পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০০৬
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (ষষ্ঠ পত্র)
বিষয় কোড: ২০ ১১ ০৬
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য : ডান পাশে উল্লিখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক। প্রত্যেক বিভাগ থেকে চারটি করে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]
ক বিভাগ—রচনামূলক প্রশ্ন
মান—১৫ × ৪ = ৬০
১। অর্থনীতি বলতে কী বোঝায়? অর্থনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু আলোচনা কর। (৫ + ১০ = ১৫)
[What do you mean by economics? Discuss the scope and subject matter of economics.]
১. অর্থনীতি বলতে কী বোঝায় (Meaning & Definition of Economics):
‘অর্থনীতি’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Economics’, যা গ্রিক শব্দ ‘Oikonomia’ (Oikos অর্থ গৃহ এবং Nemein বা Nomos অর্থ পরিচালনা বা নিয়ম) থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো ‘গার্হস্থ্য বা পারিবারিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা’। তবে আধুনিক যুগে অর্থনীতি কেবল পরিবার পরিচালনায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি সার্বিক সামাজিক বিজ্ঞান। মানবজীবনে মানুষের অভাব অসীম, কিন্তু সেই অভাব পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। এই সীমাবদ্ধ সম্পদকে কীভাবে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে সর্বাধিক অভাব পূরণ ও সামাজিক কল্যাণ অর্জন করা যায়, অর্থনীতি মূলত সেই মানবীয় আচরণ অনুসন্ধান করে।
অর্থনীতির প্রামাণ্য কয়েকটি ঐতিহাসিক সংজ্ঞা নিচে উল্লেখ করা হলো:
- অ্যাডাম স্মিথ (অর্থনীতির জনক): ১৭৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘The Wealth of Nations’-এ তিনি বলেন: “Economics is an inquiry into the nature and causes of the wealth of nations.” অর্থাৎ অর্থনীতি হলো এমন একটি বিজ্ঞান যা জাতির সম্পদের প্রকৃতি ও কারণ অনুসন্ধান করে। তিনি অর্থনীতিকে সম্পদের বিজ্ঞান হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
- আলফ্রেড মার্শাল (কল্যাণমুখী সংজ্ঞা): ১৮৯০ সালে তাঁর ‘Principles of Economics’ গ্রন্থে মার্শাল বলেন: “Economics is a study of mankind in the ordinary business of life.” অর্থাৎ অর্থনীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কার্যাবলি নিয়ে আলোচনা করে, যা বস্তুগত কল্যাণ অর্জনের সাথে জড়িত।
- লায়োনেল রবিন্স (আধুনিক ও সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা): ১৯৩২ সালে তাঁর ‘Nature and Significance of Economic Science’ গ্রন্থে রবিন্স বলেন: “Economics is the science which studies human behavior as a relationship between ends and scarce means which have alternative uses.” অর্থাৎ অর্থনীতি এমন একটি বিজ্ঞান যা বিকল্প ব্যবহারযোগ্য দুষ্প্রাপ্য উপকরণ এবং অসীম লক্ষ্যের মধ্যে সমন্বয় সাধনকারী মানবীয় আচরণ অধ্যয়ন করে। এই সংজ্ঞাটি তিনটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত: অসীম অভাব (Unlimited Wants), সীমিত সম্পদ (Scarcity of Resources) এবং সম্পদের বিকল্প ব্যবহার (Alternative Uses of Resources)।
২. অর্থনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু (Scope and Subject Matter of Economics):
অর্থনীতির পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। আধুনিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে এর মূল বিষয়বস্তুকে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রসমূহে বিন্যস্ত করা যায়:
- মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যা নির্বাচন: অধ্যাপক পি. এ. স্যামুয়েলসন (P. A. Samuelson)-এর মতে প্রতিটি সমাজ তিনটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়:
- কী উৎপাদন করতে হবে এবং কতটুকু করতে হবে? (What to produce?)
- কীভাবে উৎপাদন করতে হবে? (How to produce?)
- কার জন্য উৎপাদন করতে হবে? (For whom to produce?)
- উৎপাদন (Production): প্রাকৃতিক সম্পদ ও শ্রমের সমন্বয়ে মানুষের ব্যবহার উপযোগী দ্রব্য ও সেবা সৃষ্টি করা এবং তাতে নতুন উপযোগ (Utility) যোগ করা অর্থনীতির অন্যতম প্রাথমিক পরিধি। উৎপাদনের প্রধান চারটি উপাদান—ভূমি, শ্রম, মূলধন ও সংগঠন নিয়ে এখানে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।
- বণ্টন (Distribution): উৎপাদিত সামগ্রিক জাতীয় আয় উৎপাদনের উপাদানসমূহের মধ্যে কীভাবে খাজনা (Rent), মজুরি (Wage), সুদ (Interest) ও মুনাফা (Profit) হিসেবে বণ্টিত হয়, তা বণ্টনের তত্ত্বে আলোচিত হয়।
- বিনিময় (Exchange): উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে দ্রব্যসামগ্রীর হাতবদল, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বাজার ব্যবস্থা, অর্থ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিনিময়ের আওতাভুক্ত।
- ভোগ (Consumption): মানুষের অভাব মেটানোর উদ্দেশ্যে উৎপাদিত দ্রব্যের উপযোগ নিঃশেষ করাকে ভোগ বলে। চাহিদা, প্রান্তিক উপযোগ, ভোক্তার আচরণ ইত্যাদি ভোগের পরিধিতে অন্তর্ভুক্ত।
- ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতি (Micro & Macro Economics):
- ব্যষ্টিক অর্থনীতি: সমাজের একক ভোক্তা, পরিবার, স্বতন্ত্র ফার্ম বা নির্দিষ্ট শিল্পের অর্থনৈতিক আচরণ বিশ্লেষণ করে।
- সামষ্টিক অর্থনীতি: জাতীয় আয়, সামগ্রিক সঞ্চয়, সামগ্রিক বিনিয়োগ, সাধারণ মূল্যস্তর, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করে।
- সরকারি অর্থব্যবস্থা (Public Finance): রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের নীতি, রাজস্ব আদায়, বাজেট প্রণয়ন, সরকারি ঋণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু।
- আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য: বিভিন্ন দেশের মধ্যকার বৈদেশিক বাণিজ্য, লেনদেন ভারসাম্য (Balance of Payments), বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর (IMF, World Bank) কার্যক্রম এর অন্তর্ভুক্ত।
- কল্যাণ অর্থনীতি (Welfare Economics): অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সমাজের সামগ্রিক মানবকল্যাণ ও জীবনযাত্রার মান কীভাবে সর্বোচ্চ করা যায়, তা নিয়ে এই শাখাটি কাজ করে।
২। চাহিদা ও যোগান বলতে কী বোঝায়? চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্বটি আলোচনা কর। (৫ + ১০ = ১৫)
[What do you mean by demand and supply? Discuss the conventional theory of demand and supply.]
১. চাহিদা ও যোগানের ধারণা (Concept of Demand & Supply):
- চাহিদা (Demand): সাধারণ অর্থে কোনো দ্রব্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে চাহিদা বলে। কিন্তু অর্থনীতিতে কেবল আকাঙ্ক্ষাই চাহিদা নয়। অর্থনীতিতে কার্যকর চাহিদা হতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ হতে হয়: (১) দ্রব্যটি পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছা, (২) দ্রব্যটি কেনার মতো প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য বা অর্থ, এবং (৩) সেই অর্থ ব্যয় করার মানসিক প্রস্তুতি বা সদিচ্ছা। সুতরাং, একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দামে একজন ক্রেতা কোনো দ্রব্যের যে পরিমাণ ক্রয় করতে প্রস্তুত থাকে, তাকে অর্থনীতিতে চাহিদা বলা হয়।
চাহিদা বিধি (Law of Demand): অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, কোনো দ্রব্যের দাম বাড়লে তার চাহিদা কমে এবং দাম কমলে চাহিদা বাড়ে। অর্থাৎ দাম ও চাহিদার মধ্যে বিপরীতমুখী সম্পর্ক বিদ্যমান (D = f(P), যেখানে f’ < 0)। - যোগান (Supply): সাধারণ অর্থে কোনো দ্রব্যের বিদ্যমান মজুদকে যোগান মনে করা হয়, কিন্তু তা সঠিক নয়। অর্থনীতিতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দামে বিক্রেতা বা উৎপাদক কোনো দ্রব্যের যে নির্দিষ্ট পরিমাণ বাজারে বিক্রয় করার জন্য প্রস্তুত থাকে, তাকে যোগান বলে।
যোগান বিধি (Law of Supply): অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, দ্রব্যের দাম বাড়লে যোগান বৃদ্ধি পায় এবং দাম কমলে যোগান হ্রাস পায়। অর্থাৎ দাম ও যোগানের মধ্যে প্রত্যক্ষ বা ধনাত্মক সম্পর্ক বিদ্যমান (S = f(P), যেখানে f’ > 0)।
২. চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্ব / ভারসাম্য দাম নির্ধারণ (Conventional Theory of Demand & Supply):
সনাতন বা ক্লাসিক্যাল এবং নব্য-ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কোনো দ্রব্যের দাম এককভাবে চাহিদা বা এককভাবে যোগান দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং ক্রেতার চাহিদা এবং বিক্রেতার যোগানের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার (Interaction) মাধ্যমেই দ্রব্যের ভারসাম্য দাম (Equilibrium Price) এবং ভারসাম্য পরিমাণ (Equilibrium Quantity) নির্ধারিত হয়। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ আলফ্রেড মার্শাল একে কাঁচির দুটি ফলার সাথে তুলনা করেছেন। একটি কাঁচি যেমন একক ব্লেড দিয়ে কাপড় কাটতে পারে না, তেমনি শুধু চাহিদা বা শুধু যোগান দিয়ে দাম নির্ধারিত হতে পারে না; উভয় ফলার সমন্বয়েই ভারসাম্য সূচিত হয়।
কাল্পনিক সূচির সাহায্যে ভারসাম্য বিশ্লেষণ:
| প্রতি একক দ্রব্যের দাম (P) [টাকায়] | চাহিদার পরিমাণ (D) [একক] | যোগানের পরিমাণ (S) [একক] | বাজারের অবস্থা ও প্রতিক্রিয়া | দামের ওপর চাপ |
|---|---|---|---|---|
| ১০ | ৫০ | ১০ | অতিরিক্ত চাহিদা (D > S) | দাম বৃদ্ধির প্রবণতা |
| ২০ | ৪০ | ২০ | ঘাটতি বিদ্যমান (D > S) | দাম বৃদ্ধির প্রবণতা |
| ৩০ | ৩০ | ৩০ | চাহিদা ও যোগান সমান (D = S) [ভারসাম্য] | দাম স্থির থাকবে |
| ৪০ | ২০ | ৪০ | অতিরিক্ত যোগান (S > D) | দাম হ্রাসের প্রবণতা |
| ৫০ | ১০ | ৫০ | উদ্বৃত্ত পণ্যের চাপ (S > D) | দাম হ্রাসের প্রবণতা |
তাত্ত্বিক পর্যালোচনা:
- অতিরিক্ত চাহিদার অবস্থা (Excess Demand): যখন বাজারে দ্রব্যের দাম কম (যেমন ১০ বা ২০ টাকা) থাকে, তখন ক্রেতারা বেশি কিনতে চায় কিন্তু বিক্রেতারা কম বিক্রি করতে চায়। ফলে বাজারে দ্রব্যের ঘাটতি দেখা দেয়। ক্রেতাদের মধ্যকার প্রতিযোগিতায় দাম ক্রমশ ওপরের দিকে ধাবিত হয়।
- অতিরিক্ত যোগানের অবস্থা (Excess Supply): যখন দাম বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ বা ৫০ টাকা হয়, তখন বিক্রেতারা লাভবান হওয়ার জন্য প্রচুর পণ্য বাজারে আনে, কিন্তু চড়া দামের কারণে ক্রেতারা চাহিদা কমিয়ে দেয়। ফলে অবিক্রিত পণ্যের স্তূপ জমে এবং বিক্রেতাদের মধ্যে দাম কমানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
- ভারসাম্য অবস্থা (Equilibrium State): দাম যখন ৩০ টাকায় পৌঁছায়, তখন চাহিদার পরিমাণ (৩০ একক) এবং যোগানের পরিমাণ (৩০ একক) হুবহু পরস্পর সমান হয়ে যায় (D = S)। এই দামেই ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই সন্তুষ্ট থাকে। এই ৩০ টাকাই হলো সনাতন তত্ত্ব অনুযায়ী ভারসাম্য দাম এবং ৩০ একক হলো ভারসাম্য পরিমাণ। যেকোনো বিচ্যুতি ঘটলে বাজারের অদৃশ্য হাত (Invisible Hand) স্বয়ংক্রিয়ভাবে দামকে পুনরায় এই ভারসাম্য বিন্দুতে ফিরিয়ে আনে।
৩। উপযোগ কাকে বলে? সমালোচনাসহ ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধিটি ব্যাখ্যা কর। (৫ + ১০ = ১৫)
[What is utility? Explain the law of diminishing marginal utility with criticism.]
১. উপযোগ কাকে বলে (Definition of Utility):
সাধারণ অর্থে উপযোগ বলতে কোনো দ্রব্যের উপকারিতা বোঝায়। কিন্তু অর্থনীতিতে উপযোগ একটি নৈতিক নিরপেক্ষ ধারণা। অর্থনীতিতে উপযোগ হলো কোনো দ্রব্য বা সেবার সেই বিশেষ ক্ষমতা বা গুণ, যা দ্বারা মানুষের কোনো নির্দিষ্ট অভাব মেটানো সম্ভব হয় (Utility is the want-satisfying power of a commodity)। কোনো দ্রব্য যদি মানুষের অভাব পূরণ করতে পারে, তবে নৈতিকভাবে তা ভালো হোক কিংবা ক্ষতিকর হোক, অর্থনীতিতে তার উপযোগ রয়েছে। যেমন—খাবারের ক্ষুধা নিবারণের উপযোগ রয়েছে, আবার ক্ষতিকর হলেও ধূমপায়ীর নিকট সিগারেটের উপযোগ রয়েছে।
উপযোগকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়: (ক) প্রাথমিক উপযোগ: কোনো দ্রব্যের প্রথম একক ভোগের মাধ্যমে প্রাপ্ত তৃপ্তি; (খ) মোট উপযোগ (Total Utility – TU): কোনো দ্রব্যের বিভিন্ন একক ভোগ থেকে প্রাপ্ত প্রান্তিক উপযোগের সমষ্টি; (গ) প্রান্তিক উপযোগ (Marginal Utility – MU): দ্রব্যের ভোগের পরিমাণ এক একক বৃদ্ধি করার ফলে মোট উপযোগে যে অতিরিক্ত উপযোগ যোগ হয়, তাকে প্রান্তিক উপযোগ বলে (MU = ΔTU / ΔQ)।
২. ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি (Law of Diminishing Marginal Utility):
জার্মান অর্থনীতিবিদ এইচ. এইচ. গসেন (H. H. Gossen) ১৮৫৪ সালে সর্বপ্রথম এই তত্ত্বটি উপস্থাপন করেন, তাই একে ‘গসেনের প্রথম বিধি’ বলা হয়। পরবর্তীতে আলফ্রেড মার্শাল একে পূর্ণাঙ্গ ও বিজ্ঞানসম্মত রূপ দান করেন।
মূল বক্তব্য: অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থেকে কোনো ব্যক্তি যখন একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো নির্দিষ্ট দ্রব্যের ভোগের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি করতে থাকে, তখন ওই দ্রব্যের অতিরিক্ত এককগুলো থেকে প্রাপ্ত উপযোগ (প্রান্তিক উপযোগ) ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। একেই ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি বলে।
বিধির অনুমিত শর্তাবলি (Assumptions):
- ভোক্তা যুক্তিশীল আচরণ করবে এবং উপযোগ সংখ্যাগতভাবে পরিমাপযোগ্য (১, ২, ৩ ইত্যাদি কার্ডিনাল সংখ্যায়)।
- ভোক্তার আয়, রুচি, পছন্দ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা অপরিবর্তিত থাকবে।
- দ্রব্যের প্রতিটি একক সমজাতীয় ও মানসম্মত হতে হবে।
- ভোগের ক্ষেত্রে কোনো সময়ের ব্যবধান থাকবে না; একটির পর একটি ধারাবাহিকভাবে ভোগ করতে হবে।
- অর্থের প্রান্তিক উপযোগ সর্বদা স্থির থাকবে।
কাল্পনিক সূচি ও বিশ্লেষণ (আম ভোগের উদাহরণ):
| দ্রব্যের একক (আমের সংখ্যা) | মোট উপযোগ (TU) [টাকায় বা ইউটিলে] | প্রান্তিক উপযোগ (MU) [টাকায় বা ইউটিলে] |
|---|---|---|
| ১ম আম | ১০ | ১০ (প্রাথমিক উপযোগ) |
| ২য় আম | ১৮ | ৮ (হ্রাস পাচ্ছে) |
| ৩য় আম | ২৪ | ৬ (হ্রাস পাচ্ছে) |
| ৪র্থ আম | ২৮ | ৪ (হ্রাস পাচ্ছে) |
| ৫ম আম | ৩০ | ২ (সর্বনিম্ন ধনাত্মক) |
| ৬ষ্ঠ আম | ৩০ (সর্বোচ্চ) | ০ (শূন্য প্রান্তিক উপযোগ / পূর্ণ তৃপ্তি) |
| ৭ম আম | ২৮ (হ্রাস পাচ্ছে) | -২ (ঋণাত্মক প্রান্তিক উপযোগ / অস্বস্তি) |
সূচি বিশ্লেষণ: ১ম আম থেকে ভোক্তা ১০ একক উপযোগ পায়। ২য় আমে তীব্রতা কমায় পায় ৮ একক, এভাবে ৫ম একক পর্যন্ত প্রান্তিক উপযোগ ক্রমাগত হ্রাস পায়। ৬ষ্ঠ আমে মোট উপযোগ সর্বোচ্চ (৩০) হয় এবং প্রান্তিক উপযোগ শূন্য (০) হয়, যা ভোক্তার পরম তৃপ্তির বিন্দু। এর পরেও ৭ম আম খেতে বাধ্য করা হলে উপযোগ ঋণাত্মক (-২) হয়ে যায় এবং মোট উপযোগ কমতে থাকে।
বিধির সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা (Criticisms / Limitations):
- উপযোগের মানসিক ও সংখ্যাগত পরিমাপ অসম্ভব: আধুনিক অর্থনীতিবিদদের (হিকস ও অ্যালেন) মতে উপযোগ মানুষের অন্তরের অদৃশ্য মানসিক তৃপ্তি, একে ১, ২, ৩ টাকা বা সংখ্যায় পরিমাপ করা অবাস্তব। একে কেবল পর্যায়গতভাবে (Ordinal) প্রথম, দ্বিতীয় ইত্যাদি সাজানো যায়।
- সময়ের ব্যবধান: ভোগের মাঝে দীর্ঘ বিরতি দিলে বিধিটি কার্যকর হয় না। সকালে একটি আম খেয়ে বিকেলে আরেকটি খেলে উপযোগ না কমে বরং বাড়তে পারে।
- শখের বা দুষ্প্রাপ্য বস্তু: প্রাচীন মুদ্রা, ডাকটিকিট, মূল্যবান চিত্রকর্ম ইত্যাদি সংগ্রহের ক্ষেত্রে যত বেশি সংগ্রহ করা যায়, মানুষের আনন্দ ও উপযোগ তত বাড়ে, কমে না।
- মাদকাসক্তি বা অভ্যাস: মদ্যপায়ীদের ক্ষেত্রে নেশার মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতি অতিরিক্ত এককের উপযোগ ক্রমাগত বাড়ে।
- অর্থের প্রান্তিক উপযোগের পরিবর্তন: মার্শাল অর্থের প্রান্তিক উপযোগ স্থির ধরেছেন, যা বাস্তবসম্মত নয়। মানুষের হাতে টাকা কমে গেলে টাকার মূল্য বাড়ে।
- অপর্যাপ্ত বা ক্ষুদ্র একক: যদি কাউকে এক ফোঁটা পানি বা চামচের এক বিন্দু শরবত দেওয়া হয়, তবে তার পিপাসা না কমে উপযোগ আরও বৃদ্ধি পায়।
৪। ইসলামি অর্থনীতি বলতে কী বোঝায়? “ইসলামি অর্থনীতির উৎস যেখানে কুরআন ও হাদিস, আধুনিক অর্থনীতি সেখানে মানবপ্রসূত”—উক্তিটি ব্যাখ্যা কর। (৫ + ১০ = ১৫)
[What do you mean by Islamic economics? “The sources of Islamic economics are the Quran and Hadith, where the modern economics is man mode [made]”—Explain the quote.]
১. ইসলামি অর্থনীতির প্রামাণ্য পরিচয় (Definition of Islamic Economics):
ইসলামি অর্থনীতি হলো মানবজীবনের সার্বিক অর্থনৈতিক সমস্যা ও বৈষয়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনার এমন এক খোদায়ী বা ঐশী বিধান, যা পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ এবং শরিয়তের সার্বজনীন নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বস্তুগত বিদ্যা নয়, বরং ঈমান, তাকওয়া, হালাল-হারামের সীমারেখা, সামাজিক ইনসাফ এবং আখিরাতের চূড়ান্ত জবাবদিহিতার এক অপূর্ব সমন্বয়।
বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. নেজাতুল্লাহ সিদ্দিকী-এর মতে: “ইসলামি অর্থনীতি হলো এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা ইসলামি শরিয়তের আলোকে ন্যায়পরায়ণতা, কল্যাণ ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে মুসলিম উম্মাহ ও বিশ্বমানবতার বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক কল্যাণ নিশ্চিত করে।”
এর মূল ভিত্তি হলো: আল্লাহর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা, মানুষকে পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি (খলিফা) ও সম্পদের ট্রাস্টি হিসেবে গণ্য করা, শোষণমূলক সুদ (রিবা), জুয়া ও কালোবাজারি নিষিদ্ধ করা এবং যাকাত, সাদাকা ও ইনসাফের মাধ্যমে বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করা।
২. “ইসলামি অর্থনীতির উৎস যেখানে কুরআন ও হাদিস, আধুনিক অর্থনীতি সেখানে মানবপ্রসূত”—উক্তিটির তাৎপর্য ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ:
আলোচ্য উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত। এটি ইসলামি অর্থনীতি এবং আধুনিক মানবসৃষ্ট অর্থনীতির (পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র) মৌলিক দর্শন, উৎস ও গতিপ্রকৃতির মধ্যকার সুদূরপ্রসারী পার্থক্য নির্দেশ করে। নিচে এর বিশদ তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো:
- উৎসের স্বকীয়তা ও ভিত্তিগত পার্থক্য:
- ইসলামি অর্থনীতির উৎস: ইসলামি অর্থনীতির প্রধান ও অপরিবর্তনীয় উৎস হলো মহান আল্লাহর প্রত্যক্ষ বাণী পবিত্র কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ ও হাদিস শরিফ। এর সম্পূরক উৎস হলো ইজমা ও কিয়াস। যেহেতু এর স্রষ্টা সর্বজ্ঞানী আল্লাহ, তাই এর বিধিবিধান ত্রুটিমুক্ত, শাশ্বত এবং স্থান-কালের ঊর্ধ্বে চিরন্তন সত্য।
- আধুনিক অর্থনীতির উৎস: আধুনিক অর্থনীতি (যেমন পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্র) সম্পূর্ণ মানবমনীষা, দার্শনিক চিন্তা (অ্যাডাম স্মিথ, ডেভিড রিকার্ডো, কার্ল মার্ক্স, জন মেনার্ড কেইনস) এবং মানুষের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার ফসল। মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ ও পরিবর্তনশীল বিধায় আধুনিক অর্থনৈতিক তত্ত্বসমূহ নিত্যনতুন সংকট ও পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়।
- মৌলিক লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি:
- ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি: ইসলাম ইহলৌকিক প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি আখিরাতের চিরস্থায়ী সাফল্যকে (ফালাহ্) অর্থনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।
- আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি: আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ অর্থনীতি সম্পূর্ণ বস্তুবাদী। এর একমাত্র লক্ষ্য সর্বাধিক পার্থিব মুনাফা অর্জন, সম্পদ পুঞ্জীভূতকরণ এবং ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করা; এতে আধ্যাত্মিকতা বা আখিরাতের জবাবদিহিতার কোনো স্থান নেই।
- সম্পদের মালিকানার দর্শন:
- ইসলামে: আসমান ও জমিনের সকল সম্পদের প্রকৃত ও নিরঙ্কুশ মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ («লিল্লাহি মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদ»)। মানুষ কেবল আল্লাহর প্রতিনিধি ও আমানতদার। তাই ইচ্ছামতো অপচয় বা শোষণ করার অধিকার মানুষের নেই।
- পুঁজিবাদে: ব্যক্তিমালিকানা অবাধ ও নিয়ন্ত্রহীন, যা সীমাহীন বৈষম্য ও একচেটিয়া শোষণের জন্ম দেয়।
- সমাজতন্ত্রে: ব্যক্তিমালিকানা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সব রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়, যা ব্যক্তির কর্মোদ্যম ধ্বংস করে দেয়।
- সুদ বনাম যাকাত ভিত্তিক ব্যবস্থা:
- আধুনিক অর্থনীতি: আধুনিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো ‘সুদ’ (Interest)। সুদ ধনীদের আরও ধনী করে এবং দরিদ্রকে নিঃস্ব করে সমাজে শোষণের ভিত গড়ে।
- ইসলামি অর্থনীতি: ইসলাম সুদকে চিরতরে হারাম ঘোষণা করেছে («আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন» – সূরা বাকারা: ২৭৫)। পক্ষান্তরে দরিদ্র ও বঞ্চিতদের পুনর্বাসনে বাধ্যতামূলক ‘যাকাত’ ও ঐচ্ছিক সাদাকার মতো ইনসাফপূর্ণ বণ্টনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে।
- নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অনুশাসন:
আধুনিক অর্থনীতি নৈতিকতা-নিরপেক্ষ। লাভজনক হলে মদ, জুয়া, অস্ত্র ব্যবসা, শোষণমূলক ফাটকাবাজারি সবই সেখানে বৈধ। কিন্তু ইসলামি অর্থনীতিতে হালাল ও হারামের অমোঘ বিভাজন বিদ্যমান; যা কিছু মানবকল্যাণের পরিপন্থী তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
উপসংহার: মানবসৃষ্ট তত্ত্ব যুগে যুগে নানা অর্থনৈতিক মহামন্দা ও বৈষম্যের জন্ম দিয়ে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু কুরআন ও হাদিসের ঐশী নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামি অর্থনীতিই পারে একটি টেকসই, শোষণমুক্ত ও সুষম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
৫। ইসলামি ব্যাংক কী? বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকের উন্নয়নে সমস্যাসমূহ বর্ণনা কর এবং সমস্যার সমাধান সম্পর্কে তোমার পরামর্শ পেশ কর। (৫ + ৫ + ৫ = ১৫)
[What is Islami Bank? Describe the problems in development of Islami Bank in Bangladesh and give your suggestion about solving the problems.]
১. ইসলামি ব্যাংকের পরিচয় (Definition of Islamic Bank):
ইসলামি ব্যাংক হলো এমন একটি আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, যা ইসলামি শরিয়তের মূলনীতি—বিশেষ করে সুদমুক্ত লেনদেন, লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব এবং হালাল উৎপাদনশীল বিনিয়োগের ভিত্তিতে যাবতীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে।
ওআইসি (OIC)-এর সংজ্ঞায়: “ইসলামি ব্যাংক এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যার সংবিধি, নিয়মকানুন ও কার্যক্রমে স্পষ্টভাবে শরিয়তের বিধান কার্যকর করার অঙ্গীকার থাকে এবং যা লেনদেনে সব ধরনের সুদের আদান-প্রদান কঠোরভাবে পরিহার করে।”
ইসলামি ব্যাংকের মূল ভিত্তি হলো: মুদারাবা (শ্রম ও মূলধনের অংশীদারিত্ব), মুশারাকা (যৌথ মূলধনী ব্যবসা), মুরাবাহা (নির্দিষ্ট লাভে পণ্য বিক্রয়), ইজারা (ভাড়া ও ইজারা চুক্তি) এবং কির্দায়ে হাসানা (কল্যাণমূলক সুদমুক্ত ঋণ)।
২. বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকের উন্নয়নে সমস্যাসমূহ (Problems of Islamic Banking in Bangladesh):
১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পেলেও এর টেকসই উন্নয়নে নানাবিধ কাঠামোগত সমস্যা বিদ্যমান:
- পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং আইনের অনুপস্থিতি: বাংলাদেশে এখনও সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ কোনো ‘ইসলামিক ব্যাংকিং আইন’ প্রণীত হয়নি। বিদ্যমান প্রচলিত ব্যাংকিং কোম্পানি আইন (১৯৯১)-এর অধীনে বিশেষ ছাড় দিয়ে এদের পরিচালনা করা হয়, যা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে।
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদমুক্ত মুদ্রাবাজার সুবিধার ঘাটতি: বাংলাদেশ ব্যাংক প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোকে যে ধরনের তারল্য সহায়তা ও ‘লাস্ট রিসোর্ট অব ল্যান্ডার’ সুবিধা দেয়, ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য সুদমুক্ত অনুরূপ দীর্ঘমেয়াদি সিকিউরিটিজ বা লিকুইডিটি উপকরণের সংকট রয়েছে।
- শরিয়াহ্ বোর্ড ও তদারকির সীমাবদ্ধতা: অধিকাংশ ব্যাংকে নিজস্ব শরিয়াহ্ কাউন্সিল থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্টের চাপের কারণে স্বাধীনভাবে শতভাগ শরিয়াহ অডিট বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কোনো সর্বজনীন বাধ্যতামূলক কেন্দ্রীয় শরিয়াহ বোর্ড নেই।
- প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবলের তীব্র অভাব: ব্যাংকারদের আধুনিক ব্যাংকিংয়ের জ্ঞান থাকলেও আরবি ভাষা, ফিকহুল মুয়ামালাত ও ইসলামি অর্থনীতির সূক্ষ্ম জ্ঞানে ঘাটতি রয়েছে; ফলে তারা গ্রাহকদের সঠিক ইসলামি পদ্ধতির ধারণা দিতে ব্যর্থ হন।
- মুদারাবা-মুশারাকার চেয়ে মুরাবাহা পদ্ধতির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার: আদর্শ ইসলামি ব্যাংক যেখানে লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্বে (মুশারাকা/মুদারাবা) বিনিয়োগ করার কথা, সেখানে বাস্তবে ঝুঁকি এড়াতে প্রায় ৮০-৯০ ভাগ বিনিয়োগ কেবল পণ্য কেনাবেচা ভিত্তিক ‘মুরাবাহা’ বা ‘বাই-মুয়াজ্জাল’ পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, যা অনেক সময় সমালোচনার মুখে পড়ে।
- সুশাসনের সংকট ও অনিয়ম: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি ইসলামি ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদ দখল, বেনামি ঋণ বিতরণ এবং তারল্য সংকটের মতো গুরুতর সুশাসনজনিত জটিলতা তৈরি হয়েছে।
৩. সমস্যা সমাধানের কার্যকর পরামর্শ (Suggestions for Solving the Problems):
- স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ আইন পাস: জাতীয় সংসদে অনতিবিলম্বে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ইসলামি ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
- কেন্দ্রীয় শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড গঠন: বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে সর্বজনগ্রাহ্য ফকীহ ও অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে একটি ক্ষমতাপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় শরিয়াহ কাউন্সিল গঠন করতে হবে, যাদের অনুমোদন ব্যতীত কোনো নতুন পণ্য চালু করা যাবে না।
- সুদবিহীন অর্থবাজারের বিকাশ: ইসলামি ট্রেজারি বিল ও আধুনিক সুকুক (Sukuk) বন্ডের পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করতে হবে, যাতে ইসলামি ব্যাংকগুলো তাদের অলস তারল্য লাভজনক ও নিরাপদ উপায়ে বিনিয়োগ করতে পারে।
- ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি: প্রতিটি ব্যাংকে ইসলামি ব্যাংকিং গবেষণা সেল এবং কর্মকর্তাদের জন্য দেশি-বিদেশি শরিয়াহ ডিপ্লোমা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।
- লাভ-ক্ষতি অংশীদারিত্বমূলক বিনিয়োগ বৃদ্ধি: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) এবং কৃষি খাতে মুদারাবা ও মুশারাকা ভিত্তিক সরাসরি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে সাধারণ মানুষের সাথে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা।
- কঠোর জবাবদিহিতা ও সুশাসন: অর্থ আত্মসাৎ, বেনামি ঋণ ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রেখে কঠোর কেন্দ্রীয় তদারকির মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
৬। বিমা কাকে বলে? প্রচলিত বিমা ও ইসলামি বিমার মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর। (৫ + ১০ = ১৫)
[What is insurance? Discuss the difference between Conventional insurance and Islamic insurance.]
১. বিমা কাকে বলে (Definition of Insurance):
বিমা হলো এমন একটি আইনি ও আর্থিক চুক্তি, যার মাধ্যমে একটি পক্ষ (বিমাকারী বা কোম্পানি) নির্দিষ্ট প্রিমিয়ামের বিনিময়ে অপর পক্ষকে (বিমাগ্রহীতা) কোনো নির্দিষ্ট আকস্মিক বিপদ, দুর্ঘটনা, ধনসম্পদের ক্ষতিসাধন কিংবা নির্দিষ্ট বয়সের পর বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের আইনগত দায়িত্ব গ্রহণ করে। মানবজীবনের এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা লাঘব করাই বিমার মূল উদ্দেশ্য।
২. প্রচলিত বিমা ও ইসলামি বিমার (তাকাফুল) পার্থক্য:
প্রচলিত বিমা (Conventional Insurance) এবং ইসলামি বিমা বা ‘তাকাফুল’ (Takaful)-এর মধ্যে দার্শনিক, আইনি ও পরিচালনগত মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। নিচে তুলনামূলক বিবরণ ছক আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| পার্থক্যের বিষয় | প্রচলিত বিমা (Conventional Insurance) | ইসলামি বিমা / তাকাফুল (Islamic Insurance) |
|---|---|---|
| ১. মূল ধারণা ও দর্শন | ঝুঁকি স্থানান্তরকরণ (Risk Transfer)। কোম্পানি নির্দিষ্ট লাভের উদ্দেশ্যে গ্রাহকের ঝুঁকি কিনে নেয়। | পারস্পরিক ঝুঁকি বণ্টন ও সহযোগিতা (Risk Sharing & Mutual Assistance)। এটি ‘তাবাররু’ (দান) দর্শনে পরিচালিত। |
| ২. শরিয়তি উপাদান (সুদ, জুয়া ও ধোঁকা) | এতে ইসলাম কর্তৃক নিষিদ্ধ তিনটি উপাদান বিদ্যমান: রিবা (সুদ), মাইসির (জুয়া) এবং গারার (চরম অনিশ্চয়তা)। | এতে সুদ, জুয়া ও মারাত্মক অনিশ্চয়তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি শতভাগ হালাল শরিয়াহ নীতিতে চলে। |
| ৩. চুক্তির প্রকৃতি | এটি একটি বাণিজ্যিক কেনাবেচার চুক্তি (মুয়াওয়াদাহ), যেখানে লাভই মূল উদ্দেশ্য। | এটি যৌথ পারস্পরিক সহযোগিতা ও যৌথ দায়িত্বশীলতার চুক্তি (আকদুল মুওয়াসাত ওয়াত তাবাররু)। |
| ৪. প্রিমিয়াম বা চাঁদার মর্যাদা | প্রিমিয়ামের অর্থ পরিশোধ করার সাথে সাথে তা কোম্পানির ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। | গ্রাহকের প্রিমিয়ামকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: মূল তহবিলে দান (তাবাররু) এবং বিনিয়োগ তহবিল (মুদারাবা)। |
| ৫. তহবিল বিনিয়োগের ক্ষেত্র | সুদভিত্তিক বন্ড, শেয়ারবাজার বা প্রচলিত ব্যাংকসহ যেকোনো লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা হয়। | শুধুমাত্র শরিয়াহ সম্মত হালাল ব্যবসা ও ইসলামি আর্থিক উপকরণে বিনিয়োগ বাধ্যতামূলক। |
| ৬. অতিরিক্ত উদ্বৃত্তের (Surplus) বণ্টন | ক্ষতিপূরণ প্রদানের পর অবশিষ্ট উদ্বৃত্ত মুনাফা কোম্পানির শেয়ারহোল্ডাররা এককভাবে ভোগ করে। | অপারেশনাল খরচ ও ক্ষতিপূরণ শেষে উদ্বৃত্ত তহবিল বিমাগ্রহীতাদের (পলিসিহোল্ডার) মাঝে বণ্টন করা হয়। |
| ৭. তদারকি কর্তৃপক্ষ | কেবল রাষ্ট্রীয় সাধারণ বিমা আইন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। | রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি আলেম ও অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে গঠিত ‘শরিয়াহ কাউন্সিল’ দ্বারা প্রতিটি লেনদেন নিয়ন্ত্রিত হয়। |
উপসংহার: প্রচলিত বিমা ব্যক্তি ও বাণিজ্যিক মুনাফাকেন্দ্রিক এবং শরিয়ত নিষিদ্ধ উপাদানে দুষ্ট, পক্ষান্তরে ইসলামি তাকাফুল ব্যবস্থা পারস্পরিক মানবীয় সহমর্মিতা, সুদমুক্ত ইনসাফ এবং তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত এক অনন্য ব্যবস্থা।
খ বিভাগ—সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন
মান—৫ × ৪ = ২০
৭। ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর। (৫)
[Discuss the difference between micro and macro economics.]
১৯৩৩ সালে অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক র্যাগনার ফ্রিশ (Ragnar Frisch) সর্বপ্রথম অর্থনীতিকে দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেন: ব্যষ্টিক (Micro) এবং সামষ্টিক (Macro)। নিচে এদের প্রধান পার্থক্যসমূহ উল্লেখ করা হলো:
- শব্দগত উৎপত্তি: ‘Micro’ শব্দটি গ্রিক ‘Mikros’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ক্ষুদ্র বা ব্যক্তিগত। পক্ষান্তরে ‘Macro’ শব্দটি গ্রিক ‘Makros’ থেকে এসেছে, যার অর্থ বৃহৎ বা সামগ্রিক।
- আলোচনার পরিধি: ব্যষ্টিক অর্থনীতি সমাজের কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার, ভোক্তা বা নির্দিষ্ট ফার্মের অর্থনৈতিক আচরণ বিশ্লেষণ করে (যেমন: জনাব রহিমের মাসিক আয় বা একটি সাবান কারখানার উৎপাদন)। অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনীতি একটি দেশের সার্বিক অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করে (যেমন: বাংলাদেশের জাতীয় আয় বা মোট জাতীয় উৎপাদন)।
- মূল চলকসমূহ: ব্যষ্টিক অর্থনীতির প্রধান চলক হলো নির্দিষ্ট দ্রব্যের দাম, ব্যক্তিগত চাহিদা ও ব্যক্তিগত যোগান। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান চলক হলো সাধারণ মূল্যস্তর, সামগ্রিক চাহিদা, সামগ্রিক যোগান, জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগ।
- ভারসাম্যের ধরন: ব্যষ্টিক অর্থনীতিতে ‘আংশিক ভারসাম্য’ (Partial Equilibrium) বিশ্লেষণ করা হয়। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতিতে সমগ্র সমাজের ‘সাধারণ ভারসাম্য’ (General Equilibrium) বিশ্লেষণ করা হয়।
- মূল লক্ষ্য: ব্যষ্টিক অর্থনীতির লক্ষ্য ভোক্তার উপযোগ সর্বোচ্চকরণ বা উৎপাদকের মুনাফা সর্বোচ্চকরণ। সামষ্টিক অর্থনীতির লক্ষ্য পূর্ণ কর্মসংস্থান অর্জন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।
৮। চাহিদা রেখা কেন ডান দিকে নিম্নগামী হয়? (৫)
[Why demand curve slopes downward to the right?]
সাধারণত দ্রব্যের দাম ও চাহিদার পরিমাণের মধ্যে বিপরীতমুখী সম্পর্ক থাকে বিধায় সাধারণ চাহিদা রেখা বাম থেকে ডান দিকে নিম্নগামী হয়। এর প্রধান কারণগুলো নিচে সংক্ষেপে দেওয়া হলো:
- ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধির প্রভাব: কোনো ভোক্তা একটি দ্রব্য যত বেশি ক্রয় করে, তার প্রান্তিক উপযোগ তত কমে যায়। তাই ভোক্তা অতিরিক্ত একক কেবল তখনই কিনবে যখন দাম কম হবে। ফলে দাম কমলে চাহিদা বাড়ে এবং রেখাটি নিম্নগামী হয়।
- প্রতিস্থাপন প্রভাব (Substitution Effect): কোনো একটি দ্রব্যের দাম কমে গেলে বিকল্প অন্যান্য দ্রব্যের তুলনায় তা সস্তা মনে হয়। ফলে ভোক্তারা অন্য দ্রব্য ত্যাগ করে অপেক্ষাকৃত সস্তা দ্রব্যটি বেশি কেনে।
- আয় প্রভাব (Income Effect): দ্রব্যের দাম হ্রাস পেলে ভোক্তার ‘প্রকৃত আয়’ (Real Income) বা ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যায়। ফলে আগের সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে ভোক্তা অধিক পরিমাণ দ্রব্য ক্রয় করতে পারে।
- নতুন ক্রেতার সমাগম: দ্রব্যের দাম বেশি থাকলে কেবল ধনীরা তা কিনতে পারে। কিন্তু দাম কমে গেলে স্বল্প আয়ের বহু নতুন ভোক্তা বাজারে এসে দ্রব্যটি কিনতে শুরু করে, ফলে সামগ্রিক চাহিদা বাড়ে।
- দ্রব্যের বহুমুখী ব্যবহার: বহুবিধ ব্যবহারযোগ্য দ্রব্যের (যেমন বিদ্যুৎ, কয়লা, দুধ) দাম বেশি হলে শুধু অপরিহার্য কাজে ব্যবহৃত হয়; কিন্তু দাম কমলে তা নানা সাধারণ কাজেও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়।
৯। কর ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য কী? (৫)
[Distinguish between Tax and Zakat.]
কর (Tax) এবং যাকাত (Zakat) উভয়ই আর্থিক আদায় হলেও উভয়ের উৎস, উদ্দেশ্য ও নীতিমালায় মৌলিক পার্থক্য রয়েছে:
- উৎসের পার্থক্য: কর হলো মানবসৃষ্ট সরকারের প্রণীত একটি বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক করভার। পক্ষান্তরে যাকাত হলো ইসলামি শরিয়তের রুকন এবং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত ফরজ ইবাদত।
- উদ্দেশ্যের ভিন্নতা: কর আদায়ের মূল উদ্দেশ্য রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামরিক খরচ পরিচালনা। যাকাতের মূল উদ্দেশ্য সমাজের দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক ইনসাফ কায়েম ও আত্মশুদ্ধি অর্জন।
- ব্যয়ের খাত: সরকার করের অর্থ যেকোনো সাধারণ খাতে ইচ্ছামতো ব্যয় করতে পারে। কিন্তু যাকাতের ব্যয়ের খাত পবিত্র কুরআনে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে (সূরা তাওবাহ: ৬০ আয়াতে বর্ণিত ৮টি সুনির্দিষ্ট খাত ব্যতীত অন্য কোথাও যাকাতের অর্থ ব্যয় করা হারাম)।
- হারের পরিবর্তনযোগ্যতা: রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে করের হার পরিবর্তন, বৃদ্ধি বা হ্রাস করা যায়। কিন্তু যাকাতের হার (যেমন উদ্বৃত্ত সম্পদে আড়াই শতাংশ বা ২.৫%) চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়।
- জবাবদিহিতা: কর ফাঁকি দিলে রাষ্ট্রীয় শাস্তির ভয় থাকে, কিন্তু এতে পরকালের সওয়াব নেই। পক্ষান্তরে যাকাত প্রদান করা একনিষ্ঠ ইবাদত, যার জন্য পরকালে অশেষ সওয়াব রয়েছে এবং তা অস্বীকার বা অনাদায়ে আখিরাতের ভয়াবহ শাস্তি অবধারিত।
১০। পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার বলতে কী বোঝায়? (৫)
[What do you mean by perfect competitive market?]
যে বাজারে বহুসংখ্যক ক্রেতা এবং বহুসংখ্যক বিক্রেতা সমজাতীয় (Homogeneous) দ্রব্য একটি নির্দিষ্ট দামে অবাধে ক্রয়-বিক্রয় করে, তাকে অর্থনীতিতে পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার (Perfect Competitive Market) বলে।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- অসংখ্য ক্রেতা ও বিক্রেতা: বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতার সংখ্যা এত বেশি থাকে যে এককভাবে কোনো ক্রেতা বা বিক্রেতা দ্রব্যের দাম প্রভাবিত করতে পারে না।
- সমজাতীয় পণ্য: বিক্রেতাদের উৎপাদিত পণ্য গুণগত মান, আকার, রং ও মোড়কীকরণের দিক থেকে হুবহু অভিন্ন হয়।
- দাম গ্রহীতা (Price Taker): বাজারের সামগ্রিক চাহিদা ও যোগানের পারস্পরিক প্রভাবে দাম নির্ধারিত হয়; প্রতিটি ফার্ম কেবল সেই নির্ধারিত দাম মেনে নিতে বাধ্য থাকে (Price Taker, not Price Maker)।
- অবাধ প্রবেশ ও প্রস্থান: যেকোনো ফার্ম ইচ্ছে করলে সহজেই এই শিল্পে প্রবেশ করতে পারে বা লোকসান হলে বের হয়ে যেতে পারে।
- বাজার সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান: ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই পণ্যের মান ও দাম সম্পর্কে শতভাগ সুস্পষ্ট ধারণা থাকে।
- পরিবহন ব্যয়ের অনুপস্থিতি: পণ্যের দামে কোনো পরিবহন ব্যয় যুক্ত হয় না বলে সর্বত্র এক দাম বিরাজ করে।
১১। ইসলামে ব্যক্তি মালিকানা বলতে কী বোঝায়? (৫)
[What is the sense of ownership in Islam?]
ইসলামে ব্যক্তি মালিকানার ধারণা পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং এটি একটি সুষম ভারসাম্যপূর্ণ মতবাদ।
১. আল্লাহর নিরঙ্কুশ মালিকানা: ইসলামের মূল দর্শন হলো আকাশ ও পৃথিবীর সমগ্র মহাবিশ্ব এবং এর অন্তর্গত সকল ধনসম্পদের একমাত্র প্রকৃত ও নিরঙ্কুশ মালিক হলেন মহান আল্লাহ («লিল্লাহি মুলকুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ»)।
২. মানুষের আমানতদারিতা বা প্রতিনিধিত্বমূলক মালিকানা: মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে সম্পদের ব্যবহারিক ও আপেক্ষিক মালিকানার অধিকার লাভ করে। এটি এক ধরণের ‘আমানত’ (Trusteeship)।
৩. সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ ব্যক্তি মালিকানা: ইসলাম বৈধ ও হালাল পন্থায় অর্জিত সম্পদের ওপর মানুষের ব্যক্তি মালিকানাকে পূর্ণ স্বীকৃতি দেয়। ইসলাম মানুষের শ্রম ও মেধার মূল্যায়ন করে এবং তার সম্পদে উত্তরাধিকার আইন নিশ্চিত করে। তবে এই ব্যক্তি মালিকানা পুঁজিবাদী সমাজের মতো স্বেচ্ছাচারী বা লাগামহীন নয়।
৪. সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সীমাবদ্ধতা: একজন মালিক ইচ্ছে করলেই তার সম্পদ পুড়িয়ে ফেলতে পারে না, অপচয় করতে পারে না কিংবা সমাজবিধ্বংসী কাজে বিনিয়োগ করতে পারে না। অর্জিত সম্পদ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত ও উশর প্রদান করতে হয় এবং অভাবগ্রস্তদের অধিকার স্বীকার করতে হয়। অর্থাৎ ইসলামে ব্যক্তি মালিকানা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সামাজিক কল্যাণের এক অপূর্ব সমন্বয়।
১২। যাকাতের নিসাব আলোচনা কর। (৫)
[Discuss the Nisab of Zakat.]
‘নিসাব’ (Nisab) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ পরিমাপ, পরিমাণ বা ন্যূনতম সীমা। শরিয়তের পরিভাষায়—কোনো ব্যক্তির কাছে ঋণ ও পারিবারিক নিত্যপ্রয়োজনীয় মৌলিক ব্যয় নির্বাহের পর যে পরিমাণ উদ্বৃত্ত সম্পদ পূর্ণ এক বছর (হাওলানুল হাওল) কাল স্থায়ী থাকলে তার ওপর যাকাত প্রদান ফরজ হয়, সেই ন্যূনতম নির্ধারিত সম্পদকে যাকাতের নিসাব বলে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক নির্ধারিত বিভিন্ন সম্পদের নিসাবের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
- স্বর্ণের নিসাব: সাড়ে সাত ভরি (৭.৫ তোলা বা প্রায় ৮৫ গ্রাম) খাঁটি স্বর্ণ বা তার সমমূল্য।
- রৌপ্যের নিসাব: সাড়ে বায়ান্ন ভরি (৫২.৫ তোলা বা প্রায় ৫৯৫ গ্রাম) খাঁটি রূপা বা তার সমমূল্য।
- নগদ অর্থ ও ব্যবসায়ী পণ্য: নগদ টাকা, ব্যাংকে গচ্ছিত আমানত, শেয়ার, প্রাইজবন্ড কিংবা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত বাণিজ্যিক পণ্যের মোট আর্থিক মূল্য যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার বাজারমূল্যের সমপরিমাণ বা তার বেশি হয়, তবে তার ওপর ২.৫% (শতকরা আড়াই টাকা) হারে যাকাত আদায় করা ফরজ।
- কৃষি ফসল (উশর): সেচবিহীন প্রাকৃতিক বৃষ্টিতে উৎপাদিত ফসলের ক্ষেত্রে মোট উৎপাদনের ১০ ভাগের এক ভাগ (১০%) এবং কৃত্রিম সেচের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলের ক্ষেত্রে ২০ ভাগের এক ভাগ (৫%) উশর আদায় করতে হয়। এর ন্যূনতম নিসাব হলো ৫ ওসাক (প্রায় ৮২৫ কেজি খাদ্যশস্য)।
- গৃহপালিত পশু: উটের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫টি, গরুর ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৩০টি এবং ছাগল বা ভেড়ার ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৪০টি পশু পূর্ণ এক বছর মালিকানায় থাকলে নির্ধারিত নিয়মে যাকাত প্রদান করতে হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি কোর্সের গুরুত্ব কী?
ইসলামিক অ্যারাবিক ইউনিভার্সিটির ফাজিল ১ম বর্ষের এই কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আধুনিক অর্থনীতির প্রধান তত্ত্বসমূহের পাশাপাশি সুদমুক্ত ও ইনসাফপূর্ণ ইসলামি অর্থনৈতিক দর্শনের তুলনামূলক জ্ঞান অর্জন করতে পারে।
২. ইসলামি অর্থনীতির প্রধান উৎসগুলো কী কী?
ইসলামি অর্থনীতির মূল ও অকাট্য উৎস হলো পবিত্র কুরআন ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ। এর পাশাপাশি সম্মিলিত ঐকমত্য (ইজমা) এবং যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যমূলক অনুসিদ্ধান্ত (কিয়াস) এর দ্বিতীয় স্তরের উৎস।
৩. চাহিদা রেখা কেন সাধারণ নিয়মে নিম্নগামী হয়?
দাম কমলে ভোক্তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া (আয় প্রভাব), বিকল্প সস্তা দ্রব্যের প্রতি আকর্ষণ (প্রতিস্থাপন প্রভাব) এবং ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগের কারণে চাহিদা রেখা ডান দিকে নিম্নগামী হয়।
৪. প্রচলিত বিমা ও তাকাফুলের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
প্রচলিত বিমা মুনাফাকেন্দ্রিক ঝুঁকি হস্তান্তর এবং সুদ ও জুয়ার উপাদানে দুষ্ট, পক্ষান্তরে ইসলামি তাকাফুল পারস্পরিক সহমর্মিতা, তাবাররু (দান) ও সুদমুক্ত অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
৫. যাকাত ফরজ হওয়ার প্রধান শর্তগুলো কী কী?
মুসলমান হওয়া, স্বাধীন ও বালেগ হওয়া, নিসাব পরিমাণ উদ্বৃত্ত সম্পদের পূর্ণ মালিকানা থাকা এবং ঋণ পরিশোধের পর সেই সম্পদ এক চান্দ্রবছর স্থায়ী থাকা।
৬. আধুনিক ব্যাংক ও ইসলামি ব্যাংকের পরিচালনগত প্রধান পার্থক্য কী?
আধুনিক প্রচলিত ব্যাংক পূর্বনির্ধারিত সুদের ভিত্তিতে ঋণ লেনদেন করে, পক্ষান্তরে ইসলামি ব্যাংক লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্ব (মুদারাবা ও মুশারাকা) এবং পণ্য বেচাকেনার মাধ্যমে বিনিয়োগ পরিচালনা করে।

