জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

ইসলামে ধর্মীয়, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ধারার বিকাশ (Religious, Philosophical and Scientific Development in Islam) – 205307, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2022

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৫৪ মিনিট পড়ার সময়
৬ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2022
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: ইসলামে ধর্মীয়, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ধারার বিকাশ
বিষয় কোড: 205307 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি

১. ঈমানের সংজ্ঞা দাও। ঈমানের প্রধান স্তম্ভসমূহ আলোচনা কর।

[Define Iman. Discuss the main pillars of Iman.]

ক. ঈমানের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:

আভিধানিক অর্থ: আরবি ‘ঈমান’ (إِيمَان) শব্দটি মূলধাতু ‘আমন’ (أَمْن) থেকে নিষ্পন্ন, যার আভিধানিক অর্থ দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা, স্বীকৃতি দেওয়া, আস্থা রাখা ও অন্তরে শান্তি অনুভব করা।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামি শরীয়াহ ও কালাম শাস্ত্রের পরিভাষায়, মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর রসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে যে শাশ্বত দ্বীন মানবজাতির জন্য প্রেরণ করেছেন, তা অন্তরে অকপটে সত্য বলে বিশ্বাস করা, মুখে উচ্চারণ করে স্বীকার করা এবং তদানুযায়ী স্বীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে আমল করার সামগ্রিক নামই ঈমান। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম গাজ্জালী (রহ.)-এর মতে, “আত-তাসদিকু বিল কালব ওয়াল ইকরারু বিল লিসান” (অন্তরে অবিচল বিশ্বাস ও মুখে স্বীকৃতি প্রদানই হলো ঈমান)। ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) এর সাথে ‘আমালু বিল আরকান’ (অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল)-কে ঈমানের পূর্ণতার অপরিহার্য শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

খ. ঈমানের প্রধান স্তম্ভসমূহ (Pillars of Iman):

হাদিসে জিবরীলে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ঈমানের মূল ভিত্তি হিসেবে ছয়টি মৌলিক স্তম্ভ ঘোষণা করেছেন। সংক্ষেপে এই প্রধান স্তম্ভগুলোর বিশদ আলোচনা নিম্নে প্রদত্ত হলো:

  1. আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান (Iman in Allah): ঈমানের সর্বপ্রধান ভিত্তি হলো তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস। আল্লাহ তাআলা স্বীয় সত্তা, গুণাবলি, সার্বভৌম কর্তৃত্ব ও উপাস্য হওয়ার ক্ষেত্রে একক, অদ্বিতীয়, অংশীদারহীন এবং তিনিই সমগ্র মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা ও পালনকর্তা (সূরা আল-ইখলাস)।
  2. ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান (Belief in Angels): আল্লাহ নূরের তৈরি এক অনুগত সৃষ্টি হিসেবে ফেরেশতাদের সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা নারী বা পুরুষ নন এবং পাপমুক্ত হয়ে সার্বক্ষণিক আল্লাহর নির্দেশ পালনে নিয়োজিত (যেমন হযরত জিবরীল, মিকাইল, ইসরাফিল ও আজরাইল আ.)।
  3. আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান (Belief in Divine Scriptures): মানবজাতির হিদায়েতের জন্য যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের নিকট নাজিলকৃত কিতাবসমূহ আল্লাহর সত্য বাণী বলে বিশ্বাস করা। তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল এবং সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি গ্রন্থ হিসেবে পবিত্র আল-কুরআনে বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অঙ্গ।
  4. নবী ও রাসূলগণের প্রতি ঈমান (Belief in Prophets and Messengers): হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত প্রেরিত সকল নবী-রাসূলকে নিষ্পাপ সত্যবাদী ও আল্লাহর মনোনীত দূত হিসেবে বিশ্বাস করা। মুহাম্মদ (সা.) হলেন শেষ নবী (খাতামুন্নাবিয়্যীন), তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবে না।
  5. আখিরাত বা পরকালের প্রতি ঈমান (Belief in the Hereafter): ইহকালীন জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং মৃত্যুর পর এক অন্তহীন পরকালীন জীবনের প্রতি নিঃশঙ্ক বিশ্বাস স্থাপন করা। কিয়ামত, কবর, হাশরের ময়দানে পুনরুত্থান, মিযান (আমলের পরিমাপ), পুলসিরাত এবং জান্নাত ও জাহান্নামের শাশ্বত অস্তিত্বে বিশ্বাস ঈমানের স্তম্ভ।
  6. তাকদীর ও ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান (Belief in Divine Decree/Qadar): জগতে যা কিছু ঘটে তা সবই আল্লাহ তাআলার পূর্বনির্ধারিত জ্ঞান ও অসীম প্রজ্ঞার অধীনেই সংঘটিত হয়। কল্যাণ-অকল্যাণ আল্লাহর সৃষ্টি হলেও মানুষকে ভালো-মন্দ নির্বাচনের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি প্রদান করা হয়েছে।

২. “ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা”—পর্যালোচনা কর।

[“Islam is a complete code of life”-Review it.]

ক. ভূমিকা:

ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠান, উপাসনা বা আধ্যাত্মিক ধ্যান-ধারণার সমষ্টি নয়; বরং এটি মানবজাতির সামগ্রিক জীবনের সর্বাঙ্গীন এক শাশ্বত ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান (Complete Code of Life)। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩)।

খ. জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলামের সর্বজনীন রূপরেখা:

  1. আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিধান: মানুষের আত্মার পরিশুদ্ধি (তাযকিয়ায়ে নফস), তাকওয়া, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, বিনয় এবং চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে ইসলাম সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে। উপাসনার সাথে নৈতিক শুচিতার মেলবন্ধন ইসলামের অনন্য বৈশিষ্ট্য।
  2. পারিবারিক ও সামাজিক জীবন: পিতামাতার অধিকার, সন্তানের প্রতিপালন, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও শ্রদ্ধা, রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়তার হক এবং প্রতিবেশীর অধিকার নিশ্চিত করতে ইসলাম পূর্ণাঙ্গ বিধান প্রণয়ন করেছে। এটি সমাজের শোষণ, বর্ণবাদ ও শ্রেণীভেদ দূর করে সাম্যের ভিত্তিতে এক ঐক্যবদ্ধ ভ্রাতৃত্ব সমাজ প্রতিষ্ঠা করে।
  3. অর্থনৈতিক নীতিমালা: ইসলাম পুঁজিবাদী শোষণ এবং সমাজতান্ত্রিক দমননীতির বিপরীতে এক ন্যায়নিষ্ঠ ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামো উপহার দিয়েছে। সুদ (রিবা), মজুদদারি, ফটকাবাজি ও জুয়াকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে যাকাত, সদকা এবং ইনসাফপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্যকে উৎসাহিত করেছে, যাতে সম্পদ শুধু ধনীদের হাতে পুঞ্জীভূত না থাকে (সূরা আল-হাশর: ৭)।
  4. রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থা: ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা জনগণের কল্যাণে পরিচালিত এক খিলাফত বা আমানতদারী শাসন। এতে সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র মহান আল্লাহর (সূরা ইউসুফ: ৪০) এবং শাসক হলেন আল্লাহর প্রতিনিধি ও জনগণের সেবক (শুরা বা পরামর্শভিত্তিক শাসন)। আইনের চোখে শাসক ও সাধারণ নাগরিকের সমমর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে।
  5. আইন ও বিচারব্যবস্থা: অপরাধ দমন ও সমাজে ন্যায়বিচার (আদল) কায়েমে ইসলামে রয়েছে কঠোর অথচ ইনসাফপূর্ণ ফৌজদারি ও দেওয়ানি দণ্ডবিধি (হুদুদ ও কিসাস)। নিরপেক্ষ আদালত প্রতিষ্ঠায় ইসলাম কোনো প্রকার পক্ষপাত বা স্বজনপ্রীতি বরদাশত করে না।
  6. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও যুদ্ধনীতি: আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তি, পারস্পরিক চুক্তি রক্ষা এবং অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় ইসলাম বিশ্বস্ততার নজির স্থাপন করেছে। যুদ্ধে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রকৃতি ধ্বংস কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

৩. মুসলিম দর্শন কী? মুসলিম দর্শনের উৎসসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা কর।

[What is Muslim philosophy? Briefly discuss the sources of Muslim philosophy.]

ক. মুসলিম দর্শনের সংজ্ঞা:

ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের (ওহী) আলোকে যুক্তি, বুদ্ধি ও বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব, আল্লাহর অস্তিত্ব ও গুণাবলি, আত্মার অমরত্ব, নৈতিক মূল্যবোধ এবং সত্যের স্বরূপ উদঘাটনের সুশৃঙ্খল বিদ্যাকে মুসলিম দর্শন (Islamic Philosophy বা ফালসাফা ও ইলমুল কালাম) বলা হয়। এটি নিছক গ্রিক দর্শনের অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং ইসলামি ঈমান ও কুরআন-সুন্নাহর আলোকবর্তিকায় যুক্তি ও দর্শনের এক অপূর্ব সমন্বিত বিকাশ। আল-কিন্দি, আল-ফারাবি, ইবনে সীনা ও ইবনে রুশদ হলেন এর প্রবাদপ্রতিম দিকপাল।

খ. মুসলিম দর্শনের উৎসসমূহ:

