ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2020
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: অর্থনীতি ও ইসলামী অর্থনীতি (Economics and Islamic Economics)
বিষয় কোড: 205302 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: যে-কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
১. অর্থনীতি বলতে কী বুঝায়? অর্থনীতির পরিধি এবং বিষয়বস্তু আলোচনা কর।
[What is meant by economics? Discuss the scope and subject matter of economics.]
ক. অর্থনীতির সংজ্ঞা (Definition of Economics):
সাধারণ অর্থে অর্থনীতি হলো এমন একটি সামাজিক বিজ্ঞান যা মানুষের সীমাহীন অভাব এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সীমিত সম্পদের সমন্বয়সাধন সম্পর্কিত মানবীয় আচরণ বিশ্লেষণ করে। ইংরেজি ‘Economics’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Oikonomia’ (Oikos অর্থ গৃহ এবং Nemein অর্থ ব্যবস্থাপনা বা নিয়ম) থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এর মূল অর্থ গৃহস্থালী পরিচালনা বা গার্হস্থ্য ব্যবস্থাপনা।
- অ্যাডাম স্মিথের ধনসম্পর্কিত সংজ্ঞা: ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith) ১৭৭৬ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Wealth of Nations’-এ অর্থনীতিকে সম্পদের বিজ্ঞান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন: “Economics is an inquiry into the nature and causes of the wealth of nations.”
- আলফ্রেড মার্শালের কল্যাণমূলক সংজ্ঞা: নিও-ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদ আলফ্রেড মার্শাল (Alfred Marshall) ১৮৯০ সালে ‘Principles of Economics’ গ্রন্থে বলেন: “Economics is a study of mankind in the ordinary business of life; it examines that part of individual and social action which is most closely connected with the attainment and with the use of the material requisites of wellbeing.” অর্থাৎ অর্থনীতি মানবজাতির দৈনন্দিন জীবনের বৈষয়িক কল্যাণ সাধনের আলোচনা।
- এল. রবিন্সের দুষ্প্রাপ্যতামূলক সংজ্ঞা (আধুনিক ও সর্বজনীন): ১৯৩২ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক লায়নেল রবিন্স (Lionel Robbins) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘An Essay on the Nature and Significance of Economic Science’-এ সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা প্রদান করেন: “Economics is the science which studies human behavior as a relationship between ends and scarce means which have alternative uses.” এ সংজ্ঞার মূল ভিত্তি তিনটি: (১) অসীম অভাব (Unlimited Ends), (২) সীমিত বা দুষ্প্রাপ্য সম্পদ (Scarce Means), এবং (৩) সম্পদের বিকল্প ব্যবহার (Alternative Uses)।
খ. অর্থনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু (Scope and Subject Matter of Economics):
- উপযোগ ও অভাব (Utility and Wants): মানবজীবনে অভাব অসীম। অর্থনীতিতে অভাবের ধরন, তীব্রতা এবং কীভাবে দ্রব্য ও সেবার মাধ্যমে উপযোগ সৃষ্টি করে অভাব মেটানো যায় তা আলোচনা করা হয়।
- উৎপাদন (Production): প্রকৃতির প্রদত্ত সম্পদকে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করার প্রক্রিয়াই হলো উৎপাদন। উৎপাদনের চারটি অপরিহার্য উপাদান—ভূমি (Land), শ্রম (Labour), মূলধন (Capital) এবং সংগঠন (Organisation)—এর সমন্বয় ও উৎপাদন বিধিমালা অর্থনীতির মুখ্য বিষয়।
- বিনিময় (Exchange): উৎপাদিত উদ্বৃত্ত পণ্য সমাজের মানুষের মধ্যে বণ্টন ও বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে বাজার ব্যবস্থা, অর্থ (Money), মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রভৃতি অর্থনীতির আওতাভুক্ত।
- বণ্টন (Distribution): জাতীয় উৎপাদনের ফলে অর্জিত মোট আয় কীভাবে উৎপাদনের চারটি উপাদানের মধ্যে খাজনা (Rent), মজুরি (Wages), সুদ/মুনাফা (Interest/Profit) হিসেবে সুষমভাবে বণ্টিত হয়, তা আলোচনা করা।
- ভোগ (Consumption): উৎপাদিত পণ্যের উপযোগ নিঃশেষ করে অভাব পূরণের প্রক্রিয়াকে ভোগ বলা হয়। ভোক্তা আচরণ তত্ত্ব, চাহিদা বিধি, উপযোগ তত্ত্ব প্রভৃতি এর অন্তর্ভুক্ত।
- সরকারি অর্থব্যবস্থা (Public Finance): সরকারের আয়-ব্যয়ের নীতিমালা, করব্যবস্থা, বাজেট প্রণয়ন এবং সামাজিক কল্যাণমূলক ব্যয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ শাখা।
- সামষ্টিক ও ব্যাষ্টিক বিশ্লেষণ: আধুনিক অর্থনীতি দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত—(ক) ব্যাষ্টিক অর্থনীতি (Microeconomics): যা ব্যক্তি বা একক প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক আচরণ নিয়ে আলোচনা করে; (খ) সামষ্টিক অর্থনীতি (Macroeconomics): যা জাতীয় আয়, মোট কর্মসংস্থান, সামগ্রিক মূল্যস্তর, মুদ্রাস্ফীতি প্রভৃতি সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আলোকপাত করে।
২. চাহিদা ও যোগান কাকে বলে? চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্বটি আলোচনা কর।
[What is demand and supply? Discuss the conventional theory of demand and supply.]
ক. চাহিদা ও যোগানের ধারণা:
- চাহিদা (Demand): সাধারণ অর্থে কোনো কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে চাহিদা বলে। কিন্তু অর্থনীতিতে কেবল আকাঙ্ক্ষাকে চাহিদা বলা হয় না। অর্থনীতিতে কার্যকর চাহিদা হতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ হতে হয়: (১) কোনো দ্রব্য পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, (২) দ্রব্যটি ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য এবং (৩) অর্থ ব্যয় করার মানসিক ইচ্ছা। অধ্যাপক পেনসনের মতে, “Demand is the desire to possess something coupled with the ability and willingness to pay.”
- যোগান (Supply): সাধারণ অর্থে দ্রব্যের মোট পরিমাণকে যোগান মনে করা হলেও অর্থনীতিতে মজুত (Stock) ও যোগান ভিন্ন। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দামে বিক্রেতাগণ যে পরিমাণ দ্রব্য বিক্রয়ের জন্য বাজারে প্রস্তুত রাখেন বা বিক্রি করতে রাজি থাকেন, তাকে যোগান বলে।
খ. চাহিদা ও যোগানের সনাতন বা ক্লাসিক্যাল তত্ত্ব (Classical Theory of Demand and Supply):
সনাতন অর্থনীতিবিদগণের মতে, একটি মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক বাজারে স্বয়ংক্রিয় মূল্য ব্যবস্থার (Price Mechanism) মাধ্যমে অদৃশ্য হস্তের (Invisible Hand) নির্দেশনায় চাহিদা ও যোগানের পারস্পরিক ঘাত-প্রতিঘাতের ফলে একটি ভারসাম্য দাম ও পরিমাণ নির্ধারিত হয়। আলফ্রেড মার্শালের মতে, কাঁচির দুটি ফলক যেমন একত্রে কাজ করে কাপড় কাটে, তেমনি চাহিদা ও যোগান যুগপৎভাবে দ্রব্যের দাম নির্ধারণ করে।
- চাহিদা বিধি (Law of Demand): অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে দ্রব্যের দাম বাড়লে চাহিদার পরিমাণ হ্রাস পায় এবং দাম কমলে চাহিদার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ দাম ও চাহিদার মধ্যে বিপরীতমুখী বা ঋণাত্মক সম্পর্ক বিদ্যমান: \( D = f(P) \), যেখানে \( dD/dP < 0 \)। ফলে চাহিদা রেখা বাম দিক থেকে ডান দিকে নিম্নগামী হয়।
- যোগান বিধি (Law of Supply): অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে কোনো দ্রব্যের দাম বাড়লে যোগানের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং দাম কমলে যোগান হ্রাস পায়। অর্থাৎ দাম ও যোগানের মধ্যে ধনাত্মক বা সমমুখী সম্পর্ক বিদ্যমান: \( S = f(P) \), যেখানে \( dS/dP > 0 \)। ফলে যোগান রেখা বাম দিক থেকে ডান দিকে ঊর্ধ্বগামী হয়।
- ভারসাম্য দাম নির্ধারণ (Equilibrium Price Determination): বাজারে এমন একটি নির্দিষ্ট দাম থাকে যেখানে ক্রেতার মোট চাহিদার পরিমাণ এবং বিক্রেতার মোট যোগানের পরিমাণ পরস্পর সমান হয় (\( D = S \))। একে ভারসাম্য দাম (Equilibrium Price) এবং ওই পরিমাণকে ভারসাম্য পরিমাণ (Equilibrium Quantity) বলা হয়।
- যদি বাজারে দাম ভারসাম্য দামের চেয়ে বেশি হয়, তবে যোগান চাহিদার চেয়ে বেশি হয় (\( S > D \))। বাজারে উদ্বৃত্ত দেখা দিলে বিক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং দাম কমতে থাকে।
- যদি বাজারে দাম ভারসাম্য দামের চেয়ে কম হয়, তবে চাহিদা যোগানের চেয়ে বেশি হয় (\( D > S \))। ফলে দ্রব্যের ঘাটতি দেখা দেয় এবং ক্রেতাদের প্রতিযোগিতায় দাম বাড়তে থাকে।
- এভাবে স্বয়ংক্রিয় শক্তির ক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত চাহিদা ও যোগান পুনরায় ভারসাম্য বিন্দুতে (\( E \)) উপনীত হয়।
৩. অর্থনীতিতে বাজার বলতে কী বুঝ? পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে স্বল্পকালে একটি ফার্ম কি ক্ষতি স্বীকার করেও উৎপাদন চালিয়ে যাবে? ব্যাখ্যা কর।
[What do you mean by market in economics? Will a farm continue production with loss in a short term under perfect competition market? Explain it.]
ক. বাজারে অর্থনৈতিক অর্থ:
সাধারণ মানুষের নিকট বাজার বলতে কোনো নির্দিষ্ট স্থানকে বোঝায় যেখানে ক্রেতা-বিক্রেতারা সশরীরে সমবেত হয়ে পণ্য কেনাবেচা করে (যেমন—নিউ মার্কেট, সদরঘাট)। কিন্তু অর্থনীতিতে বাজার কোনো সুনির্দিষ্ট স্থান নয়; বরং বাজার হলো একটি প্রক্রিয়া বা ব্যবস্থা যার মাধ্যমে কোনো দ্রব্যের ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট দামে পণ্যটি কেনাবেচা সম্পন্ন হয়। ফরাসি অর্থনীতিবিদ অগাস্টিন কুরনোর (Cournot) মতে: “Economists understand by the ‘Market’ not any particular market place, but the whole of any region in which buyers and sellers are in such free intercourse with one another that the prices of the same goods tend to equality easily and quickly.”
খ. পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে স্বল্পকালে ক্ষতি স্বীকার করে উৎপাদন পরিচালনা:
স্বল্পকালে একটি পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক ফার্মের উৎপাদন ব্যয়কে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: (১) স্থির ব্যয় (Total Fixed Cost – TFC), যা উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বহন করতে হয় (যেমন—কারখানার ভাড়া, স্থায়ী কর্মচারীর বেতন) এবং (২) পরিবর্তনশীল ব্যয় (Total Variable Cost – TVC), যা উৎপাদনের পরিমাণের সাথে পরিবর্তিত হয় (যেমন—কাঁচামাল, বিদ্যুৎ বিল)।
স্বল্পকালে ফার্ম ক্ষতি স্বীকার করেও উৎপাদন চালিয়ে যাবে কি না, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে ফার্মের গড় পরিবর্তনশীল ব্যয় (Average Variable Cost – AVC) উত্তোলিত হচ্ছে কি না তার ওপর:
- দাম যদি গড় মোট ব্যয়ের চেয়ে কম কিন্তু গড় পরিবর্তনশীল ব্যয়ের সমান বা বেশি হয় (\( ATC > P \ge AVC \)): এ অবস্থায় ফার্মের ক্ষতি হচ্ছে, কারণ দাম থেকে পূর্ণ গড় ব্যয় উঠছে না। কিন্তু ফার্ম যদি এ অবস্থায় উৎপাদন চালিয়ে যায়, তবে সে তার পরিবর্তনশীল ব্যয় সম্পূর্ণ পূরণ করে স্থির ব্যয়ের একটি অংশও তুলতে সক্ষম হয়। আর যদি সে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে তাকে পুরো স্থির ব্যয়ই ক্ষতি হিসেবে গুনতে হবে। সুতরাং, ক্ষতি সর্বনিম্ন (Loss Minimization) রাখার স্বার্থে ফার্ম স্বল্পকালে উৎপাদন চালিয়ে যাবে।
- উৎপাদন বন্ধের বিন্দু (Shutdown Point): যখন পণ্যের দাম ঠিক গড় পরিবর্তনশীল ব্যয়ের সর্বনিম্ন বিন্দুর সমান হয় (\( P = \min AVC \)), তখন ফার্ম কেবল তার পরিবর্তনশীল ব্যয় মেটাতে পারে। এটি হলো উৎপাদন বন্ধের প্রান্তিক সীমা (Shutdown Point)।
- দাম গড় পরিবর্তনশীল ব্যয়ের চেয়ে কমে গেলে (\( P < AVC \)): যদি দাম এত কমে যায় যে ফার্ম তার দৈনন্দিন পরিবর্তনশীল ব্যয়ও তুলতে পারছে না, তখন ফার্ম উৎপাদন চালিয়ে গেলে স্থির ব্যয়ের ক্ষতির পাশাপাশি পরিবর্তনশীল ব্যয়েও বাড়তি লোকসান হবে। এমতাবস্থায় যুক্তিবাদী ফার্ম তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ (Shutdown) করে দেবে।
সিদ্ধান্ত: অতএব, স্বল্পকালে পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ফার্ম ক্ষতি স্বীকার করেও উৎপাদন চালিয়ে যাবে যতক্ষণ পর্যন্ত পণ্যের দাম তার গড় পরিবর্তনশীল ব্যয় মেটাতে সক্ষম থাকে (\( P \ge AVC \))।
৪. ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা দাও। “ইসলামি অর্থনীতির উৎস যেখানে কুরআন ও হাদীস, আধুনিক অর্থনীতি সেখানে মানবপ্রসূত”—উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
[Give a definition of Islamic economics. “The sources of Islamic economics are the Quran and Hadith, where the modern economics in manmade”—Explain the quote.]
ক. ইসলামি অর্থনীতির প্রামাণ্য সংজ্ঞা:
ইসলামি অর্থনীতি হলো মানবজাতির এমন একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক জীবনব্যবস্থা যা পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক অনুশাসন ও শরীয়াহর নির্দেশনার আলোকে পার্থিব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড (উৎপাদন, বণ্টন, বিনিময় ও ভোগ) পরিচালনা করে ইহকালীন শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তি (ফালাহ) অর্জনের দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
- ড. এম. নেজাতুল্লাহ সিদ্দিকীর মতে: “Islamic economics is the Muslim thinkers’ response to the economic challenges of their times, in which they were aided by the Quran and the Sunnah as well as by reason and experience.”
- ড. মুহাম্মদ ওমর চাপরার মতে: ইসলামি অর্থনীতি হলো জ্ঞানের এমন একটি শাখা যা মানুষের ফালাহ বা কল্যাণ সাধনে অবদান রাখে—মানবীয় ও বস্তুগত সম্পদের এমন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যা ন্যায়বিচার ও সাম্যের নিশ্চয়তা দেয়।
খ. উক্তিটির চুলচেরা বিশ্লেষণ ও তাৎপর্য:
উক্তিটি অত্যন্ত যথার্থ ও গভীর অর্থবহ। আধুনিক সাধারণ অর্থনীতি এবং ইসলামি অর্থনীতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য তাদের উৎপত্তিস্থল ও উৎসের মধ্যে নিহিত:
- উৎসের ঐশী বনাম মানবীয় রূপ: ইসলামি অর্থনীতির প্রধান ও অপরিবর্তনীয় উৎস হলো মহান আল্লাহর ঐশী বাণী আল-কুরআন এবং রসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ। পক্ষান্তরে, প্রচলিত আধুনিক অর্থনীতি (পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র) মানব মস্তিষ্কপ্রসূত তত্ত্ব, সীমিত অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন দার্শনিকের ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার ফল। মানুষ যেহেতু ত্রুটিযুক্ত ও স্বার্থপর হতে পারে, তাই মানুষের তৈরি অর্থনীতিতেও শ্রেণিশোষণ ও অবিচার বিদ্যমান থাকে।
- সার্বভৌমত্ব ও সম্পদের মালিকানা: প্রচলিত অর্থনীতিতে সম্পদের চূড়ান্ত মালিক ব্যক্তি (পুঁজিবাদে) অথবা রাষ্ট্র (সমাজতন্ত্রে)। কিন্তু ইসলামে সম্পদের একমাত্র ও চূড়ান্ত মালিক হলেন মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ তা’আলা। পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে: “লিল্লাহি মা ফিস সামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ” (আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর)। মানুষ পৃথিবীতে এ সম্পদের আমানতদার বা ট্রাস্টি মাত্র।
- লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: আধুনিক প্রচলিত অর্থনীতির একমাত্র লক্ষ্য হলো বস্তুগত মুনাফা অর্জন ও উপযোগের সর্বোচ্চকরণ (Profit and Utility Maximization)। এতে পরকালীন কোনো জবাবদিহিতা বা নৈতিক মূল্যবোধের স্থান নেই। অপরদিকে ইসলামি অর্থনীতির মূল লক্ষ্য হলো ‘ফালাহ’ (Falah) বা উভয় জগতের সার্বিক কল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
- নৈতিক সীমারেখা (হালাল-হারাম): আধুনিক অর্থনীতিতে চাহিদাসম্পন্ন যেকোনো পণ্য উৎপাদন বা বিক্রয় বৈধ (যেমন—মদ, জুয়া, অনৈতিক বিনোদন, পতিতাবৃত্তি)। কিন্তু ইসলামি অর্থনীতিতে কেবল হালাল সামগ্রী উৎপাদনের অনুমতি রয়েছে; মানবতা বিধ্বংসী ও ক্ষতিকর পণ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (হারাম)।
- সুদ বনাম যাকাত ভিত্তিক ব্যবস্থা: আধুনিক ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে আছে সুদের (Riba) ওপর, যা ধনীকে আরও ধনী এবং দরিদ্রকে নিঃস্ব করে তোলে। অথচ ইসলামে সুদকে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করে যাকাত ও সাদাকাহ ভিত্তিক সুষম বণ্টন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে: “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)।
৫. ইসলামি ভোক্তা কাকে বলে? ইসলামি ভোক্তা ও সাধারণ ভোক্তার মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর।
[What is Islamic consumer? Discuss a difference between Islamic consumer and conventional consumer?]
ক. ইসলামি ভোক্তার সংজ্ঞা:
যে ব্যক্তি তার ভোগমূলক যাবতীয় আচরণে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর বিধিবিধান, হালাল-হারামের সীমারেখা, অপচয়হীনতা এবং পরকালীন জবাবদিহিতার অনুভূতি দ্বারা পরিচালিত হয়, তাকে ইসলামি ভোক্তা (Islamic Consumer) বলা হয়। ইসলামি ভোক্তা কেবল নিজের উদরপূর্তি বা আত্মতৃপ্তির কথা ভাবে না, বরং সমাজের বঞ্চিত মানুষের অধিকার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে।
খ. ইসলামি ভোক্তা ও সাধারণ ভোক্তার তুলনামূলক পার্থক্য:
| পার্থক্যের বিষয় | সাধারণ বা প্রচলিত ভোক্তা (Conventional Consumer) | ইসলামি ভোক্তা (Islamic Consumer) |
|---|---|---|
| ১. চালিকাশক্তি | স্বার্থপরতা এবং এককভাবে বৈষয়িক আত্মতৃপ্তি সর্বোচ্চকরণ। | আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও উভয় জাহানের ফালাহ লাভ। |
| ২. দ্রব্যের বৈধতা | হালাল-হারামের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; উপযোগ পেলেই ভোগ করে। | কঠোরভাবে হালাল ও পবিত্র (তাইয়্যেব) পণ্য গ্রহণে বাধ্য; হারাম বর্জনীয়। |
| ৩. ব্যয়ের পরিমিতিবোধ | নিজের অর্থ যেমন খুশি অপচয় বা বিলাসবহুল প্রদর্শনীতে ব্যয় করা বৈধ। | অপচয় (ইসরাফ) ও অপব্যয় (তাবযীর) নিষিদ্ধ; মধ্যমপন্থা অবলম্বন আবশ্যক। |
| ৪. সামাজিক দায়বদ্ধতা | অন্যের অধিকার রক্ষা করা ঐচ্ছিক ব্যাপার; সামাজিক দায়িত্ব আইনগত সীমার মধ্যে। | প্রতিবেশীর ক্ষুধা ও সমাজের অভাবীদের হক আদায় করা ঈমানের অঙ্গ। |
| ৫. উপযোগের দিগন্ত | কেবল ইহলৌকিক জীবনে ভোগের মধ্যেই উপযোগ সীমাবদ্ধ। | ইহকালীন ভোগের পাশাপাশি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয়ে পরকালীন সওয়াবের উপযোগ অন্তর্ভুক্ত। |
৬. যাকাত বণ্টনের খাতসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর। সমাজের দরিদ্রতা দূরীকরণে যাকাতের ভূমিকা মূল্যায়ন কর।
[Discuss the sector of Zakat allocation in details. Evaluate the role of Zakat in poverty alleviation in society.]
ক. যাকাত বণ্টনের খাতসমূহ (মাসারিফুয যাকাত):
পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাকাত ব্যয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট আটটি খাত নির্ধারণ করে দিয়েছেন:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
“নিশ্চয় সাদাকাহ (যাকাত) কেবল অভাবগ্রস্ত (ফকির), নিঃস্ব (মিসকিন), যাকাত আদায়ে নিযুক্ত কর্মচারী, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা প্রয়োজন তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধে, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আত-তাওবা: ৬০)।
- ফকির (আল-ফুকারা): যার সামান্য সম্পদ আছে কিন্তু তা নিসাব পরিমাণ নয় এবং নিজের বা পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সম্পূর্ণ অপর্যাপ্ত।
- মিসকিন (আল-মাসাকিন): যার একেবারেই কোনো সম্পদ বা সংস্থান নেই, যে নিতান্তই রিক্তহস্ত এবং আত্মমর্যাদাবোধের কারণে মানুষের কাছে হাত পাততে পারে না।
- যাকাত কর্মকর্তা ও কর্মচারী (আল-আমিলিনা আলাইহা): ইসলামি রাষ্ট্রে যাকাত সংগ্রহ, সংরক্ষণ, হিসাব রক্ষা ও সুষ্ঠু বণ্টনের কাজে নিয়োজিত কর্মচারীগণ (তাদের কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে যাকাত থেকে বেতন দেওয়া যাবে)।
- নওমুসলিম বা মনোরঞ্জনের জন্য (আল-মুআল্লাফাতু কুলুবুহুম): যাদের হৃদয় ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা প্রয়োজন কিংবা সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী নিঃস্ব ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য।
- দাসমুক্তি (ফির রিকাব): ক্রীতদাসদের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্য (আধুনিক যুগে বন্দিদের মুক্তিপণ হিসেবেও প্রযোজ্য)।
- ঋণগ্রস্তদের ঋণমুক্তি (আল-গারিমিন): বৈধ প্রয়োজনে ঋণগ্রস্ত হয়ে যারা নিজের সম্পদ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম, তাদের ঋণমুক্ত করার জন্য।
- আল্লাহর পথে (ফি সাবিলিল্লাহ): ইসলামের প্রচার, প্রসার, দীনের প্রতিরক্ষা এবং কল্যাণে সংগ্রামরত ব্যক্তিদের জন্য।
- মুসাফির (ইবনুস সাবিল): যে ব্যক্তি সফর অবস্থায় সম্পদহীন হয়ে পড়েছে, নিজ দেশে ধনী হলেও গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য তাকে যাকাত দেওয়া যাবে।
খ. দরিদ্রতা দূরীকরণে যাকাতের কার্যকর ভূমিকা:
- সম্পদের সুষম পুনর্বণ্টন: যাকাতের মাধ্যমে সমাজের ধনীদের পুঞ্জীভূত সম্পদ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাজের সর্বনিম্নে থাকা দরিদ্র মানুষের হাতে চলে আসে, ফলে সম্পদের কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা রোধ হয়।
- ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও উৎপাদন বৃদ্ধি: দরিদ্র মানুষ যাকাতের অর্থ পেলে তাদের ভোগব্যয় ও মৌলিক পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। সামগ্রিক চাহিদা বাড়লে বাজারে পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
- দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভাঙন: দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে এককালীন উৎপাদনমুখী উপকরণ (যেমন—রিকশা, সেলাই মেশিন, গাভী বা ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি) প্রদানের মাধ্যমে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে চিরতরে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা সম্ভব।
- ঐতিহাসিক নজির: ইসলামের সোনালী যুগে খোলাফায়ে রাশেদীন ও উমর ইবনে আব্দুল আজিজের খেলাফতকালে যাকাত ব্যবস্থার সুষ্ঠু প্রয়োগের ফলে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল যে সমগ্র রাষ্ট্রে যাকাত গ্রহণ করার মতো একজন দরিদ্র মানুষও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
৭. ইসলামি ব্যাংক কী? ইসলামি ব্যাংকের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা লেখ।
[What is Islami Bank? Write the importance and necessity of Islami Bank.]
ক. ইসলামি ব্যাংকের সংজ্ঞা:
ইসলামি ব্যাংক হলো এমন একটি আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যার যাবতীয় নীতি, লক্ষ্য ও কর্মপদ্ধতি পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর শরীয়াহ নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং যা সম্পূর্ণভাবে সুদকে (রিবা) পরিহার করে লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব (মুদারাবা ও মুশারাকা) এবং শরীয়াহসম্মত বিনিয়োগের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ ও বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করে। ওআইসির (OIC) সংজ্ঞায় বলা হয়েছে: “An Islamic bank is a financial institution whose statutes, rules and procedures expressly state its commitment to the principles of Islamic Shariah and to the banning of the receipt and payment of interest on any of its operations.”
খ. ইসলামি ব্যাংকের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:
- সুদমুক্ত আর্থিক লেনদেনের সুযোগ: ইসলামে সুদ গ্রহণ ও প্রদানকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সমতুল্য অপরাধ বিবেচনা করা হয়েছে। ইসলামি ব্যাংক মুসলমানদের পাপমুক্ত উপায়ে হালাল লেনদেন ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।
- লাভ-ক্ষতির ন্যায়সঙ্গত অংশীদারিত্ব: প্রচলিত ব্যাংকে উদ্যোক্তার লোকসান হলেও ব্যাংককে নির্দিষ্ট হারে সুদ পরিশোধ করতে হয়, যা চরম অবিচার। কিন্তু ইসলামি ব্যাংক মুদারাবা ও মুশারাকার মাধ্যমে বিনিয়োগের ঝুঁকি ও মুনাফা উভয়ের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেয়।
- উৎপাদনশীল সম্পদে বিনিয়োগ: ইসলামি ব্যাংক কখনো অর্থের বিনিময়ে অর্থ কেনাবেচা করে না; বরং তা বাস্তবায়িত পণ্য, সেবা ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করে (মুরাবাহা, ইজারা, বাই-মুয়াজ্জাল), যা দেশের বাস্তব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ায়।
- নৈতিকতাহীন খাতে অর্থায়ন রোধ: ইসলামি ব্যাংক মদ, জুয়া, তামাক, অস্ত্র পাচার কিংবা অশ্লীল বিনোদনের মতো অনৈতিক ব্যবসা ও কারবারে অর্থায়ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখে।
- সামাজিক কল্যাণ ও যাকাত তহবিল পরিচালনা: প্রতিটি ইসলামি ব্যাংকে বিশেষ শরীয়াহ বোর্ড এবং যাকাত ও সাদাকাহ তহবিল থাকে, যার মাধ্যমে নিঃস্বদের সাহায্য ও দারিদ্র্য বিমোচনমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
৮. টীকা লিখ (যে কোনো চারটি):
[Write short notes (any four): (a) Consumer surplus, (b) Inflation, (c) Monopoly market, (d) Takaful, (e) IDB.]
(ক) ভোক্তার উদ্বৃত্ত (Consumer Surplus):
আলফ্রেড মার্শাল কর্তৃক উদ্ভাবিত এ তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট দ্রব্য থেকে বঞ্চিত না হওয়ার জন্য একজন ভোক্তা যে পরিমাণ অর্থ দিতে প্রস্তুত থাকে এবং প্রকৃতপক্ষে সে বাজারে যে পরিমাণ মূল্য প্রদান করে—এ দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধান বা পার্থক্যকে ভোক্তার উদ্বৃত্ত বলে। অর্থাৎ, ভোক্তার উদ্বৃত্ত = সম্ভাব্য ব্যয় – প্রকৃত ব্যয়। উদাহরণস্বরূপ, তীব্র তৃষ্ণায় একজন ব্যক্তি এক বোতল পানির জন্য ৫০ টাকা দিতে রাজি ছিল, কিন্তু দোকানে গিয়ে বোতলটি ২০ টাকায় কিনতে পারল। এখানে (৫০ – ২০) = ৩০ টাকা হলো ভোক্তার উদ্বৃত্ত।
(খ) মুদ্রাস্ফীতি (Inflation):
অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি বলতে দ্রব্যমূল্যের সামগ্রিক ও ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং অর্থের ক্রয়ক্ষমতার ক্রমহ্রাসমান অবস্থাকে বোঝায়। কোলবর্নের মতে: “Too much money chasing too few goods.” মুদ্রাস্ফীতির ফলে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, কারণ টাকার মান কমে যায় এবং একই পণ্য ক্রয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। অতিরিক্ত মুদ্রা ছাপানো, চাহিদা বৃদ্ধি, উৎপাদন হ্রাস কিংবা কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এর প্রধান কারণ।
(গ) একচেটিয়া বাজার (Monopoly Market):
যে বাজারে কোনো দ্রব্যের কেবল একজনমাত্র উৎপাদক বা বিক্রেতা থাকে এবং বাজারে কোনো নিকট বিকল্প দ্রব্য (Close Substitute) থাকে না, তাকে একচেটিয়া বাজার বলে। ইংরেজি ‘Monopoly’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Mono’ (একক) এবং ‘Polein’ (বিক্রয় করা) থেকে এসেছে। এ বাজারে নতুন ফার্মের প্রবেশ পুরোপুরি অবরুদ্ধ থাকে এবং একক বিক্রেতা পণ্যের যোগান নিয়ন্ত্রণ করে নিজের ইচ্ছামতো মূল্য নির্ধারণ (Price Maker) করতে পারে। ইসলামি অর্থনীতিতে একচেটিয়া মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করাকে ‘ইহতিকার’ বলে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
(ঘ) তাকাফুল (Takaful):
‘তাকাফুল’ হলো প্রচলিত বীমা ব্যবস্থার শরীয়াহসম্মত বিকল্প রূপ। আরবি ‘কাফালা’ শব্দ থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, জামিনদারি বা যৌথ নিরাপত্তা। এটি মূলত পারস্পরিক সহযোগিতা ও দানের (তাবাররু) ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সমবায় বীমা ব্যবস্থা। প্রচলিত বীমায় সুদ (Riba), অনিশ্চয়তা (Gharar) এবং জুয়া (Maysir) বিদ্যমান থাকে যা শরীয়াহ পরিপন্থী। তাকাফুল ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারীরা একটি সাধারণ তহবিলে অর্থ জমা দেয় এবং কোনো সদস্য আকস্মিক ক্ষতি বা বিপদের শিকার হলে সেই তহবিল থেকে তাকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়।
(ঙ) আইডিবি (Islamic Development Bank – IDB):
ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (IDB) হলো মুসলিম বিশ্বের একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৩ সালে জেদ্দায় অনুষ্ঠিত ওআইসির (OIC) অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলনে এটি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। এর সদর দপ্তর সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থিত। আইডিবির মূল লক্ষ্য হলো শরীয়াহর নীতিমালার আলোকে সদস্য দেশসমূহ ও অমুসলিম দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা। এটি সুদমুক্ত ঋণ, অনুদান, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে সদস্য দেশগুলোকে ব্যাপক আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. অর্থনীতির সবচেয়ে আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা কে দিয়েছেন?
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক লায়নেল রবিন্স ১৯৩২ সালে সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও বিকল্প ব্যবহারের ভিত্তিতে অর্থনীতির সবচেয়ে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা প্রদান করেন।
২. ইসলামি অর্থনীতির মূল লক্ষ্য কী?
ইসলামি অর্থনীতির মূল লক্ষ্য হলো শুধু পার্থিব মুনাফা নয়, বরং পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সুষম বণ্টন প্রতিষ্ঠা করে উভয় জাহানের সামগ্রিক কল্যাণ বা ‘ফালাহ’ অর্জন।
৩. পবিত্র কুরআনে যাকাতের সুনির্দিষ্ট খাত কয়টি ও কী কী?
সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে যাকাতের সুনির্দিষ্ট ৮টি খাত ঘোষণা করা হয়েছে: ফকির, মিসকিন, যাকাত কর্মচারী, নওমুসলিম, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং বিপদগ্রস্ত মুসাফির।
৪. ইসলামি ব্যাংক ও সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মূল পার্থক্য কোথায়?
সাধারণ ব্যাংক পূর্বনির্ধারিত সুদের ভিত্তিতে ঋণ প্রদান করে, যেখানে ইসলামি ব্যাংক সুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রেখে লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব (মুদারাবা ও মুশারাকা) এবং বাস্তব সম্পদের শরীয়াহসম্মত কেনাবেচায় অর্থায়ন করে।
৫. তাকাফুল কী এবং এটি কেন প্রচলিত বীমার বিকল্প?
তাকাফুল হলো ইসলামি সমবায় বীমা যা পারস্পরিক দান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে গঠিত। প্রচলিত বাণিজ্যিক বীমায় সুদ, জুয়া ও অনিশ্চয়তা থাকায় ইসলামে তার শরীয়াহসম্মত বিকল্প হিসেবে তাকাফুল পরিচালিত হয়।
৬. ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) কবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর কাজ কী?
আইডিবি ১৯৭৫ সালে জেদ্দায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল দায়িত্ব হলো ওআইসিভুক্ত সদস্য মুসলিম দেশগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সুদমুক্ত অর্থায়ন ও উন্নয়নমূলক সহায়তা প্রদান করা।