ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2023
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: ইসলামে ধর্মীয়, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ধারার বিকাশ
বিষয় কোড: 205307 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি
১. হাদিসের সংজ্ঞা দাও। হাদিস সংরক্ষণ ও সংকলনের ইতিহাস লেখ।
[Define Hadith. Write down the history of preservation and compilation of Hadith.]
ক. হাদিসের সংজ্ঞা:
আভিধানিক অর্থ: আরবি ‘হাদিস’ (حديث) শব্দের আভিধানিক অর্থ নতুন, প্রাচীন এর বিপরীত, কথা, বাণী বা সংবাদ।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুহাদ্দিসীন ও ফকিহগণের পরিভাষায়, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র কথা (ক্বওল), কাজ (ফেল), মৌন সম্মতি (তাকরির) এবং তাঁর শারীরিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নিখুঁত বর্ণনাকে হাদিস বা সুন্নাহ বলা হয়। সাহাবি ও তাবেয়ীগণের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডকেও বিশেষ অর্থে হাদিস (মাওকুফ ও মাকতু) বলা হয়। হাদিসের দুটি প্রধান অংশ থাকে: ১. সনদ (বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিক পরম্পরা) এবং ২. মতন (মূল বক্তব্য)।
খ. হাদিস সংরক্ষণ ও সংকলনের ঐতিহাসিক পর্যায়সমূহ:
- নবীজির যুগ (সংরক্ষণ ও ব্যক্তিগত লিপিবদ্ধকরণ): প্রারম্ভে কুরআনের সাথে মিশ্রিত হওয়ার ভয়ে হাদিস লিপিবদ্ধে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পরবর্তীতে কুরআনের আয়াত সুনির্দিষ্ট হওয়ার পর নবীজি হাদিস লেখার সাধারণ অনুমতি দেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) প্রস্তুত করেন বিখ্যাত ‘আস-সহিফাতুস সাদিকাহ’। এছাড়া আবু হুরায়রা ও আলী (রা.)-এর নিকট হাদিসের সংকলন ছিল। সাহাবিদের অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ছিল মুখস্থ সংরক্ষণের মূল ভিত্তি।
- খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবিদের যুগ: এ যুগে সাহাবিরা দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে মৌখিক বর্ণনা ও পাঠদানের মাধ্যমে হাদিস সংরক্ষণ করেন। হযরত আয়েশা, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) হাজার হাজার হাদিস শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেন।
- তাবেয়ী যুগ ও রাষ্ট্রীয় সংকলনের সূচনা (প্রথম হিজরি শতকের শেষভাগ): উমাইয়া খলিফা হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) সাহাবিদের ইন্তেকালের পর হাদিস বিলুপ্তির আশঙ্কায় রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করে হাদিস সংকলনের নির্দেশ দেন। মদিনার গভর্নর আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আমর এবং প্রখ্যাত ইমাম ইবনে শিহাব আজ-জুহরি (রহ.) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম হাদিস সংকলন করেন।
- দ্বিতীয় হিজরি শতক (বিষয়ভিত্তিক সংকলন): এ যুগে বিভিন্ন অধ্যায় ও ফিকহি মাসআলা অনুযায়ী হাদিস বিন্যাস শুরু হয়। ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) প্রণয়ন করেন সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘মুয়াত্তা ইমাম মালিক’। এছাড়া সুফিয়ান সাওরি ও আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের সংকলন উল্লেখযোগ্য।
- তৃতীয় হিজরি শতক (হাদিস সংকলনের স্বর্ণযুগ): এ যুগে বিশুদ্ধ হাদিসের সাথে দুর্বল হাদিস পৃথকীকরণে বৈজ্ঞানিক সনদ যাচাই (ইলমুল জারহ ওয়াত তা’দীল) ও রাবীদের জীবনী শাস্ত্র (আসমাউর রিজাল) চূড়ান্ত উৎকর্ষ লাভ করে। সংকলিত হয় হাদিসের বিশুদ্ধতম ছয়টি সংকলন ‘সিহাহ সিত্তাহ’: ১. সহীহ আল-বুখারী (ইমাম বুখারী), ২. সহীহ মুসলিম (ইমাম মুসলিম), ৩. সুনানে আবু দাউদ (ইমাম আবু দাউদ), ৪. জামি আত-তিরমিজি (ইমাম তিরমিজি), ৫. সুনানে নাসাঈ (ইমাম নাসাঈ), এবং ৬. সুনানে ইবনে মাজাহ (ইমাম ইবনে মাজাহ)।
২. ইসলামের মৌলিক নীতিসমূহ আলোচনা কর।
[Discuss the fundamental principles of Islam.]
ক. ভূমিকা:
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ, শাশ্বত ও ঐশী জীবনব্যবস্থা। এটি এমন কিছু মৌলিক ভিত্তি ও জীবনদর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা মানুষের আত্মিক উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল শাখাকে সুশৃঙ্খল ও ভারসাম্যপূর্ণ রূপ দান করে।
খ. ইসলামের মৌলিক নীতিসমূহ:
- তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ (Monotheism): ইসলামের সর্বপ্রধান ভিত্তি হলো তাওহীদ। আল্লাহ তাআলা স্বীয় সত্তা, গুণাবলি ও সার্বভৌম কর্তৃত্বে একক ও অংশীদারহীন। মহাবিশ্বের স্রষ্টা, নিয়ন্ত্রক ও আইনদাতা একমাত্র তিনিই (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)। তাওহীদ মানুষের বিবেককে সকল প্রকার পৌত্তলিকতা ও পার্থিব দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়।
- রিসালাত বা নবুওয়াত (Prophethood): মানবজাতিকে আল্লাহর পরিচয় ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে প্রেরিত নবী-রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস। হযরত মুহাম্মদ (সা.) হলেন শেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী (খাতামুন্নাবিয়্যীন), যাঁর আদর্শ অনুসরণেই মানবজাতির সর্বাঙ্গীন কল্যাণ নিহিত।
- আখিরাত বা পরকালীন জবাবদিহিতা (Accountability): পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং মৃত্যুর পর এক অনন্তকালের জীবনের সূচনা হবে। হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহর দরবারে প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে। এ বিশ্বাস মানুষকে গোপনে ও প্রকাশ্যে পাপ থেকে বিরত রাখে এবং সততার সাথে দায়িত্ব পালনে বাধ্য করে।
- আদল ও ইনসাফ (Universal Justice): জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা আত্মীয়তার ঊর্ধ্বে উঠে সমাজে ন্যায়বিচার কায়েম করা ইসলামের অবিচ্ছেদ্য নীতি। কুরআনে কঠোর নির্দেশ: “কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদের ন্যায়বিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৮)।
- উখুওয়াত বা সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও সাম্য (Brotherhood & Equality): সমগ্র মানবজাতি আদম ও হাওয়া থেকে সৃষ্ট এক পরিবারের সদস্য। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)।
- আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ): সমাজে ন্যায় ও কল্যাণের প্রসার এবং অন্যায়, দুর্নীতি ও জুলুমের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রতিটি মুসলিমের সম্মিলিত দায়িত্ব।
৩. মুয়াল্লাকা কী? ইমরুল কায়েস রচিত মুয়াল্লাকার বিষয়বস্তু আলোচনা কর।
[What is the Muallaqah? Discuss the subject-matter of Muallaqah written by Imrul Qayes.]
ক. মুয়াল্লাকার পরিচয় ও সংজ্ঞা:
আরবি ‘মুয়াল্লাকা’ (المعلقة) শব্দের আভিধানিক অর্থ ঝুলন্ত বা বিলম্বিত বস্তু (বহুবচনে ‘মুয়াল্লাকাত’)। প্রাক-ইসলামি বা জাহেলি যুগে মক্কার ওকাজ মেলার বার্ষিক কবিতা প্রতিযোগিতায় আরবের শ্রেষ্ঠ কবিদের সহস্র কবিতার মধ্য থেকে বিচারকদের রায়ে নির্বাচিত সর্বশ্রেষ্ঠ সাতটি দীর্ঘ কাসিদাকে মিসরীয় মিহি কাপড়ে স্বর্ণাক্ষরে লিখে কাবা ঘরের প্রাচীরে ঝুলিয়ে রাখা হতো। এ কারণেই এ অমর কাব্যমালাকে ‘মুয়াল্লাকা’ বা ‘সাবা মুয়াল্লাকা’ (সাতটি ঝুলন্ত গীতিগাথা) বলা হয়।
খ. ইমরুল কায়েসের পরিচয়:
ইমরুল কায়েস ছিলেন কিনদা গোত্রের এক রাজপুত্র। তিনি ছিলেন প্রাক-ইসলামি আরবি কবিতার সম্রাট ও দিকপাল (Malik ad-Dillil বা পথভ্রষ্ট রাজা)। তাঁর মুয়াল্লাকাটিকেই সাতটি মুয়াল্লাকার মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ও প্রথম বলে সর্বসম্মতভাবে গণ্য করা হয়।
গ. ইমরুল কায়েসের মুয়াল্লাকার মূল বিষয়বস্তু:
- পরিত্যক্ত প্রেমিকার স্মৃতিচারণ (নাসিব): কবিতার সূচনা হয়েছে সুপরিচিত আবেগঘন চরণে: “কিফা নাবকি মিন যিকরা হাবীবিন ওয়া মানযিলি…” (থামো! এসো আমরা কেঁদে নিই প্রেমিকা ও তার বসতির স্মৃতিতে, যা সিক্ত বাতাসের মাঝে অবস্থিত ছিল)। এতে প্রিয়ার বিরহ এবং ফেলে যাওয়া তাবুর ধ্বংসাবশেষ দেখে কবির হৃদয়বিদারক হাহাকার মূর্ত হয়ে উঠেছে।
- প্রেমোপাখ্যান ও উনায়জার প্রণয়কাহিনি: কবি তাঁর প্রিয়তমা উনায়জার সাথে দারাত জুলজুলের ঝরনায় গোপন মিলন, উটের হাওদায় আরোহণ এবং প্রণয়ের উচ্ছল স্মৃতির চিত্র নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন।
- মরুভূমির রাতের ভয়াবহতা: অন্ধকার রাতের রূপায়ণে কবি এক অনন্য উপমা ব্যবহার করেছেন। তিনি রাতকে সুবিশাল সামুদ্রিক তরঙ্গের সাথে তুলনা করেছেন, যা তার বুক ও উদর কবির ওপর চেপে দিয়ে কবিকে দীর্ঘ যন্ত্রণায় আচ্ছন্ন করে রাখে।
- দ্রুতগামী তেজস্বী ঘোড়ার বর্ণনা: তাঁর দ্রুতগামী অশ্বের বর্ণনা আরবি সাহিত্যের ক্লাসিক্যাল সম্পদ। অশ্বটি এত দ্রুত যে তা উঁচু পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া ভারী পাথরের মতো বেগে ধাবিত হয় এবং হরিণ ও বুনো গাধা শিকারে কবির বিশ্বস্ত সঙ্গী।
- প্রলয়ঙ্করী কালবৈশাখীর ঝড় ও বৃষ্টিপাত: কবিতার সমাপ্তিতে মরুর বুকে বজ্রবিদ্যুৎপূর্ণ ভয়াবহ মেঘমালা, মুষলধারে বৃষ্টি এবং জলোচ্ছ্বাসে মরুভূমির কণ্টকাকীর্ণ বৃক্ষ ও জনপদ প্লাবিত হওয়ার এক জাঁকজমকপূর্ণ জীবন্ত চিত্রকল্প অঙ্কন করেছেন।
৪. মুখাদরামুন কবি কারা? তাদের কবিতার বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর।
[Who were the Mukhadramoon poets? Mention the characteristics of their poem.]
ক. মুখাদরামুন কবিদের পরিচয়:
আরবি সাহিত্য সমালোচনার পরিভাষায়, যেসব কবি স্বীয় জীবনের একটি অংশ প্রাক-ইসলামি জাহেলি যুগে অতিবাহিত করেছেন এবং পরবর্তীতে ইসলামের আলোকোজ্জ্বল যুগ প্রত্যক্ষ করে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং উভয় যুগেই কাব্যচর্চা করেছেন, তাদের ‘শুয়ারা আল-মুখাদরামুন’ (المخضرمون) বা যুগসন্ধিক্ষণের কবি বলা হয়। হাসসান ইবনে সাবিত, কাব বিন যুহাইর, আল-খানসা, লাবিদ ইবনে রাবিয়া, এবং আল-হুতাইয়া হলেন এই ধারার প্রখ্যাত প্রতিনিধি।
খ. মুখাদরামুন কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- জাহেলি কাঠামো ও ইসলামি চেতনার অপূর্ব মেলবন্ধন: তারা কবিতার ক্লাসিক্যাল বহর ও কাসিদার ঐতিহ্য বজায় রাখলেও কবিতার মূল আত্মায় ইসলামি তাওহীদ, তাকওয়া ও আখিরাতের চেতনার সঞ্চার করেন।
- অশ্লীলতা ও অন্ধ গোত্রপ্রীতি বর্জন: জাহেলি যুগের বেলেল্লাপনা, নারীদেহের স্থূল কামোদ্দীপক বর্ণনা, মদ্যপান ও স্বগোত্রের অন্ধ অহংকার (আসাবিয়াহ) পরিহার করে শালীন, পবিত্র ও সংযত ভাষা প্রয়োগ করেন।
- কুরআনিক শব্দ ও উপমার আত্মীকরণ: পবিত্র কুরআনের অনন্য লালিত্যপূর্ণ শব্দসম্ভার, পারলৌকিক জীবনের উপমা এবং হিদায়েতের গভীর প্রত্যয় তাদের কবিতার ভাষাকে অভূতপূর্ব প্রাঞ্জলতা দান করে।
- ইসলামের প্রতিরক্ষা ও নাত-ই রাসুল: কুরাইশ কাফেরদের ব্যঙ্গাত্মক কবিতার মুখে ইসলাম ও বিশ্বনবী (সা.)-এর পবিত্র চরিত্রকে রক্ষা করার লক্ষ্যে রচিত প্রতিরক্ষামূলক কবিতা (যেমন হাসসান ইবনে সাবিতের কাব্য) এ যুগের প্রধান বৈপ্লবিক সংযোজন ছিল।
- শোকগাঁথা বা মার্সিয়ার আত্মিক রূপান্তর: কবি আল-খানসা জাহেলি যুগে ভাই সাখরের জন্য যে ব্যক্তিগত হাহাকারপূর্ণ শোকগাথা লিখতেন, ইসলাম গ্রহণের পর তা আল্লাহর ওপর সন্তুষ্টি ও শাহাদাতের মর্যাদার শাশ্বত রূপ লাভ করে। কাদিসিয়ার যুদ্ধে তাঁর চার পুত্র শহীদ হলে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে শোকের নতুন রূপ উপহার দেন।
৫. হাসসান ইবনু সাবিত কে ছিলেন? তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্যাবলি মূল্যায়ন কর।
[Who was Hassan Ibnu Sabit? Evaluate the characteristics of his poetry.]
ক. হাসসান ইবনে সাবিত (রা.)-এর পরিচয়:
হযরত হাসসান ইবনে সাবিত আল-আনসারী (রা.) ছিলেন মদিনার খাযরাজ গোত্রের সন্তান এবং তিনি ইতিহাসে ‘শায়িরুর রাসুল’ (রসুলুল্লাহর কবি বা Royal Poet of the Prophet) হিসেবে অমর হয়ে আছেন। তিনি ৬০ বছর জাহেলি যুগে অতিবাহিত করার পর মদিনা হিজরতের প্রাক্কালে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আরও প্রায় ৬০ বছর মুসলিম হিসেবে জীবনযাপন করে প্রায় ১২০ বছর বয়সে ওফাত লাভ করেন। ফলে তিনি ছিলেন মুখাদরামুন কবিদের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব।
খ. হাসসান ইবনে সাবিতের কবিতার বৈশিষ্ট্যাবলি:
- মসজিদে নববীর মিম্বার ও রুহুল কুদুসের সমর্থন: রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববীতে তাঁর জন্য একটি বিশেষ মিম্বার বা আসন স্থাপন করে দিয়েছিলেন, যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি কবিতা পাঠ করতেন। নবীজি তাঁর জন্য ঐতিহাসিক দোয়া করেছিলেন: “আল্লাহুম্মা আইয়্যিদহু বি রুহিল কুদুস” (হে আল্লাহ! আপনি জিবরীলের মাধ্যমে হাসসানকে সাহায্য করুন)।
- ইসলাম ও নবীর প্রতিরক্ষামূলক কবিতা: মক্কার কুরাইশ কবিরা (আমর ইবনুল আস, আব্দুল্লাহ ইবনে জিব’আরি) যখন বিশ্বনবীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ব্যঙ্গ কবিতা রচনা করত, তখন হাসসান তাঁর ক্ষুরধার লেখনী দিয়ে তাদের সমুচিত দাঁতভাঙা জবাব দিতেন। নবীজি বলতেন, “হাসসানের কবিতার আঘাত কুরাইশদের গায়ে তীরের চেয়েও বেশি বিঁধত।”
- অনুপম নাত ও স্তুতিগাথা (Madah): বিশ্বনবীর পবিত্র রূপ ও অনুপম চরিত্রের প্রশংসায় তিনি যেসব অমর পঙ্ক্তি রচনা করেছেন তা কিয়ামত পর্যন্ত সিরাত সাহিত্যের রত্ন হয়ে থাকবে:
“ওয়া আহসানু মিনকা লাম তারা কাত্তু আইনী, ওয়া আজমালু মিনকা লাম তালিদিন নিসা-উ; খুলিক্বতা মুবাররাআন মিন কুল্লি আইবিন, কাআন্নাকা ক্বাদ খুলিক্বতা কামা তাশা-উ।”
(আপনার চেয়ে সুন্দর মানুষ আমার চোখ কখনো দেখেনি, আপনার চেয়ে অপরূপ সন্তান কোনো নারী কখনো প্রসব করেনি; আপনি সকল ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে এমনভাবে সৃষ্ট হয়েছেন, যেন আপনি ঠিক যেমনটি চেয়েছিলেন আপনাকে ঠিক তেমনিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে!) - শোকগাথা (মার্সিয়া): মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর তাঁর রচিত শোকগাথা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধুর, যাতে উম্মতের অপূরণীয় ক্ষতির গভীর আহাজারি ফুটে উঠেছে।
৬. চিকিৎসা বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান উল্লেখ কর।
[Trace out the contributions of the Muslims towards medical science.]
ক. ভূমিকা:
মধ্যযুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অবদান ছিল বৈপ্লবিক ও যুগান্তকারী। গ্রিক ও ভারতীয় প্রাচীন চিকিৎসাকে কেবল সংরক্ষণ নয়; বরং ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, আধুনিক হাসপাতাল ও ফার্মাকোলজির আবিষ্কারের মাধ্যমে মুসলিমগণ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেন।
খ. শীর্ষস্থানীয় মুসলিম চিকিৎসাবিদদের কালজয়ী অবদান:
- আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাযী (Rhazes): বসন্ত (Smallpox) ও হাম (Measles)-এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট ক্লিনিক্যাল পার্থক্য নির্ণয়কারী বিশ্বের প্রথম চিকিৎসক। তাঁর রচিত সুবিশাল ২৫ খণ্ডের চিকিৎসা বিশ্বকোষ ‘কিতাব আল-হাবী’ শত শত বছর ইউরোপে সমাদৃত ছিল। তিনি সেলাইয়ের কাজে ক্যাটগাট (Catgut) এবং অ্যালকোহলকে অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে ব্যবহারের সূচনা করেন।
- ইবনে সীনা (Avicenna): চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। তাঁর রচিত পাঁচ খণ্ডের ‘আল-কানুন ফিত তিব্ব’ (The Canon of Medicine) সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের প্রধান পাঠ্যপুস্তক ছিল। তিনি সংক্রামক রোগের বিস্তার, কোয়ারেন্টিন পদ্ধতি এবং মনোদৈহিক রোগের চিকিৎসার আবিষ্কারক।
- আবুল কাসিম আল-জাহারাবি (Abulcasis): আধুনিক শল্যচিকিৎসার জনক (Father of Modern Surgery)। স্পেনের কর্ডোভায় তিনি প্রণয়ন করেন ৩০ খণ্ডের গ্রন্থ ‘আত-তাসরিফ’। তিনি দুই শতাধিক আধুনিক অস্ত্রোপচার যন্ত্রের নকশা ও ব্যবহার আবিষ্কার করেন।
- ইবনুন নাফিস (Ibn al-Nafis): উইলিয়াম হার্ভের প্রায় চারশত বছর পূর্বে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তিনিই মানবদেহে পালমোনারি রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া (রক্তের ফুসফুসীয় সঞ্চালন) নিখুঁতভাবে আবিষ্কার ও ব্যাখ্যা করেন।
- হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা (বিমারিস্তান): বাগদাদ, কায়রো ও দামেস্কে প্রতিষ্ঠিত বিমারিস্তানসমূহ ছিল বিশ্বের প্রথম আধুনিক হাসপাতাল। এতে পুরুষ ও নারীদের পৃথক ওয়ার্ড, মানসিক রোগীদের সঙ্গীত থেরাপি এবং চিকিৎসা শেষে রোগীদের সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আর্থিক অনুদান প্রদান করা হতো।
৭. ইতিহাস চর্চায় মুসলিমদের অবদান পর্যালোচনা কর।
[Review the contributions of the Muslims in Historiography.]
ক. ইতিহাস চর্চার উদ্ভব ও ইসলামি প্রেরণা:
পবিত্র কুরআনে অতীত জাতিসমূহের উত্থান-পতনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের জোরালো নির্দেশ এবং মহানবী (সা.)-এর মাগাজি ও সাহাবিদের জীবনবৃত্তান্ত নিখুঁতভাবে সংরক্ষণের তাগিদ থেকেই ইসলামে ইতিহাস চর্চা (ইলমুত তারিখ)-র প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সূচিত হয়। সনদ পরীক্ষা ও রাবীদের সততা যাচাইয়ের বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড ইতিহাসকে রূপকথা থেকে মুক্ত করে এক খাঁটি বিজ্ঞানে রূপান্তর করে।
খ. প্রখ্যাত মুসলিম ঐতিহাসিক ও তাঁদের অবদান:
- ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশাম: বিশ্বনবী (সা.)-এর প্রামাণ্য জীবনী ও সামরিক অভিযানের ধারাবাহিক ইতিহাস সংকলনের মাধ্যমে সিরাত ও ইতিহাস শাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেন।
- আল-ওয়াকিদি ও ইবনে সা’দ: ওয়াকিদি মাগাজি সাহিত্যের বিকাশ ঘটান এবং ইবনে সা’দ প্রণয়ন করেন সাহাবি ও তাবেয়ীদের সুবিশাল জীবনীকোষ ‘কিতাব আত-তাবাকাত আল-কুবরা’।
- মুহাম্মদ ইবনে জারির আল-তাবারি: মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক। তিনি প্রণয়ন করেন বিশ্বকোষীয় ইতিহাস গ্রন্থ ‘তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক’ (তারিখে তাবারি), যাতে সৃষ্টির সূচনা থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত সালতামামি অনুসারে নিখুঁত ইতিহাস সংরক্ষিত হয়েছে।
- আল-মাসুদী (আরবের হেরোডোটাস): তিনি প্রণয়ন করেন ‘মুরুজুয যাহাব’ (স্বর্ণভূমি ও রত্নখনি)। তিনি ভূগোল ও ইতিহাসের চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়ে বিভিন্ন জাতির সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন।
- ইবনে খালদুন (ইতিহাস দর্শনের জনক): চতুর্দশ শতাব্দীর তিউনিসিয়ার এই প্রবাদপ্রতিম মনীষী প্রণয়ন করেন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘মুকাদ্দিমা’ (Prolegomena)। তিনি অন্ধভাবে তথ্য গ্রহণ না করে সামাজিক কার্যকারণ, পরিবেশের প্রভাব এবং ‘আসাবিয়াহ’ (সামাজিক সংহতি)-র ভিত্তিতে সভ্যতার উত্থান-পতনের গতিশীল তত্ত্ব আবিষ্কার করে আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাস দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করেন।
৮. মু’তাজিলা কারা? তাদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।
[Who are the Mutajilaties? Describe their origin and development.]
ক. মু’তাজিলাদের পরিচয় ও সংজ্ঞা:
আরবি ‘মু’তাজিলা’ (المعتزلة) শব্দটি ‘ই’তিযাল’ (اعتزال) ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ পৃথক হয়ে যাওয়া বা দলত্যাগ করা। ইসলামি ধর্মতত্ত্বের ইতিহাসে যারা ওহীর ওপর মানুষের বুদ্ধি ও যুক্তির প্রাধান্য দিয়ে ইসলামি আকিদাকে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছে, সেই চরম যুক্তিবাদী সম্প্রদায়কে মু’তাজিলা (Mutazilites) বলা হয়। তারা নিজেদের ‘আহলুত তাওহীদ ওয়াল আদল’ (একত্ববাদ ও ইনসাফের অনুসারী) বলে দাবি করত।
খ. উৎপত্তি ও প্রেক্ষাপট:
উমাইয়া খিলাফতকালে বসরায় বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত হাসান বসরি (রহ.)-এর জ্ঞানগর্ভ মজলিসে কবিরা গুনাহগার ব্যক্তির অবস্থান নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। এমতাবস্থায় তাঁর অন্যতম ছাত্র ওয়াসিল ইবনে আতা (মৃ. ৭৪৮ খ্রি.) হাসান বসরির সিদ্ধান্তের বিপরীতে গিয়ে ঘোষণা করেন যে, কবিরা গুনাহকারী ব্যক্তি মুমিনও নয় আবার কাফেরও নয়, বরং সে দুই অবস্থানের মধ্যবর্তী অবস্থানে (আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইনি) থাকবে। এ ফতোয়া দিয়ে ওয়াসিল হাসান বসরির মজলিস ত্যাগ করে মসজিদের এক কোণে পৃথক হালাকা গড়ে তোলেন। তখন হাসান বসরি মন্তব্য করেন: “ই’তাযালা আন্না ওয়াসিল” (ওয়াসিল আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গেছে)। সেখান থেকেই তাদের নাম হয় ‘মু’তাজিলা’। আমর ইবনুল উবায়দ ওয়াসিলের সাথে যোগ দিয়ে এ মতবাদের প্রসার ঘটান।
গ. মু’তাজিলাদের পাঁচটি মূলনীতি (উসুলুল খামসা):
- আত-তাওহীদ (একত্ববাদ): আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলিকে তাঁর মূল সত্তার অতিরিক্ত মনে করলে বহুত্ববাদের জন্ম হয় বলে তারা সিফাতসমূহকে অস্বীকার করে এবং কুরআনকে সৃষ্টি (খালকুল কুরআন) বলে দাবি করে।
- আল-আদল (ন্যায়পরায়ণতা): তারা মানুষের ভাগ্যের পূর্বনির্ধারণ (তাকদীর) অস্বীকার করে মানুষকে স্বীয় কর্মের সম্পূর্ণ স্বাধীন স্রষ্টা মনে করে।
- আল-ওয়াদ ওয়াল ওয়াইদ (প্রতিশ্রুতি ও ভীতি প্রদর্শন): ভালো কাজের পুরস্কার এবং পাপের জন্য জাহান্নামের শাস্তি দেওয়া আল্লাহর ওপর অপরিহার্য (ওয়াজিব)।
- আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন: কবিরা গুনাহকারী ব্যক্তি মুমিন ও কাফেরের মধ্যবর্তী এক অবস্থায় থাকবে।
- আল-আমর বিল মারুফ ওয়ান নাহি আনিল মুনকার: প্রয়োজনবোধে রাষ্ট্রীয় শক্তির জোরে স্বীয় যুক্তিবাদী মতবাদ প্রজাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া।
ঘ. ক্রমবিকাশ ও রাষ্ট্রীয় মিহনা:
আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন, আল-মু’তাসিম ও আল-ওয়াসিকের আমলে মু’তাজিলা মতবাদ রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা পায়। এ সময় ‘খালকুল কুরআন’ (কুরআন সৃষ্টি) মতবাদ না মানায় ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)সহ অসংখ্য আলেমকে কারারুদ্ধ ও নির্মম চাবুক মারা হয়, যা ইতিহাসে ‘মিহনা’ (Mihna) বা ইনকুইজিশন নামে কুখ্যাত। পরবর্তীতে খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল মু’তাজিলাদের বরখাস্ত করে সুন্নী আকিদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী ও আবু মনসুর আল-মাতুরিদী যুক্তির সাহায্যেই মু’তাজিলাদের ভ্রান্ত যুক্তি খণ্ডন করে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদা চিরতরে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি
৯। সালাতের ধর্মীয় গুরুত্ব কী?
[What is the religious importance of Salat?]
সালাত হলো ইসলামের ব্যবহারিক স্তম্ভসমূহের মধ্যে প্রধানতম স্তম্ভ। হাদিস শরীফে রাসুলুল্লাহ (সা.) একে ‘দ্বীনের স্তম্ভ’ (ইমাদুদ্দীন) এবং ‘বেহেশতের চাবি’ (মিফতাহুল জান্নাহ) হিসেবে ঘোষণা করেছেন:
- ঈমান ও কুফরের পার্থক্যকারী: সালাত ত্যাগ করা কুফরের সমতুল্য। হাশরের ময়দানে বান্দার আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম সালাতের হিসাব নেওয়া হবে।
- পাপমোচন ও চারিত্রিক শুচিতা: দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত বান্দার সগিরা গুনাহসমূহ ক্ষমা করিয়ে দেয় এবং মানুষকে অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে (সূরা আল-আনকাবুত: ৪৫)।
১০। খতমে নবুয়তের ধারণা দাও।
[Give an idea about finality of Prophethood.]
খতমে নবুয়ত (Finality of Prophethood): ‘খতম’ অর্থ শেষ বা সিলমোহর। ইসলামি আকিদার চূড়ান্ত মৌলিক বিশ্বাস হলো—হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) হলেন মহান আল্লাহ প্রেরিত নবী ও রাসূলগণের সিলসিলার সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী; তাঁর পরে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নতুন নবী বা রাসূল আগমন করবেন না।
- কুরআনের অকাট্য ঘোষণা: “মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রসূল এবং সর্বশেষ নবী (খাতামুন্নাবিয়্যীন)।” (সূরা আল-আহযাব: ৪০)। নবীজি (সা.) বলেছেন, “আনা খাতামুন্নাবিয়্যীন, লা নাবিয়্যা বা’দী” (আমি শেষ নবী, আমার পরে কোনো নবী নেই)। এ বিশ্বাস অস্বীকারকারী সর্বসম্মতিক্রমে কাফের।
১১। ‘বায়তুল হিকমাহ’ সম্পর্কে ধারণা দাও।
[Give an idea about ‘Bait-al-Hikmah’.]
বাইতুল হিকমাহ (House of Wisdom): আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন ৮৩০ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী বাগদাদে তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘বাইতুল হিকমাহ’ (জ্ঞানের গৃহ) প্রতিষ্ঠা করেন।
- কার্যক্রম ও গুরুত্ব: এটি একাধারে একটি বিশাল রাজকীয় গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার ও শাস্ত্রীয় গ্রন্থ রূপান্তর ব্যুরো হিসেবে কাজ করত। হুনাইন ইবনে ইসহাকের নেতৃত্বে প্রাচীন গ্রিক দর্শন, ভারতীয় গণিত ও পারসিক চিকিৎসাবিদ্যার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থসমূহ বিপুল অর্থ ব্যয়ে আরবি ভাষায় রূপান্তরিত করা হয়। এর মাধ্যমেই ইসলামি স্বর্ণযুগের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক বিপ্লব বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১২। ইসলামে সুফীবাদের ধারণা তুলে ধর।
[Introduce the concept of Sufism in Islam.]
সুফীবাদের পরিচয় (তাসাউফ): কুরআন ও হাদিসের পরিভাষায় যাকে ‘ইহসান’ বা ‘তাযকিয়ায়ে নফস’ (আত্মার পরিশুদ্ধি) বলা হয়, পরবর্তীতে তাকেই সুফীবাদ বা তাসাউফ নামে অভিহিত করা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো পার্থিব মোহ বর্জন করে নিবেদিত চিত্তে অন্তরে আল্লাহর প্রেম ও মারিফত অর্জন করা।
- মৌলিক স্তরসমূহ: সুফীবাদের পথ চারটি ধাপে বিন্যস্ত—শরীয়ত (আইনগত আনুগত্য), তরীকত (আধ্যাত্মিক সাধনা), হাকীকত (পরম সত্যের উপলব্ধি) এবং মারিফত (স্রষ্টার নিবিড় পরিচয়)। হাসান বসরি, রাবেয়া বসরী, জুনায়েদ বাগদাদী, আব্দুল কাদির জিলানী ও খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.)-এর মাধ্যমে সুফীবাদ সমগ্র বিশ্বে ইসলামের শান্তির বাণী ছড়িয়ে দিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. হাদিসের বিশুদ্ধতম ছয়টি কিতাবকে কী বলা হয়?
হাদিস শাস্ত্রের সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও প্রামাণ্য ছয়টি সংকলনকে যৌথভাবে ‘সিহাহ সিত্তাহ’ (ছয়টি বিশুদ্ধ কিতাব) বলা হয়।
২. মুখাদরামুন কবি কাদের বলা হয়?
যেসব কবি প্রাক-ইসলামি জাহেলি যুগ ও ইসলামি যুগ উভয় যুগেই জীবিত থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং কাব্যচর্চা করেছেন তাদের ‘মুখাদরামুন’ কবি বলা হয়।
৩. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারি কবি কে ছিলেন?
হযরত হাসসান ইবনে সাবিত আল-আনসারী (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবি ও প্রধান কবি (শায়িরুর রাসুল)।
৪. চিকিৎসা বিজ্ঞানে মুসলমানদের দুটি প্রধান ঐতিহাসিক অবদান কী?
আল-রাযী কর্তৃক বসন্ত ও হামের চিকিৎসা আবিষ্কার এবং ইবনে সীনা কর্তৃক রচিত বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা বিশ্বকোষ ‘আল-কানুন ফিত তিব্ব’।
৫. ইতিহাস দর্শনের জনক কাকে বলা হয়?
চতুর্দশ শতাব্দীর প্রখ্যাত মুসলিম মনীষী ও ‘মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থের প্রণেতা ইবনে খালদুনকে আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাস দর্শনের জনক বলা হয়।
৬. মুতাজিলা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
তাবেয়ী হযরত হাসান বসরির ছাত্র ওয়াসিল ইবনে আতা (মৃ. ৭৪৮ খ্রি.) ছিলেন চরম যুক্তিবাদী মু’তাজিলা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা।