদরাকে হাকেম-এর বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা:
ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-হাকেম আন-নিশাপুরী (ওফাত ৪০৫ হি.) এ কিতাবে সেই সকল সহীহ হাদীস সংকলন করেছেন, যা ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের নির্ধারিত কঠিন শর্তে উত্তীর্ণ, কিন্তু তাঁরা নিজেদের গ্রন্থে তা আনেননি। কিতাবটিতে ইমাম হাকেম হাদীসের স্তরে কিছুটা শিথিলতা (تساهل) প্রদর্শন করেছেন বলে আল্লামা যাহাবী (রহ.) ‘তালখীসুল মুস্তাদরাক’ লিখে এর প্রতিটি হাদীসের কঠোর তাহকীক সম্পন্ন করেন।

(গ) আল-মুসনাদের পরিচয়, ইমাম আহমদ ও তাঁর মুসনাদের বৈশিষ্ট্য:
– মুসনাদের সংজ্ঞা: যে হাদীস গ্রন্থে ফিকহী বিষয়ভিত্তিক বিন্যাসের পরিবর্তে সাহাবীদের নামের ক্রমানুসারে (যেমন আশারায়ে মুবাশশারা, এরপর অন্যান্য সাহাবী) সকল হাদীস এক জায়গায় সাজানো হয়, তাকে ‘মুসনাদ’ বলে।
– ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.): ১৬৪ হিজরীতে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চার প্রধান মাযহাবের অন্যতম ইমাম। জাহমী মু’তাযিলাদের ‘খালক্বে কুরআন’ ফেতনার বিরুদ্ধে অটল থেকে অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে ‘ইমামু আহলিস সুন্নাহ’ উপাধি পান। ২৪১ হিজরীতে ওফাত লাভ করেন।
– মুসনাদে আহমদের বৈশিষ্ট্য: এটি প্রায় ৪০,০০০ হাদীসের এক মহাসমুদ্র। এতে প্রায় ৭০০ সাহাবীর সূত্রে বর্ণিত হাদীস রয়েছে। ইমাম আহমদ নিজেই বলেন, “আমি এ কিতাবটি মুসলিমদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে প্রস্তুত করেছি।”

(ঘ) ভারতীয় উপমহাদেশে ইলমুল হাদীস চর্চার প্রারম্ভিক ইতিহাস:
ভারতীয় উপমহাদেশে ইলমুল হাদীসের সূচনা হয় সাহাবায়ে কেরামের যুগে নৌ-বাণিজ্যের মাধ্যমে মালাবার উপকূলে। ৯৩ হিজরীতে মুহাম্মদ ইবনুল কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে সিন্ধু ও মুলতানে হাদীসের আনুষ্ঠানিক চর্চাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রাবী ইবনে সুবাইহ আস-সাদী ভারতে আগমন করে ইন্তেকাল করেন। পরবর্তীতে মুঘল যুগে শায়খ আলী আল-মুত্তাক্বী হিন্দী (কানযুল উম্মাল প্রণেতা), শায়খ আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিসে দেহলভী এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর মাধ্যমে দিল্লীর ‘মাদ্রাসায়ে রাহীমিয়া’কে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষে হাদীস চর্চার বিশ্ববিখ্যাত বিপ্লব সাধিত হয়।

٦- اجب بالاختصار عن اثنين : (أ) لم نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن كتابة الحديث فى اول الأمر؟، (ب) ما السنن؟ اكتب أربعة من كتب السنن مع ذكر اسماء مؤلفيها، (ج) كتب الموضوعات ما هى؟ اكتب أسباب وضع الحديث، (د) كيف تطور علم الحديث فى بنغلاديش –

[৬. যে কোনো দুটির সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও: (ক) রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথম দিকে কেন হাদীস লিখতে নিষেধ করেছিলেন? (খ) আস-সুনান কাকে বলে? গ্রন্থকারের নামসহ ৪টি সুনান গ্রন্থের নাম লেখ; (গ) কুতুবুল মাওদূ’আত কী? হাদীস জালকরণের কারণসমূহ লিখ; (ঘ) বাংলাদেশে ইলমুল হাদীসের বিকাশ কীভাবে ঘটেছিল?]

(ক) প্রথম দিকে হাদীস লেখায় নিষেধাজ্ঞার কারণ:
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছিলেন: “লা তাকতুবূ আন্নী, ওয়ামান কাতাবা আন্নী গাইরাল কুরআনি ফালইয়ামহুহু” (আমার নিকট হতে কুরআন ছাড়া আর কিছু লিখো না; যে লিখেছে সে যেন তা মুছে ফেলে)। এর কারণ ছিল:
১. কুরআনের সাথে মিশ্রণের আশঙ্কা: তখন ওহী নাজিল হচ্ছিল, সাহাবীরা একই পাত্র বা পাতায় কুরআনের পাশাপাশি হাদীসের ব্যাখ্যা লিখে ফেললে ভবিষ্যতে আসমানী কিতাবের সাথে তা গুলিয়ে যাওয়ার গভীর আশঙ্কা ছিল।
২. মুখস্থশক্তির ওপর নির্ভরতা: আরবদের স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর, লেখার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়লে তাদের মুখস্থশক্তির ধার বিনষ্ট হতো। পরবর্তীতে কুরআন সংকলন সুসংহত হলে এবং ভুল বুঝার অবকাশ না থাকায় রাসূল (সা.) হাদীস লেখার সর্বজনীন অনুমতি দান করেন।

(খ) আস-সুনান ও চারটি প্রধান সুনান গ্রন্থ:
– সংজ্ঞা: যে হাদীস গ্রন্থে আক্বীদা, ইতিহাস বা আখলাক্বী আলোচনার পরিবর্তে নিখাদ ফিকহী অনুচ্ছেদ অনুযায়ী (ত্বহারাত, সালাত, যাকাত, নিকাহ, বুয়ূ ইত্যাদি) কেবল মারফূ আহকাম সংক্রান্ত হাদীস সংকলন করা হয়, তাকে ‘সুনান’ বলে।
– চারটি বিখ্যাত সুনান গ্রন্থ:
১. সুনানু আবি দাউদ: সংকলক ইমাম আবু দাউদ সুলাইমান ইবনুল আশ’আছ আস-সিজিস্তানী (রহ.)।
২. জামে’উত তিরমিযী (সুনানুত তিরমিযী): সংকলক ইমাম আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা আত-তিরমিযী (রহ.)।
৩. সুনানুন নাসাঈ (আল-মুজতাবা): সংকলক ইমাম আহমদ ইবনে শুআইব আন-নাসাঈ (রহ.)।
৪. সুনানু ইবনে মাজাহ: সংকলক ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াযীদ ইবনে মাজাহ আল-ক্বাযবিনী (রহ.)।

(গ) কুতুবুল মাওদূ’আত ও হাদীস জালকরণের কারণসমূহ:
– সংজ্ঞা: যে সকল হাদীস গ্রন্থে কেবল বানোয়াট, মিথ্যা ও রাসূলের নামে আরোপিত জাল বর্ণনাগুলোকে চিহ্নিত করে উম্মাহকে সতর্ক করার জন্য একত্রিত করা হয়, তাকে ‘কুতুবুল মাওদূ’আত’ বলে (যেমন ইমাম ইবনুল জাওযীর ‘আল-মাওদূ’আতুল কুবরা’)।
– হাদীস জালকরণের প্রধান কারণসমূহ:
১. ইসলাম ধ্বংসের সুপ্ত ষড়যন্ত্র: যিন্দীক্ব ও মুনাফিক্বরা ইসলামের মূল বিশ্বাস নস্যাৎ করতে কোটি কোটি মিথ্যা কথা তৈরি করত।
২. মাযহাবী ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব: শিয়া, খারেজী ও বিভিন্ন গোত্রের অনুসারীরা নিজেদের দল বা নেতার পক্ষে রায় পেতে হাদীস বানাত।
৩. সওয়াবের মিথ্যা আশায় অজ্ঞ আবেদদের অপচেষ্টা: কিছু দরবেশ নামধারী মানুষ কুরআন তিলাওয়াত ও নফল ইবাদতে উদ্বুদ্ধ করতে মনগড়া ফযীলতের হাদীস তৈরি করেছিল।
৪. শাসকদের তোষামোদ ও রুজি-রোজগার: বাদশাহদের মন জয় করতে বা ওয়াজ মাহফিলে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গল্পকাররা হাদীস জাল করত।

(ঘ) বাংলাদেশে ইলমুল হাদীসের বিকাশ:
বাংলাদেশে হাদীস চর্চার গোড়াপত্তন হয় প্রাচীন চট্টগ্রাম বন্দর ও সোনারগাঁওয়ে সুফী-সাধক ও আলেমদের আগমনের মাধ্যমে। সুলতানী আমলে শায়খ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (রহ.) সোনারগাঁওয়ে সুবৃহৎ হাদীস শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে দেওবন্দের মহান সিলসিলা অনুযায়ী বিংশ শতাব্দীতে দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসা (১৯০১ খ্রি.) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক দাওরায়ে হাদীস ও কামিল মাদ্রাসার মাধ্যমে আলিয়া ও কওমী উভয় ধারায় হাদীস চর্চার অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধিত হয়, যার ফলশ্রুতিতে আজ বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ আলিম হাদীসের প্রচার ও গবেষণায় বিশ্বব্যাপী অবদান রাখছেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. কামিল ১ম বর্ষ হাদীস ৬ষ্ঠ পত্রের নাম ও বিষয় কোড কী?

এ পত্রের বিষয় নাম হলো ‘আত-তারীখুল ইসলামী ওয়া তারীখু ইলমিল হাদীস’ (At-Tarikhul Islami wa Tarikhu Ilmil Hadith 6th Paper) এবং বিষয় কোড হলো ৬১১১০৬ (611106)।

২. এ পত্রে ইতিহাসের কোন কোন অংশ অন্তর্ভুক্ত?

এ পত্রে জাহেলী যুগের আরব, খোলাফায়ে রাশেদীন, উমাইয়া খিলাফত, আব্বাসীয় খিলাফতের পাশাপাশি ইলমে হাদীস সংকলনের সুদীর্ঘ ইতিহাস ও উপমহাদেশে হাদীস চর্চার বিবরণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

৩. হুদায়বিয়ার সন্ধিকে কেন প্রকাশ্য বিজয় বলা হয়?

কারণ এ সন্ধির ফলে যুদ্ধের অবসান ঘটে, মদিনা রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় এবং শান্তির পরিবেশে আরবের ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে মানুষের দলে দলে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

৪. উমাইয়া যুগের শ্রেষ্ঠ সংস্কারক খলীফা কে ছিলেন?

উমাইয়া যুগের শ্রেষ্ঠ সংস্কারক খলীফা ছিলেন আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ান, যিনি আরবি মুদ্রার প্রবর্তন এবং রাজকীয় দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে আরবি চালু করেন।

৫. আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগ কার শাসনামলকে বলা হয়?

পঞ্চম আব্বাসীয় খলীফা হারুন-অর-রশীদের শাসনামলকে জ্ঞান-বিজ্ঞান, বাইতুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার কারণে স্বর্ণযুগ বলা হয়।

৬. কুতুবে সিত্তাহর অন্তর্ভুক্ত চারটি সুনান গ্রন্থ কী কী?

চারটি প্রধান সুনান গ্রন্থ হলো—সুনানু আবি দাউদ, সুনানুত তিরমিযী, সুনানুন নাসাঈ এবং সুনানু ইবনে মাজাহ।