ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২১
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: مناهج المفسرين ومناهج البحث (মানাহিজুল মুফাসসিরীন ওয়া মানাহিজুল বাহাছ)
বিষয় কোড: 201406 | প্রশ্নপত্র কোড: 152 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০২১ শিক্ষাবর্ষের ফাজিল সম্মান ৪র্থ বর্ষের “মানাহিজুল মুফাসসিরীন ওয়া মানাহিজুল বাহাছ” (বিষয় কোড: 201406) বিষয়ের প্রশ্নপত্রটি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই কোর্সে একদিকে রয়েছে তাফসির শাস্ত্রের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, তাফসিরের বিভিন্ন ধারা এবং খ্যাতনামা মুফাসসিরগণের অনুসৃত পদ্ধতি; অন্যদিকে রয়েছে ইসলামী গবেষণা পদ্ধতি, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, পাণ্ডুলিপি তাহক্বীক্ব এবং অভিসন্দর্ভ রচনার আন্তর্জাতিক ও বৈজ্ঞানিক মূলনীতি। নিম্নে এই প্রশ্নপত্রের উভয় অংশের (প্রথম অংশ: মানাহিজুল মুফাসসিরীন এবং দ্বিতীয় অংশ: মানাহিজুল বাহাছ) মোট ১৮টি প্রশ্নেরই প্রামাণ্য, গভীর এবং গবেষণাধর্মী সমাধান সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরা হলো।
একনজরে প্রশ্নপত্রের রূপরেখা
| বিভাগ ও অংশ | মোট প্রশ্ন | উত্তর দিতে হবে | প্রতি প্রশ্নের মান | মোট নম্বর |
|---|---|---|---|---|
| প্রথম অংশ: মানাহিজুল মুফাসসিরীন – ‘ক’ বিভাগ (রচনামূলক) | ৫টি | ৩টি | ১০ | ৩০ |
| প্রথম অংশ: মানাহিজুল মুফাসসিরীন – ‘খ’ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত) | ৪টি | ২টি | ৫ | ১০ |
| দ্বিতীয় অংশ: মানাহিজুল বাহাছ – ‘ক’ বিভাগ (রচনামূলক) | ৫টি | ৩টি | ১০ | ৩০ |
| দ্বিতীয় অংশ: মানাহিজুল বাহাছ – ‘খ’ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত) | ৪টি | ২টি | ৫ | ১০ |
| সর্বমোট | ১৮টি প্রশ্ন | ১০টি প্রশ্ন | – | ৮০ নম্বর |
প্রথম অংশ: مناهج المفسرين (মানাহিজুল মুফাসসিরীন) [পূর্ণমান: ৪০]
مجموعة (الف) – ‘ক’ বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)
যেকোনো তিনটি প্রশ্নের উত্তর দাও: ১০ × ৩ = ৩০
١- عرف علم التفسير لغة واصطلاحًا، ثم اذكر نشأته وتطوره-
علم التفسير (ইলমুত তাফসির)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাও। অতঃপর علم التفسير-এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।
ভূমিকা: উলূমুল কুরআনের কেন্দ্রবিন্দু হলো ইলমুত তাফসির। মহান রাব্বুল আলামীনের কালামের মর্মবাণী অনুধাবন, তাঁর নির্দেশিত বিধিবিধান হৃদয়ঙ্গম এবং তা বাস্তব জীবনে বাস্তবায়নের মাধ্যম হলো তাফসির শাস্ত্র। যুগে যুগে ওহীর আলো সাধারণ মানুষের বোধগম্য করার ক্ষেত্রে তাফসির শাস্ত্র অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে।
علم التفسير-এর আভিধানিক সংজ্ঞা:
‘তাফসির’ (تَفْسِيرٌ) শব্দটি আরবি বাবে তাফঈল (التَّفْعِيلُ)-এর মাসদার। এর মূলধাতু বা রুট হলো ‘ফা-সিন-রা’ (ف – س – ر) অথবা মতান্তরে উল্টোরূপ ‘সা-ফা-রা’ (س – ف – ر)।
অভিধানবিদ ইমাম ইবনে মানযূর (রহ.) ‘লিসানুল আরব’ গ্রন্থে বলেন:
«الفَسْرُ: الإِبَانَةُ وَكَشْفُ الْمُغَطَّى، وَالتَّفْسِيرُ مِثْلُهُ، وَهُوَ إِظْهَارُ الْمَعْنَى الْمَعْقُولِ»
অর্থাৎ: ‘আল-ফাসর’ অর্থ কোনো অস্পষ্ট বা আবৃত বিষয় উন্মুক্ত ও সুস্পষ্ট করা। আর ‘আত-তাফসির’ হলো বোধগম্য ভাবার্থ প্রকাশ ও ব্যাখ্যা করা। ইমাম রাগিব ইস্পাহানী (রহ.) ‘আল-মুফরাদাত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, তাফসির শব্দটি গভীর অর্থসম্পন্ন জটিল বিষয়কে স্পষ্ট করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
﴿وَلَا يَأْتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئْنَاكَ بِالْحَقِّ وَأَحْسَنَ تَفْسِيرًا﴾ (সূরা আল-ফুরকান: ৩৩)
অর্থ: “তারা আপনার কাছে এমন কোনো সমস্যা বা উপমা নিয়ে আসে না, যার সঠিক সমাধান এবং সুন্দরতম ব্যাখ্যা আমি আপনাকে প্রদান করি না।”
علم التفسير-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা:
ইসলামী পরিভাষায় ইলমুত তাফসিরের সংজ্ঞায় আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) তাঁর ‘আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন’ গ্রন্থে বলেন:
«عِلْمٌ يُفْهَمُ بِهِ كِتَابُ اللهِ الْمُنَزَّلُ عَلَى نَبِيِّهِ مُحَمَّدٍ ﷺ، وَبَيَانُ مَعَانِيهِ، وَاسْتِخْرَاجُ أَحْكَامِهِ وَحِكَمِهِ»
অর্থাৎ: “এটি এমন এক বিশেষ শাস্ত্র, যার মাধ্যমে নবী করীম ﷺ-এর ওপর অবতীর্ণ আল্লাহর কিতাবকে সম্যকভাবে বুঝা যায়, এর মর্মার্থ সুস্পষ্ট করা যায় এবং এর অন্তর্নিহিত হুকুম-আহকাম ও প্রজ্ঞাসমূহ নিরূপণ ও উদ্ভাবন করা যায়।”
ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) ‘আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন’ গ্রন্থে অনুরূপ সংজ্ঞা দিয়ে বলেন, মানুষের সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহর কালামের উদ্দেশ্য অনুধাবন করাই হলো তাফসির।
علم التفسير-এর উৎপত্তি ও ধারাবাহিক ক্রমবিকাশ:
তাফসির শাস্ত্র একদিনে বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি; বরং এটি যুগপরম্পরায় ধারাবাহিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে:
- নবুওয়াতের যুগ (প্রথম পর্যায়): ওহীর প্রত্যক্ষ ধারক ও কুরআনের প্রধান ব্যাখ্যাদাতা ছিলেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ। সাহাবায়ে কিরামের কোনো আয়াত বুঝতে অস্পষ্টতা দেখা দিলে তাঁরা নবীজি ﷺ-এর শরণাপন্ন হতেন। যেমন সূরা আল-আন’আমের ৮২ নম্বর আয়াতে উল্লিখিত ‘জুলম’ (ظُلْم) শব্দের ব্যাখ্যায় রাসুলুল্লাহ ﷺ স্পষ্ট করেন যে, এর দ্বারা শিরক উদ্দেশ্য (সূরা লুকমান: ১৩ অনুযায়ী)। আল্লাহ তা’আলা বলেন: ﴿وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ﴾ (সূরা আন-নাহল: ৪৪)।
- সাহাবায়ে কিরামের যুগ (দ্বিতীয় পর্যায়): রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর সাহাবিগণ ছিলেন তাফসিরের মূল স্তম্ভ। তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় মুফাসসির ছিলেন চার খলিফা, বিশেষ করে আলী (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এবং উবাই ইবনে কা’ব (রা.)। তাঁরা আরবি ভাষার শৈলী, শানে নুযূলের প্রত্যক্ষ জ্ঞান এবং নববী সহচর্যের আলোকে কুরআনের তাফসির বর্ণনা করতেন।
- তাবেয়ীদের যুগ (তৃতীয় পর্যায়): সাহাবিদের শিষ্যত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তাবেয়ীগণ ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন কেন্দ্রে স্বতন্ত্র তাফসির পাঠশালা গড়ে তোলেন। মক্কায় ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মাদরাসায় মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, ইকরামা প্রমুখ; মদিনায় উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর মাদরাসায় যায়েদ ইবনে আসলাম, আবুল আলিয়া প্রমুখ; এবং ইরাকে ইবনে মাসউদ (রা.)-এর পাঠশালায় আলকামা, আসওয়াদ ও হাসান বসরী (রহ.) তাফসির বিদ্যায় অভূতপূর্ব অবদান রাখেন। এ যুগে আহলে কিতাবদের ইসলাম গ্রহণের কারণে সীমিত পর্যায়ে ইসরাঈলিয়্যাত প্রবেশ করতে থাকে।
- গ্রন্থায়ন ও সংকলনের যুগ (চতুর্থ পর্যায়): দ্বিতীয় হিজরী শতকের শেষভাগে হাদীস সংকলনের অন্তর্ভুক্ত একটি অধ্যায় হিসেবে তাফসির লিখিত রূপ পেতে শুরু করে (যেমন শু’বা ইবনুল হাজ্জাজ, সুফিয়ান ইবনে উয়ায়নাহ ও ওয়াকী’ ইবনুল জাররাহ-এর সংকলন)। পরবর্তীতে তৃতীয় হিজরীতে কুরআন মাজীদের সূরার ধারাবাহিকতা অনুসারে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র তাফসির গ্রন্থ রচিত হয়। এর অবিসংবাদিত জনক হলেন ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারীর আত-তাবারী (রহ.) (ওফাত ৩১০ হি.), যাঁর রচিত ‘জামিউল বায়ান’ গ্রন্থটি তাফসির শাস্ত্রের ঐতিহাসিক মাইলফলক।
- বিষয়ভিত্তিক ও বিশেষায়িত যুগ (পঞ্চম পর্যায়): কালক্রমে তাফসির শাস্ত্র বিভিন্ন ধারা ও শাখায় বিভক্ত হয়—যেমন তাফসির বির রায় (যুক্তিভিত্তিক), ফিকহী তাফসির (আইনশাস্ত্রীয়), ভাষাতাত্ত্বিক ও বালাগাতভিত্তিক তাফসির, কালামী তাফসির এবং সুফিবাদী তাফসির। আধুনিক যুগে এসে এটি সমাজ সংস্কারমূলক ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা হিসেবে পরিব্যাপ্ত হয়েছে।
٢- كم قسمًا للتفسير؟ تحدث عن التفسير بالمأثور مفصلا-
তাফসির কত প্রকার? التفسير بالمأثور (তাফসির বিল মা’ছুর) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর।
ভূমিকা: তাফসির শাস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডারকে উপলব্ধি করার জন্য উলামায়ে কিরাম ও গবেষকগণ একে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেণিবিন্যাস করেছেন। ব্যাখ্যার উৎস ও পদ্ধতির ভিত্তিতে তাফসিরের প্রকারভেদ অন্যতম প্রধান বিভাজন।
তাফসিরের প্রকারভেদ:
ব্যাখ্যার উৎসের বিশুদ্ধতা ও বিচারপদ্ধতির আলোকে তাফসিরকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
১. التفسير بالمأثور (তাফসির বিল মা’ছুর): ওহীভিত্তিক বা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনার ওপর প্রতিষ্ঠিত তাফসির।
২. التفسير بالرأي (তাফসির বির রায়): সহীহ ইজতিহাদ, বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা ও আরবি ভাষার ব্যাকরণগত বিশ্লেষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত তাফসির।
এছাড়াও বিশেষায়িত দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে তাফসিরের আরও কিছু প্রকার রয়েছে, যেমন:
- তাফসিরুল ইশারী (আধ্যাত্মিক ও গুহ্য ইশারাভিত্তিক তাফসির)
- তাফসিরুল ফিকহী (আইনগত বিধিবিধান সম্পর্কিত আহকামুল কুরআন)
- তাফসিরুল বালাগী ওয়াল লুগাবী (ভাষাতাত্ত্বিক ও অলঙ্কারশাস্ত্রীয় তাফসির)
- তাফসিরুল মাওদূঈ (বিষয়ভিত্তিক তাফসির)
التفسير بالمأثور-এর বিস্তারিত আলোচনা:
- সংজ্ঞা ও পরিচয়: ‘আল-মা’ছুর’ (المَأْثُورُ) শব্দটি ‘আছার’ (أَثَرٌ) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ চিহ্ন বা পূর্ববর্তী বর্ণনা। পারিভাষিক অর্থে:
«هُوَ التَّفْسِيرُ الَّذِي يَعْتَمِدُ عَلَى صَحِيحِ الْمَنْقُولِ مِنَ الْقُرْآنِ، أَوِ السُّنَّةِ، أَوْ أَقْوَالِ الصَّحَابَةِ، أَوْ أَقْوَالِ التَّابِعِينَ»
অর্থাৎ: যে তাফসির কুরআন মাজীদ, সুন্নাতে রাসুল ﷺ, সাহাবায়ে কিরামের নির্ভরযোগ্য বক্তব্য এবং তাবেয়ীগণের মতামতের মতো বিশুদ্ধ ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে রচিত হয়, তাকে তাফসির বিল মা’ছুর বা তাফসির বিন নকল বলা হয়। - তাফসির বিল মা’ছুরের স্তর ও মূল উৎসসমূহ:
- কুরআন দ্বারা কুরআনের তাফসির (تفسير القرآن بالقرآن): এটি তাফসিরের সর্বোচ্চ ও অভ্রান্ততম স্তর। কুরআনের এক স্থানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা অন্য স্থানে বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। যেমন সূরা আল-ফাতিহায় উল্লিখিত ﴿صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ﴾-এর ব্যাখ্যা সূরা আন-নিসার ৬৯ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে (নবী, সিদ্দীকীন, শুহাদা ও সালিহীন)।
- সুন্নাহ দ্বারা কুরআনের তাফসির (تفسير القرآن بالسنة): রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীস হলো কুরআনের বাস্তব রূপ। যেমন সালাত কায়েম করার নির্দেশ কুরআনে রয়েছে, কিন্তু এর বিস্তারিত রাকাত, নিয়ম ও সময় সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত।
- সাহাবিগণের বক্তব্য দ্বারা তাফসির (تفسير القرآن بأقوال الصحابة): সাহাবিগণ ওহী অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাঁদের তাকওয়া ও আরবি ভাষার বিশুদ্ধ জ্ঞান প্রশ্নাতীত ছিল।
- তাবেয়ীগণের বক্তব্য দ্বারা তাফসির (تفسير القرآن بأقوال التابعين): তাবেয়ীগণ সাহাবিদের কাছ থেকে সরাসরি ইলম অর্জন করায় তাঁদের ঐক্যমত্য তাফসিরের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য।
- তাফসির বিল মা’ছুরের প্রামাণিক মর্যাদা: সমগ্র মুসলিম উম্মাহ একমত যে, তাফসির বিল মা’ছুর হলো সকল প্রকার তাফসিরের ভিত্তি ও মূল মাপকাঠি। যে তাফসির বিল মা’ছুরের প্রতিষ্ঠিত নিয়মনীতিকে উপেক্ষা করে মনগড়া কোনো মতামত পেশ করা হয়, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে বাতিল বলে গণ্য।
- তাফসির বিল মা’ছুরের প্রধান প্রামাণ্য গ্রন্থাবলি:
- জামিউল বায়ান ফী তা’বীলিল কুরআন: ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী (রহ.)। এটি সনদভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তাফসিরের আদি ও শ্রেষ্ঠ বিশ্বকোষ।
- তাফসিরুল কুরআনিল আজীম: ইমাম হাফিজ ইমাদুদ্দীন ইবনে কাছীর (রহ.)। এটি বিশুদ্ধ হাদীস ও সনদের চুলচেরা বিশ্লেষণের জন্য সর্বজনগ্রাহ্য।
- মা’আলিমুত তানযীল: ইমাম আবু মুহাম্মদ হুসাইন ইবনে মাসউদ আল-বাগাবী (রহ.)। পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বস্ত বর্ণনার অপূর্ব সংকলন।
- আদ-দুররুল মানছুর ফীত তাফসিরি বিল মা’ছুর: ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.)। সনদবিহীনভাবে বিপুল সংখ্যক রেওয়ায়েত একত্রিত করার ক্ষেত্রে এক অনন্য গ্রন্থ।
٣- بين طبقات المفسرين مع بيان مراحل التفسير بالأختصار-
তাফসিরের ধারাবাহিক পর্যায়গুলো উল্লেখপূর্বক মুফাসসিরগণের স্তরগুলো সংক্ষেপে বর্ণনা কর।
ভূমিকা: আল-কুরআনের তাফসির একটি ঐতিহাসিক ও ধারাবাহিক শাস্ত্র। রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে শুরু করে পরবর্তী যুগগুলোতে যাঁরা তাফসিরের খেদমতে আত্মনিয়োগ করেছেন, উসূলে তাফসিরের গবেষকগণ তাঁদের বিভিন্ন যুগে ও স্তরে বিন্যস্ত করেছেন।
তাফসিরের ধারাবাহিক পর্যায়সমূহ (مراحل التفسير):
ঐতিহাসিক বিবর্তনের বিচারে তাফসির মূলত চারটি প্রধান পর্যায়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে:
- প্রথম পর্যায় (মৌখিক ও প্রত্যক্ষ আমলের পর্যায়): নবুওয়াত ও সাহাবায়ে কিরামের যুগ। এ যুগে তাফসির পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়নি; বরং সাহাবিগণ নবীজি ﷺ-এর মুখনিঃসৃত বাণী মুখস্থ রাখতেন এবং ওহীর বাস্তব প্রয়োগ দেখে তা হৃদয়ঙ্গম করতেন।
- দ্বিতীয় পর্যায় (হাদীসের অংশ হিসেবে সংকলন): তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণের প্রাথমিক যুগে যখন হাদীস সংকলন শুরু হয়, তখন তাফসির ছিল হাদীসের কিতাবসমূহের একটি বিশেষ অধ্যায় (যেমন কিতাবুত তাফসির)। এ সময় ব্যক্তিগত ডায়েরি বা সহীফা আকারে তাফসির সংকলিত হতো।
- তৃতীয় পর্যায় (স্বতন্ত্র শাস্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থায়ন): হিজরী তৃতীয় শতকে তাফসির হাদীসের অধ্যায় থেকে বের হয়ে সম্পূর্ণ পৃথক শাস্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সূরার আয়াতভিত্তিক ধারাবাহিক ব্যাখ্যা, সনদের উল্লেখ এবং বিভিন্ন সাহাবী-তাবেয়ীর মতামত তুলে ধরার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তাফসিরগ্রন্থ প্রণীত হয়।
- চতুর্থ পর্যায় (শাখা-প্রশাখা ও ইজতিহাদী পর্যায়): হিজরী চতুর্থ শতক থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ পর্যায়ে তাফসিরে যুক্তি, দর্শন, বালাগাত, ব্যাকরণ, ফিকহী মাসায়েল ও সমকালীন বিজ্ঞানের সমন্বয়ে বিভিন্ন বিশেষায়িত ধারার প্রসার ঘটে।
মুফাসসিরগণের স্তরবিন্যাস (طبقات المفسرين):
আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) এবং পরবর্তী মুফাসসির গবেষকগণ মুফাসসিরদের সাধারণত প্রধান পাঁচটি স্তরে ভাগ করেছেন:
- প্রথম স্তর (সাহাবায়ে কিরামের তবকা): এই স্তরের প্রধান হলেন দশজন বিশিষ্ট সাহাবী—খুলাফায়ে রাশেদীন (আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী রা.), আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, উবাই ইবনে কা’ব, যায়েদ ইবনে ছাবিত, আবু মুসা আল-আশ’আরী এবং আবদুল্লাহ ইবনুল যুবায়ের (রা.)। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক বর্ণিত তাফসিরের অধিকারী হলেন ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ (রা.)।
- দ্বিতীয় স্তর (তাবেয়ীগণের তবকা): সাহাবিদের প্রত্যক্ষ ছাত্রবৃন্দ। ভৌগোলিক ও পাঠশালাগতভাবে এই স্তরের তিনটি কেন্দ্র ছিল:
- মক্কী পাঠশালা: মুজাহিদ ইবনে জাবর, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, ইকরামা, তাউস ও আতা ইবনে আবি রাবাহ।
- মাদানী পাঠশালা: যায়েদ ইবনে আসলাম, আবুল আলিয়া ও মুহাম্মদ ইবনে কা’ব আল-কুরাজী।
- ইরাকী পাঠশালা: আলকামা, আসওয়াদ, মুররা আল-হামদানী, আমির আশ-শা’বী এবং হাসান আল-বসরী।
- তৃতীয় স্তর (তাবে-তাবেয়ী ও হাদীস বর্ণনাকারী মুফাসসিরগণ): যাঁরা প্রথম তাফসিরকে লিখিত রূপ দিতে শুরু করেন—যেমন শু’বা ইবনুল হাজ্জাজ, সুফিয়ান সাওরী, সুফিয়ান ইবনে উয়ায়নাহ, ওয়াকী’ ইবনুল জাররাহ ও আব্দুর রাজ্জাক আস-সান’আনী।
- চতুর্থ স্তর (পূর্ণাঙ্গ সনদযুক্ত তাফসির রচয়িতাগণ): যাঁরা সমগ্র কুরআনের ধারাবাহিক তাফসির প্রণয়ন করেন—যেমন আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারীর আত-তাবারী, ইবনে আবি হাতিম আর-রাজী, ইবনে মাজাহ এবং ইবনুল মুনযির।
- পঞ্চম স্তর (পরবর্তী যুগ ও বিশেষায়িত শাস্ত্রীয় মুফাসসিরগণ): যাঁরা সনদের জটিলতা পরিহার করে সারসংক্ষেপ, বালাগাত, ব্যাকরণ ও ফিকহী বিশ্লেষণের ওপর জোর দিয়েছেন—যেমন ইমাম আল-বাগাবী (মা’আলিমুত তানযীল), যামাখশারী (আল-কাশশাফ), ইবনে আতিয়্যাহ (আল-মুহাররারুল ওয়াজীয), ফখরুদ্দীন আর-রাজী (মাফাতিহুল গায়ব), আল-কুরতুবী (আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন), ইবনে কাছীর এবং জালালুদ্দীন সুয়ূতী।
٤- عرف التفسير بالرأى، ثم بين نشأته وشروط قبوله مفصلا-
التفسير بالرأى (তাফসির বির রায়)-এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর التفسير بالرأى-এর উৎপত্তি ও গ্রহণের শর্তাবলি বিস্তারিত আলোচনা কর।
ভূমিকা: মানবজাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং কালের পরিক্রমায় নতুন নতুন সমস্যার প্রেক্ষাপটে আল-কুরআনের আয়াতসমূহকে আধুনিক ও বাস্তবসম্মতভাবে বোঝার জন্য ইজতিহাদভিত্তিক তাফসিরের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। এই ধারাটিই উলূমুল কুরআনে ‘তাফসির বির রায়’ নামে পরিচিত।
التفسير بالرأى-এর সংজ্ঞা:
আভিধানিক অর্থে ‘আর-রায়’ (الرَّأْيُ) অর্থ চিন্তা, গবেষণা, অন্তর্দৃষ্টি ও ইজতিহাদ।
পারিভাষিক সংজ্ঞায় ইমাম ড. মুহাম্মদ হুসাইন আয-যাহাবী তাঁর ‘আত-তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরূন’ গ্রন্থে বলেন:
«التَّفْسِيرُ بِالرَّأْيِ هُوَ تَفْسِيرُ الْقُرْآنِ بِالِاجْتِهَادِ الْمُسْتَنِدِ إِلَى أُصُولِ اللُّغَةِ الْعَرَبِيَّةِ وَقَوَاعِدِ الشَّرِيعَةِ الإِسْلَامِيَّةِ»
অর্থাৎ: “তাফসির বির রায় হলো আরবি ভাষার মূলনীতি এবং ইসলামী শরীয়তের প্রামাণ্য কায়েদা-কানুনের ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব ইজতিহাদ ও গবেষণার মাধ্যমে কুরআনের ব্যাখ্যা প্রদান করা।”
প্রকারভেদ: তাফসির বির রায় মূলত দুই প্রকার:
- الرأي المحمود (প্রশংসনীয় বা গ্রহণযোগ্য রায়): যা শরীয়তের নীতি, আরবি ব্যাকরণ এবং সাহাবাদের আমলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
- الرأي المذموم (নিন্দনীয় বা প্রত্যাখ্যাত রায়): যা মনগড়া খেয়ালখুশি, ভ্রান্ত আকিদা বা ভাষাজ্ঞানহীন অজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করে বলেছেন:
«مَنْ قَالَ فِي الْقُرْآنِ بِرَأْيِهِ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ» (তিরমিযী: ২৯৫০)
অর্থ: “যে ব্যক্তি কুরআনের ব্যাপারে নিজের মনগড়া মত প্রকাশ করে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।”
التفسير بالرأى-এর উৎপত্তি ও বিকাশ:
সাহাবিদের যুগ থেকেই মূলনীতিভিত্তিক রায়ের সূচনা ঘটেছিল। স্বয়ং সাহাবিগণ আরবি ভাষার ব্যুৎপত্তি ও দ্বীনের প্রজ্ঞার আলোকে যেসব ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নববী হাদীস পাননি, সেখানে ইজতিহাদ করেছেন। আলী (রা.)-কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল রাসুলুল্লাহ ﷺ কি আপনাকে বিশেষ কোনো ওহী দিয়েছেন? তিনি বলেছিলেন: “না, তবে আল্লাহ তা’আলা কোনো মানুষকে তাঁর কিতাব বোঝার যে প্রজ্ঞা ও অন্তর্দৃষ্টি (ফাহম) দান করেন, তা ব্যতীত।”
উমাইয়্যা ও আব্বাসীয় খেলাফতকালে অনারবদের বিপুল সমাগম, গ্রিক দর্শনের অনুবাদ এবং মু’তাযিলা, শিয়া, জাবারিয়া প্রভৃতি ফিরকার উদ্ভবের ফলে আল-কুরআনের আয়াতের বুদ্ধিবৃত্তিক ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এভাবেই তাফসির বির রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
তাফসির বির রায় গ্রহণযোগ্য হওয়ার অপরিহার্য শর্তাবলি (شروط قبول التفسير بالرأي):
একজন মুফাসসিরের জন্য তাফসির বির রায়ে অবতীর্ণ হতে হলে নিম্নলিখিত শর্তসমূহ পূরণ করা বাধ্যতামূলক:
- ১. আরবি ভাষার মৌলিক জ্ঞান: নাহু (ব্যাকরণ), সরফ (শব্দতত্ত্ব), ইশতিকাক্ব (শব্দমূল) এবং বালাগাত (মা’আনী, বায়ান ও বাদী’) শাস্ত্রে পূর্ণ পাণ্ডিত্য অর্জন করা।
- ২. ওহীর প্রতিষ্ঠিত নসের সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়া: কোনো ব্যাখ্যা যেন কুরআন মাজীদের কোনো দ্ব্যর্থহীন আয়াত (মুহকামাত) কিংবা সহীহ সুন্নাহর সুপ্রমাণিত বিধানের বিরোধী না হয়।
- ৩. বিশুদ্ধ আকীদার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা: কোনো ধরনের বিদ’আত, ফিরকাবাজি বা মনগড়া মতবাদ প্রমাণের হীন উদ্দেশ্যে আয়াতের অপব্যাখ্যা না করা।
- ৪. সাহাবা ও তাবেয়ীগণের ইজমা লঙ্ঘন না করা: যে বিষয়ে সালাফে সালেহীনের সর্বসম্মত ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার বিপরীতে নতুন কোনো বৈপরীত্য সৃষ্টি না করা।
- ৫. উলূমুল কুরআনের সামগ্রিক জ্ঞান: আসবাবুন নুযূল (নাযিলের প্রেক্ষাপট), নাসিখ-মানসুখ (রহিতকরণ সংক্রান্ত বিধান), কিরাত ও মুতাকাদ্দিমীনদের উসূল সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান থাকা।
- ৬. তাকওয়া ও অহংকারহীনতা: আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকা এবং নিজের অভিমতকে অভ্রান্ত ও একমাত্র ঐশী ব্যাখ্যা দাবি না করে বিনীত মনোভাব পোষণ করা।
٥- اكتب نبذة من حياة حسين بن مسعود البغوى (رح) مع بيان مناهجه في التفسير-
তাফসির শাস্ত্রে হুসাইন ইবনু মাসউদ আল-বাগাভী (রহ)-এর অনুসৃত পদ্ধতি উল্লেখপূর্বক তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।
ভূমিকা: পঞ্চম হিজরী শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ফক্বীহ এবং মুফাসসির হলেন ইমাম আল-বাগাভী (রহ.)। তিনি হাদিস ও তাফসির শাস্ত্রের এক অবিসংবাদিত ইমাম, যাঁর তাফসির গ্রন্থটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের নিকট এক বিশুদ্ধ ও প্রামাণ্য দলিল হিসেবে সমাদৃত।
ইমাম আল-বাগাভী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:
- নাম ও বংশপরিচয়: তাঁর পূর্ণ নাম আবু মুহাম্মদ আল-হুসাইন ইবনে মাসউদ ইবনে মুহাম্মদ আল-ফাররা আল-বাগাভী আশ-শাফেয়ী। ফাররা বলা হতো চর্মশিল্প বা পশমী পোশাক সংক্রান্ত কাজের জন্য।
- উপাধি: সুন্নাহর খেদমতে তাঁর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে “মুহইউস সুন্নাহ” (সুন্নাহর পুনরুজ্জীবনকারী) এবং “রুকনুদ্দীন” (দ্বীনের স্তম্ভ) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
- জন্ম ও শিক্ষা: তিনি খোরাসানের হেরাত ও মারওয়ারুজের মধ্যবর্তী ‘বাগা’ (বা বাগশুর) নামক পল্লীতে আনুমানিক ৪৩৬ বা ৪৩৭ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আলিম কাজী হুসাইন ইবনে মুহাম্মদ আল-মারওয়াযী (রহ.)-এর নিকট ফিকহ ও হাদীসের উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন।
- চারিত্রিক গুণাবলি: তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরহেযগার, নির্লোভ, অল্পেতুষ্ট এবং যাহিদ প্রকৃতির মানুষ। তিনি শুকনো রুটি ও জলপাইয়ের তেল খেয়ে জীবন অতিবাহিত করতেন এবং আজীবন জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন ছিলেন।
- রচিত গ্রন্থাবলি: তাঁর অমর সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে:
- মা’আলিমুত তানযীল (معالم التنزيل) — যা বিশ্বজুড়ে তাফসিরে বাগাভী নামে পরিচিত।
- শারহুস সুন্নাহ (شرح السنة) — হাদীস ও ফিকহের সুবিশাল আকরগ্রন্থ।
- মাসাবিহুস সুন্নাহ (مصابيح السنة) — যা পরবর্তীকালে খতীব তাবরিযী কৃত বিখ্যাত ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’-এর মূল ভিত্তি।
- আত-তাহযীব ফী ফিকহিল ইমামিশ শাফেয়ী।
- ওফাত: তিনি ৫১৬ হিজরীতে খোরাসানের মারওয়ারুজে ইনতিকাল করেন এবং তাঁর উস্তাদ কাজী হুসাইনের কবরের পাশে সমাহিত হন।
তাফসিরে ইমাম বাগাভীর অনুসৃত পদ্ধতি (مناهج البغوي في التفسير):
ইমাম বাগাভী (রহ.)-এর তাফসির গ্রন্থ ‘মা’আলিমুত তানযীল’-এর প্রধান পদ্ধতিগত বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:
- তাফসির বিল মা’ছুরের সমন্বয়: তিনি প্রধানত তাফসির বিল মা’ছুরের ধারা অনুসরণ করেছেন। আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি কুরআন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সহীহ হাদীস এবং সাহাবা-তাবেয়ীদের আসার উদ্ধৃত করেছেন।
- সনদ পরিহার ও সংক্ষিপ্তকরণ: ইমাম ছা’লাবীর তাফসিরের ওপর ভিত্তি করলেও ইমাম বাগাভী দীর্ঘ সনদসমূহ বর্জন করে শুধু মূল রাবী বা বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করেছেন, যাতে সাধারণ পাঠকের জন্য তা সহজপাঠ্য হয়।
- ইসরাঈলিয়্যাত ও জাল রেওয়ায়েত বর্জন: তৎকালীন অনেক তাফসিরে ঢুকে পড়া দুর্বল, ভিত্তিহীন কিচ্ছা-কাহিনী ও অপ্রমাণিত ইসরাঈলিয়্যাত থেকে তিনি তাঁর তাফসিরকে সযত্নে পরিচ্ছন্ন রেখেছেন। কোনো দুর্বল বিষয় উল্লেখ করলে তার দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন।
- ফিকহী মতভেদ নিরসন: তিনি একজন শাফেয়ী মাযহাবের ফক্বীহ হওয়া সত্ত্বেও অন্ধ পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করেননি; বরং অন্যান্য ফুকাহায়ে কিরামের মতামতও ইনসাফের সাথে উপস্থাপন করেছেন।
- ভাষাতাত্ত্বিক ও কিরাআতের বিশুদ্ধ আলোচনা: তিনি শব্দের ব্যুৎপত্তি, ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ এবং মুতাওয়াতির কিরাআতসমূহের অর্থগত তারতম্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও পরিমিত ভাষায় বর্ণনা করেছেন।
مجموعة (ب) – ‘খ’ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)
যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও: ৫ × ২ = ১০
٦- اذكر مصادر التفسير في عهد الصحابة-
সাহাবিগণের যুগে তাফসিরের উৎসগুলো বর্ণনা কর।
ভূমিকা: সাহাবায়ে কিরাম ছিলেন ওহীর প্রত্যক্ষ সাক্ষী এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সরাসরি ছাত্র। কুরআন মাজীদ অনুধাবনের ক্ষেত্রে তাঁদের অনুসৃত উৎসসমূহ ছিল বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্যতার চূড়ান্ত মাপকাঠি।
সাহাবিগণের যুগে তাফসিরের মূল উৎসসমূহ:
- ১. আল-কুরআনুল কারীম: সাহাবিগণ সর্বাগ্রে কুরআনের এক আয়াত দিয়ে অন্য আয়াত বুঝতেন। কারণ আল্লাহর কালামের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যাকারী হলো স্বয়ং আল্লাহর কালাম।
- ২. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ: যেসব বিষয়ে কুরআনে স্পষ্ট সমাধান পেতেন না, তাঁরা সরাসরি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ, তাঁর কর্ম ও ব্যাখ্যার দিকে প্রত্যাবর্তন করতেন।
- ৩. আরবি ভাষার বিশুদ্ধ প্রকৃতি ও জাহেলী কবিতা: সাহাবিগণ বিশুদ্ধ আরবি ভাষার অধিকারী ছিলেন। কোনো শব্দের বিরল অর্থ অনুধাবনে তাঁরা জাহেলী যুগের বিশুদ্ধ কবিতা ও প্রবাদ-প্রবচনের সাহায্য নিতেন, যেমনটি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হরহামেশা করতেন।
- ৪. শানে নুযূল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের প্রত্যক্ষ জ্ঞান: কোন প্রেক্ষাপটে, কার উদ্দেশ্যে এবং কী কারণে আয়াত নাযিল হয়েছিল, তা সাহাবিগণ নিজ চোখে দেখেছিলেন। এটি আয়াতের সঠিক প্রয়োগ বুঝতে সহায়তা করত।
- ৫. সাহাবিদের বিশুদ্ধ ইজতিহাদ ও গভীর প্রজ্ঞা: যেসব ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো নস পাওয়া যেত না, সেখানে তাঁরা শরীয়তের সার্বিক উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরীয়াহ)-কে সামনে রেখে তাকওয়াপূর্ণ ইজতিহাদ করতেন।
- ৬. আহলে কিতাবদের ঐতিহাসিক তথ্য (শর্তসাপেক্ষ): অতীব সীমিত পরিসরে অতীত জাতিসমূহের ইতিবৃত্ত জানার জন্য আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.)-এর মতো নির্ভরযোগ্য ইসলাম গ্রহণকারী আহলে কিতাবদের সাধারণ তথ্য শুনতেন, তবে আকীদা ও শরীয়তের ক্ষেত্রে তা কখনো গ্রহণ করতেন না।
٧- اكتب ترجمة عبد الله بن عباس (رض)-
আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।
ভূমিকা: সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে তাফসিরের জগতে শীর্ষতম ব্যক্তিত্ব হলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)। তিনি উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলিম ও মুফাসসির হিসেবে স্বীকৃত।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:
- জন্ম ও বংশপরিচয়: তিনি হিজরতের তিন বছর পূর্বে মক্কার শিয়াবে আবি তালিবে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সম্মানিত চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.) এবং মাতা উম্মুল ফজল লুবাবা (রা.)।
- উপাধি: জ্ঞানসমুদ্রে অবগাহনের কারণে তাঁকে বলা হতো “আল-হাবর” (মহা পণ্ডিত) এবং “আল-বাহর” (জ্ঞানের সাগর)। তাফসিরের ক্ষেত্রে তাঁর চিরন্তন উপাধি হলো “তুরজুমানুল কুরআন” (কুরআনের মুখপাত্র)।
- নবীজি ﷺ-এর বিশেষ দু’আ: শৈশবে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে দু’আ করেছিলেন:
«اللَّهُمَّ فَقِّهْهُ فِي الدِّينِ، وَعَلِّمْهُ التَّأْوِيلَ» (সহীহ বুখারী: ৭৫, মুসনাদে আহমাদ: ২৩৯৭)
অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি তাকে দ্বীনের গভীর বুঝ দান করুন এবং কুরআনের সঠিক তা’বীল ও ব্যাখ্যা শিক্ষা দিন।” - ইলমী মর্যাদা: উমর (রা.) যুবকদের মধ্যে একমাত্র ইবনে আব্বাসকে বদরী প্রবীণ সাহাবিদের মজলিসে শূরায় স্থান দিতেন এবং তাঁকে ‘যুবক পণ্ডিত’ বলে সম্মানিত করতেন। তিনি মক্কায় তাফসিরের এক সুবিশাল একাডেমি গড়ে তোলেন।
- ওফাত: তিনি ৬৮ হিজরীতে ৭১ বছর বয়সে তায়েফে ইনতিকাল করেন। মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যা (রহ.) তাঁর জানাযা পড়ান এবং বলেন, “আজ এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ আলিমের তিরোধান ঘটল।”
٨- اكتب خصائص التفسير في عصر التابعين-
তাবেয়ীদের যুগে তাফসিরের বৈশিষ্ট্য লেখ।
ভূমিকা: সাহাবিদের স্বর্ণযুগের পর তাবেয়ীগণের যুগ ছিল তাফসির সাহিত্যের প্রসারের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ যুগে তাফসিরের পরিধি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে।
তাবেয়ীদের যুগে তাফসিরের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- ভৌগোলিক তাফসির পাঠশালার বিকাশ: সাহাবিদের ছড়িয়ে পড়ার কারণে মক্কা, মদিনা ও কুফায় তিনটি স্বতন্ত্র ঘরানার তাফসির স্কুলের উৎপত্তি ঘটে।
- ইসরাঈলিয়্যাতের ব্যাপক অনুপ্রবেশ: এ যুগে আহলে কিতাবদের বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করার কারণে পূর্ববর্তী নবী-রাসুলগণের বিস্তারিত কাহিনী ও সৃষ্টিতত্ত্বের বর্ণনায় প্রচুর ইসরাঈলী রেওয়ায়েত তাফসিরের মাঝে স্থান পেতে শুরু করে।
- ইজতিহাদ ও মতভেদের বিস্তার: সাহাবিদের যুগে মতপার্থক্য কম থাকলেও তাবেয়ীদের যুগে প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে আয়াতের ব্যাখ্যায় মতভেদ বৃদ্ধি পায়।
- লিপিবদ্ধকরণের প্রাথমিক সূচনা: মৌখিক বর্ণনার পাশাপাশি তাবেয়ীগণ ব্যক্তিগত খাতা ও সহীফায় তাফসিরের নোট সংরক্ষণ শুরু করেন (যেমন মুজাহিদের তাফসির)।
- ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ: অনারবদের ভাষা সংক্রান্ত ত্রুটি (লাহন) প্রতিরোধের জন্য আয়াতের ব্যাকরণিক সমাধান ও অলঙ্কারশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা প্রদান শুরু হয়।
٩- وازن بين تفسير الكشاف وتفسير البيضاوي-
تفسير الكشاف ও تفسير البيضاوى-এর মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা কর।
ভূমিকা: আরবি ভাষা, অলঙ্কারশাস্ত্র (বালাগাত) এবং গভীর দার্শনিক বিশ্লেষণের দিক থেকে ইমাম যামাখশারীর ‘আল-কাশশাফ’ এবং কাজী বায়যাবীর ‘আনওয়ারুত তানযীল’ হলো মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত দুটি তাফসির গ্রন্থ।
উভয় গ্রন্থের পরিচিতি:
১. আল-কাশশাফ: পুরো নাম ‘আল-কাশশাফ আন হাক্বায়িকিত তানযীল ওয়া উয়ূনিল আক্বাভীল’, প্রণেতা আবুল কাসিম মাহমুদ ইবনে উমর আয-যামাখশারী (ওফাত ৫৩৮ হি.)।
২. তাফসিরে বায়যাবী: পুরো নাম ‘আনওয়ারুত তানযীল ওয়া আসরারুত তা’বীল’, প্রণেতা কাজী নাসিরুদ্দীন আবু সাঈদ আবদুল্লাহ ইবনে উমর আল-বায়যাবী (ওফাত ৬৮৫ বা ৬৯১ হি.)।
গ্রন্থদ্বয়ের মধ্যকার তুলনামূলক বিশ্লেষণ:
| তুলনার বিষয় | তফসিরে আল-কাশশাফ (যামাখশারী) | তফসিরে বায়যাবী (কাজী বায়যাবী) |
|---|---|---|
| আকীদাগত অবস্থান | যামাখশারী ছিলেন কট্টর মু’তাযিলা মতাদর্শের অনুসারী। তিনি মু’তাযিলাদের পাঁচটি মূলনীতি (তাওহীদ, আদল ইত্যাদি) প্রমাণের জন্য আয়াতের জটিল তা’বীল করেছেন। | বায়যাবী ছিলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের সুদৃঢ় আশ’আরী আকীদার আলেম। তিনি কাশশাফের মু’তাযিলা দৃষ্টিভঙ্গি খণ্ডন করে সুন্নী আকীদা প্রতিষ্ঠা করেন। |
| বালাগাত ও ভাষাশৈলী | বালাগাত ও অলঙ্কারশাস্ত্রের ক্ষেত্রে এটি এক অতুলনীয় মাস্টারপিস। এর সাহিত্যের মান অদ্বিতীয়। | তিনি কাশশাফের সাহিত্যের সারনির্যাস গ্রহণ করেছেন, তবে তা অত্যন্ত পরিমিত ও মার্জিত ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। |
| কলেবর ও বিন্যাস | গ্রন্থটি অত্যন্ত সুবিশাল, বিস্তারিত এবং প্রশ্নোত্তরমূলক (فإن قلت… قلت…) শৈলীতে রচিত। | এটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, সংহত ও পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী এক অপূর্ব সংকলন। |
| ইসরাঈলিয়্যাত ও হাদীস | ইসরাঈলিয়্যাতের সমালোচনা করলেও সূরার ফজিলত সংক্রান্ত বহু বানোয়াট হাদীস উল্লেখ করেছেন। | যামাখশারীর উল্লেখিত বহু যঈফ বিষয় তিনি সংক্ষেপ করেছেন, তবে তিনিও ফজিলতের কিছু দুর্বল হাদিস গ্রহণ করেছেন। |
| জনপ্রিয়তা ও পাঠ্যক্রম | আকীদাগত সতর্কতার কারণে সাধারণের চেয়ে উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ। | সমগ্র মুসলিম বিশ্বের কওমি ও আলিয়া মাদরাসায় পাঠ্য হিসেবে সর্বাধিক সমাদৃত ও এর ওপর কয়েক ডজন হাশিয়া রচিত হয়েছে। |
দ্বিতীয় অংশ: مناهج البحث (মানাহিজুল বাহাছ) [পূর্ণমান: ৪০]
مجموعة (الف) – ‘ক’ বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)
যেকোনো তিনটি প্রশ্নের উত্তর দাও: ১০ × ৩ = ৩০
١٠- عرف البحث، ثم تحدث عن أهمية البحث في ضوء القرآن والسنة-
البحث (গবেষণা)-এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে গবেষণার গুরুত্ব আলোচনা কর।
ভূমিকা: মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ, জ্ঞানের বিস্তার এবং ইসলামী শরীয়তের গতিশীলতা রক্ষার প্রধানতম চাবিকাঠি হলো গবেষণা। ইসলাম চিন্তা-ভাবনাহীন অন্ধ অনুকরণের ঘোর বিরোধী এবং নিরন্তর সত্য অনুসন্ধানের পক্ষে এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণা।
البحث (গবেষণা)-এর সংজ্ঞা:
আভিধানিক অর্থে ‘আল-বাহছ’ (البَحْثُ) শব্দটি অনুসন্ধান করা, সন্ধান করা, কোনো লুক্কায়িত সত্য উন্মোচন করা কিংবা মাটি খুঁড়ে কোনো কিছু বের করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
﴿فَبَعَثَ اللَّهُ غُرَابًا يَبْحَثُ فِي الْأَرْضِ لِيُرِيَهُ كَيْفَ يُوَارِي سَوْءَةَ أَخِيهِ﴾ (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩১)
অর্থ: “অতঃপর আল্লাহ একটি কাক পাঠালেন, যে মাটি খুঁড়ছিল যাতে তাকে দেখাতে পারে কীভাবে সে তার ভাইয়ের মরদেহ গোপন করবে।”
পারিভাষিক সংজ্ঞায় বৈজ্ঞানিক গবেষণা (البحث العلمي) সম্পর্কে ড. আহমাদ শলাবী বলেন:
«هُوَ مَحَاوَلَةٌ دَقِيقَةٌ نَاقِدَةٌ لِلتَّوَصُّلِ إِلَى حُلُولِ الْمُشْكِلَاتِ الَّتِي تُؤَرِّقُ الْبَشَرِيَّةَ، عَنْ طَرِيقِ التَّقَصِّي وَالتَّحْلِيلِ الْمَنْهَجِيِّ»
অর্থাৎ: “সুনির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে মানবজাতির সন্মুখীন হওয়া বিভিন্ন সমস্যার সমাধান বের করার লক্ষ্যে পরিচালিত সূক্ষ্ম ও সমালোচনামূলক অনুসন্ধানই হলো গবেষণা।”
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে গবেষণার গুরুত্ব:
- কুরআন মাজীদের আলোকে গবেষণার গুরুত্ব:
- চিন্তা ও গবেষণার প্রত্যক্ষ নির্দেশ: কুরআন মানুষকে মহাবিশ্ব ও প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে গবেষণার নির্দেশ দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
﴿أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا﴾ (সূরা মুহাম্মদ: ২৪)
অর্থ: “তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর গবেষণা করে না, নাকি তাদের অন্তরে তালা লাগানো রয়েছে?” - মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের তাগিদ: আল্লাহ তা’আলা বলেন:
﴿قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ بَدَأَ الْخَلْقَ﴾ (সূরা আল-আনকাবুত: ২০)
অর্থ: “বলুন, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং পর্যবেক্ষণ করো কীভাবে তিনি সৃষ্টির সূচনা করেছেন।” - তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের মূলনীতি (রিসার্চ মেথডোলজি): আল্লাহ তা’আলা ভিত্তিহীন তথ্যের ওপর নির্ভর করা নিষিদ্ধ করেছেন:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا﴾ (সূরা আল-হুজুরাত: ৬)
অর্থ: “হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই-বাছাই (তাহক্বীক্ব) করো।” - অন্ধ অনুকরণ বর্জন: না জেনে বা কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তি ছাড়া কোনো মতের অনুসরণকে কুরআন ধিক্কার জানিয়েছে (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩৬)।
- চিন্তা ও গবেষণার প্রত্যক্ষ নির্দেশ: কুরআন মানুষকে মহাবিশ্ব ও প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে গবেষণার নির্দেশ দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
- সুন্নাহর আলোকে গবেষণার গুরুত্ব:
- ইজতিহাদের মর্যাদা ও পুরস্কার: রাসুলুল্লাহ ﷺ সঠিক গবেষণার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াকে দ্বিগুণ সওয়াবের কাজ বলে ঘোষণা করেছেন:
«إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ» (সহীহ বুখারী: ৭৩৫২)
অর্থ: “বিচারক যখন ইজতিহাদ (গবেষণা) করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তার জন্য দুটি সওয়াব; আর যদি ইজতিহাদ করে ভুলও করে, তবে তার জন্য একটি সওয়াব।” - ইলম অন্বেষণের আবশ্যকতা: রাসুলুল্লাহ ﷺ জ্ঞান ও সত্য অনুসন্ধানকে প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ করেছেন: «طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ» (ইবনে মাজাহ: ২২৪)।
- উসূলে হাদীস ও জারহ-তা’দীলের নজির: মুসলিম উম্মাহ হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে যে ‘আসমাউর রিজাল’ ও সনদ পর্যালোচনার গবেষণাপদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল, তা আধুনিক বিশ্বের যেকোনো গবেষণা পদ্ধতির চেয়ে অধিক নিখুঁত ও বস্তুনিষ্ঠ।
- ইজতিহাদের মর্যাদা ও পুরস্কার: রাসুলুল্লাহ ﷺ সঠিক গবেষণার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াকে দ্বিগুণ সওয়াবের কাজ বলে ঘোষণা করেছেন:
١١- تحدث عن كيفية جمع المواد والمعلومات في مجال البحث العلمي بين مفصلا-
গবেষণায় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর।
ভূমিকা: বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তি হলো সঠিক, নির্ভরযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্য-উপাত্ত। তথ্য সংগ্রহের যথার্থতার ওপরই নির্ভর করে গবেষণার ফলাফল কতটা গ্রহণযোগ্য হবে। অতএব, একজন গবেষককে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তথ্য সংগ্রহ ও তা সংরক্ষণের কৌশল আয়ত্ত করতে হয়।
গবেষণায় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পদ্ধতিসমূহ (طرق جمع المعلومات):
- ১. গ্রন্থাগার বা সাহিত্য পর্যালোচনা (Library Research): তাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রে এটি প্রধানতম পদ্ধতি। গবেষক সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আদি ও আধুনিক কিতাবাদি, পাণ্ডুলিপি, গবেষণা সাময়িকী ও জার্নাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন।
- ২. প্রাথমিক উৎস ও সহায়ক উৎস চিহ্নিতকরণ:
- প্রাথমিক উৎস (Primary Sources): যেখান থেকে সরাসরি মৌলিক তথ্য পাওয়া যায় (যেমন কুরআন, হাদীসের মূল গ্রন্থ, ঐতিহাসিক দলিলপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ)।
- সহায়ক উৎস (Secondary Sources): প্রাথমিক উৎসের ওপর ভিত্তি করে রচিত বিভিন্ন ব্যাখ্যাগ্রন্থ ও প্রবন্ধ।
- ৩. প্রত্যক্ষ জরিপ ও সাক্ষাৎকার (Field Survey & Interview): সামাজিক বা প্রায়োগিক গবেষণার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রশ্নমালার (Questionnaire) ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ বা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
- ৪. পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি (Observation Method): কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা সামাজিক পরিস্থিতির ওপর গবেষক স্বয়ং উপস্থিত থেকে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ চালিয়ে তথ্য লিপিবদ্ধ করেন।
- ৫. ডিজিটাল ডেটাবেজ ও অনলাইন আর্কাইভস: আধুনিক যুগে বিশ্বখ্যাত রিসার্চ ডাটাবেজ (যেমন আল-মাকতাবাতুশ শামিলা, জেস্টোর, গুগল স্কলার ইত্যাদি) থেকে প্রামাণ্য ই-বুক ও গবেষণাপত্র সংগ্রহ করা হয়।
তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিসমূহ (طرق تدوين وحفظ المعلومات):
সংগৃহীত বিশাল তথ্যভাণ্ডার সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে রাখার জন্য গবেষকগণ নিম্নোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করেন:
- কার্ড বা স্লিপ পদ্ধতি (نظام البطاقات): এটি সনাতন তবে সর্বাধিক কার্যকরী পদ্ধতি। গবেষক নির্দিষ্ট আকারের শক্ত কাগজের কার্ড তৈরি করেন। প্রতিটি কার্ডের শীর্ষে অধ্যায় বা বিষয়ের শিরোনাম, নিচে উদ্ধৃতি এবং একেবারে নিচে লেখকের নাম, বইয়ের নাম, খণ্ড ও পৃষ্ঠা নম্বর লিখে রাখেন। পরবর্তীতে গবেষণার মূল কাঠামো রচনার সময় এই কার্ডগুলো অধ্যায়ভিত্তিক সাজিয়ে সহজেই ব্যবহার করা যায়।
- ফাইল ও ফোল্ডার পদ্ধতি (نظام الملفات): গবেষক গবেষণার পরিকল্পনা (খসড়া কাঠামো) অনুযায়ী প্রতিটি অধ্যায় বা উপ-শিরোনামের জন্য আলাদা আলাদা ফাইল বা খাম প্রস্তুত করেন এবং সংগৃহীত কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট ফাইলে সংরক্ষণ করেন।
- ডিজিটাল নোট ও রেফারেন্স ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার: বর্তমান কম্পিউটারের যুগে গবেষকগণ MS Word, Notion, OneNote এবং রেফারেন্সিং সফটওয়্যার যেমন EndNote, Zotero ও Mendeley ব্যবহার করে ডিজিটালভাবে তথ্য ও সাইটেশন সুবিন্যস্ত রাখেন।
- নিয়মিত ব্যাকআপ সংরক্ষণ: সংগৃহীত কোনো তথ্য যেন প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে হারিয়ে না যায়, সেজন্য একাধিক স্থানে (যেমন ক্লাউড ড্রাইভ, গুগল ড্রাইভ, এক্সটার্নাল হার্ডডিস্ক) ব্যাকআপ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
١٢- اذكر المراحل التي يتبعها الباحث في بحثه-
গবেষণাকর্মে একজন গবেষক যে সকল ধাপ অনুসরণ করে তা আলোচনা কর।
ভূমিকা: গবেষণা কোনো বিশৃঙ্খল বা এলোমেলো কাজ নয়; বরং এটি একটি সুসংজ্ঞায়িত, সুশৃঙ্খল ও পর্যায়ক্রমিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য গবেষককে সুনির্দিষ্ট কতগুলো ধাপ ধারাবাহিকভাবে অতিক্রম করতে হয়।
গবেষণাকর্মের মৌলিক ধাপসমূহ (مراحل إعداد البحث العلمي):
- ১. গবেষণার বিষয় ও শিরোনাম নির্বাচন (اختيار موضوع البحث وعنوانه): গবেষকের আগ্রহ, প্রাসঙ্গিকতা এবং ইসলামী উম্মাহর বর্তমান প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতি রেখে একটি মৌলিক ও গবেষণাযোগ্য বিষয় নির্ধারণ করা। শিরোনামটি হতে হবে সংক্ষিপ্ত, অর্থবহ ও সুস্পষ্ট।
- ২. গবেষণার সমস্যা চিহ্নিতকরণ (تحديد مشكلة البحث): গবেষক ঠিক কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন বা কোন বিভ্রান্তির সমাধান করতে চান, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা।
- ৩. পূর্ববর্তী সাহিত্য পর্যালোচনা (Literature Review / استعراض الدراسات السابقة): নির্বাচিত বিষয়ের ওপর অতীতে কী কী গবেষণা হয়েছে তা খতিয়ে দেখা, যাতে কাজের পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং গবেষণার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও গ্যাপ (Research Gap) স্পষ্ট হয়।
- ৪. গবেষণার উদ্দেশ্য ও প্রশ্নাবলি প্রণয়ন (أهداف البحث وتساؤلاته): এই গবেষণার মাধ্যমে কী কী সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হবে এবং কোন কোন মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে, তা নির্ধারণ করা।
- ৫. কর্মপরিকল্পনা ও রূপরেখা প্রণয়ন (خطة البحث / Research Proposal): একটি সুবিন্যস্ত খসড়া তৈরি করা, যার মধ্যে ভূমিকা, অধ্যায় ও পরিচ্ছেদের বিভাজন এবং সম্ভাব্য উপসংহার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
- ৬. তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ (جمع المادة العلمية): লাইব্রেরি, পাণ্ডুলিপি, ডিজিটাল আর্কাইভ কিংবা মাঠপর্যায়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য ও উদ্ধৃতি সংগ্রহ করা।
- ৭. তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা (نقد المادة العلمية وتحليلها): সংগৃহীত উপাত্ত অন্ধভাবে গ্রহণ না করে তার বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা (তাহক্বীক্ব) করা, সনদের সত্যতা যাচাই করা এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা।
- ৮. খসড়া পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন (صياغة البحث وكتابته): নির্ধারিত গবেষণা শৈলী (রিসার্চ মেথডোলজি) ও প্রাঞ্জল ভাষায় প্রতিটি অধ্যায় বিস্তারিতভাবে লিখে সম্পন্ন করা।
- ৯. ফলাফল ও সুপারিশমালা নির্ধারণ (النتائج والتوصيات): সমগ্র গবেষণার সারসংক্ষেপ এবং এর মাধ্যমে প্রাপ্ত নতুন সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যত গবেষণার দিকনির্দেশনা সংক্ষেপে তুলে ধরা।
- ১০. পাদটীকা, গ্রন্থপঞ্জি ও চূড়ান্ত সম্পাদন (الهوامش والفهارس والمراجعة النهائية): তথ্যের নির্ভুল সাইটেশন (পাদটীকা) যুক্ত করা, বর্ণানুক্রমিক গ্রন্থপঞ্জি তৈরি করা, বানানের ভুলত্রুটি সংশোধন করে চূড়ান্ত মুদ্রণ সম্পন্ন করা।
١٣- ما هي الشروط والصفات التي يجب أن تتوفر في الباحث الناجح؟
একজন সফল গবেষকের মধ্যে যে সকল শর্ত ও গুণাবলি থাকা আবশ্যক তা আলোচনা কর।
ভূমিকা: গবেষণা কেবল একটি একাডেমিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি পবিত্র আমানত। একজন সাধারণ লেখক এবং একজন প্রকৃত গবেষকের মাঝে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। একজন গবেষককে সফল হতে হলে বিশেষ কিছু চারিত্রিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতার অধিকারী হতে হয়।
সফল গবেষকের অপরিহার্য শর্ত ও গুণাবলি (صفات وشروط الباحث الناجح):
- ১. ইলমী আমানতদারী ও সততা (الأمانة العلمية): এটি গবেষণার আত্মা। অন্যের লেখা নিজের নামে চালিয়ে না দেওয়া (প্লেজিয়ারিজম বা কুম্ভীলকবৃত্তি বর্জন), তথ্যের মূল উৎসের সঠিক উদ্ধৃতি প্রদান এবং কারও বক্তব্য বিকৃত না করা।
- ২. ইখলাস ও বিশুদ্ধ নিয়ত (الإخلاص): খ্যাতি, প্রশংসা বা পার্থিব স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জ্ঞানের সত্য উন্মোচনের নিয়তে গবেষণা করা।
- ৩. নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতা (الموضوعية والنزاهة): অন্ধ দলীয় পক্ষপাতিত্ব, নিজস্ব পূর্বসংস্কার কিংবা বংশগত গোঁড়ামিমুক্ত থাকা। সত্য যার পক্ষেই যাক না কেন, প্রমাণের ভিত্তিতে তা অকপটে গ্রহণ করার সৎসাহস থাকা।
- ৪. অসীম ধৈর্য ও অধ্যবসায় (الصبر والمثابرة): গবেষণার পথ কণ্টকাকীর্ণ। দিনের পর দিন লাইব্রেরিতে বসে থাকা, জটিল পাণ্ডুলিপি পাঠ করা এবং ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে ধৈর্যের সাথে লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাওয়া।
- ৫. গভীর প্রজ্ঞা ও সমালোচনামূলক মেজাজ (الحس النقدي): কোনো তথ্য সামনে এলেই তা সত্য বলে গ্রহণ না করে যুক্তি, বুদ্ধি ও শরীয়তের মানদণ্ডে তা যাচাই করার প্রখর বিশ্লেষণী ক্ষমতা থাকা।
- ৬. ভাষার ওপর অগাধ দখল (إتقان لغة البحث): যে ভাষায় গবেষণা রচিত হচ্ছে (যেমন বাংলা বা আরবি), তার ব্যাকরণ, বানানরীতি ও অলঙ্কারশাস্ত্রে পূর্ণ দখল থাকা, যাতে বক্তব্য প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী হয়।
- ৭. বিনয় ও নম্রতা (التواضع العلمي): নিজের মতামতের ওপর গোঁড়ামি না করে অন্য বিশেষজ্ঞদের গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শকে সানন্দে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকা।
- ৮. আধুনিক প্রযুক্তির জ্ঞান: কম্পিউটার পরিচালনা, টাইপিং, ডাটাবেজ ব্যবহার এবং আধুনিক সফটওয়্যারের সাহায্যে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকা।
١٤- عرف المصادر والمراجع- كيف تنظم قائمتها في نهاية الرسالة؟ بين-
المصادر ও المراجع-এর পরিচয় দাও। অভিসন্দর্ভের শেষে কীভাবে গ্রন্থপঞ্জির তালিকা বিন্যাস করা হয়? বর্ণনা কর।
ভূমিকা: যেকোনো গবেষণাকর্মের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রমাণিকতার প্রধান মাপকাঠি হলো এর সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি। গবেষণায় ব্যবহৃত তথ্যাবলির উৎস সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আমানতদারীর দাবি।
المصادر ও المراجع-এর পরিচয় ও পার্থক্য:
- المصادر (মৌলিক বা আদি উৎস / Primary Sources):
যেসব গ্রন্থ প্রাচীনতম, মৌলিক এবং যেখানে সরাসরি ঐতিহাসিক ঘটনা বা কোনো শাস্ত্রের মূল বক্তব্য কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়া প্রথম লিপিবদ্ধ হয়েছে, সেগুলোকে ‘আল-মাসাদির’ বলা হয়। যেমন ইসলামী গবেষণায় পবিত্র কুরআন, সহীহ বুখারী, মুয়াত্তা ইমাম মালিক, সীরাতে ইবনে হিশাম, তাফসিরে তাবারী ইত্যাদি। - المراجع (সহায়ক বা দ্বিতীয় স্তরের উৎস / Secondary Sources):
যেসব গ্রন্থ মৌলিক উৎসের (মাসাদিরের) ওপর নির্ভর করে পরবর্তী যুগের গবেষকগণ ব্যাখ্যা, পর্যালোচনা বা বিশ্লেষণ আকারে রচনা করেছেন, সেগুলোকে ‘আল-মারাজি’ বলা হয়। যেমন আধুনিক গবেষকদের রচিত বিভিন্ন গবেষণামূলক গ্রন্থ, তাফসিরের পর্যালোচনা বা পিএইচডি থিসিস।
অভিসন্দর্ভের শেষে গ্রন্থপঞ্জির তালিকা বিন্যাস পদ্ধতি (ترتيب قائمة المصادر والمراجع):
অভিসন্দর্ভের (Thesis/Dissertation) সমাপ্তিতে ব্যবহৃত সকল বইয়ের একটি প্রামাণ্য তালিকা সংযুক্ত করতে হয়। আন্তর্জাতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মানুসারে এটি নিম্নোক্তভাবে বিন্যস্ত করা হয়:
- পবিত্র কুরআনের অগ্রাধিকার: কোনো বর্ণানুক্রমিক হিসেবের বাইরে সম্মানার্থে তালিকার সর্বাগ্রে ‘আল-কুরআনুল কারীম’ স্থান পাবে।
- শাস্ত্রভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ (ঐচ্ছিক কিন্তু একাডেমিক): বইগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যেতে পারে—যেমন:
- কুরআন ও উলূমুল কুরআন সংক্রান্ত গ্রন্থাবলি
- হাদীস ও উলূমুল হাদীস সংক্রান্ত গ্রন্থাবলি
- ফিকহ ও উসূলে ফিকহ সংক্রান্ত গ্রন্থাবলি
- ইতিহাস, সীরাত ও জীবনীগ্রন্থ
- অভিধান ও ভাষাতাত্ত্বিক গ্রন্থাবলি
- আধুনিক সাময়িকী, গবেষণা জার্নাল ও ওয়েব লিংক
- বর্ণানুক্রমিক বিন্যাস (Alphabetical Order): প্রতিটি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত গ্রন্থসমূহকে আরবি বা বাংলা বর্ণমালার ক্রমানুসারে (যেমন: ا، ب، ت অথবা অ, আ, ক, খ) সাজাতে হয়। এটি দুইভাবে করা যায়:
- লেখকের নামানুসারে (Author-first): লেখকের পারিবারিক বা প্রসিদ্ধ নাম প্রথমে এনে সাজানো (যেমন: তাবারী, মুহাম্মদ ইবনে জারীর)।
- গ্রন্থের নামানুসারে (Book-first): বইয়ের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে সাজানো (যেমন: জামিউল বায়ান…)।
- গ্রন্থপঞ্জিতে তথ্য উপস্থাপনের আদর্শ বিন্যাস: প্রতিটি এন্ট্রিতে ধারাবাহিকভাবে নিম্নোক্ত উপাদান থাকতে হবে:
লেখকের নাম, গ্রন্থের নাম (বোল্ড বা ইটালিক), তাহক্বীক্বকারক/সম্পাদকের নাম, খণ্ড সংখ্যা, সংস্করণ/মুদ্রণ সংখ্যা, প্রকাশনা সংস্থা, প্রকাশের স্থান ও প্রকাশের সন।
উদাহরণ:
ইবনে কাছীর, ইমাদুদ্দীন আবুল ফিদা ইসমাঈল। তাফসিরুল কুরআনিল আজীম। তাহক্বীক্ব: সামী ইবনে মুহাম্মদ আস-সালামাহ। খণ্ড: ১-৮, দ্বিতীয় সংস্করণ, রিয়াদ: দারু তাইয়িবাহ, ১৯৯৯ খ্রি.।
مجموعة (ب) – ‘খ’ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)
যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও: ৫ × ২ = ১০
١٥- ما المخطوطات؟ تحدث عن أهمية تحقيقها مختصرا-
পাণ্ডুলিপি কী? পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার (তাহক্বীক্ব করার) গুরুত্ব সংক্ষেপে আলোকপাত কর।
ভূমিকা: মুসলিম উম্মাহর হাজার বছরের জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য বিশ্বজুড়ে পাণ্ডুলিপির পাতায় সংরক্ষিত রয়েছে। এই প্রাচীন সম্পদকে আলোয় নিয়ে আসার প্রক্রিয়াই হলো তাহক্বীক্ব বা সম্পাদনাকর্ম।
পাণ্ডুলিপির পরিচয় (ما المخطوطات):
‘আল-মাখতূত্বাত’ (المَخْطُوطَاتُ) শব্দটি ‘খাত্ব’ (خَطّ) থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ হাতে লেখা। পরিভাষায় ছাপাখানা ও আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে আলেম ও গবেষকগণ স্বহস্তে যেসকল গ্রন্থ, পুস্তিকা বা দলিল লিপিবদ্ধ করেছিলেন, সেগুলোকে ‘পাণ্ডুলিপি’ বা ম্যানুস্ক্রিপ্ট (Manuscript) বলা হয়।
পাণ্ডুলিপি তাহক্বীক্ব বা সম্পাদনার গুরুত্ব:
- মূল লেখকের প্রকৃত রূপ পুনরুদ্ধার: অনুলিপিকারদের (কাতিব) অসাবধানতার কারণে মূল পাঠে যেসব ভুল, শব্দের বিকৃতি বা বাক্য বাদ পড়ে গিয়েছিল, তা একাধিক প্রাচীন কপির তুলনামূলক যাচাইয়ের মাধ্যমে লেখকের মূল বক্তব্যে ফিরিয়ে আনা।
- বিলুপ্তপ্রায় ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণ: পোকা-মাকড় ও কালের গর্ভে নষ্ট হয়ে যাওয়া দুর্লভ গ্রন্থাবলিকে উদ্ধার করে আধুনিক মুদ্রণরূপে প্রকাশ করা।
- উদ্ধৃতি ও সনদের সত্যতা যাচাই: পাণ্ডুলিপিতে উল্লিখিত বিভিন্ন হাদীস, আসার ও ঐতিহাসিক উদ্ধৃতির মূল উৎস চিহ্নিত করে তার ওপর টীকা প্রদান করা।
- পাঠকদের জন্য সহজলভ্যকরণ: প্রাচীন হাতের লেখা পড়া অত্যন্ত দুরূহ। সম্পাদক আধুনিক যতিচিহ্ন, অনুচ্ছেদ ও সূচিপত্র সংযোজন করে গ্রন্থটিকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রাঞ্জল করে তোলেন।
١٦- بين طرق استعمال علامات الترقيم ممثلا-
যতিচিহ্নের ব্যবহার পদ্ধতি উদাহরণসহ বর্ণনা কর।
ভূমিকা: গবেষণাপত্রের বক্তব্য সুস্পষ্ট করা, বাক্যের অর্থভেদ দূর করা এবং সঠিক ভাব প্রকাশের জন্য যতিচিহ্ন বা ‘আলামাতুত তারক্বীম’ (علامات الترقيم)-এর সঠিক ব্যবহার অপরিহার্য।
প্রধান যতিচিহ্নসমূহ ও তাদের ব্যবহারপদ্ধতি:
- কমা বা ফাসিলা (، / الفاصلة): বাক্যের মধ্যে স্বল্প বিরতি এবং পরস্পর সংযুক্ত একাধিক পদ বা খণ্ডবাক্যকে পৃথক করতে ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ: العلم نور، والجهل ظلام (জ্ঞান আলো, এবং অজ্ঞতা অন্ধকার)। - সেমিকোলন বা ফাসিলা মানকূতা (؛ / الفاصلة المنقوطة): দুটি বাক্যের মধ্যে যখন দ্বিতীয়টি প্রথমটির কারণ বা ফলাফল নির্দেশ করে, তখন এটি বসে।
উদাহরণ: اجتهد الطالب في دراسته؛ فنجح بتفوق (ছাত্রটি তার পড়াশোনায় কঠোর পরিশ্রম করেছিল; ফলে সে চমৎকারভাবে উত্তীর্ণ হলো)। - দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ বা নুকতাহ (. / النقطة): একটি সম্পূর্ণ বাক্যের সমাপ্তিতে পূর্ণ বিরতির জন্য ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ: القرآن الكريم كلام الله المعجز. - কোলন বা শারেহা (: / النقطتان الرأسيتان): কোনো উক্তি উদ্ধৃত করার পূর্বে কিংবা কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যা বা উদাহরণ উপস্থাপনের আগে বসে।
উদাহরণ: قال رسول الله ﷺ: «الدِّينُ النَّصِيحَةُ». - প্রশ্নবোধক চিহ্ন (؟ / علامة الاستفهام): কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা সূচক বাক্যের শেষে বসে।
উদাহরণ: هل قرأت هذا الكتاب؟ - উদ্ধৃতি চিহ্ন (« » / علامة التنصيص): হুবহু কোনো মূল নস, আয়াত, হাদীস বা অন্য গবেষকের বক্তব্য উদ্ধৃত করতে ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ: قال تعالى: ﴿إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ﴾.
١٧- ما الفرق بين رسالة الماجستير ورسالة الدكتور؟ بين-
মাস্টার্স ও পিএইচডি অভিসন্দর্ভের মধ্যে পার্থক্য কী? বর্ণনা কর।
ভূমিকা: উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার দুটি প্রধান স্তর হলো মাস্টার্স (এমফিল) এবং ডক্টরেট (পিএইচডি)। উভয়ের লক্ষ্য গবেষণা হলেও তাদের পরিধি ও মানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
মাস্টার্স ও পিএইচডি অভিসন্দর্ভের মধ্যকার তুলনামূলক পার্থক্য:
| পার্থক্যের বিষয় | মাস্টার্স অভিসন্দর্ভ (رسالة الماجستير) | পিএইচডি অভিসন্দর্ভ (رسالة الدكتوراه) |
|---|---|---|
| গবেষণার মূল লক্ষ্য | গবেষণা পদ্ধতির প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের ওপর উপাত্তের সুশৃঙ্খল বিন্যাস করা। | জ্ঞানের জগতে সম্পূর্ণ নতুন আবিষ্কার (Original contribution to knowledge) বা মৌলিক তত্ত্ব উদ্ভাবন করা। |
| গবেষণার পরিধি ও গভীরতা | পরিধি অপেক্ষাকৃত সীমিত এবং বিদ্যমান তত্ত্ব ও তথ্যের পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের ওপর জোর দেওয়া হয়। | পরিধি অত্যন্ত সুবিশাল, গভীর এবং কোনো বিষয়ের ওপর একচ্ছত্র বিশেষজ্ঞমূলক চুলচেরা বিশ্লেষণ আবশ্যক। |
| সময়কাল | সাধারণত ১ থেকে ২ বছরের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়। | সাধারণত ৩ থেকে ৫ বছর বা ততোধিক দীর্ঘ সময় ব্যাপী গবেষণা করতে হয়। |
| ইজতিহাদী ক্ষমতা | গবেষকের নিজস্ব রায় ও সিদ্ধান্তের পরিধি সীমিত থাকে। | গবেষকের স্বাধীন বিচারবুদ্ধি, ইজতিহাদ এবং নতুন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া বাধ্যতামূলক। |
| উৎস ব্যবহারের মাত্রা | সহায়ক গ্রন্থ ও পরিচিত উৎসের ওপর নির্ভর করে প্রস্তুত করা যায়। | দুর্লভ প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও অপ্রকাশিত মৌলিক উৎসের সরাসরি ব্যবহার অপরিহার্য। |
١٨- اذكر كيفية استخدام المكتبة لجمع المعلومات موجزا-
তথ্য সংগ্রহের জন্য লাইব্রেরি ব্যবহারের পদ্ধতি সংক্ষেপে আলোচনা কর।
ভূমিকা: লাইব্রেরি বা পাঠাগার হলো গবেষকের মূল কর্মশালা। আধুনিক লাইব্রেরির বিশাল তথ্যভাণ্ডার থেকে কাঙ্ক্ষিত তথ্য স্বল্প সময়ে ও কার্যকরভাবে খুঁজে পেতে লাইব্রেরি ব্যবহারের নিয়ম জানা আবশ্যক।
তথ্য সংগ্রহের জন্য লাইব্রেরি ব্যবহারের সুশৃঙ্খল পদ্ধতি:
- ১. ক্যাটালগ ও ইনডেক্সিং সিস্টেমের ব্যবহার: লাইব্রেরিতে প্রবেশ করে সরাসরি শেলফে খোঁজাখুঁজি না করে কার্ড ক্যাটালগ (Card Catalog) অথবা কম্পিউটারাইজড অনলাইন ক্যাটালগ (OPAC) ব্যবহার করে বইয়ের কল নম্বর (Call Number) ও শেলফ অবস্থান নির্ণয় করা।
- ২. রেফারেন্স সেকশন পরিদর্শন: বিশ্বকোষ (Encyclopedia), অভিধান (Dictionary) এবং গ্রন্থপঞ্জি (Bibliography) বিভাগে গিয়ে মূল বিষয়ের ওপর প্রাথমিক ধারণা ও সংশ্লিষ্ট বইয়ের তালিকা প্রস্তুত করা।
- ৩. সাময়িকী ও জার্নাল বিভাগ ব্যবহার: সাম্প্রতিক গবেষণা ও প্রবন্ধের জন্য কারেন্ট পিরিওডিক্যালস ও জার্নাল ইনডেক্স অনুসন্ধান করা।
- ৪. ডিজিটাল রিসোর্স ও ই-লাইব্রেরির সহায়তা গ্রহণ: আধুনিক লাইব্রেরির সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক ই-বুক ডাটাবেজ ও অনলাইন থিসিস রিপোজিটরি ব্যবহার করা।
- ৫. লাইব্রেরিয়ান ও তথ্যকর্মীর পরামর্শ গ্রহণ: দুর্লভ পাণ্ডুলিপি বা নির্দিষ্ট কোনো তথ্যের অবস্থান জানতে অভিজ্ঞ লাইব্রেরি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা গ্রহণ করা।
- ৬. সুশৃঙ্খল নোট ও ফটোকপি সংরক্ষণ: প্রয়োজনীয় অংশ চিহ্নিত করে লাইব্রেরির বিধিমোতাবেক নোট লিপিবদ্ধ করা অথবা ফটোকপি ও ডিজিটাল স্ক্যান সেবা গ্রহণ করা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ফাজিল ৪র্থ বর্ষের মানাহিজুল মুফাসসিরীন ও মানাহিজুল বাহাছ পরীক্ষার বিষয় কোড কত?
উত্তর: এই কোর্সের বিষয় কোড হলো 201406 এবং প্রশ্নপত্র কোড হলো 152।
প্রশ্ন ২: এই প্রশ্নপত্রের পূর্ণমান ও সময় বণ্টন কেমন?
উত্তর: পরীক্ষার পূর্ণমান ৮০ নম্বর এবং নির্ধারিত সময় ৪ ঘণ্টা। প্রশ্নপত্রটি দুটি স্বতন্ত্র অংশে বিভক্ত—প্রথম অংশ: মানাহিজুল মুফাসসিরীন (৪০ নম্বর) এবং দ্বিতীয় অংশ: মানাহিজুল বাহাছ (৪০ নম্বর)।
প্রশ্ন ৩: তাফসির বিল মা’ছুর এবং তাফসির বির রায়ের মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: তাফসির বিল মা’ছুর হলো কুরআন, সুন্নাহ এবং সাহাবা-তাবেয়ীগণের নির্ভরযোগ্য বর্ণনার ওপর প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যা; আর তাফসির বির রায় হলো শরীয়তের মূলনীতি ও আরবি ব্যাকরণ অনুসরণ করে গবেষকের ব্যক্তিগত ইজতিহাদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যা।
প্রশ্ন ৪: আল-কাশশাফ ও তাফসিরে বায়যাবীর প্রধান আকীদাগত বৈসাদৃশ্য কী?
উত্তর: যামাখশারী তাঁর ‘আল-কাশশাফ’ গ্রন্থে মু’তাযিলা মতাদর্শের সমর্থনে আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন, পক্ষান্তরে কাজী বায়যাবী তাঁর গ্রন্থে যামাখশারীর মু’তাযিলা ব্যাখ্যা খণ্ডন করে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের আশ’আরী আকীদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
প্রশ্ন ৫: পাণ্ডুলিপি তাহক্বীক্ব (সম্পাদনা) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: প্রাচীনকালে হস্তলিখিত কোনো গ্রন্থের অনুলিপিকারদের ভুলত্রুটি ও বিকৃতি একাধিক পাণ্ডুলিপির তুলনামূলক পর্যালোচনার মাধ্যমে দূর করে মূল লেখকের প্রকৃত বক্তব্য ও রূপ পুনরুদ্ধার করার বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকে পাণ্ডুলিপি তাহক্বীক্ব বলা হয়।
প্রশ্ন ৬: গবেষণায় المصادر (মাসাদির) এবং المراجع (মারাজি)-এর তফাত কী?
উত্তর: ‘আল-মাসাদির’ হলো গবেষণার মৌলিক বা প্রাথমিক উৎস (যেমন কুরআন ও হাদীসের মূল গ্রন্থ), আর ‘আল-মারাজি’ হলো সেই মৌলিক উৎসের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী গবেষকদের রচিত সহায়ক বা দ্বিতীয় স্তরের ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
উপসংহার ও পরীক্ষার প্রস্তুতি পরামর্শ
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের “মানাহিজুল মুফাসসিরীন ওয়া মানাহিজুল বাহাছ” (বিষয় কোড: 201406) একটি অত্যন্ত মানসম্পন্ন এবং ভবিষ্যৎ গবেষক তৈরির সহায়ক কোর্স। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের তাফসিরের স্তরসমূহ, বিখ্যাত মুফাসসিরদের কর্মপদ্ধতি এবং আধুনিক গবেষণা পদ্ধতির প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে আত্মস্থ করতে হবে। উভয় অংশের ভারসাম্য রক্ষা করে উত্তর প্রদান করলে পরীক্ষায় অনন্য ফলাফল অর্জন নিশ্চিত হবে ইনশাআল্লাহ।