জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আধুনিক মিশর ও সুদানের ইতিহাস (History of Modern Egypt and Sudan) – 205305, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2021

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৫২ মিনিট পড়ার সময়
১১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2021
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: আধুনিক মিশর ও সুদানের ইতিহাস
বিষয় কোড: 205305 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি

১. আধুনিক মিশরের রূপকার হিসেবে মুহাম্মদ আলী পাশার অবদান পর্যালোচনা কর।

[Review the contributions of Muhammad Ali Pasha as the maker of modern Egypt.]

ক. ভূমিকা:

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মিশর অভিযানের (১৭৯৮) পর সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতায় আলবেনীয় বংশোদ্ভূত অটোমান সামরিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ আলী পাশা (১৭৬৯-১৮৪৯) তাঁর অপরিসীম প্রজ্ঞা ও সামরিক শক্তিবলে মিশরের শাসনক্ষমতা অধিকার করেন। ১৮০৫ সালে উসমানীয় সুলতান তাঁকে মিশরের গভর্নর (ওয়ালী) হিসেবে স্বীকৃতি দেন। দীর্ঘ চার দশকের শাসনামলে মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক মিশরকে তিনি একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেন। এ কারণেই ঐতিহাসিকগণ তাঁকে সর্বসম্মতিক্রমে ‘আধুনিক মিশরের জনক বা রূপকার’ আখ্যা দিয়েছেন।

খ. মামলুক শক্তির চূড়ান্ত উচ্ছেদ (১৮১১):

মিশরের আধুনিকায়নে প্রধান অন্তরায় ছিল কয়েক শতাব্দীর দুর্নীতিগ্রস্ত ও প্রতিক্রিয়াশীল মামলুক সামন্ত অভিজাতরা। ১৮১১ সালের ১ মার্চ মুহাম্মদ আলী পাশা কায়রোর দুর্গে তাঁর পুত্রের আরব অভিযানের বিদায় সংবর্ধনায় প্রায় ৫০০ নেতৃস্থানীয় মামলুককে আমন্ত্রণ জানান এবং সুকৌশলে দুর্গের সংকীর্ণ ফটকে তাঁদের সকলকে হত্যা করেন। এ ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে মিশরে সামন্তবাদী প্রতিরোধ চিরতরে ধ্বংস হয় এবং তাঁর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

গ. সামরিক সংস্কার ও প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন:

  1. নিজাম-ই জাদিদ (আধুনিক সেনাবাহিনী): ঐতিহ্যবাহী ভাড়াটে সৈন্যদের বদলে তিনি ইউরোপীয় (বিশেষ করে ফরাসি) সামরিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় স্থানীয় মিশরীয় ফেল্লাহিন (কৃষক)-দের নিয়ে আধুনিক স্থায়ী সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। ফরাসি কর্নেল সেভেস (সুলেমান পাশা) এ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ দেন।
  2. অস্ত্র কারখানা ও নৌবহর নির্মাণ: আলেকজান্দ্রিয়ায় সুবিশাল ডকইয়ার্ড এবং কায়রোতে আধুনিক অস্ত্র কারখানা ও গানপাউডার মিল স্থাপন করেন। অল্প সময়ের মধ্যে মিশরীয় নৌবহর ভূমধ্যসাগরের অন্যতম শক্তিশালী শক্তিতে পরিণত হয়।

ঘ. কৃষি ও অর্থনৈতিক সংস্কার:

  1. জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ ও রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থা (Monopoly System): তিনি সমস্ত ব্যক্তিগত জমিদারি ও ওয়াকফ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেন। কৃষককে বীজ, সার ও উপকরণ সরবরাহ করে উৎপাদিত সব ফসল সরকার নির্ধারিত মূল্যে ক্রয় করত।
  2. দীর্ঘ আঁশের তুলো চাষ (জুমেল কটন): ১৮২০ সালে ফরাসি কৃষিবিদ লুই জুমেলের উদ্ভাবিত উৎকৃষ্ট মানের লম্বা আঁশের তুলা চাষ ব্যাপকভাবে শুরু করেন। এ মিশরীয় তুলা ইউরোপের বাজারে বিপুল মূল্যে রফতানি হয়ে দেশটির বৈদেশিক আয়ের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
  3. সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ও ডেল্টা বাঁধ: নীল নদের পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য তিনি বিখ্যাত ‘ডেল্টা ব্যারেজ’ (Delta Barrage) নির্মাণ শুরু করেন এবং মাহমুদিয়া খাল খনন করে আলেকজান্দ্রিয়াকে নীল নদের সাথে সংযুক্ত করেন। ফলে বার্ষিক বন্যার ওপর নির্ভরতা কমে সারা বছর চাষাবাদের আওতায় আসে লক্ষ লক্ষ একর জমি।

ঙ. শিক্ষা, মুদ্রণ ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি:

  1. ইউরোপে শিক্ষা মিশন: শত শত প্রতিভাবান মিশরীয় ছাত্রকে তিনি উচ্চশিক্ষার্থে প্যারিস ও লন্ডনে প্রেরণ করেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত রিফাআত আল-তাহতাভি।
  2. বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বুলাক প্রেস: কায়রোতে আধুনিক চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (ডা. ক্লোট বের নেতৃত্বে), প্রকৌশল কলেজ ও সামরিক একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮২২ সালে তিনি বিখ্যাত ‘বুলাক প্রেস’ (Amiri Press) প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৮২৮ সালে সরকারি পত্রিকা ‘আল-ওয়াকায়িল মিসরিয়াহ’ প্রকাশ করেন।

চ. মূল্যায়ন:

যদিও তাঁর একচেটিয়া অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধের কারণে কৃষকদের ওপর করের চাপ ছিল প্রচুর, তথাপি মুহাম্মদ আলী পাশাই প্রথম প্রাচ্য মুসলিম বিশ্বে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সফল সমন্বয় ঘটিয়ে আধুনিক জাতীয় রাষ্ট্রের মজবুত ভিত্তি গড়েছিলেন।


২. ১৯৩৬ সালের ইঙ্গ-মিশরীয় চুক্তির পটভূমি ও প্রধান শর্তাবলি আলোচনা কর।

[Discuss the background and main terms of the Anglo-Egyptian Treaty of 1936.]

ক. চুক্তির ঐতিহাসিক পটভূমি:

১৯২২ সালে ব্রিটেন একতরফাভাবে মিশরের ওপর থেকে তাদের ‘প্রোটেক্টরেট’ বা সুরক্ষিত রাজ্যের মর্যাদা প্রত্যাহার করে মিশরকে নামেমাত্র স্বাধীন রাজ্য ঘোষণা করলেও সুয়েজ খালের নিরাপত্তা, সুদানের যৌথ শাসন, বিদেশি স্বার্থরক্ষা ও প্রতিরক্ষা—এ চারটি বিষয়ে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল। ফলে ওয়াফদ পার্টির নেতৃত্বে মিশরীয় জনগণের তীব্র ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন অব্যাহত থাকে।

১৯৩৫ সালে ফ্যাসিবাদী ইতালির একনায়ক বেনিতো মুসোলিনি আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া) দখল করলে মিশরের পূর্ব ও দক্ষিণ সীমান্ত সরাসরি ইতালীয় আগ্রাসনের ঝুঁকিতে পড়ে। এ ভূ-রাজনৈতিক সংকট ব্রিটিশ ও মিশরীয় উভয় পক্ষকেই পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতার জন্য চুক্তিতে উপনীত হতে বাধ্য করে। এ প্রেক্ষাপটে ওয়াফদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা আন-নাহাস পাশা এবং ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ইডেনের মধ্যে ১৯৩৬ সালের ২৬ আগস্ট লন্ডনে ঐতিহাসিক ২০ বছর মেয়াদি ইঙ্গ-মিশরীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

খ. চুক্তির প্রধান শর্তাবলি:

  1. ব্রিটিশ সামরিক উপস্থিতি সীমিতকরণ: সমগ্র মিশরে ছড়িয়ে থাকা ব্রিটিশ সেনাবহর প্রত্যাহার করে শুধুমাত্র সুয়েজ খাল অঞ্চলে ১০,০০০ পদাতিক সেনা ও ৪০০ বিমানসেনায় সীমাবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়।
  2. যুদ্ধের সময় সর্বাত্মক সহযোগিতা: আন্তর্জাতিক কোনো সংকট বা বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হলে মিশর তার সকল বিমানবন্দর, নৌবন্দর ও রেলওয়ে ব্রিটিশ বাহিনীর ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখবে।
  3. সুয়েজ খালের সামরিক অধিকার: মিশরীয় সেনাবাহিনী নিজস্ব সক্ষমতায় সুয়েজ খালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম না হওয়া পর্যন্ত সেখানে ব্রিটিশ সামরিক পাহারা বহাল থাকবে।
  4. সুদানের প্রশাসনিক মর্যাদা: ১৮৯৯ সালের ইঙ্গ-সুদানি দ্বৈত শাসন চুক্তি (Condominium Agreement) পুনরায় বহাল রাখা হয়, যার ফলে সুদানে ব্রিটিশ আধিপত্য নিশ্চিত হয় এবং মিশরীয় অভিবাসন উন্মুক্ত হয়।
  5. ক্যাপিচুলেশন বিলোপ ও লিগ অব নেশনস: মিশরে ইউরোপীয় নাগরিকদের ভোগ করা বৈষম্যমূলক কর ও বিচারিক বিশেষ সুবিধা (Capitulations) রদ করতে ব্রিটেন সাহায্য করবে এবং ১৯৩৭ সালে মিশরের লিগ অব নেশনস (জাতিপুঞ্জ)-এর পূর্ণ সদস্যপদ প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে।
  6. দূতাবাসের মর্যাদা: কায়রোতে ব্রিটিশ হাই কমিশনারের কার্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ দূতাবাসে রূপান্তর করা হয়।

গ. চুক্তিটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও মূল্যায়ন:

১৯৩৬ সালের চুক্তি মিশরকে আন্তর্জাতিকভাবে সার্বভৌম দেশের স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবে দেশের মাটিতে ব্রিটিশ সেনা মোতায়েন থাকায় এটি ছিল পূর্ণ স্বাধীনতার পরিপন্থী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিশরীয়রা উপলব্ধি করে যে এ চুক্তি কার্যত তাদের ব্রিটিশদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে, যা পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের বিপ্লব ও ১৯৫১ সালে চুক্তিটির একতরফা বাতিলের পথ প্রশস্ত করে।


৩. ১৯৫২ সালের মিশরীয় বিপ্লবের কারণসমূহ ও জামাল আবদেল নাসেরের ভূমিকা ব্যাখ্যা কর।

[Explain the causes of the Egyptian Revolution of 1952 and the role of Gamal Abdel Nasser.]

ক. ১৯৫২ সালের বিপ্লবের মূল কারণসমূহ:

  1. রাজা ফারুকের স্বৈরাচার ও চরম দুর্নীতি: শেষ রাজবংশীয় শাসক রাজা ফারুকের বিলাসবহুল জীবনযাপন, সীমাহীন নৈতিক অবক্ষয় এবং রাজপ্রাসাদের স্বেচ্ছাচারিতা জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। দেশের সিংহভাগ আবাদি জমি ছিল মাত্র কয়েকশত সামন্ত প্রভুর কব্জায়, আর কোটি কোটি কৃষক ছিল নিঃস্ব।
  2. ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে অবমাননাকর পরাজয়: প্রথম ফিলিস্তিন যুদ্ধে মিশরীয় বাহিনীর বিপর্যয় সেনাবাহিনীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। রাজকীয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সরবরাহকৃত ত্রুটিপূর্ণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের কারণে রণাঙ্গনে শত শত মিশরীয় সেনার অপমৃত্যু ঘটে, যাকে বলা হয় ‘খারাপ অস্ত্রের কেলেঙ্কারি’ (Defective Arms Scandal)।
  3. ব্রিটিশ আধিপত্য ও ইসমাইলিয়া ট্র্যাজেডি (১৯৫২): সুয়েজ খালে ব্রিটিশ সেনাদের অব্যাহত দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে স্থানীয় গেরিলা প্রতিরোধ দমাতে ১৯৫২ সালের ২৫ জানুয়ারি ব্রিটিশ বাহিনী ইসমাইলিয়া থানায় হামলা চালিয়ে ৫০ জন মিশরীয় পুলিশকে হত্যা করে। এর প্রতিবাদে ২৬ জানুয়ারি কায়রোতে অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভ ও অগ্নিকাণ্ড (Black Saturday) ঘটে, যা আইন-শৃঙ্খলার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়।

খ. ফ্রি অফিসার্স আন্দোলন ও জামাল আবদেল নাসেরের ভূমিকা:

  1. ফ্রি অফিসার্স মুভমেন্ট গঠন: জামাল আবদেল নাসের (১৯১৮-১৯৭০) ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পর দেশপ্রেমিক তরুণ সেনা অফিসারদের নিয়ে গোপনে ‘হারাকাতুজ জুব্বাতুল আহরার’ বা ফ্রি অফিসার্স মুভমেন্ট গড়ে তোলেন। জেনারেল মুহাম্মদ নজিবকে আন্দোলনের অগ্রভাগে রাখা হলেও নাসেরই ছিলেন বিপ্লবের মূল মস্তিষ্ক ও রণকৌশলবিদ।
  2. ২৩ জুলাই ১৯৫২-এর রক্তপাতহীন সামরিক বিপ্লব: ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই মধ্যরাতে নাসেরের নেতৃত্বে ফ্রি অফিসাররা কায়রোর সেনা সদরদপ্তর, বেতার কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা দখল করে নেন। রেডিওতে আনোয়ার সাদাত বিপ্লবের ঘোষণা পাঠ করেন। ২৬ জুলাই রাজা ফারুককে সিংহাসনচ্যুত করে নির্বাসনে পাঠানো হয়।
  3. প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা (১৯৫৩): ১৯৫৩ সালের ১৮ জুন রাজতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে মিশরকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে জেনারেল নজিবের সাথে মতপার্থক্যের পর ১৯৫৪ সালে নাসের সরাসরি দেশের প্রধানমন্ত্রী ও ১৯৫৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

গ. নাসেরের বিপ্লবী সংস্কার ও প্রভাব:

  • ভূমি সংস্কার ও সামন্তবাদের অবসান: ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কৃষি সংস্কার আইন জারি করে ব্যক্তিমালিকানায় সর্বোচ্চ জমির সীমা নির্ধারণ করে উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়।
  • সুয়েজ খাল জাতীয়করণ (১৯৫৬): আসওয়ান উচ্চ বাঁধ নির্মাণে পশ্চিমা ব্যাংক ঋণ প্রত্যাহার করলে নাসের ১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরাইলের যৌথ সুয়েজ আগ্রাসনকে ব্যর্থ করে দিয়ে নাসের সমগ্র আরব জাহানের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন।
  • প্যান-আরবিজম ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন: নাসের আরব জাতীয়তাবাদের (Pan-Arabism) প্রসার ঘটান এবং নেহেরু ও টিটোর সাথে মিলে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM) গড়ে তোলেন।

৪. ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির (১৯৭৮) প্রেক্ষাপট ও মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিতে এর প্রভাব মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the context of the Camp David Accords (1978) and its impact on Middle Eastern politics.]

ক. ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির প্রেক্ষাপট:

  1. ১৯৭৩ সালের অক্টোবর যুদ্ধ (ইয়ম কিপুর): নাসেরের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত ১৯৭৩ সালে ঐতিহাসিক অক্টোবর যুদ্ধ পরিচালনা করে সুয়েজ খালের পূর্ব তীরের বার-লেভ লাইন গুঁড়িয়ে দেন। এ যুদ্ধ আরবদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেয় এবং ইসরাইলের অপরাজেয় থাকার পৌরাণিক কাহিনী ভেঙে ফেলে।
  2. মিশরের অর্থনৈতিক সংকট: উপর্যুপরি চারটি বিধ্বংসী যুদ্ধের কারণে মিশরের জাতীয় অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। সাদাত উপলব্ধি করেন যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ছাড়া মিশরের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন অসম্ভব।
  3. সাদাতের জেরুজালেম সফর (১৯৭৭): ১৯৭৭ সালের নভেম্বরে সবাইকে স্তম্ভিত করে আনোয়ার সাদাত সরাসরি ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে (Knesset) ভাষণ দেন এবং শান্তির প্রস্তাব দেন।
  4. ক্যাম্প ডেভিড সম্মেলন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মধ্যস্থতায় মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে ১২ দিনব্যাপী গোপন আলোচনার পর ১৯৭৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মিশরের আনোয়ার সাদাত এবং ইসরাইলের মেনাহেম বেগিনের মধ্যে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা পরবর্তীতে ২৬ মার্চ ১৯৭৯ তারিখে ওয়াশিংটনে আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তিতে রূপ নেয়।

খ. চুক্তির মূল কাঠামোগত শর্তাবলি:

  • সিনাই উপদ্বীপ ফেরত: ইসরাইল ১৯৬৭ সালে দখলকৃত সমগ্র সিনাই উপদ্বীপ থেকে নিজেদের সেনা ও ইহুদি বসতি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে মিশরের কাছে হস্তান্তর করবে।
  • কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও জাহাজ চলাচল: মিশর প্রথম আরব রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করবে এবং সুয়েজ খাল ও তিরান প্রণালীতে ইসরাইলি জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করবে।
  • ফিলিস্তিনি স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা: পশ্চিম তীর ও গাজায় পাঁচ বছরের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ গঠনের অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় (যা ইসরাইল কখনোই পূরণ করেনি)।

গ. মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিতে চুক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাব:

  1. আরব বিশ্বের ভাঙন ও মিশরের একঘরে হওয়া: ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও জেরুজালেম প্রশ্নকে অমীমাংসিত রেখে পৃথক শান্তি চুক্তি করায় আরব বিশ্ব চরম ক্ষুব্ধ হয়। কায়রো থেকে আরব লীগের সদরদপ্তর তিউনিসে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং প্রায় সমস্ত আরব দেশ মিশরের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।
  2. সামরিক ভারসাম্যে ইসরাইলের শ্রেষ্ঠত্ব: আরব ঐক্যের সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ মিশর যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানোয় সামরিক ভারসাম্য পুরোপুরি ইসরাইলের পক্ষে চলে যায়, যার সুযোগে ইসরাইল ১৯৮২ সালে লেবাননে আক্রমণ চালায়।
  3. সাদাত হত্যাকাণ্ড (১৯৮১): ইসলামপন্থী ও জাতীয়তাবাদীরা এ চুক্তিকে ফিলিস্তিনি জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত করে। ১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর সামরিক কুচকাওয়াজে আল-জিহাদ সংগঠনের সদস্য খালিদ আল-ইস্তাম্বুলির গুলিতে আনোয়ার সাদাত নিহত হন।

৫. ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত সুদানি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।

[Discuss the development of the Sudanese nationalist movement up to 1956.]

ক. পটভূমি ও দ্বৈত শাসনের সূচনা:

১৮৯৮ সালে ওমদুরমানের যুদ্ধে লর্ড কিচেনারের ব্রিটিশ বাহিনী মাহদীবাদী রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে। ১৮৯৯ সালে স্বাক্ষরিত হয় কুখ্যাত ‘ইঙ্গ-সুদানি কন্ডোমিনিয়াম বা দ্বৈত শাসন’ চুক্তি। এতে মিশরীয় পতাকা ও প্রশাসনের নাম ব্যবহৃত হলেও প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেলের হাতেই ন্যস্ত ছিল সুদানের নিরঙ্কুশ ঔপনিবেশিক ক্ষমতা।

খ. জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়:

  1. হোয়াইট ফ্ল্যাগ লীগ ও ১৯২৪ সালের বিদ্রোহ: তরুণ সামরিক অফিসার আলী আব্দুল লতিফ এবং উবায়দ হাজ্জ আল-আমিনের নেতৃত্বে ১৯২৪ সালে গঠিত হয় ‘হোয়াইট ফ্ল্যাগ লীগ’ (White Flag League)। তাঁরা মিশর ও সুদানের ঐক্য (Unity of the Nile Valley) এবং ব্রিটিশ শাসনের অবসানের দাবিতে খার্তুমে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, যা ব্রিটিশরা নির্মমভাবে দমন করে।
  2. গ্র্যাজুয়েটস কংগ্রেস (Graduates’ General Congress – ১৯৩৮): গর্ডন মেমোরিয়াল কলেজের শিক্ষিত সুশীল সমাজ ১৯৩৮ সালে গ্র্যাজুয়েটস কংগ্রেস গঠন করে। প্রাথমিক পর্যায়ে সমাজকল্যাণমূলক থাকলেও ১৯৪২ সালে এটি ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে সরাসরি সুদানের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার দাবি করে ঐতিহাসিক স্মারকলিপি পেশ করে।
  3. রাজনৈতিক দলসমূহের বিকাশ ও মেরুকরণ:
    • আশিকা পার্টি (পরবর্তীতে NUP): ইসমাইল আল-আজহারীর নেতৃত্বে গঠিত এ দল মিশরের সাথে যৌথ কনফেডারেশন বা নীল উপত্যকার ঐক্যে বিশ্বাসী ছিল (খতমিয়া তরিকার সমর্থনপুষ্ট)।
    • উম্মা পার্টি (Ummah Party): ইমাম আব্দুর রহমান আল-মাহদীর (মাহদীর পুত্র) নেতৃত্বে গঠিত এ দল ‘সুদান শুধুমাত্র সুদানীদের জন্য’—এ স্লোগানে সম্পূর্ণ স্বাধীন সুদানের দাবি তোলে (আনসার সম্প্রদায়ের সমর্থনপুষ্ট)।

গ. আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীনতা অর্জন (১৯৫৩-১৯৫৬):

  1. মিশরের ১৯৫২ সালের বিপ্লবের প্রভাব: মিশরে নাসের ও নজিবের বিপ্লবের পর কায়রো সুদানের ওপর তাদের ঐতিহ্যবাহী সার্বভৌমত্বের দাবি শিথিল করে। ১৯৫৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ব্রিটেন ও মিশর যৌথভাবে সুদানের তিন বছরের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বাস্তবায়নের ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করে।
  2. ১৯৫৩ সালের সাধারণ নির্বাচন: নির্বাচনে ইসমাইল আল-আজহারীর ন্যাশনাল ইউনিয়নিস্ট পার্টি (NUP) বিপুল বিজয় লাভ করে এবং তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। কিন্তু ক্ষমতায় বসে আজহারী জনমতের বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়ে মিশরের সাথে একীভূত হওয়ার পরিবর্তে পূর্ণ স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত নেন।
  3. ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি: স্বাধীন সুদানের জন্ম: ১৯৫৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর সুদানি সংসদ সর্বসম্মতিক্রমে স্বাধীনতার প্রস্তাব পাস করে। পরিশেষে ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি ব্রিটিশ ও মিশরীয় পতাকা নামিয়ে সুদানের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং সার্বভৌম সুদান প্রজাতন্ত্রের জন্ম হয়।

৬. সুদানের আধুনিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কারে জাফর নিমেরীর অবদান মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the contribution of Gaafar Nimeiry to the modern politics and economic reforms of Sudan.]

ক. নিমেরীর ক্ষমতায় আরোহণ (১৯৬৯):

১৯৬৯ সালের ২৫ মে কর্নেল জাফর মুহাম্মদ নিমেরী এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের (মে বিপ্লব) মাধ্যমে দুর্বল সংসদীয় সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি ‘রেভল্যুশনারি কমান্ড কাউন্সিল’ গঠন করেন এবং নাসেরীয় সমাজতন্ত্র ও প্যান-আরবিজমকে প্রাথমিক আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন।

খ. রাজনৈতিক রূপরেখা ও ঐতিহাসিক আদ্দিস আবাবা চুক্তি (১৯৭২):

  1. প্রথম গৃহযুদ্ধের অবসান: স্বাধীনতার পর থেকেই দক্ষিণ সুদানের অমুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে উত্তর সুদানের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ (আনিয়ানিয়া বিদ্রোহ) চলছিল। নিমেরী ঐতিহাসিক দূরদর্শিতা দেখিয়ে ১৯৭২ সালে দক্ষিণ সুদানের বিদ্রোহীদের সাথে ‘আদ্দিস আবাবা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে দক্ষিণ সুদানকে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয় এবং দীর্ঘ ১৭ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে। এটি ছিল তাঁর শাসনামলের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক সাফল্য।
  2. একদলীয় একনায়কতন্ত্র: তিনি ‘সুদানিজ সোশ্যালিস্ট ইউনিয়ন’ (SSU) গঠন করে সমস্ত বিরোধী দল নিষিদ্ধ করেন এবং দেশের একক বৈধ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন।

গ. অর্থনৈতিক সংস্কার ও ‘আরব বিশ্বের রুটির ঝুড়ি’ পরিকল্পনা:

  1. জাতীয়করণ নীতি ও পরবর্তী পশ্চাদপসরণ: ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি ব্যাংক, বীমা ও বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ করেন। তবে ১৯৭১ সালে কমিউনিস্টদের একটি পাল্টা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি কমিউনিস্ট ও সোভিয়েত বলয় ত্যাগ করে পশ্চিমা ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ হন এবং ব্যক্তিমালিকানা ফিরিয়ে দেন।
  2. ব্রেডবাস্কেট কৌশল (Breadbasket Strategy): নিমেরী সুদানকে সমগ্র আরব বিশ্বের প্রধান খাদ্য ভাণ্ডার বা ‘Breadbasket of the Arab World’ হিসেবে গড়ে তোলার উচ্চাভিলাষী মহাপরিকল্পনা নেন। উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর বিপুল পুঁজি এবং পশ্চিমা প্রযুক্তির সমন্বয়ে গেজিরা স্কিম সম্প্রসারণ, কেনানা চিনি কল (বিশ্বের বৃহত্তম চিনি কারখানা) এবং জংলেই খাল খনন শুরু হয়।

ঘ. সেপ্টেম্বর আইন (১৯৮৩) ও নিমেরীর পতন:

  1. ইসলামিক শরীয়াহ প্রবর্তন: ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে হাসান আল-তুরাবীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে জোট করে নিমেরী ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে দেশজুড়ে কঠোর ইসলামি শরীয়াহ আইন (সেপ্টেম্বর আইন) জারি করেন।
  2. দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ ও আদ্দিস আবাবা চুক্তি লঙ্ঘন: দক্ষিণ সুদানের ওপর শরীয়াহ চাপিয়ে দেওয়া এবং দক্ষিণের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করায় জন গারাং-এর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘সুদান পিপলস লিবারেশন আর্মি’ (SPLA)। এর ফলে ১৯৮৩ সালে বিধ্বংসী দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
  3. ১৯৮৫ সালের গণঅভ্যুত্থান: তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা, বৈদেশিক ঋণের বোঝা, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং গৃহযুদ্ধের চাপে অতিষ্ঠ জনগণ ১৯৮৫ সালের এপ্রিলে রাজপথে নেমে আসে। নিমেরী মার্কিন সফরে থাকাকালে জেনারেল আবদুর রহমান সোয়ার আদ-দাহাবের নেতৃত্বে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।

খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি

৭. খেদিভ ইসমাইলের আধুনিকায়ন ও দেউলিয়াত্বের কারণ কী ছিল?

[What were the reasons for Khedive Ismail’s modernization and bankruptcy?]

খেদিভ ইসমাইল পাশা (শাসনকাল: ১৮৬৩-১৮৭৯) মিশরকে একটি আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল: “আমার দেশ আর আফ্রিকার অংশ নয়, আমরা এখন ইউরোপেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।”

  • আধুনিকায়ন প্রকল্প: ১৮৬৯ সালে রাজকীয় জাঁকজমকে সুয়েজ খালের উদ্বোধন করেন। তিনি কায়রোকে আধুনিক প্যারিসের আদলে নতুন রাজপথ, কায়রো অপেরা হাউস, রেলওয়ে নেটওয়ার্ক, টেলিগ্রাফ লাইন এবং শত শত বিদ্যালয় স্থাপন করে সাজান।
  • দেউলিয়াত্বের কারণ: আমেরিকান গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তুলার দাম হঠাৎ ধস নামে। কিন্তু ইসমাইল ইউরোপীয় মহাজন ও ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত চড়া সুদে বিপুল ঋণ গ্রহণ অব্যাহত রাখেন। বিলাসবহুল প্রাসাদ নির্মাণ, অপব্যয় এবং সেনাবাহিনীর পেছনে বিপুল ঋণের ফাঁদে পড়ে ১৮৭৬ সালের মধ্যে মিশরের ঋণ প্রায় ১০ কোটি পাউন্ডে পৌঁছায়।
  • ফলাফল: ১৮৭৫ সালে বাধ্য হয়ে তিনি মাত্র ৪০ লক্ষ পাউন্ডে সুয়েজ খালের মিশরের মালিকানাধীন ৪৪% শেয়ার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরেইলির কাছে বিক্রি করেন। পরবর্তীতে ১৮৭৬ সালে দেশ দেউলিয়া ঘোষিত হয় এবং ব্রিটিশ-ফরাসি দ্বৈত অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ (Caisse de la Dette) চাপিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে ১৮৮২ সালে ব্রিটেন কর্তৃক মিশর দখলের পথ সুগম হয়।

৮. আহমেদ উরাবি পাশার মিশরীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।

[Give a brief account of Ahmed Urabi Pasha’s Egyptian nationalist movement.]

কর্নেল আহমেদ উরাবি পাশা ছিলেন মিশরীয় বংশোদ্ভূত ফেল্লাহিন বা কৃষক পরিবারের সন্তান। ১৮৭৯-১৮৮২ সালের মধ্যে তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত আন্দোলনকে আধুনিক মিশরের প্রথম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বলা হয়।

  1. আন্দোলনের কারণ: সেনাবাহিনীতে তুর্কি-সার্কাসিয়ান উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রাধান্য ও বৈষম্য, মিশরীয় অফিসারদের পদোন্নতি বঞ্চনা এবং সরকারের ওপর অ্যাংলো-ফরাসি সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ।
  2. ১৮৮১ সালের আবদিন প্রাসাদের ঘটনা: ১৮৮১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর উরাবি পাশা হাজার হাজার সেনাসদস্য ও জনতা নিয়ে কায়রোর আবদিন প্রাসাদ ঘেরাও করেন এবং খেদিভ তৌফিকের কাছে তিনটি দাবি পেশ করেন: মন্ত্রিসভার পদত্যাগ, নতুন জাতীয় সংসদ গঠন এবং সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি। খেদিভ দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন এবং উরাবি যুদ্ধমন্ত্রী নিযুক্ত হন। স্লোগান ওঠে—‘মিশর মিশরীয়দের জন্য’ (Misr lil-Misriyyin)।
  3. ব্রিটিশ আগ্রাসন ও তেল আল-কবীর যুদ্ধ (১৮৮২): ইউরোপীয় শক্তিগুলো উরাবির গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতে চক্রান্ত করে। ১৮৮২ সালের জুলাইয়ে ব্রিটিশ নৌবহর আলেকজান্দ্রিয়া ধ্বংস করে এবং ১৩ সেপ্টেম্বর ১৮৮২ তেল আল-কবীর (Tel el-Kebir)-এর যুদ্ধে উরাবি পাশা পরাজিত হন। ব্রিটিশরা মিশর দখল করে এবং উরাবিকে সিলন (শ্রীলঙ্কা)-এ নির্বাসিত করা হয়।

৯. হুসনী মুবারকের বৈদেশিক নীতি সংক্ষেপে আলোচনা কর।

[Briefly discuss the foreign policy of Hosni Mubarak.]

আনোয়ার সাদাতের হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালের অক্টোবরে ক্ষমতায় আসেন সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান মুহাম্মদ হুসনী মুবারক (শাসনকাল: ১৯৮১-২০১১)। তাঁর বৈদেশিক নীতি ছিল বাস্তবমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ:

  • আরব বিশ্বের সাথে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা: ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির কারণে আরব বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মিশরকে তিনি পুনরায় মর্যাদার সাথে ফিরিয়ে আনেন। ১৯৮৯ সালে মিশর আরব লীগে ফিরে আসে এবং সদরদপ্তর পুনরায় কায়রোতে স্থানান্তর করা হয়।
  • আমেরিকার সাথে কৌশলগত মৈত্রী: তিনি ওয়াশিংটনের সাথে গভীর সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং বার্ষিক শত কোটি ডলার মার্কিন সামরিক সহায়তা লাভ করেন। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে তিনি সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে মিশরীয় সেনা প্রেরণ করেন।
  • ইসরাইলের সাথে ‘শীতল শান্তি’ (Cold Peace): ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি বহাল রাখলেও ইসরাইলের ফিলিস্তিন নীতির বিরোধিতায় সম্পর্ককে একটি ন্যূনতম আনুষ্ঠানিক বা শীতল শান্তিতে সীমাবদ্ধ রাখেন। তিনি আরব-ইসরাইল শান্তি আলোচনায় একজন শীর্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।

১০. মুহাম্মদ আহমদ মাহদীর সুদানি বিপ্লবের গুরুত্ব লেখ।

[Write down the significance of Muhammad Ahmad al-Mahdi’s Sudanese revolution.]

১৮৮১ সালে সুদানের আধ্যাত্মিক সুফি সাধক মুহাম্মদ আহমদ নিজেকে ‘প্রতিশ্রুত মাহদী’ ঘোষণা করে তুরস্ক-মিশরীয় (তুর্কিয়া) অপশাসন এবং ক্রমবর্ধমান ব্রিটিশ খ্রিস্টান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিপ্লব শুরু করেন।

  1. স্বদেশপ্রেম ও ধর্মীয় জাগরণ: মাহদীর অনুসারী ‘আনসার’রা ধর্মীয় উন্মাদনা ও মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষায় আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ব্রিটিশ ও মিশরীয় বাহিনীকে একের পর এক যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে (যেমন শায়কান যুদ্ধ, ১৮৮৩)।
  2. খার্তুম বিজয় ও গর্ডন হত্যা (১৮৮৫): ১৮৮৫ সালের ২৬ জানুয়ারি মাহদীবাদী বাহিনী খার্তুম দখল করে এবং ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল চার্লস জর্জ গর্ডনকে হত্যা করে। এর মাধ্যমে সুদানে বিদেশি উপনিবেশের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ ঘটে।
  3. প্রথম স্বাধীন দেশীয় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা: মাহদী ওমদুরমানকে রাজধানী করে সুদান ভূখণ্ডে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, সার্বভৌম ইসলামি রাষ্ট্রের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত তাঁর উত্তরসূরি খলিফা আব্দুল্লাহির নেতৃত্বে টিকে ছিল। এ বিপ্লব সুদানি জাতীয় পরিচয়ের মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. আধুনিক মিশরের রূপকার বা জনক কাকে বলা হয়?

আলবেনীয় বংশোদ্ভূত অটোমান গভর্নর মুহাম্মদ আলী পাশাকে (১৭৬৯-১৮৪৯) তাঁর বৈপ্লবিক সামরিক, প্রশাসনিক, কৃষি ও শিক্ষাগত আধুনিকায়নের কারণে আধুনিক মিশরের রূপকার বলা হয়।

২. সুয়েজ খাল কত সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়?

১৮৬৯ সালের ১৭ নভেম্বর মিশরের খেদিভ ইসমাইলের আমলে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সুয়েজ খাল উদ্বোধন করা হয়।

৩. জামাল আবদেল নাসের কত সালে সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন?

১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই আলেকজান্দ্রিয়ায় এক ঐতিহাসিক জনসভায় মিশরীয় প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণের ঐতিহাসিক ডিক্রি ঘোষণা করেন।

৪. ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি কত সালে কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়?

১৯৭৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মধ্যস্থতায় মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী মেনাহেম বেগিনের মধ্যে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

৫. সুদান কত তারিখে ব্রিটিশ ও মিশরীয় দ্বৈত শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে?

১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি সুদান আনুষ্ঠানিকভাবে ইঙ্গ-মিশরীয় কন্ডোমিনিয়াম থেকে মুক্ত হয়ে একটি সার্বভৌম স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

৬. সুদানের প্রথম গৃহযুদ্ধ অবসানে আদ্দিস আবাবা চুক্তি কত সালে স্বাক্ষরিত হয়?

১৯৭২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট জাফর নিমেরীর সরকারের সাথে দক্ষিণ সুদানের আনিয়ানিয়া বিদ্রোহীদের মধ্যে ঐতিহাসিক আদ্দিস আবাবা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *