ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2023
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: মুসলিম স্থাপত্য ও প্রত্নতত্ত্ব (Muslim Architecture and Archaeology)
বিষয় কোড: 205306 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি
১. মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাসে মসজিদের গুরুত্ব তুলে ধরো।
[Mention the architectural importance of Masjid in the Muslim History.]
ক. মুসলিম স্থাপত্যের মূল উৎস ও কেন্দ্রবিন্দু:
ইসলামি সভ্যতার সামগ্রিক স্থাপত্যিক কীর্তিগুলোর মধ্যে ‘মসজিদ’ (Masjid) হলো সর্বাধিক মৌলিক, পবিত্র ও প্রভাবশালী উপাদান। অন্যান্য ধর্মে উপাসনালয় কেবল পুরোহিতদের আনুষ্ঠানিকতার জন্য নির্মিত হলেও ইসলামে মসজিদ হলো একাধারে এবাদতখানা, সামাজিক মেলবন্ধন ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রাণকেন্দ্র। মুসলিম স্থাপত্যের প্রতিটি কাঠামোগত উদ্ভাবন—খিলান (Arch), গম্বুজ (Dome), মিনার (Minaret), মিহরাব (Mihrab), সাহন (Courtyard) এবং ক্যালিগ্রাফিক অলঙ্করণ—মসজিদকে ঘিরেই উৎপত্তি ও চরম উৎকর্ষ লাভ করেছে।
খ. স্থাপত্যিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
- ইসলামি স্থাপত্যরীতির আদি মডেল: ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.) কর্তৃক মদিনায় প্রতিষ্ঠিত ‘মসজিদে নববী’ পরবর্তী সকল হাইপোস্টাইল ও গম্বুজযুক্ত ইসলামি স্থাপত্যের আদি আর্কিটাইপ (Archetype) নির্ধারণ করে দেয়।
- জ্যামিতিক ও ক্যালিগ্রাফিক শিল্পের বিকাশ: ইসলামে জীবন্ত প্রাণীর মূর্তি ও প্রতিকৃতি নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকায় মুসলিম স্থপতিরা মসজিদে অপূর্ব জ্যামিতিক নকশা (Arabesque) এবং কুরআনিক আয়াত সংবলিত আরবি ক্যালিগ্রাফির অনুপম প্রয়োগ করেন, যা বিশ্ব স্থাপত্যে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটায়।
- সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রাণকেন্দ্র: মধ্যযুগে প্রতিটি মুসলিম নগর পরিকল্পনায় জামে মসজিদকে কেন্দ্র করেই বাজার (সুক), বিচারালয়, হাম্মামখানা ও আবাসিক মহল্লা বিন্যস্ত হতো। কায়রোর আল-আজহার বা তিউনিসিয়ার জায়তুনা মসজিদের মতো জামে মসজিদগুলো সুবিশাল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নিয়েছিল।
- সাংস্কৃতিক সমন্বয় ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ: দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ, কর্ডোভার জামে মসজিদ, ইস্তাম্বুলের সুলতান আহমদ (নীল মসজিদ) এবং আগ্রার তাজমহল ও জামে মসজিদ প্রমাণ করে যে মসজিদ নির্মাণের তাগিদেই মুসলিমগণ পাথর খোদাই, উন্নত গাঁথুনি এবং অ্যাকোস্টিক শব্দবিজ্ঞানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
২. মহানবী (স.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদিনা মসজিদের বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যাখ্যা কর।
[Describe the features of Madina Masjid as established by the Prophet (sm.).]
ক. নির্মাণকাল ও প্রাথমিক রূপরেখা:
৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় হিজরতের পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সাহল ও সুহাইল নামক দুই এতিম বালকের নিকট থেকে ক্রয়কৃত জমিতে সাহাবিদের সাথে নিয়ে স্বহস্তে মাটি ও ইট বহন করে নির্মাণ করেন পবিত্র ‘মসজিদে নববী’। এটিই পরবর্তীকালে সমগ্র ইসলামি মসজিদ স্থাপত্যের মানদণ্ডে পরিণত হয়।
খ. স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- আয়তন ও চতুষ্কোণ কাঠামো: আদি মসজিদটি ছিল প্রায় ১০০ হাত × ১০০ হাত পরিমাপের (প্রায় ৩৫ মিটার × ৩৫ মিটার) চার দেওয়াল বেষ্টিত চতুষ্কোণ চত্বর। দেওয়ালগুলো ছিল রোদে শুকানো কাঁচা মাটির ইটের তৈরি এবং ভিত্তি ছিল পাথরের।
- ছাদ ও স্তম্ভ (Zullah): কিবলার দিকে মুসল্লিদের রোদ ও বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে খেজুর গাছের কাণ্ডকে স্তম্ভ (Pillars) হিসেবে ব্যবহার করে খেজুর পাতা ও কাদার প্রলেপ দিয়ে একটি ছায়াঘেরা নামাজের স্থান (জুল্লাহ বা লিওয়ান) নির্মাণ করা হয়। বাকি অংশটি ছিল উন্মুক্ত সাহন (Courtyard)।
- সুফফা (আবাসিক পাঠশালা): মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণে খেজুর পাতার ছাউনিযুক্ত একটি উঁচু স্থান বা চত্বর তৈরি করা হয়, যাকে ‘আস-সুফফা’ বলা হয়। এটি ছিল নিঃস্ব, গৃহহীন জ্ঞানান্বেষী সাহাবিদের (আসহাবুচ ছুফফাহ) কুরআন ও হাদিস শিক্ষার বিশ্বের প্রথম আবাসিক ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র।
- হুজরাসমূহ (বাসগৃহ): মসজিদের পূর্ব প্রাচীর সংলগ্ন উম্মুল মুমিনীনগণের জন্য কাঁচা ইট ও খেজুর পাতার ছোট ছোট কুটির বা হুজরা নির্মাণ করা হয়, যার দরজা সরাসরি মসজিদের দিকে উন্মুক্ত ছিল। পরবর্তীতে বিশ্বনবী (সা.) হযরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরাতেই দাফন হন।
- বহুমুখী সামাজিক কেন্দ্র: এটি কেবল প্রার্থনার স্থান ছিল না; বরং একাধারে ছিল সংসদ ভবন, বিচারালয়, সামরিক হেডকোয়ার্টার, কূটনৈতিক অভ্যর্থনাকেন্দ্র এবং দরিদ্রদের পুনর্বাসন কেন্দ্র।
৩. ভূমি নকশাসহ কুব্বাতুস সাখরার স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য বর্ণনা কর।
[Describe the architectural features of the Qubbatus Sakhra with ground plane.]
ক. পটভূমি ও নির্মাণকাল:
উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান ৬৮৮ থেকে ৬৯১-৯২ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেমের হারাম আল-শরীফে পবিত্র পাথরের ওপর ইসলামের প্রাচীনতম টিকে থাকা স্থাপত্য নিদর্শন কুব্বাতুস সাখরা (Dome of the Rock) নির্মাণ করেন। এখান থেকেই মহানবী (সা.) মিরাজে গমন করেছিলেন।
খ. ভূমি নকশা (Ground Plan):
- অষ্টভুজাকার প্রাচীর (Octagonal Wall): এর ভূমি নকশা সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত ও নিখুঁত অষ্টভুজাকার। বাইরের আটটি দেওয়ালের প্রতিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ মিটার (৫৪ ফুট)। চারদিকের চারটি প্রধান দিক লক্ষ্য করে চারটি মার্বেল পাথরের দরজা রয়েছে (বাব আল-জান্নাহ, বাব আল-গারব, বাব আল-কিবলা, বাব আন-নবী)।
- দ্বৈত বৃত্তাকার প্রদক্ষিণ পথ (Double Ambulatory): কেন্দ্রের পবিত্র পাথরটিকে ঘিরে দুটি সমকেন্দ্রিক বৃত্তাকার হাঁটার পথ বা প্রদক্ষিণ গলি রয়েছে। বাইরের বৃত্তাকার পথটি আটটি অষ্টভুজাকার পিয়ার (Piers) ও ১৬টি মার্বেল কলামের ওপর এবং ভেতরের বৃত্তাকার পথটি ৪টি বৃহদাকার পিয়ার ও ১২টি করিন্থিয়ান কলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
গ. স্থাপত্যিক ও শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য:
- সুবিশাল স্বর্ণমণ্ডিত দ্বৈত গম্বুজ: কেন্দ্রে ২০.৪৪ মিটার ব্যাস এবং প্রায় ৩৫ মিটার উঁচু দ্বৈত স্তরের কাঠের গম্বুজ রয়েছে। বাইরের স্তরটি সিসা ও চকচকে সোনালী পাতে মোড়ানো, যা সূর্যের আলোয় দূর থেকে অপরূপ দ্যুতি ছড়ায়।
- চোখধাঁধানো মোজাইক ও ক্যালিগ্রাফি: ভেতরের দেওয়াল ও ড্রামে প্রায় ১,২০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে নীল, সবুজ ও সোনালী রঙের কাঁচের মোজাইক দিয়ে কুরআনিক জান্নাতের বৃক্ষ ও পুষ্পশোভিত নকশা করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ২৪০ মিটার দীর্ঘ কুরআনিক কুফি লিপির শিলালিপি, যা ইসলামের ইতিহাসে প্রাচীনতম টিকে থাকা ক্যালিগ্রাফিক প্রমাণ।
৪. উমাইয়া ও আব্বাসীয় মসজিদ স্থাপত্যের একটি তুলনামূলক আলোচনা কর।
[Discuss a comparative study between the Umayyad and Abbasids Masjid architecture.]
| তুলনার বিষয় | উমাইয়া মসজিদ স্থাপত্য (৬৬১-৭৫০) | আব্বাসীয় মসজিদ স্থাপত্য (৭৫০-১২৫৮) |
|---|---|---|
| ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব | সিরিয়াকেন্দ্রিক; বাইজেন্টাইন ও হেলেনীয় ক্লাসিক্যাল পাথরের শিল্পরীতি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। | ইরাককেন্দ্রিক (বাগদাদ ও সামাররা); প্রাচীন সাসানীয় পারসিক ও মেসোপটেমীয় ইট সংস্কৃতির প্রভাব। |
| নির্মাণ সামগ্রী | কাটা নিখুঁত চুনাপাথর, মার্বেল কলাম এবং কাঠের ছাদ ও বিম। | পোড়ামাটির ইট (Baked Bricks), রোদে শুকানো কাঁচা ইট এবং ভারী প্লাস্টার বা স্টুকো (Stucco)। |
| মিনারের ধরন | চতুষ্কোণ টাওয়ার আকৃতির মিনার (যেমন দামেস্ক জামে মসজিদের মিনারাতুল আরূস)। | সর্পিল ও পেঁচানো প্যাগোডা আকৃতির মিনার (যেমন সামাররার মালবিয়া মিনার ও আবু দুলাফ)। |
| অলঙ্করণ শৈলী | স্বর্ণ, নীল ও সবুজ কাঁচের মোজাইক চিত্রকর্ম ও উদ্ভিজ্জ নকশা। | প্লাস্টার বা স্টুকোর ওপর গভীর খোদাইকৃত জ্যামিতিক কারুকাজ (স্টাইল এ, বি ও সি)। |
| প্রতিনিধিত্বশীল উদাহরণ | দামেস্ক জামে মসজিদ, কুব্বাতুস সাখরা, আল-আকসা মসজিদ। | সামাররা জামে মসজিদ, আবু দুলাফ মসজিদ, কায়রোর ইবনে তুলুন মসজিদ। |
৫. কুয়াতুল ইসলাম মসজিদকে ইন্দো-মুসলিম স্থাপত্যের উদাহরণ হিসেবে মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the Quatul Islam Masjid as an example of Indo-Muslim architecture.]
ক. ঐতিহাসিক পটভূমি ও নির্মাণ:
দিল্লির প্রথম মুসলিম সুলতান কুতুবুদ্দীন আইবেক ১১৯২ থেকে ১১৯৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে দিল্লির কিল্লা রায় পিথোরায় ‘কুয়াতুল ইসলাম মসজিদ’ (Might of Islam Mosque) নির্মাণ করেন। এটি ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম বিজয়ের পর নির্মিত প্রাচীনতম বিদ্যমান জামে মসজিদ এবং ইন্দো-মুসলিম স্থাপত্যরীতির (Indo-Islamic Architecture) প্রথম ঐতিহাসিক মাইলফলক।
খ. ইন্দো-মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য মেলবন্ধন হিসেবে মূল্যায়ন:
- উপাদানের সংমিশ্রণ (স্পোলিয়া বা Spolia): মসজিদটি নির্মাণের জন্য তৎকালীন ২৭টি ধ্বংসপ্রাপ্ত হিন্দু ও জৈন মন্দিরের মার্বেল ও লাল বেলেপাথরের খোদাইকৃত স্তম্ভ (Pillars) ব্যবহার করা হয়। মুসলিম স্থপতিরা সেগুলোর মূর্তির মুখাবয়ব ঘষে ফেলে ইসলামি স্থাপত্যের উপযোগী করে পুনর্বিন্যাস করেন।
- করবেল্ড বা স্তুপীকৃত খিলান (Corbelled Arches): ভারতীয় স্থানীয় কারিগররা প্রকৃত খিলান (True Arch with Keystone) নির্মাণে অভ্যস্ত ছিল না; তারা পাথরের ওপর পাথর সাজিয়ে করবেল পদ্ধতিতে পাঁচ খিলানবিশিষ্ট সুবিশাল তোরণ প্রাচীর (Screen Wall) তৈরি করে, যা ভারতীয় ও ইসলামি প্রযুক্তির চমৎকার সংমিশ্রণ।
- আরব্য ক্যালিগ্রাফি ও ভারতীয় পদ্মফুলের যুগলবন্দি: তোরণ প্রাচীরের পাথরে একদিকে পবিত্র কুরআনের সুদৃশ্য নাসখ ও কুফি ক্যালিগ্রাফি খোদাই করা হয়েছে, অন্যদিকে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী পদ্মফুল, লতাপাতা ও ঘণ্টার নকশা খোদাই করে এক অপরূপ সমন্বিত শিল্পধারা তৈরি করা হয়েছে।
- কুতুব মিনার সংযোগ: এ মসজিদের প্রাঙ্গণেই আজানের জন্য কুতুবুদ্দীন আইবেক ও ইলতুৎমিশ নির্মাণ করেন বিশ্ববিখ্যাত ৭২.৫ মিটার সুউচ্চ কুতুব মিনার, যা ইন্দো-মুসলিম বিজয়ের অমর প্রতীক।
৬. ইতিহাসের সাথে প্রত্নতত্ত্বের সম্পর্ক নির্ণয় কর।
[Determine the relation between history and Archaeology.]
ক. ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের মৌলিক পরিচয়:
ইতিহাস: মানবজাতির অতীত কর্মকাণ্ড, চিন্তাভাবনা ও সমাজবিকাশের লিখিত ও ধারাবাহিক বিবরণ হলো ইতিহাস। এর মূল নির্ভরতা লিখিত দলিল, পাণ্ডুলিপি ও ঐতিহাসিক সাক্ষ্য।
প্রত্নতত্ত্ব (Archaeology): মাটির নিচে প্রোথিত বা অতীতের রেখে যাওয়া বস্তুগত ধ্বংসাবশেষ—স্থাপত্য, সমাধি, মুদ্রা, শিলালিপি, হাতিয়ার, তৈজসপত্র ও কঙ্কাল বৈজ্ঞানিক খনন ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে অতীত সংস্কৃতি পুনর্নির্মাণের বিজ্ঞানই হলো প্রত্নতত্ত্ব।
খ. পারস্পরিক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক:
- লিখিত ইতিহাসের শূন্যতা পূরণ: লিখিত ইতিহাসের ব্যাপ্তি মাত্র ৫,০০০ বছরের। এর পূর্ববর্তী প্রাগৈতিহাসিক লক্ষ লক্ষ বছরের মানবজাতির ইতিহাস পুরোপুরি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি ঐতিহাসিক যুগেও মহাস্থানগড়, ময়নামতি, পাহাড়পুর বা হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর মতো সভ্যতাগুলোর ইতিহাস প্রত্নতত্ত্ব ছাড়া জানা সম্ভব হতো না।
- লিখিত প্রমাণের সত্যতা যাচাই: লিখিত ইতিহাসে শাসকের পক্ষপাতিত্ব বা অতিশয়োক্তি থাকতে পারে; কিন্তু মাটি খুঁড়ে পাওয়া মুদ্রা, শিলালিপি ও মৃৎপাত্র কখনো মিথ্যা বলে না। প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু ইতিহাসের অকাট্য নিরপেক্ষ দালিলিক প্রমাণ।
- কালনির্ণয় ও সামাজিক জীবনের পুনর্নির্মাণ: কার্বন-১৪ (Carbon-14 Dating) ও থার্মোলুমিনেসেন্স পদ্ধতির সাহায্যে প্রত্নতত্ত্ববিদরা প্রাচীন পুরাকীর্তির নিখুঁত বয়স নির্ধারণ করে ইতিহাসের কালানুক্রমিক ধারাবাহিকতা নিখুঁত করেন।
৭. খিলান কী? এর প্রকারগুলো আলোচনা কর।
[What is Arch? Discuss its classification.]
ক. খিলানের সংজ্ঞা:
স্থাপত্যবিদ্যার পরিভাষায়, দুটি দেয়াল বা স্তম্ভের মধ্যবর্তী উন্মুক্ত স্থানের ওপরের ছাদ বা দেওয়ালের উল্লম্ব ভার বহন করার জন্য কীলকাকার ইট বা পাথর দিয়ে নির্মিত বক্রাকৃতির (Curved) দৃঢ় কাঠামোগত স্থাপত্যিক কৌশলকে খিলান (Arch) বলা হয়। ইসলামি স্থাপত্যে খিলান কেবল ভারবহনের কৌশল নয়, বরং এর নান্দনিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য বিশ্ব স্থাপত্যে অদ্বিতীয়।
খ. প্রধান প্রধান খিলানের প্রকারভেদ:
- অর্ধবৃত্তাকার খিলান (Semicircular Arch): আদি রোমান রীতির খিলান, যা একটি নিখুঁত অর্ধবৃত্ত তৈরি করে। উমাইয়া স্থাপত্যে এবং স্পেনের আদি মুসলিম পর্বে এটি ব্যবহৃত হয়।
- ঘোড়ার নাল খিলান (Horseshoe Arch): অর্ধবৃত্তের চেয়ে অধিক বাঁকা হয়ে নিচের দিকে সামান্য সংকুচিত হয়, যা দেখতে ঘোড়ার ক্ষুরের মতো। কর্ডোভার জামে মসজিদ ও মুরিশ মুসলিম স্থাপত্যের প্রধান প্রতীক।
- সুচালো খিলান (Pointed Arch): দুটি বৃত্তাকার চাপ কেন্দ্রে একটি সুচালো বিন্দুতে মিলিত হয়। এটি উমাইয়া মরুপ্রাসাদ ও আব্বাসীয় স্থাপত্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং ক্রুসেডারদের মাধ্যমে ইউরোপে গিয়ে গথিক স্থাপত্যের ভিত্তি স্থাপন করে।
- বহুভাঁজ বা বহুপত্র খিলান (Polylobed / Multifoiled Arch): খিলানের অন্তর্বলয়ে তিন, পাঁচ বা ততোধিক খাঁজ বা পাপড়ির মতো নকশা থাকে। স্পেনের আলহাম্বা প্রাসাদ ও কর্ডোভার মিহরাবে এর অপূর্ব ব্যবহার রয়েছে।
- কিল খিলান ও ওজি খিলান (Ogee / Keel Arch): জাহাজের উল্টানো পাটাতনের মতো বাঁকবিশিষ্ট সুদৃশ্য খিলান, যা ফাতেমীয় ও পারসিক স্থাপত্যে সমাদৃত।
৮. সামাররা জামি মসজিদের অবস্থান উল্লেখপূর্বক এর স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ কর।
[Describe the architectural characteristics of Samarra Jami Mosque mentioning its location.]
ক. অবস্থান ও নির্মাণকাল:
ইরাকের রাজধানী বাগদাদের প্রায় ১২৫ কিলোমিটার উত্তরে টাইগ্রিস (দজলা) নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক আব্বাসীয় রাজধানী সামাররায় অবস্থিত। আব্বাসীয় খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল ৮৪৮ থেকে ৮৫১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সুবিশাল সামাররা জামে মসজিদ (Great Mosque of Samarra) নির্মাণ করেন। এটি মধ্যযুগের মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদ ছিল।
খ. স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- বিশাল আয়তন ও প্রতিরক্ষা প্রাচীর: মসজিদটি প্রায় ২৪০ মিটার × ১৫৬ মিটার (প্রায় ৩৮,০০০ বর্গমিটার) আয়তনের এক সুবিশাল আয়তাকার চত্বর জুড়ে অবস্থিত। এর চারদিকের দেওয়াল পোড়ামাটির ইট দিয়ে নির্মিত এবং এতে ৪৪টি সুদৃঢ় অর্ধবৃত্তাকার বুরুজ (Bastions) রয়েছে, যা দেখতে দুর্গের মতো।
- হাইপোস্টাইল হল ও অরণ্যসম স্তম্ভ: প্রার্থনাকক্ষে মার্বেল ও ইটের তৈরি শত শত অষ্টভুজাকার স্তম্ভ ছিল যা কাঠের সমতল ছাদকে ধরে রাখত। সুবিশাল খোলা চত্বর (সাহন) চারদিক থেকে স্তম্ভযুক্ত ছাদ বা রিওয়াক দ্বারা বেষ্টিত ছিল।
- ঐতিহাসিক মালবিয়া মিনার (Malwiya Minaret): মসজিদের উত্তর দেওয়ালের বাইরে ২৭ মিটার দূরে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত ‘মালবিয়া মিনার’ এর সর্বশ্রেষ্ঠ বিস্ময়। এটি ৫২ মিটার (১৭০ ফুট) সুউচ্চ সর্পিল প্যাগোডা আকৃতির মিনার। নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত বাইরের দেওয়াল ঘেঁষে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে একটি ঢালু সিঁড়ি ওপরে উঠেছে, যার শীর্ষে পৌঁছালে প্রাচীন মেসোপটেমীয় জিগুরাতের (Ziggurat) কথা মনে করিয়ে দেয়।
খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি
৯। বাংলায় কয়েকটি মুসলিম পুরাকীর্তির বিবরণ দাও।
[Describe some antiquities of Muslims in Bengal.]
বাংলায় মুসলিম সুলতানি ও মুঘল আমলে অসংখ্য কালজয়ী পুরাকীর্তি গড়ে ওঠে:
- ষাটগম্বুজ মসজিদ (বাগেরহাট): পঞ্চদশ শতকে হযরত খান জাহান আলী (রহ.) কর্তৃক নির্মিত তুঘলকি রীতির পোড়ামাটির ইট ও পাথরের অপূর্ব মসজিদ, যাতে মোট ৮১টি গম্বুজ রয়েছে (ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য)।
- ছোট সোনা মসজিদ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ): সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে নির্মিত ‘সুলতানি বাংলার রত্ন’, যাতে কালো ব্যাসল্ট পাথর ও সোনালী গিল্টি করা ১৫টি গম্বুজ রয়েছে।
- লালবাগ কেল্লা (ঢাকা): ১৬৭৮ সালে যুবরাজ মুহাম্মদ আজম শাহ কর্তৃক সূচিত মুঘল দুর্গ কমপ্লেক্স, যাতে রয়েছে পরীবিবির অপরূপ মার্বেল সমাধি ও সুদৃশ্য দরবার হল।
১০। আদর্শ মসজিদের বৈশিষ্ট্যগুলো লেখ।
[Write down the component of an ideal Masjid.]
একটি আদর্শ জামে মসজিদের প্রধান পাঁচটি অপরিহার্য গাঠনিক উপাদান থাকে:
- সাহন (Courtyard): মসজিদের মাঝখানে উন্মুক্ত চত্বর, যার কেন্দ্রে সাধারণত ওজু বা পবিত্রতার জন্য জলাধার (হাওজ) থাকে।
- মিহরাব (Mihrab): কিবলা দেওয়ালে নির্মিত অর্ধবৃত্তাকার কুলুঙ্গি, যা মক্কার কাবা ঘরের দিক নির্দেশ করে এবং যেখানে ইমাম দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ান।
- মিম্বার (Minbar): মিহরাবের ডানপাশে নির্মিত সিঁড়িযুক্ত উঁচু আসন, যেখান থেকে খতিব জুমার খুতবা দেন।
- মিনার (Minaret): দূরদূরান্তে আজানের ধ্বনি পৌঁছানোর জন্য নির্মিত সুউচ্চ স্তম্ভ বা টাওয়ার।
- গম্বুজ ও মুসাল্লা (Dome & Prayer Hall): কিবলা হলের ওপর নির্মিত সুবিশাল গম্বুজ যা প্রার্থনাকক্ষের গাম্ভীর্য ও আলো-বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত করে।
১১। কুব্বাত আস-সাখরা’র স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা কর।
[Describe the architectural features of the Dome of the Rock.]
জেরুজালেমের হারাম আল-শরীফে উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক কর্তৃক ৬৯১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত কুব্বাতুস সাখরার মূল বৈশিষ্ট্য:
- অষ্টভুজাকার কাঠামো: বাইজেন্টাইন ব্যাসিলিকার অনুকরণ নয়, বরং নিখুঁত অষ্টভুজাকার দেওয়াল যার চারদিকে চারটি মার্বেল তোরণ রয়েছে।
- স্বর্ণের দ্বৈত গম্বুজ: কেন্দ্রে ২০.৪৪ মিটার ব্যাসের দ্বৈত স্তরের কাঠের গম্বুজ যা বাইরে স্বর্ণমণ্ডিত। ভেতরের দেওয়াল প্রাচীনতম কুরআনিক কুফি লিপির শিলালিপিতে সুসজ্জিত।
১২। স্পেনের কর্ডোভা মসজিদ।
[Mosque of Cordava, Spain.]
স্পেনের উমাইয়া খলিফাদের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যকীর্তি হলো কর্ডোভা জামে মসজিদ (Mezquita de Cordoba):
- স্তম্ভের অরণ্য: প্রায় ৮৫৬টি মার্বেল ও গ্রানাইটের সুদৃশ্য স্তম্ভের ওপর ছাদ প্রতিষ্ঠিত।
- দ্বি-স্তরবিশিষ্ট লাল-সাদা খিলান: উচ্চতা বাড়াতে একটি খিলানের ওপর আরেকটি খিলান বসানো হয়েছে এবং লাল ইট ও সাদা পাথরের গাঢ় ডোরাকাটা নকশা করা হয়েছে। দ্বিতীয় আল-হাকামের নির্মিত স্বর্ণমণ্ডিত মোজাইক শোভিত মিহরাব বিশ্ব স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিস্ময়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ইসলামি স্থাপত্যে সর্বপ্রথম মডেল বা আদি মসজিদ কোনটি?
৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদিনার ‘মসজিদে নববী’ হলো পরবর্তী সকল ইসলামি মসজিদ স্থাপত্যের আদি ভিত্তি ও মডেল।
২. কুব্বাতুস সাখরা (Dome of the Rock) কত সালে কে নির্মাণ করেন?
উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান ৬৮৮ থেকে ৬৯১-৯২ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেমে কুব্বাতুস সাখরা নির্মাণ করেন।
৩. ভারতের প্রাচীনতম বিদ্যমান ইন্দো-মুসলিম মসজিদ কোনটি?
দিল্লির সুলতান কুতুবুদ্দীন আইবেক কর্তৃক ১১৯৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত ‘কুয়াতুল ইসলাম মসজিদ’ হলো ভারতের প্রাচীনতম বিদ্যমান ইন্দো-মুসলিম মসজিদ।
৪. খিলানের প্রধান প্রকারভেদগুলো কী কী?
প্রধান খিলানগুলো হলো: অর্ধবৃত্তাকার খিলান, সুচালো খিলান, ঘোড়ার নাল খিলান এবং বহুভাঁজ বা বহুপত্র খিলান।
৫. সামাররা জামে মসজিদের বিখ্যাত মিনারের নাম কী?
সামাররা জামে মসজিদের বিখ্যাত ৫২ মিটার উঁচু সর্পিল প্যাগোডা আকৃতির মিনারের নাম ‘মালবিয়া মিনার’ (Malwiya Minaret)।
৬. বাংলায় মুসলিম স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন কোনটি?
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ হলো বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন।