জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

বাংলার ইতিহাস (১২০১-১৭৫৭) (History of Bengal (1201-1757)) – 205303, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2022

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৫১ মিনিট পড়ার সময়
৮ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2022
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: বাংলার ইতিহাস (১২০১-১৭৫৭) (History of Bengal)
বিষয় কোড: 205303 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি

১. বার ভূঁইয়া কারা? বাংলায় মুঘলদের বিরুদ্ধে বার ভূঁইয়াদের তৎপরতা আলোচনা কর।

[Who were the Bara Bhuiyans? Discuss the activities of the Bara Bhuiyans in Bengal against the Mughals.]

ক. বার ভূঁইয়াদের পরিচয়:

১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে শেষ স্বাধীন আফগান সুলতান দাউদ খান কররানীর পতনের মাধ্যমে বাংলায় আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা হলেও সমগ্র পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায় মুঘল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। তখন ভাটি অঞ্চল (পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা)-এর যে বারোজন পরাক্রমশালী স্বাধীনচেতা জমিদার ও সামন্ত অধিপতি মুঘল সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে নিজেদের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন, ইতিহাসে তাঁরা ‘বার ভূঁইয়া’ (Bara Bhuiyans) নামে খ্যাত।

  • নেতৃত্ব: বার ভূঁইয়াদের প্রধান নেতা ছিলেন সোনারগাঁয়ের জমিদার ঈসা খান মসনদ-ই-আলা এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র মুসা খান
  • অন্যান্য প্রধান সদস্য: খাজা উসমান খান (বোকাইনগর ও শ্রীহট্ট), মাসুম খান কাবুলি (চাতমোহর), প্রতাপাদিত্য (যশোর), কেদার রায় (শ্রীপুর), কন্দর্প নারায়ণ (বাকলা চন্দ্রদ্বীপ), ফজল গাজী (ভাওয়াল) প্রমুখ। তাঁরা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন।

খ. মুঘলদের বিরুদ্ধে বার ভূঁইয়াদের সামরিক তৎপরতা:

  1. নৌযুদ্ধে ভৌগোলিক সুবিধা: বার ভূঁইয়াদের প্রধান শক্তি ছিল তাঁদের শক্তিশালী নৌবহর (Nawara) এবং বাংলার নদ-নদী, খাল-বিল বেষ্টিত কর্দমাক্ত ভৌগোলিক পরিবেশ। মুঘলদের প্রধান শক্তি ছিল অশ্বারোহী বাহিনী, যা ভাটি অঞ্চলের জলাভূমিতে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ত।
  2. খানজাহানের অভিযান ও ঈসা খানের প্রতিরোধ (১৫৮৪): সম্রাট আকবরের সেনাপতি শাহবাজ খান ভাটি অঞ্চলে আক্রমণ চালালে ঈসা খান জলপথে অতর্কিত আক্রমণ করে এবং ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষা নদীর বাঁধ কেটে দিয়ে মুঘল শিবির ভাসিয়ে দেন। মুঘল বাহিনী শোচনীয়ভাবে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়।
  3. মানসিংহের সাথে ঐতিহাসিক যুদ্ধ (১৫৯৭): রাজপুত সেনাপতি রাজা মানসিংহকে আকবর বাংলার সুবাদার করে পাঠালে বিক্রমপুরের অদূরে ত্রিমোহনী ও কাত্রাবোর নৌযুদ্ধে ঈসা খান ও মাসুম খান কাবুলির যৌথ নৌবাহিনী মানসিংহের সেনাপতি দুর্জন সিংহকে হত্যা করে এবং মুঘল বাহিনীকে পরাস্ত করে। জনশ্রুতি অনুসারে, মানসিংহের সাথে ঈসা খানের ঐতিহাসিক দ্বৈরথ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যেখানে ঈসা খানের মহত্ত্ব দেখে মানসিংহ মুগ্ধ হন।
  4. সুবাদার ইসলাম খানের চূড়ান্ত দমন (১৬০৮-১৬১৩): সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সুবাদার ইসলাম খান চিশতি এক সুসংগঠিত রণকৌশল নেন। তিনি ১৬১০ সালে ঢাকাকে নতুন রাজধানী (‘জাহাঙ্গীরনগর’) হিসেবে গড়ে তোলেন এবং সুবিশাল রাজকীয় নৌবহর প্রস্তুত করেন। একে একে তিনি বার ভূঁইয়াদের অভ্যন্তরীণ ঐক্যে ফাটল ধরান। ১৬১১ সালে কুদ্দালিয়ার নৌযুদ্ধে মুসা খান পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করেন এবং ১৬১২ সালে খাজা উসমান নিহত হলে বাংলায় বার ভূঁইয়াদের স্বাধীনতার অবসান ঘটে এবং সমগ্র বাংলা মুঘলদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে আসে।

২. বাংলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সুবাদার শায়েস্তা খানের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the achievements of Subader Shaista Khan in the socio-economic development of Bengal.]

ক. পরিচিতি ও শাসনকাল:

মীর জুমলার মৃত্যুর পর সম্রাট আওরঙ্গজেবের মাতুল নবাব শায়েস্তা খান ১৬৬৪ থেকে ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত (মাঝে ১৬৭৭-৭৯ বাদে) সুদীর্ঘ প্রায় চব্বিশ বছর বাংলার সুবাদার হিসেবে শাসন পরিচালনা করেন। তাঁর শাসনকালকে বাংলার ইতিহাসে ‘শান্তি, সমৃদ্ধি ও সস্তা মূল্যের স্বর্ণযুগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

খ. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সস্তা পণ্যের যুগ:

  1. টাকায় আট মণ চাল: শায়েস্তা খানের শাসনামলের সবচেয়ে ঐতিহাসিক কিংবদন্তি হলো দ্রব্যমূল্যের অবিশ্বাস্য সস্তা হার। তাঁর আমলে টাকায় আট মণ (প্রায় ৩২০ কেজি) উৎকৃষ্ট চাল পাওয়া যেত। তিনি ঢাকা ত্যাগের সময় পশ্চিমের তোরণটি (‘শায়েস্তা খানি গেট’) ইটের গাঁথুনি দিয়ে বন্ধ করে এই আদেশ উৎকীর্ণ করিয়েছিলেন যে, ভবিষ্যতে যে শাসক পুনরায় এমন সস্তায় চাল বিক্রি নিশ্চিত করতে পারবেন কেবল তিনিই এই ফটক উন্মুক্ত করবেন (পরবর্তীতে সুবাদার সরফরাজ খান এটি খুলেছিলেন)।
  2. কৃষি ও শিল্পের অভূতপূর্ব বিকাশ: কৃষকদের ওপর থেকে অন্যায্য আবওয়াব ও অতিরিক্ত কর প্রত্যাহার করা হয়। বাংলার বিখ্যাত মসলিন ও রেশম বস্ত্রের ইউরোপীয় রফতানি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ইংরেজ, ডাচ ও ফরাসি কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকার পণ্য বাণিজ্য করত।

গ. নিরাপত্তা বিধান ও চট্টগ্রাম বিজয় (১৬৬৬):

বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ম্যাগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের (হার্মাদ) নির্মম লুটতরাজে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। শায়েস্তা খান ৩০০টি সুসজ্জিত রণতরী তৈরি করে তাঁর পুত্র বুজুর্গ উমেদ খানের নেতৃত্বে ১৬৬৬ সালে আরাকানি জলদস্যুদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপ পুনরুদ্ধার করেন। চট্টগ্রামের নতুন নাম রাখা হয় ‘ইসলামাবাদ’। এর ফলে দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলায় স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়।

ঘ. সামাজিক ও স্থাপত্যিক কীর্তি:

তিনি ঢাকাকে এক অপরূপ স্থাপত্যের নগরীতে রূপ দেন। তাঁর স্থাপত্যিক কীর্তিগুলোর মধ্যে লালবাগ কেল্লার অভ্যন্তরীণ পরী বিবির মাজার, শায়েস্তা খানের মসজিদ, সাতগম্বুজ মসজিদ এবং লালবাগের বিশাল কাটরা অন্যতম। তাঁর সুবিচার, ধর্মপরায়ণতা ও জনকল্যাণমুখী শাসনে সাধারণ প্রজারা পরম সুখে দিনাতিপাত করত।


৩. পলাশী যুদ্ধের পটভূমি ব্যাখ্যা কর এবং নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের কারণ উল্লেখ কর।

[Explain the background of the battle of Plassey and point out the reasons of Nawab Shiraj-Ud-Daula’s defeat.]

ক. পলাশী যুদ্ধের পটভূমি (১৭৫৭):

  1. ইংরেজদের বাণিজ্যিক অপব্যবহার ও দস্তকের অপপ্রয়োগ: ১৭১৭ সালে মুঘল সম্রাট ফররুখশিয়ারের ফরমান বলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অনুমতি (দস্তক) দেওয়া হয়েছিল, কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারীরা তা ব্যক্তিগত বাণিজ্যে ব্যবহার করে নবাবের বিপুল রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছিল।
  2. অনুমতিহীন দুর্গ নির্মাণ ও নবাবকে অবমাননা: তরুণ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ১৭৫৬ সালে মসনদে বসলে ইংরেজরা অন্যান্য বিদেশি শক্তির মতো কোনো উপহার বা সৌজন্য প্রদর্শন করেনি। উপরন্তু নবাবের সরাসরি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সুরক্ষিত ও সামরিকীকরণ করছিল।
  3. রাজবল্লভ ও কৃষ্ণদাসের পলায়ন: নবাবের বিপুল তহবিল তছরুপকারী ঘসেটি বেগমের দেওয়ান রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাস বিপুল অর্থসম্পদ নিয়ে কলকাতায় পালিয়ে গেলে ইংরেজ গভর্নর ড্রেক তাকে আশ্রয় দেন এবং নবাবের দূতকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন।
  4. ষড়যন্ত্র ও আলিনগরের সন্ধি: নবাব কলকাতা অভিযান করে দুর্গ দখল করেন। পরবর্তীতে লর্ড ক্লাইভ ও ওয়াটসন এসে কলকাতা পুনর্দখল করে নবাবের সাথে আলিনগরের চুক্তি করেন এবং গোপনে প্রধান সেনাপতি মীর জাফর, উমিচাঁদ, জগৎশেঠ ও রায়দুর্লভদের সাথে নবাবকে উৎখাতের দেশদ্রোহী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।

খ. নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের মূল কারণসমূহ:

  1. মীর জাফরের চরম বিশ্বাসঘাতকতা: ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে নবাবের ৫০,০০০ সেনা থাকা সত্ত্বেও প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান, রায়দুর্লভ ও ইয়ার লতিফের অধীনস্থ প্রায় ৪৫,০০০ মূল সেনা পুতুলের মতো যুদ্ধ না করে দাঁড়িয়ে থাকে।
  2. বৃষ্টিতে বারুদ ভিজে যাওয়া ও ভুল কৌশল: দুপুরের আকস্মিক বৃষ্টিতে নবাবের খোলা বারুদ ভিজে অকেজো হয়ে পড়ে, অথচ ইংরেজরা ত্রিপল দিয়ে নিজেদের গানপাউডার সুরক্ষিত রেখেছিল। মীর মদন ও মোহনলালের বীরোচিত আক্রমণে যখন ইংরেজরা পর্যুদস্ত, তখন হঠাৎ মীর মদন কামানের গোলার আঘাতে শহীদ হন।
  3. যুদ্ধ স্থগিতের মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত: দেশপ্রেমিক বীর মীর মদনের মৃত্যুর পর আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে নবাব মীর জাফরের কাছে পরামর্শ চান। মীর জাফর কুরআনে হাত রেখে রক্ষার মিথ্যা শপথ করে নবাবকে সেদিনকার মতো যুদ্ধ স্থগিত করার পরামর্শ দেন। নবাব যুদ্ধ থামানোর নির্দেশ দেওয়ামাত্রই বিশ্রামরত অসতর্ক নবাবের সেনাদের ওপর ক্লাইভ অতর্কিত হামলা চালায়।
  4. অভিজ্ঞতার অভাব ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা: মাত্র তেইশ বছর বয়সী তরুণ নবাব তাঁর চারপাশের বিশ্বাসঘাতকদের চরিত্র চিনতে পারেননি এবং পূর্বে ষড়যন্ত্র প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও মীর জাফরকে সেনাপতির পদে বহাল রাখার ভুল করেছিলেন। এর ফলে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য দুইশত বছরের জন্য অস্তমিত হয়।

৪. মুঘল আমলে বাংলার আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিবরণ দাও।

[Give an account of the socio-economic conditions of Bengal during the Mughal period.]

ক. অর্থনৈতিক অবস্থা (Economic Scenario):

  1. স্বয়ংসম্পূর্ণ কৃষি ও খাদ্যের প্রাচুর্য: মুঘল আমলে বাংলা ছিল সমগ্র মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান শস্যভাণ্ডার। ধান, গম, ডাল, সরিষা, পাট এবং আখের বাম্পার ফলন হতো। সুবাদার ও দেওয়ানদের প্রণোদনায় নদীমাতৃক পলি মাটিতে সারা বছর ফসল ফলত এবং ইউরোপীয় পর্যটক বার্নিয়ার বাংলাকে ‘ভারতের জান্নাত’ (Jannat-ul-Bilad) বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
  2. বিশ্ববিখ্যাত বস্ত্র ও কুটির শিল্প: ঢাকার সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্র (যেমন মলমল খাস, শবনম, আবে রওয়ান) সমগ্র বিশ্বের রাজপ্রাসাদসমূহে সমাদৃত ছিল। এ ছাড়া রেশম, তসর, চিনি ও লবণ শিল্পে লাখ লাখ কারিগর নিয়োজিত ছিল।
  3. আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বর্ণযুগ: হুগলী, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সপ্তগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পারস্য, আরব, চীন, পর্তুগাল, হল্যান্ড ও ইংল্যান্ডে বাংলার পণ্য রফতানি হতো। রফতানির বিনিময়ে বাংলায় প্রচুর সোনা ও রূপা প্রবেশ করত।

খ. সামাজিক অবস্থা (Social Scenario):

  1. সম্প্রদায়গত সম্প্রীতি ও গ্রামীণ জীবন: প্রধান দুটি ধর্ম সম্প্রদায় ছিল মুসলিম ও হিন্দু। তবে পারস্পরিক ধর্মীয় শ্রদ্ধাবোধ ও সহাবস্থান ছিল চমৎকার। গ্রামীণ সমাজ পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হতো। সুফি সাধক ও পীর-মাশায়েখদের প্রভাবে ইসলামি মূল্যবোধ ব্যাপকভাবে অনুসৃত হতো।
  2. শ্রেণি বিভাজন: সমাজে তিনটি প্রধান স্তর ছিল—উচ্চবিত্ত (সুবাদার, মনসবদার, অভিজাত ও বৃহৎ জমিদার), মধ্যবিত্ত (বণিক, কারিগর ও কাজী-পণ্ডিত) এবং নিম্নবিত্ত (সাধারণ কৃষক, দিনমজুর ও তাঁতি)।
  3. নারীর অবস্থা: সমাজে নারীর সার্বিক অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা সীমিত ছিল। পর্দার প্রচলন ছিল সর্বজনীন। তবে গৃহকোণে নারীরা তাঁত বোনা ও কুটির শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখত।

৫. বাংলায় ফরায়েজী আন্দোলনের কার্যক্রম ও প্রকৃতি আলোচনা কর।

[Discuss the activities and nature of the Faraji Movement in Bengal.]

ক. পটভূমি ও হাজী শরীয়তুল্লাহর সংস্কার:

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং হিন্দু জমিদার ও নীলকরদের শোষণে বাংলার মুসলিম সমাজ একদিকে সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস হচ্ছিল এবং অন্যদিকে শিরক ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত হচ্ছিল। এ প্রেক্ষাপটে মক্কা থেকে দীর্ঘ শিক্ষা শেষে ফিরে ফরিদপুরের হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) ১৮১৮ সালে এক বৈপ্লবিক সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন, যা ‘ফরায়েজী আন্দোলন’ (Farazi Movement) নামে খ্যাত।

  • নামকরণ: ‘ফরায়েজ’ শব্দটি আরবি ‘ফরজ’ (বাধ্যতামূলক বিধান)-এর বহুবচন। ইসলাম নির্দেশিত মৌলিক ফরজ বিধানাবলি যথাযথভাবে পালন এবং সমস্ত বিদ’আত বর্জন করাই ছিল এ আন্দোলনের মূল দাবি।
  • দারুল হরব ঘোষণা: তিনি ব্রিটিশ শাসিত বাংলাকে ‘দারুল হরব’ (যুদ্ধাবস্থা বা অমুসলিম ভূমি) ঘোষণা করেন এবং ইসলামি ন্যায়সঙ্গত শাসক না থাকা পর্যন্ত জুমার সালাত ও ঈদের জামাত স্থগিত রাখার ফতোয়া দেন, যা ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে পরোক্ষ চরম রাজনৈতিক প্রতিবাদ।

খ. দুদু মিয়ার নেতৃত্বে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর:

১৮৪০ সালে হাজী শরীয়তুল্লাহর ইন্তেকালের পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র মুহসিনুদ্দিন আহমদ ওরফে দুদু মিয়া (১৮১৯-১৮৬২) এ আন্দোলনকে সুসংগঠিত কৃষক মুক্তি সংগ্রামে রূপান্তর করেন:

  1. খেলাফত ব্যবস্থা ও বিকল্প আদালত: দুদু মিয়া সমগ্র বাংলাকে বিভিন্ন ‘হালকা’য় বিভক্ত করে প্রতিটি ইউনিটে একজন খলিফা বা প্রতিনিধি নিয়োগ করেন। তিনি জমিদার ও ব্রিটিশ আদালতের বদলে নিজস্ব সালিশি পঞ্চায়েত ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
  2. ‘লাঙ্গল যার জমি তার’ দর্শন: দুদু মিয়া ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন: “সমস্ত জমির প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা; সুতরাং আল্লাহর জমিনে খাজনা আদায় করার অধিকার কোনো জমিদারের নেই।” তিনি কৃষকদের অন্যায্য জমিদারি কর ও দাঁড়ি রাখার ওপর কর দেওয়া বন্ধের নির্দেশ দেন।
  3. নীলকর ও জমিদারদের বিরুদ্ধে লাঠিয়াল প্রতিরোধ: কৃষকদের রক্ষায় তিনি সুপ্রশিক্ষিত লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন এবং নীলকুঠির নীলকর ও অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই পরিচালনা করেন।

গ. আন্দোলনের প্রকৃতি:

ফরায়েজী আন্দোলন প্রাথমিকভাবে একটি ধর্মীয় পরিশুদ্ধি আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীতে তা ব্রিটিশবিরোধী ও সামন্তবাদবিরোধী এক বিশাল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী কৃষক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এটি বাঙালি মুসলমানদের আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম মাইলফলক।


৬. ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।

[Discuss the causes and consequences of the Partition of Bengal in 1905.]

ক. ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের মূল কারণসমূহ:

  1. প্রশাসনিক সুবিশালতা ও দুর্গমতা: তৎকালীন অবিভক্ত বাংলা প্রেসিডেন্সি ছিল বিশাল—বিহার, উড়িষ্যা ও আসামসহ জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮৫ লক্ষ। কলকাতা কেন্দ্রিক একজন ছোটলাটের (লেফটেন্যান্ট গভর্নর) পক্ষে প্রত্যন্ত পূর্ব বাংলা ও আসামের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব ছিল।
  2. পূর্ব বাংলার দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অনগ্রসরতা: সমস্ত অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড কলকাতায় পুঞ্জীভূত থাকায় পূর্ব বাংলার কৃষিপ্রধান অঞ্চল, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থা চরমভাবে অবহেলিত ছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো উন্নতি হচ্ছিল না।
  3. রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও ‘বিভাজন ও শাসন’ (Divide and Rule): লর্ড কার্জনের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক ঐক্যে ফাটল ধরানো। বাংলাকে বিভক্ত করে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসকে দুর্বল করাই ছিল ব্রিটিশ কূটকৌশল।

খ. ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া:

  1. নতুন প্রদেশ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ সৃষ্টি: ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিভাগ এবং আসাম নিয়ে নতুন প্রদেশ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ গঠিত হয়, যার রাজধানী হয় ঢাকা এবং প্রথম ছোটলাট হন ব্যামফিল্ড ফুলার।
  2. পূর্ব বাংলার মুসলমানদের স্বতঃস্ফূর্ত স্বাগত: মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ নতুন প্রদেশের ফলে রাজধানী হিসেবে ঢাকার নবজন্ম ঘটে। হাইকোর্ট, সচিবালয়, সুদৃশ্য রাজপথ নির্মিত হয় এবং মুসলমানদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভূতপূর্ব দ্বার উন্মোচিত হয়। নওয়াব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে মুসলমানরা নতুন আশার আলো দেখতে পায়।
  3. উচ্চবর্ণের হিন্দু ও কংগ্রেসের তীব্র স্বদেশি আন্দোলন: কলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু জমিদার, আইনজীবী ও রাজনীতিবিদরা বঙ্গভঙ্গকে ‘বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ’ আখ্যা দিয়ে তীব্র বিরোধিতা শুরু করে। শুরু হয় স্বদেশি আন্দোলন, বিদেশি পণ্য বর্জন এবং উগ্র সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড (যেমন অনুশীলন ও যুগান্তর সমিতি)।
  4. মুসলিম লীগের জন্ম (১৯০৬): কংগ্রেসের বৈরী আচরণে উপলব্ধি করে নওয়াব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
  5. ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ: হিন্দু সন্ত্রাসবাদ ও রাজনৈতিক আন্দোলনের চাপে নতি স্বীকার করে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেন। এর ফলে পূর্ব বাংলার মুসলমানরা ব্রিটিশদের প্রতারণায় গভীরভাবে মর্মাহত হয় এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়।

৭. মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারে নওয়াব আব্দুল লতিফের পদক্ষেপসমূহ বর্ণনা কর।

[Discuss the steps of Nawab Abdul Latif to the development of English education among the Muslims.]

ক. পটভূমি ও স্যার সৈয়দের সমকক্ষ ভূমিকা:

১৮৩৭ সালে ফারসির বদলে ইংরেজিকে সরকারি ভাষা করা হলে এবং ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশদের বৈরী মনোভাবের কারণে বাংলার মুসলমানরা আধুনিক ইংরেজি শিক্ষাকে ধর্মবিরোধী মনে করে বর্জন করে। ফলে তারা চাকরি, রাজনীতি ও অর্থনীতি থেকে ছিটকে পড়ে। এ চরম সন্ধিক্ষণে উত্তর ভারতের স্যার সৈয়দ আহমদ খানের মতো বাংলার মুসলমানদের আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার আলোয় ফিরিয়ে আনতে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন নওয়াব আব্দুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩)

খ. তাঁর গৃহীত প্রধান পদক্ষেপসমূহ:

  1. মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি প্রতিষ্ঠা (১৮৬৩): ১৮৬৩ সালে তিনি কলকাতায় ঐতিহাসিক ‘মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি’ (মুসলিম সাহিত্য সমাজ) প্রতিষ্ঠা করেন। এ প্ল্যাটফর্মে বিশিষ্ট মুসলিম বুদ্ধিজীবী, আলেম ও ব্রিটিশ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সমবেত করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ইংরেজি শিক্ষার উপযোগিতা নিয়ে নিয়মিত সেমিনার ও বিতর্ক আয়োজন করা হতো।
  2. ইংরেজি শিক্ষাকে ধর্মসম্মত প্রমাণের প্রচেষ্টা: গোঁড়া আলেমদের বিভ্রান্তি দূর করার জন্য তিনি ১৮৭০ সালে এক ঐতিহাসিক সেমিনারে প্রখ্যাত আলেম মাওলানা কেরামত আলী জৌনপুরীকে দিয়ে ফতোয়া প্রকাশ করান যে, ব্রিটিশ শাসিত ভারত দারুল হরব নয় এবং এখানে ইংরেজি ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন শরীয়াহসম্মত।
  3. কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার সংস্কার ও হিন্দু কলেজের দ্বার উন্মোচন: তিনি কলকাতা মাদ্রাসায় উচ্চতর ইংরেজি বিভাগ খোলার ব্যবস্থা করেন। এ ছাড়া রক্ষণশীল হিন্দু কলেজের পরিবর্তে প্রেসিডেন্সি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে মুসলিম ছাত্রদের ভর্তির অধিকার আদায় করেন।
  4. মহসিন ফান্ডের সদ্ব্যবহার: হাজী মুহাম্মদ মহসিনের বিপুল ওয়াকফ ফান্ডের অর্থ পূর্বে কেবল সাধারণ খাতে খরচ হতো; নওয়াব আব্দুল লতিফের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সরকার এ ফান্ডের অর্থ দিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে তিনটি নতুন মাদ্রাসা এবং মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য বিপুল পরিমাণ উচ্চশিক্ষার বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

৮. লাহোর প্রস্তাবের পটভূমি আলোচনা কর। এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল কী ছিল?

[Discuss the background of the Lahore Resolution. What were its far reaching results?]

ক. লাহোর প্রস্তাবের ঐতিহাসিক পটভূমি:

  1. ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর কংগ্রেসী দুঃশাসন: ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিভিন্ন প্রদেশে কংগ্রেস সরকার গঠন করে বন্দেমাতরম গান বাধ্যতামূলক করে, বিদ্যালয়ে মহাত্মা গান্ধীর প্রতিকৃতিতে প্রণাম চালু করে এবং মুসলিম সংস্কৃতিকে কোণঠাসা করে। এতে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বি-জাতিতত্ত্ব (Two-Nation Theory) অকাট্য প্রমাণিত হয়।
  2. মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশন (১৯৪০): ১৯৪০ সালের ২২-২৪ মার্চ লাহোরের মিন্টো পার্কে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সাধারণ অধিবেশনে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ২৩ মার্চ ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

খ. লাহোর প্রস্তাবের মূল বক্তব্য:

“ভৌগোলিক দিক দিয়ে সংলগ্ন এলাকাগুলোকে সুনির্দিষ্ট সীমানা দিয়ে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে যাতে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে একত্রিত করে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ (Independent States) গঠন করা যায়, যেখানে অন্তর্ভুক্ত অঙ্গরাজ্যগুলো হবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম।”

গ. সুদূরপ্রসারী ফলাফল:

  1. পাকিস্তান আন্দোলনের একমাত্র ভিত্তি: হিন্দু সংবাদপত্রগুলো এ প্রস্তাবকে ব্যঙ্গ করে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ আখ্যা দিলেও মুসলিম লীগ একে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে এবং এর ভিত্তিতেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়।
  2. বাংলাদেশ সৃষ্টির ঐতিহাসিক বীজ: মূল লাহোর প্রস্তাবে বহুবচন শব্দ ‘States’ (স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ) ব্যবহার করা হয়েছিল, যার অর্থ ছিল পূর্ব ভারতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতে অপর একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। যদিও ১৯৪৬ সালে দিল্লী কনভেনশনে জিন্নাহ চক্রান্ত করে একে একবচনে রূপান্তর করেন, তথাপি মূল লাহোর প্রস্তাবের এই ‘স্বাধীন রাষ্ট্রের’ নীতিই পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঐতিহাসিক আইনি ও নৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি

৯. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কে ধারণা দাও।

[Give an idea about the permanent settlement.]

১৭৯৩ সালের ২২ মার্চ ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় কোম্পানির রাজস্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জমিদারদের সাথে যে বংশানুক্রমিক স্থায়ী ভূমি রাজস্ব চুক্তি সম্পাদন করেন, তাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) বলে।

  • শর্তাবলি: জমিদারদের ভূমির চূড়ান্ত মালিক ঘোষণা করা হয়। সরকারি রাজস্বের পরিমাণ চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় (মোট আদায়ের ১০/১১ অংশ কোম্পানি এবং ১/১১ অংশ জমিদার)। সূর্যাস্ত আইন অনুযায়ী বছরের নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের পূর্বে রাজস্ব দিতে ব্যর্থ হলে জমিদারি নিলামে বিক্রি হতো।
  • প্রভাব: এর ফলে বংশানুক্রমিক পুরাতন মুসলিম জমিদাররা ধ্বংস হয় এবং কলকাতায় অবস্থানকারী নতুন পরজীবী মধ্যস্বত্বভোগী হিন্দু জমিদার শ্রেণির সৃষ্টি হয়। বাংলার সাধারণ রায়ত বা কৃষকরা জমিদারদের স্বেচ্ছাচারী অত্যাচারের শিকার হয়ে চিরদিনের জন্য জমিস্বত্বহীন মজুরে পরিণত হয়।

১০. ছিয়াত্তরের মন্বন্তর সম্পর্কে কী জান লেখ।

[Write what do you know about the seventy-six famine.]

বাংলা ১১৭৬ সন (১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে) বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বৈত শাসনের ফলে যে ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল, ইতিহাসে তা ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে কুখ্যাত।

  • কারণসমূহ: ১৭৬৮-৬৯ সালে অনাবৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতি হলেও মূল কারণ ছিল লর্ড ক্লাইভের প্রবর্তিত দ্বৈত শাসনের অবাধ লুণ্ঠন। কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারীরা চালের একচেটিয়া মজুতদারি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এবং দুর্ভিক্ষের মধ্যেও জোরপূর্বক শতকরা দশ ভাগ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করে।
  • ভয়াবহ পরিণতি: খাবারের অভাবে মানুষ গাছের ছাল, পাতা ও পচা মাংস খেয়ে রাস্তায় মরে পড়ে থাকত। এ মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে বাংলার মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ—প্রায় এক কোটি মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে। সমগ্র গ্রামকে গ্রাম জনমানবহীন শ্মশানে পরিণত হয়।

১১. অন্ধকূপ হত্যা সম্পর্কে কী জান লেখ।

[Write what do you know about the dungeon killing.]

