পরীক্ষা কোড: ২০২ | বিষয় কোড: ২০৩২০২ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৫১
اختبار السنة الثانية للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ۲۰۲۱
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
বিভাগ: দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ (الدعوة والدراسات الإسلامية)
বিষয়: তারিখুদ দাওয়াহ আল-ইসলামিয়্যাহ (تاريخ الدعوة الإسلامية)
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
مجموعة (الف) [‘ক’ অংশ – রচনামূলক প্রশ্নাবলি]
أجب عن أربعة من مجموعة (الف) (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও): মান: ১৫ × ৪ = ৬০
١- تحدث عن أساليب دعوة الرسول صلى الله عليه وسلم في مكة المكرمة-
[১. মক্কা মুকাররামায় রসূল (স) এর দা’ওয়াতের পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত, সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুওয়ত লাভের পর সুদীর্ঘ ১৩ বছর পবিত্র মক্কা মুকাররামায় তাওহীদের দাওয়াত পরিচালনা করেন। চরম পৌত্তলিকতা, কুসংস্কার ও জাহেলিয়াতের ঘনঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত মক্কী সমাজে তিনি যে সুনিপুণ, হিকমতপূর্ণ ও দূরদর্শী দাওয়াতী কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত সকল দা’ঈর জন্য আলোকবর্তিকা।
১. মক্কী দাওয়াতের পর্যায়ক্রমিক রূপরেখা
মক্কী জীবনের দাওয়াত মূলত দু’টি প্রধান অধ্যায়ে বিভক্ত ছিল:
- গোপন দাওয়াতের অধ্যায় (الدعوة السرية – ৩ বছর): হেরা গুহায় প্রথম ওহী লাভের পর তিনি সর্বপ্রথম তাঁর ঘনিষ্ঠতম আত্মীয়স্বজন ও বিশ্বস্ত বন্ধুদের নিকট অত্যন্ত সংগোপনে দ্বীনের দাওয়াত পেশ করেন। এই স্তরে হযরত খাদীজা, আলী, যায়েদ ইবনে হারেসা এবং আবু বকর সিদ্দিক (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু বকর (রা.)-এর প্রভাবে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ইসলামে প্রবেশ করেন এবং দারুল আরকাম ছিল ঈমানী প্রশিক্ষণের গোপন কেন্দ্র।
- প্রকাশ্য দাওয়াতের অধ্যায় (الدعوة الجهرية – ১০ বছর): যখন নির্দেশ আসল: ﴿فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ﴾ (সূরা আল-হিজর: ৯৪), তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে মক্কার কুরাইশদের তাওহীদের পথে আহ্বান জানান।
২. মক্কায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতের প্রধান কৌশল ও পদ্ধতিসমূহ
- হিকমত ও সদুপদেশ (الحكمة والموعظة الحسنة): মক্কার বহুদেববাদী সমাজের অসার যুক্তি খণ্ডনে তিনি প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল ও আন্তরিক উপদেশ প্রয়োগ করেন। কুরআন নির্দেশ দেয়: ﴿ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ﴾ (সূরা আন-নাহল: ১২৫)।
- ব্যক্তিগত চরিত্র ও সততার প্রমাণ (القدوة الحسنة): দাওয়াত পেশ করার পূর্বে তিনি নিজের আজীবন সততা ও নিষ্কলুষ চরিত্রের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সাফা পর্বতে দাঁড়িয়ে তিনি কুরাইশদের নিকট প্রশ্ন করেছিলেন, “আমি যদি বলি এই উপত্যকার ওপার থেকে এক শত্রু সৈন্য তোমাদের আক্রমণ করতে আসছে, তোমরা কি বিশ্বাস করবে?” সবাই একবাক্যে বলেছিল, “আমরা আপনার থেকে সত্য ছাড়া কখনই মিথ্যা শুনিনি, আপনি আল-আমীন।”
- বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি ও সৃষ্টির নিদর্শন প্রদর্শন (الاستدلال العقلي): মূর্তিপূজার অসারতা প্রমাণে তিনি বিবেককে জাগ্রত করার পদ্ধতি অবলম্বন করেন। যেমন—যে মূর্তি মাছি সৃষ্টি করতে পারে না বা নিজের গায়ের মাছিটি তাড়াতে পারে না, সে কীভাবে মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করবে?
- ধৈর্য ও অহিংস প্রতিরোধ (الصبر والتحمل وعدم العنف): কুরাইশরা যখন তাঁর ও নবদীক্ষিত দুর্বল মুসলমানদের ওপর অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করল (যেমন বিলাল, খাব্বাব, সুমাইয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুম), তখন তিনি সশস্ত্র যুদ্ধের অনুমতি না দিয়ে অসীম ধৈর্য ও অবিচলতার নির্দেশ দেন: ﴿فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ﴾।
- হিজরতের বিকল্প ক্ষেত্র তৈরি: চরম নির্যাতনের মুখে সাহাবীদের জীবন রক্ষার্থে তিনি হাবশায় (ইথিওপিয়া) দুই দফায় হিজরতের নির্দেশ দেন। এটি ছিল ইসলামের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রথম কৌশলগত পদক্ষেপ।
- মৌসুমী মেলা ও বহিরাগত কাফেলায় দাওয়াত: হজ্জের মৌসুম এবং উক্বায, মাজনাহ ও যুল-মাজাযের মেলায় আরবের দূর-দূরান্ত থেকে আগত গোত্রগুলোর তাবুতে তাবুতে গিয়ে তিনি একাকী দ্বীনের দাওয়াত পেশ করতেন। এই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রের সাথে আক্বাবার ঐতিহাসিক শপথ অনুষ্ঠিত হয়।
٢- عرف الصحابة- ثم اكتب وسائل الدعوة المتبعة في عهدهم-
[২. সাহাবার পরিচয় দাও। সাহাবাদের যুগে অনুসৃত দা’ওয়াতের মাধ্যমসমূহ লেখ।]
১. সাহাবীর পরিচয় ও সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘সাহাবী’ (صحابي) শব্দটি ‘সুহবাত’ (صحبة) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ সঙ্গী, সহচর, সাথী বা বন্ধু। বহুবচনে ‘আসহাব’ (أصحاب) বা ‘সাহাবা’ (الصحابة)।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুহাদ্দিসীন ও উসূলবিদগণের সর্বসম্মত সংজ্ঞানুসারে হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহ.) ‘আল-ইসাবা ফী তাময়ীযিস সাহাবা’ গ্রন্থে বলেন:
«الصَّحَابِيُّ مَنْ لَقِيَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُؤْمِنًا بِهِ، وَمَاتَ عَلَى الْإِسْلَامِ»
অর্থ: “সাহাবী হলেন সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যিনি ঈমানের সাথে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ইসলামের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন।” (যদিও মাঝে কোনো কারণে মুরতাদ হয়ে থাকেন, কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে পুনরায় ইসলামে ফিরে এলে তিনিও সাহাবী হিসেবে গণ্য)।
২. সাহাবাদের যুগে অনুসৃত দাওয়াতের মাধ্যমসমূহ (وسائل الدعوة)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর সাহাবায়ে কেরাম সমগ্র বিশ্বে দ্বীনের দাওয়াত ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন বাস্তবমুখী ও কার্যকর মাধ্যম অবলম্বন করেছিলেন:
- পবিত্র কুরআনের সংরক্ষণ ও প্রচার: সাহাবায়ে কেরাম কুরআনকে দাওয়াতের মূল উৎস হিসেবে ব্যবহার করতেন। হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে যুদ্ধক্ষেত্রের হাফেযদের শাহাদাতের পর কুরআন একত্রীকরণ এবং হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে অভিন্ন ‘মুসহাফে উসমানী’ তৈরি করে বিভিন্ন প্রদেশে প্রেরণের মাধ্যমে বিশুদ্ধ দাওয়াতের পথ সুগম হয়।
- হাদীস রেওয়ায়েত ও তা’লীমী হালাকা: সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও বাণী সমগ্র মুসলিম জাহানে ছড়িয়ে দেন। মদীনা, কুফা, বসরা, দামেশক ও ফুসতাতের মসজিদে মসজিদে তাঁরা দরস ও হালাকা কায়েম করে নতুন প্রজন্মকে দ্বীনের জ্ঞান শিক্ষা দিতেন।
- উত্তম চরিত্র ও ন্যায়পরায়ণ শাসন (القدوة والعدل): খোলাফায়ে রাশেদীন ও প্রাদেশিক গভর্নরদের অনাড়ম্বর জীবন ও অতুলনীয় ন্যায়বিচার দেখে রোম ও পারস্যের প্রজারা দলে দলে ইসলামে দীক্ষিত হয়। কোনো বলপ্রয়োগ ছাড়াই কেবল মুসলিম শাসকদের আচরণ ছিল দাওয়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
- চিঠিপত্র ও দূত প্রেরণ (إرسال الرسل والكتب): বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান, গোত্রপ্রধান ও সেনাপতিদের নিকট দাওয়াতী পত্র পাঠানো হতো। তাঁরা যুদ্ধের পূর্বে শত্রুপক্ষকে তিনটি প্রস্তাব দিতেন: ইসলাম গ্রহণ, জিজিয়া প্রদান অথবা যুদ্ধ।
- ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ: আরব বণিক সাহাবী ও তাঁদের অনুসারীরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাফেলার মাধ্যমে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে চীন, ভারত, লঙ্কাদ্বীপ ও মালয় দ্বীপপুঞ্জে গমন করেন এবং ব্যবসায়িক সততা প্রদর্শনের মাধ্যমে সেখানে ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করেন।
- জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর মাধ্যমে তাগুতী বাধার অপসারণ: তৎকালীন রোমান ও সাসানীয় সাম্রাজ্য তাদের প্রজাদের ওপর সত্যের বাণী শোনার পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। সাহাবায়ে কেরাম বীরত্বপূর্ণ জিহাদের মাধ্যমে সেই অত্যাচারী রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে স্বাধীনভাবে দাওয়াত পৌঁছানোর উন্মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেন।
٣- اكتب نبذة عن حياة عثمان بن عفان رضى الله عنه مع بيان خدماته في الدعوة الاسلامية-
[৩. ইসলামি দা’ওয়াতে হযরত উসমান ইবনে আফ্ফান (রা) এর অবদান আলোচনামূলক তাঁর জীবনী সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ কর।]
১. হযরত উসমান ইবনে আফ্ফান (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
- নাম ও বংশপরিচয়: নাম উসমান, উপনাম আবু আমর ও আবু আবদুল্লাহ। পিতার নাম আফ্ফান, মাতার নাম আরওয়া। তিনি কুরাইশ বংশের অন্যতম প্রভাবশালী শাখা বনু উমাইয়ার সন্তান ছিলেন। হস্তীবর্ষের ষষ্ঠ বছর (৫৭৭ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
- ইসলাম গ্রহণ ও ‘যুন্নূরাইন’: প্রথম দিকেই হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর দাওয়াতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীয় কন্যা রুকাইয়াহ (রা.)-কে তাঁর সাথে বিবাহ দেন। তাঁর ইন্তেকালের পর অপর কন্যা উম্মে কুলসুম (রা.)-কেও তাঁর সাথে বিবাহ দেন। পরপর দু’জন নবীকন্যাকে বিবাহ করার এই বিরল সম্মানের কারণে তিনি ‘যুন্নূরাইন’ (দুই জ্যোতির অধিকারী) উপাধিতে ভূষিত হন।
- খেলাফত লাভ ও শাহাদাত: হযরত ওমর (রা.)-এর শাহাদাতের পর গঠিত ছয় সদস্যের শুরা কমিটির সিদ্ধান্তে ২৩ হিজরীতে তিনি তৃতীয় খলিফা নির্বাচিত হন। সুদীর্ঘ ১২ বছর খেলাফত পরিচালনার পর ৩৫ হিজরীর ১৮ যিলহজ্জ একদল চরমপন্থী বিদ্রোহীদের হাতে কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন।
২. ইসলামী দাওয়াতে হযরত উসমান (রা.)-এর অবিস্মরণীয় অবদান
- আল-কুরআনের সর্বজনীন সংস্করণ সংকলন (جمع القرآن وتوحيد المصحف): ইসলামি দাওয়াতের ইতিহাসে এটি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান। আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান অভিযানে বিভিন্ন অঞ্চলের সৈন্যদের মধ্যে কিরাত ও উচ্চারণ নিয়ে মতভেদ দেখে হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) খলিফাকে সতর্ক করেন। হযরত উসমান (রা.) হযরত হাফসা (রা.)-এর কাছে রক্ষিত মূল সহিফা আনিয়ে যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে কুরাইশী উচ্চারণে প্রামাণ্য প্রতিলিপি প্রস্তুত করেন এবং সাম্রাজ্যের প্রধান কেন্দ্রগুলোতে পাঠিয়ে দেন। ফলে মুসলিম উম্মাহর দাওয়াতী সংবিধান কিয়ামত পর্যন্ত বিকৃতি ও বিভক্তি থেকে রক্ষা পায়। এ কারণে তাঁকে ‘জামেউল কুরআন’ বলা হয়।
- বিপুল ধনসম্পদ দ্বীনের পথে উৎসর্গ (الإنفاق في سبيل الله): মদীনায় হিজরতের পর পানির তীব্র সংকটে মুসলমানরা বিপন্ন হলে তিনি ইহুদির নিকট থেকে ‘বি’রে রুমা’ (রুমা কূপ) ৩৫ হাজার দিরহামে ক্রয় করে সাধারণ মানুষের জন্য ওয়াকফ করে দেন। তাবুক যুদ্ধের (জায়শুল উসরাহ) সময় তিনি একাই এক হাজার উট, সত্তরটি ঘোড়া এবং এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা দান করেন। এতে রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন: “আজকের পর উসমান যা-ই করুক, কোনো কিছুই তার ক্ষতি করবে না।”
- মসজিদে নববীর সম্প্রসারণ: মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে তিনি নিজ খরচে পার্শ্ববর্তী জমি ক্রয় করে মসজিদে নববীকে সম্প্রসারিত ও সুসজ্জিত করেন।
- বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে ইসলামের দাওয়াত ও নৌবাহিনী গঠন: তাঁর খিলাফতকালে ইসলামী সাম্রাজ্য আফ্রিকা, ত্রিপলী, সাইপ্রাস, খোরাসান, তাবারিস্তান ও সিন্ধু পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তিনি মুসলিম ইতিহাসের সর্বপ্রথম শক্তিশালী নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে যায়।
٤- عرف التابعين- ثم بين فضلهم ومساهمتهم في رواية الحديث النبوى موضحا-
[৪. তাবেয়িন এর পরিচয় দাও। তাবেয়িনদের মর্যাদা এবং হাদিস রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান বিশদভাবে বর্ণনা কর।]
১. তাবেয়ীর সংজ্ঞা ও পরিচয়
আভিধানিক অর্থ: ‘তাবেয়ী’ (تابعي) শব্দটি ‘তাবা’আ’ (تبع) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ অনুসারী, পশ্চাদগামী বা সঙ্গী। বহুবচনে ‘তাবেয়ীন’ (التابعون / التابعين)।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: উলূমুল হাদীসের পরিভাষায় হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী ও খতীব বাগদাদী বলেন:
«التَّابِعِيُّ هُوَ مَنْ لَقِيَ الصَّحَابِيَّ مُؤْمِنًا بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَاتَ عَلَى الْإِسْلَامِ»
অর্থ: “তাবেয়ী হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি কোনো সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন মুমিন অবস্থায় এবং ইসলামের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন।” ইমাম হাকিম নাইসাবুরী বলেন, কেবল দেখা করাই যথেষ্ট নয়, বরং সাহাবীর সাহচর্য বা রেওয়ায়েত অর্জন করাই তাবেয়ী হওয়ার পূর্ণাঙ্গ শর্ত।
২. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাবেয়ীনদের মর্যাদা
- পবিত্র কুরআনের সাক্ষ্য: আল্লাহ তা’আলা তাবেয়ীনদের ওপর স্বীয় সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়ে ইরশাদ করেন:
﴿وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ﴾ [التوبة: ١٠٠]
(আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রবর্তী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে)।
- হাদীসের সাক্ষ্য: সর্বশ্রেষ্ঠ তিন যুগের দ্বিতীয় যুগ হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাবেয়ীনদের যুগকে চিহ্নিত করেছেন:
«خَيْرُ أُمَّتِي قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ» [صحيح البخاري: ٣٦٥١]
(আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগ [তাবেয়ীন], অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগ [তাবে-তাবেয়ীন])।
৩. হাদীস রেওয়ায়েত ও সংরক্ষণে তাবেয়ীনদের অনন্য অবদান
সাহাবায়ে কেরামের পর হাদীসের মূল সংরক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়নের দায়িত্ব পালন করেন তাবেয়ীনগণ:
- হাদীস অন্বেষণে দীর্ঘ সফর (الرحلة في طلب الحديث): তাবেয়ীনগণ কেবল একটি হাদীস যাচাই ও শ্রবণের জন্য শত শত মাইল মরুপথ অতিক্রম করে সাহাবীদের দ্বারে দ্বারে উপস্থিত হতেন। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) বলতেন, “আমি একটিমাত্র হাদীসের জন্য বহু দিন ও রাত পায়ে হেঁটে সফর করেছি।”
- হাদীসের প্রথম আনুষ্ঠানিক সংকলন (تدوين الحديث): খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর নির্দেশে তাবেয়ী ইমাম মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব আয-যুহরী (রহ.) সর্বপ্রথম সরকারি উদ্যোগে হাদীস গ্রন্থনা শুরু করেন।
- মদীনার সাত ফকীহ (الفقهاء السبعة): মদীনায় তাবেয়ীগণের শীর্ষ সাতজন ফকীহ হাদীস ও ফিকহের প্রামাণ্য সমাধান দিতেন— সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, উরওয়াহ ইবনুয যুবাইর, আল-কাসিম ইবনে মুহাম্মদ, খারিজা ইবনে যায়েদ, আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান, সুলাইমান ইবনে ইয়াসার এবং উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ।
- সনদ যাচাই ও আসমাউর রিজালের সূচনা: ফিতনার যুগে শিয়া, খারেজী ও জাল হাদিস রচনাকারীদের বিভ্রান্তি ঠেকাতে তাবেয়ী মুহাম্মদ ইবনে সিরীন (রহ.) ঘোষণা করেন: “إِنَّ هَذَا الْعِلْمَ دِينٌ، فَانْظُرُوا عَمَّنْ تَأْخُذُونَ دِينَكُمْ” (নিশ্চয় এই ইলম হলো দ্বীন, অতএব লক্ষ্য কর কার নিকট থেকে তোমরা তোমাদের দ্বীন গ্রহণ করছ)। এভাবেই হাদিসের নির্ভুল সনদ ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয়।
٥- اكتب نبذة عن حياة حسن البصرى رحمه الله- بين مساهمته في الوعظ والنصيحة-
[৫. হাসান বসরী (রহ) এর জীবনী সংক্ষেপে লেখ। ওয়াজ ও নসীহতের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বর্ণনা কর।]
১. ইমাম হাসান বসরী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
- নাম ও জন্ম: নাম আল-হাসান, উপনাম আবু সাঈদ। পিতার নাম ইয়াসার এবং মাতার নাম খায়রা (যিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামাহ রাযি.-এর মুক্তদাসী ছিলেন)। হযরত ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালের শেষভাগে ২১ হিজরীতে মদীনা মুনাওয়ারায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে উম্মুল মুমিনীনের কোলে তিনি লালিত-পালিত হন এবং খলিফা ওমর (রা.) তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন: “اللَّهُمَّ فَقِّهْهُ فِي الدِّينِ، وَحَبِّبْهُ إِلَى النَّاسِ” (হে আল্লাহ! তাকে দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা দান করুন এবং মানুষের প্রিয়ভাজন করুন)।
- ইলম অর্জন: তিনি বদরী সাহাবীসহ বহু প্রবীণ সাহাবীর সাহচর্য লাভ করেন। বিশেষ করে হযরত আলী (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর নিকট থেকে সরাসরি ইলম হাসিল করেন। পরে তিনি বসরার প্রধান ইলমী মারকাযের ইমাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
- ইন্তেকাল: ১১০ হিজরীতে এই মহান তাবেয়ী বসরায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাযায় এত বিপুল মানুষের ঢল নেমেছিল যে ঐ দিন বসরার জামে মসজিদে আসরের নামাজ অনুষ্ঠিত হতে পারেনি।
২. ওয়াজ ও নসীহতের ক্ষেত্রে হাসান বসরী (রহ.)-এর অনন্য অবদান
- হৃদয়গ্রাহী ও অশ্রুসিক্ত বাগ্মিতা: হাসান বসরী (রহ.) ছিলেন তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ খতীব ও ওয়ায়েজ। তাঁর বক্তব্য শুনে শ্রোতাদের চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতো এবং অন্তর আল্লাহর ভয়ে কেঁপে উঠত। তাঁর কথা সম্পর্কে বলা হতো: “كَلَامُ الْحَسَنِ يُشْبِهُ كَلَامَ الْأَنْبِيَاءِ” (হাসানের কথা যেন নবীদের কথার অনুরূপ প্রভাব বিস্তার করে)।
- দুনিয়াবিমুখতা ও যুহদের পুনরুজ্জীবন: উমাইয়া যুগে যখন মুসলিম সমাজে প্রচুর ধনসম্পদ ও বিলাসিতার প্রবেশ ঘটেছিল, তখন হাসান বসরী (রহ.) সমাজকে আখেরাতমুখী করার জন্য তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি বলতেন: “হে আদম সন্তান! তুমি তো কেবল কতগুলো দিনের সমষ্টি; যখন একটি দিন চলে যায়, তখন তোমার জীবনের একটি অংশ বিলীন হয়ে যায়।”
- শাসকদের সামনে নির্ভীক সত্যভাষণ: তিনি উমাইয়া খলিফা ও কঠোর গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিঃসংকোচে নসীহত করতেন। হাজ্জাজের নির্মমতার জবাবে তিনি মৃত্যুর ভয় না করে হক কথা তুলে ধরেছিলেন।
- ইখলাস ও অন্তরের ব্যাধির চিকিৎসা: তিনি রিয়া (লোকদেখানো আমল), অহংকার ও মুনাফেকীর লক্ষণগুলো বিশ্লেষণ করে মানুষকে খাঁটি অন্তরে ইবাদত করার তাগিদ দিতেন। তিনি বলতেন, “যে ব্যক্তি আখেরাত অন্বেষণ করে সে দুনিয়া ও আখেরাত উভয়টিই পায়, আর যে দুনিয়া খোঁজে সে উভয়টিই হারায়।”
٦- كيف انتشر الإسلام في منطقة راجشاهي؟ بيّن موضحا-
[৬. রাজশাহী অঞ্চলে কীভাবে ইসলাম প্রচারিত হয়? বিশদভাবে বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
প্রাচীন বাংলার বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র পদ্মা বিধৌত রাজশাহী অঞ্চল ছিল হিন্দু সেন রাজাদের শক্ত ঘাঁটি ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির লীলাভূমি। এই অঞ্চলে ইসলামের শাশ্বত বাণী কোনো রাজনৈতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে নয়, বরং একদল আত্মত্যাগী সুফি-দরবেশের আগমন, তাঁদের আধ্যাত্মিক সাধনা, চরিত্র মাধুর্য এবং সামাজিক সাম্যের আকর্ষণে বিদ্যুতবেগে সাধারণ জনগণের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছিল।
১. রাজনৈতিক পটভূমি ও ইখতিয়ার উদ্দিন খিলজীর বিজয়
১২০৪-১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী নদীয়া ও লক্ষণাবতী জয়ের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন। এর ফলে উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় সুফি-সাধক ও ধর্মপ্রচারকদের জন্য এক নিরাপদ ও অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়।
২. সুফি-সাধকগণের আগমন ও দাওয়াতী ভূমিকা
রাজশাহী অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী কয়েকজন প্রখ্যাত সুফি সাধক:
- শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.): রাজশাহী অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের প্রধান পুরোধা ব্যক্তিত্ব হলেন হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.)। তিনি ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে (আনুমানিক ১২৮৮ খ্রি.) মধ্য এশিয়া থেকে বাগদাদ হয়ে পদ্মা নদীর তীরে রামপুর-বোয়ালিয়ায় (বর্তমান রাজশাহী শহর) আগমন করেন। তিনি ছিলেন হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর বংশধর। পদ্মার তীরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত খানকাহ ও দরগাহ ছিল আর্তমানবতার সেবাকেন্দ্র। তিনি স্থানীয় অবহেলিত অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষকে সম্মান ও ভালোবাসায় বরণ করে নেন। তাঁর প্রভাবে তৎকালীন রাজা ও অগণিত সাধারণ হিন্দু-বৌদ্ধ ইসলাম গ্রহণ করেন।
- শাহ তুর্কান শহিদ (রহ.): শাহ মখদুমের আগমনের পূর্বে এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছিলেন শাহ তুর্কান (রহ.)। তিনি অত্যাচারী রাজাদের বিরুদ্ধে মজলুমদের পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং শাহাদাত বরণ করেন।
- হযরত জালাল উদ্দিন তাবরিজী (রহ.): রাজশাহীর সন্নিকটস্থ মালদহ ও বরেন্দ্র অঞ্চলে সুফি সাধক জালাল উদ্দিন তাবরিজী (রহ.)-এর দাওয়াতী সফর রাজশাহী ভূখণ্ডে ইসলামের বিস্তারকে ব্যাপক ত্বরান্বিত করে।
- বোরহান উদ্দিন বাগা (রহ.): রাজশাহীর বাঘা অঞ্চলে হযরত শাহ মোয়াজ্জেম ওরফে শাহ দৌলা এবং হযরত মাওলানা আবদুল হামিদ দানিশমন্দ (রহ.) এক বিশাল ইসলামি শিক্ষা কেন্দ্র ও মাদরাসা গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে মুঘল আমলে এখানে বাঘা শাহী মসজিদ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম দাওয়াতী বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়।
৩. ইসলাম দ্রুত বিস্তারের কারণসমূহ
- ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্য থেকে মুক্তি: তৎকালীন সেন শাসনামলে তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দু ও বঞ্চিত বৌদ্ধ জনগণ তীব্র সামাজিক নির্যাতনের শিকার ছিল। ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও একত্ববাদের বাণী তাদের মুক্তির দিশা দেয়।
- খানকাহ ভিত্তিক সমাজসেবা ও চিকিৎসা: সুফিদের লঙ্গরখানায় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে বিনামূল্যে অন্ন বিতরণ এবং ভেষজ চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের অন্তরে ইসলামের প্রতি গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি করা হতো।
এভাবেই আধ্যাত্মিকতা, শিক্ষা ও সুফিগণের অনুপম চরিত্রের স্পর্শে রাজশাহী অঞ্চল এক ঐতিহাসিক মুসলিম জনপদে রূপান্তরিত হয়।
مجموعة (ب) [‘খ’ অংশ – সংক্ষিপ্ত উত্তরীয় প্রশ্নাবলি]
أجب عن أربعة أسئلة من الآتية (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও): মান: ৫ × ৪ = ২০
٧- اكتب وصية أبي بكر رضى الله عنه لعمر رضى الله عنه حين استخلفه-
[৭. আবু বকর (রা) ওমর (রা)-কে খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করার পর তাঁকে যে ওসিয়ত করেছিলেন তা লেখ:]
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর ওফাতকালে মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ সংহতির স্বার্থে সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শক্রমে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে খলিফা মনোনীত করেন। দায়িত্ব অর্পণের প্রাক্কালে তিনি ওমর (রা.)-কে ডেকে যে ঐতিহাসিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ওসিয়ত করেছিলেন, তার মূল অংশ নিম্নরূপ:
- আল্লাহর দিনের ও রাতের হকের সচেতনতা: “হে ওমর! তুমি আল্লাহকে ভয় কর। জেনে রেখ, দিনে আল্লাহর কিছু নির্দিষ্ট হক বা দায়িত্ব রয়েছে যা তিনি রাতে গ্রহণ করেন না; এবং রাতে তাঁর কিছু হক রয়েছে যা তিনি দিনে গ্রহণ করেন না।”
- ফরয আদায়ের পূর্বে নফল অগ্রাহ্য: “জেনে রেখ, যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি ফরয আমল যথাযথভাবে আদায় না করবে, ততক্ষণ তোমার কোনো নফল আমল আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না।”
- মীযানের পাল্লা ভারী হওয়ার রহস্য: “কেয়ামতের দিন যাদের নেক আমলের পাল্লা ভারী হবে, তা কেবল এজন্যই হবে যে তারা দুনিয়াতে হকের অনুসরণ করেছিল এবং হক পালন করা ছিল তাদের জন্য কঠিন। পক্ষান্তরে যাদের পাল্লা হালকা হবে, তা এজন্য যে তারা বাতেল ও মিথ্যার অনুসরণ করেছিল।”
- ভয় ও আশার ভারসাম্য: “আল্লাহ তা’আলা জান্নাতীদের আলোচনা করেছেন তাঁদের সর্বোত্তম আমলের মাধ্যমে এবং জাহান্নামীদের আলোচনা করেছেন তাঁদের নিকৃষ্ট আমলের মাধ্যমে। সুতরাং মুমিন সর্বদা আশা ও ভয়ের মাঝে থাকবে—আল্লাহর কাছে অযৌক্তিক দাবি করবে না, আবার তাঁর রহমত থেকেও নিরাশ হবে না।”
- ওসিয়ত পালনের গুরুত্ব: “যদি তুমি আমার এই উপদেশগুলো হৃদয়ে ধারণ কর, তবে তোমার কাছে মৃত্যুর চেয়ে প্রিয় কোনো বস্তু থাকবে না, যা তোমার জন্য অবধারিত। আর যদি এগুলো বিনষ্ট কর, তবে তোমার কাছে মৃত্যুর চেয়ে অপ্রিয় কিছু থাকবে না, আর তুমি তা এড়াতেও পারবে না।”
٨- اكتب مساهمة الإمام أبي حنيفة رحمه الله في تطوير الفقه الإسلامي موجزا-
[৮. ফিকহে ইসলামির বিকাশে ইমাম আবু হানীফা (রহ) এর অবদান সংক্ষেপে লেখ:]
ফিকহে ইসলামীর নিয়মতান্ত্রিক বিন্যাস, গবেষণা ও সংকলনের ক্ষেত্রে ইমামুল আযম আবু হানীফা নোমান ইবনে সাবিত (রহ.) (৮০-১৫০ হি.)-এর অবদান একক ও অবিসংবাদিত। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন: “النَّاسُ فِي الْفِقْهِ عِيَالٌ عَلَى أَبِي حَنِيفَةَ” (ফিকহের ক্ষেত্রে সকল মানুষই আবু হানীফার মুখাপেক্ষী)।
- ফিকহী শুরা পরিষদ গঠন ও যৌথ গবেষণা: তিনি একক সিদ্ধান্তে ফতোয়া না দিয়ে ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ও ইমাম যুফার (রহ.)-এর মতো চল্লিশজন শীর্ষ মুজতাহিদ পণ্ডিতকে নিয়ে একটি ‘ফিকহ একাডেমি’ বা যৌথ গবেষণা পরিষদ গঠন করেন। কোনো মাসআলা উপস্থাপিত হলে কয়েক দিন ধরে আলোচনা-বিতর্কের পর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে তা লিপিবদ্ধ করা হতো।
- অনুমানভিত্তিক বা কাল্পনিক ফিকহের প্রবর্তন (الفقه التقديري): ভবিষ্যতে ঘটতে পারে এমন বহু জটিল পরিস্থিতির অগ্রিম সমাধান তিনি কুরআন-সুন্নাহর মূলনীতির আলোকে বের করে রেখেছিলেন, যা ইসলামী আইনের আধুনিকতাকে বহু শতাব্দী এগিয়ে দেয়।
- কেয়াস ও ইসতিহসানের সুশৃঙ্খল প্রয়োগ: নতুন উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে তিনি কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক উদ্দেশ্য (মাক্বাসিদুশ শরীয়াহ) রক্ষা করে কিয়াস ও জনকল্যাণমুখী ‘ইসতিহসান’ পদ্ধতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
- অধ্যায়ভিত্তিক কিতাব আকারে ফিকহের সংকলন: তিনিই সর্বপ্রথম পবিত্রতা (তাহারাত), নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, ক্রয়-বিক্রয় (বুয়ূ’) ইত্যাদি সুনির্দিষ্ট অধ্যায়ে ইসলামী আইনকে সুশৃঙ্খলভাবে সংকলন করেন।
٩- اذكر استقامة الإمام احمد بن حنبل رحمه الله وثبوته على الحق أمام فتنة خلق القرآن-
[৯. فتنة خلق القرآن এর সময় ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ) এর সত্যের উপর অবিচলতা ও ইস্তেকামাত সম্পর্কে আলোচনা কর:]
১. ফিতনায়ে খালকে কুরআনের পটভূমি: আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন, মু’তাসিম ও ওয়াসিকের আমলে মু’তাযিলা দার্শনিকদের প্রভাবে এই বিভ্রান্তিকর আকিদা রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয় যে, ‘কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং সৃষ্টি’ (خلق القرآن)। তৎকালীন বহু আলেম প্রাণভয়ে কিংবা কৌশলে রাষ্ট্রীয় মত মেনে নেন। কিন্তু ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) অটলভাবে ঘোষণা করেন: “الْقُرْآنُ كَلَامُ اللَّهِ غَيْرُ مَخْلُوقٍ” (কুরআন আল্লাহর কালাম, তা সৃষ্ট নয়)।
২. ইমামের অতুলনীয় ইস্তেকামাত ও নির্যাতন বরণ:
- কারাবরণ ও চাবুকের আঘাত: খলিফা মু’তাসিমের দরবারে তাঁকে ভারী শিকল পরিয়ে হাজির করা হয়। জল্লাদরা পালাক্রমে তাঁকে এমন তীব্র বেত্রাঘাত করত যে সাধারণ মানুষ হলে মরে যেত। প্রতি আঘাতে তাঁর শরীর রক্তাক্ত হতো এবং তিনি বেহুঁশ হয়ে যেতেন; কিন্তু জ্ঞান ফিরলেই বলতেন: “আমাকে কুরআন বা হাদিস থেকে একটি দলিল দিন, আমি তা মেনে নেব।”
- বন্দিদশা ও গৃহবন্দিত্ব: দীর্ঘ ২৮ মাস তাঁকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কারারুদ্ধ রাখা হয়। এরপর ওয়াসিকের আমলেও দীর্ঘকাল তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখা হয় এবং জামাতে নামাজ পড়া ও দারস দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়।
- হকের বিজয় ও সুন্নাহর হেফাজত: অবশেষে খলিফা মুতাওয়াক্কিলের আমলে এই ফিতনার অবসান ঘটে এবং ইমাম আহমদকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হয়। ইমাম আহমদের এই পর্বতসম অবিচলতার কারণেই ইসলামী উম্মাহর বিশুদ্ধ আকিদা রক্ষা পেয়েছিল। এজন্য আলী ইবনুল মাদীনী (রহ.) বলেন: “আল্লাহ তা’আলা রিদ্দার যুদ্ধের দিন আবু বকর (রা.) দ্বারা এবং খালকে কুরআনের ফিতনার দিন আহমদ বিন হাম্বল দ্বারা ইসলামকে রক্ষা করেছেন।”
١٠- اكتب أسماء عشرة من اشهر المحدثين من اتباع التابعين-
[১০. اتباع التابعين যুগের দশজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসের নাম লেখ:]
তাবে-তাবেয়ীন (اتباع التابعين) হলেন সেই সম্মানিত প্রজন্ম, যাঁরা তাবেয়ীনদের সাহচর্য লাভ করেছিলেন এবং হাদীস সংকলন ও সংরক্ষণে স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করেছিলেন। নিম্নে তাবে-তাবেয়ীন যুগের দশজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিসের নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় উল্লেখ করা হলো:
- ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) (৯৩-১৭৯ হি.): মদীনার প্রধান মুহাদ্দিস ও ফকীহ, সুবিখ্যাত প্রথম প্রামাণ্য হাদীসগ্রন্থ ‘আল-মুয়াত্তা’-এর রচয়িতা।
- সুফিয়ান সাওরী (রহ.) (৯৭-১৬১ হি.): কুফার শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিস, যাঁকে হাদীসশাস্ত্রে ‘আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস’ বলা হয়।
- সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ (রহ.) (১০৭-১৯৮ হি.): মক্কার সুবিখ্যাত মুহাদ্দিস ও হাফেযে হাদীস, যাঁর কাছ থেকে শত শত মুহাদ্দিস হাদিস গ্রহণ করেছেন।
- শু’বাহ ইবনুল হাজ্জাজ (রহ.) (৮২-১৬০ হি.): বসরার শীর্ষ মুহাদ্দিস, হাদীসের সহীহ ও যঈফ বর্ণনাকারী যাচাইয়ে রিজাল শাস্ত্রের প্রথম পথিকৃৎ।
- আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) (১১৮-১৮১ হি.): খোরাসানের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, যিনি ইলম, জিহাদ ও দানশীলতার অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।
- আল-লাইস ইবনে সা’দ (রহ.) (৯৪-১৭৫ হি.): মিসরের শীর্ষ মুহাদ্দিস ও ফকীহ, যাঁর সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী বলেছিলেন যে তিনি ফিকহে ইমাম মালিকের চেয়েও অগ্রগামী ছিলেন।
- হাম্মাদ ইবনে সালামাহ (রহ.) (৯১-১৬৭ হি.): বসরার অন্যতম প্রধান মুহাদ্দিস ও আরবি ব্যাকরণবিদ, যিনি হযরত আনাস (রা.)-এর হাদিস সংরক্ষণে অগ্রগণ্য ছিলেন।
- ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান (রহ.) (১২০-১৯৮ হি.): হাদীসের জারহ ও তা’দীল (সমালোচনা সাহিত্য) শাস্ত্রের অন্যতম মহান ইমাম।
- ওয়াকী ইবনুল জাররাহ (রহ.) (১২৮-১৯৭ হি.): কুফার সুবিখ্যাত মুহাদ্দিস ও হাফেয, যিনি ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদের ওস্তাদ ছিলেন।
- আবদুর রহমান ইবনে মাহদী (রহ.) (১৩৫-১৯৮ হি.): বসরার শীর্ষ মুহাদ্দিস, যিনি হাদীসের ইল্লত (সূক্ষ্ম ত্রুটি) নির্ণয়ে অতুলনীয় ছিলেন।
١١- اكتب دورا الشيخ معين الدين الجشتي رحمه الله في نشر الإسلام في شبه القارة الهندية بالإيجاز-
[১১. ভারত উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে শেখ মুঈনুদ্দিন চিশতী (রহ) এর অবদান সংক্ষেপে লেখ:]
ভারত উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের ইতিহাসে সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতী সানজারী আজমিরী (রহ.) (৫৩৬-৬৩৩ হি. / ১১৪২-১২৩৬ খ্রি.)-এর অবদান চিরস্মরণীয় ও দিগন্তকারী।
- আজমিরে আগমন ও দাওয়াত কেন্দ্র স্থাপন: রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আধ্যাত্মিক নির্দেশে তিনি সুদূর মধ্য এশিয়া থেকে হিজরত করে ভারতে আসেন। তৎকালীন হিন্দু রাজপুত শক্তির কেন্দ্রস্থল রাজস্থানের আজমিরে তিনি স্বীয় খানকাহ ও দাওয়াতী মিশন স্থাপন করেন।
- লক্ষ লক্ষ মানুষের ইসলাম গ্রহণ: বর্ণপ্রথা ও জাতিভেদের যাঁতাকলে পিষ্ট নিম্নবর্ণের অচ্ছুত হিন্দু সম্প্রদায় তাঁর অনুপম চরিত্র, প্রেম, সহমর্মিতা ও সাম্যের আচরণে মুগ্ধ হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁর হাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় নব্বই লক্ষ মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে।
- চিশতিয়া তরিকার প্রচার ও প্রতিনিধি প্রেরণ: তিনি চিশতিয়া তরিকাকে উপমহাদেশে সুদৃঢ় করেন এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বীয় সুযোগ্য খলিফাদের প্রেরণ করেন—যেমন দিল্লিতে খাজা কুতবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ.) এবং পাঞ্জাবে বাবা ফরিদ গঞ্জে শকর (রহ.), যার ফলে সারা ভারতে ইসলামের দাওয়াতী নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়ে।
- লঙ্গরখানা ও মানবসেবা (خدمة الخلق): তাঁর খানকাহে ২৪ ঘণ্টা লঙ্গরখানা চালু থাকত, যেখানে ধনী-দরিদ্র, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই একসাথে বসে খাবার খেত। এই অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রেমই ছিল ইসলামের সর্বাধিক শক্তিশালী দাওয়াত।
١٢- علق على اثنين مما يلى: (الف) الدعوة في المدينة المنورة في عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم (ب) أم المؤمنين خديجة رضى الله عنها (ج) عمر بن عبد العزيز رحمة الله عليه (د) الموعظة الحسنة
[১২. নিম্নের যে কোনো দুটি বিষয়ের উপর টীকা লেখ: (পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির স্বার্থে চারটি বিষয়েরই বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিম্নে দেওয়া হলো):]
(الف) الدعوة في المدينة المنورة في عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم (মদীনা মুনাওয়ারায় নববী দাওয়াত)
মক্কায় দীর্ঘ ১৩ বছর একক বিশ্বাসের ভিত গড়ার পর মদীনায় হিজরতের মাধ্যমে দাওয়াতী কার্যক্রম রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও আইনি পূর্ণতা লাভ করে। মদীনায় দাওয়াতের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ ছিল: (১) মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা, যা ছিল দাওয়াত, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রধান কেন্দ্র; (২) মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা (মুআখাত); (৩) বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদীনা সনদ’ প্রণয়ন, যার মাধ্যমে মুসলিম ও অমুসলিম ইহুদিদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি নির্ধারিত হয়; (৪) সমকালীন বিশ্বের পরাশক্তি রোম, পারস্য, আবিসিনিয়া ও মিসরের সম্রাটদের নিকট ইসলামের দাওয়াতী চিঠি ও প্রতিনিধি প্রেরণ; এবং (৫) হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে শান্তি স্থাপন করে ব্যাপক মাত্রায় দাওয়াত ছড়িয়ে দেওয়া, যার পরিণতিতে মক্কা বিজয় সম্পন্ন হয়।
(ب) أم المؤمنين خديجة رضى الله عنها (উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহা)
হযরত খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রাযি.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথমা স্ত্রী, নারীদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী এবং ইসলামের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মত্যাগী নারী। হেরা গুহায় প্রথম ওহী লাভের পর আতঙ্কগ্রস্ত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তিনি অভয় দিয়ে বলেছিলেন: “কখনই নয়! আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনই লাঞ্ছিত করবেন না; কারণ আপনি আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক রাখেন, অসহায়ের বোঝা বহন করেন এবং সত্যের সহায়তা করেন।” নবুওয়তের সূচনাপর্বে তিনি নিজের সমস্ত অতুলনীয় ধনসম্পদ দ্বীনের দাওয়াতে ব্যয় করে দেন। শি’আবে আবু তালিবে তিন বছরের বন্দিদশায় তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে পাহাড়ের মতো অটল থেকে অনাহারে দিন কাটিয়েছিলেন। দশম নববী বর্ষে তাঁর ইন্তেকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) এত গভীরভাবে শোকাহত হন যে ঐ বছরকে ‘আমুল হুযন’ (দুঃখের বছর) ঘোষণা করা হয়েছিল।
(ج) عمر بن عبد العزيز رحمة الله عليه (হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.)
উমাইয়া খলিফা হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) (৬১-১০১ হি.)-কে তাঁর অনুপম ন্যায়পরায়ণতা, খেলাফতে রাশেদার আদর্শ পুনরুজ্জীবন এবং তাকওয়ার কারণে ইতিহাসের ‘পঞ্চম খলিফায়ে রাশেদ’ বলা হয়। মাত্র আড়াই বছরের শাসনামলে (৯৯-১০১ হি.) তিনি উমাইয়া রাজপরিবারের অন্যায়ভাবে দখলকৃত সকল সম্পদ বায়তুলমালে বাজেয়াপ্ত করেন, বংশীয় বৈষম্য দূর করেন এবং অমুসলিম প্রজাদের সাথে জিজিয়ার অন্যায্য প্রয়োগ রহিত করেন। ফলে দলে দলে অমুসলিমরা ইসলাম গ্রহণ করে। সরকারি উদ্যোগে তিনিই সর্বপ্রথম হাদীস সংকলনের ফরমান জারি করেন। তাঁর আমলে সুবিচার ও অর্থনৈতিক প্রাচুর্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে যাকাত নেওয়ার মতো কোনো দরিদ্র মানুষ খুঁজে পাওয়া যেত না।
(د) الموعظة الحسنة (উত্তম নসীহত বা সদুপদেশ)
‘আল-মাও’ইযাতুল হাসানাহ’ (الموعظة الحسنة) হলো দাওয়াত ইলাল্লাহর অন্যতম প্রধান কুরআনিক ভিত্তি (সূরা আন-নাহল: ১২৫)। এর অর্থ হলো এমন প্রাঞ্জল, স্নেহশীল, দরদমাখা ও আন্তরিক উপদেশ, যা মানুষের অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে এবং বিবেককে সৎকাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। উত্তম নসীহতের অপরিহার্য শর্ত হলো—উপদেশদাতাকে অহংকার ও কর্কশ ভাষা পরিহার করতে হবে, কোনো মানুষের ব্যক্তিগত দোষ জনসমক্ষে প্রকাশ করে লজ্জিত করা যাবে না, বরং নির্জনে পরম মমতায় সংশোধন করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: «الدِّينُ النَّصِيحَةُ» (দ্বীন হলো একান্ত শুভকামনা ও সদুপদেশ – সহীহ মুসলিম: ৫৫)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: মক্কার গোপন দাওয়াতের প্রধান কেন্দ্র কোনটি ছিল?
উত্তর: মক্কার গোপন দাওয়াতের প্রাথমিক তিন বছর সাহাবায়ে কেরামের একত্র হওয়া, নামাজ আদায় ও দ্বীনী প্রশিক্ষণের প্রধান কেন্দ্র ছিল হযরত আরকাম ইবনে আবিল আরকাম (রা.)-এর বাড়ি (দারুল আরকাম)।
প্রশ্ন ২: হযরত উসমান (রা.)-কে কেন ‘জামেউল কুরআন’ বলা হয়?
উত্তর: বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিমদের মধ্যে কিরাত নিয়ে মতভেদ দেখা দিলে তিনি কুরতুবী ও কুরাইশী উচ্চারণের ভিত্তিতে সাহাবাদের ঐকমত্যে কুরআনের প্রামাণ্য একক সংস্করণ সংকলন ও প্রচার করেছিলেন, ফলে উম্মাহ বিভক্তি থেকে রক্ষা পায়।
প্রশ্ন ৩: তাবেয়ী কাদের বলা হয়?
উত্তর: উলূমুল হাদীসের পরিভাষায় যে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ইসলামের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁকে তাবেয়ী বলা হয়।
প্রশ্ন ৪: ‘ফিতনায়ে খালকে কুরআন’ কী ছিল?
উত্তর: আব্বাসীয় যুগে মু’তাযিলা দার্শনিকদের প্ররোচনায় সৃষ্টি হওয়া এক বিভ্রান্তিকর রাষ্ট্রীয় চাপ, যেখানে দাবি করা হতো যে কুরআন আল্লাহর অবিনশ্বর কালাম নয় বরং সৃষ্ট। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) অসীম নির্যাতনের মুখেও এর বিরুদ্ধে অটল থেকে খাঁটি আকিদা রক্ষা করেন।
প্রশ্ন ৫: রাজশাহী অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের প্রধান পুরোধা ব্যক্তিত্ব কে ছিলেন?
উত্তর: হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.), যিনি ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে বাগদাদ থেকে এসে পদ্মা তীরবর্তী রামপুর-বোয়ালিয়ায় (রাজশাহী) খানকাহ স্থাপন করে নিজ আধ্যাত্মিকতা ও মানবসেবার মাধ্যমে ব্যাপক ইসলাম প্রচার করেন।
প্রশ্ন ৬: খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতী (রহ.)-এর মূল দাওয়াতী কেন্দ্র কোথায় ছিল?
উত্তর: ভারতের রাজস্থানের আজমিরে, যেখানে তিনি খানকাহ ও লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠা করে প্রেম, ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের বাণীর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ইসলামে দীক্ষিত করেন।