ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2020
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: মুসলিম স্থাপত্য ও প্রত্নতত্ত্ব (Muslim Architecture and Archaeology)
বিষয় কোড: 205306 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি
১. মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাসে মসজিদের গুরুত্ব তুলে ধর।
[Mention the architectural importance of mosque in the Muslim history.]
ক. ভূমিকা ও মসজিদের তাৎপর্য:
আরবি ‘মসজিদ’ (مسجد) শব্দের আভিধানিক অর্থ সিজদা করার স্থান। পরিভাষায় মুসলমানদের জামাতে নামাজ আদায়ের পবিত্র ইবাদতগাহকে মসজিদ বলা হয়। কিন্তু মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে মসজিদ কেবল নিছক কোনো আনুষ্ঠানিক উপাসনালয় ছিল না; বরং তা ছিল সমগ্র মুসলিম নগরজীবনের কেন্দ্রবিন্দু, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক, বিচারালয়, সংসদীয় পরামর্শকক্ষ এবং সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্মিলনস্থল। বিখ্যাত স্থাপত্য ইতিহাসবিদ কে. এ. সি. ক্রেসওয়েল (K. A. C. Creswell) যথার্থই বলেছেন, মুসলিম স্থাপত্যকলার উন্মেষ, বিকাশ ও চূড়ান্ত শিখরে আরোহণের সমগ্র ইতিহাস মূলত মসজিদ স্থাপত্যের ধারাবাহিক বিবর্তনেরই ইতিহাস।
খ. স্থাপত্যিক গুরুত্ব ও উপাদানসমূহের বিকাশ:
- মৌলিক কাঠামোর প্রমিতকরণ: একটি আদর্শ মসজিদের মাধ্যমে মুসলিম স্থাপত্যে কতগুলো অনন্য অপরিহার্য উপাদানের জন্ম ও বিকাশ ঘটেছে:
- মিহরাব (Mihrab): কা’বামুখী কিবলা নির্দেশক অর্ধবৃত্তাকার বা বহুকোণীয় খাঁজ, যা প্রথম উমাইয়া আমলে প্রবর্তিত হয়।
- মিম্বর (Minbar): ইমামের খুতবা প্রদানের জন্য সোপানযুক্ত উঁচু আসন, যা ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতীক।
- মিনার (Minaret): দূর-দূরান্তে আজানের ধ্বনি পৌঁছে দেওয়ার জন্য নির্মিত আকাশচুম্বী সুউচ্চ স্তম্ভ, যা পরবর্তীতে মুসলিম সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্বের রাজকীয় প্রতীক হয়ে ওঠে।
- গম্বুজ (Dome/Qubba): মসজিদের ওপর স্থাপিত অর্ধগোলাকার বা কন্দাকৃতি ছাদ, যা আকাশের বিশালতা ও ঐশী মহিমার প্রতীক।
- সাহান ও হাওজ (Courtyard and Basin): মসজিদের উন্মুক্ত কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণ এবং মুসল্লিদের ওজু করার জন্য পবিত্র জলাধার।
- নগর পরিকল্পনার মধ্যমণি: দামেস্ক, বাগদাদ, কায়রো, কর্ডোভা বা ঢাকা—যেকোনো মুসলিম ঐতিহাসিক নগরীর পত্তন হয়েছে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদকে কেন্দ্র করে। মসজিদের চারপাশেই গড়ে উঠেছে প্রশাসনিক ভবন (দারুল ইমারা), বাজার (সুক), আবাসিক এলাকা এবং সরাইখানা।
- অনন্য অলংকরণ রীতির উদ্ভাবন: ইসলামে জীবদেহের মূর্তি ও প্রতিকৃতি অঙ্কন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকায় মুসলিম স্থপতিগণ মসজিদকে সাজাতে তিনটি সম্পূর্ণ মৌলিক শিল্পরীতির জন্ম দেন: (১) ক্যালিগ্রাফি (Calligraphy): কুরআনের আয়াতের নান্দনিক ক্যালিগ্রাফিক লিপি; (২) আরাবেস্ক (Arabesque): লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার অন্তহীন ছন্দময় পুনরাবৃত্তি; এবং (৩) মুকারনাস (Muqarnas): মৌচাকসদৃশ স্ট্যালাকটাইট ভল্টিং।
- স্থাপত্য প্রকৌশলের উৎকর্ষ: বিশাল ফাঁকা স্থানকে স্তম্ভবিহীনভাবে আচ্ছাদিত করার জন্য মুসলিম স্থপতিগণ মসজিদের মাধ্যমেই চোখা খিলান (Pointed Arch), ঘোড়ার খুরের মতো খিলান (Horseshoe Arch), এবং স্কুইঞ্চ ও পেন্ডেন্টিভ কৌশলের মাধ্যমে বর্গাকার ভিত্তির ওপর বৃত্তাকার গম্বুজ স্থাপনের যুগান্তকারী প্রকৌশল প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছিলেন।
২. মহানবী (সা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদীনা মসজিদের বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যাখ্যা কর।
[Describe the features of Madina mosque as establish by Profet (Sm.).]
ক. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদীনায় হিজরত করার পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর উটনী কাসওয়ার থেমে যাওয়ার স্থানে বনু নাজ্জার গোত্রের দুই এতিম বালক সাহল ও সুহাইলের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে জমি ক্রয় করেন। সেখানে তিনি সাহাবীদের সাথে নিজ হাতে শ্রম দিয়ে ইসলামের ইতিহাসের দ্বিতীয় এবং প্রধান কেন্দ্র মসজিদে নববী (المسجد النبوي) নির্মাণ করেন।
খ. স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- পরিমাপ ও চতুষ্কোণ ভূমি নকশা: মসজিদটি ছিল প্রায় বর্গাকার বা চতুষ্কোণ আকৃতির। এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ছিল প্রায় ১০০ হাত বাই ১০০ হাত (মতান্তরে ৬০ হাত বা ৭০ হাত)। এটি খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত সাহানযুক্ত আদি হাইপোস্টাইল (Hypostyle) মসজিদের আদি প্রতিরূপ।
- নির্মাণ সামগ্রী ও সরলতা: নির্মাণের উপকরণ ছিল স্থানীয় পরিবেশের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ ও চরম অনাড়ম্বর। এর ভিত্তি ছিল প্রায় তিন হাত পর্যন্ত পাথরের এবং দেয়াল ছিল রোদে পোড়ানো মাটির কাঁচা ইট (লিবন)। মেঝের ওপর কোনো কার্পেট ছিল না, বিছানো ছিল সামান্য বালু ও সুরকি।
- ছাদ ও স্তম্ভ: খেজুর গাছের গুঁড়ি দিয়ে মোট ৩৫টি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয় এবং তার ওপর খেজুরের পাতা ও ডালপালা বিছিয়ে কাদার প্রলেপ দিয়ে একচালা ছাদ নির্মাণ করা হয়। বৃষ্টির দিনে পানি চুইয়ে পড়ত।
- কিবলার অভিমুখ পরিবর্তন: প্রাথমিক পর্যায়ে মদীনা মসজিদের কিবলা ছিল উত্তর দিকে জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাসের অভিমুখে। দ্বিতীয় হিজরীতে সূরা আল-বাকারার ১৪৪ নম্বর আয়াত নাযিলের মাধ্যমে কিবলা পরিবর্তনের ঐশী নির্দেশ আসলে দক্ষিণমুখী পবিত্র কা’বার দিকে কিবলা পরিবর্তিত হয়। পূর্বের কিবলার দিকটি তখন একটি উন্মুক্ত আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়।
- আসহাবে সুফফা (অনাবাসী বিদ্যাপীঠ): মসজিদের পেছনের অংশে একটি ছাউনিযুক্ত উঁচু চত্বর ছিল যা ‘সুফফা’ নামে পরিচিত। হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-সহ প্রায় সত্তর-আশি জন গৃহহীন, নিঃস্ব ও ইলমপিপাসু সাহাবী সেখানে সার্বক্ষণিক অবস্থান করে কুরআন ও হাদীস চর্চা করতেন। এটিই ছিল ইসলামের প্রথম আন্তর্জাতিক আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়।
- হুজরা বা পারিবারিক আবাসন: মসজিদের পূর্ব ও উত্তর দেয়ালে ঘেঁষে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র স্ত্রীদের জন্য মাটির দেয়াল ও কম্বলের পর্দাযুক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কামরা (হুজরা) নির্মাণ করা হয়। বিশেষ করে হযরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় পরবর্তীতে মহানবী (সা.), হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমর (রা.)-কে সমাহিত করা হয় (রওজা মুবারক)।
- তিনটি প্রবেশদ্বার: মসজিদে তিনটি দরজা ছিল—পশ্চিম দিকে ‘বাবে রহমত’, পূর্ব দিকে ‘বাবে জিবরাঈল’ এবং দক্ষিণ দিকে সাধারণ প্রবেশের পথ (যা কিবলা পরিবর্তনের পর উত্তরে স্থানান্তরিত হয়)।
৩. দামেস্ক জামে মসজিদকে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মসজিদ কেন বলা হয় ব্যাখ্যা কর।
[Why the Jami mosque of Damascus is called first full-fledged mosque, discuss.]
ক. নির্মাণ প্রেক্ষাপট:
উমাইয়া খলিফা প্রথম আল-ওয়ালিদ (৭০৫–৭১৫ খ্রি.) ৭০৬ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে প্রাচীন জুপিটার মন্দিরের ওপর প্রতিষ্ঠিত সেইন্ট জন চার্চের অবশিষ্ট অংশটি খ্রিস্টানদের কাছ থেকে সমঝোতার মাধ্যমে ক্রয় করে সেখানে এক বিশ্ববিস্ময়কর জামে মসজিদ নির্মাণ করেন, যা উমাইয়া মসজিদ বা দামেস্ক জামে মসজিদ (Umayyad Mosque of Damascus) নামে পরিচিত।
খ. প্রথম পূর্ণাঙ্গ মসজিদ বলার কারণসমূহ:
মদীনা বা কুফার মসজিদগুলো ছিল অত্যন্ত সাদামাটা ও প্রাথমিক পর্যায়ের। কিন্তু দামেস্ক জামে মসজিদেই সর্বপ্রথম একটি আদর্শ জামে মসজিদের সকল প্রয়োজনীয় স্থাপত্যিক ও নান্দনিক অনুষঙ্গ সুসংহত ও পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে:
- পরিকল্পিত হাইপোস্টাইল ও ট্রান্সেপ্ট কাঠামো: এটি ১৫৭ মিটার দীর্ঘ এবং ১০০ মিটার প্রশস্ত। এতে একটি সুবিশাল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ (সাহান) এবং তিন সারি করিন্থিয়ান স্তম্ভশ্রেণিবিশিষ্ট সুপরিসর নামাযকক্ষ (লিওয়ান) তৈরি করা হয়। কিবলার সমান্তরাল তিন নেভবিশিষ্ট হলের মাঝখানে লম্বালম্বি একটি উঁচু কেন্দ্রীয় গ্যালারি (Transept) নির্মাণ করা হয়, যা টি-আকৃতির (T-Plan) পরিকল্পনা এনে দেয়।
- স্থাপত্যিক উপাদানসমূহের পূর্ণাঙ্গ সমাবেশ:
- স্থায়ী অবতল মিহরাব (Concave Mihrab): এখানে প্রাচীরে সুনির্দিষ্ট অবতল খাঁজকাটা স্থায়ী মিহরাব স্থাপন করা হয়।
- মাকসুরা (Maqsura): খলিফার নিরাপত্তার জন্য কারুকার্যময় কাঠের বেষ্টনীযুক্ত বিশেষ প্রার্থনা কক্ষ সংযোজিত হয়।
- অনুপম মিনারসমূহ: এ মসজিদেই সর্বপ্রথম স্থায়ী মিনার নির্মিত হয়। এতে তিনটি বিখ্যাত মিনার রয়েছে—উত্তরে ‘মিনারেত আল-আরূস’ (কনের মিনার), দক্ষিণ-পূর্বে ‘ঈসা মিনার’ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ‘কায়েতবে মিনার’।
- ঈগলের গম্বুজ (Dome of the Eagle / কুব্বাতুন নিসর): কেন্দ্রীয় ট্রান্সেপ্টের শীর্ষে মার্বেল ও কাঠের তৈরি বিশাল আকৃতির গম্বুজ স্থাপন করা হয়, যা দূর থেকে উড়ন্ত ঈগলের মতো দেখাত।
- বিশ্ববিখ্যাত মোজাইক অলংকরণ (বারাদা নদী ও স্বর্গের দৃশ্য): মসজিদের দেয়াল ও আর্কেড স্বর্ণের পটভূমিতে কাঁচ ও পাথরের তৈরি জমকালো মোজাইক (Mosaic) শিল্পে সজ্জিত করা হয়। এতে দামেস্কের বারাদা নদী, বিশাল ছায়াঘেরা উদ্যান, প্রাসাদ ও বৃক্ষরাজির চিত্র আঁকা হয়, যা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত জান্নাতের এক স্বর্গীয় দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে। কোনো মানুষ বা প্রাণীর ছবি ছাড়াই এ অলংকরণ ছিল অনুপম।
উপসংহার: ক্রেসওয়েল ও ফিলিপ হিট্টি একমত পোষণ করেছেন যে, মুসলিম মসজিদ স্থাপত্যের ইতিহাসে দামেস্ক জামে মসজিদই হলো সর্বপ্রথম সুসংগঠিত, রাজকীয় ও স্থাপত্যিক দিক থেকে ‘প্রথম পূর্ণাঙ্গ মসজিদ’।
৪. উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে মসজিদ স্থাপত্যের তুলনামূলক একটি আলোচনা কর।
[Compare the architectural features of mosque in Umayyad and Abbasid period.]
ভূমিকা: ইসলামের ইতিহাসে উমাইয়া বংশ (৬৬১–৭৫০ খ্রি.) ছিল ভূমধ্যসাগরীয় রোমান ও বাইজেন্টাইন অঞ্চলের উত্তরাধিকারী, অন্যদিকে আব্বাসীয় খিলাফত (৭৫০–১২৫৮ খ্রি.) ইরাক ও পারস্যের প্রাচীন সাসানীয় সংস্কৃতির সংস্পর্শে গড়ে ওঠে। ফলে উভয় যুগের মসজিদ স্থাপত্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈসাদৃশ্য ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।
তুলনামূলক বৈশিষ্ট্যের পর্যালোচনা:
| তুলনার বিষয় | উমাইয়া আমলের মসজিদ স্থাপত্য (৬৬১–৭৫০ খ্রি.) | আব্বাসীয় আমলের মসজিদ স্থাপত্য (৭৫০–১২৫৮ খ্রি.) |
|---|---|---|
| ১. ভৌগোলিক প্রভাব ও রীতি | সিরিয়া ও ভূমধ্যসাগর কেন্দ্রিক; বাইজেন্টাইন ও হেলেনিস্টিক রোমান রীতির প্রবল প্রভাব। | ইরাক ও পারস্য কেন্দ্রিক; প্রাচীন মেসোপটেমীয় ও সাসানীয় পারসিক রীতির প্রভাব। |
| ২. নির্মাণ সামগ্রী | প্রধানত খাঁটি চুনাপাথর, মার্বেল ও প্রকাণ্ড পাথরের ব্লক ব্যবহার করা হতো। | ইরাকে পাথরের অভাব থাকায় প্রধানত রোদে শুকানো ও আগুনে পোড়ানো লাল ইট এবং কাদা ব্যবহার করা হতো। |
| ৩. স্তম্ভ ও খিলান | প্রাচীন রোমান মন্দিরের মার্বেল স্তম্ভ (Corinthian) এবং অর্ধবৃত্তাকার বা অশ্বখুরাকৃতি খিলান। | ইটের তৈরি ভারী অষ্টকোণীয় স্তম্ভ এবং চোখা খিলান (Pointed Arch)। |
| ৪. মিনার শৈলী | বাইজেন্টাইন চার্চের আদলে বর্গাকার বা চারকোনা মিনার (যেমন—দামেস্কের কনের মিনার)। | মেসোপটেমীয় প্রাচীন জিগুরাতের আদলে প্যাঁচানো সর্পিল মিনার (যেমন—সামারার মালবিয়া মিনার)। |
| ৫. অলংকরণ পদ্ধতি | স্বর্ণালী কাঁচের মোজাইক (Mosaic), রঙিন মার্বেল পাথর ও জান্নাতের বৃক্ষরাজির চিত্র। | খোদাই করা প্লাস্টার বা স্টাকো (Carved Stucco) এবং চকচকে রঙিন টালি বা গ্লেজড টাইলস। |
| ৬. আকার ও বিশালতা | অনুপাতে সুষম, রাজকীয় ও নান্দনিক (যেমন—ডোম অব দ্য রক, দামেস্ক জামে মসজিদ)। | বিশালতার দিক থেকে পর্বতসম ও সুবিশাল চত্বরবিশিষ্ট (যেমন—সামারার জামে মসজিদ, আবু দুলাফ)। |
৫. প্রত্নতত্ত্বের সংজ্ঞা দাও ও এর স্বরূপ বিশ্লেষণ কর।
[Give the definition of archaeology and narrate its importance.]
ক. প্রত্নতত্ত্বের প্রামাণ্য সংজ্ঞা:
ইংরেজি ‘Archaeology’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Arkhaios’ (প্রাচীন বা পুরাবস্তু) এবং ‘Logia’ (বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা বা জ্ঞান) থেকে এসেছে। সুতরাং আভিধানিক অর্থে প্রত্নতত্ত্ব হলো প্রাচীনত্বের বিজ্ঞান। পরিভাষায়, প্রত্নতত্ত্ব হলো মানববিজ্ঞানের এমন একটি শাখা যা মাটির নিচে বা ওপরের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ, বস্তুগত অবশেষ (Material Remains), হাতিয়ার, মুদ্রা, স্থাপত্য, মৃৎপাত্র ও লিপিমালা বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে খনন ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাচীন মানবজাতির সংস্কৃতি, সমাজ ও জীবনযাত্রার ইতিহাস পুনর্গঠন করে।
- গর্ডন চাইল্ডের মতে: “Archaeology is the study of human societies through their material remains.”
- কলিন রেনফ্রুর মতে: প্রত্নতত্ত্ব মানব অতীতের বৈষয়িক রূপরেখা আবিষ্কারের অন্যতম বৈজ্ঞানিক প্রণালী।
খ. প্রত্নতত্ত্বের স্বরূপ ও বহুমুখী গুরুত্ব:
- লিখিত ইতিহাস-পূর্ব যুগের একমাত্র উৎস: মানব ইতিহাসের ৯৯% সময়কাল ছিল প্রাগৈতিহাসিক (যখন লেখার কোনো আবিষ্কার হয়নি)। পাথরের অস্ত্র, ফসিল ও গুহাচিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রত্নতত্ত্বই সেই অন্ধকার যুগের মানব বিবর্তনের কাহিনী উন্মোচন করেছে।
- লিখিত ইতিহাসের সত্যতা যাচাই: লিখিত ইতিহাস অনেক সময় রাজদরবারের চাটুকারিতা বা পক্ষপাতে দূষিত হতে পারে। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন (যেমন—মুদ্রা, শিলালিপি, শহরের ধ্বংসাবশেষ) কখনো মিথ্যা বলে না। এটি লিখিত বিবরণের ঐতিহাসিক সত্যতা নিরূপণের সবচেয়ে নিরপেক্ষ কষ্টিপাথর।
- বহুশাস্ত্রীয় বৈজ্ঞানিক রূপ (Multidisciplinary Nature): আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব এখন কেবল কোদাল দিয়ে মাটি খোঁড়া নয়; এটি পদার্থবিজ্ঞানের রেডিও-কার্বন ডেটিং (C-14), ভূ-প্রকৃতিবিদ্যা, উপগ্রহীয় চিত্রায়ন (Satellite Imagery), জিনতত্ত্ব (DNA analysis) এবং রসায়নের সাথে একীভূত একটি পরম আধুনিক বিজ্ঞান।
- জাতীয় পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষা: যেমন মহাস্থানগড়, ময়নামতী বা পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের আবিষ্কার বাঙালি জাতির সহস্রাব্দের প্রাচীন সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে সমুন্নত করেছে।
৬. প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে?
[What are the initiatives taken to preserve archaeological sites?]
ভূমিকা: প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ হলো মানবজাতির অতীত ইতিহাসের অমূল্য ও অপরিবর্তনীয় দলিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ুর পরিবর্তন, মানবীয় অবহেলা, যুদ্ধবিগ্রহ এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের হাত থেকে পুরাকীর্তি রক্ষা করতে আন্তর্জাতিকভাবে ইউনেস্কো (UNESCO) চার্টার এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণের প্রধান বৈজ্ঞানিক ও আইনি ব্যবস্থাসমূহ:
- আইনি সুরক্ষা ও সাইট সীমানা নির্ধারণ (Legislative Protection): যেকোনো প্রত্নতাত্ত্বিক ঢিবি বা প্রাচীন ইমারত চিহ্নিত হলে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে তাকে ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ ঘোষণা করা হয়। এর চারপাশে বাফার জোন তৈরি করে নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের মধ্যে যেকোনো প্রকার ব্যক্তি মালিকানাধীন নির্মাণকাজ ও মাটি কাটা আইনত নিষিদ্ধ করা হয় (যেমন—বাংলাদেশের পুরাকীর্তি আইন ১৯৭৬)।
- ভৌতিক ও কাঠামোগত সংরক্ষণ (Physical & Structural Consolidation):
- প্রাচীন দেয়ালের ফাটল ও ক্ষয় মেরামতে আধুনিক সিমেন্ট বা রড ব্যবহার না করে মূল যুগের ঐতিহ্যবাহী চুন-সুরকি ও পোড়ামাটির উপাদান দিয়ে নিখুঁতভাবে মজবুত করা হয়।
- বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা হয় যাতে ভিত্তিমূলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়।
- রোদের অতিবেগুনি রশ্মি ও অতিবৃষ্টি থেকে উন্মুক্ত ধ্বংসাবশেষ রক্ষা করতে পলিথিন, শেড বা ফাইবারগ্লাসের আধুনিক আচ্ছাদন দেওয়া হয়।
- রাসায়নিক সংরক্ষণ (Chemical Conservation):
- প্রাচীন পাথুরে ইমারত ও পোড়ামাটির টেরাকোটার ওপর জন্ম নেওয়া শ্যাওলা, ছত্রাক ও উদ্ভিদের শিকড় জৈব-রাসায়নিক দ্রবণের (Biocide) সাহায্যে নির্মূল করা হয়।
- লবণাক্ততার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত করতে রাসায়নিক প্রলেপ (Desalination & Consolidation) ব্যবহার করা হয়।
- যাদুঘরীয় সংরক্ষণ ও সাইট মিউজিয়াম: ছোট ছোট প্রত্নবস্তু যেমন—মুদ্রা, ভাস্কর্য, ধাতব হাতিয়ার ও অলংকার সাইট থেকে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে তুলে এনে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতাযুক্ত (Climate-controlled) আধুনিক যাদুঘরে প্রদর্শন ও সংরক্ষণ করা হয়।
- জনসচেতনতা ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা: স্থানীয় জনগণের মধ্যে ঐতিহ্যের প্রতি মমতা জাগ্রত করা এবং দর্শনার্থীদের অসচেতনভাবে পুরাকীর্তির ওপর হাঁটাচলা ও দেয়াল ক্ষোদাই বন্ধে কঠোর নিরাপত্তা প্রহরা ও টিকিট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি
৭. টীকা লেখ (যে কোনো দুটি):
[Write short note (any two): (a) Arch, (b) Sahan, (c) Dome of the Rock, (d) Antiquity.]
(ক) খিলান (Arch):
খিলান হলো দুটি উল্লম্ব খুঁটি বা প্রাচীরের মধ্যবর্তী উন্মুক্ত স্থানকে বক্রাকারে আচ্ছাদিত করার কাঠামোগত স্থাপত্য কৌশল। মুসলিম স্থপতিগণ প্রাচীন রোমান অর্ধবৃত্তাকার খিলানকে রূপান্তর করে চোখা খিলান (Pointed Arch), ওজি খিলান (Ogee Arch) এবং কর্ডোভার বিখ্যাত অশ্বখুরাকৃতি খিলানের (Horseshoe Arch) জন্ম দেন। এটি ভারবহন ক্ষমতা বহুগুণ বাড়ায় এবং মুসলিম ইমারতের দরোজা, জানালা ও বারান্দায় অপরূপ সৌন্দর্য সৃষ্টি করে।
(খ) সাহান (Sahan):
মসজিদ স্থাপত্যের উন্মুক্ত কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণকে সাহান (Sahan) বলা হয়। এটি চারদিকে স্তম্ভযুক্ত বারান্দা বা রিওয়াক (Riwaq) দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। সাহানের ঠিক মাঝখানে মুসল্লিদের অজু করার জন্য একটি চমৎকার জলাধার বা ঝরনা (হাওজ/মিদা) থাকে। বৃহৎ জনসমাবেশে নামায আদায় এবং মসজিদ অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশের জন্য সাহান অপরিহার্য।
(গ) ডোম অব দ্য রক (কুব্বাতুস সাখরা):
জেরুজালেমের হারাম আল-শরীফে অবস্থিত ডোম অব দ্য রক (Dome of the Rock / قبة الصخرة) হলো ইসলামের ইতিহাসের প্রাচীনতম টিকে থাকা স্থাপত্যের মহাবিস্ময়। উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান ৬৯১/৬৯২ খ্রিস্টাব্দে যে পবিত্র পাথরের (সাখরা) ওপর থেকে মহানবী (সা.) মিরাজে গমন করেছিলেন, সেটিকে কেন্দ্র করে এটি নির্মাণ করেন। এটি একটি অষ্টকোণীয় ইমারত যার শীর্ষে ২০ মিটার ব্যাসের সুবিশাল সোনালী রঙের কাঠের গম্বুজ স্থাপিত। এর অভ্যন্তরে কুরআনিক ক্যালিগ্রাফি এবং মোজাইকের কাজ মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য মাস্টারপিস।
(ঘ) পুরাবস্তু / পুরাতত্ত্ব (Antiquity):
আইনি ও প্রত্নতাত্ত্বিক পরিভাষায় পুরাবস্তু (Antiquity) বলতে মানব সভ্যতার অতীত যুগের এমন সব প্রাচীন বস্তুগত নিদর্শনকে বোঝায় যা অন্তত একশত বা ততোধিক বছর প্রাচীন এবং যা ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক, শৈল্পিক বা নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত মূল্যবান। যেমন—প্রাচীন মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক, শিলালিপি, ধাতব অস্ত্রশস্ত্র, অলংকার বা প্রাচীন স্থাপত্য। যেকোনো দেশের পুরাবস্তু জাতীয় সম্পদ হিসেবে সুরক্ষিত থাকে এবং অনুমতি ছাড়া এর ক্রয়-বিক্রয় বা বিদেশে পাচার আন্তর্জাতিকভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নির্মিত মসজিদ কোনটি?
মদীনায় হিজরতের সময় মহানবী (সা.) কর্তৃক মদীনার উপকণ্ঠে নির্মিত ‘মসজিদে কুবা’ হলো ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নির্মিত মসজিদ।
২. ডোম অব দ্য রক কোন শাসকের আমলে এবং কোথায় নির্মিত হয়?
উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান ৬৯১ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেমের পবিত্র হারাম আল-শরীফে অবস্থিত বরকতময় পাথরের ওপর ডোম অব দ্য রক নির্মাণ করেন।
৩. দামেস্ক জামে মসজিদকে কেন প্রথম পূর্ণাঙ্গ মসজিদ বলা হয়?
কারণ এ মসজিদেই সর্বপ্রথম স্থায়ী মিনার, অবতল মিহরাব, মাকসুরা, গম্বুজ, ট্রান্সেপ্ট হল এবং নান্দনিক মোজাইক অলংকরণের মতো সকল উপাদান সুসংহত রূপ লাভ করে।
৪. আব্বাসীয় আমলের সামারার জামে মসজিদের বিশেষত্ব কী?
সামারার জামে মসজিদের বিশেষত্ব হলো প্রাচীন মেসোপটেমীয় জিগুরাতের মতো এর পেঁচানো সর্পিল মিনার, যা ‘মালবিয়া’ (Malwiya) মিনার নামে বিশ্বখ্যাত।
৫. প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের বয়স নির্ণয়ে কোন আধুনিক পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়?
জৈব প্রত্ননিদর্শনের বয়স নির্ধারণে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ‘রেডিও-কার্বন ডেটিং’ (Carbon-14 Dating) পদ্ধতি সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ও ব্যবহৃত প্রযুক্তি।
৬. মুসলিম স্থাপত্যের প্রধান তিনটি অলংকরণ শিল্প কী কী?
মুসলিম স্থাপত্যের প্রধান তিনটি অলংকরণ ধারা হলো ক্যালিগ্রাফি (লিপিকলা), আরাবেস্ক (জ্যামিতিক ও উদ্ভিজ্জ নকশা) এবং মুকারনাস (মৌচাকসদৃশ ভল্টিং)।