১৭৫৬ সালের ২০ জুন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করার পর ব্রিটিশ কর্মচারী জে. জেড. হলওয়েল নবাবকে আন্তর্জাতিকভাবে কালিমালিপ্ত করার জন্য একটি কুখ্যাত পৌরাণিক কাহিনী রটনা করেন, যা ইতিহাসে ‘অন্ধকূপ হত্যা’ (Black Hole Tragedy) নামে পরিচিত।

  • হলওয়েলের মিথ্যা দাবি: তিনি দাবি করেন যে, নবাবের নির্দেশে মাত্র ১৮ ফুট দীর্ঘ এবং ১৪ ফুট ১০ ইঞ্চি প্রশস্ত একটি জানালাবিহীন সংকীর্ণ প্রকোষ্ঠে ১৪৬ জন ইংরেজ বন্দিকে এক ভয়াবহ গ্রীষ্মের রাতে আটকে রাখা হয়েছিল, যার ফলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ১২৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
  • ঐতিহাসিক সত্যতা: আধুনিক ঐতিহাসিকগণ (যেমন অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ও যদুনাথ সরকার) নিখুঁত বৈজ্ঞানিক জ্যামিতিক পরিমাপ করে প্রমাণ করেছেন যে, অত ছোট একটি কামরায় কখনোই ১৪৬ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে ঢোকানো সম্ভব নয়। এটি ছিল সম্পূর্ণ একটি পরিকল্পিত ব্রিটিশ মনগড়া মিথ্যা অপপ্রচার, যার উদ্দেশ্য ছিল ক্লাইভের আগ্রাসী সামরিক অভিযান ও নবাব হত্যার নৈতিক বৈধতা তৈরি করা।

১২. সিপাহী বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন বলা হয় কেন?

[Why does the Sepoy Mutiny called the first movement of the Indian independence?]

১৮৫৭ সালে ব্যারাকপুর, মিরাট ও দিল্লিতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাদের যে মহাবিদ্রোহ সংঘটিত হয়, ব্রিটিশরা একে তুচ্ছ ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ বললেও প্রখ্যাত জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিবিদগণ (যেমন ভি. ডি. সাভারকার) একে যথার্থভাবেই ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ (First War of Indian Independence) বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর যৌক্তিক কারণসমূহ:

  1. সর্বভারতীয় বিস্তৃতি ও গণঅংশগ্রহণ: এটি কেবল ব্যারাকের সিপাহীদের বিদ্রোহ ছিল না; এতে অযোধ্যার কৃষক, কারিগর, সাধারণ প্রজা, সুফি-উলামা এবং মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর, ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ, নানা সাহেব ও কুনওয়ার সিংহের মতো শীর্ষ ভারতীয় রাজারা একযোগে ব্রিটিশ বিতাড়নে শামিল হয়েছিলেন।
  2. বিদেশি ঔপনিবেশিক শাসন উচ্ছেদের লক্ষ্য: সিপাহীদের মূল স্লোগান ছিল—‘খালক খোদা কা, মুলক বাদশাহ কা, হুকুমাত কোম্পানি কা নেহি চলেগা’। অর্থাৎ বিদেশি ফিরিঙ্গি শক্তিকে ভারতছাড়া করে স্বদেশি সার্বভৌম শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠাই ছিল এ সংগ্রামের ঘোষিত লক্ষ্য।
  3. হিন্দু-মুসলিম অনন্য জাতীয় ঐক্য: ব্রিটিশদের সাম্প্রদায়িক বিভাজন নীতিকে চূর্ণ করে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যৌথভাবে রক্ত ঢেলেছিল। এ বিদ্রোহের ফলেই কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে এবং ১৮৫৮ সালে ভারত সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীনে যায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. বার ভূঁইয়াদের প্রধান নেতা কে ছিলেন?

সোনারগাঁয়ের পরাক্রমশালী জমিদার ঈসা খান মসনদ-ই-আলা ছিলেন বাংলার বার ভূঁইয়াদের সর্বসম্মত প্রধান নেতা।

২. কোন মুঘল সুবাদারের আমলে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত?

সুবাদার শায়েস্তা খানের সুদীর্ঘ শাসনামলে (১৬৬৪-১৬৮৮ খ্রি.) বাংলায় টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত।

৩. পলাশী যুদ্ধ কত তারিখে এবং কোন নদীর তীরে সংঘটিত হয়েছিল?

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন নদীয়া জেলার ভাগীরথী নদীর তীরে ঐতিহাসিক পলাশীর আম্রকাননে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

৪. বাংলায় ফরায়েজী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

ফরিদপুরের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও সংস্কারক হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) ফরায়েজী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

৫. ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব কত তারিখে কে উত্থাপন করেছিলেন?

১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

৬. ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বাংলা কত সনে সংঘটিত হয়েছিল?

বাংলা ১১৭৬ সনে (ইংরেজি ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে) কোম্পানির দ্বৈত শাসনের নির্মম শোষণে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর সংঘটিত হয়েছিল।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *