পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৩২
ফাজিল স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
[ভারতীয় মুসলমানদের ইতিহাস (১৫২৬—১৮৫৭ খ্রি.)]
বিষয় কোড: ২০৫১০৪
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক বিভাগ থেকে ৪টি এবং খ বিভাগ থেকে ২টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]
ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)
১। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবরের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the achievements of Jahiruddin Mohammad Babur as a founder of the Mughal Empire.]
ভূমিকা
১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে ভারতে প্রায় তিনশত বছরের গৌরবময় মুঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবর। মধ্য এশিয়ার ফারগানার পিতৃহীন এক কিশোর থেকে হিন্দুস্তানের একচ্ছত্র সম্রাট হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ বিশ্ব সামরিক ইতিহাসের এক অনন্য রোমাঞ্চকর উপাখ্যান।
প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বাবুরের প্রধান কৃতিত্বসমূহ
- ১. পানিপথের প্রথম যুদ্ধ ও দিল্লি বিজয় (১৫২৬ খ্রি.): মাত্র ১২,০০০ দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে তিনি ইব্রাহিম লোদীর ১ লাখ বিশাল বাহিনীকে পরাস্ত করেন। ভারতে তিনিই প্রথম অটোমান বা রুমী যুদ্ধকৌশল এবং কামানের গোলন্দাজ বাহিনী মোতায়েন করে সামরিক বিপ্লব ঘটান।
- ২. খানুয়ার যুদ্ধ ও রাজপুত প্রতিরোধ চূর্ণ (১৫২৭ খ্রি.): মেওয়ারের অকুতোভয় রাজপুত বীর রানা সাঙ্গার নেতৃত্বে সম্মিলিত রাজপুত কনফেডারেসি বাবরকে উৎখাত করতে উদ্যত হয়। বাবর এই যুদ্ধকে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করেন, মদ্যপান ত্যাগের ঐতিহাসিক শপথ নেন এবং সৈন্যদের সামনে আগুনঝরা ভাষণ দেন। খানুয়ার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রাজপুতদের শোচনীয়ভাবে চূর্ণ করে বাবর ‘গাজী’ উপাধি গ্রহণ করেন এবং উত্তর ভারতে মুঘল আধিপত্য নিরঙ্কুশ করেন।
- ৩. চান্দেরি ও ঘাগরার যুদ্ধ (১৫২৮ ও ১৫২৯ খ্রি.): চান্দেরির যুদ্ধে মেদিনী রাওকে এবং ঘাগরার যুদ্ধে বাংলা ও বিহারের আফগানদের পরাজিত করে তিনি সিন্ধু নদ থেকে বিহার পর্যন্ত সাম্রাজ্যকে সুসংহত করেন।
- ৪. সাহিত্যিক ও শিল্পমনা রূপ: বাবর কেবল অপরাজেয় যোদ্ধাই ছিলেন না; তিনি ছিলেন তুর্কি ভাষার শ্রেষ্ঠ গদ্যকার ও কবি। তাঁর স্বরচিত আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-বাবুরী’ (বাবুরনামা) বিশ্বসাহিত্যের ক্লাসিক সম্পদ। তিনি ভারতে চারবাগ ও মার্বেল ফোয়ারার মাধ্যমে মুঘল স্থাপত্যরীতির ভিত্তি স্থাপন করেন।
উপসংহার
বাবর দীর্ঘকাল শাসন করার সুযোগ পাননি (১৫৩০ সালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন), কিন্তু তিনি যে দৃঢ় সাম্রাজ্যের বীজ বপন করে গিয়েছিলেন, তাঁর বংশধররা তাকে এক বিশ্ববিশ্রুত সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিল।
২। মুঘল রাজনীতিতে সম্রাট হুমায়ুনের ব্যর্থতার দিকগুলো পর্যবেক্ষণ কর।
[Make an observation of the aspects of failure of Emperor Humayun in Mughal politics.]
ভূমিকা
মুঘল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাট নাসিরুদ্দীন মুহাম্মদ হুমায়ুন (শাসনকাল: ১৫৩০—১৫৪০ এবং ১৫৫৫—১৫৫৬ খ্রি.) ছিলেন এক অমায়িক, পণ্ডিত ও ক্ষমাশীল শাসক। কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্যের প্রাথমিক সংকটময় রাজনীতিতে তাঁর অতিরিক্ত দয়াশীলতা, রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা এবং সামরিক অলসতা তাঁর জন্য চরম ব্যর্থতা ও সিংহাসনচ্যুতি ডেকে এনেছিল। ঐতিহাসিক লেনপুল যথার্থই মন্তব্য করেছেন: “হুমায়ুন তাঁর সারা জীবন হোঁচট খেয়েছেন এবং অবশেষে হোঁচট খেয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন।”
হুমায়ুনের ব্যর্থতার প্রধান দিকসমূহ
- ১. সাম্রাজ্য ভাগ করে দেওয়ার আত্মঘাতী ভুল: পিতা বাবুরের অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী হুমায়ুন তাঁর সাম্রাজ্য ভাইদের মধ্যে ভাগ করে দেন। কামরানকে কাবুল ও কান্দাহার, আসকারীকে সাম্ভাল এবং হিন্দালকে আলোয়ার দেওয়া হয়। এর ফলে তিনি নিজের সামরিক মেরুদণ্ড পাঞ্জাব ও আফগান রিক্রুটমেন্ট অঞ্চল হারিয়ে একাকিত্বে পড়েন এবং ভাইরা সংকটের সময় বিশ্বাসঘাতকতা করে।
- ২. আফিম আসক্তি ও যুদ্ধক্ষেত্রে অলস বিলাসিতা: গুজরাট জয়ের পর মাণ্ডুতে এবং বাংলা জয়ের পর গৌড়ে (যার নাম দেন ‘জান্নাতাবাদ’) হুমায়ুন টানা ছয় মাস আমোদ-প্রমোদ ও আফিমের নেশায় মত্ত হয়ে কাটিয়ে দেন। এই সুযোগে শেরশাহ বিহার ও বাংলায় নিজের সামরিক শক্তি সংহত করেন।
- ৩. শেরশাহের কূটকৌশল অনুধাবনে ব্যর্থতা: হুমায়ুন শেরশাহ সূরীকে সাধারণ এক ছোট জমিদার মনে করে অবজ্ঞা করেছিলেন। চুনার দুর্গে শেরশাহকে ক্ষমা করে তিনি চরম ভুল করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর সাম্রাজ্য গ্রাস করেছিল।
- ৪. চৌসা ও কনৌজের যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় (১৫৩৯ ও ১৫৪০ খ্রি.):
- চৌসার যুদ্ধ (১৫৩৯ খ্রি.): গঙ্গাতীরে অসতর্ক অবস্থায় শেরশাহ রাতের অন্ধকারে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে হুমায়ুনের সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করেন। হুমায়ুন ঘোড়াসহ গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে নিজাম নামক এক ভিস্তির (পানি বহনকারী) সাহায্যে প্রাণ বাঁচান।
- কনৌজের যুদ্ধ (১৫৪০ খ্রি.): কনৌজের ময়দানে পুনরায় ভাইদের অনৈক্যের কারণে হুমায়ুনের বিশাল বাহিনী শেরশাহের সুশৃঙ্খল বাহিনীর কাছে চূর্ণ হয়। হুমায়ুন ভারতে সিংহাসন হারিয়ে পারস্যে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
উপসংহার
হুমায়ুনের ব্যক্তিগত চরিত্রে কোনো ত্রুটি ছিল না; তিনি ছিলেন সৎ ও মহানুভব। কিন্তু একজন প্রতিষ্ঠাকালীন সম্রাটের জন্য যে ইস্পাতকঠিন সিদ্ধান্ত ও নির্মম বাস্তবতা প্রয়োজন ছিল, তা তাঁর ছিল না। তবে ১৫৫৫ সালে পারস্যের শাহ তামাস্পের সহায়তায় তিনি হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করে নিজের ভুলের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত করতে পেরেছিলেন।
৩। মনসবদারী প্রথার বিশেষ উল্লেখপূর্বক সম্রাট আকবরের সামরিক সংস্কার আলোচনা কর।
[Discuss the military reforms of Emperor Akbar with special reference to the Mansabadari system.]
ভূমিকা
সম্রাট আকবরের (১৫৫৬—১৬০৫ খ্রি.) সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রধান চাবিকাঠি ছিল তাঁর সামরিক বাহিনীর আমূল সংস্কার। মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক সেনাবাহিনীর দুর্বলতা দূর করে তিনি ১৫৭১—৭৫ খ্রিষ্টাব্দে চেঙ্গিজ খাঁ ও মধ্য এশিয়ার সামরিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এক অনন্য ও আধুনিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, যা ‘মনসবদারী প্রথা’ (Mansabdari System) নামে পরিচিত।
মনসবদারী প্রথার মূল স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য
- ‘মনসব’ শব্দের অর্থ ও পদমর্যাদা: ‘মনসব’ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ পদমর্যাদা বা র্যাংক। মনসবদার ছিলেন সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের অধিকারী ব্যক্তি। সর্বনিম্ন ১০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০,০০০ পর্যন্ত (পরবর্তীতে যুবরাজদের জন্য ১২,০০০) মোট ৬৬টি পদমর্যাদা ছিল, যদিও বাস্তবে ৩৩টি গ্রেড কার্যকর ছিল।
- জাত ও সওয়ার (Zat and Sawar): ১৫৯৫ সালে আকবর মনসবদারীতে দুটি পদবি যুক্ত করেন:
- জাত (Zat): মনসবদারের ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং তাঁর নিজস্ব বাৎসরিক বেতন নির্ধারণ করত।
- সওয়ার (Sawar): মনসবদারকে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ঠিক কতজন সুসজ্জিত অশ্বারোহী সৈন্য সর্বদা প্রস্তুত রাখতে হবে, তা নির্দেশ করত।
- দাগ ও চেহারা প্রথা (Dagh and Chehra): মনসবদাররা যাতে বেতনের সময় ভুয়া সৈন্য বা দুর্বল ঘোড়া দেখিয়ে রাজকোষ প্রতারণা করতে না পারে, সেজন্য আলাউদ্দিন খলজির অনুকরণে আকবর ঘোড়ার গায়ে রাজকীয় সিলমোহরের পোড়া দাগ (দাগ) এবং প্রতিটি সৈন্যের শারীরিক বর্ণনাসম্বলিত রেজিস্ট্রি (চেহারা) সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করেন।
- বেতন ও জায়গির: মনসবদারদের নগদ অর্থ (নকদি) অথবা নির্দিষ্ট এলাকা থেকে রাজস্ব আদায়ের অধিকার (জায়গির) দেওয়া হতো। তবে মনসবদারী পদটি বংশানুক্রমিক ছিল না; সম্রাটের ইচ্ছানুযায়ী পদোন্নতি, পদাবনতি বা বদলি হতো এবং কোনো মনসবদারের মৃত্যুর পর তাঁর সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রীয়ভাবে বাজেয়াপ্ত (জবতি প্রথা) করা হতো।
অন্যান্য সামরিক সংস্কার
আকবর শক্তিশালী কামান ও গোলন্দাজ বাহিনী (তোপখানা), হাতিবাহিনী এবং নৌবহর (নওয়ারা) আধুনিকায়ন করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে সরাসরি সম্রাট কর্তৃক নিযুক্ত নিজস্ব খাস বাহিনী ‘আহাদী’ (Ahadis) গড়ে তোলেন।
উপসংহার
মনসবদারী প্রথা মুঘল সামরিক বাহিনীকে একটি সুসংহত, পেশাদার এবং সম্রাটের প্রতি অনুগত অখণ্ড সেন্ট্রালাইজড ফোর্সে রূপান্তর করেছিল। এটিই ছিল আকবরের তিন মহাদেশ কাঁপানো সামরিক বিজয়ের মূল ভিত্তি।
৪। সম্রাট শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে সংঘটিত উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বের বিবরণ দাও।
[Give an account of the war of succession of the sons of Emperor Shahjahan.]
ভূমিকা
১৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট শাহজাহান হঠাৎ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর চার যোগ্য পুত্র—দারা শিকোহ, শাহ সুজা, আওরঙ্গজেব ও মুরাদ বখশের মধ্যে সিংহাসন দখলের যে চরম রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়, তা মুঘল ইতিহাসের এক ট্র্যাজিক অধ্যায়। মুঘলদের কোনো নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার আইন না থাকায় “তখত ইয়া তাখতা” (সিংহাসন নয়তো শবদেহ)—এই নীতিতেই এ সংঘাত পরিচালিত হয়।
চার পুত্রের চরিত্র ও রাজনৈতিক অবস্থান
- দারা শিকোহ: জ্যেষ্ঠ পুত্র, উদারপন্থী সুফি ও উপনিষদের ফারসি অনুবাদক, শাহজাহানের প্রিয়পাত্র ও মনোনীত যুবরাজ; অবস্থান দিল্লিতে।
- শাহ সুজা: দ্বিতীয় পুত্র, শৌখিন ও বিলাসী; বাংলার শক্তিশালী সুবেদার; অবস্থান রাজমহলে।
- আওরঙ্গজেব: তৃতীয় পুত্র, নিষ্ঠাবান সুন্নি, অপরাজেয় সমরনায়ক, কঠোর রাজনীতিবিদ; দাক্ষিণাত্যের সুবেদার।
- মুরাদ বখশ: কনিষ্ঠ পুত্র, অকুতোভয় যোদ্ধা কিন্তু অপরিণামদর্শী; গুজরাটের সুবেদার।
গৃহযুদ্ধের প্রধান ঘটনাবলি ও যুদ্ধসমূহ
- বাহাদুরপুরের যুদ্ধ (ফেব্রুয়ারি ১৬৫৮ খ্রি.): বাংলার সুবেদার শাহ সুজা নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে আগ্রার দিকে অগ্রসর হলে দারার পুত্র সুলাইমান শিকোহ বাহাদুরপুরের যুদ্ধে সুজাকে পরাজিত করে বাংলায় তাড়িয়ে দেন।
- ধর্মতের যুদ্ধ (এপ্রিল ১৬৫৮ খ্রি.): আওরঙ্গজেব কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তায় কনিষ্ঠ ভাই মুরাদকে সাম্রাজ্যের এক-তৃতীয়াংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঐক্যজোট গঠন করেন। উজ্জয়িনীর কাছে ধর্মতের যুদ্ধে তাঁরা শাহজাহানের রাজকীয় বাহিনীকে (রাজপুত যশোবন্ত সিংয়ের অধীনে) শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন।
- সামুগড়ের নির্ণায়ক যুদ্ধ (মে ১৬৫৮ খ্রি.): আগ্রা থেকে মাত্র ৮ মাইল দূরে সামুগড়ের ময়দানে দারা শিকোহ ৫০,০০০ বিশাল সৈন্য নিয়ে আওরঙ্গজেবের মুখোমুখি হন। তীব্র গরমে এবং দারার রণকৌশলগত ভুলে (যুদ্ধহস্তী থেকে নেমে ঘোড়ায় চড়া) দারার বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। দারা পালিয়ে যান। এই যুদ্ধই আওরঙ্গজেবের সিংহাসন নিশ্চিত করে।
- আগ্রা দুর্গ অবরোধ ও শাহজাহানকে বন্দিকরণ: ১৬৫৮ সালের জুনে আওরঙ্গজেব আগ্রা দুর্গের পানির সরবরাহ বন্ধ করে দেন। বৃদ্ধ শাহজাহান আত্মসমর্পণ করেন এবং জীবনের শেষ আট বছর আগ্রা দুর্গের মুসাম্মান বুরজে বন্দি অবস্থায় অতিবাহিত করেন। মুরাদকে পরে গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
- দেওরাইর যুদ্ধ (১৬৫৯ খ্রি.): দারা পুনরায় রাজপুতানা থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে দেওরাইর যুদ্ধে লড়াই করে পরাজিত হন। পরবর্তীতে বিশ্বাসঘাতক মালিক জীবনের হাতে বন্দি হয়ে দিল্লিতে আনীত হন এবং রাষ্ট্রদ্রোহ ও ধর্মত্যাগের অভিযোগে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। সুজাকে আরাকানের জঙ্গলে হত্যা করা হয়।
উপসংহার
আওরঙ্গজেবের এই বিজয় ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামরিক দক্ষতার বিজয়। তবে পিতা ও ভাইদের প্রতি তাঁর নির্মম আচরণ মুঘল রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ সৌহার্দ্যকে চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছিল।
৫। সম্রাট আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি আলোচনা কর।
[Discuss the Deccan policy of Emperor Aurangzeb.]
ভূমিকা
মুঘল সম্রাট আবুল মুজাফফর মহিউদ্দীন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব আলমগীরের (শাসনকাল: ১৬৫৮—১৭০৭ খ্রি.) শাসনামলের দ্বিতীয়ার্ধ (১৬৮১—১৭০৭ খ্রি.) সম্পূর্ণভাবে দক্ষিণ ভারত বা দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধে ব্যয়িত হয়েছিল। তিনি টানা ২৫ বছর দিল্লিতে না ফিরে দাক্ষিণাত্যের তাঁবুতে জীবন কাটিয়ে দেন। ঐতিহাসিক ভি. এ. স্মিথ মন্তব্য করেছেন: “স্পেনীয় ক্ষত যেমন নেপোলিয়নকে ধ্বংস করেছিল, তেমনি দাক্ষিণাত্য ক্ষত আওরঙ্গজেবকে ধ্বংস করেছিল।”
দাক্ষিণাত্য নীতির উদ্দেশ্য ও পর্যায়সমূহ
- ১. শিয়া সালতানাত বিজয়ের বাসনা: দাক্ষিণাত্যের দুটি ধনী শিয়া রাজ্য—বিজাপুরের আদিল শাহী এবং গোলকুন্ডার কুতুব শাহী সালতানাতকে তিনি ইসলামি শরিয়ত ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী মনে করতেন। তিনি ১৬৮৬ সালে বিজাপুর এবং ১৬৮৭ সালে গোলকুন্ডা দুর্গ জয় করে মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
- ২. মারাঠা শক্তির উত্থান ও দমন: ছত্রপতি শিবাজীর নেতৃত্বে হিন্দু মারাঠারা গেরিলা যুদ্ধ (বার্গি হামলা) শুরু করে মুঘলদের জন্য ত্রাস সৃষ্টি করে। ১৬৬৬ সালে শিবাজী আগ্রায় এসে বন্দি হন এবং নাটকীয়ভাবে মিষ্টির ঝুড়িতে পালিয়ে যান। শিবাজীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র শম্ভুজীকে ১৬৮৯ সালে আওরঙ্গজেব বন্দি ও মৃত্যুদণ্ড দেন।
- ৩. অন্তহীন গেরিলা যুদ্ধ: শম্ভুজীর মৃত্যুর পর মারাঠারা রাজা রাম ও তারাবাইয়ের নেতৃত্বে সমগ্র দাক্ষিণাত্যে অগণিত স্বাধীন গেরিলা দলে বিভক্ত হয়ে মুঘল রসদ ও সেনাবহরে অতর্কিত আক্রমণ চালাতে থাকে। মুঘলরা একটি দুর্গ জয় করলে মারাঠারা অন্য দুর্গ দখল করত।
দাক্ষিণাত্য নীতির ফলাফল ও ক্ষতিকর প্রভাব
- অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব: দীর্ঘ ২৫ বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুঘল রাজকোষ সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যায়। সৈন্যদের কয়েক মাসের বেতন বকেয়া পড়ে।
- উত্তর ভারতে প্রশাসনের পতন: সম্রাট সুদূর দক্ষিণে আটকে থাকায় উত্তর ভারতে শিখ, জাট ও সৎনামীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক চেইন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
- বিশাল সৈন্যক্ষয়: দাক্ষিণাত্যের রণাঙ্গনে প্রায় এক লক্ষ মুঘল সৈন্য ও ঘোড়া রোগ, অনাহার ও যুদ্ধে প্রাণ হারায়। ১৭০৭ সালে আহমেদনগরে ক্লান্ত, ভগ্নহৃদয় সম্রাট মৃত্যুবরণ করেন।
উপসংহার
বিজাপুর ও গোলকুন্ডা ধ্বংস করে আওরঙ্গজেব মারাঠাদের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক বাফার রাজ্যগুলো হারিয়েছিলেন। ফলে দাক্ষিণাত্য নীতি মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের সবচেয়ে প্রধান কারণ হিসেবে পরিগণিত হয়।
৬। মুঘল সংস্কৃতির উৎকর্ষতার ক্ষেত্রে সম্রাট জাহাঙ্গীরের অবদান মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the contributions of Emperor Jahangir to the development of Mughal culture.]
ভূমিকা
মুঘল সম্রাট নূরউদ্দীন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর (শাসনকাল: ১৬০৫—১৬২৭ খ্রি.) যুদ্ধজয়ের চেয়ে শিল্প, সাহিত্য, প্রকৃতি এবং বিশেষ করে চিত্রকলা ও উদ্যানবিদ্যার পরম সমঝদার ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তাঁর শাসনামলে মুঘল চিত্রকলা নিখুঁত সৌন্দর্য ও বাস্তবসম্মত সূক্ষ্মতার চরম শিখরে উন্নীত হয়েছিল।
সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরের প্রধান অবদানসমূহ
- ১. মুঘল চিত্রকলার স্বর্ণযুগ: জাহাঙ্গীর স্বয়ং ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ চিত্র সমালোচক। তিনি দাবি করতেন যে কোনো ছবির চোখ, ভ্রু বা নাক ভিন্ন ভিন্ন শিল্পীর আঁকা হলেও তিনি দেখেই বলে দিতে পারতেন কোনটি কার আঁকা। পারসিক প্রভাব কাটিয়ে তাঁর আমলে খাঁটি ভারতীয় ও ইউরোপীয় রীতির মিশ্রণে পোর্ট্রেট বা প্রতিকৃতি অঙ্কনে বিপ্লব ঘটে।
- মনসুর (উস্তাদ মনসুর): বিরল পশুপাখি ও ফুল আঁকার জন্য ‘নাদিরুল আসর’ উপাধি পান (যেমন: বিখ্যাত সাইবেরিয়ান সারস ও ডোডো পাখির ছবি)।
- আবুল হাসান: মানব প্রতিকৃতি অঙ্কনে সেরা হওয়ায় ‘নাদিরুজ্জামান’ উপাধিতে ভূষিত হন।
- বিশানদাস: সম্রাট তাঁকে পারস্যের শাহের দরবারে পাঠিয়ে রাজপরিবারের নিখুঁত প্রতিকৃতি আঁকিয়ে আনেন।
- ২. কাশ্মীর ও লাহোরে মুঘল উদ্যান নির্মাণ: প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি কাশ্মীরে নির্মাণ করেন পৃথিবীর অন্যতম নয়নভিরাম ‘শালিমার বাগ’ এবং ‘নিশাত বাগ’। লাহোরের কামরান উদ্যানেও তিনি চমৎকার ফোয়ারা ও বাগান তৈরি করেন।
- ৩. আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী’: ফারসি ভাষায় স্বরচিত তাঁর আত্মজীবনী সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। এতে তিনি ভারতের উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, ফুল-পাখির প্রজনন এবং আবহাওয়ার চমৎকার বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।
- ৪. স্থাপত্য ও সুগন্ধি আবিষ্কার: সেকান্দরায় পিতা আকবরের সমাধি সৌধের নির্মাণ সম্পন্ন করেন। তাঁর স্ত্রী নূরজাহান গোলাপের পাপড়ি থেকে আধুনিক ‘আতর’ বা সুগন্ধি তেল (আতর-ই-জাহাঙ্গীরী) আবিষ্কার করেন।
উপসংহার
জাহাঙ্গীরের শিল্পপ্রীতি মুঘল সংস্কৃতির ভাবগাম্ভীর্যকে পরিশীলিত করেছিল। তাঁর হাতেই মুঘল শিল্পকলা রাজকীয় দরবার পেরিয়ে বৈশ্বিক নান্দনিকতার মর্যাদা লাভ করেছিল।
৭। মুঘলদের শিল্প ও স্থাপত্যের অগ্রগতি বর্ণনা কর।
[Describe the progress of art and architecture of the Mughals.]
ভূমিকা
১৫২৬ থেকে ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল শাসনামল ছিল ভারতীয় স্থাপত্যকলার সবচেয়ে ভাস্বর স্বর্ণযুগ। ফারসি, মধ্য এশীয় এবং ভারতীয় হিন্দু রীতির এক অপূর্ব মেলবন্ধনে মুঘলরা যে নতুন স্থাপত্যধারার জন্ম দিয়েছিল, তাকে বলা হয় ‘ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্য’ (Indo-Islamic Architecture)। বিশালত্ব, প্রতিসাম্য (Symmetry), মার্বেল পাথরের অলঙ্করণ এবং চারবাগ নকশা ছিল এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ধারাবাহিক স্থাপত্যিক অগ্রগতি
- ১. বাবর ও হুমায়ুন: বাবর ভারতে জ্যামিতিক চারবাগ পদ্ধতির সূচনা করেন (আগ্রার আরামবাগ)। হুমায়ুনের সমাধি (দিল্লি) তাঁর বিধবা স্ত্রী হাজি বেগম কর্তৃক নির্মিত হয়, যার লাল বেলেপাথর ও শ্বেতপাথরের দ্বৈত গম্বুজ পরবর্তী তাজমহলের আদি মডেল হিসেবে স্বীকৃত।
- ২. আকবরের স্থাপত্য—ফতেহপুর সিক্রি: আকবর লাল বেলেপাথরের বিশালত্বকে প্রাধান্য দেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো পরিকল্পিত নতুন রাজধানী ‘ফতেহপুর সিক্রি’। এর মধ্যে রয়েছে জামে মসজিদ, গুজরাট জয়ের স্মারক বিশ্বের সর্বোচ্চ তোরণ ‘বুলন্দ দরওয়াজা’, পঞ্চমহল এবং সুফি সেলিম চিশতীর শ্বেত মার্বেলের মাজার। আগ্রা দুর্গ ও লাহোর দুর্গও তাঁর আমলে নির্মিত।
- ৩. শাহজাহানের যুগ—মার্বেলের স্বর্ণযুগ: শাহজাহান ছিলেন ‘প্রিন্স অব বিল্ডার্স’ (স্থপতিদের যুবরাজ)। তিনি লাল পাথরের পরিবর্তে ধবধবে সাদা মার্বেল পাথর এবং সোনা ও দামি রত্ন বসানোর ‘পিয়েত্রা দুরা’ (Pietra Dura) কৌশলের চরম বিকাশ ঘটান:
- তাজমহল (আগ্রা): যমুনার তীরে মমতাজ মহলের স্মরণে নির্মিত বিশ্ববিশ্রুত প্রেমের সমাধি, যা পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম।
- দিল্লির লালকেল্লা ও জামে মসজিদ: লালকেল্লার দিওয়ান-ই-আম এবং অনুপম কারুকার্যময় দিওয়ান-ই-খাস (যেখানে রাখা ছিল বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসন)। দিল্লির জামে মসজিদ ভারতের বৃহত্তম মসজিদ।
- ময়ূর সিংহাসন (তখত-ই-তাউস): কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ ও কহিনূর হীরা খচিত জাদুকরী সিংহাসন।
- ৪. আওরঙ্গজেব: তিনি লাহোরে বিশাল ‘বাদশাহী মসজিদ’ এবং ঔরঙ্গাবাদে স্ত্রীর স্মরণে ‘বিবি কা মাকবারা’ (দাক্ষিণাত্যের তাজমহল) নির্মাণ করেন।
উপসংহার
মুঘল স্থাপত্য কেবল ইমারত নির্মাণ ছিল না, এটি ছিল পাথরে খোদাই করা এক মহাকাব্যিক শিল্পসৌন্দর্য, যা আজও সমগ্র বিশ্বে ভারতের সবচেয়ে বড় পর্যটন ও সাংস্কৃতিক অহংকার।
৮। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের কারণসমূহ পর্যালোচনা কর। এটিকে কী ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলা যায়?
[Review the causes of the Great Revolt of 1857, Can it be regarded as the first struggle for Indian Independence?]
ভূমিকা
১০ মে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মিরাট সেনানিবাসে ভারতীয় সিপাহিদের বিদ্রোহের মাধ্যমে শুরু হওয়া ‘১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ’ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এটি ছিল বিগত শতবর্ষের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔপনিবেশিক শোষণ, রাজনৈতিক আগ্রাসন এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত গণক্ষোভের এক নজিরবিহীন সশস্ত্র বিস্ফোরণ।
মহাবিদ্রোহের প্রধান কারণসমূহ
- ১. রাজনৈতিক কারণ—স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse): লর্ড ডালহৌসি এই অন্যায় নীতি প্রয়োগ করে ঝাঁসি, সাতারা, নাগপুর এবং অপশাসনের মিথ্যা অজুহাতে অযোধ্যা দখল করেন। শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহের উপাধি ও লালকেল্লা কেড়ে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং নানা সাহেবের পেনশন বন্ধ করা হয়।
- ২. অর্থনৈতিক কারণ—নির্দয় শোষণ: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়। ইংল্যান্ডের তৈরি কাপড়ের অবাধ আমদানিতে বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতি ও কারিগর সমাজ ধ্বংস হয়ে বেকার হয়ে পড়ে।
- ৩. সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ: কোম্পানি আইনের মাধ্যমে সতীদাহ নিবারণ ও বিধবা বিবাহ চালু করায় রক্ষণশীল হিন্দুরা ক্ষুব্ধ হয়। পাশাপাশি খ্রিস্টান মিশনারিদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাইবেল পড়ানো ধর্মান্ধতার আশঙ্কা তৈরি করে।
- ৪. সামরিক কারণ ও সিপাহিদের ক্ষোভ: ভারতীয় সিপাহিদের ব্রিটিশ সৈন্যদের চেয়ে কম বেতন দেওয়া হতো, পদোন্নতি বন্ধ ছিল এবং সমুদ্রে পাড়ি দেওয়ার বাধ্যতামূলক আইন (General Service Enlistment Act) তাদের জাত যাওয়ার ভয় সৃষ্টি করে।
- ৫. প্রত্যক্ষ কারণ—এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ: ১৮৫৬ সালে সেনাবাহিনীতে প্রবর্তিত এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজের ঢাকনা দাঁত দিয়ে কাটতে হতো। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে এই কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি মেশানো রয়েছে। এতে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত লাগে। মঙ্গল পাণ্ডে ব্যারাকপুরে প্রথম বিদ্রোহের আগুন জ্বালান।
“এটি কি ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম?”—মূল্যায়ন
- ঔপনিবেশিক ইংরেজ ঐতিহাসিকদের মত (নিছক সিপাহি বিদ্রোহ): জন লরেন্স ও চার্লস বল একে নিছক “স্বার্থান্বেষী সিপাহিদের সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ” বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন।
- ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হওয়ার পক্ষে যুক্তি:
- ১৯০৯ সালে বিপ্লবী বিনায়ক দামোদর সাভারকর তাঁর কালজয়ী গ্রন্থে সর্বপ্রথম একে “The Indian War of Independence” (ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম) বলে প্রমাণ করেন।
- বিদ্রোহে কেবল সিপাহিরা ছিল না; অযোধ্যা, রুহিলাখণ্ড ও বিহারে সাধারণ কৃষক, তালুকদার, আলেম এবং মেহনতি জনতা শামিল হয়েছিল।
- হিন্দু-মুসলিম ঐক্যবদ্ধভাবে শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে সমগ্র ভারতের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করে বিদেশি ব্রিটিশদের ভারত থেকে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে সশস্ত্র লড়াই করেছিল। রানি লক্ষ্মীবাঈ, নানা সাহেব, তাতিয়া তোপি এবং কুনওয়ার সিং জাতীয় মুক্তির প্রতীক হয়েছিলেন।
উপসংহার
যদিও আধুনিক সুসংহত জাতীয়তাবাদের অভাব ছিল, তবুও বিদেশি ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার এমন বিশাল গণআন্দোলন ভারতীয় ইতিহাসে পূর্বে কখনোই ঘটেনি। তাই ঐতিহাসিক বিচারে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ হিসেবে আখ্যায়িত করা সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত।
খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)
৯। শের শাহের শাসনব্যবস্থা আলোচনা কর।
[Discuss the administrative system of Sher Shah.]
প্রশাসনিক রূপরেখা
শেরশাহ সূরী (১৫৪০—১৫৪৫ খ্রি.) ছিলেন মধ্যযুগীয় ভারতের সর্বাপেক্ষা প্রতিভাবান সংস্কারক। তিনি সাম্রাজ্যকে ৪৭টি ‘সরকার’ এবং প্রতিটি সরকারকে বহু ‘পরগনায়’ বিভক্ত করেন। পরগনায় শিকদার ও আমিন নিয়োগ করা হতো। তিনি রায়তদের অধিকারের জন্য ‘পাট্টা ও কবুলিয়ত’ প্রবর্তন করেন। যোগাযোগ বিপ্লবে ১,৫০০ ক্রোশ দীর্ঘ গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড এবং ১,৭০০ সরাইখানা স্থাপন করেন। আধুনিক মুদ্রা হিসেবে বিশুদ্ধ রৌপ্যের ‘রুপিয়া’ (Rupiya) তিনিই প্রথম চালু করেছিলেন।
১০। মুঘল সাম্রাজ্যের সংহতি বিধানে সম্রাট আকবরের নীতিসমূহ ব্যাখ্যা কর।
[Explain the policies of Emperor Akbar to the consolidation of the Mughal Empire.]
সংহতি নীতিসমূহ
- ১. উদার রাজপুত নীতি: রাজপুত কন্যাদের বিবাহ, তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা এবং রাজা মানসিংহ ও ভগবান দাসকে উচ্চ সামরিক সেনাপতি পদে নিয়োগ করে শত্রু রাজপুতদের বিশ্বস্ত মিত্রে পরিণত করেন।
- ২. জিজিয়া ও তীর্থকর বিলোপ: অমুসলিমদের ওপর থেকে বৈষম্যমূলক জিজিয়া কর প্রত্যাহার করে জাতীয় ঐক্যের সূচনা করেন।
- ৩. মনসবদারী প্রথা ও কেন্দ্রীভূত প্রশাসন: সমগ্র সাম্রাজ্যের সৈন্য ও আমলাদের একক সেন্ট্রাল চেইনের আওতায় এনে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ চিরতরে বন্ধ করেন।
১১। মুঘল সাম্রাজ্যের অবক্ষয় ও পতনের কারণসমূহ বিশ্লেষণ কর।
[Analyze the causes of decline and fall of the Mughal Empire.]
পতনের প্রধান কারণসমূহ
- আওরঙ্গজেবের সুদীর্ঘ ২৫ বছরের ব্যর্থ ও রক্তক্ষয়ী দাক্ষিণাত্য যুদ্ধ, যা রাজকোষ শূন্য করে দেয়।
- আওরঙ্গজেবের পরবর্তী উত্তরসূরিদের চরম অযোগ্যতা, মদ্যপানে আসক্তি ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্র।
- কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তরাধিকার নীতি না থাকায় ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।
- মারাঠা, শিখ ও জাটদের অবিরত বিদ্রোহ।
- নাদির শাহ (১৭৩৯ খ্রি.) ও আহমদ শাহ আবদালীর ধ্বংসাত্মক ভারত আক্রমণ এবং ময়ূর সিংহাসন ও কোহিনূর লুট।
- ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধুনিক অস্ত্র ও কূটকৌশলপূর্ণ আগ্রাসন।
১২। তাজমহলের উপর একটি টীকা লেখ।
[Write a short note on the ‘Tajmahal’.]
তাজমহলের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
ভারতের আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত ‘তাজমহল’ মুঘল স্থাপত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন এবং পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী আরজুমান্দ বানু বেগম (মমতাজ মহল)-এর স্মরণে ১৬৩১ থেকে ১৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এটি নির্মাণ করেন। প্রধান স্থপতি ছিলেন ওস্তাদ আহমদ লাহোরী। রাজস্থানের মাকরানা থেকে আনা নিখাদ শ্বেত মার্বেল পাথরে নির্মিত এই সমাধিতে মূল্যবান রত্ন বসানোর ‘পিয়েত্রা দুরা’ নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাজমহলকে অভিহিত করেছেন: “কালের কপোলতলে একবিন্দু নয়নের জল।”
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘ভারতীয় মুসলমানদের ইতিহাস (১৫২৬—১৮৫৭)’ পেপারের সময়সীমা কতটুকু?
১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবুরের মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ও শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের ক্ষমতাচ্যুতি পর্যন্ত এ পেপারের মূল সিলেবাস।
২. আকবরের মনসবদারী প্রথায় ‘জাত’ ও ‘সওয়ার’-এর অর্থ কী?
‘জাত’ দ্বারা মনসবদারের ব্যক্তিগত পদমর্যাদা ও বেতন বোঝাত, আর ‘সওয়ার’ দ্বারা বোঝাত তাঁকে সম্রাটের অধীনে কতজন যুদ্ধাশ্ব ও অশ্বারোহী সৈন্য প্রস্তুত রাখতে হবে।
৩. আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি কেন মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য দায়ী ছিল?
টানা ২৫ বছর যুদ্ধ করতে গিয়ে মুঘল রাজকোষ সম্পূর্ণ শূন্য হয়, লক্ষাধিক দক্ষ সৈন্য প্রাণ হারায় এবং উত্তরে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়।
৪. জাহাঙ্গীরের শাসনামলকে কেন চিত্রকলার স্বর্ণযুগ বলা হয়?
তিনি পারসিক প্রভাবমুক্ত খাঁটি ভারতীয় রীতির প্রতিকৃতি ও বাস্তবসম্মত জীবজন্তুর নিখুঁত চিত্রাঙ্কনে উস্তাদ মনসুর ও আবুল হাসানের মতো পণ্ডিতদের শ্রেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছিলেন।
৫. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে কেন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলা হয়?
কারণ হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধভাবে বিদেশি ব্রিটিশ শোষণ থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য এবং বাহাদুর শাহকে স্বাধীন ভারতের প্রতীক বানিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধে অবতীর্ণ হয়েছিল।
৬. ২০৫১০৪ বিষয়ের পরীক্ষার খাতায় ভালো উত্তরের মূল কৌশল কী?
মুঘল আমলের ফারসি পরিভাষা (মনসব, সুবা, জায়গির, পিয়েত্রা দুরা, চারবাগ), ঐতিহাসিক তারিখ এবং ব্রিটিশ ও ভারতীয় ঐতিহাসিকদের তুলনামূলক পর্যালোচনা সন্নিবেশিত করা।

