জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

বাংলার ইতিহাস (১২০১-১৭৫৭) (History of Bengal (1201-1757)) – 205303, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2020

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৫০ মিনিট পড়ার সময়
৮ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2020
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: বাংলার ইতিহাস (১২০১-১৭৫৭) (History of Bengal)
বিষয় কোড: 205303 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি

১. বার ভূঁইয়া কারা? মুঘলদের বিরুদ্ধে বাংলার বার ভূঁইয়াদের তৎপরতা আলোচনা কর।

[Who are the Bara Bhuiyans? Discuss the activities of the Bara Bhuiyans of Bengal against the Mughals.]

ক. বার ভূঁইয়াদের পরিচয়:

১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে শেষ স্বাধীন আফগান সুলতান দাউদ খান কররানীর পতনের পর মুঘল সম্রাট আকবর বাংলাকে মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করার ঘোষণা দেন। কিন্তু বাংলার স্বাধীনচেতা স্থানীয় জমিদার ও আফগান সর্দারগণ মুঘলদের আনুগত্য মেনে নেননি। ভাটি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে মুঘল আধিপত্যের বিরুদ্ধে যে বীর দেশপ্রেমিক জমিদারগণ সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদেরকে ইতিহাসে বার ভূঁইয়া (Bara Bhuiyans) বলা হয়। ‘বার’ শব্দটি নির্দিষ্ট সংখ্যা ১২ বোঝাতে নয়, বরং অনির্দিষ্ট সংখ্যক বহু স্বাধীন ভূস্বামী ও জমিদারদের বোঝাতে প্রচলিত ছিল।

আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’ এবং মির্জা নাথানের ‘বাহারিস্তান-ই-গায়েবীর’ প্রামাণ্য বর্ণনা অনুযায়ী, ঈসা খাঁ মসনদ-ই-আলা এবং তাঁর পুত্র মুসা খাঁর নেতৃত্বে ভাটি অঞ্চলের বার ভূঁইয়াদের মধ্যে প্রধান ছিলেন: (১) ঈসা খাঁ (সোনারগাঁও ও ভাটি), (২) মুসা খাঁ, (৩) খাজা উসমান খান লোহানী (বোকাইনগর ও উসমানপুর), (৪) মাসুম খান কাবুলি (চাটমোহর), (৫) কেদার রায় (শ্রীপুর), (৬) প্রতাপাদিত্য (যশোর), (৭) কন্দর্প নারায়ণ ও রামচন্দ্র (বাকলা বা বরিশাল), (৮) ফজল গাজী (ভাওয়াল), (৯) আনোয়ার গাজী (চান্দপ্রতাপ), (১০) বাহাদুর গাজী (ভাওয়াল), (১১) রাজা কংস নারায়ণ (তাহিরপুর) এবং (১২) মুকুন রাম (ভূষণা)।

খ. মুঘলদের বিরুদ্ধে বার ভূঁইয়াদের প্রতিরোধ তৎপরতা:

  1. খান জাহান ও শাহবাজ খানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ: সম্রাট আকবর সেনাপতি খান জাহানকে বাংলায় পাঠান। কিন্তু ঈসা খাঁর রণকৌশলের কাছে মুঘল বাহিনী পরাস্ত হয়। ১৫৮৩ সালে সুবাদার শাহবাজ খান বিশাল বহর নিয়ে ভাটি আক্রমণ করেন। ঈসা খাঁ নদীমাতৃক বাংলার ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ত্রিমোহনীর যুদ্ধে শাহবাজ খানকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন।
  2. রাজা মানসিংহের বিরুদ্ধে ঈসা খাঁর যুদ্ধ: ১৫৯৪ সালে আকবর তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতি রাজপুত বীর রাজা মানসিংহকে বাংলার সুবাদার করে পাঠান। ১৫৯৭ সালে বিক্রমপুরের সন্নিকটে মেঘনা নদীতে মানসিংহের জামাতা দুর্জন সিংহের নেতৃত্বে মুঘল নৌবহর আক্রমণ করলে ঈসা খাঁ ও মাসুম খান কাবুলি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। দুর্জন সিংহ নিহত হন এবং বহু মুঘল সৈন্য বন্দি হয়। জনশ্রুতি রয়েছে যে, ঈসা খাঁ ও মানসিংহের মধ্যে ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বযুদ্ধ (Duel) সংঘটিত হয়েছিল, যেখানে মানসিংহের তরবারি ভেঙে গেলে ঈসা খাঁ তাঁকে নিজের তরবারি এগিয়ে দেন। ঈসা খাঁর এই মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে মানসিংহ তাঁর সাথে সন্ধি করেন।
  3. ইসলাম খান চিশতীর চূড়ান্ত অভিযান: ১৬০৮ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সুবাদার নিযুক্ত হয়ে আসেন দূরদর্শী কূটনীতিবিদ ইসলাম খান চিশতী। তিনি উপলব্ধি করেন যে নদীমাতৃক বাংলায় জয়লাভ করতে হলে শক্তিশালী নৌবহর (নওয়ারা) আবশ্যক। তিনি রাজধানী রাজমহল থেকে সরিয়ে পূর্ব বাংলার কেন্দ্রে ঢাকায় (জাহাঙ্গীরনগর) স্থানান্তর করেন।
  4. মুসা খাঁর পরাজয় ও বার ভূঁইয়াদের অবসান: ইসলাম খান সুকৌশলে ভূঁইয়াদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করেন এবং প্রতাপাদিত্যকে পরাস্ত করে মুসা খাঁর মিত্রদের বিচ্ছিন্ন করেন। ১৬১১ সালে কুদ্দালিয়া ও শীতলক্ষ্যা নদীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুসা খাঁ বীরত্বের সাথে লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত মুঘল নৌবহরের নিকট আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। এর মধ্য দিয়ে বাংলায় বার ভূঁইয়াদের গৌরবোজ্জ্বল প্রতিরোধ পর্বের অবসান ঘটে এবং সমগ্র বাংলায় সুদৃঢ় মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

২. বাংলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সুবাদার শায়েস্তা খানের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the achievements of Subadar Shaista Khan in the socio-economic development of Bengal.]

ভূমিকা: মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মামা নবাব শায়েস্তা খান দুই মেয়াদে (১৬৬৪–১৬৭৮ খ্রি. এবং ১৬৭৯–১৬৮৮ খ্রি.) সুদীর্ঘ প্রায় চব্বিশ বছর অত্যন্ত দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সাথে বাংলার সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সুশাসনকাল বাংলার ইতিহাসে শান্তি, নিরাপত্তা এবং অবিশ্বাস্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক স্বর্ণযুগ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

ক. সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা:

  1. মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যু দমন: বাংলার উপকূলীয় অঞ্চল ও নদী অববাহিকায় আরাকানি মগ এবং পর্তুগিজ হার্মাদ জলদস্যুরা নারকীয় তাণ্ডব, অপহরণ ও লুটতরাজ চালাত। শায়েস্তা খান ঢাকায় শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ (নওয়ারা) নির্মাণ করেন এবং পুত্র বুজুর্গ উমেদ খানের নেতৃত্বে ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি মগ-পর্তুগিজদের চূড়ান্তভাবে উৎখাত করে চট্টগ্রাম দখল করেন এবং এর নাম রাখেন ‘ইসলামাবাদ’। এর ফলে বাংলায় দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতা দূর হয়।
  2. কুচবিহার ও আসামে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা: পূর্ববর্তী সুবাদার মীর জুমলার মৃত্যুর পর সীমান্ত অঞ্চলে যে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছিল, শায়েস্তা খান তা দৃঢ়তার সাথে প্রশমিত করে সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।

খ. অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অভাবনীয় প্রাচুর্য:

  1. টাকায় আট মণ চাল: শায়েস্তা খানের আমলের অর্থনৈতিক প্রাচুর্যের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় প্রমাণ হলো তখন মাত্র এক টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল দ্রব্যাদি অত্যন্ত সুলভ মূল্যে জনগণের নাগালে ছিল। সমকালীন ইতিহাসবিদ শিহাবউদ্দীন তালিশের বর্ণনায় জানা যায়, শায়েস্তা খান যখন ঢাকা ত্যাগ করেন, তখন তিনি ঢাকার পশ্চিম ফটক বন্ধ করে এই নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন যে, ভবিষ্যতে যে শাসক টাকায় আট মণ চাল বিক্রি করাতে পারবে, কেবল তিনিই এই ফটক খুলবেন। পরবর্তীতে সুবাদার সুজাউদ্দীন খাঁ পুনরায় ফটকটি উন্মুক্ত করেন।
  2. বাণিজ্য বিস্তার ও শিল্প বিপ্লব: বাংলার বিশ্বখ্যাত সুতি ও মসলিন বস্ত্র, পাট, রেশম, শোর ও চালের উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। ডাচ, ইংরেজ, ফরাসি প্রভৃতি ইউরোপীয় বণিকগণ বাংলায় বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে এবং কোটি কোটি রুপির ব্যবসা পরিচালনা করে। শায়েস্তা খান তাদের কাছ থেকে শুল্ক আদায়ে কঠোর নীতি অনুসরণ করেন।
  3. অবকাঠামোগত ও স্থাপত্য বিকাশ: তিনি রাজধানী ঢাকাকে এক অপরূপ স্থাপত্যের নগরীতে পরিণত করেন। লালবাগ কেল্লা (তাঁর জামাতা আজম শাহ কর্তৃক সূচিত ও শায়েস্তা খান কর্তৃক পরিবর্ধিত), পরীবিবির মাজার, হোসেনী দালান, ছোট কাটরা এবং বহু মনোরম মসজিদ ও সেতু নির্মাণ করে তিনি ঢাকার রূপরেখা বদলে দেন।

৩. পলাশী যুদ্ধের পটভূমি ব্যাখ্যা কর এবং নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের কারণ উল্লেখ কর।

[Explain the context of the battle of Palashi and the reasons for the defeat of Nawab Shiraj-ud-daula.]

ক. পলাশী যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি:

১৭৫৬ সালের ৯ই এপ্রিল আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর মাত্র ২৩ বছর বয়সে তাঁর প্রিয় দৌহিত্র নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু সিংহাসনে বসেই তিনি এক চতুর্মুখী চরম রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হন। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্য ও ষড়যন্ত্রের ফলেই ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। যুদ্ধের প্রধান কারণসমূহ ছিল:

  1. ইংরেজদের রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন: সিরাজের সিংহাসন আরোহণের পর ফরাসি ও ডাচরা উপঢৌকন পাঠিয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলেও ইংরেজরা কোনো উপহার পাঠায়নি এবং নবাবের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে।
  2. বাণিজ্যিক দস্তকের অপব্যবহার: ১৭১৭ সালে সম্রাট ফররুখশিয়ারের ফরমান বলে কোম্পানি যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অধিকার (দস্তক) পেয়েছিল, কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসায় তা ব্যাপকভাবে অপব্যবহার করে দেশীয় বণিকদের ধ্বংস এবং সরকারের বিপুল রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছিল।
  3. ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের অবৈধ সংস্কার: নবাবের স্পষ্ট নিষেধ অমান্য করে ইংরেজরা কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের সামরিক প্রাচীর নির্মাণ ও পরিখা খনন অব্যাহত রাখে।
  4. রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দান: নবাবের পরম শত্রু ও অর্থ আত্মসাৎকারী কৃষ্ণদাসকে ইংরেজরা কলকাতায় রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় এবং নবাবের দূত নারায়ণ দাসকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়।
  5. আলীনগরের চুক্তি ভঙ্গ ও চন্দননগর দখল: নবাব ক্ষুব্ধ হয়ে কলকাতা আক্রমণ করে তা দখল করেন (আলীনগর নাম দেন)। পরবর্তীতে ক্লাইভ ও ওয়াটসন এসে আলীনগরের চুক্তি সম্পাদন করে আবার তা দখল করে নেয় এবং নবাবের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ফরাসিদের চন্দননগর কুঠি গুঁড়িয়ে দেয়।
  6. মীর জাফর ও উমিচাঁদের গভীর চক্রান্ত: নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর, ঘসেটি বেগম, শওকত জঙ্গ, রায়দুর্লভ, জগত শেঠ এবং উমিচাঁদ ইংরেজ লর্ড ক্লাইভের সাথে গোপনে ষড়যন্ত্র করে পলাশীর নাট্যমঞ্চ তৈরি করে।

খ. নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের প্রধান কারণসমূহ:

  1. সেনাপতি মীর জাফরের চরম বিশ্বাসঘাতকতা: নবাবের ৫০,০০০ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর অর্ধেকের বেশি ছিল মীর জাফর, ইয়ার লতিফ ও রায়দুর্লভের অধীনে। যুদ্ধের ময়দানে মীর জাফর তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে কাঠের পুতুলের মতো নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে থাকে এবং যুদ্ধ না করে বিশ্বাসঘাতকতা করে।
  2. মীর মাদনের শাহাদাত ও বারুদ ভিজে যাওয়া: বীর সেনাপতি মীর মদন এবং মোহন লাল ইংরেজদের ওপর তীব্র আক্রমণ চালিয়ে ইংরেজদের পর্যুদস্ত করে ফেলেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ প্রবল বৃষ্টিতে নবাবের বারুদ ও গোলাবারুদ ভিজে অকেজো হয়ে যায় (ইংরেজরা ত্রিপল দিয়ে তাদের গোলাবারুদ ঢেকে রেখেছিল)। কামানের গোলার আঘাতে মীর মদন শাহাদাত বরণ করলে নবাব মানসিক মনোবল হারিয়ে ফেলেন।
  3. মীর জাফরের প্রতারণামূলক পরামর্শে যুদ্ধ স্থগিত: মীর মদনের মৃত্যুর পর নবাব অত্যন্ত আবেগতাড়িত হয়ে মীর জাফরকে কুরআন ছুঁইয়ে শপথ করান এবং যুদ্ধের দায়িত্ব দেন। ধূর্ত মীর জাফর নবাবকে ভুল বুঝিয়ে যুদ্ধ স্থগিত করার পরামর্শ দেয়। যুদ্ধরত ক্ষীপ্র সৈন্যদের পিছু হটার নির্দেশ দেওয়া মাত্রই রবার্ট ক্লাইভ সুযোগ বুঝে পেছন থেকে অতর্কিত হামলা চালিয়ে বিশৃঙ্খল নবাব বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
  4. নবাবের রাজনৈতিক অপরিণামদর্শিতা ও কোমলতা: মীর জাফরের পূর্ববর্তী ষড়যন্ত্রসমূহ জানা সত্ত্বেও নবাব তাকে একাধিকবার ক্ষমা করেছিলেন এবং প্রধান সেনাপতির পদে বহাল রেখেছিলেন। এই অতিরিক্ত কোমলতাই নবাবের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

৪. মুঘল আমলে বাংলার আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিবরণ দাও।

[Describe the socio-economic condition of Bengal during the Mughal period.]

ভূমিকা: মুঘল আমলে (১৫৭৬–১৭৫৭ খ্রি.) বাংলা রাজনৈতিক ঐক্য এবং অর্থনৈতিক প্রাচুর্যের কারণে সমগ্র মুঘল সাম্রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশে পরিণত হয়েছিল। সুজাউদ্দিন ও আলীবর্দী খাঁর আমলে বাংলাকে মুঘল সাম্রাজ্যের ‘জান্নাতুল বিলাদ’ (স্বর্গোদ্যান বা রত্নভাণ্ডার) হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো।

ক. সামাজিক অবস্থা:

  1. সম্প্রদায়ে সম্প্রীতি ও যৌথ পরিবার: বাংলায় হিন্দু ও মুসলিম দুই প্রধান সম্প্রদায় পাশাপাশি অত্যন্ত সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের সাথে বসবাস করত। গ্রামীণ সমাজে ধর্মীয় সংকীর্ণতা ছিল না। যৌথ পরিবার প্রথা সমাজে প্রচলিত ছিল এবং প্রবীণদের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা বজায় রাখা হতো।
  2. শ্রেণিভেদ ও পেশাভিত্তিক সমাজ: সমাজে প্রধানত তিনটি শ্রেণি ছিল—অভিজাত শ্রেণি (সুবাদার, দেওয়ান, মনসবদার ও জমিদার), মধ্যবিত্ত শ্রেণি (শিক্ষক, কাজি, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মচারী) এবং সাধারণ কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণি। তাঁতী, কামার, কুমার, জেলে প্রভৃতি পেশাভিত্তিক সম্প্রদায় নিজ নিজ পেশায় নিয়োজিত ছিল।
  3. শিক্ষা ও সংস্কৃতি: মুসলিমদের জন্য প্রতিটি মসজিদের সাথে মক্তব এবং উচ্চশিক্ষার জন্য মাদ্রাসা ছিল। হিন্দুদের জন্য ছিল টোল ও পাঠশালা। ফারসি ছিল রাজভাষা, তবে সমান্তরালভাবে বাংলা সাহিত্যেরও অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছিল। আলাওল, দৌলত কাজী, কাশীরাম দাস প্রমুখ কবি এ যুগেই সাহিত্য সমৃদ্ধ করেন।

খ. অর্থনৈতিক অবস্থা:

  1. কৃষি ও খাদ্য প্রাচুর্য: বাংলা ছিল উর্বর পললভূমি। বছরে তিনবার ধান ও রবিশস্য উৎপাদিত হতো। খাদ্যশস্য, চাল, ডাল, সরিষা ও আখের উৎপাদন এত বেশি ছিল যে তা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ভারত ও বিশ্ববাজারে রপ্তানি হতো। সমকালীন পর্যটক বার্নিয়ার (Bernier) লিখেছেন: “Bengal produces of every necessary of life in great abundance.”
  2. বিশ্ববিখ্যাত বস্ত্র ও কুটির শিল্প: ঢাকার মসলিন বস্ত্র ছিল বিশ্ববিখ্যাত সূক্ষ্মতার প্রতীক। এছাড়া জামদানি, কাসা, মলমল এবং বিভিন্ন রেশমি ও সুতি বস্ত্র বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ছিল। নৌশিল্পে চট্টগ্রাম ও ঢাকা ছিল এশিয়ার অন্যতম সেরা জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র।
  3. বাণিজ্যিক রমরমা ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন: ইংরেজ, ডাচ, পর্তুগিজ ও ফরাসি ব্যবসায়ীরা বাংলা থেকে পণ্য ক্রয়ের জন্য ইউরোপ থেকে জাহাজভর্তি রৌপ্য ও স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে আসত। ফলে বাংলায় প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার আগমন ঘটত এবং বাণিজ্য ভারসাম্য বাংলার অনুকূলে থাকত।

৫. বাংলায় ফরায়েজী আন্দোলনের কার্যক্রম ও প্রকৃতি আলোচনা কর।

[Discuss the activities and nature of Faraji Movement in Bengal.]

ক. ফরায়েজী আন্দোলনের সূচনা ও কার্যক্রম:

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ফরিদপুরের হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১–১৮৪০ খ্রি.) বাংলার মুসলিম সমাজের কুসংস্কার দূরীকরণ এবং ইসলামি অনুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যে ধর্মীয় ও আর্থ-সামাজিক সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলেন, তাকে ফরায়েজী আন্দোলন (Faraizi Movement) বলা হয়। ‘ফরায়েজী’ শব্দটি আরবি ‘ফরজ’ (অবশ্য পালনীয় বিধান) থেকে এসেছে।

  1. ধর্মীয় সংস্কার: হাজী শরীয়তুল্লাহ মক্কায় দীর্ঘ বিশ বছর অবস্থান করে শরীয়তের গভীর জ্ঞান লাভ করেন। বাংলায় ফিরে তিনি দেখেন মুসলিমরা অনৈসলামিক পীরপূজা, কবরপূজা, মহররমের তাযিয়া এবং কুসংস্কারে নিমজ্জিত। তিনি ঘোষণা করেন ইসলামে শিরক ও বিদ’আতের কোনো স্থান নেই। তিনি সমাজকে কুরআন-সুন্নাহর ফরজ নির্দেশাবলি কঠোরভাবে পালনের আহ্বান জানান।
  2. দারুল হরব ঘোষণা ও জুমা-ঈদের জামাত স্থগিত: ইংরেজদের অধীনে বাংলা পরাধীন হওয়ায় হাজী শরীয়তুল্লাহ বাংলাকে ‘দারুল হরব’ (শত্রুর দেশ বা যুদ্ধক্ষেত্র) ঘোষণা করেন। শরীয়াহ অনুযায়ী ন্যায়পরায়ণ মুসলিম শাসকের অনুপস্থিতিতে পরাধীন ভূখণ্ডে জুমার ও ঈদের নামাজ স্থগিত রাখার ফতোয়া দেন, যা সাধারণ কৃষক ও মুসলিমদের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত করে।
  3. দুদু মিয়ার নেতৃত্বে কৃষক প্রতিরোধ ও লাঠিয়াল বাহিনী গঠন: হাজী শরীয়তুল্লাহর ওফাতের পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র পীর মুহসীন উদ্দীন আহমদ ওরফে দুদু মিয়া (১৮১৯–১৮৬২ খ্রি.) এ আন্দোলনকে একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র গণআন্দোলনে রূপ দেন। তিনি সমগ্র বাংলাকে কয়েকটি ‘হালকা’য় বিভক্ত করেন এবং প্রতিটি হালকা পরিচালনার জন্য খলিফা বা প্রতিনিধি নিয়োগ করেন। তিনি নীলকর সাহেব ও হিন্দু জমিদারদের অন্যায় অত্যাচার, বেআইনি কর এবং মুসলমানদের দাড়ি রাখার ওপর আরোপিত করের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি ঘোষণা করেন: “লাঙ্গল যার জমি তার, জমি আল্লাহর দান, সুতরাং জমিতে কর ধার্য করার অধিকার কোনো জমিদারের নেই।”

খ. ফরায়েজী আন্দোলনের প্রকৃতি (Nature):

  • ধর্মীয় থেকে আর্থ-সামাজিক রূপান্তর: এটি সূচিত হয়েছিল একটি ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হিসেবে, কিন্তু জমিদার ও শ্বেতাঙ্গ নীলকরদের নিপীড়নের মুখে তা দ্রুত একটি প্রজা-কল্যাণকামী রাজনৈতিক ও কৃষক প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।
  • তৃণমূল রায়তদের মুক্তি সনদ: এটি ছিল তৎকালীন বাংলার শোষিত নিম্নবিত্ত মুসলিম কৃষক ও তাঁতীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সর্বপ্রথম ঐক্যবদ্ধ তৃণমূল গণসংগ্রাম।

৬. লাহোর প্রস্তাবের পটভূমি আলোচনা কর। তুমি কী মনে কর যে, লাহোর প্রস্তাবের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ নিহিত ছিল?

[Discuss the background of the Lahore resolution. Do you think that the Lahore resolution contained the seeds of independent Bangladesh?]

ক. লাহোর প্রস্তাবের পটভূমি (১৯৪০):

  1. ১৯৩৭ সালের নির্বাচন ও কংগ্রেসের মুসলিমবিদ্বেষী নীতি: ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে ৭টি প্রদেশে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা গঠন করে মুসলমানদের ওপর ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত চাপিয়ে দেয়, বিদ্যাপীঠে গান্ধীর ছবি পূজা বাধ্যতামূলক করে এবং মুসলিম স্বার্থ চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে। এতে মুসলিমরা উপলব্ধি করে ঐক্যবদ্ধ ভারতে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন।
  2. দ্বিজাতি তত্ত্বের উত্থান: মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৩৯ সালে ঘোষণা করেন যে ভারতের হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি; তাদের ধর্ম, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও চেতনা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
  3. লাহোর সম্মেলন ও শের-ই-বাংলা: ১৯৪০ সালের ২২–২৪শে মার্চ লাহোরের মিন্টো পার্কে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ২৩শে মার্চ বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, কৃষক প্রজা পার্টির প্রধান শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এক যুগান্তকারী প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। একেই লাহোর প্রস্তাব (Lahore Resolution) বলা হয়।

খ. স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ কি লাহোর প্রস্তাবে নিহিত ছিল? বিশ্লেষণ:

আমি সম্পূর্ণভাবে একমত যে, ১৯৪০ সালের মূল লাহোর প্রস্তাবের মধ্যেই ১৯৭১ সালের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের বীজ স্পষ্টভাবে নিহিত ছিল। নিম্নে এর যুক্তিসমূহ তুলে ধরা হলো:

  1. মূল প্রস্তাবে বহুবচন ‘States’ শব্দটির ব্যবহার: ফজলুল হক উত্থাপিত মূল লাহোর প্রস্তাবের মূল বক্তব্য ছিল: “The areas in which Muslims are numerically in a majority as in the North-Western and Eastern Zones of India should be grouped to constitute ‘Independent States’ in which the constituent units shall be autonomous and sovereign.” অর্থাৎ ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকাগুলোকে নিয়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ (Independent States) গঠিত হবে। এখানে পূর্বাঞ্চলীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ও আসামকে নিয়ে একটি সম্পূর্ণ পৃথক, স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্রের স্পষ্ট ঘোষণা ছিল।
  2. ১৯৪৬ সালের জিন্নাহর চক্রান্ত ও দিল্লী কনভেনশন: ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে দিল্লীতে মুসলিম লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্মেলনে জিন্নাহ চক্রান্ত করে টাইপিংয়ের ভুল (Typographical Error) দাবি করে ‘States’-এর স্থলে একক ‘State’ প্রতিস্থাপন করে এক কৃত্রিম পাকিস্তান সৃষ্টি করেন। এ অন্যায্য পরিবর্তন বাঙালি নেতৃবৃন্দ কখনো মন থেকে মেনে নেননি।
  3. বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ঐতিহাসিক ভিত্তি: ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের ওপর যে শাসন ও শোষণ চালিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬৬-র ছয় দফা এবং ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে বাঙালিরা বারবার লাহোর প্রস্তাবের সেই মূল স্পিরিট তথা পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও সার্বভৌমত্বের দাবিকেই আইনি ও রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবিও ছিল লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রণীত।

উপসংহার: সুতরাং, ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সকল বিবেচনায় লাহোর প্রস্তাবের ‘States’ ধারণাই পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল তাত্ত্বিক ও সাংবিধানিক ভিত্তিভূমি প্রস্তুত করেছিল।


খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি

৭. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কে লেখ।

[Write about permanent settlement.]

১৭৯৩ সালের ২২শে মার্চ ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় যে নির্দিষ্ট ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) বলা হয়। এ ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো:

  • জমিদারদের জমির চিরস্থায়ী বংশানুক্রমিক মালিকানা প্রদান করা হয়, بشرط যে তারা নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের পূর্বে নির্ধারিত রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা দেবে (সূর্যাস্ত আইন)।
  • মোট রাজস্বের ১০/১১ অংশ সরকারের জন্য ধার্য করা হয় এবং ১/১১ অংশ জমিদারের কমিশন হিসেবে নির্ধারিত হয়। কিন্তু ভবিষ্যতে রাজস্বের পরিমাণ কখনো বৃদ্ধি না করার স্থায়ী চুক্তি হয়।
  • ফলাফল: এর ফলে একদল অনুগত ও পরজীবী ভূস্বামী-জমিদার শ্রেণির সৃষ্টি হয়, কিন্তু বাংলার নিরীহ প্রজা ও কৃষকদের সমস্ত ঐতিহ্যগত স্বত্ব কেড়ে নিয়ে তাদেরকে জমিদারের ইচ্ছাধীন ক্রীড়নক প্রজায় পরিণত করা হয়।

৮. ছিয়াত্তরের মন্বন্তর সম্পর্কে কী জানো লেখ।

[Write what do you know about the seventy-six manbantara.]

বাংলা ১১৭৬ সন (ইংরেজি ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে) বাংলায় যে মানবসৃষ্ট ও ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়েছিল, তাকে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (Great Bengal Famine of 1770) বলা হয়। এ দুর্ভিক্ষের কারণ ও ভয়াবহতা নিমরূপ:

  • কারণ: ১৭৬৫ সালে লর্ড ক্লাইভের দ্বৈত শাসন (Dual Government) ব্যবস্থার ফলে ইংরেজরা অবাধে দেওয়ানি কর আদায় করে এবং অনাবৃষ্টির অজুহাত দেখিয়ে চাল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত চড়া মূল্যে বিক্রি করে। চরম খাদ্য সংকটের মাঝেও ইংরেজরা জোরপূর্বক রাজস্ব আদায় অব্যাহত রাখে।
  • ক্ষয়ক্ষতি: এ দুর্ভিক্ষে বাংলার তৎকালীন মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ—প্রায় এক কোটি মানুষ অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করে। গ্রামকে গ্রাম শ্মশানে পরিণত হয় এবং চাষাবাদের জমি জঙ্গলে রূপ নেয়। সমকালীন গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসও এ চরম রাজস্ব লুণ্ঠনের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

৯. বঙ্গভঙ্গ রদের ঘটনায় মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? ব্যাখ্যা কর।

[Explain the reaction of Muslims to the abolition of Partition of Bengal.]

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠিত হলে পূর্ব বাংলার পিছিয়ে পড়া মুসলিমদের শিক্ষা, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল। কিন্তু উগ্র হিন্দু ও কংগ্রেসের স্বদেশী আন্দোলনের সন্ত্রাসের মুখে নতি স্বীকার করে ১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ দিল্লী দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) ঘোষণা করেন।

মুসলিমদের তীব্র প্রতিক্রিয়া:

  • চরম হতাশা ও বিশ্বাসভঙ্গ: বঙ্গভঙ্গ রদের আকস্মিক ঘোষণায় বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায় চরমভাবে ব্যথিত ও স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। তারা অনুভব করে যে ব্রিটিশ সরকার চরম স্বার্থপর এবং তারা উগ্র আন্দোলনকারীদের কাছে তাদের অনুগত মুসলমানদের বলি দিয়েছে। নবাব সলিমুল্লাহ ক্ষোভে ও দুঃখে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
  • রাজনৈতিক আত্মসচেতনতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: এ চরম বিশ্বাসঘাতকতার পর মুসলিম নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারেন কেবল সরকারের ওপর নির্ভর করে দাবি আদায় সম্ভব নয়। ক্ষতিপূরণস্বরূপ মুসলিমদের সান্ত্বনা দিতে ১৯১২ সালে বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন, যার চূড়ান্ত ফসল হলো ১৯২১ সালের ঐতিহাসিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১০. অন্ধকূপ হত্যা সম্পর্কে কী জান লেখ।

[Write what do you know about the dungeon killing.]

অন্ধকূপ হত্যার কাহিনী ও অপপ্রচার: ১৭৫৬ সালের ২০শে জুন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলকাতা আক্রমণ করে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ অধিকার করেন। এরপর জন জেড হলওয়েল (J. Z. Holwell) নামক এক ইংরেজ কর্মচারী মনগড়া প্রচার চালান যে, নবাবের সৈন্যরা ১৪৬ জন ইংরেজ বন্দিকে মাত্র ১৮ ফুট দীর্ঘ এবং ১৪ ফুট ১০ ইঞ্চি প্রশস্ত একটি জানালাবিহীন ক্ষুদ্র অন্ধকার কক্ষে সারা রাত আটক রাখে। তীব্র গরমে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এবং পদদলিত হয়ে পরদিন সকালে ১২৩ জন মারা যায় এবং হলওয়েলসহ মাত্র ২৩ জন বেঁচে থাকে। এ বানোয়াট কাহিনীকে ইংরেজ ইতিহাসে ‘অন্ধকূপ হত্যা’ (Black Hole Tragedy) বলা হয়।

ঐতিহাসিক সত্যতা ও অলীকতা: আধুনিক ঐতিহাসিকগণ (যেমন—অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, স্যার যদুনাথ সরকার ও অমলেন্দু দে) বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক প্রমাণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, ১৮ ফুট বাই ১৫ ফুটের একটি ক্ষুদ্র ঘরে ১৪৬ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে শারীরিকভাবে গাদাগাদি করে ঢোকানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশদের আগ্রাসন এবং ক্লাইভের পলাশী আক্রমণের পক্ষে ইংল্যান্ডের জনমত ও আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায়ের উদ্দেশ্যে হলওয়েল এ জঘন্য মিথ্যা কাহিনীটি সাজিয়ে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার চরিত্র হননের অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. বার ভূঁইয়া বলতে কাদের বোঝানো হতো?

১৫৭৬ সালে মুঘলদের বাংলা আক্রমণের পর ভাটি অঞ্চলে ঈসা খাঁ ও মুসা খাঁর নেতৃত্বে যে স্বাধীনচেতা জমিদারগণ মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রবল সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদেরকে সমষ্টিগতভাবে বার ভূঁইয়া বলা হয়।

২. সুবাদার শায়েস্তা খানের আমলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতীক কী ছিল?

শায়েস্তা খানের শাসনামলে দ্রব্যমূল্য এতটাই সুলভ ও সস্তা ছিল যে তখন মাত্র এক টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত, যা তাঁর সুশাসনের ঐতিহাসিক প্রতীক হয়ে আছে।

৩. পলাশী যুদ্ধ কবে সংঘটিত হয় এবং নবাব সিরাজের প্রধান দুর্বলতা কী ছিল?

১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা এবং তাঁর ওপর নবাবের অযৌক্তিক আস্থা ও কোমলতাই ছিল সিরাজের পরাজয়ের মূল কারণ।

৪. বাংলায় ফরায়েজী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

ফরিদপুরের হাজী শরীয়তুল্লাহ ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ধর্মীয় কুসংস্কার দূরীকরণ ও ইসলামি ফরজ বিধানাবলি পালনের উদ্দেশ্যে ফরায়েজী আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র দুদু মিয়া একে কৃষক প্রতিরোধে রূপ দেন।

৫. লাহোর প্রস্তাবের মূল প্রস্তাবক কে ছিলেন?

১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

৬. অন্ধকূপ হত্যার অলীক কাহিনীর আবিষ্কারক কে ছিলেন?

ইংরেজ কর্মকর্তা জন জেড হলওয়েল নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সুনাম নষ্ট করতে এবং ব্রিটিশ আধিপত্যের পক্ষে সহানুভূতি পেতে অন্ধকূপ হত্যার বানোয়াট কাহিনী প্রচার করেছিলেন।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *