জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ (As-Sirah An-Nabawiyyah) – 205301, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2020

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৬৫ মিনিট পড়ার সময়
১০ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2020
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ (السيرة النبوية)
বিষয় কোড: 205301 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


مجموعة (أ) – ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি

١- تحدث عن أحوال العرب الدينية والخلقية قبل مبعث النبي صلى الله عليه وسلم-

[রসূল (স)-এর নবুওয়াতের পূর্বে আরবদের ধর্মীয় ও নৈতিক অবস্থা আলোচনা কর।]

ভূমিকা: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত লাভের পূর্ববর্তী সময়কে ইসলামের ইতিহাসে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতার যুগ বলা হয়। এ যুগে আরব সমাজ রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় এবং নৈতিক দিক থেকে চরম অন্ধকার ও বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিল। ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি (P. K. Hitti) যথার্থই বলেছেন, “The pre-Islamic Arabs had no high ideal of morality or religion.” নৈতিকতাহীন ও পৌত্তলিক সমাজব্যবস্থাই ছিল তৎকালীন আরবের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

ক. নবুওয়াত-পূর্ব আরবের ধর্মীয় অবস্থা:

  1. মূর্তিপূজা ও বহুঈশ্বরবাদ: আরবরা আদি পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর একত্ববাদী দীন পরিত্যাগ করে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়েছিল। খোজাআ গোত্রের সর্দার আমর ইবনে লুহাই সর্বপ্রথম শাম (সিরিয়া) থেকে হুবাল মূর্তি এনে কা’বা ঘরে স্থাপন করে মূর্তিপূজার সূচনা করে। কা’বা গৃহে ৩৬০টি প্রধান দেব-দেবীর মূর্তি রক্ষিত ছিল। এর মধ্যে লাত, মানাত, উজ্জা এবং হুবাল ছিল সর্বপ্রধান।
  2. প্রকৃতিপূজা ও জড়োপাসনা: পাথর, বৃক্ষ, নক্ষত্র, কূয়া এবং বাতাস প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তির উপাসনা করত আরবরা। কোনো অদ্ভুত সুন্দর পাথর দেখলে তারা তার পূজা করত এবং যাত্রাপথে সুন্দর পাথর পেলে পূর্বের পাথর ফেলে নতুনটির উপাসনা শুরু করত।
  3. অদৃষ্টবাদ ও ভাগ্যগণনা: তারা ভাগ্য নির্ধারণে তীরের সাহায্যে লটারি করত (ইস্তিকসাম বিল আযলাম)। কোনো শুভ কাজের সূচনায় পাখি উড়িয়ে তার দিক দেখে শুভ-অশুভ নির্ণয় করত।
  4. পরকালে অবিশ্বাস: অধিকাংশ আরব পুনরুত্থান ও পরকালীন হিসাব-নিকাশে বিশ্বাস করত না। তাদের ধারণা ছিল জীবন পার্থিব পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ, মৃত্যুর পর দেহ মাটিতে মিশে যাবে। পবিত্র কুরআনে তাদের মনোভাব তুলে ধরা হয়েছে: “তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন, আমরা মরি ও বাঁচি এবং কালই কেবল আমাদেরকে ধ্বংস করে।” (সূরা আল-জাসিয়া: ২৪)।
  5. ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্মের বিকৃতি: ইয়েমেন ও খাইবারে ইহুদি এবং নজজরান ও ঘাসসান অঞ্চলে খ্রিস্টানদের বসবাস থাকলেও তাদের ধর্মগ্রন্থে চরম বিকৃতি ঘটেছিল। তারা পারস্পরিক দলাদলি ও অন্ধ কুসংস্কারে জর্জরিত ছিল।
  6. হানিফ সম্প্রদায়ের উপস্থিতি: এ সার্বিক অন্ধকারের মধ্যেও স্বল্পসংখ্যক সত্যসন্ধানী ব্যক্তি ছিলেন যারা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর একত্ববাদের অনুসারী ছিলেন। তাঁদেরকে ‘হানিফ’ বলা হতো। ওয়ারাকা ইবনে নওফেল, জায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েল প্রমুখ ছিলেন এ দলের অন্তর্ভুক্ত।

খ. নবুওয়াত-পূর্ব আরবের নৈতিক অবস্থা:

  1. নারীজাতির অবমাননা ও কন্যাশিশু জীবন্ত সমাহিতকরণ: জাহেলি সমাজে নারীর কোনো আইনি বা সামাজিক মর্যাদা ছিল না। নারীদের উত্তরাধিকার সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। সমাজে কন্যাশিশুর জন্মকে চরম লজ্জাজনক ও অপমানের প্রতীক বিবেচনা করে নবজাত কন্যাশিশুকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো (ওয়াদুল বানাত)। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে।” (সূরা আন-নাহল: ৫৮-৫৯)।
  2. উচ্ছৃঙ্খলতা, ব্যভিচার ও বহুবিবাহ: অনিয়ন্ত্রিত বহুবিবাহ এবং অবাধ যৌনাচার সমাজে প্রকট আকার ধারণ করেছিল। পতিতা পল্লিগুলোতে বিশেষ পতাকা টাঙিয়ে রাখা হতো। বৈবাহিক কোনো আইনি বিধিনিষেধ না থাকায় পিতৃহীন সৎমায়েদের পর্যন্ত বিয়ে করার প্রথা প্রচলিত ছিল।
  3. মদ্যপান ও জুয়াখেলা: মদ্যপান ও জুয়াখেলা (আল-মাইসির) ছিল তৎকালীন আরব জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ। অহংকার প্রকাশার্থে তারা মদের ফোয়ারা বইয়ে দিত এবং জুয়ায় বাজি ধরে নিজের সর্বস্ব এমনকি স্ত্রী-সন্তানদেরও বাজি রাখত।
  4. রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও গোত্রীয় আসাবিয়্যাত: গোত্রীয় অন্ধ পক্ষপাতিত্ব (আল-আসাবিয়্যাত) সমাজে তুচ্ছ কারণে ভয়াবহ যুদ্ধের জন্ম দিত। একটি ঘোড়দৌড়কে কেন্দ্র করে বনু বকর ও বনু তাগলিবের মধ্যে ৪০ বছরব্যাপী ধ্বংসাত্মক ‘বাসুস যুদ্ধ’ এবং একটি উটকে কেন্দ্র করে ‘দাহিস ও গাবরা’ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। হরবুল ফিজার (অন্যায় সমর) ছিল তেমনি এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত।
  5. লুণ্ঠন ও দস্যুবৃত্তি: মরুময় জীবনযাত্রায় এক গোত্র অন্য গোত্রের ওপর আক্রমণ চালিয়ে পশু ও সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়াকে বীরত্ব মনে করত। একে বলা হতো ‘গাজওয়া’ বা আক্রমণ নীতি।
  6. দাস-দাসীদের প্রতি অমানবিক নির্যাতন: দাস-দাসীদের পশুর মতো হাটে বিক্রি করা হতো এবং তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হতো। তাদের কোনো মানবাধিকার ছিল না।
  7. কতিপয় ইতিবাচক গুণাবলি: চরম নৈতিক অবক্ষয়ের মাঝেও আরবদের মধ্যে অতিথি পরায়ণতা (দিয়াফাহ), সাহসিকতা, তেজস্বিতা, কাব্যপ্রতিভা ও প্রতিশ্রুতি পালনের মতো কিছু প্রশংসনীয় গুণ বিদ্যমান ছিল।

উপসংহার: বস্তুত ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে আরব উপদ্বীপ যখন ধর্মীয় বিকৃতি ও নৈতিক পতনের চরম খাদে নিমজ্জিত ছিল, ঠিক তখনই মানবজাতিকে আলোর দিশা দিতে মহান আল্লাহ তা’আলা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে রহমাতুল্লিল আলামীন হিসেবে প্রেরণ করেন।


٢- متى وقعت حادثة أصحاب الفيل؟ اذكر هذه الحادثة مفصلا-

[হস্তি বাহিনীর ঘটনাটি কখন সংঘটিত হয়? ঘটনাটি বিস্তারিত আলোচনা কর।]

সংঘটনের সময়কাল: হস্তি বাহিনীর ঘটনাটি (حادثة أصحاب الفيل) হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের মাত্র ৫০ বা ৫৫ দিন পূর্বে ৫৭০/৫৭১ খ্রিস্টাব্দের মুহাররম মাসে সংঘটিত হয়। এ ঐতিহাসিক ও অলৌকিক ঘটনার তাৎপর্যের কারণে ওই বছরটিকে আরবরা ‘আমুল ফীল’ (عام الفيل) বা হস্তিবর্ষ হিসেবে গণনা শুরু করে এবং এর মাধ্যমেই তারা তাদের দিনপঞ্জিকা নির্ধারণ করত।

ঘটনার পটভূমি ও বিস্তারিত বিবরণ:

  1. আবরাহার ক্বালিস গির্জা নির্মাণ: তৎকালীন আবিসিনিয়ার (হাবশা) নাজ্জাশী সম্রাটের পক্ষ থেকে ইয়েমেনের খ্রিস্টান গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিল আবরাহা আল-আশরাম। সে দেখল আরবের সমস্ত মানুষ বায়তুল্লাহ বা কা’বা শরীফ জিয়ারতের জন্য মক্কায় গমন করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আরবদের মন মক্কার কা’বা থেকে ফেরানোর উদ্দেশ্যে সে সানা শহরে অত্যন্ত কারুকার্যময় ও বিশাল আকারের এক গির্জা নির্মাণ করে, যার নাম দেয় ‘আল-ক্বালিস’।
  2. কা’বা ধ্বংসের সংকল্প: বনু কিনানা গোত্রের এক ব্যক্তি এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রাতে গোপনে ক্বালিস গির্জায় প্রবেশ করে মলমূত্র ত্যাগ করে তা অপবিত্র করে দেয়। এতে আবরাহা ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিজ্ঞা করে যে, সে মক্কার পবিত্র কা’বা ঘর মাটির সাথে গুঁড়িয়ে দেবে।
  3. বিশাল হস্তিবাহিনীর অভিযান: আবরাহা ৬০ হাজার সৈন্যের এক সুবিশাল বাহিনী গঠন করে। এ বাহিনীর অগ্রভাগে রাখা হয় বিশাল আকারের হস্তি (মাহমুদ নামক হস্তি প্রধান ছিল)। যাত্রাপথে জু নাফার ও নুফায়েল ইবনে হাবিব নামক ইয়েমেনি নেতৃবৃন্দ বাধা দিলে আবরাহা তাদের পরাজিত করে অগ্রসর হয়।
  4. মুগাম্মাসে শিবির ও আব্দুল মুত্তালিবের প্রতিক্রিয়া: মক্কার উপকণ্ঠে ‘মুগাম্মাস’ নামক স্থানে পৌঁছে আবরাহার বাহিনী কুরাইশদের বহু উট দখল করে নেয়, যার মধ্যে নবীজী (সা.)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিবের ২০০ উটও ছিল। আব্দুল মুত্তালিব আবরাহার সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর উট ফেরত চান। আবরাহা বিস্মিত হয়ে বলল, “আমি তোমার পিতৃপুরুষের কা’বা ঘর ধ্বংস করতে এসেছি, আর তুমি উটের দাবি করছ?” আব্দুল মুত্তালিব ঐতিহাসিক উত্তর দিয়েছিলেন: “ইন্নি আনা রাব্বুল ইবিল, ওয়া লিল বায়তি রাব্বুন সাইয়াহমিহি” (নিশ্চয় আমি উটের মালিক, আর এই ঘরের একজন রব বা মালিক আছেন, তিনিই একে রক্ষা করবেন)। আবরাহা উট ফিরিয়ে দিল এবং আব্দুল মুত্তালিব কুরাইশদের নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করলেন।
  5. ঐশী গজব ও আবাবিল পাখির আক্রমণ: পরদিন সকালে আবরাহা কা’বা আক্রমণের নির্দেশ দিল। কিন্তু প্রধান হাতি মাহমুদকে কা’বার দিকে চালিত করার শত চেষ্টা করলেও হাতিটি হাঁটু গেড়ে বসে রইল, অথচ ইয়েমেন বা সিরিয়ার দিকে ঘোরালে সে দ্রুত হাঁটত। এমন সময় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অলৌকিক শাস্তি নেমে আসল। লোহিত সাগরের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষুদ্র ‘আবাবিল’ পাখি উড়ে আসল। প্রতিটি পাখির চঞ্চুতে একটি এবং দুই পায়ে দুটি করে চূর্ণিত পাথর কণা (হিজারাতুম মিন সিজ্জিল) ছিল। পাখিগুলো যখন সৈন্যবাহিনীর উপর সেই পাথর নিক্ষেপ করল, তখন তা প্রতিটি সেনার শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেল। নিমেষেই আবরাহার বাহিনী ভক্ষিত তৃণের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
  6. পবিত্র কুরআনে ঘটনার সাক্ষ্য: আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ফীলে এ ঘটনার চিরন্তন বিবরণ দিয়েছেন: “তুমি কি দেখনি তোমার প্রতিপালক হস্তিবাহিনীর সাথে কিরূপ আচরণ করেছিলেন? তিনি কি তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেননি? তিনি তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি, যারা তাদের ওপর নিক্ষেপ করেছিল পোড়ামাটির কঙ্কর; অতঃপর তিনি তাদেরকে করে দিলেন ভক্ষিত চর্বিত ঘাসের ন্যায়।” (সূরা আল-ফীল: ১-৫)।

তাৎপর্য: এ ঘটনার ফলে সমগ্র আরবে কুরাইশদের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং তারা ‘আহলুল্লাহ’ (আল্লাহর পরিবার) উপাধিতে ভূষিত হয়। একই সাথে এটি ছিল মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াত ও শুভাগমনের জন্য এক অলৌকিক ঐশী প্রেক্ষাপট (ইরহিসাত)।


٣- اكتب ما تعرف عن مولد النبي صلى الله عليه وسلم ورضاعته ونشأته-

[রসূল (স)-এর জন্ম, দুগ্ধপান ও শৈশব সম্পর্কে যা জান লেখ।]

ভূমিকা: আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভাগমন ছিল সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ করুণা ও আলোকবর্তিকা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: “ওয়ামা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আলামীন” (আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি)। তাঁর পবিত্র জন্ম, শৈশব ও কৈশোর ছিল অনুপম পবিত্রতায় ভাস্বর।

১. পবিত্র জন্ম (আল-মাওলিদুন নাবাবী):

মহানবী (সা.) ৫৭১ খ্রিস্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল (মতান্তরে ৯ই রবিউল আউয়াল, ২৯শে আগস্ট) সোমবার ভোরে মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশের বনু হাশিম শাখায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুল্লাহ এবং মাতার নাম আমিনা। জন্মের পূর্বেই তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ব্যবসা উপলক্ষ্যে সিরিয়া যাওয়ার পথে ইয়াসরিবে (মদীনা) মৃত্যুবরণ করেন। জন্মের পর দাদা আব্দুল মুত্তালিব অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে নাতিকে কোলে নিয়ে কা’বায় যান এবং আল্লাহর শোকর আদায় করে তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’ (প্রশংসিত)। মাতা আমিনা তাঁর নাম রাখেন ‘আহমদ’।

২. দুগ্ধপান পর্ব (আর-রিদাহ):

  1. সুওয়াইবার স্তন্যপান: জন্মের পর সর্বপ্রথম নবীজী (সা.)-কে কয়েকদিন দুধ পান করান তাঁর চাচা আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবা (যাঁকে আবু লাহাব ভ্রাতুষ্পুত্রের জন্মের সুসংবাদে মুক্ত করে দিয়েছিল)।
  2. হালিমাতুস সাদিয়্যার গৃহে গমন: তৎকালীন মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশদের নিয়ম ছিল মরুর উন্মুক্ত, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শুদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষার জন্য নবজাতকদের বেদুইন ধাত্রীদের নিকট লালন-পালনের জন্য পাঠানো হতো। বনু সা’দ গোত্রের ধাত্রী হযরত হালিমা বিনতে আবু জুয়ায়েব (হালিমা আস-সাদিয়্যা) পিতৃহীন শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে নিজ ক্রোড়ে তুলে নেন।
  3. বরকতময় অলৌকিক ঘটনা: শিশু মুহাম্মদ (সা.) হালিমার ঘরে আসার সাথে সাথেই তাদের রোগা উটনী ও বকরির ওলান দুধে ভরে ওঠে, তাদের আর্থিক অনটন দূর হয় এবং সর্বত্র বরকত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি চার বছর বয়স পর্যন্ত বনু সা’দ গোত্রে লালিত-পালিত হন।
  4. বক্ষ বিদারণ (শাক্কুস সদর): চার বছর বয়সে মরুপ্রান্তরে খেলাধুলা করার সময় জিবরাঈল (আ.) এসে তাঁর বক্ষ বিদারণ করেন এবং হৃদয় থেকে একটি কালো রক্তপিণ্ড অপসারণ করে জমজম কূপের পানিতে তা ধৌত করে পুনরায় স্থাপন করেন। এ ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে হালিমা শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে তাঁর মা আমিনার কোলে ফিরিয়ে দেন।

৩. শৈশব ও বেড়ে ওঠা (আন-নাশ’আহ):

  1. মায়ের স্নেহবঞ্চনা ও ওফাত: ছয় বছর বয়সে মা আমিনা শিশুপুত্রকে নিয়ে স্বামীর কবর জিয়ারত ও আত্মীয়দের সাথে সাক্ষাতের জন্য ইয়াসরিবে যান। মক্কায় ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে আমিনা গুরুতর অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করেন। ফলে তিনি মা-বাবা উভয়হীন এতিমে পরিণত হন। উম্মে আয়মান তাঁকে মক্কায় নিয়ে আসেন।
  2. দাদা আব্দুল মুত্তালিবের অভিভাবকত্ব: মাতার মৃত্যুর পর দাদা আব্দুল মুত্তালিব পরম স্নেহে তাঁকে লালন-পালন করেন। কা’বার চত্বরে দাদার বিছানায় বসার একমাত্র অধিকার ছিল শিশু মুহাম্মদের। কিন্তু আট বছর বয়সে দাদা আব্দুল মুত্তালিবও ইন্তেকাল করেন।
  3. চাচা আবু তালিবের আশ্রয়: দাদার ওফাতের পর চাচা আবু তালিব তাঁর অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন। আবু তালিব অসচ্ছল ছিলেন, কিন্তু তিনি নিজের সন্তানদের চেয়েও মুহাম্মদ (সা.)-কে অধিক ভালোবাসতেন। নবীজী (সা.) চাচার আর্থিক অনটনে সাহায্য করার জন্য মক্কার পাহাড়ে ছাগল চরাতেন।
  4. সিরিয়া সফর ও পাদ্রী বুহাইরা: বারো বছর বয়সে চাচা আবু তালিবের সাথে তিনি বাণিজ্যিক কাফেলায় সিরিয়া যান। বসরা নামক স্থানে খ্রিস্টান পাদ্রী বুহাইরা বালকের মধ্যে শেষ নবীর লক্ষণ প্রত্যক্ষ করেন এবং তাঁর দুই কাঁধের মাঝে ‘মোহরে নবুওয়াত’ দেখে আবু তালিবকে সতর্ক করে বলেন, যেন ইহুদিদের হাত থেকে এই বালককে রক্ষা করা হয়।
  5. হিলফুল ফুযুল গঠন: কৈশোরে হরবুল ফিজারের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞ দেখে ব্যথিত হয়ে তিনি যুবকদের নিয়ে ‘হিলফুল ফুযুল’ (শান্তি সংঘ) গঠন করেন, যার লক্ষ্য ছিল মজলুমের পাশে দাঁড়ানো, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পথচারীদের নিরাপত্তা প্রদান। চরম সততা ও বিশ্বস্ততার কারণে মক্কাবাসী তাঁকে ‘আল-আমিন’ (বিশ্বাসী) ও ‘আস-সাদিক’ (সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করে।

٤- من خديجة بنت خويلد؟ متى تزوجها النبي صلى الله عليه وسلم؟ اذكر الأحداث المتعلقة بزواج النبي صلى الله عليه وسلم هذا-

[খাদীজা বিনতে খোয়াইলিদ কে? নবীজী (স) কখন তাকে বিয়ে করেন? নবীজী (স)-এর এই বিয়ে সম্পর্কিত ঘটনাবলি উল্লেখ কর।]

১. খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.)-এর পরিচয়:

হযরত খাদীজা (রা.) ছিলেন মক্কার কুরাইশ বংশের আসাদ গোত্রের অত্যন্ত অভিজাত, বিদুষী, মার্জিত ও শীর্ষস্থানীয় ধনী ব্যবসায়ী নারী। তাঁর পিতার নাম খুওয়াইলিদ ইবনে আসাদ এবং মাতার নাম ফাতিমা বিনতে জায়েদ। জাহেলি যুগে তাঁর চারিত্রিক পবিত্রতা, নিষ্কলুষ মর্যাদা ও মহানুভবতার কারণে মক্কাবাসী তাঁকে ‘তাহিরা’ (পুণ্যময়ী/পবিত্রা) এবং ‘সাইয়্যিদাতু নিসায়ি কুরাইশ’ (কুরাইশ নারীদের নেত্রী) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। পূর্বে তাঁর দুটি বিবাহ হয়েছিল (আবু হালা ও আতিক ইবনে আবিদ)-এর সাথে এবং তিনি বিধবা ছিলেন।

২. বিবাহের সময়কাল:

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ২৫ বছর বয়সে খাদীজা (রা.)-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন খাদীজা (রা.)-এর বয়স ছিল ৪০ বছর। ঘটনাটি ঘটেছিল নবুওয়াত প্রাপ্তির ১৫ বছর পূর্বে, আনুমানিক ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে।

৩. বিবাহ সংক্রান্ত ঘটনাবলি:

  1. বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের প্রস্তাব: হযরত খাদীজা (রা.) তাঁর বিশাল বাণিজ্য কাফেলা পরিচালনার জন্য বিশ্বস্ত ও দক্ষ ব্যক্তির সন্ধান করতেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর সততা, নিষ্ঠা ও ‘আল-আমিন’ খ্যাতির কথা শুনে তিনি নিজের ব্যবসায়ের পণ্য নিয়ে সিরিয়ায় বাণিজ্যে যাওয়ার প্রস্তাব দেন এবং অন্যান্য ব্যবসায়ীদের চেয়ে দ্বিগুণ লভ্যাংশ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন।
  2. সিরিয়া সফর ও গোলাম মায়সারার পর্যবেক্ষণ: মুহাম্মদ (সা.) চাচা আবু তালিবের সম্মতিক্রমে খাদীজা (রা.)-এর বিশ্বস্ত গোলাম মায়সারাকে সাথে নিয়ে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ব্যবসায় অভাবনীয় লাভ হয়। মায়সারা প্রত্যক্ষ করেন যে, ভ্রমণের সময় একখণ্ড মেঘ সর্বদা মুহাম্মদ (সা.)-এর মাথার ওপর ছায়া দান করত এবং তিনি পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়ে চরম ন্যায়পরায়ণতা ও আমানতদারি রক্ষা করতেন।
  3. মায়সারার বিবরণ ও খাদীজা (রা.)-এর অনুরাগ: মক্কায় ফিরে মায়সারা খাদীজা (রা.)-এর কাছে মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুপম চরিত্র, ব্যবসায়িক অলৌকিক বরকত ও অনন্য সততার বিস্তারিত বিবরণ দেন। এতে খাদীজা (রা.) গভীরভাবে অভিভূত হন এবং তাঁর প্রতি তীব্র শ্রদ্ধা ও বিবাহের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
  4. বিবাহের প্রস্তাব প্রেরণ: তৎকালীন মক্কার বহু ধনী ও প্রভাবশালী নেতা খাদীজা (রা.)-কে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। কিন্তু খাদীজা (রা.) তাঁর বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনাব্বিহের মাধ্যমে মুহাম্মদ (সা.)-এর নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। মুহাম্মদ (সা.) চাচা আবু তালিব ও অন্যান্য মুরুব্বিদের সাথে পরামর্শ করে সানন্দে এ প্রস্তাব গ্রহণ করেন।
  5. বিবাহ অনুষ্ঠান ও খুতবা: নির্ধারিত দিনে উভয় পরিবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে মহা ধুমধামে বিবাহ সম্পন্ন হয়। মুহাম্মদ (সা.)-এর পক্ষে চাচা আবু তালিব অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী বিবাহের খুতবা পাঠ করেন এবং খাদীজা (রা.)-এর পক্ষে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেল উপস্থিত ছিলেন। মোহরানা হিসেবে ধার্য করা হয়েছিল ২০টি উট (মতান্তরে ৫০০ দিরহাম)।
  6. দাম্পত্য জীবনের তাৎপর্য: খাদীজা (রা.) বেঁচে থাকা পর্যন্ত নবীজী (সা.) অন্য কোনো বিবাহ করেননি। খাদীজা (রা.) তাঁর সমস্ত ধন-সম্পদ ইসলামের প্রচার ও রসূল (সা.)-এর পদতলে সঁপে দিয়েছিলেন। ওহী লাভের পর প্রথম তিনিই ইসলাম গ্রহণ করে রসূলুল্লাহ (সা.)-কে সান্ত্বনা ও সাহস যুগিয়েছিলেন।

٥- كيف بدأ نزول الوحي على النبي صلى الله عليه وسلم؟ وماذا نزل؟ ومن هم السابقون الى الإسلام؟ بين-

[নবীজী (স)-এর উপর ওহী অবতরণের সূচনা কীভাবে হয় এবং কী অবতীর্ণ হয়? সর্বাগ্রে কারা ইসলাম গ্রহণ করেন? আলোচনা কর।]

১. ওহী অবতরণের সূচনা (বাদউল ওহী):

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স যখন প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি, তখন তিনি নির্জনতা প্রিয় হয়ে ওঠেন। মক্কার সমাজ ও মানবতার নৈতিক অবক্ষয় দেখে তাঁর কোমল হৃদয় ব্যথিত হতো। তিনি মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে জাবালে নূরের হেরা গুহায় (غار حراء) ছাতু ও পানি নিয়ে ধ্যানমগ্ন থাকতেন।

  • সত্য স্বপ্নের সূচনা: সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী, ওহী সূচনার প্রথম লক্ষণ ছিল ‘রুইয়া সাদিকাহ’ বা সত্য স্বপ্ন। তিনি রাতে স্বপ্নে যা দেখতেন, প্রভাতে ভোরের আলোর মতো তা হুবহু বাস্তবায়িত হতো। এভাবে ছয় মাস অতিবাহিত হয়।
  • জিবরাঈল (আ.)-এর আগমন: ৬১০ খ্রিস্টাব্দের রমজান মাসের লাইলাতুল কদরের এক শান্ত রাতে (আনুমানিক ২৭শে রমজান) আল্লাহর প্রধান ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) হেরা গুহায় আবির্ভূত হন। তিনি এসে বললেন, “ইক্বরা” (পড়ুন)। রসূলুল্লাহ (সা.) উত্তর দিলেন, “মা আনা বিক্বারী” (আমি তো পড়তে জানি না)। তখন ফেরেশতা তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে এমন জোরে চাপ দিলেন যে তাঁর কষ্ট অনুভূত হলো। এভাবে তিনবার আলিঙ্গন ও নিবিড় চাপ দেওয়ার পর তৃতীয়বারে জিবরাঈল (আ.) পাঠ করলেন।

২. সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী:

হেরা গুহায় মানবজাতির মুক্তির দিশারী হিসেবে সর্বপ্রথম পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত অবতীর্ণ হয়:

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ (১) خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ (২) اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ (৩) الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ (৪) عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ (৫)
“পাঠ করুন আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্তপিণ্ড হতে। পাঠ করুন, আর আপনার প্রতিপালক পরম দয়ালু। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।” (সূরা আল-আলাক: ১-৫)।

এ আয়াতগুলো নিয়ে রসূলুল্লাহ (সা.) কম্পিত হৃদয়ে বাড়ি ফিরলেন এবং খাদীজা (রা.)-কে বললেন, “যাম্মিলূনী, যাম্মিলূনী” (আমাকে চাদর দিয়ে আবৃত কর)। খাদীজা (রা.) তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন, “কখনো নয়, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, অসহায়ের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বকে সাহায্য করেন এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন।” এরপর খাদীজা (রা.) তাঁকে তাওরাত ও ইঞ্জিলের পণ্ডিত ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে নিয়ে যান। ওয়ারাকা সমস্ত ঘটনা শুনে ঘোষণা করেন, ইনিই সেই ‘নামূস’ (জিবরাঈল), যিনি মূসা (আ.)-এর নিকট এসেছিলেন।

৩. আস-সাবিকূনাল আউয়ালূন (সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণকারীগণ):

ওহী লাভের পর সর্বপ্রথম যাঁরা কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই ইসলামের দাওয়াত কবুল করেন, ইতিহাসে তাঁদেরকে আস-সাবিকূনাল আউয়ালূন বলা হয়:

  1. নারীজাতির মধ্যে প্রথম: উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.)। তিনি সমগ্র মানবজাতির মধ্যেও সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী।
  2. প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে প্রথম: মহানবীর আজীবন বিশ্বস্ত বন্ধু হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।
  3. বালকদের মধ্যে প্রথম: মহানবীর চাচাতো ভাই হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) (তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ১০ বছর)।
  4. মুক্ত ক্রীতদাসদের মধ্যে প্রথম: মহানবীর পালিত পুত্র হযরত জায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)।
  5. দাসদের মধ্যে প্রথম: হাবশী মুয়াযযিন হযরত বেলাল ইবনে রাবাহ (রা.)।
  6. আবু বকর (রা.)-এর দাওয়াতে ইসলাম গ্রহণকারী মহাতারকাগণ: হযরত উসমান ইবনে আফফান, যুবায়ের ইবনে আওয়াম, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)।

٦- تحدث عن أسباب هجرة النبي صلى الله عليه وسلم إلى المدينة المنورة ونتائجها-

[নবীজী (স)-এর মদীনা হিজরতের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।]

ভূমিকা: ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর সাহাবীগণের জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করে ইয়াসরিবে (মদীনা মুনাওয়ারা) গমনাগমনকে ইসলামের ইতিহাসে হিজরত (الهجرة) বলা হয়। এটি কোনো কাপুরুষোচিত পলায়ন ছিল না; বরং তা ছিল দ্বীন রক্ষা ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক যুগান্তকারী কৌশলগত মহাবিপ্লব।

ক. হিজরতের প্রধান কারণসমূহ:

  1. কুরাইশদের অমানুষিক জুলুম ও নির্যাতন: মক্কায় মুসলিমদের ওপর কুরাইশ কাফেরদের বর্বর নির্যাতন চরমে পৌঁছেছিল। সাহাবীদের তপ্ত বালুতে শুইয়ে বুকে পাথর চাপা দেওয়া হতো এবং আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হতো।
  2. আবু তালিব ও খাদীজা (রা.)-এর ওফাত (আমুল হুযন): নবুওয়াতের দশম বর্ষে নবীজীর পরম আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিব এবং জীবনসঙ্গিনী খাদীজা (রা.) ইন্তেকাল করেন। ফলে কাফেররা নবীজীর ওপর শারীরিক আক্রমণের দুঃসাহস দেখায়।
  3. তায়েফের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা: আশ্রয়ের আশায় তায়েফে গমন করলে তায়েফের বখাটেরা নবীজী (সা.)-এর পবিত্র শরীরে পাথর নিক্ষেপ করে রক্তাক্ত করে। মক্কায় প্রত্যাবর্তনের পর তিনি বুঝতে পারেন সেখানে ইসলামের প্রসার রুদ্ধ হয়ে গেছে।
  4. আকাবার ঐতিহাসিক শপথ: ৬২১ ও ৬২২ খ্রিস্টাব্দে ইয়াসরিবের আউস ও খাজরাজ গোত্রের লোকেরা প্রথম ও দ্বিতীয় আকাবার শপথে রাসূল (সা.)-কে জানমাল দিয়ে রক্ষার অঙ্গীকার করে এবং মদীনায় আগমনের আন্তরিক আমন্ত্রণ জানায়।
  5. মদীনার অনুকূল পরিবেশ ও ভ্রাতৃদ্বন্দ্বের অবসান: ইয়াসরিবে আউস ও খাজরাজ গোত্রের দীর্ঘস্থায়ী বুয়াসের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একজন নিরপেক্ষ, প্রজ্ঞাবান নেতার তীব্র প্রয়োজন ছিল। মদীনার ইহুদিদের মাধ্যমে তারা পূর্ব থেকেই একজন শেষ নবীর আগমন বার্তা সম্পর্কে অবহিত ছিল।
  6. দারুন নদওয়ায় হত্যার চক্রান্ত: কুরাইশরা তাদের পার্লামেন্ট ‘দারুন নদওয়ায়’ মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে, প্রতিটি গোত্রের একজন করে যুবক মিলিতভাবে মুহাম্মদ (সা.)-কে তরবারি দিয়ে একযোগে হত্যা করবে।
  7. ঐশী নির্দেশ (আল্লাহর হুকুম): কাফেরদের চক্রান্তের খবর জানিয়ে আল্লাহ তা’আলা ওহী নাযিল করেন এবং নবীজী (সা.)-কে হিজরতের সরাসরি নির্দেশ দান করেন।

খ. হিজরতের সুদূরপ্রসারী ফলাফল ও তাৎপর্য:

  1. মদীনা সনদের প্রণয়ন ও ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর: মদীনায় পৌঁছেই নবীজী বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদীনা সনদ’ প্রণয়ন করেন এবং মদীনাকে একটি সার্বভৌম ইসলামি সাধারণতন্ত্রে রূপান্তর করেন।
  2. মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে অভূতপূর্ব ভ্রাতৃত্ব (মুওয়াখাত): মক্কা থেকে রিক্তহস্তে আসা মুহাজিরদের পুনর্বাসনে স্থানীয় আনসারগণ নিজেদের বাড়ি-ঘর, জমি-জমা অর্ধেক বিলিয়ে দিয়ে বিশ্ব ইতিহাসে ত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
  3. মসজিদে নববী নির্মাণ: মদীনায় কেন্দ্রীয় উপাসনালয়, বিচারালয়, সামরিক হেডকোয়ার্টার এবং শিক্ষার পাঠশালা হিসেবে মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সাথে প্রতিষ্ঠিত হয় আবাসিক জ্ঞানকেন্দ্র ‘আসহাবে সুফফা’।
  4. রক্ষণাত্মক থেকে বিজয়ী শক্তিতে রূপান্তর: মক্কার মাজলুম (নির্যাতিত) অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মুসলিমরা সুসংগঠিত সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। এরপর একে একে বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে বিজয় আসে এবং অবশেষে মক্কা বিজিত হয়।
  5. হিজরী সনের প্রবর্তন: ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা.) হিজরতের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে ৬২২ খ্রিস্টাব্দের হিজরত থেকেই ইসলামি বর্ষপঞ্জিকা (হিজরী সন) গণনা শুরু করেন।

مجموعة (ب) – খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি

٧- متى هاجر المسلمون إلى الحبشة؟ ولماذا؟

[মুসলমানরা কখন হাবশায় হিজরত করেছিলেন এবং কেন?]

সময়কাল: নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষে (৬১৫ খ্রিস্টাব্দের রজব মাসে) প্রথম দফায় ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী (হযরত উসমান ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়াহ সহ) আবিসিনিয়া বা হাবশায় হিজরত করেন। পরবর্তীতে একই বছর ৮৩ জন পুরুষ ও ১৯ জন নারী নিয়ে হযরত জাফর ইবনে আবি তালিবের নেতৃত্বে দ্বিতীয় দফায় হাবশায় হিজরত অনুষ্ঠিত হয়।

কারণসমূহ: মক্কার কুরাইশদের বর্বর শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চরম আকার ধারণ করেছিল। হাবশার খ্রিস্টান বাদশাহ আসহামা আন-নাজ্জাশী (Negus) ছিলেন একজন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ, সহনশীল ও ধর্মপ্রাণ শাসক। তাঁর রাজ্যে কারো ওপর অবিচার করা হতো না। তাই মুসলিমদের জীবন, ঈমান ও ধর্মচর্চার স্বাধীনতা রক্ষা করতেই মহানবী (সা.) তাদেরকে হাবশায় হিজরতের অনুমতি দান করেন।

٨- من هو بلال بن رباح؟ اذكر قصة إسلامه-

[বেলাল বিন রাবাহ কে? তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা উল্লেখ কর।]

পরিচয়: হযরত বেলাল ইবনে রাবাহ (রা.) ছিলেন হাবশী বংশোদ্ভূত একজন ক্রীতদাস। ইসলামের ইতিহাসে তিনি ছিলেন প্রথম মুয়াযযিন (মুয়াযযিনুর রাসূল) এবং বায়তুল মালের কোষাধ্যক্ষ।

ইসলাম গ্রহণ ও ত্যাগের কাহিনী: তিনি উমাইয়া ইবনে খালাফের ক্রীতদাস ছিলেন। মহানবী (সা.)-এর তাওহীদের দাওয়াত শুনে তিনি প্রাথমিক পর্যায়েই ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা জানতে পেরে নিষ্ঠুর উমাইয়া তাঁর ওপর পাশবিক নির্যাতন শুরু করে। দ্বিপ্রহরের তীব্র রোদে মক্কার মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর ওপর তাঁকে নগ্ন পিঠে শুইয়ে বুকের ওপর ভারী পাথর চাপা দেওয়া হতো এবং গলায় দড়ি বেঁধে মক্কার দুষ্ট ছেলেদের দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে ঘোরানো হতো। কিন্তু শত নির্যাতনেও তাঁর জবান থেকে কেবল একটি ধ্বনিই উচ্চারিত হতো—“আহাদ, আহাদ” (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক)। পরবর্তীতে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) চড়া মূল্যে উমাইয়া ইবনে খালাফের কাছ থেকে তাঁকে ক্রয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুক্ত করে দেন।

٩- اكتب ما تعرف عن مرحلة دعوة النبي صلى الله عليه وسلم السرية موجزاً-

[রসুল (স)-এর গোপন দাওয়াতের পর্ব সম্পর্কে যা জান সংক্ষেপে লেখ।]

গোপন দাওয়াতের সময় ও কৌশল: নবুওয়াত লাভের পর প্রথম তিন বছর মহানবী (সা.) অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সাথে গোপনে ইসলামের দাওয়াত পরিচালনা করেন (মারহালাতুদ দাওয়াতিস সিররিয়্যাহ)। এ পর্বে তিনি সাধারণ প্রকাশ্য জনসমাবেশ না করে কেবল নিকটাত্মীয়, পরম বিশ্বস্ত বন্ধু এবং সত্যসন্ধানী ব্যক্তিদের মাঝে ইসলামের একত্ববাদের বাণী প্রচার করতেন।

দারুল আরকামের ভূমিকা: এ সময় সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত হযরত আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়িটি ‘দারুল আরকাম’ নামে পরিচিতি পায়, যা ছিল ইসলামের প্রথম গোপন প্রশিক্ষণাগার ও পাঠশালা। সেখানে নবদীক্ষিত মুসলিমগণ গোপনে নামাজ আদায় করতেন এবং কুরআন শিক্ষা করতেন। এ তিন বছরে প্রায় ৪০ জন নারী-পুরুষ ইসলাম কবুল করেন। অতঃপর সূরা আশ-শু’আরা ও হিজরের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা প্রকাশ্য দাওয়াতের হুকুম দিলে গোপন পর্বের সমাপ্তি ঘটে।

١٠- ما هي بيعة العقبة؟ ومتى وقعت؟ بين-

[আকাবার শপথ কী? এটি কখন সংঘটিত হয়? বর্ণনা কর।]

সংজ্ঞা ও সংঘটনকাল: মিনা চত্বরের সন্নিকটে ‘আকাবা’ নামক গিরিপথে ইয়াসরিবের (মদীনা) তীর্থযাত্রীদের সাথে মহানবী (সা.)-এর যে ঐতিহাসিক আনুগত্যের অঙ্গীকারনামা সম্পাদিত হয়েছিল, তাকে বায়আতুল আকাবা (بيعة العقبة) বলা হয়। এটি দুই দফায় সংঘটিত হয়:

  1. প্রথম আকাবার শপথ (৬২১ খ্রি./নবুওয়াতের ১২শ বর্ষ): ইয়াসরিবের ১২ জন ব্যক্তি রাসূল (সা.)-এর হাতে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন। তাঁরা অঙ্গীকার করেন যে, তাঁরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবেন না, চুরি করবেন না, ব্যভিচার করবেন না, সন্তান হত্যা করবেন না এবং কোনো মিথ্যা অপবাদ রটাবেন না। এটি ছিল প্রধানত ধর্মীয় ও নৈতিক শপথ, তাই একে ‘বায়আতুন নিসা’ও বলা হয়। তাঁদের ইসলাম শিক্ষার জন্য রাসূল (সা.) হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)-কে মদীনায় প্রথম দূত হিসেবে পাঠান।
  2. দ্বিতীয় আকাবার শপথ (৬২২ খ্রি./নবুওয়াতের ১৩শ বর্ষ): মুসআব (রা.)-এর দাওয়াতে মদীনায় ঘরে ঘরে ইসলাম পৌঁছে যায়। হজের মৌসুমে ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী (মোট ৭৫ জন) আকাবার উপত্যকায় গভীর রাতে গোপনে মিলিত হন। তাঁরা অঙ্গীকার করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় হিজরত করলে তাঁরা নিজেদের পরিবার ও সন্তানদের যেভাবে রক্ষা করেন, ঠিক সেভাবেই জানমাল দিয়ে রাসূল (সা.)-কে রক্ষা করবেন। এ শপথের মধ্য দিয়েই ঐতিহাসিক মদীনা হিজরতের পথ উন্মুক্ত হয়।

١١- ما هو ميثاق المدينة؟ وماذا كانت ثمرته؟

[মদীনার সনদ কী? এর ফলাফল কী ছিল?]

মদীনার সনদের পরিচয়: ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদীনায় হিজরত করার পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মুহাজির, আনসার এবং মদীনায় বসবাসরত ইহুদি ও অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ৪৭ বা ৫৩টি ধারাবিশিষ্ট যে ঐতিহাসিক লিখিত চুক্তি সম্পাদন করেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে তাকে মদীনার সনদ (ميثاق المدينة) বলা হয়। এটি পৃথিবীর সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান।

ফলাফল ও সুফল:

  • একক জাতি গঠন (উম্মাহ ওয়াহিদা): সনদে ঘোষণা করা হয় মদীনার মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিকরা মিলে একটি অবিভাজ্য রাজনৈতিক জাতি গঠন করবে।
  • ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ: ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করা হয় (লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়াদীন)।
  • সার্বভৌম বিচারব্যবস্থা: মহানবী (সা.)-কে মদীনা রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি ও সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা আল্লাহর হুকুম ও নবীর ফয়সালার ওপর ছেড়ে দেওয়ার বিধান রাখা হয়।
  • মদীনার প্রতিরক্ষা: বহিঃশত্রু মদীনা আক্রমণ করলে সকল সম্প্রদায় যৌথভাবে যুদ্ধব্যয় বহন ও মাতৃভূমি রক্ষা করবে বলে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মদীনায় দীর্ঘকালের রক্তক্ষয়ী গোত্রীয় কলহের অবসান ঘটিয়ে এক অপূর্ব শান্তির সমাজ উপহার দেয়।

١٢- لماذا وقعت غزوة بدر؟ وماذا كانت نتيجتها؟

[বদরের যুদ্ধ কেন সংঘটিত হয়? এর ফলাফল কী ছিল?]

সংঘটনকাল: দ্বিতীয় হিজরীর ১৭ই রমজান (১৭ই মার্চ, ৬২৪ খ্রিস্টাব্দ) মদীনা থেকে প্রায় ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বদর প্রান্তরে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ গাযওয়ায়ে বদর (غزوة بدر) সংঘটিত হয়।

যুদ্ধের কারণসমূহ:

  1. কুরাইশদের অব্যাহত শত্রুতা ও মদীনা রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র।
  2. মুহাজির সাহাবীদের মক্কায় রেখে আসা ধন-সম্পদ ও বাড়িঘর কুরাইশদের জবরদখল ও বিক্রি করে দেওয়া।
  3. আবু সুফিয়ানের বিশাল বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়া থেকে ফেরার সময় গুজব রটানো হয় যে মুসলিমরা তা আক্রমণ করেছে। ফলে আবু জাহেল ১,০০০ সশস্ত্র সেনার সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে মদীনা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে বদরে উপনীত হয়।

যুদ্ধের ফলাফল:

  • মাত্র ৩১৩ জন নিঃসম্বল মুসলিম সৈন্য আল্লাহর বিশেষ ঐশী মদদে ১,০০০ জন রণসাজে সজ্জিত কুরাইশ বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাভূত করে।
  • কুরাইশ বাহিনীর প্রধান সেনাপতি আবু জাহেল, উতবা, শায়বা ও উমাইয়া ইবনে খালাফসহ ৭০ জন শীর্ষস্থানীয় মুশরিক নেতা নিহত হয় এবং ৭০ জন বন্দি হয়।
  • মুসলিমদের মধ্য থেকে মাত্র ১৪ জন (৬ জন মুহাজির ও ৮ জন আনসার) শাহাদাত বরণ করেন।
  • পবিত্র কুরআনে এ যুদ্ধকে ‘ইয়াউমুল ফুরকান’ (সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যের দিন) হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ বিজয়ের ফলে নবীন মদীনা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব চিরতরে সুসংহত হয় এবং আরবে ইসলামের অপ্রতিরোধ্য আধিপত্য সূচিত হয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ বিষয়ের মূল প্রতিপাদ্য কী?

আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ হলো বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনচরিত, নবুওয়াতী মিশন, মক্কী ও মাদানী যুগের দাওয়াতী সংগ্রাম এবং ইসলামি রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রামাণ্য ইতিহাস অধ্যয়ন।

২. ‘আমুল ফীল’ বা হস্তিবর্ষ বলতে কোন সনকে বোঝায়?

৫৭০/৫৭১ খ্রিস্টাব্দে ইয়েমেনের শাসক আবরাহা যখন বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে পবিত্র কা’বা গৃহ ধ্বংস করতে এসে আল্লাহর ঐশী শাস্তিতে ধ্বংস হয়েছিল, সেই বছরটিকে আরবরা হস্তিবর্ষ বা ‘আমুল ফীল’ বলে। এ বছরই মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেন।

৩. হিলফুল ফুযুল কী এবং এর লক্ষ্য কী ছিল?

হরবুল ফিজারের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুবক মুহাম্মদ (সা.)-এর উদ্যোগে মক্কার শান্তিকামী যুবকদের নিয়ে গঠিত প্রথম সমাজকল্যাণমূলক শান্তি সংঘ হলো হিলফুল ফুযুল। এর উদ্দেশ্য ছিল মজলুমের অধিকার রক্ষা, অত্যাচারীকে প্রতিহত করা এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

৪. মদীনা সনদকে পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান বলা হয় কেন?

৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.) কর্তৃক প্রণীত মদীনা সনদে একটি বহু-ধর্মীয় ও বহু-গোত্রীয় সমাজের নাগরিক অধিকার, বিচারিক কাঠামো, প্রতিরক্ষা ও রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতা সুস্পষ্ট ধারায় বিধিবদ্ধ করা হয়েছিল, যা আধুনিক সংবিধানের সকল মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

৫. হিজরতের ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী?

হিজরতের মাধ্যমে ইসলাম মক্কার অত্যাচারিত সংখ্যালঘু অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে মদীনায় স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি আন্তর্জাতিক ইসলামি রাষ্ট্রের রূপ লাভ করে। এ কারণেই হযরত উমর (রা.) হিজরত থেকেই ইসলামি বর্ষপঞ্জিকা (হিজরী সন) প্রবর্তন করেন।

৬. বদরের যুদ্ধকে কুরআনে ‘ইয়াউমুল ফুরকান’ বলা হয়েছে কেন?

বদরের যুদ্ধের ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে সত্য (ইসলাম) ও মিথ্যার (কুফর) মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য ও সীমারেখা নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল এবং মুসলিম উম্মাহ বিশ্বমঞ্চে অপরাজেয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল বলে একে ‘ইয়াউমুল ফুরকান’ বলা হয়।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *