কামিল (স্নাতকোত্তর) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা, ২০২৪
বিষয়: মুসতালাহুল হাদীস ওয়া মানাহিজুল মুহাদ্দিসীন (Mustalahul Hadith wa Manahijul Muhaddithin) — ৫ম পত্র [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
বিষয় কোড: ৬১১১০৫ | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
الجزء الأول : مصطلح الحديث (الدرجة – ٦٠) | الجزء الثاني : مناهج المحدثين (الدرجة – ٤٠)
কামিল (মাস্টার্স) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা ২০২৪-এর ‘মুসতালাহুল হাদীস ওয়া মানাহিজুল মুহাদ্দিসীন’ (Mustalahul Hadith wa Manahijul Muhaddithin – বিষয় কোড: ৬১১১০৫) বিষয়ের মূল প্রশ্নপত্র ও প্রতিটি প্রশ্নের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশুদ্ধ সমাধান নিচে দেওয়া হলো। হাদীস শাস্ত্রের নীতিমালা (উসূলুল হাদীস) এবং যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসগণের সংকলন পদ্ধতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ সমৃদ্ধ এ সমাধানটি কামিল পরীক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনে বিশেষ সহায়ক হবে।
প্রশ্নকাঠামো ও উত্তর নির্দেশিকা:
১. ১ম অংশ: মুসতালাহুল হাদীস (মান: ৬০): ‘ক’ বিভাগ হতে ৩টি বর্ণনামূলক প্রশ্ন (১৫ × ৩ = ৪৫) এবং ‘খ’ বিভাগ হতে ৩টি টীকা (৫ × ৩ = ১৫) উত্তর করতে হয়।
২. ২য় অংশ: মানাহিজুল মুহাদ্দিসীন (মান: ৪০): ‘ক’ বিভাগ হতে ২টি বর্ণনামূলক প্রশ্ন (১৫ × ২ = ৩০) এবং ‘খ’ বিভাগ হতে ২টি সংক্ষিপ্ত আলোচনা (৫ × ২ = ১০) উত্তর করতে হয়।
(পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির স্বার্থে সকল ১১টি প্রশ্নের প্রামাণ্য সমাধান নিচে সন্নিবেশিত করা হলো)।
١- أوضح الفرق بين الخبر والحديث ثم بين أقسام الخبر باعتبار وصوله إلينا مفصلا –
[১. খবর (الخبر) ও হাদীস (الحديث)-এর মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট কর এবং আমাদের নিকট পৌঁছার দিক বিবেচনায় খবরের শ্রেণিবিভাগ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা:
ইলমে হাদীসের পরিভাষায় ‘হাদীস’ ও ‘খবর’ অতি তাৎপর্যপূর্ণ দুটি মৌলিক পারিভাষিক শব্দ। মুহাদ্দিসীন ও উসূলবিদগণের দৃষ্টিতে এদের অর্থগত সীমা নিয়ে সূক্ষ্ম আলোচনা রয়েছে।
১. খবর ও হাদীসের মধ্যকার আভিধানিক ও পারিভাষিক পার্থক্য:
| পার্থক্যের বিষয় | হাদীস (الحديث) | খবর (الخبر) |
|---|---|---|
| আভিধানিক অর্থ | নতুন (ضد القديم), বার্তা, কথোপকথন। | সংবাদ, তথ্য, ঐতিহাসিক বিবরণী (النبأ)। |
| উৎস ও সূত্র | নির্দিষ্টভাবে কেবল নবী করীম (সা.)-এর কথা, কাজ, অনুমোদন ও বৈশিষ্ট্য। | নবী (সা.) ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা অতীত রাজন্যবর্গের যেকোনো তথ্য। |
| মুহাদ্দিসদের তিন মত | ১. সমার্থক মত (الترادف): হাদীস ও খবর সম্পূর্ণ একই অর্থবোধক। ২. বিপরীত মত (التباين): যা রাসূল (সা.) থেকে বর্ণিত তা হাদীস, আর অন্য কারো থেকে যা বর্ণিত তা খবর (এজন্য হাদীসের আলিমকে ‘মুহাদ্দিস’ এবং ইতিহাসের আলিমকে ‘আখবারী’ বলে)। ৩. আম-খাছ মত (العموم والخصوص المطلق): খবর হলো ব্যাপক (আম), যা রাসূল (সা.) ও অন্যান্য সকলের কথা অন্তর্ভুক্ত করে; আর হাদীস হলো বিশেষ (খাছ), যা কেবল রাসূল (সা.)-এর সাথে সম্পৃক্ত। এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও অগ্রগণ্য মত। |
২. পৌঁছার মাধ্যম বিবেচনায় খবরের শ্রেণিবিভাগ (أقسام الخبر باعتبار وصوله إلينا):
বর্ণনাকারীদের সংখ্যা ও সূত্রে আমাদের নিকট পৌঁছার ভিত্তিতে খবর মূলত দুই প্রকার:
১. খবরে মুতাওয়াতির (الخبر المتواتر):
– সংজ্ঞা: যে হাদীস সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি যুগে এমন বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, যাদের পক্ষে মিথ্যা রচনার উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়া স্বাভাবিক ও যুক্তিগতভাবে অসম্ভব।
– শর্তাবলী: বিপুল সংখ্যক রাবী থাকা; সনদের প্রতিটি স্তরে (তাবাকাত) এ সংখ্যা বিদ্যমান থাকা; স্বাভাবিকভাবে তাদের মিথ্যায় একমত হওয়া অসম্ভব হওয়া; এবং খবরটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত হওয়া (যেমন: আমরা স্বচক্ষে দেখেছি বা স্বকর্ণে শুনেছি)।
– হুকুম: মুতাওয়াতির হাদীস অকাট্য নিশ্চিত জ্ঞান (العلم اليقيني القطعي) প্রদান করে। এর অস্বীকারকারী কাফির।
– প্রকারভেদ: মুতাওয়াতিরে লাফযী (শব্দ ও অর্থ উভয়ই অভিন্ন) এবং মুতাওয়াতিরে মা’নবী (বিভিন্ন ঘটনায় অভিন্ন মূলভাব বর্ণিত)।
২. খবরে আহাদ (خبر الآحاد):
– সংজ্ঞা: যে হাদীসে মুতাওয়াতিরের শর্তসমূহ পূর্ণাঙ্গভাবে পাওয়া যায় না, তাকে খবরে আহাদ বা ওয়াহিদ বলে।
– হুকুম: এটি ধারণাপ্রসূত প্রামাণিক জ্ঞান (العلم النظري الظني) প্রদান করে। গ্রহণযোগ্য শর্ত সাপেক্ষে এর ওপর আমল করা ওয়াজিব। সনদের সংখ্যার বিবেচনায় এটি আবার তিন প্রকার: মাশহূর (المشهور), আযীয (العزيز), এবং গারীব (الغريب)।
٢- عرف الآحاد ثم اذكر أقسام الآحاد من حيث القبول والرد مع ذكر صور القبول والرد وأساسهما –
[২. খবরে আহাদ-এর পরিচয় দাও এবং গ্রহণ ও বর্জনের (মাকবূল ও মারদূদ) মানদণ্ডে এর প্রকারভেদ, রূপরেখা ও ভিত্তি বিস্তারিত আলোচনা কর।]
১. খবরে আহাদের পরিচয়:
– আভিধানিক অর্থ: ‘আহাদ’ (آحاد) শব্দটি ‘ওয়াহেদ’ (واحد)-এর বহুবচন, যার অর্থ একক সংবাদ।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর মতে: “মা লাম ইয়াজমা’ শুরূ তাত তাওয়াতুর” (ما لم يجمع شروط التواتر)—অর্থাৎ যে হাদীসে তাওয়াতুরের শর্তসমূহ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, তাকে খবরে আহাদ বলা হয়।
২. গ্রহণযোগ্যতা ও প্রত্যাখ্যানের ভিত্তিতে আহাদের প্রকারভেদ:
খবরে আহাদ বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততা, স্মৃতিশক্তি ও সনদের ধারাবাহিকতার ওপর ভিত্তি করে দুই ভাগে বিভক্ত:
১. খবরে মাকবূল (الخبر المقبول): যে হাদীসের বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতা ও বর্ণনার প্রামাণিকতা প্রাধান্য পায় এবং যা দলীল হিসেবে আমলযোগ্য হয়।
২. খবরে মারদূদ (الخبر المردود): যে হাদীসের বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতা প্রাধান্য পায় না এবং ত্রুটির কারণে তা আমলের অযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যাত হয়।
৩. মাকবূল ও মারদূদের রূপরেখা ও ভিত্তি (صور القبول والرد وأساسهما):
| শ্রেণি | মূল ভিত্তি (Asas) | মূল রূপসমূহ (Surat) | শারঈ বিধান (Hukum) |
|---|---|---|---|
| খবরে মাকবূল (গ্রহণযোগ্য) | রাবীর আদল (সততা), দ্বাবত (স্মৃতিশক্তি), ইত্তিসালে সনদ (অবিচ্ছিন্নতা), শুযূয ও ইল্লাত হতে মুক্ত থাকা। | ১. সহীহ লিযাতিহী (الصحيح لذاته) ২. সহীহ লিগাইরিহী (الصحيح لغيره) ৩. হাসান লিযাতিহী (الحسن لذاته) ৪. হাসান লিগাইরিহী (الحسن لغيره) |
আক্বীদা ও আহকামে আমল করা ওয়াজিব এবং অকাট্য দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য। |
| খবরে মারদূদ (বর্জনীয়) | সনদে রাবী বাদ পড়া (سقط في الإسناد) অথবা রাবীর চরিত্রে বা স্মৃতিতে অপবাদ থাকা (طعن في الراوي)। | ১. সনদ বিচ্যুতির কারণে: মুআল্লাক, মুরসাল, মুদাল, মুনক্বাতী, মুদাল্লাস। ২. অপবাদের কারণে: মাওদূ’ (মিথ্যা), মাতরূক, মুনকার, মুআল্লাল, মুদরাজ, মাক্বদূব। |
আমলে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তবে ফাযায়েলের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদীস নির্দিষ্ট শর্তে গ্রহণীয়। |
আমল ও দলীল হিসেবে আহাদের গ্রহণযোগ্যতার শর্তাবলী: জুমহুর উসূলবিদ ও মুহাদ্দিসগণের মতে, খবরে আহাদ যদি মাকবূলের স্তরে উত্তীর্ণ হয় তবে তা বিশ্বাসগত বিষয়ের চেয়ে কর্মগত বিধিবিধান (আহকাম) ও হালাল-হারামের ক্ষেত্রে অকাট্য দলীল হিসেবে কার্যকর হবে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, খবরে আহাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শর্ত হলো রাবীর আমল নিজের বর্ণনার বিপরীত না হওয়া এবং তা ব্যাপক জনসম্পৃক্ত বিষয় (উমূমে বালওয়া)-এর অন্তর্ভুক্ত না হওয়া। পক্ষান্তরে ইমাম শাফেয়ী ও আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) নির্ভরযোগ্য রাবীর বর্ণিত যে কোনো মাকবূল আহাদ হাদীসকে নির্দ্বিধায় আমলযোগ্য সাব্যস্ত করেছেন।
٣- عرف الصحيح لذاته والصحيح لغيره مع ذكر تفاوت مراتب الصحيح ومراتب أصح الأسانيد موضحا –
[৩. সহীহ লিযাতিহী ও সহীহ লিগাইরিহী-এর সংজ্ঞা দাও এবং সহীহ হাদীসের স্তরের তারতম্য ও শ্রেষ্ঠতম সনদসমূহের (আসাহহুল আসানীদ) পর্যায়ক্রম ব্যাখ্যা কর।]
১. সহীহ লিযাতিহী (الصحيح لذاته):
– সংজ্ঞা: যে হাদীসের সনদের ধারাবাহিকতা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এমন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের দ্বারা অবিচ্ছিন্ন থাকে, যারা প্রত্যেকেই পূর্ণ ধার্মিক (আদিল) ও প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী (তাম্মুদ দ্বাবত), এবং হাদীসটি কোনো প্রকার শুযূয (অসঙ্গতি) ও সুপ্ত ক্ষতিকর দোষত্রুটি (ইল্লাতে ক্বাদিহাহ) থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত—তাকে সহীহ লিযাতিহী বলে।
– শর্ত ৫টি: اتصال السند (সনদের অবিচ্ছিন্নতা), عدالة الرواة (রাবীদের সততা), ضبط الرواة (নিখুঁত স্মৃতিশক্তি), عدم الشذوذ (অসঙ্গতিহীনতা), এবং عدم العلة (সুপ্ত ত্রুটিহীনতা)।
২. সহীহ লিগাইরিহী (الصحيح لغيره):
– সংজ্ঞা: মূলত যে হাদীসটি তার নিজস্ব সনদের বিচারে ‘হাসান লিযাতিহী’ (অর্থাৎ রাবীর স্মৃতিশক্তিতে সামান্য দুর্বলতা বিদ্যমান ছিল), কিন্তু পরবর্তীতে সমমানের বা অধিকতর শক্তিশালী একাধিক ভিন্ন সনদের সমর্থনের ফলে তার সেই সামান্য ঘাটতি পূরণ হয়ে সহীহ-এর মানে উন্নীত হয়, তাকে ‘সহীহ লিগাইরিহী’ বলা হয়।
৩. সহীহ হাদীসের উচ্চমর্যাদার স্তরবিন্যাস (مراتب الصحيح):
মুহাদ্দিসীনে কেরামের সর্বসম্মত নীতি অনুযায়ী সহীহ হাদীসের মোট ৭টি ক্রমিক স্তর রয়েছে:
১. মুত্তাফাকুন আলাইহি (متفق عليه): ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম উভয়ের যৌথ সংকলিত হাদীস।
২. মুনফারিদুন বিল বুখারী (انفرد به البخاري): যা কেবল ইমাম বুখারী সংকলন করেছেন।
৩. মুনফারিদুন বিমুসলিম (انفرد به مسلم): যা কেবল ইমাম মুসলিম সংকলন করেছেন।
৪. আলা শারতিশ শাইখাইন (على شرطهما ولم يخرجاه): যা বুখারী-মুসলিমের শর্তে সহীহ, কিন্তু তাঁরা তা কিতাবে আনেননি।
৫. আলা শারতিল বুখারী (على شرط البخاري): কেবল বুখারীর শর্ত অনুযায়ী উত্তীর্ণ।
৬. আলা শারতি মুসলিম (على شرط مسلم): কেবল মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী উত্তীর্ণ।
৭. সহীহুন ইনদা গাইরিহিমা (صحيح عند غيرهما): বুখারী-মুসলিম ব্যতিরেকে অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ইমাম (যেমন ইবনে খুযাইমা, ইবনে হিব্বান, হাকেম) কর্তৃক সহীহ সাব্যস্ত।
৪. শ্রেষ্ঠতম সনদের স্তরসমূহ (مراتب أصح الأسانيد):
১. স্বর্ণালী সনদ (سلسلة الذهب): ইমাম মালিক ← ইমাম নাফে’ ← হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ← রাসূলুল্লাহ (সা.)।
২. ইমাম যুহরী ← আলী ইবনুল হুসাইন (যায়নুল আবেদীন) ← হুসাইন ইবনে আলী ← হযরত আলী (রা.)।
৩. ইবনে সীরীন ← উবাইদাহ আস-সালমানী ← হযরত আলী (রা.)।
৪. আ’মাশ ← ইবরাহীম নাখঈ ← আলক্বামাহ ← হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)।
٤- ما المقصود بالعدالة والضبط والعلة فى علم مصطلح الحديث؟ اذكر أقسام الضبط مفصلا –
[৪. মুসতালাহুল হাদীসের পরিভাষায় ‘আদালাহ’ (عدالة), ‘দ্বাবত’ (ضبط) এবং ‘ইল্লাহ’ (علة) বলতে কী বোঝায়? দ্বাবত-এর প্রকারভেদ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
১. মৌলিক পরিভাষাত্রয়ের বিশদ ধারণা:
– আদালাহ (العدالة): এটি রাবীর এমন এক সহজাত মানসিক ও আধ্যাত্মিক গুণ বা নৈতিক স্বভাব, যা তাকে সর্বদা তাকওয়া ও মানবীয় শালীনতা (مروءة) বজায় রাখতে বাধ্য করে। আদিল হওয়ার শর্ত হলো: ইসলাম, বালেগ হওয়া, বিবেকবান হওয়া, ফাসেক্বী ও কবিরা গুনাহ থেকে মুক্ত থাকা, সগিরা গুনাহে অবিচল না থাকা এবং হীন চরিত্র বর্জন করা।
– দ্বাবত (الضبط): শ্রবণলব্ধ বা লিখিত হাদীসকে কোনো ধরনের হ্রাস-বৃদ্ধি, বিকৃতি বা বিভ্রান্তি ছাড়া অবিকল মুখস্থ রাখা কিংবা সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপিতে নিরাপদ রাখা এবং অন্যকে যথাযথভাবে বর্ণনার সক্ষমতাকে ‘দ্বাবত’ বলে।
– ইল্লাহ (العلة): হাদীসের সনদ বা মতনে বিদ্যমান এমন এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম, গোপন ও অন্তর্নিহিত ক্ষতিকর ত্রুটি, যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে আপাতদৃষ্টিতে সহীহ মনে হলেও অভিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের গভীর বিশ্লেষণে ধরা পড়ে এবং যা হাদীসের বিশুদ্ধতাকে বিনষ্ট করে দেয়।
২. দ্বাবত (الضبط)-এর বিশদ শ্রেণিবিভাগ:
মুহাদ্দিসগণের ঐকমত্যে দ্বাবত প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত:
১. দ্বাবতুস সাদর বা মুখস্থের নিখুঁত সংরক্ষণ (ضبط الصدر):
– সংজ্ঞা: শাইখের মুখ থেকে হাদীস শোনার মুহূর্ত থেকে শুরু করে অন্যের নিকট বর্ণনা করা পর্যন্ত হাদীসটিকে নিজের স্মৃতিপটে এমন দৃঢ়ভাবে গেঁথে রাখা, যাতে যখনই প্রয়োজন হবে তখনই কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়া পূর্ণ নির্ভুলভাবে তা শুনিয়ে দিতে সক্ষম হওয়া।
– মানদণ্ড: অসতর্কতা, অতি-বিস্মৃতি বা ভ্রান্তি থেকে মুক্ত থাকা।
২. দ্বাবতুল কিতাব বা লিখিত নথির নিখুঁত সংরক্ষণ (ضبط الكتاب):
– সংজ্ঞা: স্বহস্তে লিখিত বা নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে অনুলিপিকৃত হাদীসের পাণ্ডুলিপির সঠিকতা যাচাই (মুআবলাহ) করার পর থেকে অন্যের নিকট তা বর্ণনা করা পর্যন্ত নিজের সিন্দুকে বা হেফাজতে এমনভাবে তালাবদ্ধ ও নিরাপদ রাখা, যাতে কোনো বিকৃতিকারী বা অন্য কারো পক্ষে তাতে প্রক্ষেপণ (ইদরাজ) বা হেরফের করা অসম্ভব হয়।
٥- عرف مختلف الحديث ثم بين طرق دفع التعارض بين الحديثين المتعارضين فى الظاهر –
[৫. মুখতালিফুল হাদীসের পরিচয় দাও এবং বাহ্যত পরস্পরবিরোধী দুটি হাদীসের বৈপরীত্য নিরসনের সুনির্দিষ্ট উপায়সমূহ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
১. মুখতালিফুল হাদীসের তাত্ত্বিক ও পারিভাষিক পরিচয়:
– আভিধানিক অর্থ: ‘মুখতালিফ’ শব্দটি বাবে ইফতিয়াল থেকে গৃহীত, যার অর্থ পরস্পর বৈসাদৃশ্যপূর্ণ হওয়া বা ভিন্নতা প্রকাশ পাওয়া।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী ও ইমাম নববী (রহ.)-এর মতে: “هو الحديث المقبول المعارض بمثله مع إمكان الجمع بينهما”—অর্থাৎ এমন দুটি গ্রহণযোগ্য (মাকবূল) ও সহীহ হাদীস যা বাহ্যত একে অপরের বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে, অথচ সূক্ষ্ম পর্যালোচনায় উভয়ের মাঝে চমৎকার সমন্বয় সাধন করা সম্ভবপর হয়, তাকে ‘ইলমে মুখতালিফুল হাদীস’ বলে।
– বাস্তবতা: মূলত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সুন্নাহর অভ্যন্তরে কোনো বাস্তব বৈপরীত্য (تعارض حقيقي) থাকা অসম্ভব। কারণ তিনি ওহী ছাড়া কোনো কথা বলেননি। এই বিরোধ কেবল পাঠকের প্রাথমিক বোঝাপড়া বা প্রেক্ষিতের অজ্ঞতার কারণে আপাতদৃষ্টিতে (تعارض ظاهري) মনে হয়।
২. বৈপরীত্য নিরসনের বৈজ্ঞানিক চার স্তর (طرق دفع التعارض):
জমহুর মুহাদ্দিসীন ও ফকীহগণের ঐকমত্য অনুযায়ী আপাত বৈপরীত্য দূর করার জন্য ধারাবাহিক চারটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য:
১. আল-জাম’ ওয়াত তাতবীক্ব (الجمع والتطبيق – সমন্বয় সাধন): সর্বপ্রথম সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে উভয় হাদীসের মর্মার্থের মাঝে মিলবন্ধন তৈরি করা। যেমন: একটিকে সাধারণ (আম) এবং অপরটিকে বিশেষ (খাছ) ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা; কিংবা একটিকে জায়েয (ইবাহাত) এবং অপরটিকে উত্তম (আফযালিয়্যাত)-এর ওপর নির্ধারণ করা। যেমন: রাসূল (সা.) দাঁড়িয়ে পানি পান করেছেন এবং বসে পান করার নির্দেশ দিয়েছেন—এখানে ফকীহগণ সমন্বয় করেছেন যে বসে পান করা মুস্তাহাব আর দাঁড়িয়ে পান করা বৈধতা প্রকাশের জন্য ছিল।
২. মা’রিফাতুন নাসখ (معرفة النسخ – তারিখ ও রহিতকরণ নির্ণয়): যদি কোনোভাবেই সমন্বয় সম্ভব না হয় এবং নিশ্চিত ঐতিহাসিক সন-তারিখ জানা যায়, তবে পরবর্তী হাদীসটিকে ‘নাসিখ’ (রহিতকারী) এবং পূর্ববর্তী বিধানটিকে ‘মানসূখ’ (রহিত) ঘোষণা করতে হবে। যেমন: সিঙ্গা লাগালে রোজা ভাঙা সংক্রান্ত পূর্ববর্তী হাদীসটি পরবর্তী যুগে রহিত ঘোষিত হয়েছে।
৩. আত-তারজীহ (الترجيح – প্রাধান্য দান): যদি কোনো ইতিহাস জানা না যায়, তবে সনদের অধিক বিশুদ্ধতা, রাবীদের স্মৃতিশক্তির প্রখরতা, ফিকহী দূরদর্শিতা কিংবা কুরআনের অকাট্য মূলনীতির নৈকট্যের ভিত্তিতে একটিকে অপরটির ওপর প্রাধান্য দিতে হবে। হানাফী মাযহাবে কিয়াস ও উসূলের সাথে অধিক সঙ্গতিপূর্ণ বর্ণনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
৪. আত-তাওয়াক্কুফ (التوقف – সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা): যদি উপরোক্ত তিনটি পদ্ধতির কোনোটিই প্রয়োগ করা সম্ভব না হয়, তবে কোনো পক্ষাবলম্বন না করে বিষয়টি আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে প্রামাণ্য দলীল স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত আমল স্থগিত রাখতে হবে।
৩. এ শাস্ত্রের প্রামাণ্য গ্রন্থাবলী:
এ বিষয়ে সর্বপ্রথম স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেন ইমাম শাফেঈ (রহ.) তাঁর ‘ইখতিলাফুল হাদীস’ গ্রন্থে। পরবর্তীতে ইমাম ইবনে কুতাইবাহ রচনা করেন ‘তা’বীলু মুখতালিফিল হাদীস’ এবং ইমাম আবু জাফর আত-তহাবী (রহ.) রচনা করেন অমর বিশ্বকোষ ‘শরহু মুশকিলিল আছার’ ও ‘শরহু মা’য়ানিল আছার’ যা এ শাস্ত্রের চূড়ান্ত স্মারক।
٦- علق على ثلاثة مما يلى : (أ) العزيز، (ب) أقسام الغريب، (ج) الحسن لذاته والحسن لغيره، (د) الفرق بين المعلق والمعضل، (هـ) المدلس –
[৬. যে কোনো তিনটির ওপর সংক্ষেপ টীকা লিখ: (ক) আযীয; (খ) গারীব-এর প্রকারভেদ; (গ) হাসান লিযাতিহী ও হাসান লিগাইরিহী; (ঘ) মুআল্লাক ও মুদালের পার্থক্য; (ঙ) মুদাল্লাস।]
(ক) আল-আযীয (العزيز):
– সংজ্ঞা: সনদের যেকোনো একটি স্তরে বা সকল স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যা কমপক্ষে দুইজন হওয়াকে আযীয হাদীস বলে। দুইয়ের কম অর্থাৎ একজন হলে তা গারীব হয়ে যাবে, আর দুইয়ের অধিক হয়ে গেলে মাশহূর হতে পারে।
– উদাহরণ: রাসূল (সা.)-এর বাণী—”তোমাদের কেউ ততক্ষণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান ও সমস্ত মানুষ হতে অধিক প্রিয় হব।” এই হাদীসটি হযরত আনাস (রা.) হতে কাতাদাহ ও আব্দুল আযীয ইবনে সুহাইব বর্ণনা করেছেন, এবং তাঁদের উভয়ের কাছ থেকে আবার দু’জন করে বর্ণনা করেছেন।
(খ) আক্বসামুল গারীব বা গারীব-এর প্রকারভেদ (أقسام الغريب):
সনদে একাকীত্বের (ইনফিরাদ) অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে গারীব দুই প্রকার:
১. গারীবে মুতলাক্ব বা ফারদে মুতলাক্ব (الغريب المطلق): সনদের মূল মূলে অর্থাৎ সাহাবীর স্তরে একক বর্ণনাকারী থাকা (যেমন: “ইন্নামাল আ’মালু বিন নিয়্যাত” হাদীসে হযরত উমর (রা.) একক বর্ণনাকারী)।
২. গারীবে নিসবী (الغريب النسبي): সনদের মূল স্তরে একাধিক হলেও পরবর্তী কোনো স্তর বা বিশেষ কোনো অঞ্চলের (যেমন কেবল মক্কাবাসী বা কুফাবাসী) সূত্রে একক হওয়া।
(গ) আল-হাসান লিযাতিহী ও আল-হাসান লিগাইরিহী:
– হাসান লিযাতিহী: যে হাদীসে সহীহ হাদীসের সব শর্ত পূর্ণ থাকে, কিন্তু বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তিতে (দ্বাবত) সামান্য ঘাটতি বা লঘুতা পরিলক্ষিত হয়।
– হাসান লিগাইরিহী: মূলত দুর্বল (যয়ীফ) হাদীস, যার দুর্বলতা চরম পর্যায়ের নয় এবং যা একাধিক ভিন্ন সনদের সমর্থনের মাধ্যমে হাসান স্তরে উন্নীত হয়।
(ঘ) মুআল্লাক ও মুদালের পার্থক্য (الفرق بين المعلق والمعضل):
– মুআল্লাক (المعلق): সনদের শুরু হতে গ্রন্থকারের পক্ষ থেকে এক বা একাধিক রাবীকে ধারাবাহিকভাবে বিলুপ্ত করে সরাসরি সাহাবী বা রাসূল (সা.)-এর দিকে সম্বন্ধ করা।
– মুদাল (المعضل): সনদের মাঝখান হতে পরপর দুই বা ততোধিক রাবী বাদ পড়লে তাকে মুদাল বলে। মুদাল মুআল্লাকের চেয়েও মারাত্মক দুর্বল।
(ঙ) আল-মুদাল্লাস (المدلس):
যে হাদীসের সনদের কোনো অভ্যন্তরীণ দোষ বা রাবীকে গোপন করে আপাতদৃষ্টিতে সনদটিকে সুন্দর ও দোষহীন রূপে প্রকাশ করা হয়, তাকে মুদাল্লাস বলে। এটি তাদলীসুল ইসনাদ (সমসাময়িক শাইখ যার সাথে সাক্ষাৎ হয়নি তার থেকে সরাসরি শোনার মতো শব্দ বলা) অথবা তাদলীসুশ শুয়ূখ (পরিচিত শাইখের অপরিচিত উপাধি উল্লেখ করা) হতে পারে।
٧- بين توجيهات الرسول صلى الله عليه وسلم بخصوص نقل الحديث وروايته مفصلا –
[৭. হাদীস সংরক্ষণ, শিক্ষাদান ও নির্ভুল বর্ণনার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রদত্ত দিকনির্দেশনাসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা:
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর পবিত্র বাণী ও সুন্নাহকে অবিকৃতভাবে উম্মাহর পরবর্তী প্রজন্মের নিকট পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরামকে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছিলেন।
১. হাদীস শ্রবণে ও প্রচারে উৎসাহ ও সুসংবাদ:
রাসূলুল্লাহ (সা.) হাদীস মুখস্থকারী ও প্রচারকারীদের জন্য বিশেষ মর্যাদা ও উজ্জ্বল চেহারার দু’আ করেছেন। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন:
“نَضَّرَ اللَّهُ امْرَأً سَمِعَ مِنَّا حَدِيثًا فَحَفِظَهُ حَتَّى يُبَلِّغَهُ، فَرُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ”
“আল্লাহ সেই ব্যক্তির মুখমণ্ডল উজ্জ্বল ও সতেজ রাখুন, যে আমার কথা শুনে তা মুখস্থ রাখল এবং অন্যের নিকট তা অবিকল পৌঁছে দিল। কারণ জ্ঞানের অনেক বাহক এমন ব্যক্তির কাছে তা পৌঁছায়, যে তার চেয়েও অধিক সমঝদার।”
২. মিথ্যারোপ ও প্রক্ষেপণের বিরুদ্ধে কঠোর ভীতি প্রদর্শন:
হাদীস বর্ণনায় সামান্যতম অসাবধানতা রোধে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করে ইরশাদ করেন:
“مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ”
“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করল, সে যেন তার বাসস্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নিল।” (মুতাওয়াতির হাদীস)। এই বাণীর কারণে সাহাবায়ে কেরাম হাদীস বর্ণনায় প্রচণ্ড সতর্কতা অবলম্বন করতেন।
৩. হাদীস লিখে সংরক্ষণের নির্দেশনা:
ইসলামের প্রারম্ভে কুরআনের সাথে মিশ্রণের আশঙ্কায় সাময়িক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পরবর্তীতে রাসূল (সা.) সাহাবীদের হাদীস লেখার সরাসরি নির্দেশ দেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.)-কে তিনি নির্দেশ দেন: “তুমি লেখ, কারণ সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, এই মুখ দিয়ে সত্য ছাড়া আর কিছুই বের হয় না।” এভাবে তিনি সাহাবীদের ‘সহীফায়ে সাদিক্বাহ’ প্রণয়নের সুযোগ দেন।
৪. দূর-দূরান্তে বার্তা প্রেরণের আদেশ:
রাসূল (সা.) বলেন: “বালি্লগূ আন্নী ওয়ালাও আয়াত” (আমার পক্ষ থেকে একটিমাত্র বাণী হলেও তা মানুষের কাছে পৌঁছে দাও)। এর মাধ্যমে প্রতিটি মুমিনের ওপর সুন্নাহর প্রচারকে আমানত হিসেবে অর্পণ করা হয়েছে।
٨- بين منهج الصحابة رضى الله عنهم فى تحمل السنة وأدائها –
[৮. সুন্নাহ গ্রহণ (তাহাম্মুল) ও তা পরবর্তী প্রজন্মের নিকট হস্তান্তরে (আদা) সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর অনুসৃত বৈজ্ঞানিক কর্মপদ্ধতি বিশ্লেষণ কর।]
ভূমিকা:
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ছিলেন সুন্নাহর বিশ্বস্ততম ধারক ও বাহক। তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহকে যেভাবে প্রত্যক্ষভাবে ধারণ করেছেন এবং অপরিসীম সতর্কতায় তা পরবর্তী তাবেঈদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তা আধুনিক ইতিহাস গবেষণারও এক বিস্ময়কর নজির।
১. সুন্নাহ গ্রহণে (تحمل السنة) সাহাবীদের মানহায ও পদ্ধতি:
১. প্রত্যক্ষ সাহচর্য ও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ: সাহাবীগণ সার্বক্ষণিকভাবে নবী করীম (সা.)-এর মজলিসে উপস্থিত থাকতেন। যেমন হযরত আবু হুরায়রা (রা.) আসহাবে সুফফায় থেকে প্রতিটি কথা ধারণ করতেন।
২. পালাক্রমে উপস্থিতির নীতি: হযরত উমর (রা.) ও তাঁর আনসার প্রতিবেশী পালাক্রমে একদিন পর পর রাসূল (সা.)-এর দরবারে যেতেন এবং ওই দিনের ওহী ও হাদীসের পাঠ পরস্পরের সাথে বিনিময় করতেন।
৩. সরাসরি প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে স্পষ্টীকরণ: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) কোনো কথা বুঝতে অসুবিধা হলে পুনরায় প্রশ্ন করে পূর্ণ বিষয়টি পরিষ্কার করে নিতেন।
৪. বাস্তব আমলের মাধ্যমে মুখস্থকরণ: সাহাবীগণ কেবল তাত্ত্বিক মুখস্থ করতেন না, বরং যা শুনতেন সাথে সাথে নিজ জীবনে আমল করে তা চিরস্থায়ী করে নিতেন।
২. সুন্নাহ হস্তান্তরে ও বর্ণনায় (أداء السنة) সাহাবীদের সতর্কতা:
১. অল্প হাদীস বর্ণনার নীতি (الإقلال من الرواية): বড় বড় সাহাবী যেমন আবু বকর, উমর ও যুবায়ের (রা.) মিথ্যার আশঙ্কায় অত্যন্ত কম হাদীস বর্ণনা করতেন।
২. সাক্ষী তলবের নীতি (طلب الشهود): হযরত আবু বকর ও উমর (রা.) কোনো একক সাহাবীর হাদীস শুনেই তা মেনে নিতেন না, বরং অন্য কোনো সাহাবী তা শুনেছেন কি-না তার পক্ষে সাক্ষী চাইতেন (যেমন মীরাসের মাসআলায় মুগীরা ইবনে শু’বার সাক্ষ্যে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামাহকে ডাকা হয়েছিল)।
৩. শপথ করানোর নীতি (استحلاف الراوي): হযরত আলী (রা.) বলেন: “আমি যখন কোনো সাহাবীর কাছ থেকে রাসূলের হাদীস শুনতাম, তখন তাকে আল্লাহর নামে শপথ করাতাম; তিনি শপথ করলে আমি তা বিশ্বাস করতাম।”
৪. কুরআনের মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্য পরীক্ষা: হযরত আয়েশা (রা.) কোনো বর্ণনা শুনলে তা সরাসরি কুরআনের আয়াতের আলোকে যাচাই করতেন।
٩- ناقش دور الخليفة عمر بن عبد العزيز فى تدوين الحديث –
[৯. হাদীস সংকলন ও সংরক্ষণের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে উমাইয়া খলীফা হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.)-এর ঐতিহাসিক ভূমিকা পর্যালোচনা কর।]
ভূমিকা:
হিজরী প্রথম শতকের শেষভাগে সাহাবায়ে কেরামের তিরোধান এবং ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির যুগে হাদীস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক চরম সন্ধিক্ষণ উপস্থিত হয়। এই ক্রান্তিলগ্নে উমাইয়া খলীফা পঞ্চম খলীফায়ে রাশেদ হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.) প্রথম রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে হাদীস সংকলনের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
১. রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি ও যুগান্তকারী উদ্যোগ:
৯৯ হিজরীতে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি লক্ষ্য করলেন যে, প্রবীণ সাহাবী ও তাবেঈদের ইন্তেকালের কারণে ইলমে হাদীস বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং বিদআতী দলগুলো মনগড়া বক্তব্য প্রচারের অপচেষ্টা করছে। তখন তিনি মদিনার গভর্ণর আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনে হাযমের নিকট ঐতিহাসিক ফরমান পাঠালেন:
“انْظُرْ مَا كَانَ مِنْ حَدِيثِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاكْتُبْهُ، فَإِنِّي خِفْتُ دُرُوسَ الْعِلْمِ وَذَهَابَ الْعُلَمَاءِ”
“রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যে সকল হাদীস সংরক্ষিত আছে তা অনুসন্ধান কর এবং লিপিবদ্ধ কর; কেননা আমি ইলমের বিলুপ্তি এবং আলেমদের প্রয়াণের গভীর আশঙ্কা করছি।”
২. ইমাম যুহরী (রহ.)-এর ওপর দায়িত্ব অর্পণ:
খলীফা উমর ইবনে আব্দুল আযীয তৎকালীন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও রিজাল বিশেষজ্ঞ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব আয-যুহরী (রহ.)-কে সুসংগঠিতভাবে হাদীস সংকলনের নির্দেশ দেন। ইমাম যুহরী বলেন: “খলীফা উমর ইবনে আব্দুল আযীয আমাদের হাদীস সংকলনের আদেশ দেন, ফলে আমরা খণ্ড খণ্ড পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করি এবং খলীফা তাঁর রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রদেশে তার এক একটি কপি প্রেরণ করেন।”
৩. ফলাফল ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য:
১. ব্যক্তিগত বিক্ষিপ্ত সহীফাগুলো প্রথম রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে সুসংহত দিওয়ানে রূপ লাভ করে।
২. জাল ও বানোয়াট বর্ণনা রচনার পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যায়।
৩. ইমাম মালিকের ‘মুয়াত্তা’ এবং পরবর্তী যুগের সিহাহ সিত্তাহর সংকলনের সুদৃঢ় ভিত্তি এই মহান খলীফার নির্দেশেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
١٠- تحدث عن الإنجازات التى قام بها العلماء والأئمة المحدثون فى مجال تدوين الأحاديث وعلوم الحديث فى القرن الثالث الهجرى –
[১০. হিজরী তৃতীয় শতকে হাদীস সংকলন ও উলূমুল হাদীসের বিভিন্ন শাখা বিকাশে মুহাদ্দিসীন ও ইমামগণের গৌরবোজ্জ্বল অবদান আলোচনা কর।]
ভূমিকা:
হিজরী তৃতীয় শতাব্দীকে ইলমে হাদীসের ইতিহাসে ‘স্বর্ণযুগ’ (العصر الذهبي) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই শতাব্দীতেই হাদীস সংকলন তার পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ লাভ করে।
১. বিশুদ্ধ হাদীস সংকলনে সিহাহ সিত্তাহর অবিস্মরণীয় অবদান:
তৃতীয় হিজরীতেই বিশ্বখ্যাত ‘কুতুবে সিত্তাহ’ বা ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ রচিত হয়:
১. সহীহুল বুখারী (ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আল-বুখারী – ওফাত ২৫৬ হি.): হাদীসের বিশুদ্ধতম গ্রন্থ, যেখানে কেবল সহীহ মারফূ হাদীস কঠোর শর্তে সংকলিত হয়েছে।
২. সহীহ মুসলিম (ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আন-নিশাপুরী – ওফাত ২৬১ হি.): অতুলনীয় অধ্যায় বিন্যাস ও একই স্থানে সকল সনদের অপূর্ব সংকলন।
৩. সুনানু আবি দাউদ (ইমাম আবু দাউদ আস-সিজিস্তানী – ওফাত ২৭৫ হি.): ফিকহ ও আহকাম বিষয়ক সুন্নাতের শ্রেষ্ঠ আকর গ্রন্থ।
৪. জামে’উত তিরমিযী (ইমাম আবু ঈসা আত-তিরমিযী – ওফাত ২৭৯ হি.): হাদীসের স্তর নির্ণয় (সহীহ, হাসান, গরীব) ও ফকীহদের ইখতিলাফের বিশ্বকোষ।
৫. সুনানুন নাসাঈ (ইমাম আহমদ ইবনে শুআইব আন-নাসাঈ – ওফাত ৩০৩ হি.): সনদের সূক্ষ্ম ত্রুটি ও ইল্লাত বর্ণনার নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ।
৬. সুনানু ইবনে মাজাহ (ইমাম ইবনে মাজাহ আল-ক্বাযবিনী – ওফাত ২৭৩ হি.): অনুপম তারতীব ও যাওয়াইদের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার।
২. উলূমুল হাদীস ও সহযোগী শাস্ত্রসমূহের অভূতপূর্ব বিকাশ:
১. ইলমুল জারহ ওয়াত তা’দীল: রাবীদের জীবনী ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ে ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, আলী ইবনুল মাদীনী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল প্রামাণ্য কিতাব রচনা করেন।
২. ইলমুল ইলাল: সনদের গোপন ত্রুটি নির্ণয়ে ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী ও ইমাম তিরমিযী পৃথক গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।
৩. মুসনাদ গ্রন্থসমূহ: ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল তাঁর সুবিশাল ‘আল-মুসনাদ’ সংকলন করেন যাতে প্রায় ৪০ হাজার হাদীস স্থান পায়।
١١- علق على اثنين مما يلى : (أ) قواعد منهج الرواية، (ب) الرواية بالمعنى، (ج) الصحف والنسخ الحديثية، (د) المستدركات –
[১১. যে কোনো দুটির ওপর সংক্ষেপ পর্যালোচনা কর: (ক) রেওয়ায়েতের উসূল ও নীতিমালা; (খ) অর্থের ভিত্তিতে হাদীস বর্ণনা (রেওয়ায়েত বিল মা’না); (গ) প্রাচীন হাদীসের সহীফা ও অনুলিপিসমূহ; (ঘ) মুস্তাদরাকাত।]
(ক) ক্বাওয়ায়েদু মানহাজির রেওয়ায়েত (قواعد منهج الرواية):
হাদীস বর্ণনার বৈজ্ঞানিক মূলনীতি হলো—রাবীকে বিশ্বস্ত মুসলিম ও সুস্থ মস্তিষ্কের হতে হবে, যে শাইখের থেকে বর্ণনা করা হচ্ছে তাঁর থেকে সরাসরি শ্রবণ (সামা’) নিশ্চিত হতে হবে, বর্ণনার শব্দাবলি (হাদ্দাসানা, আখবারানা, আম্বাআনা ইত্যাদি) সুনির্দিষ্ট স্তরে প্রয়োগ করতে হবে এবং শাইখের অনুমতি (ইজাযাহ) ছাড়া কোনো পাণ্ডুলিপি থেকে বর্ণনা নিষিদ্ধ।
(খ) আর-রেওয়ায়েত বিল মা’না বা অর্থের ভিত্তিতে বর্ণনা (الرواية بالمعنى):
হাদীসের মূল শব্দের পরিবর্তে সমার্থক শব্দ দিয়ে বর্ণনা করাকে রেওয়ায়েত বিল মা’না বলে। জমহুর মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের মতে শর্তসাপেক্ষে এটি জায়েয:
১. বর্ণনাকারীকে আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের সূক্ষ্ম জ্ঞানে পণ্ডিত হতে হবে, যাতে শব্দের পরিবর্তনে অর্থের কোনো বিকৃতি না ঘটে;
২. হালাল-হারামের বিধান সংক্রান্ত অকাট্য পরিভাষায় তা না হওয়া;
৩. তবে যথাসম্ভব রাসূল (সা.)-এর মূল শব্দ মুখস্থ রেখে ‘রেওয়ায়েত বিল লাফয’ করাই সর্বোত্তম।
(গ) আস-সুহুফ ওয়ান নুসাখ আল-হাদীসিয়্যাহ (الصحف والنسخ الحديثية):
রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবাদের যুগে লিখিত সংকলনগুলোকে সহীফা বলা হয়। বিখ্যাত সহীফাসমূহ:
১. আস-সহীফাতুস সাদিক্বাহ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) প্রণীত;
২. সহীফায়ে জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.): হজ বিষয়ক প্রামাণ্য নথি;
৩. সহীফায়ে হাম্মাম ইবনে মুনাব্বিহ: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত ১৩৮টি সহীহ হাদীসের প্রাচীনতম সংরক্ষিত কপি।
(ঘ) আল-মুস্তাদরাকাত (المستدركات):
যে হাদীস গ্রন্থে কোনো পূর্ববর্তী প্রধান ইমামের (যেমন বুখারী ও মুসলিম) নির্ধারিত শর্তে উত্তীর্ণ হাদীসসমূহ সংকলন করা হয়, যা ওই ইমামগণ নিজেদের কিতাবে অন্তর্ভুক্ত করে যাননি। এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো ইমাম হাকেম নিশাপুরী (রহ.) রচিত ‘আল-মুস্তাদরাকু আলাছ ছহীহাইন’।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. কামিল ১ম বর্ষ হাদীস ৫ম পত্রের বিষয় ও কোড কী?
এ পত্রের বিষয় হলো ‘মুসতালাহুল হাদীস ওয়া মানাহিজুল মুহাদ্দিসীন’ (Mustalahul Hadith wa Manahijul Muhaddithin 5th Paper) এবং এর কোড হলো ৬১১১০৫ (611105)।
২. পরীক্ষায় মুসতালাহুল হাদীস অংশে কত নম্বর বরাদ্দ?
মুসতালাহুল হাদীস অংশে মোট ৬০ নম্বর বরাদ্দ, যার মধ্যে ৪৫ নম্বর বর্ণনামূলক প্রশ্নে এবং ১৫ নম্বর সংক্ষিপ্ত টীকায় থাকে।
৩. মানাহিজুল মুহাদ্দিসীন অংশে কত নম্বর বরাদ্দ?
মানাহিজুল মুহাদ্দিসীন অংশে মোট ৪০ নম্বর বরাদ্দ, যার মধ্যে ৩০ নম্বর বড় প্রশ্নে এবং ১০ নম্বর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নে থাকে।
৪. সহীহ হাদীসের পাঁচটি প্রধান শর্ত কী কী?
সনদের অবিচ্ছিন্নতা (ইত্তিসালুস সনদ), রাবীদের সততা (আদালাহ), নিখুঁত স্মৃতিশক্তি (দ্বাবত), কোনো বর্ণনায় বৈপরীত্য না থাকা (শুযূযমুক্ত) এবং গোপন ত্রুটি না থাকা (ইল্লাতমুক্ত)।
৫. হাদীসের স্বর্ণযুগ কোন শতাব্দীকে বলা হয়?
হিজরী তৃতীয় শতাব্দীকে হাদীস শাস্ত্রের স্বর্ণযুগ বলা হয়, কারণ এ সময়েই সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিমসহ সিহাহ সিত্তাহর অমর কিতাবসমূহ সংকলিত হয়েছিল।
৬. কামিল পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার কৌশল কী?
আরবি পারিভাষিক সংজ্ঞাগুলো হুবহু উপস্থাপন করা, উসূলের মূলনীতি ও ফকীহদের মতভেদ চার্ট ও টেবিল আকারে সাজিয়ে সুন্দরভাবে পরিবেশন করা।

