ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2022
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মুসলমানদের ইতিহাস
বিষয় কোড: 205308 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি
১. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভৌগোলিক সীমানা উল্লেখ কর। ইসলামের আগমনের পূর্বে এ অঞ্চলের লোকদের সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা আলোচনা কর।
[Mention the geographical boundaries of South-East Asia. Discuss the social and religious conditions of the people of this region before the advent of Islam.]
ক. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভৌগোলিক সীমানা:
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশে অবস্থিত এক সুবিশাল কৌশলগত ও বৈচিত্র্যময় ভৌগোলিক বলয়। ভৌগোলিকভাবে এটি দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত:
- মূল ভূখণ্ড বা ইন্দোচীন উপদ্বীপ (Mainland South-East Asia): এর মধ্যে বর্তমান মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং পশ্চিম মালয়েশিয়া অন্তর্ভুক্ত। এর উত্তরে চীন, পশ্চিমে ভারত ও বঙ্গোপসাগর অবস্থিত।
- দ্বীপময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা মালয় দ্বীপপুঞ্জ (Insular South-East Asia): এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া (সুমাত্রা, জাভা, বোর্নিও বা কালিমন্তন, সুলাওয়েসি, বালিসহ প্রায় সতের হাজার দ্বীপ), মালয়েশিয়ার সাবাহ ও সারাওয়াক, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই এবং ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ অন্তর্ভুক্ত। এর পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিণে ভারত মহাসাগর অবস্থিত। মালাক্কা ও সুন্দা প্রণালী এ অঞ্চলের জলপথের প্রধান প্রবেশদ্বার।
খ. ইসলামের আগমনের পূর্বে সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা:
- ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব (Indianization): প্রথম থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া গভীরভাবে ভারতীয় সনাতন ও বৌদ্ধ সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত ছিল। সুমাত্রাকেন্দ্রিক শ্রীবিজয় রাজ্য ছিল বৌদ্ধধর্ম ও মহাযান সংস্কৃতির কেন্দ্র এবং জাভাকেন্দ্রিক মজপহিত ও শৈলেন্দ্র সাম্রাজ্য ছিল হিন্দু ও শৈব ধর্মের অনুসারী।
- সামাজিক স্তরবিন্যাস ও বৈষম্য: হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথার অনুরূপ সামাজিক বৈষম্য সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিকড় গেড়েছিল। রাজন্যবর্গ ও অভিজাত ব্রাহ্মণ বা পুরোহিত সম্প্রদায় নিজেদের ‘দেবরাজ’ বা ঈশ্বরের অবতার দাবি করে সাধারণ প্রজাদের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিধিনিষেধ চাপিয়ে দিয়েছিল। সাধারণ কৃষক ও দাসদের কোনো সামাজিক অধিকার ছিল না।
- ধর্মীয় বিশ্বাস ও বহুদেববাদ: সমাজ ছিল বহুদেববাদী ও সর্বপ্রাণবাদী (Animism)। শিব, বিষ্ণু ও বুদ্ধের মূর্তিপূজার পাশাপাশি আদিম প্রেতাত্মা, পর্বত ও বৃক্ষের পূজায় সাধারণ মানুষ বিশ্বাসী ছিল। কুসংস্কার, বলিদান প্রথা এবং মন্ত্রতন্ত্র সামাজিক জীবনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
- পারিবারিক ও নৈতিক অবস্থা: রাজদরবারে বহুবিবাহ ও দাস-দাসী প্রথা বহুল প্রচলিত ছিল। নৈতিক মূল্যবোধে শিথিলতা এবং উচ্চবিত্তদের অবাধ ভোগবিলাস বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীতে ইসলামের সাম্য, মানবমর্যাদা ও একত্ববাদের বাণী এসব শোষিত মানুষের নিকট মুক্তির দিশারী হয়ে দাঁড়ায়।
২. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলামের বিস্তারে আরব ও গুজরাটি মুসলিম বণিকদের ভূমিকা পর্যালোচনা কর।
[Review the role of Arab and Gujarati Muslim merchants in the expansion of Islam in South-East Asia.]
ক. ভূমিকা:
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা কোনো সামরিক বিজয় বা অস্ত্রের মাধ্যমে ঘটেনি; বরং এটি ছিল বাণিজ্যিক যোগাযোগ, সুফি সাধকদের আধ্যাত্মিক পরশ এবং মুসলিম বণিকদের অনুপম নৈতিক চরিত্রের মাধ্যমে এক শান্তিময় সামাজিক রূপান্তর। এ ক্ষেত্রে আরব ও ভারতীয় গুজরাটি মুসলিম বণিকদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও কার্যকর।
খ. আরব মুসলিম বণিকদের অবদান:
- প্রাচীন বাণিজ্যপথ ও উপকূলীয় উপনিবেশ: প্রাক-ইসলামি যুগ থেকেই আরব ও ইয়েমেনি (হাদরামাউত) নাবিকগণ লোহিত সাগর ও ওমান উপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে মালয় প্রণালী ও চীনের ক্যান্টন বন্দরে যাতায়াত করতেন। সপ্তম ও অষ্টম শতকে ইসলাম গ্রহণের পর তারা সুমাত্রা, জাভা ও মালয় উপকূলে বাণিজ্যঘাঁটি স্থাপন করেন।
- মৌসুমি বায়ু ও দীর্ঘকালীন অবস্থান: পালতোলা জাহাজের নাবিকদের মৌসুমি বায়ুর (Monsoon winds) অনুকূল বাতাসের জন্য বন্দরগুলোতে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হতো। এই অবকাশে আরব বণিকগণ স্থানীয় বন্দরগুলোতে বসতি গড়ে তোলেন, মসজিদ নির্মাণ করেন এবং ইসলামি রীতিনীতি অনুশীলন করেন।
- সততা, ওজন ও নৈতিক জীবনাচরণ: আরব ব্যবসায়ীদের আমানতদারি, ওজনে সঠিক পরিমাপ এবং সত্যবাদিতা দেখে স্থানীয় অনগ্রসর অধিবাসীরা মুগ্ধ হয়। ইসলামের অহিংস ও সাম্যের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করে।
গ. গুজরাটি মুসলিম বণিকদের ভূমিকা:
- কাম্বে বন্দর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য: ভারতের গুজরাটের কাম্বে (খাম্বাত) বন্দর ছিল মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে মসলা বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে গুজরাট মুসলিম শাসনাধীনে আসার পর সেখানকার সমৃদ্ধ মুসলিম সদাগরগণ বস্ত্র, সুতি কাপড় ও কাঁচের বিনিময়ে সুমাত্রা ও মালাক্কা থেকে লবঙ্গ, গোলমরিচ ও জায়ফল ক্রয়ে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেন।
- বৈবাহিক সম্পর্ক ও সামাজিক মিশেল: ধনী গুজরাটি ও আরব সদাগরগণ স্থানীয় মালয় প্রধান, সর্দার ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যাদের বিবাহ করেন। ফলে তাদের পারিবারিক পরিমণ্ডলে এবং শাসনকাঠামোয় ইসলামের প্রবেশ সহজতর হয়। সুমাত্রার পাসের সুলতানের সমাধিফলকে কাম্বের মার্বেল পাথরের খোদাই করা এ ঐতিহাসিক সংযোগের বাস্তব প্রমাণ।
- সুফি সাধকদের পৃষ্ঠপোষকতা: বণিকদের জাহাজে করে সুফি সাধক ও দরবেশগণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আসেন। বণিকগণ তাদের থাকা-খাওয়া ও খানকাহ নির্মাণের যাবতীয় আর্থিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যার ফলে উপকূলীয় অঞ্চল দ্রুত ইসলামি জনপদে পরিণত হয়।
৩. কীভাবে মালাক্কা রাজ্যের উত্থান ঘটে? মালাক্কার বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্কে ধারণা দাও।
[How did the kingdom of Malacca emerge? Give an idea of the foreign trade of Malacca.]
ক. মালাক্কা রাজ্যের উত্থান পটভূমি:
চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে দক্ষিণ সুমাত্রার পালেমবাং রাজ্যের পতন ঘটলে সেখানকার হিন্দু যুবরাজ পরমেশ্বর (Parameswara) পালিয়ে প্রথমে সিঙ্গাপুরে (তেমাসেক) এবং পরবর্তীতে প্রায় ১৪০২-১৪০৩ খ্রিস্টাব্দে মালয় উপদ্বীপের এক ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী গ্রামে এসে আশ্রয় নেন। কথিত আছে, একটি হরিণ শিকারী কুকুরকে নদীতে ফেলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস দেখে তিনি মুগ্ধ হন এবং যে মালাক্কা গাছের নিচে তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তার নামানুসারে এ জনপদের নাম রাখেন ‘মালাক্কা’।
- কৌশলগত অবস্থান: মালাক্কা প্রণালীর সবচেয়ে সরু ও সুরক্ষিত স্থানে অবস্থিত হওয়ায় এটি ঝড়ঝঞ্ঝামুক্ত এক প্রাকৃতিক পোতাশ্রয়ে পরিণত হয়। ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের মিলনস্থলে অবস্থানের কারণে এটি পূর্ব ও পশ্চিমের বাণিজ্যপথের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
- চীনা মিং সাম্রাজ্যের কূটনৈতিক সমর্থন: উত্তর দিক থেকে শ্যামদেশের (থাইল্যান্ড) আগ্রাসী আক্রমণ প্রতিহত করতে পরমেশ্বর চীনের মিং সম্রাটদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। ১৪০৫ ও ১৪০৯ সালে বিখ্যাত চীনা অ্যাডমিরাল চেং হো (জেং হে) রাজকীয় নৌবহর নিয়ে মালাক্কায় আসেন এবং মালাক্কাকে রাজকীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌম মর্যাদা প্রদান করেন।
- ইসলাম গ্রহণ: সুমাত্রার পাসে রাজ্যের মুসলিম রাজকন্যার সাথে বিবাহের পর পরমেশ্বর ইসলাম গ্রহণ করে ‘ইসকান্দার শাহ’ নাম ধারণ করেন। রাজার ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে মালাক্কা হিন্দু রাজ্য থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত হয়।
খ. মালাক্কার আন্তর্জাতিক বৈদেশিক বাণিজ্য:
- বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ এন্ট্রেপো বন্দর (Entrepot Port): মালাক্কা নিজে কোনো পণ্য উৎপাদন না করলেও এটি পরিণত হয় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পণ্যের আন্তর্জাতিক বিনিময় কেন্দ্রে। পর্তুগিজ লেখক টোমে পিরেসের ভাষায়: “যে ব্যক্তি মালাক্কার নিয়ন্ত্রণ নেবে, তার হাতে থাকবে বিশ্ববাণিজ্যের চাবিকাঠি।”
- বাণিজ্যের পণ্যসম্ভার: মালুকু দ্বীপপুঞ্জ থেকে লবঙ্গ, জায়ফল ও মসলা; চীন থেকে সিল্ক, চিনা মাটির বাসন ও চা; ভারত থেকে সূক্ষ্ম বস্ত্র, সুতি কাপড় ও নীল; আরব ও পারস্য থেকে আফিম, আতর, ঘোড়া ও কাঁচের সামগ্রী মালাক্কায় ক্রয়-বিক্রয় হতো।
- শাহবান্দার (Port Master) ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা: বহির্বাণিজ্য সুশৃঙ্খল করতে মালাক্কায় চারটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর জন্য চারজন পৃথক বন্দর কমিশনার বা ‘শাহবান্দার’ নিয়োগ করা হয় (গুজরাটি, ভারতীয়/বর্মি, জাভানিজ এবং চীনা/ফিলিপিনো)। আধুনিক গুদামজাতকরণ, নৌ-ট্যাক্স (কাস্টমস) এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।
৪. মালাক্কার সুলতান মোজাফফর শাহের শাসনকাল আলোচনা কর।
[Discuss the reign of Sultan Muzaffar Shah of Malacca.]
ক. পটভূমি ও সিংহাসন আরোহণ:
সুলতান মোজাফফর শাহ (পূর্বনাম রাজা কাসিম) ১৪৪৬ থেকে ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মালাক্কা শাসন করেন। তিনি ছিলেন মালাক্কার পঞ্চম শাসক। তাঁর সিংহাসন আরোহণ মালাক্কার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মোড় ঘুরিয়ে দেয়; কারণ এর মাধ্যমে রাজদরবারে হিন্দু ভাবধারার তামিল গোষ্ঠীর প্রভাব খর্ব হয় এবং প্রকৃত মুসলিম মালয় ধারার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটে। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সুলতান’ উপাধি গ্রহণ করেন।
খ. শাসনকালের প্রধান অর্জনসমূহ:
- ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা: সুলতান মোজাফফর শাহ ইসলামকে মালাক্কার সংবিধিবদ্ধ রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি আলেম, ফকিহ ও ধর্মীয় পণ্ডিতদের রাজদরবারে উচ্চ পদে আসীন করেন এবং ইসলামি অনুশাসন রাষ্ট্রীয় জীবনে বাস্তবায়ন করেন।
- মালাক্কা সংহিতা (Undang-Undang Melaka) প্রণয়ন: তিনিই প্রথম ইসলামি শরীয়াহ আইনের সাথে সমন্বয় করে মালাক্কার সুপ্রসিদ্ধ লিখিত আইন ‘উন্দাং-উন্দাং মালাক্কা’ এবং সমুদ্রবাণিজ্য সংক্রান্ত ‘উন্দাং-উন্দাং লাউত মালাক্কা’ সংকলন ও কার্যকর করেন। এতে চুরি, হত্যা ও ব্যভিচারের শরয়ী শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।
- শ্যামের (থাইল্যান্ড) দুই দফা আক্রমণ প্রতিহতকরণ: শ্যামদেশের শক্তিশালী রাজা মালাক্কার বাণিজ্যিক সমৃদ্ধিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে ১৪৪৬ ও ১৪৫৬ খ্রিস্টাব্দে দুবার বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে মালাক্কা আক্রমণ করে। সুলতান মোজাফফর শাহ বীরত্বের সাথে উভয় আক্রমণ প্রতিহত করে শ্যামীয়দের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন এবং মালাক্কার স্বাধীনতা চিরতরে সুসংহত করেন।
- যোগ্য সেনাপতি ও বেন্দাহারা তুন পেরাকের উত্থান: এ সফলতার মূলে ছিলেন প্রবাদপ্রতিম সেনাপতি তুন পেরাক (Tun Perak)। সুলতান তাঁর অসামান্য রণকৌশল ও বুদ্ধিমত্তা দেখে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী বা ‘বেনদাহারা’ (Bendahara) পদে নিয়োগ দেন। তুন পেরাকের নেতৃত্বে মালাক্কা পরবর্তীতে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত হয়।
- বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ও রাজধানী সৌন্দর্যকরণ: তাঁর শাসনামলে ভারত, আরব ও পারস্যের বণিকদের অধিকতর নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। তিনি মালাক্কায় সুদৃশ্য জামে মসজিদ ও প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করেন।
৫. পর্তুগিজগণ কর্তৃক মালাক্কা দখলের প্রেক্ষাপট আলোচনা কর। যুদ্ধে মালাক্কার সুলতানের পরাজয়ের কারণসমূহ চিহ্নিত কর।
[Discuss the context of the capture of Malacca by the Portuguese. Identify the causes of the defeat of the Sultan of Malacca in the battle.]
ক. পর্তুগিজদের মালাক্কা দখলের প্রেক্ষাপট:
১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো দা গামা ভারতে পৌঁছানোর পর পর্তুগিজরা মসলা বাণিজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং ইসলামি শক্তিকে ধ্বংস করার সুদূরপ্রসারী ক্রুসেডীয় নীতি গ্রহণ করে। ১৫০৯ সালে ডিয়োগো লোপেজ ডি সিকুইরা মালাক্কায় বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের চেষ্টা করলে সুলতান মাহমুদ শাহ গুজরাটি বণিকদের সতর্কবার্তায় কয়েকজন পর্তুগিজকে বন্দি করেন। এর প্রতিশোধ গ্রহণ এবং প্রাচ্যের বাণিজ্যিক কেন্দ্রবিন্দু দখলের উদ্দেশ্যে ১৫১১ খ্রিস্টাব্দে ভারতের পর্তুগিজ গভর্নর আফোনসো দে আলবুকার্ক (Afonso de Albuquerque) ১৮টি রণতরী ও প্রায় ১,২০০ সশস্ত্র সুপ্রশিক্ষিত সৈন্য নিয়ে মালাক্কা আক্রমণ করেন। প্রবল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৫১১ সালের ২৪ আগস্ট মালাক্কা পর্তুগিজদের করতলগত হয়।
খ. যুদ্ধে মালাক্কার সুলতানের পরাজয়ের কারণসমূহ:
- অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তির অসমতা: মালয় সৈন্যরা তির-ধনুক, বল্লম, ঐতিহ্যবাহী কৃস (Kris) ছুরি এবং প্রাচীন কামানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অপরদিকে পর্তুগিজরা আধুনিক ভারী ব্রোঞ্জের কামান, শক্তিশালী রণতরী ও দূরপাল্লার মাস্কেট বন্দুকে সুসজ্জিত ছিল।
- আভ্যন্তরীণ অনৈক্য ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্র: তৎকালীন সুলতান মাহমুদ শাহ ছিলেন দুর্বল ও বিলাসী। যোগ্য বেন্দাহারা তুন মুতাহিরকে মিথ্যা অপবাদে হত্যা করার ফলে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে চরম বিশৃঙ্খলা, অসন্তোষ ও নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়।
- বিদেশি বণিক ও অমুসলিমদের বিশ্বাসঘাতকতা: মালাক্কার বিশাল অমুসলিম চীনা ও হিন্দু ব্যবসায়ীরা মুসলিম শাসনের প্রতি অনুগত ছিল না। চীনা বণিকরা গোপনে আলবুকার্ককে তাদের নৌকা ধার দেয় এবং স্থানীয় হিন্দু নেতা নিনাচাতু পর্তুগিজদের সামরিক তথ্য সরবরাহ করে বিশ্বাসঘাতকতা করে।
- কৌশলগত ভুল ও সেতুর পতন: মালাক্কা নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি ছিল যুদ্ধের প্রধান কৌশলগত প্রাণকেন্দ্র। আলবুকার্ক ভারী সশস্ত্র নৌবহর নদীর মোহনায় ঢুকিয়ে সেতুর ওপর আক্রমণ চালায়। মালয় বাহিনী সেতুটি ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে রাজধানী দুই ভাগে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
৬. ডাচ কারা? জাভায় ডাচদের প্রবর্তিত কালচার সিস্টেমের সুফল ও কুফল পর্যালোচনা কর।
[Who were the Dutch? Review the merits and demerits of the Culture System introduced by the Dutch in Java.]
ক. ডাচদের পরিচয়:
ইউরোপের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের নেদারল্যান্ডস বা হল্যান্ডের অধিবাসীদের ডাচ (Dutch) বা ওলন্দাজ বলা হয়। ১৬০২ সালে তারা ‘ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ (VOC) গঠন করে প্রাচ্যের বাণিজ্যে আগমন করে এবং পর্তুগিজদের বিতাড়িত করে বাটাভিয়াকে (বর্তমান জাকার্তা) কেন্দ্র করে গোটা ইন্দোনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
খ. কালচার সিস্টেম (Culture System / Cultuuurstelsel):
১৮২৫-১৮৩০ সালের জাভা যুদ্ধের বিপুল ব্যয় এবং বেলজিয়াম বিপ্লবের কারণে নেদারল্যান্ডসের রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে পড়ে। এ অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ডাচ গভর্নর জেনারেল জোহানেস ভ্যান ডেন বোশ (Johannes van den Bosch) জাভার কৃষকদের ওপর এক বাধ্যতামূলক কৃষি ব্যবস্থা চাপিয়ে দেন, যা ইতিহাসে ‘কালচার সিস্টেম’ নামে পরিচিত। এর মূল বিধান ছিল—প্রতিটি গ্রামের কৃষকদের তাদের চাষযোগ্য জমির এক-পঞ্চমাংশ (২০%) জমিতে সরকারি নির্দেশিত রপ্তানিযোগ্য অর্থকরী ফসল (কফি, চিনি, নীল, চা, তামাক) চাষ করতে হবে এবং তা নির্ধারিত পানির দরে ডাচ সরকারের হাতে তুলে দিতে হবে।
গ. কুফল (Demerits / নেতিবাচক প্রভাব):
- চরম দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকট: ধান চাষের সর্বোৎকৃষ্ট জমিগুলো কফি ও আখের চাষে বাধ্যতামূলকভাবে বরাদ্দ করায় সমগ্র জাভায় চালের ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়। ১৮৪০-এর দশকে দেমাক ও গ্রোবোগানে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে।
- বেগার খাটুনি ও অমানবিক নিপীড়ন: কৃষকদের শুধু জমিতে নয়, বরং ফসল প্রক্রিয়াকরণ কারখানা ও বন্দর পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই বাধ্যতামূলক বেগার (Corvee labor) খাটানো হতো।
- ঔপনিবেশিক শোষণ ও লুন্ঠন: এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নেদারল্যান্ডস সরকার শত শত কোটি গিল্ডার মুনাফা অর্জন করে স্বদেশের অর্থনীতিকে ফুলেফেঁপে তোলে, যার বিনিময়ে জাভার কৃষক নিঃস্ব ও ক্রীতদাসে পরিণত হয়। মালটাটুলির বিখ্যাত উপন্যাস ‘ম্যাক্স হ্যাভেলার’-এ ডাচ শোষণের এই করুণ চিত্র উন্মোচিত হয়।
ঘ. সুফল (Merits / পরোক্ষ ইতিবাচক দিক):
- যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: অর্থকরী ফসল বন্দরে নেওয়ার সুবিধার্থে ডাচরা জাভাজুড়ে উন্নত সড়ক, রেলপথ ও নৌবন্দর নির্মাণ করে।
- অর্থকরী ফসলের সাথে পরিচয়: স্থানীয় কৃষকরা আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদাসম্পন্ন আধুনিক বাণিজ্যিক কৃষির প্রযুক্তি ও সেচ ব্যবস্থার সংস্পর্শ লাভ করে।
- জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ: এ নির্মম শোষণই পরবর্তীকালে ইন্দোনেশীয় কৃষকদের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ বপন করে।
৭. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠনের পটভূমি আলোচনা কর। কীভাবে ব্রিটিশরা মালয় ভূখণ্ডে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল?
[Discuss the background of the formation of the East India Company. How did the British establish dominance in the Malay lands?]
ক. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠনের পটভূমি:
ষোড়শ শতকের শেষভাগে ডাচ ও পর্তুগিজদের মসলা বাণিজ্যের একচেটিয়া আধিপত্য এবং বিশেষ করে ডাচদের কর্তৃক মসলার দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে ইংল্যান্ডের বণিকরা সংক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর রানী প্রথম এলিজাবেথের রাজকীয় সনদবলে একদল প্রভাবশালী লন্ডন ব্যবসায়ী ‘ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ (British East India Company) প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রবেশ করতে চাইলেও ১৬২৩ সালে আম্বোয়নায় ডাচদের হাতে ব্রিটিশদের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের (Amboyna Massacre) পর তারা সাময়িকভাবে ভারতে নজর দেয়। পরবর্তীতে চীন বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা পুনরায় মালয় উপদ্বীপে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশল গ্রহণ করে।
খ. মালয় ভূখণ্ডে ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর্যায়সমূহ:
- পেনাং অধিগ্রহণ (১৭৮৬): ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ফ্রান্সিস লাইট কেদাহর সুলতানকে শ্যামীয় আক্রমণ থেকে সুরক্ষার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কৌশলগত পেনাং দ্বীপ লিজ নেন এবং পরবর্তীতে এটিকে ব্রিটিশ বাণিজ্য ঘাঁটিতে রূপান্তর করেন।
- সিঙ্গাপুর প্রতিষ্ঠা (১৮১৯): স্যার স্ট্যামফোর্ড র্যাফেলস জোহরের সুলতানের অভ্যন্তরীণ উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে এক চুক্তি সম্পাদন করেন এবং ১৮১৯ সালে সিঙ্গাপুরকে একটি মুক্ত বাণিজ্য বন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন, যা অচিরেই ব্রিটিশদের প্রধান নৌঘাঁটিতে পরিণত হয়।
- মালাক্কা লাভ ও প্রণালী উপনিবেশ গঠন (১৮২৬): ১৮২৪ সালের ইঙ্গ-ওলন্দাজ চুক্তির মাধ্যমে ডাচদের নিকট থেকে মালাক্কা লাভ করে ব্রিটিশরা পেনাং, মালাক্কা ও সিঙ্গাপুরকে একত্রিত করে ‘স্ট্রেইটস সেটেলমেন্টস’ (Straits Settlements) গঠন করে।
- পাংকোর চুক্তি ও আবাসিক ব্যবস্থা (১৮৭৪): মালয় উপদ্বীপের অভ্যন্তরীণ খনিজ টিনসমৃদ্ধ রাজ্য পেরাকে চীনা খনি শ্রমিকদের দাঙ্গা ও উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশরা ১৮৭৪ সালে ঐতিহাসিক ‘পাংকোর চুক্তি’ (Pangkor Treaty) চাপিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে সুলতানের ওপর একজন ‘ব্রিটিশ রেসিডেন্ট’ (British Resident) চাপানো হয়, যার পরামর্শ মানা বাধ্যতামূলক ছিল।
- ফেডারেটেড ও নন-ফেডারেটেড মালয় স্টেটস: ক্রমান্বয়ে সেলাঙ্গর, পাহাং ও নেগ্রি সেম্বিলানে রেসিডেন্ট বসিয়ে ১৮৯৬ সালে গঠন করা হয় ‘ফেডারেটেড মালয় স্টেটস’ এবং পরবর্তীতে উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো দখল করে সমগ্র মালয়ে একচ্ছত্র ব্রিটিশ উপনিবেশ কায়েমি হয়।
৮. ইন্দোনেশিয়ায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পটভূমি এবং প্রভাব পর্যালোচনা কর।
[Review the background and impact of the nationalist movement in Indonesia.]
ক. জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পটভূমি:
তিন শতকেরও অধিককাল ধরে ডাচ ঔপনিবেশিক শোষণ, কালচার সিস্টেমের বর্বরতা এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ইন্দোনেশিয়ার গণমানুষের মাঝে ঐক্য ও জাতীয়তাবাদের তীব্র স্ফুরণ ঘটে।
- ডাচদের এথিক্যাল পলিসি (Ethical Policy, 1901): তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে ডাচ সরকার শিক্ষাবিস্তার ও সেচব্যবস্থার যে ‘নৈতিক নীতি’ গ্রহণ করে, তার ফলে ইন্দোনেশিয়ায় একদল আধুনিক ও প্রাশ্চাত্যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হয়। তারাই জাতীয়তাবাদী চেতনার নেতৃত্ব দেন।
- মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি পুনর্জাগরণ: জামালুদ্দীন আফগানী ও মুহাম্মদ আবদুহর প্যান-ইসলামিজম ও সংস্কার আন্দোলনের তরঙ্গে বহু ইন্দোনেশীয় তরুণ কায়রো ও মক্কায় অধ্যয়ন করে স্বদেশে ফিরে এসে উপনিবেশবাদবিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করেন।
- সংগঠনসমূহের আত্মপ্রকাশ: ১৯০৮ সালে আধুনিক বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন ‘বুদি উতোমো’ (Budi Utomo) গঠিত হয়। এরপর ১৯১২ সালে ওমর সাঈদ তজোক্রোয়ামিনোতোর নেতৃত্বে গঠিত হয় প্রথম প্রকৃত গণআন্দোলনমুখী সংগঠন ‘সারেকাত ইসলাম’ (Sarekat Islam), যা কোটি কোটি মুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ করে। এরপর ১৯২৭ সালে আহমদ সুকর্ণ প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইন্দোনেশিয়ান ন্যাশনালিস্ট পার্টি’ (PNI)।
খ. জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব:
- ঐক্যের জাতীয় প্রতীক—যুব অঙ্গীকার (Sumpah Pemuda, 1928): ১৯২৮ সালের ২৮ অক্টোবর দ্বিতীয় যুব কংগ্রেসে ঐতিহাসিক যুব অঙ্গীকার ঘোষিত হয়: এক মাতৃভূমি (ইন্দোনেশিয়া), এক জাতি (ইন্দোনেশীয় জাতি), এবং এক ভাষা (বাহাসা ইন্দোনেশিয়া)। এটি দ্বীপভিত্তিক আঞ্চলিকতাকে সমূলে বিনষ্ট করে এক অখণ্ড জাতীয় রূপ উপহার দেয়।
- রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ: সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও ওলামা সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ডাচদের কর ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সুকর্ণ, হাত্তা ও শাহরিয়ারের মতো দেশপ্রেমিক নেতারা কারাবরণ ও নির্বাসন ভোগ করেও স্বাধীনতার দাবি অক্ষুণ্ণ রাখেন।
- ১৯৪৫ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা: এ দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ডাচদের পরাজয় ও জাপানি দখলদারিত্বের অবসানের পর ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট ড. আহমদ সুকর্ণ ও মুহাম্মদ হাত্তা আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি
৯. ইউরোপীয়রা কেন প্রাচ্যে আগমন করেছিল?
[Why did the Europeans come to the East?]
পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর প্রাচ্যে আগমনের পেছনে একাধিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ ক্রিয়াশীল ছিল:
- কনস্টান্টিনোপলের পতন (১৪৫৩): উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ কনস্টান্টিনোপল বিজয় করলে ইউরোপীয়দের ঐতিহ্যবাহী স্থল বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে নতুন সমুদ্রপথ আবিষ্কার অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
- মসলা বাণিজ্যের একচ্ছত্র লাভ (Spice Trade): মাংস সংরক্ষণ ও স্বাদের জন্য গোলমরিচ, লবঙ্গ ও জায়ফলের চাহিদা ইউরোপে ছিল আকাশচুম্বী। আরব ও ভেনিসীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দিয়ে সরাসরি প্রাচ্য থেকে বিপুল লাভে মসলা অর্জনের তীব্র লালসা।
- খ্রিস্টধর্ম প্রচার ও ইসলামবিরোধী ক্রুসেড: প্রাচ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করা এবং বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের অর্থনৈতিক ক্ষমতার উৎস ধ্বংস করা ইউরোপীয়দের প্রধান মিশন ছিল (God, Gold, and Glory)।
১০. চীন-মালাক্কা সম্পর্কের উপর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী রচনা কর।
[Compose a brief account of the China-Malacca relations.]
পঞ্চদশ শতাব্দীর সূচনায় চীন ও নবগঠিত মালাক্কা সালতানাতের মধ্যকার কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক মালাক্কার অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছিল:
- কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও সুরক্ষা: শ্যামদেশের আগ্রাসন থেকে বাঁচতে প্রতিষ্ঠাতা পরমেশ্বর চীনা মিং সম্রাটের আনুগত্য স্বীকার করেন। ১৪০৫ সালে চীনা সম্রাট মালাক্কাকে সার্বভৌম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রাজকীয় সিলমোহর ও হলুদ ছাতা উপহার দেন।
- অ্যাডমিরাল চেং হোর ঐতিহাসিক সফর: বিখ্যাত মুসলিম নৌ-সেনাপতি জেং হে তাঁর সুবিশাল বহর নিয়ে একাধিকবার মালাক্কায় অবস্থান করেন এবং এটিকে চীনের মূল নৌ-ঘাঁটিতে রূপান্তর করেন।
- বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ: এর ফলে চীন ও মালাক্কার মধ্যে অবাধ বাণিজ্য গড়ে ওঠে। চীনাদের অভিবাসনের ফলে মালাক্কায় এক অনন্য মিশ্র সংস্কৃতির উদ্ভব হয়, যা ‘বাবা-নিওনিয়া’ (Peranakan) নামে খ্যাত।
১১. ১৮২৪ সালে স্বাক্ষরিত ইঙ্গ-ওলন্দাজ চুক্তির পটভূমি এবং ফলাফল উল্লেখ কর।
[Mention the background and consequences of the Anglo-Dutch Treaty signed in 1824.]
পটভূমি: ১৮১৯ সালে ব্রিটিশরা সিঙ্গাপুর প্রতিষ্ঠা করলে ডাচরা ক্ষুব্ধ হয়। মালয় দ্বীপপুঞ্জে ব্রিটিশ ও ডাচদের মধ্যকার সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এড়াতে এবং বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ১৮২৪ সালের ১৭ মার্চ লন্ডনে উভয় পরাশক্তি ঐতিহাসিক ‘ইঙ্গ-ওলন্দাজ চুক্তি’ (Anglo-Dutch Treaty of 1824) স্বাক্ষর করে।
- মালাক্কা প্রণালীকে বিভাজন রেখা নির্ধারণ: মালাক্কা প্রণালী বরাবর কাল্পনিক সীমারেখা টেনে এর উত্তর অঞ্চল (মালয় উপদ্বীপ ও সিঙ্গাপুর) ব্রিটিশ প্রভাববলয়ে এবং দক্ষিণ অঞ্চল (সুমাত্রা, জাভাসহ সমগ্র ইন্দোনেশিয়া) ডাচদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া হয়।
- উপনিবেশ অদল-বদল: ব্রিটিশরা সুমাত্রার বেনকুলেন ডাচদের হাতে ছেড়ে দেয় এবং ডাচরা মালয় উপদ্বীপের মালাক্কা বন্দর ব্রিটিশদের অর্পণ করে।
- ফলাফল: মালয় জাতির হাজার বছরের ঐতিহাসিক ঐক্য চিরতরে দ্বিধাবিভক্ত হয়, যার ফলে পরবর্তীতে আধুনিক মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া নামক দুটি পৃথক রাষ্ট্রের ভৌগোলিক বিভাজন নিশ্চিত হয়।
১২. ইন্দোনেশিয়ায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থান সম্পর্কে ধারণা দাও।
[Give an idea about the rise of the nationalist movement in Indonesia.]
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ডাচ শাসনের নির্মম অর্থনৈতিক শোষণ এবং জাতিগত বৈষম্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইন্দোনেশিয়ায় আধুনিক জাতীয়তাবাদের অপ্রতিরোধ্য উত্থান ঘটে:
- বুদি উতোমো (১৯০৮): জাভার তরুণ চিকিৎসকদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রথম সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক জাতীয়তাবাদী সংগঠন, যা ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় জাগরণের সূচনা দিবস হিসেবে পালিত হয়।
- সারেকাত ইসলাম (১৯১২): মুসলিম ব্যবসায়ীদের হাত ধরে গঠিত হয়ে এটি দ্রুত গণমানুষের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। ইসলামের সাম্য ও ঐক্যের ধারণাকে কাজে লাগিয়ে এটি ডাচদের বিরুদ্ধে প্রথম ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টি করে।
- সুকর্ণের নেতৃত্ব ও পূর্ণ স্বরাজ: ড. আহমদ সুকর্ণের নেতৃত্বে ১৯২৭ সালে গঠিত পিএনআই (PNI) কোনো আপস নয়, বরং সরাসরি ডাচদের উৎখাত করে পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দেয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলাম প্রচারের প্রধান মাধ্যম কী ছিল?
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলাম কোনো সামরিক অভিযানে নয়, বরং আরব ও গুজরাটি মুসলিম বণিকদের সততা, বৈবাহিক সম্পর্ক এবং সুফি সাধকদের আধ্যাত্মিক আদর্শের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে বিস্তার লাভ করেছিল।
২. মালাক্কা সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
মালাক্কা সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সুমাত্রার পলাতক রাজপুত্র পরমেশ্বর, যিনি ১৪০২-১৪০৩ খ্রিস্টাব্দে মালাক্কা প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে সুলতান ইসকান্দার শাহ নাম ধারণ করেন।
৩. পর্তুগিজ সেনাপতি আলবুকার্ক কত খ্রিস্টাব্দে মালাক্কা দখল করেন?
পর্তুগিজ নৌ-সেনাপতি আফোনসো দে আলবুকার্ক ১৫১১ খ্রিস্টাব্দের ২৪ আগস্ট তীব্র যুদ্ধের পর মুসলিম মালাক্কা সালতানাতের রাজধানী দখল করেন।
৪. জাভায় ওলন্দাজদের প্রবর্তিত ‘কালচার সিস্টেম’ কী?
১৮৩০ সালে ডাচ গভর্নর জেনারেল ভ্যান ডেন বোশ কর্তৃক প্রবর্তিত একটি বাধ্যতামূলক কৃষি ব্যবস্থা, যার অধীনে কৃষকদের জমির এক-পঞ্চমাংশে বাধ্যতামূলকভাবে কফি, নীল ও আখের মতো রপ্তানি ফসল উৎপাদন করে ডাচদের দিতে হতো।
৫. ১৮২৪ সালের ইঙ্গ-ওলন্দাজ চুক্তির প্রধান প্রভাব কী ছিল?
এ চুক্তির মাধ্যমে মালাক্কা প্রণালী বরাবর ব্রিটিশ ও ডাচদের সীমারেখা নির্ধারিত হয়, যা মালয় ভূখণ্ডকে স্থায়ীভাবে বিভক্ত করে আজকের মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া রাষ্ট্রের রূপরেখা তৈরি করে দেয়।
৬. ইন্দোনেশিয়ায় জাতীয়তাবাদের প্রথম প্রভাবশালী গণসংগঠন কোনটি ছিল?
১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘সারেকাত ইসলাম’ (Sarekat Islam) ছিল ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম ব্যাপক প্রভাবশালী গণসংগঠন।