জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আধুনিক তুরস্ক, ইরান ও আফগানিস্তানের ইতিহাস (History of Modern Turkey, Iran and Afghanistan) – 205304, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2021

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৫৪ মিনিট পড়ার সময়
৭ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2021
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: আধুনিক তুরস্ক, ইরান ও আফগানিস্তানের ইতিহাস
বিষয় কোড: 205304 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি

১. আধুনিক তুরস্ক গঠনে মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের সংস্কার ও অবদান পর্যালোচনা কর।

[Review the reforms and contributions of Mustafa Kemal Ataturk in the making of modern Turkey.]

ক. ভূমিকা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্যের শোচনীয় পরাজয় এবং সাম্রাজ্যবাদী মিত্রশক্তির মাধ্যমে তুরস্ক বিভাজনের ষড়যন্ত্রের মুহূর্তে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন গাজী মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক (১৮৮১-১৯৩৮)। তিনি বীরোচিত সমরনেতৃত্বের মাধ্যমে বিদেশি দখলদারিত্ব হটিয়ে ১৯২৩ সালে আধুনিক প্রজাতন্ত্রী তুরস্ক প্রতিষ্ঠা করেন এবং মধ্যযুগীয় ঐতিহ্য ভেঙে আধুনিক পাশ্চাত্য ভাবধারায় একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতিরাষ্ট্র গঠন করেন।

খ. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার:

  1. সুলতানাত ও খেলাফত বিলোপ: মোস্তফা কামাল ১৯২২ সালের ১ নভেম্বর সুলতানাত বিলুপ্ত করেন। পরবর্তীতে ১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর তুরস্ককে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয় এবং ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ সুদীর্ঘ শতাব্দীর উসমানীয় খেলাফত আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
  2. ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রবর্তন: ১৯২৪ সালে নতুন সংবিধান রচিত হয়। ১৯২৮ সালে সংবিধান সংশোধন করে “ইসলাম তুরস্কের রাষ্ট্রধর্ম”—এ অনুচ্ছেদটি বাতিল করা হয় এবং রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ ঘোষণা করা হয়।
  3. কামালবাদের ছয় মূলনীতি (Six Arrows of Kemalism): রিপাবলিকানিজম (প্রজাতন্ত্রবাদ), ন্যাশনালিজম (জাতীয়তাবাদ), পপুলিজম (গণবাদ), সেকুলারিজম (ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ), স্ট্যাটিজম (রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণবাদ) এবং রেভল্যুশনিজম (সংস্কারবাদ বা পরিবর্তনকামিতা)।

গ. বিচার বিভাগীয় ও আইনগত সংস্কার:

  1. শরীয়াহ আইনের বিলোপ: বিচারব্যবস্থা থেকে ইসলামি শরীয়াহ আইন প্রত্যাহার করা হয় এবং ধর্মীয় আদালত বন্ধ করা হয়।
  2. ইউরোপীয় আইনের অনুকরণ: ১৯২৬ সালে সুইজারল্যান্ডের দেওয়ানি আইন (Swiss Civil Code), ইতালির ফৌজদারি আইন এবং জার্মানির বাণিজ্যিক আইন তুরস্কে রূপান্তর করে কার্যকর করা হয়। বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা হয় এবং সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার স্বীকৃত হয়।

ঘ. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কার:

  1. পোশাক সংস্কার: ১৯২৫ সালে ঐতিহ্যবাহী ফেজ টুপি ও পাগড়ি পরিধান নিষিদ্ধ করে পশ্চিমা টুপি (Hat Law) পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়। নারীদের জন্য পর্দাপ্রথা নিরুৎসাহিত করা হয়।
  2. সূফী দরগাহ ও খানকা বন্ধ: কুসংস্কার ও অন্ধভক্তি দূর করার লক্ষ্যে সমস্ত দরবেশ সম্প্রদায়, ত্বরিকা ও দরগাহ রাষ্ট্রীয় আদেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
  3. পশ্চিমা ক্যালেন্ডার ও মেট্রিক পদ্ধতি: হিজরি বর্ষপঞ্জির স্থলে জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার এবং প্রাচীন পরিমাপের বদলে মেট্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। সাপ্তাহিক ছুটি রবিবারে স্থানান্তর করা হয়।
  4. পারিবারিক পদবি গ্রহণ: ১৯৩৪ সালে পদবি আইন পাস হয়, যার মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিকের পারিবারিক নাম রাখা বাধ্যতামূলক হয় এবং গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি মোস্তফা কামালকে ‘আতাতুর্ক’ (তুর্কিদের পিতা) উপাধিতে ভূষিত করে।

ঙ. শিক্ষাগত ও ভাষাগত সংস্কার:

  1. একমুখী ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা: ১৯২৪ সালে ‘তেভহিদ-ই তেদরিসাত’ (শিক্ষার ঐক্য আইন) জারি করে সব ধর্মীয় মাদ্রাসা বন্ধ করে জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একমুখী ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
  2. ল্যাটিন বর্ণমালা প্রবর্তন (১৯২৮): আরবি বর্ণমালার পরিবর্তে পরিমার্জিত ল্যাটিন বর্ণমালা গৃহীত হয়। দেশব্যাপী গণশিক্ষা অভিযান চালিয়ে দ্রুত সাক্ষরতার হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করা হয়।
  3. ভাষা পরিশোধন আন্দোলন: তুর্কি ভাষা থেকে আরবি ও ফারসি শব্দবর্জন করে প্রাচীন বিশুদ্ধ তুর্কি শব্দ পুনঃপ্রচলন করা হয়।

চ. মূল্যায়ন:

আতাতুর্কের চরম ধর্মনিরপেক্ষতা ও বলপ্রয়োগের নীতি ঐতিহ্যবাদী মুসলিমদের মধ্যে সমালোচিত হলেও, এটি অনস্বীকার্য যে তাঁর কঠোর দূরদর্শিতা ধ্বংসপ্রাপ্ত ‘ইউরোপের রুগ্ণ মানুষ’ তুরস্ককে মধ্যপ্রাচ্যের একটি শক্তিশালী, সার্বভৌম ও আধুনিক শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করেছিল।


২. ১৯২৩ সালের লুজান চুক্তির প্রেক্ষাপট ও ফলাফল মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the background and results of the Treaty of Lausanne, 1923.]

ক. পটভূমি ও প্রেক্ষাপট:

১৯২০ সালের ১০ আগস্ট প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী মিত্রশক্তি পুতুল সুলতান ষষ্ঠ মুহাম্মদকে দিয়ে চরম অবমাননাকর ‘সেভার্স চুক্তি’ স্বাক্ষর করায়। এর মাধ্যমে উসমানীয় সাম্রাজ্যকে সম্পূর্ণ টুকরো টুকরো করে কনস্টান্টিনোপল ও প্রণালী অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয় এবং আনাতোলিয়া গ্রিস, ইতালি ও ফ্রান্সের মধ্যে বাঁটোয়ারা করা হয়। মোস্তফা কামালের নেতৃত্বাধীন তুর্কি জাতীয়তাবাদীরা এ দাসত্বমূলক চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন।

১৯১৯-১৯২২ সালের রক্তক্ষয়ী জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে কামাল আতাতুর্কের বীরত্বপূর্ণ তুর্কি বাহিনী আক্রমণকারী গ্রিক বাহিনীকে সাগরে নিক্ষেপ করে এবং ইস্তাম্বুল ও স্মার্না পুনর্দখল করে। এ বিজয় মিত্রশক্তিকে সেভার্স চুক্তি বাতিল করে তুর্কি জাতীয় সরকারের সাথে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করে। সুইজারল্যান্ডের লুজান শহরে দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯২৩ সালের ২৪ জুলাই ঐতিহাসিক লুজান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

খ. লুজান চুক্তির প্রধান শর্তাবলি:

  1. তুরস্কের সার্বভৌম সীমানা স্বীকৃতি: আধুনিক তুরস্কের বর্তমান ভৌগোলিক সীমানা (আনাতোলিয়া ও পূর্ব থ্রেস) আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়। স্বাধীন আর্মেনিয়া ও স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তানের সেভার্স প্রস্তাব বাতিল করা হয়।
  2. ক্যাপিচুলেশন বিলোপ: উসমানীয় যুগে ইউরোপীয়দের প্রদত্ত অপমানজনক বিচারিক ও বাণিজ্যিক বিশেষ সুবিধা (Capitulations) সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়।
  3. প্রণালী বিষয়ক বিধান: বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালীর সামরিক নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক কমিশনের হাতে রাখা হলেও বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত হয় (যা পরবর্তীতে ১৯৩৬ সালে মনট্রেক্স কনভেনশনে তুরস্কের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে)।
  4. জনসংখ্যা বিনিময় (Population Exchange): গ্রিস ও তুরস্কের মধ্যে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ঐতিহাসিক জনসংখ্যা বিনিময় চুক্তি হয়; প্রায় ১২ লক্ষ গ্রিক অর্থোডক্স খ্রিস্টান গ্রিসে এবং ৪ লক্ষ তুর্কি মুসলিম গ্রিস থেকে তুরস্কে স্থানান্তরিত হয়।

গ. লুজান চুক্তির ঐতিহাসিক ফলাফল ও তাৎপর্য:

  1. উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রথম এশীয় বিজয়: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র তুরস্কই যুদ্ধের মাধ্যমে মিত্রশক্তির আরোপিত দাসত্বমূলক চুক্তি বাতিল করে সমমর্যাদাসম্পন্ন চুক্তি আদায় করতে সক্ষম হয়।
  2. প্রজাতন্ত্রী তুরস্কের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: লুজান চুক্তির মাধ্যমেই ১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর কামাল আতাতুর্কের নতুন প্রজাতন্ত্রী তুরস্কের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি আন্তর্জাতিকভাবে মজবুত হয়।
  3. সার্বভৌম জাতীয় ঐক্যের সূচনা: বিদেশি হস্তক্ষেপমুক্ত অভ্যন্তরীণ সংস্কারের পথ উন্মুক্ত হয়, যা মোস্তফা কামালকে দ্রুত ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে সাহায্য করে।

৩. ইরানে তেল জাতীয়করণ আন্দোলনের পটভূমি ও ফলাফল বর্ণনা কর।

[Describe the background and results of the oil nationalization movement in Iran.]

ক. আন্দোলনের পটভূমি:

  1. অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির (AIOC) শোষণ: ১৯০১ সালে উইলিয়াম ডি’আর্সিকে দেওয়া তেল ইজারার ভিত্তিতে ১৯০৮ সালে ইরানে তেল আবিষ্কৃত হয়। ব্রিটিশ মালিকানাধীন অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি ইরানের বিপুল তেলসম্পদ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। ইরানকে দেওয়া হতো অতি সামান্য রয়্যালটি (মাত্র ১৬%), অথচ ব্রিটিশ সরকার কোম্পানি থেকে কর পেত ইরানের রয়্যালটির চেয়েও বেশি।
  2. জাতীয়তাবাদী ক্ষোভ ও ড. মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের উত্থান: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইরানি জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক শোষণমুক্তির তীব্র জাতীয়তাবাদী চেতনা জেগে ওঠে। ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেতা ড. মোহাম্মদ মোসাদ্দেক এ আন্দোলনের মূল রূপকার হিসেবে আবির্ভূত হন।
  3. সংসদে ঐতিহাসিক প্রস্তাব: ১৯৫১ সালের মার্চ মাসে ইরানি মজলিস (সংসদ) সর্বসম্মতিক্রমে তেল শিল্প জাতীয়করণের আইন পাস করে। জনমতের চাপে যুবরাজ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী ড. মোসাদ্দেককে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য হন।

খ. জাতীয়করণের প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:

প্রধানমন্ত্রী ড. মোসাদ্দেক ১৯৫১ সালের মে মাসে আবাদান তেল শোধনাগারসহ সকল তেলক্ষেত্র ইরানি জাতীয় তেল কোম্পানির (NIOC) নিয়ন্ত্রণে নেন। এর ফলে বিশ্বরাজনীতিতে তীব্র সংঘাত শুরু হয়:

  • ব্রিটিশ অর্থনৈতিক অবরোধ: ব্রিটেন পারস্য উপসাগরে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে এবং ইরানি তেল আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রয়ে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়ে।
  • আন্তর্জাতিক বিচারালয়ে মামলা: ব্রিটেন হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করলেও আদালতের রায় মোসাদ্দেকের জাতীয় সার্বভৌমত্বের পক্ষে যায়।

গ. অপারেশন এজাক্স (Operation Ajax) ও ফলাফল:

  1. ১৯৫৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থান: তেল হাতছাড়া হওয়া এবং ইরানে কমিউনিস্ট তুদেহ পার্টির প্রভাব বৃদ্ধির ভয়ে মার্কিন সিআইএ (CIA) ও ব্রিটিশ এমআইসিক্স (MI6) যৌথভাবে কুখ্যাত ‘অপারেশন এজাক্স’ পরিচালনা করে। ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদীর মাধ্যমে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ড. মোসাদ্দেককে উৎখাত ও বন্দি করা হয়।
  2. শাহের নিরঙ্কুশ একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: মোসাদ্দেকের পতনের পর রোমে পালিয়ে যাওয়া মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী ইরানে ফিরে আসেন এবং মার্কিন সহায়তায় রক্তক্ষয়ী সাভাক (SAVAK) গোয়েন্দা সংস্থা গঠন করে নিরঙ্কুশ রাজকীয় স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করেন।
  3. তেল কনসোর্টিয়াম গঠন: ১৯৫৪ সালে তেল খাতের পুনর্গঠন করে একটি পশ্চিমা কনসোর্টিয়াম গঠিত হয়, যেখানে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ৪০% এবং ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোকে ৪০% অংশীদারিত্ব দেওয়া হয়।
  4. ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের ভিত্তিপ্রস্তর: মোসাদ্দেক সরকারের পতনের ফলে ইরানি জনগণের মনে মার্কিন ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে গভীর ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের জন্ম হয়, তারই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লবে।

৪. ইরানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ‘শ্বেত বিপ্লব’ (White Revolution)-এর প্রভাব বিশ্লেষণ কর।

[Analyze the impact of the ‘White Revolution’ on the economic and social life of Iran.]

ক. শ্বেত বিপ্লবের ধারণা ও উদ্দেশ্য:

১৯৬৩ সালে ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শ ও সমর্থনে রক্তপাতহীন এক ব্যাপক আধুনিকায়ন ও সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করেন, যা ইতিহাসে ‘ইনকিলাব-ই সেফিদ’ বা ‘শ্বেত বিপ্লব’ (White Revolution) নামে খ্যাত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজতন্ত্রের জন্য গ্রামীণ কৃষক সমাজের সমর্থন আদায় করা, সামন্ততান্ত্রিক জমিদার ও উলামাদের ক্ষমতা খর্ব করা এবং দেশকে অতি দ্রুত পশ্চিমা ধাঁচে আধুনিকায়ন করা।

খ. শ্বেত বিপ্লবের প্রধান কর্মসূচিসমূহ:

  1. ভূমি সংস্কার আইন: বৃহৎ জমিদার ও ধর্মীয় ওয়াকফ সম্পত্তি রাষ্ট্র অধিগ্রহণ করে ক্ষুদ্র চাষীদের মধ্যে বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
  2. বন ও চারণভূমি জাতীয়করণ: দেশের সমস্ত বনাঞ্চল ও চারণভূমি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হয়।
  3. শিল্প কারখানার শেয়ার বিক্রি: রাষ্ট্রীয় কলকারখানার শেয়ার সাধারণ শ্রমিক ও জনগণের কাছে বিক্রি করে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটানো।
  4. মুনাফায় শ্রমিকের অংশীদারিত্ব: শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ২০% নিট মুনাফা শ্রমিকদের মধ্যে বণ্টন বাধ্যতামূলক করা হয়।
  5. সাক্ষরতা ও স্বাস্থ্য বাহিনী গঠন (Literacy & Health Corps): শিক্ষিত তরুণদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার অংশ হিসেবে গ্রামে গ্রামে গিয়ে নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে নিয়োজিত করা।
  6. নারীর ক্ষমতায়ন ও ভোটাধিকার: নারীদের ভোটাধিকার প্রদান এবং বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদে শরীয়াহ আদালতের পরিবর্তে পারিবারিক দেওয়ানি আদালত প্রবর্তন।

গ. অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে প্রভাব ও পরিণতি:

  1. কৃষি বিপর্যয় ও খাদ্য আমদানির নির্ভরতা: অপরিকল্পিত ভূমি সংস্কারের কারণে জমির ক্ষুদ্র খণ্ডে বিভাজন হয়। কৃষক আধুনিক সার, সেচ ও ঋণের সুবিধা না পেয়ে কৃষিজমি পরিত্যাগ করে শহরে অভিবাসন শুরু করে। ফলে খাদ্য রফতানিকারক ইরান আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়।
  2. শহরাঞ্চলে বস্তির বৃদ্ধি ও বেকারত্ব: গ্রাম থেকে লাখ লাখ নিঃস্ব কৃষক তেহরানসহ প্রধান শহরগুলোতে এসে জমা হয়। শহরগুলোতে ব্যাপক বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয়।
  3. ধর্মীয় উলামা শ্রেণির চরম অসন্তোষ: ওয়াকফ সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া, বিচারব্যবস্থায় ধর্মীয় কর্তৃত্ব বিলোপ এবং সাংস্কৃতিক পাশ্চাত্যকরণের বিরুদ্ধে আলেম সমাজ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ সময় আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি শ্বেত বিপ্লবকে “ইসলাম ও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এবং মার্কিন-ইহুদি ষড়যন্ত্র” আখ্যা দিয়ে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে রুখে দাঁড়ান।
  4. পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসন ও সামাজিক অবক্ষয়: নাইটক্লাব, অ্যালকোহল ও অশালীন জীবনধারার প্রসারে সাধারণ ধর্মপ্রাণ ইরানি পরিবারগুলোতে গভীর সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা ও ক্ষোভ জন্মায়।

ঘ. মূল্যায়ন:

শাহের শ্বেত বিপ্লব বাহ্যিকভাবে কিছু অর্থনৈতিক সূচক বাড়ালেও তা তৃণমূল জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক অংশগ্রহণহীন উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া এই আধুনিকায়নই শেষ পর্যন্ত শাহের পতনের ক্ষেত্র তৈরি করে এবং ১৯৭৯ সালের গণবিপ্লবকে ত্বরান্বিত করে।


৫. আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট সরকারের (১৯৭৮-১৯৮৯) উত্থান ও পতন আলোচনা কর।

[Discuss the rise and fall of the Communist Government in Afghanistan (1978-1989).]

ক. কমিউনিস্টদের উত্থান ও সাওর বিপ্লব (১৯৭৮):

আফগানিস্তানে পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আফগানিস্তান (PDPA) ছিল প্রধান মার্কসবাদী রাজনৈতিক দল, যা দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী উপদলে বিভক্ত ছিল—নুর মুহাম্মদ তারাকি ও বাবরাক কারমালের ‘পারচাম’ (Parcham) এবং হাফিজুল্লাহ আমিনের ‘খালক’ (Khalq)।

১৯৭৩ সালে রাজা জহির শাহকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসেন সরদার মুহাম্মদ দাউদ খান। ১৯৭৮ সালে দাউদ খান কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলে সামরিক বাহিনীর কমিউনিস্ট অফিসারদের সহায়তায় ১৯৭৮ সালের ২৭-২৮ এপ্রিল রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো হয়, যা ইতিহাসে ‘সাওর বিপ্লব’ (Saur Revolution) নামে পরিচিত। প্রেসিডেন্ট দাউদকে হত্যা করে নুর মুহাম্মদ তারাকিকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করা হয়।

খ. কমিউনিস্ট সরকারের চরমপন্থী নীতি ও বিদ্রোহের সূত্রপাত:

  1. ইসলাম-বিরোধী নীতি ও ঐতিহ্যগত সংঘাত: তারাকির নেতৃত্বে খালক সরকার ঐতিহ্যবাহী ইসলামি ও উপজাতীয় আফগান সমাজে রাতারাতি উগ্র মার্কসবাদী নীতি চাপিয়ে দেয়। জাতীয় পতাকার রং পরিবর্তন করে লাল পতাকা করা হয় এবং ইসলামি অনুশাসন অবমাননা করা হয়।
  2. মুজাহিদীন বিদ্রোহ: গ্রামীণ ও পাহাড়ী আফগান জনগণ ও উলামায়ে কেরাম নাস্তিক্যবাদী কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। ১৯৭৯ সালের মার্চে হেরাত শহরে বিশাল বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
  3. দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব ও আমিনের রক্তক্ষয়ী উত্থান: খালক ও পারচামের অন্তর্দ্বন্দ্বে ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বরে হাফিজুল্লাহ আমিন গোপনে তারাকিকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেন।

গ. সোভিয়েত সামরিক আগ্রাসন (১৯৭৯):

হাফিজুল্লাহ আমিনের অযোগ্যতা এবং আফগানিস্তানে ইসলামিক শাসন কায়েমের আশঙ্কায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর লাল ফৌজ (Red Army) প্রেরণ করে আফগানিস্তান দখল করে নেয়। আমিনকে প্রাসাদে হত্যা করে মস্কোপন্থী বাবরাক কারমালকে বসানো হয়।

ঘ. আফগান জিহাদ ও সোভিয়েত পরাজয়:

  1. আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ ও মুজাহিদীনদের সংগ্রাম: সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও চীনের সরাসরি মদদে আফগান মুজাহিদীন দলগুলো (যেমন আহমেদ শাহ মাসুদ, গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার, বোরহানউদ্দিন রব্বানী) অপ্রতিরোধ্য গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে।
  2. স্টিংগার মিসাইল ও সোভিয়েত বিপর্যয়: মুজাহিদীনদের হাতে মার্কিন স্টিঙ্গার বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছালে সোভিয়েত যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার ধ্বংস হতে থাকে। আফগানিস্তান পরিণত হয় ‘সোভিয়েতের নিজস্ব ভিয়েতনাম’-এ।
  3. জেনেভা চুক্তি ও সেনা প্রত্যাহার (১৯৮৮-১৯৮৯): বিপুল প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক পতনের মুখে নতুন সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ যুদ্ধ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮৮ সালের জেনেভা চুক্তির পর ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ সোভিয়েত সেনা আফগানিস্তান ত্যাগ করে।

ঙ. কমিউনিস্ট সরকারের চূড়ান্ত পতন (১৯৯২):

সোভিয়েত বাহিনী চলে গেলেও ড. মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহর কমিউনিস্ট সরকার কিছুদিন সোভিয়েত সহায়তায় টিকে ছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক পতনের ফলে সব ধরনের আর্থিক ও সামরিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯২ সালের এপ্রিলে মুজাহিদীন বাহিনী কাবুল দখল করে এবং আফগানিস্তানে ১৪ বছরের রক্তক্ষয়ী কমিউনিস্ট দুঃশাসনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।


৬. ১৯৯২-১৯৯৬ মেয়াদে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও তালেবান আন্দোলনের পটভূমি মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the internal politics of Afghanistan during 1992-1996 and the background of the Taliban movement.]

ক. ১৯৯২ সালে কমিউনিস্ট পতনের পর গৃহযুদ্ধ:

১৯৯২ সালের এপ্রিলে নাজিবুল্লাহ সরকারের পতনের পর মুজাহিদীন দলগুলো ‘ইসলামিক স্টেট অব আফগানিস্তান’ গঠন করে। পেশোয়ার চুক্তি অনুযায়ী সিবঘাতুল্লাহ মুজাদ্দিদি দুই মাস এবং পরবর্তীতে অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন রব্বানী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আহমেদ শাহ মাসুদ হন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পদে মনোনীত হিযব-ই-ইসলামির প্রধান গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার রব্বানী ও মাসুদের সরকারকে মেনে নিতে অস্বীকার করেন। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুজাহিদীন দলগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। হেকমতিয়ার চারপাশ থেকে কাবুলের ওপর হাজার হাজার রকেট নিক্ষেপ করেন। জেনারেল দোস্তুমের উজবেক মিলিশিয়া এবং হেজব-ই-ওয়াহদাত (শিয়া মিলিশিয়া)-এর দলবদলে কাবুলের সিংহভাগ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং প্রায় ৫০,০০০ নিরীহ নাগরিক নিহত হয়।

খ. নৈরাজ্য, উপদলীয় শাসন ও সাধারণ মানুষের দুর্দশা:

  1. স্থানীয় যুদ্ধবাজদের দৌরাত্ম্য: দেশের সর্বত্র আইন-শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। বিভিন্ন সড়কে বন্দুকধারী মিলিশিয়ারা চৌকি বসিয়ে চাঁদাবাজি, লুটতরাজ, ধর্ষণ ও ব্যবসায়ীদের অপহরণ শুরু করে।
  2. কান্দাহারের চরম নৈরাজ্য: দক্ষিণ আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশে যুদ্ধবাজদের অনৈতিক আচরণ, নিরীহ নারীদের ওপর পাশবিক অত্যাচার এবং বালক ধর্ষণ (বাচ্চা বাজি)-এর মতো জঘন্য অপরাধ নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়।

গ. তালেবান আন্দোলনের পটভূমি ও উত্থান (১৯৯৪):

  1. মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের আত্মপ্রকাশ: কান্দাহারের মাইওয়ান্দ জেলার এক সাধারণ মাদ্রাসার শিক্ষক এবং সাবেক মুজাহিদ যোদ্ধা মোল্লা মুহাম্মদ ওমর স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের (তালিব) সংগঠিত করেন। ১৯৯৪ সালের বসন্তে এক অত্যাচারী যুদ্ধবাজের হাত থেকে অপহৃত কিশোরীদের উদ্ধারের মাধ্যমে তাঁদের প্রাথমিক প্রতিরোধের সূচনা হয়।
  2. ‘তালেবান’ শব্দের তাৎপর্য: ‘তালেবান’ মূলত আরবি ‘তালিব’ (জ্ঞানার্থী বা মাদ্রাসা ছাত্র)-এর পশতু বহুবচন। কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক কঠোর শরীয়াহ শাসন কায়েম, যুদ্ধবাজদের অস্ত্রহীন করা এবং আফগান সমাজে শান্তি ও নৈতিকতা ফিরিয়ে আনাই ছিল তাঁদের ঘোষিত মূল লক্ষ্য।
  3. জনসমর্থন ও দ্রুত বিজয়: দুর্নীতিগ্রস্ত যুদ্ধবাজদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাধারণ আফগান জনগণ ও ব্যবসায়ী মহল তালেবানদের স্বাগত জানায়। ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে তালেবান বাহিনী কান্দাহার দখল করে এবং রক্তপাতহীনভাবে অস্ত্র সমর্পণ করতে বাধ্য করে।
  4. পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন: মধ্য এশিয়ার সাথে সরাসরি বাণিজ্যপথ নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাসীরুল্লাহ বাবরের সরকার এবং আইএসআই (ISI) তালেবানদের রসদ ও কূটনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে।

ঘ. ১৯৯৬ সালে কাবুল বিজয় ও ইসলামি আমিরাত ঘোষণা:

১৯৯৫ সালে হেরাত দখলের পর তালেবানরা কাবুলের দিকে অগ্রসর হয়। ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে আহমেদ শাহ মাসুদ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়াতে কাবুল থেকে উত্তর উপত্যকায় সেনা প্রত্যাহার করেন। ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ তারিখে তালেবানরা কাবুলে প্রবেশ করে ক্ষমতা দখল করে, সাবেক কমিউনিস্ট প্রেসিডেন্ট নাজিবুল্লাহকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয় এবং ‘ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তান’ প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করে।


খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি

৭. সেভার্স চুক্তির প্রধান শর্তসমূহ কী ছিল?

[What were the main terms of the Treaty of Sevres?]

১৯২০ সালের ১০ আগস্ট প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত উসমানীয় সাম্রাজ্যের পুতুল সুলতান ষষ্ঠ মুহাম্মদের সরকারের সাথে বিজয়ী মিত্রশক্তির মধ্যে ফ্রান্সের সেভার্স শহরে এক চূড়ান্ত অপমানজনক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর প্রধান শর্তাবলি ছিল:

  • সাম্রাজ্যের চরম বিভাজন: হেজাজ, সিরিয়া, ইরাক ও ফিলিস্তিন অঞ্চল উসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে ব্রিটিশ ও ফরাসি ম্যান্ডেটের অধীন করা হয়।
  • তুর্কি মাতৃভূমির ব্যবচ্ছেদ: স্মার্না (ইজমির) ও পূর্ব থ্রেস গ্রিসকে প্রদান করা হয়; আদানা ও সিলিসিয়া ফ্রান্সকে এবং দক্ষিণ আনাতোলিয়া ইতালিকে অর্পণ করা হয়।
  • স্বাধীন আর্মেনিয়া ও কুর্দিস্তান: পূর্ব আনাতোলিয়ায় একটি স্বাধীন আর্মেনিয়া রাজ্য গঠন এবং কুর্দিদের জন্য স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়।
  • সামরিক ও প্রণালী নিয়ন্ত্রণ: তুর্কি সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা কমিয়ে সর্বোচ্চ ৫০,০০০-এ সীমিত করা হয় এবং বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালী সম্পূর্ণ সামরিকীকরণমুক্ত করে মিত্রশক্তির আন্তর্জাতিক কমিশনের নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করা হয়।

ফলাফল: এ দাসত্বমূলক চুক্তি তুর্কি জাতির আত্মমর্যাদায় প্রচণ্ড আঘাত হানে এবং কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের জন্ম দেয়, যার ফলে এ চুক্তি কোনোদিন বাস্তবায়িত হতে পারেনি।


৮. ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরস্কের সদস্যপদ লাভের প্রতিবন্ধকতাসমূহ লেখ।

[Write down the obstacles to Turkey’s membership in the European Union.]

তুরস্ক দীর্ঘ দশক ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)-এর পূর্ণ সদস্যপদ অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে আসলেও বিভিন্ন জটিল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভূ-কৌশলগত কারণে এ প্রক্রিয়া অচলাবস্থায় নিমজ্জিত হয়েছে। প্রধান প্রতিবন্ধকতাসমূহ হলো:

  1. সাইপ্রাস সংকট: উত্তর সাইপ্রাসে তুর্কি সামরিক উপস্থিতি এবং গ্রিক সাইপ্রিয়ট সরকারকে তুরস্ক স্বীকৃতি না দেওয়ায় সাইপ্রাস ও গ্রিস সর্বদাই তাদের ভিটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে।
  2. মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ড (কোপেনহেগেন ক্রাইটেরিয়া): বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, কুর্দি সংখ্যালঘু অধিকার এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়মিত তুরস্কের ওপর অভিযোগ উত্থাপন করে।
  3. সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ভিন্নতা: ইউরোপীয় ইউনিয়নের রক্ষণশীল দেশগুলোর (বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানি) অলিখিত মনোভাব হলো ইইউ একটি ‘খ্রিস্টান ক্লাব’; ফলে ৮ কোটিরও বেশি মুসলিম জনসংখ্যার দেশকে অন্তর্ভুক্ত করলে ইউরোপের জনমিতি ও সংসদে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে।
  4. ভূ-কৌশলগত অবস্থান ও অভিবাসন চাপ: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির সীমান্ত (সিরিয়া, ইরাক, ইরান) সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ সীমান্তে পরিণত হওয়ার ভয় ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে প্রবল।

৯. রেজা শাহ পাহলভীর আধুনিকায়ন নীতি সংক্ষেপে লেখ।

[Briefly write down the modernization policy of Reza Shah Pahlavi.]

১৯২৫ সালে কাজার রাজবংশের অবসান ঘটিয়ে ইরানের সিংহাসনে বসেন পাহলভী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রেজা শাহ পাহলভী (শাসনকাল: ১৯২৫-১৯৪১)। তিনি তুরস্কের আতাতুর্কের সংস্কার দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে ইরানে ব্যাপক আধুনিকায়ন কর্মসূচি পরিচালনা করেন:

  • সামরিক সংস্কার ও আধুনিক সেনাবাহিনী: ক্ষুদ্র ও উপজাতীয় মিলিশিয়ার বদলে তিনি ইউরোপীয় প্রশিক্ষিত শক্তিশালী কেন্দ্রীয় স্থায়ী সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু করেন।
  • যোগাযোগ ও ট্রান্স-ইরানিয়ান রেলওয়ে: ক্যাস্পিয়ান সাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিখ্যাত ‘ট্রান্স-ইরানিয়ান রেলওয়ে’ নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করে দেশের অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটান।
  • পোশাক সংস্কার ও কাশফ-ই হিজাব: ১৯৩৬ সালে রাজকীয় ডিক্রির মাধ্যমে নারীদের জন্য চাদর বা পর্দা পরিধান নিষিদ্ধ (কাশফ-ই হিজাব) করা হয় এবং পুরুষদের ইউরোপীয় কোট-প্যান্ট ও পাহলভী হ্যাট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়।
  • শিক্ষা ও আইন সংস্কার: ১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আধুনিক তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়। বিচারব্যবস্থায় ধর্মীয় আলেমদের কর্তৃত্ব কমিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ফরাসি আইনের আলোকে দেওয়ানি আইন প্রবর্তন করেন।

১০. ডুরান্ড লাইন কী? এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আলোচনা কর।

[What is the Durand Line? Discuss its historical significance.]

ক. পরিচয় ও পটভূমি:

ডুরান্ড লাইন (Durand Line) হলো বর্তমান আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী প্রায় ২,৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রেখা। ১৮৯৩ সালের ১২ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পররাষ্ট্র সচিব স্যার হেনরি মর্টিমার ডুরান্ড এবং আফগানিস্তানের আমির আব্দুর রহমান খানের মধ্যে সম্পাদিত এক সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে এ কৃত্রিম সীমানা নির্ধারিত হয়।

খ. ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও সংঘাত:

  1. পশতুন জাতির বিভক্তিকরণ: ডুরান্ড লাইন নির্ধারণের মাধ্যমে প্রাচীন পশতুন উপজাতিদের ভৌগোলিকভাবে দুই ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়; অর্ধেকের বেশি পশতুন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমানে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তান) অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে এবং বাকিরা আফগানিস্তানে রয়ে যায়।
  2. আফগানিস্তানের অস্বীকৃতি: ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের বিদায় ও পাকিস্তান সৃষ্টির পর আফগানিস্তানের কোনো সরকারই (কমিউনিস্ট, মুজাহিদীন কিংবা তালেবান) ডুরান্ড লাইনকে বৈধ স্থায়ী আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। আফগানিস্তানের দাবি, এটি ছিল একটি সাময়িক সীমান্ত চুক্তি।
  3. ‘পশতুনিস্তান’ বিতর্ক ও আঞ্চলিক অস্থিরতা: ডুরান্ড লাইনের দুই তীরের উপজাতীয় সম্পর্ক ও অবাধ যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা কখনোই সম্ভব হয়নি। এটি দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার তিক্ত কূটনৈতিক সম্পর্কের মূল উৎস এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ দমনে একটি প্রধান জটিলতা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক কবে তুরস্কের খেলাফত আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করেন?

১৯২৪ সালের ৩ মার্চ গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে আইন পাসের মাধ্যমে মোস্তফা কামাল আনুষ্ঠানিকভাবে উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

২. লুজান চুক্তি কত সালে এবং কোথায় স্বাক্ষরিত হয়?

১৯২৩ সালের ২৪ জুলাই সুইজারল্যান্ডের লুজান শহরে তুর্কি জাতীয়তাবাদী সরকার এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মিত্রশক্তির মধ্যে লুজান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

৩. ইরানে তেল জাতীয়করণ আন্দোলনের প্রধান রূপকার কে ছিলেন?

ইরানের জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ছিলেন ১৯৫১ সালের তেল শিল্প জাতীয়করণ আন্দোলনের প্রধান দূরদর্শী রূপকার ও নেতা।

৪. ইরানের ‘শ্বেত বিপ্লব’ কত সালে কে প্রবর্তন করেন?

১৯৬৩ সালে ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী রক্তপাতহীন আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে শ্বেত বিপ্লব ঘোষণা করেন।

৫. আফগানিস্তানে সাওর বিপ্লব কত সালে সংঘটিত হয়েছিল?

১৯৭৮ সালের ২৭-২৮ এপ্রিল আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট দল পিডিপিএ (PDPA)-এর নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী সাওর বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় মার্কসবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

৬. আফগানিস্তানে ডুরান্ড লাইন চুক্তি কত সালে স্বাক্ষরিত হয়?

১৮৯৩ সালের ১২ নভেম্বর ব্রিটিশ সরকারের স্যার মর্টিমার ডুরান্ড এবং আফগান আমির আব্দুর রহমান খানের মধ্যে ঐতিহাসিক ডুরান্ড লাইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *