ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2022
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: আধুনিক মিশর ও সুদানের ইতিহাস
বিষয় কোড: 205305 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি
১. নেপোলিয়ন বোনাপার্ট কর্তৃক মিশর বিজয় সংক্ষেপে আলোচনা কর এবং মিশরের আধুনিকীকরণে ফরাসীদের অবদান মূল্যায়ন কর।
[Briefly discuss the conquest of Egypt by Nepoleon Bonaparte and evaluate the French contributions to modernizing Egypt.]
ক. নেপোলিয়নের মিশর অভিযান ও বিজয় (১৭৯৮):
ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভারতীয় বাণিজ্য পথ বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে ১৭৯৮ সালের মে মাসে প্রায় ৪০০ যুদ্ধজাহাজ এবং ৩৬,০০০ সৈন্য নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেন। ১ জুলাই ১৭৯৮ তারিখে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় অবতরণ করেন এবং ২১ জুলাই বিখ্যাত ‘পিরামিডের যুদ্ধে’ (Battle of the Pyramids) মধ্যযুগীয় ধারায় যুদ্ধরত মামলুক সেনাপতি মুরাদ বে ও ইব্রাহিম বেকে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলন্দাজ বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্বে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে কায়রো অধিকার করেন।
খ. মিশরের আধুনিকীকরণে ফরাসিদের ঐতিহাসিক অবদান:
- বিজ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্তি ও ‘ইনস্টিটিউট ডি ইজিপ্ট’: নেপোলিয়নের সাথে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি ১৬৭ জন শীর্ষস্থানীয় ফরাসি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, গণিতবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক কায়রোতে এসেছিলেন। তিনি কায়রোতে ‘Institut d’Egypte’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা মিশরে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করে।
- রোসেটা স্টোন ও প্রাচীন হায়ারোগ্লিফিক পাঠোদ্ধার: ১৭৯৯ সালে ফরাসি ক্যাপ্টেন পিয়ের বুশার রশিদ (রোসেটা) দুর্গে একটি কালো ব্যাসল্ট পাথর আবিষ্কার করেন, যা ‘রোসেটা স্টোন’ (Rosetta Stone) নামে বিশ্বখ্যাত। এতে প্রাচীন গ্রিক ও হায়ারোগ্লিফিক লিপির সমন্বয় ছিল। পরবর্তীতে ১৮২২ সালে ফরাসি পণ্ডিত জ্যাঁ ফ্রাঁসোয়া শাঁপোলিয়ঁ এর পাঠোদ্ধার করে প্রাচীন ফারাও যুগের মিশরীয় ইতিহাসের বিস্ময়কর দুয়ার উন্মোচন করেন।
- ‘ডেসক্রিপশন ডি ইজিপ্ট’ (Description de l’Egypte): ফরাসি বিশেষজ্ঞরা মিশরের ভূগোল, উদ্ভিদ, প্রাণী, প্রাচীন স্মৃতিসৌধ এবং সমাজব্যবস্থা নিয়ে ২০ খণ্ডের সুবিশাল গবেষণামূলক বিশ্বকোষ রচনা করেন, যা আধুনিক মিশরতত্ত্বের (Egyptology) জন্ম দেয়।
- প্রশাসনিক ও চিকিৎসা সংস্কার: ফরাসিরা প্রথম আধুনিক কায়রো পৌরসভা বা ‘দিওয়ান’ গঠন করে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা দেয়। কায়রোতে প্রথম আধুনিক হাসপাতাল ও মহামারী প্লেগ নিয়ন্ত্রণের স্যানিটেশন ব্যবস্থা চালু করে।
- সুয়েজ খালের প্রাথমিক সমীক্ষা ও আরবি মুদ্রণযন্ত্র: নেপোলিয়নের প্রকৌশলীরাই প্রথম লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করতে খাল খননের আধুনিক ভৌগোলিক সম্ভাব্যতা যাচাই করেন। এ ছাড়া নেপোলিয়ন প্রথম আরবি হরফের আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র মিশরে আনয়ন করেন।
২. আধুনিক মিশরের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মুহাম্মদ আলী পাশার কৃতিত্ব পর্যালোচনা কর।
[Review the achievement of Mohammad Ali Pasha as a founder of modern Egypt.]
ক. ভূমিকা:
ফরাসিদের বিদায়ের পর উসমানীয় সেনাবাহিনীর আলবেনীয় কর্মকর্তা মুহাম্মদ আলী পাশা (১৭৬৯-১৮৪৯) তাঁর অপরিসীম মেধা, সামরিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে ১৮০৫ সালে মিশরের শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম মহান সংস্কারক। মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ধ্বংস করে তিনি একটি শক্তিশালী স্বয়ংসম্পূর্ণ আধুনিক রাষ্ট্র গঠন করেন বিধায় তাঁকে সর্বসম্মতিক্রমে ‘আধুনিক মিশরের প্রতিষ্ঠাতা’ বলা হয়।
খ. তাঁর বহুমুখী কৃতিত্ব ও অবদান:
- মামলুকদের সমূলে বিনাশ (১৮১১): কায়রোর দুর্গে এক সুপরিকল্পিত অভিযানে ৫০০ মামলুক সর্দারকে হত্যা করে তিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা প্রতিক্রিয়াশীল সামন্ততন্ত্রের চির অবসান ঘটান।
- সামরিক আধুনিকায়ন (নিজাম-ই জাদিদ): ফরাসি সামরিক উপদেষ্টা কর্নেল সেভেসের (সুলেমান পাশা) সহায়তায় স্থানীয় মিশরীয় ফেল্লাহিন (কৃষক)-দের নিয়ে আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। আলেকজান্দ্রিয়ায় নৌ-ঘাঁটি ও জাহাজ নির্মাণ কারখানা এবং কায়রোতে অস্ত্র-বারুদের কারখানা স্থাপন করেন।
- কৃষি বিপ্লব ও লম্বা আঁশের তুলা: ১৮২০ সালে ফরাসি প্রকৌশলী লুই জুমেলের উদ্ভাবিত দীর্ঘ আঁশের উৎকৃষ্ট তুলা (Jumel Cotton) চাষ বাধ্যতামূলক করেন। এ তুলা ইউরোপের টেক্সটাইল কারখানায় বিপুল মূল্যে বিক্রি হয়ে মিশরের বৈদেশিক আয়ের মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়। সেচের জন্য তিনি ডেল্টা ব্যারেজ ও মাহমুদিয়া খাল খনন করেন।
- রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থা (Monopoly): অভ্যন্তরীণ জমিদারি ও ব্যক্তিমালিকানা বিলোপ করে সমস্ত কৃষিপণ্য ও বাণিজ্যের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, যার ফলে অর্জিত বিপুল রাজস্ব দিয়ে আধুনিকায়নের ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হয়।
- শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ: প্যারিসে শত শত মেধাবী মিশরীয় ছাত্রকে পাঠিয়ে উচ্চশিক্ষিত মানবসম্পদ গড়ে তোলেন। কায়রোতে আধুনিক মেডিকেল কলেজ (ডা. ক্লোট বের নেতৃত্বে), ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল এবং ১৮২২ সালে বিখ্যাত ‘বুলাক প্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮২৮ সালে প্রথম সরকারি গেজেট ‘আল-ওয়াকায়িল মিসরিয়াহ’ প্রকাশ করেন।
৩. খেদিভ ইসমাইলের সংস্কারসমূহ আলোচনা কর। তিনি কি মিশরের অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের জন্য দায়ী ছিলেন?
[Discuss the reforms introduced by Khedive Ismail. Was he responsible for the economic bankruptcy of Egypt?]
ক. খেদিভ ইসমাইলের আধুনিকায়ন সংস্কারসমূহ (১৮৬৩-১৮৭৯):
খেদিভ ইসমাইল পাশা মিশরকে সম্পূর্ণ ইউরোপীয় ধাঁচে সাজাতে চেয়েছিলেন। তাঁর প্রধান সংস্কারসমূহ ছিল:
- সুয়েজ খালের ঐতিহাসিক সমাপ্তি ও উদ্বোধন (১৮৬৯): ফরাসি প্রকৌশলী ফার্দিনান্দ ডি লেসেপসের খাল খনন প্রকল্প সম্পন্ন করে ১৮৬৯ সালে সমগ্র ইউরোপের সম্রাট, রানি ও রাজন্যবর্গকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সুয়েজ খাল উদ্বোধন করেন।
- নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামো: কায়রোকে ‘নীল নদের প্যারিস’ বানাতে আধুনিক চওড়া রাজপথ, গ্যাসবাতি, সেতু, কায়রো অপেরা হাউস এবং বিলাসবহুল আবদিন প্রাসাদ নির্মাণ করেন। ৪,৫০০ মাইলের বেশি আধুনিক টেলিগ্রাফ লাইন এবং ১,২০০ মাইল রেলপথ স্থাপন করেন।
- শিক্ষা ও বিচার সংস্কার: মেয়েদের জন্য প্রথম আধুনিক বিদ্যালয় (আস-সুয়ুফিয়া) প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৮৭৫ সালে মিশরীয় ও ইউরোপীয়দের বিরোধ নিষ্পত্তিতে ‘মিক্সড কোর্টস’ (Mixed Courts) প্রবর্তন করেন।
খ. অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও ইসমাইলের দায় মূল্যায়ন:
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট যে মিশরের অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের জন্য খেদিভ ইসমাইল প্রধানত দায়ী ছিলেন, যদিও ইউরোপীয় মহাজনদের ধূর্ততাও কম দায়ী ছিল না:
- তুলার দাম ধস ও অপরিণামদর্শী বৈদেশিক ঋণ: আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় মিশরীয় তুলার আকাশচুম্বী দাম দেখে ইসমাইল ভাবেন এ সমৃদ্ধি চিরকাল থাকবে। যুদ্ধ শেষে মার্কিন তুলা বাজারে ফিরলে তুলার দাম ধসে পড়ে। কিন্তু ইসমাইল তাঁর অপব্যয় না কমিয়ে ইউরোপীয় বেসরকারি ব্যাংক ও মহাজনদের কাছ থেকে ১২% থেকে ৩০% চড়া চক্রবৃদ্ধি সুদে ঋণ নেওয়া অব্যাহত রাখেন।
- বিলাসবহুল অপব্যয়: সুয়েজ খালের উদ্বোধনী জলসায় তিনি প্রায় ২০ লক্ষ পাউন্ড অপচয় করেন। তাঁর রাজকীয় হারেম, প্রাসাদ ও ইউরোপীয় আমোদপ্রমোদে রাষ্ট্রের কোষাগার শূন্য হয়ে যায়। ১৮৭৬ সালের মধ্যে মিশরের জাতীয় ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি পাউন্ডে পৌঁছায়, যার বার্ষিক সুদ দেওয়াই মিশরের মোট বার্ষিক আয়ের চেয়ে বেশি ছিল।
- সুয়েজ খালের শেয়ার বিক্রি ও কায়েস ডি লা দেত: ঋণ পরিশোধের দায়ে ১৮৭৫ সালে ইসমাইল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডিজরেইলির কাছে মাত্র ৪০ লক্ষ পাউন্ডে সুয়েজ খালের ৪৪% মিশরীয় শেয়ার বিক্রি করেন। ১৮৭৬ সালে দেশ দেউলিয়া ঘোষিত হয় এবং অ্যাংলো-ফরাসি দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ পরিষদ (Caisse de la Dette Publique) বসানো হয়। পরিশেষে ১৮৭৯ সালে সুলতানের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে ১৮৮২ সালে ব্রিটিশরা প্রত্যক্ষভাবে মিশর দখল করে। অতএব, দূরদর্শিতাহীন বিলাসী ঋণের কারণে ইসমাইল দেউলিয়াত্বের ঐতিহাসিক দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
৪. সাদ জগলুল পাশার পরিচয় দাও। মিশরের সাংবিধানিক আন্দোলনে তাঁর ওয়াফদ পার্টির ভূমিকা নিরূপণ কর।
[Introduce Saad Zaglul Pasha. Determine the role of his Wafd Party in the constitutional movement of Egypt.]
ক. সাদ জগলুল পাশার পরিচয়:
সাদ জগলুল পাশা (১৮৫৯-১৯২৭) ছিলেন আল-আজহার ও কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত প্রখ্যাত মিশরীয় ফেল্লাহিন বংশোদ্ভূত আইনজীবী, বিচারক, জাতীয়তাবাদী নেতা এবং মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিক জাতীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি জামালুদ্দিন আফগানি ও মুহাম্মদ আবদুহর আধুনিক সংস্কারচিন্তায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তাঁকে আধুনিক মিশরের ‘জাতির পিতা’ (Za’im al-Ummah) বলা হয়।
খ. ওয়াফদ পার্টির উৎপত্তি ও ১৯১৯ সালের বিপ্লব:
- ‘আল-ওয়াফদ আল-মিসরি’ গঠন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ১৯১৮ সালের ১৩ নভেম্বর সাদ জগলুল পাশা তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে ব্রিটিশ হাই কমিশনার স্যার রেজিনাল্ড উইনগেটের সাথে দেখা করে প্যারিস শান্তি সম্মেলনে মিশরের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি পেশ করার অনুমতি চান। এ প্রতিনিধি দলকে আরবিতে ‘ওয়াফদ’ (Wafd – প্রতিনিধি দল) বলা হয়, যা পরবর্তীতে মিশরের সবচেয়ে জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলে রূপ নেয়।
- নির্বাসন ও ১৯১৯ সালের গণবিপ্লব: ব্রিটিশরা জগলুল ও তাঁর তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করে মাল্টা দ্বীপে নির্বাসিত করলে সমগ্র মিশরে ১৯১৯ সালের ৯ মার্চ সর্বাত্মক রক্তক্ষয়ী গণবিপ্লব শুরু হয়। ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, আইনজীবী এবং মুসলিম ও কপটিক খ্রিস্টানরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসে। নারীরাও বোরকা পরিধান করে মিছিলে শামিল হন। বাধ্য হয়ে ব্রিটিশরা জগলুলকে মুক্তি দেয়।
গ. সাংবিধানিক আন্দোলনে ভূমিকা ও ১৯২৩ সালের সংবিধান:
- একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা (১৯২২): ওয়াফদ পার্টির আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে ব্রিটিশ সরকার ১৯২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মিশরকে শর্তসাপেক্ষ ‘সার্বভৌম রাজতন্ত্র’ ঘোষণা করে।
- ১৯২৩ সালের উদার সংবিধান: ওয়াফদ পার্টির চাপে প্রণীত হয় ঐতিহাসিক ১৯২৩ সালের সংবিধান, যেখানে রাজার ক্ষমতা সীমিত করে একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাঠামো দেওয়া হয়।
- ঐতিহাসিক নির্বাচন ও জগলুলের সরকার (১৯২৪): ১৯২৪ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ওয়াফদ পার্টি সংসদের ৯০% আসন লাভ করে একচ্ছত্র বিজয় অর্জন করে এবং সাদ জগলুল প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যান এবং মিশরে সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেন।
৫. ১৯৩৬ সালের ইঙ্গ-মিশরীয় চুক্তির বিবরণ দাও। এ চুক্তি থেকে কী মিশরীয়রা প্রকৃত স্বাধীনতা পেয়েছিল?
[Give an account of the Anglo-Egyptian Treaty of 1936. Did the Egyptians get real independence from this treaty?]
ক. চুক্তির প্রেক্ষাপট ও মূল শর্তাবলি:
১৯৩৫ সালে ইতালির ফ্যাসিবাদী একনায়ক মুসোলিনি কর্তৃক আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া) দখলের পর মিশরে ব্রিটিশ ও মিশরীয় উভয় পক্ষই অভিন্ন সামরিক সহযোগিতার প্রয়োজন অনুভব করে। ১৯৩৬ সালের ২৬ আগস্ট লন্ডনে ওয়াফদীয় প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা আন-নাহাস পাশা এবং ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ইডেনের মধ্যে ২০ বছর মেয়াদি এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
- শর্তাবলি: কায়রো ও আলেকজান্দ্রিয়া থেকে ব্রিটিশ সৈন্য প্রত্যাহার করে শুধুমাত্র সুয়েজ খাল অঞ্চলে ১০,০০০ সেনা ও ৪০০ বিমানে সীমাবদ্ধ রাখা। আন্তর্জাতিক যুদ্ধাবস্থায় মিশর তার সমস্ত বন্দর ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্রিটিশদের ছেড়ে দেবে। সুদানে ১৮৯৯ সালের ইঙ্গ-সুদানি দ্বৈত শাসন বহাল রাখা। ইউরোপীয়দের ক্যাপিচুলেশন অধিকার বিলোপে সাহায্য করা এবং মিশরের লিগ অব নেশনস-এর সদস্যপদ নিশ্চিত করা।
খ. মিশরীয়রা কি প্রকৃত স্বাধীনতা পেয়েছিল?
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে এটি নিশ্চিত যে এ চুক্তি থেকে মিশরীয়রা কোনো প্রকৃত স্বাধীনতা পায়নি, বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক শৃংখলের একটি নবায়ন মাত্র:
- নিজ ভূখণ্ডে বিদেশি সেনা বহাল: দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল সুয়েজ খাল অঞ্চলে ব্রিটিশ সৈন্য পাহারা বহাল থাকা সার্বভৌমত্বের সরাসরি লঙ্ঘন ছিল।
- ১৯৪২ সালের আবদিন প্রাসাদের ঘটনা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২ তারিখে ব্রিটিশ ট্যাঙ্ক কায়রোর আবদিন প্রাসাদ ঘেরাও করে রাজা ফারুককে বন্দুকের মুখে নাহাস পাশাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগে বাধ্য করে। এটি প্রমাণ করে যে মিশরের স্বাধীনতা ছিল কেবল কাগুজে।
- সুদানে অধিকার খর্ব: নীল উপত্যকার ঐক্যের যে দাবি মিশর করত, এ চুক্তি তা নস্যাৎ করে সুদানে ব্রিটিশদের একক আধিপত্য নিশ্চিত করেছিল। ফলে ১৯৫১ সালে নাহাস পাশা একতরফাভাবে এ চুক্তি বাতিল ঘোষণা করেন।
৬. সুদানে ইঙ্গ-মিশরীয় যৌথ শাসনের উৎস ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।
[Discuss the origin and evolution of joint rule of Anglo-Egyptian in Sudan.]
ক. যৌথ শাসনের উৎস (১৮৯৯ সালের কন্ডোমিনিয়াম চুক্তি):
১৮৮৫ সালে মাহদীবাদী বিপ্লবীরা ব্রিটিশ সেনাপতি জেনারেল গর্ডনকে হত্যা করে সুদান থেকে বিদেশি আধিপত্য উচ্ছেদ করেছিল। ১৮৯৮ সালে ওমদুরমানের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লর্ড কিচেনার মাহদীবাদী বাহিনীকে পরাস্ত করে সুদান পুনঃদখল করেন। ১৮৯৯ সালের ১৯ জানুয়ারি লর্ড ক্রমার এবং মিশরীয় সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় কুখ্যাত ‘ইঙ্গ-সুদানি কন্ডোমিনিয়াম বা দ্বৈত শাসন’ চুক্তি।
খ. দ্বৈত শাসনের ক্রমবিকাশ ও স্বরূপ:
- নামেমাত্র দ্বৈত শাসন, নিরঙ্কুশ ব্রিটিশ কর্তৃত্ব: চুক্তির বিধান ছিল সুদানের সরকারি ভবনে ব্রিটিশ ও মিশরীয় উভয় পতাকা পাশাপাশি উড়বে এবং পদবি হবে যৌথ। কিন্তু বাস্তবে সুদানের সর্বোচ্চ শাসক ‘গভর্নর জেনারেল’ হতেন একজন ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা। সমস্ত সামরিক ও বেসামরিক শীর্ষ পদ ব্রিটিশদের হাতে ছিল। মিশরকে কেবল অর্থ জোগান দেওয়া এবং নিম্নস্তরের কেরানি ও সাধারণ সৈন্য প্রেরণের কাজে ব্যবহার করা হতো।
- ১৯২৪ সালের স্যার লি স্ট্যাক হত্যাকাণ্ড ও মিশরীয়দের বিতাড়ন: ১৯২৪ সালে কায়রোতে সুদানের ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল স্যার লি স্ট্যাক জাতীয়তাবাদীদের গুলিতে নিহত হলে লর্ড অ্যালেনবি চরম প্রতিশোধ নেন। তিনি সুদান থেকে সমস্ত মিশরীয় অফিসার ও সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করেন। এর ফলে দ্বৈত শাসন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং সুদান সম্পূর্ণ ব্রিটিশ ক্রাউন কলোনির রূপ নেয়।
- দক্ষিণ সুদান নীতি (Closed District Ordinance – ১৯২২): ব্রিটিশরা দক্ষিণ সুদানকে একটি ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ ঘোষণা করে সেখানে আরবি ভাষা ও ইসলাম প্রচার নিষিদ্ধ করে এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ সুদানকে উত্তর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে, যা পরবর্তীতে স্বাধীন সুদানে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের মূল বীজ বপন করেছিল।
৭. সুদানের মাহদী আন্দোলন বিশ্লেষণ কর এবং এ আন্দোলনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর।
[Analyse the Mahdiya Movement of Sudan and explain the significance of this movement.]
ক. আন্দোলনের কারণ ও পটভূমি:
১৮২১ সালে মুহাম্মদ আলী পাশার সুদান বিজয়ের পর থেকে তুর্কি-মিশরীয় শাসন (তুর্কিয়া) সুদানে সীমাহীন অত্যাচার, উচ্চ করের বোঝা এবং স্থানীয় ঐতিহ্যকে অবমাননা করছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ খ্রিস্টান কর্মকর্তাদের আধিপত্য সুদানের ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এ প্রেক্ষাপটে সুফি সাধক মুহাম্মদ আহমদ (১৮৪৪-১৮৮৫) ১৮৮১ সালের জুন মাসে নিজেকে শেষ যুগের ‘প্রতিশ্রুত মাহদী’ ঘোষণা করে বিদেশি অপশাসনের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দেন। তাঁর অনুসারীদের ‘আনসার’ (Ansar) বলা হতো।
খ. সামরিক অভিযান ও খার্তুম বিজয়:
- শায়কান যুদ্ধ (১৮৮৩): ব্রিটিশ কর্নেল উইলিয়াম হিকসের নেতৃত্বাধীন ১০,০০০ আধুনিক মিশরীয় বাহিনীকে মাহদীর আনসাররা বর্শা ও তরবারি নিয়ে আক্রমণ করে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
- খার্তুম অবরোধ ও গর্ডন হত্যা (১৮৮৫): ১৮৮৫ সালের ২৬ জানুয়ারি মাহদীবাদী বাহিনী খার্তুম দখল করে এবং ঔপনিবেশিক গভর্নর জেনারেল চার্লস জর্জ গর্ডনকে হত্যা করে ওমদুরমানকে রাজধানী করে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করে।
গ. মাহদী আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য:
- ঔপনিবেশিকতাবিরোধী প্রথম সফল আফ্রিকান প্রতিরোধ: উনিশ শতকের ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের চরম উত্থানকালে কোনো আফ্রিকান মুসলিম জাতি কর্তৃক পরাশক্তি ব্রিটেনকে সামরিকভাবে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র কায়েম করার এটিই ছিল একমাত্র অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।
- সুদানি জাতীয় চেতনার জন্ম: বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী উপজাতি ও অঞ্চলকে একটি একক জাতীয় পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করে আধুনিক সুদানি জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি রচনা করেছিল এ আন্দোলন।
৮. স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সুদানের অভ্যুদয়ের ইতিহাস আলোচনা কর।
[Discuss the history of the emergence of Sudan as an independent and Sovereign state.]
ক. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাতীয়তাবাদী জাগরণ:
১৯৩৮ সালে গর্ডন কলেজের শিক্ষিত তরুণদের দ্বারা গঠিত ‘গ্র্যাজুয়েটস জেনারেল কংগ্রেস’ সুদানের স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক সূচনা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সুদানে দুটি প্রধান রাজনৈতিক ধারা তৈরি হয়—ইসমাইল আল-আজহারীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ইউনিয়নিস্ট পার্টি (NUP) যারা মিশরের সাথে ঐক্যে বিশ্বাসী ছিল এবং ইমাম আব্দুর রহমান আল-মাহদীর নেতৃত্বাধীন উম্মা পার্টি যারা পূর্ণ স্বাতন্ত্র্যবাদী স্বাধীনতার দাবিদার ছিল।
খ. মিশরের বিপ্লব ও ১৯৫৩ সালের স্বায়ত্তশাসন চুক্তি:
১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই মিশরে নাসের ও নজিবের ফ্রি অফিসার্স বিপ্লব ঘটলে কায়রোর নীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। নাসের সুদানের ওপর ঐতিহ্যবাহী মিশরীয় দাবি শিথিল করেন। ১৯৫৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ব্রিটেন ও মিশরের মধ্যে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে সুদানকে তিন বছরের অন্তর্বর্তীকালীন স্বায়ত্তশাসন এবং পরবর্তীতে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়।
গ. ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি: স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা:
- আজহারীর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: ১৯৫৩ সালের নির্বাচনে বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল আল-আজহারী মিশরের সাথে একীভূত হওয়ার পূর্ব প্রতিশ্রুতি বাদ দিয়ে সুদানি জনমতের বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়ে পূর্ণ স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত নেন।
- সংসদে স্বাধীনতার প্রস্তাব: ১৯৫৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর সুদানের জাতীয় সংসদ সর্বসম্মতিক্রমে সুদানকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র ঘোষণার ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস করে। ব্রিটেন ও মিশর এ দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।
- সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ: ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি খার্তুমের গভর্নমেন্ট হাউজে ব্রিটিশ ও মিশরীয় পতাকা নামিয়ে সুদানের স্বাধীন তিন রঙের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন সার্বভৌম সুদান প্রজাতন্ত্রের জন্ম হয়।
খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি
৯. আধুনিক মিশরের ভৌগোলিক ইতিহাস আলোচনা কর।
[Discuss the geographical history of modern Egypt.]
মিশর আফ্রিকা ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি আন্তঃমহাদেশীয় কৌশলগত রাষ্ট্র। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস যথার্থই বলেছেন: “Egypt is the gift of the Nile” (মিশর নীল নদের দান)।
- নীল উপত্যকা ও ব-দ্বীপ: মিশরের প্রায় ৯৬% এলাকা মরুভূমি (সাহারা ও সিনাই)। কিন্তু নীল নদের অববাহিকা ও উত্তরাঞ্চলীয় ডেল্টা অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম উর্বর কৃষিভূমি, যেখানে দেশটির ৯৫% মানুষ বসবাস করে।
- সুয়েজ খাল ও সিনাই উপদ্বীপ: এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত সিনাই উপদ্বীপ এবং ১৮৬৯ সালে খননকৃত সুয়েজ খালের কারণে এটি ইউরোপ, এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের বিশ্বের অন্যতম প্রধান চোকপয়েন্টে পরিণত হয়েছে।
১০. আধুনিক মিশরের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মোহাম্মদ আলী পাশার কৃতিত্ব বিচার কর।
[Justify Muhammad Ali Pasha as a founder of Modern Egypt.]
মুহাম্মদ আলী পাশাকে (১৮০৫-১৮৪৯) আধুনিক মিশরের প্রতিষ্ঠাতা বলার প্রধান কারণসমূহ:
- তিনি শত বছরের দুর্নীতিগ্রস্ত মামলুক সামন্ততন্ত্র ধ্বংস করে একটি সুশৃঙ্খল কেন্দ্রীয় ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসন কায়েম করেন।
- ইউরোপীয় ধাঁচে আধুনিক শক্তিশালী সেনাবাহিনী, অস্ত্র কারখানা ও নৌবহর তৈরি করে অটোমান সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের শক্তি অর্জন করেন।
- লম্বা আঁশের তুলা চাষ ও সেচ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করে জাতীয় অর্থনীতির মজবুত বুনিয়াদ গড়েন।
- মেডিকেল কলেজ, বুলাক প্রেস ও ফ্রান্সে শিক্ষা মিশন পাঠিয়ে আধুনিক বুদ্ধিজীবী শ্রেণি সৃষ্টি করেন। তাঁর হাত ধরেই মধ্যযুগ থেকে মিশর আধুনিক যুগে প্রবেশ করেছিল।
১১. ১৯৫৬ সালে সুয়েজখাল জাতীয়করণের প্রেক্ষাপট আলোচনা কর।
[Discuss the background of the nationalization of the Suez Canal.]
১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই আলেকজান্দ্রিয়ার এক জনসভায় প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। এর প্রেক্ষাপট:
- আসওয়ান বাঁধ ঋণের প্রত্যাহার: নীল নদে সুবিশাল আসওয়ান উচ্চ বাঁধ নির্মাণের জন্য আমেরিকা ও বিশ্বব্যাংক প্রাথমিক ঋণ অনুমোদনের পর মিশরের স্বাধীন জোটনিরপেক্ষ নীতি ও কমিউনিস্ট চেকোস্লোভাকিয়ার সাথে অস্ত্র চুক্তির অজুহাতে ১৯৫৬ সালের জুলাইয়ে হঠাৎ ঋণ প্রত্যাহার করে নেয়।
- জাতীয় আত্মমর্যাদা ও আর্থিক বিকল্প: ক্ষুব্ধ নাসের ঘোষণা করেন যে মিশরীয়দের রক্ত-ঘামে খননকৃত সুয়েজ খালের বার্ষিক বিপুল রাজস্ব দিয়েই মিশর নিজস্ব অর্থায়নে আসওয়ান বাঁধ নির্মাণ করবে। ফলে তিনি কোম্পানির সব শেয়ার জাতীয়করণ করেন। এর জের ধরেই পরবর্তীতে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরাইল যৌথভাবে সুয়েজ আক্রমণ চালায়।
১২. নাসেরবাদ বলতে কী বোঝ? আলোচনা কর।
[What do you mean by Nasserism? Discuss.]
মিশরীয় প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসেরের (১৯১৮-১৯৭০) রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মতাদর্শকে সামগ্রিকভাবে ‘নাসেরবাদ’ (Nasserism) বলা হয়। এর মূল স্তম্ভসমূহ হলো:
- প্যান-আরবিজম (Pan-Arabism): মরক্কো থেকে ইরাক পর্যন্ত সমগ্র আরব জাতিকে কৃত্রিম ঔপনিবেশিক সীমানা ভেঙে একটি একক অখণ্ড আরব উম্মাহ বা কনফেডারেশনে রূপান্তরিত করার জাতীয়তাবাদী স্বপ্ন। ১৯৫৮ সালে সিরিয়া ও মিশরের মিলনে ‘ইউনাইটেড আরব রিপাবলিক’ (UAR) গঠন ছিল এর প্রত্যক্ষ প্রয়োগ।
- আরব সমাজতন্ত্র (Arab Socialism): সাম্যবাদ বা নাস্তিক্যবাদী মার্কসবাদ নয়, বরং বৃহৎ শিল্প ও ব্যাংকের জাতীয়করণ এবং কৃষকদের মাঝে জমি বণ্টনের মাধ্যমে বৈষম্যহীন সমাজ গঠন।
- সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও জোটনিরপেক্ষতা: পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য যেকোনো সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং তিতো ও নেহেরুর সাথে মিলে নিরপেক্ষ তৃতীয় বিশ্বের নেতৃত্ব প্রদান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. নেপোলিয়ন বোনাপার্ট কত সালে মিশর অভিযান পরিচালনা করেছিলেন?
১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মিশর অভিযান পরিচালনা করে পিরামিডের যুদ্ধে মামলুকদের পরাজিত করেন।
২. প্রাচীন মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক লিপির পাঠোদ্ধার কোন পাথরের সাহায্যে করা হয়?
১৭৯৯ সালে আবিষ্কৃত ঐতিহাসিক রোসেটা স্টোনের (Rosetta Stone) সাহায্যে ১৮২২ সালে ফরাসি পণ্ডিত জ্যাঁ ফ্রাঁসোয়া শাঁপোলিয়ঁ হায়ারোগ্লিফিক লিপির পাঠোদ্ধার করেন।
৩. মিশরের ওয়াফদ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান কে ছিলেন?
সাদ জগলুল পাশা (১৮৫৯-১৯২৭) ছিলেন ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক জাতীয়তাবাদী ওয়াফদ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও অবিসংবাদিত নেতা।
৪. সুদানের মাহদী বিপ্লবের নেতা কে ছিলেন?
সুফি সাধক মুহাম্মদ আহমদ (১৮৪৪-১৮৮৫) নিজেকে প্রতিশ্রুত মাহদী ঘোষণা করে ১৮৮১ সালে ব্রিটিশ ও তুর্কি-মিশরীয় শাসনের বিরুদ্ধে মাহদী বিপ্লব শুরু করেন।
৫. সুদান কত তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করে?
১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি সুদান ইঙ্গ-মিশরীয় দ্বৈত শাসন থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
৬. সুয়েজ খাল জাতীয়করণের ঐতিহাসিক ঘোষণা কে কত সালে দেন?
১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই মিশরীয় প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের আলেকজান্দ্রিয়ার জনসভায় সুয়েজ খাল জাতীয়করণের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন।