ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2021
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: ইসলামে ধর্মীয়, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ধারার বিকাশ
বিষয় কোড: 205307 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি
১. ইসলামি হাদিস সংরক্ষণ ও সংকলনের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ ও সিহাহ সিত্তার পরিচয় দাও।
[Give an account of the historical development of preservation and compilation of Hadith and introduce the Sihah Sittah.]
ক. হাদিস সংরক্ষণ ও সংকলনের ঐতিহাসিক পর্যায়সমূহ:
- প্রথম যুগ (নবীযুগ ও সাহাবি যুগ):
- পবিত্র নবীযুগে হাদিস প্রধানত সাহাবায়ে কেরামের প্রখর স্মৃতিশক্তির মাধ্যমে সংরক্ষিত হতো। প্রাথমিক দিকে কুরআনের সাথে সংমিশ্রণ এড়াতে সাধারণ হাদিস লিপিবদ্ধে সতর্কতা থাকলেও পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন: “জ্ঞানকে লেখনীর মাধ্যমে বেঁধে রাখ।”
- সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.)-এর সংকলিত ‘আস-সাহিফাতুস সাদিকাহ’, হযরত আলী (রা.)-এর সাহিফা এবং হযরত আনাস (রা.)-এর সংকলন এ যুগের প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
- দ্বিতীয় যুগ (তাবেয়ি যুগ ও সরকারি উদ্যোগ):
- উমাইয়া খলিফা হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) হাদিস বিলুপ্তির আশঙ্কায় রাষ্ট্রীয়ভাবে হাদিস সংগ্রহের ফরমান জারি করেন। তাঁর নির্দেশে মদিনার গভর্নর আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আমর এবং বিশ্বখ্যাত মুহাদ্দিস মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব আজ-জুহরি (রহ.) আনুষ্ঠানিকভাবে হাদিস গ্রন্থনা করেন।
- তৃতীয় যুগ (তাবে-তাবেয়ি যুগ ও বিষয়ভিত্তিক সংকলন – দ্বিতীয় শতক):
- এ যুগে হাদিস ফিকহি অধ্যায়ভিত্তিক সংকলিত হয়। এ যুগের শ্রেষ্ঠ সংকলন হলো ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.)-এর ‘আল-মুওয়াত্তা’, ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর কিতাবুল আসার এবং সুফিয়ান সাওরির সংকলনসমূহ।
- চতুর্থ যুগ (হাদিস সংকলনের স্বর্ণযুগ – তৃতীয় শতক):
- তৃতীয় হিজরি শতকে হাদিস শাস্ত্রের কঠোরতম বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষা (উসুলুল হাদিস ও আসমাউর রিজাল) প্রয়োগ করে সহিহ হাদিস পৃথক করা হয়। এ যুগেই সিহাহ সিত্তাহ বা ছয়টি বিশুদ্ধতম হাদিস গ্রন্থ সংকলিত হয়।
খ. সিহাহ সিত্তার (ছয়টি বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ) প্রামাণ্য পরিচয়:
- সহিহ বুখারি: সংকলক ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (১৯৪-২৫৬ হি.)। ষোল বছর অক্লান্ত পরিশ্রমে ৬ লক্ষ হাদিস যাচাই-বাছাই করে ৭,২৭৫টি (পুনরাবৃত্তিসহ) সহিহ হাদিস নিয়ে ‘আল-জামি আস-সহিহ’ সংকলন করেন। কুরআনের পর এটিই মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক বিশুদ্ধ গ্রন্থ।
- সহিহ মুসলিম: সংকলক ইমাম মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ আল-কুশায়রি আন-নিশাপুরি (২০৬-২৬১ হি.)। এতে সনদ ও মতন বিন্যাসের ক্ষেত্রে অনন্য শৃঙ্খলা অনুসরণ করা হয়েছে।
- সুনানে আবু দাউদ: সংকলক ইমাম আবু দাউদ সুলাইমান ইবনে আল-আশআস আস-সিজিস্তানি (২০২-২৭৫ হি.)। এটি মূলত আহকাম ও ফিকহি বিধান সম্পর্কিত হাদিসের শ্রেষ্ঠ সংকলন (প্রায় ৪,৮০০ হাদিস)।
- জামি আত-তিরমিজি: সংকলক ইমাম আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা আত-তিরমিজি (২০৯-২৭৯ হি.)। প্রতিটি হাদিসের মান (সহিহ, হাসান, জয়িফ) এবং ফকিহদের ইজতিহাদি অভিমত উল্লেখ করা এর অনন্য বৈশিষ্ট্য।
- সুনানে নাসাঈ: সংকলক ইমাম আহমদ ইবনে শুয়াইব আন-নাসাঈ (২১৫-৩০৩ হি.)। বর্ণনাকারীদের যাচাইয়ে অত্যন্ত কঠোর শর্ত আরোপের জন্য এটি বিখ্যাত।
- সুনানে ইবনে মাজাহ: সংকলক ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মাজাহ আল-কাজবিনি (২০৯-২৭৩ হি.)। চমৎকার অধ্যায় বিন্যাস ও বিরল হাদিসের উপস্থিতির কারণে এটি সিহাহ সিত্তার ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত।
২. মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ এবং তাদের মূল পাঁচটি আকিদাগত মূলনীতি আলোচনা কর।
[Discuss the origin and development of the Mutazilite sect and their five basic theological principles.]
ক. উৎপত্তি ও নামকরণ:
উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আব্দুল মালিকের শাসনামলে (৮ম শতকের প্রথমার্ধে) বসরায় প্রখ্যাত তাবেয়ি হযরত হাসান বসরী (রহ.)-এর পাঠচক্রে এক ব্যক্তি এসে প্রশ্ন করল: কাবীরা গুনাহকারী ব্যক্তি মুমিন না কাফের? খারিজিরা বলত কাফের, আর মুরজিয়ারা বলত পূর্ণ মুমিন। হাসান বসরী চিন্তা করার পূর্বেই তাঁর ছাত্র ওয়াসিল ইবনে আতা (রহ.) দাঁড়িয়ে বললেন: “সে মুমিনও নয়, কাফেরও নয়; বরং সে ঈমান ও কুফরের মধ্যবর্তী এক স্থানে (আল-মানজিলাতু বাইনাল মানজিলাতাইন) অবস্থানকারী।”
এ মন্তব্যের পর ওয়াসিল তাঁর শিক্ষক হাসান বসরীর মজলিস থেকে নিজেকে আলাদা করে মসজিদের অপর এক স্তম্ভের পাশে নিজস্ব দল গঠন করেন। তখন হাসান বসরী মন্তব্য করেন: ‘ই’তাজালা আন্না ওয়াসিল’ (ওয়াসিল আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে)। এ বিচ্ছিন্ন হওয়া (ই’তিজাল) থেকেই এ দলের নাম হয় মু’তাযিলা (Mutazilah)। ওয়াসিল ইবনে আতা এবং আমর ইবনে উবায়দ ছিলেন এ মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা।
খ. ক্রমবিকাশ ও মিহনা (Mihna):
আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের পুত্র খলিফা আল-মামুন, আল-মুতাসিম ও আল-ওয়াসিক মু’তাযিলা মতবাদকে রাষ্ট্রীয় দর্শনে রূপান্তর করেন। তাঁরা কুরআনকে ‘সৃষ্ট’ (খালকে কুরআন) দাবি করে ঐতিহ্যবাদী আলেমদের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন চালান, যা ইতিহাসে ‘মিহনা’ নামে পরিচিত। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) অটল সাহসিকতায় এ দার্শনিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নির্যাতন বরণ করেন। পরবর্তীতে খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল মু’তাযিলাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাহার করেন এবং ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী (রহ.)-এর মাধ্যমে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদা চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে।
গ. মু’তাযিলাদের পাঁচটি মূলনীতি (আল-উসুলুল খামসাহ):
- আত-তাওহিদ (আল্লাহর একত্ববাদ): আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলিকে পৃথক মানতে অস্বীকার করে তাঁরা দাবি করে আল্লাহর অতিরিক্ত কোনো গুণ বা সিফাত নেই। তাদের মতে কুরআন আল্লাহর শাশ্বত বাণী নয়, বরং সৃষ্ট (খালকে কুরআন) এবং পরকালে মুমিনদের চর্মচক্ষে আল্লাহকে দেখা অসম্ভব।
- আল-আদল (আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতা): তাঁরা মানুষকে তার সমস্ত কর্মের স্বাধীন কর্তা (Free Will) মনে করে। মানুষ তার কাজের জন্য নিজেই দায়ী, আল্লাহ কাউকে মন্দ কাজ করতে বাধ্য করেন না।
- আল-ওয়াদ ওয়াল ওয়াইদ (প্রতিশ্রুতি ও হুমকি): আল্লাহ সৎকর্মশীলদের জান্নাত দিতে এবং তওবা ছাড়া মারা যাওয়া কবিরা গুনাহগারকে চিরকাল জাহান্নামে শাস্তি দিতে বাধ্য। আল্লাহর এ প্রতিশ্রুতির কোনো ব্যত্যয় ঘটতে পারে না।
- আল-মানজিলাতু বাইনাল মানজিলাতাইন (মধ্যবর্তী অবস্থান): কোনো মুসলিম কবিরা গুনাহ করলে সে ঈমান থেকে বের হয়ে যায় কিন্তু কাফের হয় না; বরং ফাসিক হিসেবে ঈমান ও কুফরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করে।
- আল-আমর বিল মারুফ ওয়ান-নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ): ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য তারা সশস্ত্র সংগ্রাম ও রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগকে ওয়াজিব বা অপরিহার্য মনে করত।
৩. চিকিৎসা ও দর্শনশাস্ত্রে মুসলিম মনীষী শেখ আবু আলী ইবনে সিনার অবদান মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the contribution of Muslim polymath Sheikh Abu Ali Ibn Sina in medicine and philosophy.]
ক. পরিচিতি:
শেখ আবু আলী আল-হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭ খ্রি.), পাশ্চাত্যে ‘অ্যাভিসেনা’ (Avicenna) নামে পরিচিত, ছিলেন মধ্যযুগের অবিসংবাদিত জ্ঞানতাপস ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের রাজপুত্র (Prince of Physicians)। বোখারার আফশানায় জন্মগ্রহণকারী এ মনীষী মাত্র দশ বছর বয়সে কুরআন হিফজ করেন এবং আঠারো বছর বয়সেই তৎকালীন সমস্ত বিজ্ঞানে অতুলনীয় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
খ. চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবদান ও ‘আল-কানুন ফিত তিব্ব’:
- মাস্টারপিস গ্রন্থ ‘আল-কানুন ফিত তিব্ব’ (The Canon of Medicine): দশ লক্ষেরও বেশি শব্দের এ সুবিশাল বিশ্বকোষে মানব অ্যানাটমি, প্যাথলজি, ফার্মাকোলজি ও সার্জারির সমস্ত জ্ঞান সুশৃঙ্খলভাবে সংকলিত হয়েছে। দ্বাদশ শতকে জেরার্ড অব ক্রেমোনা কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে এটি পরবর্তী ছয়শত বছর ধরে ইউরোপের মন্টপেলিয়ার, প্যারিস ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান পাঠ্যবই হিসেবে সমাদৃত ছিল। ডা. উইলিয়াম অসলারের মতে, “আল-কানুন অন্য যেকোনো বইয়ের চেয়ে দীর্ঘকাল ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইবেল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।”
- সংক্রামক রোগ ও জীবাণু তত্ত্ব: তিনি প্রথম আবিষ্কার করেন যে যক্ষ্মা ও প্লেগের মতো রোগ পানি ও বাতাসের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। সংক্রামক রোগীর বিস্তার রোধে তিনি সর্বপ্রথম কোয়ারেন্টিন (Quarantine) বা পৃথকীকরণ পদ্ধতির বিধান দেন।
- অপথালমোলজি ও স্নায়ুবিজ্ঞান: চোখের সূক্ষ্ম গঠন, চোখের পেশির স্নায়ুবিক ক্রিয়া এবং চোখের ছানির আধুনিক অস্ত্রোপচারের বিস্তারিত বিবরণ দেন। তিনিই প্রথম মেনিনজাইটিস ও মুখের পক্ষাঘাত (Facial Paralysis) সঠিকভাবে শনাক্ত করেন।
- ভেষজ ওষুধ ও ফার্মাকোপিয়া: প্রায় ৭৬০ প্রকার বিভিন্ন প্রাকৃতিক ভেষজ ওষুধের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ও মানবদেহে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করে লিপিবদ্ধ করেন।
গ. দর্শনশাস্ত্রে অবদান ও ‘কিতাবুশ শিফা’:
- এনসাইক্লোপেডিক গ্রন্থ ‘কিতাবুশ শিফা’ (The Book of Healing): এটি ছিল যুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, গণিত ও মেটাফিজিক্স বা পরাবিদ্যার সুবিশাল দার্শনিক বিশ্বকোষ। এতে আত্মার অসুস্থতা থেকে মুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক নিরাময়ের বিশ্লেষণ রয়েছে।
- এরিস্টটলীয় ও নিও-প্লাতোনিক দর্শনের ইসলামি সমন্বয়: ইবনে সিনা এরিস্টটলের যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের সাথে ইসলামি তাওহিদীয় দৃষ্টিভঙ্গির এক সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করেন, যা পরবর্তীকালে আল-ফারাবি, ইবনে রুশদ এবং ইউরোপে সেন্ট থমাস অ্যাকুইনাসের চিন্তাচেতনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
- উড়ন্ত মানব তত্ত্ব (Floating Man Experiment): মানুষের আত্মসচেতনতা ও আত্মার অস্তিত্ব যে শারীরিক ইন্দ্রিয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়, তা প্রমাণের জন্য তিনি যুক্তিবিদ্যার ইতিহাসে বিখ্যাত ‘ফ্লোটিং ম্যান’ চিন্তন পরীক্ষার অবতারণা করেন।
৪. প্রাক-ইসলামি জাহেলি যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ইমরুল কায়েসের মুয়াল্লাকা ও সাহিত্যিক অবদান পর্যালোচনা কর।
[Review the Muallaqah and literary contributions of Imru al-Qays, one of the greatest poets of pre-Islamic Jahiliyyah.]
ক. কবির পরিচয় ও ভবঘুরে রাজপুত্র:
ইমরুল কায়েস ইবনে হুজর আল-কিন্দি (আনু. ৫০১-৫৪৪ খ্রি.) ছিলেন দক্ষিণ আরবের কিন্দা রাজবংশের রাজপুত্র। আমোদপ্রমোদ ও কবিতার প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগের কারণে পিতা তাঁকে নির্বাসিত করেন। আসাদ গোত্রের হাতে পিতা নিহত হলে তিনি শপথ নেন: “আজকের দিনটি মদের, আর আগামীকাল যুদ্ধের।” প্রতিশোধের সন্ধানে তিনি আরবের বিভিন্ন গোত্রে ঘুরে বেড়ান এবং রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ানের সাহায্যপ্রার্থী হন। তাঁকে আরব্য কাব্যের ‘ভবঘুরে বাদশাহ’ (আল-মালিকুজ জুদলিল) বলা হয়।
খ. কাসিদা ও মুয়াল্লাকার বৈশিষ্ট্য:
উকাজ মেলার বার্ষিক সাহিত্য প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করায় ইমরুল কায়েসের দীর্ঘ কাসিদাটি সোনার হরফে লিখে কাবার দেওয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, যা তাঁর বিখ্যাত মুয়াল্লাকা হিসেবে খ্যাত। এর সূচনা ছন্দময় পঙ্ক্তি:
“কিফা নাবকি মিন জিকরা হাবিবিও ওয়া মানজিলি / বিসিকতিল লিওয়া বাইনাদ দাখুলি ফা হাওমালি”
(থামো, আমরা প্রিয়তমার স্মৃতি এবং তাঁর বাসস্থানের বিরহে অশ্রু বিসর্জন করি…)
গ. সাহিত্যিক অবদান ও কাব্যের বিশিষ্টতা:
- কাসিদার প্রথাগত কাঠামো প্রবর্তন: ইমরুল কায়েসই সর্বপ্রথম কাসিদার শুরুতে পরিত্যক্ত প্রেমিকার স্মৃতিতে রোদন (নসিব বা আটলাল), তারপর মরুযাত্রার কষ্ট এবং শেষে বীরত্ব ও শিকারের বর্ণনার ক্লাসিক্যাল রীতি প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে সমগ্র আরবি সাহিত্য এ রীতি অনুসরণ করে।
- উপমার অপূর্ব প্রয়োগ (Imagery): তাঁর উপমা ও রূপক ছিল অদ্বিতীয়। তিনি তাঁর দ্রুতগামী অশ্বের বর্ণনায় বলেন, তা যেন পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া এক অখণ্ড শিলাখণ্ড। রাতের অন্ধকারকে তুলনা করেছেন সমুদ্রের বিশাল তরঙ্গের সাথে।
- প্রকৃতি ও ঝড়ের নিখুঁত চিত্রায়ন: রাতের মেঘমালা, বজ্রপাত, বিদ্যুৎ চমক এবং মরুভূমির মুষলধারে বৃষ্টির জীবন্ত চিত্র তিনি এমনভাবে এঁকেছেন যা বিশ্বসাহিত্যে বিরল।
- মর্যাদা ও প্রভাব: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন: “ইমরুল কায়েস কবিদের দলনেতা হিসেবে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” অর্থাৎ কাব্যসৌন্দর্যে তিনি সবার শীর্ষে থাকলেও তাঁর নৈতিক আদর্শ ছিল কলুষিত।
৫. ইসলামি অর্থব্যবস্থায় দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক নিরাপত্তা বিধানে যাকাতের ভূমিকা বিশ্লেষণ কর।
[Analyze the role of Zakat in poverty alleviation and social security in the Islamic economic system.]
ক. যাকাতের সংজ্ঞা ও বিধান:
ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের তৃতীয় স্তম্ভ হলো যাকাত। শরীয়তের পরিভাষায় নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রত্যেক স্বাধীন, সুস্থ মস্তিষ্ক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের ওপর বছরান্তে তাঁর উদ্বৃত্ত ধন-সম্পদের শতকরা আড়াই ভাগ (২.৫%) নির্ধারিত আটটি খাতে বণ্টন করাকে যাকাত বলে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন: “তোমরা সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর।” (সূরা আল-বাকারা: ৪৩)।
খ. দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা:
- সম্পদের সুষম বণ্টন ও ধনীদের একচেটিয়া রোধ: পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সম্পদ কেবল ধনীদের হাতে পুঞ্জীভূত হয়। যাকাত ধনীদের সঞ্চিত সম্পদ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়ে সমাজের দরিদ্র, অনাথ ও বিধবাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে সম্পদের প্রবাহ নিশ্চিত করে (সূরা আল-হাশর: ৭)।
- কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা সৃষ্টি: যাকাতের অর্থ কেবল সাময়িক ভিক্ষা বা খাদ্য ক্রয়ের জন্য নয়; বরং তা দিয়ে দরিদ্রদের রিকশা, সেলাই মেশিন, দোকান বা ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি দিয়ে স্থায়ীভাবে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, যাতে সে পরবর্তী বছরে স্বয়ং যাকাতদাতার কাতারে উন্নীত হয়।
- ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের মুক্তি (আল-গারিমিন): ব্যবসায়িক দুর্যোগে নিঃস্ব হওয়া ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের যাকাতের বায়তুল মাল থেকে ঋণমুক্ত করে পুনরায় স্বাভাবিক অর্থনৈতিক জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়।
গ. সামাজিক নিরাপত্তা বিধান:
- উদ্বেগমুক্ত সমাজ গঠন: প্রতিবন্ধী, অন্ধ, পঙ্গু, বয়োবৃদ্ধ এবং বিধবাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সামাজিক বীমা (Social Security) হিসেবে যাকাত কাজ করে। এতে সমাজে অপরাধপ্রবণতা, চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাই হ্রাস পায়।
- শ্রেণিহীন সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ: ধনীদের মনে অহংকার ও কৃপণতার বদলে দানশীলতা জন্মায় এবং দরিদ্রদের মন থেকে ধনীদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ দূরীভূত হয়ে এক গভীর ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে।
- ঐতিহাসিক নজির: খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে এবং উমাইয়া খলিফা হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.)-এর শাসনামলে প্রাতিষ্ঠানিক যাকাত ব্যবস্থার এমন সফল প্রয়োগ হয়েছিল যে সমগ্র সাম্রাজ্যে যাকাতের অর্থ গ্রহণ করার মতো একজন দরিদ্র মানুষও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
৬. মধ্যযুগে বিশ্ব চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়নে মুসলিম মনীষীদের অবদান মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the contribution of Muslim scholars to the development of world medical science in the Middle Ages.]
ক. ভূমিকা:
যখন মধ্যযুগীয় ইউরোপে রোগ-ব্যাধিকে ডাইনি বা অপদেবতার অভিশাপ মনে করে রক্তক্ষরণ করা হতো, তখন মুসলিম মনীষীগণ কুরআন ও হাদিসের প্রেরণা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে এক সম্পূর্ণ পরীক্ষামূলক, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করেছিলেন।
খ. শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও তাঁদের বৈপ্লবিক উদ্ভাবনসমূহ:
- আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আর-রাজি (Rhazes – ৮৬৫-৯২৫ খ্রি.):
- বসন্ত (Smallpox) ও হাম (Measles)-এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে নিরূপণ করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাবুল জুদরি ওয়াল হাসবাহ’-তে।
- তাঁর বিশ খণ্ডের চিকিৎসা বিশ্বকোষ ‘কিতাবুল হাবি’ (Continens) ইউরোপে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সমাদৃত ছিল। তিনিই প্রথম প্রাণীর অন্ত্রের সুতা (Catgut) দিয়ে ক্ষত সেলাইয়ের প্রবর্তন করেন।
- শেখ আবু আলী ইবনে সিনা (Avicenna – ৯৮০-১০৩৭ খ্রি.):
- তাঁর রচিত ‘আল-কানুন ফিত তিব্ব’ চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে সুসংহত মাস্টারপিস। তিনি কোয়ারেন্টিন পদ্ধতি, পানি ও বায়ুবাহিত সংক্রামক রোগের তত্ত্ব এবং যক্ষ্মার কারণ আবিষ্কার করেন।
- আবুল কাসিম আজ-জাহরাভি (Albucasis – ৯৩৬-১০১৩ খ্রি.):
- কর্ডোভার এ মনীষীকে আধুনিক সার্জারির জনক (Father of Modern Surgery) বলা হয়। তাঁর রচিত ৩০ খণ্ডের বিশ্বকোষ ‘আত-তাসরিফ’-এ প্রায় দুইশত বিভিন্ন ধরনের সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতির (যেমন স্ক্যালপেল, ফোর্সেপস, কাঁচি, সিরিঞ্জ) চিত্রসহ ব্যবহারের বিবরণ দেওয়া হয়।
- আলাউদ্দিন ইবনে আন-নাফিস (১১২১-১২৮৮ খ্রি.):
- উইলিয়াম হার্ভে কর্তৃক রক্ত সংবহন আবিষ্কারের তিন শতাব্দী পূর্বে দামেস্কের এ বিজ্ঞানী মানবদেহে রক্ত চলাচলের পালমোনারি রক্ত সংবহনতন্ত্র (Pulmonary Circulation of Blood) বা ফুসফুসীয় সংবহন নিখুঁতভাবে আবিষ্কার ও ব্যাখ্যা করেন।
- ইবনুল হাইসাম (Alhazen):
- তাঁর সুবিখ্যাত ‘কিতাবুল মানাজির’ (Book of Optics)-এ চোখের গঠন, রেটিনা এবং দৃষ্টিশক্তি কীভাবে গঠিত হয় তার নির্ভুল জ্যামিতিক প্রমাণ তুলে ধরেন।
গ. আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থা (বিমারিস্তান):
বাগদাদ, কায়রো ও দামেস্কে মুসলিম শাসকরা আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতাল (বিমারিস্তান) প্রতিষ্ঠা করেন। যেমন কায়রোর বিখ্যাত মানসুরি হাসপাতাল। এতে পুরুষ ও মহিলাদের আলাদা ওয়ার্ড, বহির্বিভাগ, মানসিক ওয়ার্ড, ফার্মেসি, মেডিকেল লাইব্রেরি ও মেডিকেল কলেজ ছিল এবং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হতো।
খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি
৭. ইসলামি জীবনবিধানে সালাতের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক গুরুত্ব সংক্ষেপে লেখ।
[Briefly write down the spiritual and social importance of Salah in the Islamic way of life.]
ঈমানের পর ইসলামের দ্বিতীয় ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক স্তম্ভ হলো সালাত বা নামাজ। এটি দৈনিক পাঁচবার বান্দাহ ও মহান স্রষ্টার মাঝে সরাসরি সেতুবন্ধন রচনা করে।
- আধ্যাত্মিক গুরুত্ব: সালাত বান্দার আত্মাকে অপবিত্রতা, অহংকার ও পার্থিব মোহ থেকে পরিশুদ্ধ করে। কুরআন মাজিদে ঘোষিত হয়েছে: “নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা আল-আনকাবুত: ৪৫)। এটি মুমিনের জীবনের মি’রাজস্বরূপ।
- সামাজিক গুরুত্ব: জামাতে সালাত আদায় মুসলমানদের মধ্যে দৈনিক পাঁচবার মিলনের ক্ষেত্র তৈরি করে। মসজিদে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা এক কাতারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সিজদা করার মাধ্যমে বিশ্বজনীন সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া সালাত মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সময়নিষ্ঠা ও শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তোলে।
৮. খতমে নবুওয়াতের তাৎপর্য ও কুরআনিক প্রমাণ সংক্ষেপে আলোচনা কর।
[Briefly discuss the significance and Quranic proof of Khatm-e-Nabuwwat.]
খতমে নবুওয়াত (নবুওয়াতের সমাপ্তি): ইসলামি আকিদার অন্যতম অলঙ্ঘনীয় মূল ভিত্তি হলো ‘খতমে নবুওয়াত’। অর্থাৎ হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু হওয়া নবুওয়াত ও রিসালাতের সুদীর্ঘ সিলসিলা সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের মাধ্যমে চিরতরে সমাপ্ত হয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে আর কোনো নতুন নবী বা রাসূল আসবেন না।
- কুরআনিক প্রমাণ: মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন: “মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী (খাতামান নাবিয়্যিন)।” (সূরা আল-আহযাব: ৪০)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম…” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩)। দ্বীন যেহেতু পূর্ণাঙ্গ, তাই নতুন কোনো নবীর আগমন নিষ্প্রয়োজন।
- হাদিসের অকাট্য সাক্ষ্য: রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন: “আমি শেষ নবী, আমার পরে আর কোনো নবী নেই।” (সহিহ মুসলিম)।
৯. আব্বাসীয় খেলাফতকালে বায়তুল হিকমাহ-র প্রতিষ্ঠা ও জ্ঞানচর্চার স্বরূপ ব্যাখ্যা কর।
[Explain the establishment and nature of intellectual pursuit of Bayt al-Hikmah during the Abbasid Caliphate.]
আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের প্রাথমিক উদ্যোগের পর তাঁর পুত্র খলিফা আব্দুল্লাহ আল-মামুন ৮৩০ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্ববিখ্যাত জ্ঞানচর্চাকেন্দ্র ও গবেষণাগার ‘বায়তুল হিকমাহ’ (House of Wisdom)।
- বহুভাষিক গ্রন্থ রূপান্তর কর্মকাণ্ড: প্রাচীন গ্রিক, সিরিয়াক, পারসিয়ান ও ভারতীয় সংস্কৃত ভাষার চিকিৎসা, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিতশাস্ত্রের অমূল্য গ্রন্থসমূহকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আরবি ভাষায় রূপান্তরিত করা হয়। হুনাইন ইবনে ইসহাকের নেতৃত্বে গঠিত রূপান্তর পরিষদকে খলিফা মামুন গ্রন্থের ওজনের সমপরিমাণ সোনা উপহার দিতেন।
- উন্মুক্ত গবেষণাগার ও মানমন্দির: বায়তুল হিকমাহর সাথে সংযুক্ত ছিল সুবিশাল লাইব্রেরি এবং শাম্মাসিয়া মানমন্দির (Astronomical Observatory), যেখানে মুসলিম জ্যোতির্বিদরা সৌরজগতের গতিবিধি ও পৃথিবীর পরিধি পরিমাপের বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করতেন।
- ঐতিহাসিক মহিমা: এটি মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে তৎকালীন বিশ্বের শীর্ষ চিন্তাবিদদের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এবং মধ্যযুগের বৈজ্ঞানিক রেনেসাঁ সৃষ্টিতে প্রধান ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করেছিল।
১০. মুসলিম বিজ্ঞানীদের বীজগণিত ও গণিতশাস্ত্রে মৌলিক অবদান সংক্ষেপে লেখ।
[Briefly write down the fundamental contributions of Muslim scientists to algebra and mathematics.]
মধ্যযুগে মুসলিম গণিতবিদগণ বিশ্ব গণিতশাস্ত্রের কাঠামোকে চিরতরে পাল্টে দিয়েছিলেন:
- মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি (বীজগণিতের জনক): তিনি তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘হিসাব আল-জাবর ওয়াল মুকাবালা’ রচনার মাধ্যমে গণিতের এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে ‘বীজগণিত’ (Algebra – ‘আল-জাবর’ শব্দ থেকে উদ্ভূত) উদ্ভাবন করেন। তাঁর নাম থেকেই কম্পিউটার বিজ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি ‘অ্যালগরিদম’ (Algorithm) শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।
- শূন্য (Zero) ও হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতি: মুসলিম বিজ্ঞানীরা ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতির সাথে শূন্য (সিফর) যুক্ত করে দশমিক স্থানিক মানপদ্ধতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেন, যা আধুনিক গণনার ভিত্তি স্থাপন করে।
- ত্রিকোণমিতি ও ত্রিকোণমিতিক অনুপাত: আল-বাত্তানি ও আবুল ওয়াফা বুজানি সাইন (Sin), কোসাইন (Cos), ট্যানজেন্ট (Tan) ও কোট্যানজেন্টের সারণি নিখুঁতভাবে প্রণয়ন করেন।
- ওমর খৈয়াম: তিনি জ্যামিতির মাধ্যমে দ্বিঘাত ও ত্রিঘাত সমীকরণের (Cubic Equations) চমৎকার সমাধান বের করেন এবং আধুনিক ক্যালেন্ডারের চেয়েও নির্ভুল ‘জালালি ক্যালেন্ডার’ প্রণয়ন করেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. সিহাহ সিত্তাহ বলতে কী বোঝায়?
হাদিস শাস্ত্রের সবচেয়ে বিশুদ্ধ ছয়টি সংকলনকে একত্রে সিহাহ সিত্তাহ বলা হয় (বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ)।
২. মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
অষ্টম শতকের প্রথমার্ধে বসরায় তাবেয়ি হযরত হাসান বসরী (রহ.)-এর মজলিস ত্যাগ করে ওয়াসিল ইবনে আতা (রহ.) এ দার্শনিক দলের গোড়াপত্তন করেন।
৩. চিকিৎসাবিজ্ঞানের রাজপুত্র কাকে বলা হয় এবং তাঁর প্রধান গ্রন্থের নাম কী?
শেখ আবু আলী ইবনে সিনাকে (অ্যাভিসেনা) চিকিৎসাবিজ্ঞানের রাজপুত্র বলা হয় এবং তাঁর প্রধান বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থের নাম ‘আল-কানুন ফিত তিব্ব’।
৪. প্রাক-ইসলামি জাহেলি যুগের কোন কবির কবিতা কাবার দেওয়ালে প্রথম ঝোলানো হয়েছিল?
শ্রেষ্ঠ আরব্য কবি ইমরুল কায়েসের বিখ্যাত দীর্ঘ কাসিদা বা মুয়াল্লাকা শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি হিসেবে কাবার পবিত্র দেওয়ালে স্বর্ণাক্ষরে ঝোলানো হয়েছিল।
৫. মধ্যযুগে আধুনিক সার্জারির জনক কাকে বলা হয়?
আন্দালুসিয়ার (স্পেন) কর্ডোভার প্রখ্যাত মুসলিম শল্যচিকিৎসক আবুল কাসিম আজ-জাহরাভিকে (Albucasis) আধুনিক সার্জারির জনক বলা হয়।
৬. বাগদাদের ঐতিহাসিক বায়তুল হিকমাহ কোন আব্বাসীয় খলিফা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন?
আব্বাসীয় খলিফা আব্দুল্লাহ আল-মামুন ৮৩০ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বহুভাষিক গ্রন্থ রূপান্তরের জন্য বায়তুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করেন।