ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2023
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ (السيرة النبوية)
বিষয় কোড: 205301 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) : ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)
١- اكتب عن تعريف السيرة، ومكانتها في التاريخ وأهمية دراستها بالتفصيل-
[السيرة এর পরিচয়, ইতিহাসে এর অবস্থান ও তা অধ্যয়নের গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত লেখ।]
ক. আস-সিরাহ-এর পরিচয় ও সংজ্ঞা:
আভিধানিক অর্থ: আরবি ‘আস-সিরাহ’ (السيرة) শব্দটি মূলধাতু ‘সায়রুন’ (سير) থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ পথ চলা, চালচলন, স্বভাব-চরিত্র, জীবনপদ্ধতি ও জীবনবৃত্তান্ত।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামি পরিভাষায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-এর পবিত্র জন্ম, শৈশব, নবুওয়াত লাভ, দ্বীনের দাওয়াত, জিহাদ, হিজরত, রাষ্ট্রপরিচালনা, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং ওফাত পর্যন্ত সামগ্রিক জীবনের নিখুঁত, প্রামাণ্য ও ধারাবাহিক ইতিবৃত্তকে ‘আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ’ (السيرة النبوية) বলা হয়।
খ. ইতিহাসে সিরাতের অনন্য অবস্থান:
মানবজাতির লিখিত ইতিহাসে মহানবী (সা.)-এর সিরাতের মতো এত প্রামাণ্য, নিরপেক্ষ ও অনুপুঙ্খ সংরক্ষিত জীবনী আর দ্বিতীয়টি নেই। সনদের ধারাবাহিকতা (ইসনাদ), প্রত্যক্ষদর্শী সাহাবিদের সাক্ষ্য এবং ঐতিহাসিক নির্ভুলতার নিরিখে সিরাত সাহিত্য বিশ্ব ইতিহাস চর্চায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করেছে। এটি কেবল কোনো ব্যক্তির জীবনী নয়, বরং মানবসভ্যতার এক বিপ্লবাত্মক রূপান্তরের জীবন্ত ইতিহাস।
গ. সিরাত অধ্যয়নের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:
- কুরআনের ব্যবহারিক রূপ অনুধাবন: হযরত আয়েশা (রা.)-কে নবীজির চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “কানা খুলুকুহুল কুরআন” (পবিত্র কুরআনই ছিল তাঁর জীবন্ত চরিত্র)। সিরাত জানা ব্যতিরেকে কুরআনের বাস্তব প্রয়োগ বোঝা অসম্ভব।
- উসওয়াতুন হাসানাহ বা সর্বোত্তম আদর্শ গ্রহণ: মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন: “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মাঝে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।” (সূরা আল-আহযাব: ২১)। সিরাত অধ্যয়নের মাধ্যমেই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহর অনুপম সুন্নাহ অনুসরণ করা সম্ভব।
- ঈমানের পূর্ণতা অর্জন: নবীপ্রেম ঈমানের অন্যতম প্রধান শর্ত। বিশ্বনবীর ত্যাগ, ধৈর্য ও উম্মতের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা অনুধাবনের প্রধান মাধ্যম হলো সিরাত চর্চা।
- ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকনির্দেশনা: অত্যাচারী ব্যবস্থার মুখে শান্তিপূর্ণ দাওয়াত, মদিনার মতো বহুত্ববাদী কল্যাণরাষ্ট্র গঠন এবং ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা কায়েমে সিরাত বিশ্ববাসীর জন্য চিরন্তন গাইডলাইন।
٢- تحدث عن أحوال العرب الاجتماعية والاقتصادية قبل بعثة الرسول صلى الله عليه وسلم-
[রসুল (স) এর নবুওয়াতের পূর্বে আরবদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা আলোচনা কর।]
ক. ভূমিকা:
নবী করিম (সা.)-এর আগমনের পূর্ববর্তী আরবদের ইতিহাস ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতার যুগ নামে পরিচিত। এ যুগে আরবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো চরম অরাজকতা, নিষ্ঠুরতা ও বৈষম্যে নিমজ্জিত ছিল।
খ. প্রাক-ইসলামি আরবের সামাজিক অবস্থা:
- গোত্রীয় বিদ্বেষ ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ: আরব সমাজ বিভিন্ন গোত্রে (কাবিলা) বিভক্ত ছিল। ‘আসাবিয়াহ’ বা অন্ধ গোত্রপ্রীতির কারণে সামান্য অজুহাতে (যেমন ঘোড়দৌড় বা উটের পানি পান) রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হতো এবং তা বংশপরম্পরায় চলত (যেমন বাসুসের যুদ্ধ, বুআসের যুদ্ধ, ফিজার যুদ্ধ)।
- নারী জাতির চরম লাঞ্ছনা ও কন্যাশিশু জীবন্ত প্রোথিতকরণ: সমাজে নারীদের কোনো মানবিক অধিকার বা উত্তরাধিকার ছিল না; তাদের পণ্যদ্রব্যের মতো ভোগ ও কেনাবেচা করা হতো। কন্যাসন্তানের জন্মকে অপমানজনক মনে করে পিতা নিজ হাতে তাকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলত (ওয়াদুল বানাত)। পবিত্র কুরআনে এ বর্বরতার কঠোর নিন্দা করা হয়েছে (সূরা আত-তাকভীর: ৮-৯)।
- দাস-দাসীদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন: দাস-দাসীদের জীবন্ত পশুর ন্যায় বিবেচনা করা হতো। প্রভুরা তাদের ওপর নির্মম শারীরিক অত্যাচার চালাত এবং তাদের জীবনের কোনো আইনগত নিরাপত্তা ছিল না।
- নৈতিক অধঃপতন: মদ্যপান, জুয়াখেলা (মাইসির), ব্যভিচার ও অশ্লীল নৃত্যগীত সামাজিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
গ. প্রাক-ইসলামি আরবের অর্থনৈতিক অবস্থা:
- সুদের বর্বর শোষণ (রিবা): অর্থনীতি ছিল পুরোপুরি সুদী মহাজনদের কবলে। চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ আদায় করা হতো; ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণগ্রহীতার স্ত্রী ও সন্তানদের দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হতো।
- বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতি: মক্কার কুরাইশগণ গ্রীষ্মকালে সিরিয়া এবং শীতকালে ইয়েমেনে বাণিজ্য কাফেলা পরিচালনা করত (সূরা কুরাইশ: রিহলাতাশ শিতা-ই ওয়াস সাইফ)। ওকাজ, মাজান্না ও যুল মাজাযের মেলায় পণ্যের পাশাপাশি জুয়া ও অনৈতিক লেনদেন চলত।
- লুটতরাজ ও রাহাজানি (গাজভ): মরুবাসী যাযাবর বেদুইনদের জীবিকার অন্যতম উৎস ছিল মরুযাত্রী কাফেলা ও প্রতিবেশী গোত্রের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে গবাদিপশু ও মালামাল লুণ্ঠন করা।
- কৃষি ও পশুপালন: তায়েফ, ইয়াসরিব ও খায়বারের মতো মরূদ্যানসমূহে খেজুর ও আঙুরের চাষ হতো এবং সাধারণ বেদুইনরা উট ও ভেড়া পালন করে দুধ ও পশম বিক্রি করে জীবনধারণ করত।
٣- من خديجة بنت خويلد؟ متى تزوجها النبى صلى الله عليه وسلم؟ أذكر الأحداث المتعلقة بزواج النبى صلى الله عليه وسلم-
[খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ কে? নবিজী (স) কখন তাকে বিয়ে করেন? নবিজী (স) এর বিয়ে সম্পর্কিত ঘটনাবলি উল্লেখ কর।]
ক. হযরত খাদিজা (রা.)-এর পরিচয়:
হযরত খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) ছিলেন কুরাইশ বংশের আসাদ গোত্রের এক পরম মহীয়সী নারী। তিনি ছিলেন আরবের শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ী এবং অনুপম চরিত্র ও পবিত্রতার কারণে জাহেলি যুগেই সমগ্র আরবে ‘তাহিরা’ (পবিত্রা) উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। পূর্বে দুবার তাঁর বিবাহ হয়েছিল এবং তিনি বিধবা ছিলেন।
খ. বিবাহের সময়কাল:
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স যখন ২৫ বছর এবং হযরত খাদিজা (রা.)-এর বয়স যখন ৪০ বছর, তখন ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁদের শুভ বিবাহ সুসম্পন্ন হয়।
গ. বিবাহের প্রেক্ষাপট ও ঘটনাবলি:
- সিরিয়া বাণিজ্য সফর ও আমানতদারি: নবীজির সততা ও ‘আল-আমিন’ খ্যাতির কথা শুনে হযরত খাদিজা (রা.) স্বীয় বাণিজ্য পণ্যের দায়িত্ব দিয়ে তাঁকে সিরিয়ার বুসরা বন্দরে পাঠান এবং সাহায্যের জন্য স্বীয় বিশ্বস্ত দাস মাইসারাকে সঙ্গী করেন। এ সফরে অভূতপূর্ব ব্যবসায়িক মুনাফা অর্জিত হয়।
- মাইসারার অলৌকিক ও চারিত্রিক সাক্ষ্য: সফর থেকে ফিরে মাইসারা খাদিজা (রা.)-এর নিকট বিশ্বনবীর অনুপম সততা, সদাচরণ এবং প্রচণ্ড রোদের সময় মেঘমালা দ্বারা ছায়া দেওয়ার মতো অলৌকিক ঘটনাবলি বর্ণনা করেন। এতে খাদিজা (রা.) গভীর শ্রদ্ধায় আপ্লুত হন।
- বিয়ের প্রস্তাব প্রেরণ: খাদিজা (রা.) তাঁর বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনাব্বিহের মাধ্যমে বিশ্বনবী (সা.)-এর নিকট বিয়ের প্রস্তাব প্রেরণ করেন। নবীজি স্বীয় চাচা আবু তালিবের সাথে পরামর্শ করে এ প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করেন।
- শুভ বিবাহ অনুষ্ঠান: উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিবাহ মজলিস অনুষ্ঠিত হয়। চাচা আবু তালিব বিবাহের খুতবা পাঠ করেন এবং খাদিজার পক্ষে তাঁর চাচাতো ভাই ওরাকা বিন নওফেল উপস্থিত ছিলেন। মোহরানা হিসেবে বিশটি উট ধার্য করা হয়। এ দাম্পত্য জীবন ছিল ২৫ বছরের অফুরন্ত ভালোবাসা, সহানুভূতি ও ত্যাগের এক শাশ্বত উপাখ্যান।
٤- تحدث عن بدؤ نزول الوحى على الرسول صلى الله عليه وسلم وكيفيته في ضوء القرآن والسنة-
[রসুল (স) এর উপর ওহি অবতরণের সূচনা ও পদ্ধতি সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আলোচনা কর।]
ক. ওহি অবতরণের সূচনা ও হেরা গুহার নির্জন সাধনা:
নবুওয়াত লাভের পূর্বলগ্নে মহানবী (সা.)-এর নিকট নির্জনতা প্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি মক্কার অদূরে জাবালে নূরের হেরা গুহায় ছাতু ও পানি নিয়ে দিনরাত স্রষ্টার ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। এ সময় তিনি যেসব স্বপ্ন দেখতেন, তা সকালের সূর্যের আলোর মতো হুবহু সত্যে পরিণত হতো (রু’ইয়া সাদিকাহ)।
অবশেষে ৬১০ খ্রিস্টাব্দের পবিত্র রমজান মাসের এক বরকতময় রজনীতে (লাইলাতুল কদর) হযরত জিবরীল (আ.) মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি নিয়ে আবির্ভূত হন। সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদিস অনুসারে, জিবরীল (আ.) এসে বললেন—“ইক্বরা” (পাঠ করুন)। নবীজি বললেন, “মা আনা বিক্বারী” (আমি পড়তে জানি না)। তখন ফেরেশতা তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে এমন জোরে আলিঙ্গন করলেন যে তিনি নিদারুণ কষ্ট অনুভব করলেন। এভাবে তিনবার আলিঙ্গনের পর কুরআনের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাজিল হয়:
“পাঠ করুন আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আর আপনার প্রতিপালক পরম দয়ালু। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।” (সূরা আল-আলাক: ১-৫)।
খ. ওহি অবতরণের পদ্ধতিসমূহ (Modes of Revelation):
সুন্নাহ ও কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী রসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর ওহি প্রধানত নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে অবতীর্ণ হতো:
- ঘণ্টাধ্বনির ন্যায় (সালসালাতুল জারাস): ওহির সর্বাধিক কষ্টকর পদ্ধতি ছিল অবিরাম ঘণ্টার ধ্বনির মতো শব্দ হওয়া। তীব্র শীতের দিনেও নবীজির কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়ত এবং উটের ওপর সওয়ার থাকলে উটটি মাটির সাথে নুয়ে পড়ত।
- মানুষের আকৃতিতে ফেরেশতার আগমন: জিবরীল (আ.) প্রখ্যাত সাহাবি হযরত দিহইয়া কালবী (রা.)-এর সুরত ধরে মানুষের বেশে এসে নবীজির সাথে কথা বলতেন (যেমন হাদিসে জিবরীল)।
- জিবরীল (আ.)-এর আদি রূপে দর্শন: নবীজি তাঁর জীবনে দুবার জিবরীল (আ.)-কে তাঁর আসল ছয়শত ডানাবিশিষ্ট আসমান-জমিনব্যাপী সুবিশাল রূপ প্রত্যক্ষ করেছিলেন (হেরা গুহায় এবং মিরাজের রাতে সিদরাতুল মুনতাহায়)।
- অন্তরে সরাসরি প্রক্ষিপ্তকরণ (ইলকা ফিল কালব): কোনো বাহ্যিক উপস্থিতি ব্যতিরেকে সরাসরি নবীজির পবিত্র হৃদয়ে আল্লাহর বার্তা প্রতিস্থাপিত হতো।
- পর্দার অন্তরাল থেকে প্রত্যক্ষ বাক্যালাপ: মিরাজের রজনীতে মহান আল্লাহ তাআলা কোনো মাধ্যম ব্যতিরেকে সরাসরি বিশ্বনবীর সাথে কথা বলেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেন।
٥- بين أسباب هجرة الرسول صلى الله عليه وسلم إلى المدينة المنورة ونتائجها-
[রসুল (স) এর মদিনা হিজরতের কারণ ও ফলাফলসমূহ বর্ণনা কর।]
ক. মদিনা হিজরতের প্রধান কারণসমূহ (৬২২ খ্রি.):
- কুরাইশদের অমানবিক নির্যাতন ও বয়কট: মক্কায় ইসলাম গ্রহণকারী দুর্বল ও দাস সাহাবিদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয় এবং শিয়াবে আবু তালিবে তিন বছর অবরুদ্ধ করে মুসলিমদের অনাহারে রাখা হয়।
- আশ্রয়দাতাদের ওফাত ও আশার সমাধি (আমুল হুজন): নবুওয়াতের দশম বর্ষে পরম হিতাকাঙ্ক্ষী চাচা আবু তালিব এবং মমতাময়ী সহধর্মিণী খাদিজা (রা.)-এর ওফাত ঘটলে মক্কায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর নির্যাতন চরম আকার ধারণ করে। তায়েফের রক্তক্ষয়ী সফরও কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে পারেনি।
- আকাবার ঐতিহাসিক বায়আত: মদিনার আওস ও খাজরাজ গোত্রের নেতৃবৃন্দ আকাবার ময়দানে পরপর দুবছর শপথ গ্রহণ করে বিশ্বনবীকে মদিনায় আগমন এবং জানমাল দিয়ে সুরক্ষার অঙ্গীকার প্রদান করেন।
- দারুন নদওয়ায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র: কুরাইশ নেতৃবৃন্দ দারুন নদওয়ায় সম্মিলিত হয়ে প্রতিটি গোত্র থেকে একজন শক্তিশালী যুবক নিয়ে নবীজিকে ঘুমন্ত অবস্থায় সমস্বরে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়।
- আল্লাহ তাআলার ঐশী নির্দেশ: সবশেষে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করার প্রত্যক্ষ নির্দেশ নাজিল হয় (সূরা আল-ইসরা: ৮০)।
খ. মদিনা হিজরতের ফলাফল ও ঐতিহাসিক সুদূরপ্রসারী প্রভাব:
- নির্যাতিত অবস্থা থেকে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বে উত্তরণ: হিজরতের মাধ্যমে ইসলামের প্রতিরক্ষামূলক ও নির্যাতিত মাক্কী জীবনের অবসান ঘটে এবং স্বাধীন সার্বভৌম ইসলামি রাষ্ট্রের সূচনা হয়।
- মদিনা সনদ ও প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা: মদিনায় পৌঁছে নবীজি ইহুদি, পৌত্তলিক ও মুসলিমদের মধ্যে ৪৭টি ধারার ঐতিহাসিক ‘মদিনা সনদ’ প্রণয়ন করে পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধানভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র কায়েম করেন।
- মুহাজির ও আনসারদের ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ববন্ধন (মুওয়াখাত): মক্কার সর্বস্বান্ত মুহাজিরদের সাথে মদিনার আনসারদের যে অতুলনীয় আত্মিক ও অর্থনৈতিক ভ্রাতৃত্ব কায়েম করা হয়, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
- হিজরি সনের প্রবর্তন: খলিফা হযরত উমর (রা.) এই ঐতিহাসিক মোড় ঘোরানো ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে হিজরতের বছর থেকেই ইসলামি ক্যালেন্ডার বা হিজরি সনের গণনা শুরু করেন।
٦- لماذا وقعت غزوة أحد؟ وما هي أسباب انهزام المسلمين فيها؟
[উহুদ যুদ্ধ কেন সংঘটিত হয়? উহাতে মুসলমানদের পরাজয়ের কারণসমূহ কী?]
ক. উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার কারণসমূহ (৬২৫ খ্রি. / ৩ হিজরি):
- বদর যুদ্ধের শোচনীয় পরাজয়ের প্রতিশোধ: বদর যুদ্ধে কুরাইশদের শীর্ষ ৭০ জন নেতা নিহত হওয়ায় মক্কার প্রতিটি ঘরে শোকের মাতম ওঠে। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে তারা প্রতিশোধ গ্রহণের শপথ নেয়।
- সিরিয়া বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার: মদিনার মুসলিমদের কারণে কুরাইশদের লোহিত সাগর তীরবর্তী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে যায়। অর্থনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা মদিনা ধ্বংসের উন্মাদনায় মাতে।
- ইহুদি ও মুনাফিকদের উসকানি: মদিনার নির্বাসিত ইহুদি এবং আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মুনাফিক চক্র মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের সামরিক আক্রমণে প্রত্যক্ষ আর্থিক ও সামরিক সহযোগিতার প্রলোভন দেখায়।
খ. যুদ্ধে মুসলমানদের সাময়িক বিপর্যয়ের কারণসমূহ:
- তীরন্দাজ দলের রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ অমান্যকরণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) জাবালে রুমাত (তীরন্দাজদের পাহাড়)-এ আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের নেতৃত্বে ৫০ জন তীরন্দাজ মোতায়েন করে কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন—“আমরা জয়ী হই বা পরাজিত হই, শকুনে আমাদের গোশত খুঁটে খেলেও আমার নির্দেশ ছাড়া তোমরা স্থান ত্যাগ করবে না।” কিন্তু প্রাথমিক বিজয়ের পর গনিমতের মাল সংগ্রহের লোভে ৪০ জন তীরন্দাজ নির্দেশ অমান্য করে পাহাড় ত্যাগ করে।
- খালিদ বিন ওয়ালিদের ঝটিকা আক্রমণ: কুরাইশ অশ্বারোহী সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ অরক্ষিত গিরিপথ লক্ষ্য করে পেছন দিক থেকে অতর্কিত প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। ফলে জয় পরাজয়ে রূপ নেয় এবং মুসলিমরা দুই দিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
- রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাহাদাতের গুজব: যুদ্ধের ময়দানে ইবনে কামিয়া কর্তৃক রটে দেওয়া হয় যে মহানবী (সা.) শহীদ হয়েছেন। এ নিদারুণ সংবাদে সাধারণ সাহাবিরা দিশেহারা ও মনোবলহীন হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন।
- মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের বিশ্বাসঘাতকতা: যুদ্ধের প্রাক্কালে মদিনা থেকে বের হয়ে এক-তৃতীয়াংশ (৩০০ জন) সৈন্য নিয়ে মুনাফিক সর্দার দলত্যাগ করে ফিরে আসে, যা মুসলিম বাহিনীর ওপর প্রাথমিক মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে।
٧- اذكر شروط صلح الحديبية، ثم بين أهمية هذا الصلح في التاريخ الإسلامي-
[হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তাবলি উল্লেখ কর। অতঃপর ইসলামের ইতিহাসে উক্ত সন্ধির গুরুত্ব পর্যালোচনা কর।]
ক. হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রধান শর্তাবলি (৬২৮ খ্রি. / ৬ হিজরি):
৬ হিজরিতে ১,৪০০ সাহাবি নিয়ে উমরাহ পালন করতে গিয়ে মক্কার উপকণ্ঠে হুদায়বিয়া নামক স্থানে কুরাইশ প্রতিনিধি সুহাইল ইবনে আমরের সাথে নবীজির ১০ বছর মেয়াদি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শর্তগুলো ছিল:
- মুসলিমরা এ বছর উমরাহ না করে মদিনায় ফিরে যাবে এবং পরবর্তী বছর মাত্র তিন দিনের জন্য নিরস্ত্র অবস্থায় মক্কায় এসে উমরাহ পালন করতে পারবে।
- আগামী ১০ বছর উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো যুদ্ধ হবে না, পূর্ণ শান্তি বজায় থাকবে।
- মক্কার কোনো ব্যক্তি অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া মদিনায় আশ্রয় নিলে তাকে মক্কায় ফেরত দিতে হবে; কিন্তু মদিনার কোনো মুসলিম মক্কায় এলে তাকে ফেরত দেওয়া হবে না।
- আরবের যেকোনো গোত্র স্বাধীনভাবে মুসলিমদের বা কুরাইশদের সাথে মিত্রতা চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে (এর আলোকেই খুজাআ গোত্র মুসলিমদের এবং বকর গোত্র কুরাইশদের সাথে জোট বাঁধে)।
খ. ইসলামের ইতিহাসে হুদায়বিয়ার সন্ধির তাৎপর্য:
- কুরআনের ঘোষণা—ফাতহুম মুবীন (সুস্পষ্ট বিজয়): আপাতদৃষ্টিতে শর্তগুলো অপমানজনক মনে হলেও মহান আল্লাহ এ সন্ধিকে ‘ফাতহুম মুবীন’ বা প্রকাশ্য বিজয় ঘোষণা করেন (সূরা আল-ফাতহ: ১)। কারণ এর মাধ্যমে কুরাইশরা মদিনা রাষ্ট্র ও রাসুলুল্লাহকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
- অবাধ মেলামেশা ও ইসলামের দ্রুততম প্রসার: যুদ্ধ বন্ধ হওয়ায় আরবের পৌত্তলিকরা নির্ভয়ে মুসলিমদের সাথে ব্যবসা ও মেলামেশার সুযোগ পায়। মুসলিমদের চারিত্রিক মহত্ত্ব দেখে মাত্র দুই বছরে যে পরিমাণ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে, তা পূর্ববর্তী ১৮ বছরের মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি। এ সময়ই খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আমর ইবনুল আস ইসলাম গ্রহণ করেন।
- আন্তর্জাতিক দাওয়াতের দ্বার উন্মোচন: অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় নবীজি রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস, পারস্যের খসরু পারভেজ, মিসরের মুকাওকিস ও আবিসিনিয়ার নাজ্জাশীর নিকট দ্বীনের দাওয়াতনামা প্রেরণ করেন।
- বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয়ের পটভূমি: কুরাইশদের মিত্র বনু বকর কর্তৃক এ চুক্তির শর্ত ভঙ্গের কারণেই অষ্টম হিজরিতে ঐতিহাসিক শান্তিপূর্ণ মক্কা বিজয়ের পটভূমি রচিত হয়।
٨- ما الفرق بين الغزوة والسرية؟ بين السرية الرسول (ص) بالتفصيل-
[গাজওয়া ও সারিয়ার পার্থক্য কী? রসুল (স) এর সারিয়াসমূহের বিস্তারিত বর্ণনা দাও।]
ক. গাজওয়া ও সারিয়ার মৌলিক পার্থক্য:
| তুলনার বিষয় | গাজওয়া (غزوة) | সারিয়া (سرية) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা ও নেতৃত্ব | যেসব সামরিক অভিযানে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) স্বয়ং সশরীরে সেনাপতিত্ব করেছেন। | যেসব অভিযানে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং অংশগ্রহণ করেননি; বরং কোনো বিশ্বস্ত সাহাবিকে সেনাপতি নিযুক্ত করে পাঠিয়েছেন। |
| মোট সংখ্যা | সিরাত বিশেষজ্ঞদের মতে গাজওয়ার সংখ্যা ২৭টি (যার মধ্যে ৯টিতে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ হয়েছিল)। | সারিয়ার সংখ্যা ঐতিহাসিক মতভেদে ৩৮ থেকে ৬০টির অধিক। |
| অভিযানের পরিধি | সুদূরপ্রসারী, বৃহৎ সৈন্যদল ও সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধ (যেমন বদর, উহুদ, খন্দক, তাবুক)। | সীমিত গোয়েন্দা নজরদারি, নিরাপত্তা টহল ও শত্রুর আগাম গতিবিধি রোধকরণ। |
খ. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উল্লেখযোগ্য সারিয়াসমূহের বিবরণ:
- সারিয়ায়ে হামযা (১ হিজরি): ইসলামের সর্বপ্রথম সারিয়া। লোহিত সাগর উপকূলে কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলার ওপর নজরদারির জন্য হযরত হামযা (রা.)-এর নেতৃত্বে ৩০ জন মুহাজির সাহাবি প্রেরিত হন। মাজদি বিন আমরের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ ছাড়াই উভয় পক্ষ ফিরে আসে।
- সারিয়ায়ে উবায়দা বিন হারিস (১ হিজরি): রাবিগ উপত্যকায় ৬০ জন মুহাজিরকে নিয়ে প্রেরিত হয়। এতে হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) ইসলামের ইতিহাসে প্রথম তীর নিক্ষেপ করেন।
- সারিয়ায়ে নাখলা (২ হিজরি): আব্দুল্লাহ বিন জাহাশের নেতৃত্বে প্রেরিত এই অভিযানে কুরাইশদের কাফেলা আটক করা হয় এবং ভুলবশত রজব মাসের শেষ দিনে একজন নিহত হয়। পরবর্তীতে সূরা আল-বাকারার ২১৭ নং আয়াত নাজিল হয়ে পরিস্থিতি নিষ্পত্তি হয়।
- সারিয়ায়ে যায়েদ ইবনে হারেসা (মুতা যুদ্ধ – ৮ হিজরি): রোমান সম্রাট ও গাসসানিদের বিরুদ্ধে ৩,০০০ সৈন্য নিয়ে জর্ডানের মুতায় প্রেরিত হয়। একে সেনাপতিদের ত্যাগের কারণে সারিয়া বলা হলেও এটি বিশাল যুদ্ধ ছিল। একে একে জায়েদ, জাফর ও আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা শহীদ হলে খালিদ বিন ওয়ালিদ চমৎকার রণকৌশলে মুসলিমদের রক্ষা করে ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি পান।
- সারিয়ায়ে আলী ইবনে আবি তালিব (১০ হিজরি): ইয়েমেনে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে হযরত আলী (রা.)-এর নেতৃত্বে প্রেরিত হয়, যার ফলে সমগ্র হামদান গোত্র একদিনে ইসলাম গ্রহণ করে।
مجموعة (ب) : খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)
٩- اكتب عن حقيقة الإسراء والمعراج في ضوء الكتاب والسنة-
[কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে إسراء ও معراج এর তাৎপর্য লিপিবদ্ধ কর।]
ইসরা ও মিরাজের পরিচয়: নবুওয়াতের দশম বর্ষে রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র জীবনের এক অলৌকিক মহাশ্রেষ্ঠ মুজিজা সংঘটিত হয়। ‘ইসরা’ অর্থ নৈশভ্রমণ—পবিত্র কাবা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমন (সূরা বনি ইসরাইল: ১); এবং ‘মিরাজ’ অর্থ ঊর্ধ্বগমন—বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে বোরাকে চড়ে সপ্তাকাশ ও সিদরাতুল মুনতাহা পেরিয়ে আল্লাহর আরশে আরোহণ (সূরা আন-নাজম: ১৩-১৮)। এটি সশরীরে ও জাগ্রত অবস্থায় সংঘটিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে উম্মতের ওপর শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়।
١٠- بين حكم الجهاد في الزمن الحاضر وموقف الإسلام منه-
[বর্তমান যুগে জিহাদের হুকুম ও ইসলামে উহার ভূমিকা বর্ণনা কর।]
জিহাদের স্বরূপ: আরবি ‘জিহাদ’ শব্দের অর্থ সত্য ও ন্যায়ের পথে সর্বাত্মক সাধনা ও সংগ্রাম। ইসলামে সন্ত্রাসবাদ বা নিরীহ মানুষ হত্যাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জিহাদ কেবল আত্মরক্ষা ও জুলুম প্রতিরোধের জন্য বৈধ।
- বর্তমান যুগের হুকুম: বর্তমান যুগে জিহাদের সর্বোচ্চ রূপ হলো কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম (জিহাদুন নফস), লেখনী, বক্তৃতা, শিক্ষা ও মিডিয়ার মাধ্যমে ইসলামের সত্য সুন্দর বাণী ছড়িয়ে দেওয়া (বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ) এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান। মুসলিম ভূখণ্ড শত্রুর সরাসরি সামরিক আগ্রাসনে পড়লে আক্রান্তদের জন্য আত্মরক্ষামূলক সশস্ত্র জিহাদ ফরজে আইন হয়ে দাঁড়ায়।
١١- تحدث عن حلف الفضول-
[হিলফুল ফুজুল সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ফিজার যুদ্ধের ভয়াবহ রক্তপাত দেখে ব্যথিত হয়ে কুরাইশ যুবক মুহাম্মদ (সা.) তাঁর পিতৃব্য যুবায়ের ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সহযোগিতায় প্রায় ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল্লাহ ইবনে জুদ’আনের গৃহে একটি শান্তিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম হিলফুল ফুজুল (শান্তি চুক্তি)। এর মূল লক্ষ্য ছিল: মজলুম ও বিদেশিদের নিরাপত্তা দেওয়া, অত্যাচারীকে প্রতিরোধ করা এবং মক্কার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা। নবুওয়াত লাভের পরও বিশ্বনবী বলতেন, “ইসলামেও যদি এমন চুক্তির আহ্বান জানানো হয়, তবে আমি সানন্দে সাড়া দেব।”
١٢- اذكر أسباب فتح مكة-
[মক্কা বিজয়ের কারণসমূহ উল্লেখ কর।]
৮ম হিজরিতে (৬৩০ খ্রি.) রক্তপাতহীন ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের প্রধান কারণসমূহ:
- হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্ত ভঙ্গ: কুরাইশদের মিত্র বনু বকর গোত্র রাতের অন্ধকারে মুসলিমদের মিত্র বনু খুজাআ গোত্রের ওপর আক্রমণ চালিয়ে নারী ও শিশুদের কাবা ঘরের ভেতরেও হত্যা করে এবং কুরাইশরা তাদের অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে।
- নবীজির আল্টিমেটাম প্রত্যাখ্যান: রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরাইশদের নিকট তিনটি প্রস্তাব পাঠান: ক. খুজাআ গোত্রের রক্তের বিনিময় দেওয়া, খ. বনু বকরের সাথে মিত্রতা বাতিল করা, অথবা গ. হুদায়বিয়ার চুক্তি বাতিল ঘোষণা করা। কুরাইশরা উদ্ধত হয়ে চুক্তি বাতিলের পথ বেছে নেয়, যার ফলে নবীজি ১০,০০০ সাহাবি নিয়ে মক্কা অভিযান পরিচালনা করেন।
١٣- اكتب أسماء زوجات الرسول صلى الله عليه وسلم وأولاده-
[রসুল (স) এর সহধর্মিণীদের ও তাঁর সন্তান-সন্ততিদের নামসমূহ লিপিবদ্ধ কর।]
উম্মাহাতুল মুমিনীন (নবীজির সহধর্মিণীগণ): ১. হযরত খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ, ২. সাওদা বিনতে জামআ, ৩. আয়েশা বিনতে আবি বকর, ৪. হাফসা বিনতে উমর, ৫. যয়নব বিনতে খুযাইমা, ৬. উম্মে সালমা (হিন্দ), ৭. যয়নব বিনতে জাহাশ, ৮. জুওয়াইরিয়া বিনতে হারেস, ৯. উম্মে হাবিবা (রমলা), ১০. সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই, ১১. মায়মুনা বিনতে হারেস (এবং মারিয়া কিবতিয়া রা.)।
সন্তান-সন্ততিগণ: নবীজির ৩ পুত্র ও ৪ কন্যা ছিলেন। পুত্রগণ: আল-কাসিম, আব্দুল্লাহ (তৈয়ব/তাহির) ও ইব্রাহিম (মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে)। কন্যাগণ: হযরত যয়নব, রুকাইয়াহ, উম্মে কুলসুম এবং জান্নাতের নারীদের সর্দার হযরত ফাতেমা (রা.)।
١٤- ما هي بيعة العقبة؟ بين-
[আকাবার শপথ কী? বর্ণনা কর।]
মক্কার নিকটবর্তী মিনা প্রান্তরের ‘আকাবা’ নামক গিরিপথে ইয়াসরিবের (মদিনা) নবদীক্ষিত মুসলিমদের সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক শপথকে বায়আতে আকাবা বলা হয়:
- প্রথম আকাবার বায়আত (৬২১ খ্রি. / ১২ নবুওয়াত): মদিনার ১২ জন প্রতিনিধি আল্লাহর সাথে শরিক না করা, চুরি, ব্যভিচার ও মিথ্যা অপবাদ না দেওয়ার সামাজিক নৈতিক শপথ গ্রহণ করেন। নবীজি তাদের সাথে কুরআন শিক্ষার জন্য মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)-কে পাঠান।
- দ্বিতীয় আকাবার বায়আত (৬২২ খ্রি. / ১৩ নবুওয়াত): ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী সাহাবি গোপনে উপস্থিত হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে মদিনায় আমন্ত্রণ জানান এবং নিজেদের পরিবার ও সন্তানদের মতো জানমাল দিয়ে নবীজিকে সুরক্ষার রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
١٥- ما هو ميثاق المدينة؟ وماذا كانت ثمرته-
[মদিনার সনদ কী? এর ফলাফল কী ছিল?]
মদিনা সনদের পরিচয়: ৬২২ খ্রিস্টাব্দে হিজরতের পর মদিনার বহুত্ববাদী সমাজে মুহাজির, আনসার এবং ইহুদি ও পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক শান্তি, নিরাপত্তা ও ঐক্য নিশ্চিত করতে মহানবী (সা.) ৪৭টি ধারাসংবলিত পৃথিবীর সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করেন, যা ‘মদিনার সনদ’ (Constitution of Medina) নামে খ্যাত।
- ফলাফল ও সুফল: এর মাধ্যমে মদিনা একটি সুসংহত সার্বভৌম রাষ্ট্রে রূপ লাভ করে এবং বিশ্বনবী (সা.) সর্বসম্মত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি পান। সকল ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে মদিনাকে সম্মিলিতভাবে রক্ষার অঙ্গীকার অর্জিত হয়।
١٦- بين الوصايا التي أوصى بها رسول الله صلى الله عليه وسلم أمته في حجة الوداع-
[বিদায় হজের সময় রসুল (স) উম্মতকে যে উপদেশগুলো দিয়েছিলেন, তা বর্ণনা কর।]
১০ম হিজরিতে (৬৩২ খ্রি.) আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতের পাদদেশে সোয়া লক্ষাধিক সাহাবির মহাসমাবেশে বিশ্বনবী (সা.) তাঁর জীবনের অন্তিম ভাষণ দেন, যা সর্বজনীন মানবাধিকারের ম্যাগনাকার্টা। এর প্রধান উপদেশাবলি:
- রক্ত ও সম্পদের অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতা: মানুষের জীবন ও সম্পদ এই পবিত্র দিন, পবিত্র মাস ও পবিত্র শহরের মতোই সম্মানিত। জাহেলি যুগের সকল রক্তের দাবি চিরতরে বাতিল।
- সুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: সব ধরনের সুদী লেনদেন নিষিদ্ধ এবং সর্বপ্রথম নিজ বংশের আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সুদ রহিত করেন।
- মানবাধিকার ও সাম্য: অনারবের ওপর আরবের এবং আরবের ওপর অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া।
- নারীদের অধিকার সুরক্ষা: নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো; তাদের ওপর পুরুষদের এবং পুরুষদের ওপর নারীদের সমান অধিকার রয়েছে।
- পথভ্রষ্ট না হওয়ার উপায়: নবীজি বলেন, “আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতদিন তা আঁকড়ে থাকবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং তাঁর রসূলের সুন্নাহ।”
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. সিরাত (السيرة) পাঠের মূল উদ্দেশ্য কী?
সিরাত পাঠের মূল উদ্দেশ্য হলো কুরআনের জীবন্ত ব্যবহারিক রূপ অনুধাবন করা এবং মহানবী (সা.)-এর পবিত্র সুন্নাহ ও চরিত্রকে ব্যক্তি, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করা।
২. মহানবী (সা.) কত বছর বয়সে হযরত খাদিজা (রা.)-কে বিবাহ করেন?
মহানবী (সা.) ২৫ বছর বয়সে ৪০ বছর বয়সী মক্কার মহীয়সী ও ধনী ব্যবসায়ী হযরত খাদিজা (রা.)-কে বিবাহ করেন।
৩. হিজরতের প্রধান কারণ কী ছিল?
কুরাইশদের অব্যাহত অমানবিক নিপীড়ন, দারুন নদওয়ায় নবীজিকে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং মদিনার আনসারদের সুরক্ষার অঙ্গীকারের প্রেক্ষিতে আল্লাহর ঐশী নির্দেশেই ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনা হিজরত সংঘটিত হয়।
৪. হুদায়বিয়ার সন্ধিকে কুরআনে কী নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে?
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ফাতহ-এর প্রথম আয়াতে হুদায়বিয়ার সন্ধিকে ‘ফাতহুম মুবীন’ (প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট বিজয়) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
৫. গাজওয়া ও সারিয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
যেসব সামরিক অভিযানে মহানবী (সা.) স্বয়ং সশরীরে নেতৃত্ব দিয়েছেন সেগুলোকে ‘গাজওয়া’ এবং যেসব অভিযানে তিনি নিজে না গিয়ে কোনো সাহাবির নেতৃত্বে সৈন্য পাঠিয়েছেন সেগুলোকে ‘সারিয়া’ বলা হয়।
৬. মদিনার সনদের প্রধান ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী?
মদিনার সনদ হলো পৃথিবীর সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান, যার মাধ্যমে বহুত্ববাদী সমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার ও আইনের শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়।