  1. পবিত্র কুরআন: মুসলিম দর্শনের মূল ও চিরন্তন উৎস হলো পবিত্র কুরআন। কুরআনের শত শত আয়াতে মানুষকে চিন্তা-ভাবনা (তাফাক্কুর), গভীর অনুধাবন (তাদাব্বুর) এবং মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণার প্রত্যক্ষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে (যেমন: “তারা কি উটের দিকে তাকায় না, কীভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে? আকাশের দিকে তাকায় না, কীভাবে তা সমুন্নত রাখা হয়েছে?” — সূরা আল-গাশিয়াহ)।
  2. হাদিস ও সুন্নাহ: মহানবী (সা.)-এর পবিত্র বাণী জ্ঞানার্জন, প্রজ্ঞা (হিকমাহ) এবং গভীর উপলব্ধি অর্জনে মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করেছে। নবীজি (সা.) বলেছেন: “প্রজ্ঞা হলো মুমিনের হারানো সম্পদ, সে যেখানেই তা পায়, গ্রহণ করার শ্রেষ্ঠ হকদার।”
  3. ইলমুল কালাম ও আকিদাগত বিতর্ক: হিজরি প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে খারেজি, শিয়া, মুরজিয়া এবং বিশেষ করে যুক্তিবাদী মুতাজিলা সম্প্রদায়ের উত্থানের ফলে আল্লাহর সিফাত, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (জবর ও কদর) এবং কুরআনের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে যেসব তাত্ত্বিক যুক্তিতর্ক সূচিত হয়, তা মুসলিম দর্শনের প্রাথমিক ভিত্তি নির্মাণ করে।
  4. প্রাচীন গ্রিক শাস্ত্রীয় গ্রন্থের আত্মীকরণ ও সংস্কার: আব্বাসীয় যুগে বাইতুল হিকমাহর মাধ্যমে এরিস্টটল, প্লেটো, নিও-প্লেটোনিজম এবং গ্যালেনের দর্শন ও বিজ্ঞানগ্রন্থসমূহ আরবি ভাষায় রূপান্তর ও গভীর পর্যালোচনা করা হয়। মুসলিম দার্শনিকগণ গ্রিক তত্ত্বগুলোকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে কুরআনিক তাওহীদের সাথে সাংঘর্ষিক অংশগুলো বর্জন করে যুক্তিভিত্তিক এক নতুন ধারা বিনির্মাণ করেন।
  5. পারস্য ও ভারতীয় দর্শন ঐতিহ্য: প্রাচ্যের সমৃদ্ধ যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ঐতিহ্যও মুসলিম দার্শনিক চিন্তাকে সমৃদ্ধ ও উদার করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

৪. প্রাক ইসলামি যুগের আরবি সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা দাও।

[Give an idea about the characteristics of Arabic literature in the pre-Islamic period.]

ক. ঐতিহাসিক পটভূমি:

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত লাভের পূর্ববর্তী প্রায় দেড়শত বছরের সময়কালকে জাহেলি যুগ বা প্রাক-ইসলামি যুগ বলা হয়। রাজনৈতিক অনৈক্য ও নৈতিক অবক্ষয় থাকা সত্ত্বেও ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রাচীন বেদুইন আরবদের দক্ষতা ছিল বিস্ময়কর ও চূড়ান্তে উপনীত। মরুভূমির উন্মুক্ত প্রকৃতি, বেদুইন জীবনযাত্রা ও গোত্রীয় সংঘাত তাদের কবিতায় অপূর্ব রূপ লাভ করেছিল। প্রখ্যাত উক্তি রয়েছে: “আশ-শি’রু দিওয়ানুল আরব” (কবিতা হলো আরবদের জাতীয় জীবন ও ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল)।

খ. প্রাক-ইসলামি সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  1. কবিতার একচ্ছত্র প্রাধান্য: জাহেলি যুগে গদ্যের অস্তিত্ব খুব সীমিত ছিল; সাহিত্যের মূল চালিকাশক্তিই ছিল কাব্যগাথা। ওকাজ মেলার বার্ষিক কবিতা প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ সাতটি দীর্ঘ গীতিকবিতা স্বর্ণাক্ষরে লিখে পবিত্র কাবা ঘরের গায়ে ঝুলিয়ে রাখা হতো, যাদের ‘মুআল্লাকা’ (ঝুলন্ত কাব্যমালা) বলা হয়। ইমরুল কায়েস, তারাফা, যুহাইর বিন আবি সুলমা, লাবিদ, আন্তারা প্রমুখ ছিলেন এর প্রধান রূপকার।
  2. কাসিদার সুনির্দিষ্ট ছন্দকাঠামো: আরবি কবিতার ক্লাসিক্যাল ধারা ‘কাসিদা’ (Qasida)-র উদ্ভব ঘটে এ যুগে। একটি আদর্শ কাসিদা শুরু হতো পরিত্যক্ত প্রেমিকার স্মৃতিচারণ (নাসিব বা তাশবিব), এরপর মরুভূমির রুক্ষতা ও উটের কষ্টকর যাত্রা এবং পরিশেষে মূল স্তুতি বা বীরত্ববর্ণনায় সমাপ্ত হতো।
  3. গোত্রপ্রীতি ও বীরত্বগাথা (হামাসা ও ফাখর): গোত্রের সুনাম ও শৌর্যবীর্য গাথা বর্ণনা করা কবিদের প্রধান দায়িত্ব ছিল। স্বীয় গোত্রের অহংকার (ফাখর) এবং প্রতিপক্ষ গোত্রের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক বিদ্রূপ কবিতা (হিজা) ছিল অতিমাত্রায় জনপ্রিয়।
  4. মরুপ্রকৃতির বাস্তবসম্মত চিত্রায়ন: রুক্ষ সাহারা, কালবৈশাখীর ঝড়, বুনো গাধা, দ্রুতগামী উট, শিকারি বাজপাখি ও মৃগয়ার নিখুঁত জীবন্ত রূপ তাদের কবিতায় চিত্রিত হতো। কৃত্রিম অলঙ্কারহীন সহজ ও নিখুঁত শব্দের সমাবেশ ছিল এর বৈশিষ্ট্য।
  5. নারী ও প্রেমের অকৃত্রিম রূপ: প্রেমিকা ও নারীর রূপসৌন্দর্য এবং তাদের বিরহের বিষাদঘন অনুভূতি বেদুইন কবিদের প্রিয় উপজীব্য ছিল।
  6. কথ্য ও শ্রুতিভিত্তিক সংরক্ষণ: এ যুগের সাহিত্য লিখিত আকারে নয়, বরং কবি ও বর্ণনাকারীদের (রাবী) অসাধারণ স্মরণশক্তির ওপর নির্ভর করে যুগ যুগ ধরে মৌখিকভাবে প্রজন্মান্তরে সংরক্ষিত হতো।

৫. আব্বাসীয় আমলে শিক্ষার বিভিন্ন শাখায় মুসলমানদের অবদান মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the contribution of the Muslims to the different branches of learning during the Abbasid period.]

ক. বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের পটভূমি:

আব্বাসীয় খিলাফতকাল (৭৫০-১২৫৮ খ্রি.) বিশেষ করে খলিফা আল-মনসুর, হারুনুর রশীদ ও আল-মামুনের শাসনকাল ছিল ইসলামি সভ্যতার ‘স্বর্ণযুগ’ (Golden Age of Islam)। ৮৩০ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত গবেষণাকেন্দ্র ও রাজকীয় প্রকাশনালয় ‘বাইতুল হিকমাহ’ (House of Wisdom) বিশ্বজ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রাচীন গ্রিক, সিরিয়াক, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষার ক্লাসিক্যাল জ্ঞানগ্রন্থসমূহ বিপুল অর্থব্যয়ে সংগ্রহ করে আরবি রূপদানের মাধ্যমে এক নজিরবিহীন প্রাতিষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক বিপ্লব সূচিত হয়।

খ. শিক্ষার বিভিন্ন শাখায় মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল অবদান:

  1. গণিত ও বীজগণিত: আল-খোয়ারিজমি শূন্যের ব্যবহার ও দশমিক পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করেন এবং বীজগণিতকে স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে আবিষ্কার করে প্রণয়ন করেন যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘কিতাব আল-জাবর ওয়াল মুকাবালা’। তাঁর নামানুসারেই আধুনিক ‘অ্যালগরিদম’ (Algorithm) ও ‘এলজেব্রা’ শব্দের উদ্ভব ঘটে।
  2. চিকিৎসা বিজ্ঞান: আল-রাযী সংক্রামক রোগ, বসন্ত ও হামের চিকিৎসায় বৈপ্লবিক নির্দেশনা দিয়ে লেখেন ‘আল-হাবী’। চিকিৎসা জগতের অপরাজেয় সম্রাট ইবনে সীনা প্রণয়ন করেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বকোষ ‘আল-কানুন ফিত তিব্ব’ (The Canon of Medicine), যা শত শত বছর ধরে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের প্রধান পাঠ্য ছিল। আল-মাজুসী রক্তসঞ্চালনের প্রাথমিক রূপরেখা বর্ণনা করেন।
  3. জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যা: বাগদাদ ও দামেস্কে মানমন্দির স্থাপিত হয়। আল-বাত্তানী ও আল-ফারগানি সৌরবর্ষের নিখুঁত পরিমাপ ও বিষুবীয় গতি নির্ণয় করেন। আল-হাসান ইবনে আল-হাইসাম তাঁর অমর গ্রন্থ ‘কিতাবুল মানাযির’-এর মাধ্যমে আলোকবিজ্ঞানের (Optics) বিপ্লব ঘটান এবং আধুনিক ক্যামেরার আদি রূপ ‘পিনহোল ক্যামেরা’ আবিষ্কার করেন।
  4. রসায়ন শাস্ত্র: জাবির ইবনে হাইয়ানকে আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তিনি পাতন, স্ফটিকীকরণ, ঊর্ধ্বপাতন পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন এবং নাইট্রিক এসিড, সালফিউরিক এসিড ও অম্লরাজ প্রস্তুত করেন।
  5. ভূগোল ও ইতিহাস: আল-মাসুদী, আল-ইয়াকুবী ও আল-বিরুনী বিশ্বভ্রমণ ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে পৃথিবীর আহ্নিক গতি, ব্যাসার্ধ ও বিভিন্ন জাতির ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন। ঐতিহাসিক আল-তাবারি রচনা করেন সুবিশাল বিশ্বকোষীয় ইতিহাস গ্রন্থ।
  6. ধর্মতত্ত্ব ও হাদিস শাস্ত্র: এ যুগেই হাদিসের বিশুদ্ধতম ছয়টি সংকলন (সিহাহ সিত্তাহ)—বুখারী, মুসলিম, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ বিধিবদ্ধভাবে সংকলিত হয় এবং চার মাযহাবের ইমামগণের দ্বারা ইসলামি ফিকহ শাস্ত্র সুসংহত রূপ লাভ করে।

৬. মুসলিম শাসনামলে ইউরোপে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিস্তারে স্পেনের ভূমিকা নিরূপণ কর।

[Determine the role of Spain in the development of science and learning in Europe during the Muslim rule.]

ক. মধ্যযুগীয় স্পেনের ঐতিহাসিক অবস্থান:

৭১১ খ্রিস্টাব্দে তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে মুসলিম বিজয় সূচিত হওয়ার পর মুসলিম স্পেন (আন্দালুসিয়া) প্রায় আট শতাব্দীকাল ধরে গোটা ইউরোপ মহাদেশের জ্ঞানের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। যখন সমগ্র ইউরোপ মধ্যযুগীয় অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও গির্জাকেন্দ্রিক ‘অন্ধকার যুগে’ (Dark Ages) নিমজ্জিত ছিল, তখন স্পেনের কর্ডোভা, গ্রানাডা, সেভিল ও টলেডো ছিল মুক্তচিন্তা, বিশ্ববিদ্যালয় ও কোটি পাণ্ডুলিপির সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের উজ্জ্বল তীর্থক্ষেত্র। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি লিখেছেন: “মধ্যযুগে কর্ডোভা ছিল ইউরোপের সবচেয়ে সভ্য ও পরিশীলিত শহর।”

খ. ইউরোপীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক জাগরণে স্পেনের ভূমিকা:

  1. ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মাতৃভূমি: কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রানাডার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্ঞানার্জনের জন্য ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি ও ইংল্যান্ড থেকে শত শত খ্রিস্টান পণ্ডিত আগমন করতেন। কর্ডোভায় পাঠরত খ্রিস্টান পণ্ডিত জের্বার্ট পরবর্তীতে পোপ দ্বিতীয় সিলভেস্টার হিসেবে নির্বাচিত হয়ে মুসলিম জ্ঞান ইউরোপে ছড়িয়ে দেন।
  2. টলেডোর রূপান্তরকরণ ব্যুরো (Translation School of Toledo): দ্বাদশ শতাব্দীতে আর্চবিশপ রেমন্ডের পৃষ্ঠপোষকতায় টলেডোতে একটি সুবিশাল প্রকাশনা ও রূপান্তরকরণ প্রকল্প গড়ে ওঠে। জেরার্ড অব ক্রেমোনা, মাইকেল স্কট প্রমুখ পণ্ডিত মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের আরবি গ্রন্থসমূহ সরাসরি লাতিন ভাষায় রূপান্তর করেন। এর মাধ্যমেই ইউরোপীয়রা চিকিৎসা, যুক্তিবিদ্যা, বীজগণিত ও পদার্থবিদ্যার উচ্চতর জ্ঞানের সংস্পর্শ পায়।
  3. দর্শনের পুনরুজ্জীবন ও ইবনে রুশদ (Averroes): কর্ডোভার প্রখ্যাত দার্শনিক ইবনে রুশদ এরিস্টটলের মূল দর্শনকে যুক্তিনিষ্ঠভাবে ব্যাখ্যা ও সংস্কার করেন। তাঁর লাতিন সংস্করণ ইউরোপের প্যারিস, অক্সফোর্ড ও পাডুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চিন্তার স্বাধীনতা ও রেনেসাঁসের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি (Averroism) স্থাপন করে।
  4. শল্যচিকিৎসার জনক আল-জাহারাবি (Abulcasis): কর্ডোভার চিকিৎসাবিজ্ঞানী আবুল কাসিম আল-জাহারাবি প্রণয়ন করেন চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের বিস্ময়কর গ্রন্থ ‘আত-তাসরিফ’। তিনি দুই শতাধিক আধুনিক শল্যচিকিৎসার যন্ত্রপাতির নকশা ও ব্যবহার আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তী পাঁচশত বছর সমগ্র ইউরোপের সার্জনদের একক গাইডবুক ছিল।
  5. কৃষি ও প্রযুক্তি বিপ্লব: মুসলিমগণ স্পেনে উন্নত সেচব্যবস্থা (নোরিয়া বা জলচক্র), সুড়ঙ্গপথ, শস্যের বৈচিত্র্যকরণ (তুলা, আখ, জলপাই, কমলা, ধান) এবং কাগজ তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। জাতেনিয়ার কাগজের মিলের মাধ্যমেই ইউরোপে প্রথম সাশ্রয়ী কাগজের প্রচলন ঘটে।

৭. সালাতের ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব বর্ণনা কর।

[Describe the religious and social importance of Salat.]

ক. সালাতের পরিচয় ও অবস্থান:

ইসলামের ব্যবহারিক ইবাদতসমূহের মধ্যে সালাত (নামাজ) হলো সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এটি ঈমানের পর দ্বীনের মেরুদণ্ডস্বরূপ। হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে: “আস-সালাতু ইমাদুদ্দীন” (সালাত হলো দ্বীনের স্তম্ভ; যে তা কায়েম করল সে দ্বীনকে রক্ষা করল, আর যে তা বিনষ্ট করল সে দ্বীনকেই ধ্বংস করল)। মিরাজের রজনীতে মহান আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেন।

খ. সালাতের ধর্মীয় গুরুত্ব:

  1. আল্লাহর নৈকট্য ও মোনাজাত: সালাত বান্দার সাথে মহান আল্লাহর সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যম। সেজদারত অবস্থায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটে পৌঁছায়।
  2. গুনাহ মাফ ও আত্মশুদ্ধি: দৈনিক পাঁচবার সালাত আদায়ের মাধ্যমে বান্দার আত্মিক ময়লা দূর হয়। নবীজি (সা.) একে বাড়ির সম্মুখ দিয়ে প্রবাহিত স্বচ্ছ নহর বা নদীতে প্রত্যহ পাঁচবার গোসল করার সাথে তুলনা করেছেন, যাতে শরীরের কোনো ময়লা অবশিষ্ট থাকে না।
  3. পাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখা: পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা আল-আনকাবুত: ৪৫)।
  4. হাশরের ময়দানে প্রথম হিসাব: কিয়ামতের দিন বান্দার আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম সালাতের হিসাব নেওয়া হবে। সালাত সঠিক হলে অন্য সকল হিসাব সহজ হয়ে যাবে।

গ. সালাতের সামাজিক গুরুত্ব:

  1. সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের দৃশ্যমান প্রকাশ: মসজিদে জামাতে সালাত আদায়ে ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা, সাদা-কালো ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়। এটি বর্ণবাদ ও শ্রেণীশোষণকে সমূলে উপড়ে ফেলে।
  2. শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা: দৈনিক নির্দিষ্ট সময়ে সালাত আদায় মানুষকে সময়নিষ্ঠ, পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তোলে।
  3. নেতৃত্বের আনুগত্য ও পারস্পরিক সহমর্মিতা: ইমামের একক নির্দেশে রুকু-সেজদা করার মাধ্যমে নেতৃত্ব মান্য করার শিক্ষা অর্জিত হয়। জামাতে অনুপস্থিত মুসল্লিদের খোঁজখবর নেওয়ার মাধ্যমে সমাজের বিপদগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি হয়।
  4. দৈহিক ও মানসিক প্রশান্তি: সালাত মুসলিম হৃদয়ে অসীম প্রশান্তি আনে এবং এর শারীরিক রুকু ও সেজদা মানবদেহের স্নায়বিক ও রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়াকে সুস্থ রাখে।

৮. চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সীনার অবদান মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the contribution of Ibn Sina in medical science.]

ক. প্রাথমিক জীবন ও ব্যক্তিত্ব:

আবু আলী আল-হুসাইন ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭ খ্রি.), পাশ্চাত্যে ‘অ্যাভিসেনা’ (Avicenna) নামে পরিচিত, ছিলেন মধ্যযুগের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বহুশাস্ত্রজ্ঞ প্রতিভা, দার্শনিক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অবিসংবাদিত যুবরাজ (Prince of Physicians)। তিনি বোখারার নিকটবর্তী আফসানায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মাত্র আঠারো বছর বয়সেই তৎকালীন প্রচলিত চিকিৎসা ও দর্শনের সকল জ্ঞান আয়ত্ত করে সুখ্যাতি অর্জন করেন।

খ. আল-কানুন ফিত তিব্ব (The Canon of Medicine):

চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সীনার সর্বশ্রেষ্ঠ ও বিশ্ববিজয়ী সৃষ্টি হলো ‘আল-কানুন ফিত তিব্ব’। প্রায় দশ লক্ষ শব্দের সমন্বয়ে রচিত পাঁচ খণ্ডের এই সুবিশাল চিকিৎসা বিশ্বকোষে রোগতত্ত্ব, অঙ্গসংস্থান, ফার্মাকোলজি ও থেরাপিউটিকসের এক অবিশ্বাস্য সুশৃঙ্খল বিন্যাস উপস্থাপন করা হয়। দ্বাদশ শতাব্দীতে এটি লাতিন ভাষায় রূপান্তর করা হয় এবং সপ্তদশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত ইউরোপের মন্টেপিলিয়ার, প্যারিস ও বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিদ্যার একমাত্র অবিসংবাদিত রেফারেন্স টেক্সটবুক হিসেবে সমাদৃত ছিল।

গ. চিকিৎসা বিজ্ঞানে মৌলিক আবিষ্কার ও বৈপ্লবিক চিন্তাধারা:

  1. সংক্রামক রোগ ও জীবাণুতত্ত্বের ধারণা: তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন যে ক্ষতিকর অদৃশ্য জীবাণু পানি ও বাতাসের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে মানবদেহে রোগ বিস্তার করে। রোগীকে আলাদা রাখার বিধান অর্থাৎ আধুনিক কোয়ারেন্টিন (Quarantine) পদ্ধতির আদি প্রবক্তা তিনিই।
  2. যক্ষ্মা ও অ্যানকাইলোস্টোমিয়াসিসের রোগতত্ত্ব: তিনি যক্ষ্মা (Tuberculosis)-কে সংক্রামক রোগ হিসেবে প্রথম চিহ্নিত করেন এবং প্লুরিসি ও ফুসফুসের প্রদাহের পার্থক্য নিরূপণ করেন। অন্ত্ৰের পরজীবী কৃমি সম্পর্কেও বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
  3. মনোদৈহিক বা সাইকোসোম্যাটিক চিকিৎসা (Psychosomatic Medicine): ইবনে সীনা প্রথম প্রমাণ করেন যে মানুষের মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও আবেগগত ভারসাম্যহীনতা শারীরিক জটিল রোগের কারণ হতে পারে। তিনি বহু মানসিক রোগীকে মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে নিরাময় করেন।
  4. ঔষধবিজ্ঞান (Pharmacology): কানুনের দ্বিতীয় খণ্ডে তিনি প্রায় ৭৬০টি ভেষজ ও খনিজ উপাদানের ভেষজ গুণাবলি, ডোজ এবং প্রস্তুতপ্রণালীর নিখুঁত বৈজ্ঞানিক তালিকা প্রস্তুত করেন।
  5. অস্ত্রোপচার ও অ্যানেস্থেশিয়া: তিনি রক্তক্ষরণ বন্ধের আধুনিক কৌশল, মূত্রথলির পাথর অপসারণের নালী এবং রোগীদের অজ্ঞান করার জন্য সুপ্তিদায়ক ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার প্রবর্তন করেন।

খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি

৯. মানবজীবনে পবিত্র কুরআনের গুরুত্ব বিশ্লেষণ কর।

[Analyze the importance of the Holy Quran in human life.]

পবিত্র কুরআন হলো মানবজাতির হিদায়েতের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরীল (আ.)-এর মাধ্যমে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর নাজিলকৃত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ শাশ্বত কিতাব। মানবজীবনে এর গুরুত্ব অপরিসীম:

  • শাশ্বত জীবনপথ প্রদর্শক (হুদান লিন্নাস): মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ধাপে ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য নির্দেশক হিসেবে কুরআন কাজ করে (সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৫)।
  • আত্মিক ও মানসিক নিরাময় (শিফা): পবিত্র কুরআন মানুষের অন্তরের রোগ—অহংকার, হিংসা, কপটতা ও হতাশা দূর করে প্রশান্তিময় জীবনের সন্ধান দেয় (সূরা বনি ইসরাইল: ৮২)।
  • ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ: এটি জুলুম, শোষণ ও বর্ণবাদ দূর করে ইনসাফ, মানবাধিকার ও সার্বজনীন মানবিক মর্যাদার ভিত্তি স্থাপন করে।

১০. যাকাতের নৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব পর্যালোচনা কর।

[Review the moral and social importance of Zakat.]

যাকাত ইসলামের অন্যতম অপরিহার্য অর্থনৈতিক স্তম্ভ। নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপর নির্দিষ্ট হারে শতকরা আড়াই ভাগ (২.৫%) সম্পদ দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা ফরজ।

  • নৈতিক গুরুত্ব: যাকাত প্রদানকারীর অন্তরকে কৃপণতা, লোভ ও সম্পদের অন্ধ মোহ থেকে পবিত্র করে উদারতা ও খোদাভীতি সৃষ্টি করে এবং অবশিষ্ট সম্পদকে বরকতময় করে।
  • সামাজিক গুরুত্ব: যাকাত সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যবর্তী ব্যবধান হ্রাস করে। এটি দারিদ্র্য দূরীকরণ, বেকারত্ব মোচন, এতিম-বিধবাদের পুনর্বাসন এবং সম্পদ কেবল ধনিক শ্রেণীর হাতে পুঞ্জীভূত হওয়া বন্ধ করে এক শোষণমুক্ত ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

১১. সমাজ জীবনে ইজতিহাদের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ কর।

[Mention the necessity of Ijtihad in social life.]

ইজতিহাদের পরিচয়: কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নীতিমালার আলোকে কোনো নতুন সমস্যা বা আধুনিক পরিস্থিতির সমাধান বের করার লক্ষ্যে শরীয়াহ বিশারদ বা মুজতাহিদের পূর্ণ মেধা ও সাধনা প্রয়োগ করার পদ্ধতিকে ‘ইজতিহাদ’ বলে।

  • ইসলামি শরীয়াহর গতিশীলতা রক্ষা: কাল পরিবর্তনের সাথে সাথে মানবজীবনে নিত্যনতুন সমস্যার উদ্ভব ঘটে (যেমন আধুনিক ব্যাংকিং, শেয়ার বাজার, বায়ো-মেডিকেল প্রযুক্তি, অঙ্গ প্রতিস্থাপন ইত্যাদি)। কুরআন-হাদিসের মূল চেতনার আলোকে ইজতিহাদ এসব আধুনিক বিষয়ের শরয়ী সমাধান বের করে শরীয়াহকে চিরসবুজ রাখে।
  • জরলতা পরিহার ও জীবন ঘনিষ্ঠতা: ইজতিহাদ ইসলামি বিধানের বাস্তবায়ন সহজ করে সমাজকে গোঁড়ামি ও স্থবিরতার হাত থেকে মুক্ত রাখে। আল্লামা ইকবাল ইজতিহাদকে ইসলামের ‘গতির মূল চালিকাশক্তি’ (The principle of movement) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

১২. উমাইয়া আমলে আরবি সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর।

[Describe the characteristics of Arabic literature during the Umayyad period.]

উমাইয়া খিলাফতকালে (৬৬১-৭৫০ খ্রি.) রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে আরবি সাহিত্যে বেশ কিছু নতুন বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়:

  • রাজনৈতিক কবিতার বিকাশ (Political Poetry): উমাইয়া, শিয়া, খারেজি ও জুবায়েরী রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ প্রচারের জন্য কবিরা দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কবিতা রচনা শুরু করেন।
  • নাকাইদ কবিতা (Naqaid/Duel Poems): এ যুগের সবচেয়ে চমকপ্রদ কাব্যধারা ছিল দুই কবির ছন্দ ও ব্যঙ্গাত্মক দ্বৈরথ বা নাকাইদ। জারির, ফারাজদাক ও আল-আখতাল এই ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ পুরোধা ছিলেন।
  • গজল ও প্রেমগীতির প্রসার: মক্কা ও মদিনার অভিজাত সমাজে পরিশীলিত ও রোমান্টিক প্রণয়ধর্মী গজল কবিতার ব্যাপক প্রসার ঘটে (উমর ইবনে আবি রাবিয়াহ এবং মাজনু-লায়লার প্রেমোপাখ্যান খ্যাত জামিল বুছাইনা)।
  • গদ্য ও সরকারি লিপিশৈলীর সূচনা: খলিফা আব্দুল মালিকের নির্দেশে আরবিকে রাষ্ট্রভাষা করার পর আব্দুল হামিদ আল-কাতিবের হাত ধরে রাষ্ট্রীয় চিঠিপত্র ও সাহিত্যিক গদ্যের সূচনা হয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ঈমানের মৌলিক স্তম্ভ কয়টি ও কী কী?

হাদিসে জিবরীল অনুসারে ঈমানের মৌলিক স্তম্ভ ছয়টি: ১. আল্লাহর প্রতি ঈমান, ২. ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান, ৩. আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, ৪. নবী-রাসূলগণের প্রতি ঈমান, ৫. আখিরাতের প্রতি ঈমান এবং ৬. তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান।

২. ইসলামকে কেন পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা বলা হয়?

কারণ ইসলাম কেবল আনুষ্ঠানিক উপাসনা নয়; বরং মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ, ভারসাম্যপূর্ণ ও শাশ্বত নীতিমালা উপহার দেয়।

৩. মুসলিম দর্শনের মূল ভিত্তি বা উৎস কী?

মুসলিম দর্শনের মূল ভিত্তি হলো পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ চিন্তা-ভাবনার আহ্বান, যার সাথে পরবর্তীতে মুসলিম পণ্ডিতদের দ্বারা প্রাচীন গ্রিক দর্শনের পর্যালোচনা ও ইসলামি দৃষ্টিকোণে সংস্কার যুক্ত হয়।

৪. জাহেলি যুগের শ্রেষ্ঠ কাব্য সংকলনকে কী বলা হয়?

প্রাক-ইসলামি বা জাহেলি যুগের শ্রেষ্ঠ সাতটি দীর্ঘ গীতিকাব্যকে ‘মুআল্লাকা’ (ঝুলন্ত কাব্যমালা) বলা হয়, যা স্বর্ণাক্ষরে লিখে কাবা শরীফের গায়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।

৫. চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সীনার সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ কোনটি?

ইবনে সীনার অমর চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশ্বকোষ হলো ‘আল-কানুন ফিত তিব্ব’ (The Canon of Medicine), যা শত শত বছর ধরে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রধান পাঠ্যগ্রন্থ ছিল।

৬. ইসলামি শরীয়াহর গতিশীলতা রক্ষায় ইজতিহাদের ভূমিকা কী?

ইজতিহাদ কুরআন ও সুন্নাহর আলোতে আধুনিক যুগের মানবজীবনের নতুন নতুন সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান বের করে ইসলামি বিধানকে চিরকাল প্রাসঙ্গিক ও গতিশীল রাখে।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *