ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2022
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ (السيرة النبوية)
বিষয় কোড: 205301 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি
١- تحدث عن أحوال العرب الدينية والثقافية قبل مبعث النبي صلى الله عليه وسلم
[১. রাসূল (সা.)-এর নবুওয়াতের পূর্বে আরবদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবস্থা আলোচনা কর।]
ক. ধর্মীয় অবস্থা (Jahiliyyah Religious Scenario):
ইসলাম আগমনের পূর্বে আরবের সমাজ ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, যাকে ইতিহাসে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বলা হয়। ধর্মীয় ক্ষেত্রে তৎকালীন আরব সমাজে চরম বিকৃতি ঘটেছিল:
- মূর্তিপূজা ও বহুঈশ্বরবাদ (Idolatry): হযরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদী ‘দ্বীনে হানিফ’ বিলুপ্ত হয়ে عمرو بن لحي (আমর ইবনে লুহাই)-এর মাধ্যমে আরবে মূর্তিপূজার সূচনা হয়। পবিত্র কাবাঘরেই ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। প্রধান প্রধান মূর্তি ছিল হুবাল, লাত (তায়েফে), মানাত (মদিনার কুদাইদে) এবং উযযা (নাখলা উপত্যকায়)। ভাগ্য নির্ধারণে বাণ বা তীর নিক্ষেপ (ইস্তিকসাম বিল আজলাম) করা হতো।
- প্রকৃতি ও নক্ষত্রপূজা: কিছু আরব গোত্র সূর্য, চাঁদ, শুক্র গ্রহ ও বিভিন্ন নক্ষত্রের পূজা করত। জিন ও অশরীরী আত্মাকে সন্তুষ্ট করতে তারা বলিদানে লিপ্ত হতো।
- পরকালে অবিশ্বাস: আরবরা মৃত্যুর পর পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ এবং জান্নাত-জাহান্নামে বিশ্বাস করত না। পবিত্র কুরআনে তাদের মনোভাব উদ্ধৃত হয়েছে: “আমাদের এ পার্থিব জীবনই সব; আমরা বাঁচি ও মরি, মহাকালের ব্যবধান ছাড়া আর কিছুই আমাদের ধ্বংস করে না।” (সূরা আল-জাসিয়া: ২৪)।
- হানিফ সম্প্রদায়: এই ঘোর অন্ধকারের মাঝেও কিছু বিরল ব্যক্তি পৌত্তলিকতা বর্জন করে তাওহিদের ওপর অবিচল ছিলেন, যাদের ‘হানিফ’ বলা হতো (যেমন ওরাকা ইবনে নওফেল, যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল)।
খ. সাংস্কৃতিক অবস্থা (Cultural Scenario):
- ভাষাগত ও কাব্যিক উৎকর্ষ: জাহেলি যুগের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল তাদের কাব্যচর্চা ও ভাষার অলঙ্কারশাস্ত্র (বালাগাত)। আরবরা তাদের ভাষার বিশুদ্ধতা নিয়ে এতটাই গর্বিত ছিল যে তারা অন্যান্য সমস্ত জাতিকে ‘আজম’ (নির্বোধ বা বোবা) বলে ডাকত।
- উকাজের বার্ষিক মেলা ও মুয়াল্লাকাত: তায়েফের নিকটবর্তী উকাজে প্রতি বছর এক মাসব্যাপী বিশাল বাণিজ্য ও সাহিত্য মেলা অনুষ্ঠিত হতো। সেখানে আরবের শীর্ষ কবিরা কাসিদা আবৃত্তি করতেন। প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ সাত বা দশটি কাসিদা সোনার হরফে লিখে কাবার গায়ে ঝুলিয়ে রাখা হতো, যা ‘মুয়াল্লাকাত’ নামে বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য রত্নভাণ্ডার হিসেবে সমাদৃত।
- স্মৃতিশক্তি ও বংশলতিকা জ্ঞান (ইলমুল আনসাব): আরবরা অদ্বিতীয় প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিল। তারা হাজার হাজার কবিতার লাইন এবং শত শত পূর্বপুরুষের বংশলতিকা মুখস্থ রাখতে পারত।
- অতিথিপরায়ণতা ও বীরত্ব: সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ইতিবাচক দিক ছিল সীমাহীন আতিথেয়তা (যেমন হাতেম তাঈ-এর দানশীলতা) এবং নিজ গোত্রের জন্য আত্মত্যাগের বীরত্বগাথা।
٢- بين واقعة خصومة القريش مع محمد صلى الله عليه وسلم وما وجه فتح المسلمين؟
[২. মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে কুরাইশদের শত্রুতার কাহিনী বর্ণনা কর। মুসলমানদের বিজয়ের কারণ কী?]
ক. কুরাইশদের শত্রুতার সূচনা ও রূপরেখা:
মহানবী (সা.) যখন সাফা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে তাওহিদের দাওয়াত দিলেন, তখন থেকেই মক্কার সুবিধাভোগী কুরাইশ কাফেররা তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শত্রুতা শুরু করে। আবু লাহাব, আবু জাহেল, উমাইয়া ইবনে খালাফ এবং উতবা-শায়বাদের নেতৃত্বে এ বিরোধ এক চরম নির্মম রূপ ধারণ করে:
- শারীরিক নির্যাতন ও উৎপীড়ন: দুর্বল ও ক্রীতদাস সাহাবিদের ওপর অমানুষিক বর্বরতা চালানো হয়। হযরত বেলাল (রা.)-কে তপ্ত বালুতে পাথর চাপা দেওয়া হয়, আম্মার (রা.)-এর পিতা-মাতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে ইসলামের প্রথম শহীদ করা হয়। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গলায় চাদর পেঁচিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টা এবং সিজদারত অবস্থায় উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া হয়।
- কুৎসা রটনা ও কূটনৈতিক ষড়যন্ত্র: তাঁকে গণক, উন্মাদ, জাদুকর বলে অপপ্রচার চালানো হয়। হাবশায় হিজরতকারী সাহাবিদের ফিরিয়ে আনতে নাজ্জাশির দরবারে কূটকৌশল চালানো হয়।
- শিয়াবে আবি তালিবে বয়কট (৭ম-১০ম নবুওয়াত বর্ষ): বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবকে শিয়াবে আবি তালিব গিরিদুর্গে দীর্ঘ তিন বছর অবরুদ্ধ রেখে অনাহারে মারার ষড়যন্ত্র করা হয়। অবশেষে দারুন নাদওয়ায় বিশ্বনবী (সা.)-কে হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
খ. মুসলমানদের চূড়ান্ত বিজয়ের প্রধান কারণসমূহ:
- আল্লাহ তাআলার ঐশী সাহায্য ও তাওহিদের শক্তি: মুসলমানদের মূল চালিকাশক্তি ছিল আল্লাহর ওপর অগাধ তাওয়াক্কুল এবং সত্যের অনিবার্য বিজয় সম্পর্কিত অটল ঈমান।
- বিশ্বনবী (সা.)-এর আদর্শ নেতৃত্ব ও ধৈর্য: চরম নির্যাতনের মুখেও রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে অপূর্ব প্রজ্ঞা, অসীম ধৈর্য ও দূরদর্শী কূটনৈতিক কৌশল প্রদর্শন করেছিলেন।
- সাহাবায়ে কেরামের চরম আত্মত্যাগ: ইসলাম ও নেতার প্রতি সাহাবিদের নিঃশর্ত আনুগত্য এবং জীবন বিলিয়ে দেওয়ার প্রেরণা (শাহাদাতের আকাক্ষা) শত্রুর বিপুল সৈন্যবাহিনীকে স্তব্ধ করে দিত।
- উচ্চ নৈতিকতা ও মানবিক আদর্শ: ইসলাম মানুষের হৃদয় জয় করেছিল। কুরাইশরা রণাঙ্গনে পরাজিত হওয়ার পূর্বে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে পরাজিত হয়েছিল। মক্কা বিজয়ের দিনে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা কাফেরদের মন থেকে চিরতরে শত্রুতা মুছে দেয়।
٣- ماذا تعرف عن حول النبي صلى الله عليه وسلم ورضاعته مفصلا
[৩. নবীজী (সা.)-এর জন্ম ও দুধপান সম্পর্কে যা জান লেখ।]
ক. মহিমান্বিত জন্ম ও বংশমর্যাদা:
ঐতিহাসিক ‘আমুল ফিল’ বা হস্তীবর্ষে, ৫৭১ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল (মতান্তরে ৯ রবিউল আউয়াল), সোমবার সুবহে সাদেকের সময় মক্কার সুপ্রসিদ্ধ কুরাইশ বংশের বনু হাশিম শাখায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পূর্বেই তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ সিরিয়া থেকে ফেরার পথে ইয়াসরিবে (মদিনা) মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রিয় দাদা আব্দুল মুত্তালিব নবজাতকের নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’ (প্রশংসিত) এবং স্নেহময়ী মাতা আমিনা নাম রাখেন ‘আহমদ’।
খ. দুধপানের বরকতময় ইতিহাস:
- মাতা আমিনা ও সুওয়াইবার দুধপান: জন্মের পর প্রথম কয়েকদিন মাতা আমিনা তাঁকে দুধপান করান। এরপর চাচা আবু লাহাবের মুক্তদাসী সুওয়াইবা (রহ.) কয়েকদিন তাঁকে দুধপান করান। এ জন্য হযরত হামজা (রা.) ছিলেন তাঁর দুধভাই।
- হালীমাতুস সাদিয়াহর আগমন: কুরাইশদের অভিজাত প্রথা ছিল শিশুদের মুক্ত মরুভূমির বিশুদ্ধ আবহাওয়ায় লালন-পালন করা, যাতে তাদের স্বাস্থ্য বলিষ্ঠ হয় এবং তারা বিশুদ্ধ কুরাইশি আরবি ভাষা রপ্ত করতে পারে। সে লক্ষ্যে বনু সা’দ গোত্রের ধাত্রী হালীমাতুস সাদিয়াহ মক্কায় আসেন। এতিম শিশু হওয়ায় অন্যান্য ধাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নিলেও হালীমা বরকতের আশায় মুহাম্মদ (সা.)-কে কোলে তুলে নেন।
- বনু সা’দ উপত্যকায় অলৌকিক বরকত: মুহাম্মদ (সা.)-কে কোলে নেওয়ার সাথে সাথেই হালীমার শুকিয়ে যাওয়া স্তন দুধে পূর্ণ হয়, দুর্বল বাহন দ্রুতগামী হয় এবং তাদের গৃহে গবাদিপশুর দুধ ও সমৃদ্ধি উপচে পড়ে। সেখানে তিনি চার বা পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত লালিত-পালিত হন।
- বক্ষবিদারণ (শাক্কুস সদর): বনু সা’দ পল্লীতে অবস্থানকালেই চার বছর বয়সে জিব্রাইল (আ.) আগমন করে শিশু নবীর বক্ষ বিদারণ করেন এবং হৃদয় থেকে একটি কালো রক্তপিণ্ড বের করে যমযমের পানিতে ধুয়ে পুনরায় স্থাপন করেন, যা ছিল নবুওয়াতী পবিত্রতার বিশেষ ঐশী প্রস্তুতি। এর পর ভীত হয়ে হালীমা শিশু মুহাম্মদকে নিরাপদে তাঁর মা আমিনার কোলে ফিরিয়ে দেন।
٤- تحدث عن نزل الوحى والدعوة السرية
[৪. ওহি নাজিল ও গোপনে ইসলামি দাওয়াত সম্পর্কে বর্ণনা দাও।]
ক. হেরা গুহায় প্রথম ওহি নাজিল:
চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হলে মহানবী (সা.) মানবজাতির মুক্তির ভাবনায় ব্যাকুল হয়ে মক্কার অদূরে জাবালে নূরের হেরা গুহায় নির্জন মোরাকাবা শুরু করেন। ৬১০ খ্রিস্টাব্দের পবিত্র রমজান মাসের এক বরকতময় রাতে (লাইলাতুল কদর) প্রধান ফেরেশতা হযরত জিব্রাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি নিয়ে আবির্ভূত হন।
জিব্রাইল (আ.) বললেন: ‘ইকরা’ (পড়ুন)। বিশ্বনবী (সা.) বললেন: ‘মা আনা বিক্বারি’ (আমি তো পড়তে জানি না)। জিব্রাইল (আ.) তাঁকে তিনবার সজোরে আলিঙ্গন করে ছেড়ে দিয়ে ওহির প্রথম পাঁচটি আয়াত পাঠ করালেন:
“ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক্ব। খালাকাল ইনসানা মিন ‘আলাক্ব…”
(পাঠ করুন আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে… সূরা আল-আলাক: ১-৫)।
ভীতির সাথে গৃহে ফিরে এসে তিনি উম্মুল মুমিনীন খাদিজা (রা.)-কে বললেন: ‘যাম্মিলুনি, যাম্মিলুনি’ (আমাকে চাদর দিয়ে আবৃত কর)। খাদিজা (রা.) তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং প্রখ্যাত তাওরাত বিশারদ ওরাকা ইবনে নওফেলের কাছে নিয়ে যান, যিনি নিশ্চিত করেন যে ইনিই মুসা (আ.)-এর কাছে আসা মহাদূত ‘নামূস’ (জিব্রাইল)।
খ. গোপনে ইসলামি দাওয়াতের পর্যায় (আদ-দাওয়া আস-সিররিয়্যাহ):
- প্রথম তিন বছরের গোপন দাওয়াত: কুরাইশদের প্রবল পৌত্তলিক বিরোধিতার মুখে প্রাথমিক কৌশল হিসেবে বিশ্বনবী (সা.) তিন বছর অত্যন্ত গোপনে কেবল বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাঝে তাওহিদের দাওয়াত দেন।
- প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী অগ্রগামী দল:
- নারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম: উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.)।
- প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম: আজীবন বন্ধু হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।
- বালকদের মধ্যে সর্বপ্রথম: দশ বছর বয়সী চাচাতো ভাই হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)।
- মুক্তদাসদের মধ্যে সর্বপ্রথম: হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)।
- দারুল আরকাম (ইসলামের প্রথম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র): সাহাবি হযরত আরকাম ইবনে আবিল আরকাম (রা.)-এর বাসভবনকে গোপন দাওয়াত, সালাত ও কুরআন শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র (দারুল ইসলাম) হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। প্রায় চল্লিশজন সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করা পর্যন্ত দারুল আরকামে এ গোপন পাঠশালা চলে।
٥- بين أسباب الهجرة وأهميتها فى التاريخ الإسلامى
[৫. ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের কারণ ও গুরুত্ব বর্ণনা কর।]
ক. হিজরতের কারণসমূহ:
- কুরাইশদের অমানুষিক নিপীড়ন ও প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র: নবুওয়াতের দশম বর্ষে পরম হিতৈষী চাচা আবু তালিব ও মহীয়সী স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর (আমুল হুজন) কুরাইশদের অত্যাচার চরম সীমায় পৌঁছায়। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে কুরাইশ নেতারা দারুন নাদওয়ায় বৈঠক করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রাতের আঁধারে হত্যার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়।
- তায়েফের তিক্ত অভিজ্ঞতা: মক্কার বাইরে আশ্রয়ের সন্ধানে তায়েফ গমন করলে সেখানকার বখাটেরা পাথর নিক্ষেপ করে বিশ্বনবী (সা.)-এর পবিত্র শরীর রক্তাক্ত করে দেয়।
- আকাবার ঐতিহাসিক বায়’আত ও ইয়াসরিববাসীর আমন্ত্রণ: ৬২১ ও ৬২২ খ্রিস্টাব্দে আকাবার দুটি শপথে মদিনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের নেতৃবৃন্দ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে নিজেদের জীবনের চেয়েও বেশি নিরাপত্তা দেওয়ার শপথ নিয়ে মদিনায় আসার উদাত্ত আহ্বান জানান।
- আল্লাহ তাআলার ঐশী নির্দেশ: যখন পরিস্থিতি চরম রূপ নিল, তখন আল্লাহ তাআলা স্বয়ং হিজরতের অনুমতি ও নির্দেশ দান করেন (সূরা আল-ইসরা: ৮০)।
খ. ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব:
- মক্কী ও মাদানী যুগের সুস্পষ্ট বিভাজন: হিজরত ছিল কেবল ভৌগোলিক স্থান পরিবর্তন নয়, বরং তা ছিল নির্যাতন ও নিপীড়নের যুগ থেকে বিজয়, শক্তি ও রাষ্ট্রগঠনের যুগে উত্তরণ।
- প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র ও মদিনা সনদ প্রতিষ্ঠা: হিজরতের মাধ্যমেই মদিনায় বিশ্বের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধানভিত্তিক সার্বভৌম ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
- মুহাজির ও আনসারদের ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ব (মুওয়াখাত): মদিনার আনসাররা মক্কার নিঃস্ব মুহাজিরদের সাথে নিজেদের ঘরবাড়ি, সম্পদ ও জমি সমানভাবে ভাগ করে দিয়ে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ভ্রাতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
- হিজরি সন প্রবর্তন: ইসলামের এ ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তনের স্মারক হিসেবে পরবর্তীতে খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা.) হিজরতকে ভিত্তি করে বিশ্বখ্যাত ‘হিজরি বর্ষপঞ্জি’ প্রবর্তন করেন।
٦- ماذا تعرف عن اخلاق النبى صلى الله عليه وسلم وشمائله؟
[৬. নবীজী (সা.)-এর স্বভাব ও চারিত্রিক গুণাবলি আলোচনা কর।]
ক. কুরআনিক সাক্ষ্য ও অনুপম চরিত্র:
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানবজাতির ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ ও সর্বোত্তম আদর্শের মূর্ত প্রতীক। মহান আল্লাহ তাঁর চরিত্রের প্রশংসায় ঘোষণা করেছেন: “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত।” (সূরা আল-কলম: ৪)। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-কে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাব দেন: “তাঁর চরিত্র ছিল হুবহু পবিত্র কুরআন।”
খ. চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- আল-আমিন ও পরম সত্যবাদিতা: যৌবনেই মক্কার সমস্ত কাফের-মুশরিকরা তাঁর সততা ও আমানতদারিতে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্ত) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। হিজরতের চরম রাতেও তিনি শত্রুদের গচ্ছিত আমানত ফেরত দেওয়ার জন্য হযরত আলী (রা.)-কে বিছানায় রেখে যান।
- ক্ষমা ও কোমলতা (রহমাতুল্লিল আলামিন): তিনি ব্যক্তিগত কারণে কখনো কারও ওপর প্রতিশোধ নেননি। তায়েফের রক্তক্ষয়ী নির্যাতনের পরেও তিনি তাদের ধ্বংস চাননি, বরং হিদায়াত প্রার্থনা করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন চরম শত্রু কুরাইশদের সামনে তিনি ঘোষণা করেন: “লা তাসরিবা আলাইকুমুল ইয়াওম” (আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত)।
- অনাড়ম্বর ও বিনয়ী জীবনযাপন: সমগ্র আরবের একচ্ছত্র অধিপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি খেজুর পাতার পাটিতে ঘুমাতেন, যার দাগ তাঁর পিঠে বসে যেত। তিনি নিজের জুতো নিজে মেরামত করতেন, গৃহকর্মে স্ত্রীদের সাহায্য করতেন এবং দাস-দাসী ও এতিমদের পাশে বসে আহার করতেন।
- সাহসিকতা ও ন্যায়পরায়ণতা: রণাঙ্গনে যখন সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হতো (যেমন হুনাইনের যুদ্ধে), তখনো তিনি পর্বতসম অটল সাহসিকতায় সামনে এগিয়ে যেতেন। ন্যায়বিচারে তিনি ছিলেন আপসহীন; তিনি ঘোষণা করেছিলেন: “আমার কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।”
٧- تحدث عن غزوة بدر ثم اكتب أثرها في تاريخ الإسلامية
[৭. বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে আলোচনা কর। অতঃপর ইসলামের ইতিহাসে তার প্রভাব লিপিবদ্ধ কর।]
ক. পটভূমি ও যুদ্ধের বিবরণ (২য় হিজরি, ১৭ রমজান):
মদিনার নতুন ইসলামি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে মক্কার শীর্ষ কুরাইশ নেতা আবু জাহেল এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্য, শত শত অশ্বারোহী ও বর্ম পরিহিত সেনাবহর নিয়ে মদিনার দিকে অগ্রসর হয়। অপরপক্ষে বিশ্বনবী (সা.) মাত্র ৩১৩ জন প্রায় নিরস্ত্র সাহাবি (মাত্র ২টি ঘোড়া ও ৭০টি উট সম্বলিত) নিয়ে মদিনা থেকে ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে বদর প্রান্তরে উপস্থিত হন।
যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (সা.) রোনাজারি করে দোয়া করলেন: “হে আল্লাহ! আজ যদি এই মুষ্টিমেয় দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত তোমার ইবাদত করার মতো আর কেউ থাকবে না।” আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের বাহিনী পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেন (সূরা আল-আনফাল: ৯)। অসম এ যুদ্ধে ইসলামের কাফেলা কাফেরদের শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে। আবু জাহেল, উতবা, শায়বাসহ শীর্ষ ৭০ জন কুরাইশ সর্দার নিহত হয় এবং ৭০ জন বন্দি হয়। মুসলমানদের মাত্র ১৪ জন সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন।
খ. ইসলামের ইতিহাসে বদরের সুদূরপ্রসারী প্রভাব:
- ইয়াওমুল ফুরকান (সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী দিন): পবিত্র কুরআনে বদরের দিনকে সত্য ও অসত্যের পার্থক্যকারী দিন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আরবে কুরাইশদের সামরিক অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্ব চিরতরে চূর্ণ হয়।
- মদিনা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক স্থায়িত্ব: এ অভাবনীয় বিজয়ের মাধ্যমে মদিনা রাষ্ট্র একটি অপরাজেয় আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। মদিনার মুনাফিক ও আশেপাশের ইহুদি গোত্রগুলো আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
- বদর যুদ্ধের বন্দিদের প্রতি মানবিক আচরণ: বন্দিদের হত্যা না করে মুক্তিপণের মাধ্যমে এবং যারা দরিদ্র কিন্তু শিক্ষিত ছিল, তাদের মদিনার দশজন মুসলিম শিশুকে শিক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে মুক্তি দেওয়া হয়, যা মানব ইতিহাসে যুদ্ধবন্দিদের প্রতি অতুলনীয় মহানুভবতার প্রতীক।
٨- اذكر شروط ميثاق المدينة – ثم تحدث عن أهمية هذا الميثاق فى التاريخ الإسلامي
[৮. মদিনা সনদের শর্তাবলি আলোচনা কর। অতঃপর ইসলামের ইতিহাসে এর প্রভাব তুলে ধর।]
ক. পটভূমি ও ঐতিহাসিক সনদ:
৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় হিজরতের পর মুহাজির, আনসার, স্থানীয় পৌত্তলিক এবং বনু কুরাইজা, বনু নাদির ও বনু কাইনুকা ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে শান্তি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) ৪৭টি ধারাবিশিষ্ট এক ঐতিহাসিক লিখিত চুক্তি প্রণয়ন করেন, যা ‘মদিনা সনদ’ (Constitution of Medina) নামে খ্যাত। এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশ্বের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান।
খ. মদিনা সনদের প্রধান শর্তাবলি:
- উম্মাহ গঠন ও নাগরিক সমতা: সনদে স্বাক্ষরকারী সকল মুসলিম, ইহুদি ও পৌত্তলিক গোত্র সম্মিলিতভাবে একটি অখণ্ড রাজনৈতিক জাতি বা ‘উম্মাহ’ হিসেবে গণ্য হবে।
- ধর্মীয় স্বাধীনতা: ইহুদিরা তাদের নিজ ধর্ম পালন করবে এবং মুসলমানরা তাদের নিজ ধর্ম পালন করবে। কারো ধর্মীয় স্বাধীনতায় কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
- যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: মদিনার ওপর বাইরের কোনো শত্রু আক্রমণ চালালে সকল সম্প্রদায় যৌথভাবে অর্থ ও সামরিক শক্তি দিয়ে মদিনা রক্ষা করবে।
- কুরাইশদের আশ্রয় নিষিদ্ধ: মক্কার আক্রমণকারী কুরাইশ বা তাদের কোনো সহযোগীকে কোনো মদিনাবাসী কোনো প্রকার আশ্রয় বা বাণিজ্য সুবিধা দিতে পারবে না।
- সর্বোচ্চ বিচারিক কর্তৃত্ব: মদিনার সম্প্রদায়সমূহের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তার চূড়ান্ত মীমাংসা করবেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তা আল্লাহর আইন মোতাবেক নিষ্পত্তি হবে।
গ. ইসলামের ইতিহাসে মদিনা সনদের প্রভাব:
মদিনা সনদের মাধ্যমে শতাব্দীপ্রাচীন আউস ও খাযরাজের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে, আধুনিক বহুত্ববাদী ধর্মনিরপেক্ষ কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং মহানবী (সা.) মদিনার অবিসংবাদিত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকৃত হন। এটি আধুনিক যুগের মানবাধিকার ও সাংবিধানিক শাসনের আদি উৎস।
খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি
٩- متى هاجر المسلمون إلى الحبشة؟ ولماذا؟
[৯. মুসলমানরা কখন হাবশায় হিজরত করেছিলেন এবং কেন?]
সময়কাল: নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষে (৬১৫ খ্রি.) হযরত উসমান (রা.) ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যা (রা.)-সহ ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন নারীর একটি কাফেলা প্রথম হাবশায় হিজরত করেন। পরবর্তীতে হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর নেতৃত্বে ৮৩ জন পুরুষ ও ১৯ জন নারীর দ্বিতীয় দল হাবশায় হিজরত করেন।
কারণ: মক্কায় কুরাইশদের সীমাহীন নির্যাতন অসহনীয় হয়ে পড়লে রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের ঈমান ও জীবন রক্ষার স্বার্থে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে খ্রিস্টান রাজা নাজ্জাশির (আসহামা) সুশাসিত হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরতের নির্দেশ দেন। নাজ্জাশি তাঁদের সাদরে আশ্রয় দেন এবং কুরাইশদের ফেরত পাঠানোর দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।
١٠- ما هي بيعة العقبة ومتى وقعت؟ بين
[১০. আকাবার শপথ কী? এটি কখন সংঘটিত হয়? বর্ণনা কর।]
মক্কার অদূরে ‘আকাবা’ নামক গিরিপথে মদিনার (ইয়াসরিব) অধিবাসীদের সাথে মহানবী (সা.)-এর সম্পাদিত ঐতিহাসিক আনুগত্যের চুক্তিকে আকাবার বায়’আত বা শপথ বলা হয়। এটি দুই পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়:
- প্রথম বায়’আত (৬২১ খ্রি. / দ্বাদশ নবুওয়াত বর্ষ): ইয়াসরিবের ১২ জন প্রতিনিধি শিরক না করা, চুরি ও ব্যভিচার বর্জন, সন্তান হত্যা না করা এবং রাসূল (সা.)-এর অনুগত থাকার শপথ নেন। এটি ছিল মূলত নৈতিক ও ধর্মীয় শপথ।
- দ্বিতীয় বায়’আত (৬২২ খ্রি. / ত্রয়োদশ নবুওয়াত বর্ষ): ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী সাহাবি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে মদিনায় আমন্ত্রণ জানান এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেদের স্ত্রী-সন্তানের মতো জীবন দিয়ে বিশ্বনবীকে রক্ষা করার সামরিক ও রাজনৈতিক শপথ নেন। এ শপথের ফলেই ঐতিহাসিক হিজরতের পথ সুগম হয়।
١١- تحدث عن غزوة تبوك
[১১. তাবুক অভিযান সম্পর্কে যা জান লেখ।]
৯ম হিজরির রজব মাসে (৬৩০ খ্রি.) রোমান বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সম্ভাব্য আক্রমণের সংবাদ পেয়ে মদিনা থেকে ৪০০ মাইল উত্তরে রোম সীমান্তে পরিচালিত অভিযানই হলো তাবুক অভিযান। এটি ছিল মহানবী (সা.)-এর জীবনের সর্বশেষ সামরিক অভিযান।
তীব্র গরম, ফসল কাটার মৌসুম এবং দুর্ভিক্ষের কারণে এ যুদ্ধকে ‘জাইশুল উসরাহ’ (অনটনের সেনাদল) বলা হয়। হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর সমুদয় সম্পদ এবং হযরত উসমান (রা.) এক-তৃতীয়াংশ সেনার সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেন। বিশ্বনবী (সা.) ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে তাবুকে পৌঁছালে ভয়ে রোমান বাহিনী ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যায়। কোনো যুদ্ধ ছাড়াই আরবের উত্তর সীমান্তে মুসলমানদের একচ্ছত্র রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়।
١٢- وازن بين حياة النبي صلى الله عليه وسلم في مكة وبين حياته الطيبة في المدينة المنورة
[১২. মহানবি (সা.)-এর পবিত্র মক্কী জীবন ও মাদানী জীবনের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা কর।]
মহানবী (সা.)-এর তেইশ বছরের নবুওয়াতী জীবন দুটি স্বতন্ত্র কিন্তু পরস্পরের পরিপূরক পর্যায়ে বিভক্ত:
- মক্কী জীবন (প্রথম ১৩ বছর): এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল তাওহিদ, আখেরাত ও রিসালাতের মৌলিক আকিদা গঠন, পৌত্তলিকতার মূলোৎপাটন এবং চরম জুলুম ও বয়কটের মুখে অসীম ধৈর্য ও নৈতিক পরিশুদ্ধি অর্জন। এ যুগে রাষ্ট্র বা শাসনক্ষমতা ছিল না।
- মাদানী জীবন (পরবর্তী ১০ বছর): এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল একটি সার্বভৌম ইসলামি রাষ্ট্র পরিচালনা, লিখিত সংবিধান (মদিনা সনদ), অর্থব্যবস্থা, যাকাত, বিচার বিভাগ, সামাজিক আইনকানুন এবং আত্মরক্ষামূলক জিহাদ পরিচালনা। মক্কী জীবনের রোপিত ঈমানের বীজ মাদানী জীবনে এক বিশাল ছায়াঘেরা মহীরুহ ইসলামি সভ্যতায় রূপ লাভ করে।
١٣- اكتب أسباب فتح مكة
[১৩. মক্কা বিজয়ের কারণসমূহ লেখ।]
৮ম হিজরির রমজান মাসে (৬৩০ খ্রি.) রক্তপাতহীনভাবে ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় সম্পন্ন হয়। এর মূল কারণসমূহ ছিল:
- হুদায়বিয়ার চুক্তি লঙ্ঘন: হুদায়বিয়ার চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বনু খোজাআ গোত্র মুসলমানদের সাথে এবং বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করে। কিন্তু কুরাইশরা অস্ত্র ও লোকবল দিয়ে রাতের অন্ধকারে বনু বকরের সাথে মিলে বনু খোজাআর ওপর হামলা চালিয়ে পবিত্র হারাম শরীফে মানুষ হত্যা করে।
- চুক্তির শর্ত প্রত্যাখ্যান: ক্ষতিগ্রস্ত বনু খোজাআ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে প্রতিকার চাইলে তিনি কুরাইশদের তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দেন: (১) নিহতদের রক্তপণ দেওয়া, (২) বনু বকরের সাথে মৈত্রী বাতিল করা, অথবা (৩) হুদায়বিয়ার চুক্তি বাতিল ঘোষণা করা। অহংকারী কুরাইশরা চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয়। ফলে রাসূলুল্লাহ (সা.) দশ হাজার সাহাবি নিয়ে রক্তপাতহীনভাবে মক্কা বিজয় করেন।
١٤- قوم النبي صلى الله عليه وسلم حاكما وقائدا ورئيس الحكومة
[১৪. প্রজ্ঞাময় নেতা এবং রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে মহানবি (সা.)-এর মূল্যায়ন কর।]
ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের সর্বসম্মত মতে, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন ইতিহাসের সফলতম রাষ্ট্রনায়ক ও সামরিক অধিনায়ক। মাইকেল এইচ হার্ট তাঁর ‘The 100’ গ্রন্থে তাঁকে এক নম্বরে স্থান দিয়ে লিখেছেন: “He was the only man in history who was supremely successful on both the religious and secular levels.”
- আইনের শাসন ও মানবাধিকার: তিনি কোনো স্বৈরশাসক ছিলেন না; মজলিসে শূরার পরামর্শে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন।
- অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার: যাকাত ও বায়তুল মালের মাধ্যমে দারিদ্র্যমুক্ত বৈষম্যহীন এক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করেন।
- আন্তর্জাতিক কূটনীতি: রোম, পারস্য, মিশর ও হাবশার রাজাদের কাছে তাওহিদের পত্র প্রেরণ করে বৈশ্বিক কূটনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
١٥- من هو بلال بن رباح؟ اذكر قصة إسلامه
[১৫. বেলাল বিন রাবাহ কে? তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা উল্লেখ কর।]
পরিচয়: হযরত বেলাল ইবনে রাবাহ আল-হাবাশি (রা.) ছিলেন একজন হাবশি (আফ্রিকান) বংশোদ্ভূত ক্রীতদাস। তিনি ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন এবং জান্নাতী সুসংবাদপ্রাপ্ত মহান সাহাবি।
ইসলাম গ্রহণ ও আত্মত্যাগের কাহিনী: মক্কার আদি যুগে বিশ্বনবী (সা.)-এর তাওহিদের বাণী শুনে তিনি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর পাষণ্ড মনিব উমাইয়া ইবনে খালাফ এ সংবাদ জানতে পেরে তাঁকে লোহার বর্ম পরিয়ে মক্কার তপ্ত রোদে শুইয়ে রাখত এবং বুকের ওপর বিশাল ভারী পাথর চাপা দিয়ে বলত: ‘মুহাম্মদকে অস্বীকার কর এবং লাত-উযযার পূজা কর’। চরম কষ্টের মধ্যেও বেলাল (রা.)-এর কণ্ঠ থেকে কেবল একটি ধ্বনিই বের হতো: ‘আহাদ! আহাদ!’ (আল্লাহ এক! আল্লাহ এক!)। পরবর্তীতে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বিপুল মূল্যের বিনিময়ে তাঁকে উমাইয়ার হাত থেকে ক্রয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুক্ত করে দেন।
١٦- بين الوصايا التي أوصى بها رسول الله صلى الله عليه وسلم أمته في حجة الوداع
[১৬. বিদায় হজের সময় রসূল (সা.) উম্মতকে যে উপদেশগুলো দিয়েছেন, তা বর্ণনা কর।]
দশম হিজরিতে (৬৩২ খ্রি.) আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতের পাদদেশে লক্ষাধিক সাহাবির সামনে বিশ্বনবী (সা.) তাঁর জীবনের ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণ দান করেন। তাঁর প্রধান উপদেশসমূহ:
- জীবনের পবিত্রতা ও মানবাধিকার: “আজকের এই দিন ও এই মাসের মতো তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্ভ্রম পরস্পরের জন্য চিরতরে হারাম ও সম্মানিত করা হলো।”
- জাতিভেদ ও বর্ণবাদের মূলোৎপাটন: “কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের এবং কোনো আরবের ওপর অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি।”
- সুদ ও জাহেলি রক্তের প্রতিশোধ বাতিল: সুদের সমস্ত কারবার চিরতরে বাতিল ঘোষণা করা হয় এবং জাহেলি যুগের সমস্ত রক্তের প্রতিশোধ ক্ষমা করা হয়।
- নারীদের অধিকার রক্ষা: নারীদের সাথে সদয় ব্যবহারের কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেন: “তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর।”
- কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা: “আমি তোমাদের মাঝে দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি; যতদিন তোমরা তা আঁকড়ে থাকবে ততদিন কখনো পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাহ।”
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. হেরা গুহায় সর্বপ্রথম পবিত্র কুরআনের কোন সূরার আয়াত নাজিল হয়েছিল?
৬১০ খ্রিস্টাব্দের রমজান মাসে হেরা গুহায় জিব্রাইল (আ.)-এর মাধ্যমে সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত সর্বপ্রথম ওহি হিসেবে নাজিল হয়েছিল।
২. ইসলামের ইতিহাসে ঐতিহাসিক মদিনা সনদ কত সালে সম্পাদিত হয়?
৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে ৪৭টি ধারার এই সনদ প্রণয়ন করেন।
৩. বদরের যুদ্ধ কত হিজরিতে সংঘটিত হয় এবং মুসলিম সৈন্যসংখ্যা কত ছিল?
২য় হিজরির ১৭ রমজান ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং এতে মুসলিম সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন।
৪. ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন কে ছিলেন?
হযরত বেলাল ইবনে রাবাহ আল-হাবাশি (রা.) ছিলেন ইসলামের সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক মুয়াজ্জিন।
৫. ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় কত হিজরিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল?
৮ম হিজরির ২০ রমজান (৬৩০ খ্রি.) মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে দশ হাজার সাহাবির কাফেলা সম্পূর্ণ রক্তপাতহীনভাবে মক্কা বিজয় সম্পন্ন করে।
৬. মহানবী (সা.) জীবনের সর্বশেষ কোন সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন?
৯ম হিজরির রজব মাসে রোমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত তাবুক অভিযানে বিশ্বনবী (সা.) সর্বশেষ সামরিক নেতৃত্ব দান করেছিলেন।