ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2020
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মুসলমানদের ইতিহাস
বিষয় কোড: 205308 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি
১. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
[Introduce briefly the South-East Asia.]
ক. ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা:
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (South-East Asia) হলো এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশে অবস্থিত এক বিশাল ও বৈচিত্র্যময় ভৌগোলিক অঞ্চল, যা পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগর এবং পশ্চিমে ভারত মহাসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত। ভৌগোলিকভাবে এ অঞ্চলটি দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত:
- মূল ভূখণ্ডীয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (Mainland South-East Asia): মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনাম (যাকে পূর্বে ইন্দোচিন বলা হতো)।
- সামুদ্রিক বা দ্বীপীয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (Maritime South-East Asia / Malay Archipelago): মালয় উপদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়ার প্রায় ১৭ হাজার দ্বীপ (সুমাত্রা, জাভা, বোর্নিও বা কালিমান্তান, সুলাওসি, বালু), মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই এবং ফিলিপাইন।
খ. ঐতিহাসিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব:
- আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের করিডোর: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্তর্গত মালাক্কা প্রণালী (Strait of Malacca) প্রাচীনকাল থেকেই চীন, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্য সংযোগকারী সেতু হিসেবে কাজ করছে।
- মসলার দ্বীপপুঞ্জ (Spice Islands): এ অঞ্চলের মলুক্কাস দ্বীপপুঞ্জ লবঙ্গ, দারুচিনি, জায়ফল, গোলমরিচ ও কর্পূরের মতো মহামূল্যবান মসলার একমাত্র বিশ্ব-উৎস ছিল, যার আকর্ষণে যুগে যুগে আরব বণিক ও ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা এখানে আগমন করেছিল।
- সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংমিশ্রণ: প্রাচীনকালে এ অঞ্চলটি হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির অধীনে ছিল (শ্রীবিজয় ও মজপহিত সাম্রাজ্য)। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দী থেকে মুসলিম সুফি ও আরব বণিকদের হাত ধরে এখানে ইসলাম দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া হলো বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ।
২. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত ইসলাম বিস্তারের কারণসমূহ নির্ণয় কর।
[Trace out the causes of rapid spreading of Islam is South-East Asia.]
ভূমিকা: মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর ভারতের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কোনো সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইসলাম বিস্তার লাভ করেনি। এখানকার ইসলাম প্রচার ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, বাণিজ্যিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার অনন্য সমন্বয়। নিম্নে দ্রুত ইসলাম প্রসারের প্রধান কারণসমূহ আলোচনা করা হলো:
প্রধান কারণসমূহ:
- আরব, পারসিক ও গুজরাটি বণিকদের সততা: সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দী থেকেই সুমাত্রা ও মালাক্কায় মুসলিম ব্যবসায়ীরা জাহাজ নিয়ে আসতেন। তাঁদের উন্নত চারিত্রিক সততা, ওজন ও মাপে নিখুঁত আমানতদারি এবং অমায়িক আচরণে স্থানীয় অমুসলিম রাজন্যবর্গ ও সাধারণ জনগণ গভীরভাবে মুগ্ধ হয়ে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।
- সুফি সাধক ও ওয়ালী সঙ্গা (Wali Sanga)-এর ভূমিকা: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিশেষ করে জাভায় ‘ওয়ালী সঙ্গা’ (নয়জন সুফি সাধক) লোকজ সংস্কৃতির সাথে ইসলামের এক অপরূপ সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তাঁরা সুফি দর্শনের প্রেম, মানবসেবা ও তাওহীদের শিক্ষা প্রচার করেন। তাঁদের আধ্যাত্মিক সাধনায় আকৃষ্ট হয়ে নিম্নবর্ণের লাখ লাখ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।
- বৈবাহিক সম্পর্ক ও রাজকীয় ধর্মান্তর: মুসলিম ধনী বণিকগণ স্থানীয় রাজা, সর্দার ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যাদের সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হতেন। মালাক্কার প্রতিষ্ঠাতা শাসক পরমেশ্বর ইসলাম গ্রহণ করে ‘সুলতান ইস্কান্দার শাহ’ নাম ধারণ করেন। রাজার ইসলাম গ্রহণে সমগ্র প্রজাসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম কবুল করে।
- হিন্দু সমাজের জাতিভেদ প্রথা থেকে মুক্তি: তৎকালীন হিন্দু ও বৌদ্ধ সমাজ চরম বর্ণভেদ ও জাতিভেদে জর্জরিত ছিল। শূদ্র ও নিম্নবর্ণের মানুষদের কোনো সামাজিক অধিকার ছিল না। ইসলামের সাম্য, মানবতা ও সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধ নিম্নবর্ণের মানুষকে এক নতুন সম্মানের জীবন উপহার দেয়।
- সহজ-সরল ধর্মবিশ্বাস: জটিল মূর্তিপূজা বা পুরোহিতদের মধ্যস্থতাহীন একত্ববাদী আল্লাহর ইবাদতের সরলতা মানুষকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে।
- মালাক্কা সালতানাতের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা: পঞ্চদশ শতাব্দীতে মালাক্কা একটি শক্তিশালী ইসলামি সাম্রাজ্যে পরিণত হলে সমগ্র মালয় দ্বীপপুঞ্জে ধর্ম প্রচারকদের পাঠিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হয়।
৩. ইউরোপীয়দের আগমনের পূর্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থার বিবরণ দাও।
[Give an account of economic condition in South-East Asia before the European came.]
ভূমিকা: ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজদের আগমনের পূর্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশ্ববাণিজ্যের সবচেয়ে প্রাণবন্ত, সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যময় অর্থনৈতিক বলয় হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। স্থানীয় কৃষি এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের যুগলবন্দী এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভিত অত্যন্ত মজবুত করে তুলেছিল।
ক. কৃষি ও বনজ সম্পদ:
জাভা ও সুমাত্রার আগ্নেয়গিরির উর্বর মাটি ছিল কৃষি উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। সেখানে প্রচুর পরিমাণে ধান উৎপাদিত হতো যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে মালাক্কা ও অন্যান্য বাণিজ্যকেন্দ্রে সরবরাহ করা হতো। এছাড়া বনজ সম্পদের মধ্যে চন্দন কাঠ, কর্পূর, সুগন্ধি রজন এবং হাতির দাঁত আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ মূল্যে বিক্রি হতো।
খ. মসলার বিশ্ব-একচেটিয়া আধিপত্য:
মলুক্কাস দ্বীপপুঞ্জ (বান্দা ও তেরনাতে) ছিল লবঙ্গ, জায়ফল ও গোলমরিচের খনি। বিশ্বজুড়ে মাংস সংরক্ষণ ও ঔষধ তৈরিতে এ মসলার আকাশচুম্বী চাহিদা ছিল। এ মসলা বাণিজ্য এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে স্বর্ণ ও রৌপ্যের স্রোতে ভাসিয়ে দিত।
গ. এন্ট্রাপট (Entrepôt) বাণিজ্য ও মালাক্কার ভূমিকা:
- মালাক্কা ছিল সমগ্র পূর্ব গোলার্ধের প্রধান মুক্ত আন্তর্জাতিক বন্দর (Entrepot)। চীনা সিল্ক ও চীনামাটির বাসন, ভারতের গুজরাটি সুতি বস্ত্র ও বাংলার সূক্ষ্ম সুতা, আরবের সুগন্ধি ও ঘোড়া—সবকিছু মালাক্কায় এনে বিনিময় করা হতো।
- পর্তুগিজ পর্যটক তেমো পিরেস (Tome Pires) লিখেছেন: “মালাক্কা এত ধনী ও সমৃদ্ধ যে এর সমতুল্য বাণিজ্য বন্দর বিশ্বে দ্বিতীয়টি নেই। মালাক্কার যে অধিপতি, সে যেন ভেনিসের গলায় হাত দিয়ে বসে আছে।”
- বন্দরগুলোতে ন্যায্য শুল্ক আদায় করা হতো এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার জন্য ‘শাহবান্দর’ (Port Master) ব্যবস্থা কার্যকর ছিল। কোনো ইউরোপীয় একচেটিয়া শোষণ তখন ছিল না; ছিল উন্মুক্ত ও স্বাধীন বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ।
৪. মালাক্কা সালতানাতের পতনের কারণসমূহ পর্যালোচনা কর।
[Review the causes of the downfall of the Malacca Sultanate.]
ভূমিকা: প্রায় এক শতাব্দী ধরে সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য ও ইসলামের নেতৃত্ব দানকারী সমৃদ্ধ মালাক্কা সালতানাত ১৫১১ সালে পর্তুগিজ সেনাপতি আলফোনসো দে আলবুকার্কের আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এ আকস্মিক পতনের পেছনে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর বহুবিধ কারণ দায়ী ছিল:
পতনের প্রধান কারণসমূহ:
- সুলতান মাহমুদ শাহের দুর্বল ও স্বেচ্ছাচারী চরিত্র: মালাক্কার শেষ শাসক সুলতান মাহমুদ শাহ ছিলেন অত্যন্ত বিলাসী, অযোগ্য ও দূরদর্শিতাহীন। তাঁর অপরিনামদর্শী নীতি সালতানাতকে বিশৃঙ্খলার অতলে নিমজ্জিত করে।
- অভ্যন্তরীণ প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও যোগ্য নেতৃত্বের শূন্যতা: মালাক্কার প্রবাদপ্রতিম প্রধান উজির (বেন্দাহারা) তুন পেরাকের মৃত্যুর পর যোগ্য নেতৃত্বের তীব্র সংকট তৈরি হয়। পরবর্তী বেন্দাহারা তুন মুতাহির এবং রাজপরিবারের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। সুলতান মাহমুদ চক্রান্তের শিকার হয়ে তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও প্রভাবশালী বেন্দাহারা তুন মুতাহিরকে মৃত্যুদণ্ড দেন, যা প্রশাসনে চরম বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
- বাণিজ্যিক সম্প্রদায়ের অনৈক্য ও বিশ্বাসঘাতকতা: মালাক্কার স্থানীয় মালয় অভিজাত এবং তামিল মুসলিম ও চীনা বণিকদের মধ্যে চরম বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছিল। পর্তুগিজরা যখন আক্রমণ করে, তখন চীনা ও অন্যান্য অ-মালয় বণিকরা সুলতানকে সাহায্য না করে পর্তুগিজদের গোপন সাহায্য ও তথ্য সরবরাহ করে।
- সামরিক ও প্রযুক্তিগত অনগ্রসরতা: পর্তুগিজ বাহিনীর কাছে ছিল আধুনিক কামান, ভারী রণতরী, লোহার বর্ম ও বন্দুক। পক্ষান্তরে মালাক্কার মালয় সৈন্যদের হাতে ছিল প্রধানত তির-ধনুক, বল্লম এবং বিষাক্ত বিষাক্ত ডার্টযুক্ত ব্লো-পাইপ ও ঐতিহ্যবাহী ক্রিস (Kris) ছুরি। উন্নত আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে মালাক্কার বাহিনী বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি।
- ১৫১১ সালে আলবুকার্কের ভয়াবহ আক্রমণ: সুসজ্জিত ১৮টি যুদ্ধজাহাজ ও ১,২০০ সশস্ত্র নৌসেনা নিয়ে পর্তুগিজ ভাইসরয় আলবুকার্ক মালাক্কা আক্রমণ করেন। প্রবল প্রতিরোধের পরও কৌশলগত সেতু দখল করে পর্তুগিজরা শহরটি পুড়িয়ে দেয় এবং মালাক্কা সালতানাতের গৌরবময় ইতিহাসের চির সমাপ্তি ঘটায়।
৫. পর্তুগিজ কারা? দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের বাণিজ্য পথের অনুসন্ধান প্রক্রিয়া বর্ণনা কর।
[Who were the Portuguese? Narrate their enquiries process of Trade route in South-East Asia.]
ক. পর্তুগিজদের পরিচয়:
পর্তুগিজ হলো ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে আইবেরিয়ান উপদ্বীপে অবস্থিত পর্তুগাল রাজ্যের অধিবাসী। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে ভৌগোলিক আবিষ্কার ও সমুদ্রযাত্রায় তারা সমগ্র ইউরোপে অগ্রদূত ছিল। প্রিন্স হেনরি দ্য নেভিগেটর (Prince Henry the Navigator)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় তারা আধুনিক ক্যারাক ও ক্যারাভেল জাতীয় শক্তিশালী সমুদ্রগামী জাহাজ এবং কম্পাস ও অ্যাস্ট্রোল্যাব প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে অজানা সমুদ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দেয়।
খ. বাণিজ্য পথ অনুসন্ধান প্রক্রিয়া:
- ১৪৫৩ সালের কনস্টান্টিনোপলের পতন ও বিকল্প পথের তাগিদ: উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ কনস্টান্টিনোপল বিজয় করলে ইউরোপীয়দের প্রাচীন স্থলবাণিজ্য পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে ইউরোপে মসলার সংকট দেখা দেয়। মসলার দ্বীপে পৌঁছানোর বিকল্প সমুদ্রপথ আবিষ্কার তাদের জীবন-মরণের প্রশ্নে পরিণত হয়।
- আফ্রিকা প্রদক্ষিণ ও ভারতে আগমন (১৪৯৮): ১৪৮৮ সালে বার্থোলোমিউ ডিয়াজ উত্তমাশা অন্তরীপ (Cape of Good Hope) আবিষ্কার করেন। এরপর ১৪৯৮ সালে বিখ্যাত পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করে ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছান।
- মালাক্কার তথ্য সংগ্রহ ও লোপেজ দে সেকেইরা (১৫০৯): ভারতে এসে পর্তুগিজরা জানতে পারে যে মসলার আসল খনি ভারতে নয়, বরং আরও পূর্বে মালাক্কা ও মলুক্কাস দ্বীপপুঞ্জে। ১৫০৯ সালে রাজা প্রথম ম্যানুয়েলের আদেশে ডিয়োগো লোপেজ দে সেকেইরা পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে প্রথম মালাক্কায় পৌঁছেন এবং স্থানীয় বাণিজ্যের তথ্য সংগ্রহ করেন।
- আলবুকার্কের নৌঘাঁটি দখল নীতি ও মালাক্কা বিজয় (১৫১১): ১৫১০ সালে ভারতের গোয়া দখল করে আলবুকার্ক ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজ আধিপত্য কায়েম করেন। এরপর সরাসরি মসলা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ১৫১১ সালে তিনি মালাক্কা প্রণালী আক্রমণ ও বিজয় করেন। মালাক্কা দখলের পর তারা মলুক্কাসের তেরনাতে ও তিদোরে দ্বীপে দুর্গ নির্মাণ করে মসলা বাণিজ্য নিজেদের করায়ত্ত করে।
৬. ব্রিটিশ কর্তৃক মলয় অধিকারের বর্ণনা দাও।
[Describe the British supremacy in Malay.]
ভূমিকা: অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ সরকার ধাপে ধাপে কূটকৌশল, চুক্তি ও সামরিক প্রভাব খাটিয়ে সমগ্র মালয় উপদ্বীপকে (বর্তমান মালয়েশিয়া) নিজেদের উপনিবেশে পরিণত করে।
মলয় অধিকারের মূল পর্যায়সমূহ:
- পেনাং অধিকার (১৭৮৬): ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেন ফ্রান্সিস লাইট কেদাহর সুলতানকে বার্মিজদের বিরুদ্ধে সামরিক সাহায্যের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কৌশলে পেনাং দ্বীপের ইজারা লাভ করেন এবং ১৭৮৬ সালে সেখানে ব্রিটিশ ঘাঁটি স্থাপন করেন।
- সিঙ্গাপুরের পত্তন (১৮১৯): দূরদর্শী ব্রিটিশ কূটনীতিবিদ স্যার স্ট্যামফোর্ড র্যাফেলস (Sir Stamford Raffles) ১৮১৯ সালে জোহরের সুলতানের অভ্যন্তরীণ উত্তরাধিকার বিরোধের সুযোগ নিয়ে জোহরের কাছ থেকে সিঙ্গাপুর বন্দর ইজারা নেন এবং এটিকে একটি অবাধ মুক্ত বাণিজ্য বন্দর (Free Port) হিসেবে গড়ে তোলেন, যা দ্রুত এশিয়ার শ্রেষ্ঠ বন্দরে পরিণত হয়।
- ১৮২৪ সালের ইঙ্গ-ডাচ চুক্তি ও মালাক্কা লাভ: ১৮২৪ সালের ঐতিহাসিক ইঙ্গ-ডাচ চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ ও ডাচদের মধ্যে প্রভাব বলয় ভাগাভাগি হয়। ডাচরা সিঙ্গাপুরের ওপর দাবি ত্যাগ করে এবং বিনিময়ে সুমাত্রায় তাদের অবাধ কর্তৃত্ব পায়, আর ব্রিটিশরা পায় ঐতিহাসিক মালাক্কা।
- স্ট্রেইটস সেটেলমেন্টস গঠন (১৮২৬): পেনাং, মালাক্কা এবং সিঙ্গাপুর—এ তিনটি কৌশলগত বাণিজ্যিক অঞ্চলকে একত্রিত করে ব্রিটিশরা গঠন করে ‘স্ট্রেইটস সেটেলমেন্টস’ (Straits Settlements), যা সরাসরি কলকাতা এবং পরবর্তীতে লন্ডনের ঔপনিবেশিক দপ্তর থেকে পরিচালিত হতো।
- প্যাংকর চুক্তি (১৮৭৪) ও রেসিডেন্ট প্রথা: মালয় রাজ্যগুলোর (পেরাক, সেলাঙ্গর, পাহাং ও নেগরি সেম্বিলান) টিনের খনির নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্রিটিশরা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে হস্তক্ষেপ করে। ১৮৭৪ সালে পেরাকের সুলতানের সাথে ‘প্যাংকর চুক্তি’ স্বাক্ষর করে ব্রিটিশ ‘রেসিডেন্ট’ (Resident) নিয়োগ বাধ্যতামূলক করে। ইসলাম ও স্থানীয় রীতিনীতি ছাড়া বাকি সকল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব ব্রিটিশ রেসিডেন্টের হাতে চলে যায়।
- ফেডারেটেড ও নন-ফেডারেটেড মালয় স্টেটস: ১৮৯৬ সালে চারটি প্রধান রাজ্য নিয়ে গঠিত হয় ‘ফেডারেটেড মালয় স্টেটস’। পরবর্তীতে ১৯০৯ সালে ব্যাংকক চুক্তির মাধ্যমে শ্যামদেশের (থাইল্যান্ড) কাছ থেকে কেলান্তান, তেরেঙ্গানু, কেদাহ ও পারলিস দখল করে গঠিত হয় ‘নন-ফেডারেটেড মালয় স্টেটস’। এর মধ্য দিয়ে সমগ্র মলয় উপদ্বীপে নিরঙ্কুশ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব সম্পন্ন হয়।
খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি
৭. টীকা লিখ (যে কোনো দুটি):
[Write short notes (any two): (a) Tome Pires, (b) Cultural System, (c) VOC, (d) Free Trade Port.]
(ক) তেমো পিরেস (Tome Pires):
তেমো পিরেস (১৪৬৮–১৫৪০ খ্রি.) ছিলেন একজন বিখ্যাত পর্তুগিজ ফার্মাসিস্ট, রাজকীয় লেখক এবং প্রথম ইউরোপীয় দূত যিনি চীনে গিয়েছিলেন। তিনি ১৫১২ থেকে ১৫১৫ সাল পর্যন্ত মালাক্কায় পর্তুগিজ প্রশাসনের হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ সময় তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারত মহাসাগরের ভূগোল, বাণিজ্য ও সমাজ নিয়ে তাঁর অমর ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘সুমা ওরিয়েন্টাল’ (Suma Oriental) রচনা করেন। এটি ষোড়শ শতাব্দীর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মালাক্কা সালতানাতের সমাজ, বাণিজ্য এবং ইসলামের বিস্তার সম্পর্কিত সবচেয়ে প্রামাণ্য ও অমূল্য ইউরোপীয় লিখিত দলিল।
(খ) কালচারাল সিস্টেম (Cultuurstelsel):
১৮৩০ সালে ডাচ গভর্নর-জেনারেল জোহানেস ভ্যান ডেন বোশ ইন্দোনেশিয়ার জাভায় দেউলিয়া ডাচ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য যে নির্মম ও জবরদস্তিমূলক কৃষি শোষণ নীতি প্রবর্তন করেন, তাকে কালচারাল সিস্টেম বা চাষাবাদ প্রথা (Culture System) বলা হয়। এর আওতায় জাভার প্রত্যেক দরিদ্র কৃষককে তাদের আবাদি জমির এক-পঞ্চমাংশ (২০%) জমিতে ধান চাষ না করে ইউরোপীয়দের চাহিদামতো রপ্তানিযোগ্য অর্থকরী ফসল (যেমন—কফি, চিনি, নীল, মসলা ও তামাক) বাধ্যতামূলকভাবে চাষ করতে হতো এবং তা নামমাত্র মূল্যে সরকারকে জমা দিতে হতো। এতে ডাচ রাজকোষ ফুলে-ফেঁপে উঠলেও জাভায় ধান উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং লাখ লাখ কৃষক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে মৃত্যুবরণ করে। তীব্র প্রতিবাদের মুখে ১৮৭০ সালে এটি প্রত্যাহার করা হয়।
(গ) ভিওসি (VOC – Dutch East India Company):
১৬০২ সালে একাধিক ছোট ডাচ বাণিজ্য কোম্পানিকে একত্রিত করে নেদারল্যান্ডসের পার্লামেন্টের সনদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বৃহৎ যৌথ মূলধনী কোম্পানি হলো ভিওসি (Vereenigde Oostindische Compagnie / VOC)। এটি ছিল বিশ্বের সর্বপ্রথম শেয়ার ইস্যুকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। নেদারল্যান্ডস সরকার কোম্পানিকে একচেটিয়া বাণিজ্য, নিজস্ব সেনাবাহিনী ও নৌবহর পরিচালনা, দুর্গ নির্মাণ এবং স্বাধীনভাবে চুক্তি ও যুদ্ধ ঘোষণার সার্বভৌম ক্ষমতা প্রদান করেছিল। ১৬১৯ সালে তারা বাটোভিয়া (আধুনিক জাকার্তা) প্রতিষ্ঠা করে ইন্দোনেশিয়ায় তাদের এশীয় সদর দপ্তর স্থাপন করে এবং দীর্ঘ প্রায় দুই শতাব্দী ধরে মসলা বাণিজ্যে নিষ্ঠুর একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম রাখে। দুর্নীতি ও ঋণের কারণে ১৭৯৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর ভিওসি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়।
(ঘ) অবাধ বাণিজ্য বন্দর (Free Trade Port):
অবাধ বা মুক্ত বাণিজ্য বন্দর হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দর যেখানে আগত যেকোনো দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ কোনো ধরনের আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, বৈষম্যমূলক কর বা প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই মুক্তভাবে পণ্য খালাস, সংরক্ষণ ও পুনঃরপ্তানি করতে পারে। ১৮১৯ সালে স্যার স্ট্যামফোর্ড র্যাফেলস ডাচদের একচেটিয়া শুল্ক নীতিকে পরাস্ত করার জন্য সিঙ্গাপুরকে বিশ্বের অন্যতম প্রথম আধুনিক ‘অবাধ বাণিজ্য বন্দর’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এর ফলে সমগ্র চীন, ভারত ও মলয় দ্বীপপুঞ্জের শত শত দেশের হাজার হাজার বাণিজ্য জাহাজ সিঙ্গাপুরে ভিড়তে শুরু করে এবং অতি দ্রুত সিঙ্গাপুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বপ্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপান্তরিত হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলাম কীভাবে বিস্তার লাভ করে?
কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান ছাড়াই সুফি সাধক ও আরব বণিকদের চারিত্রিক সততা, বৈবাহিক সম্পর্ক এবং ইসলামের মানবিক সাম্যের বাণীর মাধ্যমে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উপায়ে ইসলাম বিস্তার লাভ করে।
২. মালাক্কা সালতানাত কে প্রতিষ্ঠা করেন?
চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে পরমেশ্বর নামক সুমাত্রার এক যুবরাজ মালাক্কা নগরী ও সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন, যিনি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে সুলতান ইস্কান্দার শাহ নাম গ্রহণ করেন।
৩. মালাক্কা সালতানাতের পতন কবে এবং কার হাতে ঘটে?
১৫১১ সালে পর্তুগিজ ভাইসরয় ও সেনাপতি আলফোনসো দে আলবুকার্কের নৌবাহিনীর ভয়াবহ আক্রমণে মালাক্কা সালতানাতের পতন ঘটে।
৪. ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (VOC) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৬০২ সালে নেদারল্যান্ডসে ভিওসি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি ইন্দোনেশিয়ার মসলা বাণিজ্যে দীর্ঘ দুই শতাব্দী ধরে একচেটিয়া শোষণ পরিচালনা করে।
৫. আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
ব্রিটিশ কর্মকর্তা স্যার স্ট্যামফোর্ড র্যাফেলস ১৮১৯ সালে জোহরের কাছ থেকে সিঙ্গাপুর ইজারা নিয়ে এটিকে একটি আন্তর্জাতিক অবাধ মুক্ত বাণিজ্য বন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
৬. ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম প্রচারে ‘ওয়ালী সঙ্গা’ বলতে কাদের বোঝায়?
জাভায় পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে যে নয়জন সুফি ও সাধক পুরুষ লোকজ রীতিনীতির সমন্বয়ে অত্যন্ত সফলভাবে ইসলাম প্রচার করেছিলেন, তাঁদেরকে সমষ্টিগতভাবে ‘ওয়ালী সঙ্গা’ (নয় ওলী) বলা হয়।